আমরা যখন ‘নেশা’ শব্দটা শুনি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিগারেট, মদ বা ড্রাগসের ছবি। আমরা জানি এগুলোর মধ্যে নিকোটিন বা অ্যালকোহলের মতো উপাদান থাকে যা মানুষকে নির্ভরশীল করে তোলে। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আপনার আদরের সন্তানটি কেন একটি চকলেটের জন্য মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে কান্নাকাটি করে? কেন সে ডাল-ভাত ফেলে লজেন্সের জন্য জেদ ধরে?
অনেকেই মনে করেন এটি শিশুদের দুষ্টুমি বা বায়না। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় এটি অনেক সময় সাধারণ বায়নার গণ্ডি পেরিয়ে ‘আসক্তি’ বা অ্যাডিকশনের পর্যায়ে চলে যায়। প্রশ্ন হলো—লজেন্স বা চকলেটে তো মদ বা নিকোটিন নেই, তবে এতে কেন নেশা হয়? আজ আমরা এই রহস্যের গভীরে যাব।
১. আসক্তির আসল কারিগর: ডোপামিন (Dopamine)
আমাদের মস্তিষ্কে একটি অঞ্চল আছে যাকে বলা হয় ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ (Reward System)। আমরা যখন ভালো কোনো কাজ করি বা সুস্বাদু কিছু খাই, তখন মস্তিষ্ক ডোপামিন নামক একটি নিউরোট্রান্সমিটার বা রাসায়নিক নিঃসরণ করে। এটি আমাদের মনে আনন্দের অনুভূতি দেয়।
চকলেট বা লজেন্স যখন শিশুরা খায়, তখন এতে থাকা উচ্চমাত্রার চিনি সরাসরি মস্তিষ্কের এই রিওয়ার্ড সেন্টারে আঘাত করে। ফলে নিমিষেই শিশুর মন ভালো হয়ে যায় এবং সে এক ধরণের সুখ অনুভব করে। মস্তিষ্ক তখন এই সুখ বারবার পেতে চায়। এখান থেকেই শুরু হয় নেশার চক্র। কোকেন বা হিরোইনের মতো ড্রাগস যেভাবে মস্তিষ্কে ডোপামিন বাড়ায়, চিনিও অনেকটা একই পথে হাঁটে—যদিও তার তীব্রতা কম।
২. চিনির জাদু: কেন এটি আসক্তিকর?
লজেন্স বা ক্যান্ডির মূল উপাদান হলো চিনি (Sucrose) এবং হাই ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাপ। গবেষণায় দেখা গেছে, চিনি জিহ্বার স্বাদগ্রন্থিতে পৌঁছানোর সাথে সাথে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। প্রাকৃতিক ফলমূলের তুলনায় প্রক্রিয়াজাত মিষ্টিতে চিনির ঘনত্ব থাকে কয়েক গুণ বেশি।
বাচ্চাদের ছোট শরীর এবং সংবেদনশীল মস্তিষ্ক এই অতিরিক্ত চিনির ধাক্কা সামলাতে পারে না। তারা খুব দ্রুত এই কৃত্রিম আনন্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একে বলা হয় ‘সুগার রাশ’ (Sugar Rush)। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন এই সুগার লেভেল আবার কমে যায়।
৩. সুগার ক্রাশ (Sugar Crash) ও মেজাজ খিটখিটে হওয়া
মিষ্টি খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বেড়ে যায়। শরীর তখন এই শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রচুর পরিমাণে ইনসুলিন নিঃসরণ করে। এর ফলে কিছুক্ষণ পর রক্তে শর্করার মাত্রা আবার দ্রুত পড়ে যায়। একে বলে ‘সুগার ক্রাশ’।
যখন এই ক্রাশ হয়, তখন শিশুটি ক্লান্ত, খিটখিটে এবং অস্থির অনুভব করে। তার মস্তিষ্ক তখন আবার সেই ডোপামিন বা আনন্দের অনুভূতি পেতে চায়। ফলস্বরূপ সে আবার লজেন্স বা চকলেটের জন্য বায়না ধরে। এভাবেই একটি অন্তহীন চক্র তৈরি হয়, যা দেখতে হুবহু ড্রাগ অ্যাডিকশনের মতো।
৪. চকলেটের বিশেষ উপাদান: ক্যাফেইন ও থিওব্রোমিন
লজেন্সের চেয়েও চকলেটে আসক্তি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কারণ চকলেটের মূল উপাদান কোকো (Cocoa)-তে সামান্য পরিমাণে ক্যাফেইন এবং থিওব্রোমিন থাকে।
-
ক্যাফেইন: এটি একটি উদ্দীপক যা আমাদের সজাগ রাখে। শিশুদের জন্য সামান্য ক্যাফেইনও তাদের স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে দিতে পারে।
-
থিওব্রোমিন: এটি হৃদস্পন্দন কিছুটা বাড়িয়ে দেয় এবং পেশি শিথিল করে আরামদায়ক অনুভূতি দেয়।
এই উপাদানগুলো চিনির সাথে মিলেমিশে এক ধরণের ‘ফিল গুড’ কেমিক্যাল তৈরি করে, যা শিশুদের বারবার চকলেট খেতে প্ররোচিত করে।
৫. কৃত্রিম রং ও ফ্লেভারের ভূমিকা
বাজারে পাওয়া যাওয়া সস্তা ও আকর্ষণীয় লজেন্সগুলোতে প্রচুর পরিমাণে কৃত্রিম রং (Food Color) এবং কৃত্রিম সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু ফুড কালার (যেমন- Red 40 বা Yellow 5) শিশুদের মধ্যে অতি-চঞ্চলতা বা হাইপার-অ্যাক্টিভিটি তৈরি করে। এই উত্তেজনা শিশুদের লজেন্সের প্রতি মানসিকভাবে আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়। তারা ওই নির্দিষ্ট রঙের লজেন্স দেখলেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে।
৬. বিজ্ঞাপনের মায়াজাল ও নিউরো-মার্কেটিং
আমরা বড়রা অনেক সময় লজেন্সকে কেবল খাবার হিসেবে দেখি, কিন্তু কোম্পানিগুলো শিশুদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করে। কার্টুন ক্যারেক্টার, উজ্জ্বল মোড়ক এবং বিশেষ ধরণের শব্দ (প্যাকেট খোলার শব্দ বা কামড় দেওয়ার শব্দ) শিশুদের অবচেতন মনে গেঁথে যায়। একে বলা হয় ‘নিউরো-মার্কেটিং’। শিশুরা যখনই ওই নির্দিষ্ট কার্টুন বা লোগো দেখে, তাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ শুরু হয় এবং তারা সেটা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।
৭. চকলেট-লজেন্স আসক্তির কুফল
অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বয়ে আনে:
-
দাঁতের ক্ষয়: লজেন্সের চিনি দাঁতের এনামেল নষ্ট করে দেয় এবং ক্যাভিটি তৈরি করে।
-
স্থূলতা (Obesity): ছোটবেলা থেকেই অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের ফলে ওজন বেড়ে যায়।
-
মনোযোগের অভাব: চিনি আসক্তির কারণে অনেক শিশু পড়াশোনা বা স্বাভাবিক কাজে মনোযোগ দিতে পারে না।
-
টাইপ-২ ডায়াবেটিস: অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে, ছোটবেলা থেকেই এই অভ্যাসের কারণে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
৮. অভিভাবক হিসেবে আপনার করণীয়
শিশুরা যেহেতু নেশাদ্রব্য বুঝবে না, তাই দায়িত্ব অভিভাবকদেরই নিতে হবে।
-
একবারে বন্ধ করবেন না: হঠাৎ করে সব মিষ্টি বন্ধ করে দিলে শিশুটি আরও বেশি বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। ধীরে ধীরে পরিমাণ কমিয়ে আনুন।
-
বিকল্প খাবার: লজেন্সের বদলে মিষ্টি ফল (যেমন- খেজুর, আম, আপেল) দিন। ফলের চিনিতে ফাইবার থাকে, তাই এটি হুট করে রক্তে চিনি বাড়ায় না।
-
পুরস্কার হিসেবে মিষ্টি নয়: “পড়া শেষ করলে চকলেট দেব” এই ধরণের কথা বলা বন্ধ করুন। এতে শিশুর মনে ধারণা হয় যে চকলেট খুব দামি বা ভালো কিছু।
-
প্যাকেটের গায়ে কী আছে পড়ুন: বাজার থেকে কিছু কেনার আগে দেখে নিন তাতে কতটুকু চিনি বা ‘High Fructose Corn Syrup’ আছে।
শেষ কথা
শিশুদের খাবারে কোম্পানিগুলো সরাসরি মাদক মেশায় না ঠিকই, কিন্তু চিনির যে বিপুল পরিমাণ ব্যবহার তারা করে, তা মস্তিষ্কের জন্য কোনো মাদকের চেয়ে কম নয়। লজেন্স বা চকলেটকে কেবল একটি তুচ্ছ খাবার মনে না করে এর বৈজ্ঞানিক প্রভাবগুলো বোঝা জরুরি। সুস্থ প্রজন্ম গড়তে হলে আমাদের চিনির এই মায়াজাল থেকে শিশুদের বের করে আনতেই হবে।


