অক্টোপাস ও মাকড়সা – প্রকৃতির খেয়ালিপনা
প্রকৃতির খেয়ালিপনা বড়ই বিচিত্র। বিবর্তনের ধারায় লক্ষ কোটি বছর ধরে প্রাণীজগতে যে কত অদ্ভুত সব নকশা তৈরি হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। ভাবুন তো, একটি প্রাণী আমাদের ঘরের কোণে জাল বুনছে, আর অন্যটি সমুদ্রের অতল গহ্বরে প্রবাল প্রাচীরের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখছে। আপাতদৃষ্টিতে এদের একটি স্থলচর, অন্যটি জলচর। কিন্তু এদের দুজনকে যদি পাশাপাশি রাখা হয়, তবে একটি অদ্ভুত মিল আমাদের চোখে পড়ে—সংখ্যাটি ‘আট’।
বলছিলাম মাকড়সা এবং অক্টোপাসের কথা। একজন ডাঙার ত্রাস, অন্যজন সমুদ্রের গভীরের এলিয়েন। জীববিজ্ঞানের খাতায় এদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে হলেও, আচরণের ধরণ, শিকারের কৌশল এবং শারীরিক গঠনে এদের মধ্যে রয়েছে এক বিস্ময়কর সামঞ্জস্য ও বৈপরীত্য। আজকের লেখায় আমরা মাকড়সা ও অক্টোপাসের সেই জাদুকরী মিল ও অমিলগুলোর গভীরেই উঁকি দেব।
আট পায়ের রহস্য এবং শারীরিক গঠন
প্রথমেই যে বিষয়টি আমাদের নজর কাড়ে, তা হলো এদের বাহু বা পায়ের সংখ্যা। মাকড়সা ‘আরাকনিড’ (Arachnid) শ্রেণিভুক্ত প্রাণী, যার আটটি পা রয়েছে। অন্যদিকে, অক্টোপাস হলো ‘সেফালোপড’ (Cephalopod) গোত্রের, যার নামের অর্থই হলো ‘মাথা-পা’ (Head-foot)। অক্টোপাসের আটটি শুঁড় বা বাহু সরাসরি তার মাথার সঙ্গে যুক্ত।
তবে সংখ্যার মিল থাকলেও গঠনের দিক থেকে এরা আকাশ-পাতাল তফাৎ। মাকড়সার শরীর আবৃত থাকে শক্ত কাইটিন নির্মিত খোলসে (Exoskeleton)। তাদের পাগুলো সন্ধিপদী বা জোড়া লাগানো, যা হাইড্রোলিক চাপের সাহায্যে নড়াচড়া করে।
বিপরীত চিত্র দেখা যায় অক্টোপাসের ক্ষেত্রে। এদের শরীরে কোনো হাড় বা শক্ত খোলস নেই; পুরোটাই যেন এক মাংসল জেলি। হাড়বিহীন হওয়ার কারণেই অক্টোপাস অবিশ্বাস্যভাবে নিজেকে সংকুচিত করে খুব ছোট ছিদ্র দিয়েও গলে যেতে পারে, যা মাকড়সার পক্ষে অসম্ভব। মাকড়সার পায়ের কাজ মূলত চলাফেরা ও জাল বোনা, কিন্তু অক্টোপাসের বাহুগুলো যেন একেকটি স্বাধীন সত্তা। প্রতিটি বাহুর নিজস্ব স্নায়ুতন্ত্র বা ‘মিনি ব্রেইন’ রয়েছে, যা দিয়ে তারা স্বাদ গ্রহণ করতে পারে এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
শিকারি সত্তা: জাল বনাম ছদ্মবেশ
শিকার ধরার কৌশলে এই দুই প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা অবাক করার মতো। মাকড়সার কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জ্যামিতিক নকশার এক নিখুঁত জাল। এরা মূলত ‘অ্যামবুশ প্রিডেটর’ বা ওৎ পেতে থাকা শিকারি। আঠালো জালে পোকা আটকা পড়লে, মাকড়সা ছুটে গিয়ে বিষাক্ত দংশনে তাকে অবশ করে ফেলে। এরপর লালাগ্রন্থি থেকে নিসৃত এনজাইম দিয়ে শিকারকে তরল করে পান করে।
অক্টোপাসও শিকারি হিসেবে কম যায় না, তবে তাদের অস্ত্র ভিন্ন। অক্টোপাসকে বলা হয় ‘সমুদ্রের জাদুকর’। এদের ত্বকে থাকে ক্রোমাটোফোর (Chromatophore) নামক বিশেষ কোষ, যার সাহায্যে এরা চোখের পলকে রং ও টেক্সচার পরিবর্তন করে পরিবেশের সাথে মিশে যেতে পারে। মাকড়সা যেমন জাল পেতে শিকারের অপেক্ষা করে, অক্টোপাস তেমনি ছদ্মবেশে শিকারের খুব কাছে গিয়ে হঠাৎ আক্রমণ করে। কাঁকড়া বা ঝিনুক জাতীয় শক্ত খোলস ভাঙার জন্য অক্টোপাসের রয়েছে টিয়া পাখির মতো শক্ত ঠোঁট (Beak), যা মাকড়সার ‘ফ্যাং’ বা বিষদাঁতের সাথে তুলনার যোগ্য।
উভয় প্রাণীর ক্ষেত্রেই বিষের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ব্লু-রিংড অক্টোপাসের বিষ যেমন মারাত্মক, তেমনি ব্ল্যাক উইডো বা ব্রাউন রিক্লুস মাকড়সার বিষও প্রাণঘাতী হতে পারে।
বুদ্ধিমত্তার লড়াই
মস্তিষ্কের ওজনের অনুপাতে অক্টোপাস অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান। এদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, বোতলের ছিপি খোলার ক্ষমতা, এমনকি ল্যাবরেটরিতে ধাঁধঁ সমাধান করার নজির বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছে। অক্টোপাসকে অনেক সময় ‘প্রাইমেট অফ দ্য সি’ বা সমুদ্রের বানর বলেও ডাকা হয়।
তুলনামূলকভাবে মাকড়সাকে আমরা ‘বুদ্ধিমান’ না বলে ‘ইনস্টিংক্ট’ বা সহজাত প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত প্রাণী বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, জাম্পিং স্পাইডার বা পোর্টেশিয়া মাকড়সারাও শিকার ধরার আগে পরিকল্পনা করতে পারে। তবুও, স্নায়বিক জটিলতা এবং শেখার ক্ষমতার দিক দিয়ে অক্টোপাস মাকড়সার চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে।
নিঃসঙ্গ জীবন এবং মাতৃত্বের ট্র্যাজেডি
সামাজিকতার দিক থেকে মাকড়সা ও অক্টোপাস—উভয়েই একলা চলো নীতিতে বিশ্বাসী। এরা কেউ পিঁপড়া বা মৌমাছির মতো দলবদ্ধ হয়ে থাকে না। প্রজননের সময়টুকু ছাড়া বাকি জীবন এরা একাকী কাটাতে পছন্দ করে।
তবে এদের জীবনের সবচেয়ে করুণ মিলটি দেখা যায় মাতৃত্বের ক্ষেত্রে। অনেক প্রজাতির মাকড়সা এবং অক্টোপাস ‘সেমেলপ্যারাস’ (Semelparous) প্রাণী, অর্থাৎ জীবনে একবারই তারা প্রজনন করে এবং এরপরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। একটি মা অক্টোপাস ডিম পাড়ার পর মাসের পর মাস না খেয়ে ডিম পাহারা দেয় এবং বাচ্চা ফোটার পরপরই অনাহারে মারা যায়। একইভাবে, কিছু প্রজাতির মাকড়সা নিজের দেহকে সন্তানদের খাদ্য হিসেবে বিলিয়ে দেয়। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর অথচ ধ্রুব সত্যটি এই দুই প্রাণীকে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
পরিশেষ
স্থলভাগের মাকড়সা আর জলভাগের অক্টোপাস—দুটি ভিন্ন জগতের বাসিন্দা হলেও বিবর্তনের খেলায় তারা যেন একে অপরের আয়না। আটটি পা বা বাহু দিয়ে তারা নিজেদের জগতকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। একজনের শক্তি তার নিখুঁত জালের বুননে, অন্যজনের শক্তি তার অসামান্য বুদ্ধিমত্তা আর ছদ্মবেশে। আমাদের চোখের সামনে বা অগোচরে, এই দুই আট-পেয়ে দানব প্রতিনিয়ত তাদের অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির নিজস্ব ভাষায়।

