ইতিহাসের বই খুললে সাধারণত আমরা পাই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, নিষ্ঠুর সম্রাট আর ধ্বংসের গল্প। কিন্তু আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এমন একজন মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল যার গল্পটা একদম আলাদা। তিনি যখন কোনো শহর জয় করতেন, সেখানে আগুন জ্বালাতেন না। বরং তিনি সেখানে শান্তির মশাল নিয়ে প্রবেশ করতেন। তিনি আর কেউ নন, পারস্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মহান সম্রাট সাইরাস। তাকে কেন ইতিহাসের সবচাইতে প্রভাবশালী এবং ন্যায়পরায়ণ শাসক বলা হয়? চলুন জেনে নেওয়া যাক তার জীবনের এমন কিছু রোমাঞ্চকর তথ্য যা সিনেমাকেও হার মানাবে।
১. অলৌকিক জন্ম এবং মেষপালকের সেই ঘর
সাইরাসের জন্ম নিয়ে প্রচলিত আছে এক অদ্ভুত কাহিনী। তৎকালীন মিডিয়া সাম্রাজ্যের রাজা আস্টিয়াজেস একটি স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে তিনি দেখেন তার নাতি তাকে সিংহাসনচ্যুত করবে এবং পুরো পৃথিবী শাসন করবে। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে রাজা তার সেনাপতি হারপাগাসকে আদেশ দেন শিশু সাইরাসকে মেরে ফেলার জন্য।
কিন্তু হারপাগাস শিশুটির মায়ায় পড়ে যান। তিনি তাকে না মেরে এক মেষপালকের কাছে রেখে আসেন। পাহাড়ে অবহেলায় বেড়ে ওঠা সেই মেষপালকের ছেলেই যে একদিন বিশাল পারস্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত যখন তার পরিচয় ফাঁস হলো, রাজা তাকে মেনে নিতে বাধ্য হলেন। সাইরাস তার মাতামহকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত করলেও তাকে হত্যা করেননি, বরং তাকে সসম্মানে নিজের রাজপ্রাসাদে রেখে দিয়েছিলেন। এই ক্ষমাশীলতাই ছিল সাইরাসের প্রথম এবং সবচাইতে বড় শক্তি।
২. ব্যবিলন জয়: এক ফোঁটা রক্ত না ঝরিয়ে ইতিহাস গড়া
প্রাচীন বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী এবং সুরক্ষিত শহর ছিল ব্যবিলন। এর দেয়াল ছিল এতই উঁচু যে কেউ তা টপকানোর কথা ভাবতেও পারত না। ৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সাইরাস যখন ব্যবিলন আক্রমণ করেন, সবাই ভেবেছিল রক্তগঙ্গা বইবে। কিন্তু সাইরাস এক অভাবনীয় বুদ্ধি খাটালেন।
তিনি ইউফ্রেটিস নদীর পানিকে অন্য পথে ঘুরিয়ে দিলেন। এতে নদীর পানির উচ্চতা কমে যায় এবং সাইরাসের সৈন্যরা সরাসরি নদীপথ দিয়ে শহরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি যখন ব্যবিলনে প্রবেশ করলেন, সাধারণ মানুষ তাকে মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগত জানাল। তিনি কোনো সাধারণ মানুষকে হত্যা করেননি, কোনো মন্দির ধ্বংস করেননি। বরং তিনি ঘোষণা করলেন, আজ থেকে সবাই যার যার ধর্ম পালনে স্বাধীন।
৩. ইহুদিদের মুক্তি এবং সাইরাস সিলিন্ডার
ব্যবিলনের রাজারা ইহুদিদের বন্দি করে রেখেছিল এবং তাদের পবিত্র উপাসনালয় ধ্বংস করে দিয়েছিল। সাইরাস ক্ষমতায় এসে তাদের মুক্তি দেন এবং জেরুজালেমে ফিরে গিয়ে নিজেদের মন্দির পুনর্নির্মাণের অনুমতি দেন। এই কারণে বাইবেলে সাইরাসকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে স্মরণ করা হয়।
তার এই মহানুভবতার কথা একটি মাটির সিলিন্ডারে খোদাই করে রাখা হয়েছে, যা আজ সাইরাস সিলিন্ডার (Cyrus Cylinder) নামে পরিচিত। একে বলা হয় পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম মানবাধিকার সনদ। আজ থেকে ২৫০০ বছর আগে একজন সম্রাট কথা দিয়েছিলেন যে তিনি ধর্ম, বর্ণ এবং জাতির ভিত্তিতে কারও ওপর বৈষম্য করবেন না। ভাবা যায়?
৪. সাইরাস কি পবিত্র কুরআনে বর্ণিত জুলকারনাইন?
বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তার গবেষণায় দাবি করেছেন যে, পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ জুলকারনাইন আসলে এই সাইরাস দ্য গ্রেট।
এর সপক্ষে অনেকগুলো যুক্তি দেওয়া হয়:
১. সাইরাস ছিলেন এক ঈশ্বরবাদী এবং অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ।
২. তিনি পশ্চিম এবং পূর্ব দিকে রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।
৩. প্রাচীন ভাস্কর্যে সাইরাসের মাথায় দুটি শিং সদৃশ মুকুট দেখা যায়, যা জুলকারনাইন নামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যদিও ইতিহাসবিদদের মধ্যে এটি নিয়ে মতভেদ আছে, তবে সাইরাসের মহানুভবতা তাকে যে কোনো মহাকাব্যের নায়কের চাইতেও বড় করে তুলেছে।
৫. বিশাল এক সাম্রাজ্যের বিনয়ী রাজা
সাইরাস যখন মারা যান, তিনি চাইলে নিজের জন্য পিরামিডের মতো বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ বানাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। ইরানের পাসারগাদ শহরে আজও তার সমাধিটি দাঁড়িয়ে আছে খুব সাধারণ একটি পাথরের ঘরের মতো। সেখানে একটি লিপি ছিল যেখানে লেখা ছিল:
“ওহে মানুষ, আমি সাইরাস, আমি পারসিকদের সাম্রাজ্য দিয়েছিলাম এবং আমি এশিয়ার রাজা ছিলাম। দয়া করে এই সামান্য মাটিটুকু আমাকে ছেড়ে দিও যা আমার শরীরকে ঢেকে রেখেছে।”
একজন সম্রাট যিনি অর্ধেক পৃথিবী শাসন করেছেন, তার এমন বিনয় সত্যিই অবাক করার মতো।
৬. কেন আজ আমরা সাইরাসকে মনে রাখব?
আজকের পৃথিবীতে যখন চারিদিকে যুদ্ধ আর হানাহানি, তখন সাইরাস আমাদের শেখান যে জবরদস্তি করে নয়, বরং মানুষের অধিকার রক্ষা করে বেশিদিন টিকে থাকা যায়। তিনি শুধু একজন রাজাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি একটি ডাক ব্যবস্থা বা পোস্টাল সিস্টেম চালু করেছিলেন যা ছিল সেই সময়ের ইন্টারনেট। দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে খবর পৌঁছে দিত তার বার্তাবাহকরা।
সাইরাস দ্য গ্রেটের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ক্ষমতা মানুষকে অহংকারী করে না, বরং যদি তার মন বড় হয়, তবে সেই ক্ষমতা দিয়ে সে পুরো পৃথিবীর মুক্তিদাতা হতে পারে। আপনার কী মনে হয়? সাইরাস কি আসলেই জুলকারনাইন ছিলেন? নাকি ইতিহাসের এক অনন্য বীর? আপনার মতামত কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।

