আপনার বারান্দার ছোট্ট লজ্জাবতী গাছটি কি আপনার অগোচরে মনে মনে অংক কষছে? যে গাছটি আপনার সামান্য স্পর্শ পেলেই লাজুক মুখে গুটিয়ে যায়, তার ভেতরে কি লুকিয়ে আছে কোনো গণিতবিদের মস্তিষ্ক?
শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও, সাম্প্রতিক একটি গবেষণা পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি (William & Mary) বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার ভিশটন এবং তার গবেষক দল প্রমাণ করেছেন যে, লজ্জাবতী গাছ বা ‘মিমোসা পুডিকা’ (Mimosa pudica) গণনা করার ক্ষমতা রাখে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই কাজটির জন্য তাদের কোনো মস্তিষ্ক বা নিউরনের প্রয়োজন হয় না।
বিজ্ঞানের চোখে লজ্জাবতী গাছের বুদ্ধিমত্তা
অধ্যাপক পিটার ভিশটন এবং তাঁর ছাত্রী পেজ বার্টোশ তাদের এই গবেষণাটি ‘কগনিটিভ সায়েন্স’ (Cognitive Science) জার্নালে প্রকাশ করেছেন। গবেষকরা দেখেছেন, লজ্জাবতী গাছ আলো এবং অন্ধকারের চক্র মনে রাখতে পারে এবং সেই অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করে। তারা কেবল পরিবেশের পরিবর্তন অনুভব করে না, বরং সেই পরিবর্তনগুলো কতবার ঘটছে তা ‘গণনা’ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে।
সাধারণত আমরা জানি প্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্র থাকে যার মাধ্যমে তারা তথ্য প্রক্রিয়া করে। কিন্তু গাছের এই তথ্য মনে রাখার এবং গণনা করার পদ্ধতি উদ্ভিদ বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, বুদ্ধি বা চেতনার জন্য কেবল মস্তিষ্ক থাকলেই চলে না, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণের মধ্যেই নিজস্ব উপায়ে তথ্য প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা আছে।
জগদীশ চন্দ্র বসুর সেই অমর সত্য
গাছের প্রাণ এবং সংবেদনশীলতা নিয়ে কথা উঠলেই আমাদের মনে সবার আগে ভেসে ওঠে বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর নাম। আজ থেকে ১০০ বছরেরও বেশি আগে তিনি তাঁর আবিষ্কৃত ‘ক্রেসকোগ্রাফ’ যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করেছিলেন যে উদ্ভিদেরও জীবন আছে, তারা ব্যথায় সাড়া দেয় এবং বাইরের উদ্দীপনা অনুভব করতে পারে।
২০২৬ সালের এই আধুনিক গবেষণাটি যেন জগদীশ চন্দ্র বসুর সেই আবিষ্কারেরই এক বিশাল আধুনিক স্বীকৃতি। তিনি যা বলে গিয়েছিলেন, আধুনিক বিজ্ঞান আজ উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে তা নতুন করে প্রমাণ করছে। লজ্জাবতী গাছের এই গণিত শেখার ক্ষমতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা আসলে কত কম জানি এই সবুজ জগৎ সম্পর্কে।
মস্তিষ্ক ছাড়াই কীভাবে শেখে গাছ?
গাছের কোনো মস্তিষ্ক নেই, তবে তাদের কোষগুলোর মধ্যে এক ধরনের রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক সংকেত আদান-প্রদান হয়। এই সংকেতগুলোই তাদের ডাটাবেজ হিসেবে কাজ করে। যখন একটি গাছ বারবার একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তখন তার কোষগুলো সেই প্যাটার্নটি চিনে ফেলে। এভাবেই তারা আলো-অন্ধকারের সংখ্যা বা সময়ের ব্যবধান বুঝে নিতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘প্ল্যান্ট কগনিশন’ বা উদ্ভিদের নিজস্ব প্রজ্ঞা।
প্রকৃতি আমাদের প্রতিদিন অবাক করে। যে গাছটিকে আমরা কেবল জড়বৎ কিছু একটা ভেবে ভুল করি, সেই গাছের ভেতরও বয়ে চলেছে বুদ্ধিমত্তার এক অদৃশ্য স্রোত। লজ্জাবতী গাছের এই গণনা করার ক্ষমতা হয়তো ভবিষ্যতে উদ্ভিদ বিজ্ঞানের আরও বড় কোনো রহস্য উন্মোচনে সাহায্য করবে।
আপনার মনের কৌতূহল মেটাতে নিচের এক কথার প্রশ্নোত্তর দেখে নিতে পারেন:
গাছ কি ব্যথা অনুভব করে?
বিজ্ঞানের মতে গাছের স্নায়ু নেই তবে তারা ক্ষতির সংকেত অনুভব করতে পারে।
লজ্জাবতী গাছ স্পর্শে কুঁকড়ে যায় কেন?
এটি মূলত তাদের আত্মরক্ষার একটি কৌশল যা তড়িৎ-রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে ঘটে।
জগদীশ চন্দ্র বসু গাছের কী রহস্য আবিষ্কার করেছিলেন?
তিনি দেখিয়েছিলেন গাছেরা গান শোনে, ব্যথায় কাঁদে এবং বিষ প্রয়োগে তাদের প্রতিক্রিয়া হয়।
মৌমাছিও কি গণিত বোঝে?
হ্যাঁ, গবেষণায় দেখা গেছে মৌমাছি শূন্যের ধারণা এবং সাধারণ যোগ-বিয়োগ বুঝতে পারে।
গাছ কি একে অপরের সাথে কথা বলে?
অবশ্যই! মাটির নিচে থাকা ছত্রাকের নেটওয়ার্ক বা ‘উড ওয়াইড ওয়েব’-এর মাধ্যমে তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে।

good post