
কেমন হতো, যদি টাইম মেশিনে করে সহজেই ফিরে যেতে পারতাম ছেলেবেলায়। আবার পেতাম নির্ঝঞ্ঝাট সহজ-সরল জীবন। কিংবা যদি এক লাফে দশ বছর পরের ভবিষ্যতে চলে যেতাম, আর পড়াশোনার ঝামেলায় পড়তে হতো না, তা-ই না? কিন্তু, সেরকম কি আসলে সম্ভব?
২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া সাড়া জাগানো মুভি Predestination নিশ্চয়ই অনেকেই দেখেছেন। টাইম মেশিনে করে সহজেই কীভাবে অনেক বছর অতীতে চলে যাওয়া যায়, কীভাবে নিজের বাচ্চাকালকে চোখের সামনে দেখা যায়। যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই ধরেই নিয়েছেন যে, এসব নিছকই সায়েন্স ফিকশন! বাস্তবে অতীত বা ভবিষ্যতে আবার যাওয়া যায় নাকি! সে প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবো আজ আমরা। বিজ্ঞানের আলোকে বোঝার চেষ্টা করবো- আসলেও সময় পরিভ্রমণ সম্ভব কি না।
সময় পরিভ্রমণ- সম্ভাবনা ও বাস্তবতা; image source: writeup.in
সময় পরিভ্রমণ বলতে সহজ ভাষায় অতীতে বা ভবিষ্যতে যেতে পারাকে বোঝায়। আমি যদি ২০০০ সালে ফিরে যেতে পারি বা ২০৩০ সালের পৃথিবীতে চলে যেতে পারি, তবে তাকে সময় পরিভ্রমণ বলবে। শুনতে যতটা সহজ লাগছে বাস্তবে কিন্তু সেটা ততটা সহজ না। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন! ততটা সহজ না, তবে অসম্ভব কিছুও না! টাইম ট্রাভেল কীভাবে সম্ভব তা জানতে হলে আমাদের একটু গভীরে যেতে হবে। জেনে আসতে হবে সময় পরিভ্রমণ নিয়ে বিজ্ঞানের কিছু তত্ত্ব।
সময় পরিভ্রমণ বোঝার জন্য আপনাকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা ও আলোর গতিসূত্র বুঝতে হবে। আইনস্টাইন সময় জিনিসটাকে আলোর মাধ্যমে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন। কোনো বস্তু যত দ্রুত গতিতে চলবে, তার সাপেক্ষে সময় তত স্থির হয়ে থাকবে। অর্থাৎ, আপনি যদি আলোর কাছাকাছি গতিতে চলতে পারেন, তবে আপনার সাপেক্ষে সময় প্রায় স্থির থাকবে। আপনি দুই ঘন্টা ভ্রমণ করে আসার পর দেখবেন পৃথিবীতে হয়তো এর মাঝে দুই বছর সময় চলে গিয়েছে! এ তো গেল আলোর কাছাকাছি গতিতে ভ্রমণ করতে পারলে কী হবে সেই কথা। আর আলোর চেয়ে দ্রুতগতিতে যেতে পারলে আপনি সময়কেই অতিক্রম করে ফেলতে পারবেন!
একটি সহজ উদাহরণ দেয়া যাক। মনে করুন, আপনি পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের কোনো একটি নক্ষত্রকে টেলিস্কোপ দিয়ে দেখছেন। এই মুহূর্তে আপনি যে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রটি দেখছেন সেটি কিন্তু নক্ষত্রটির বর্তমান অবস্থা না। আমরা কোনো বস্তু তখন দেখতে পাই যখন সেটি থেকে আলো এসে আমাদের চোখে পড়ে। অর্থাৎ, এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে থাকা সেই নক্ষত্রটি থেকে আলো এসে পৃথিবীতে পৌঁছাতে এক লক্ষ বছর লেগেছে। আপনি এই মুহুর্তে নক্ষত্রটিকে যেমন দেখছেন সেটি আপনার কাছে বর্তমান হলেও, নক্ষত্রটির কাছে সেটি এক লক্ষ বছর অতীতের ঘটনা।
এখন, কল্পনা করে নিন, সেই নক্ষত্রটি ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সেখানে বাস করা একটি এলিয়েন ১ লক্ষ আলোকবর্ষ/সেকেন্ড গতিতে পৃথিবীতে চলে আসলো। সে আসার পরও কিন্তু সে নক্ষত্রটিকে একই অবস্থায় দেখতে পাবে পৃথিবী থেকে। তারও এক লক্ষ বছর পর পৃথিবীবাসীরা সেই নক্ষত্রকে ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে যেতে দেখবে। তাহলে এ থেকে আমরা কী বুঝলাম? পৃথিবীবাসীরা যা এক লক্ষ বছর পর দেখবে, যা তাদের কাছে এক লক্ষ বছর ভবিষ্যতের ঘটনা, সেই ঘটনাটি পৃথিবীতে চলে আসা এলিয়েনের কাছে নিকট অতীত!
স্পেস-টাইম ফেব্রিক; image source: nasa.org
এখন, এখানে একটি ছোট সমস্যা রয়ে গেছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তো খুব করে বললাম, এলিয়েনটি এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরত্ব এক সেকেন্ডে চলে আসবে। কিন্তু, তা কি আদৌ সম্ভব? উত্তর, সম্ভব নয়। আইনস্টাইনের সূত্রমতে, আলোর গতি ধ্রুব এবং কোনো কিছুই আলোর চেয়ে অধিকতর গতিশীল হতে পারবে না। সেই হিসেবে এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরত্বও এক মুহূর্তে অতিক্রম করা সম্ভব না। তাহলে ভবিষ্যতে পরিভ্রমণ করার উপায় কী? আসুন, এবারে আর দ্বিধায় না রেখে সহজে বুঝিয়ে দেই।
আমরা কোনো বিন্দুর অবস্থান বের করি XYZ অক্ষ দ্বারা। অর্থাৎ, দৈর্ঘ্য নির্ণয়ে X, প্রস্থ নির্ণয়ে Y আর উচ্চতা নির্ণয়ে Z অক্ষ ব্যবহার করি। কিন্তু কোনো ঘটনার প্রকৃত অবস্থান জানতে এ তিনটি মাত্রা বাদেও আরেকটি মাত্রার প্রয়োজন। তা হলো সময়। এ চতুর্থ মাত্রাকে আইনস্টাইন স্পেস-টাইম বলেছেন। এখন, মহাবিশ্বে জালের মতো ছড়ানো যে স্পেস টাইম ফেব্রিক রয়েছে, তা দিয়ে সময়/আলো প্রবাহিত হয়। যেহেতু আলোর গতিকে অতিক্রম করা সম্ভব না, সেহেতু আমাদের সময় পরিভ্রমণের জন্য বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে। একটি ব্যবহারিক উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি। একটি কাগজের পৃষ্ঠা হাতে নিন। পৃষ্ঠাটির বরাবর উপরে নিচের দুই প্রান্তে দুটি আলাদা ফুটো করুন। এবারে মাঝ বরাবর পৃষ্ঠাটি দুই ভাঁজ করে কী দেখতে পেলেন? ফুটো দুটি একসাথে লেগে আছে, তাই তো? এবার পৃষ্ঠাটি আবার আগের মতো খুলে ধরুন। খুলে রাখা পৃষ্ঠায় দুটি ছিদ্র যতটা দূরে, ভাঁজ করা পৃষ্ঠার ক্ষেত্রে বলতে গেলে তা একদমই নেই।
ওয়ার্মহোল; image source: sciencenews.uk
এখন যদি এই পৃষ্ঠাটিকে আমরা একটি স্পেস-টাইম ফেব্রিক হিসেবে কল্পনা করি তাহলে বুঝতে পারি, স্বাভাবিকভাবে দুটি ঘটনা বিন্দু অনেক দূরত্বে থাকলেও, ফেব্রিকের সংকোচনের ফলে দুটি ঘটনা বিন্দুকে খুব অল্প দূরত্বে নিয়ে আসা সম্ভব। অর্থাৎ, সাধারণভাবে যে ঘটনা বিন্দুটি অনেক পরে দেখতে পাওয়ার কথা, সেখানে শর্টকাটে অনেক আগেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। এ ধারণার উপর ভিত্তি করেই ওয়ার্মহোল বা সময় সুড়ঙ্গের ধারণাটি এসেছে।
ওয়ার্মহোল হচ্ছে এমন একটি ক্ষুদ্র সুড়ঙ্গ, যা অনেক অনেক আলোকবর্ষ দূরের দুটি ঘটনা বিন্দুকেও স্পেস ফেব্রিকের সংকোচনের মাধ্যমে খুব কাছাকাছি দূরত্বে নিয়ে আসে। সুতরাং, ওয়ার্মহোলের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে আলোর অধিক গতিবেগ ছাড়াই ভবিষ্যৎ পরিভ্রমণ সম্ভব। প্রশ্ন থাকতে পারে, এখন পর্যন্ত কেউ ওয়ার্মহোলে করে কেন তাহলে ভবিষ্যত ভ্রমণ করেনি। এর উত্তর হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, মহাবিশ্বে ওয়ার্মহোল খুব মাঝে মাঝে সামান্য কিছু সময়ের জন্য আবির্ভূত হয়। তাছাড়াও এ ওয়ার্মহোলগুলোর ব্যাস হয় এক সেন্টিমিটারের লক্ষ কোটি ভাগের কম। সুতরাং এত কম সময় স্থায়ী ও এত ক্ষুদ্র ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করা প্রায় অসম্ভব! সুতরাং, ভবিষ্যত পরিভ্রমণ তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবিকভাবে এখন পর্যন্ত ভবিষ্যত পরিভ্রমণ করার মতো প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি।
চতুর্থ মাত্রা; image source: space.org
ভবিষ্যত পরিভ্রমণ নিয়ে আলোচনা গেল। এবার আসা যাক অতীত পরিভ্রমণে। তাহলে তো অতীত পরিভ্রমণও একইভাবে ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে করা যাবে, তাই না? উত্তর, না। এখানে দুটি ঝামেলা আছে। এই ঝামেলাগুলোকে ‘সেলফ কনসিস্টেন্সি থিওরি’ ও ‘গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স থিওরি’ বলে।
আমি ভবিষ্যতে গিয়ে যদি সব ভেঙেচুরে একাকার করে ফেলি, তাহলে সেটি বড় কোনো প্রাকৃতিক সমস্যা দাঁড় করাবে না। আমি ১০০ বছর ভবিষ্যতে গিয়ে ভাংচুর করে চলে আসার পর, স্বাভাবিকভাবে ১০০ বছর পরের ভবিষ্যতে এই ঘটনাটিই হবে। কিন্তু সমস্যা হবে অতীতে গিয়ে কোনো অদ্ভুত ঘটনা ঘটালে। মনে করুন, ১৯৪৬ সালের ৬ জুলাইয়ে আমি গিয়ে যদি সদ্য জন্ম নেয়া জর্জ বুশকে মেরে ফেলি, তাহলে আবার বর্তমানে এসে বুশকে কীভাবে দেখবো? সে তো জন্মের দিনই মারা গিয়েছিল, তা-ই না? জটিল লাগছে খুব? এ প্রশ্নের উত্তরই আছে দুটি থিওরিতে।
আসুন দেখে নেই থিওরি দুটির মূলকথা।
সেলফ কনসিস্টেন্সি থিওরি: এ থিওরি অনুযায়ী, কেউ অতীত ভ্রমণ করলেও সে প্রকৃতির কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না। প্রকৃতি তাকে কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে দেবে না। কেউ চাইলে ওয়ার্মহোলে করে অতীতে গিয়ে ঘুরে আসতে পারবে, সবকিছু দেখতে পারবে, কিন্ত কোনো ঘটনায় প্রভাব রাখতে পারবে না। ছায়ার মতো শুধুই দর্শনার্থী হয়ে থাকতে হবে। সুতরাং, এক্ষেত্রে কোনো ঘটনার পরিবর্তন বা কোনো ধরনের প্যারাডক্স সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।
প্যারালাল ইউনিভার্স; image source: space.com
গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স: ধরে নিচ্ছি, আমি ৮০ বছর অতীতে গিয়ে দেখলাম আমার দাদা কাদা মাখামাখি করে হা-ডু-ডু খেলছে। এখন, আমি যদি সাথে করে নিয়ে যাওয়া রিভলবার দিয়ে আমার দাদাকে গুলি করে মেরে ফেলি, তাহলে আমি আসবো কোথা থেকে? আমার দাদা যদি শিশু বয়সে মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে তো তার আর বিয়েও হবে না। তার ছেলে, মানে আমার বাবাও পৃথিবীতে আসবে না কোনোদিন। আমার বাবা যদি জন্মই না নেয় তাহলে তো আমারও জন্ম নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্ত আমি তো আছি! তাহলে আমি আসলাম কোথা থেকে! অতীত পরিভ্রমণ সম্পর্কিত এই গোলমেলে সমস্যাকে বলে গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স।
এ সমস্যা সামনে আসার পর বিজ্ঞানীরা এর আপাত সমাধান হিসেবে প্যারালাল ইউনিভার্সের কথা বলেছেন। প্যারালাল ইউনিভার্স থিওরি মতে, প্রতিটি ঘটনার অসংখ্য সম্ভাবনা থাকতে পারে। অর্থাৎ, একই ধরনের ঘটনা আরো অনেকগুলো ইউনিভার্সে থাকা সম্ভব। দুটি সমান্তরাল রেখার যেভাবে কখনো দেখা হয় না, একইভাবে দুটি প্যারালাল ইউনিভার্সেরও কখনো দেখা হবে না। দুটি সমান্তরাল রেখার মাঝে ছোট আরেকটি রেখা টেনে যেভাবে দুটি রেখাকে যুক্ত করা যায়, একইভাবে ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে দুটি প্যারালাল ইউনিভার্সের মাঝে ভ্রমণ করা হয়। সুতরাং, আপনি অতীতে যেতে চাইলে কখনোই আপনার নিজের ইউনিভার্সের অতীতে যেতে পারবেন না। আপনি ওয়ার্মহোলে ঢোকামাত্র অন্য কোনো প্যারালাল ইউনিভার্সে চলে যাবেন। সেখানে গিয়ে আপনি আপনার দাদাকে হত্যা করলেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ সেই ইউনিভার্সের ভবিষ্যতে আপনার কোনো অস্তিত্বই নেই!
গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স; image source: alltop.com
এই ছিলো মোটামুটি সময় পরিভ্রমণ নিয়ে আলোচনা। XYZ অক্ষের মতো হয়তো বা একদিন সময়কেও মানুষ নিজের মতো করে ভ্রমণের কাজে ব্যবহার করতে পারবে। বিজ্ঞানের বহুর্মুখী অগ্রযাত্রার নিরিখে বলতে পারি, আপাতত সম্ভব না হলেও, হয়তো সেই দিন আর বেশি দূরে নয়!












































































কোথাও কেউ নেই। পরিত্যক্ত শহরে বাতাসে উড়ে বেড়ানো কিছু কাগজপত্র আর পলিথিনের ব্যাগের শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দও নেই। একটু পরপর ভূতুড়ে কঙ্কালের মতো যেন দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নদশার পরিত্যক্ত বহুতল ভবনগুলো। মাঝে মাঝে এ গলি থেকে ও’ গলিতে দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে হ্যামেলিনের গল্পের মতো বিশালাকৃতির ইঁদুর অথবা অন্য কোনবিস্তারিত পড়ুন
কোথাও কেউ নেই। পরিত্যক্ত শহরে বাতাসে উড়ে বেড়ানো কিছু কাগজপত্র আর পলিথিনের ব্যাগের শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দও নেই। একটু পরপর ভূতুড়ে কঙ্কালের মতো যেন দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নদশার পরিত্যক্ত বহুতল ভবনগুলো। মাঝে মাঝে এ গলি থেকে ও’ গলিতে দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে হ্যামেলিনের গল্পের মতো বিশালাকৃতির ইঁদুর অথবা অন্য কোনো নাম না জানা বিদঘুটে প্রাণী। আর এই পরিত্যক্ত শহরেই হয়তো বাঁচার চেষ্টা করছে বিচ্ছিন্ন একটি-দুটি পরিবার।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: Entertainment One
এই দৃশ্য আমাদের অত্যন্ত পরিচিত। শত শত পোস্ট অ্যাপোক্যালিপ্টিক চলচ্চিত্র আছে, যেখানে এ ধরনের দৃশ্য দেখানো হয়। কোনো ভাইরাসের আক্রমণে, রহস্যময় কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে, কিংবা বিষাক্ত কোনো রাসায়নিক দুর্ঘটনায় বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের মৃত্যুর পর অল্প কিছু বেঁচে থাকা মানুষের ভাগ্যে কী ঘটতে পারে, সেটাই এ ধরনের চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সত্যিই যদি কখনো হঠাৎ করে বিশ্বের সব মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীতে কী কী ঘটতে পারে? মানব সভ্যতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হতে কীরকম সময় লাগতে পারে?
উৎসাহী বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময় এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেল বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গবেষকের সাহায্যে মনুষ্য পরবর্তী যুগের পৃথিবীর চিত্র আঁকার চেষ্টা করেছেন। সামান্য কিছু পার্থক্য থাকলেও তারা অধিকাংশই মোটামুটি একই ধরনের সম্ভাবনা এবং আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। চলুন জেনে নিই কী ঘটতে পারে পৃথিবীর ভাগ্যে, যদি আমরা হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে যাই।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: tokyogenso
মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পৃথিবীর অধিকাংশ এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। বিশ্বের অধিকাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় জ্বালানি তেলের মাধ্যমে। মানুষ না থাকলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মতো কেউ না থাকায় কয়েক ঘন্টার ব্যবধানেই বিশ্বের অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। কেবলমাত্র উইন্ডমিল, সোলার প্যানেল এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরবরাহকৃত এলাকাতেই বিদ্যুৎ প্রবাহ অবিচ্ছিন্ন থাকবে।
উইন্ডমিলের লুব্রিক্যান্ট শেষ হয়ে গেলে এবং সোলার প্যানেলের উপর ধুলোবালি পড়ে তা আচ্ছাদিত হয়ে গেলে কয়েক মাসের মধ্যে সেগুলোও অকার্যকর হয়ে যাবে। শেষপর্যন্ত শুধুমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত থাকতে পারে। এগুলো কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর পর্যন্তও কার্যকর থাকতে পারে। অব্যবস্থাপনায় সেগুলোও নষ্ট হয়ে গেলে কয়েক শত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পৃথিবী সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: tokyogenso
প্রথম কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আরেকটি বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। বিশ্বের তেল এবং গ্যাস শোধনাগারগুলোতে বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি হবে। নিয়ন্ত্রণ করার কেউ না থাকায় সেগুলো মাসের পর মাস ধরে জ্বলতে পারে। লোকালয় কিংবা বনাঞ্চল থেকে বেশি দূরে অবস্থিত না হলে অগ্নিকান্ড ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। এছাড়াও প্রথম ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই শক্তি গ্রহণের মাত্রায় ব্যাপক হ্রাস হওয়ায় বিশ্বের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেফ মোডে চলে যাবে।
দুই-তিন দিনের মধ্যেই বিশ্বের অধিকাংশ ভূগর্ভস্থ রেললাইন এবং টানেল পানিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে যাবে। নিয়মিত পানি নিষ্কাশনের জন্য অধিকাংশ ভূগর্ভস্থ রেললাইন এবং টানেলেই পাম্প ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এবং জেনারেটরের জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় সেগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এবং পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব না হওয়ায় ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে পড়বে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
১০ দিনের মধ্যেই অধিকাংশ পোষা প্রাণী অনাহারে মৃত্যুবরণ করবে। ইলেক্ট্রিক গেটগুলো অকেজো হয়ে পড়ায় প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই বিশ্বের শত কোটি গরু, ছাগল, শূকর, মুরগিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণী তাদের খামার থেকে বেরিয়ে পড়বে। যারা বের হতে পারবে না, তারা খামারের ভেতরেই মারা যাবে। আর যারা বের হতে পারবে, তারাও বাইরের পরিবেশের সাথে অভ্যস্ত না হওয়ায় এবং খাবারের সংকট থাকায় ধীরে ধীরে মারা পড়বে। বেঁচে থাকবে কেবল আগে থেকেই বাইরে থাকা হিংস্র বন্য পশুরা। বিভিন্ন জাতের ইঁদুর এবং তেলাপোকা বেঁচে থাকলেও যেগুলো মানুষের ফেলে দেওয়া ময়লার উপর নির্ভরশীল ছিল, খাদ্যের অভাবে তাদের সংখ্যাও বিপুলভাবে হ্রাস পাবে।
এক মাসের মধ্যেই নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলোকে ঠান্ডা করার জন্য ব্যবহৃত পানি বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার ফলে রিঅ্যাক্টরগুলোতে বিস্ফোরণ শুরু হবে। নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এর প্রতিক্রিয়া হবে চেরনোবিল এবং ফুকুশিমার সম্মিলিত বিপর্যয়ের চেয়েও মারাত্মক। বিশাল এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে যাবে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত পৃথিবীর বড় একটি অংশ জুড়ে এর প্রভাব বজায় থাকবে। আশেপাশের এলাকার প্রচুর প্রাণী দীর্ঘকাল পর্যন্ত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ছাড়াও প্রাকৃতিক কারণেও নিয়মিত অগ্নিকান্ড ঘটবে। সামান্য বজ্রপাতের কারণে কোনো এলাকায় অগ্নিকান্ডের সূচনা হলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। অগ্নিকান্ডের কারণে বিশ্বের প্রচুর গ্রামের কাঠের নির্মিত ঘরবাড়ি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আগুনের হাত থেকে বেঁচে গেলেও কাঠের অধিকাংশ ঘরবাড়ি ধীরে ধীরে ঘুণপোকা এবং ছারপোকার আক্রমণে ধ্বসে পড়তে থাকবে। মোটামুটি ৭৫ বছরের মধ্যে কাঠের বিম এবং কলামগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করবে এবং ১০০ বছরের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ কাঠের স্থাপনা ধ্বসে পড়বে।
২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে ফুটপাথ এবং রাস্তাঘাটগুলোতে ফাটল ধরে সেখানে আগাছা এবং গাছপালা জন্মাতে থাকবে। এ সময়ের মধ্যে ফুটপাত এবং খোলা চত্বরগুলোর তিন-চতুর্থাংশই ঘাস এবং আগাছায় আবৃত হয়ে যাবে। বিশ্বের অনেক রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাবে। শীত প্রধান দেশে শীতকালে পানি জমে বরফ হয়ে যাবে এবং গরমকালে আবার বরফ গলে পানিতে রূপান্তরিত হবে। এই তারতম্যের কারণে রাস্তাঘাটের ভাঙণ ত্বরান্বিত হবে। বৃষ্টির পানি ছাদের উপর জমে কনক্রিটের ভবনগুলোরও একই দশা সৃষ্টি করবে। মোটামুটি ২০০ বছরের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ কনক্রিটের বিল্ডিং ভেঙে পড়তে শুরু করবে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
ব্যবস্থাপনার অভাবে স্টিলের তৈরি ভবন এবং ব্রিজগুলোতে বৃষ্টির পানি এবং বাতাসের অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় মরচে ধরতে শুরু করবে। মোটামুটি ৩০০ বছরের মধ্যে আইফেল টাওয়ার, গোল্ডেন গেট ব্রিজসহ বিশ্বের অধিকাংশ স্টিলের স্থাপনা ভেঙে পড়তে শুরু করবে। মরুভূমিতে এই প্রক্রিয়া একটু মন্থর হবে, কিন্তু তার আগেই আরব আমিরাত, কাতারসহ বিশ্বের অধিকাংশ মরুময় এলাকা পুনরায় বালিতে ডুবে যাবে। যত মজবুতই হোক, ব্যবস্থাপনা না থাকায় কয়েকশো বছরের মধ্যে বাঁধগুলোও ভেঙে পড়বে এবং প্রচুর এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। প্রকৃতি ধীরে ধীরে মানব সভ্যতাকে গ্রাস করে নিতে থাকবে।
মানুষের কারণে যেসব বন্যপ্রাণী, পাখি এবং সামুদ্রিক মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল, তাদের সংখ্যা পুনরায় বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে। চিড়িয়াখানা থেকে বের হয়ে যাওয়া বন্য এবং বিরল প্রজাতির প্রাণীরাও নতুন করে বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করবে। মানুষের অনুপস্থিতিতে দূষণ হ্রাস পাবে, বায়ুমন্ডল পরিষ্কার হয়ে উঠতে থাকবে। কয়েক হাজার বছর পরে মানুষের নির্মিত শহরগুলোর খুব কম চিহ্নই অবশিষ্ট থাকবে। শহরের রাস্তাগুলো নদীতে এবং শহরগুলো বনাঞ্চলে পরিণত হয়ে যাবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে মানুষ যে কৃত্রিম আবাসস্থল তৈরি করেছিল, প্রকৃতি সেগুলো আবার অধিগ্রহণ করে নিবে।

সংক্ষেপে দেখুনশিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
মানুষের নির্মিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে শেষপর্যন্ত টিকে থাকবে প্রাচীনকালে পাথর কেটে তৈরি করা বিশালাকৃতির স্থাপনাগুলোই। ১০ হাজার বছর পর কেবলমাত্র চীনের মহাপ্রাচীর, মিসরের পিরামিড এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট রাশমোর ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ছাড়া বলতে গেলে মানুষের নির্মিত আর কোনো স্থাপনাই টিকে থাকবে না। মাউন্ট রাশমোরে পাহাড় কেটে প্রেসিডেন্টদের তৈরি মূর্তিগুলোই হয়তো সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হবে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত না হলে সেগুলো সাত মিলিয়ন বছর পর্যন্ত অক্ষত থাকতে পারবে। দশ থেকে পনেরো মিলিয়ন বছর পর যদি কোনো এলিয়েন পৃথিবীতে ভ্রমণ করে, তবে কেবলমাত্র কিছু প্লাস্টিকের অবশেষ ছাড়া মানুষের তৈরি কোনো কিছুই তারা খুঁজে পাবে না।