সাইন আপ করুন সাইন আপ করুন

সাইন আপ করুন

জিমেইল থেকে লগইন করুন
অথবা আড্ডাবাজ একাউন্ট থেকে


আগে থেকেই একাউন্ট আছে? এখনি লগ ইন করুন

লগ ইন করুন লগ ইন করুন

লগিন করুন

জিমেইল থেকে লগইন করুন
অথবা আড্ডাবাজ একাউন্ট থেকে

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?

কোন একাউন্ট নেই? এখানে সাইন আপ করুন

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন

রিসেট পাসওয়ার্ড

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? আপনার ইমেইল এড্রেস দিন। ইমেইলের মাধ্যমে আপনি নতুন পাসওয়ার্ড তৈরির লিংক পেয়ে যাবেন।

আগে থেকেই একাউন্ট আছে? এখনি লগ ইন করুন

দুঃক্ষিত, প্রশ্ন করার অনুমতি আপনার নেই, প্রশ্ন করার জন্য অবশ্যই আপনাকে লগ ইন করতে হবে.

জিমেইল থেকে লগইন করুন
অথবা আড্ডাবাজ একাউন্ট থেকে

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?

একাউন্ট নেই? এখানে সাইন আপ করুন

দুঃক্ষিত, ব্লগ লেখার অনুমতি আপনার নেই। লেখক হতে হলে addabuzzauthor@gmail.com ঠিকানায় মেইল পাঠিয়ে অনুমতি নিন। (Sorry, you do not have permission to add post. Please send a request mail to addabuzzauthor@gmail.com for giving permission.)

জিমেইল থেকে লগইন করুন
অথবা আড্ডাবাজ একাউন্ট থেকে

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?

একাউন্ট নেই? এখানে সাইন আপ করুন

আপনি কেন মনে করছেন এই প্রশ্নটি রিপোর্ট করা উচিৎ?

আপনি কেন মনে করছেন এই উত্তরটি রিপোর্ট করা উচিৎ?

আপনি কেন মনে করছেন এই ব্যক্তিকে রিপোর্ট করা উচিৎ?

সাইন ইনসাইন আপ

AddaBuzz.net

AddaBuzz.net Logo AddaBuzz.net Logo

AddaBuzz.net Navigation

  • হোমপেজ
  • ব্লগ
  • ইউজার
  • যোগাযোগ
সার্চ করুন
একটি প্রশ্ন করুন

Mobile menu

Close
একটি প্রশ্ন করুন
  • হোমপেজ
  • জরুরী প্রশ্ন
  • প্রশ্ন
    • নতুন প্রশ্ন
    • জনপ্রিয় প্রশ্ন
    • সর্বাধিক উত্তরিত
    • অবশ্যই পড়ুন
  • ব্লগ পড়ুন
  • গ্রুপ
  • কমিউনিটি
  • জরিপ
  • ব্যাজ
  • ইউজার
  • বিভাগ
  • সাহায্য
  • টাকা উত্তোলন করুন
  • আড্ডাবাজ অ্যাপ

ইতিহাস

Question related on history should be listed here.

শেয়ার করুন
  • Facebook
8 ফলোয়ার
84 উত্তর
215 প্রশ্ন
হোমপেজ/ইতিহাস
অ্যাপ ইন্সটল করুন
  • সাম্প্রতিক প্রশ্ন
  • সর্বাধিক উত্তর
  • উত্তর
  • অনুত্তরিত
  • সর্বাধিক দেখা
  • সর্বাধিক পছন্দকৃত
  • এলোমেলো

AddaBuzz.net Latest প্রশ্ন

ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

জেন্দাবেস্তা কি?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৪,০০০ ধর্মীয় মতবাদ বা বিশ্বাস চালু আছে। এসবের মধ্যে একটি হলো জরথুস্ত্রবাদ। প্রায় ৪,০০০ বছর পূর্বে পারস্যে (ইরান) উদ্ভব হওয়া এই ধর্মকে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। অতিপ্রাচীন এই ইরানীয় ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন জরথুস্ত্র। তাদের ধর্মগ্রন্থ জেন্দাবেস্তবিস্তারিত পড়ুন

    বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৪,০০০ ধর্মীয় মতবাদ বা বিশ্বাস চালু আছে। এসবের মধ্যে একটি হলো জরথুস্ত্রবাদ। প্রায় ৪,০০০ বছর পূর্বে পারস্যে (ইরান) উদ্ভব হওয়া এই ধর্মকে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। অতিপ্রাচীন এই ইরানীয় ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন জরথুস্ত্র। তাদের ধর্মগ্রন্থ জেন্দাবেস্তা বা আবেস্তা নামে পরিচিত। খ্রি.পূ. ১৫০০ অব্দ – খ্রি.পূ. ১০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে ধর্মপ্রবক্তা জরথুস্ত্রের মুখ নিঃসৃত বাণীসমূহ বংশপরম্পরা ও ঐতিহ্যগতভাবে কেতাবে লিপিবদ্ধ হয়ে তা রূপ নিয়েছে জেন্দাবেস্তায়। জেন্দাবেস্তার মৌলিক প্রার্থনা এবং স্তবগান রচিত হয়েছে আবেস্তা ভাষায়। সাসানীয় সাম্রাজ্যের আগপর্যন্ত (২৪৪ খ্রি. – ৬৫১ খ্রি.) এই ভাষা মৌখিকভাবে সংরক্ষিত থাকে। সাসানীয় সাম্রাজ্যের আমলে আরামীয় লিপির ওপর ভিত্তি করে আবেস্তা ভাষার জন্য তৈরি করা হয় নিজস্ব বর্ণমালা। বর্তমানে এটি একটি অধুনা-লুপ্তপ্রায় ভাষা।

    জেন্দাবেস্তা
    জরথুস্ত্রীয় প্রথা অনুযায়ী, সর্বজ্ঞানী দেবতা অহুর মাজদা জরাথুস্ত্রের নিকট দিব্যজ্ঞান প্রকাশ করেছিলেন। জরথুস্ত্র তা পাঠ করে শুনিয়েছিলেন সম্রাট বিশতাসপারকে। সেই শ্লোকসমূহ মোট ২১ খানা বইয়ে লিপিবদ্ধ করা আছে, যা নাস্ত নামে পরিচিত। জরথুস্ত্রবাদ রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত এবং বিকশিত হবার পর ধর্মসংক্রান্ত মূল রচনার পাশাপাশি ধর্মীয় রীতিনীতি, ভাষ্য, প্রথা- এসবের ধারণা উন্নতিসাধন ঘটে। আবেস্তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়গুলো লালিত হয়েছে আকেমেনিড সাম্রাজ্য ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের আমলে, জরথুস্ত্রীয় পারসিকদের দ্বারা।

    অহুর মাজদা
    প্রাচীন ইরানের প্রধান ধর্ম ছিল বহুঈশ্বরবাদী এবং সেই ধর্মে অহুর মাজদা ছিলেন দেবসম্রাট। এই দেবতারা জোটবদ্ধভাবে লড়তেন সত্যের পক্ষে, বাধা হয়ে দাঁড়াতেন অশুভ শক্তি ‘আংগ্রা মন্যু’ ও তার দলবলের বিরুদ্ধে। অহুর মাজদা ও তার দলের সেবক হিসেবে পূজা-অর্চনায় নিয়োজিত ছিলেন একদল পুরোহিত। সম্ভবত খ্রি.পূ. ১৫০০ অব্দ – খ্রি.পূ. ১০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে জরথুস্ত্র নামে এক পুরোহিত অহুর মাজদা থেকে দিব্যজ্ঞান প্রাপ্ত হন। অহুর মাজদা তাকে দর্শন দেন এক নদীর তীরে। ঐশ্বরিক সেই সত্তা নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন ‘বহু মানাহ’ (সৎ উদ্দেশ্য) নামে। তিনি জরথুস্ত্রকে জানিয়েছিলেন, প্রকৃত ঈশ্বর একজনই, তিনি হলেন অহুর মাজদা। তার থেকে প্রাপ্ত দৈববাণীসমূহ মানুষের মধ্যে প্রচার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জরাথুস্ত্রকে।

    অহুর মাজদা বনাম আঙ্গ্রা মন্যু
    জরাথুস্ত্রের সেই ধর্মীয় বাণী প্রচারের প্রচেষ্টা শুরুতে কেউ ভালো নজরে দেখেনি। একসময় জীবননাশের হুমকি পাওয়ায়, তিনি নিজ গৃহ ত্যাগ করে হাজির হন সম্রাট বিশতাসপার রাজ দরবারে। প্রথমে সম্রাট নয়া ধর্মমতের জন্য তাকে বন্দি করলেও, রাজার প্রিয় ঘোড়াকে সুস্থ করে দিলে জরাথুস্ত্রের প্রতি সদয় হন তিনি। একসময় জরথুস্ত্রীয় ধর্মে ধর্মান্তরিত হন সম্রাট। এরপর সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজ্যজুড়ে শুরু হয় এই ধর্মের প্রচার ও প্রসার।

    সম্রাট বিশতাসপাসের রাজদরবারে জরথুস্ত্র
    আবেস্তার প্রাচীনতম অধ্যায়ের নাম হলো গাথা। মনে করা হয়, অহুর মাজদার প্রশংসা সংবলিত এই স্তুতিসমূহ রচিত হয়েছিল স্বয়ং জরাথুস্ত্রের দ্বারা। এই অংশে সঠিক ও সুপথে জীবন পরিচালনায় রাস্তা দেখানোর জন্য অহুর মাজদার নিকট মিনতি করা হয়েছে। কিংবদন্তি অনুসারে, এই স্তবগানগুলো রচনা করা হয়েছিল সম্রাট বিশতাসপাসের আদেশে। যদিও এর কোনো মজবুত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।

    জরথুস্ত্র
    এই ধর্ম রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত হয়েছিল আকেমেনিড সাম্রাজ্যকালে, সম্ভবত সম্রাট প্রথম দারিয়ুসের আমলে। সাইরাস দ্য গ্রেটের আমলে বিভিন্ন নথিতে অহুর মাজদার উল্লেখ পাওয়া গেলেও, তখন বহু-ঈশ্বরবাদী বিশ্বাস চালু ছিল। কথিত আছে, আকেমেনিডরা আবেস্তার একটি সংস্করণ রচনা করেছিলেন, যা খ্রি.পূ. ৩৩০ অব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের অভিযানে পার্সিপোলিস পুড়িয়ে দেওয়ার সময় ধ্বংস হয়ে যায়। যদিও বর্তমানে বহু পণ্ডিত সে বিষয়কে অস্বীকার করে থাকেন।

    সম্রাট প্রথম দারিয়ুস
    হেলেনিস্টিক সেলূসিড সাম্রাজ্যের দ্বারা আকেমেনিড সাম্রাজ্য প্রতিস্থাপিত হলে, শুধুমাত্র উচ্চশ্রেণীর গ্রিকরা ছাড়া মোটামুটি বাকি সবার মাঝে জরথুস্ত্রীয় ধর্মের অনুশীলন অব্যাহত ছিল। এরপর ক্ষমতার গদিতে পার্থীয় সাম্রাজ্য আসীন হলে, তাদের উচ্চশ্রেণীও গ্রহণ করে জরথুস্ত্রীয় মতবাদ। জানা যায়, সেসময় আবেস্তার একটি সংস্করণ রচিত হয়েছিল। আকেমেনিড সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে সেটিও হারিয়ে যায়। আধুনিক যুগের বহু ইতিহাসবিদ সেই দাবিকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন।

    পার্থীয় যোদ্ধা
    প্রাচীনকালে আবেস্তা রচনার স্বর্ণযুগ ছিল সাসানীয় সাম্রাজ্য। সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম আর্দাশির (রাজত্বকাল: ২২৪ খ্রি.-২৪০ খ্রি.) জরথুস্ত্রীয় পুরোহিতদের রাজদরবারে তলব করে আবৃত্তি করিয়েছিলেন সেই স্তুতিগাথা, যাতে তা লিপিবদ্ধ করে রাখা যায়। মৌখিক ধর্মীয়জ্ঞান তখন রূপ নিয়েছিল লিখিতরূপে। প্রথম আর্দাশিরের পুত্র প্রথম শাপুর (রাজত্বকাল: ২৪০ খ্রি.-২৭০ খ্রি.) এই কাজ চলমান রাখেন। এরপর দ্বিতীয় শাপুর (রাজত্বকাল: ৩০৯-৩৭৯ খ্রিঃ), এবং প্রথম খসরুর (রাজত্বকাল: ৫৩১ খ্রি.-৫৭৯ খ্রি.) শাসনামলে গিয়ে শেষ হয় লিপিবদ্ধকরণের এই মহাকর্ম।

    সম্রাট প্রথম আর্দাশির

    আবেস্তা ও বৈদিক সাহিত্যের মাঝে সাদৃশ্য

    গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, ঋগ্বেদ এবং আবেস্তার লেখক-পূর্বপুরুষ একই ছিলেন এবং তারা ছিলেন প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয়। তবে ঋগ্বেদ এবং আবেস্তা রচনার বহু পূর্বেই তারা পৃথক হয়েছিলেন। প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয়দের আদি বাসভূমি ছিল উত্তর-পশ্চিম ইরান ও আনাতোলিয়ার পূর্বাংশ। আদি তাম্র যুগে (Early Copper Age) তাদের কয়েকটি গোষ্ঠী ভারতে প্রবেশ করে, এরাই ছিলেন ঋগ্বেদ রচনার পূর্বপুরুষ ভারতীয়-আর্য (Indo-Aryans)।

    প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের মতে, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষীদের আবাসস্থল ছিল মধ্য এশিয়া এবং ধীরে ধীরে বহু শতাব্দী ধরে তারা চারণভূমির সন্ধানে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার মতে, এই মধ্য এশিয়ার অভিবাসীরাই ইরানে আবেস্তা এবং ভারতে ঋগ্বেদ রচনা করেছেন।

    ১৯ শতকে পারসি পুরোহিতদের একটি চিত্র
    পারসিক ভাষা সম্পর্কের দিক থেকে উত্তর ভারতের ভাষার খুব কাছাকাছি। দুই অঞ্চলের ভাষাই ব্যুৎপত্তিগতভাবে ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীভুক্ত। ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, দেব, নাসত্য শব্দগুলোর উল্লেখ রয়েছে আবেস্তায়। সনাতন ধর্মের অসুরই আবেস্তায় বর্ণিত অহুর। তবে ইন্দ্রকে আবেস্তায় খলনায়ক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর অসুর বা অহুর পেয়েছে সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান। আচার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও উপনয়ন, সোম পানীয় পান এসবের ক্ষেত্রে দুই ধর্মে যথেষ্ট মিল লক্ষ্য করা যায়।

    ফেস রিকন্সট্রাকশন প্রযুক্তিতে প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয় একজন নারীর মুখাবয়ব

    আবেস্তা

    আবেস্তার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশের নাম গাথা। এগুলো হলো ব্যক্তিগত প্রশংসাস্তুতি, যা প্রার্থনা-নিবেদন এবং উপাসনা-আরাধনার সমন্বয়ে গঠিত। দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা জন্য কীভাবে জরথুস্ত্রীয় রীতিনীতি পালন করতে হয়, গাথা সে সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করে থাকে। গাথার সাথে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নির্দেশনা পুস্তকগুলো হলো জেন্দ, বেন্দিদাদ ইত্যাদি।

    যশ্ন গাথা

    যশ্ন (ভক্তি) হলো জরথুস্ত্রীয় ধর্মের আরাধনা, যা আবার কতগুলো গাথা অংশে বিভক্ত। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো, অহুর মাজদার মহিমাকে কেন্দ্র করে নিজ মনকে আলোর দিকে ধাবিত করা।

    যশ্ন গাথা মূলত পাঁচ ভাগে বিভক্ত:

    • অহুনাবৈতি গাথা
    • উশতাবৈতি গাথা
    • স্পেনতামন্যুষ গাথা
    • বহুক্ষত্র গাথা
    • বহিষতৈষতি গাথা


    যশ্ন গাথা
    বিশপেরাদ

    ২৩টি প্রার্থনাস্তব নিয়ে গঠিত বিশপেরাদ, যা যশ্নসমূহের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে থাকে। মূলত বিশপেরাদ হলো একটি জরথুস্ত্রীয় ধর্মানুষ্ঠান, যেখানে এই প্রার্থনাসমূহ পাঠ করা হয়। তবে যশ্নকে বাদ দিয়ে আলাদাভাবে বিশপেরাদের প্রার্থনাবাক্য পাঠের কোনো উপায় নেই।

    যশ্‌ত্
    যশ্‌ত্

    যশ্‌ত্ হলো একুশটি স্তুত সংবলিত বর্ণনা, যা পারলৌকিক এবং পবিত্র উপাদান জল এবং অগ্নিকে নির্দেশ করে। প্রাচীন ধর্মীয় রীতি সংস্কার করার সময় জরথুস্ত্র জনপ্রিয় কিছু দেবদেবীকে এই ধর্মে স্থান দিয়েছিলেন – যেমন অনহিতা (জল, উর্বরতা, স্বাস্থ্য এবং জ্ঞানের দেবী) এবং মিথ্র (সূর্যোদয়, চুক্তির দেবতা) প্রমুখ। যদিও বর্তমানে শুধু অহুর মাজদাকে সর্বশক্তিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তারপরেও কেউ অনহিতার নিকট সন্তানলাভের মানত করলে, তা অহুর মাজদার নিকটই মানত করার সমতুল্য। কারণ, এখানে দেবী অনহিতা শুধুমাত্র একজন মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকেন। এইসকল প্রার্থনার রীতি লিপিবদ্ধ করা আছে যশ্‌ত্ খণ্ডে।

    দেবী অহনিতা
    বেন্দিদাদ

    সর্বমোট ২২টি খণ্ড নিয়ে বেন্দিদাদ গঠিত। পুরাণ, প্রার্থনা, ধর্মানুষ্ঠান, গ্রহণীয় এবং বর্জনীয় আচার-ব্যবহার, অশুভ শক্তির হাত থেকে প্রতিরক্ষা, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শেষকৃত্য, অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, দান-খয়রাতসহ বহু বিষয় আলোচনা করা আছে এতে। একজন আদর্শ জরথুস্ত্রীয় হিসেবে কীভাবে জীবনযাপন করতে হবে, সে বিষয়ের দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় বেন্দিদাদে। বেন্দিদাদ নিয়ে জরথুস্ত্রীয়রা দুইভাগে বিভক্ত। একদলের কাছে এটি প্রত্যাখ্যাত হলেও আরেকদল তা সাদরে গ্রহণ করেছে। তবে এই বেন্দিদাদে লিপিবদ্ধ আছে সুপ্রাচীন কিছু জরথুস্ত্রীয় কাহিনি, যা খ্রিঃপূঃ অষ্টম সহস্রাব্দের বলে ধারণা করা হয়। সৃষ্টিপুরাণ, মহাপ্লাবনের আখ্যান ইত্যাদির বর্ণনা আছে এই অংশে।

    বেন্দিদাদ

    পুনরুদ্ধার

    ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমদের পারস্য বিজয় পতন ঘটায় সাসানীয় সাম্রাজ্যের। এই বিজয়ে পারস্যে ক্রমশ ম্লান হয়ে আসে জরথুস্ত্রীয় ধর্মের প্রভাব। এরপর পারসিকদের একটি অংশ পালিয়ে আসে ভারতবর্ষে, আরেকদল থেকে যায় নিজ মাতৃভূমিতেই। জরথুস্ত্রীয়দের গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মন্দিরগুলো ধ্বংস করা হয়। ফলে হারিয়ে যায় আবেস্তার ধর্মীয় প্রভাব। ৮ম-১০ শতাব্দীর মাঝে অনেক পারসি পালিয়ে আসে ভারতে। সাথে করে নিয়ে আসে তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ধর্মগ্রন্থ। ভারতীয় ওই পারসিদের বর্তমান বংশধর হলো শিল্পপতি টাটা ও গোদরেজ পরিবার, ফিল্ড মার্শাল শ্যাম মানেকশ, পরমাণু বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা, রাজনীতিবিদ ফিরোজ গান্ধি, অভিনেতা বোমান ইরানি, প্রযোজক রনি স্ক্রুভালা, জন আব্রাহাম, ফারহান আখতার, ফারাহ খান, জিম শরভ, আফতাব শিবদাসানিরা।

    ফারহান আখতার, ফারাহ খান, আফতাব শিবদাসানি, জন আব্রাহাম, জিম শরভ, বরুন তুর্কি
    ১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দে একজন বণিক ভারত থেকে আবেস্তীয় পাণ্ডুলিপি নিয়ে আসেন ব্রিটেনে। ইউরোপীয়রা তখন বুঝতে পারে, খণ্ডিত আকারে হলেও এই গ্রন্থের অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান। ১৭৫৫ সালে এই পাণ্ডুলিপিটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়, ‘Bodleian Library of Oxford University’ নামক এক গ্রন্থাগারে। একসময় এটি নজরে আসে যুবকবয়সী ফ্রেঞ্চ পণ্ডিত অঁকিতেল দুপেরঁর। আবেস্তা পুনরুদ্ধারে তিনি তার মহাকাব্যিক যাত্রা করেন ভারতের উদ্দেশ্য, এবং ১৭৬২ সালে ফ্রান্সে ফিরে আসেন ১৮০ খানা আবেস্তীয় পাণ্ডুলিপি নিয়ে। এরপর তার হাত ধরেই শুরু হয় এর অনুবাদকর্ম।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 110 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
Adnan bin zaman
Adnan bin zamanপণ্ডিত
সময়ঃ 2 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

1905 সালে বঙ্গভঙ্গের কারণ কী এবং তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার?

  1. allaboutsubha
    allaboutsubha শিক্ষক https://www.youtube.com/allaboutsubha/
    উত্তর দিয়েছেন 2 বছর আগে

    বঙ্গভঙ্গ 1905 সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। এর কারণ এবং বাস্তবায়নের দায়িত্বের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা যাক: বঙ্গভঙ্গের কারণ: জাতিগত ও ধর্মীয় বিভেদ: ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে ববিস্তারিত পড়ুন

    বঙ্গভঙ্গ 1905 সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। এর কারণ এবং বাস্তবায়নের দায়িত্বের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা যাক:

    বঙ্গভঙ্গের কারণ:

    1. জাতিগত ও ধর্মীয় বিভেদ: ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার কৌশল হিসেবে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মূলত, বাংলার মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ফাটল ধরাতে এটি একটি কৌশল ছিল।
    2. প্রশাসনিক কার্যক্রমের অকার্যকারিতা: বাংলার প্রশাসনিক কার্যক্রমের অদক্ষতা ও সঙ্কটের ফলে, বাংলার বড় আকারের শাসনব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন মনে করা হয়েছিল। এ কারণে ব্রিটিশ সরকার বাংলাকে দুটি ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনা নেয়।
    3. রাজনৈতিক আন্দোলনের শক্তি: বাংলায় বিশেষ করে কলকাতায় অতি সক্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো, যেমন বঙ্গীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং অন্যান্য স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনগুলো ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুরু করেছিল। এতে ব্রিটিশ সরকার ভয় পেয়েছিল যে, একীভূত বাংলার মধ্যে রাজনৈতিক শক্তি সংগঠিত হয়ে ওঠে এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরালো হতে পারে। তাই বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে তারা বাংলার রাজনৈতিক শক্তিকে ভাগ করতে চেয়েছিল।
    4. ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষা: ব্রিটিশ সরকার চেয়েছিল যে, বৃহত্তর বাংলা একত্রিত হয়ে বিপ্লবী বা স্বাধীনতার আন্দোলন গড়ে তোলার বদলে, ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনের মাধ্যমে নিজেদের শাসন শক্তি বজায় রাখতে।

    বাস্তবায়নের দায়িত্ব:

    বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করেন তখনকার গভর্নর লর্ড কার্জন। তিনি 1905 সালে 16 অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা করেন। এই সিদ্ধান্তে, বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় — একটি হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ এবং একটি মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশের বেশিরভাগ অংশ)।

    কার্জনের লক্ষ্য ছিল, বাংলার মুসলিম এবং হিন্দু জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করা এবং ব্রিটিশ শাসনকে আরো শক্তিশালী করা। যদিও বঙ্গভঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে তীব্র প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু হয়েছিল, কিন্তু এটি ব্রিটিশ শাসনকেই দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছিল।

    উপসংহার:

    বঙ্গভঙ্গ 1905 সালে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ, যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতবর্ষে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজন সৃষ্টি করে তাদের শাসন বজায় রাখা। এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নকারী ছিলেন লর্ড কার্জন, যিনি তৎকালীন বাংলার গভর্নর ছিলেন।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 2 টি উত্তর
  • 103 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

ইতিহাসের বিখ্যাত পাঁচটি তরবারির নাম কি?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    মানুষের ইতিহাসে তরবারির ব্যবহার শুরু হয় ব্রোঞ্জ যুগে। সর্বপ্রাচীন তরবারির যে নমুনাটি পাওয়া যায় সেটি খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ সালে তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। একসময়কার খাবার সংগ্রহ ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনীতা থেকে মানুষ অস্ত্র নির্মাণ করলেও সময়ের সাথে সাথে অস্ত্রের ব্যবহার হয়ে দাঁড়ায় মানুষের কী ভালো কী মনবিস্তারিত পড়ুন

    মানুষের ইতিহাসে তরবারির ব্যবহার শুরু হয় ব্রোঞ্জ যুগে। সর্বপ্রাচীন তরবারির যে নমুনাটি পাওয়া যায় সেটি খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ সালে তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। একসময়কার খাবার সংগ্রহ ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনীতা থেকে মানুষ অস্ত্র নির্মাণ করলেও সময়ের সাথে সাথে অস্ত্রের ব্যবহার হয়ে দাঁড়ায় মানুষের কী ভালো কী মন্দ, কী ন্যয় কী অন্যায়- যাবতীয় চাহিদা পূরণের জন্য ব্যবহৃত অন্যতম উপায়। আগ্নেয়াস্ত্র আবিস্কারের আগ পর্যন্ত তরবারিই ছিল মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত হাতিয়ার। এই লেখায় তুলে ধরা হল পৃথিবীর ইতিহাসে ব্যবহৃত পাঁচটি তরবারির কথা যেগুলো বিখ্যাত হয়েছিল এদের তরবারিসুলভ গুণ ও একই সাথে এদের ব্যবহারকারীর খ্যাতির কারণে।

    জুলফিকার

    জুলফিকার ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী ইবনে আবু তালিব (রা) এর ব্যবহৃত তরবারি। উহুদ এর যুদ্ধে হযরত মুহাম্মদ (সা) তার চাচাতো ভাই আলী-কে এই তরবারি দিয়েছিলেন।

    ইসলামিক বর্ণনা থেকে জানা যায়, উহুদের যুদ্ধে মক্কার সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধার ঢাল ও শিরস্ত্রাণ এক আঘাতে দ্বিখণ্ডিত করেন আলী (রা)। এই আঘাতে তার তরবারিটিও ভেঙে যায়। এই ঘটনার পর হযরত মুহাম্মাদ (সা) তার নিজ তরবারি জুলফিকার আলীকে দেন। শিয়া মতাদর্শ অনুযায়ী, মুসলমানদের বারোতম ইমাম মুহাম্মাদ আল মাহদী’র নিকট সংরক্ষিত ইসলামের ঐতিহাসিক জ্ঞান ও হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর যুদ্ধাস্ত্রের এক গোপন সংগ্রহ যা ‘আল জাফর’ নামে পরিচিত সেখানে এই তরবারিটি রাখা আছে।

    মূল জুলফিকার তরবারিটির প্রকৃত অবয়ব জানা যায় না। তবে ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনায় এটিকে চিত্রায়িত করা হয়েছে দুইটি দীর্ঘ ব্লেড জোড়া লাগানো অবস্থায়, যার অগ্রভাগ অনেকটা কাঁচির মত দ্বিখণ্ডিত। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় একে দুটো দীর্ঘ ব্লেড V আকৃতিতে জোড়া লাগানো অবস্থায় চিত্রায়িত করা হয়।

    zulfiqar

    জুলফিকার। মুঘল আমলে তৈরি রেপ্লিকা

    অটোমান পতাকায় V আকৃতির জুলফিকার।

    অটোমান পতাকায় V আকৃতির জুলফিকার

    মধ্য প্রাচ্যীয় যুদ্ধাস্ত্রের বর্ণনায় জুলফিকার-এর এর কথা অবধারিতভাবেই আসে। এর আকৃতির অনুকরণে এক সময় প্রাচ্যের অঞ্চলগুলোতে তরবারি তৈরির সময় অগ্রভাগ দ্বিখণ্ডিত রাখা হত।

    অটোমান সাম্রাজ্যের পতাকায় জুলফিকার এর বহুল চিত্রায়ন দেখা যায়। বিশেষত ষোল ও সতের শতকের অশ্বারোহী বাহিনী ‘জেনিসারি’র পতাকায় এর ছবি অঙ্কিত হত।  এমনকি জুলফিকার এর নাম সম্বলিত কবচের ব্যবহারও ছিল যা এখনও বিদ্যমান। কবচে খোদাই করা লেখাগুলোর মধ্যে বহুল ব্যবহৃত দুটো লাইন ছিল- “আলী অদ্বিতীয়, জুলফিকার তরবারি অদ্বিতীয়।”

    shah_jahan_and_his_son_dara_shikoh_c17th_century

    শিল্পীর কল্পনায়, মুঘল সম্রাট শাহজাহান মুঘল বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। উপরের বাম দিকে যুদ্ধের প্রশিক্ষিত হাতি বহন করছে জুলফিকার এর প্রতীক

    zulfikar-webbybuzz-com

    জুলফিকার এর একটি রেপ্লিকা;

    ইতিহাসের বিভিন্ন সময় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ দল, যুদ্ধে ব্যবহৃত জাহাজ এমনকি একটি ট্যাঙ্ক এর নামও জুলফিকারের নাম অনুসারে রাখা হয়েছে। বসনিয়ার যুদ্ধের সময় বসনিয়ান সৈন্যদের একটি বিশেষ ইউনিটের নাম ছিল জুলফিকার।

     

    ওয়ালেস সোর্ড

    ওয়ালেস সোর্ড ছিল স্কটিশ স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা উইলিয়াম ওয়ালেস এর তরবারি। স্কটিশদের স্বাধীনতার দাবিতে ১২৯৭ সালের স্টার্লিং এর যুদ্ধ ও ১২৯৮ সালের ফলক্রিক এর যুদ্ধে ওয়ালেস এই তরবারিটি ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়।

    ওয়ালেস তরবারিটি সবচেয়ে বিখ্যাত এর বিশাল আকার ও ওজনের জন্য। ৪ ফুট ৪ ইঞ্চি দীর্ঘ ব্লেড সহ পুরো তরবারির দৈর্ঘ্য ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি! এর ব্লেডের প্রস্থ ২.২৫ ইঞ্চি আর অগ্রভাগে ০.৭৫ ইঞ্চি। বিশালাকার এই তরবারির ওজন প্রায় ৩ কেজি!

    wallace_sword

    ওয়েলস মনুমেন্টে সংরক্ষিত ওয়ালেস সোর্ড

    স্কটল্যান্ডের স্টার্লিং এর ওয়ালেস মনুমেন্ট এ সংরক্ষিত এই তরবারিটির আকার ও এর গঠনপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে এটি সত্যিকারের উলিয়াম ওয়ালেস এর ব্যবহৃত তরবারি কিনা তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেন, সংরক্ষিত তরবারিটি তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি তরবারির ভিন্ন ভিন্ন অংশ একসাথে করে। সংরক্ষিত তরবারিটি দুই হাতে ধরে ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে তৈরি করা। আর গবেষকদের মতে, এটি ব্যবহারের জন্য উইলিয়াম ওয়ালেস এর উচ্চতা হতে হত অন্তত ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি! অথচ ১৩ শতকের স্কটল্যান্ডের মানুষের গড় উচ্চতা ছিল ৫ ফুট। তাই কথা উঠে, হয় ওয়ালেস সে সময়ের তুলনায় একজন দানবাকৃতির মানুষ ছিলেন নতুবা সংরক্ষিত এই তরবারিটি তার ব্যবহৃত নয়।

    braveheart-piterest

    ব্রেভহার্ট সিনেমায় উইলিয়াম ওয়ালেস এর ভূমিকায় মেল গিবসন

    জানা যায়, ফলক্রিক এর যুদ্ধে আটককৃত ওয়ালেসকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর ১৩০৫ সালে ডুম্বার্টন ক্যাসল এর গভর্নরের নিকট এই তরবারিটি ছিল। যদিও এর কোনো রেকর্ড পাওয়া যায় নি। দু’শো বছর পর ১৫০৫ সালে জানা যায়, স্কটল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জেমস এর নির্দেশে তরবারিটির খাপ, হাতল ও বেল্ট পরিবর্তন করা হয়, কেননা তখন জনশ্রুতি ছিল ওয়ালেস এর তরবারিতে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল স্টার্লিং এর যুদ্ধের ইংরেজ কমান্ডার হিউ ক্রেসিংহাম এর চামড়া থেকে। ১৮৮৮ সালে ওয়ালেস মনুমেন্টে সংরক্ষণের জন্য তরবারিটি দেয়া হয়।

    হনজো মাসামুনে

    হনজো মাসামুনে সর্বকালের সেরা তরবারিগুলোর একটি হিসেবে খ্যাত যার নির্মাতা ছিলেন মাসামুনে। মাসামুনে ছিলেন একজন জাপানি তরবারি নির্মাতা যাকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধাতুবিদ্যাবিশারদ বলা হয়। আনুমানিক ১২৮৮ সাল থেকে ১৩২৮ সাল পর্যন্ত তার কাজের পরিধি সম্পর্কে জানা যায়। সুক্ষতম ধার ও সৌন্দর্যের কারণে মাসামুনের নির্মিত তরবারিগুলোর মান কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিল।

    masamune-sword-austria-ancient-origins-net

    অস্ট্রিয়ার জাদুঘরে সংরক্ষিত মাসামুন নির্মিত একটি তরবারি

    ধারণা করা হয় হনজো মাসামুনে নামটি এসেছে হনজো শিগেনাগা নামক এক জাপানি যোদ্ধার নাম থেকে। হনজো শিগেনাগা ছিলেন ১৬ শতকের উয়েসুগি ক্ল্যান এর একজন জেনারেল। উমানোসুকে নামক একজন বিখ্যাত যোদ্ধার আক্রমণে শিগেনাগার শিরস্ত্রাণ টুকরো হয়ে যায়। কিন্তু তিনি বেঁচে যান সেই লড়াইয়ে এবং পুরস্কার হিসেবে তাকে যে তরবারি দিয়ে আঘাত করা হয় সেটি রেখে দেন। তরবারিটি এর আগে অনেক বিখ্যাত যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরবর্তীতে অর্থাভাবের কারণে তয়োতমি ক্ল্যান এর নিকট তরবারিটি বিক্রি করে দেন শিগেনাগা।

    katana_masamune

    মাসামুনে নির্মিত একটি তরবারি

    তয়োতমি ক্ল্যান এর পতনের পর তরবারিটি জাপানের তকুগাওয়া পরিবারের নিকট আসে। জাপানের ‘শগুন’ শাসনামলের অন্যতম শাসক ছিল তকুগাওয়া পরিবার। এই তরবারিটি পরিবারের এক শাসকের পর আরেকজনের নিকট শাসনের প্রতীক হিসেবে দেয়া হত। তকুগাওয়া পরিবারের শাসনামল শেষ হবার পরেও তারা তরবারিটি রেখে দেয়। ১৯৩৯ সালে হনজো মাসামুনেকে জাপানের জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে এর সর্বশেষ মালিকানা ছিল তকুগাওয়া লেমাসা’র নিকট। যুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পনের পর ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে হনজো মাসামুনে সহ আরও ১৪টি তরবারি জাপানের মেজিরো পুলিশ স্টেশনে জমা দেন তকুগাওয়া লেমাসা। ১৯৪৬ সালে পুলিশ এই তরবারিগুলো সার্জেন্ট কোল্ডি বাইমোর নামক একজনের কাছে দেয় বলে জানা যায়। সেই থেকে এই তরবারিটির আর কোনো হদিশ পাওয়া যায় নি। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে সার্জেন্ট কোল্ডি বাইমোর নামক কোনো ব্যক্তি তরবারিগুলো গ্রহণ করেছেন এমন তথ্যের কোনো রেকর্ড জাপানের কোথাও নেই। জাপানের এমন হারিয়ে যাওয়া অনেকগুলো বিখ্যাত তরবারির মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান ছিল হনজো মাসামুনে।

    জোয়ায়ুস

    শার্লেম্যান, যিনি চার্লস দ্য গ্রেট নামেও পরিচিত, তার ব্যবহৃত তরবারির নাম জোয়ায়ুস। শার্লেম্যান মধ্যযুগের শুরুতে ইউরোপের একটি বড় অংশের নেতৃত্ব দেন যার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে আজকের ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো। ৭৭৪ সালে তিনি ছিলেন ইতালির রাজা। ৮০০ সালে তিনি রোমান সম্রাট হয়েছিলেন। এর তিন শতক আগে পশ্চিম ইউরোপ সাম্রাজ্যের পতনের পর তিনিই ছিলেন প্রথম স্বীকৃত সম্রাট।

    joyeuse_louvre-wikimedia

    ল্যুভর মিউজিয়ামে সংরক্ষিত জোয়ায়ুস

    কথিত আছে, ক্রুশবিদ্ধ যিশু মৃত কিনা তা যাচাইয়ের জন্য যে বর্শা ব্যবহৃত হয়েছিল সে ‘পবিত্র বর্শা’ থেকে নেয়া উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে জোয়ায়ুস এর হাতলে। ১৮৬৭ সালে বিখ্যাত ‘বুলফিঞ্চ’স মিথোলজি’ বইয়ে দেখানো হয় শার্লেম্যান জোয়ায়ুস দিয়ে কোর্সাবল নামক একজন আরব সেনানায়কের শিরশ্ছেদ করছেন এবং আরেক বিখ্যাত যোদ্ধা ওজিয়েরের কাঁধে এটি ছুঁয়ে নাইট উপাধি প্রদান করছেন।

    ১২৭০ থেকে ১৮২৪ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের সম্রাটদের অভিষেক অনুষ্ঠানে জোয়ায়ুস তরবারিটি প্রদর্শিত হত। ১৭৯৩ সালে এটিকে ল্যুভর মিউজিয়ামে নিয়ে আসা হয়।

    charlemagne

    শিল্পীর কল্পনায় শার্লেম্যান, হাতে জোয়ায়ুস

    প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে এসব অভিষেক অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য জোয়ায়ুসের গঠনে পরিবর্তন এসেছে অনেকবার। কোনো গবেষক বলছেন এর ব্লেডটিই কেবল মূল জোয়ায়ুসের ব্লেড, কেউ বলেন ১০ শতকে এর ব্লেড পরিবর্তন করা হয়েছে, কেউ বলেন ১৩ শতকে। আবার কারো মতে, ১০ শতকে পরিবর্তিত ব্লেডটিও ১৮০৪ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অভিষেক অনুষ্ঠানের সময় পাল্টে ফেলা হয়েছিল। ল্যুভরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, বর্তমানে প্রদর্শিত জোয়ায়ুস এর হাতলের মাথাটি তৈরি হয়েছে ১০-১১ শতকে, হাতল ও ব্লেডের সংযোগস্থল ক্রসগার্ডটি তৈরি হয়েছে ১২ শতকে এবং তরবারির খাপ তৈরি হয়েছে ১৩ শতকে।

    নেপোলিয়নের তরবারি

    মানব ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত এবং একই সাথে বিতর্কিত যোদ্ধা নেপোলিয়ন বোনাপার্ট অমর তার অসামান্য যুদ্ধ পরিকল্পনার জন্য। ফরাসী বিপ্লবের ধারক এবং ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়নের জীবনাবসান ঘটে আটলান্টিক মহাসাগরের সেইন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হয়ে।

    নেপোলিয়নের ব্যবহৃত তরবারিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত তার স্বর্ণখচিত তরবারি যেটি ২০০৭ সালে ফ্রান্সের একটি নিলামে সাড়ে ৬ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। ১৮০০ সালে নেপোলিয়ন ইতালির আলেসান্দ্রিয়াতে মারেঙ্গোর যুদ্ধে এই তরবারিটি শেষবারের মত ব্যবহার করেছিলেন অস্ট্রিয় বাহিনীর বিরুদ্ধে। অস্ট্রিয় বাহিনীর অপ্রস্তুত অবস্থায় হঠাৎ আক্রমণ করে এই যুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিলেন নেপোলিয়ন।

    np-sword-ap

    নেপোলিয়নের স্বর্ণখচিত তরবারি

    তরবারির প্রায় ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি দীর্ঘ ও সামান্য বাঁকানো ব্লেডটিতে স্বর্ণের কারুকাজ করা আছে। ধারণা করা হয়, এটিই নেপোলিয়নের সর্বশেষ তরবারি যেটি সাধারণ মানুষের মালিকানায় আছে।

    তরবারিটির ডিজাইনের পেছনে আছে নেপোলিয়নের মিশর অভিযানের সময়কার অভিজ্ঞতা। তিনি দেখেন সেখানকার ব্যবহৃত তরবারিগুলো সামান্য বাঁকানো থাকায় এগুলো ব্যবহারে সুবিধাজনক। এরপর তিনি নিজের জন্য এই ডিজাইনের তরবারি তৈরি করেন।

    nps

    নিলামে প্রদর্শিত হচ্ছে নেপোলিয়নের তরবারি

    মারেঙ্গোর যুদ্ধের পর তার ছোট ভাই জেরোমি বোনাপার্টের বিয়েতে তরবারিটি উপহার দেন নেপোলিয়ন। এরপর থেকে বংশপরম্পরায় তরবারিটি তাদের কাছে ছিল।

    ১৯৭৮ সালে তরবারিটিকে ফ্রান্সের জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করা হয়। নিয়ম করা হয় ফরাসী নাগরিক নন এমন কেউ এটি কিনলে তার অবশ্যই ফ্রান্সে একটি ঠিকানা থাকতে হবে যেখানে তরবারিটি বছরের অন্তত ৬ মাস রাখতে হবে।

    এতক্ষণ পৃথিবীর বিখ্যাত পাঁচটি তরবারি সম্পর্কে জানলেন। এই তরবারিগুলোর কোনোটি ব্যবহৃত হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে, কোনোটি মতাদর্শ প্রচারে, কোনোটি সাম্রাজ্য বিস্তারে। তবে তরবারির মূল কাজ কিন্তু একটাই, মানুষের উপর ব্যবহৃত হওয়া। ‘ফাদার অব ইউরোপ’ খ্যাত শার্লেম্যান এর তরবারি জোয়ায়ুস এর শাব্দিক অর্থ হল উৎফুল্ল! ভাবা যায়, একটা তরবারির নাম উৎফুল্ল! আজকের যুগে তরবারি কেবল সৈন্যদের সাইডআর্ম কিংবা ক্রীড়া সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হলেও একটা সময় এটাই ছিল মানুষের বিধ্বংসী কাজের প্রতীক, কারও কারও কাছে যা ছিল কেবলই উৎফুল্ল হবার নিয়ামক।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 100 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 2 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

মগের মুল্লুকের সীমানা কতটুকু ছিল? ইতিহাস কী বলে ?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 2 বছর আগে
    উত্তরটি এডিট করা হয়েছে।

    সময়টা ২৭ জানুয়ারি বুধবার, ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ। চট্টগ্রামের  ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। এই দিনে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খানের পুত্র বুজুর্গ উমিদ খানের নেতৃত্বে মোগল বাহিনীর হাতে আরাকান ম্রাউক-উ রাজ্যের বাহিনী  পরাজিত হয়।১ যার ফলে নাফ নদী পর্যন্ত বাংলার সীমানা আবার পুনরুদ্ধার হয়। ম্রাউক-উ রাজ্যের শাসন আমল যবিস্তারিত পড়ুন

    সময়টা ২৭ জানুয়ারি বুধবার, ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ। চট্টগ্রামের  ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। এই দিনে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খানের পুত্র বুজুর্গ উমিদ খানের নেতৃত্বে মোগল বাহিনীর হাতে আরাকান ম্রাউক-উ রাজ্যের বাহিনী  পরাজিত হয়।১ যার ফলে নাফ নদী পর্যন্ত বাংলার সীমানা আবার পুনরুদ্ধার হয়। ম্রাউক-উ রাজ্যের শাসন আমল যাকে দুঃশাসন আর চরম অত্যাচারের কারণে এ অঞ্চলকে  মগের মুল্লুক নামে অভিহিত করা হতো। ফেনী নদী থেকে সমগ্র আরাকান পর্যন্ত এ রাজ্যটি বিস্তৃত ছিল।

    বঙ্গের সুলতানদের হটিয়ে মধ্যযুগে প্রায় শত বছর চট্টগ্রামে মগ রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। এ বিজয়ের পর থেকে আর কখনো বাংলার প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক আওতার বাইরে যায়নি চট্টগ্রাম। মোগল, ব্রিটিশ, পাকিস্তানি, স্বাধীন বাংলাদেশ যখনই যার শাসন ছিল না কেনো এই ভূখন্ডে, চট্টগ্রাম সবসময়ই ছিল বাংলার সাথে, বাংলার প্রবেশদ্বার হিসেবে।

    চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। বাণিজ্যের কারণে যুগে যুগে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রয়োজনীয়তা ছিল। আরাকানিদের শাসনামলে চট্টগ্রামে বলা যায় এক ধরনের অরাজকতা বিদ্যমান ছিল। স্থানীয় অধিবাসীদের দাস হিসেবে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া, দস্যুতা, লুণ্ঠন এসব নানাবিধ ব্যাপার নিত্যনৈমিত্তিক ছিল। কবি আলাওলও দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে পরে নিজগুণে আরাকানের রাজসভায় জায়গা করে নিয়েছিলেন।

    নানা অরাজকতায় আরাকানি বা মগদের সহায়তা করত পর্তুগিজ বা ফিরিঙ্গিরা। এছাড়া ওলন্দাজ যা তৎকালীন ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে অভিহিত ছিল, তাদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল মগদের। ইতিহাসবিদরা পর্তুগিজ ও মগদের নৃশংসতার বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন “আরাকানের মগ এবং ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা উভয়ই প্রতিনিয়ত বাংলা (ঢাকা হইতে চট্টগ্রাম অঞ্চল) লুণ্ঠন করত। তারা যেসকল হিন্দু ও মুসলমানদের আটক করতে পারত, তাদের হাতের তালুতে ছিদ্র করে গর্তের মধ্য দিয়ে পাতলা বেতের ফিতা ঢুকিয়ে বাঁধত এবং তাদের জাহাজের ডেকের নীচে একসাথে আটকে রাখত। প্রতিদিন সকালে তারা উপর থেকে বন্দীদের জন্য কিছু কাঁচা চাল ছুড়ে দিত, যেমনটি পাখিকে খাবার ছুড়ে দেয়া হয়। তাদের দাক্ষিণাত্যের বন্দরে ডাচ, ইংরেজ ও ফরাসি বণিকদের কাছে বিক্রি করা হত। কখনও কখনও তারা তাদের বন্দীদেরকে উচ্চ মূল্যে বিক্রির জন্য তমলুক এবং বালেশ্বরে নিয়ে আসত। শুধুমাত্র ফিরিঙ্গিরা তাদের বন্দীদের বিক্রি করত, কিন্তু মগরা বন্দীদের আরাকানে কৃষি ও অন্যান্য পেশায় বা গৃহকর্মী ও উপপত্নী হিসাবে নিয়োগ করত”২। ইতিহাসবিদরা যদিও আরাকানিদের এই শাসনামল বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আরাকানিরা ফিরিঙ্গিদের সাহায্যপুষ্ট হয়ে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল এবং তাদের শক্তিশালী নৌ বাহিনী ছিল, তাদের উৎখাত করা খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না।

    কবি আলাওল আরাকান রাজের শক্তি-প্রতীক নৌবহরের বর্ণনা তার কাব্যগ্রন্থ সিকান্দরনামায় (যা পূর্ণাঙ্গভাবে ১৬৭৩ সালে প্রকাশিত হয়) বর্ণনা করেছেন:

    অসংখ্যাত নৌকাপাঁতি নানা জাতি নানা ভাতি
    সুচিত্র বিচিত্র বাহএ।
    জরশি-পাট-নেত লাঠিত চামর যূত
    সমুদ্র পূর্ণিত নৌকামএ।৩

    ১৬১৭ এবং ১৬২১ খ্রিস্টাব্দে দুইটি মোগল অভিযান ব্যর্থ হয়।

    ১৬৫৭ সালে মোগল সিংহাসন নিয়ে বাদশাহ শাহজাহানের চারপুত্রের মধ্যে সংঘটিত ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের কাছে তার অপর ভাইয়েরা পরাজিত হন।

    আওরঙ্গজেব আলমগীরের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাইদের একজন হলেন শাহজাদা সুজা। শাহজাদা সুজা ১৬৪০ সাল থেকে ১৬৬০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ বছর বাংলার সুবেদার ছিলেন।

    ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে পরাজয়ের পর শাহজাদা সুজার লক্ষ্য ছিল নোয়াখালী থেকে জাহাজে করে সমুদ্র পথে মক্কা অথবা ইস্তাম্বুলে চলে যাবেন। কিন্তু বর্ষাকাল এসে যাওয়ায় তা আর হয়ে ওঠেনি। এদিকে বাদশাহ আওরঙ্গজেবের বাহিনী প্রতিনিয়ত খোঁজ করছে শাহজাদা সুজার।

    আওরঙ্গজেবের হাত থেকে রক্ষা পেতে তাই শাহজাদা সুজা পার্শ্ববর্তী আরাকান রাজ্যে বিপুল সংখ্যক ধনরত্ন (প্রায় ২৩ টন ওজনের)৪ নিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে চলে যান। ১৬৬০ সালের আগস্ট মাসে এককালের পরাক্রমশালী বাঙলার সুবেদার শাহজাদা সুজার ঠাঁই হলো আরাকান রাজ্যে।

    কিন্তু ছয় মাসের মাথায় শাহজাদা সুজাকে খুন করে আরাকান রাজা। শাহজাদার পরিবারের মেয়েদের করা হয় লাঞ্ছিত এবং ছেলেদের করা হয় কারারুদ্ধ। মোগল শাহজাদার এই বিয়োগান্ত সংবাদ অচিরেই পৌঁছে যায় দিল্লি বাদশাহ তথা সুজার ভাই আওরঙ্গজেব আলমগীরের কাছে। মোগল সম্রাট তার ভাই শাহ সুজা এর সন্তানাদি এবং ধনরত্ন ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে পরপর দুইজন দূতকে আরাকান রাজদরবারে পাঠান। আরাকানিরা প্রথম দূতকে বন্দি করে দাস হিসেবে পাঠিয়ে দেয়। দ্বিতীয় দূতকে আরাকানের রাজদরবার গ্রহণ করে কিন্তু ইতিমধ্যে সমস্ত সন্তানাদিকে হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের সম্পদ হাতছাড়া হয়েছে, তাই কোন সদুত্তর মেলেনি।৫

    নিজ ভাই হলেও হয়তোবা ক্ষমতার প্রশ্নে কখনোই সুজার প্রতি সহানুভূতি দেখাতেন না বাদশাহ আওরঙ্গজেব। কিন্তু তাই বলে ভিনদেশী কারো হাতে ভাইয়ের খুন!

    আরাকান রাজের হাতে নিজ ভাইয়ের খুনের প্রতিশোধ নিতে তাই নিজ মামা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহচর শায়েস্তা খাঁকে বাংলার সুবেদার করে পাঠান দিল্লি বাদশাহ আওরঙ্গজেব।

    যুদ্ধ এড়ানো যাবেনা মনে করে আরাকানিরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানিরা পর্তুগিজদের সহায়তায় উল্টো ঢাকা আক্রমণ করে বসে এবং ১৬০ টির মতো নৌযান ধ্বংস করে। মোগল সম্রাটের নির্দেশে শায়েস্তা খান যুদ্ধের পরিকল্পনায় নেমে পড়েন।৬ তিনি ৩০০ যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করে নৌ সেনাপতি ইবনে হোসেইন এর হাতে দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। এর সাথে শায়েস্তা খান ওলন্দাজ এবং ফিরিঙ্গিদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং ফিরিঙ্গিদের সাথে আরাকানিদের বিবাদের সুবিধা নেন।

    ১৬৬৫ সালের শীতকাল। সুবেদার শায়েস্তা খাঁ এক সুসজ্জিত সেনাবাহিনী গঠন করলেন মগদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধারের এই মিশনে প্রধান সেনানায়ক হিসেবে যোগ দিলেন সুবেদার শায়েস্তা খাঁর সুযোগ্য পুত্র বুজুর্গ উমেদ খাঁ।

    মোগলরা ওলন্দাজ কূটনৈতিক সমর্থন ও সামরিক সাহায্যের আশ্বাস নিয়ে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে সন্দ্বীপ দখল করে। বাংলার নৌপথ সম্বন্ধে অভিজ্ঞ পর্তুগিজ ক্যাপ্টেন মুর এর নেতৃত্বে ৪০টি জাহাজ মোগল নৌ বহরের সাথে যুক্ত হলে নৌযুদ্ধ অন্য মাত্রা লাভ করে।৭ ইতিমধ্যে শায়েস্তা খানের পুত্র বুজুর্গ উমিদ খানের নেতৃত্বে ৬৫০০ সংখ্যক মোগল বাহিনী ফেনী নদী পেরিয়ে চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মোগলদের জয়লাভের পূর্বে চট্টগ্রামকে তখন বলা হত পাহাড় এবং গাছের জঙ্গল। ঐতিহাসিকরা উপমা দিয়ে লিখেছেন বন এত ঘন ছিল যে পিঁপড়ে চলাচলের পথ ছিল না।৮ মোগল বাহিনীর জন্য ঢাকা থেকে বিপুল সংখ্যক কুড়াল সরবরাহ করা হয়েছিল যা দিয়ে তারা বন পরিষ্কার করে চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে এসে হাজির হয়। ইতিহাসবিদরা মোগলদের এই তৈরি করা রাস্তা বর্তমান ঢাকা চট্টগ্রাম ট্রাঙ্ক রোডের সূত্রপাত বলে অভিহিত করেন।৯

    দ্বিমুখী আক্রমণে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারির ২৭ তারিখে তিন দিন অবরুদ্ধ থেকে প্রায় বিনা বাধায় এ অঞ্চলের আরাকানিদের কেন্দ্র চাটগছার কিল্লা বা আন্দরকিল্লার পতন হয়।১০ শায়েস্তা খান এর কূটনৈতিক সাফল্যের কারণে শক্তিশালী আরাকানিদের বিরুদ্ধে মোগলদের এই অসম্ভব জয় সম্ভব হয়।

    আলমগীরনামায় লিপিবদ্ধ তথ্য অনুসারে অনুমিত হয় ভূতপূর্ব ম্রাউক-উ রাজা সিরিসূধম্মারাজা এর পুত্র এই মোগল বাহিনীর সাথে ছিলেন এবং মোগলদের অভিপ্রায় ছিল আরাকান দখলের পর তাঁকে রাজা হিসাবে অধিষ্ট করা।১১ কিন্তু অপ্রতুল রসদ ও বর্ষা সমাগমের কারণে তারা নাফ নদীর তীর পর্যন্ত তাদের অগ্রযাত্রা সীমিত করে।১২ মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের পর বিলুপ্ত হয় দাসপ্রথা এবং পর্তুগিজদের দাপট কমে যায়।

    বুজুর্গ উমিদ খান আন্দরকিল্লা পতনের পর চট্টগ্রামের নামকরণ ইসলামাবাদ করেন এবং পরবর্তী বছরে কিল্লার উপরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন যেটি বর্তমানে আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদের প্রবেশদ্বারের উপরে দুইটি প্রস্তর খন্ডে ফারসি ভাষায় কিছু লিখা আছে, দ্বিতীয় লেখাটির অনুবাদ করলে দাঁড়ায়  ‘হে জ্ঞানী! তুমি জগৎবাসীকে বলে দাও, আজ এ দুনিয়ায় দ্বিতীয় কাবা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার প্রতিষ্ঠাকাল ১০৭৮ হিজরি।’

    বাংলার এই অঞ্চল পুনর্দখলের জন্য রাখাইনরা এর পরে অনেক চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি। পরবর্তীতে মোগলরা চট্টগ্রামে বহু স্থাপনা, মসজিদ, মন্দির নির্মাণ করে। রহমতগঞ্জ, হামজারবাগ, ঘাট ফরহাদবেগ, আসকার দীঘি, বাগমনিরাম, মোগলটুলী, পাঠানটুলী, বাগ-ই-হামজাহ মসজিদ, মিসকিন শাহ মসজিদ, কদম মুবারক মসজিদ, বায়েজিদ বোস্তামি মসজিদ, ওয়ালী খান মসজিদ সহ অনেক স্থাপনা চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে মোগলদের উপস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। মূলত ফেনী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এর বিস্তৃতি দেখা যায়। এগুলি চট্টগ্রামকে অনেক ঐতিহ্যবাহী করে তুলেছে। আমরা যেন এই কীর্তিগুলি সংরক্ষণ করি যাতে তা ইতিহাস মনে রাখতে সাহায্য করবে।

    ফেনী নদী থেকে আরাকান পর্যন্ত ছিল ‘মগের মুল্লুক’

     

    ২৭ জানুয়ারি ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দ। রোজ বুধবার। চট্টগ্রামের ইতিহাসে দিনটি বেশ স্মরণীয় হয়ে আছে আজও। এই দিনে মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খানের পুত্র বুজুর্গ উমিদ খানের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনীর হাতে আরাকান ম্রাউক-উ রাজ্যের বাহিনী পরাজিত হয়। যার ফলে নাফ নদী পর্যন্ত বাংলার সীমানা আবার পুনরুদ্ধার হয়।

    ম্রাউক-উ রাজ্যের শাসন আমলকে বলা হতো দুঃশাসনের শেষ পন্থা! তাই তো চরম অত্যাচারের কারণে এ অঞ্চলকে ‘মগের মুল্লুক’ নামে অভিহিত করা হতো। ফেনী নদী থেকে সমগ্র আরাকান পর্যন্ত এ রাজ্যটি বিস্তৃত ছিল।

    মগ কারা?

    মগের মুলুক—শব্দটা পড়ে কী ভাবছেন? বিশৃঙ্খল অবস্থা, অরাজক দেশ; তাই তো? কিন্তু বলুন তো এই ‘মগ’ কী জিনিস? আর মুলুকটা মগদেরই বা কেন হলো? বিষয়টি নিয়ে কতশত প্রশ্ন মানুষের মনে। তবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইতিহাস আর মগের মুলুক ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

    বঙ্গের সুলতানদের হটিয়ে মধ্যযুগে প্রায় শত বছর চট্টগ্রামে মগ রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। এ বিজয়ের পর থেকে আর কখনো বাংলার প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক আওতার বাইরে যায়নি চট্টগ্রাম। মুঘল, ব্রিটিশ, পাকিস্তানি, স্বাধীন বাংলাদেশেএসব জায়গায় যখনই যার শাসন ছিল না কেন; এই ভূখণ্ডে চট্টগ্রাম সবসময়ই ছিল বাংলার সঙ্গে, বাংলার প্রবেশদ্বার হিসেবে।

    ভৌগোলিকভাবে আরাকান বা বর্তমানের মিয়ানমার রাজ্যটি হলো মগদের দেশ। আক্ষরিক অর্থে মিয়ানমার হলো মগের মুলুক। তবে মগদের সঙ্গে যুক্ত এই কথাটি ব্যবহার করা হয় যথেচ্ছাচার আর অরাজকতার বিষয়টি বোঝাতে।

    চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। বাণিজ্যের কারণে যুগে যুগে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রয়োজনীয়তা ছিল। আরাকানিদের শাসনামলে চট্টগ্রামে বলা যায় এক ধরনের অরাজকতা বিদ্যমান ছিল। স্থানীয় অধিবাসীদের দাস হিসেবে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া, দস্যুতা, লুণ্ঠন এসব নানাবিধ ব্যাপার নিত্যনৈমিত্তিক ছিল। কবি আলাওলও দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে পরে নিজগুণে আরাকানের রাজসভায় জায়গা করে নিয়েছিলেন।

    ১৬২৫ সালের দিকে আমাদের বঙ্গভূমি ছিল খুব সমৃদ্ধশালী। তখন পর্তুগিজ আর মগ জলদস্যুরা পূর্ব ও নিম্ন বঙ্গের অনেক স্থানে খুব লুটপাট চালায়। এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে তাদের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। তখন এ ভূখণ্ড শাসন করতেন মুঘল সুবেদাররা। তারা এসেছিলেন সেই আফগান ভূমি থেকে আর তাদের শাসনের কেন্দ্র ছিল দিল্লি। ফলে জলস্থান মানে সমুদ্র বা নৌপথে যুদ্ধ করতে পারতেন না তারা।

    এদিকে মগেরা ছিল ভয়ংকর জলদস্যু। তারা নৌপথের যুদ্ধে খুব পটু। তাই মুঘল সুবেদাররা কখনোই মগদের সঙ্গে পেরে ওঠেননি। তখন খান-ই-দুরান ছিলেন ঢাকার সুবেদার। কথিত আছে, মানুষ হিসেবে তিনি একটু দুর্বলচিত্তের অধিকারী ছিলেন। মগ জলদস্যুদের ভয়ে তিনি রাজমহলে পালিয়ে যান। এই সুযোগে মগরা এই অঞ্চলে ইচ্ছেমতো লুটপাট, অত্যাচার নির্যাতন করে।

    মগেরা ছিল ভয়ংকর জলদস্যু। ছবি: সংগৃহীত

    নানা অরাজকতায় আরাকানি বা মগদের সহায়তা করত পর্তুগিজ বা ফিরিঙ্গিরা। এছাড়া ওলন্দাজ যা তৎকালীন ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে অভিহিত ছিল, তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল মগদের। ইতিহাসবিদরা যদিও আরাকানিদের এই শাসনামল বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আরাকানিরা ফিরিঙ্গিদের সাহায্যপুষ্ট হয়ে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল এবং তাদের শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল। তাই তাদের উৎখাত করা খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না।

    মগদের বিরুদ্ধে অভিযান

    ১৬১৭ এবং ১৬২১ খ্রিষ্টা দুটি মুঘল অভিযান ব্যর্থ হয়। ১৬৫৭ সালে মুঘল সিংহাসন নিয়ে বাদশাহ শাহজাহানের চার পুত্রের মধ্যে সংঘটিত ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের কাছে তার অপর ভাইয়েরা পরাজিত হন। আওরঙ্গজেব আলমগীরের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাইদের একজন হলেন শাহজাদা সুজা। তিনি ১৬৪০ সাল থেকে ১৬৬০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ বছর বাংলার সুবেদার ছিলেন।

    ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে পরাজয়ের পর শাহজাদা সুজার লক্ষ্য ছিল নোয়াখালী থেকে জাহাজে করে সমুদ্র পথে মক্কা অথবা ইস্তাম্বুলে চলে যাবেন। কিন্তু বর্ষাকাল এসে যাওয়ায় তা আর হয়ে ওঠেনি। এদিকে বাদশাহ আওরঙ্গজেবের বাহিনী প্রতিনিয়ত খোঁজ করছে শাহজাদা সুজার। আওরঙ্গজেবের হাত থেকে রক্ষা পেতে শাহজাদা সুজা পার্শ্ববর্তী আরাকান রাজ্যে বিপুলসংখ্যক ধনরত্ন নিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে চলে যান। ১৬৬০ সালের আগস্ট মাসে এককালের পরাক্রমশালী বাঙলার সুবেদার শাহজাদা সুজার ঠাঁই হলো আরাকান রাজ্যে।

    ছয় মাসের মাথায় শাহজাদা সুজাকে খুন করেন আরাকান রাজা। শাহজাদার পরিবারের মেয়েদের করা হয় লাঞ্ছিত এবং ছেলেদের করা হয় কারারুদ্ধ। মুঘল শাহজাদার এই বিয়োগান্ত সংবাদ অচিরেই পৌঁছে যায় দিল্লি বাদশাহ তথা সুজার ভাই আওরঙ্গজেব আলমগীরের কাছে। মুঘল সম্রাট তার ভাই শাহ সুজার সন্তানাদি এবং ধনরত্ন ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে পরপর দুজন দূতকে আরাকান রাজদরবারে পাঠান। আরাকানিরা প্রথম দূতকে বন্দি করে দাস হিসেবে পাঠিয়ে দেয়। দ্বিতীয় দূতকে আরাকানের রাজদরবার গ্রহণ করে, কিন্তু এরই মধ্যে সব সন্তানাদিকে হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের সম্পদ হাতছাড়া হয়েছে, তাই কোনো সদুত্তর মেলেনি।

    নিজ ভাই হলেও হয়তোবা ক্ষমতার প্রশ্নে কখনোই সুজার প্রতি সহানুভূতি দেখাতেন না বাদশাহ আওরঙ্গজেব। কিন্তু তাই বলে ভিনদেশি কারো হাতে ভাইয়ের খুন! আরাকান রাজের হাতে নিজ ভাইয়ের খুনের প্রতিশোধ নিতে তাই নিজ মামা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহচর শায়েস্তা খাঁকে বাংলার সুবেদার করে পাঠান দিল্লি বাদশাহ আওরঙ্গজেব।

    যুদ্ধ এড়ানো যাবে না মনে করে আরাকানিরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানিরা পর্তুগিজদের সহায়তায় উল্টো ঢাকা আক্রমণ করে বসে এবং ১৬০টির মতো নৌযান ধ্বংস করে। মুঘল সম্রাটের নির্দেশে শায়েস্তা খান যুদ্ধের পরিকল্পনায় নেমে পড়েন। তিনি ৩০০ যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করে নৌ সেনাপতি ইবনে হোসেইনের হাতে দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। পাশাপাশি শায়েস্তা খান ওলন্দাজ এবং ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে আরাকানিদের বিবাদের সুবিধা নেন।

    ১৬৬৫ সালের শীতকাল। সুবেদার শায়েস্তা খাঁ এক সুসজ্জিত সেনাবাহিনী গঠন করলেন মগদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধারের এই মিশনে প্রধান সেনানায়ক হিসেবে যোগ দিলেন সুবেদার শায়েস্তা খাঁর সুযোগ্য পুত্র বুজুর্গ উমেদ খাঁ। মুঘলরা ওলন্দাজ কূটনৈতিক সমর্থন ও সামরিক সাহায্যের আশ্বাস নিয়ে ১৬৬৫ খ্রিষ্টাব্দে সন্দ্বীপ দখল করে। বাংলার নৌপথ সম্পর্কে অভিজ্ঞ পর্তুগিজ ক্যাপ্টেন মুরের নেতৃত্বে ৪০টি জাহাজ মুঘল নৌবহরের সঙ্গে যুক্ত হলে নৌযুদ্ধ অন্যমাত্রা লাভ করে।

    মুগল সুবেদার শায়েস্তা খানের পুত্র বুজুর্গ উমিদ খানের নেতৃত্বে মুগল বাহিনীর হাতে আরাকান ম্রাউক–উ রাজ্যের বাহিনী পরাজিত হয়। ছবি: সংগৃহীত

    এরই মধ্যে শায়েস্তা খাঁর পুত্র বুজুর্গ উমিদ খাঁর নেতৃত্বে ৬ হাজার ৫০০ সংখ্যক মুঘল বাহিনী ফেনী নদী পেরিয়ে চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মুঘলদের জয়লাভের পূর্বে চট্টগ্রামকে তখন বলা হতো পাহাড় এবং গাছের জঙ্গল। ঐতিহাসিকরা উপমা দিয়ে লিখেছেন- বন এত ঘন ছিল যে পিঁপড়ে চলাচলের পথ ছিল না। মুঘল বাহিনীর জন্য ঢাকা থেকে বিপুলসংখ্যক কুড়াল সরবরাহ করা হয়েছিল, যা দিয়ে তারা বন পরিষ্কার করে চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে এসে হাজির হয়। ইতিহাসবিদরা মুঘলদের এই তৈরি করা রাস্তা বর্তমান ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রাঙ্ক রোডের সূত্রপাত বলে অভিহিত করেন।

    দ্বিমুখী আক্রমণে ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারির ২৭ তারিখে তিন দিন অবরুদ্ধ থেকে প্রায় বিনা বাধায় এ অঞ্চলের আরাকানিদের কেন্দ্র চাটগছার কিল্লা বা আন্দরকিল্লার পতন হয়। শায়েস্তা খাঁর কূটনৈতিক সাফল্যের কারণে শক্তিশালী আরাকানিদের বিরুদ্ধে মুঘলদের এই অসম্ভব জয় সম্ভব হয়।

    আলমগীরনামায় লিপিবদ্ধ তথ্য অনুসারে অনুমিত হয় ভূতপূর্ব ম্রাউক-উ রাজা সিরিসূধম্মারাজার পুত্র এই মোগল বাহিনীর সাথে ছিলেন এবং মুগলদের অভিপ্রায় ছিল আরাকান দখলের পর তাকে রাজা হিসাবে অধৃষ্ট করা। কিন্তু অপ্রতুল রসদ ও বর্ষা সমাগমের কারণে তারা নাফ নদীর তীর পর্যন্ত তাদের অগ্রযাত্রা সীমিত করে। মুগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের পর বিলুপ্ত হয় দাসপ্রথা। এর পাশাপাশি পর্তুগিজদের দাপটও কমে যায়।

    বুজুর্গ উমিদ খান আন্দরকিল্লা পতনের পর চট্টগ্রামের নামকরণ ইসলামাবাদ করেন এবং পরবর্তী বছরে কিল্লার উপরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন যেটি বর্তমানে আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদের প্রবেশদ্বারের উপরে দুইটি প্রস্তর খণ্ডে ফারসি ভাষায় কিছু লিখা আছে, দ্বিতীয় লেখাটির অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘হে জ্ঞানী! তুমি জগৎবাসীকে বলে দাও, আজ এ দুনিয়ায় দ্বিতীয় কাবা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার প্রতিষ্ঠাকাল ১০৭৮ হিজরি।’

    অত্যাচার অব্যাহত ছিল মুঘল আমলের শেষেও

    মুঘল আমলের শেষেও মগদের এই অত্যাচার অব্যাহত ছিল। পুরো বাংলা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে, তারা আসামেও অনেক অত্যাচার করে। ১৮২৪ সালের দিকে এই অত্যাচার চরম আকার ধারণ করে। তারপর তাদের সঙ্গে শাসক এবং সাধারণ মানুষের অনেকগুলো যুদ্ধ হয়। ১৮২৪, ১৮৫২ এবং ১৮৮৫ সালের যুদ্ধের পরে মগদের শক্তি বেশ কমে আসে। এভাবে আস্তে আস্তে তাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পায় এই ভূখণ্ডের মানুষ।

    যদিও এক সময় ঠিকই মগদের অত্যাচার কমেছে, তবু প্রায় দু’শ বছর সহ্য করতে হয়েছিল এই অত্যাচার। আর সেই তখন থেকেই যথেচ্ছাচার আর অরাজকতার অবস্থাকে বোঝাতে এই প্রবাদ ব্যবহার করা হয়। আজও যখন আমাদের সমাজে কেউ যেমন-তেমনভাবে অন্যের ওপর প্রভাব খাটায়, অত্যাচার করে, দুর্বল মানুষকে কষ্ট দেয় তখন মগদের সময়ের কথার সঙ্গে সেটা তুলনা করা হয় আর বলা হয়, মগের মুলুক।

    বাংলার এই অঞ্চল পুনর্দখলের জন্য রাখাইনরা এরপর অনেকবার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি। পরবর্তীতে মুগলরা চট্টগ্রামে বহু স্থাপনা, মসজিদ, মন্দির নির্মাণ করে। রহমতগঞ্জ, হামজারবাগ, ঘাট ফরহাদবেগ, আসকার দীঘি, বাগমনিরাম, মুগলটুলী, পাঠানটুলী, বাগ-ই-হামজাহ মসজিদ, মিসকিন শাহ মসজিদ, কদম মুবারক মসজিদ, বায়েজিদ বোস্তামি মসজিদ, ওয়ালী খান মসজিদসহ অনেক স্থাপনা চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে মুগলদের উপস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। মূলত ফেনী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এর বিস্তৃতি দেখা যায়। এগুলো চট্টগ্রামকে অনেক ঐতিহ্যবাহী করে তুলেছে।

    মুগলদের এই বিজয় না হলে হয়তো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মতো ফেনী নদীর তীরে হয়তো আমাদেরও দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হতো।

     

    মোগলদের এই বিজয় না হলে হয়তো এখন রোহিঙ্গাদের মতো ফেনী নদীর তীরে আমাদেরও দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হতো।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 99 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 2 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

ইতালিতে কমলা দিয়ে লড়াইয়ের উৎসবের ইতিহাস কি ?

  1. allaboutsubha
    allaboutsubha শিক্ষক https://www.youtube.com/allaboutsubha/
    উত্তর দিয়েছেন 2 বছর আগে

    ইতালিয় ভাষায় বলা হয় Carnevale di Ivrea। এই উৎসবে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন দলে সংঘটিত হয়ে পরস্পরের প্রতি কমলা নিক্ষেপ করে। এটি ইতালির সর্ববৃহৎ প্রতীকী `খাদ্য যুদ্ধ' বা `ফুড ফাইট', যা শাসকের স্বেচ্ছাচারিতার বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের প্রতীক।

    ইতালিয় ভাষায় বলা হয় Carnevale di Ivrea। এই উৎসবে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন দলে সংঘটিত হয়ে পরস্পরের প্রতি কমলা নিক্ষেপ করে। এটি ইতালির সর্ববৃহৎ প্রতীকী `খাদ্য যুদ্ধ’ বা `ফুড ফাইট’, যা শাসকের স্বেচ্ছাচারিতার বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের প্রতীক।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 82 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

নারকীয় হত্যাযজ্ঞ দ্য রেপ অব নানকিন কোথায় ও কবে সংঘটিত হয়?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    দ্য রেপ অব নানকিন: চীনের উপর চালানো জাপানিদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চ্যাং ঝি কিয়াং; বয়স মাত্র নয় বছর। মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। পথে তাদেরকে আটকে ফেলে জাপানি সৈন্যরা। তার মাকে ওরা (জাপানি সৈন্যরা) ধর্ষণ করতে চায়। কিয়াং বাধা দিলে তাকে ধরে ছুঁড়ে ফেলে দেয় সৈনিকরা। তারা তার মাকে বিবস্ত্র হতবিস্তারিত পড়ুন

    You are currently viewing দ্য রেপ অব নানকিন: চীনের উপর চালানো জাপানিদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ

    দ্য রেপ অব নানকিন: চীনের উপর চালানো জাপানিদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ

    চ্যাং ঝি কিয়াং; বয়স মাত্র নয় বছর। মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। পথে তাদেরকে আটকে ফেলে জাপানি সৈন্যরা। তার মাকে ওরা (জাপানি সৈন্যরা) ধর্ষণ করতে চায়। কিয়াং বাধা দিলে তাকে ধরে ছুঁড়ে ফেলে দেয় সৈনিকরা। তারা তার মাকে বিবস্ত্র হতে বলে। কিয়াংয়ের মা তা না করলে তাকে স্তনে বেয়োনেটে দিয়ে সজোরে আঘাত করে আর তার মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মৃত ভেবে সৈন্যরা চলে গেলে কিয়াং গিয়ে তার মাকে ডেকে তোলার চেষ্টা করে। তাঁর বুকের ক্ষত পরিমাপ করতে বস্তু সরাতেই ক্ষুধার্ত ছোট ভাইটি মায়ের স্তনে মুখ দেয়। কিন্তু তার মুখ ভরে উঠে রক্তে। ততক্ষণে তাঁর মা সত্যিই না ফেরার দেশে চলে গেছে।

    ঘটনাটি ১৯৩৭ সালের, চীনের নানকিন শহরের। শুধু এটিই নয়, এটি শুধুমাত্র চীনে জাপানিদের চালানো লক্ষ লক্ষ হত্যা ধর্ষণের মাত্র একটি ঘটনা।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হওয়ার ২ বছর আগে ১৯৩৭ সালের শেষদিকে চীনের পূর্ব জিয়াংসু প্রদেশের রাজধানী শহর নানকিং এ হামলা শুরু করে। হামলায় শহরের সৈন্য এবং নিরীহ বেসামরিক সহ হাজার হাজার লোককে হত্যা করে; আর মহিলাদের করা হয় ধর্ষণ ও নির্যাতন।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের মিত্র জাপানীদের চালানো এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নাম ‘দ্য রেইপ অব নানকিং’। এই তান্ডবকে নানকিং ম্যাসাকার ও বলা হয়ে থাকে।

    আক্রমণের প্রস্তুতি

    চিন ও জাপানের রক্তাক্ত লড়াইয়ে জাপানীদের হাতে সাংহাইয়ের পতন হওয়ার পর চীনা সৈন্যরা পিছু হটতে শুরু করে। জাপানীদের হাতে পুরো সৈন্য বাহিনী হারানোর ভয়ে চীনা সৈন্যদের নানকিং থেকে সরিয়ে আরও ভেতরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। জাপানীদের এগিয়ে আসার খবর শুনে নানকিংয়ের অধিবাসীরা পালাতে শুরু করলে চীনা সরকার তাতে বাঁধা দেয়। জাপানীরা যখন নানকিং এসে পৌঁছায়, তখন শহরের ভেতর ৫ লক্ষ অধিবাসী বসবাস করছিল।

    নানকিন আক্রমণ করার আগে জাপানিরা পথ যা পেয়েছে তাই হামলা করে ধ্বংস করেছে। পথেঘাটে সকল গ্রামের বাড়ি জ্বালিয়ে পুরিয়ে ছাড়খাড় করেছে। মহিলাদের ধর্ষণ করেছে, আর পুরুষদের কোনো কথা ছাড়াই হত্যা করেছে। মহিলাদের ধর্ষণ করার পর নির্যাতন করে হত্যা করেছে। যুবতী মেয়েদের দিনে ৬ থেকে ৭ বার ধর্ষণ করেছে।


    জাপানি সৈনিকরা এক প্রকার হাটতে হাটতে নানকিন দখল করেছে। তবুও কেনো তাদের এতো নিঃসংশতা তার কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন বিচিত্র উপায়ে তারা বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করতো।

    মুকাই এবং নদার নামে ২ জাপানিজ নিজেদের মাঝে ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতাও শুরু করেছিলেন।

    এই প্রতিযোগিতায় কে কয়টি খুন করেছে তার অগ্রগতির প্রতিবেদন শীর্ষস্থানীয় জাপানী পত্রিকাগুলো প্রতিদিনের আর্কষণীয় সংবাদ হিসেবে প্রচার করেছিল, এ যেন ছিল এক আন্তর্জাতিক খেলার ফলাফল।



    সেই বর্বর দুই সেনা অফিসার মুকাই এবং নদা
    ১৯৩৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর নানকিন দখলের পর টানা ৬ সপ্তাহ জাপানিজরা সেখানে দানবীয় তান্ডব চালিয়েছে। এই ৬ সপ্তাহে তারা প্রায় ৮০,০০০ নারী ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণ করার পর তারা তাদের খুন করেছে অধিকাংশ কে। আর পুরুষদের সামনে পেলে সরাসরি হত্যা করেছে।

    কেবল খুন করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। খুনের আগে যতভাবে মহিলাদের কষ্ট দেওয়া সম্ভব তার প্রায় সব বর্বরতাই জাপানীরা দেখিয়েছিল। গর্ভবতী মহিলাদের পেট কেটে খালি হাতে গর্ভের শিশুকে বের করে ফেলতো সৈন্যরা। যুবতী মেয়েদের দিনে ছয়-সাতবারও ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। তরুণীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য নানকিং থেকে বিভিন্ন জাপানী ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়েছিল। শিশুরাও জাপানী বর্বরতা থেকে রেহাই পায়নি। বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বহু শিশুকে হত্যা করা হয়।

    সেসময় নানকিনে থাকা সাংবাদিক জেমস এম ম্যাককালাম তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিখেছিলেন,

    আমি জানি না আমি কি লিখবো! এমন বর্বতা কখনো শুনিনি, দেখিনি বা পড়িওনি কখনো। চারিদিকে শুধু ধর্ষণ! ধর্ষণ! ধর্ষণ!
    প্রতি রাতেই আনুমানি ১০০০ টি ধর্ষণ আর অনেকগুলো দিনে। ধর্ষণের পর বেয়নেট দিয়ে গুতিয়ে, ছুরিকাঘাত করে কখনো গুলি করে হত্যা করছে। জাপানিজ সেনারা নিজেদের যা খুশি তাই করছে। যা খুশি করাকেই তারা তাদের স্বাধীনতা ভাবছে।

    নিউ ইর্য়ক টাইমসের এক সাংবাদিক লিখেছিলেন,

    সমুদ্রের পাড়ে যাওয়ার পথে আক্ষরিকভাবেই লাশের স্তুপ মাড়িয়ে উনাকে যেতে হয়েছে। সমুদ্রতীরে তার চোখের সামনে মাত্র দশ মিনিটে ২০০ বন্দীকে হত্যা করা হয়।

    জাপানিরা শহরটিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার জন্য দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ, নানজিংয়ের অর্ধেক ভবন লুট ও পুড়িয়ে ফেলেছিল তারা। তারা প্রথমে সম্মত হয়েছিল যে তারা নানজিং শহরের সেফটি এরিয়ায় আক্রমণ করবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, তারা তা করেনি।

    রবার্ট ও. উইলসন, সেফটি জোনে কর্মরত একজন ডাক্তার তার পরিবারকে একটি চিঠিতে লিখেছেন,

    বেসামরিকদের হত্যা ভয়ঙ্কর। আমি প্রায় বিশ্বাসের বাইরে ধর্ষণ এবং নৃশংসতার ঘটনাগুলি কয়েকশত পৃষ্ঠায় বর্ণনা করলেও শেষ করতে পারবো না। জাপানিজরা আমার ৭ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মীর মধ্যে ৫ জনকেই মেরে ফেলেছে। আর ২ জন বেয়নেট এর আঘাতে আধমরা হয়ে আছে।
    এছাড়াও গত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চীনা স্টাফ সদস্যের বাড়িতে ভাঙচুর করা হয় এবং দুই নারী, তার আত্মীয়কে ধর্ষণ করে জাপানি সৈনিকরা। একটি ৮ বছরের বাচ্চা ছেলেকে বেয়নেট দিয়ে মেরেছে। ছেলেটির শরূরে ৫ টি বেয়নেটের ক্ষত ছিল যার একটি তার পেটে প্রবেশ করেছিল, ওমেন্টামের একটি অংশ পেটের বাইরে ছিল। আমি মনে করি সে বাঁচবে।

    ১৯৩৮ সালের জানুয়ারিতে জাপানি বাহিনী ঘোষণা করে যে নানজিং-এ আদেশ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং তারা নিরাপত্তা অঞ্চলটি ভেঙে দিয়েছে। তবে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত হত্যা-ধর্ষণ বন্ধ হয়নি। শহরটির নিয়ন্ত্রণ একটি পুতুল সরকারকে দেওয়া হয়েছিল যেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ অবধি শাসন করেছিল।

    ভবিষ্যৎ ফলাফল

    আজ অবধি, নানজিং গণহত্যায় নিহতের সঠিক সংখ্যা আমাদের কাছে নেই। অনুমান করা হয় প্রায় ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ নিরীহ মানুষ হত্যা করেছিল জাপানি সৈনিকরা।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুদিম পরে, দূরপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধের জন্য মাতসুই এবং তার লেফটেন্যান্ট তানি হিসাওকে বিচার করে দোষী সাব্যস্ত করে।

    নানজিং-এর ঘটনা নিয়ে চরম ক্ষোভ ও বিতৃষ্ণা আজ পর্যন্ত চীন-জাপান সম্পর্ককে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।

    জাপান সরকার বহু বছর এ বর্বরতার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। বরং বিভিন্ন সময় চীনের প্রকাশিত সংবাদ ও তথ্যকে একপেশে হিসেবে দাবী করেছে। ১৯৯৫ সালের ১৫ আগস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তৎকালীন জাপান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তমিচি মুরায়ামা চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জাপান যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল তার জন্য আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু জাপান কখনোই লিখিতভাবে নানকিং গণহত্যার জন্য চীনের কাছে দুঃখ প্রকাশ কিংবা ক্ষমা চায়নি।

    ২০১৫ সালে জাপানী প্রধানমন্ত্রী শিনজো এ্যাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ৭০ বছর উপলক্ষ্যে যে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেন তাতে চীনে জাপানের এই বর্বরতার বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়, যা চীন-জাপান সর্ম্পকে টানাপোড়ন সৃষ্টি করে।

    চীন ও জাপানের সম্পর্কের টানা পোড়নে আজও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানী গণহত্যার প্রভাব সুস্পষ্ট।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 82 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
jahanur
jahanurপণ্ডিত
সময়ঃ 2 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

সক্রেটিস এর মৃত্যুর কারণ কি ছিল? সক্রেটিসের কিছু উক্তি বলবেন কি?

  1. nova
    সেরা উত্তর
    nova নতুন
    উত্তর দিয়েছেন 2 বছর আগে

    সক্রেটিস এর মৃত্যুর কারণ সক্রেটিসের মৃত্যু একটি বিতর্কিত ঘটনা। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সে, খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে দুটি প্রধান অভিযোগ ছিল—ধর্মের অবমাননা এবং যুবকদের বিপথগামী করা। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে হেমলক বিষ পান করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বাধ্য করা হয়। যদিওবিস্তারিত পড়ুন

    সক্রেটিস এর মৃত্যুর কারণ

    সক্রেটিসের মৃত্যু একটি বিতর্কিত ঘটনা। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সে, খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে দুটি প্রধান অভিযোগ ছিল—ধর্মের অবমাননা এবং যুবকদের বিপথগামী করা। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে হেমলক বিষ পান করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বাধ্য করা হয়। যদিও সক্রেটিস নিজে বিশ্বাস করতেন, তিনি কোনো ভুল করেননি এবং যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমে সত্যের সন্ধান করে যাচ্ছিলেন। তার মৃত্যুর পেছনে রাজনীতির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য, কারণ সে সময় এথেন্সের শাসকগণ তার চিন্তাধারাকে বিপজ্জনক বলে মনে করেছিলেন।

    সক্রেটিসের কিছু বিখ্যাত উক্তি

    1. “আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না।”
    2. “নিজেকে জানো।”
    3. “যদি তুমি সুখী হতে চাও, তাহলে যতটা সম্ভব কম প্রত্যাশা রাখ।”
    4. “বিজ্ঞতার লক্ষণ হলো সত্যপ্রীতি।”
    5. “যে সৎ ব্যক্তি অসৎ ব্যক্তির সঙ্গে মিশে থাকে, সে সত্যিই করুণার পাত্র।”

    দার্শনিক হিসেবে সক্রেটিস এর জনপ্রিয়তার কারণ

    সক্রেটিস দার্শনিক হিসেবে এত জনপ্রিয় হওয়ার কারণ তার চিন্তাশক্তি এবং যুক্তির ব্যবহার। তিনি কোনো লিখিত বই রেখে যাননি, বরং ছাত্রদের সঙ্গে আলাপচারিতা এবং প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে দর্শন শেখাতেন। তার ‘মায়েউটিক মেথড’ নামে পরিচিত পদ্ধতি, যেখানে তিনি প্রশ্ন করে মানুষকে নিজের অজ্ঞানতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করতেন, আজও শিক্ষা এবং দর্শনে আলোচিত হয়। তার চিন্তাধারা, বিশেষত সত্য ও ন্যায়ের প্রতি তার অঙ্গীকার, তাকে বিশ্ববিখ্যাত করেছে।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 2 টি উত্তর
  • 73 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

সংখ্যা আবিষ্কারের ইতিহাস কি?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    হিসাবের দুনিয়ায় সংখ্যা ছাড়া আমাদের কি জীবন চলে? দিন, মাস, বছরের হিসাব রাখা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটা কাজে সংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। আর তাই তো সংখ্যার মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক প্রাচীন সভ্যতায় মানুষ সংখ্যার সাথে ঐশী সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে। কিছু সংখ্যাকে মানুষ মনে করত পবিত্র, আবার কিছুবিস্তারিত পড়ুন

    হিসাবের দুনিয়ায় সংখ্যা ছাড়া আমাদের কি জীবন চলে? দিন, মাস, বছরের হিসাব রাখা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটা কাজে সংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। আর তাই তো সংখ্যার মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক প্রাচীন সভ্যতায় মানুষ সংখ্যার সাথে ঐশী সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে।

    কিছু সংখ্যাকে মানুষ মনে করত পবিত্র, আবার কিছু সংখ্যা ছিল মানুষের কাছে আতঙ্ক। এমনকি পাশ্চাত্যে আজও অনেক জায়গায় সেই বিশ্বাস টিকে আছে। Unlucky 13 কিংবা Lucky 7 এর মতো বিষয়গুলো অদ্যাবধি অনেক মানুষ বিশ্বাস করে। তবে নিরীহ গোবেচারা সংখ্যাদের মাঝে আদৌ কোনো শুভত্ব বা অশুভত্ব লুকিয়ে আছে কিনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে সেই বিশ্বাস খণ্ডন করা যতটা না আকর্ষণীয়, তার চেয়ে ঢের আকর্ষণীয় সংখ্যা ও গণনা পদ্ধতির ক্রমবিকাশ ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাস সম্পর্কে জানা। এই ফিচারটি সাজানো  হয়েছে সংখ্যার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নিয়ে।

    শুরুর কথা

    সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই গণনার প্রয়োজনীয়তা মানুষ উপলব্ধি করেছে। শিকার করা প্রাণীর সংখ্যা কিংবা দ্রব্য বিনিময় যুগে লেনদেনের সুবিধার্থে হিসাব নিকাশের ধারণা অর্জন করা মানুষের জন্য ছিল অপরিহার্য। তবে শুরুর দিকে সংখ্যা নিয়ে মানুষের ধারণা বেশ অস্পষ্ট ছিল। সংখ্যাগুলো সর্বদাই বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকত, যেমন- একটি পাখি, এক জোড়া জানোয়ার, দুটো হাত, এক হাঁড়ি মাছ।

    আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে এক-দুশো বছর আগেও সংখ্যা নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিলো না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় দক্ষিণ আফ্রিকার হটেনটট আদিবাসীর কথা। তাদের ভাষায় শুধু এক থেকে চার পর্যন্ত সংখ্যা ছিল এবং চারের চেয়ে বড় সব সংখ্যাই তাদের ভাষায় অনেক! আবার অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী কামিলারই গোত্রের মানুষ তিনের চেয়ে বড় কোনো সংখ্যা বোঝাতে সেই সংখ্যাকে এক থেকে তিন পর্যন্ত সংখ্যাগুলোর যোগফল আকারে প্রকাশ করত। যেমন তাদের কাছে মাল মানে এক, বুলান মানে দুই, গুলিবা মানে তিন। তাই চারকে তারা বলত বুলান-বুলান (দুই-দুই) পাঁচকে বুলান-গুলিবা (দুই-তিন) আর ছয়কে (গুলিবা-গুলিবা)।

    এখন প্রশ্ন চলে আসে কামিলারাই গোত্রের ভাষায় একশ কিংবা এক হাজারকে কীভাবে বলা যায়? খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে হটেনটট কিংবা কামিলারাই গোত্রের গণনা পদ্ধতি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু এতে তাদের কিছুই আসে যায়নি, কারণ একশ পর্যন্ত গণনা করার দরকারই হয়ত তাদের ছিল না। তবে নবপোলীয় যুগে উন্নত সভ্যতাগুলোর বিকাশের সাথে সাথে প্রয়োজন পড়ল আরও উন্নত গণনা পদ্ধতির।

    অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী

    মিশরীয় গণনা পদ্ধতি

    মানব সভ্যতা বিকাশের পেছনে মিশরীয়দের অবদান অনস্বীকার্য। প্রাচীন মিশরে ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থাপত্য এবং জীবন যাত্রায় প্রভূত উন্নতির সাথে সাথে একটি উন্নত গণনা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। আর সেই প্রয়োজনীয়তা থেকে বিকশিত হয়েছিল মিশরীয় সংখ্যা পদ্ধতি। প্রকান্ড পিরামিডগুলো নির্মাণের সময় হাজার হাজার শ্রমিকের খোরাক এবং বিপুল পরিমাণ নির্মাণ সামগ্রীর পাকা হিসাব রাখতে তারা সংখ্যা প্রতীক ব্যবহার করত। তবে ধারণা করা হয় মিশরীয়দের সংখ্যা পদ্ধতির সূচনা হয়েছিল পিরামিডেরও আগে, খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের দিকে।

     

    মিশরীয় সংখ্যা পদ্ধতি

    কিন্তু আমাদের এখনকার মতো ছিল না মিশরীয়দের সেই সংখ্যাপদ্ধতি। সেখানে ছিল না শুন্যের ব্যবহার। বরং ১০ এর বিভিন্ন গুনিতকের জন্য ছিল আলাদা আলাদা প্রতীক। ধরা যাক, মিশরীয় পদ্ধতিতে আমরা ৮৩৭২ লিখতে চাই। এক্ষেত্রে আমাদের ৮ টি ০০০, ৭টি ১০০, ৩টি ১০ এবং ২টি ১ পাশাপাশি লিখতে হবে। ফলে ৮৭৩২ সংখ্যার প্রাচীন মিশরীয় রূপটি হবে নিচের ছবিটির মতো।

    মিশরীয় পদ্ধতিতে ৮৭৩২

    ব্যাবিলনীয় পদ্ধতি

    গণিতশাস্ত্রে ব্যাবিলনীয়দের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। একদিকে জ্যামিতি শাস্ত্র বিকাশিত হয়েছিল মিশরে, আর অন্যদিকে পাটিগণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যা বিকাশিত হয়েছিল ব্যাবিলনে। ব্যাবিলনীয় বিজ্ঞানের সুদূরপ্রসারী প্রভাব আজও আমাদের মাঝে বিদ্যমান। বৃত্তকে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে বিভক্তকরণ এবং ৬০ মিনিটে ১ ঘন্টা ও ১২ ঘন্টায় ১ দিনের প্রচলন কিন্তু ব্যাবিলনীয়রাই করেছিল অর্থাৎ ব্যাবিলনীয় ১ মিনিট ছিল আমাদের এখনকার ২ মিনিটের সমান। তবে ব্যাবিলনীয়দের অর্জিত জ্ঞানের বেশিরভাগই কালের বিবর্তনের হারিয়ে গেলেও মৃতপাত্রে অঙ্কিত ও পাথরের ফলকে খোদাই করা লেখা থেকে জানা যায় ব্যাবিলনীয়রা পিথাগোরাসের উপপাদ্য ও দ্বিপদী উপপাদ্য সম্পর্কে অবগত ছিল।

    মিশরীয়দের মতো ব্যাবিলনীয়রাও শুন্যের ব্যবহার জানত না। তবে মিশরীয়দের সাথে ব্যাবিলনীয়দের সংখ্যা পদ্ধতির মূল পার্থক্য হলো- মিশরীয়রা কোনো সংখ্যাকে প্রকাশ করত ১০ এর গুণিতক আকারে অর্থাৎ উপরে যেটা আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি। অন্যদিকে ব্যাবিলনীয়রা সেই কাজটিই করত ৬০ এর গুণিতক আকারে প্রকাশ করে। তাই ব্যাবিলনীয় সংখ্যা পদ্ধতিকে ষাটমূলক পদ্ধতিও বলা হয়।

    ব্যাবিলনীয় ষাটমূলক সংখ্যা পদ্ধতি

    উপর্যুক্ত চিহ্নগুলো ছাড়াও তারা আরও বেশকিছু শর্টকাট পদ্ধতি ব্যবহার করত। এখানে একটি প্রশ্ন অবধারিতভাবে চলে আসে- ব্যাবিলনীয়দের ৬০ প্রীতির কারণটা কী? এর কোনো সরাসরি উত্তর পাওয়া যায় না। অনেকগুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ব্যাপার এর সাথে জড়িয়ে আছে। প্রথমত, ৬০ হচ্ছে এমন একটি সংখ্যা যেটি ১,২,৩,৪,৫,৬,১০,১২,১৫,২০ এবং ৩০ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য। তাই ভগ্নাংশ সংক্রান্ত কোনো সমস্যা সমাধানে ৬০ বেশ কাজের সংখ্যা।

    ধরা যাক, একটি ব্যবসায় ৩ জন অংশীদার এমনভাবে চুক্তি করল যে তারা প্রত্যেকে যথাক্রমে মোট লাভের ১/২, ১/৩ এবং ১/৬ অংশ পাবে। তাহলে যদি ৬০ টাকা লাভ হয় প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয়জন যথাক্রমে ৩০, ২০, ১০ টাকা পাবে। অর্থাৎ লাভ যত টাকাই হোক না কেন, সেটাকে যদি ৬০ এর গুণিতক আকারে প্রকাশ করা হয়, তাহলে হিসাবটা দাঁড়ায় বেশ সোজা। যদি ১০০০ টাকা লাভ হয় (১৬×৬০+৪০=১০০০), তাহলে প্রথমজন পাবে ১৬টি ৩০ টাকা বা ৪৮০ এবং সাথে বাকি ৪০ টাকার অর্ধেক ২০ টাকা। দ্বিতীয়জন পাবে ১৬টি ২০ টাকা এবং তৃতীয়জন পাবে ১৬টি ১০ টাকা এবং  প্রথমজন ৪০ টাকা থেকে অর্ধেক টাকা নেবার পর বাকি অর্ধেক টাকা থেকে দুজনই এমন ভাবে ভাগ পাবে যাতে দ্বিতীয়জন তৃতীয়জনের দ্বিগুণ টাকা পায়। খুব সহজেই কোনো গুণ ভাগ করা ছাড়াই হয়ে গেল নির্ভুল বন্টন।

    এখানে একটি জিনিস মনে রাখতে হবে- আমাদের মতো চমৎকার গুণ-ভাগ করার পদ্ধতি সেসময়ে জানা ছিল না। বর্তমানে আমরা যে দশমিক অঙ্কপাতন পদ্ধতিতে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ করি, সেটা আবিষ্কৃত হয়েছে ব্যাবিলনের আরও ৩০০০-৩৫০০ বছর পরে ভারতবর্ষে। এছাড়া ব্যাবিলনীয়রা এক সৌর বৎসরের দৈর্ঘ্য হিসাব করেছিল ৩৬০ দিন, যেটা প্রকৃত দৈর্ঘ্য ৩৬৫ দিনের বেশ কাছাকাছি। তাদের ১২ ঘন্টায় ১ দিন, ৬০ মিনিটে ঘন্টার কথা তো আগেই জেনেছি আমরা। আর এসব কারণে ব্যাবিলনীয়রা ষাটমূলক পদ্ধতিকেই বেছে নিয়েছিল বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করেন।

    ব্যাবিলনীয়দের খোদাই করা শিলা লিপি

    গ্রীক ও রোমান পদ্ধতি

    ব্যাবিলন ও মিশরের মতো গ্রীক ও রোমানরাও শুন্যের ব্যবহার জানত না। এর একটি বড় কারণ গ্রীক ও রোমানরা অনেক ব্যাপারেই তাদের দ্বারা প্রভাবিত। ১০০, ২০০ প্রভৃতি সংখ্যাকে আজকের জামানার মতো এক বা দুইয়ের পিঠে দুই শুন্য এভাবে না লিখে তারা বরং ব্যাবিলন ও মিশরের মতো আলাদা প্রতীক ব্যবহার করত। তবে গ্রীকরা সংখ্যার জন্য কোনো আলাদা প্রতীক উদ্ভাবন করেনি, বরং গ্রীক বর্ণমালার অক্ষরের সাহায্যে তারা সংখ্যা প্রকাশ করত। আর রোমান পদ্ধতিতে সংখ্যা লেখা আজও প্রাথমিক স্কুলগুলোতে শেখানো হয়। তাই সেটা নিয়ে নতুন করে বলাই বাহুল্য।

    গ্রীক সংখ্যার সারণী

    উপরের সারণি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি  λ (উচ্চারণ ল্যাম্বডা) দ্বারা বোঝানো হত ৩০ (কারণ λ এর অবস্থান ৩ নম্বর সারিতে এবং ১০ এর কলামে) এবং β (উচ্চারণ বিটা) দ্বারা বোঝানো হত ২। তাই গ্রীক পদ্ধতিতে ৩২ লিখতে চাইলে আমাদের লিখতে হবে λ β। কিন্তু সমস্যা হলো সারণি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি ১ থেকে ৯৯৯৯  পর্যন্ত সংখ্যা লিখতেই গ্রীকরা ৩৬টি আলাদা আলাদা অক্ষর ব্যবহার করত। একইভাবে একলক্ষ পর্যন্ত লিখতে ৪৬টি, দশলক্ষ পর্যন্ত লিখতে ৫৫ এবং এক কোটি পর্যন্ত লিখতে ৬৪টি আলাদা আলাদা হরফ ব্যবহার করতে হত যেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে আমরা পৃথিবীর সকল সংখ্যাকেই ০-৯ এই দশটি প্রতীকের সাহায্যে লিখতে পারি। এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন অক্ষর মনে রাখা একদিকে যেমন দুষ্কর, অন্যদিকে তাদের যোগ,বিয়োগ,গুণ,ভাগ করাও কষ্টসাধ্য।

    রোমানদের পদ্ধতিটি ছিল অনেকটা মিশরীয়দের মতো। যেমন কেউ রোমান পদ্ধতিতে ২০১৭ লিখতে চাইলে তাকে দুটি এক হাজার (M), একটি দশ (X) এবং সাত (VII) পাশাপাশি লিখতে হবে। তাই রোমান পদ্ধতিতে ২০১৭ হল MMXVII

    মায়া সভ্যতার গণনা পদ্ধতি

    এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা যেসব সভ্যতার নাম্বার সিস্টেম নিয়ে আলোচনা করলাম, সেগুলো প্রত্যেকটি প্রত্যেকের সাথে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল অথবা প্রভাবিত হয়েছিল। তবে এই লিস্টের ব্যতিক্রম হলো মায়া সভ্যতা। ল্যাটিন আমেরিকার এই সভ্যতাটি সম্পর্কে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মানুষের জানতে পেরেছে মাত্র ৫০০ বছর আগে। অথচ মায়া সভ্যতার বিকাশকাল আজ থেকে প্রায় পনেরশ বছর আগে। মায়া সভ্যতা সম্পর্কে লোকমুখে অনেক রহস্যময় কাহিনী প্রচলিত থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে ক্যালেন্ডারের জন্য মায়া সভ্যতা সবচেয়ে বেশি পরিচিত। মজার ব্যাপার হল তাদের ক্যালেন্ডারে ২০১২ সালের পর আর কোন সাল ছিল না। এর বাখ্যা অনেকে এইভাবে দিলেন যে মায়ানরা বিশ্বাস করত ২০১২ সালের পর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, যদিও অনেক গবেষক এই মতের সাথে দ্বিমতপোষণ করেছেন। সে যা-ই হোক, মায়া সভ্যতায় সংখ্যা পদ্ধতির বিকাশ ঘটেছিল একদম স্বতন্ত্রভাবে। তাদের সংখ্যাপদ্ধতি ছিল ৫ ভিত্তিক এবং অবাক করা ব্যাপার হলো মায়ারা শুন্যের জন্য আলাদা প্রতীক ব্যবহার করত। শুন্য, এক ও পাঁচ এই তিনটি সংখ্যার জন্য তারা শুধু তারা আলাদা প্রতীক ব্যবহার করত। বাকি সকল সংখ্যাগুলো লিখত এই তিনটি প্রতীক ব্যবহার করে। সেদিক থেকে চিন্তা করলে আধুনিক পদ্ধতির অনেক কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল মায়ানরা। তবে যোগ-বিয়োগের জন্য মায়াদের পদ্ধতিও বিশেষ সুবিধের ছিল না।

    মায়া সভ্যতায় ব্যবহৃত সংখ্যা প্রতীক

    আধুনিক পদ্ধতি

    বর্তমানে যে পদ্ধতিতে আমরা সংখ্যা লিখি সেটা প্রাচীন ভারতীয় এবং আরবদের সম্মিলিত অবদানের ফসল। আহুন্য থেকে নয় পর্যন্ত মোট দশটি প্রতীক ব্যবহার করে যেকোনো সংখ্যা লিখতে পারার বর্তমান পদ্ধতিটি ভারতীয়রা আবিষ্কার করেছিল প্রায় ৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। যদিও খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকেই এই পদ্ধতির যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন, তবে ৬০০ খ্রিস্টাব্দের আগের কোনো লিপিবদ্ধ প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

    সে যা-ই হোক, ব্যবসা বাণিজ্য এবং ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে আরবদের আনাগোনা সেই সময় থেকেই ছিল। ভারতীয় পদ্ধতিতে যোগ-বিয়োগের হিসাব সে সময়ে আরবে প্রচলিত সিস্টেমের চেয়ে ছিল অনেক সহজ ও কার্যকরী। এই দারুণ পদ্ধতিটি তাই আরবদের মনে ধরে গেল খুব সহজে। ভারত থেকে শিখে আসা পদ্ধতি আরবরা ছড়িয়ে দিল সারা বিশ্বে। আরবীতে শুন্যকে বলা হয় সিফর। আরব বনিকদের কাছে শেখা শূন্য বা সিফরকে ইতালিয়রা ল্যাটিনে বলত জেপিরো। আর ল্যাটিন জেপিরো থেকেই এসেছে ইংরেজি জিরো শব্দটি। যদিও ইতালিয় বনিকরা জানত ইন্দো-আরবীয় পদ্ধতিতে হিসাব নিকাশ খুব সহজে করা যায়, তারপরও ভিনদেশীদের পদ্ধতি বলে বাণিজ্য ছাড়া আর অন্য কোনো কাজে তারা এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে চাইত না। তবে অচিরেই ইউরোপে জনপ্রিয়তা লাভ করে ইন্দো-আরবীয় পদ্ধতি। আর এই জনপ্রিয়করণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন যে মানুষটি তার নাম লিওনার্দো ফিবোনাচি(১১৭০-১২৫০)। এই ফিবোনাচির নামানুসারেই কিন্তু নামকরণ করা হয়েছে বিখ্যাত ফিবোনাচি সিরিজের, যদিও সংস্কৃত ছন্দ প্রকরণে ফিবোনাচি সিরিজের ব্যবহার বহু শতাব্দী আগে থেকেই ছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না ফিবোনাচি সেখান থেকেই আকৃষ্ট হয়েছিলেন এই ধারাটির প্রতি। সর্বপ্রথম ছন্দ প্রকরণে ফিবোনাচি ধারা ব্যবহার করেন খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের ভারতীয় পন্ডিত পিঙ্গলা। আর এটাই আদ্যবধি জানা ফিবোনাচি সিরিজ ব্যবহারের প্রাচীনতম নজির।

                                                                                  লিওনার্দো ফিবোনাচি

    নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায় মানবসভ্যতার আজকের এই অভাবনীয় উন্নতির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে যে শাস্ত্রটি তার নাম বিজ্ঞান। গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের ভাষা। আর এতক্ষণ আমরা সেই ভাষার প্রতীক “সংখ্যা”র সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জানার চেষ্টা করলাম।

    একটি কথা আমাদের মনে রাখা উচিত, কোনো সভ্যতার পক্ষেই সম্পূর্ণ শুন্য জ্ঞান থেকে জ্ঞানের সুউচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। প্রতিটি সভ্যতাই কোনো না কোনো ভাবে পূর্বতন সভ্যতাগুলোর কাছে ঋণী। কিন্তু ইতিহাসের ফাঁকতালে হারিয়ে গেছে এদের অনেকের নাম; হারিয়ে গেছে তাদের অবদান। হয়ত তাদেরই কোনো আবিষ্কার অন্য কেউ পুনরাবিষ্কার করে হয়ে গেছেন জগৎবিখ্যাত কিন্তু মূলচিন্তকের নাম পৃথিবীর মানুষ বেমালুম ভুলে গেছে। এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন চলে আসা উচিত, গণিত ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য ইতিহাসে অমর থাকা আদৌ কি খুব জরুরী? হয়ত ইতিহাসের জন্য জরুরী তবে ক্রমবিকাশমান সভ্যতার কাছে সেটি নেহাত কৌতূহল নিবারক তথ্য। কারণ প্রাচীন সভ্যতার অনেক প্রতিভাধর বিজ্ঞানী ও গণিতবেত্তার নাম ইতিহাস থেকে মুছে গেছে, কিন্তু তাদের সুদূর প্রসারী প্রভাব আজও অনুভব করে চলেছে মানবসভ্যতা। তাহলে ইতিহাসের গুরুত্ব কতটুকুই বা রইল? অবশ্যই সেটা ভেবে দেখার বিষয় এবং সেই গুরু দায়িত্ব ন্যস্ত করা হল পাঠকের উপরই।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 71 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
rakib
rakibনতুন
সময়ঃ 2 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

ইতিহাসের সবচেয়ে বুদ্ধিমান অপরাধী কে? তার কি অপরাধ ছিল?

  1. surma
    সেরা উত্তর
    surma নতুন
    উত্তর দিয়েছেন 2 বছর আগে

    ইতিহাসের সবচেয়ে বুদ্ধিমান অপরাধী ইতিহাসে অনেক বুদ্ধিমান অপরাধী ছিল, তবে তাদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয় ব্রুস রেনল্ডস কে। তিনি বিখ্যাত "দ্য গ্রেট ট্রেন রবারি"র (1963) মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। এই চুরিতে তিনি ও তার দল চলন্ত রয়্যাল মেইল ট্রেন থেকে প্রায় £2.6 মিলিয়ন (আজকের দিনে প্রায় £50 মিলবিস্তারিত পড়ুন

    ইতিহাসের সবচেয়ে বুদ্ধিমান অপরাধী

    ইতিহাসে অনেক বুদ্ধিমান অপরাধী ছিল, তবে তাদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয় ব্রুস রেনল্ডস কে। তিনি বিখ্যাত “দ্য গ্রেট ট্রেন রবারি“র (1963) মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। এই চুরিতে তিনি ও তার দল চলন্ত রয়্যাল মেইল ট্রেন থেকে প্রায় £2.6 মিলিয়ন (আজকের দিনে প্রায় £50 মিলিয়ন) ডাকাতি করেছিলেন। রেনল্ডসের বুদ্ধিমত্তার অন্যতম উদাহরণ হলো, কীভাবে তিনি ট্রেনের সিগন্যাল পরিবর্তন করে ট্রেন থামিয়ে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিলেন। যদিও চুরির পর তার দল ধরা পড়ে, রেনল্ডস প্রায় ৫ বছর লুকিয়ে ছিলেন, যা তাকে একটি কৌশলী অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

    আরেকজন বিখ্যাত অপরাধী পাবলো এসকোবার। তিনি কলম্বিয়ার মাদক সম্রাট হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এসকোবারের অপরাধসমূহের মধ্যে ছিল বিশাল মাদক সাম্রাজ্য তৈরি করা, যেখানে তার প্রশিক্ষিত সৈন্য ও বিশাল সম্পত্তির অধিকারী ছিলেন। এসকোবার সাধারণ মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে বিপুল অর্থ খরচ করে গরিবদের সহায়তা করতেন, যার ফলে তিনি “রবিনহুড” উপাধি পান। তার কৌশলী বুদ্ধির মাধ্যমে তিনি অনেকদিন ধরে তার সাম্রাজ্য বজায় রাখতে পেরেছিলেন।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 1
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 3 টি উত্তর
  • 71 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
Adnan bin zaman
Adnan bin zamanপণ্ডিত
সময়ঃ 2 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

Prussian education system কি? Prussian education system এর প্রধান দিকগুলি কী ছিল এবং তারা কীভাবে আধুনিক শিক্ষাকে প্রভাবিত করেছিল?

  1. হেলাল খান
    হেলাল খান নতুন
    উত্তর দিয়েছেন 2 বছর আগে

    Prussian education system ছিল জার্মানির প্রুশিয়া অঞ্চলে 18শ এবং 19শ শতকে গড়ে ওঠা একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা সুশৃঙ্খল, বাধ্যতামূলক এবং সরকার-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষার মডেল তৈরি করেছিল। এই পদ্ধতিকে আধুনিক গণশিক্ষার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটি অনেক দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। Prusবিস্তারিত পড়ুন

    Prussian education system ছিল জার্মানির প্রুশিয়া অঞ্চলে 18শ এবং 19শ শতকে গড়ে ওঠা একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা সুশৃঙ্খল, বাধ্যতামূলক এবং সরকার-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষার মডেল তৈরি করেছিল। এই পদ্ধতিকে আধুনিক গণশিক্ষার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটি অনেক দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

    Prussian education system-এর প্রধান দিকগুলি

    বাধ্যতামূলক শিক্ষা

    প্রুশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা প্রথম বাধ্যতামূলক শিক্ষা চালু করে। 1763 সালে ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যকর করেন, যা নিশ্চিত করত যে সকল শিশুকে একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত স্কুলে যেতে হবে।

    রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা

    পুরো শিক্ষাব্যবস্থা সরাসরি সরকারের অধীনে ছিল। শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ, পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব সরকার পালন করত।

    বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা

    শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল যাতে সকল শিশু শিক্ষার সুযোগ পায়, এমনকি নিম্নবিত্ত পরিবারগুলিও।

    শৃঙ্খলাবদ্ধ পাঠদান পদ্ধতি

    শিক্ষাকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছিল, যেখানে শৃঙ্খলা এবং আনুগত্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত। শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ে ক্লাস করতে হত এবং শিক্ষকদের কঠোর নীতিতে পাঠদান করতে হয়।

    কারিগরি ও পেশাগত শিক্ষা

    শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। প্রুশিয়ার শিক্ষা কাঠামোতে কারিগরি দক্ষতা ও পেশাগত শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

    জাতীয়তাবাদ ও আনুগত্য

    শিক্ষার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আদর্শ এবং শাসকের প্রতি আনুগত্যের মানসিকতা তৈরির চেষ্টা করা হত।

    Prussian education system-এর প্রভাব

    আধুনিক গণশিক্ষার ভিত্তি

    প্রুশিয়ান মডেল ছিল প্রথম শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে গণশিক্ষার ধারণা গড়ে ওঠে। এটি অন্যান্য দেশের (যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, এবং জাপান) শিক্ষাব্যবস্থা প্রভাবিত করে।

    শ্রেণিকক্ষের কাঠামো

    বর্তমানের শ্রেণিকক্ষ ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা (একজন শিক্ষক, নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাস, নির্ধারিত পাঠ্যক্রম) মূলত প্রুশিয়ার শিক্ষা কাঠামো থেকে নেওয়া।

    শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ

    শিক্ষকদের সুশৃঙ্খল প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া, যা আজও শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

    বাধ্যতামূলক শিক্ষা আইন

    অনেক দেশ প্রুশিয়ার বাধ্যতামূলক শিক্ষার ধারণা গ্রহণ করে, যা নিশ্চিত করে যে প্রতিটি শিশুই একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা পায়।

    জাতীয় পরিচয় ও আনুগত্যের প্রচার

    রাষ্ট্রীয় শিক্ষার ধারণা, যেখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতীয় পরিচয়ের বোধ তৈরি করা হয়, প্রুশিয়ান শিক্ষা থেকে এসেছে।

    আধুনিক শিক্ষায় প্রুশিয়ান শিক্ষার সীমাবদ্ধতা

    অতিরিক্ত শৃঙ্খলা এবং সৃজনশীলতার অভাব।

    শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাধীন চিন্তার বিকাশে বাধা সৃষ্টি।

    রাষ্ট্রের প্রভাব শিক্ষাকে অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করত।

    সংক্ষেপে, প্রুশিয়ান শিক্ষাব্যবস্থা একটি সুশৃঙ্খল শিক্ষার মডেল তৈরি করে যা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে। তবে, আজকের শিক্ষায় স্বাধীন চিন্তা এবং উদ্ভাবনী শিক্ষাদানের উপর জোর দিয়ে এই মডেলের সীমাবদ্ধতাগুলি দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 71 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

আনুবিস: প্রাচীন মিশরের শিয়াল দেবতা। কি তার ইতিহাস ?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট ফেলুদা সিরিজের প্রথমদিকের একটি গল্পের নাম ছিল ‘শিয়াল দেবতা রহস্য’। সেই গল্পে প্রাচীন মিশরীয় দেবতা ‘আনুবিস’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বিখ্যাত লেখকদের গল্প, উপন্যাস বা মিশরীয় উপকথাই হোক, ইতিহাসের পাতায় আনুবিস সুপরিচিত ও জনপ্রিয় এক নাম। কিংবদন্তিতে বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন তিনি। শিবিস্তারিত পড়ুন

    সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট ফেলুদা সিরিজের প্রথমদিকের একটি গল্পের নাম ছিল ‘শিয়াল দেবতা রহস্য’। সেই গল্পে প্রাচীন মিশরীয় দেবতা ‘আনুবিস’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বিখ্যাত লেখকদের গল্প, উপন্যাস বা মিশরীয় উপকথাই হোক, ইতিহাসের পাতায় আনুবিস সুপরিচিত ও জনপ্রিয় এক নাম। কিংবদন্তিতে বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন তিনি। শিয়ালের মুখাবয়ব ও মানুষের দেহ সম্বলিত দেবতা আনুবিস হচ্ছেন মমিকরণ প্রক্রিয়া ও মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের মিশরীয় দেবতা। এছাড়াও তিনি হারানো আত্মা ও অসহায়দের সাহায্য করে থাকেন। ধারণা করা হয়, তিনি সম্ভবত পূর্বের শিয়াল দেবতা ওয়েপওয়াটেট থেকে বিকশিত হয়েছেন, এবং ওয়েপওয়াটেটের সাথে তাকে প্রায়শই গুলিয়ে ফেলা হয়। মিশরে তখন শিয়ালেরা কবর খুঁড়ে মৃতদেহ ছিন্নভিন্ন করে ফেলত। সেজন্য প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, শেয়াল দেবতা সেই শেয়ালদের হাত থেকে কবরের লাশগুলোকে রক্ষা করতে পারবেন। মিশরের প্রাক-রাজবংশীয় যুগের কোনো একসময় বন্য কুকুর এবং শিয়ালের হাত থেকে রাজকীয় কবরগুলোতে সর্বোত্তম সুরক্ষা দেওয়ার জন্য দেবতা আনুবিসের ধারণার উদ্ভব ঘটে।

    আবার অনেক মিশর-তত্ত্ববিদ বলেন, মিশরের অধিবাসীরা বিশ্বাস করত- কোনো ব্যক্তির মৃতদেহের সাথে কুকুর সমাহিত করা হলে ওই কুকুর তার হয়ে আনুবিসের কাছে সুপারিশ করবে। সেই কারণে ব্যক্তির মৃতদেহের সাথে কুকুরকেও সমাহিত করত তারা। খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০ থেকে ৩০ অব্দ পর্যন্ত এই পশু-সমাধি প্রথায় বিশ্বাসী ছিল মিশরীয়রা। মিশরের প্রথম রাজবংশের রাজকীয় সমাধিতেও আনুবিসের মূর্তির সন্ধান মেলে। ওসাইরিস পুরাণ বিকশিত হবার আগপর্যন্ত আনুবিস ছিলেন মৃতদের দেবতা। কিন্তু ওসাইরিস পরবর্তীতে এই দায়িত্ব নেবার পর আনুবিস মমিকরণ দেবতার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।

    দেবতা আনুবিস
    মিশরীয় উপকথা অনুযায়ী, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মমি তৈরি করেছিলেন দেবতা আনুবিস। কাহিনিটি এমন- দেবতা গেব এবং তার বোন আকাশ ও স্বর্গদেবী নুট বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের গভীর প্রণয়ের ফলে জন্ম হয় আইসিস, ওসাইরিস, সেথ, ও নেপথিস নামক চার দেব-দেবীর। এদের মধ্যে নেপথিস সেথকে এবং আইসিস বিয়ে করেন ওসাইরিসকে। সূর্যদেবতা ‘রা’-কে যখন বার্ধক্য কিছুটা নুইয়ে ফেলে, তখন তিনি ওসাইরিসকে শাসনকার্যের ভার বুঝিয়ে দিয়ে সূর্যরথে চড়ে পাড়ি দেন স্বর্গে। ওসাইরিসের রাজত্বকালে মিশরের সবখানেই সুখ-শান্তি ছড়িয়ে ছিল। প্রচণ্ড ভ্রমণপিপাসু হওয়ায় ওসাইরিস প্রায়শই রানী আইসিসকে সাময়িকভাবে রাজ্যভার অর্পণ করে ভ্রমণে বের হতেন। এমনি এক ভ্রমণে ওসাইরিস তার সহোদর সেথের স্ত্রী নেপথিসের সঙ্গে গোপনে মিলিত হন। ফলে নেপথিসের গর্ভে আসেন আনুবিস। জানতে পেরে সেথ ক্ষিপ্ত হয়ে ওসাইরিসকে হত্যা করেন। হত্যার পর তার শরীর ৪২ টুকরা করে মিশরের ৪২টি অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে দেন। এরপর সেথ সিংহাসন দখল করে ফেলেন। শান্তিভূম মিশরে নেমে আসে ঘোর অশান্তির কালো ছায়া।

    আনুবিস, আইসিস, এবং ফারাও তুতেনখামুন
    ওসাইরিসের স্ত্রী দেবী আইসিস জানতেন, শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান ছাড়া তার স্বামীর আত্মা স্বর্গে আরোহণ করতে পারবে না। তাই, আইসিস ও নেপথিস বাজপাখির রূপ নিয়ে, পুরো মিশর খুঁজে ওসাইরিসের শরীরের ৪২টি অংশ উদ্ধার করেন। এরপর জাদু দিয়ে ৪২টি টুকরা একত্র করা হয়। আইসিস তার স্বামী ওসাইরিসের মৃতদেহ উদ্ধার করার পর, সূর্যদেবতা আনুবিসকে মৃতদেহটি মমি করার নির্দেশ দেন। জ্ঞানের দেবতা থোথের সহায়তায় আনুবিস ওসাইরিসের শবদেহ কাপড়ে মুড়িয়ে দেন। তারপর আনুবিস তার পিতার লাশ সংরক্ষণের জন্য প্রথম মমি তৈরি করেন। এভাবেই মিশরের মাটিতে তৈরি হয় প্রথম মমি। যথারীতি ‘Opening of the mouth’ অনুষ্ঠানটি সম্পন্নের পর ওসাইরিসকে সমাহিত করা হয়। এই ঘটনার পর থেকেই আনুবিসকে মমিকরণের দেবতা বলা হয়।

    মৃতদেহ মমি করছেন আনুবিস
    এই মমিকরণ প্রক্রিয়ার সময় সেথের সাথে আনুবিসের প্রচণ্ড লড়াই বেধে গিয়েছিল। মমিকরণের সময় ওসাইরিসের মৃতদেহ মমি করার স্থানে রাখেন আনুবিস। যেহেতু মমিকরণ প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ সময়ের এক কাজ, তাই প্রতি রাতেই আনুবিস কাজ শেষ করে ওই স্থান ত্যাগ করতেন। ব্যাপারটা সুচতুর দৃষ্টিতে পরখ করলেন দেবতা সেথ। তার উদ্দেশ্য ছিল ওসাইরিসের মৃতদেহ চুরি করা। তাই একরাতে তিনি আনুবিসের রূপ ধারণ করে সেখান থেকে ওসাইরিসের মৃতদেহ চুরি করেন। তবে সেথ মৃতদেহ নিয়ে বেশিদূর যেতে পারেননি। এর আগেই টের পেয়ে যান আনুবিস, এবং সেথকে ধাওয়া করেন। আনুবিসের হাত থেকে বাঁচতে ষাঁড়ের রূপ ধারণ করেন সেথ। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। আনুবিস তাকে ধরে নিয়ে নপুংসক বানিয়ে দেন। তারপর বন্দী করে রাখেন মিশরের সপ্তদশ নোমে সাকারাতে।

    বন্দিত্বের দশা বরণ করে নেবার পর সেখান থেকে পালানোর ফন্দি আঁটতে থাকেন সেথ। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি বিশাল এক বিড়ালের রূপ ধারণ করলেন। কিন্তু এবারও তিনি আনুবিসকে ফাঁকি দিয়ে বের হতে পারলেন না। ধরা খাওয়ার পর আনুবিস তাকে টকটকে লাল লোহা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সেঁক দিলেন। চিতাবাঘের শরীরে কীভাবে ছোপ ছোপ দাগের জন্ম হয়েছে- প্রাচীন মিশরের এই কিংবদন্তি থেকেই সে কাহিনী বর্ণনা করা হতো।

    এরপরেও ক্ষান্ত হননি সেথ। তিনি বিভিন্ন কায়দা ও কৌশলে ওসাইরিসের মৃতদেহ চুরির চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এবারও তিনি ব্যর্থ হয়ে আনুবিসের হাতে ধরা পড়লেন। তবে, এবার আর আনুবিস ছোটখাট শাস্তির ধার ধারেননি। তিনি হত্যা করলেন সেথকে। তার শরীর থেকে চামড়া ছাড়িয়ে শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। এরপর সেথের পুরো ফৌজকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে তিনি সেথের শিবিরে প্রবেশ করে তরবারির এক কোপে সেথের পুরো বাহিনীর শিরশ্ছেদ করলেন।

    আনুবিসের মূর্তি (আনুমানিক ১০০ খ্রিস্টাব্দ – ১৩৮ খ্রি.পূ.)
    কিছু জনশ্রুতি অনুসারে, আনুবিস ছিলেন দেবতা রা-র পুত্র। প্রথমদিকে তিনি মৃতদের প্রাথমিক দেবতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সময়ের সাথে সাথে ওসাইরিসের ধর্মীয় উপাসনার গুরুত্ব বাড়তে থাকলে, আনুবিসের কাহিনী ওসাইরিস পুরাণের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে নয়া ওসাইরিস পুরাণ (খ্রি.পূ. ২০০০ অব্দ নাগাদ) অনুসারে, আনুবিস হয়ে উঠেছিলেন ওসাইরিস এবং নেপথিসের জারজ সন্তান। নেপথিস তার স্বামী সেথের ভয়ে আনুবিসকে গোপনে পরিত্যাগ করেন। এতিম আনুবিসকে তখন পরিত্যক্ত অবস্থায় খুঁজে পান দেবতা আইসিস। তাকে দেখে মনের কোণে মায়া জাগে আইসিসের। পরবর্তীতে তিনি আনুবিসকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে, বেশ কিছু প্রাচীন মিশরীয় কিংবদন্তি অনুসারে, আনুবিস সত্যিকার অর্থেই সেথের ঔরসজাত সন্তান ছিল। সেসকল কিংবদন্তি অনুযায়ী, সেথের দ্বারা গর্ভবতী হবার পর নেপথিস সেথের কাছ থেকে সে খবর লুকিয়ে রাখে। কারণ, সন্তানসম্ভবা নেপথিস ভাবতেন, সেথের সংস্পর্শে এলে তার সন্তানও সেথের মতো রূঢ় ও বেপরোয়া স্বভাবের হয়ে উঠবে। তখন তিনি গোপনে আনুবিসকে আইসিসের কাছে দত্তক দেন।

    আনুবিসকে নিয়ে ‘দুই ভাইয়ের গল্প’ নামে আরও একটি গল্প চালু আছে। সেই গল্পে আনুবিসের বাটা নামে এক অনুজ ছিল। বাটা ছিলেন প্রাচীন মিশরের একজন আঞ্চলিক দেবতা, যিনি সময়ের সাথে সাথে মিশরীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনের কারণে কালের গর্ভের হারিয়ে গেছেন। যেসব পুরাণে আনুবিসকে ওসাইরিসের সন্তান হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেসব পুরাণে, আনুবিসের ভাই হিসেবে হোরাস, সোপডেপ, বাবি, এবং ওয়েপওয়াওয়েটের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

    আনুমানিক ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শবাধারে অঙ্কিত আনুবিসের চিত্র
    মিশরীয় জনশ্রুতি অনুসারে, মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির সামনে প্রথমেই যে দেবতা হাজির হন, তিনি হলেন মৃতের জগতের অধিকর্তা দেবতা আনুবিস। মারা যাওয়ার পর মৃত ব্যক্তি বাকশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। আনুবিস তাকে সেই ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন। মৃতের গ্রন্থের ১২৫ নং মন্ত্র অনুযায়ী, সেই মৃত ব্যক্তিকে অনন্তকালের পথ প্রদর্শনের কাজটা করে থাকেন দেবতা আনুবিস। মৃত ব্যক্তি আকাশের তারায় পরিণত হতে পারবেন কি না, তা বিচারের ভার আনুবিসের ওপরে। আনুবিসের হাতে থাকে পালকযুক্ত দণ্ড, যা দিয়ে মূলত মৃতের বিচার করা হয়।

    সহজে চেনার জন্য আনুবিসের মধ্যে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও চিহ্ন বিদ্যমান ছিল। অধিকাংশ মিশরীয় দেবতাদের মতো তার একটি মানবদেহ ছিল, তার ঘাড়ের উপর বসানো ছিল শিয়ালের মাথা। পেছন দিক দিয়ে শেয়ালের মতো একটি লেজও ছিল তার। তার শরীরের রঙ ছিল কালো। তাঁকে প্রায়শই একটি আসনে বসা অবস্থায় চিত্রিত করা হয়। অধিকাংশ মিশরীয় দেবতাদের মতো তিনিও নিজ আকৃতি মুহূর্তেই পরিবর্তন করতে পারতেন। দেবতা ওসাইরিসের মৃতদেহ দেখে তিনি এতটাই মর্মাহত হয়েছিলেন যে, তখন সাথে সাথে তিনি নিজেকে গিরগিটিতে রূপান্তর করে ফেলেন।

    দেবতা আনুবিসের মূর্তি
    প্রাচীন মিশরীয় সংস্কৃতি শেষদিকে এসে অনেকটা গ্রিক সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়েছিল। আজ মিশরীয় দেবতারা যেসকল নামে ইতিহাসের পাতায় পরিচিত, তার অধিকাংশই গ্রিকদের দেওয়া, এবং তা এসেছে গ্রিক অনুবাদ থেকে। গ্রিকরা মিশরীয় দেবতাদের পৃষ্ঠপোষকতা করলেও, দেব-দেবীদের নামকরণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতার পরিচয় দেয়নি। এর অন্যতম এক কারণ হতে পারে, প্রাচীন মিশরীয়দের মধ্যে স্বরবর্ণহীন লিখনপদ্ধতি চালু ছিল। তাই গবেষকদের অনুমান অনুযায়ী, তৎকালীন প্রাচীন মিশরে আনুবিসকে ‘আনপু’ বা ‘ইনপু’ বলে ডাকা হতো। দেবতা আনুবিসের কন্যা কেবেচেতকে প্রাচীন মিশরীয়রা ক্বেবেহেত, কেবহুত, কেবেহুত, ক্বেবেহুত ও কাবেচেত নামেও ডাকত। তিনি ছিলেন সজীবতা ও বিশুদ্ধতার দেবী।

    সম্ভবত আনুবিসের প্রার্থনার জন্য প্রাচীন মিশরে আলাদাভাবে কোনো মন্দির নির্মাণ করা হয়নি। কারণ, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই দেবতার প্রতি নিবেদিত কোনো মন্দির খুঁজে পাননি। তাই কবরস্থান ও সমাধিগুলোকেই তার মন্দির হিসেবে ধরা হয়। প্রাচীন মিশরের প্রথম রাজবংশের মাস্তাবাতে তার নামের সন্ধান মিলেছে। যেমন, সাক্কারার পূর্ব দিকে অবস্থিত আনুবিয়নের এক উপাসনালয়ে মমি-কৃত কুকুর ও শিয়ালের অস্তিত্ব মিলেছে। ধারণা অনুযায়ী, প্রথম রাজবংশের রাজত্বকালে তাকে ওসাইরিসের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরবর্তী রাজবংশগুলোতে ধর্মীয় ভাবধারা বা দেবপূজার পরিবর্তন ঘটলেও, আনুবিস ছিলেন সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ দেবতাদের মধ্যে অন্যতম।

    আনুবিস হুনেফারকে বিচারসভায় নিয়ে আসছেন
    মিশরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে নয়জন আদি দেব-দেবীর কথা বলা হয়েছে। এদেরকে একত্রে এননিয়াড নামে অভিহিত করা হয়। আনুবিস ছিলেন এননিয়াডের মধ্যে অন্যতম। টলেমি শাসনামলে (৩০০ খ্রিস্টাব্দ – ৩০ খ্রি.পূ.), যখন মিশর গ্রিক ফারাওদের অধীনস্থ ছিল, তখন আনুবিসের নাম গ্রিক দেবতা হারমেসের সাথে মিশিয়ে ‘হারমানুবিস’ নামে এক দেবতার উৎপত্তি ঘটে। কারণ, দুজন দেবতার কাজের মাঝে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুজনেই মৃত্যুর পর আত্মাকে পরকালের পথ দেখাতেন। দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচীন রোমে এই দেবতার পূজা করা হতো, এমন তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 70 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষ কে ছিলেন?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষ ছিলেন তারারে। তারারের জন্ম ১৭৭২ সালে ফ্রান্সের লিঁওর একটি ছোট মফস্বল শহরে। তারারে যে সময়টায় জন্মেছিলেন তখন ফরাসি বিদ্রোহ চলছিলো পুরোদমে। তারারে কুকুর, বিড়াল থেকে শুরু করে যে কোনো প্রাণী জীবন্ত গিলে ফেলতে পারতো। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি কিশোর বয়সেই প্রতিদিন প্রায়বিস্তারিত পড়ুন

    You are currently viewing তারারে: পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষ; যিনি জীবন্ত কুকুর, বিড়াল এমনকি বাচ্চা শিশু খেয়েছিলেন

    পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষ ছিলেন তারারে।

    তারারের জন্ম ১৭৭২ সালে ফ্রান্সের লিঁওর একটি ছোট মফস্বল শহরে। তারারে যে সময়টায় জন্মেছিলেন তখন ফরাসি বিদ্রোহ চলছিলো পুরোদমে।

    তারারে কুকুর, বিড়াল থেকে শুরু করে যে কোনো প্রাণী জীবন্ত গিলে ফেলতে পারতো। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি কিশোর বয়সেই প্রতিদিন প্রায় একটি ষাঁড়ের চারভাগের একভাগ খেয়ে ফেলতো তারারে, যা ছিলো প্রায় তার ওজনের সমান। এমন অদ্ভুত ও অপ্রত্যাশিত খাবার খেতে পারা মানুষটি বেঁচেছিলেন মাত্র ২৬ বছর।

    সার্কাসের দলে যোগদান

    তারারের পরিবার ছিলো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। তাদের পক্ষে তার এই বিশাল পরিমান খাদ্যের যোগান দেওয়া ছিলো অসম্ভব। আর তাই পেটের ক্ষুধার দায়ে ঘর ছাড়েন তারারে। পেটের ক্ষুধার জন্য তিনি রাস্তায় খাবার ভিক্ষা করতে শুরু করেন, কখনওবা ক্ষুধার জ্বালায় ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া মানুষের উৎচিষ্ঠ ও পচা খাবারগুলোই খুঁজে খেতে শুরু করেন। বেশ কিছুকাল এভাবে চলার পর তারারে যোগ দেন একটি সার্কাস পার্টিতে। এই সার্কাস দলটি ছিলো পকেট মারদের। তারা সাধারণ মানুষদের সার্কাস দেখানোর ছলনায় তাদের পকেট মারতো।

    বেশ কয়েকদিনের মধ্যেই তারারে সেই সার্কাস দল মানে পকেটমার দলের সকলের চোখের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেন। সে মঞ্চে উঠে যে কোনো কিছু খেয়ে ফেলে সাধারণ দর্শকদের দেখাতো। তারারে পাথর থেকে শুরু করে কর্ক এমনকি সে ১ ডজন আপেলও গিলে ফেলতো নিমিষেই।

    এক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনানুযায়ী, তারারে দাঁত দিয়ে জীবিত বিড়াল ছিড়ে তার রক্ত পান করতো। তারপর শুধু কঙ্কাল বাদে পুরো বিড়ালটাই গলধকরণ করে ফেলতো। একইভাবে সে কুকুরও খেয়ে ফেলতো পারতো।

    বেশ কিছুকাল সার্কাসে এই কাজ করার পর তারারের পরিপাকতন্ত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়। আর তাকে ফ্রান্সের একটি হাসপাতালে ভর্তি করানে হয়। তার শরীরের অবস্থার কথা ভেবে ডাক্তার তাকে পরামর্শ দেয় সার্কাসে এই কাজ করা ছেড়ে দিতে। শেষমেশ তারারে সার্কাসের কাজটি ছেড়ে দেয়।

    এতো এতো খাবার খাওয়ার পরও তারারের শরীরের ওজন ছিলো খুবই সাধারণ। ১৭ বছরে তার ওজন ছিলো মাত্র ১০০ পাউন্ড (প্রায় ৪৬ কেজি)। তবে তার পুরো শরীরের চামড়া ছিলো ঝুলে পড়া চামড়া। যখন সে খাবার খেতো তখন চামড়াগুলো বেলুনের মতো ফুলে উঠতো। তার মুখখানা ছিলো অস্বাভাবিক রকমের বড়। এক সাথে ১ ডজন ডিম কিংবা আপেল মুখে নিয়ে রাখতে পারতো তারারে।

    তারারের শরীর ছিলো খুবই দূর্গন্ধ। তার আশেপাশে দিয়ে গিয়ে হেঁটেও যেতো না। খাবার খাওয়ার পর সেই দুর্গন্ধ বেড়ে যেতো আরো কয়েকগুণ। খাবার খাওয়ার পর তারারের শরীর প্রচন্ড ঘামতে শুরু করতো, আর চোখগুলো হয়ে যেতো রক্তবর্ণ। অনেকের ভাষ্যমতে খাবার খাওয়ার পর তারারের শরীর থেকে বাষ্প বের হতে শুরু করতো। এতো এতো খাবার খাওয়ার পরেও তারারের ওজন কখনো বাড়েনি। এমনকি তাকে কখনে বমিও করতে দেখা যায় নি। তবে ছোটবেলা থেকেই তার ডায়রিয়ার সমস্যা ছিলো।

    সেনাবাহিনীতে তারারে

    সার্কাসের কাজ ছেড়ে তারারে ফরাসী বিপ্লবী সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তারারের অতিরিক্ত খেতে পারার সুযোগটাই কাজে লাগায় সেনাবাহিনী। তাকে কুরিয়ার হিসে ব্যবহার করা হয়, এজন্য সে গুরুত্বপূর্ণ কাগজ বা নথিপত্রগুলো গিলে ফেলতো। তবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার পর তারারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে উঠে খাবার। সেনাবাহিনীতে প্রত্যেক সেনাবাহিনীর নির্দিষ্ট পরিমান রেশন বরাদ্দ থাকে। কিন্তু যে পরিমান খাবার তারারে কে দেওয়া হতো তা ছিলো খুবই নগন্য। আর তাই খাবারের জন্য তারারে অন্য সৈনিকদের কাজ করে দিতেন।

    পেটের ক্ষুধার জ্বালা নিবারন করতে তারারে ঘাস, টিকটিকি, সাপ কিংবা পোকামাকড় খাওয়া শুরু করেন। তারারের এই ক্ষুধা সমস্যা দেখে ফরাসী আর্মি তার রেশন ৪ গুন করে দিয়েছিলো। তবুও তার ক্ষুধা মেটেনি। তারারে মাঝে মাঝেই খাওয়ার অভাবে মিলিটারি হসপিটালে ভতি হতেন।

    মিলিটারি হাসপাতালের দায়িত্বে ছিলেন ব্যারন পার্সি নামের এক মিলিটারি ডাক্তার। তারারের কর্মকান্ড দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান। ব্যারন পার্সি ঠিক করেন, তিনি তারারেকে নিয়ে পরীক্ষা করবেন। আর এজন্য হাসপাতালের ১৫ জন মানুষের রান্না করা খাবার তাকে খেতে দেন।

    ডাক্তারের ভাষ্যমতে, প্রায় দুটি ষাঁড়ের মাংস দিয়ে বানানো বড় বড় পাই ও চার গ্যালন দুধ একাই খেয়ে শেষ করেন তিনি। খাওয়ার পরপরই ঘুমিয়ে পড়েন তারারে। সেই সময় পার্সি তার বেলুনের মতো ফুলে যাওয়া পাকস্থলির রহস্যের কূলকিনারা করতে পারেননি।

    ব্যারন পার্সি বলেন,

    কুকুর এবং বিড়ালরাও তার দিকে তাকালে ভয়ে পালিয়ে গেল, যেন তারা তাদের ভাগ্য কি হতে পারে অনুমান করতে পারতো।

    সেনাবাহিনীর কুরিয়ার তারারে

    সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার পরেই তারারের রাইন তীরের ফরাসী আর্মি ক্যাম্পে ডাক পরে তারারের। সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করার জন্য তারা তারারের অতিরিক্ত খেতে পারার ক্ষমতাকে ব্যবহার করার চিন্তা করে। এজন্য সেনাবাহিনীর জেনারেল আলেকজান্দ্রে ডি বিউহার্নাইস একটি নথি কাঠের বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে তারারের হাতে দেন এবং তা খেয়ে ফেলতে বলেন। তারা সেই কাঠের বাক্সটি গিলে ফেলেন, এর দুই দিন পর তা তার মূত্রনালী দিয়ে বের হয়ে আসে। বক্সের মধ্যে থাকা নথিটি তখনও পাঠযোগ্য অবস্থায় ছিলো।

    আর এইভাবে একজন সামরিক কুরিয়ার হিসাবে কাজ করতে থাকেন তারারে, যেনো শত্রু অঞ্চলের মাধ্যমে নিরাপদে নথিপত্র বহন করতে পারে যাতে তাকে তল্লাশি করা হলে সেগুলি খুঁজে পাওয়া না যায়।

    তারারের এই অদ্ভুত ও অসামান্য গুণের জন্য ফরাসি সেনাবাহিনী তাকে পুরষ্কার হিসেবে ষাঁড়ের ১৪ কেজি কাঁচা ফুসফুস দেওয়া হয়। আর তা তৎক্ষনাৎ সবার সামনে খেয়ে ফেলেন

    দীর্ঘ ১ বছর তারারে সাফল্যের সাথে কুরিয়ার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছিল। এরপরই একদিন তারারে বর্ডারে প্রুসিয়ান আর্মিদের হাতে ধরা পড়েন। তারারেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল একজন ফরাসি কর্নেলের কাছে একটি বার্তা বহন করার জন্য। তাকে বলা হয়েছিল যে নথিগুলি অত্যন্ত সামরিক তাৎপর্যপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবে, ডি বিউহারনাইস শুধুমাত্র একটি নোট লিখেছিলেন কর্নেল নিশ্চিত করুন যে বার্তাটি সফলভাবে গৃহীত হয়েছে, এবং যদি তাই হয়, প্রুশিয়ান সৈন্যদের গতিবিধি সম্পর্কে সম্ভাব্য দরকারী তথ্যের উত্তর দিতে।

    তারারে জার্মান কৃষকের ছদ্মবেশে তারারে অন্ধকারের আড়ালে প্রুশিয়ান বডার অতিক্রম করেছিলেন। যেহেতু তারারে জার্মান বলতে পারতেন না। শীঘ্রই সে স্থানীয় বাসিন্দাদের সন্দেহের শিকার হয়। স্থানীয় মানুষজন প্রুশিয়ান কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেন এবং প্রুসিয়ান সেনাবাহিনী তাকে বন্দী করেন।

    প্রুসিয়ান সেনাবাহিনী তার শরীরে তল্লাশি চালিয়েও সন্দেহজনক কিছু পায়নি। কথা বের করার জন্য তারা তারারেকে চাবুক দিয়ে পিটিয়ে আহত করে। প্রচন্ড মার খেয়েও তারারে কোনো কথা বলেন নি। অনেক মারধর করার পর তাকে তারা একটি ল্যাট্রিনে বেঁধে রেখেছিলো। বেশ কিছুদিন প্রহার করার পর তারারেকে প্রুসিয়ানরা বর্ডারের কাছাকাছি ফেলে রেখে দেয়।

    তারারের ক্ষুধা নিরাময়ের চেষ্টা

    এই ঘটনার পর তারারে সেনাবাহিনীতে কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এরপর তিনি মিলিলিটারি হাসপাতালে ফেরত আসেন। তারারে ডাক্তার পার্সিকে অনুরোধ করেন, তাকে চিকিৎসা করে সাধারণ মানুষের মতো স্বাভাবিক করে দেওয়ার জন্য। পার্সি এই কাজে আগ্রহী ছিলেন তাই তারারের প্রস্তাবে রাজিও হয়ে যান।

    ক্ষুধা কমানোর জন্য ডাক্তার পার্সি তারারে কে প্রথমে ক্ষুধা নিবৃত্তিকারক লুডেনাম খাওয়ান। কিন্তু এতে কাজ না হলে তাকে প্রচুর মদ ও ভিনেগার খাওয়ানো হয়। কিন্তু তাতেও কাজ না হওয়ায় তাকে প্রচুর পরিমানে নরম সেদ্ধ ডিম খাওয়ানো হয় ক্ষুধা কমানোর জন্য। এতো কিছু করার পরেও তার ক্ষুধা নিভৃত করতে ব্যর্থ হন ডাক্তার পার্সি।

    তারারে হাসপাতালের বাহিরে লুকিয়ে কসাইদের ফেলে দেওয়া পঁচা মাংস খেতে থাকেন। ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া খাবার খাওয়ার জন্য তিনি কুকুরদের সাথে রিতীমত লড়াই করতেন। এছাড়াও হাসপাতালের বেশ কয়েকজন রুগীর শরীরের রক্ত পান ও করেছিলো তারারে। বেশ কয়েকবার হাসপাতালের মর্গের লাশ খেতে চাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তারারে। হাসপাতালের অন্য ডাক্তাররা তাকে মানসিক বিকারগস্ত মনে করছিলো তাই তাকে কোনো পাগলাগারদে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু ডাক্তার পার্সি তারারেকে নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যেতে আগ্রহী ছিলেন, তাই তারারে মিলিটারি হাসপাতালেই ছিলেন।

    এর কিছুকাল পরে হাসপাতাল থেকে ১৪ মাস বয়সী একটি শিশু হারিয়ে যায়। হাসপাতালের সকলেই এর পিছনে ধারণা করছিলো তারারে শিশুটিকে খেয়ে ফেলেছে। এই ঘটনার পর ডাক্তার পার্সির পক্ষে তারারেকে বাঁচানো ছিলো অসম্ভব। হাসপাতালের কর্মীরা তারারেকে ধাওয়া করলে সে সেখান থেকে পালিয়ে যায়, এরপর সে আর কখনো সেই মিলিটারি হাসপাতালে ফেরত আসেনি।

     

    তারারের মৃত্যু

    এই ঘটনার ৪ বছর পর ১৭৯৮ সালে ভার্সাই হাসপাতাল থেকে একজন ডাক্তার পার্সির সাথে যোগাযোগ করেন, তিনি ডাক্তার পার্সিকে জানান যে তাদের একজন রোগী তার সাথে দেখা করতে চায়। সেই রোগীটি আর কেউ নয়, সে ছিলো তারারে। তারারে ততোদিনে শরীর ভেঙে দূর্বল হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে বিছানায় পরে আছেন।

    ডাক্তার পার্সিকে তারারে বলেন ২ বছর আগে তিনি একটি সোনার কাঁটা চামচ গিলে ফেলে ছিলেন আর তার জন্যই আজকে শরীরের এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তারারে আশা করছিলেন পার্সি তাকে এই অবস্থা থেকে নিরাময় করে তুলতে পারে। পার্সি পরীক্ষা করে দেখেন তারারের প্রচন্ড যক্ষ্মা হয়পছে। এর একমাস পর প্রচন্ড যক্ষ্মা আর সেই সাথে ডায়রিয়া হয়ে মৃত্যু হয় তারারের।

    তারারের মৃত্যুর পর তারারের শরীরের অটোসপি করতে কোনো সার্জেন রাজি ছিলেন না। কিন্তু সেই হাসপাতালের একজন ডাক্তার টেসিয়ার কৌতুহলী ছিলেন তারারের শরীরে আদৌও কোনে সোনার কাঁটা চামচ আছে কিনা। তাই তিনি তারারের অটোসপি করতে রাজি হন। তারারের শরীর কেটে দেখা যায় তার পেট সাধারণ মানুষের তুলনায় অধিক প্রশস্ত। তারারের পাকস্থলি, খাদ্যনালী, যকৃত ও পিত্তকোষ অস্বাভাবিক রকমের বড়। আলসারে পরিপূর্ণ পাকস্থলীর সাথে পুরো শরীরের ভেতর পুঁজে ভরা ছিলো। তবে অবাক করা বিষয় হলো, তার পেটের ভেতরে থাকা সেই সোনালী কাঁটা চামচটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় ছিলো, তারারের শরীর অন্য সাধারণ মানুষের তুলনায় খুব দ্রুতই পচতে শুরু করেছিলো।

    মাত্র ২৬ বছর বয়সেই মৃত্যু হয় এই অদ্ভুত মানুষটির। কেনো তার এতো ক্ষুধা ছিলো সেই রহস্য কেউ ভেদ করতে পারে নি।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 67 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

প্রথম কে উড়েছিলেন আকাশে ?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    পাখির প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়েই হয়ত মানুষ উড়তে চেয়েছিল ডানা মেলে। ইতিহাস যখন থেকে টিকে আছে, তার আগেও হয়তো কত মানুষ চেষ্টা করে গেছেন উড়তে। জানার উপায় নেই কেউ সফলও হয়েছিলেন কি না কিংবা জানা যাবে না কোনো ব্যর্থতার গল্পও। আকাশে ওড়ার ইতিহাসে স্মরণীয় যারা মানুষের আকাশে ওড়ার প্রচেষ্টা নিয়ে জড়িয়ে আছে নানা মানুষবিস্তারিত পড়ুন

    পাখির প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়েই হয়ত মানুষ উড়তে চেয়েছিল ডানা মেলে। ইতিহাস যখন থেকে টিকে আছে, তার আগেও হয়তো কত মানুষ চেষ্টা করে গেছেন উড়তে। জানার উপায় নেই কেউ সফলও হয়েছিলেন কি না কিংবা জানা যাবে না কোনো ব্যর্থতার গল্পও।

    আকাশে ওড়ার ইতিহাসে স্মরণীয় যারা

    মানুষের আকাশে ওড়ার প্রচেষ্টা নিয়ে জড়িয়ে আছে নানা মানুষের নাম। গ্রিক উপকথায় ইকারাসের আকাশে ওড়ার কাহিনী হয়তো কম-বেশি সবার জানা। এরকম নানা উপকথা ছড়িয়ে আছে মানুষের আকাশে ওড়া নিয়ে। উপকথাগুলো আজ না হয় থাক চলুন ঘুরে আসি বাস্তবেই কিছু প্রচেষ্টার কথা।

    পঞ্চম শতাব্দীতে ঘুড়ির ‍উদ্ভাবন ঘটে চীনে। ছয় শতাব্দীতে ইয়ান হাংটাও এর কথা জানা যায়, যাকে বিশালাকারের ঘুড়ির সাথে বেধে উড়তে বাধ্য করা হয়েছিল।

    তবে প্রথম সফলভাবে আকাশে ডানা মেলেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস ৯ম শতকে। ইবনে ফিরনাসের আকাশে ওড়ার কাহিনী নিয়েই আলোচনা করবো। তার আগে জানা যাক আরো কিছু কাহিনী।
    শিল্পীর কল্পনায় ইবনে ফিরনাসের আকাশে উড়া- ছবি dakhinhawa.com
    শিল্পীর কল্পনায় ইবনে ফিরনাসের আকাশে ওড়া
    সম্ভবত ইবনে ফিরনাসের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই পরের শতকে ওড়ার চেষ্টা করেছিলেন আল জহুরী। ১০০৭ খ্রিস্টাব্দে আল জহুরী তুর্কিস্থানের উলু মসজিদের ১,০০২ ফুট উঁচু মিনার হতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওড়ার প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

    পশ্চিমে একাদশ শতকে ইংল্যান্ডের ইলমার অব মালমেসবুরি প্রায় ১,০০০ ফুট উচু থেকে গ্লাইডিংয়ের মাধ্যমে ওড়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি আংশিক সফলতা পেলেও দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন।
    ছবি ক্যাপশন- দ্য ভিঞ্চির আঁকা অর্নিথপটারের নকশা- ছবি- উইকিপিডিয়া
    দ্য ভিঞ্চির আঁকা অর্নিথপটারের নকশা
    ফিরনাসের প্রায় ৭০০ বছর পর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি আঁকেন উড্ডয়ন যন্ত্রের নকশা অর্নিথপটার। যদিও জীবদ্দশায় ভিঞ্চি কখনো সে যন্ত্রের পরীক্ষামূলক ব্যবহার করেননি, তবুও ভিঞ্চিকে উড্ডয়ন যন্ত্রের আধুনিক চিন্তক হিসেবে ধরা হয়। দ্য ভিঞ্চি ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন যন্ত্র সম্পর্কে জেনেছিলেন কি না তা জানার উপায় নেই। যদি না জেনে থাকেন, তবে বলতে হয় কয়েকশ বছর ব্যবধানে থেকেও দুজন বিজ্ঞানী একই প্রশ্নের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন, আর তা হলো কিভাবে পাখির আকাশে ওড়ার দক্ষতা মানুষের মধ্যে প্রতিস্থাপন করা যায়।
    আহমেদ সেলেবি গ্লাইডিং করে পাড়ি দিয়েছিলেন ফসফরাস- ছবি-
     গ্যালাটা টাওয়ার হতে গ্লাইডিং করে বসফরাস পাড়ি দিয়েছিলেন আহমেদ সেলেবি
    ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দে ওসমানীয় শাসনামলে আহমেদ সেলেবি ইস্তাবুলের গালাটা টাওয়ার হতে গ্লাইডিং করে বসফরাস পাড়ি দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। আহমদ সেলেবির সাফল্যে অণুপ্রাণিত হয়ে তার তিন বছর পর ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে আহমেদ সেলেবির ভাই লাগারি হাসান সেলেবি গানপাউডার দিয়ে রকেট বানিয়ে তোপকাপি প্রাসাদের নিকটে সফলভাবে আকাশের দিকে প্রায় তিনশ মিটার উপরে উঠে যান। তার রকেটের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে তিনি এখনকার প্যারাস্যুটের মতো পাখার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বসফরাসের পানিতে নেমে আসেন।
    শিল্পীর কল্পনায় লাগারি হাসান সেলেবির রকেট – ছবি- kartamirakrym.blogspot.com
    শিল্পীর কল্পনায় লাগারি হাসান সেলেবির রকেট
    ১৮০০ সালের দিকে স্যার জর্জ কেলি প্রথম পাখির মতো ঝাপটানো ডানার বদলে স্থির ডানার কথা বলেছিলেন। বাতাসের চেয়ে ভারী বস্তু কী কী অবস্থায় বাতাসে ভাসতে পারে, তার বৈজ্ঞানিক শর্তাবলী তিনিই প্রথম খুঁটিয়ে দেখেন। অ্যারোডাইনামিকস বা বায়ুগতিবিদ্যার জন্ম তার হাত ধরেই।
    ছবি ক্যাপশন- ১৯০৩ সালের ১৭ ই ডিসেম্বর প্রথম আকাশে উড়েন রাইট ভ্রাতৃদ্বয়- ছবি- wright-brothers.org
    ১৯০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রথম আকাশে ওড়েন রাইট ভ্রাতৃদ্বয়
    যদিও রাইট ভ্রাতৃদ্বয়কেই প্রথম যন্ত্রচালিত উড়োজাহাজ উদ্ভাবনের কৃতিত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু তার আগেও অনেকেই এই লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি গিয়েছিলেন। এমনকি ১৯০১ সালে গুস্তাভ হোয়াইটহেড এবং ১৯০২ সালে রিচার্ড পিয়ার্স উড়োজাহাজ উদ্ভাবনে সফল হয়েছিলেন বলেও মেনে নেন অনেকেই। ১৯০৩ সালেই রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের কয়েক মাস আগে যন্ত্রচালিত উড্ডয়ন যন্ত্রের উদ্ভাবনের দাবি করেন জার্মান উদ্ভাবক কার্ল জথো।

    এর আরো আগে ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে মন্টগোলফায়ার ভ্রাতৃদ্বয় বেলুনের সাহায্যে সফলভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করেছিলেন। আর ১৮৫২ সালে হেনরি গিফার্ড তার উদ্ভাবিত এয়ারশিপে করে পাক্কা ২৭ কিলোমিটার পাড়ি দেন। বাষ্পশক্তিতে চলতো তার জাহাজের প্রপেলার। তাছাড়া যার কথা না বললেই নয় তিনি অটো লিলিয়েনথাল, আধুনিক উড়োজাহাজ উদ্ভাবনের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা। উনবিংশ শতাব্দীতে এই অটো লিলিয়েনথালের আকাশে ওড়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা ও তার গবেষণালব্ধ ফল পরবর্তীতে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়কে উদ্বুদ্ধ করেছিল উড়োজাহাজ উদ্ভাবনের জন্য। লিলিয়েনথাল তার উদ্ভাবিত গ্লাইডারে ওড়ার সময় দুর্ঘটনায় মারা যান ১৮৯৬ সালে।
    ছবি ক্যাপশন হেনরি গ্রিফার্ড ও তার এয়ারশীপ- ছবি- steemkr.com
    হেনরি গ্রিফার্ড ও তার এয়ারশিপ
    যা-ই হোক, ১৭০০ সাল থেকে ১৯০৩ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ব্যক্তি বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন আকাশে উড়তে। তাদের প্রায় অনেকের প্রচেষ্টাই ইতিহাসে সমুজ্জ্বল। এবার চলুন আবার ফিরে যাই ৯ম শতকে ইবনে ফিরনাসের কাছে!

    ইবনে ফিরনাস: প্রথম যিনি মেলেছিলেন ডানা

    ইতিহাসে প্রথম সফলভাবে আকাশে ডানা মেলেছিলেন যিনি তিনি হচ্ছেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস। তিনি ৯ম শতাব্দীতে উমাইয়া খিলাফতের সময় স্পেনের আন্দালুসিয়ার একজন পলিম্যাথ বা বহুশাস্ত্র বিশারদ ছিলেন। তার উড্ডয়ন প্রচেষ্টা সম্পর্কে ঐতিহাসিক ফিলিপ কে. হিট্টি তার হিস্ট্রি অব আরব গ্রন্থে মন্তব্য করেন, “ইবনে ফিরনাসই প্রথম ব্যক্তি যিনি আকাশে ওড়ার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন বৈজ্ঞানিকভাবে।”

    ইবনে ফিরনাসের পরিচয়

    আব্বাস ইবনে ফিরনাসের পুরো নাম আব্বাস আবু আলকাসিম ইবনে ফিরনাস ইবনে ইরদাস আল তাকুরিনি। তার জম্ম ৮১০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন মুসলিম জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র স্পেনে। তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রকৌশলী, উদ্ভাবক, উড্ডয়ন বিশারদ, চিকিৎসক, কবি, সুরকার, পদার্থবিদ, সঙ্গীতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী।
    বাগদাদে ইবনে ফিরনাসের ভাস্কর্য- ছবি- nabaa.news
    বাগদাদে ইবনে ফিরনাসের ভাস্কর্য
    তার জম্মস্থান ছিল স্পেনের রোনদায়। রোনদা এখন স্পেনের একটি পর্যটন শহর। তিনি যদিও রোনদায় জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু জ্ঞানের প্রতি তার আসক্তি থেকে তিনি রোনদা থেকে কর্ডোবায় গমন করেন। তবে তার আগে তিনি কিছু সময় ইরাকে ব্যয় করেন। তখন বাগদাদের দারুল হিকমাহ ছিল মুসলিম জ্ঞানপিপাসুদের তীর্থস্থান। তিনি সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর জ্ঞান আহরণ করেন ও ফিরে এসে কর্ডোবায় বসবাস শুরু করেন।

    ইবনে ফিরনাসের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব

    যদিও ইবনে ফিরনাস ভালো মানের কবি ছিলেন, কিন্তু প্রথম আকাশে ওড়ার কৃতিত্বের জন্য তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

    পি. কে. হিট্টি তার হিস্ট্রি অব আরব গ্রন্থে লিখেছেন, “আবু আল কাসিম জাহরাবীর পর স্পেনে প্রাচ্য সংগীত জনপ্রিয় করার পেছনে ইবনে ফিরনাসের অনবদ্য ভূমিকা ছিল। তার উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পাথর থেকে গ্লাস তৈরি। তিনি একটি সৌরমডেলও তৈরি করেছিলেন, যেখানে নক্ষত্র, মেঘ, এমনকি বজ্রপাতের অবস্থাও দেখানো হয়েছিল।”

    তিনি আল মাকাতা নামক জলঘড়ির উদ্ভাবন করেছিলেন। প্ল্যানিস্ফিয়ার নামক যন্ত্র ও পাঠের উপযোগী লেন্সও প্রস্তুত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তার বাসস্থানের একটি কক্ষে তিনি গ্রহ-নক্ষত্রের এমন একটি মডেল তৈরি করেছিলেন, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘূর্ণায়মান ছিল।

    তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো পাথরের স্ফটিককে কাটার প্রক্রিয়া। স্পেনে এটি তখন সম্ভব হতো না বিধায় স্পেন এ বিষয়ে মিশরের উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ইবনে ফিরনাসের এই উদ্ভাবনের ফলে স্পেন এই নির্ভরশীলতা থেকে রেহাই পায়।

    আরমেন ফিরমেন ও ইবনে ফিরনাস

    আরমেন ফিরমেন ৮৫২ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোবার একটি মসজিদের মিনার হতে নিজের উদ্ভাবিত পোশাক পরে ওড়ার চেষ্টা করেন। যদিও তা সফল হয়নি, কিন্তু তারপরেও তার পোশাক নিচের দিকে তার পতনের গতিকে কমিয়ে দেওয়ায় তিনি খুব বেশি আঘাত পাননি।
    শিল্পীর কল্পনায় কর্ডোবার মসজিদের মিনার হতে আরমেন ফিরম্যানের উড্ডয়ন প্রচেষ্টা – ছবি- elpoderdelasgalaxias.wordpress.com
    শিল্পীর কল্পনায় কর্ডোবার মসজিদের মিনার হতে আরমেন ফিরম্যানের উড্ডয়ন প্রচেষ্টা
    কেউ কেউ মনে করেন, ইবনে ফিরনাস ছিলেন সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং এ ঘটনাই ইবনে ফিরনাসকে আকাশে উড়তে অনুপ্রাণিত করে।

    আবার অনেকেই এই মতের বিরোধিতা করেন এবং তারা মনে করেন আরমেন ফিরমেন ও ইবনে ফিরনাস একই ব্যক্তি ছিলেন এবং আরমেন ফিরমেন ইবনে ফিরনাসের নামেরই ল্যাটিন সংস্করণ। তারা মনে করেন, ইবনে ফিরনাস এই ঘটনার পর তার উড্ডয়ন যন্ত্র উন্নয়নে মনোযোগ দেন ও দীর্ঘ ২৩ বছর পর তিনি আবারো আকাশে উড়ার প্রচেষ্টা চালান।

    ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রচেষ্টা

    বেশ কিছু সূত্রে ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রচেষ্টা বর্ণিত হলেও তার উড্ডয়ন প্রচেষ্টার বিস্তারিত পাওয়া যায় ঐতিহাসিক আল মাকারির লেখায়। তবে আল মাকারি ইবনে ফিরনাসের সমসাময়িক ছিলেন না। তিনি ফিরনাসের বিষয়ে লেখেন প্রায় ৭৫০ বছর পর। তবে ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রচেষ্টার সফলতার বিষয়ে প্রায় সব ঐতিহাসিকই একমত।
      ছবি ক্যাপশন- শিল্পীর কল্পনায় আব্বাস ইবনে ফিরনাস । ছবি-  Huffpostmaghreb.com
    শিল্পীর কল্পনায় আব্বাস ইবনে ফিরনাস
    ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রসঙ্গে মন্তব্য পাওয়া যায় সমসাময়িক কর্ডোবার আমির প্রথম মুহাম্মদের রাজকবি মুমিন ইবনে সাইদের কবিতায়। ইবনে সাইদ ফিরনাস সম্পর্কে কবিতায় লিখেন, “শকুনের পালক দ্বারা আবৃত হলে তিনি ফিনিক্সের চেয়েও দ্রুত ওড়েন।”

    ইবনে ফিরনাস তার উদ্ভাবিত উড্ডয়ন যন্ত্রে পালক ও সিল্কের ব্যবহার করেছিলেন। পঁয়ষট্টি বছর বয়সে তিনি স্পেনের কর্ডোবার নিকটবর্তী রুসাফা এলাকার আরুস পর্বত থেকে তার উদ্ভাবিত উড্ডয়নযন্ত্র সহকারে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

    কর্ডোবা থেকে অনেক মানুষ তার আকাশে ওড়া দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছিলেন। ইবনে ফিরনাস তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, এখান থেকে ওড়ার পর যদি সব ঠিক থাকে তবে আমি এখানেই আবার ফিরে আসব। তার উড্ডয়নযন্ত্র সফলভাবেই কাজ করে এবং প্রায় দশ মিনিট তিনি তার যন্ত্রের সাহায্যে উড়তে সমর্থ হন। কিন্তু সফলভাবে ‍উড়লেও তিনি একটু ভুল করেছিলেন।
    ছবি ক্যাপশন- দুবাইয়ের ইবনে বতুতা শপিংমলে ফিরনাসের রেপ্লিকা- ছবি- reportasenews.com
    দুবাইয়ের ইবনে বতুতা শপিংমলে ফিরনাসের রেপ্লিকা
    আল মাকারি উল্লেখ করেন, তিনি তার শরীরকে পালক দ্বারা আবৃত করেন এবং তার শরীরে কয়েকটি পাখা যোগ করেন। তারপর শূন্যে ভেসে পড়েন। যারা তার এই উড্ডয়ন প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের লেখনীতে পাওয়া যায়, তিনি পাখার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য দূরত্ব অতিক্রম করেন এবং যেখান থেকে উড্ডয়ন শুরু করেছিলেন আবার সেখানে ফিরে আসেন। কিন্তু সফলভাবে অবতরণ করতে ব্যর্থ  হন। এ সময় তিনি গুরুতর আহত হন।

    ইবনে ফিরনাস প্রাণে বেঁচে গেলেও পিঠে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। তার বয়স তখন পঁয়ষট্টি বছর। এরপর তিনি তার উড্ডয়নযন্ত্রে ঠিক কী ভুল ছিল তা শনাক্তকরনে মনোনিবেশ করেন। তিনি উপলদ্ধি করেন, পাখি অবতরণের সময় লেজ এবং ডানাগুলোর সমন্বিতভাবে কার্যক্ষমের মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু তিনি তার যন্ত্রে গতি কমানোর জন্য সেরকম কোনো লেজ বা বিকল্প পদ্ধতি রাখেননি।

    তারপরেও তিনি প্রায় ১২ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তার পক্ষে আর আকাশে ওড়া সম্ভব হয়নি। কারণ তিনি আর আগের মতো সুস্থতা লাভ করেননি। ৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে ইবনে ফিরনাস ইন্তেকাল করেন।
    ইবনে ফিরনাস শিল্পীর চোখে- ছবি- angelfire.com
    ইবনে ফিরনাস শিল্পীর চোখে
    ইবনে ফিরনাস মানুষের উড্ডয়নের  ইতিহাসে কিংবা আকাশে ওড়ার পেছনে মানুষের যে প্রচেষ্টা তার একজন সফল স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে স্বরণীয় হয়ে আছেন। তার প্রচেষ্টাকে বলা যায় আধুনিক উড়োজাহাজ আবিষ্কারের প্রথম ধাপ। মানুষকে ডানা মেলে ওড়ার স্বপ্ন দেখানো ইবনে ফিরনাস তাই ইতিহাসে অমর।

    আকাশে ওড়ার এই স্বপ্নদ্রষ্টাকে স্মরণীয় করে রাখতে চাঁদের একটি জ্বালামুখের নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। ২০১৩ সালে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোলস রয়েস ইবনে ফিরনাসের নামে তাদের একটি গাড়ির সংস্করণ বের করে, যার নাম দেয় ইবনে ফিরনাস মোটিফ। স্পেনের কর্ডোবায় ইবনে ফিরনাস সেতু, বাগদাদে ইবনে ফিরনাসের ভাস্কর্য, দুবাইয়ের ইবনে বতুতা মলে ফিরনাসের রেপ্লিকা ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় হয়তো ইবনে ফিরনাসের নামের সাথে পরিচয় ঘটতে পারে আপনার। তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে, তার যুগের চাইতে এগিয়ে থাকা একজন মানুষ হিসেবে ।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 66 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

কোন বিখ্যাত উপন্যাস আমেরিকার ইতিহাস পরিবর্তন করে দিয়েছিলো?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    আঙ্কেল টম’স কেবিন   কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার করার পর। দলে দলে ইউরোপের শেতাঙ্গরা সেখানে গিয়ে নিজেদের উপনিবেশ গড়ে তোলে। নতুন নতুন উপনিবেশ তৈরির সময় তারা দেখল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলের মাটি তুলোর চাষের পক্ষে খুব উৎকৃষ্ট। এই তুলোর চাষের অঞ্চলে প্রয়োজন পড়লো অতি অল্প খরচে অধিক শ্রমবিস্তারিত পড়ুন

    আঙ্কেল টম’স কেবিন

     

    You are currently viewing আঙ্কেল টম’স কেবিন: যে উপন্যাস আমেরিকার ইতিহাস পরিবর্তন করে দিয়েছে

    কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার করার পর। দলে দলে ইউরোপের শেতাঙ্গরা সেখানে গিয়ে নিজেদের উপনিবেশ গড়ে তোলে। নতুন নতুন উপনিবেশ তৈরির সময় তারা দেখল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলের মাটি তুলোর চাষের পক্ষে খুব উৎকৃষ্ট।

    এই তুলোর চাষের অঞ্চলে প্রয়োজন পড়লো অতি অল্প খরচে অধিক শ্রমদানকারী অসংখ্য মানুষের, যারা চিরদিনের মতো কেনা গোলাম হয়ে দৈহিক নিপীড়নের ভয়ে বিনা পারিশ্রমিকে আমৃত্যু শ্রমদান করবে। আর তাই এই ধরনের শ্রমিক শিকার করা হলো আফ্রিকার দুর্বল অসহায় কালো মানুষদের গ্রামকে গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে, আর ওদের খাঁচায় পুরে শেকলে বেঁধে নিজেদের দেশ ও সমাজ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসা হলো কামান আর বন্দুকের ভয় দেখিয়ে সমুদ্রের পরপারে আমেরিকায়।

    আর হয়ে গেলো ওরা আজন্ম ক্রীতদাস। ওদের সন্তান-সন্তুতিদের নিয়ে, আর যারা ওদের শিকার করেছিলো সেসব ক্রীতদাস-ব্যবসায়ীরা ওদের বেচতে লাগলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলের ওই সব শ্বেতাঙ্গ তুলো-চাষীদের কাছে। যে-সব শ্বেতাঙ্গ ওদের কিনতো, তারা ওদের মৃত্যু ঘটালেও আইনের চোখে অপরাধী হোতো না, কেননা ওরা আইনের বলে সর্বপ্রকার মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এক ধরনের পণ্যসামগ্রী।

    লেখিকা হ্যারিয়েট বিচার স্টো ও মার্কিন গৃহযুদ্ধ

    হ্যারিয়েটের লেখা আঙ্কেল টমস কেভিল কে মনে করা হয় আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার ভিত্তি স্তম্ভ। বইটি প্রকাশিত হয় ১৮৫২ সালে প্রকাশিত হওয়ার প্রথম বছরেই বইটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বিক্রি হয় প্রায় ৩ লক্ষেরও অধিক কপি আর গ্রেট ব্রিটেনে তার সংখ্যা ১ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। সে সময়ে কোনো বই এতো বিশাল সংখ্যক পরিমাণে বিক্রি ছিলো কেবলই কল্পনা। শুধুমাত্র বাইবেল বিক্রির সংখ্যাই এই উপন্যাসের কাছাকাছি ছিলো।

    একজন লেখক যে শুধুমাত্র লেখকই নয় তিনি চাইলে তার কলমের জোড়ে পুরো একটা সমাজ বা রাষ্ট্রের পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন হ্যারিয়েট বিচার স্টো তার পারফেক্ট উদাহরণ।

    হ্যারিয়েট বিচার স্টো ১৮৩০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ওয়াইয়োতে থাকতেন। সে সময়ে তার বেশ কিছু মুক্তি পাওয়া কিংবা পালিয়ে আসা ক্রিতদাসদের সাক্ষাৎকার নেন। তার মুখেই জানতে পারেন ক্রীতদাসদের ভয়াবহ জীবনের কথা। হ্যারিয়েট বিচার স্টো সবসময়ই বলেছেন উপন্যাসের আঙ্কেল টমস কোনো নির্দিষ্ট ক্রীতদাসের জীবনের উপর ভিত্তি করে লেখা উপন্যাস নয়।

    তবে এই উপন্যাস লেখার ব্যাপারে হ্যারিয়েট আগ্রহী হয়ে উঠেন যখন তিনি জোসিয়া হ্যানসন নামক এক নিগ্রো ক্রীতদাসের লেখা নিজের আত্মজীবনী ‘দ্য লাইফ অব জোসিয়া হ্যানসন’ পড়েন। এই আত্মজীবনীটি প্রকাশিত হয়েছিলো আঙ্কেল টমস কেবিন প্রকাশ হওয়ার ৩ বছর আগে; ১৮৪৯ সালে।

    জোসিয়া হ্যানসন তার আত্মজীবনীতে লেখেন আইজ্যাক ম্যারিল্যান্ডে তে রিলে নামের এক ব্যবসায়ীর ৩৭০০ একর জমিতে তিনি তামাক চাষ করতেন। অতিরিক্ত পরিশ্রম ও নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ১৮৩০ সালে তিনি সেখান থেকে তিনি পালিয়ে কানাডায় চলে যান। তবে একা পালান নি সঙ্গে আরো অনেক ক্রীতদাসদের সাথে নিয়ে পালিয়ে ছিলেন। নিজের ক্রীতদাস জীবনের ভয়ংকর রোমাঞ্চকর স্মৃতিচারণ করেই নিজের আত্মজীবনী লিখে ফেলেন। আর এই বইটি হ্যারিয়েট বিচার স্টো কে আঙ্কেল টমস কেভিন উপন্যাস লেখার রসদ জুগিয়ে ছিলো। সঙ্গে ছিলো বহু বছরে পাওয়া অনেক কৃতদাসদের নেওয়া সাক্ষাৎকার।

    ১৮৫২ সালে হ্যারিয়েট বিচার স্টো যখন আঙ্কেল টমস কেবিন প্রকাশ করেন, তখন আমেরিকায় ক্রীতদাস প্রথা বাতিল করার কোনো সম্ভাবনাই ছিলো না। খুব দ্রুত বইটি জনপ্রিয় হতে শুরু করায় সাধারণ মানুষজন নতুন করে কৃতদাসদের ব্যাপারে ভাবতে শুরু করে। ফলে মানুষের মধ্যে দাসপ্রথা বিরোধী মনোভাবের সৃষ্টির শুরু হয়। কিন্তু আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলো ছিলো পুরোপুরি দাস নির্ভর ফলে উত্তর ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর মধ্যে শুরু হয়ে যায় দ্বন্দ্ব এবং ১৮৬০ এ শুরু হয় যায় ৪ বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।

    গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সাথে দেখা হয়েছিলো লেখিকা হ্যারিয়েট বিচার স্টো এর। প্রথম সাক্ষাৎতে লিংকন বলেছিলেন:-

    “So this is the little lady who started this great war.” (ইনিই তাহলে সেই অল্পবয়স্ক ভদ্রমহিলা যিনি এই যুদ্ধের সুত্রপাত করেছেন)।

    সংক্ষেপে আঙ্কেল টমস কেবিন উপন্যাসের কাহিনী

    উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আঙ্কেল টমস মালিক আর্থার শেলভি ফার্মের একজন কৃতদাস। আর্থার শেলভি মানুষ হিসেবে ছিলেন খুবই ভালো। তিনি কৃতদাসদের উপর জুলুম নির্যাতন করতেন না। শেলভি ঋনগ্রস্থ ছিলেন। এতোটাই খারাপ অবস্থা যে ফার্ম বন্ধ করে দিতে হবে। শেলভির স্ত্রী এমিলি শেলভি স্বামীকে পরামর্শ দেন যেনো টাকা জোগান দেওয়ার জন্য তাদের ক্রীতদাস টমকে ও আরেক ক্রীতদাসী এলিজার ছেলে সন্তান হ্যারি কে বিক্রি করে দেন। শেলভির ছেলে জর্জ শেলভি আঙ্কেল টমকে বিক্রি করার বিষয়টি কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারেন নি। সে টমের কোলেপিঠে বড় হয়েছে, টমকে সে খুব ভালোবাসতো। অপরদিকে এলিজা যখন বুঝতে পেরেছে তালের মালিক টাকার অভাবে টমের সঙ্গে তার ছোট ছেলে শিশুকেও বিক্রি করে দিবে তাই ঝুঁকি নিয়ে সেই রাতেই ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যায়।

    আঙ্কেল টমসকে বিক্রি করে দেওয়া হয় হেলী নামক এক দাস ব্যবসায়ীর কাছে। সেই সাথে হ্যালি গুন্ডাদেরকেও এলিজাকে ও তার ছেলে হ্যারিকে যেনো খুঁজে ধরে নিয়ে আসে। বিক্রির পর শুরু হয় টমের উপর শারিরীক প্রহার। টমকে বিক্রি করার জন্য জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। সেই জাহাজ থেকে ইভা নামের একটি মেয়ে শিশু পানিতে পড়ে প্রায় মরতে বসে। টম নিজের ঝুঁকি নিয়ে লাফ দিয়ে ইভার জীবন বাঁচায়। আর তাই ইভার বাবা ক্লেয়ার টমকে অনেক দাম দিয়ে কিনে নেন। টমের সাথে ইভার ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এতোটাই ভালো বন্ধুত্ব যে ইভা নিজের মা থেকে টমকেই বেশি ভালোবাসতো।

    চিত্রশিল্পীর তুলিতে আঙ্কেল টম
    ২ বছর সুন্দর ও সুখী ভাবেই জীবন কেটে যায় টমের। একসময় অসুস্থ হয়ে ইভা অল্প বয়সেই মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে ইভা তার বাবাকে অনুরোধ করে গিয়েছিল যেনো সে আঙ্কেল টমকে কৃতদাস থেকে মুক্তি দিয়ে দেয়। ইভার বাবা টমকে মুক্তি দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেন। এরই মধ্যে ইভার বাবা আততায়ীর হাতে খুন হন।

    ইভার মা টমকে একদম পছন্দ করতেন না কারন তার মেয়ে বেঁচে থাকতে তার থেকে টমকেই বেশি ভালোবাসতেন। আর তাই তিনি টমের উপর ক্রুদ্ধ ছিলেন। টমকে তিনি সিমন লেগ্রি নামক এক পাষণ্ড দাস ব্যাবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন। সিমন লেগ্রি তাকে নিয়ে যায় লুসিয়ানায় তার তুলোর বাগানে। সিমনের অত্যাচারে ক্রীতদাসেরা মারাও যেতো সেখানে আইন কানুন বলে কিছু ছিলো না। হতো না কোনো অপরাধের বিচার।

    সিমন আঙ্কেল টমকে দিয়ে অন্য কৃতদাসদের নির্যাতন করতে চাইলে টম তা করতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে সীমন ক্ষেপে যায় টমের উপর সে প্রহার করতে শুরু করে। টম ছিলো ঈশ্বরে বিশ্বাসী সেটা সিমন একদম পছন্দ করতো না। টম বলতো এই শরীর তোমার তুমি যা কিছু করতে পারো কিন্তু আমার আত্মা আমি কেবল যীশু কে উৎসর্গ করেছি। এসব শুনে সিমন লেগ্রি আরো ক্ষেপে টমকে প্রহার করতো।

    এরই মাঝে আঙ্কেল টম ক্যাসি ও ইমেলি নামে দুই ক্রীতদাসও দাসীকে বাগান থেকে পালাতে সাহায্য করেন। আর এটা সীমন কোনোভাবেই সহ্য করতে পারে নি। সে আঙ্কেল টমকে এতোটাই প্রহার শুরু করে যে আঙ্কেল টমস প্রায় মৃত্যু শয্যায় চলে যায়। মৃত্যুর আগে টমের প্রথম মালিকে শেলভির জেলে জর্জের সাথে দেখা হয়। জর্জ টমকে বলে সে তাকে মুক্ত করতে এসেছে। টম জর্জকে বলে যীশু তাকে মুক্তির জন্য ডাকছে। এর কিছুক্ষণ পর টম পরলোকগমন করেন। টমের মৃত্যুতে শোকাহত শেলভি পরিবার তাদের সকল ক্রীতদাসদের মুক্তি ঘোষণা করে। অপর দিকে এলিজা ও তার ছেলে হ্যারিকে নিয়ে নিজের পলাতক কৃতদাস স্বামীর সাথে পালিয়ে কানায় চলে যেতে সক্ষম হন। আর মুক্তি পান ক্রীতদাসের জঘন্যময় জীবন থেকে।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 66 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

ভাষার উৎপত্তি হয় কিভাবে?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    ১ মানব সভ্যতা ও সমাজের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মূলত ভাষা। নিজেদের মধ্যে অর্থপূর্ণভাবে ঠিক করে যোগাযোগ করতে না পারলে এই সভ্যতা গড়ে তোলা আদৌ সম্ভব হতো বলে মনে হয় না। অন্যান্য প্রাণীর দিকে তাকালেই এটা আমরা বুঝতে পারি। এই ভাষার প্রচলন কীভাবে হলো সেটা নিয়ে অনেক গল্প আছে। এরকম বিখ্যাত গল্পগুলোর একটিবিস্তারিত পড়ুন

    ১

    মানব সভ্যতা ও সমাজের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মূলত ভাষা। নিজেদের মধ্যে অর্থপূর্ণভাবে ঠিক করে যোগাযোগ করতে না পারলে এই সভ্যতা গড়ে তোলা আদৌ সম্ভব হতো বলে মনে হয় না। অন্যান্য প্রাণীর দিকে তাকালেই এটা আমরা বুঝতে পারি।

    এই ভাষার প্রচলন কীভাবে হলো সেটা নিয়ে অনেক গল্প আছে। এরকম বিখ্যাত গল্পগুলোর একটি আমরা প্রায় সবাই সম্ভবত ছোটকালে পড়েছি বা শুনেছি। বিশেষ করে ব্যাকরণ বইগুলোতে এই গল্পটা থাকত। তবে এই গল্পটা সরাসরি ভাষার উৎপত্তি নিয়ে না, বরং বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি নিয়ে।

    শিল্পির চোখে টাওয়ার অফ ব্যাবিলন; Image Source: Phillip Medhurst
    গল্প মতে, প্রাচীন ব্যবিলনের মানুষ ভেবেছিল একটা টাওয়ার বানাবে। সেই টাওয়ার দিয়ে ছুঁয়ে ফেলবে আকাশ। মানুষ ভাবত, নীল আকাশের ওপারেই স্রষ্টার বাস। তাই টাওয়ার বানালে স্রষ্টার কাছে সরাসরি পৌঁছানো যাবে, কথা বলা যাবে। কিন্তু টাওয়ারের কাজ অনেক দূর হওয়ার পরে স্রষ্টা ভাবলেন, এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না!

    একদিন লোকজন ইট-পাথর আনতে গিয়েছিল। টাওয়ারের কাছে এসে ওরা টের পেল, কেউ আর কারো কথা বুঝতে পারছে না। স্রষ্টা আসলে একেকজনকে একেক ভাষা শিখিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু কেউ কথা না বুঝলে টাওয়ারের কাজ কীভাবে এগোবে! ভেস্তে গেল টাওয়ার বানানো। স্রষ্টা আকাশের ওপারে অধরাই রয়ে গেলেন। আর এদিকে, মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ল নানা ধরনের ভাষা।

    এই গল্পের অনেক ফাঁক-ফোঁকর আছে। চাইলেই গল্পটা নিয়ে নানারকম প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু সেসব প্রশ্ন করা আমাদের উদ্দেশ্য না। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, এই ব্যাপারটাকে তলিয়ে দেখা। বুঝতে চেষ্টা করা, আসলেই ঠিক কী হয়েছিল। তবে এই কাজটা আমরা করব বিজ্ঞানের চোখে, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে।

    সেজন্য অবশ্যই আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাচীন পৃথিবীতে। যে পৃথিবীর কথা ঘুরে ফিরে এসেছে মানুষের ইতিহাসে, কল্পে-গল্পে।

    ২

    কথা হলো, আমরা কি শুরু থেকেই শুরু করব? চট করে ফিরে যাব সেই পৃথিবীতে? ভাবার চেষ্টা করব, সে সময়ের মানুষ তখন কী করছিল? উঁহু, সেটা করা যাবে না। যুক্তি আমাদের বলে, উল্টো দিক থেকে পুরো জিনিসটা দেখার চেষ্টা করতে হবে আমাদের। ধীরে ধীরে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ফিরে যেতে হবে সেই সময়টায়, যখন ভাষার শুরু হয়েছিল।

    কথা হলো, বিজ্ঞানীরা এটা কীভাবে করেন? মানে, ভাষা তো আর ফসিল রেখে যায়নি যে, ফসিল বিশ্লেষণ করে, কার্বন ডেটিং করে এর ইতিহাস বের করে ফেলা যাবে। কথা সত্য। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের দেহের গঠণ বিশ্লেষণ করলে সেটা দেখা যায় যে, ধীরে ধীরে তারা যোগাযোগের দিকে ঝুঁকছে। তাদের দেহে সেই চিহ্ন ফুটে উঠছে ধারাবাহিকভাবে। সেই সঙ্গে তাদের রেখে যাওয়া বিভিন্ন জিনিসেও আমরা এর ছাপ দেখতে পাই। এসব সূত্র ধরে ধরেই বিজ্ঞানীরা ভাষার শুরুর গল্পটা বোঝার চেষ্টা করেছেন।

    আগেই বলেছি, সেটা করতে হবে উল্টোভাবে। এই হিসেবে, প্রথম প্রমাণটা পাওয়া যায় মানুষের লেখালেখির। যে লিখতে পারে, সে যে ভাষা পারবে, সেটা তো আর আলাদা করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মানুষের লেখার ইতিহাসের সূচনা হয়েছে মাত্র কয়েক হাজার বছর আগে। তার মানে, এটা আমাদের খুব বেশি দূরে নিয়ে যেতে পারে না। সেজন্য উনিশ শতকের বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, ভাষার উৎপত্তি বের করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। শুধু ভেবেই ক্ষান্ত দেননি। ১৮৬৬ সালে প্যারিস ল্যাঙ্গুইস্টিক সোসাইটি এ বিষয় নিয়ে আলোচনা-গবেষণাও নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। উঁহু, গবেষণা করলে পাপ হবে, এমন না। ওদের মনে হয়েছিল, এই নিয়ে কাজ করাটা কেবলই সময় নষ্ট।

    আশার কথা হলো, সময় বা অর্থ নষ্ট হবে ভেবে কৌতূহলী মানুষ কখনোই থেমে যায়নি। সেজন্যেই মানুষ চাঁদে পা রাখতে পেরেছে। মানুষের হাতে গড়া মহাকাশযান পেরিয়ে গেছে সৌরজগতের সীমানা। একইভাবে একশ বছরের মতো পরে এসে জীববিজ্ঞানী ও ইভোলিউশনারি থিওরিস্টরা ভাবলেন, এভাবে তো ভাষাকে ফেলে রাখার কোনো মানে হয় না। আমাদের জীবন ও সভ্যতার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ইতিহাস জানতে হবে। সেজন্য কাজে নামা দরকার। কিন্তু কীভাবে?

    ফসিল নেই, নেই যথেষ্ট সূত্র। লেখালেখিও শুরু হয়েছে অল্প কিছুদিন আগে। তাহলে উপায়? বিজ্ঞানীরা ভাবেন। ভেবে ভেবে তারা সেই আপ্ত বাক্যের কাছে ফিরে গেলেন। দশে মিলে করি কাজ, হারি-জিতি নাহি লাজ! শুধু জীববিজ্ঞানের হাত ধরে হয়তো হবে না। কিন্তু বিজ্ঞানের বাকি সব শাখা আছে কী করতে? শেষমেষ প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, ভাষা বিজ্ঞান ও কগনিটিভ সায়েন্স- সব কিছু একসঙ্গে নিয়ে মাঠে নামলেন বিজ্ঞানীরা। অবশেষে ফল পাওয়া গেল৷ এর মধ্যে দিয়ে শুধু একটি নয়, মানুষের ভাষা খুঁজে পাওয়া নিয়ে দু-দুটো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান মিলে গেল একসঙ্গে।

    প্রাচীন মানুষের আঁকা গুহাচিত্র; Image Source: frontiersin.org

    ৩

    চল্লিশ হাজার বছর আগের কথা। মানুষ তখন গুহাচিত্র আঁকত। এ ধরনের ছবি আমরা দেখেছি। সেসব ছবির পেছনে চিন্তা, সংস্কৃতি ও বিমূর্ত ভাবনা ছিল, এটা আমরা বুঝতে পারি। ভাষার জন্যে তো ঠিক এই জিনিসগুলোই দরকার, তাই না? তাহলে, কয়েক হাজার বছর থেকে চল্লিশ হাজার বছর পর্যন্ত পিছিয়ে এলাম আমরা। কথা হলো, এই সময়েই কি ভাষার আবির্ভাব হয়েছিল?

    হতে পারে। না-ও হতে পারে! সহজ কথায়, সবই ঠিক আছে, কিন্তু এককভাবে এই ব্যাখ্যাটি যথেষ্ট না। অর্থাৎ আরো প্রমাণ দরকার। সেজন্যে আমরা সে সময়ের মানব-সমাজের দিকে তাকাতে পারি।

    এ সব মিলে ধরে নেওয়া যায়, মানুষের মাঝে ভাষার উদ্ভব হয়েছিল চার লাখ বছর আগে।

    মানুষের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব, চল্লিশ হাজার বছর আগে মানুষ কিন্তু এক জায়গায় নেই। গোত্র বা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে নানাদিকে ছড়িয়ে গেছে। তার মানে, এই সময়ে যদি ভাষার উৎপত্তি হয়, তাহলে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় একইসঙ্গে বা অল্প সময়ের ব্যবধানে সব মানুষদের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসতে হবে। চিন্তার ক্ষমতা তৈরি হলেই শুধু হবে না, সেটা প্রকাশের মানসিক ও শারীরিক ক্ষমতা এবং সেজন্য দেহে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও হতে হবে। এ থেকে আমরা একটা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসতে পারি।

    মানুষ নিশ্চয়ই আরো আগেই ভাষা শিখে গিয়েছিল। সেজন্যই তারা বিমূর্ত চিন্তা করতে শিখেছে এবং সেসব গুছিয়ে আঁকতে শিখেছে গুহার দেয়ালে। তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? তখনকার পৃথিবীতেও ভাষা ছিল, হয়তো বিভিন্ন গোত্র বা দলের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলত; কিন্তু উৎপত্তিটা তখন হয়নি। হয়েছে আরো আগে, আরো অনেক আদিম পৃথিবীতে।

    ৪

    আদিম পৃথিবীতে মানুষের আগেই এসেছিল এপরা। এই এপদের গলায় বড় আকারের বায়ুথলী ছিল। এটা দিয়ে তারা ‘গোঁ গোঁ’ ধরনের শব্দ করে প্রতিপক্ষ বা অন্যান্য প্রাণীকে ভয় দেখাত। সমস্যা হচ্ছে, এ ধরনের বায়ুথলী স্বরবর্ণের উচ্চারণে বাধা দেয়। এটা কিন্তু বিজ্ঞানীরা ইচ্ছেমতো বলে দেননি। বেলজিয়ামের ফ্রি ইউনিভার্সিটি অফ ব্রাসেলসে বিজ্ঞানী বার্ট দ্য বোর সিমুলেশন করে দেখিয়েছেন। কিন্তু মানুষের ভাষার পেছনে স্বরবর্ণ, যাকে বলে, আবশ্যক।

    এপদের মধ্যে এ ধরনের বায়ুথলী ছিল ঠিকই, কিন্তু হোমো হাইডেলবার্জেনিস প্রজাতীর দেহে এরকম কিছু দেখা যায় না। এই হোমো হাইডেলবার্জেনিস থেকেই পরে নিয়ান্ডারথাল ও স্যাপিয়েন্সরা এসেছে বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা। হোমো হাইডেলবার্জেনিস পৃথিবীতে ছিল প্রায় সাত লাখ বছর আগে। অর্থাৎ এ সময় পৃথিবীতে ভাষা না থাকলেও, ভাষা তৈরি হওয়ার বেশ কিছু প্রয়োজনীয় উপাদান ততদিনে চলে এসেছে।

    নিয়ান্ডারথাল; Image Source: theguardian.com
    আধুনিক মানুষের কথা যদি ভাবি, মস্তিষ্ক থেকে মেরুদণ্ড হয়ে অনেক অনেকগুলো স্নায়ু ডায়াফ্রাম এবং পাঁজরের মধ্যকার পেশীতে এসে যুক্ত হয়েছে। ঠিকভাবে শ্বাস নিয়ন্ত্রণ ও যথার্থ শব্দ করার জন্য এগুলো জরুরি ভূমিকা রাখে। এই একই জিনিস নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও দেখা যায়।

    এই দুই প্রজাতির কানের ভেতরের অংশেও একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। ফলে, মানুষের উচ্চারিত শব্দের কম্পাংকের যে পরিসীমা আছে- এই সীমায় প্রজাতি দুটির কানের ভেতরে দারুণ সংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে। কথা বলার জন্য শোনা ও এর ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বোঝাটা জরুরি। এটার খুব সহজ একটা উদাহরণ আমরা বর্তমানেই দেখতে পারি। যারা কথা বলতে পারেন না, তারা কানেও শুনতে পান না। কারণ, শুনে সেটা প্রকাশ না করতে পারলে, এই ভার মস্তিষ্ক নিতে পারবে না। আবার, না শুনলে বলার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি হওয়া একরকম অসম্ভব।

    এরপরেও, কথা বলার জন্য আরেকটা জিনিস দরকার। FOXP2 জিন। মস্তিষ্কের যে অংশ কথা নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে কারিকুরি ফলায় এটি। অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যেই এটা থাকে। কিন্তু মানুষের ভেতরে এই জিনটি কিছুটা উন্নত। সেজন্যই আমরা মুখ ও চেহারায় ভাষার জন্য প্রয়োজনীয় নড়াচড়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও এই জিন ছিল, কিন্তু এতটা উন্নত ছিল না।

    এসব তথ্য আমাদেরকে একটা সময়ের দিকে ইঙ্গিত করে। এ থেকে বলা যায়, মোটামুটি চার লাখ বছর আগে পৃথিবীতে ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল। ততদিনে মানুষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা চলে এসেছে তার ভেতরে। ধীরে ধীরে চিন্তার ক্ষমতাও বাড়ছে। সেজন্যই এই ভাবনাগুলো প্রকাশ করা জরুরি হয়ে গেছে। ফলে তৈরি হয়েছে ভাষা।

    হোমো ইরেক্টাস; Image Source: resonance.is
    কিন্তু আরো আগে, প্রায় দুই মিলিয়ন বছর আগে হোমো ইরেক্টাসরা যখন শিকার করত, তখন তারা নানারকম যন্ত্র বানাত সেজন্যে। তাহলে তারাও কি ভাষা জানত? হয়তো জানত। হয়তো জানত না। কিন্তু সেই ভাষা যে আধুনিক মানুষের ভাষা ছিল না, এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত। মানুষের ভাষার আদিম রূপ, হয়তো ঠিক ভাষা হয়েও ওঠেনি- এমন কিছু থাকলেও থাকতে পারে সে সময়।

    এ সব মিলে ধরে নেওয়া যায়, মানুষের মাঝে ভাষার উদ্ভব হয়েছিল চার লাখ বছর আগে। আর, সেই ভাষাই দিনে দিনে আরো পরিণত হয়েছে। আবার, মানুষ দল বা গোত্রে ভাগ হয়ে যাওয়ার ফলে বিকৃত হয়ে গেছে ভাষা। সেভাবেই তৈরি হয়েছে নানা ধরনের এত সব ভাষা। কিন্তু যতই আলাদা হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি না কেন, ভালোভাবে খুঁজলে আজও আমরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মধ্যেও মিল খুঁজে পাই, কাছাকাছি উচ্চারণ ও অর্থের শব্দ খুঁজে পাই। এই সব কিছুই আমাদের একটি সাধারণ ভাষার দিকে ইঙ্গিত করে। সাধারণ এক প্রজাতির ভাষার শুরুটাও যে একটা সাধারণ ভাষা দিয়েই হবে, তা আর আশ্চর্য কী!

    ভাষার উৎপত্তির সময়কাল; Image Source: Writer

    ৫

    ভাষার উদ্ভবের সময়কাল নাহয় পাওয়া গেল। কিন্তু কথা হলো, এই ভাষাটা এলো কীভাবে? ভাষার উৎপত্তি যে যোগাযোগের জন্য, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু এই তাড়নাটা মানুষ অনুভব করা শুরু করল কেন? এই প্রশ্নটাই মানুষের ভাষা খুঁজে পাওয়া নিয়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন। (প্রথম প্রশ্নটা কী ছিল, সেটা কি আলাদা করে আর বলা লাগবে? তা-ও বলে দেই। প্রশ্নটা হলো, ভাষার উৎপত্তিটা কখন হয়েছিল? আসলে, এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে না পারলে, সে সময় মানুষ কী কারণে এই তাড়নাটা অনুভব করেছিল, সেটা বের করা কঠিন।)

    এই প্রশ্নের তিনটি সম্ভাব্য উত্তর আছে। প্রথম উত্তরটা দিয়ে গেছেন চার্লস ডারউইন। ভদ্রলোক বলেছিলেন, বিভিন্ন প্রাণীকে সঙ্গী নির্বাচনের কৌশল হিসেবে অদ্ভুত সব কাজকর্ম করতে দেখা যায়। মানুষও সেরকম কিছু করতে চাইত। এর ফলে প্রোটোল্যাঙ্গোয়েজ বা ‘আদিভাষা’ ধরনের একটা কিছু একটা গড়ে ওঠে। অবশ্য, এই আদিভাষার সরাসরি কোনো অর্থ ছিল না। যেমন- পাখিদের ডাক।

    গিবন; Image Source: nationalgeographic.com
    পুরুষরা সেই আদিভাষা ব্যবহার করে নারীদের আকর্ষণ করতে চাইত। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য তারা আদিভাষা নিয়ে আরো ভাবতে থাকে, এবং আরো জটিল ও সুমধুর কোনো ধ্বনি প্রকাশের চেষ্টা করতে থাকে। এভাবেই ভাষা গড়ে ওঠে। ডারউইন উদাহরণ হিসেবে গিবনদের কথা বললেন। এই প্রাইমেটরাও এভাবে গেয়ে গেয়ে নারী গিবনদের আকৃষ্ট করতে চায়। কেউ কেউ পরে এই অনুমানের ওপরে ভিত্তি করে বলেছেন, শুধু পুরুষরাই এমনটা না-ও করতে পারে। নারীরাও হয়তো একইভাবে পুরুষদের আকৃষ্ট করতে চাইত।

    কিন্তু এরকম হলে, এর ফলে জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের বাকিদের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে থাকার কথা। বাড়তি কোনো বৈশিষ্ট্য বা সুবিধা পাওয়ার কথা তাদের। আবার, একই জিনিস বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়া সবগুলো গোত্র বা দলের মধ্যেই ঘটতে হবে। এসব কিছু বিবেচনা করে ডারউইনের এই উত্তরকে ঠিক জুতসই মনে হয় না।

    কিন্তু এই আইডিয়ার ওপরে ভিত্তি করেই দ্বিতীয় উত্তর বা ধারণাটি গড়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা খেয়াল করে দেখলেন, মানুষ, এমনকি অন্ধরাও সাধারণত হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলার চেষ্টা করে। তাহলে, ‘আদিভাষা’টা হয়তো স্বর নির্ভর না, বরং ভঙ্গিনির্ভর হয়ে গড়ে উঠেছিল। সেই ব্যাপারটাই এখনও আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। হয়তো সেজন্যই এখনো আমরা কিছু বোঝাতে না পারলে হাত বা কাঁধ নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করি। আবার, সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই ভঙ্গি ভালোরকম প্রভাব রাখতে পারে। যেমন- বক্তব্যের সময় মানুষের ভঙ্গি দেখে আকৃষ্ট হই আমরা। নাচের মুদ্রা দেখে আকৃষ্ট হই। এই ব্যাপারগুলোর ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় কিছুটা করে।

    আবার খেয়াল করলে দেখা যাবে, অন্যান্য বেশ কিছু প্রাণীও টুকটাক অঙ্গভঙ্গি করে। মানুষ হয়তো ভাবতে শেখার কারণে এই ভঙ্গিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছিল আরো অনেক দূর। আর, অঙ্গভঙ্গি করে যে পুরোপুরি যোগাযোগ করা যায়, সেটা তো আমরা জানিই। মূক-বধির অনেকেই এভাবে যোগাযোগ করেন।

    দারুণ চিন্তা-ভাবনা হলেও, এই প্রস্তাবনারও একটা বড় ঝামেলা আছে। ভঙ্গিনির্ভর এই ভাষা থেকে স্বরনির্ভর ভাষা এলো কীভাবে?

    ফলে, তৃতীয় আরেকটি আইডিয়া বা উত্তর নিয়ে ভাবলেন বিজ্ঞানীরা। এই আইডিয়াটিই বর্তমানে সবচেয়ে ভালোভাবে ভাষাকে ব্যাখ্যা করতে পারে। এটাকে বলে ওনোম্যাটোপিয়া (onomatopoeia)। মানে, কোনো শব্দ শুনে সেটাকে নকল করার চেষ্টা। এখনও মানব শিশুদের এরকম শব্দ শুনে শুনে বলার চেষ্টা করতে দেখা যায়।

    মানুষের যদি ভাষা বলার মতো যথেষ্ট বোধ না-ও থেকে থাকে, তবু শুনে শুনে এই নকল করতে পারাটা খুব জটিল কিছু না। আগেই বলেছি, ভাষা আসতে আসতে ততদিনে মানুষের মধ্যে ধ্বনি উচ্চারণের শারীরিক সক্ষমতা চলে এসেছে। তাছাড়া, নতুন কিছু গবেষণা থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, অন্যান্য প্রাইমেটও বেশ ভালোভাবেই শ্বাস এবং গলার নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

    যৌক্তিকভাবে ব্যাপারটা থেকে আমরা একটা কল্পনা দাঁড় করাতে পারি। বিভিন্ন প্রাণীর ডাক শুনে শুনে মানুষ সেটাকে নকল করতে শিখেছে। সেসব প্রাণীর বিরুদ্ধে টিকে থাকতে গিয়ে বানাতে হয়েছে সরঞ্জাম। সেই সাথে, সেরকম কোনো প্রাণী, যেমন- বাঘকে আসতে দেখলে বাকিদের সাবধান করে দেওয়ার প্রয়োজনীতা তৈরি হয়েছে। বাঘের গর্জন নকল করে নিজেদের লোকজনকে সতর্ক করে দেওয়ার চেয়ে সহজ আর কী আছে? তাতে করে ভিন্ন ভিন্ন প্রানিকে শনাক্ত করতে পারছে মানুষ। আবার, ধীরে ধীরে এসব ধ্বনি বা ডাকের মধ্যে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে। আরেকটা ভালো ব্যাপার হলো, বিভিন্ন প্রাণির ডাক নকল করে শিকারের জন্য তাদেরকে প্রলুব্ধ করে ফাঁদেও ফেলা সম্ভব ছিল। এভাবে ধীরে ধীরে অর্থবোধক ধ্বনি বুঝতে শিখেছে মানুষ। বুঝতে শিখেছে, ধ্বনির মাধ্যমে চাইলে অন্যদেরকে কিছু বোঝানো যায়।

    সেই সাথে অঙ্গভঙ্গিও শিখছিল মানুষ। এটা অবশ্য অনেকটাই সহজাত (মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও এটা দেখা যায়)। তাছাড়া, সরঞ্জাম বানাতে গিয়েও হাত-পা অর্থবোধকভাবে নাড়ানোর কৌশল বুঝতে পারছিল মানুষ। এভাবেই, সময়ের সাথে সাথে গড়ে উঠতে শুরু করেছিল ভাষা।

    একটা সময়, হয়তো রাতের বেলা আগুনের পাশে বসে মজা করে প্রাণীদের ডাক নকল করতে গিয়ে, বা নিজেদের মতো করে কিছু বোঝাতে গিয়ে মানুষ গাইতে শিখেছে। টের পেয়েছে, গলার তাল-লয় নিয়ন্ত্রণ করে অর্থবোধক ধ্বনিকে আরো সুমধুর করে তোলা যায়।

    কাউকে গান গাইতে শুনলে আমরাও গলা মেলাই; Image Source: pinkvilla.com
    এই গান গাওয়াটার খুব বড় একটা ভূমিকা আছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সাধারণ বাক্যে ‘আমরা’ বা দলগত বোধটা সেভাবে প্রকাশ পায় না। গানে সেটা সহজেই করা যায়। একজন গাইতে থাকলে বাকিরা গলা মেলাতে পারে। এটাও আসলে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তির অংশ। এখনও সেজন্যই গান শুনলে আমরাও গলা মেলাই, মেলাতে চাই। শব্দ করে না হলেও মনে মনে গেয়ে উঠি একই বাক্য।

    ইউনিভার্সিটি কলেজ, লন্ডনের নৃতত্ত্ববিদ জেরোম লুইস মনে করেন, এভাবেই গড়ে উঠেছে ভাষা। আর, এই প্রস্তাবনা সত্যি হলে এটি যেমন ভাষা ও গানের উৎপত্তির ব্যাখ্যা দিতে পারবে, তেমনি বলতে পারবে এদের উৎপত্তির সময়কালও। আর, এই উৎপত্তির সময়টা পেলে দিনে দিনে ভাষার ওপরে কী প্রভাব পড়েছে এবং ভাষা কীভাবে বদলেছে- তার একটা মোটামুটি হিসেব আমরা দাঁড় করাতে পারব।

    শব্দ হয়তো ফসিল রেখে যায় না, রেখে যায় না কোনো চিহ্ন। কিন্তু এত বছর পরে হলেও, আমরা এর ইতিহাস লেখার সূত্র খুঁজে পেয়েছি। হয়তো আরো কিছুটা সময় লাগবে, কিন্তু আমরা নিশ্চয়ই লিখে ফেলতে পারব ভাষার ইতিহাস। মানুষের ইতিহাসের ওপরে এর প্রভাব ও সময়ের বাঁকে বাঁকে এর দিক বদল। আসলে, বিজ্ঞানীরাও সেজন্যই ভাষার গল্পটা বোঝার চেষ্টা করে গেছেন নিরন্তর।

    কারণ, ভাষার ইতিহাস ছাড়া মানুষের ইতিহাস কোনোভাবেই পূর্ণতা পায় না।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 66 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 2 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

বাংলাদেশের প্রথম পতাকা তৈরি করেন কে?

  1. allaboutsubha
    allaboutsubha শিক্ষক https://www.youtube.com/allaboutsubha/
    উত্তর দিয়েছেন 2 বছর আগে

    শিবনারায়ণ দাস বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকার অন্যতম এবং মূল নকশাকার। তিনি একজন ছাত্রনেতা ও স্বভাব আঁকিয়ে ছিলেন। ১৯৭০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ১১৬ নং কক্ষে রাত এগারটার পর পুরো পতাকার নকশা সম্পন্ন করেন।

    শিবনারায়ণ দাস বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকার অন্যতম এবং মূল নকশাকার। তিনি একজন ছাত্রনেতা ও স্বভাব আঁকিয়ে ছিলেন। ১৯৭০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ১১৬ নং কক্ষে রাত এগারটার পর পুরো পতাকার নকশা সম্পন্ন করেন।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 3 টি উত্তর
  • 66 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

এপ্রিল ফুলের প্রকৃত ইতিহাস কি?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    এপ্রিল ফুলের ইতিহাস: মুসলিমদের ভুল বিশ্বাস ও আসল সত্যি ঘটনা পহেলা এপ্রিল সারা বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘এপ্রিল ফুলস ডে’। এই দিনের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে নিজের আশেপাশের মানুষদের সাথে প্রাঙ্ক করা মানে বোকা বানানো। তবে বোকা বানানোর এই পশ্চিমা সংস্কৃতি নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমবিস্তারিত পড়ুন

    You are currently viewing এপ্রিল ফুলের ইতিহাস: মুসলিমদের ভুল বিশ্বাস ও আসল সত্যি ঘটনা

    এপ্রিল ফুলের ইতিহাস: মুসলিমদের ভুল বিশ্বাস ও আসল সত্যি ঘটনা

    পহেলা এপ্রিল সারা বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘এপ্রিল ফুলস ডে’। এই দিনের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে নিজের আশেপাশের মানুষদের সাথে প্রাঙ্ক করা মানে বোকা বানানো। তবে বোকা বানানোর এই পশ্চিমা সংস্কৃতি নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের মাঝে বেশ কিছু গল্প প্রচলিত আছে। এই গল্প গুলো মোটেই সত্যি নয়।

    সচরাচর এপ্রিল ফুল নিয়ে ঘুরেফিরে ৩ এটি গল্প শোনা যায়।

    গল্প ১

    ৭১১ সাল থেকে স্পেনে মুসলিমদের দখলে যাওয়ার পর থেকেই স্পেন জ্ঞান- বিজ্ঞান ও সভ্যতায় ইউরোপের অন্য অঞ্চলে তুলনায় বহুগুণে এগিয়ে যায়। দীর্ঘ দিন মুসলিম শাসনের পর প্রায় ৮০০ বছর পর ১৫ শতকের শেষ দিকে রাজা ফার্ডিনান্ড ও রাণী ইসাবেলার নেতৃত্বে স্পেনের বিভিন্ন শহর দখন করে নিতে থাকে সৈন্যরা। তবে প্রায় সব শহর হাতছাড়া হয়ে গেলে গ্রানাডা তখনো মুসলিমদের দখলেই ছিল।



    রাজা ফার্ডিনান্ড


    রাণী ইসাবেলা 
    দীর্ঘদিন শহরে অবরুদ্ধ থাকার পর ১৪৯২ সালে মুসলিম শাসকগণ সিদ্ধান্ত নেন তারা আত্মসমর্পণ করবেন। আত্মসমর্পণের সময় স্প্যানিশদের পক্ষ থেকে বলা হয়, যেসকল মুসলিম মসজিদে আশ্রয় নেবে। তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না। ফলে দলে দলে মুসলিম রা মসজিদে প্রবেশ করে। আর স্পেনিশরা মসজিদের দরজা বন্ধ করে দিয়ে মসজিদে আগুন দিয়ে লক্ষ লক্ষ মুসলিম পুড়িয়ে মারে। আর বাহিরে আনন্দে চিৎকার করতে থাকে বোকাদের দল! বোকাদের দল।

    মুসলমানদের বোকা বানিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ইউরোপ থেকে মুসলিমদের বিতাড়িত করার দিন হিসেবে এখনো এপ্রিলের ১ তারিখকে বোকা বানাবার দিন হিসেবে পালন করে পশ্চিমারা।

    গল্প ২

    দীর্ঘদিন যুদ্ধ করেও যখন স্পেনিশরা গ্রানাডা দখল করতে পারছিলো না, তখন স্পেনিশরা ভারী চিন্তায় পড়ে যায়। তখন তারা শুরু করে এক ষড়যন্ত্রের। তারা নানান ছলচাতুরী করে শহরে ভেতর প্রচুর মদ ও সিগারেট শহরের ভেতর পাঠায়। এসব মদ সিগারেট পেয়ে মুসলিমরা নেশায় বুদ হয়ে যায়। একসময় আল্লাহর উপর ভয়ভীতি ও হারিয়ে ফেলে।

    এরপর এপ্রিলের ১ তারিখ গ্রানাডার পতন হয়। মুসলমানদের পানীয় এবং সিগারেট দিয়ে বোকা বানিয়ে গ্রানাডা দখল করার দিবস হিসেবে পশ্চিমারা এখনো এই দিনটিকে ‘এপ্রিল ফুল’স ডে’ হিসেবে পালন করে।

    গল্প ৩

    ১৪৯২ সালে রাজা ফার্ডিনান্দ ও রাণী ইসাবেলার বাহিনী গ্রানাডা প্রবেশের আগে মুসলিমদের সাথে চুক্তি করে যে তাদেরকে জাহাজে করে আরবে পাঠিয়ে দেয়া হবে। পরে শহর দখল করে যখন জাহাজে করে সবাইকে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছিল ভূমধ্যসাগর দিয়ে, তখন মাঝসাগরে এসে সবগুলো জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়। লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে সাগরে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।

    কোথাও কোথাও বলা হয় জাহাজেই স্প্যানিশরা সব মুসলিমকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেয়। দিনটি ছিল ১ এপ্রিল। এখনো পশ্চিমারা মুসলমানদের বোকা বানাবার দিনকে ‘এপ্রিল ফুলস ডে’ হিসেবে পালন করে।

    যেভাবে স্পেন থেকে মুসলিমদের পতন ও গ্রানাডা দখল হয়েছিল

    ৭১১ সাল থেকে শুরু করে ১৫ শতক পর্যন্ত প্রায় ৮০০ বছর স্পেন শাসন করেছে মুসলিমরা। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই ক্ষমতা আর জৌলুশও হারাতে থাকে। ক্ষমতা হারানোর নেপথ্যে ছিলো রাজা ফার্ডিনান্ড ও রাণী ইজাবেলার যৌথ শক্তি। ১৪৮২ সাল থেকে ফার্ডিনান্ড ও ইজাবেলা ইউরোপের অন্য দেশগুলো থেকে আর্থিক ও সৈন্য সাহায্য নিয়ে একে একে স্পেনের বিভিন্ন শহর দখল করতে থাকেন।

    প্রায় সব শহর দখল করে ফেললেও গ্রানাডা দখল করতে পারছিল না। গ্রানাডা তখনো তৎকালীন মুসলিম শাসক দ্বাদশ মুহাম্মদের অধীনে ছিল।

    ১৪৯১ সালে গ্রানাডার বিভিন্ন জায়গা দখল করতে করতে তার শহরের প্রধান গেটের সম্মুখে চলে আসে। বেশ কিছুদিন অবরুদ্ধ থাকার পর দ্বাদশ মুহাম্মদ আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি ইসাবেলা এবং ফার্ডিনান্দ শহরে প্রবেশ করেন এবং দ্বাদশ মুহাম্মদের কাছ থেকে নগরের চাবি নেন।



    দ্বাদশ মোহাম্মদ 
    এপ্রিল ফুল সত্য নাকি মিথ্যা?

    পেগি লিসের লেখা ‘ইসাবেল দ্য কুইন’, জন এডওয়ার্ডের লেখা ‘ফার্ডিনান্দ এন্ড ইসাবেলা’ কিংবা আই.এল.প্লাঙ্কেটের লেখা ‘আ হিস্ট্রি অফ মেডিভাল স্পেন’ এসব বই থেকে জানা যায় যে, ২ জানুয়ারিতেই গ্রানাডা নগরীর পতন হয়। ঐদিন মসজিদে মানুষদের আটকিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়ার কোন প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি। এমনকি ঐদিন কোন গণহত্যা হয়েছে সেটাও কোন সমর্থিত সূত্র থেকে কখনো পাওয়া যায়নি।

    মানব ইতিহাসের যখনি কোনো শহরে আক্রমণ হয়েছে তখনি রক্তপাত হয়েছে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বেশ কিছু সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায় ১৬০৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলমানদের একটা অংশকে স্পেন থেকে ফেরত পাঠানো শুরু হয়। তবে অনেককে জোর করে খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার প্রচেষ্টাও চলেছে বেশ অনেক জায়গায়।

    এপ্রিল ফুল নিয়ে যে জাহাজ ডুবি, মসজিদে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে হত্যা এসবের কোনো প্রমান নেই। এমনকি মদ সিগারেট দিয়ে মুসলিমদের পথভ্রষ্ট করার ঘটনাটিও মিথ্যা। মদ্যপানের সাথে বাকি পৃথিবীর মতো আরবরাও পরিচিত ছিল হাজার বছরের বেশি সময় ধরে। আর সিগারেট তো সেদিনের আবিষ্কার।

    এপ্রিল ফুল তাহলে কিভাবে এলো?

    এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যমতে প্রাচীন রোমান উৎসব হিলারিয়া (যা উদযাপিত হত ২৫শে মার্চ) থেকেই এপ্রিল ফুল’স ডের উৎপত্তি।

    জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে বছর শুরু হত ২৫ মার্চ। আর টানা ৮ দিনের উৎসবের শেষ দিন অর্থাৎ এপ্রিলের ১ তারিখ নববর্ষ উদযাপন হত। এরপর ষোল শতকে যখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু হয়, তখন নববর্ষ সরে যায় ১ জানুয়ারি। কোন কোন সূত্রমতে, ক্যালেন্ডার বদলাবার খবর অনেকেই না জানায় তারা ১ এপ্রিলেই নববর্ষ উদযাপন করতে যেয়ে বোকা বনে যায়। তখন থেকেই এই এপ্রিলের ১ তারিখে নিজেরা নিজেদের বোকা বানিয়ে মজা নেয়।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 65 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

কোথা থেকে এলো টয়লেট পেপার ?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    টয়লেট পেপার বা টয়লেট টিস্যু যে নামেই বলেন না কেন, এই পেপারের কাজ কিন্তু সবারই জানা। রেস্টুরেন্ট কিংবা চলতি পথে, নানা কাজে টিস্যু পেপার এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, টিস্যু পেপার ছাড়া এখন কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান চলেই না। খাবারের শেষে, কপালের ঘাম মুছতে, হাতমুখ ধোয়া শেষে টিস্যু পেপার দিবিস্তারিত পড়ুন

    You are currently viewing টয়লেট পেপারের ইতিহাস: রোমানরা টয়লেট পেপার হিসেবে কাঠি ব্যবহার করতো

    টয়লেট পেপার বা টয়লেট টিস্যু যে নামেই বলেন না কেন, এই পেপারের কাজ কিন্তু সবারই জানা। রেস্টুরেন্ট কিংবা চলতি পথে, নানা কাজে টিস্যু পেপার এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, টিস্যু পেপার ছাড়া এখন কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান চলেই না।

    খাবারের শেষে, কপালের ঘাম মুছতে, হাতমুখ ধোয়া শেষে টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ না মুছলে যেন চলেই না। ব্যক্তিগত, পারিবারিক জায়গা থেকে সামাজিক অনুষ্ঠান পর্যন্ত টিস্যু পেপার এনেছে বড় পরিবর্তন। পরিচ্ছনতার ধারণা বদলে দিয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এনেছে নতুন মাত্রা।তবে মলমূত্র ত্যাগের পর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য টয়লেট টিস্যুর বিকল্প আর কিছুই নেই।

    আধুনিক টয়লেট পেপার আবিষ্কার হওয়ার পূর্বে মানুষ কি ব্যবহার করতো?

    বর্তমানে যে আধুনিক টয়লেট পেপার পাওয়া যায় তার সৃষ্টির সময়কাল আনুমানিক ২০০ বছর। ঠিক কবে থেকে টয়লেট পেপার ব্যবহার শুরু হয়েছে তার সঠিক ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না।

    প্রাচীন চীন

    প্রাচীন চীনের মানুষরা টয়লেট এর শেষে কাগজ ব্যবহার করত। এই কাগজ সাধারণ কাগজের চেয়ে তুলনামূলক নরম ছিলো। তবে রাজ আদালতের সদস্যরা যেসব কাগজ ব্যবহার করতেন তা আবার সুগন্ধিযুক্ত ছিল।

    চীনে টয়লেট পেপার ব্যবহারের প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় ৫৮৯ খ্রিস্টাব্দে। যাইহোক, যেহেতু চীনারা খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীতে কাগজ আবিষ্কার করেছিল, তাই তারা নিশ্চিতভাবে ৫৮৯ খ্রিস্টাব্দের আগেও টয়লেটের উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করে থাকতে পারেন।

    ইতিহাস বলছে, ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দে চীনে টয়লেট পেপার ব্যবহার করার রীতি চালু ছিল। এরপর চতুর্দশ শতকে মিং বংশের শাসনকালে চীনের রাজ প্রাসাদে এই কাগজের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়। ১৩৯৩ সালে শুধুমাত্র রাজ পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য বছরে ৭,২০,০০০ টুকরো টয়লেট পেপার দরকার হত। প্রতিটি টুকরোর মাপ ছিল ৬০ সেমি X ৯০ সেমি।



    প্রাচীন চীনের কাগজ 
    প্রাচীন রোম

    প্রাচীন রোমানরা একটি লাঠিতে একটি স্পঞ্জ ব্যবহার করত, যাকে বলা হয় জাইলোস্পনজিয়াম। এই নরম ডিভাইসটি ব্যবহার শেষে ভিনেগারে ভরা একটি বালতিতে ফেরত দিতে হতো, যেনো পরবর্তী তে অন্য কোনো ব্যক্তি সেটি ব্যবহার করতে পারে।


    প্রাচীন গ্রীক

    প্রাচীন গ্রীকরা মোছার জন্য সিরামিক টুকরো ব্যবহার করত। (বলাই বাহুল্য, সেই পাথর ও ছিদ্রের কারণে ত্বকে জ্বালাপোড়া এবং অর্শ্বরোগ হয়)। এই সিরামিকে তারা নিজেদের শত্রুর নাম লিখে রাখতো।



    সিরামিকে শত্রুর নাম খোদাই করে গ্রীকরা তা ব্যবহার করতো
    এই সিরামিকের টুকরোকে বলা হত পেসসোই। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা গ্রীক সাম্রাজ্যের পাওয়া বিভিন্ন নথি থেকে এটি আবিষ্কার করেছিলেন। এমনকি একবার একটি গুহায় পাওয়া যায় সেই সময়কার মানুষের মল। যা পরীক্ষার পর পেসোইয়ের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।

    সেসময়ে পাবলিক টয়লেটগুলোতে গ্রীকরা পেসসোই রেখে দিত। যেই এই টয়লেট ব্যবহার করবে সেই তার শত্রুর বিরুদ্ধে কিছু করতে পারল বলে ভেবে নিতে পারবে। অর্থাৎ এটিও তাদের এক ধরনের যুদ্ধ বলা যায়। শত্রুর বিরুদ্ধে কিছু করা।



    প্রাচীন গ্রীসের কিছু পেসসোই 
    প্রাচীন জাপান

    অষ্টম শতাব্দীর দিকে জাপানীরা তাদের মলদ্বারের বাইরের এবং অভ্যন্তর পরিষ্কার করার জন্য এক ধরণের কাঠের কাঠি ব্যবহার করত। যেটার নাম ছিল চুগি। এছাড়াও পানি, পাতা, ঘাস, পাথর, পশুর চামড়া এবং ঝিনুক ব্যবহার করত। এটি ছিল প্রাচীনকালের মানুষের কথা। আর মধ্যযুগে মরিসন জাতিরা ব্যবহার করত শ্যাওলা, গাছের ছাল, খড়, এবং কাপড়ের টুকরো।


    লোকেরা এতসব জিনিস ব্যবহার করেছিল যে একজন ফরাসী ঔপন্যাসিক ফ্রান্সোইস রাবেলাইস ষোড়শ শতাব্দীতে এই বিষয়টি নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখেছিলেন। তার কবিতা পশ্চিমা বিশ্বে টয়লেট পেপারের প্রথম উল্লেখ করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন এদের শুধু হাঁসের মাথা ব্যবহার করাই বাদ আছে।

    আধুনিক টয়লেট পেপারের ইতিহাস

    ১৮৫৭ সালে, জোসেফ সি. গেয়েটি টয়লেট পেপারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি কাগজ বিক্রি শুরু করেন। তার পণ্য একটি বাক্সে কাগজের পৃথক শীট দ্বারা গঠিত। তিনি অ্যালোভেরার নির্যাস দিয়ে এটিকে মিশ্রিত করেন এবং তার উপাধির সাথে একটি জলছাপ যুক্ত করেছিলেন।

    ১৮৭১ সালে, শেঠ হুইলার রোল্ড এবং ছিদ্রযুক্ত টয়লেট পেপার পেটেন্ট করেছিলেন।

    ১৮৯০ সালে, স্কট পেপার কোম্পানি একটি রোলে টয়লেট পেপার বিক্রি শুরু করে।

    ১৯৩০ সালে, নর্দার্ন টিস্যু কোম্পানি স্প্লিন্টার-মুক্ত টয়লেট পেপার বিক্রি শুরু করে। এটি সমস্ত ব্যবহারকারীদের জন্য কি একটি স্বস্তিদায়ক বিষয় ছিল!

    ১৯৪২সালে, আরেকটি বিপ্লব ঘটেছিল। ইংল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুস পেপার মিল অ্যান্ড্রেক্স প্রবর্তন করেছিল, প্রথম টু-প্লাই টয়লেট পেপার।


    ১৯৫৪ সালে, নর্দান টিস্যু কোম্পানি প্রথম রঙিন টয়লেট পেপার বিক্রি শুরু করে।

    ১৯৫৫ সালে, স্কট পেপার কোম্পানি প্রথমবারের মতো টিভিতে টয়লেট পেপারের বিজ্ঞাপন দেয়।

    Ezoicপ্রথম দেশব্যাপী টয়লেট পেপার সংকট

    ২০২০ সালের মার্চ মাসে, COVID-19 মহামারী চলাকালীন, একাধিক দেশ টয়লেট পেপার কেনার আতঙ্কের কথা জানিয়েছে, যা এর ঘাটতির কারণ হয়েছিল।

    যাইহোক, এটি প্রথম টয়লেট পেপার সংকট ছিল না।

    ১৯৭৩ সালে প্রথম টয়লেট পেপার এর সংকট দেখা দিয়েছিল।

    ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে তেলের সংকট দেখা দেয়; যা জাপানে গুজব ছড়িয়ে দেয় যে দেশটি টয়লেট পেপার ফুরিয়ে যাচ্ছে।
    জাপানি গৃহিণীরা টয়লেট পেপার কেনার উন্মাদনায় সাড়া দিয়েছিল। প্রতিদিন শত শত দোকানের সামনে অপেক্ষা করত যতটা সম্ভব রোল হাতে পাওয়ার জন্য।
    ১৯ শে ডিসেম্বর, ১৯৭৩-এ, জনি কারসন, একজন জনপ্রিয় আমেরিকান কৌতুক অভিনেতা, টয়লেট পেপার ফুরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্য টুনাইট শো-তে রসিকতা করেছিলেন, যা আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল এবং টয়লেট পেপারের প্রকৃত ঘাটতি ছিল।

    কারসন পরে তার রসিকতার জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং আশা প্রকাশ করেছিলেন যে লোকেরা তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসাবে মনে করবে না; যে টয়লেট পেপারের সংকট সৃষ্টি করেছিল।
    টয়লেট পেপার উৎপাদন পরিবেশের উপর একটি বিশাল প্রভাব ফেলে। প্রতিদিন, টয়লেট পেপার তৈরির জন্য পর্যাপ্ত কাঠ সরবরাহ করতে প্রায় ২৭,০০০ এর ও বেশি গাছ কাটা হয়।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 64 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস কোনটি?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

    দ্য টেল অফ গেঞ্জিঃ পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস গল্প উপন্যাস পড়তে আমরা কমবেশি সবাই ভালোবাসি। আমাদের বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা ‘আলালের ঘরের দুলাল’। সেটি ১৮৫৮ সালে লিখেছিলেন তিনি। আজ থেকে প্রায় ১৬৩ বছর আগে! অথচ বিশ্বের প্রথম উপন্যাস লেখা হয়েছিল আজ থেকে ১০১২ বছর আগে জাপানি ভাষায়। আবিস্তারিত পড়ুন

    You are currently viewing দ্য টেল অফ গেঞ্জিঃ পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস

    দ্য টেল অফ গেঞ্জিঃ পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস

    গল্প উপন্যাস পড়তে আমরা কমবেশি সবাই ভালোবাসি। আমাদের বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা ‘আলালের ঘরের দুলাল’। সেটি ১৮৫৮ সালে লিখেছিলেন তিনি। আজ থেকে প্রায় ১৬৩ বছর আগে!
    অথচ বিশ্বের প্রথম উপন্যাস লেখা হয়েছিল আজ থেকে ১০১২ বছর আগে জাপানি ভাষায়। আর সেই উপন্যাস লিখেছিলেন একজন নারী, ভাবা যায়?

    আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে ১০০৭ সালে প্রথম পূর্ণাঙ্গ একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থটিতে চরিত্র ছিল মোট ৩৫০টি আর ছিল অসংখ্য আবেগময় কবিতা। ‘দ্য টেল অফ গেঞ্জি’ নামে এ উপন্যাসটিতে এক রাজপুত্রের ভালোবাসার কাহিনী বিধৃত হয়েছে; এ রাজপুত্র অসংখ্য নারীর সঙ্গ পছন্দ করতেন। উপন্যাসটি রচনা করেছিলেন জাপানের নারী ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু। এটিই বিশ্বের প্রথম উপন্যাস।

    মুরাসাকি শিকিবু

    ৯৭৮ (মতান্তরে ৯৭৩) খ্রিষ্টাব্দে জাপানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১০১৪ খ্রিষ্টাব্দে। এক অভিজাত পরিবারে জন্ম। বাবা ছিলেন হেইয়ান সাম্রাজ্যের প্রাদেশিক গভর্নর। পদটি সম্মানজনক হলেও রাজধানীর রাজ-অমাত্যদের মতো সমান মর্যাদার ছিল না। অথচ নবম শতক থেকে তাদের অভিজাত গোষ্ঠীর ফুজিওয়ারারা সম্রাটদের পারিষদ হিসেবে দরবার আলোকিত করেছেন এবং প্রভাব খাটিয়েছেন। ফুজিওয়ারা ললনারা সম্রাজ্ঞী হয়েছেন। দশম শতকের শেষ এবং একাদশ শতকের শুরুতে শুধু ফুজিওয়ারা নো মিচিনাগা তাঁর চার কন্যাকে সম্রাটদের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। এই ফুজিওয়ারা গোষ্ঠীর প্রভাব-প্রতিপত্তি তখন হেইয়ান সাম্রাজ্যে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল। মুরাসাকির জন্মের আগে জাপান বন্ধুহীন এবং বিচ্ছিন্ন এক সাম্রাজ্য ছিল। চীনের তেঙ সম্রাটদের আমলে (সপ্তম থেকে নবম শতক) জাপান থেকে ২০টি দল চীনে নানা মিশনে যায়। এরা ফিরে এসে জাপানের পুরো সাংস্কৃতিক পরিম-লে পরিবর্তন আনে। এতে চীনা ভাষা এবং সংস্কৃতির সংস্পর্শে গিয়ে জাপানের জাতীয় সংস্কৃতির এক শক্তিশালী উত্থান ঘটে। জাপানিরা ক্রমান্বয়ে কানা ভাষাকে চায়নিজ ভাষার বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ করে তুলতে থাকে। মুরাসাকির সময়ে পুরুষেরা চায়নিজ ভাষায় লিখতেন আর মেয়েরা কানা ভাষায়। দুই ভাষায়ই জাপানি সাহিত্য সমৃদ্ধ হতে থাকে।



    মুরাসাকি শিকিবুর প্রতিকৃতি

    মুরাসাকি সে-সময়কার সৌভাগ্যবতীদের একজন। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে চায়নিজ ক্লাসিক্যাল ভাষা এবং সাহিত্যে শিক্ষা লাভ করেছেন। মুরাসাকি শিকিবুর লেখা ডায়েরি থেকে জানা যায়, তাঁর ছোট ভাইকে এক গৃহশিক্ষক এ-ভাষা শেখাতেন। শুনে-শুনে মুরাসাকি এ-ভাষা শিখে ফেলেন। তাঁর ভাষা শেখার দক্ষতা দেখে তাঁর পিতা বলেছিলেন, তুই যদি আমার ছেলে হতিস, আমার জন্য তা হতো বড় সৌভাগ্যের। মনে করা হয়, তিনি ঐতিহ্যগতভাবে সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীত, লিখনশৈলী এবং চিত্রকলায়ও সমান ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। তবে তাঁর শিক্ষাটা সাধারণ্যে গৃহীতব্য ছিল না। কারণ তাতে প্রচলিত গোঁড়ামির প্রশ্রয় ছিল না।

    মুরাসাকির বর ছিল তাঁর পিতার এক বন্ধু। পিতার প্রায় সমবয়সী। নাম ফুজিওয়ারা নো নোবুতাকা (৯৫০-১০০১ খ্রি.)। একই বংশ। সম্রাটের দরবারে চাকুরে, আমলা। অনুষ্ঠান-উৎসববিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। পোশাক-আশাকে অপচয়কারী। তবে প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পী। তাঁর অনেক বাড়িঘর, আর ছিল অজ্ঞাতসংখ্যক স্ত্রী এবং রক্ষিতা। মুরাসাকির সঙ্গে বিয়ের পরও এ-ভদ্রলোক অন্যদের সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। প্রথা অনুসারে মুরাসাকি পিত্রালয়ে অবস্থান করতেন। স্বামী মাঝেমধ্যে সেখানে মিলিত হতেন। নোবুতাকা একাধিক প্রদেশের গভর্নর ছিলেন এবং বিপুল সম্পদের অধিকারী হন। তাদের এক কন্যা কেনসি (কাতাইকো) ৯৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করে। এর দুবছর পর নোবুতাকা কলেরায় মারা যান।

    স্বামীর মৃত্যুতে মুরাসাকি ভেঙে পড়েন। তিনি তাঁর ডায়েরিতে সে-সময়কার অনুভূতির কথা বর্ণনা করেছেন এভাবে – ‘আমি মানসিক চাপের মধ্যে বিষাদগ্রস্ত হয়ে গেলাম। দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং সিদ্ধান্তহীনতা পেয়ে বসল আমাকে। কয়েক বছর এতটাই উদাসীন হয়ে রইলাম যে, সময় আর পোশাক-পরিচ্ছদের কোনোই ঠিক-ঠিকানা রইল না। আমার অশেষ নিঃসঙ্গতা এক সময় খুবই অসহ্য হয়ে উঠল। মুরাসাকি শিকিবু স্বামীর মৃত্যুর পর ইম্পেরিয়াল লেডি-ইন-ওয়েটিং হিসেবে সম্রাটের অমত্মঃপুরে প্রবেশ করেন। তাঁকে জাপানের রানি ‘লেডি-ইন ওয়েটিং’ করবার জন্য অনুমোদন করেছিলেন। রানি আকিকো তাঁর এই বিদ্যানুরাগের খবর পেয়েছিলেন হয়তো।


    উপন্যাসের প্লট

    তিনি রাজদরবারে গিয়ে ওখানে থাকতে শুরু করেন। তারপর ভালোমতো এই রাজদরবারের ইতিহাস নিয়ে খোঁজখবর করেন। এছাড়া প্রতিদিন সেখানে কী ঘটছে তার একটা ডায়েরিও রাখতেন। যে ডায়েরি আজো আছে। সেই গোপন জগতের সব ঘটনা যা দেখেছেন, যা শুনেছেন সব লিখে রাখেন। ঠিক সেইসময় তিনি একটি উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। এইভাবে লিখতে লিখতে চুয়ান্ন পর্ব লেখা হয়ে যায়। আর এটিই পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস।


    উপন্যাসের কাহিনি খুব সংক্ষেপে এরকমঃ-

    সম্রাট কিরিতসুবোর দ্বিতীয় সন্তান গেঞ্জি। তিন বছর বয়সে গেঞ্জির মাতৃবিয়োগ ঘটে। উপপত্নীর সন্তান হলেও সম্রাট তাকে খুব পছন্দ করতেন। সম্রাট তাঁর সন্তানের মায়ের কথা ভুলতে পারেন না। সম্রাট এমন এক রমণীর কথা শুনলেন, যে কিনা দেখতে তাঁর পরলোকগত উপপত্নী, গেঞ্জির মায়ের মতো। এই মহিলার নাম ফুজিতসুবো। তিনি পূর্ববর্তী এক সম্রাটের কন্যা। সম্রাট তাঁকে বিয়ে করলেন। গেঞ্জি এ-মহিলাকে মান্য করে। তাঁর কাছে লালিত-পালিত হয়। যৌবনে উপনীত হয় গেঞ্জি। অত্যন্ত সুদর্শন, ‘হিকারো’ বা সাইনিং গেঞ্জি। তবে রাজনৈতিক কারণে অবনমিত মর্যাদায় নিম্ন পর্যায়ের রাজকর্মচারী হিসেবে তাকে কর্মজীবন শুরু করতে হয়। এ সময় হিকারো গেঞ্জি তাঁর সৎমা ফুজিতসুবোর প্রেমে পড়ে যায়। তাদের মধ্যে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তার আগে নো অয়ী নামের এক যুবতীর সঙ্গে বিয়ে হয় গেঞ্জির। সৎমায়ের সঙ্গে সম্পর্কের কথা জেনে গেলে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। গেঞ্জির সঙ্গে ফুজিতসুবোর অবৈধ সম্পর্কের কথা প্রকাশ পেয়ে গেলে গেঞ্জি খুব হতাশ হয়ে পড়ে। স্ত্রীর সঙ্গেও সম্পর্ক খারাপ। তখন সে অনেক নারীর সঙ্গে অতৃপ্ত ও অসম্পূর্ণ প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাকে অবজ্ঞা ও বোকামির শিকার হতে হয়। কেউ-কেউ তাকে হতাশ করে অসময়ে মারাও যায়। একবার সে দেখতে পায় এক সুন্দরী মহিলা তার জানালায় দাঁড়িয়ে আছে। গেঞ্জি অনুমতি ছাড়াই তার কক্ষে প্রবেশ করে। মহিলাকে বিছানায় যেতে বাধ্য করে। ক্ষমতাধর ব্যক্তি বলে মহিলা গেঞ্জিকে বাধা দেয় না।

    আরেকবার গেঞ্জি উত্তর পল্লির কিতাইয়ামা পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণে যায়। কিতাইয়ামা কিয়োটোতে অবস্থিত। সেখানে সে দশ বছর বয়সী এক মেয়েকে দেখতে পায়। মেয়েটি দেখতে ঠিক ফুজিতসুবোর মতো। সে এ-বালিকাকে অপহরণ করে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসে এবং ফুজিতসুবোর মতো তাকে শিক্ষিত ও মার্জিতভাবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়। মেয়েটির নাম মুরাসাকি। এ-সময় গেঞ্জি গোপনে সম্রাজ্ঞী ফুজিতসুবোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তাতে সম্রাজ্ঞী সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে এই ছেলের নাম রাখা হয় রেইঝেই। এরা দুজন ছাড়া সবাই জানে এই ছেলের পিতা সম্রাট কিরিতসুবো। পরে এই ছেলে ক্রাউনপ্রিন্স এবং লেডি ফুজিতসুবো সম্রাজ্ঞী হন। গেঞ্জি এবং ফুজিতসুবো প্রতিজ্ঞা করে যে, এরা এ গোপন তথ্য কখনো ফাঁস করবে না। সবকিছু গোপন রাখবে।
    এ গোপনীয়তার মধ্যে গেঞ্জি এবং তার স্ত্রী অয়ীর সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। তার স্ত্রী একটি সন্তান জন্ম দেয়। তবে সন্তানটি মারা যায়। গেঞ্জি দুঃখ পেয়ে আবার হতাশ হয়ে পড়ে। দুঃখ ভুলে যাওয়ার জন্য গেঞ্জি এবার মুরাসাকিকে কাছে পায়। তাকে নিয়ে ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে ওঠে এবং এক সময় তাকে বিয়ে করে।

    গেঞ্জির পিতা সম্রাট কিরিতসুবো এ-সময় মারা যান। তার বড় ছেলে সুজেকো সম্রাট হন। সম্রাটের মাতা কোকিডেন কিরিতসুবোর রাজনৈতিক শত্রম্নদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পুত্রের ক্ষমতা সংহত করেন।

    গেঞ্জি রাজদ–র ব্যাপারে মোটেও উৎসাহী নয়। এ-সময় তার আরেকটি গোপন প্রেমের তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। সম্রাট সুজেকো গেঞ্জির সঙ্গে তার এক রক্ষিতার মিলনদৃশ্য দেখে ফেলেন। সম্রাটের এই গোপন রক্ষিতার কথা শুধু গেঞ্জি জানত।

    সম্রাট রক্ষিতাকে উপভোগের বিষয়টি শুধু তার ভাই গেঞ্জিকে বলেছিলেন। সম্রাট বিশ্বাসভঙ্গের কারণে গেঞ্জিকে শাস্তিস্বরূপ প্রত্যন্ত হারিমা প্রদেশের সুমা নগরীতে পাঠিয়ে দেন। সুমা নগরীতে আকাশি নভিস নামে পরিচিত এক ভদ্রলোক গেঞ্জিকে আতিথ্য দেন। গেঞ্জি আকাশির এক কন্যার প্রেমে পড়ে যায়। সে-প্রেমের ফসল হিসেবে এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়।


    এদিকে রাজধানীতে সম্রাট সুজেকো তার বাবাকে স্বপ্নে দেখে মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হন। তার হৃদয় ভেঙে যায়। মা কোকিডেন অসুস্থ। তার সিংহাসন ধরে রাখার ক্ষমতা নেই। এই মানসিক অবস্থায় সম্রাট গেঞ্জিকে ক্ষমা করে দেন। গেঞ্জি রাজধানী কিয়োটোতে প্রত্যাবর্তন করে। এ পর্যায়ে সম্রাটের ভ্রাতা রেইঝেই সম্রাট হন। গেঞ্জি রাজকর্মচারীর কাজে ইস্তফা দেয়। এক সময় নতুন সম্রাট জানতে পারেন যে, গেঞ্জিই তার আসল পিতা। সম্রাট পিতার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে গেঞ্জিকে সর্বোচ্চ রাজপদ প্রদান করেন।

    বয়সের কারণে গেঞ্জির স্বাস্থ্যের অবনতি হতে শুরু করে। দুর্বল স্বাস্থ্যের জন্য রাজকীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না হলেও গেঞ্জির প্রেম ও আবেগময় জীবনে ধীরে-ধীরে অধঃপতন নেমে আসে। সে আরেকটি বিয়ে করে। তাকে ‘ওন্যা সান নো মিয়া’ অর্থাৎ থার্ড প্রিন্সেস বা তৃতীয় রাজকুমারী বলা হয় (এ-নামে জাপানের কানসাইতে একটি শহর রয়েছে)। এই রাজকুমারীর সঙ্গে গেঞ্জির ভাইপোর প্রেম এবং দৈহিক সম্পর্ক তৈরি হয়। তাতে জন্ম হয় প্রিন্স কাওরোর। সবাই জানে কাওরো গেঞ্জির সন্তান, আসলে তা নয়।

    বৃদ্ধ বয়সে গেঞ্জির বিয়ে মুরাসাকির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটায়। মুরাসাকি ‘বিকুনি’র (সন্ন্যাসিনী) জীবন বেছে নেন। সন্ন্যাসিনী অবস্থায় মুরাসাকি মারা যান। এ মৃত্যু গেঞ্জিকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। জীবনের কি তা হলে এই পরিণতি? মৃত্যুচিন্তা তাকে পেয়ে বসে। গেঞ্জি এক সময় মারা যায়।

    উপন্যাসটি এখানে শেষ হতে পারত। কিন্তু তা বাড়ানো হয়েছে গেঞ্জির পরবর্তী আরো দুই প্রজন্ম পর্যন্ত। উপন্যাসের ৪৫ থেকে ৫৪ অধ্যায় পর্যন্ত তার ব্যাপ্তি। এ অধ্যায়গুলোকে বলা হয় ‘টেন উজি চ্যাপ্টার’। উজির পটভূমিতে এ অধ্যায়গুলো রচিত বলে এরকম নাম। এ অধ্যায়গুলোও প্রেম আর বিরহের।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 64 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
ashad khandaker
ashad khandakerসবজান্তা
সময়ঃ 3 বছর আগেক্যাটাগরিঃ ইতিহাস

কোন প্রথা টিকিয়ে রাখতে পবিত্র বাইবেল পরিবর্তন করা হয়েছিল ?

  1. ashad khandaker
    ashad khandaker সবজান্তা
    উত্তর দিয়েছেন 3 বছর আগে

      দ্য স্লেভ বাইবেল, বা ক্রীতদাস বাইবেল হচ্ছে খ্রীস্টানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের আমেরিকান ক্রীতদাসদের জন্য তৈরিকৃত বাইবেল এর এক নতুন সংস্করণ। মূল বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট ও নিউ টেস্টামেন্ট মিলিয়ে চ্যপ্টার ছিল ১১৮৯ টি, আর স্লেভ বাইবেল এ তার সংখ্যা মাত্র ২৩২ টি। মূল বাইবেল এর একটি বৃহৎ অংশই বাদ দেওবিস্তারিত পড়ুন

    You are currently viewing ক্রীতদাস বাইবেল: দাসপ্রথা টিকিয়ে রাখতে পবিত্র বাইবেল পরিবর্তন করা হয়েছিল

     

    দ্য স্লেভ বাইবেল, বা ক্রীতদাস বাইবেল হচ্ছে খ্রীস্টানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের আমেরিকান ক্রীতদাসদের জন্য তৈরিকৃত বাইবেল এর এক নতুন সংস্করণ। মূল বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট ও নিউ টেস্টামেন্ট মিলিয়ে চ্যপ্টার ছিল ১১৮৯ টি, আর স্লেভ বাইবেল এ তার সংখ্যা মাত্র ২৩২ টি।

    মূল বাইবেল এর একটি বৃহৎ অংশই বাদ দেওয়া হয়েছিল স্লেভ বাইবেল বা কৃতদাসের বাইবেলে। বিশেষ করে এমন সকল অধ্যায় বা কাহিনী বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা কৃতদাসদের তাদের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে। আর এই কাটছাঁট করা নতুন সংস্করণের এই বাইবেল দিয়েই দীর্ঘ ২০০ বছরের অধিক সময় ধরে কৃতদাসদের ক্রীস্টধর্মে দীক্ষা দেওয়া হতো।

    ওল্ড টেস্টামেন্টের ৫০ ভাগ, এবং ওল্ড টেস্টামেন্টের ৯০ ভাগই এই ‘স্লেভ বাইবেল’ থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল। বিশেষ করে স্বাধীনতা এবং মুক্তি সংক্রান্ত বিষয়গুলো। বাদ গিয়েছিল বুক অব এক্সোডাসেরও অনেক অংশ।
    ~ ডেভিড এন্থোনি স্মিথ

    আমেরিকায় কৃষ্ণরা

    কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার করার পর। দলে দলে ইউরোপের শেতাঙ্গরা সেখানে গিয়ে নিজেদের উপনিবেশ গড়ে তোলে। নতুন নতুন উপনিবেশ তৈরির সময় তারা দেখল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলের মাটি তুলোর চাষের পক্ষে খুব উৎকৃষ্ট।

    এই তুলোর চাষের অঞ্চলে প্রয়োজন পড়লো অতি অল্প খরচে অধিক শ্রমদানকারী অসংখ্য মানুষের, যারা চিরদিনের মতো কেনা গোলাম হয়ে দৈহিক নিপীড়নের ভয়ে বিনা পারিশ্রমিকে আমৃত্যু শ্রমদান করবে। আর তাই এই ধরনের শ্রমিক শিকার করা হলো আফ্রিকার দুর্বল অসহায় কালো মানুষদের গ্রামকে গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে, আর ওদের খাঁচায় পুরে শেকলে বেঁধে নিজেদের দেশ ও সমাজ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসা হলো কামান আর বন্দুকের ভয় দেখিয়ে সমুদ্রের পরপারে আমেরিকায়।

    আর হয়ে গেলো ওরা আজন্ম ক্রীতদাস। ওদের সন্তান-সন্তুতিদের নিয়ে, আর যারা ওদের শিকার করেছিলো সেসব ক্রীতদাস-ব্যবসায়ীরা ওদের বেচতে লাগলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলের ওই সব শ্বেতাঙ্গ তুলো-চাষীদের কাছে। যে-সব শ্বেতাঙ্গ ওদের কিনতো, তারা ওদের মৃত্যু ঘটালেও আইনের চোখে অপরাধী হোতো না, কেননা ওরা আইনের বলে সর্বপ্রকার মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এক ধরনের পণ্যসামগ্রী।

    সে সময়টায় যেহেতু খ্রীস্ট ধর্মের প্রচার চলছিলো তাই এই শ্বেতাঙ্গ মালিকরা তাদের কৃষ্ণাঙ্গ দাসদেরকেও খ্রীস্ট ধর্মে দীক্ষিত করার সিদ্ধান্ত নিলো। তৎকালীন সময়ের আমেরিকায়  ‘সোসাইটি ফর দি কনভার্সন এন্ড রিলিজিয়াস ইন্সট্রাকশন অব নিগ্রো স্লেভস ইন দ্য ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ নামে একটি ব্রিটিশ মিশনারী সংস্থা ছিল। আর তারাই এই সদ্য খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করা কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য এই নতুন ধরনের বাইবেল তৈরি করেছিলেন।

    যেসব অংশ বাদ দেওয়া হয়েছিলো

    ১. ঐশ্বরিক নেতৃত্বে স্বাধীনতা

    “আর প্রভু বললেন, আমি অবশ্যই মিশরে থাকা আমার লোকদের দুর্দশা দেখেছি, এবং তাদের কার্যকর্তাদের কারণে তাদের কান্না শুনেছি;  কারণ আমি তাদের দুঃখ জানি;  এবং আমি তাদের মিশরীয়দের হাত থেকে উদ্ধার করতে নেমে এসেছি, এবং তাদের সেই দেশ থেকে বের করে একটি ভাল দেশে এবং একটি বিশাল দেশে, দুধ ও মধু প্রবাহিত দেশে নিয়ে যেতে…” (এক্সোডাস ৩:৭-৮)

    এক্সোডাসের এই অংশটিতে মূলত মিশরে ইসরায়েলাইটদের অবরুদ্ধ দশা এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুত ভূমিতে তাদের মুক্তির কথা বলা আছে। ক্রীতদাস প্রথার শিকার হওয়া আফ্রিকানরা যে বাইবেলের এই অংশটির প্রতি আকৃষ্ট হতেন, তার ঐতিহাসিক কারণ ছিল। কারণ এই ইজরায়েলাইটদের সঙ্গে তারা নিজেদের অনেক মিল দেখতে পেতেন।

    কারণ তারাও তো অন্য একটি দেশে বন্দী অবস্থায় ছিলেন। তারাও মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন। তারা ভাবতেন, আমরা যদি ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস রাখি, আমরাও একদিন মুক্তি পাব। ঈশ্বর আমাদের মুক্তি দেবেন। কাজেই এই কাহিনী তাদের নিজেদের কাহিনির সঙ্গে খুবই মিলে যায়। দাস প্রথার শিকার এই আফ্রিকানদের মধ্য থেকে যে আধ্যাত্মিক নেতারা তৈরি হবেন, তাদের অনেকেই কিন্তু এ থেকে অনুপ্রেরণা নেবেন।

    ২. দ্য স্টোরি অব জোসেফ

    এর পরের অনুপ্রেরণা গল্পটি জোসেফ এর (ইসলাম ধর্মে তাকে ডাকা হয় ইউসুফ নবী নামে)। জোসেফ এর এই গল্প জেনেসিস ৩৭ থেকে ৫০ পর্যন্ত। যেখানে রয়েছে পারিবারিক প্রতারণা, বিভিন্ন পরীক্ষা ও সবশেষে চূড়ান্ত বিজয়।

    জোসেফ কে তার ভাইরা হিংসে করে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। সেই ক্রীতদাস থেকে জোসেফ একসময় হয়ে উঠেন মিশরের ফেরাউন এর পর দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি।

     

    “এটা সত্যি য়ে তোমরা আমার প্রতি অনিষ্ট করার পরিকল্পনা করেছিলে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরই আমার জন্য ভাল কিছু পরিকল্পনা করছিলেন| ঈশ্বরের আমার মাধ্যমে অনেকের প্রাণ বাঁচানোর পরিকল্পনা ছিল|” (জেনেসিস ৫০:২০)

    এই গল্পটি কৃতদাসদের মধ্যে আশার আলোর সঞ্চালন করতে পারে ভেবে কৃতদাস বাইবেলে এই গল্পের পুরোটাই বাদ দেওয়া হয়।

    ৩. হামুরাবির কোড

    বাইবেল এর ওল্ড টেস্টামেন্টে হামুরাবির কোডেরও উল্লেখ আছে। হামুবারি কোড হচ্ছে প্রাচীন ব্যাবিলনের প্রাচীনতম আইন এর মধ্যে একটি। এই আইনের একটি অংশ বাইবেল এর মধ্যেও ছিল। এই আইন ধারা সেসময় সমাজে ন্যায়বিচার করা হতো ধনী, গরীর কিংবা দাস নির্বিশেষে।

    “কোন ব্যাক্তি যখন অন্য আরেকজনের নামে কোন অভিযোগ করবে তখন অভিযুক্তকে নদীর পানিতে ঝাপিয়ে পরতে হবে, যদি অভিযুক্ত ব্যাক্তি ডুবে যায়, তাহলে প্রমানিত হবে যে সে আসলেই দোষী এবং তখন আভিযোগকারি আভিযুক্তের ঘর বাড়ি সব পেয়ে যাবে। আর যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন ধরনের আঘাত ছাড়াই নদীর পানি থেকে সাতরে তীর চলে আসতে পারে তাহলে প্রমানীত হবে যে সে আসলে নির্দোষ। এক্ষেত্রে মিথ্যা অভিযোগ আনার কারণে অভিযোগকারীর মৃত্যুদণ্ড হবে।”  (হাম্মুরাবির কোড, আইন 2)

    আইনের এই অংশটি দাসদের নাগরিক অধিকার এবং ন্যায়বিচারের ধারণা দিতে পারে। এমনকি সম্ভাব্য ভিন্নমত এবং অস্থিরতার বীজ বপন করতে পারে। আর তাই এই অংশটিও ক্রীতদাস বাইবেল থেকে বাদ দেওয়া হয়।

    ৪. সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য ঈশ্বরের দূত বা নবীদের বিচার

    বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে, আমোস, ইশাইয়া এবং জেরেমিয়ার মতো নবীরা সামাজিক ন্যায়বিচারের অটল ছিলেন। তারা বারবার সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে।

    “কিন্তু ন্যায়বিচার জলের মতো গড়িয়ে পড়ুক, এবং ন্যায়পরায়ণতা অবিরাম প্রবাহিত স্রোতের মতো।”  (আমোস 5:24)

    আমোসের এই শক্তিশালী উদ্ধৃতি এবং অন্যান্য নবীদের অনুরূপ শিক্ষাগুলি বিদ্রোহের জন্য অনুঘটক হিসাবে কাজ করতে পারে। আর তাই এই অংশগুলোকে বাদ দিয়ে ক্রীতদাসেরর বাইবেল সংকলকেরা ক্রীতদাসদের সামাজিক নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করার কোনও চিন্তাভাবনাকে প্রশমিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

    ৫. ড্যানিয়েলের গল্প

    ক্রীতদাসের বাইবেল থেকে আরো একটি শক্তিশালী ও অনুপ্রেরণা গল্প বাদ দেওয়া হয়েছিল। সেটি প্রোফেট ড্যানিয়েল এর গল্প। প্রোফেট ড্যানিয়েল ছিলেন, ব্যাবিলনের রাজার দরবারে সেবারত একজন ইহুদি, ঈশ্বরের প্রতি তার বিশ্বাস বজায় রাখতে রাজার প্রতি প্রার্থনা করার আদেশ তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আর সেই অপরাদে রাজা তাকে একটি সিংহের খাঁচায় নিক্ষেপ করেন, আর সেখান থেকে দানিয়েল সুস্থভাবে বেরিয়ে আসেন।

    “আমার ঈশ্বর তাঁর দূতকে পাঠিয়েছেন, এবং তিনি সিংহদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন।  তারা আমাকে আঘাত করেনি, কারণ আমি তার দৃষ্টিতে নির্দোষ পেয়েছি।  আমি আপনার আগে কোন অন্যায় করিনি, মহারাজ।”  (ড্যানিয়েল 6:22)

    এই ঘটনাকে গুলো ক্রীতদাসদের মনে আশার আলো ও বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি করতে পারে তাই এই গল্পগুলোও স্লেভ বাইবেল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

    ১৮ শতকের মাঝামাঝিতে ক্রীতদাস প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়। এর আগে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী খ্রিস্টান মিশনারী ও বুর্জোয়া শ্রেণীর মানুষেরা এই নতুন সংস্করণের বাইবেল কে নিপীড়ন এর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।

    সংক্ষেপে দেখুন
      • 0
    • শেয়ার করুন
      শেয়ার করুন
      • শেয়ার করুন Facebook
      • শেয়ার করুন Twitter
      • শেয়ার করুন LinkedIn
      • শেয়ার করুন WhatsApp
  • 0
  • 1 টি উত্তর
  • 63 বার প্রদর্শিত
  • 0 জন ফলোয়ার
উত্তর দিন
আরও প্রশ্ন লোড করুন

Sidebar

লগ ইন করুন
  • জনপ্রিয়
  • উত্তর
  • Mithun

    নির্মাণকাজে মরুভূমির বালু কেন ব্যবহার করা হয়না?

    • 12 টি উত্তর
  • Hina Khan

    Is Telegram MOD APK safe to use? What are the ...

    • 9 টি উত্তর
  • shanto

    ড্রাইভিং লাইসেন্স অনলাইন আবেদন, লাইসেন্সের অনলাইন কপি ডাউনলোড, লাইসেন্স হয়েছে ...

    • 8 টি উত্তর
  • Admin

    নতুন ক্যাটাগরি "SEO" যুক্ত হলো আড্ডাবাজে!

    • 7 টি উত্তর
  • Mahmudul

    একটি ঘোর লাগানো ছবি দেখাতে পারবেন কি?

    • 6 টি উত্তর
  • jahanur
    jahanur একটি উত্তর দিয়েছেন You can definitely use Instagram downloaders on both your phone… জুলাই 26, 2026, সময়ঃ 1:11 অপরাহ্ন
  • ঝুমুর হাসান
    ঝুমুর হাসান একটি উত্তর দিয়েছেন কাকরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janta Party) কাকরোচ জনতা পার্টি (CJP)… জুলাই 22, 2026, সময়ঃ 12:58 অপরাহ্ন
  • Fist Name
    Fist Name একটি উত্তর দিয়েছেন https://jojoji.com এই লিংক থেকে পোস্ট বা প্রশ্ন উত্তর করে সহজেই… জুলাই 13, 2026, সময়ঃ 1:50 পূর্বাহ্ন
  • mar7w7
    mar7w7 একটি উত্তর দিয়েছেন great post! জুন 15, 2026, সময়ঃ 2:56 পূর্বাহ্ন
  • M Sarah
    M Sarah একটি উত্তর দিয়েছেন তাফসীরুল কুরআনিল আযীম বা তাফসীরে ইবনে কাসীর ইসলামী বিশ্বের অন্যতম… জুন 10, 2026, সময়ঃ 9:18 পূর্বাহ্ন

জনপ্রিয় গ্রুপ

  • মুভি ম্যানিয়া 🤘 Movie Mania

    মুভি ম্যানিয়া 🤘 Movie Mania

    • 4 ইউজার
    • 1 পোস্ট
    • 109 বার প্রদর্শিত
  • Earn Money

    • 3 ইউজার
    • 0 পোস্ট
    • 159 বার প্রদর্শিত
  • Knowledge World

    Knowledge World

    • 3 ইউজার
    • 2 পোস্ট
    • 119 বার প্রদর্শিত
  • CT Game Review

    CT Game Review

    • 3 ইউজার
    • 1 পোস্ট
    • 1,149 বার প্রদর্শিত
  • Crazy Time Fun

    Crazy Time Fun

    • 2 ইউজার
    • 0 পোস্ট
    • 81 বার প্রদর্শিত

চলতি মাসের সেরা ইউজার

SA Samim

SA Samim

  • 13 প্রশ্ন
  • 3 পয়েন্ট
এডিটর
Fist Name

Fist Name

  • 0 প্রশ্ন
  • 2 পয়েন্ট
নতুন
Alice Moto

Alice Moto

  • 0 প্রশ্ন
  • 1 পয়েন্ট
নতুন
john151564

john151564

  • 0 প্রশ্ন
  • 1 পয়েন্ট
নতুন
Saimon1

Saimon1

  • 0 প্রশ্ন
  • 1 পয়েন্ট
নতুন
লগ ইন করুন

Explore

  • হোমপেজ
  • জরুরী প্রশ্ন
  • প্রশ্ন
    • নতুন প্রশ্ন
    • জনপ্রিয় প্রশ্ন
    • সর্বাধিক উত্তরিত
    • অবশ্যই পড়ুন
  • ব্লগ পড়ুন
  • গ্রুপ
  • কমিউনিটি
  • জরিপ
  • ব্যাজ
  • ইউজার
  • বিভাগ
  • সাহায্য
  • টাকা উত্তোলন করুন
  • আড্ডাবাজ অ্যাপ

Footer

AddaBuzz.net

আড্ডাবাজ একটি সামাজিক প্রশ্নোত্তর ইঞ্জিন। যেখানে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে একে অপরের জ্ঞান আদান-প্রদান হয়। প্রশ্ন করুন, উত্তর দিন, জ্ঞান ভাগাভাগি করুন।

Adv 234x60

aalan

আমাদের সম্পর্কিত

  • আমাদের টিম
  • আমাদের লক্ষ্য

লিগ্যাল স্টাফ

  • Privacy Policy
  • Terms and Conditions
  • Data Deletion Instructions

সাহায্য

  • Knowledge Base
  • Contact us

আমাদের ফলো করুন

© 2026 AddaBuzz. All Rights Reserved
With Love by AddaBuzz.net

✕
🔔 নোটিফিকেশন চালু করুন নতুন প্রশ্নোত্তর ও ব্লগ আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন