সাইন আপ করুন
লগিন করুন
রিসেট পাসওয়ার্ড
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? আপনার ইমেইল এড্রেস দিন। ইমেইলের মাধ্যমে আপনি নতুন পাসওয়ার্ড তৈরির লিংক পেয়ে যাবেন।
আপনি কেন মনে করছেন এই প্রশ্নটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই উত্তরটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই ব্যক্তিকে রিপোর্ট করা উচিৎ?
ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবিকে কেনো অভিশপ্ত রত্নপাথর বলা হয়?
রত্নপাথরের প্রতি মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। ইতিহাসে অনেক রত্নই তাদের আঁকার আকৃতি আর সৌন্দর্য দিয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে। তবে কোনো কোনো রত্ন কুখ্যাতি অর্জন করেছে তাদের মালিকদের দুর্ভাগ্যের সঙ্গী হয়ে। সচেতন বা অসচেতন যেভাবেই হোক এসব রত্নকেই দুর্ভাগ্যের কারণ ধরে নিয়েছে বহু মানুষ। ফলে তাদের কপালে জুটেছে অভিশপ্ত পবিস্তারিত পড়ুন
রত্নপাথরের প্রতি মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। ইতিহাসে অনেক রত্নই তাদের আঁকার আকৃতি আর সৌন্দর্য দিয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে। তবে কোনো কোনো রত্ন কুখ্যাতি অর্জন করেছে তাদের মালিকদের দুর্ভাগ্যের সঙ্গী হয়ে। সচেতন বা অসচেতন যেভাবেই হোক এসব রত্নকেই দুর্ভাগ্যের কারণ ধরে নিয়েছে বহু মানুষ। ফলে তাদের কপালে জুটেছে অভিশপ্ত পাথরের তকমা। আমাদের গল্প তেমন পাথরগুলি নিয়েই। তাদের মধ্যে একটি ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের অন্যতম সম্পদ তাদের রাজকীয় গহনা। নানা দেশ থেকে নিয়ে আসা রত্নপাথর এর অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর মধ্যে একটি এই ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি (Black Prince’s Ruby )।
নামে রুবি হলেও এই রত্নটি ভিন্ন ধরনের একটি পাথর, যার নাম স্পিনেল (spinel)। এটি সম্ভবত পৃথিবীর বৃহত্তম অখণ্ড লাল স্পিনেল। ব্রিটিশ রাজ পরিবার ১৬৩৭ সালের দিকে এটি হাত করে। তখনো একে রুবি বলেই মনে করা হতো। ষোড়শ শতাব্দীর দিকে পরীক্ষা নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয় এটি আসলে স্পিনেল জাতীয় পাথর। রুবির সাথে স্পিনেলের বাহ্যিক মিল থাকায় একে রুবি বলে ভ্রম হচ্ছিল। ওজনের হিসেবে প্রায় ১৭০ ক্যারেট আর লম্বায় প্রায় ৫ সেন্টিমিটার এই পাথরের অবস্থান বর্তমানে ব্রিটিশ রাজমুকুটে। অভিশপ্ত রত্নপাথরের তালিকাতেও এটি স্থান দখল করে রেখেছে।

স্পিনেল দেখতে অনেকটাই রুবির মতো
উৎপত্তি
বলা হয় ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি তোলা হয়েছিল বর্তমান তাজিকিস্তানের অন্তর্গত বাদাখশানের কুহ-ই-লাল খনি থেকে। তবে ইতিহাসের পাতায় এর আবির্ভাব চতুর্দশ শতকে। প্রচলিত গল্প মতে তখন কিংডম অফ গ্রানাডার প্রিন্স আবু সাইদের সম্পত্তি ছিল এই রুবি। সমসাময়িক কাস্টিলের শাসক ছিলেন ডন পেদ্রো। কাস্টিল তখন স্পেনের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তির পথে। এ সময় চলমান রিকনকুইস্তার অংশ হিসেবে পেদ্রো নাকি লাগাতার হামলা চালাচ্ছিলেন গ্রানাডার উপর।

মানচিত্রে গ্রানাডা ও কাস্টিল
১৩৬২ সালে কয়েকটি যুদ্ধে ডন পেদ্রোর হাতে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হয় গ্রানাডা। আলোচনার প্রস্তাব দেন আবু সাইদ। পেদ্রো তাকে কাস্টিলে আমন্ত্রণ জানান। মূল্যবান পরিচ্ছদ আর গহনা পরিধান করে প্রিন্স নিজেই পেদ্রোর ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন।
পেদ্রো কিন্তু আলোচনায় মোটেও আগ্রহী ছিলেন না। তার কানে গিয়েছিল আবু সাইদের সঙ্গে থাকা বিশাল একটি রত্নের কথা। এই পাথর দখল করতে তিনি ফাঁদ পেতেছিলেন। গ্রানাডার লোকেদের নাগালে পেয়েই তিনি সৈনিকদের লেলিয়ে দিলেন। আবু সাইদসহ সবার কপালে জুটল তরবারির কোপ। জনশ্রুতি আছে, পেদ্রো নিজের হাতে প্রিন্সকে হত্যা করেন, তার মৃতদেহ থেকে খুলে নেন রুবি। এরপর থেকেই এর গায়ে সেঁটে যায় অভিশপ্ত তকমা। এই গল্পের সত্যাসত্য নিয়ে সন্দেহ থাকলেও এটা সত্যি যে পেদ্রোর কাছেই প্রথম সুনির্দিষ্টভাবে খবর এই পাথরের খবর পাওয়া যায়।
ডন পেদ্রোর দুর্গতি
পেদ্রোর সৎ ভাই, হেনরি অফ ট্রাস্তামারা কাস্টিলের সিংহাসন দাবি করে বসেন। সৈন্যসামন্ত জুটিয়ে পেদ্রোর উপর আক্রমণ করলেন তিনি। বিপন্ন পেদ্রো পালিয়ে গেলেন ফ্রান্সের বোর্দো শহরে। সেখানে তখন ব্রিটিশ রাজপুত্র এডওয়ার্ড অফ উডস্টকের দরবার। পেদ্রো রাজার সহায়তা প্রার্থনা করলেন। তাকে প্রতিশ্রুতি দিলেন এর বিনিময়ে তিনি মূল্যবান রত্ন আর টাকাপয়সা দিয়ে কোষাগার পূর্ণ করে দেবেন।
এডওয়ার্ড ছিলেন জাঁদরেল সেনাপতি। ইতিহাসে তার বীরত্বের অনেক কাহিনী লেখা আছে। মৃত্যুর দেড়শ বছরের পর থেকে লোকমুখে ব্ল্যাক প্রিন্স উপাধি পেয়েছিলেন তিনি। কেন, তা নিয়ে বেশ কয়েকটি মতবাদ চালু রয়েছে।

এডওয়ার্ড দ্য ব্ল্যাক প্রিন্স
একটি গল্প হল যে তিনি সবসময় কালো বর্ম পরিধান করতেন বলে এই নাম। কারো কারো ধারণা তার প্রতীক, যেখানে তিনটি অস্ট্রিচ পাখির পালক ফুটিয়ে তোলা কালো পটভূমিতে, সেখান থেকেই এই উপাধির জন্ম। অনেকে দাবি করেন যুদ্ধবন্দীদের উপর নির্মমতার ফলে তাকে ডাকা হয় ব্ল্যাক প্রিন্স।
যাই হোক না কেন, এডওয়ার্ড সাড়া দিলেন পেদ্রোর অনুরোধে। দলবল নিয়ে চললেন স্পেনে। ১৩৬৭ সালের ৩ এপ্রিল উত্তর স্পেনে ব্যাটল অফ নাজেরা’তে (Najerá) তার হাতে বিধ্বস্ত হলেন হেনরি ও তার মিত্ররা। পেদ্রোকে সিংহাসনে বসিয়ে দিলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টাকাপয়সা দিয়ে পেদ্রো ব্যর্থ হলেন। কারণ হিসেবে দেখালেন খালি রাজকোষ।
এডওয়ার্ড এবার দাবি করে বসলেন পেদ্রোর সাধের রুবি। পেদ্রোর হাতে কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি অনেকটা বাধ্য হয়েই এডওয়ার্ডকে দিয়ে দিলেন তার রত্ন। সেই সাথে ব্রিটিশ রাজ পরিবার বনে গেল রুবির মালিক।
রুবির অভিশাপ কিন্তু পেদ্রোকে ছাড়েনি। এডওয়ার্ড ফিরে যাবার সাথে সাথেই হেনরি আবার মাথাচাড়া দিলেন। তার সাথে লড়াই করতে করতে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন ডন পেদ্রো। সিংহাসন তো গেলই, ব্যাটল অফ নাজেরার মাত্র তিন বছরের মাথায় অনেকটা নিঃস্ব অবস্থায় প্রাণটাও খোয়ালেন তিনি সৎভাইয়ের হাতে।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিশৃঙ্খলা
এডওয়ার্ডের কাছে ছিল বলে রুবির পোশাকি নাম হয়ে যায় ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি। দুর্ভোগ তাকেও ঘিরে ধরে। রোগে ভুগে সিংহাসনে বসার আগেই মাত্র ছেচল্লিশ বছর বয়সে এডওয়ার্ডের মৃত্যু হয়। ফলে তার ছেলে রিচার্ড হয়ে গেলেন ক্রাউন প্রিন্স। তার দখলে চলে এলো বাবার রুবি। পরবর্তীতে দশ বছর বয়সেই দ্বিতীয় রিচার্ড নামে অভিষেক হল তার।
দ্বিতীয় রিচার্ডের ভাগ্যও খুব ভাল ছিল না। তাকে সইতে হচ্ছিল অভিজাতদের বিরোধিতা। এদের অন্যতম জন অফ গন্টের ছেলে হেনরি বলিংব্রুককে তিনি নির্বাসন দিয়েছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর হেনরি দেশে ফিরে এলেন, সাথে আনলেন একদল সেনা। রিচার্ডের উপর বিরক্ত অনেকেই তার সাথে যোগ দেয়। ফলে দ্রুতই হেনরির দল ভারী হয়ে গেল। রিচার্ডকে গদি থেকে টেনে নামিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দিলেন তিনি। বলা হয় সেখানেই অনাহারে মৃত্যু হয় দ্বিতীয় রিচার্ডের।

দ্বিতীয় রিচার্ড
হেনরি বলিংব্রুক সিংহাসনে বসেছিলেন চতুর্থ হেনরি নামে। ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি তার অধিকারে চলে আসে। তিনি পত্তন করেন ল্যাঙ্কাস্ট্রিয়ান রাজবংশের। দীর্ঘ রোগে ভুগে হেনরি মারা গেলে ছেলে পঞ্চম হেনরি অভিষিক্ত হন। তিনি নিজ শিরস্ত্রাণের উপর সংযুক্ত করেন ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি।
এই শিরস্ত্রাণ পরে ১৪১৫ সালের ২৫ অক্টোবর সংঘটিত বিখ্যাত এজিনকোর্টের যুদ্ধে ফরাসীদের বিপক্ষে নেমেছিলেন হেনরি। ময়দানে ফরাসী রাজপুত্র ডিউক অফ অ্যালঁস প্রথম জনের (Duc d’Alençon) মুখোমুখি হলেন ইংল্যান্ডের রাজার। বলা হয় কুঠারের আঘাতে হেনরির শিরস্ত্রাণ প্রায় ভেঙ্গে ফেলেছিলেন তিনি। আরো অনেক ফরাসীও তার উপর আক্রমণ করে। হেনরি বেঁচে গেলেও তার শিরস্ত্রাণ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়। তবে যুদ্ধে জয় পান তিনি।
লড়াই শেষ হলে এক ফরাসী ভাঙ্গা টুকরোগুলি জোগাড় করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যায়। হেনরি ফিরে পায় তার রুবি। পুরষ্কার হিসেবে ফরাসী ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।


ব্যাটল অফ এজিনকোর্টে চতুর্থ হেনরি
টিউডর এবং স্টুয়ার্ট বংশ
ষোড়শ শতাব্দীতে টিউডররা ইংল্যান্ডের রাজক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। প্রথম এলিজাবেথের শাসনামলে স্কটদের রানী মেরিকে ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি উপহার দেন এলিজাবেথ। পরে এই মেরিকেই মাথা পেতে দিতে হয় জল্লাদের খাঁড়ার নিচে। তার ছেলে জেমসের কাছে রক্ষিত ছিল মায়ের রুবি। তিনি ১৬০৩ সালে ইংল্যান্ডের রাজা হলে টিউডর শাসনের সমাপ্তি ঘটে, সূচনা হয় স্টুয়ার্টদের সময়ের।
জেমসের পর ছেলে প্রথম চার্লস হিসেবে ক্ষমতা পেলেন। উত্তরাধিকার হিসেবে তার কাছেই চলে গেল ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি। চার্লসের দুর্ভাগ্যের জন্ম দিয়ে উত্থান হল অলিভার ক্রমওয়েলের। ১৬৪৬ সালে প্রথম ব্রিটিশ গৃহযুদ্ধের অবসানে চার্লসকে গদিচ্যুত করলেন তিনি। এর দুই বছর পর প্রথম চার্লসকে মৃত্যুদণ্ড দেন ক্রমওয়েল।
চার্লসের রত্ন ক্রমওয়েল জব্দ করে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। বিক্রির তালিকায় ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবির নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। তবে অনেকেই দুটি রুবি পাথরের যেকোনো একটি এই রত্ন হতে পারে বলে মত দেন। একটি রুবি বিক্রি হয়েছিল চার পাউন্ডে, আরেকটি পনেরো পাউন্ডে। ১৬৬০ সালে এই কেনাবেচা সম্পন্ন হয়।
ক্রমওয়েলের মৃত্যুর পর রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে চার্লসের ছেলে রাজা হন। দ্বিতীয় চার্লস ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি পুনরায় কিনে নেন। তিনি নিজ মুকুটে এই পাথর স্থাপন করেন। তার শাসনামলে ডাচদের সাথে যুদ্ধে ব্রিটিশ কোষাগারে টান পড়ে। লড়াইয়ের কোনো সুফল পেতেও চার্লস ব্যর্থ হন।
চার্লসের পর ভাই দ্বিতীয় জেমস সিংহাসনে বসলেও মাত্র তিন বছরের মাথায় বাধ্য হন নির্বাসনে চলে যেতে। এরপর অনেক বছর ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবির তেমন কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।
বর্তমান
ব্রিটিশ রাজপরিবারের গহনাসমূহ দর্শনার্থীদের দেখার জন্য রাখা থাকে টাওয়ার অফ লন্ডনে। ১৮৪১ সালে টাওয়ারে আগুন লাগলে পুলিশ ইন্সপেক্টর পিয়ার্সের সাহসিকতায় রক্ষা পায় সমস্ত গহনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বোমাবর্ষণ থেকেও কোনক্রমে রক্ষা পায় টাওয়ার অফ লন্ডন। বর্তমানে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে টাওয়ার অফ লন্ডন। সেখানে গেলেই দেখা মিলবে ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবির।

সংক্ষেপে দেখুনটাওয়ার অফ লন্ডনে রাখা ব্রিটিশ মুকুটের রত্ন
ভালোভাবে খতিয়ে দেখলে ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবির সাথে জড়িত অনেক দুর্ভাগ্যের কাহিনীর যুক্তিপূর্ণ কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। মূলত মানুষের অনিয়ন্ত্রিত লোভ-লালসা থেকেই এসব ঘটনার সূচনা। তবে মানুষের মনে ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি অভিশপ্ত হিসেবেই থেকে গেছে।
সেপ্পুকু বা হারা-কিরি এর ইতিহাস কি?
শত্রুর হাতে ধরা পড়ার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়- এই মানসিকতা বেশ পুরনো। ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে, অনেক ঐতিহ্যবাহী রীতি আছে, যেখানে পরাজিত যোদ্ধারা শত্রুর হাতে বন্দিত্বের অপমান সহ্যের চেয়ে আত্মহত্যাকে হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন। এমনই এক আনুষ্ঠানিক আত্মহত্যা পদ্ধতি হল ‘সেপ্পুকু’ , যা অনেক ক্ষেত্রে ‘হারা-কিরি’বিস্তারিত পড়ুন
শত্রুর হাতে ধরা পড়ার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়- এই মানসিকতা বেশ পুরনো। ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে, অনেক ঐতিহ্যবাহী রীতি আছে, যেখানে পরাজিত যোদ্ধারা শত্রুর হাতে বন্দিত্বের অপমান সহ্যের চেয়ে আত্মহত্যাকে হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন। এমনই এক আনুষ্ঠানিক আত্মহত্যা পদ্ধতি হল ‘সেপ্পুকু’ , যা অনেক ক্ষেত্রে ‘হারা-কিরি’ নামেও পরিচিত।
আত্মহত্যার এই রীতি আনুষ্ঠানিকভাবে সেপ্পুকু হিসেবেই পরিচিত জাপানের অধিবাসীদের কাছে, হারা-কিরি নামটি জাপানের বাইরের মানুষদের কাছেই বেশি প্রচলিত। তবে নাম দুটি ভিন্ন হলেও অর্থ একই। সেপ্পুকু বা হারা-কিরি অর্থ হল পেট কেটে ফেলা। হ্যাঁ, এই রীতিতে নিজেই নিজের পেট কেটে মৃত্যুবরণ করে আত্মহত্যাকারী।
সেপ্পুকুতে পেট কাটার বিভিন্ন ধরন
স্বেচ্ছামৃত্যুর এই রীতির উৎস জাপান। জাপানের সামুরাই গোষ্ঠীর নাম শোনেনি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। জাপানিজ যোদ্ধাদের বলা হতো ‘সামুরাই’। সামুরাই নামটি অভিজাত যোদ্ধাদের চিহ্নিত করার জন্য মূলত ব্যবহৃত হতো শুরুতে। তবে ১২ শতাব্দীতে জাপানের ক্ষমতায় উত্থিত হওয়া যোদ্ধা গোষ্ঠীর সকলের জন্যই এই নামটি ব্যবহৃত হয়। এই সামুরাই গোষ্ঠীতেই মর্যাদাসূচক জীবনদানের এই পদ্ধতির প্রচলন হয়।
কেন পেট কেটেই মারা যাওয়ার এই রীতি? প্রাচীন জাপানে ধারণা করা হতো, মানুষের আত্মার বাস হল পেটে। তাই পেট সম্পূর্ণ চিরে মৃত্যুটাকে ধরা হতো মারা যাওয়ার সবচেয়ে অকপট ও সাহসী উপায়। আর তাই এই বিশেষ অধিকার কেবল অভিজাত সামুরাই গোত্রেরই ছিল। সাধারণ জনগণ স্বেচ্ছায় মৃত্যু বেছে নিলে ফাঁসিতে ঝুলে বা পানিতে ডুবে মারা যেতে পারত, সামুরাই গোত্রের মেয়েরা নিজের গলা কেটে মৃত্যুবরণ করতে পারত, সেই পদ্ধতিকে বলা হত ‘জিগাই (Jigai)’, কিন্তু সেপ্পুকু পালনের অধিকার ও মর্যাদা একমাত্র সামুরাই পুরুষ যোদ্ধাদের জন্যই সংরক্ষিত ছিল। একমাত্র সেপ্পুকু পালনের মাধ্যমেই একজন সামুরাই যোদ্ধা তার এবং পরিবারের সম্মান বাঁচাতে বা বজায় রাখতে পারতেন বলে মনে করা হতো। পরাজিত বা অসম্মানিত সামুরাই, যে আত্মহত্যার বদলে আত্মসমর্পণ বেছে নিত, সে সমাজের কাছে তিরস্কারের পাত্রে পরিণত হতো।
সেপ্পুকু রীতি
হারা-কিরির প্রথম নজির দেখা গিয়েছিল ১১৮০ সালে, ‘ইউজি (Uji)’র যুদ্ধের পর। প্রথম হারা-কিরি কার্যকর করেন মিনামোটো নো ইয়োরিমাশা। তিনি শত্রুর হাতে ধরা পড়ে নির্যাতনের স্বীকার হয়ে মূল্যবান তথ্য দেয়ার চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নেন। এর আগপর্যন্ত সামুরাইদের মধ্যে এই ধারণা অত প্রচলিত ছিল না। কিন্তু এর পর থেকেই প্রাণত্যাগের এই নিয়মের প্রতি এক অসুস্থ জনপ্রিয়তা দেখা যায়। এমন পদ্ধতি আমাদের কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু মান-সম্মানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া জাপানের ঐতিহ্যে এটি খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
মিনামোটো নো ইয়োরিমাশার প্রতিকৃতি
মোটামুটি ১২ শতাব্দীর দিকে সেপ্পুকু বেশ বড় পরিসরে পরিচিতি পায়। কিন্তু ১৭ শতাব্দী পর্যন্ত এই রীতি বেশ অগোছালোভাবেই পালিত হত। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম মেনে করা হতো না, মৃত্যুর প্রক্রিয়াও মানুষভেদে বিভিন্ন ছিল। সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি ছিল ‘ট্যানটো’ নামে ছোট একধরনের ধারালো ছুরি ব্যবহার করে লম্বালম্বিভাবে পেট চিরে ফেলা, আর সবচেয়ে কম প্রচলিত পদ্ধতি ছিল যেকোনো ছুরিকে এক জায়গায় বসিয়ে তার উপর পতিত হওয়া। এই অসামঞ্জস্যের আমূল পরিবর্তন আসে ‘এডো’ পিরিয়ডে (প্রায় ১৬০৩ থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত)। অর্থাৎ যেসময় তোকুগাওয়া শোগুনেট আর তাদের অধীনস্ত প্রায় ৩০০ ‘দাইমিয়ো’দের রাজত্ব ছিল জাপানিজ সমাজে।
সেপ্পুকুতে ব্যবহৃত একটি ট্যানটো
এই সময়ে এসে সমাজের উপর স্তরের বাসিন্দারা বিভিন্ন জটিল ধাপ সংযোজনের মাধ্যমে সেপ্পুকুকে বেশ কঠোর একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করে। প্রথম সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে সেপ্পুকু কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, সে জায়গা নিয়ে। সাধারণত সেপ্পুকু পালন করার কথা যুদ্ধক্ষেত্রে, যখন যুদ্ধ জেতার সকল আশা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এডো পিরিয়ডে এই ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মহত্যার পরিবর্তে পরাজিত যোদ্ধাকে পরে বিশাল জনসমাগমে সেপ্পুকু পালন করতে হতো। এই ধরনের সেপ্পুকু ছিল বাধ্যতামূলক। অসম্মান থেকে পরাজিত সামুরাই যোদ্ধাকে বাঁচাতে মুখ্য শাস্তি হিসেবে এটি পালন করা হতো। বেশ আয়োজন করেই পালিত হতো এই রীতি। প্রথমে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় সাদা কুশন বিছানো হতো। পরাজিত যোদ্ধাকে ধবধবে সাদা একটি কিমোনো (জাপানের ঐতিহ্যবাহী পোশাক) পরে কুশনের উপর হাঁটু গেড়ে বসতে হতো। তাকে তার প্রিয় খাবার দেয়া হতো শেষ খাবার হিসেবে। পাশে ‘ট্যানটো’ অর্থাৎ পেট চেরার জন্য ছুরিটি নিয়ে শান্তভাবে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে যোদ্ধা লিখত ‘মৃত্যু-কবিতা’, যা তার শেষ কথা ও সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হতো। এর পূর্বেই যোদ্ধা একজন ‘কাইশাকুনিন’ বা সাহায্যকারী বেছে নিতেন, যে তার পেছনে বামদিকে তলোয়ার নিয়ে প্রস্তুত থাকত। ট্যানটো দিয়ে পেট কাটার সাথে সাথেই কাইশাকুনিন মাথার পেছন দিকে তলোয়ারের আঘাতের মাধ্যমে যোদ্ধার মৃত্যু নিশ্চিত করত।
কাইশাকুনিনকে হতে হত বেশ দক্ষ তলোয়ারবাজ, কেননা তাকে মাথাটা এমনভাবে কাটতে হতো যেন সম্পূর্ণ মাথা ধড় থেকে আলাদা না হয়ে পড়ে। কিছুটা মাংস ধড়ের সাথে যুক্ত থেকে এমনভাবে মাথার অবস্থান নিশ্চিত করতে হতো যেন দেখে মনে হয় পরাজিত ঐ যোদ্ধা সামনের দিকে মাথা নত করে আছে। ১৮০০ সালের দিকে পুরো সেপ্পুকু পদ্ধতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে চলে আসে কাইশাকুনিন। যদিও নিয়ম ছিল, প্রথমে যোদ্ধা পেট কাটবে এবং এর নির্দিষ্ট সময় পর কাইশাকুনিন তার মাথার পেছনে আঘাত করবে, কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যেত, পেটে আঘাতের সাথে সাথেই মাথায় আঘাত হয়ে গেছে। যত সময় যেতে লাগল, দেখা গেল যে যোদ্ধা তার পেটে ছুরি বসানোর আগেই কাইশাকুনিন মাথায় আঘাত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দিচ্ছে।
শিল্পীর তুলিতে কাইশাকুনিনের তলোয়ার
বাধ্যতামূলক সেপ্পুকুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন বলা যায় ৪৭ রনিনের ঘটনাকে। রনিন বলা হত প্রভুহীন সামুরাই যোদ্ধাদের, যারা প্রায়ই থাকত ভবঘুরে ও সক্রিয়ভাবে বিদ্রোহী। ৪৭ রনিন প্রভুহীন হয়ে পড়ে, যখন তাদের প্রভু ‘আসানো নাগানোরি’কে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে হত্যা করা হয়। আসানোকে হত্যার জন্য তারা শোগুন (জাপানের তৎকালীন সামরিক একনায়ক) তোকুগাওয়া সুনায়োশির অধীনস্ত দাইমিয়ো ‘কিরা ইয়োশিনাকা’কে দায়ী ধরে তাকে হত্যা করে। এই ঘটনার পর শোগুন সেই ৪৭ রনিনকে সেপ্পুকু পালনের নির্দেশ দেয়।
প্রভুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়া ৪৭ রনিনের সমাধি
আরেক ধরনের সেপ্পুকু ছিল স্বেচ্ছাকৃত। এটি ছিল মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত যোদ্ধাদের শত্রুর হাতে পড়ার চেয়ে মৃত্যু বেছে নেয়া। ধীরে ধীরে কোনো সামুরাই তার প্রভুর প্রতি বিশ্বস্ততার নজির হিসেবে কিংবা কোনো সরকার বা রাজনৈতিক নেতার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ হিসেবে বা নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে স্বেচ্ছায় সেপ্পুকু পালন শুরু করে। আধুনিক জাপানেও স্বেচ্ছা সেপ্পুকুর বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য নজির আছে, যার একটি হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর বেশ কিছু সামরিক সেনার সেপ্পুকু পালনের মাধ্যমে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া। প্রায় ১৫ সেন্টিমিটারের একটি চাকু দিয়ে পেটের বাম থেকে ডান দিকে কাটার মাধ্যমে তারা আত্মহত্যা করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এক সেনার সেপ্পুকু পালন
আরেকটি বিখ্যাত সেপ্পুকুর ঘটনা ঘটে ১৯৭০ সালে, যখন জাপানের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক মিশিমা ইউকিয়ো নিজের পেট কেটে জনসম্মুখে মৃত্যুবরণ করেন। জাপানের ঐতিহ্যের মূল্য হারানোর ব্যাপারে তার চিন্তাভাবনাকে সমর্থন দিতেই তিনি এই পথ বেছে নেন।
মিশিমা ইউকিয়ো
বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু চলচ্চিত্র, লেখা ও নাটকে সেপ্পুকুর বিভিন্ন রূপ উঠে এসেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করলে স্বেচ্ছা সেপ্পুকুকে আরো কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। সাধারণত চলচ্চিত্রে এই সেপ্পুকুর নতুন একটি ধরন প্রকাশ পায়, যাকে বলা হত ‘কানশি’, যেখানে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা ভূস্বামীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে সেপ্পুকু পালন করা হতো। তবে অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ সেপ্পুকুর চেয়ে পার্থক্য থাকত যে, এক্ষেত্রে সামুরাই যোদ্ধারা পেটে বেশ গভীর ক্ষত সৃষ্টি করত এবং যত দ্রুত সম্ভব তা ব্যান্ডেজ করে ফেলত। পরবর্তীতে জনতার সামনে সে তার বক্তব্য রাখত এবং সেই ক্ষত উন্মোচন করত প্রতিবাদের প্রতি তার একাত্মতা হিসেবে।
এই ধরনটি ‘ফুনশি’ বা ধিক্কারের মৃত্যু থেকে একদম আলাদা। ফুনশিকে ধরা হত সেপ্পুকুর বিশেষভাবে চিত্রায়িত করা এক মাধ্যম। কোনো অসন্তোষ বা প্রতিবাদের পক্ষে শক্তিশালী পক্ষ রাখতে গিয়ে সামুরাই যোদ্ধারা এই সেপ্পুকু পালন করত। জাপানের নাট্যশালায় আবার সেপ্পুকুর এক কল্পিত সংস্করণ ছিল, যাকে ‘কাজিবারা’ বলা হত। আবার কিছু সামুরাই ‘জুমোঞ্জি গিরি’ নামে সেপ্পুকুর এক ধরন বেছে নিত। এই পদ্ধতিতে কোনো কাইশাকুনিন মঞ্জুর করা হতো না। পেট আনুভূমিকভাবে কেটে ট্যানটো দিয়ে আবার বুক থেকে নিচের দিকে লম্বা ক্ষত করা হয় এ পদ্ধতিতে। এটি বিশেষভাবে সেপ্পুকুর বেদনাদায়ক পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত, কারণ এতে ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটে।
সম্রাট মেইজি (Meiji) দ্বারা মেইজি সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের পর ১৮৭৩ সালের দিকে বিচারিক শাস্তি হিসেবে সেপ্পুকুর প্রচলন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। তবে প্রশাসনিকভাবে প্রচলিত না থাকলেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে এর অনুশীলন জাপানে চলতেই থাকে।
যদিও সামুরাই গোত্রে সেপ্পুকু বা হারা-কিরি বেশ সম্মানজনক মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা হয়, কিন্তু বেশ অনেকবারই প্রশ্ন ওঠে যে আসলেই এটি সম্মানজনক নাকি নিছকই ঠুনকো গর্ব বজায় রাখার চেষ্টা? পরিচালক কোবায়াশি পরিচালিত ‘হারা-কিরি’ নামের চলচ্চিত্রে হারা-কিরি বা সেপ্পুকুর অন্য আরেকটি রূপ ফুটে ওঠে। প্রভুহীন সামুরাই যোদ্ধা অর্থাৎ রনিনদের অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা পরিচালক চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলেন। চলচ্চিত্রটিতে দেখা যায়, মোটোমি নামক এক তরুণ রনিন লি গোত্রের প্রাসাদের সামনে সেপ্পুকু পালনের অনুমতি চায়।
হারা-কিরি চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য
তখনকার সময়ে রনিনদের অবস্থা বেশ করুণ ছিল, কাজ নেই, তাই নেই উপার্জনও। মোটোমি শুনেছিল, আগে একজন রনিন এভাবে সেপ্পুকু পালন করতে চাওয়ায় তাকে বেশকিছু পয়সাকড়ি দিয়ে বিদায় করে দেয়া হয়। অসুস্থ স্ত্রী ও বাচ্চার চিকিৎসার জন্য সে একইভাবে কিছু অর্থ পাওয়ার আশায় এই কাজটি করে। কিন্তু এরকম রনিনদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে ও তা কমানোর জন্য একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে- এমন চিন্তা থেকে গোত্রের তিন বয়োজ্যেষ্ঠ সামুরাই মোটমিকে শিক্ষা দেয়ার চিন্তা করেন। তাকে জোর করা হয় সেপ্পুকু পালনে। তার বাঁশের তলোয়ার দিয়েই তাকে সেপ্পুকু পালনে বাধ্য করা হয়। আসলেই সেপ্পুকু বা হারা-কিরির মর্যাদা রক্ষা ব্যাপারটি কতটুকু যুক্তিসঙ্গত তা-ই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে। জোর করে বা শাস্তি হিসেবে এই পীড়াদায়ক পদ্ধতিতে কাউকে মরতে বাধ্য করা কতটা যুক্তিসঙ্গত ছিল সে প্রশ্ন রয়েই যায়।
সংক্ষেপে দেখুনকিভাবে এলো মজার চুয়িং গাম?
আধুনিক সময়ে চুয়িং গাম শিশু-কিশোরদের কাছে অতি পরিচিত একটি খাবার। প্রতিটি মুদি দোকানেই বিভিন্ন স্বাদের, রংয়ের, আকার কিংবা মূল্যের চুয়িং গাম দেখতে পাওয়া যায়। শিশুরা এসব দেদারসে কেনে। আমাদের দেশে মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি কিংবা বৃদ্ধদের কাছে এর তেমন আবেদন না থাকলে ইউরোপে বা আধুনিক দেশগুলোতে সময় কাটানোরবিস্তারিত পড়ুন
আধুনিক সময়ে চুয়িং গাম শিশু-কিশোরদের কাছে অতি পরিচিত একটি খাবার। প্রতিটি মুদি দোকানেই বিভিন্ন স্বাদের, রংয়ের, আকার কিংবা মূল্যের চুয়িং গাম দেখতে পাওয়া যায়। শিশুরা এসব দেদারসে কেনে। আমাদের দেশে মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি কিংবা বৃদ্ধদের কাছে এর তেমন আবেদন না থাকলে ইউরোপে বা আধুনিক দেশগুলোতে সময় কাটানোর মাধ্যম হিসেবে এটি দারুণ এক খাদ্য। খেলোয়াড়েরা খেলার বা অনুশীলনের সময় যেন গলা শুকিয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে প্রায়শই চুয়িং গাম চিবিয়ে থাকেন। সেলিব্রিটি ব্যক্তিত্বদের ফেলে দেয়া চুয়িং গাম কুড়িয়ে এনে পরবর্তীতে নিলামে বিশাল অংকে বিকোনোর খবরও শোনা গিয়েছে বেশ কয়েকবার। এই খাবারটির রয়েছে এক মজাদার ইতিহাস।
ইতিহাস বলছে, চুয়িং গাম চিবানো হতো সেই প্রাচীনকাল থেকেই। আজ থেকে নয় হাজার বছর পূর্বে উত্তর ইউরোপের বাসিন্দারা একধরনের গাছের ছাল চিবোতেন। গবেষকদের মতে, সম্ভাব্য দুটি কারণে সেই সময় তারা গাছের ছাল চিবাতেন। একটি হচ্ছে সেটি চিবানোর ফলে তারা একটি আলাদা স্বাদ লাভ করতেন, আরেকটি হচ্ছে দাঁতের ব্যথা সারানোর জন্য তারা এরকমটা করে থাকতেন৷ আমেরিকা মহাদেশের প্রাচীন মায়া সভ্যতায়ও চুয়িং গাম চাবানোর নিদর্শন পাওয়া যায়। মায়া সভ্যতায় স্যাপোডিল্লা গাছ থেকে উৎপন্ন হয়ে জমে যাওয়া রস চিবানো হতো। সাধারণত ক্ষুধা মেটাতে কিংবা তৃষ্ণা নিবারণ করতেই এমনটা করতো মায়ানরা। এরপর মেক্সিকোর বিখ্যাত আজটেক সভ্যতায়ও একইভাবে স্যাপোডিল্লা গাছ থেকে উৎপন্ন চুয়িং গাম খাওয়া হতো।
ইতোপূর্বে চুয়িং গাম চর্বণের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ নিয়মের চিহ্ন পাওয়া না গেলেও আজটেক সভ্যতায় চুয়িং গাম চিবানোর নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল। শিশু ও অবিবাহিত নারীরা প্রকাশ্যেই চিবোতে পারতেন। বিবাহিত নারী এবং বিধবাদের ক্ষেত্রে নিয়ম ছিল ব্যক্তিগত পরিসরে উপভোগ করার। তারা মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে এমনটা করতেন। অপরদিকে পূর্ণবয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে একেবারেই আড়ালে চিবোনোর কঠোর নিয়ম ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দাঁত পরিষ্কার করা।

উত্তর আমেরিকায় পাইন গাছের সদৃশ ‘স্প্রুস ট্রি’র সর্জরস চিবানোর চল ছিল। পরবর্তীতে ইউরোপীয়রা সেখানে উপনিবেশ স্থাপন করলে তারাও চিবানোর সংস্কৃতি অব্যাহত রাখে। ১৮৪০ সালের দিকে প্রথমবারের মতো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে জন কার্টিস নামের একজন ব্যক্তি চুয়িং গাম শিল্পের সূচনা করেন। তিনি স্প্রুস গাছের রস সংগ্রহ করে সেটি গরম পানিতে সিদ্ধ করতেন। এরপর সেই রস জমিয়ে সুবিধা মতো কাটা হতো। কেটে ছোট টুকরো করার পর সেগুলোতে ভুট্টা থেকে উৎপন্ন ময়দা মাখানো হতো, যাতে একসাথে অনেকগুলো রাখলে একটির সাথে আরেকটি লেগে না যায়। এভাবে বানানো চুয়িং গামের স্বাদ খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না। ফলে তিনি ও তার পরের চুয়িং গাম উৎপাদকরা প্যারাফিন তেলসহ বিভিন্ন উপাদান যোগ করার সিদ্ধান্ত নেন।
নিউ ইয়র্কের থমাস অ্যাডামস নামের একজন ব্যক্তির সাথে নির্বাসিত মেক্সিকান প্রেসিডেন্ট এ্যান্টনিও লোপেজ ডি সান্তা আন্নার দেখা হয়। নির্বাসিত প্রেসিডেন্টের কাছে থাকা স্যাপোডিল্লা গাছের নির্যাস থেকে উৎপাদিত চুয়িং গাম ‘চিকল’ থমাস অ্যাডামসের নজরে আসে। তারা দুজনে ‘চিকল’ নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা করেন। নির্বাসিত প্রেসিডেন্ট লোপেজ চেয়েছিলেন রাবারের বিকল্প হিসেবে আমেরিকায় তারা চিকলের প্রসার ঘটাবেন। কিন্তু পরীক্ষাগুলোতে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না আসায় তারা হতাশ হয়ে পড়েন। থমাস অ্যাডামস দেখতে পান, চিকল যদি উন্নতমানের চুয়িং গাম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে ভালো সম্ভাবনা আছে। ১৮৮০ সালের দিকে তিনি একটি কোম্পানি তৈরি করেন, যেটি পুরো আমেরিকায় চিকল থেকে তৈরিকৃত চুয়িং গাম সরবরাহ করতো।
বিশ শতকে চুয়িং গামের বাজার বড় হতে থাকে। আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় উইলিয়াম রিংলে জুনিয়র নামের একজন ব্যক্তি সাবানের বিপণন করতেন। তিনি তার পণ্য বিপণনের জন্য বিক্রেতাদের বিভিন্ন বাড়তি সুবিধা দেয়া শুরু করেন। যেমন- কোনো বিক্রেতা যদি পাইকারি হারে নির্দিষ্ট পরিমাণ সাবান ক্রয় করতো, তবে তিনি বেশ কিছু বেকিং পাউডারের ক্যান ফ্রি দিতেন। পরবর্তীতে দেখা গেল বাজারে সাবানের চেয়ে বেকিং পাউডারই বেশি বিকোচ্ছে৷ এরপর তিনি সাবান বাদ দিয়ে বেকিং পাউডারের বিপণন শুরু করেন এবং বাড়তি সুবিধা হিসেবে বিক্রেতাদের কিছু চুয়িং গামের প্যাকেট ফ্রি দিতেন। একপর্যায়ে বাজারে চুয়িং গামের বিশাল চাহিদা তৈরি হয়। ১৮৯৩ সালের দিকে তিনি চিউয়িং গাম তৈরির দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন (জ্যুসি ফ্রুট এবং রিংলে’জ স্পিয়ারমিন্ট)। চুয়িং গামের বিজ্ঞাপনের পেছনে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন। এটি তাকে আমেরিকার অন্যতম সেরা ধনী ব্যক্তিতে পরিণত করে।

এদিকে ১৮৮৫ সাল থেকেই চুয়িং গাম উৎপাদন করে যাচ্ছিল ফ্র্যাঙ্ক ফ্লিয়ার নামের একজন ব্যক্তির নিজস্ব কোম্পানি। তিনি চেয়েছিলেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো যেরকম চুয়িং গাম বিক্রি করছে, তার চেয়ে ভিন্ন ঘরানার কিছু বিক্রি করবেন। ১৯০৬ সালে তিনি বাবল গাম বাজারে আনেন, যার নাম দিয়েছিলেন ‘ব্লিবার-ব্লাবার’৷ কিন্তু এটি সেভাবে আলোড়ন তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। ১৯২৮ সালে ফ্র্যাঙ্ক ফ্লিয়ারের প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী ওয়াল্টার ডাইমার আরও উন্নত বাবল গাম তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করেন। ওয়াল্টার ডাইমারের উদ্ভাবিত কৌশলের বাবল গামের নাম দেয়া হয় ‘ডাবল বাবল’। এই বাবল গাম বাজারে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন স্বাদের ও বর্ণের চুয়িং গাম তৈরি করে চলেছে।
সংক্ষেপে দেখুনজেন্দাবেস্তা কি?
বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৪,০০০ ধর্মীয় মতবাদ বা বিশ্বাস চালু আছে। এসবের মধ্যে একটি হলো জরথুস্ত্রবাদ। প্রায় ৪,০০০ বছর পূর্বে পারস্যে (ইরান) উদ্ভব হওয়া এই ধর্মকে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। অতিপ্রাচীন এই ইরানীয় ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন জরথুস্ত্র। তাদের ধর্মগ্রন্থ জেন্দাবেস্তবিস্তারিত পড়ুন
বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৪,০০০ ধর্মীয় মতবাদ বা বিশ্বাস চালু আছে। এসবের মধ্যে একটি হলো জরথুস্ত্রবাদ। প্রায় ৪,০০০ বছর পূর্বে পারস্যে (ইরান) উদ্ভব হওয়া এই ধর্মকে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। অতিপ্রাচীন এই ইরানীয় ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন জরথুস্ত্র। তাদের ধর্মগ্রন্থ জেন্দাবেস্তা বা আবেস্তা নামে পরিচিত। খ্রি.পূ. ১৫০০ অব্দ – খ্রি.পূ. ১০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে ধর্মপ্রবক্তা জরথুস্ত্রের মুখ নিঃসৃত বাণীসমূহ বংশপরম্পরা ও ঐতিহ্যগতভাবে কেতাবে লিপিবদ্ধ হয়ে তা রূপ নিয়েছে জেন্দাবেস্তায়। জেন্দাবেস্তার মৌলিক প্রার্থনা এবং স্তবগান রচিত হয়েছে আবেস্তা ভাষায়। সাসানীয় সাম্রাজ্যের আগপর্যন্ত (২৪৪ খ্রি. – ৬৫১ খ্রি.) এই ভাষা মৌখিকভাবে সংরক্ষিত থাকে। সাসানীয় সাম্রাজ্যের আমলে আরামীয় লিপির ওপর ভিত্তি করে আবেস্তা ভাষার জন্য তৈরি করা হয় নিজস্ব বর্ণমালা। বর্তমানে এটি একটি অধুনা-লুপ্তপ্রায় ভাষা।








জেন্দাবেস্তা
জরথুস্ত্রীয় প্রথা অনুযায়ী, সর্বজ্ঞানী দেবতা অহুর মাজদা জরাথুস্ত্রের নিকট দিব্যজ্ঞান প্রকাশ করেছিলেন। জরথুস্ত্র তা পাঠ করে শুনিয়েছিলেন সম্রাট বিশতাসপারকে। সেই শ্লোকসমূহ মোট ২১ খানা বইয়ে লিপিবদ্ধ করা আছে, যা নাস্ত নামে পরিচিত। জরথুস্ত্রবাদ রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত এবং বিকশিত হবার পর ধর্মসংক্রান্ত মূল রচনার পাশাপাশি ধর্মীয় রীতিনীতি, ভাষ্য, প্রথা- এসবের ধারণা উন্নতিসাধন ঘটে। আবেস্তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়গুলো লালিত হয়েছে আকেমেনিড সাম্রাজ্য ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের আমলে, জরথুস্ত্রীয় পারসিকদের দ্বারা।
অহুর মাজদা
প্রাচীন ইরানের প্রধান ধর্ম ছিল বহুঈশ্বরবাদী এবং সেই ধর্মে অহুর মাজদা ছিলেন দেবসম্রাট। এই দেবতারা জোটবদ্ধভাবে লড়তেন সত্যের পক্ষে, বাধা হয়ে দাঁড়াতেন অশুভ শক্তি ‘আংগ্রা মন্যু’ ও তার দলবলের বিরুদ্ধে। অহুর মাজদা ও তার দলের সেবক হিসেবে পূজা-অর্চনায় নিয়োজিত ছিলেন একদল পুরোহিত। সম্ভবত খ্রি.পূ. ১৫০০ অব্দ – খ্রি.পূ. ১০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে জরথুস্ত্র নামে এক পুরোহিত অহুর মাজদা থেকে দিব্যজ্ঞান প্রাপ্ত হন। অহুর মাজদা তাকে দর্শন দেন এক নদীর তীরে। ঐশ্বরিক সেই সত্তা নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন ‘বহু মানাহ’ (সৎ উদ্দেশ্য) নামে। তিনি জরথুস্ত্রকে জানিয়েছিলেন, প্রকৃত ঈশ্বর একজনই, তিনি হলেন অহুর মাজদা। তার থেকে প্রাপ্ত দৈববাণীসমূহ মানুষের মধ্যে প্রচার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জরাথুস্ত্রকে।
অহুর মাজদা বনাম আঙ্গ্রা মন্যু
জরাথুস্ত্রের সেই ধর্মীয় বাণী প্রচারের প্রচেষ্টা শুরুতে কেউ ভালো নজরে দেখেনি। একসময় জীবননাশের হুমকি পাওয়ায়, তিনি নিজ গৃহ ত্যাগ করে হাজির হন সম্রাট বিশতাসপার রাজ দরবারে। প্রথমে সম্রাট নয়া ধর্মমতের জন্য তাকে বন্দি করলেও, রাজার প্রিয় ঘোড়াকে সুস্থ করে দিলে জরাথুস্ত্রের প্রতি সদয় হন তিনি। একসময় জরথুস্ত্রীয় ধর্মে ধর্মান্তরিত হন সম্রাট। এরপর সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজ্যজুড়ে শুরু হয় এই ধর্মের প্রচার ও প্রসার।
সম্রাট বিশতাসপাসের রাজদরবারে জরথুস্ত্র
আবেস্তার প্রাচীনতম অধ্যায়ের নাম হলো গাথা। মনে করা হয়, অহুর মাজদার প্রশংসা সংবলিত এই স্তুতিসমূহ রচিত হয়েছিল স্বয়ং জরাথুস্ত্রের দ্বারা। এই অংশে সঠিক ও সুপথে জীবন পরিচালনায় রাস্তা দেখানোর জন্য অহুর মাজদার নিকট মিনতি করা হয়েছে। কিংবদন্তি অনুসারে, এই স্তবগানগুলো রচনা করা হয়েছিল সম্রাট বিশতাসপাসের আদেশে। যদিও এর কোনো মজবুত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
জরথুস্ত্র
এই ধর্ম রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত হয়েছিল আকেমেনিড সাম্রাজ্যকালে, সম্ভবত সম্রাট প্রথম দারিয়ুসের আমলে। সাইরাস দ্য গ্রেটের আমলে বিভিন্ন নথিতে অহুর মাজদার উল্লেখ পাওয়া গেলেও, তখন বহু-ঈশ্বরবাদী বিশ্বাস চালু ছিল। কথিত আছে, আকেমেনিডরা আবেস্তার একটি সংস্করণ রচনা করেছিলেন, যা খ্রি.পূ. ৩৩০ অব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের অভিযানে পার্সিপোলিস পুড়িয়ে দেওয়ার সময় ধ্বংস হয়ে যায়। যদিও বর্তমানে বহু পণ্ডিত সে বিষয়কে অস্বীকার করে থাকেন।
সম্রাট প্রথম দারিয়ুস
হেলেনিস্টিক সেলূসিড সাম্রাজ্যের দ্বারা আকেমেনিড সাম্রাজ্য প্রতিস্থাপিত হলে, শুধুমাত্র উচ্চশ্রেণীর গ্রিকরা ছাড়া মোটামুটি বাকি সবার মাঝে জরথুস্ত্রীয় ধর্মের অনুশীলন অব্যাহত ছিল। এরপর ক্ষমতার গদিতে পার্থীয় সাম্রাজ্য আসীন হলে, তাদের উচ্চশ্রেণীও গ্রহণ করে জরথুস্ত্রীয় মতবাদ। জানা যায়, সেসময় আবেস্তার একটি সংস্করণ রচিত হয়েছিল। আকেমেনিড সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে সেটিও হারিয়ে যায়। আধুনিক যুগের বহু ইতিহাসবিদ সেই দাবিকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন।
পার্থীয় যোদ্ধা
প্রাচীনকালে আবেস্তা রচনার স্বর্ণযুগ ছিল সাসানীয় সাম্রাজ্য। সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম আর্দাশির (রাজত্বকাল: ২২৪ খ্রি.-২৪০ খ্রি.) জরথুস্ত্রীয় পুরোহিতদের রাজদরবারে তলব করে আবৃত্তি করিয়েছিলেন সেই স্তুতিগাথা, যাতে তা লিপিবদ্ধ করে রাখা যায়। মৌখিক ধর্মীয়জ্ঞান তখন রূপ নিয়েছিল লিখিতরূপে। প্রথম আর্দাশিরের পুত্র প্রথম শাপুর (রাজত্বকাল: ২৪০ খ্রি.-২৭০ খ্রি.) এই কাজ চলমান রাখেন। এরপর দ্বিতীয় শাপুর (রাজত্বকাল: ৩০৯-৩৭৯ খ্রিঃ), এবং প্রথম খসরুর (রাজত্বকাল: ৫৩১ খ্রি.-৫৭৯ খ্রি.) শাসনামলে গিয়ে শেষ হয় লিপিবদ্ধকরণের এই মহাকর্ম।
সম্রাট প্রথম আর্দাশির
আবেস্তা ও বৈদিক সাহিত্যের মাঝে সাদৃশ্য
গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, ঋগ্বেদ এবং আবেস্তার লেখক-পূর্বপুরুষ একই ছিলেন এবং তারা ছিলেন প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয়। তবে ঋগ্বেদ এবং আবেস্তা রচনার বহু পূর্বেই তারা পৃথক হয়েছিলেন। প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয়দের আদি বাসভূমি ছিল উত্তর-পশ্চিম ইরান ও আনাতোলিয়ার পূর্বাংশ। আদি তাম্র যুগে (Early Copper Age) তাদের কয়েকটি গোষ্ঠী ভারতে প্রবেশ করে, এরাই ছিলেন ঋগ্বেদ রচনার পূর্বপুরুষ ভারতীয়-আর্য (Indo-Aryans)।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের মতে, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষীদের আবাসস্থল ছিল মধ্য এশিয়া এবং ধীরে ধীরে বহু শতাব্দী ধরে তারা চারণভূমির সন্ধানে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার মতে, এই মধ্য এশিয়ার অভিবাসীরাই ইরানে আবেস্তা এবং ভারতে ঋগ্বেদ রচনা করেছেন।


১৯ শতকে পারসি পুরোহিতদের একটি চিত্র
পারসিক ভাষা সম্পর্কের দিক থেকে উত্তর ভারতের ভাষার খুব কাছাকাছি। দুই অঞ্চলের ভাষাই ব্যুৎপত্তিগতভাবে ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীভুক্ত। ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, দেব, নাসত্য শব্দগুলোর উল্লেখ রয়েছে আবেস্তায়। সনাতন ধর্মের অসুরই আবেস্তায় বর্ণিত অহুর। তবে ইন্দ্রকে আবেস্তায় খলনায়ক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর অসুর বা অহুর পেয়েছে সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান। আচার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও উপনয়ন, সোম পানীয় পান এসবের ক্ষেত্রে দুই ধর্মে যথেষ্ট মিল লক্ষ্য করা যায়।
ফেস রিকন্সট্রাকশন প্রযুক্তিতে প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয় একজন নারীর মুখাবয়ব
আবেস্তা
আবেস্তার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশের নাম গাথা। এগুলো হলো ব্যক্তিগত প্রশংসাস্তুতি, যা প্রার্থনা-নিবেদন এবং উপাসনা-আরাধনার সমন্বয়ে গঠিত। দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা জন্য কীভাবে জরথুস্ত্রীয় রীতিনীতি পালন করতে হয়, গাথা সে সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করে থাকে। গাথার সাথে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নির্দেশনা পুস্তকগুলো হলো জেন্দ, বেন্দিদাদ ইত্যাদি।
যশ্ন গাথা
যশ্ন (ভক্তি) হলো জরথুস্ত্রীয় ধর্মের আরাধনা, যা আবার কতগুলো গাথা অংশে বিভক্ত। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো, অহুর মাজদার মহিমাকে কেন্দ্র করে নিজ মনকে আলোর দিকে ধাবিত করা।
যশ্ন গাথা মূলত পাঁচ ভাগে বিভক্ত:
যশ্ন গাথা
বিশপেরাদ
২৩টি প্রার্থনাস্তব নিয়ে গঠিত বিশপেরাদ, যা যশ্নসমূহের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে থাকে। মূলত বিশপেরাদ হলো একটি জরথুস্ত্রীয় ধর্মানুষ্ঠান, যেখানে এই প্রার্থনাসমূহ পাঠ করা হয়। তবে যশ্নকে বাদ দিয়ে আলাদাভাবে বিশপেরাদের প্রার্থনাবাক্য পাঠের কোনো উপায় নেই।

যশ্ত্
যশ্ত্
যশ্ত্ হলো একুশটি স্তুত সংবলিত বর্ণনা, যা পারলৌকিক এবং পবিত্র উপাদান জল এবং অগ্নিকে নির্দেশ করে। প্রাচীন ধর্মীয় রীতি সংস্কার করার সময় জরথুস্ত্র জনপ্রিয় কিছু দেবদেবীকে এই ধর্মে স্থান দিয়েছিলেন – যেমন অনহিতা (জল, উর্বরতা, স্বাস্থ্য এবং জ্ঞানের দেবী) এবং মিথ্র (সূর্যোদয়, চুক্তির দেবতা) প্রমুখ। যদিও বর্তমানে শুধু অহুর মাজদাকে সর্বশক্তিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তারপরেও কেউ অনহিতার নিকট সন্তানলাভের মানত করলে, তা অহুর মাজদার নিকটই মানত করার সমতুল্য। কারণ, এখানে দেবী অনহিতা শুধুমাত্র একজন মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকেন। এইসকল প্রার্থনার রীতি লিপিবদ্ধ করা আছে যশ্ত্ খণ্ডে।

দেবী অহনিতা
বেন্দিদাদ
সর্বমোট ২২টি খণ্ড নিয়ে বেন্দিদাদ গঠিত। পুরাণ, প্রার্থনা, ধর্মানুষ্ঠান, গ্রহণীয় এবং বর্জনীয় আচার-ব্যবহার, অশুভ শক্তির হাত থেকে প্রতিরক্ষা, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শেষকৃত্য, অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, দান-খয়রাতসহ বহু বিষয় আলোচনা করা আছে এতে। একজন আদর্শ জরথুস্ত্রীয় হিসেবে কীভাবে জীবনযাপন করতে হবে, সে বিষয়ের দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় বেন্দিদাদে। বেন্দিদাদ নিয়ে জরথুস্ত্রীয়রা দুইভাগে বিভক্ত। একদলের কাছে এটি প্রত্যাখ্যাত হলেও আরেকদল তা সাদরে গ্রহণ করেছে। তবে এই বেন্দিদাদে লিপিবদ্ধ আছে সুপ্রাচীন কিছু জরথুস্ত্রীয় কাহিনি, যা খ্রিঃপূঃ অষ্টম সহস্রাব্দের বলে ধারণা করা হয়। সৃষ্টিপুরাণ, মহাপ্লাবনের আখ্যান ইত্যাদির বর্ণনা আছে এই অংশে।

বেন্দিদাদ
পুনরুদ্ধার
৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমদের পারস্য বিজয় পতন ঘটায় সাসানীয় সাম্রাজ্যের। এই বিজয়ে পারস্যে ক্রমশ ম্লান হয়ে আসে জরথুস্ত্রীয় ধর্মের প্রভাব। এরপর পারসিকদের একটি অংশ পালিয়ে আসে ভারতবর্ষে, আরেকদল থেকে যায় নিজ মাতৃভূমিতেই। জরথুস্ত্রীয়দের গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মন্দিরগুলো ধ্বংস করা হয়। ফলে হারিয়ে যায় আবেস্তার ধর্মীয় প্রভাব। ৮ম-১০ শতাব্দীর মাঝে অনেক পারসি পালিয়ে আসে ভারতে। সাথে করে নিয়ে আসে তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ধর্মগ্রন্থ। ভারতীয় ওই পারসিদের বর্তমান বংশধর হলো শিল্পপতি টাটা ও গোদরেজ পরিবার, ফিল্ড মার্শাল শ্যাম মানেকশ, পরমাণু বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা, রাজনীতিবিদ ফিরোজ গান্ধি, অভিনেতা বোমান ইরানি, প্রযোজক রনি স্ক্রুভালা, জন আব্রাহাম, ফারহান আখতার, ফারাহ খান, জিম শরভ, আফতাব শিবদাসানিরা।

ফারহান আখতার, ফারাহ খান, আফতাব শিবদাসানি, জন আব্রাহাম, জিম শরভ, বরুন তুর্কি
১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দে একজন বণিক ভারত থেকে আবেস্তীয় পাণ্ডুলিপি নিয়ে আসেন ব্রিটেনে। ইউরোপীয়রা তখন বুঝতে পারে, খণ্ডিত আকারে হলেও এই গ্রন্থের অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান। ১৭৫৫ সালে এই পাণ্ডুলিপিটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়, ‘Bodleian Library of Oxford University’ নামক এক গ্রন্থাগারে। একসময় এটি নজরে আসে যুবকবয়সী ফ্রেঞ্চ পণ্ডিত অঁকিতেল দুপেরঁর। আবেস্তা পুনরুদ্ধারে তিনি তার মহাকাব্যিক যাত্রা করেন ভারতের উদ্দেশ্য, এবং ১৭৬২ সালে ফ্রান্সে ফিরে আসেন ১৮০ খানা আবেস্তীয় পাণ্ডুলিপি নিয়ে। এরপর তার হাত ধরেই শুরু হয় এর অনুবাদকর্ম।
জলদানব নেসি কি সত্যিই আছে?
বিচিত্র পৃথিবীতে রয়েছে অবারিত রহস্যের হাতছানি। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল, এরিয়া-৫১‘র মতো বাস্তবিক রহস্য যেমন রয়েছে, তেমনি আছে ইয়েতি, ক্রাকেন, সাসকোয়াশ, বুনিপ, লক নেস মনস্টার, চুপাকাবরা ইত্যাদির মতো রহস্যময় কল্পদানব। এদের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে না থাকলেও মানুষ এদের নিয়ে সবসময় উৎসাহ দেখিয়েছে। জাঁবিস্তারিত পড়ুন
বিচিত্র পৃথিবীতে রয়েছে অবারিত রহস্যের হাতছানি। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল, এরিয়া-৫১‘র মতো বাস্তবিক রহস্য যেমন রয়েছে, তেমনি আছে ইয়েতি, ক্রাকেন, সাসকোয়াশ, বুনিপ, লক নেস মনস্টার, চুপাকাবরা ইত্যাদির মতো রহস্যময় কল্পদানব। এদের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে না থাকলেও মানুষ এদের নিয়ে সবসময় উৎসাহ দেখিয়েছে। জাঁকজমক করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এদের খোঁজার জন্য। কিন্তু চিরকালই অধরা থেকে গেছে এই কিংবদন্তিতুল্য জীবগুলো, তারপরও এদের সম্পর্কে মানুষের আগ্রহের কোনো কমতি হয়নি।
স্কটল্যান্ডের ইনভার্নেসের কাছে এক বিশাল হ্রদের নাম নেস। স্কটিশ গেলিক ভাষায় হ্রদকে লক (Loch) বলা হয়, আর উচ্চারণ করা হয় ‘লখ’। এই লক নেসেই এক রহস্যময় কল্পিত দানবের বাস বলে কিংবদন্তী প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই তাকে দেখেছে বলে দাবি করলেও প্রাণীটির অস্তিত্ব সম্বন্ধে এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নেস হ্রদের এই দানবকে ‘নেসি’ বলেও ডাকা হয়। নেসি শব্দের অর্থ হলো ‘পবিত্র’। লক নেস মনস্টারকে আক্ষরিক বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘নেস হ্রদের দানব’। গ্রেট ব্রিটেইনের স্বাদুপানির সবচেয়ে একক বৃহত্তম উৎস এ হ্রদটির আয়তন ২২ বর্গ কিলোমিটার, গভীরতা ৮০০ ফুটেরও বেশি।

নেসি’র উৎস
নেসি’র কিংবদন্তির উৎস খুঁজতে হলে আমাদেরকে অনেক পেছনে ফিরে যেতে হবে, একেবারে সেই প্রথম শতকে। রোমানরা নর্দার্ন স্কটল্যান্ডে পদার্পণ করার পর স্থানীয় পিক্ট জাতির তৈরি পাথরচিত্রে তারা এক অচেনা প্রাণী দেখতে পায়। রোমানরা প্রাণীটিকে বর্ণনা করে ‘পায়ের বদলে ফ্লিপার (সাঁতার কাটার ডানা) বিশিষ্ট দীর্ঘচঞ্চু অদ্ভুত জানোয়ার’ হিসেবে। সে সময় অবশ্য স্কটল্যান্ডে নেসি’র মতো আরও অনেক জলদানবের উপস্থিতির কথা জানা যায়। পুরনো অনেক নথিপত্রেই সাগরে বাস করা বিশালকার সাপ, কেলপি (ঘোড়াকৃতির প্রেতাত্মা), সাগরচারী ঘোড়া ইত্যাদি কাল্পনিক জন্তুর উল্লেখ পাওয়া যায়।
নেসি’র প্রথম লিখিত উল্লেখ দেখা যায় আজ থেকে ১,৫০০ বছর আগে সন্ত কলম্বা নামক এক মিশনারির জীবনীতে। ষষ্ঠ শতকে এ ধর্মপ্রচারক স্কটল্যান্ডে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করেন। তিনি দানবটির মোকাবেলা করেন বলে তার জীবনীগ্রন্থে বর্ণনা করা আছে। একদিন ইনভার্নেসের কাছে নর্দার্ন পিক্টের রাজার সাথে দেখা করতে যাওয়ার পথে সেইন্ট কলম্বা নেস লকের ধারে কয়েকজন লোককে একটি লাশ কবর দিতে দেখেন। মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে সঙ্গীরা সেই লকের কোনো এক দানবকে দায়ী করে। সাধুবাবা ‘মন্ত্রবলে’ মৃত লোকটিকে জীবিত করে দেন। এরপর তিনি তার এক চেলাকে সাঁতরে লক পাড়ি দিয়ে অপর পাড় থেকে একটি নৌকা আনতে আদেশ করেন। শিষ্যটি সাঁতার কাটতে গিয়ে সেই জলদানবের মুখে পড়ে।
এবার আবারও নিজের শক্তি দেখান কলম্বা। প্রার্থনার জোরে তিনি দানবটিকে বশ করেন। তার হুকুমে জলদানব শিষ্যকে ছেড়ে দিয়ে গভীর পানিতে অন্তর্ধান করে। চোখের সামনে এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা দেখে উপস্থিত লোকজন তৎক্ষণাৎ সাধুর চরণে আশ্রয় নিয়ে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়। তবে সেইন্ট কলম্বা’র এ ঘটনার কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। কলম্বাকে স্কটল্যান্ডে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কৃতিত্ব দেওয়া হয়। মনে করা হয়- তাকে মহৎ, অলৌকিক, শক্তিশালীরূপে প্রচার করার জন্য তার জীবনীতে এমন একটি জলদানবের মিথ্যে গল্প ফাঁদা হয়েছে।

লক নেস
আধুনিক সময়ে নেসিকে নিয়ে আবারও আলোড়ন সৃষ্টি হয় ১৯৩৩ সালে। সে বছর লক নেসের পাড় ঘেসে একটি নতুন রাস্তা তৈরি করা হয়। মে মাসের দুই তারিখ স্থানীয় পত্রিকা দ্য ইনভার্নেস কুরিয়ার এক প্রতিবেদনে জানায়, এক দম্পতি ওই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় নেসিকে দেখেছেন। ব্যবসায়ী জর্জ স্পাইসার ও তার স্ত্রী’র ভাষ্যে-
কয়েক সপ্তাহ পরে আরেক মোটরসাইকেল আরোহী একই দাবি তোলেন। এরপর স্বভাবতই চারদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। এক সার্কাস-মালিক তো বিশ হাজার পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করেন দানবটি জ্যান্ত ধরে দেওয়ার জন্য। লন্ডনের পত্রিকাগুলো লক নেস এলাকায় সাংবাদিক পাঠাতে শুরু করে। ডেইলি মেইল শিকারী মার্মাডুক ওয়েদেরেলকে নিয়োগ করে নেসিকে ধরবার জন্য। কিছুদিন সন্ধান করার পরে ওয়েদেরেল, ‘নরম পা বিশিষ্ট প্রায় কুড়ি ফুট দীর্ঘ খুব শক্তিশালী’ চৌপেয়ে এক প্রাণীর বড় আকারের পায়ের ছাপ পাওয়ার কথা জানান। তার ওপর ভিত্তি করে ডেইলি মেইল খবর ছাপে এরূপ শিরোনামে: MONSTER OF LOCH NESS IS NOT LEGEND BUT A FACT
পরে অবশ্য ওয়েদেরেলের পায়ের ছাপগুলো ব্রিটিশ মিউজিয়াম অভ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করে জানা যায়, সেগুলো আসলে জলহস্তীর পায়ের ছাপ। একই বছরের নভেম্বর মাসে হিউ গ্রে নামক আরেকজন ব্যক্তি নেসি’র আরেকটি ছবি তোলেন। ছবিটিতেও লম্বা ঘাড়বিশিষ্ট কোনো বড় আকারের প্রাণীর অস্পষ্ট অবয়ব ফুটে ওঠে। সমালোচকেরা দাবি করেন, এটি ছিল মুখে লাঠি আঁকড়ে ধরে কোনো কুকুরের সাঁতার কাটার ছবি।

হিউ গ্রে’র তোলা ছবি
পরের বছর আবারও নেসি’র ‘দেখা’ মেলে। এবার ডেইলি মেইলে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপানো হয় ১৯৩৪ সালের ২১ এপ্রিল। পত্রিকাটির প্রথম পাতায় ছাপানো ‘সার্জনের ফটোগ্রাফ’ নামে খ্যাত এ ছবিতে দেখা যায়, লম্বা ঘাড়সম্বলিত একটি সরু আকৃতির মাথা পানির ওপরে উত্থিত হয়ে আছে। ছবিটি ডেইলি মেইলকে সরবরাহ করেন লন্ডনের সেই সময়ের বিখ্যাত ডাক্তার রবার্ট কেনেথ উইলসন। এ ছবি দেখেই অনেকে নেসিকে প্লেসিওসর বলে মনে করেন। প্লেসিওসর হচ্ছে একধরনের সামুদ্রিক সরীসৃপ। ২০৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ালেও ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে ডাইনোসরদের সাথে এই প্রজাতিটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়।
নেসি হয়তো কোনোক্রমে ওই গণবিলুপ্তি থেকে বেঁচে গিয়েছে। কিন্তু এখানেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। প্লেসিওসররা ছিল শীতল রক্তের প্রাণী। তাই লক নেসের বরফশীতল পানিতে এ প্রাণীটির এত বছর টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। যা-ই হোক, অনেক বছর পরে ১৯৯৪ সালে প্রমাণিত হয়, ছবিটি আসলে ভুয়া ছিল। সে আরেক গল্প!
ক্রিস্টিয়ান স্পার্লিং নামক এক ব্যক্তি জানান যে, ছবিটি ভুয়া এবং তিনি ঘটনাটির সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। আসলে এই স্পার্লিং ছিলেন দানোশিকারী মার্মাডুক ওয়েদেরেলের সৎপুত্র। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম যখন তার ছবিকে জলহস্তীর বলে প্রমাণ করে, তখন ওয়েদেরেলকে মানুষের অনেক দুয়ো শুনতে হয়। এমনকি খোদ ডেইলি মেইল পত্রিকায়ও তাকে উপহাস করা হয়। রাগে, দুঃখে বেচারা জনসমক্ষে আসা বন্ধ করে দেন। অপমানের শোধ নেওয়ার জন্য তিনি এক দুষ্টু ফন্দি আঁটেন। উলওয়র্থসের দোকান থেকে কেনা খেলনা টিনের সাবমেরিনের সাথে নকল ঘাড় ও মাথা সংযুক্ত করে সেটিকে লক নেসে স্থাপন করে নিজের পুত্র ইয়ান ও সৎপুত্র স্পার্লিংয়ের সহায়তায় একটি ছবি তোলেন। ছবি তোলার পর মডেলটি ডুবে যায় এবং খুব সম্ভবত এটি এখনো হ্রদের তলায় কোথাও ঘুমিয়ে আছে।
কিন্তু সে ছবি ডাক্তার উইলসনের কাছে কী করে পৌঁছাল? আসলে রবার্ট উইলসন তখনকার বিখ্যাত ডাক্তার ছিলেন। তাই গণমাধ্যমে ছবিটি পাঠানোর জন্য ওয়েদেরেল তাকেই নির্বাচন করেন। কিন্তু ডাক্তার কেন এই মজায় নিজেকে শরিক করলেন, তা রহস্যই থেকে গেছে।

বাঁয়ে ডেইলি মেইলে প্রকাশিত ক্রপ করা ‘সার্জনের ফটোগ্রাফ’, ডানে মূল ছবি
দেখতে কেমন নেসি?
ভিজিটস্কটল্যান্ড ওয়েবসাইটে নেসি’র এমন বর্ণনাই দেওয়া আছে। কিন্তু যেহেতু নেসিকে স্পষ্টভাবে দেখার কোনো প্রমাণ নেই বা কোনো বিশ্বাসযোগ্য ছবিও আজ অব্দি কেউ তুলতে পারেনি, তাই নেসি যে আদতে কী জন্তু- তা জানা অসম্ভব। তবে স্পাইসার দম্পতি নেসিকে লম্বা ঘাড়বিশিষ্ট বলে উল্লেখ করেছিলেন। স্কটিশ দ্য ইনভার্নেস কুরিয়ার পত্রিকার সম্পাদক ইভান ব্যারন তাদের প্রতিবেদনে নেসিকে ‘দানব’ হিসেবে অ্যাখ্যা করেন বলে নেসি’র পরিচয় আজও জলদানবই রয়ে গেছে।
জলদানবের খোঁজে
সেই ১৯৩৪ সালেই সংগঠিত হয়ে নেসিকে খোঁজা আরম্ভ হয়। ২০ জন লোককে দৈনিক দুই পাউন্ড করে দেওয়া হয়েছিল দানবটিকে ‘পাহারা’ দেওয়ার জন্য। কিন্তু কেউই কিছু দেখতে পায়নি। তারপরও নেসি’র পেছনে আরও অনেক অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অনেক শৌখিন তদন্তকারী প্রায় বিরামহীন রাত্রিজাগরণ করে নেসিকে খুঁজেছেন। ১৯৬০-এর দশকে অনেক ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় সোনার (Sonar) প্রযুক্তি ব্যবহার করে লেকটিতে অভিযান পরিচালনা করে। অকাট্যভাবে কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলেও সোনার যন্ত্রে পানির নিচে এমন সব বড় মাপের বস্তুর নড়াচড়া ধরা পড়েছিল, যার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এরপর ১৯৭৫ সালে বোস্টনের অ্যাকাডেমি অভ অ্যাপ্লাইড সায়েন্স আরেকটি উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করে। এবার সোনারের পাশাপাশি আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। একটি ছবি বিশ্লেষণ করার পর প্লেসিওসরের মতো কোনো প্রাণীর বিশালাকৃতির ফ্লিপারসদৃশ বস্তু ধরা পড়ে। ১৯৮০ ও ‘৯০-এর দশকে আরও সোনার সন্ধান করেও এ রহস্যের কোনো মীমাংসা হয়নি। ২০০৩ সালে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (বিবিসি) আগ্রহ ও অর্থায়নে ৬০০টি সোনার বিম ব্যবহার করেও কারও ভাগ্যে কোনো শিকে ছেঁড়েনি। কেলডোনিয়ান খাল নামক একটি প্রশস্ত চ্যানেলের মাধ্যমে লক নেস উত্তর সাগরের সাথে সংযুক্ত থাকায় অনেকে মনে করেন, নেসি বা নেসিসদৃশ প্রাণী হয়তো সাগরে চলে গেছে।

প্লেসিওসর
ডিএনএ গবেষণা
নিউজিল্যান্ডের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক লক নেসের পানি থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তার ডিএনএ পরীক্ষা করেন। এনভায়রনমেন্টাল ডিএনএ শনাক্তের এ পদ্ধতিতে সাবজেক্ট জলাশয়ের বিভিন্ন অংশ থেকে পানি সংগ্রহ করা হয়। পানিতে বাস করা জীবগুলো যখন চলাচল করে তখন এগুলো শরীরের ত্বক, আঁশ, লোম, মল, প্রস্রাব ইত্যাদি থেকে ডিএনএ’র ক্ষুদ্র অংশ পেছনে রেখে যায়। এরপর এই ডিএনএগুলো বিদ্যমান বৃহৎ তথ্যভাণ্ডারের সাথে মিলিয়ে দেখে জানা যায়, জলাশয়ে কী কী জীব বাস করছে।
অধ্যাপক নিল গেমেলের নেতৃত্বে লক নেসের পরীক্ষায় তিন হাজার ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। এগুলোর বেশিরভাগই ছোট ছোট প্রাণী। এর বাইরে মানুষ, শূকর, হরিণ, কুকুর, গবাদিপশু, পাখি, খরগোশ ইত্যাদির ডিএনএ-ও পাওয়া যায়। কিন্তু প্লেসিওসর বা এরকম কোনো প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর ডিএনএ পাওয়া যায়নি। একইভাবে ক্যাটফিশ বা হাঙরের দাবিও ধোপে টেকে না।
ডিএনএ পরীক্ষায় বোঝা যায়, লক নেসে যথেষ্ট পরিমাণে ইল মাছের উপস্থিতি রয়েছে। এ থেকেই গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, লক নেস মনস্টার আসলে একটি বিশালাকৃতির ইল। অধ্যাপক গেমেল বলেন,
তিনি বলেন,
ইল প্রসঙ্গে তার মত হলো,
অধ্যাপক নিল গেমেল
কিন্তু ওই হ্রদে কখনো কোনো বিশাল ইল ধরা পড়েনি। আর সবচেয়ে বড় আকারের ধৃত ইউরোপিয়ান ইলটির ওজন ৫.৩৮ কিলোগ্রাম। গেমেলের অভিমত, হয়তো ইলের আকার আশ্চর্যজনকরকম বড় নয়; কিন্তু তাদের গবেষণায় যে ফলাফল পাওয়া গিয়েছে, তাতে সম্ভাবনাটিকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে দানব পাওয়া যাক বা না যাক, লক নেসের সবরকম প্রজাতির একটি শক্তিশালী তথ্যভাণ্ডার যে গবেষণাটির মাধ্যমে তৈরি হয়েছে, তাতে আর সন্দেহ নেই। এ হ্রদের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে এখন আরও বেশি বৈজ্ঞানিক তথ্য আহরণ করা সম্ভব হয়েছে গবেষণাটি দ্বারা।
দাবি নাকচ
লক নেস মনস্টার একটি দানবাকৃতির ইল মাছ- এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছেন স্টিভ ফেল্থাম নামক একজন ‘পেশাদার দানো-শিকারী’। ১৯৯১ সাল থেকে নেসি’র খোঁজ করছেন এই ভদ্রলোক। ২৯ বছর ধরে চোখে বাইনোকুলার আর টেলিস্কোপ লাগিয়ে নেসি’র খোঁজে লক নেস তন্নতন্ন করে ফেলার জন্য গিনেস বইয়েও নাম উঠেছে তার। ৫৬ বছর বয়সী এই অনুসন্ধিৎসু নতুন গবেষণাটিকে ‘অ্যান্টি-ডিসকভারি’ বলে অভিহিত করেছেন।
টাইমস অভ লন্ডনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অবশ্য তিনি জানান, জীবনের ২৯ বছর নেসি’র পেছনে ব্যয় করেও তার এতটুকু আফসোস নেই। ফেল্থামের মতে, নেসি খুব সম্ভবত ওয়েলসের স্থানীয় জাতের ক্যাটফিশ, যেটি দৈর্ঘ্যে ১৩ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে।

স্টিভ ফেল্থাম
উল্লেখ্য, রিভার মনস্টার্স টিভি সিরিজের জেরেমি ওয়েডের বিশ্বাস লক নেসে গ্রিনল্যান্ড শার্কের আবাস রয়েছে। এ হাঙর ২০ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে আর এদের কোনো পৃষ্ঠপাখনা থাকে না।
লক নেসে সাঁতার কাটতে চান?
চাইলেও পারবেন না। কে জানে, যদি নেসি এসে পা কামড়ে ধরে! অবশ্য আপনি যদি দুঃসাহসী হন, নেসিকে কুছ পরোয়া না করেন, তবুও এ হ্রদে সাঁতার কাটা খুব একটা সম্ভব হবে না। কারণ, নেসের পানি আপনার হাড় কাঁপিয়ে দেবে। বছরে এখানে গড় তাপমাত্রা থাকে ৫° সেলসিয়াস। এ নিম্ন তাপমাত্রার পানিতে সাঁতার কাটতে গেলে নেসি’র কামড় না খেলেও হাইপোথার্মিয়া ঠিক জেঁকে বসবে।
নেসি’র দর্শন পাওয়ার আশা নিয়ে প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ লক নেসে ঘুরতে যান। স্কটল্যান্ডের অর্থনীতিতে তা বছরে প্রায় ৪১ মিলিয়ন পাউন্ড অবদান রাখে। আপনিও লক নেস দেখতে যেতে পারেন, কিন্তু খুব সম্ভবত নেসি’র সাথে মোলাকাত হবে না। তাতে ষোলকলা পূর্ণ না হলেও লেকপাড়ের হরিৎশোভা আর লেকের ‘কাকচক্ষুর ন্যায় টলটলে’ পানির অনিন্দ্যসৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। সেইসাথে ছবির মতো সুন্দর, সবুজে মোড়া স্থানীয় গ্রামগুলোতো আছেই।
তবে আপনার কপালগুনে যদি নেসি’র দেখা পেয়ে যান, তাহলে ‘লক নেস মনস্টার সাইটিং রেজিস্টার’-এ তা লিখে রাখতে ভুলবেন না যেন। ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে গ্যারি ক্যাম্পবেল নামক এক ভদ্রলোক নেসি’র সঙ্গে মোলাকাত করেন। পানিতে আলোড়ন দেখে তার বিশ্বাস জন্মে, ওটা নেসি’র অবদান। সে দর্শনের কথা লিখে রাখতে গিয়ে তিনি একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। তার এই রেজিস্টারে এখন পর্যন্ত ১১১৮টি দর্শনের কথা উল্লেখ করেছেন বিভিন্নজন। এগুলোর মধ্যে নিউজপেপার রিপোর্ট, পুরনো নথিপত্র, সরাসরি দেখার রিপোর্ট রয়েছে।

‘দ্য প্রাইভেট লাইফ অভ শার্লক হোমস’ (১৯৬৯) সিনেমায় দেখানো নেসি
অবিনাশী নেসি
গেমেলের পরীক্ষাতে লক নেস দানবের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্যান্য পরীক্ষার মতো এর ফলও ‘নেগেটিভ’ এসেছে। তার ফলে নেসি’র অস্তিত্বের সম্ভাবনা আরও ফিকে হয়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে নেসিকে প্রামাণিকভাবে বাতিল করে দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম অভ ন্যাচারাল হিস্ট্রি’র মতে, আজ পর্যন্ত নেসি’র অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেই যে তার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিতে হবে, তা কিন্তু মোটেও নয়। কারণ, একজন বৈজ্ঞানিক বা অনুসন্ধিৎসু মানুষ হিসেবে যথেষ্ট পোক্ত প্রমাণ ছাড়া কোনোকিছুরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। স্মিথসোনিয়ান এনসাইক্লোপিডিয়ায় লেখা আছে, দানবটির কঙ্কাল বা জীবিত আটক হওয়ার মতো শক্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা উচিত।
সংক্ষেপে দেখুনআরব সংস্কৃতির বিখ্যাত পৌরনিক কাহিনীগুলোর মধ্যে অন্যতম কোনগুলো?
বিশ্বের যেকোনো সভ্যতার পৌরাণিক কাহিনীগুলো সেসব এলাকায় মানুষের মাঝে যুগের পর যুগ টিকে থাকে। বংশপরম্পরায় মানুষ তা পরের প্রজন্মকে বলে যায়। আর এভাবেই এই কাহিনীগুলো মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের বজ্রদেবতা থরের নর্স পুরাণ বলি বা ভারতীয় উপমহাদেশের পৌরাণিক কাহিনী, এসব কিছুই যুগের পর যুগ ধরে মুবিস্তারিত পড়ুন
বিশ্বের যেকোনো সভ্যতার পৌরাণিক কাহিনীগুলো সেসব এলাকায় মানুষের মাঝে যুগের পর যুগ টিকে থাকে। বংশপরম্পরায় মানুষ তা পরের প্রজন্মকে বলে যায়। আর এভাবেই এই কাহিনীগুলো মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের বজ্রদেবতা থরের নর্স পুরাণ বলি বা ভারতীয় উপমহাদেশের পৌরাণিক কাহিনী, এসব কিছুই যুগের পর যুগ ধরে মুখে মুখে টিকে আছে আর পরবর্বতীতে বই আকারে লিখিত হয়েছে। প্রাচীন আরবেও এরূপ কিছু বৈচিত্র্যময় এবং অবিশ্বাস্য পৌরাণিক কাহিনী, গল্প আর কিংবদন্তি রয়েছে। আর এসব গল্প হাজার হাজার বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিকভাবে রক্ষিত হয়েছে।
আরবের প্রাচীন সভ্যতাগুলোর জনগণের মধ্যে বিশ্বের কিছু বিশুদ্ধ পৌরাণিক কাহিনী ও রূপকথা প্রচলিত আছে। এসব কাহিনীতে যেমন রয়েছে মানুষের বীরত্বের কথা, তেমনি রয়েছে দৈত্য দানবের ক্ষমতা ও রাজত্বের কথা। বিশ্বের অন্যান্য সভ্যতার যেমন নিজস্ব কাহিনী তাদের সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে, আরবেও তেমনটা ঘটেছে। যখন আমরা প্রাচীন আরবের পুরাণ সম্পর্কে বলি তখন আমরা বেশিরভাগই মধ্যযুগীয় উৎসগুলোর উপর নির্ভর করি, কারণ এর আগে লিখিত আকারে এসব লিপিবদ্ধ ছিল না। বলে রাখা ভালো, এখানে ধর্ম, লোককাহিনী ও উপকথার মিশেল ঘটেছে। এসব কাহিনীর অনেক কিছুই পরবর্তীতে আরবের বিভিন্ন ধর্মের সাথে মিশে গিয়েছে আর সেগুলোর অংশ হয়ে যায়। আজকের লেখায় এমনি কিছু পৌরাণিক কাহিনী ও রূপকথার বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
বাহামুত, এক পৌরাণিক প্রাণী
বিশ্বাস করা হয়, এটি গভীর সমুদ্রে থাকা একটি দৈত্যাকার এবং দানবীয় মাছ। প্রাচীন আরবের লোকেরা বিশ্বাস করত যে এই পৌরাণিক প্রাণী পৃথিবীকে ধরে রেখেছে। পৌরাণিক কাহিনী মতে, দৈত্যাকার এই মাছটি তার পিঠে একটি দৈত্যাকার ষাঁড়কে বহন করে আছে এবং এর উপর একটি রত্নপাথর আছে, যাতে একটি দেবদূত পৃথিবী এবং সমুদ্রের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে।


বিশ্বাস অনুযায়ী বাহামুত এভাবেই পৃথিবীকে ধরে রেখেছে
বাহামুতের কল্পিত চিত্র
দানব নাসনাস
এটি আরবের পৌরাণিক কাহিনীর একটি ভয়ঙ্কর দানব। নাসনাসকে রাক্ষস এবং মানুষের সম্মিলিত সন্তান বলে মনে করা হতো। কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করা আর কেবল স্পর্শ করেই তাদেরকে শুকিয়ে বা মেরে ফেলা বা তাদের শরীর থেকে মাংস নিয়ে ফেলা ছিল এর ক্ষমতার উদাহরণ। এটি বিশ্বাস করা হতো যে নাসনাসের শুধুমাত্র অর্ধেক মাথা, এবং শরীরের প্রতিটি অংশ অর্ধেক আছে। শুধুমাত্র একটি পা দিয়েই বিশাল লাফ দিতে পারত এই দানব, যার মাধ্যমে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে মানুষকে ধরত আর হত্যা করত।

পৌরাণিক প্রাণী শাদ’হাওয়ার
মধ্যযুগীয় আরবের একটি পৌরাণিক প্রাণী শাদ’হাওয়ার। মনে করা হতো, এটি ইউনিকর্নের মতো একটি প্রাণী, যার একটি বিশাল শিং আছে। এই শিং থেকে ৪২টি শাখা ছড়িয়ে থাকে। কিংবদন্তি অনুযায়ী, এর জাদুকরী শিং থেকে বাতাসের সাথে শক্তিশালী সঙ্গীত বাজত, যা এর শাখাগুলোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। এই প্রাণীর শিং রাজাদের উপহার দেওয়া হতো, যা বাঁশির মতো বাজানো হতো। এর একদিকে বাজানো হলে তা একটি মনোমুগ্ধকর সুর উৎপন্ন করে, এবং যখন অন্যদিকে বাজানো হয়, সুরটি এতই দুঃখের হয় যে এটি মানুষকে কাঁদায়।

পৌরাণিক প্রাণী রক
প্রাচীন আরবদের একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক প্রাণী রক হলো একটি বিশাল কিংবদন্তি শিকারি পাখি। বিভিন্ন নাবিক, জেলে এবং অনুসন্ধানকারীরা এর সম্পর্কে লিখে গেছেন। তারা শপথ করেছিলেন যে, তাদের অভিযানে থাকাকালীন এই জাদুকরী প্রাণীকে দেখেছিলেন। এর কথা এসেছে বিখ্যাত অভিযাত্রী ইবনে বতুতা ও মার্কো পোলোর লেখায়। এছাড়া আরব্য রজনীর এক হাজার এক রাত ও সিনবাদের গল্পেও এর কথা এসেছে। রককে প্রায়ই পশ্চিমা পৌরাণিক প্রাণী, যেমন- ফিনিক্স বা থান্ডারবার্ডের সাথে তুলনা করা হয়েছে। রকের শরীর এত বৃহৎ ও এর শক্তি এত বেশি যে এটি তার পা দিয়ে অনায়াসে একটি বড় হাতিকেও তুলে নিতে পারে।

আনকা আল-মুগরিব
আনকা বা আনকা মুগরিব বা আনকা আল-মুগরিব আরবীয় পৌরাণিক কাহিনীর একটি রহস্যময় কল্পিত বৃহৎ স্ত্রী পাখি। বলা হয়ে থাকে, এটি অনেক দূর পর্যন্ত উড়ে যায়, এবং জীবদ্দশায় মাত্র একবারই দেখা দেয়। এটাও বলা হয় যে, একে ‘সূর্য অস্ত যাওয়ার জায়গায়’ দেখতে পাওয়া যায়। আনকা শব্দটি আনাক এর স্ত্রীলিঙ্গ, যার অর্থ ‘লম্বা ঘাড়’। এটি দিয়ে সম্ভবত বোঝায় যে পাখিটি একটি সারস বা অন্যান্য লম্বা গলার পাখির মতো বা কেবল একটি ঈগলের মতো একটি বড় শক্ত ঘাড় রয়েছে, যার মাধ্যমে একে চিহ্নিত করা যায়। মুগরিব শব্দের বেশ কিছু অর্থ রয়েছে: অদ্ভুত, বিদেশী, দূরবর্তী, পশ্চিম, সূর্যাস্ত, বিচ্ছিন্ন, অজানা, সাদা, ভোর ইত্যাদি।

আনকা নামটি ‘দুর্ভাগ্য বা কঠিন ব্যাপার’ এর সাথেও সম্পর্কযুক্ত এবং আনকা মুগরিব নামটি দিয়ে বিপর্যয়কে বোঝানো হতো। এটি হয়েছিল কারণ পাখিটিকে মূলত বেশ নিখুঁতভাবে সাথে সৃষ্ট বলা হয়েছিল, কিন্তু এটি প্লেগে পরিণত হয়েছিল, এবং তাই একে হত্যা করা হয়েছিল। জাকারিয়া আল-কাজউইনির মহাজাগতিক বই ‘দ্য ওয়ান্ডার্স অব ক্রিয়েশন’-এ আনকা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, “পাখিদের আত্মীয় যারা কাফ পর্বতে একা বাস করত“, এবং “অনেক যুগে অর্জিত অভিজ্ঞতাসহ একটি জ্ঞানী পাখি যা নৈতিক উপদেশ দেয়।” কাজউইনি আরও বলেছেন, পাখিটি ১,৭০০ বছর বেঁচে থাকে, ৫০০ বছর বয়সে মিলন করে, ডিম ভাঙার পর ছানা ভেতরে থাকে, এবং ১২৫ বছর পরে বের হয়ে আসে। এদের কখনও কখনও আধুনিক সময়ে ফিনিক্সের মতো প্রাণী হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এদের ৪টি ডানা থাকে। কথিত আছে যে আনকা হাতি এবং বড় মাছ ছাড়া কিছুই খায় না। আর্মেনিয়ান ও বাইজেন্টাইন ঈগল এবং তুর্কি কোনরুল ও পারস্য পুরাণের সিমুর্গের সাথে আনকাকে প্রায়শই সাদৃশ্য মনে করা হয়।
ঘুল
ঘুল বা ঘুওল হলো একটি দানব-সদৃশ সত্তা বা পৌরাণিক দানবীয় প্রাণী। ঘুলের ধারণা প্রাক-ইসলামিক আরবের ধর্মগুলোতে তৈরি হয়েছিল, যে প্রাণীকে কবরস্থানে দেখা যায়, এবং বিশ্বাস করা হতো- এটি মানুষের মাংস খায়। ঘুল একটি আরবি শব্দ, যা এসেছে ঘালা থেকে, এর অর্থ ‘জব্দ করা’। আরবি লোককাহিনী মতে, কবরস্থান এবং অন্যান্য জনবসতিহীন স্থান ঘুলের বসবাসের জায়গা হিসেবে। পুরুষদের ঘুল বলা হয়, আর মহিলাদের ঘুলা বলা হয়। একে অনেক গল্পে দেখানো হয়েছে, যে অসহায় মানুষদের প্রলুব্ধ করে, সাধারণত পুরুষদের, আর যাতে করে এটি তার বাড়িতে গিয়ে তাদের সবাইকে খেতে পারে।

কেউ কেউ বলে যে, ঘুল হলো মরুভূমিতে বসবাসকারী দানব, যা আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে, বিশেষ করে হায়েনার ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে। এটি অসতর্ক লোকদেরকে মরুভূমির বর্জ্য বা পরিত্যক্ত জায়গায় হত্যা করে খাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করে। প্রাণীটি ছোট বাচ্চাদেরও শিকার করে, তাদের রক্ত পান করে, মুদ্রা চুরি করে এবং মৃতকে খায়। তারপরে যে ব্যক্তিকে এটি খায় তার রূপ ধারণ করে।
ওয়্যারহায়েনা
ওয়্যারহায়েনা নামের এই পৌরাণিক প্রাণী একটি নিওলজিজম যা হায়েনাদের সাথে জড়িত, যা ওয়্যারউলফের ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। আরব উপদ্বীপ, উত্তর আফ্রিকা, হর্ন অফ আফ্রিকা এবং নিকট প্রাচ্যের পাশাপাশি কিছু সংলগ্ন অঞ্চলের সাধারণ লোককাহিনীতে এর দেখা মেলে। ওয়্যারউলফের মতো, যেগুলো সাধারণত মানুষের বিবর্তনের ফলে হয় বলে বিশ্বাস করা হয়, ওয়্যারহায়েনার কাহিনীগুলোও বলে যে তারা কীভাবে মানুষের ছদ্মবেশে হায়েনা হতে পারে।
সোমালিয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে এটি বিশ্বাস করা হয় যে, কোরি ইসমারিস এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি রাতের বেলা নিজেকে একটি একটি জাদুর লাঠি দিয়ে ঘষে হায়েনা-মানবে রূপান্তরিত করতে পারতেন এবং ভোরের আগে মানব অবস্থায় ফিরে যেতেন। ইথিওপিয়াতে ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয় যে প্রতিটি কামার, যাদের ব্যবসা বংশগত, তারা সবাই একেকজন জাদুকর বা ডাইনি আর তারা তাদের ক্ষমতা হায়েনায় পরিণত হয়। এই কামার ওয়্যারহায়েনারা মধ্যরাতে কবর লুট করে বলে বিশ্বাস করা হয়, তাদের বওদা বলা হয়ে থাকে। অধিকাংশ দেশবাসী তাদের সন্দেহের চোখে দেখে। এই বিশ্বাস বর্তমানে সুদান এবং তানজানিয়ার পাশাপাশি মরক্কোতেও রয়েছে। অনেক ইথিওপিয়ান খ্রিস্টান সেখানকার ইহুদিদের বওদা হিসেবে চিহ্নিত করে, তাদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের মৃতদেহ খুঁজে বের করার এবং সেগুলো খাওয়ায় অভিযোগ তোলে।

পশ্চিম সুদানের জনগণের লোককাহিনী অনুযায়ী একটি হাইব্রিড প্রাণী রয়েছে, যে একজন মানুষ, আর রাতে একটি নরখাদক দানবে রূপান্তরিত হয়। এটি মানুষদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। প্রাণীটিকে প্রায়শই একটি শক্তিশালী জাদুকর বা নিরাময়কারী, কামার, বা কাঠুরে হিসেবে তার মানব আকারে চিত্রিত করা হয়, যার একটি লোমশ শরীর, লাল এবং জ্বলজ্বল চোখ থাকে।
আল-মিরাজ
আল-মিরাজ হলো একটি পৌরাণিক প্রাণী, যা মধ্যযুগীয় আরবি সাহিত্যে উল্লিখিত এক শিংওয়ালা খরগোশ বা খরগোশের মতো। এই নামটি ইস্কান্দারের কিংবদন্তির একটি সংস্করণে লেখা হয়েছে, যিনি ভারত মহাসাগরের ড্রাগন দ্বীপের ড্রাগনকে পরাজিত করার পরে বাসিন্দাদের কাছ থেকে উপহার হিসেবে প্রাণীটি পেয়েছিলেন। প্রাণীটির দিকে দৃষ্টি পড়লে অন্যান্য সব প্রাণীও পালাতে বাধ্য হয়।
কাজউইনির মারভেলস অব থিংস ক্রিয়েটেড এবং মিরাকুলাস অ্যাসপেক্টস অব থিংস এক্সিস্টিং (দ্য ওয়ান্ডার্স অব ক্রিয়েশন) অনুসারে, আল-মিরাজ হলো ভারত মহাসাগরের জাজিরাত আল-তিনিন যা সি-সার্পেন্ট আইল্যান্ড বা ড্রাগন আইল্যান্ড নামে পরিচিত একটি দ্বীপে বসবাস করা কথিত একটি জন্তু। এর রয়েছে একটি কালো শিং। এর গায়ের রং হলুদ, আর এটি দেখতে খরগোশের মতো। এটি দেখে সমস্ত বন্য জানোয়ারও পালিয়ে যায়। দ্বীপবাসীরা ইস্কান্দারকে (আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট) একটি ড্রাগন (বা বড় সাপ) হত্যা করতে সাহায্য করার পরে একে উপহার দিয়েছিল, যেটি গবাদি পশু খেয়েছিল।

দানব কুতরুব
আরবীয় লোককাহিনীর জনপ্রিয় প্রাণী কুতরুব, ওয়্যারউলফের মতো এই দানব একধরনের রাক্ষস। কুতরুবকে প্রায়শই পশ্চিমা সংস্কৃতির পিশাচের সাথে তুলনা করা হয়। সেখানে একে কবরস্থানের বাসিন্দা বলা হয়েছে, যা মৃতদেহ ভক্ষণ করে।

ফালাক
আরবের পৌরাণিক কাহিনী মতে, ফালাক হলো এক বিশালাকার পৌরাণিক সাপ। এটি বাহামুত নামে পরিচিত একটি মাছের নিচে বাস করে। ‘ওয়ান থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান নাইটস’ বা ‘আরব্য রজনীর এক হাজার এক রাত’-এ একে বিপজ্জনক দানব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি বলা হয়ে থাকে যে, এই সাপ কেবল সৃষ্টিকর্তার শক্তিকেই ভয় করে যা একে জগতের সমস্ত সৃষ্টিকে গ্রাস করতে বাধা দেয়। ফালাক খুব বিপজ্জনক প্রাণী। তবে এরা সাধারণত পৃথিবীতে খনন করা সুড়ঙ্গে থাকে। এদের দেহ অতিবৃহৎ নয়, তবুও পর্যাপ্ত খাবার এবং পানি পেলে এদের দেহ বিশাল আকারে বৃদ্ধি পেতে পারে।
ফালাক খুব ঘনিষ্ঠভাবে নর্স জর্মুনগান্ডারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ফালাককে অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পৌরাণিক বিশ্বাসমতে, এটি পৃথিবী, স্বর্গ এবং তার উপরে থাকা ছয়টি নরককে গ্রাস করতে পারে। এদের অগ্নি প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রয়েছে। সেই সাথে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে তাপ সহ্য করার সক্ষমতা।

‘ওয়ান থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান নাইটস’ অনুযায়ী একটি বিশাল ফালাক পৃথিবী পৃষ্ঠের নীচে বাস করে, তবে এটি সৃষ্টিকর্তার ভয়ে এর নীচে থাকা সবকিছু গ্রাস করা থেকে এড়িয়ে থাকে। যদিও এই পৌরাণিক কাহিনীকে প্রায় আমেরিকান এবং ইউরোপীয় ম্যাজিজুওলজিস্টরা অস্বীকৃতি জানান, তবে তারা আজকের ম্যাগমা পাইথনের বিবর্তনীয় প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আলাদিনের বিস্ময়কর প্রদীপের কিংবদন্তি
আরবের সবচেয়ে বিখ্যাত লোককাহিনীগুলোর মধ্যে একটি হলো কিংবদন্তি আলাদিনের জাদুর প্রদীপের গল্প। সারা বিশ্বের শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে এই গল্পটি পরিচিত ও বহুল প্রচলিত। এটি আজও মানুষের কল্পনা ও আবেগকে ধারণ করে রেখেছে। মূলত এই গল্পটি ‘আরব্য রজনীর এক হাজার এক রাত’-এর একটি অংশ। গল্পে এক যুবক ছেলে আলাদিনের কথা বলা হয়েছে যে ছিল দরিদ্র। সে একটি দুষ্ট জাদুকরের দ্বারা প্রতারিত হয়। পরে সে একটি জাদুকরী প্রদীপের মালিক হয়ে যায়। প্রদীপের মধ্যে থাকা একটি জিনি বা জ্বিনের মাধ্যমে একের পর এক দুঃসাহসিক কাজ শুরু করে। এভাবে সে জিনির সাহায্যে রাজকন্যার মন জয়ে সক্ষম হয়।

কিংবদন্তি অনুসারে আলাদিন ছিল জাদুর প্রদীপের মালিক
আলীবাবা এবং চল্লিশ চোরের গল্প
কিংবদন্তি ‘আরব্য রজনীর এক হাজার এক রাত’-এর আরেকটি বিখ্যাত গল্প এটি। এই গল্পে আলীবাবা নামে এক দরিদ্র কাঠুরির কথা উঠে এসেছে। বনে একটি দুঃসাহসিক অভিযানের সময় তিনি চোরের লুকানো আস্তানা আবিষ্কার করেন, আর জাদুকরী শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে সেই গুহার দরজা খুলতে সক্ষম হন। আলীবাবা অবশেষে দুষ্ট চোরদের হাত থেকে রক্ষা পান এবং তাদের বিশাল ধনভান্ডারের মালিক হয়ে যান।

জারকা’ আল-ইয়ামামার কিংবদন্তি
আরব্য পৌরাণিক কাহিনী মতে, জারকা’ আল-ইয়ামামা ছিল অবিশ্বাস্য শক্তি, এবং জাদুবিদ্যার অধিকারী একজন শক্তিশালী মহিলা। কিংবদন্তি মতে, তার উজ্জ্বল নীল চোখ তাকে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিতে এবং ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করতে সাহায্য করত। কিন্তু তার ঈর্ষান্বিত উপজাতি শত্রুরা শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যা করে। তার চোখ উপড়ে নেয়, এবং তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে।

কিংবদন্তি নাবিক সিন্দবাদ
আরেকটি বিখ্যাত কিংবদন্তি গল্প, যা বর্তমান ইরাক থেকে আরম্ভ হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই কিংবদন্তি অনুসারে সিন্দবাদ ছিল একজন বিখ্যাত নাবিক ও অভিযাত্রী। তার দুঃসাহসিক অভিযাত্রা আর কাজের অসংখ্য গল্প রয়েছে। সিন্দবাদের সাতটি দুঃসাহসিক অভিযানের গল্পের কথা পাওয়া যায়। এসব গল্পের বেশিরভাগই যাদুকরী প্রাণী আর শক্তিশালী দানবদের নিয়ে তৈরি, যাদের মুখোমুখি হয়েছিল সিন্দবাদ। আর তাদের সাথে মোকাবিলা করে বিজয় লাভ করেছিল।
হারিয়ে যাওয়া শহর মরুভূমির আটলান্টিস
হারিয়ে যাওয়া শহর মরুভূমির আটলান্টিস, যা এখন আরবের একটি পৌরাণিক কাহিনী এবং কিংবদন্তি। পৌরাণিক কাহিনী মতে এটি ছিল আরবের একটি প্রাচীন শহর, যা সৃষ্টিকর্তা একটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটিয়ে ধ্বংস করে দেয়। ফলে এই শহরটি বালির নিচে চাপা পড়েছিল। শহরটিকে ওয়াবার, ইরাম, উবার এবং পিলার অব ইরামসহ অনেক নামে উল্লেখ করা হয়। এই স্থানটি সত্যিই কি পৌরাণিক কাহিনী নাকি বাস্তবে এর অস্তিত্ব আছে কিনা তা নিয়ে পণ্ডিত, ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং অনুসন্ধানকারীদের মধ্যে বেশ বিতর্ক রয়েছে। যদিও এটি দাবি করা হয়েছিল যে শহরটি ১৯৯২ সালে ওমানে আবিষ্কৃত হয়েছিল, তবে খুব কম লোকই বিশ্বাস করে যে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি উবারই ছিল। অনেক অভিযাত্রী এই গল্পের উপর এখনো বিশ্বাস করে চলেছেন এবং হারিয়ে যাওয়া শহরটির অনুসন্ধান করছেন। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে এটি আধুনিক সৌদি আরবের দক্ষিণ মরুভূমির কোথাও অবস্থিত।

পৌরাণিক কাহিনী, রূপকথা, লোককাহিনী, উপকথা বা দৈত্য দানো যা-ই বলি না কেন, এসব তৈরি হয়েছিল মানুষের কল্পনা, বা কল্পকাহিনীর উপর ভিত্তি করে। যদিও এসব কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাক বা না যাক, তারপরও মানুষের মনোব্যাঞ্জনা, আকাঙ্ক্ষা আর আনন্দের জন্য প্রাচীন আরবে এসবের বেশ গুরুত্ব ছিল তা বলাই যায়।
সংক্ষেপে দেখুনলবণ নিয়ে পৃথিবী জুড়ে কত রকম সংস্কার-কুসংস্কার রয়েছে?
লবণের এক জীবাণুনাশক ধর্ম আছে। অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীই তাদের খাদ্যে প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে লবণ ব্যবহার করে থাকে। অল্পমাত্রায় হলেও শরীর রক্ষার জন্য এই যৌগিক পদার্থটি গ্রহণ করা আবশ্যক। শারীরবৃত্তীয় কাজে লবণের এই গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতির জন্যই সেই প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে এসেও মানুষের মনবিস্তারিত পড়ুন
লবণের এক জীবাণুনাশক ধর্ম আছে। অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীই তাদের খাদ্যে প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে লবণ ব্যবহার করে থাকে। অল্পমাত্রায় হলেও শরীর রক্ষার জন্য এই যৌগিক পদার্থটি গ্রহণ করা আবশ্যক। শারীরবৃত্তীয় কাজে লবণের এই গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতির জন্যই সেই প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে এসেও মানুষের মনে আপনা থেকে লবণ নিয়ে কিছু সংস্কার তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে লবণের প্রচলন
প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে লবণ ব্যবহার করতে শুরু করে। হয়তো কিছুটা প্রতীকী ব্যাপার হিসেবেই এটা চালু হয়েছিল। তখনও লোহা এবং লবণ এই দুটো জিনিসের উৎস সম্পর্কে মানুষের তেমন কোনো ধারণা ছিল না। তারা মনে করতো কোনো আধিদৈবিক, অলৌকিক কারণে এসব উপাদান প্রকৃতিতে সৃষ্টি হয়েছে। বস্তুত ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো লবণ ছাড়া চলতোই না। এখনো অনেক ধর্মীয় প্রথায় সে সংস্কার মেনে চলা হয়।

প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে লবণ নিয়ে গড়ে ওঠে নানা সংস্কার
দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে একসময় যেসব প্রাণীকে ‘বলি’ দেওয়া হতো, তাতে নুন মাখিয়ে রাখা হতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, এর ফলে সেই মাংস কখনো বাসী হতো না, তাতে পচন ধরতো না। মায়া সভ্যতায় হিংস্র ও বর্বর অ্যাজটেকরা লবণের এক দেবীকে পুজো করতো। খ্রিস্ট ধর্মে ব্যাপটিজম বা দীক্ষার সময় যে পবিত্র জলে গোসল করানো হয়, সেই জলে লবণ মেশানো থাকে। দীক্ষার পর দীক্ষিত ব্যক্তির মুখে লবণ ছোয়ানোর প্রথা রয়েছে।
বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্য অনুসারে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্নের পর বাড়িতে প্রবেশের পূর্বে কাঁধের উপর দিয়ে লবণ ছিটিয়ে তবেই গৃহে প্রবেশ করতে হয়। কোনো অশুভ আত্মা যাতে তার ওপর ভর করতে না পারে সেজন্যই বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা এই প্রথা মেনে চলেন। শিন্টো মতালম্বীরা তাদের ধর্মীয় কোনো কাজ শুরু করার পূর্বে স্থানটিকে শুদ্ধ করা জন্য লবণপানি ছিটিয়ে দেন।

বৌদ্ধ ধর্মে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্নের পর বাড়িতে প্রবেশের পূর্বে কাঁধের উপর দিয়ে লবণ ছিটানো হয়ে থাকে
ইহুদী উপকথায় লবণের চুক্তিনামার কথা আছে। ঈশ্বর ও ইজরায়েল নামক পবিত্র ভূমির শাশ্বত বন্ধনের কথা নাকি ওই চুক্তিপত্রে বর্ণিত আছে।
বিভিন্ন সমাজে লবণ নিয়ে যত কুসংস্কার
বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সমাজের মানুষের মাঝে লবণ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা সংস্কার। অনেক সমাজে বিয়ের সময় কনের পোশাকের পকেটে একটু লবণ রেখে দেওয়ার রীতি আছে। ওই সামান্য লবণ ভবিষ্যতে নাকি বিশাল সৌভাগ্য নিয়ে আসবে বর-কনের দাম্পত্য জীবনে। গুজরাটিরা নববর্ষে কিংবা বিয়ের কেনাকাটার শুরুতে প্রথমে লবণ কিনে থাকেন, যাতে নববর্ষের অনুষ্ঠান বা বিয়ের অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হতে পারে। দক্ষিণ ভারতীয় অনেক হিন্দুর মধ্যে নব বিবাহিত দম্পতিকে বা কোনো নতুন গৃহে প্রবেশের সময় দম্পতিকে লবণ ছিটিয়ে গৃহে অভ্যর্থনা জানানো হয়।


নব বিবাহিত দম্পতিকে লবণ ছিটিয়ে গৃহে অভ্যর্থনা জানানো হয়
জাপানের সুমো কুস্তিগররা কুস্তির খেলার মঞ্চটিকে লবণ ছিটিয়ে শুদ্ধ করে থাকেন। জীবনে সৌভাগ্য আনয়নের জন্য যুবক জেলে বা নাবিকরা তাদের সমুদ্রযাত্রার আগে পকেটে একটু লবণ ছিটিয়ে নিতো। শুধুই যুবক জেলে বা নাবিকদের জীবনেই লবণ সৌভাগ্য আনে না, সদ্যোজাত শিশুর ক্ষেত্রেও লবণের ওরকম প্রভাব আছে বলে ভাবা হতো। কোনো সদ্যোজাত শিশুর ওপর যাতে ডাইনীর প্রভাব না পড়ে, সেজন্য উপহার হিসেবে লবণ দেয়ার প্রচলন ছিল একসময়। পরবর্তীকালে ধনী ব্যক্তিরা অনেকেই লবণের বদলে শিশুকে একটু রুপো উপহার দিতেন। ধারণা ছিল রুপোর মধ্যেও লবণের এই গুণটি আছে; ডাইনীকে দূরে সরিয়ে রাখার গুণ।
সংস্কার হিসেবে সুমো কুস্তিগিররা খেলার মঞ্চটিকে লবণ ছিটিয়ে শুদ্ধ করে নেন
জেলেদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও মাছ ধরার জালে একটু লবণ ছড়িয়ে দেন। যারা নৌকো তৈরি করেন, তাদের মধ্যেও এ ধরনের একটি প্রথা আছে। নতুন নৌকোর দুটো কাঠের তক্তার মাঝে একটু লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে। তাদের অনেকেই জানেন না, কেন তারা এমন করেন। প্রাচীন সংস্কার থেকেই মূলত তারা এটি করে থাকেন। জেলেদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, নৌকো, জাল নিরাপদে রাখার জন্য এটি তাদের এক নীরব প্রার্থনা। এই প্রার্থনা শক্তিমান সমুদ্র দেবতার প্রতি। তাকে তুষ্ট করার জন্যই এভাবে লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হয়।
মিশরীয়রা তপ্ত মরুভূমির ওপর যাত্রার প্রাক্কালে লবণ পুড়িয়ে তা মরুভূমির বালির ওপর ছিটিয়ে দিতেন। প্রাচীনকালে সন্ধি স্থাপনের সময় পূর্বতন দুই বিবদমান পক্ষই একসঙ্গে মুখে একটু লবণ পুরে দিতেন। দুজনের একসঙ্গে লবণ খাওয়ার অর্থই হলো এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্বের বন্ধনে বাঁধা পড়া। প্রাচীন জাদুকর ও অ্যালকেমিস্টরা ব্ল্যাক ম্যাজিক, বিভিন্ন ভূতের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বোতল ভর্তি লবণ ব্যবহার করতেন। তাদের বিশ্বাস লবণ সেই ভূতদের অবসাদগ্রস্ত ও নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
পাশ্চাত্যে লবণ নিয়ে যত সংস্কার
পাশ্চাত্যের লোকদের মনেও লবণ নিয়ে নানা সংস্কার আছে। ১৪৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরে প্রচুর পরিমাণে লবণ উৎপাদিত হতো। প্রাচীন মিশরে রাজ পরিবারের মৃত ব্যক্তিদেরকে মমি তৈরির কাজে লবণ ব্যবহৃত হতো। একসময় লবণ বেশ মূল্যবান দ্রব্য ছিল। মুদ্রা হিসেবে একসময় লবণের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। প্রাচীন গ্রিসে দাস বেচাকেনায় লবণকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এমনকি রোমান সৈন্যদের বেতন হিসেবে লবণ প্রদান করা হতো। সেখান থেকেই লবণ নিয়ে এক অদ্ভুত ধারণা তৈরি হয়।


প্রাচীনকালে রোমান সৈন্যদের বেতন হিসেবে লবণ প্রদানের প্রথা চালু ছিল
লবণের অপব্যবহার মানে অমঙ্গলকে ডেকে আনা। হঠাৎ খাওয়ার টেবিলে লবণ পড়ে যাওয়ার অর্থ শয়তান ধারেকাছেই কোথাও আছে। অদৃশ্য বাতাসে ভর করে সে কাছে চলে আসবে, কানে ফিস ফিস করে কু মন্ত্রণা দেবে। অমঙ্গল বা শয়তানের অবস্থান বাঁ কাঁধে। তাই লবণের পাত্র থেকে হঠাৎ লবণ পড়ে গেলে শয়তান যাতে কোনো সুযোগ নিতে না পারে, যাতে সে কাছে ঘেঁষতে না পারে, সেজন্য তার চোখ দুটো অন্ধ করে দেওয়ার জন্য এক চিমটি লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হয় বাঁ কাঁধে।
অশুভকে কাছে ঘেঁষতে না দেওয়ার জন্য বাঁ কাঁধে এক চিমটি লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হতো
জার্মানি ও স্কটল্যান্ডের কিছু কিছু জায়গায় পশুপালকরা তাদের গৃহপালিত পশু থেকে উৎপাদিত মাখনের কিছু অংশে লবণ মেখে খামারের আশেপাশে ছড়িয়ে দেন। খামারের পশুদের ওপর কোনো অশুভ প্রভাব যাতে না পড়ে এবং মাখন ও দুধের উৎপাদন যাতে ব্যহত না হয় এজন্য খামার মালিকেরা কাজটি করে থাকেন।
আইরিশদের এবং ইউক্রেনীয়দের বিভন্ন লোকগাঁথা থেকে জানা যায়, অপদেবতার পুজারী, ভয়ঙ্কর জিপসিদের দেখে ভয় পাওয়া বা তাদের দেওয়া কোনো অভিশাপ কাটানোর জন্য জিপসিদের চলে যাওয়ার পর রাস্তায় একটু লবণ ছিটিয়ে দেওয়ার প্রচলন ছিল।

সংক্ষেপে দেখুনমিশরে রাজপরিবারের মৃত ব্যক্তিকে মমি করার সময় লবণ পানিতে মৃতদহেকে গোসল করানো হতো
লবণ নিয়ে এসব সংস্কার বা কুসংস্কার সেই প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে আসছে, যার কিছু কিছু এখনো বিভিন্ন সমাজে চালু রয়েছে। মানুষের এসব সংস্কার এক আদিম বিশ্বাস হতে জাত। এসব বিশ্বাস অধিকাংশ মানুষই না জেনেই আজও বহন করে চলেছে যুগের পর যুগ। যদিও সেই বিশ্বাসের অনেকটুকুই এখন শুধু মজার গল্প হিসেবে ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।
আনুবিস: প্রাচীন মিশরের শিয়াল দেবতা। কি তার ইতিহাস ?
সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট ফেলুদা সিরিজের প্রথমদিকের একটি গল্পের নাম ছিল ‘শিয়াল দেবতা রহস্য’। সেই গল্পে প্রাচীন মিশরীয় দেবতা ‘আনুবিস’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বিখ্যাত লেখকদের গল্প, উপন্যাস বা মিশরীয় উপকথাই হোক, ইতিহাসের পাতায় আনুবিস সুপরিচিত ও জনপ্রিয় এক নাম। কিংবদন্তিতে বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন তিনি। শিবিস্তারিত পড়ুন
সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট ফেলুদা সিরিজের প্রথমদিকের একটি গল্পের নাম ছিল ‘শিয়াল দেবতা রহস্য’। সেই গল্পে প্রাচীন মিশরীয় দেবতা ‘আনুবিস’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বিখ্যাত লেখকদের গল্প, উপন্যাস বা মিশরীয় উপকথাই হোক, ইতিহাসের পাতায় আনুবিস সুপরিচিত ও জনপ্রিয় এক নাম। কিংবদন্তিতে বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন তিনি। শিয়ালের মুখাবয়ব ও মানুষের দেহ সম্বলিত দেবতা আনুবিস হচ্ছেন মমিকরণ প্রক্রিয়া ও মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের মিশরীয় দেবতা। এছাড়াও তিনি হারানো আত্মা ও অসহায়দের সাহায্য করে থাকেন। ধারণা করা হয়, তিনি সম্ভবত পূর্বের শিয়াল দেবতা ওয়েপওয়াটেট থেকে বিকশিত হয়েছেন, এবং ওয়েপওয়াটেটের সাথে তাকে প্রায়শই গুলিয়ে ফেলা হয়। মিশরে তখন শিয়ালেরা কবর খুঁড়ে মৃতদেহ ছিন্নভিন্ন করে ফেলত। সেজন্য প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, শেয়াল দেবতা সেই শেয়ালদের হাত থেকে কবরের লাশগুলোকে রক্ষা করতে পারবেন। মিশরের প্রাক-রাজবংশীয় যুগের কোনো একসময় বন্য কুকুর এবং শিয়ালের হাত থেকে রাজকীয় কবরগুলোতে সর্বোত্তম সুরক্ষা দেওয়ার জন্য দেবতা আনুবিসের ধারণার উদ্ভব ঘটে।
আবার অনেক মিশর-তত্ত্ববিদ বলেন, মিশরের অধিবাসীরা বিশ্বাস করত- কোনো ব্যক্তির মৃতদেহের সাথে কুকুর সমাহিত করা হলে ওই কুকুর তার হয়ে আনুবিসের কাছে সুপারিশ করবে। সেই কারণে ব্যক্তির মৃতদেহের সাথে কুকুরকেও সমাহিত করত তারা। খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০ থেকে ৩০ অব্দ পর্যন্ত এই পশু-সমাধি প্রথায় বিশ্বাসী ছিল মিশরীয়রা। মিশরের প্রথম রাজবংশের রাজকীয় সমাধিতেও আনুবিসের মূর্তির সন্ধান মেলে। ওসাইরিস পুরাণ বিকশিত হবার আগপর্যন্ত আনুবিস ছিলেন মৃতদের দেবতা। কিন্তু ওসাইরিস পরবর্তীতে এই দায়িত্ব নেবার পর আনুবিস মমিকরণ দেবতার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।



দেবতা আনুবিস
মিশরীয় উপকথা অনুযায়ী, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মমি তৈরি করেছিলেন দেবতা আনুবিস। কাহিনিটি এমন- দেবতা গেব এবং তার বোন আকাশ ও স্বর্গদেবী নুট বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের গভীর প্রণয়ের ফলে জন্ম হয় আইসিস, ওসাইরিস, সেথ, ও নেপথিস নামক চার দেব-দেবীর। এদের মধ্যে নেপথিস সেথকে এবং আইসিস বিয়ে করেন ওসাইরিসকে। সূর্যদেবতা ‘রা’-কে যখন বার্ধক্য কিছুটা নুইয়ে ফেলে, তখন তিনি ওসাইরিসকে শাসনকার্যের ভার বুঝিয়ে দিয়ে সূর্যরথে চড়ে পাড়ি দেন স্বর্গে। ওসাইরিসের রাজত্বকালে মিশরের সবখানেই সুখ-শান্তি ছড়িয়ে ছিল। প্রচণ্ড ভ্রমণপিপাসু হওয়ায় ওসাইরিস প্রায়শই রানী আইসিসকে সাময়িকভাবে রাজ্যভার অর্পণ করে ভ্রমণে বের হতেন। এমনি এক ভ্রমণে ওসাইরিস তার সহোদর সেথের স্ত্রী নেপথিসের সঙ্গে গোপনে মিলিত হন। ফলে নেপথিসের গর্ভে আসেন আনুবিস। জানতে পেরে সেথ ক্ষিপ্ত হয়ে ওসাইরিসকে হত্যা করেন। হত্যার পর তার শরীর ৪২ টুকরা করে মিশরের ৪২টি অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে দেন। এরপর সেথ সিংহাসন দখল করে ফেলেন। শান্তিভূম মিশরে নেমে আসে ঘোর অশান্তির কালো ছায়া।
আনুবিস, আইসিস, এবং ফারাও তুতেনখামুন
ওসাইরিসের স্ত্রী দেবী আইসিস জানতেন, শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান ছাড়া তার স্বামীর আত্মা স্বর্গে আরোহণ করতে পারবে না। তাই, আইসিস ও নেপথিস বাজপাখির রূপ নিয়ে, পুরো মিশর খুঁজে ওসাইরিসের শরীরের ৪২টি অংশ উদ্ধার করেন। এরপর জাদু দিয়ে ৪২টি টুকরা একত্র করা হয়। আইসিস তার স্বামী ওসাইরিসের মৃতদেহ উদ্ধার করার পর, সূর্যদেবতা আনুবিসকে মৃতদেহটি মমি করার নির্দেশ দেন। জ্ঞানের দেবতা থোথের সহায়তায় আনুবিস ওসাইরিসের শবদেহ কাপড়ে মুড়িয়ে দেন। তারপর আনুবিস তার পিতার লাশ সংরক্ষণের জন্য প্রথম মমি তৈরি করেন। এভাবেই মিশরের মাটিতে তৈরি হয় প্রথম মমি। যথারীতি ‘Opening of the mouth’ অনুষ্ঠানটি সম্পন্নের পর ওসাইরিসকে সমাহিত করা হয়। এই ঘটনার পর থেকেই আনুবিসকে মমিকরণের দেবতা বলা হয়।
মৃতদেহ মমি করছেন আনুবিস
এই মমিকরণ প্রক্রিয়ার সময় সেথের সাথে আনুবিসের প্রচণ্ড লড়াই বেধে গিয়েছিল। মমিকরণের সময় ওসাইরিসের মৃতদেহ মমি করার স্থানে রাখেন আনুবিস। যেহেতু মমিকরণ প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ সময়ের এক কাজ, তাই প্রতি রাতেই আনুবিস কাজ শেষ করে ওই স্থান ত্যাগ করতেন। ব্যাপারটা সুচতুর দৃষ্টিতে পরখ করলেন দেবতা সেথ। তার উদ্দেশ্য ছিল ওসাইরিসের মৃতদেহ চুরি করা। তাই একরাতে তিনি আনুবিসের রূপ ধারণ করে সেখান থেকে ওসাইরিসের মৃতদেহ চুরি করেন। তবে সেথ মৃতদেহ নিয়ে বেশিদূর যেতে পারেননি। এর আগেই টের পেয়ে যান আনুবিস, এবং সেথকে ধাওয়া করেন। আনুবিসের হাত থেকে বাঁচতে ষাঁড়ের রূপ ধারণ করেন সেথ। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। আনুবিস তাকে ধরে নিয়ে নপুংসক বানিয়ে দেন। তারপর বন্দী করে রাখেন মিশরের সপ্তদশ নোমে সাকারাতে।
বন্দিত্বের দশা বরণ করে নেবার পর সেখান থেকে পালানোর ফন্দি আঁটতে থাকেন সেথ। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি বিশাল এক বিড়ালের রূপ ধারণ করলেন। কিন্তু এবারও তিনি আনুবিসকে ফাঁকি দিয়ে বের হতে পারলেন না। ধরা খাওয়ার পর আনুবিস তাকে টকটকে লাল লোহা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সেঁক দিলেন। চিতাবাঘের শরীরে কীভাবে ছোপ ছোপ দাগের জন্ম হয়েছে- প্রাচীন মিশরের এই কিংবদন্তি থেকেই সে কাহিনী বর্ণনা করা হতো।
এরপরেও ক্ষান্ত হননি সেথ। তিনি বিভিন্ন কায়দা ও কৌশলে ওসাইরিসের মৃতদেহ চুরির চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এবারও তিনি ব্যর্থ হয়ে আনুবিসের হাতে ধরা পড়লেন। তবে, এবার আর আনুবিস ছোটখাট শাস্তির ধার ধারেননি। তিনি হত্যা করলেন সেথকে। তার শরীর থেকে চামড়া ছাড়িয়ে শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। এরপর সেথের পুরো ফৌজকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে তিনি সেথের শিবিরে প্রবেশ করে তরবারির এক কোপে সেথের পুরো বাহিনীর শিরশ্ছেদ করলেন।

আনুবিসের মূর্তি (আনুমানিক ১০০ খ্রিস্টাব্দ – ১৩৮ খ্রি.পূ.)
কিছু জনশ্রুতি অনুসারে, আনুবিস ছিলেন দেবতা রা-র পুত্র। প্রথমদিকে তিনি মৃতদের প্রাথমিক দেবতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সময়ের সাথে সাথে ওসাইরিসের ধর্মীয় উপাসনার গুরুত্ব বাড়তে থাকলে, আনুবিসের কাহিনী ওসাইরিস পুরাণের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে নয়া ওসাইরিস পুরাণ (খ্রি.পূ. ২০০০ অব্দ নাগাদ) অনুসারে, আনুবিস হয়ে উঠেছিলেন ওসাইরিস এবং নেপথিসের জারজ সন্তান। নেপথিস তার স্বামী সেথের ভয়ে আনুবিসকে গোপনে পরিত্যাগ করেন। এতিম আনুবিসকে তখন পরিত্যক্ত অবস্থায় খুঁজে পান দেবতা আইসিস। তাকে দেখে মনের কোণে মায়া জাগে আইসিসের। পরবর্তীতে তিনি আনুবিসকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে, বেশ কিছু প্রাচীন মিশরীয় কিংবদন্তি অনুসারে, আনুবিস সত্যিকার অর্থেই সেথের ঔরসজাত সন্তান ছিল। সেসকল কিংবদন্তি অনুযায়ী, সেথের দ্বারা গর্ভবতী হবার পর নেপথিস সেথের কাছ থেকে সে খবর লুকিয়ে রাখে। কারণ, সন্তানসম্ভবা নেপথিস ভাবতেন, সেথের সংস্পর্শে এলে তার সন্তানও সেথের মতো রূঢ় ও বেপরোয়া স্বভাবের হয়ে উঠবে। তখন তিনি গোপনে আনুবিসকে আইসিসের কাছে দত্তক দেন।
আনুবিসকে নিয়ে ‘দুই ভাইয়ের গল্প’ নামে আরও একটি গল্প চালু আছে। সেই গল্পে আনুবিসের বাটা নামে এক অনুজ ছিল। বাটা ছিলেন প্রাচীন মিশরের একজন আঞ্চলিক দেবতা, যিনি সময়ের সাথে সাথে মিশরীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনের কারণে কালের গর্ভের হারিয়ে গেছেন। যেসব পুরাণে আনুবিসকে ওসাইরিসের সন্তান হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেসব পুরাণে, আনুবিসের ভাই হিসেবে হোরাস, সোপডেপ, বাবি, এবং ওয়েপওয়াওয়েটের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

আনুমানিক ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শবাধারে অঙ্কিত আনুবিসের চিত্র
মিশরীয় জনশ্রুতি অনুসারে, মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির সামনে প্রথমেই যে দেবতা হাজির হন, তিনি হলেন মৃতের জগতের অধিকর্তা দেবতা আনুবিস। মারা যাওয়ার পর মৃত ব্যক্তি বাকশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। আনুবিস তাকে সেই ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন। মৃতের গ্রন্থের ১২৫ নং মন্ত্র অনুযায়ী, সেই মৃত ব্যক্তিকে অনন্তকালের পথ প্রদর্শনের কাজটা করে থাকেন দেবতা আনুবিস। মৃত ব্যক্তি আকাশের তারায় পরিণত হতে পারবেন কি না, তা বিচারের ভার আনুবিসের ওপরে। আনুবিসের হাতে থাকে পালকযুক্ত দণ্ড, যা দিয়ে মূলত মৃতের বিচার করা হয়।
সহজে চেনার জন্য আনুবিসের মধ্যে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও চিহ্ন বিদ্যমান ছিল। অধিকাংশ মিশরীয় দেবতাদের মতো তার একটি মানবদেহ ছিল, তার ঘাড়ের উপর বসানো ছিল শিয়ালের মাথা। পেছন দিক দিয়ে শেয়ালের মতো একটি লেজও ছিল তার। তার শরীরের রঙ ছিল কালো। তাঁকে প্রায়শই একটি আসনে বসা অবস্থায় চিত্রিত করা হয়। অধিকাংশ মিশরীয় দেবতাদের মতো তিনিও নিজ আকৃতি মুহূর্তেই পরিবর্তন করতে পারতেন। দেবতা ওসাইরিসের মৃতদেহ দেখে তিনি এতটাই মর্মাহত হয়েছিলেন যে, তখন সাথে সাথে তিনি নিজেকে গিরগিটিতে রূপান্তর করে ফেলেন।

দেবতা আনুবিসের মূর্তি
প্রাচীন মিশরীয় সংস্কৃতি শেষদিকে এসে অনেকটা গ্রিক সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়েছিল। আজ মিশরীয় দেবতারা যেসকল নামে ইতিহাসের পাতায় পরিচিত, তার অধিকাংশই গ্রিকদের দেওয়া, এবং তা এসেছে গ্রিক অনুবাদ থেকে। গ্রিকরা মিশরীয় দেবতাদের পৃষ্ঠপোষকতা করলেও, দেব-দেবীদের নামকরণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতার পরিচয় দেয়নি। এর অন্যতম এক কারণ হতে পারে, প্রাচীন মিশরীয়দের মধ্যে স্বরবর্ণহীন লিখনপদ্ধতি চালু ছিল। তাই গবেষকদের অনুমান অনুযায়ী, তৎকালীন প্রাচীন মিশরে আনুবিসকে ‘আনপু’ বা ‘ইনপু’ বলে ডাকা হতো। দেবতা আনুবিসের কন্যা কেবেচেতকে প্রাচীন মিশরীয়রা ক্বেবেহেত, কেবহুত, কেবেহুত, ক্বেবেহুত ও কাবেচেত নামেও ডাকত। তিনি ছিলেন সজীবতা ও বিশুদ্ধতার দেবী।
সম্ভবত আনুবিসের প্রার্থনার জন্য প্রাচীন মিশরে আলাদাভাবে কোনো মন্দির নির্মাণ করা হয়নি। কারণ, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই দেবতার প্রতি নিবেদিত কোনো মন্দির খুঁজে পাননি। তাই কবরস্থান ও সমাধিগুলোকেই তার মন্দির হিসেবে ধরা হয়। প্রাচীন মিশরের প্রথম রাজবংশের মাস্তাবাতে তার নামের সন্ধান মিলেছে। যেমন, সাক্কারার পূর্ব দিকে অবস্থিত আনুবিয়নের এক উপাসনালয়ে মমি-কৃত কুকুর ও শিয়ালের অস্তিত্ব মিলেছে। ধারণা অনুযায়ী, প্রথম রাজবংশের রাজত্বকালে তাকে ওসাইরিসের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরবর্তী রাজবংশগুলোতে ধর্মীয় ভাবধারা বা দেবপূজার পরিবর্তন ঘটলেও, আনুবিস ছিলেন সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ দেবতাদের মধ্যে অন্যতম।

সংক্ষেপে দেখুনআনুবিস হুনেফারকে বিচারসভায় নিয়ে আসছেন
মিশরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে নয়জন আদি দেব-দেবীর কথা বলা হয়েছে। এদেরকে একত্রে এননিয়াড নামে অভিহিত করা হয়। আনুবিস ছিলেন এননিয়াডের মধ্যে অন্যতম। টলেমি শাসনামলে (৩০০ খ্রিস্টাব্দ – ৩০ খ্রি.পূ.), যখন মিশর গ্রিক ফারাওদের অধীনস্থ ছিল, তখন আনুবিসের নাম গ্রিক দেবতা হারমেসের সাথে মিশিয়ে ‘হারমানুবিস’ নামে এক দেবতার উৎপত্তি ঘটে। কারণ, দুজন দেবতার কাজের মাঝে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুজনেই মৃত্যুর পর আত্মাকে পরকালের পথ দেখাতেন। দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচীন রোমে এই দেবতার পূজা করা হতো, এমন তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে।
আফ্রোদিতি কে ছিলেন ?
সৃষ্টিজগতের অন্যতম আরাধ্য বোধহয় রূপ ও গুণ! দেব-দেবী থেকে শুরু করে মানুষ, সবাই রূপ ও গুণের পূজারী। সৃষ্টির সবাই সৌন্দর্যের প্রতি চরমভাবে আকৃষ্ট। নারীর সৌন্দর্যে ডুব দিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায় জগতের প্রতিটি পুরুষই। সুন্দরী নারীর প্রতি যৌনতা ও ভালোবাসা অনুভব করা পুরুষের সহজাত প্রবৃত্তি। সুন্দরী নবিস্তারিত পড়ুন
সৃষ্টিজগতের অন্যতম আরাধ্য বোধহয় রূপ ও গুণ! দেব-দেবী থেকে শুরু করে মানুষ, সবাই রূপ ও গুণের পূজারী। সৃষ্টির সবাই সৌন্দর্যের প্রতি চরমভাবে আকৃষ্ট। নারীর সৌন্দর্যে ডুব দিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায় জগতের প্রতিটি পুরুষই। সুন্দরী নারীর প্রতি যৌনতা ও ভালোবাসা অনুভব করা পুরুষের সহজাত প্রবৃত্তি। সুন্দরী নারীর প্রতি ভালোবাসা ও কামনা অনুভব করে না এমন পুরুষ নেই। গ্রিক উপকথা সৌন্দর্য ও ভালোবাসার ধারণাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। সেখানে সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও যৌনতা যার মাধ্যমে অন্য মাত্রা পেয়েছে তিনি আফ্রোদিতি। রোমান উপকথায় আফ্রোদিতিকে ভেনাস নামে অভিহিত করা হয়েছে।

সৌন্দর্য, কাম ও ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি গ্রিক পুরাণের অন্যতম প্রভাবশালী দেবী
গ্রিক মিথোলজির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিখ্যাত ১২ দেব-দেবীকে অলিম্পিয়ান নামে অভিহিত করা হয়। প্রথম যুগের টাইটানদের পর এই ১২ জন দেব-দেবী ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেন। অলিম্পাস পাহাড়ে তাদের বসবাস ছিল বলে তাদের অলিম্পিয়ান নামে ডাকা হয়। তারা গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রাচীন গ্রীকদের জীবনে দারুণ প্রভাব রেখেছেন।
গ্রিক পুরাণের এই অলিম্পিয়ান দেবদেবীদের অন্যতম হলেন সৌন্দর্য ও ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি। তার রূপে, গুণে মুগ্ধ হয়েছে দেবতা থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত সকলেই। তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা করেছে স্বর্গ থেকে শুরু করে মর্ত্যের অনেকেই। আফ্রোদিতিও স্বর্গ-মর্ত্যের অনেককে যৌনসুখ দিয়েছেন। প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি প্রেমও করেছেন অনেক দেবতা ও মানুষের সঙ্গে।
হেসিয়ডের বর্ণনানুযায়ী, আফ্রোদিতি হলেন সবচেয়ে প্রাচীন অলিম্পিয়ান। তিনি সমুদ্রকে শান্ত করেন, তৃণভূমিগুলোকে ফুল দিয়ে সতেজ করেন। এমনকি, তার কথায় ঝড় থেমে যায়। বন্য প্রাণীরাও তার বশ্যতা স্বীকার করে। এই কারণেই তার প্রধান প্রতীকগুলো সাধারণত প্রকৃতি থেকে আসা, যার মধ্যে রয়েছে গোলাপ, ঘুঘু, চড়ুই এবং রাজহাঁস।
সমস্ত দেব-দেবীর মধ্যে আফ্রোদিতি সবচেয়ে বেশি কামুক এবং যৌনতায় পরিপূর্ণ। এজন্য অনেক ভাস্কর্য ও চিত্রকর্মে তাকে নগ্নভাবে দেখানো হয়। লম্বা সোনালি চুলগুলো তার পিঠের নিচে প্রবাহিত হয়।
আফ্রোদিতির জন্ম নিয়ে বেশ কয়েকটি গল্প প্রচলিত রয়েছে। অনেকে বলে, তিনি দেবরাজ জিউসের কন্যা, আবার কারো কারো মতে জিউসের আগেই আফ্রোদিতির অস্তিত্ব ছিল। সবচেয়ে প্রচলিত ও বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, আফ্রোদিতি ছিলেন ইউরেনাসের কন্যা। উপকথা অনুযায়ী, দেব-দেবীদের জন্মের আগে আদিম বিশৃঙ্খলা ছিল। সেই আদিম বিশৃঙ্খলা থেকে গাইয়া, আর্থ বা পৃথিবীর দেবীর জন্ম হয়। একসময় ইউরেনাস গাইয়ার সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে এবং বারোজন টাইটান, তিনটি সাইক্লোপস, এক চোখের দৈত্য এবং পঞ্চাশটি মাথা ও ১০০ হাতসহ তিনটি দানবীয় হেকাটোনচায়ার জন্ম হয়। কিন্তু ইউরেনাস তার সন্তানদের ঘৃণা করতেন। তিনি তার এই সন্তানদের অস্তিত্বে খুশি ছিলেন না, বরং ক্ষুব্ধ ছিলেন।
এরপরও ইউরেনাস গাইয়াকে বার বার তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করতে বাধ্য করে। কিন্তু যখন তাদের মিলনের ফলে দানব শিশুর জন্ম হতে থাকে, তখন সেই শিশুদের তিনি গ্রহণ করতেন না। ফলে গাইয়া ইউরেনাসকে ঘৃণা করতে শুরু করেন। শেষে নিরুপায় হয়ে গাইয়া তার শিশুদের কাছে সাহায্য চায়। আর্থের শিশুদের মধ্যে ক্রোনাস অত্যন্ত সাহসী ছিল। যখন ইউরেনাস এসে আবার গাইয়ার সাথে শুয়ে পড়ে, তখন অদম্য সাহসী ক্রোনাস তার পিতার যৌনাঙ্গ কেটে সমুদ্রে ফেলে দেয়।

সর্বকনিষ্ঠ টাইটান ক্রোনাস তার পিতার যৌনাঙ্গ কেটে সমুদ্রে ফেলে দেন
আরেক মত অনুযায়ী, ইউরেনাস যখন ঘুমিয়ে ছিল তখন গাইয়া ক্রোনাসের হাতে একটি কাস্তে তুলে দেন এবং ক্রোনাস সেই কাস্তে দিয়ে ইউরেনাসের যৌনাঙ্গ কেটে দেয়। ইউরেনাসের সেই যৌনাঙ্গ সাইথেরার কাছে গিয়ে পড়ে এবং সমুদ্রের স্রোতে সেই যৌনাঙ্গ সাইপ্রাস দ্বীপের উপকূলে চলে যায়। ইউরেনাসের যৌনাঙ্গ থেকে সৃষ্ট সমুদ্রের ফেনা থেকে একটি সুন্দরী মেয়ের জন্ম হয়। সেই কন্যা যখন দ্বীপে পা রাখে, তার পায়ের নীচ থেকে ঘাস ঝরছিল। সেই কন্যাই সৌন্দর্য ও ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি।
গ্রিক ভাষায় ‘আফ্রোস’ শব্দের অর্থ ‘ফেনা’। সমুদ্রের ফেনা থেকে জন্ম হয়েছিল বলে তাকে আফ্রোদিতি নামে ডাকা হয়। গ্রিক ভাষায় আফ্রোদিতি শব্দের অর্থই হলো ‘সমুদ্রোদ্ভুতা’, মানে যার জন্ম সমুদ্র থেকে হয়েছে। এভাবে সাইথেরার লেডি, সাইপ্রাসের লেডি এবং প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি প্রথম আদিম দেবী হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রিক কবি হিসিওড এই মতের পক্ষে। আরেক বিখ্যাত গ্রিক কবি হোমারের মতে, আফ্রোদিতি দেবরাজ জিউস ও দেবী ডিওনের কন্যা। দার্শনিক প্লেটো আফ্রোদিতি সম্পর্কে আরেক তত্ত্ব দেন। তার মতে, দেবালয়ে আফ্রোদিতি নামে দুজনের অস্তিত্ব ছিল। এর একজন ছিল ‘স্বর্গীয় প্রেমের দেবী’, অপরজন ‘দৈহিক প্রেমের দেবী’।
প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির অনেক পুরুষের সঙ্গে প্রেম ছিল। তিনি যদিও বিয়ে করেছিলেন শিল্পের দেবতা হেফাস্টাসকে, তথাপি তিনি অনেকের সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন। আফ্রোদিতি যখন অলিম্পাসে অবতরণ করেন, তখন সেখানকার সবাই আফ্রোদিতির সৌন্দর্যে দিশেহারা। সেখানে তখন এক বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়। এমতাবস্থায় বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে এবং কোনোরকম যুদ্ধ এড়াতে দেবরাজ জিউস ও বিয়ের দেবী হেরা আফ্রোদিতিকে শিল্প ও আগুনের দেবতা হেফাস্টাসের সঙ্গে বিয়ে দেন। হেফাস্টাস ছিলেন খোঁড়া এবং কুৎসিত চেহারার। আফ্রোদিতি তার সঙ্গে সুখী ছিলেন না। ফলে তিনি শুরু করলেন পরকীয়া।

কামার দেবতা হেফাস্টাস ছিলেন আফ্রোদিতির স্বামী
স্ত্রীর পরকীয়ার কথা জানতে পেরে হেফাস্টাস তাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করতে থাকেন। দেবালয়ের কামার এবং শিল্পের দেবতা হেফাস্টাস এমন একটি বিছানা তৈরি করেন যেখানে কেউ শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হলে সোনার শেকলে আটকা পড়বে। আফ্রোদিতির প্রেমিক ছিলেন যুদ্ধের দেবতা অ্যারিস। অ্যারিস ও আফ্রোদিতির অনেক সন্তানও ছিল। একদিন হেফাস্টাসের তৈরি সেই বিছানায় আফ্রোদিতি ও অ্যারিস যৌনসম্পর্কে আবদ্ধ হলে তারা সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় শেকলে আটকা পড়েন। শেষপর্যন্ত সমুদ্রদেবতা পসাইডন তাদের এই অপ্রীতিকর অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন।
এছাড়াও আফ্রোদিতি আরো অনেক দেবতার সঙ্গে প্রেম ও শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন পসাইডন ও হার্মিস। শুধু দেবতাই নয়, মানুষের সঙ্গেও প্রেমের সম্পর্ক ছিল আফ্রোদিতির। অ্যাডোনিসসহ কয়েকজন মানুষের সঙ্গে তার প্রেম ছিল।

গ্রিক উপকথার সমুদ্রদেবতা পসাইডন ছিলেন আফ্রোদিতির প্রেমিক
ট্রোজান যুদ্ধের জন্য পরোক্ষভাবে হলেও আফ্রোদিতি অনেকাংশেই দায়ী ছিলেন। এই ঘটনার সূত্রপাত দেবতাদের এক বিয়েতে। দেবতা পেলেউস ও থেটিসের বিয়েতে ‘বিবাদের দেবী ইরিস’ একটি সোনার আপেল নিয়ে আসেন এবং সবচেয়ে সুন্দরী দেবীকে দেওয়ার কথা জানান। এই প্রতিযোগিতায় অ্যাথেনা, হেরা এবং আফ্রোদিতিই ছিলেন সবার শীর্ষে। দেবরাজ জিউসের আদেশে ট্রোজান রাজপুত্র প্যারিসের উপর এই প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্ব বর্তায়।
সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতি নিজেকে এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী নারী বলে বিশ্বাস করতেন। অন্য কেউ তার চেয়ে বেশি সুন্দরী হতে পারে এটা তিনি মানতেই পারতেন না। ফলে এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার জন্য তিনি উঠে-পড়ে লাগেন। আফ্রোদিতি প্যারিসকে বলেন, প্যারিস যদি তাকে সেরা সুন্দরী হিসেবে ঘোষণা দেয় তবে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে তার প্রেম করিয়ে দেবে। প্যারিসও এই প্রস্তাব ফেলতে পারেনি।

ট্রয়ের যুবরাজ প্যারিসকে স্বর্গের দেবীদের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার বিচারক করা হয়
সেই প্রতিযোগিতায় প্যারিস আফ্রোদিতিকে সেরা সুন্দরী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে দেবীও তার কথামতো স্পার্টার রানী হেলেনের সঙ্গে প্যারিসের প্রেম ঘটিয়ে দেন। হেলেন ছিলেন স্পার্টার রাজা মেনেলাওসের স্ত্রী। হেলেনের প্রেমে অন্ধ প্যারিস তখন তাকে নিয়ে নিজের শহর ট্রয়ে পালিয়ে আসেন। মেনেলাওস তার ভাই আগামেমননকে ট্রয় দখল করে হেলেনকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়। ফলস্বরূপ শুরু হয় ট্রয়ের যুদ্ধ।
গ্রিক উপাখ্যানের সৌন্দর্য ও ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতিকে নিয়ে যুগ যুগ ধরে বহু গল্প ও আখ্যান তৈরি হয়েছে। সেই প্রাচীন গ্রিস থেকে এখনো পর্যন্ত শিল্পী ও সাহিত্যিকরা আফ্রোদিতির রূপ নিয়ে মাতামাতি করেন। নিঃসন্দেহে আফ্রোদিতি গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেব-দেবীদের অন্যতম একজন। তিনি গ্রিক তথা পশ্চিমা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক চিত্তাকর্ষক চরিত্র।
সংক্ষেপে দেখুনইউনিকর্ন: উপকথার অলৌকিক আকর্ষণ। কোথায় উদ্ভব এর?
তাকে নিয়ে মানুষ যতটা বুঁদ হয়েছে ইতিহাস জুড়ে, অন্য কোনো প্রাণী নিয়ে ততটা হয়নি। বিভিন্ন সংস্কৃতির উপকথায় দুর্দান্ত সব আখ্যানের অন্যতম আকর্ষণ এটি। প্রাচীন গ্রীস থেকে ভারত, মেসোপটেমিয়া থেকে চীন- কোথায় আলোচিত হয়নি? এরিস্টটল, টিসিয়াস, প্লিনি, স্ট্র্যাবো কিংবা মার্কো পলোর মতো পণ্ডিতেরা পর্যন্ত তার অস্তিত্ববিস্তারিত পড়ুন
তাকে নিয়ে মানুষ যতটা বুঁদ হয়েছে ইতিহাস জুড়ে, অন্য কোনো প্রাণী নিয়ে ততটা হয়নি। বিভিন্ন সংস্কৃতির উপকথায় দুর্দান্ত সব আখ্যানের অন্যতম আকর্ষণ এটি। প্রাচীন গ্রীস থেকে ভারত, মেসোপটেমিয়া থেকে চীন- কোথায় আলোচিত হয়নি? এরিস্টটল, টিসিয়াস, প্লিনি, স্ট্র্যাবো কিংবা মার্কো পলোর মতো পণ্ডিতেরা পর্যন্ত তার অস্তিত্বের পক্ষে সাফাই গেয়ে গেছেন।

উপকথার অন্যতম নায়ক ইউনিকর্ন
ইউনিকর্ন, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পৌরাণিক প্রাণী। তার মধ্যে এমন অনেক গুণাবলি বিদ্যমান, যা যে কারো কাছে পরম মূল্যবান। তাদের গতি আলোর গতির সাথে তুলনীয়। সাধারণ সময়ে শান্ত ও পবিত্র হলেও প্রয়োজনে প্রচণ্ড বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী। শক্তিতে কোনো ইউনিকর্নকে আটক করা একেবারেই অসম্ভব।
মোটা দাগে ইউনিকর্ন
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মতামত দেওয়া হয়েছে ইউকর্নকে উপস্থাপন করার জন্য। খুব সাধারণ বর্ণনা মতে, সাদা বড় ঘোড়ার মতো দেখতে এরা। ঠিক কপালের মাঝখানটাতে আছে পেঁচানো লম্বা শিং, যার অগ্রভাগের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে উঠে গেছে। পৌরাণিক লেখকদের প্রথম দিকের লেখকেরা কেউ কেউ তাকে বেগুনী বর্ণের মাথার অধিকারী বলেছেন। কেউ বলেছেন, সিংহের লেজের মতো লেজের কথা। সেই সাথে ছাগলের দাঁড়ির মতো দাঁড়িও সংযুক্ত করা হয়েছে কারো বর্ণনায়। গ্রীক পণ্ডিত টিসিয়াস বলেছেন- প্রাণীটা গাধার মতো। যার লাল মাথা, নীল চোখ এবং সাদা শরীর। তিরিশ সেন্টিমিটার লম্বা শিংয়ের গোড়ায় সাদা, মাঝখানে কালো এবং ডগায় লাল। প্লিনির বর্ননা মতে, ইউনিকর্নের মাথা হরিণের ন্যায়। শূকরের লেজের মতো লেজ এবং শিং এক মিটার লম্বা।

ইউনিকর্নের ধারণায় তফাৎ ছিল যুগ ভেদে ও সংস্কৃতি ভেদে
তারপরেও একটা বিষয়ে প্রায় সবাই একমত। ইউনিকর্নের অলৌকিক ক্ষমতার জন্য মানুষ তাকে খুঁজেছে হন্যে হয়ে। অভিজাতরা তাদের আভিজাত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য কিংবা শত্রুর কুনজর থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য কৌতূহলী হয়ে উঠেছে তার শিং-এর আশায়। সামর্থহীনরাও প্রত্যাশা করেছে নিজেদের ভাগ্য উন্নোয়নে। গড়ে উঠেছে অন্যরকম এক ব্যবসা। যদিও প্রায়শ শিংগুলো হয় গণ্ডার ধাঁচের। কিন্তু তারপরেও তা অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি করেছে ভিন্নভাবে। জিনিসটার আশির্বাদ তখন ছিল স্বর্ণ কিংবা যেকোনো মূল্যবান পাথরের চেয়েও মূল্যবান।
চীনের ইউনিকর্ন
চীনা উপকথায় বিশেষ এক জন্তুর নাম কি-লিন। কি-লিনকে নেওয়া যায় চীনের ইউনিকর্ন হিসেবে। যদিও গ্রীক উপকথার কাইমেরার সাথেও কি-লিনের মিল বিদ্যমান। কি-লিনের শরীর দেখতে হরিণের মতো কিন্তু মাথাটা সিংহের। সবুজ আঁশ দিকে ঢাকা শরীর। একটা লম্বা শিং মাথার ঠিক মধ্যভাগে স্থিত। জাপানি উপকথায় কিরিন নামে যে জন্তুর ধারণা, তা চীনা কি-লিন থেকেই এসেছে বলে মনে করা হয়।

কি-লিন, চীনা উপকথার ইউনিকর্ন
কি-লিনকে শান্তিপ্রিয় এবং অলৌকিক হিসাবে গণ্য করা হয়। সে সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে যাবার সময় একটা পাতাও ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। তারপরেও তাদের যাতায়াত অধিকাংশ সময় মেঘ কিংবা পানির উপর দিয়ে। একটা মানুষ ভালো না খারাপ, তার দিকে তাকিয়েই বুঝে নিতে সক্ষম তারা। সাধারণ সময়ে শান্ত হলেও মন্দ লোকদের শাস্তি দেবার জন্য তারা নিজের অমেয় শক্তির প্রকাশ ঘটায়। ইউনিকর্নের মতোই তাকে উর্বরতা ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসাবে দেখা হয়। তারা শিল্পকলায় উঠে এসেছে নবদম্পতির জন্য সন্তান দানকারী হিসাবে।
আফ্রিকান সংস্কৃতি
কঙ্গো উপকথায় আবাদা নামে ইউনিকর্ন সদৃশ প্রাণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। আকারে গাধার মতো এবং শূকরের লেজের মতো লেজ বিদ্যমান। তবে একটি না, এদের শিং দুটি। এই শিং নানা রোগের প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করে। বিশেষ ভাবে তার শিং বিষের প্রতিষেধক হিসাবে সবথেকে ফলপ্রসূ। যেমনটা বর্ণনা করা হয়েছে ইউনিকর্নের ক্ষেত্রে।
দক্ষিণ আমেরিকা
চিলির উপকথায় ক্যামাহুয়েতো অনেকটা ইউনিকর্নের কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। একে বর্ণনা করা হয়েছে অনেকটা ষাঁড়ের মতো। ক্যামাহুয়েতোর শিং অজস্র রোগের প্রতিষেধক। এ কারণে তাদেরকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করতো মাচি বা চিকিৎসক শ্রেণি। ইউনিকর্নের মতো তারও একটা শিং। জন্তুটাকে প্রথমে ধরে এনে বন্দী করে রাখা হতো। তারপর খুব সতর্কতার সাথে শিং কেটে নেওয়া হতো। আলগোছে জায়গাটা বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হতো বনে। নপুংষকতা দূরীকরণে কিংবা বৃদ্ধ বয়সেও সন্তান জন্মদানে সক্ষমতা অর্জনের জন্য এই শিং ভূমিকা রাখতো বলে প্রচলিত ছিল।

দক্ষিণ আমেরিকার উপকথায় ক্যামাহুয়েতোর ছিল বিশেষ অবস্থান
ইউরোপীয় সংস্কার
ইউনিকর্নের ধারণা নানাভাবে প্রভাবিত করেছে ইউরোপীয় জীবনকে। এমনকি পরবর্তী খ্রিষ্টধর্মেও একে গ্রহণ করা হয়। সাদা ঘোড়ার মতো বড় প্রাণী। মাথার ঠিক মাঝখান থেকে উঠে গেছে দীর্ঘ শিং। ভাবা হতো, ইউনিকর্ন অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী। যেকোনো ধরনের রোগ থেকে মুক্তি, অপবিত্র পানিকে পবিত্রকরণ কিংবা ভয়াবহ বিষের প্রতিষেধক হিসাবে শিংকে ভেবে নেওয়া হয়েছিল প্রধান সমাধান। শিং দ্বারা নির্মিত কাপে পানি পান ছিল সীমাহীন উপকারের। আর তাই তার চাহিদাও ছিল আকাশচুম্বী। যেহেতু ইউনিকর্ন খুব পবিত্র ও নিষ্পাপ। শুধুমাত্র কুমারীই তাকে আবদ্ধ করতে পারবে।

ভিঞ্চির প্রথম দিকের খসড়ায় ইউরিকর্ন
ইতিহাসে ইউনিকর্ন
ইউনিকর্নের প্রথম প্রকাশ দেখা যায় গ্রীক চিকিৎসক ও ঐতিহাসিক টিসিয়াসের লেখায়। বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইন্ডিকা’য় তিনি তার অভিমত প্রকাশ করেন। ভারতের এই প্রাণী বুনো গাধার মতো। আলোর গতির মতো দ্রুত চলে। মাথার মাঝখান থেকে আটাশ ইঞ্চি লম্বা শিং তাকে অন্য জন্তু থেকে আলাদা করেছে। শিংগুলো সাদা, লাল কিংবা কালো হতে পারে।
টিসিয়াস খুব সম্ভবত তথ্যগুলো তৎকালীন পারস্য থেকে পান। জীবনের বেশ কিছু সময় তিনি পারস্যে কাটিয়েছেন। প্রায় কাছাকাছি বর্ণনা দেন এরিস্টটল। তার মতে,
এছাড়া স্ট্র্যাবো, প্লিনির মতো অন্য অনেকেই বর্ণনা করে গেছেন। প্রাচীন নগরী পার্সিপোলিসে ইউনিকর্নের ভাস্কর্য দেখেও তার প্রভাব অনুমেয়। কসমাস ইন্ডিকোপ্লেসটেস নামে আলেকজান্দ্রিয়ার এক ব্যবসায়ীর লেখা থেকেও বেশ তথ্য পাওয়া যায়। তিনি ভারত ও ইথিওপিয়া ভ্রমণ করেন। তার দাবি ছিল ইউনিকর্নের সমস্ত ক্ষমতা থাকে শিংয়ের মাঝে।

প্রাচীন পার্সিপোলিসের দেয়ালে ইউনিকর্ন
মার্কো পলোর বর্ণনা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও উল্লেখ করার মতো। তিনি খুব কাছ থেকে দেখার দাবি করেন। আকারে হাতির মতো। চুলগুলো অনেকটা মহিষের সাথে তুলনীয়। মাথার মধ্যখানে কালো শিং আছে। প্রাণীটা বেশিরভাগ সময় কাদাতে থাকতে পছন্দ করে। অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত মনে তিনি বলেছেন, বহুদিন থেকে শুনে আসা ইউনিকর্নের সাথে চোখে দেখার কত পার্থক্য। তার বর্ণনা থেকে মনে হয়, তিনি যে প্রাণীকে দেখে বিহ্বল হয়েছেন, তা আসলে গণ্ডার ছিল।
মধ্যযুগের বিবর্তন
মধ্যযুগে বিশেষ করে খ্রিষ্টধর্মের প্রভাবে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন ঘটলো ইউনিকর্নের ধারণায়। চার্চের নির্দেশনায় থাকা চিত্রকরেরা ফুটিয়ে তুললো ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে। ঠিক এই সময়েই কুমারী মেয়ের সংশ্লিষ্টতা আসে। প্রচলিত হতে থাকে নানা উপকথা। শিকারীরা যেহেতু কোনোভাবেই বন্দী করতে পারতো না। সুতরাং কোনো কুমারী মেয়েকে বুঝিয়ে গাছের নিচে বসিয়ে রাখা হতো। ইউনিকর্ন প্রশান্ত মনে কুমারীর কোলে মাথা রেখে বসতো। যখন ঘুমিয়ে পড়তো, তখন শিকারীরা চারপাশে ঘিরে ধরতো এবং আবদ্ধ করতো। ত্রয়োদশ ও চতু্র্দশ শতকে প্রচুর রোমান্টিক আখ্যান গড়ে উঠেছে ইউনিকর্নকে জড়িয়ে।

ইউকর্নের সাথে কুমারীর আখ্যান দারুণভাবে প্রচলিত হয় ইউরোপে
খ্রিষ্টিয় চার্চের আগ্রহ
চার্চ আগ্রহের সাথেই গ্রহণ করেছিল ইউনিকর্নের ধারণা। যীশু খ্রিষ্টের সাথে রূপকার্থে সংশ্লিষ্টতা খুঁজে বের করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য যীশুর অবতার হিসেবে। ইউনিকর্নের কুমারী মেয়ের নিকটবর্তী হওয়া যীশু খ্রিষ্টের কুমারী মা মেরীর নিকটবর্তী হওয়াকেই রূপকভাবে উপস্থাপন করে। এবং একারণেই কুমারীর কোলে ইউনিকর্নের ঘুমিয়ে পড়ার পেছনে যীশু খ্রিষ্টের ঘুমিয়ে পড়ার তাৎপর্য নিহিত। এমনটাই দাবি করতেন সে সময়কার প্রচারকেরা।

চার্চ ইউনিকর্নকে গ্রহণ করেছে যীশুর রূপক হিসাবে
অন্য একটি রূপক যীশুর জীবনের শেষের দিনগুলো। ইউনিকর্ন চাইলে শিকারীদের উচিৎ শিক্ষা দিতে পারে। সে শক্তি ও সক্ষমতা তার আছে। কিন্তু তা না করে সে কুমারীর কোলে গিয়ে ঘুমায়। তারপর শিকারীরা এসে তাকে বধ করে। যেন নিষ্পাপ জন্তুটা নিজেকে এক পবিত্র পন্থায় উৎসর্গ করে দিলো। অনুরূপ যীশু খ্রিষ্ট চাইলেই পাপীদের উচিৎ শিক্ষা দিতে পারতেন। অথচ তিনি প্রথমে কুমারী মেরির কোলে আসলেন। তারপর করলেন আত্মোৎসর্গ। এ থেকে অন্তত এটা স্পষ্ট যে, শুধুমাত্র উপকথাতে সীমাবদ্ধ না থেকে ইউনিকর্ন ধর্মের মূলেও একটা জায়গা করে ফেলেছিল।
সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
সত্যিই কি ইউনিকর্ন ছিল? যদি উপকথাই হয়ে থাকে তবে কীভাবে গড়ে উঠেছে এরকম একটা প্রাণীর ধারণা? বলা হয়, ইতিহাস পরিণত হয় কিংবদন্তিতে আর কিংবদন্তি পরিণত হয় উপকথায়। খুব সম্ভবত প্রাকৃতিক কিছু প্রাণীর ধারণা থেকে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইউনিকর্নের ধারণা জন্ম লাভ করেছে। আবার এটাও হতে পারে ঘোড়ার মতো, গাধার মত দেখতে এরকম প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিদ্যমান প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে যৌক্তিক অবস্থানে আছে গণ্ডার। তার বৈশিষ্ট্য এবং দেহের আকৃতিই শুধু না, মার্কো পলোর দাবি অনুযায়ী সেরকমই সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। গণ্ডারের অতিরঞ্জিত বর্ণনা থেকে ইউনিকর্নের জন্ম লাভ অসম্ভব না। এছাড়া ঔরক্স কিংবা নাওয়েলের মতো কিছু প্রাণী বিশেষত ইউরোপে ইউনিকর্নের উপকথার পেছনে প্রভাবক হতে পারে।

সংক্ষেপে দেখুনগণ্ডার কিংবা নাওয়েল অনেকের কাছেই ইউনিকর্ন সৃষ্টির অনুপ্রেরণা
সে যা-ই হোক, সত্য কিংবা মিথ্যার মাপকাঠি দিয়ে উপকথা বিচার করা যায় না। বিচার করতে হয় তার প্রভাব দিয়ে। ইউনিকর্ন যে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের বহু সংস্কৃতিকে অণুরিত করেছে, সেখানেই তার সফলতা।
বান্দরবানের বগা লেকের ড্রাগন: গল্প নাকি সত্যি?
রাগত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক উড়ছে আর ক্ষণে ক্ষণে মুখ থেকে আগুনের হলকা বের করছে- ড্রাগনকে তো এই রূপেই চিনি আমরা। যুগে যুগে ড্রাগন নিয়ে কম মিথের সৃষ্টি হয়নি, যদিও আদৌ তাদের অস্তিত্ব ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্কেরও কোনো কমতি নেই। একদিকে পৃথিবীর বুকে তাদের বিচরণের ইতিহাস প্রমাণের জন্য আজও নিরলসভাবে খেটে চলেছেন ইতিবিস্তারিত পড়ুন
রাগত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক উড়ছে আর ক্ষণে ক্ষণে মুখ থেকে আগুনের হলকা বের করছে- ড্রাগনকে তো এই রূপেই চিনি আমরা। যুগে যুগে ড্রাগন নিয়ে কম মিথের সৃষ্টি হয়নি, যদিও আদৌ তাদের অস্তিত্ব ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্কেরও কোনো কমতি নেই। একদিকে পৃথিবীর বুকে তাদের বিচরণের ইতিহাস প্রমাণের জন্য আজও নিরলসভাবে খেটে চলেছেন ইতিহাসবেত্তারা, অপরদিকে নিত্যনতুন মুখরোচক সব গল্পের ঝুলি ভর্তি হচ্ছে মানুষের মুখে মুখে। সে যা-ই হোক, ড্রাগনের কথা আমরা সাধারণত চীন, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার উপকথায় পেয়ে থাকলেও মজার বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের বগা লেককে ঘিরেই রয়েছে একটি ড্রাগন মিথ। চলুন তবে জেনে আসা যাক বান্দরবানের বগা লেকের সাথে ড্রাগনের সম্পর্কটা আসলে কোথায়?
সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি বান্দরবান আর সেখানকার প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি বগা লেক, দ্য লেক অফ মিস্ট্রি বা ড্রাগন লেক নামেও সুপরিচিত এটি। যুগে যুগে অভিযাত্রিকদের তা আকৃষ্ট করেছে দুর্নিবারভাবে। বগা লেকের আসল নাম ‘বগাকাইন হ্রদ’, যা স্থানীয়ভাবে ‘বগা লেক’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির একটি হ্রদ এটি। কেওক্রাডং পর্বতের গা ঘেঁষে, বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে বগা লেকের অবস্থান। প্রশাসনিক হিসেবে হ্রদটি রুমা উপজেলায় পড়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৪০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত লেকটি। ফানেল বা চোঙাকৃতির আরেকটি ছোট পাহাড়ের চুড়ায় বগা লেকের অদ্ভুত গঠন অনেকটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের কথা মনে করিয়ে দেয়।
হতে পারে এই সেই বগা!
আজ থেকে প্রায় ২,০০০ বছর আগে উৎপত্তি হয় বগা লেকের। এর উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত আছে বেশ কিছু মিথ। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত গল্পটি অনেকটা এরকম।
অনেক অনেক দিন আগে বান্দরবানে একটি চোঙাকৃতির পাহাড় ছিল। তখনকার বান্দরবান আর এখনকার বান্দরবানের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক বিদ্যমান। সে সময় বান্দরবান মানেই ছিল দুর্গম পাহাড়ে ঘেরা ঘন অরণ্যের বসতি। সে পাহাড়ের আদিম কোলে বাস করত আদিবাসীর দল। ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা সহ আরও বেশ কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়ের আবাস ছিল সেথায়। হঠাৎ করে সেসব গ্রাম থেকে হারিয়ে যেতে থাকে গবাদিপশু থেকে শুরু করে ছোট ছোট বাচ্চারাও।
দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে গ্রামপ্রধান, সাধারণ মানুষ সবাই। খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেল, বাচ্চাগুলোর কিংবা গবাদিপশুর সর্বশেষ পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে ঐ চোঙা আকৃতির পাহাড়ে। সবাই ধারণা করতে শুরু করলো, অতিপ্রাকৃত কিছু একটি বাসা বেঁধেছে রহস্যময় ঐ পাহাড়ের কোলে, তারই আক্রমণের শিকার হচ্ছে নিরীহ এই প্রাণী আর বাচ্চারা। আসল রহস্য উদঘাটন করতে এগিয়ে আসে গ্রামের একদল সাহসী পুরুষ। তারা চোঙা আকৃতির পাহাড়ের মাথায় উঠে দেখে, সেখানে বসে আছে বিশাল এক ড্রাগন। তাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না এই ড্রাগনের খপ্পরেই পড়েছে এতোগুলো প্রাণী!
ড্রাগনের উপস্থিতি নিয়ে অবশ্য ভিন্ন একটি মত প্রচলিত আছে। সেই মতানুসারে, বর্তমানে যেখানে বগা লেক অবস্থিত, সেখানে একদিন আকাশ থেকে নেমে আসে আজব এক প্রাণী। এমন কোনো প্রাণী যে পৃথিবীতে থাকতে পারে, স্থানীয়রা তা কল্পনাও করতে পারেনি। বিশাল পাখাওয়ালা সেই প্রাণী যখন-তখন আগুনের হলকা বের করে ধ্বংস করে দিতে থাকে তাদের ঘরবাড়ি। প্রচণ্ড ঘাবড়ে যায় তারা। কী করে এই উদ্ভট জীবটিকে খুশি করা যাবে, সে উপায় খুঁজতে থাকে গ্রামবাসী। ইতোমধ্যে ড্রাগনটি চোঙা আকৃতির ঐ গুহায় নিজের আস্তানা বানিয়ে নেয়। এলাকার লোকজন তার নাম দেয় ‘বগা’। বগাকে খুশি করতে নিয়মিত বিভিন্ন জীবজন্তু ধরে নিয়ে উপঢৌকন হিসেবে পরিবেশন করতে থাকে তারা। বেশ নিরুপদ্রবভাবেই দিন কাটতে থাকে সবার।
এমনই কোনো এক আগুনের হলকায় হয়তো সৃষ্টি হয় বগা লেক
এর মধ্যে হঠাৎ করে গ্রামের শিশুরা নিখোঁজ হতে থাকে একের পর এক। শুরুতে এক সম্প্রদায়ের মানুষ অন্য সম্প্রদায়কে দোষারোপ করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তারা টের পায়, এটি কোনো নির্দিষ্ট গোত্রের সাথে নয়, বরং সবার সাথেই ঘটছে। এবার সবার সন্দেহের তীর এসে পড়ে বগার দিকে। বগাকে উৎখাত করতে না পারলে বাঁচানো যাবে না শিশুদের, এটুকু বুঝতে কারো বাকি থাকে না। কাজেই প্রতিটি গোত্র থেকে বেছে বেছে সাহসী জওয়ানদের নিয়ে গঠন করা হলো একটা দল। যুদ্ধ করেই হোক আর নিজের জীবন বাজি ধরে ড্রাগনের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়েই হোক- শিশুদের তারা উদ্ধার করে আনবেই এই ব্রত নিয়ে বেরিয়ে গেল যোদ্ধারা।
তীর, ধনুক, বল্লম, লাঠি আর মশাল হাতে নিয়ে রাতের অন্ধকারে তারা হানা দিল বগার গুহায়। গুহার মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মানুষের রক্ত আর হাড়গোড় দেখে তারা বুঝে নিল কী ঘটেছে এখানে। ক্ষেপে গিয়ে একসঙ্গে ঘুমন্ত বগার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল যুবকরা। কোনো জাদুবিদ্যা দেখানো বা আগুনের ফোয়ারা ছোটানোর আগেই বগাকে কুপোকাত করে ফেললো সবাই মিলে। এতজন যোদ্ধার সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে কোনোমতে গা ঝাড়া দিয়ে পালানোর রাস্তা খুঁজতে লাগলো সে। যে রথে করে একদিন তার উদয় হয় বগা লেকের পাড়ে, সেই রথে উঠে পালানোর চেষ্টা করল বগা। কিন্তু গ্রামের ক্ষিপ্ত যুবকরা বগার রথে আগুন ধরিয়ে দিল।
যোদ্ধাদের ধরিয়ে দেয়া সে আগুনে পুড়ে মরল বগা। তবে তার আগে শেষবারের মতো মুখ থেকে আগুনের ফোয়ারা ছুটাল সে। সেই আগুনের তাপে আর প্রচণ্ড বিস্ফোরণে থর থর করে কেঁপে উঠল চোঙা আকৃতির পাহাড় আর বগার তৈরি করা গুহা। ভেঙে পড়তে শুরু করলো পাহাড়, তৈরি হলো বিশাল এক গর্ত। এই গর্তটিই বর্তমানে বগা লেক হিসেবে পরিচিত, যার অপর নাম ড্রাগন হ্রদ।
কে বলবে শান্ত এই নিরিবিলি হ্রদে এক সময় ড্রাগন ছিল?
এ ব্যাপারে তৃতীয় যে মতটি প্রচলিত রয়েছে, তা অনেকটা এরকম।
আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে বান্দরবান অঞ্চলে বসবাস করতো খুমী নামক আদিবাসী একটি গোত্র। অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীর মতো তাদেরও নিজস্ব কিছু প্রাচীন দেবতা ছিল। আঞ্চলিক উপকথা অনুযায়ী, এই দেবতাদের মধ্যে একজন স্থানীয়দের উপর রেগে গিয়ে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তিনি একটি ড্রাগনের রূপ ধারণ করেন এবং পূজারীদের ধরে ধরে খাওয়া শুরু করেন। ড্রাগনরূপী সে দেবতা এক পর্যায়ে খুব জোরে হুংকার ছাড়েন, আর তার ফলে একটি অবিশ্বাস্য ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। এই ভূমিকম্পের কারণেই যেখানে গরীব গ্রামবাসীরা বসবাস করত, সেখানে তৈরি হয় একটি হ্রদ। এই হ্রদটিই যে বগা লেক, তা বলাই বাহুল্য! অচিরেই বৃষ্টির পানিতে ভরে ওঠে গর্তটি। এরপর থেকে বাইরের কোনো সাহায্য পাওয়া না গেলেও, এই লেকের পানি কখনো শুকায়নি। প্রতি বসন্তে হ্রদের স্বচ্ছ পানি ঘোলা হয়ে যায় আর রঙ পরিবর্তন করতে থাকে। এই ঘটনা আদিবাসীদের বিশ্বাসকে আরো বদ্ধমূল করে তোলে আর তার সাথে সাথে আরো নানা ধরনের উপকথার জন্ম দেয়।
উৎপত্তিগত দিক থেকে, বগা শব্দটি নেয়া হয়েছে ‘বাগা’ থেকে। বাগা অর্থ রাগান্বিত ড্রাগন। এবার আসা যাক বগা লেকের উৎপত্তি সম্পর্কে ভূতাত্ত্বিকেরা কী বলছেন, সে প্রসঙ্গে। তাদের মতে, হয় মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ নয়তো মহাশূন্য থেকে উল্কাপিণ্ডের পতনের কারণে সৃষ্টি হয়েছে বগা লেক। এর পানি অম্লধর্মী। কোনো জলজ প্রাণীর পক্ষে এখানে বেঁচে থাকা সম্ভব না। বাইরের কোনো পানি এখানে ঢুকতেও পারে না, আবার এর আশপাশে পানির কোনো দৃশ্যমান উৎসও নেই। কাজেই আশেপাশে পানির কোন উৎস না থাকলেও এই বিশাল জলরাশি কীভাবে সৃষ্টি হলো, তা এক রহস্যই বটে। তবে তারচেয়েও বড় রহস্য হচ্ছে বগা লেকের পানির রঙ পরিবর্তন। প্রতি বছর অদ্ভুত কোনো এক কারণে বগা লেকের পানির রঙ কয়েকবার পাল্টায়।
শান্ত-স্নিগ্ধ বগা লেক
অলৌকিক সৌন্দর্যের বগা লেক নিয়ে রয়েছে অজস্র রহস্য। এর আশেপাশে কোনো ঝর্ণা না থাকলেও, লেকের মতোই চারপাশের অন্যান্য জলাশয়ের পানির রঙেও দেখা দেয় একই পরিবর্তন। এর বেশ কিছু সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, লেকটির তলদেশে একটি উষ্ণ ঝর্ণা রয়েছে। ঝর্ণা থেকে যখন পানি বের হয়, তখনই হ্রদের পানির রঙ বদলে যায়। আবার পাহাড়িদের মধ্যে প্রচলিত ড্রাগন বা আগুনের মিথ অনুযায়ী অনেকেই একে মৃত আগ্নেয়গিরি বলে সন্দেহ করেন। এই মৃত আগ্নেয়গিরির প্রভাবেও লেকের পানির রঙে পরিবর্তন আসতে পারে। ঝর্ণা বা লেক কোনোটার গভীরতাই এখনো পর্যন্ত নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের মতে গভীরতা ২০০-২৫০ ফুট হলেও ইকো মিটারে ১৫১ ফুট পর্যন্ত গভীরতার হদিস পাওয়া গেছে।
অনেকেই ভাবতে পারেন এগুলো নিছকই গল্প। তবে যাহা রটে তাহার কিছু তো বটে! কাপ্তাই হ্রদ, মহামায়া হ্রদ, ফয়েজ লেক আরও কত হ্রদ তো আছে, কোনোটি নিয়েই তো এমন কাহিনীর প্রচলন নেই। সত্যিটা জানার তো আর কোনো উপায় নেই, আপাতত নাহয় বহুল প্রচলিত এই মিথগুলোই জানা থাকুক আমাদের সবার।
সংক্ষেপে দেখুনবিশাল সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ : সৌভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্যের প্রতীক?
অ্যালবাট্রোজ Diomedeidae গোত্রের অন্তর্গত একপ্রকার সামুদ্রিক পাখি, যা মূলত অ্যান্টার্কটিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরের আশেপাশে পাওয়া যায়। প্রাচীনকাল থেকে নাবিকদের মধ্যে এই পাখি নিয়ে রয়েছে নানা রকম বিশ্বাস। কারো মতে- এই পাখি সৌভাগ্যের বাহক, কেউ বা ভাবত ঘোর বিপদের চিহ্ন হিসেবে। কেন এমন ভাবনা তবিস্তারিত পড়ুন
অ্যালবাট্রোজ Diomedeidae গোত্রের অন্তর্গত একপ্রকার সামুদ্রিক পাখি, যা মূলত অ্যান্টার্কটিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরের আশেপাশে পাওয়া যায়। প্রাচীনকাল থেকে নাবিকদের মধ্যে এই পাখি নিয়ে রয়েছে নানা রকম বিশ্বাস। কারো মতে- এই পাখি সৌভাগ্যের বাহক, কেউ বা ভাবত ঘোর বিপদের চিহ্ন হিসেবে। কেন এমন ভাবনা তৈরি হলো? আসলেই কি ভাগ্যের সাথে এর কোনো সম্পর্ক আছে? এ ব্যাপারে জানার আগে অ্যালবাট্রোজ নিয়ে সাধারণ কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক।
দৈত্যাকার এই পাখিকে মনে করা হয় মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ ভ্রমণকারী। এরা শত শত মাইল একটানা উড়ে পাড়ি দিতে পারে। জীবনের বেশিরভাগ সময় এরা আকাশেই ব্যয় করে, প্রজননের সময় ভূমিতে নেমে আসে। এর বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে এর বিশালাকার ডানার কথা। একেকটি ডানা প্রায় ১২ ফুট পর্যন্ত লম্বা। এরা স্কুইড, মাছ, কাঁকড়া এবং আরো কিছু জলজ প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। এখন পর্যন্ত এর মোট ২২টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি প্রজাতি বিলুপ্তির পথে এবং আরো কয়েকটি সংকটাপন্ন। অ্যালবাট্রোজ বছরে কেবল একটি ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা বেরোয়, এবং আরো তিন সপ্তাহ বাবা-মা ছানার দেখভাল করে। প্রায় ৩-১০ মাসের মধ্যে বাচ্চাগুলো উড়তে শিখে যায়, এবং একসময় বাসা ছেড়ে উড়ে চলে যায়।



বাচ্চাসহ অ্যালবাট্রোজ
এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা সবচেয়ে বয়স্ক পাখিটিও একটি অ্যালবাট্রোজ। ৭০ বছর বয়স্ক পাখিটির নাম উইসডম। ১৯৫৬ সালে প্রাণীবিদ Chandler Robbins এর পায়ে রিং পরান। পাখিটি তার জীবদ্দশায় প্রায় সাত লক্ষ মাইলের মতো সামুদ্রিক পথ পাড়ি দিয়েছে, এবং বর্তমানে তীরে ফিরে এসেছে ডিম পাড়ার জন্য। রিং পরানোর পর প্রায় ৪০ বার ডিম পেড়েছে পৃথিবীর বয়স্কতম এই পাখি, যার সর্বশেষ ডিমটি পেড়েছে ২০২১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি ।
উইসডম
অ্যালবাট্রোজ সম্পর্কে প্রচলিত একটি প্রবাদ হচ্ছে- ‘An albatross around your neck’ , যা মূলত ভয়ানক দুর্ভাগ্য বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। অ্যালবাট্রোজ মূলত একটি সামুদ্রিক পাখি, যাকে প্রাচীনকালে নাবিকরা সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করত। তখন বেশিরভাগ নাবিক ছিল কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তারা বিশ্বাস করত- অ্যালবাট্রোজ মৃত নাবিকদের আত্মা ধারণ করে এবং জাহাজগুলোকে যেকোনো দুর্ভাগ্য থেকে রক্ষা করে। কিছু নাবিক আবার একে দুর্ভাগ্যের প্রতীকও মনে করত। তারা ভাবত- অ্যালবাট্রোজ জাহাজের পিছু নেয়া মানে কোনো না কোনো নাবিকের মৃত্যু হওয়া। সৌভাগ্য হোক বা দুর্ভাগ্য, অ্যালবাট্রোজ হত্যা করা ছিল নিষিদ্ধ। সবাই বিশ্বাস করত- অ্যালবাট্রোজকে হত্যা করলে জাহাজের ওপর অভিশাপ নেমে আসবে। ব্রিটিশ লেখক স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের কবিতা ‘The Rime of the Ancient Mariner’ অ্যালবাট্রোজের সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্যের দিক একইসাথে তুলে ধরে।
স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ
কবিতার শুরুতে এক বৃদ্ধ নাবিক একজন যুবককে ডাকে তার গল্প শোনানোর জন্য। যুবকটি একটি বিয়ের দাওয়াতে যাচ্ছিল। মাঝপথে বৃদ্ধ নাবিক তার পথ আটকে ফেলে। শুরুতে শুনতে না চাইলেও নাবিকের উজ্জ্বল চোখ দেখে যুবকটি আর না করতে পারেনা। লেখকের ভাষায়,
বৃদ্ধ নাবিক তার কোনো এক সমুদ্রযাত্রার গল্প শুরু করে। সেই যাত্রায় শুরুতে সমুদ্র ছিল শান্ত। আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল এবং আবহাওয়া একদম অনুকূলে ছিল। হঠাৎ করে প্রকৃতি উত্তাল হয়ে ওঠে। সমুদ্রে দৈত্যাকার একটি ঝড় ওঠে, আর জাহাজটি তার পথ থেকে দক্ষিণ দিকে সরে যায়। ঝড়ের কবলে পড়ে তারা কুয়াশা আর বরফে ঢাকা সমুদ্রের মধ্যে গিয়ে আটকা পড়ে।

শিল্পীর তুলিতে ঝড়ের কবলে পড়া জাহাজ
তখনই একটি অ্যালবাট্রোজ জাহাজের চারপাশে উড়তে শুরু করে। নাবিকরা একে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে খুশি হয়ে ওঠে। পাখিটিকে নাবিকরা খাবার দেয়া শুরু করে, একইসাথে বরফ কেটে এগিয়ে চলে জাহাজ। কিন্তু কুয়াশা তখনো কেটে যায়নি। এর মধ্যে একদিন বৃদ্ধ নাবিকটি তার ক্রস বো দিয়ে পাখিটিকে মেরে ফেলে। প্রথমে নাবিকরা ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে এমন কান্ডের জন্য। কিন্তু পাখিটিকে মেরে ফেলার পরপরই দেখা যায় আবহাওয়া ভাল হতে শুরু করে এবং কুয়াশা কেটে যায়। এতে নাবিকরা আবার তাকে বাহবা দিতে থাকে।
এরপর একদিন বাতাস থেমে যায়। জাহাজের পালে বাতাস না থাকায় সমুদ্রে আটকা পড়ে নাবিকেরা। দিনের পর দিন তারা সমুদ্রের বুকে ভেসে বেড়ায়। তাদের পানীয় জল শেষ হয়ে যায়। চারপাশে পানি থাকা সত্ত্বেও পান করার মতো এক ফোঁটা পানি থাকে না। লেখকের বর্ণনার এই অংশটুকু অনেকেরই চেনা।
নাবিকেরা তাদের দুর্দশার জন্য অ্যালবাট্রোজের হত্যাকারীকে দায়ী করে। তাকে বার বার অভিশাপ দেয় এবং তার গলায় মৃত অ্যালবাট্রোজটি ঝুলিয়ে দেয়। এখান থেকেই ‘An albatross around your neck’ প্রবাদের উৎপত্তি।

বৃদ্ধ নাবিকের গলায় মৃত পাখিটি ঝোলানো হয়
তখন পশ্চিম দিক থেকে একটি জাহাজকে তাদের দিকে আসতে দেখা যায়। জাহাজ নিকটবর্তী হবার পর দেখা গেল তা ছিল জীবন-মৃত্যুর জাহাজ। জাহাজের মধ্যে নাবিকদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা হচ্ছিল। খেলায় সিদ্ধান্ত হয় সকল নাবিককে মৃত্যু দেয়া হবে এবং যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করা হবে। কিন্তু পাখি হত্যাকারী বৃদ্ধ নাবিককে বাঁচিয়ে রাখা হবে। বেঁচে থাকাই হবে তার জন্য শাস্তি। একে একে জাহাজের সকলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বেঁচে থাকে শুধু সেই বৃদ্ধ নাবিক, গলায় ঝোলানো মৃত অ্যালবাট্রোজ নিয়ে। চারপাশের মৃত চোখগুলো যেন তাকে অভিশাপ দিচ্ছিল, আশেপাশে অদ্ভুত সব জীব ভেসে বেড়াচ্ছিল, দুর্বিষহ এক জীবন নিয়ে নাবিক ভেসে বেড়ায় সমুদ্রে।
এরপর একদিন জাহাজের পাশে কিছু সাপ ভেসে বেড়াতে দেখে নাবিক। কোনো অজানা কারণে সাপগুলোর প্রতি তার মনে ভালবাসা জন্মায়, এবং পাপের চিহ্ন মৃত অ্যালবাট্রোজ তার গলা থেকে খুলে পড়ে। শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে নাবিক তার জন্মভূমিতে ফিরে আসে। পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তার এই ঘটনা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালবাসার মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করা সম্ভব- এই বাণী সকলের কাছে পৌঁছে দেয়।
প্রকৃতপক্ষে, ভাগ্যের সাথে পাখির সম্পৃক্ততা কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রাচীনকাল থেকে নাবিকদের মুখে মুখে চলে আসা মিথগুলো থেকে ‘অ্যালবাট্রোজ সৌভাগ্যের প্রতীক’ এই চিন্তার উৎপত্তি। লেখক স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের কবিতায় পাখির সাথে সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যের সম্পর্ক ছাপিয়ে স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালবাসার বার্তাই ফুটে উঠেছে।
সংক্ষেপে দেখুনমূর্খ কালিদাস কিভাবে মহাকবি হলেন?
বাংলা ভাষার প্রধান উৎস হচ্ছে সংস্কৃত ভাষা। আরও সহজভাবে বললে সংস্কৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি। আর সেই সংস্কৃত ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হলেন মহাকবি কালিদাস। প্রাচীন ভারতেরও তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। এটাই কালিদাস পণ্ডিতের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তবে আমাদের সাথে কালিদাস পণ্ডিতের পরিচয়টা হয়ত ঘটেছে অন্যভাবে। আর সবিস্তারিত পড়ুন
বাংলা ভাষার প্রধান উৎস হচ্ছে সংস্কৃত ভাষা। আরও সহজভাবে বললে সংস্কৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি। আর সেই সংস্কৃত ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হলেন মহাকবি কালিদাস। প্রাচীন ভারতেরও তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। এটাই কালিদাস পণ্ডিতের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তবে আমাদের সাথে কালিদাস পণ্ডিতের পরিচয়টা হয়ত ঘটেছে অন্যভাবে। আর সেটা হচ্ছে ‘ধাঁধাঁ’।
বর্তমানে ধাঁধাঁর প্রচলন কমে গেলেও আমাদের বাল্যকাল কেটেছে মজার মজার ধাঁধাঁর খেলায়। আর কালিদাসের ধাঁধাঁ ছাড়া যেন ধাঁধাঁর আসর জমতোই না। যেমন, কালিদাস পণ্ডিতে কয় বাল্যকালের কথা/ নয় হাজার তেঁতুল গাছে কয় হাজার পাতা? কিংবা, কালিদাস পন্ডিতের ফাঁকি/ আড়াইশ থেকে পাঁচ পঞ্চাশ গেলে/ আর কত থাকে বাকী? যদিও এসব ধাঁধাঁ আদৌ কালিদাস পণ্ডিতের কিনা তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ আছে, তবে এতটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তিনি প্রতিভাধর ছিলেন বিধায়ই তার নামে এসব ধাঁধাঁ প্রচলিত হয়ে আসছে।

কালিদাসের উপমা আর যুক্তিতে মুহ্যমান হয়ে এভাবেই তাকে কুর্নিশ করতেন সবাই
কালিদাসের জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না, মানে ইতিহাসবিদগণ তার জন্ম সম্পর্কিত তথ্যের ব্যাপারে কোনো ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেননি। তার জন্মস্থান এবং জন্ম সন নিয়ে নানা মতামত প্রচলিত আছে। এজন্য আমরা ইতিহাসবিদদের অভিযুক্ত না করে বরং স্বয়ং কালিদাসকেই অভিযুক্ত করতে পারি! এত এত কবিতা লিখে গেলেন, অথচ একটি বইয়ের পেছনে নিজের জন্মবৃত্তান্তটা একটু লিখে যেতে পারলেন না? হা হা, আজকাল লেখকরা তো নিজের পরিচয়টা নিজেই লিখে দেন বইয়ের পেছনে!
কালিদাসের মতো একজন মহাকবির জন্ম-মৃত্যু কিংবা জন্মভূমি সম্পর্কে জানার শখ হয়তো রবীন্দ্রনাথেরও ছিল। এজন্যই রবীন্দ্রনাথ তার ক্ষণিকা কাব্যের সেকাল কবিতায় লিখেছেন-
হারিয়ে গেছে সে-সব অব্দ, ইতিবৃত্ত আছে স্তব্ধ-
হায় রে গেল সঙ্গে তারি সেদিনের সেই পৌরনারী
কালিদাস কবে জন্মেছেন আর কোথায় জন্মেছেন তা নিয়ে দেশি-বিদেশি গবেষকরা অসংখ্য বই লিখেছেন। একেকজনের একেক রকমের দাবী! কেউ বলেছেন, যিশুখ্রিস্টের জন্মের অনেক আগেই কালিদাসের জন্ম হয়েছে। তাদের মতে, কালিদাসের ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম’ গ্রন্থের নায়ক অগ্নিমিত্র ছিল শুঙ্গ বংশীয় রাজা, বাস্তবে এ রাজার শাসনামল ছিল যিশুখ্রিস্টের জন্মের অনেক আগে, আর এই নাটকটি অগ্নিমিত্রের জীবদ্দশায়ই রচিত হয়েছিল, তাই কালিদাসের জন্য অবশ্যই যিশুখ্রিস্টের জন্মের আগে।

কালিদাসের ভাস্কর্য
আবার কেউ কেউ বলেছেন, না, যিশুখ্রিস্টের জন্মের অনেক পরে কালিদাসের জন্ম। তাদের মতে, কালিদাসের জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টীয় চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি। কেননা, কালিদাস বিক্রমাদিত্য নামে পরিচিত এক গুপ্ত সম্রাটের সভাকবি ছিলেন। কালিদাসের অনেক রচনায় চন্দ্রগুপ্তের রাজ্য, রাজধানী উজ্জয়িনী ও রাজসভার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানেও সমস্যা হচ্ছে, ‘বিক্রমাদিত্য’ নাম দ্বারা আসলে সুনির্দিষ্ট কিছু বোঝার উপায় নেই। ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসে অন্তত ছয়জন রাজা ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধি ধারণ করে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। ফলে, আমাদের জন্য কালিদাস সম্বন্ধীয় বিক্রমাদিত্যকে খুঁজে বের করাও বেশ কঠিন কাজ। তবে অধিক প্রচলিত মত হচ্ছে, গুপ্ত সাম্রাজ্যের সর্বাধিক খ্যাতিমান নৃপতি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, যার উপাধি ছিল ‘বিক্রমাদিত্য’, তার সভাকবি ছিলেন কালিদাস। আর এই রাজার রাজত্বকাল ছিল ৩৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪১৪ খ্রিস্টাব্দ। তারপরেও মূল কথা হচ্ছে, কালিদাস কবে জন্মেছিলেন সেই তথ্য কেউই সঠিক ভাবে বলতে পারবে না। তাই আমরা সেসব তর্ক থেকে নাহয় দূরেই থাকলাম।
জন্মসালের মতো তার জন্মস্থান নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, উজ্জয়িনী। সেকালে মালব রাজ্যের রাজধানী ছিল, যা এখন মধ্যপ্রদেশের একটি জেলা ও শহর। আবার অনেক গবেষকের মতে, বিদিশা, আধুনিককালে যার নামকরণ করা হয়েছে ভিলশা, এটিও মধ্যপ্রদেশের একটি শহর। আবার কেউ বলেন, দেবগিরি পাহাড়ের কাছে দশোর গ্রামে কালিদাসের জন্ম। কেউ কেউ বলেন, বিদর্ভ, যা এখন ‘বেয়ার’ বলে সকলে চেনে, এটিও এখন মহারাষ্ট্রের একটি প্রদেশ। আবার সংস্কৃত গবেষক লক্ষ্মী ধর কল্লার মতে, তিনি কাশ্মীরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে এসব তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কালিদাস জন্মেছিলেন ভারতের কোনো এক জায়গায়। এছাড়া এর পেছনে আরেকটি যুক্তি দেয়া যেতে পারে কালিদাসের কাব্যের ভেতর থেকেই; তা হলো, কালিদাস অন্ততপক্ষে চার বার ভারত পরিভ্রমণ করেছিলেন এবং কখনো একই পথে দ্বিতীয়বার যাননি। সব মিলিয়ে এ ধারণায় উপনীত হওয়া যায় যে, মধ্যপ্রদেশ বা এর আশেপাশে তার জন্ম হয়েছিল।
তবে মজার ব্যাপার হলো কালিদাস বাস্তবে একজন অশিক্ষিত-মূর্খ মানুষ ছিলেন। নিজের স্ত্রীও তার বোকামি নিয়ে হাসি-তামাশা করত। রাগে ক্ষোভে তিনি একবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। কথিত আছে, এমতাবস্থায় তিনিও দস্যু রত্নাকরের মতো ‘কালি দেবী’র মতান্তরে সরস্বতীর আশীর্বাদ পেয়েছিলেন। এতেই মূর্খ কালিদাস হয়ে উঠলেন মহাকবি কালিদাস!
ছোটবেলায় বাবা-মা হারান কালিদাস। সর্বহারা শিশু কালিদাসের লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাখাল গোত্রের লোকজন। রাখালদের কাছে লালিত-পালিত হওয়ায় কালিদাসের লেখাপড়ার কোনো সুযোগ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু তিনি দেখতে-শুনতে ছিলেন খুবই সুদর্শন। এতটাই সুদর্শন ছিলেন যে তাকে রাজপুত্রের মতো লাগত। আর সে কারণেই তার বিয়ে হয় এক সুন্দরী রাজকন্যার সঙ্গে। এ বিয়ে নিয়েও একটি মজার ঘটনা প্রচলিত আছে। কথিত আছে, উক্ত রাজকন্য নাকি রাজার খুবই অবাধ্য ছিলেন, তাই মন্ত্রীর পরামর্শে রাজা তার কন্যাকে শায়েস্তা করার জন্য কালিদাসের সাথে বিবাহ দিয়ে দেন।
রাজপুত্রের মতো চেহারা থাকলেও বাস্তবে কালিদাস ছিলেন লেখাপড়া না জানা এক মূর্খ যুবক। নিজের ভাল-মন্দ বিচার করার মতো ক্ষমতাও ছিল না তার। একদিন কিছু লাকড়ির দরকার হলে কালিদাস গাছে উঠে গাছের যে ডালে বসে আছেন সেই ডালটিই কাটতে শুরু করলেন। উক্ত গাছের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় এক পথিক কালিদাসের এমন বোকামি দেখে তাকে ডাল কাটার সঠিক উপায় বলে দিলেন, কিন্তু কালিদাস এতটাই মূর্খ ছিলেন যে, ঐ পথিকের পরামর্শও তিনি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। ডাল কাটতে গিয়ে ডালের সাথে কালিদাস নিজেও মাটিতে পড়ে আহত হন। বোকামির এমন সংবাদ সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

মূর্খ কালিদাসের ডাল কাটার দৃশ্য
এমনিতেই বোকামির জন্য কালিদাস প্রতিদিন স্ত্রীর কাছে বকা-ঝকা শুনতেন। ডাল কাটার বোকামি যেন তা আরও উস্কে দিল। স্ত্রীর এমন ব্যবহারে কালিদাস একদিন রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে, অপমানে ঘর থেকে বের হয়ে আত্মহত্যা করার জন্য নদীতে ঝাপ দিলেন। কিন্তু তিনি সেখানেও ব্যার্থ। নদী থেকে তাকে উদ্ধার করলেন দেবী কালি, আর সেই কৃতজ্ঞতায় তিনি হয়ে গেলেন দেবীর ‘কালি’র দাস। সে অনুসারেই তার নাম হয়ে গেল কালিদাস। শুধু যে দেবী কালি তার জীবন বাঁচালেন তা-ই নয়, তাকে দিলেন জ্ঞান ও বুদ্ধির আশীর্বাদ, তাতেই কালিদাস হয়ে উঠলেন মহাকবি। রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকির দস্যু থেকে সাধক হয়ে ওঠার গল্পের মতো কালিদাস মূর্খ থেকে হয়ে উঠলেন মহাকবি। তার বুদ্ধির তারিফ করতে গিয়ে তার নামে আজও প্রচলিত আছে হাজার হাজার জটিল ধাঁধাঁ। তিনি হয়ে উঠলেন প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার।
কালিদাস দুটি মহাকাব্য লিখেছেন- ‘রঘুবংশম্’ এবং ‘কুমারসম্ভবম্’। নাটক রচনা করেছেন তিনটি- ‘বিক্রমোর্বশীয়ম্’, ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম্’ আর ‘অভিজ্ঞানশকু্ন্তলম্’। গীতিকাব্য লিখেছেন দুটি- একটি হলো ‘মেঘদূতম্’, যাকে আমরা বাংলায় ‘মেঘদূত’ বলে জানি এবং অন্যটির নাম ‘ঋতুসংহারমা’।

‘মালবিকাগ্নিমিত্রম্’ নাটকের একটি দৃশ্য
কালিদাসের রচনাবলীর মধ্যে আমাদের কাছে দুটি গ্রন্থ সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এর মধ্যে আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গল্পের আকারে ‘শকুন্তলা’ লিখেছিলেন ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ থেকে ভাবানুবাদ করে। আর অন্যটি হচ্ছে ‘মেঘদূতম’ বা ‘মেঘদূত’। বাংলায় এ পর্যন্ত বহুজন এই ছোট্ট কাব্যগ্রন্থটির অনুবাদ করেছেন। সংক্ষিপ্ত হলেও এটিই তার অমর কীর্তি; তার শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে স্বীকৃত। ‘মেঘদূতে’র বিষয়বস্তু নিয়ে হায়াৎ মামুদ লিখেছেন,
কালিদাস শুধু কবিতা বা নাটকের কারণেই আজকের দিনে গুরুত্বপূর্ণ নন। তার লেখালেখিতে রয়েছে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, ভূগোল ও রাজনৈতিক নানা উপাদান। তিনি আজও আমাদের অনুপ্রেরণার কারণ। ১৯৬৬ সালে তাকে নিয়ে ‘মহাকবি কালিদাস’ নামে একটি তামিল সিনেমাও নির্মিত হয়েছে। তাকে নিয়ে হয়ত গবেষণা চলতে থাকবে আরও দীর্ঘকাল।

সংক্ষেপে দেখুনকালিদাসকে স্মরণীয় করে রাখতে তার নাটক অবলম্বনে নির্মিত ডাকটিকিট
জম্বি: এক ভৌতিক সত্তার আদ্যোপান্ত !! আসলেই রয়েছে কি এর কোন সত্যতা ?
হলিউড সিনেমার কল্যাণে জম্বি এখন আমাদের খুব পরিচিত একটি ভৌতিক সৃষ্টি। অসংলগ্ন পদক্ষেপ, পচন ধরা দেহাবশেষ, গোঁ-গোঁ শব্দ, ছেঁড়া পোশাক, মানুষের মৃতদেহ থেকে মাংস খুবলে খাওয়া, হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কামড়ে শরীর থেকে মাংস আলাদা করে নেওয়া; জম্বি কথাটি শুনলে আমাদের মনে এসব দৃশ্যপটই ফুটে ওঠে। কখনো খুব ধীর, আবার কবিস্তারিত পড়ুন
হলিউড সিনেমার কল্যাণে জম্বি এখন আমাদের খুব পরিচিত একটি ভৌতিক সৃষ্টি। অসংলগ্ন পদক্ষেপ, পচন ধরা দেহাবশেষ, গোঁ-গোঁ শব্দ, ছেঁড়া পোশাক, মানুষের মৃতদেহ থেকে মাংস খুবলে খাওয়া, হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কামড়ে শরীর থেকে মাংস আলাদা করে নেওয়া; জম্বি কথাটি শুনলে আমাদের মনে এসব দৃশ্যপটই ফুটে ওঠে। কখনো খুব ধীর, আবার কখনো উসাইন বোল্টকে হারিয়ে দেওয়ার মতো দৌড়- সিনেমায় জম্বির প্রকাশে এগুলো চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য। কোথা থেকে এলো জম্বি চরিত্র, প্রথম কবে কোথায় জম্বির উৎপত্তি? অথবা জম্বি কি হলিউডের নিজস্ব উদ্ভাবন? মগজখেকো জম্বিকে নিয়ে এসব প্রশ্ন কি কখনো আপনার মগজে খেলে গিয়েছে? সেসব প্রশ্নেরই উত্তর দেওয়া হবে এই লেখায়।

THE WALKING DEAD
জম্বি কী?
‘জম্বিল্যান্ড’-এ ডুব দেওয়ার আগে জম্বি সম্বন্ধে একটু জেনে নেওয়া যাক। এক কথায় বলতে গেলে, জম্বি মানে জিন্দালাশ। যে লাশ মৃত্যুর পর আবার জেগে ওঠে তা-ই জম্বি হিসেবে পরিণত হয়। জম্বি শব্দটির উৎপত্তি পশ্চিম আফ্রিকার দুটো ভাষা থেকে। গ্যাবন-এর মিতসোগো ভাষায় ‘জুম্বি’ (ndzumbi) মানে হলো ‘লাশ’। আবার কঙ্গো ভাষায় ‘জাম্বি’ (nzambi) মানে হচ্ছে ‘মৃত ব্যক্তির আত্মা’। জম্বি না মৃত, না জীবিত; বলা যায় জীবন্মৃত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবিত ও মৃত ছোটগল্পটির মূল আভাসের সাথে জম্বির ধারণার বেশ মিল রয়েছে। ওই গল্পের প্রোটাগনিস্টকে ভুলে মৃত ভেবে শ্মশানে পাঠানো হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি জেগে উঠে নিজের বাড়িতে ফিরে যান। তবে তার আচরণ ওপরে বর্ণিত জম্বির মত হয়ে যায়নি কারণ তিনি প্রকৃত অর্থে কখনো মৃত্যুবরণ করেননি।
জম্বি কিংবদন্তির দুটো আলাদা আলাদা রূপ (Archetype) রয়েছে। এর আদি উৎপত্তিতে দেখায় যায়, ন্যাক্রোমেন্সার বা জাদুকরেরা মৃত ব্যক্তিকে মন্ত্রবলে পুনরুজ্জীবিত করে নিজেদের দাস হিসেবে ব্যবহার করতেন। অধুনা পশ্চিমা জম্বি ন্যারেটিভে জম্বি সৃষ্টির জন্য জাদুবিদ্যার প্রয়োজন পড়ে না। এখানে জম্বির উত্থান হতে পারে ভাইরাসের কারণে, তেজস্ক্রিয়তার কারণে, অন্য জম্বির কামড়ের কারণে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ভুলের কারণে ইত্যাদি। তবে দু’ধরনের জম্বিরই কিছু সমধর্মী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো জম্বির নিজের ইচ্ছায় পরিচালিত হওয়ার অপারগতা, সারাক্ষণ মানুষের মাংস খেতে চাওয়া, স্খলিতপদ ইত্যাদি।
জম্বির উৎপত্তি
আপনি যদি জম্বি নামের এই ভীতিকর সৃষ্টিকে হলিউড থেকে চিনে থাকেন তাহলে আপনার মনে হতেই পারে জম্বি হয়তো পশ্চিমা ফোকলোরের নিজস্ব দানব। মূলত জম্বির ধারণাটি বৈশ্বিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে পশ্চিমা শিল্পমাধ্যমই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। তবে জম্বির শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদেরকে যেতে হবে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশ হাইতিতে। সতের বা আঠার শতকের হাইতি তখন ‘সেইন্ট-ডমিংগ’ নামে পরিচিত ছিল। ফ্রান্সের অধীনে থাকা হাইতিতে আখের আবাদ ও চিনিকলে কাজ করার জন্য আফ্রিকা থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের দাস হিসেবে আনা হতো। সেসময়ের আর সব শ্বেতাঙ্গ দাসমালিকের মতো ফরাসিপ্রভুরাও ছিল নিষ্ঠুর প্রকৃতির। তাদের নিষ্ঠুরতার মাত্রা এতটাই নির্মম ছিল যে আফ্রিকা থেকে আনা শ্রমিকদের অর্ধেকই কাজ করতে করতে অল্প কয়েক বছরের মধ্যে মারা গিয়েছিলেন।
এই হতভাগ্য শ্রমিকেরা বিশ্বাস করতেন মৃত্যুই ছিল তাদের একমাত্র মুক্তি। তারা মনে করতেন মৃত্যুর পর তাদের পুনর্জন্ম হবে ‘ল্যান গিনি’ তথা গিনি বা আফ্রিকাতে। সেখানে তারা মুক্ত মানুষ হিসেবে জন্ম নেবেন। কিন্তু এই স্বাধীনতা লাভের জন্য আত্মহত্যা করা যাবে না। কারণ আত্মহত্যা করলে মুক্তি তো মিলবেই না বরং ওই পুরনো দেহপিঞ্জরেই আত্মাছাড়া অবস্থায় অনন্তকালের জন্য আটকে থাকতে হবে। আত্মহত্যার এই শাস্তিটুকুই হচ্ছে জম্বিতে রূপান্তরিত হওয়া।

জম্বিকে জনপ্রিয় করেছে হলিউড
‘আত্মারাম খাঁচাছাড়া’ বলে বাংলায় একটা প্রবাদ রয়েছে। জম্বি মানেও একটি দেহরূপ খাঁচা যার ভেতরে প্রাণ বা আত্মার অস্তিত্ব নেই। কিন্তু বাংলায় প্রবাদটি কিছুটা হাস্যরসের ছলে বলা হলেও হাইতিয়ান জম্বির ক্ষেত্রে এটি বেশ করুণ একটি বিষয়।
১৭৯১ সালে হাইতিতে বিপ্লবের মাধ্যমে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তিকে উৎখাত করা হয়। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ১৮০৪ সালে সেইন্ট-ডমিংগো নাম থেকে পরিবর্তিত হয়ে হাইতি প্রথম স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। জম্বি কিংবদন্তি তখন হাইতিয়ান লোকগাথার অংশ হয়ে যায়। ভুডু ধর্মবিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত এই কিংবদন্তিতে মনে করা হয়, জম্বি তৈরির কারিগর হচ্ছেন খারাপ জাদুকর বা ডাইনি। এই জাদুকরেরা বকর (Bokor) নামে পরিচিত। বকররা মৃত মানুষকে জড়িবুটি দিয়ে জীবিত করে জম্বি বানিয়ে নিজেদের দাস হিসেবে ব্যবহার করতেন।
ভুডু বকর ও কালাজাদু বিশ্বাসের জম্বির এই রূপান্তরিত রূপটিই আমেরিকান সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে। কালো জম্বি এরপর সাদা জম্বিতে পরিণত হয়। কিছু বই ও কয়েকটি হলিউড সিনেমার মাধ্যমে জম্বি ধীরে ধীরে মার্কিন সমাজে বিস্তার লাভ করে। এরপর সময়ের সাথে সাথে ইউরোপ পেরিয়ে এশিয়াতেও পৌঁছে যায় জম্বি কিংবদন্তি।

আখ ক্ষেতে জম্বি; হাতে আঁকা ছবি
জম্বির ‘গ্রিন কার্ড’
ইউরোপের কাছে স্বাধীন হাইতি তখন লজ্জা ও পরাজয়ের জ্বলজ্বলে বাস্তবতা। তাই হাইতিকে ইউরোপীয়রা দেখতে থাকে নৃশংসতা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, মৃত্যুর দেশ হিসেবে। বিশ শতকের শুরুতে, ১৯১৫ সালে আমেরিকা হাইতি দখল করে। ‘আধুনিকায়নের’ উদ্দেশে সেখানে গেলেও দেখা যায় হাইতির নিজস্ব জম্বি সংস্কারকেই সাথে করে নিয়ে এসেছে আমেরিকানরা। ১৯২০ ও ‘৩০-এর দশকের মার্কিন পাল্প ম্যাগাজিনগুলোর বর্ণনায় ফুটে ওঠে কীভাবে প্রতিহিংসাপরায়ন জিন্দালাশ কবর থেকে উঠে তাদের খুনীদের তাড়া করছে সে গল্প। কিন্তু জম্বিকে মার্কিন মুলুকে আরও পাকাপোক্ত আসন দেওয়ার কাজটা করে কয়েকজন লেখক, ও হলিউড।
’২০-এর দশকের শেষের দিকে দুজন মার্কিন লেখক হাইতি ভ্রমণ করেন। ১৯২৭ সালে হাইতিতে যান উইলিয়াম সিব্রুক। তিনি যথেষ্ট গুণধর ছিলেন এবং ভ্রমণ-লেখক, সাংবাদিক, অকাল্টিস্ট ইত্যাদি গুণের সাথে সাথে মদ্যপানেও তার বিশেষ প্রতিভা ছিল। হাইতি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি দ্য ম্যাজিক আইল্যান্ড (১৯২৯) নামে একটি বই লিখেন। সিব্রুক নিজেকে ‘নিগ্রোফাইল’ হিসেবে পরিচয় দিতেন। নিগ্রোফাইল তাদেরকে বলা হয় যারা নিজের সুখী জীবনকে ত্যাগ করে ‘আদিমতা’কে আঁকড়ে ধরে আরাম পান। অন্য অর্থে বলা যায়, যেসব শ্বেতাঙ্গ নিজেদের আয়েসী জীবনের চেয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের কষ্টের জীবনকে বেশি পছন্দ করেন তারাই নিগ্রোফাইল। সিব্রুক হাইতিতে গিয়ে ভুডু ধর্মের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তার বইয়ের একটি চ্যাপ্টার, ‘ডেড ম্যান ওয়ার্কিং ইন কেইন ফিল্ডস’, এ তিনি জম্বি দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। হাইতিয়ান-আমেরিকান সুগার কর্পোরেশন-এর আখের আবাদে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় জম্বি দেখানোর জন্য। এই জম্বিরা রাতের বেলায় ওই বাগানে কাজ করে।
আখখেত থেকে আখ সংগ্রহ করছেন দাসেরা
কিছুক্ষণের জন্য থমকে যান সিব্রুক। তার মনে হলো এতদিন যা শুনেছিলেন হাইতির জম্বি কুসংস্কার নিয়ে, তার সবটাই সত্যি। পরে ধাতস্ত হয়ে এর ব্যাখ্যায় পৌঁছান তিনি: জম্বিটম্বি কিছুই নয়, স্রেফ একদল নির্বোধ, উন্মাদ মানুষ যাদেরকে দিয়ে জোর করে কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
হাইতি ভ্রমণকারী দ্বিতীয়জন ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ ঔপন্যাসিকা জোরা নিল হার্সটন। ’২০-’৩০-এর দশকের হার্লেম নবজাগরণের অনেক প্রথিতযশা কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্যিকই হাইতিকে নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। ভুডু ধর্মযাজক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য পেশাদার নৃতাত্ত্বিক হার্সটন হাইতিতে তিন মাস অবস্থান করেন। ১৯৩৭ সালে লেখা তার বই টেল মাই হর্স-এ হার্সটন জম্বির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং স্পষ্ট করে তিনি কীভাবে জম্বিকে ছুঁয়ে দেখেছিলেন তার বর্ণনা দিয়েছিলেন।
কিন্তু যার ছবি হার্সটন তুলেছিলেন তিনি অবশ্য একজন সাধারণ মানবিই ছিলেন। বেচারীর নাম ছিল ফেলিসিয়া ফেলিক্স-মেন্টর। তাকে সমাজ থেকে একঘরে করা হয়েছিল। তার জায়গা হয়েছিল মানসিক হাসপাতালে।
এ প্রসঙ্গে বাংলা অঞ্চলের ডাইনিদের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সমাজে ডাইনিদের খুব একটা সমাদর ছিল না। তারাশঙ্করের লেখা স্বর্ণ ডাইনির গল্প-এর প্রথম কয়েকটা লাইন এখানে তুলে দিচ্ছি।
অথবা পথের পাঁচালী‘র আতুরি বুড়ির কথা? সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, গাঁয়ের বাইরে একান্তে নীরবে, নিভৃতে বাস করা এক অশীতিপর বৃদ্ধা। সমাজের নির্মম দুনিয়ার এই বাসিন্দারা আমাদের এখানে ডাইনি আর অনেক অনেক দূরের হাইতিতে জম্বি হয়ে যান।

জোরা নিল হার্সটন-এর তোলা ছবি
হাইতি থেকে হলিউড
সিব্রুক আর হার্সটন-এর লেখার হাত ধরেই জম্বির আগমন মার্কিন মুলুকে। এর পরের কাজটি করে হলিউড।
দ্য ম্যাজিক আইল্যান্ড প্রকাশের তিন বছর পর হোয়াইট জম্বি (১৯৩২) নামে একটি সিনেমা মুক্তি পায়। এরপর জম্বি নিয়ে রিভল্ট অভ দ্য জম্বিজ (১৯৩৬), কিং অভ দ্য জম্বিজ (১৯৪১), আই ওয়াকড উইদ আ জম্বি (১৯৪৩) মুক্তি পায় পর্যায়ক্রমে।
তবে হলিউডের জম্বির জনক হিসেবে পরিচালক জর্জ এ. রোমেরো-কে মানা হয়। ১৯৬৮ সালে তার পরিচালনায় নাইট অভ দ্য লিভিং ডেড সিনেমায় অ্যান্টাগনিস্ট হিসেবে এক দঙ্গল নরমাংসভোগী মানুষকে দেখানো হয় যাদেরকে ‘ঘোউল’ (ghouls) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। জম্বিকে নিয়ে প্রথম এ সিনেমাটি বানানো হলেও এতে কখনোই জম্বি শব্দটি উচ্চারণ করা হয়নি। এরপর দশ বছর পরে আরেকটি সিনেমা, ডন অভ দ্য ডেড (১৯৭৮)-এ প্রথমবারের মতো জম্বি শব্দটি ব্যবহার করেন রোমেরো। এর পরের কয়েক দশকে রোমেরো আরও কয়েকটি জম্বি সিনেমা পরিচালনা করেন।
এরপর ধীরে ধীরে জম্বি ফিল্ম জনপ্রিয়তা লাভ করে মার্কিন দর্শকদের কাছে। জম্বির বৈশিষ্ট্যেও ক্রমশ নতুন নতুন পরিবর্তন আনা হয়। প্রথমদিকে জম্বিকে ধীরপদ হিসেবে দেখানো হলেও পরবর্তী সময়ের সিনেমা ইত্যাদিতে আমরা জম্বিকে দৌড়াতেও দেখি। সিনেমার বাইরে জম্বিকে নিয়ে টিভি সিরিজ, গেইম তৈরি করা হয়। দ্য ওয়াকিং ডেড (২০১০) সিরিজ, বা রেসিডেন্ট ইভল গেমের ভয়ধরানো জম্বিওয়ার্ল্ড থেকে শুরু করে কমেডি-হরর শন অভ দ্য ডেড (২০০৪) বা জম্বিল্যান্ড (২০০৯)- জম্বি এখন বৈশ্বিক বিনোদন জগতের অন্যতম অনুষঙ্গ।

নাইট অভ দ্য লিভিং ডেড-এ দেখানো জম্বি
চাইলেই বানানো যাবে জম্বি?
ভুডু ধর্ম এখনো ক্যারিবিয়ান, ব্রাজিল, দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে চালু আছে। বকরেরা ‘কুপ পুদ্রে’ নামক একধরনের সাদাটে পাউডার তৈরি করেন। এই পাউডার একজন সুস্থসবল মানুষকেও ‘জম্বি’ বানিয়ে দিতে পারে। ১৯৮০’র দশকে হার্ভার্ডের এথনোবোটানিস্ট ওয়েড ডেভিস ‘জম্বি পাউডার’ নিয়ে গবেষণা করার জন্য হাইতি ভ্রমণ করেন। তার অনুসন্ধানে তিনি খুঁজে পান বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূলত মানবদেহের পোড়া হাড়, কয়েকধরণের ব্যাঙ, পোকা, পাফারফিশ ইত্যাদি মিশিয়ে এ পাউডার তৈরি করা হয়। এই পাফারফিশের ভেতর থাকা মারাত্মক বিষ (toxin) টেট্রডোটক্সিন (Tetrodotoxin) মানুষকে মৃত্যুর দ্বার অব্দি পৌঁছে দিতে পারে।
অল্প পরিমাণ টেট্রডোটক্সিন শরীরে প্রবেশ করলে মানুষের শরীর অসাড় হয়ে যেতে পারে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় থাকে না ব্যক্তি বেঁচে আছেন কী মরে গেছেন। শ্বাস-প্রশ্বাস প্রায় থেমে যায়, হৃদস্পন্দন শূন্যের কাছাকাছি নেমে যায়। তবে ব্যক্তির জ্ঞান বজায় থাকে কিন্তু তিনি কথা বলতে পারেন না।
ডেভিস মনে করেন এই টক্সিনই হচ্ছে জম্বি পাউডারের মূল ভিত্তি। ডেভিসের ব্যাখ্যা হলো, কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ পরিমাণে এই বিষ দেওয়া হলে ব্যক্তি এমন একটি অবস্থায় পৌঁছান যে দেখে মনে হয় তিনি মরে গেছেন। এরপর তাকে কবর দেওয়ার পর সেই ‘লাশ’ কবর থেকে তোলেন বকর। এরপর ওই জম্বিকে দ্বিতীয় আরেকটি ড্রাগ দেওয়া হয়। জিমসন উইড ((Datura stramonium) থেকে তৈরি এই ঔষধ রোগীর স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রমকে ব্যহত করে।
তবে হাইতিতে গিয়ে চাইলেই আপনি জম্বি বানাতে পারবেন না। জম্বিফিকেশন ও দেশে এতটাই বাস্তব ব্যাপার যে এটি প্রতিরোধের জন্য আইন পর্যন্ত করতে হয়েছে। হাইতিয়ান পেনাল কোডের ২৪৯ আর্টিকেলে বলা আছে কেউ যদি জম্বি তৈরি করতে চায় তবে তা হত্যাচেষ্টা বলে পরিগণিত হবে। আর এ উদ্দেশে কাউকে কবর দেওয়া হলে সেটা খুন বলে গণ্য করা হবে।

ক্লেয়ারভায়াস নারসিস
‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ও অন্যান্য
১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল ল্যান্সেট তিনটি জম্বিফিকেশনের কথা জানায়। একটি ঘটনায় একজন মহিলাকে মৃত্যুর পর কবর দেওয়া হলেও তিন বছর পর তিনি আবার ফিরে আসেন। পরে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার কবর খোঁড়া হলে সেখানে পাথর ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। তার পরিবার তাকে গ্রহণ করবে কিনা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকলে পরে তাকে একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই ভদ্রমহিলার সাথেই দেখা হয়েছিল জোরা নিল হার্সটন-এর।
আমেরিক্যান কেমিক্যাল সোসাইটি’র প্রকাশনা কেমম্যাটার্স-এ আরেকটি জম্বিবৃত্তান্ত জানা যায়। ১৯৬২ সালে ক্লেয়ারভায়াস নারসিস শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ডাক্তারেরা তাকে পরে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর পরপরই তাকে কবর দেওয়া হয়। এর ১৮ বছর পর আঞ্জেলিনা নারসিসের দরজায় এক লোক এসে নিজেকে তার ভাই ক্লেয়ারভায়াস নারসিস হিসেবে দাবী করেন। তিনি জানান তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার পর কবর থেকে তোলা হয়েছিল। এরপর তাকে জম্বি বানিয়ে দূরের কোনো এক আখের আবাদে দাস করে রাখা হয়। যে ডাক্তার নারসিস-কে মৃত ঘোষণা করেছিলেন, তিনি সহ গ্রামের অনেকেই এই নবাগতকে ক্লেয়ারভায়াস নারসিস বলে শনাক্ত করেন।
সংক্ষেপে দেখুনবিখ্যাত ট্রয় নগরীর গোড়াপত্তন হলো কিভাবে?
সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। তখন এশিয়া মাইনরের উত্তরে অবস্থিত ছিল বিখ্যাত এক নগরী। ইতিহাস হোক বা উপকথা, এই নগরীর নাম বিবিধ কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। সমুদ্র উপকূল থেকে খানিক দূরে এই অবস্থিত বর্ণিল সৌন্দর্যমণ্ডিত এই নগরীর নাম ছিল ‘ট্রয়’। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আছরে পড়ত ট্রয় বন্দরের সুবিস্তারিত পড়ুন
সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। তখন এশিয়া মাইনরের উত্তরে অবস্থিত ছিল বিখ্যাত এক নগরী। ইতিহাস হোক বা উপকথা, এই নগরীর নাম বিবিধ কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। সমুদ্র উপকূল থেকে খানিক দূরে এই অবস্থিত বর্ণিল সৌন্দর্যমণ্ডিত এই নগরীর নাম ছিল ‘ট্রয়’। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আছরে পড়ত ট্রয় বন্দরের সুদীর্ঘ বেলাভূমিতে। জ্যোৎস্না রাতে চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করতো সাগরের নীল জলরাশি, সাথে অন্ধকারের নীরবতা ভেঙে দিত সমুদ্রের মুহুর্মুহু গর্জন।

ট্রয় নগরী
ট্রয় নগরী উত্থানের আখ্যান বর্ণনা করতে হলে ফিরে যেতে হবে সম্রাট ড্যারডানাসের আমলে। ড্যারডানাস হলেন গ্রিক পুরাণে বর্ণিত পৃথিবীর একদম শুরুর দিকের একজন বাদশাহ। পৃথিবীতে মহাপ্লাবন সংঘটিত হবার আগে তিনি অ্যারকাডিয়া সাম্রাজ্যের মসনদে আসীন ছিলেন। তবে পরিচালনার দায়ভার শুধু তার একার ছিল না। ড্যারডানাসের অগ্রজ ইয়াজিনও ছোট ভাইয়ের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাম্রাজ্য দেখাশোনা করেছেন। এই দুজন ছিলেন দেবরাজ জিউস এবং ইলেক্ট্রার ঔরসজাত সন্তান। সেই হিসেবে তারা ছিলেন টাইটান অ্যাটলাসের দৌহিত্র।
গ্রিক পুরাণ অনুসারে, এই ধরণী অধার্মিক, ঝগড়াটে ও হিংসুক মানুষ দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গেলে দেবরাজ জিউস এক মহাপ্লাবনের পরিকল্পনা করেন। জিউসের উদ্দেশ্য ছিল, তিনি পৃথিবী থেকে সকল পাপী ও পাপের চিহ্ন মুছে ফেলবেন। মহাপ্লাবনের সময় বেঁচে থাকা অ্যারকাডিয়ানরা আশ্রয় নিয়েছিল এক পাহাড়ের চূড়ায়। জিউসের আদেশেই ড্যারডানাস এবং ইয়াজিয়ন সিদ্ধান্ত নিলেন, অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হবার জন্য তারা বিশাল এক নৌকা নির্মাণ করবেন। সবাই হাত লাগালে দ্রুতই ফুরিয়ে এলো নৌকার কাজ। ভ্রমণের জন্য মহাপ্লাবনের বুকে প্রজাদের নিয়ে তরী ভাসালেন ড্যারডানাস। বলে রাখা ভালো, আইডাস ও ডেইমাস নামে দুই পুত্র সন্তান ছিল ড্যারডানাসের। আইডাস তার বাবার সাথে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলেও ডেইমাস ওখানেই থেকে গেলেন। মহাপ্লাবনের সমাপ্তি ঘটার পর ডেইমাস হয়ে উঠেছিলেন ওই জায়গার শাসনকর্তা।

মহাপ্লাবন
এভাবে দিনের পর দিন গড়িয়ে যেতে লাগল। চলতে চলতে তরী গিয়ে ঠেকল স্যামোথ্রেসের এক দ্বীপে। সবাই সেই দ্বীপে কিছুদিন অবস্থান করল। অনুর্বর জমির জন্য সেই দ্বীপ মনে ধরেনি ড্যারডানাসের। এছাড়াও দ্বীপটিতে বড় ভাই ইয়াজিয়নকে হারিয়ে ফেলেছিলেন ড্যারডানাস। তবে ইয়াজিয়নকে নিয়ে অন্যরকম আরেকটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। ক্যাডমাস ও হারমোনিয়ার বিয়েতে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল ড্যারডানাস এবং ইয়াজিয়নকে। বিবাহ ভোজনের সময় দেবী ডিমিটার ভুলিয়ে ভালিয়ে মোহের মায়ায় আচ্ছন্ন করে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন ইয়াজিয়নকে। রঙ-তামাশার পর যখন তারা বিবাহ ভোজনে ফিরে আসলেন, তখন পুরো ব্যাপারটি জানতে পারেন দেবরাজ জিউস। ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে তিনি বজ্রাঘাতে সাথে সাথে খুন করে ফেলেন ইয়াজিয়নকে।
যা-ই হোক, ড্যারডানাস এবং তার পুত্র আইডাস স্যামোথ্রেস ত্যাগ করার পর এশিয়া মাইনরের নিকটবর্তী শহর অ্যাবিডসে এসে পৌঁছলেন। আগন্তুক হিসেবে তাদের সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন ওখানের বাদশাহ টিউকার। তারপর ড্যারডানাসের সাথে বাদশাহ টিউকার তার নিজ কন্যা বাটেয়াকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেন। উত্তরাধিকারসূত্রে টিউকাস তার রাজ্যের কিছু অংশ ড্যারডানাসকে দিয়ে দেন। ওই স্থানে ড্যারডানাস নতুন এক বসতি গড়ে তুললেন, এবং ওই অঞ্চলের নামকরণ করলেন নিজের নামানুসারেই।
সময়ের সাথে সাথে সেই ড্যারডানিয়া নগরীর ক্রমশ বিস্তৃতি ঘটতে লাগল। সম্রাট ড্যারডানাস এবং বাটেয়ার কোল আলো করে আইরাস ও এরিক্টোনিয়াস নামে দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করে, যাদের উত্তরসূরিরাই গ্রিক উপকথার পাতায় পাতায় সুবিদিত হয়ে আছেন। এরিক্টোনিয়াসের সাথে নদীর দেবী সিমোয়েসের কন্যা অ্যাস্টিওসির বিয়ের ফলে তাদের ঘরে জন্ম নেয় ট্রস নামক এক সন্তান। এই ট্রসের পুত্রের মধ্যে আবার আইলাস, গ্যানোমিড এবং অ্যাসারাকাস অন্যতম। এই আইলাস ইলিয়ান নামে এক নগরীর নির্মাণে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। বাবা ‘ট্রস’ এর সম্মানার্থে পরবর্তীতে ইলিয়ান নগরীর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ট্রয়’।


ট্রস
কিংবদন্তি অনুসারে, গ্যানোমিডকে দেখে প্রচণ্ড ভালো লেগে যাওয়ায় তাকে অপহরণ করেন দেবরাজ জিউস। ছেলে হারানোর শোকে পাথর হওয়া ট্রসকে সান্ত্বনাস্বরূপ জিউস তখন উপহার পাঠালেন। তিনি দেবদূত হারমেসকে দিয়ে দুটি স্বর্গীয় ঘোড়া ট্রসের নিকট উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করলেন, যেগুলো ছুটতে পারত হাওয়ার বেগে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, স্বর্গীয় সামগ্রী হওয়ায় দুটি ঘোড়াই ছিল অমর। হারমেস ট্রসকে এ বলেও আশ্বস্ত করে দিয়েছিল যে, গ্যানোমিডকে নিযুক্ত করা হয়েছে দেবতাদের মদ্য পরিবেশক হিসেবে। যেহেতু সে দেবতাদের সেবায় সরাসরি নিযুক্ত, তাই সে অমরত্বও লাভ করে ফেলেছে।
গ্যানোমিডকে অপহরণ করছেন ঈগলরূপী জিউস
ট্রয় নগরীর বর্ণনা দিতে হলে সম্রাট লাওমেডনের পরিচিতিও খোলাসা করার প্রয়োজন। লাওমেডন ছিলেন আইলাসের সন্তান এবং গ্যানোমিড এবং অ্যাসারাকাসের ভ্রাতুষ্পুত্র। লাওমেডনের মায়ের নাম ছিল ইউরিডাইসি, যিনি ছিলেন অ্যারগসের বাদশাহ অ্যাড্রাস্টাসের কন্যা। থেমিস্ট ও টেলেক্লিয়া নামে দুই বোনও ছিল লাওমেডনের। একাধিক স্ত্রী নিয়ে রাজমহল আলোকিত করে রেখেছিলেন সম্রাট লাওমেডন।
তাদের মধ্যে পটামই স্ক্যামান্ডারের কন্যা স্ট্রেইমো এবং রিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্য স্ত্রীদের নাম হলো প্ল্যাসিয়া, থোসা, এবং লিওসিপ। এই স্ত্রীদের গর্ভেই জন্ম নিয়েছিল লাওমেডনের সন্তান থিটোনাস, ল্যাম্পাস, ক্লাইটিয়াস, হাইসটাও, পোডারসেস প্রমুখ। এদের মধ্যে উপকথায় প্রথম জনপ্রিয়তার মুখ দেখে থিটোনাস, যাকে দেবী ইয়োস অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য পোডারসেসের কপালেই জনপ্রিয়তার মুকুট চিরস্থায়ী হয়। লাওমেডনের কন্যাদের মধ্যে হেসিওনি, সিলা, অ্যাস্টিওসি, অ্যান্টিগন, প্রোক্লিয়ার নাম উপকথার পাতায় অক্ষয় হয়ে আছে।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, ট্রয় নগরীর সুবিশাল প্রাচীর তৈরিতে হাত লাগিয়েছিল খোদ দেবতারাও। প্রাচীর নির্মাণের কাহিনীটাও বেশ চমৎকার। দেবরাজ জিউস একবার ষড়যন্ত্রের অপরাধে সঙ্গীতের দেবতা অ্যাপোলো এবং সমুদ্র দেবতা পসেইডনকে এক বছরের জন্য অলিম্পাসের চূড়া থেকে নির্বাসিত করে দিলেন। ফলে মর্ত্যলোকে এসে ঠাঁই নিলেন দেবতা অ্যাপোলো এবং পসেইডন।




পসেইডন
পৃথিবীতে এসে জনসাধারণের মতোই কর্মসন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন দুই দেবতা। তারা কাজ পেয়ে গেলেন তৎকালীন ট্রয়ের অধীশ্বর রাজা লাওমেডনের কৃপায়। অ্যাপোলোকে নিযুক্ত করা হলো পশুসম্পদ দেখভালের জন্য, আর পসেইডন পেলেন ট্রয়ের প্রাচীর নির্মাণের কাজ। পসেইডন একা হাতে কাজ সামলাতে পারছিলেন না বলে তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন অ্যাগিনার মরণশীল রাজা অ্যাকাস। লাওমেডন সমুদ্র দেবতা পসেইডন এবং দেবতা অ্যাপোলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হলেন যে, দুই দেবতা মিলে যদি ট্রয়ের দুর্ভেদ্য এক প্রাচীর নির্মাণ করে দেন তাহলে বাদশাহ তাদেরকে বিপুল পারিতোষিকে তুষ্ট করবেন। কিন্তু প্রাচীর নির্মাণের পর শঠতার কালো ছায়ায় আশ্রয় নিলেন লাওমেডন। তিনি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে ফেললেন। ফলে দারুণ ক্ষোভে ফেটে পড়লেন দেবতা অ্যাপোলো এবং পসেইডন। ক্রুদ্ধ হয়ে অ্যাপোলো পুরো ট্রয়ের মাটিতে মড়ক বিস্তার করে দিলেন।
পসেইডন এবং অ্যাপোলোকে পুরষ্কার দিতে অস্বীকার করছেন লাওমেডন
ওদিকে ট্রয়ের ধ্বংস কামনা করে সমুদ্র থেকে ‘ট্রোজান সিটাস‘ নামে বিশালাকার এক দানব পাঠালেন পসেইডন। লাওমেডন সেই দানব বধের জন্য সৈন্য পাঠালেও আদতে কোনো লাভ হয়নি। ওই দানবের সামনে একমুহূর্তও টিকতে পারেনি লাওমেডনের ফৌজ। দানবটা একে একে নগরবাসীর বাড়িঘর, শস্য, ফসল সবকিছুই ধ্বংস করে ফেলতে লাগল। প্রজাদের জন্য কেঁদে উঠল বিশ্বাসঘাতক লাওমেডনের মন। তিনি মন্দিরে গিয়ে বিষণ্ণ মনে নিজ প্রজাদের জন্য দয়া ভিক্ষা চাইলেন। লাওমেডনের জন্য খানিক দয়া উদয় হলো দেবতাদের মন কোণে। তাই মন্দির থেকে দৈববাণী হলো, প্রতি বছর ট্রয়ের একজন কুমারীকে ওই দানবের কাছে দিয়ে আসতে হবে, তবেই দেবতাদের সন্তুষ্টি মিলবে। এভাবে প্রতি বছর লটারির মাধ্যমে বেছে নেয়া হতো একজন কুমারীকে, এবং তাকে উৎসর্গ করা হতো ওই সমুদ্র রাক্ষসের নিকট।
ট্রোজান সিটাস
লাওমেডনের বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষতিপূরণ চুকাতে গিয়ে একে একে বলি হলো পাঁচজন কুমারী। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে ষষ্ঠ বছরে লটারি পরীক্ষায় উঠে এলো স্বয়ং লাওমেডন কন্যা রাজকুমারী হেসিওনির নাম! কপাল চাপড়াতে থাকলেন বাদশাহ লাওমেডন, মানসিকভাবে একেবারেই ভেঙে পড়লেন তিনি। তখন রাজা গিয়ে আবারও তার ললাট ঠেকিয়ে পড়ে রইলেন দেবতাদের মন্দিরে। ফের দেবতারা সম্রাটের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে বিপদ থেকে পরিত্রাণের জন্য এক সাহায্যের ব্যবস্থা করলেন। বীরযোদ্ধা হেরাক্লিস (হারকিউলিস) তখন রাজা অ্যারিসকাসের রাজদরবার থেকে সঙ্গীদের সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তার জাহাজ ট্রয় নগরীর বন্দরে এসে থামার পর হঠাৎ তিনি দেখলেন, রাজকন্যা হেসিওনিকে নিয়ে সমুদ্রপাড়ে বিরাট শোকের মাতম চলছে। বাদশাহ লাওমেডন এবং তার রানী অঝোরে অশ্রুবর্ষণ করে যাচ্ছেন। কৌতূহলপরবশ হয়ে সমাগমের দিকে এগিয়ে গেলেন হেরাক্লিস, ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলেন লাওমেডনের কাছে। বাদশাহর কাছ থেকে সমস্ত বিবরণ জানার পর ওই দানবের সাথে যুদ্ধ লড়তে সম্মত হলেন হেরাক্লিস।
হেরাক্লিস
যুদ্ধে লড়ার আগে হেরাক্লিস শর্ত জুড়ে দিলেন, সেই দানবকে বধ করলে তাকে যেন সম্রাটের সেই স্বর্গীয় ঘোড়া জোড়া উপহার দেয়া হয়। রাজা সানন্দে মেলে নিলেন সেই শর্ত। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন হেরাক্লিস। যেই তিনি তার সিংহচর্মে নির্মিত বস্ত্র খুলে শক্ত হাতে মুগুরটা পাকরাও করলেন, তখন বীরত্ব যেন তার ইস্পাত সদৃশ শরীর থেকে ঠিকরে পড়ছিল। খানিক পরেই বিশাল জলরাশির বুক চিড়ে বেরিয়ে এলো বিশালাকার সেই দানব। বড় বড় দাঁতের ফাঁকে ফেনা গড়িয়ে পড়ছে তার, ভারিক্কি ও ভয়ংকর চেহারার জন্য পুরো সমুদ্রটাকে মৃত্যুপুরী মনে হচ্ছে। দুঃসাহসী হেরাক্লিসের মুগুরের এক আঘাতেই ধরাশায়ী হলো দানব, অচেতন হয়ে গেলো সে। পরবর্তীতে হেরাক্লিস তার তরবারি দাবনটার হৃৎপিণ্ড বরাবর ঢুকিয়ে দিতেই সমুদ্রের নীল জলরাশি টকটকে লাল শরবতের রূপ নিলো।
এই যাত্রায় বেঁচে গেলো রাজকন্যা হেসিওনি। সকলেই ভাবল, পূর্বের বিশ্বাসঘাতকতার ফল ভোগ, পাপের প্রায়শ্চিত্ত এবং হেরাক্লিসের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রাজা লাওমেডন হয়ত তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। কিন্তু সকলের ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করে এবারেও বেঁকে বসলেন রাজা লাওমেডন। কিছুদিন পর একটি পরীক্ষা শেষ করে রাজা লাওমেডনের কাছে ফিরে এলেন হেরাক্লিস। কিন্তু হেরাক্লিসের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিলেন লাওমেডন। তিনি দুটো ঘোড়া পাঠালেন ঠিকই, তবে সেগুলো দেবরাজ জিউসের দেয়া স্বর্গীয় ঘোড়া নয়। প্রবঞ্চনার শিকার হওয়ায় হেরাক্লিস ক্রোধে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, লাওমেডনকে তিনি উপযুক্ত শাস্তি দিয়েই ছাড়বেন।
ট্রাকিসে যুবতী স্ত্রী ডিয়ানিরাকে রেখে ভ্রাতুষ্পুত্র আইওলাসকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন হেরাক্লিস। সাহায্যে পাওয়ার আশা নিয়ে প্রথমেই দ্বারস্থ হলেন পুরনো বন্ধু টেলামন এবং পেলিয়াসের কাছে। টেলামন মাত্র কিছুদিন আগেই অ্যাথেন্সের স্যালামিসে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন। সাংসারিক সকল ব্যস্ততার পাট চুকিয়ে মোট ছ’টা জাহাজের ব্যবস্থা করলেন টেলামন। সাথে যোগ দিলেন পেলিয়াস, ওইক্লিস, আইওলাস, ডাইমাকাসের মতো গ্রীক বীরেরা। প্রত্যেককে একটি করে জাহাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হলো।
মহাবীর হেরাক্লিসের নেতৃত্বে সমুদ্রের বুক চিরে আপন গতিতে ট্রয়ের দিকে এগিয়ে চলল যুদ্ধজাহাজগুলো। ট্রয়ের উপকূলে এসে ওইক্লিসকে জাহাজের পাহারায় রেখে বাকিরা আক্রমণ চালালেন নগরীতে। অকস্মাৎ এই হামলার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না রাজা লাওমেডন। তবে তৎক্ষণাৎ তিনি ফন্দি আঁটলেন। কিছু সৈন্য যোগাড় করে গোপন পথে এগোতে থাকলেন জাহাজগুলোর দিকে। প্রথমেই কব্জায় পেয়ে গেলেন অপ্রস্তুত ওইক্লিসকে, নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো তাকে। ওই গোপন পথের বাঁক ধরেই ট্রয়ে ফিরে এলেন লাওমেডন। পথে অবশ্য হেরাক্লিসের কিছু সৈন্যের সাথে হালকা যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি, কিন্তু সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেন। সুস্থ দেহে নগরীতে পৌঁছানোর সাথে সাথেই বন্ধ করে দিলেন নগরীর দরজা।
ওদিকে, পুরো ট্রয় নগরীকেই চারদিক থেকে অবরোধ করে রাখলেন হেরাক্লিস। তবে তাকে বেশিদিন এ নগরী অবরোধের বেষ্টনীতে রাখতে হয়নি। ট্রয় নগরীর প্রাচীর দেবতা অ্যাপোলো এবং পসেইডন নির্মাণ করলেও, তাদের সাহায্য করেছিলেন টেলামন আর পেলিয়াসের বাবা সম্রাট অ্যাকাস। মরণশীল মানুষের হাত লেগেছে বলে প্রাচীরটি পুরোপুরি অমর হতে পারেনি। বাবার মুখে ট্রয়ের বিখ্যাত প্রাচীরের গল্প শুনতে শুনতেই বড় হয়েছেন পেলিয়াস। প্রাচীরের কোথায় ফাঁকফোকর আছে, তা পেলিয়াস ভালো করেই জানতেন। বাকিদের জানিয়ে দিলেন সেই দুর্বলতার কথা, গর্ত দিয়ে পঙ্গপালের মতো প্রবেশ করল তার অনুসারীরা। হেরাক্লিস নগরীর প্রধান দুর্গে আক্রমণ শুরু করলেই দু’পক্ষের মাঝে বাধে মরণপণ লড়াই। খানিক বাদে দেখা গেলো মৃত লাওমেডনের নিথর দেহ লুটিয়ে আছে মাটিতে। রাজার ছোট সন্তান পোডারসেস বাদে আর কেউ বেঁচে নেই তখন। যুদ্ধের পর সকল বন্দীদের সামনে এনে দাঁড় করালেন হেরাক্লিস। বন্দীদের মধ্যে রাজকুমারী হেসিনওনিও ছিল। তখন হেরাক্লিস বললেন,
বেদনায় জর্জরিত হেসিওনি তখন ক্রন্দনরত কণ্ঠে জবাব দিলো,
প্রত্যুত্তরে হেরাক্লিস জানান দিলেন,
সাথে সাথে নিজের স্বর্ণ-খচিত মুখাবরণ খুলে দিলো হেসিওনি, মুক্ত করল পোডারসেসকে। এরপর থেকেই পোডারসেসের নাম হয়ে গেলো ‘প্রায়াম’, যার অর্থ ‘মুক্তিপণ দেয়া হয়েছে’। হেসিওনিকে অনুচর টেলামনের সাথ বিয়ে দিয়ে, প্রায়ামকে ট্রয়ের মসনদে বসিয়ে আসলেন হেরাক্লিস। তারপর তিনি দলবল নিয়ে চিরদিনের জন্য ট্রয় ছেড়ে চলে আসেন। রাজা লাওমেডন চিরনিদ্রায় শায়িত ছিলেন ট্রয়ের সিয়ান ফটকের কাছে। কথিত আছে, লাওমেডনের কবর যতদিন অক্ষত ছিল, ততদিন ট্রয় নগরীতে কোনো শত্রুর অনুপ্রবেশ হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখব গ্রিস ও ট্রয়ের টানা দশ বছরের যুদ্ধ শেষে কাঠের ঘোড়া নগরীতে ঢোকানোর সময় নগরীর প্রধান ফটক বড় করার প্রয়োজন পড়ে। ফলে উচ্ছেদ করা হয় লাওমেডনের অক্ষত কবর। এরপরেই পতন ঘটে শত বছর শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত ট্রয় নগরীর।


সংক্ষেপে দেখুনহেকুবা এবং প্রায়াম
ওদিকে, ধীরে ধীরে শৌর্যবীর্য নিয়ে ট্রয়ের নির্মল আলো-বাতাসে বেড়ে উঠতে লাগলেন প্রায়াম। একসময় তিনি হেকুবার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রাজা প্রায়াম এবং তার রানী হেকুবার রাজত্বকালে ট্রয় ক্রমশ সম্পদ ও শক্তিতে ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে। নগরীর কল্যাণ এবং সেটাকে সংঘাত-সংঘর্ষের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুললেন, নির্মাণ করলে বিশাল বিশাল সুউচ্চ এবং সুদৃঢ় দুর্গ। ট্রয়ের পাশ দিয়ে কোনো জাহাজ গেলে সেটা থেকেও কর আদায়ের ব্যবস্থা করলেন। ক্রমে ক্রমে প্রায়ামের শাসনামলে ট্রয় নগরী হয়ে উঠলো তৎকালীন প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর এবং পরাক্রমশালী এক রাষ্ট্রে। রাজা প্রায়াম এবং রানী হেকুবার কোল আলো করে মোট উনিশজন সন্তান জন্ম নিয়েছিল।
নিজ স্ত্রীর সাথে হেক্টর
তাদের মধ্যে হেক্টর, প্যারিস, হেলেনাস, ক্যাসান্ড্রা, ডেইফোবাস, ট্রলিয়াস, পলিক্সেনা, ক্রিউসা, পলিডোরাস অন্যতম। তবে পৃথিবীজোড়া খ্যাতি অর্জন করতে পারা একমাত্র সন্তান ছিল হেক্টর। মহাবীর অ্যাকিলিসের নাম নিলে হেক্টরের নামও শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করা হয়। তার যুদ্ধনীতির জ্ঞান এবং যুদ্ধকৌশলে পারদর্শিতা তৎকালীন ট্রয়ের আর কারও ছিল না। মনের উদারতা, এবং আনুগত্যেও তিনি সকলের নজর কেড়ে নিয়েছিলেন। যদি গুণের দিকগুলো তুলনা করা হয়, তবে প্রেমের দেবী আফ্রোদাইতির সন্তান এবং প্রায়ামের ভ্রাতুষ্পুত্র ইনিয়াস ছাড়া তার সমকক্ষ আর কেউ ছিলেন না। এই ইনিয়াসই রোমান জাতির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডের নাম কেন এমন হল?
গ্রিনল্যান্ড সবুজে ঢাকা কোনো জায়গা নয় এবং আইসল্যান্ডও নামের মতোই বরফাবৃত নয়। শুনলে সত্যিই অবাক হবেন, গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮০ ভাগ অঞ্চলই স্থায়ী বরফে আবৃত। অন্যদিকে, আইসল্যান্ডের মাত্র ১১ ভাগ অংশ বরফে ঢাকা। গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের এই ‘প্যারাডক্স’ ধরনের নাম ও বৈশিষ্ট্য খুব স্বাভাবিক কারণেই বিখ্যাতবিস্তারিত পড়ুন
গ্রিনল্যান্ড সবুজে ঢাকা কোনো জায়গা নয় এবং আইসল্যান্ডও নামের মতোই বরফাবৃত নয়। শুনলে সত্যিই অবাক হবেন, গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮০ ভাগ অঞ্চলই স্থায়ী বরফে আবৃত। অন্যদিকে, আইসল্যান্ডের মাত্র ১১ ভাগ অংশ বরফে ঢাকা। গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের এই ‘প্যারাডক্স’ ধরনের নাম ও বৈশিষ্ট্য খুব স্বাভাবিক কারণেই বিখ্যাত গোটা পৃথিবী জুড়ে। আপনি কি কখনো ভেবেছেন, কেন এই রকম অদ্ভুত নামকরণ?
স্যাটেলাইট থেকে আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ড যেমন দেখা যায়
নামকরণের এই ব্যাপারটি ছিলো সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত। ভাইকিংরা যখন প্রথম এই ভূখণ্ড দুটিতে পা রাখে, তখনই নিজেদের খাতিরে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে সবকিছু বিপরীত দিকে পরিচালিত করলো। ভাইকিংরা সবুজ ভূখণ্ডটির নাম দিলো আইসল্যান্ড। কারণ উর্বর ও অনুকূল আবহাওয়ার অঞ্চলটি যেন সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এবং খুব বেশি লোকারণ্যে পরিণত না হয়। অন্যদিকে কঠিন বরফে আবৃত ভূখণ্ডটির নামকরণ করা হলো গ্রিনল্যান্ড, এই প্রতিকূল পরিবেশের দ্বীপটি কে দখল করতে গেলো কিংবা বসবাস করতে লাগলো তা নিয়ে খুব একটা মাথা না ঘামালেও চলতো। কিন্তু বাস্তবতা মাত্র তিন-চার বাক্যের মতোই সহজ নয়, নামকরণের পিছনে রয়েছে জটিল ঘটনাবলী, যার সাথে জড়িত রয়েছে জলবায়ুর পরিবর্তন ও ভাইকিং প্রথা। নামকরণের এই উপাখ্যান লোকগাঁথা ও উপকথার মতো প্রচলিত।
গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের নামকরণ হয়েছে ভাইকিংদের ইতিহাস থেকে
নরওয়েজিয়ান ভাইকিংদের প্রথা ছিলো, প্রথমে যা তাদের দৃষ্টিগোচর হবে, সেই অনুসারে তার নামকরণ করা। ভূখণ্ডের নামকরণের ক্ষেত্রে শেষে শুধুমাত্র ‘ল্যান্ড’ যুক্ত করে দিলেই হলো। যেমন বিখ্যাত নরওয়েজিয়ান ভাইকিং এরিক দ্য রেডের ছেলে লিফ এরিকসন কানাডার একটি অঞ্চলের নামকরণ করেছিলো ভিনল্যান্ড (Vinland)। ‘Vin’ শব্দটি এসেছে ফরাসি ভাষা থেকে, যার অর্থ ওয়াইন। সম্ভবত যে অংশে এরিকসন প্রথম নোঙর করেছিলেন সেখানে প্রচুর বন্য আঙুর দেখতে পেয়েছিলেন। তাই এমন নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
লিফ এরিকসনের কল্পিত চিত্র
উত্তর আটলান্টিক সাগরের একটি দ্বীপ রাষ্ট্র আইসল্যান্ড, মোট আয়তন ১,০২,৭৭৫ বর্গ কিলোমিটার। উপসাগরীয় প্রবাহের দরুন আইসল্যান্ডের সাধারণ তাপমাত্রা যথেষ্ট উষ্ণ। বর্তমানে আইসল্যান্ডের তাপমাত্রা ফেব্রুয়ারিতে সাধারণত গড়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও জুলাই থেকে আগস্টে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে উঠানামা করে। আইসল্যান্ড এক সময় ছিলো বিরান ভূমি। লোককাহিনী অনুসারে, ভাইকিংদের হাত ধরে সেখানে জনপদ গড়ে উঠেছিলো।
আইসল্যান্ড নামকরণের ইতিহাস নবম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে নিহিত। লোককাহিনী অনুযায়ী, নরওয়েজিয়ান ভাইকিং নাদাদর প্রথম আইসল্যান্ড আবিষ্কার করেন এবং যখন এই দ্বীপের উপকূলে তিনি পৌঁছান তখন সেখানে তুষারপাত হচ্ছিলো। প্রথা অনুযায়ী, নাদাদর দ্বীপটির নামকরণ করলেন ‘Snow land‘। নাদাদরের পর আইসল্যান্ডে পা রাখেন সুইডিশ ভাইকিং গারোর সভাভারোসন। সভাভারোসন বসতি স্থাপন করার পর সেটি নিজের নামে নামকরণ করেন ‘Garðarshólmur‘ বা গারোর দ্বীপ (Garðar’s Isle)। আজও এই নাম টিকে রয়েছে, আইসল্যান্ড আরেকটি যে নামে পরিচিত তা হলো ‘Garðarshólmur‘। গারোর পরে দ্বীপে যে ভাইকিং বসতি স্থাপন করেছিলেন, তার ভাগ্য ছিলো দুঃখ-দুর্দশায় পূর্ণ।
গারোর সভাভারোসন
আইসল্যান্ডের পথে ভাইকিং ফ্লোকি ভিলগারোরসন পাড়ি জমানোর পথে তার মেয়ে নৌকা থেকে পড়ে গিয়ে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। যতদিনে আইসল্যান্ডে পৌঁছান ফ্লোকি, ততদিনে দ্বীপের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া সকল পশু-পাখিও মারা যায়। সবকিছু হারিয়ে খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন ফ্লোকি। প্রচলিত উপকথা অনুসারে, এরপর সমুদ্রের ধারে কোনো এক পর্বতশীর্ষে আরোহণ করেন ফ্লোকি। পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এক বিশাল বরফ খণ্ড নজরে আসে ফ্লোকির। রাগে ও হতাশায় নিঃস্ব ফ্লোকি তখন দ্বীপটির নাম বদলে নতুন নাম দেন আইসল্যান্ড। সেই থেকে আজও এই নামেই পরিচিত উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের এই দ্বীপটি।
যেখানে সব হারিয়েছেন ফ্লোকি, সেখানে আর কোনো ধরনের বসতি গড়ে উঠুক তা বোধ হয় আর চাননি তিনি। তাই মাতৃভূমি নরওয়েতে ফিরে গিয়ে ফ্লোকি গুজব রটাতে থাকে দ্বীপটি বসবাসের একেবারে অনুপযোগী ও বরফে ঢাকা। কিন্তু ফ্লোকির সাথে থাকা নাবিকদলের একজন থরোফ প্রচার করে বেড়ায় যে দ্বীপটি দারুণ উর্বর এবং সবুজ ঘাসে ভরপুর। ক্রমেই লোকারণ্যে পরিণত হয় আইসল্যান্ড। ফ্লোকির পরে যারা আইসল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেন, তারা আর পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করেননি।
সমুদ্র অভিযানে ভাইকিংদের নৌকা
আইসল্যান্ডের নামকরণ নিয়ে আরেকটি উপকথা প্রচলিত রয়েছে। নরওয়েজিয়ান ভাইকিংদের দুই দলের মধ্যে যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধ থেকে একদল পালিয়ে নৌকায় পাড়ি জমায়, শেষপর্যন্ত তারা সত্যিকার অর্থেই সবুজ এক দ্বীপে পৌঁছায়। ভাইকিংদের এই দলটির আশংকা ছিলো শত্রুপক্ষ ও বিরোধীগুলো এমন সবুজ দ্বীপের কথা জানতে পারলে বার বার আক্রমণ করে দখল করা চেষ্টা করবে।
তাই তারা দ্বীপটির নাম দিলো আইসল্যান্ড এবং বাইরের পৃথিবীতে গুজব রটিয়ে দিলো যে দ্বীপটি বরফাচ্ছাদিত ও বসবাসের অযোগ্য। বিরোধী দলগুলোকে তাদের সবুজ দ্বীপ থেকে আরও দূরে সরিয়ে রাখতে তারা আরও প্রচার করেছিলো যে দূরে দারুণ সুন্দর সবুজ ও বিশাল একটি দ্বীপ রয়েছে। আসলে বিশাল এই দ্বীপটি ছিলো বরফে ঢাকা ও খুবই প্রতিকূল ভূখণ্ড। এই বিশাল দ্বীপটিই আজ গ্রিনল্যান্ড নামে পরিচিত।
আইসল্যান্ডের সবুজে ঢাকা পাহাড়, পুরো আইসল্যান্ডে বরফাঞ্চল মাত্র ১১ ভাগ
২১,৬৬,০৮৬ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে থাকা গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ। গ্রিনল্যান্ড যদিও উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত কিন্তু দ্বীপটির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইউরোপের হাতে। গ্রিনল্যান্ডের তাপমাত্রা আজকে যত কম, একসময় এত হিমশীতল ছিলো না। বরফ ও শামুকের খোলসের প্রাপ্ত অংশ নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৮০০-১৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ অংশ বর্তমানের তুলনায় অনেক উষ্ণ ছিলো।
কঠিন বরফে ঢাকা গ্রিনল্যান্ড, দ্বীপটির ৮০ ভাগ অঞ্চলই বরফে আবৃত
‘ভিনল্যান্ড’ নামকরণের হোতা ভাইকিং এরিকসনরের বাবা এরিক দ্য রেডের আসল নাম এরিক থরভালদসন। এরিকই ছিলো প্রথম ইউরোপিয়ান যিনি সর্বপ্রথম পা রাখেন গ্রিনল্যান্ডে এবং সেখানে বসতি স্থাপন করে। গ্রিনল্যান্ডে এরিকের পা রাখার ঘটনা ছিলো ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। প্রচলিত রয়েছে, নরওয়েতে থাকাকালীন সময়ে কোনো এক বিবাদে জড়িয়ে তিনজনকে হত্যা করে এরিক। তৎকালীন আইনানুসারে, হত্যার শাস্তি ছিলো মৃত্যদন্ড কিংবা নির্বাসন। এরিক বেছে নিয়েছিলেন নির্বাসন, যা তাকে পথ দেখিয়েছিলো সমুদ্র অভিযানে এবং নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের।
এরিক তার দলবল নিয়ে গ্রিনল্যান্ডের যে অংশে পা রাখেন, তা ছিলো দ্বীপটির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ এবং সময়টি ছিলো গ্রীষ্মকাল। এই উষ্ণ অংশটি একেবারে কঠিন বরফে আবৃত ছিলো না। যদিও বসবাসের জন্য এটি কিছুটা অনুকূলে থাকলেও, একেবারে সহজও ছিলো না এখানে বসতি স্থাপন করা। উষ্ণ তাপমাত্রা ফসল ও সবুজ প্রকৃতির জন্য সহায়ক ছিলো। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ অংশে জুন মাসের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবিষ্কারের সময়, ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে গ্রিনল্যান্ডের ঘাস হয়তো যথেষ্ট সবুজ ছিলো। এই বিবেচনায় ভাইকিংদের দেওয়া এই নাম সম্ভবত সময়ের বিবেচনায় সঠিক ছিলো। অবশ্য উপকথা অনুযায়ী, বসতি স্থাপনের জন্য এরিক তখন অন্যান্যদের আকৃষ্ট করার জন্য দ্বীপটির নাম দিয়েছিলো গ্রিনল্যান্ড।
এরিক দ্য রেড
কিন্তু চৌদ্দ শতকের দিকে দ্বীপটির তাপমাত্রা কমে যেতে থাকে, তখন বাইরে থেকে এসে সেখানে বসতি স্থাপন করা লোকদের সংখ্যা কমে গেলো। গ্রিনল্যান্ডে মাসের উষ্ণতম সময়েও তাপমাত্রা ০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের আশেপাশে বিরাজ করে। শীতকালে উত্তর-পূর্ব উপকূলের তাপমাত্রা -৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে আসে, অনেক সময় এটি -৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াসও হয়। ভাইকিংরা বসতি স্থাপনের আগে থেকেই গ্রিনল্যান্ডে বসবাস করতো সেখানকার স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী ইনুয়িত। স্থানীয় ইনুয়িতদের কাছে গ্রিনল্যান্ড পরিচিত ‘কালালিত নুনাত’, অর্থ ‘দ্য ল্যান্ড অব দ্য পিপল’।
জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলতে শুরু করেছে, অন্যদিকে আইসল্যান্ডের দিকে উপসাগরীয় উষ্ণ প্রবাহও ধীর গতির হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে হাজার বছর পূর্বে ভাইকিংদের দেওয়া নাম হয়তো সার্থকতা পাবে অদূর ভবিষ্যতে। কারণ তাহলে আইসল্যান্ডের তাপমাত্রা কমে হিমাংকের নিচে নামবে ও কঠিন বরফ জমতে শুরু করবে সমুদ্র উপকূলে। অন্যদিকে, গ্রিনল্যান্ড উষ্ণ হতে শুরু করবে, বরফ গলে যাবে এবং হয়তো আরও বেশি সবুজের সমারোহ দেখা যাবে। কিন্তু এমন আমূল পরিবর্তন বয়ে আনবে বিশাল বিপর্যয়, যা হবে কল্পনাতীত।
সংক্ষেপে দেখুনবাবা ইয়াগা কে?
রুশ দেশের ডাইনি বুড়ি বাবা ইয়াগা ডাইনি বুড়ি নামক চরিত্রটার সাথে আমাদের বিলক্ষণ পরিচয় আছে। ছোটবেলা থেকেই আমরা ডাইনিদের গল্প শুনি। ওরা কামরুপ কামাক্ষা থেকে মন্ত্র তন্ত্র শিখে এসেছে, বিবস্ত্র হয়ে গোটা একেকটা গাছ নিয়ে বাতাসে উড়ে বেড়ায় এমনতর আজগুবি কাহিনী নিয়ে চমৎকার সব গল্প বাংলা সাহিত্যে অনেক আছে। তারাশবিস্তারিত পড়ুন
রুশ দেশের ডাইনি বুড়ি বাবা ইয়াগা
ডাইনি বুড়ি নামক চরিত্রটার সাথে আমাদের বিলক্ষণ পরিচয় আছে। ছোটবেলা থেকেই আমরা ডাইনিদের গল্প শুনি। ওরা কামরুপ কামাক্ষা থেকে মন্ত্র তন্ত্র শিখে এসেছে, বিবস্ত্র হয়ে গোটা একেকটা গাছ নিয়ে বাতাসে উড়ে বেড়ায় এমনতর আজগুবি কাহিনী নিয়ে চমৎকার সব গল্প বাংলা সাহিত্যে অনেক আছে। তারাশংকর বন্দোপাধ্যায় তো ডাইনিদের নিয়ে দু’টি খাসা গল্প লিখে গিয়েছেন। তারাবাবুর ডাইনিরা স্রেফ চোখের দৃষ্টি দিয়েই মানুষের ভবলীলা সাঙ্গ করে দিতে পারতেন।
তা ডাইনি ব্যাপারটা আমাদের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। পৃথিবীর সব নৃগোষ্ঠী্র লোককথাতেই এরকম চরিত্রের দেখা মেলে। এমনই একটি চরিত্র হচ্ছে বাবা ইয়াগা।
বাবা ইয়াগার আবাস
কোথায় থাকেন বাবা ইয়াগা? সেক্ষেত্রে আমাদের নজর ফেরাতে হবে উত্তর দিকে। আমাদের পরিচিত পরিমণ্ডল ছেড়ে আরো বহু মাইল দূরে।
পূর্ব ইউরোপ। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এখানে থাকে স্লাভিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। এই স্লাভরা আবার পূর্ব স্লাভ, পশ্চিম স্লাভ, দক্ষিণ স্লাভ- এমন নানা ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে রুশ জাতির লোকেরা পড়েছে পূর্ব স্লাভ জনগোষ্ঠীর মধ্যে। আমাদের বাবা ইয়াগা থাকেন এই রুশ জাতির সুবিশাল আবাস ভূমিতে ছড়িয়ে থাকা গহীন সব বনের মধ্যে। যদিও পোলিশ এবং বুলগেরীয়সহ অন্যান্য স্লাভ দেশীয় লোককথাগুলোতেও তার কথা পাওয়া যায়।
বাবা ইয়াগা
কেন এই নাম?
বাবা ইয়াগার নাম শুনলে বাংলাভাষীদের ধন্দে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। ‘বাবা’ শব্দটার তো আলাদা অর্থ আছে বাংলা ভাষায়। তবে রুশী বুড়ি বাবা ইয়াগার নামের অর্থ পুরোটাই আলাদা। হরেক রকমের স্লাভ ভাষায় হরেক রকমের অর্থ করা যায় বলে আমরা প্রধানত রুশ ভাষাতেই আমাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখবো।
কিছু কিছু শব্দ আছে না যেগুলো শুনলে পুংলিঙ্গ আর স্ত্রী লিঙ্গ আলাদা করা যায় না? এই যেমন শিশু। শিশু বললে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের কথাই মনে হতে পারে। বাবা ইয়াগার ‘বাবা’ এমনই একটি লিঙ্গহীন শব্দ। তবে খাস রুশীতে ‘বাবা’ শব্দটার আক্ষরিক অর্থ করা যেতে পারে দিদিমা বা দাদী।
আর ইয়াগা অর্থ? নানা ভাষায় ইয়াগার নানা অর্থ আছে। তবে মোটামুটিভাবে বলা যেতে পারে- রাগ, নৃশংসতা, আতংক ইত্যাদি যেকোনো কিছু বোঝাতেই ইয়াগা শব্দটা পারঙ্গম। এর আরেকটা অর্থ হতে পারে সাপ। সে যা-ই হোক, ভাষাতত্ত্ববিদদের কচকচানি এড়িয়ে আমরা বলতে পারি, বাবা ইয়াগার মানে হচ্ছে ‘রাগী দিদিমা’। প্রধানত পূর্ব আর দক্ষিণী স্লাভদের মধ্যেই বাবা ইয়াগার কথা শোনা যায়। পশ্চিমী স্লাভদের জেজিবাবা নামের আরেকটি নিজস্ব দিদিমা আছেন। তিনিও অনেকটা বাবা ইয়াগার মতোই। হতে পারে প্রাচীনকালে দুজনে একই চরিত্র ছিলেন। অন্যান্য স্লাভ জাতিদেরও বাবা ইয়াগা সদৃশ দিদিমা আছেন। বুলগেরিয়ার গোর্শকা মাজকা (বনের মা), সার্বিয়ার বাবা করিজমা, ক্রোয়েশিয়ার বাবা রোগা, হাঙ্গেরির ভাসোরু বাবা এবং রোমানিয়ার মুমা পাদুরি অনেকটা একই চরিত্র বলা চলে। ১৭৫৫ সালের রুশী ব্যাকরণ বইয়ে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাবা ইয়াগার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয়, যদিও তার বিষয়ে বহু শত বছর ধরেই গল্পগাথা প্রচলিত আছে।
বাবা ইয়াগার হালচাল
প্রাচীন রুশ বর্ণনা ঘেটে দেখা যাচ্ছে, আমাদের বাবা ইয়াগার বাস গহীন বনে। লোকালয় থেকে অনেক দূরে। সেখানে সচরাচর মানুষের পা পড়ে না। ঘুরে বেড়ায় যতসব মস্ত মস্ত ভাল্লুক আর নেকড়ের দল। এহেন ভয়াল জঙ্গলের মাঝে একটু ফাঁকা জায়গায় বাবা ইয়াগার বাড়ি। তা সেটাও বড়ই বিদঘুটে। স্রেফ একটা মুরগীর পা। আর সেই মুরগীর পায়ের ওপরে লাট্টুর মত বনবন করে ঘুরে একটা কুড়েঘর। কুড়েতে কোনো দরজা-জানালার বালাই নেই। মেঝেতে লুকনো এক ফুটো দিয়েই কেবল প্রবেশ করা যায়। বাবা ইয়াগা সেই কুড়েঘরে থাকেন।
বাবা ইয়াগার কুড়ে
বাবা ইয়াগা দেখতে কেমন? কেমন আবার। ডাইনি বুড়ি যেমন হয় তেমনই। শতচ্ছিন্ন জামাকাপড়, হদ্দ ময়লা, মাথায় শণের মতো চুল, প্যাকাটির মত হাত-পা, ইস্পাতের দাঁত। সব মিলিয়ে খুব একটা মনোরম নন। আর দশটা রুশী মানুষের মতো বাবা ইয়াগার বাসাতেও আছে প্রকান্ড এক চুল্লী। উনি সেটার ওপরে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকেন। লম্বা নাক গিয়ে ঠেকেছে বাড়ির ছাদে। পা গিয়ে পড়েছে চৌকাঠে। মাঝে মধ্যে একটু হাওয়া খাওয়ার শখ হলে বুড়ি বেরিয়ে পড়েন স্রেফ একটা হামানদিস্তা নিয়ে। তা সে হামানদিস্তাও আকারে বিশাল বড়। ইয়াগা তাতে চড়ে ঘুরে বেড়ান। কখনো কখনো আবার ঘরের ঝাঁটাতেো চড়ে বসেন। সংগে প্রায়ই দেখা যায় পোষা একটা দাঁড়কাককে। অনেক গল্পে দেখা যায়, বাবা ইয়াগার বাসার চারপাশে মানুষের হাড়ের বেড়া, তাতে মশাল জ্বলছে। এরই ফাঁকে ফাঁকে খুটিতে গাঁথা রয়েছে নরমুণ্ডু।
বেশ ভীতিপ্রদ চরিত্র এই বাবা ইয়াগা
বাবা ইয়াগার পরিবার পরিজন নিয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে অনেক গল্পে দেখা যায় তার দুটি বোন আছে। ভয়াল নাগপুত্র জমেই গরিনিচ সম্পর্কে তার বোনপো হয়। আবার এক গল্পে দেখা যায় আন্দ্রেই নামক জনৈক রুশীর সাথে বাবা ইয়াগার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। কালো, লাল আর সাদা রঙ এর তিন রহস্যময় ঘোড়সওয়ার দিদিমাকে সাহায্য করে। এরা যথাক্রমে রাত, সূর্য আর দিনকে নির্দেশ করে। এছাড়া বাতাসে ভেসে থাকতে পারে এমন তিনজোড়া হাত তার কাজকর্ম করে দেয়। বলা হয়, তার কাছে আছে মৃতকে বাঁচিয়ে তুলতে পারার শক্তিশালী এক দাওয়াই- মন্ত্রপূত পানীয়।
বাবা ইয়াগা চরিত্র কেমন
বাবা ইয়াগাকে শুরুতেই ডাইনি বুড়ি গোত্রীয় বলে দেওয়ায় তার চরিত্র যে বিশেষ হিতকর হবে না, সেটা বোঝা যায়। তবে বাবা ইয়াগা কিন্তু সব সময়ই খারাপ বেশে আসেন না। হ্যাঁ, এটা ঠিক, কোনো পথভুলো রুশী আচমকা ওনার বাসাতে গেলে তিনি বঙ্গীয় ডাইনিদের মতোই হাউ মাউ খাউ জাতীয় হুংকার দিয়ে তেড়ে আসেন। তবে একবার বুড়িকে সামলে নিয়ে দরকারের কথাটা খুলে বললে অনেক সময় দেখা যায় তিনি অনাহূত অতিথিকে গোসল করিয়ে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় এর ব্যবস্থা করবার জন্য উতলা হয়ে পড়েছেন। শুধু তা-ই না, অতিথি কিসের সন্ধানে বন জঙ্গল ঢুড়ে বেড়াচ্ছে সেটারও যথাযথ খোঁজ নিয়ে কোনো না কোনো উপায় বাতলে দেন। অনেক সময় একটা সুতার বল দিয়ে দেন। সেটা গড়াতে গড়াতে অতিথিকে লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে তার মধ্যে দয়া-দাক্ষিণ্যের কমতি নেই। সাক্ষাত দিদিমা বলা চলে। এই যেমন সওদাগর পুত্র ইভানকে রাজার রোষ থেকে বাঁচানোর বুদ্ধি বাতলে দেওয়ায় বেচারা সে যাত্রা পার পেয়ে গিয়েছিলো, মার্যুশকা খোঁজ পেয়েছিলো নিজের স্বামীর। বিশুদ্ধ মনের মানুষ দেখলে বুড়ি সাহায্য না করে থাকতে পারেন না।
দিদিমা হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন
তবে রেগে গেলে এই বাবা ইয়াগাই ভয়ংকর। মানুষের মাংসে তার অরুচি নেই। মন যদি হয় কলুষিত, যদি থাকে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য- তাহলেই কর্ম সারা। অতিথিকে তৎক্ষণাত কেটেকুটে রান্না চড়িয়ে দেন গহীন বনের বাসিন্দা এই বিদঘুটে দিদিমা। অনেক সময় হামানদিস্তায় পিষে গুড়ো করে ফেলেন দুষ্টু পথিককে।
তবে দয়ালু বা নিষ্ঠুর যা-ই হন না কেন, বাবা ইয়াগা যে জ্ঞানী- এ কথাটা অস্বীকার করবার হিম্মত কারো হবে না। পৃথিবীর সবকিছু নিয়েই তিনি কিছু না কিছু জানেন। বিচিত্র সব দায়ে ঠেকে মানুষ যায় তার কাছে। বাবা ইয়াগাও তাদের হরেক রকমের বুদ্ধি বাতলে দেন। এই যেমন সুন্দরী ভাসিলিসাকে কিভাবে ফেরত আনা যায় বা আপনি বাজা বাদ্য, রগুঢ়ে বেড়াল, নাচিয়ে হাঁস প্রভৃতি বিচিত্র বস্তুর সন্ধান তিনি দিয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে ভালো মন্দ মিশিয়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায় তার চরিত্রে।
অবশেষে
বাবা ইয়াগার মতো পুরাকথার চরিত্রগুলোর ভালো-মন্দ বিচার আসলে অসম্ভব। তবে প্রাচীন স্লাভ জাতির অনেক কিছুই বাবা ইয়াগার কাহিনীগুলো থেকে জানা যায়। বাবা ইয়াগার কুড়েটির কথাই ধরা যাক। অনেকের ধারণা, আদি স্লাভেরা মৃত মানুষকে পোড়ানোর জন্য এমনিধারা খুঁটির ওপরে বসানো কুড়েঘর ব্যবহার করতো।
বাবা ইয়াগা এবং অতিথি
রুশদেশে বাবা ইয়াগা বরাবরই বেশ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তাকে নিয়ে বাঁধা হয়েছে পিয়ানোর সুর, সোভিয়েত আমলে বানানো হয়েছে চলচ্চিত্র। রুশ লোকগাথার এই খুনখুনে বৃদ্ধাকে অনেকে প্রকৃতি দেবীর একটি প্রতিরুপ হিসেবেও কল্পনা করেন। প্রকৃতি যেমন পরিশ্রমী আর ভালো মানুষকে দু’হাত ভরে উপহার দেয় এবং লোভী লোকদেরকে দেয় চরম শাস্তি, বাবা ইয়াগার চরিত্রটি যেন ঠিক সেদিক লক্ষ্য রেখেই বানানো হয়েছে। শত শত বছর ধরে তাতে যোগ হয়েছে নানা উপাদান। দাঁড়িয়ে গিয়েছে এক বর্ণিল চরিত্র।
কাজেই কেউ যদি রুশ দেশের বিরাট বনগুলোতে যান, আর সেখানে কোনো এক সন্ধ্যা রাতে বার্চের বন ফুড়ে হামানদিস্তায় চড়ে এই ভয়ানক বুড়িকে উড়ে আসতে দেখেন, তাহলে ভয় পাবেন না যেন! আপনি যদি নিষ্কলুশ হৃদয়ের অধিকারী হন, রহস্যময়ী দিদিমা আপনাকে মাথায় তুলে রাখবেন। অবশ্য মনে অসৎ মন্ত্রণা থাকলে স্রেফ চুল্লীতে সেদ্ধ হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই! এভাবেই ভালো-মন্দ, সু আর কু এর ধারণাগুলো নিয়ে টিকে আছেন রুশভূমির এই বিখ্যাত দিদিমা- বাবা ইয়াগা।
সংক্ষেপে দেখুনমুষলধারে বৃষ্টির সঙ্গে ‘ক্যাটস এন্ড ডগস’ এর সম্পর্ক কী?
অফিস শেষে বাসায় ফিরছেন। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি নামলো তো নামলোই, আর থামাথামির কোনো নামগন্ধ নেই। এমন বৃষ্টিকে আমরা বলি মুষলধারে বৃষ্টি। ইংরেজরা একে বলে, “It’s raining cats and dogs.” আক্ষরিক অর্থ করলে দাঁড়ায়, বিড়াল-কুকুরের বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ঝুম বৃষ্টির সাথে বিড়াল-কুকুরবিস্তারিত পড়ুন
অফিস শেষে বাসায় ফিরছেন। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি নামলো তো নামলোই, আর থামাথামির কোনো নামগন্ধ নেই। এমন বৃষ্টিকে আমরা বলি মুষলধারে বৃষ্টি। ইংরেজরা একে বলে, “It’s raining cats and dogs.” আক্ষরিক অর্থ করলে দাঁড়ায়, বিড়াল-কুকুরের বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ঝুম বৃষ্টির সাথে বিড়াল-কুকুরের সম্পর্ক কোথায়? কেন এমন নামকরণ করা হয়েছে?
কুকুরে বিড়ালে বৃষ্টি হচ্ছে!
সর্বপ্রথম এই বাগধারাটির মতোই একটি বাগধারার ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় ১৬৫১ সালে প্রকাশিতওলর ইস্কানাস নামের এক কবিতা সংকলনে। ব্রিটিশ কবি হেনরি ভাউঘান এই বইয়ের এক কবিতায় একটি বাড়ির ছাদের কথা উল্লেখ করেন। এটি নাকি কুকুর-বিড়ালের ‘বৃষ্টি’ থেকে সুরক্ষিত ছিল। এক বছর পর রিচার্ড ব্রোম নামক এক ইংরেজ নাট্যকার তার সিটি উইট নামের কমেডি নাটকে ‘It shall rain dogs and polecats’ লাইনটি উল্লেখ করেন। এখানে পোলক্যাট হলো একধরনের বিড়ালজাতীয় প্রাণী।
এরপর ১৭৩৮ সালে বিখ্যাত ইংরেজ লেখক জোনাথন সুইফট Complete Collection of Genteel and Ingenious Conversation নামে সমাজের উচ্চশ্রেণীর কথোপকথন নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক লেখা প্রকাশ করেন। এই লেখায় একটি চরিত্রের কথোপকথনে সর্বপ্রথম এই বাগধারাটির বর্তমান রূপ ‘raining cats and dogs’ কথাটি উঠে আসে, যা ছিল নিম্নরূপ-
তবে বাগধারার এই রূপটি হয়তো সুইফট নিজে উদ্ভাবন করেননি। বরং আগে থেকেই প্রচলিত এই বাগধারাটিকে সুইফট নিজের মতো পরিবর্তন করে নিয়েছিলেন। সুইফটের লেখার পর থেকেই বাগধারাটির বর্তমান রূপ বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য ব্রিটিশ লেখকদের মধ্যেও এই বাগধারাটির ভিন্ন ভিন্ন রূপ ব্যবহার করতে দেখা যায়। যেমন It’s raining pitchforks কিংবা it’s raining stair-rods। এগুলোর সবই মুষলধারে বৃষ্টি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সুইফটের বাগধারাটিই সর্বত্র ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
জোনাথন সুইফট
ব্যঙ্গাত্মক লেখাটি ছাড়াও সুইফট City Shower নামে ১৭১০ সালে একটি কবিতা লিখেন। সেখানে ভারি বর্ষণের পর বন্যার বর্ণনা দেন তিনি। এই কবিতায় বন্যার ফলে রাস্তাঘাটে বিড়াল, কুকুরের মতো মৃত প্রাণীর একটি বর্ণনা রয়েছে। এর সাথে হয়তো এই বাগধারাটির একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। ঠিক কীভাবে এই বাগধারাটি এলো তার সঠিক কোনো তথ্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবে গবেষকরা এর উৎপত্তির পেছনে কয়েকটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। প্রথম তত্ত্ব অনুসারে, এই বাগধারার উৎপত্তি আসলে পৌরাণিক কাহিনী থেকে। নর্স পুরাণে ঝড়ের দেবতা ওডিনকে সবসময় নানা প্রাণীর সাথে চিত্রায়িত করা হয়েছে। বিশেষ করে কুকুর ও নেকড়ের সাথে তাকে বেশি দেখা যায়। ফলে নর্সরা কুকুরকে ঝড়ের প্রতীক হিসেবে মানতো।
ওডিনের পাশে কুকুর
আবার লোককাহিনী অনুসারে, ডাইনিরা ঝড়ের মাঝে ঝাড়ুতে চড়ে আকাশে ওড়াওড়ি করে। আর তাদের সাথে থাকে কালো বিড়াল। ডাইনি ও কালো বিড়াল একসময় সমুদ্রের নাবিকদের কাছে ভারী বৃষ্টির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। গবেষকদের মতে, Raining cats and dogs এর মাঝে থাকা বিড়াল দ্বারা ভারী বর্ষণ এবং কুকুর দ্বারা ঝড়ো বাতাসকে বোঝানো হয়। এগুলো এসেছে উপরের দুই পৌরাণিক প্রেক্ষাপট থেকে।
বিড়াল সহ ডাইনীদের প্রতীক
আবার আরেকদল গবেষকের মতে, Cats and dogs শব্দ দুটি এসেছে গ্রিক Cata doxa থেকে। এই গ্রিক শব্দযুগল অনেকটা ইংরেজি শব্দযুগলের মতোই শোনায়। গ্রিক ঐ শব্দযুগলের অর্থ হলো, যা বিশ্বাস করা যায় না, অর্থাৎ যখন অবিশ্বাস্য রকম জোরেশোরে বৃষ্টি হচ্ছে; তখন সেটিকে বলা হয় Raining cats and dogs।
আরেকটি ধারণা অনুসারে, Cats and dogs আসলে বর্তমানে অপ্রচলিত শব্দ Catadupe-এর বিকৃত রূপ। প্রাচীন ইংরেজি সাহিত্যে Catadupe-এর অর্থ ছিল ঝর্ণা বা জলপ্রপাত। এ শব্দটি দিয়ে নীলনদের জলোচ্ছ্বাস বোঝানো হতো। সেই অর্থে, Raining cats and dogs এর মানে ছিল ঝর্ণার মতো বৃষ্টি। এই বাগধারাটির উৎপত্তির পেছনে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে গল্পটি প্রচলিত রয়েছে সেটি এসেছে লোকসাহিত্য থেকে।
এই গল্প অনুসারে, বহুকাল আগে মানুষ খড়ের ঘরে বাস করতো। সেসময় কুকুর বিড়ালের মতো গৃহপালিত প্রাণীরা এসব খড়ের ঘরের চালে উঠে বিশ্রাম নিতো। খুব জোরে বৃষ্টি নামলে বৃষ্টির তোড়ে ঘরের ছাদ থেকে কুকুর বিড়াল মাটিতে গড়িয়ে পড়তো। সেখান থেকেই হয়তো মুষলধারে বৃষ্টির নামের সাথে কুকুর বিড়াল জড়িয়ে যায়। লোকসাহিত্য ছাড়াও এই গল্পের আরেকটি বড় উৎস হলো Life in the 1500s নামে ১৯৯৯ সালে গোটা ইন্টারনেট জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ইমেইল। এই ইমেইলে বলা হয়,
তবে একটু বাস্তবতা বিচার করলেই বোঝা যাবে, এ গল্পটি আসলে ভিত্তিহীন। কারণ বিড়াল হয়তো লাফিয়ে ঘরের চালে উঠে আশ্রয় নিতে পারে, কিন্তু কুকুরের জন্য তা প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া ঝড়বৃষ্টির মধ্যে কুকুর কিংবা বিড়াল ঘরের চালের মতো উন্মুক্ত স্থানে আশ্রয় নেবে এমনটা ভাবাও আসলে অযৌক্তিক। গবেষকদের মতে, এ গল্পটির আসলে কোনো ভিত্তি নেই।
শিল্পীর কল্পনায় বৃষ্টিতে কুকুর ও বিড়াল ঝরে পড়ার দৃশ্য
এই বাগধারা নিয়ে এমন আরেকটি গল্প প্রচলিত আছে। সপ্তদশ কিংবা অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে ব্রিটিশ শহরগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। সেসময় ভারী বৃষ্টি হলেই শহরগুলোতে ছোটখাট বন্যার সৃষ্টি হতো। ফলে বন্যার পানিতে ডুবে কুকুর-বিড়ালের মতো অনেক প্রাণী মারা যেত। বৃষ্টির পর এগুলোরই মৃতদেহ ভেসে থাকতো পানিতে। কেউ কেউ মনে করতেন, এই প্রাণীগুলো বাইবেলে উল্লেখিত সেই ব্যাঙ ঝরে পড়া বৃষ্টির মতোই আকাশ থেকে ঝরে পড়েছে।
আকাশ থেকে মাছ ও পাখির মতো ছোটখাটো প্রাণী বৃষ্টির সাথে ঝরে পড়ার অনেক ঘটনা থাকলেও কুকুর বিড়াল ঝরে পড়ার মতো ঘটনা বেশ বিরল। তবে আকাশ থেকে না পড়লেও রাস্তায় ভেসে থাকা কুকুর কিংবা বিড়ালের মৃতদেহ থেকেই হয়তো এই বাগধারাটি এসেছে। পূর্বে উল্লেখিত জোনাথন সুইফটের সেই কবিতাটিতেও ঠিক এমনটির উল্লেখ পাওয়া যায়।
এমন বৃষ্টিতে ছাতা নিতে ভুলবেন না!
শুধু ইংরেজিতেই এই বাগধারাটি ব্যবহার হয় এমন কিন্তু না। পৃথিবীর অনেক দেশের অনেক অঞ্চলে এই বাগধারাটির ভিন্ন ভিন্ন রূপ প্রচলিত রয়েছে। যেমন, দক্ষিণ আফ্রিকায় মুষলধারে বৃষ্টি হলে বলা হয় It’s raining old women with clubs। আর্জেন্টিনায় বলা হয় It’s raining dung head-first। স্লোভাকিয়ায় বলা হয় Tractors are falling। আয়ারল্যান্ডে বলা হয় It’s throwing cobblers’ knives।
সংক্ষেপে দেখুনমাওলানা জালাল উদ্দীন রুমি কে ছিলেন?
মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমি: স্রষ্টার প্রেমে মাতাল এক সুফি কবি প্রচলিত সকল ধর্ম ও ধর্মীয় গুরু’রা যেখানে স্রষ্টার পরিচয় দিচ্ছেন রূঢ়তা, হিংস্রতা, কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা দিয়ে। সেখানে তিনি স্রষ্টাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন প্রেম দিয়ে। তার রচিত ‘মসনবী’ কে আজো ফার্সি ভাষার শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বলে ভাবা হয়। মসনবী নিবিস্তারিত পড়ুন
মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমি: স্রষ্টার প্রেমে মাতাল এক সুফি কবি
প্রচলিত সকল ধর্ম ও ধর্মীয় গুরু’রা যেখানে স্রষ্টার পরিচয় দিচ্ছেন রূঢ়তা, হিংস্রতা, কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা দিয়ে। সেখানে তিনি স্রষ্টাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন প্রেম দিয়ে।
তার রচিত ‘মসনবী’ কে আজো ফার্সি ভাষার শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বলে ভাবা হয়। মসনবী নিয়ে পারস্য দেশের গুণী-জ্ঞানীরা বলেন, আল্লাহ যদি আরবি ভাষায় কোরান প্ৰকাশ না করে ফার্সিতে করতেন, তবে মৌলানা জালালউদ্দীন রুমির ‘মসনবি’ কেতাবখানাকে কোরান নাম দিয়ে চালিয়ে দিতেন।
মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি জন্মগ্রহণ করেন ১২০৭ সালে বালখে (যা বর্তমানে আফগানিস্তান)। তার বাবা বাহা উদ্দিন একজন সুপরিচিত আলেম। সেই সাথে তিনি বালখের একজন ধর্মতাত্ত্বিক ও আইনজ্ঞও ছিলেন। রুমির অনুসারীদের কাছে তিনি ‘সুলতান আল-উলামা’ নামেই পরিচিত। আর এর ফলেই শৈশব থেকেই রুমির সুযোগ হয়েছিল জ্ঞান আর জ্ঞানীদের সাথে মিলেমিশে বড় হওয়ার, যার স্পষ্ট ছাপ পাওয়া তার প্রতিটি কথায়।
রুমির জন্মভূমি বালখ
রুমির বাবার লেখা একটি আলোচনার সংকলন পাওয়া যায়, যার নাম ‘মাআরিফে বাহা ওয়ালাদ’ যার অর্থ ‘বাহা ওয়ালাদের শিক্ষা’। সেখানে খোদার প্রতি সমর্পণ, নৈষ্ঠিক মরমি জীবন ও মরমি তত্ত্ব সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট যুক্তি দেখতে পাওয়া যায়। তরুণ রুমি বাবার লেখা এই সংকলন পড়তে খুব ভালোবাসতেন। বাবার এই লেখাই হয়তো রুমির মধ্যে শৈশবেই সুফি হওয়ার বীজ বপন করেছিল।
অপরদিকে মাওলানা রুমির মা মুইমিনা খাতুনের পরিবার ছিল সেসময়ে বেশ সম্মানিত। তার পরিবার বহু যুগ ধরেই ইসলামের হানাফি মাযহাবের প্রচারকের ভূমিকায় কাজ করে যাচ্ছিল, যা পরে মাওলানা রুমিও জারি রাখেন।
রুমির শৈশব সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। রুমির শৈশবে চেঙ্গিসখানের সাম্রাজ্যের উত্থানের শুরু হয়। মঙ্গোলরা একে একে দেশ,রাজ্য ও সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকে। একের পর এক নগরী ধ্বংস করে শ্মশানে পরিণত করে। আর তাই বধ্য হয়ে ১২১৬ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সী রুমি নিষ্ঠুর মঙ্গোলীয় বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে পরিবার ও বাবার শিষ্যদের সাথে বলখ থেকে পশ্চিমে রওনা হন।
১২২৮ সালের দিকে সেলজুক সাম্রাজ্যের শাসক সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ মাওলানা রুমির বাবা বাহাউদ্দিন এবং তার পরিবারকে আনাতোলিয়ার কোনিয়ায় নিমন্ত্রণ করে আনেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুরোধ করেন, যার ফলশ্রুতিতে রুমির পুরো পরিবার সেখানে থেকে যায়। আর সেখানেই তার বাবা বাকি জীবন সেলজুক সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদের তৈরি করে দেওয়া প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে কাটান।
বলখে রুমির একজন শিক্ষক ছিলেন। তার নাম ছিল বুরহানুদ্দিন মুহাক্কিক তিরমিজি । তিনি রুমির বাবার শিষ্য ছিলেন। রুমির বাবা মারা গেলেন ১২৩১ সালে তখন তার বয়স ৮০ বছর। আর সেই সময়েই বুরহানুদ্দিন কোনিয়ায় এসে পৌঁছালেন। তিনি রুমির শিক্ষার ভার নিলেন।

তুরস্কের বুকাতে রুমির ভাস্কর্য
বুরহানুদ্দিনের নির্দেশে রুমি সিরিয়ার আলেপ্পো ও দামেস্কে কয়েক বছর থাকেন। উদ্দেশ্য ছিল সেখানে থাকা বড় পণ্ডিতদের কাছে শিক্ষা লাভ করা। দামেস্কে থাকার সময় সম্ভবত তিনি বিখ্যাত সুফি গুরু ইবনে আরাবির বক্তৃতা শোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। ইবনে আরাবি বলতেন ওয়াহদাতুল ওয়াজুদের কথা। এর মানে ‘সত্তার একত্ব’। এই ধারণাই হয়ে উঠে রুমির কবিতার দার্শনিক ভিত্তি। মানে, সেই এক ও অনন্য বাস্তবতা, যা সবার উৎস ও প্রকাশ। সেখানেই সবার প্রত্যাবর্তন ঘটে।
এমনি করে রুমি ফারসি-আরবি ভাষা ও সাহিত্যে উঁচু শিক্ষা লাভ করেছেন। সঙ্গে ছিল ধর্মীয় শাস্ত্র, দর্শন ও আইনশাস্ত্রে শিক্ষা। বুরহানুদ্দিন তাকে চিল্লা, মানে চল্লিশ দিনের নির্জন সুফি-সাধনায় শিক্ষা দিয়েছিলেন। সেকালে বাবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রুমি এক নামী শিক্ষক ও গুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।
রুমি, শামস তাবরেজি ও আধ্যাত্মিকতা
রুমির বয়স তখন ৩৭। ১২৪৪ সালের ২৯ নভেম্বর। রুমি দেখা পান তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির। তিনি একজন ভবঘুরে দরবেশ। তার বয়স তখন ৬০। নাম শামস তাবরেজি। মানে তাবরেজের সূর্য। তাবরেজ উত্তর-পশ্চিম ইরানের এক শহর। শামস ছিলেন এক রহস্যময় পুরুষ। শামস তাবরেজি নিরক্ষর ছিলেন বলে প্রচলিত মতাদর্শ রয়েছে। কিন্তু কি করে এমন একজন নিরক্ষর মানুষ রুমির মতো এতো নামী পন্ডিত কে আত্মহারা কবি বানিয়ে দিতে পারলেন তা আজো পাঠকদের বিস্মিত করে।
শামস তাবরিজি ছিলেন সমাজ থেকে একটু আলাদা, যিনি নিজেকে সম্পদ থেকে সবসময় দূরে রেখেছেন। আধ্যাত্মিকতা আর সম্পদের মোহ থেকে মুক্ত থাকার দরুণ তিনি সবসময় কিছু মানুষের কাছে অন্যরকম মর্যাদা পেতেন। মানুষ তাকে ‘পাখি’ বলে ডাকত, কারণ তিনি এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকতেন না, দ্রুত জায়গা পরিবর্তন করতেন। লোক মুখে প্রচলিত ছিল, তিনি একজন শিষ্য খুঁজতেন যে কি না তার পরে আধ্যাত্মিকতার কাজটি এগিয়ে নেবে।
শামস তাবরিজি
কী ঘটেছিল তাঁদের দুজনের মধ্যে? কে ছিলেন গুরু? কে শিষ্য?
এই কথার উত্তর খুঁজতে গেলে দুটি ব্যাপার বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, শামস নিরক্ষর বিরাগী দরবেশ ছিলেন না। তিনি পণ্ডিতও ছিলেন না। তবে পণ্ডিত আর সুফি সাধকদের কাছে তার পাঠ নেওয়ার নজির আছে। তার আলোচনার একটি সংকলন বই আকারে পাওয়া যায়; নাম মাকালাতে শামস, মানে শামসের আলোচনা। আর এই আলোচনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন মওলানা রুমির পুত্র। সেই বইয়ের আলোচনাই বলে দেন কতোটা সূক্ষ্ম দৃষ্টির মানুষ ছিলেন।
রুমির মন ভালোবাসা, সৃষ্টির মূল্য নিশ্চিত করে স্রষ্টা তথা পরম সত্যকে ধারণ করার জন্য তাঁর হৃদয়-প্রাণ উন্মুখ হয়েই ছিল। প্রয়োজন ছিল একটি আগুনের ছোঁয়া। শামস তাবরেজ শুধু সেই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ খুলে দিলেন। আর বের হয়ে এল আশ্চর্য সুন্দর, আকুল করা, অন্তর্দৃষ্টিতে সতেজ রুমির কবিতাগুলো। সারাদিনমান আমি এই নিয়ে ভাবি তারপর রাতে আমি তা বলি”আমি কোথা হতে আগত?”
আর আমার লক্ষ্যটি তাহলে কী?আমার আত্মাটি অন্য কোথাও হতে আগত আমি তাতে নিশ্চিত!
শামস আর রুমির দেখা না হলে দুজনের কেউই ইতিহাসে জায়গা করে নিতেন না। এই দুইয়ের সাক্ষাৎকে এর চেয়ে কম কিছু দিয়ে মাপা যায় না । তবে তাঁদের সম্পর্কের ধরন কেমন ছিল?
শামসের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরই রুমি তার গীতিকবিতা, মানে গজলগুলো বলা শুরু করলেন। তার সাধারণ কক্ষে তিনি সন্ধ্যার পর শিষ্যদের নিয়ে বসতেন । সেখানে ‘সামা’, মানে ভাবসংগীতের আসর হতো। সে আসরের মাঝে একখানা খুঁটি ছিল। হাল বা ভাবে এসে মওলানা সেই খুঁটি ধরে চক্রাকারে ঘুরতেন । বাহ্যজ্ঞানরহিত মওলানা একের পর এক গজল বলে যেতেন। শিষ্যরা সেগুলো লিখে রাখতেন। গুরু শামস তাবরেজ স্মরণে বলা এই কবিতাগুলোর সংকলনের নাম দিওয়ানে শাম তাবরেজ। একে ‘দিওয়ানে কবির’ বা মহান সংকলন নামেও ডাকা হয়। এই সংকলনে আছে ৩৫০০ গজল, ২০০০ রুবাই বা চতুষ্পদী। সব মিলিয়ে ৪২,০০০ লাইন। প্রতিটি কবিতা আকুল প্রেমের। অনেকগুলো সরাসরি রুমির মুর্শিদ শামস তাবরেজের নাম উল্লেখ করেই বলা।

দেওয়ান-এ শামস-এ তাবরেজী” ১৫০৩ সালের একটি পৃষ্ঠার অনুকরণ
প্রেক্ষাপট বিচ্ছিন্ন হয়ে এই কবিতা পাঠ করার মারাত্মক পরিণাম হতে পারে। এর প্রমাণ হতে পারে এই যে পশ্চিমে রুমির কবিতা জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণাও গজিয়ে উঠল যে এই কবিতাগুলো সমকামী প্রেমের আবেগের নিদর্শন। এই ভাবনা হচ্ছে ইতিহাসের জমিনে না দাঁড়িয়ে কেবল নিজের কাল আর সমাজের সাপেক্ষে কিছুকে ধারণ করতে চাওয়ার ফল।
অন্য সংস্কৃতির প্রথা নিজ সংস্কৃতি দিয়ে বুঝতে চাওয়া ভুল। যেমন মধ্যপ্রাচ্যে সাক্ষাতে পুরুষেরা পুরুষের আর নারীরা নারীদের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে অভিবাদন জানায়। পশ্চিমা দেশে এর প্রত্যক্ষ মানে সমকামিতা ছাড়া আর কিছু নয়। অপর দিকে পশ্চিমা সমাজে প্রথাটা ঠিক বিপরীত। প্রাচ্যে যা অকল্পনীয়। জাপানে ঘরের বাইরে চুমু দেওয়া খুবই অস্বাভাবিক। এমনকি জাপানি মায়েরাও তাঁদের শিশুকে বাইরে চুমু দেন না।
সুফিদের একটি ঐতিহ্যের নাম ‘সোহবাত’। যার মানে সাহচর্য। যেখানে দুই অন্বেষণকারীই একে অপরকে শ্রদ্ধা আর ভালোবেসে নিয়মিত সাক্ষাৎ করেন। নিজেদের অনুভূতি আর অভিজ্ঞতা একে অপরকে জানান। এই দুজন গুরু ও শিষ্য হতে পারেন। দুজনই গুরুস্থানীয় হতে পারেন কিংবা দুজনেই বন্ধু হতে পারেন। এই চর্চা মরমি পথের পথিকদের পথের সুলুক সন্ধান জানতে কাজে লাগে। এতে করে নিজেদের জানা-বোঝা বাড়ে। শামস ছিলেন রুমির ‘হাম-সোহবাত’, সাহচর্য সঙ্গী। রুমি আর শামসের মতো দুজন মানুষ সহসা একে অপরের কাছে আসেন না। এমন ঘটনা কালেভদ্রে হয়। এ যেন দুই মহানদীর এক হয়ে প্রেমের সমুদ্রে মিশে যাওয়া।
ফারসিভাষী সুফি কবিদের মধ্যে রুমি প্রথম প্রেমের কবিতা লেখেননি। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি সেই জায়গায় এক অতি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের মধ্যে জন্মেছেন। সেই প্রেম কখন মানব থেকে পরম আর কখন পরম থেকে মানবে আসে, তা দ্রুত বোঝা কঠিন।
রুমির মৃত্যু
রুমি মারা যান ১২৭৩ সালের ৭ ডিসেম্বর, রোববার সন্ধ্যাবেলা। তার সমাধি তখন থেকে প্রেমিকদের তীর্থভূমি। পশ্চিমে তিনি পরিচিত রুমি নামে। কারণ, তিনি বাস করতেন যেখানে, সেই স্থানকে বলা হতো ‘রুম’। আনাতোলিয়ার বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে পারস্যবাসীরা রুম নামে ডাকত। আফগান বা তুর্কিরা তাকে বলেন জালালউদ্দিন বলখি। কারণ, তার জন্ম বলখ নগরে। তবে পুবের মানুষেরা তাকে সেই জন্ম বা আবাসের বেড়া পার হয়ে ডাকেন ‘মওলানা’ বলে। তবে ফারসিভাষী তথা অনারব মুসলমানরা রুমিকে ‘মওলানা’ বলেই ডাকতে ভালোবাসে । যার অর্থ গুরু, শিক্ষক।
১৯৮১-১৯৯৪ সালের তুরস্কের ৫০০০ লিরা(টাকা) নোটের পিছনে রুমি এবং তার সমাধিস্তম্ভ।
রুমিকে তার পিতার কাছে কোনিয়ায় সমাহিত করা হয় এবং যেটি একটি চমকপ্রদ ঘর, “ইয়াসিল তুর্ব”(সবুজ সমাধি, যা বর্তমানে মাওলানা মিউজিয়াম), তার কবরের উপর দাঁড়িয়ে আছে। তার সমাধিফলকে লেখাঃ
জর্জিয়ার রাণী গুরসু খাতুন ছিলেন রুমির উৎসাহদাতা এবং কাছের বন্ধু। তিনি কোনিয়াতে রুমির সমাধি নির্মানে তহবিল প্রদান করেন। ১৩ শতকের মাওলানা মিউজিয়ামসহ তার মসজিদ, থাকার জায়গা, বিদ্যালয় এবং মৌলভি তরীকার অন্যান্য ব্যক্তিদের সমাধি দেখতে আজকেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম-অমুসলিমরা ছুটে যান।
তুরস্কের কোনিয়াতে রুমির সমাধি।
জালাল উদ্দিন যিনি রুমি নামে পরিচিত, তিনি ছিলেন ইসলামের একজন দার্শনিক এবং মরমী। তার উপদেশ সমর্থন করে ভালবাসার মাধ্যমে অসীম পরমতসহিষ্ণুতা, ইতিবাচক যুক্তি, ধার্মিকতা, দানশীলতা এবং সচেতনতা। তিনি এবং তার শিষ্যদের কাছে সকল ধর্মই অধিক বা কম সত্য। মুসলিম, খৃষ্টান এবং ইহুদীকে একই দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন, তার শান্তিপূর্ণ এবং সহিষ্ণু শিক্ষাদান বা উপদেশ সকল ধর্মের মানুষের অন্তর স্পর্শ করেছে।
দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স উপন্যাসের আড়ালে মাস্কেটিয়ার্সদের বাস্তব জীবন কেমন?
দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স: উপন্যাসের আড়ালে মাস্কেটিয়ার্সদের বাস্তব জীবন বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক আলেকজান্ডার দ্যুমার বিখ্যাত এডভেঞ্চার উপন্যাস ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’। ১৮৪৪ সালে আলেকজান্ডার দ্যুমা তার সহযোগী আরেক লেখক অগাস্ট ম্যাক কে নিয়ে ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ শিরোনামে Le Siècle নামক একটি সাপ্তাবিস্তারিত পড়ুন
দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স: উপন্যাসের আড়ালে মাস্কেটিয়ার্সদের বাস্তব জীবন
বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক আলেকজান্ডার দ্যুমার বিখ্যাত এডভেঞ্চার উপন্যাস ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’। ১৮৪৪ সালে আলেকজান্ডার দ্যুমা তার সহযোগী আরেক লেখক অগাস্ট ম্যাক কে নিয়ে ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ শিরোনামে Le Siècle নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত করতে থাকে। এই উপন্যাসের মাধ্যমে আলেকজান্ডার দুমা তার পাঠকদের ১৭ শতকের ফ্রান্সের কিছু মাস্কেটিয়ার্সদের এডভেঞ্চারময় জীবনে নিয়ে যান।
গল্পটি পত্রিকায় প্রতি সপ্তাহে ১ টি অধ্যায় বা অনুচ্ছেদ আকারে প্রকাশিত হতো। যেহেতু সেসময় সাধারণ মানুষের পক্ষে একটা গোটা বইয়ের দাম বহন করার সক্ষমতা ছিলো কম, তাই তারা দৈনিক পত্রিকার প্রতি এতোটাই ঝুঁকে পড়ে যে Le Siècle পত্রিকা কেনার জন্য সংবাদপত্রের দোকানগুলোতে দীর্ঘ লাইন লেগে থাকতো
ফরাসি ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার আলেকজান্ডার দ্যুমা
দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স উপন্যাসটি ১৭ শতকের ফ্রান্সের প্রেক্ষাপটে রচিত। উপন্যাসের শুরু হয় ফ্রান্সের গ্যাসকনের ডার্টানিয়ান নামক এক যুবক ছেলেকে দিয়ে। ডার্টানিয়ান গ্যাসকন ছেড়ে প্যারিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। তার জীবনের উদ্দেশ্য সে রাজার রক্ষীবাহিনী মাস্কেটিয়ার্সের দলে যোগ দিয়ে নিজের জীবনের ক্যারিয়ার গড়বে। আর প্যারিসে এসেই বিভিন্ন ঘটনাবহুল দৃশ্যপটের মাধ্যমে তার বন্ধুত্ব হয় ফ্রান্সের রাজা লুই ত্রয়োদশ এর তিন অনুগত মাস্কেটিয়ার অ্যাথোস, পোর্থোস এবং আরামিসের সাথে।
এই চার মাস্কেটিয়ার্স একসাথে অনেক এডভেঞ্চারময় ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন। রাজা লুই ত্রয়োদশের রাণী অ্যান-অস্ট্রিয়ার সম্মান বাঁচাতে মন্ত্রী ও তার সহযোগীদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বেঁচে গিয়েছেন। কিন্তু এই উপন্যাসের প্লট ও চরিত্রগুলো কিন্তু আলেকজান্ডার দ্যুমা ১৭ শতকের ফ্রান্সের বাস্তব জীবন থেকেই নিয়েছিলেন। আজ আপনার উপন্যাসের নায়কদের বাস্তব জীবন সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দেবো এই লেখার মাধ্যমে।
মাস্কেটিয়ার্সদের উৎপত্তি
থ্রি মাস্কেটিয়ার্সদের নায়কদের সম্পর্কে জানার আগে আমাদের মাস্কেটিয়ার্স সম্পর্কে জানা উচিত। মাস্কেটিয়ারদের উৎপত্তি হয় ১৬ শতকের গোঁড়ার দিকে, যখন রাজা ষষ্ঠ হেনরি একটি ছোট অশ্বারোহী বাহিনী তৈরি করেছিলেন। মাস্কেটিয়ার্স বাহিনী আর্কেবাস নাম এক ধরনের লম্বা বন্দুক দিয়ে সজ্জিত থাকতো। তারা তাদের সঠিন নিশানায় লক্ষভেদের জন্য পুরো রাজ্য জুড়ে বিখ্যাত ছিলেন।
একজন অশ্বারোহী মাস্কেটিয়ার
১৬১৫ সালে ফ্রান্সের রাজা লুই ত্রয়োদশ মাস্কেটিয়ার্সদের কাজকর্ম ও সাজসজ্জায় বিশেষ পরিবর্তন আনেন। তিনি তার নিরাপত্তার জন্য এই বিশেষ বাহিনীর ব্যবহার শুরু করেন।
শুরু থেকেই, মাস্কেটিয়ার্সরা ছিলো একটি অভিজাত রেজিমেন্ট। মাস্কেটিয়ার্স দলে প্রায় সব নিয়োগকারীই ছিলো আভিজাত বংশের মানুষজন, যদিও সামরিক দক্ষতাই ছিল প্রধান। মূল মাস্কেটিয়ার্স দলে যোগ দেওয়ার আগে তাদের ট্রেনিং দেওয়ানো হতো। তবে সদ্য যোগ দেওয়া সকল মাস্কেটিয়ার্সরা ছিলো বয়সে তরুন। তাদের সকলের বয়সই ১৬ থেকে ১৮ বছরের মাঝামাঝি।
মাস্কেটিয়ার্সরা অশ্ব,তলোয়ার ও আগ্নেয়াস্ত্র চালানোতে বেশি দক্ষ ছিলো। ফ্রান্সে যখন যুদ্ধ চলতো না তারা রাজা সহচারী হিসেবে যুক্ত থাকতো। রাজার বিনোদন বা মনোরঞ্জনের দায়িত্ব ছিলো তাদেরই হাতে। আবার দেশে যুদ্ধ লাগলে রাজার সঙ্গে তারা রাজার সঙ্গে যুদ্ধে সম্মুখভাগে কাজ করতো। এছাড়াও তারা রাজার দরজায় সেন্ট্রি হিসেবেও কাজ করতো।
বাস্তবে উপন্যাসের চরিত্র ডার্টানিয়ান
বাস্তবে ডার্টানিয়ানের নাম চার্লস ডি ব্যাটজ দে ক্যাস্টেলমোর। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৬১৩-১৫ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের লুপিয়াকের কাছের শ্যাটো কাস্টেলমোরে। তার পরিবার ছিলো দরিদ্র আর তিনি ছিলেন সেই পরিবারে ছোট ছেলে। তিনি খুবই কম বয়সে ফ্রান্সের একটি অভিজাত রেজিমেন্টে যোগ দেন। তিনি ১৬৩৫ সালে ফ্রাঙ্কোয়েস ডি গুইলনের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন। তার মায়ের পারিবারিক পদবির নাম ছিলো ডার্টানিয়ান, উপন্যাসে আলেকজান্ডার দ্যুমা তাকে আমাদের সামনে এই নামেই পরিচয় করিয়েছেন।
ডার্টানিয়ান ১৬৪০ এর দশকে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ১৬৪১ সালে তিনি ইংল্যান্ডে একটি মিশনে গিয়েছিলেন আর ফিরে আসেন যখন ফ্রান্সের রাজা লুই ত্রয়োদশ পরলোকগমন করেন। ডার্টানিয়ান ১৬৪৪ সালে মাস্কেটিয়ার্স দলে যোগ দেন। মাস্কেটিয়ার্সের রেজিমেন্ট ভেঙে গেলে তিনি মন্ত্রী কার্ডিনাল মাজারিনের সাথে কাজ শুরু করেন। এ সময় তিনি বেশ কয়েকটি গোপন মিশন পরিচালনা করেন। তবে ডার্টানিয়ান সবচেয়ে বেশি কুখ্যাত দূর্নীতিবাজ অর্থমন্ত্রী নিকোলা ফুকে কে গ্রেফতার করার জন্য।
চার্লস ডি ব্যাটজ দে ক্যাস্টেলমোর স্ট্যাচু যিনি পাঠকদের কাছে ডার্টানিয়ান নামে পরিচিত
ডার্টানিয়ান একসময় রাজ পরিবারের বিশেষ অংশ হয়ে উঠেন। তিনি রাজার হরিণ শিকারী দলের অধিনায়কের দায়িত্ব নেন। রাজা লুই ত্রয়োদশের পুত্র রাজা লুই চতুর্দশের ভ্রমণের সময় সবসময় রাজার সঙ্গেই থাকতেন।
১৬৫৯ সালে ডার্টানিয়ান শার্লট অ্যান ডি চ্যানেলেসি নামের এক বিধবা নারীকে বিয়ে করেন, যার সাথে আগের স্বামীর ২ জন পুত্র সন্তানও ছিলো। কিন্তু ১৬৬৫ সালেই তাদের এই বিবাহ ভেঙে যায়।
সাংসারিক হতে না পারলেও তিনি ছিলেন একজন সফল সৈনিক। ১৬৫৬ সালে তিনি গার্ডস দলের ক্যাপ্টেন হন। এর দুই বছর পর ১৬৫৮ সালে আবারো পুনরায় গঠিত হওয়া মাস্কেটিয়ার্স দলের সাব-লেফটেন্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৬৬৭ সালে তিনি সেই মাস্কেটিয়ার্স ব্রিগেডিয়ার হন। এছাড়াও তিনি সাময়িক সময়ের জন্য ফ্রান্সের লীলের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ডার্টানিয়ান ১৬৭৩ সালের ২৫ জুন যুদ্ধচলাকলীন শত্রুর আঘাতে নিহত হন।
বাস্তব জীবনে অ্যাথোস
অ্যাথোসের আসল নাম আরমান্ড ডি সিলেগু ডি’অথস ডি’আউটভিল। আলেকজান্ডার দ্যুমার মাস্কেটিয়ার্স সদস্যদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে আভিজাত্যপূর্ণ সেই সাথে ছিলেন জ্ঞানী মানুষ। তিনি সবসময় মদ্যপান করতেন। উপন্যাসে তার এই প্রচুর মদ পানের পেছনে ছিলো এক করুন প্রেমে আঘাত পাওয়ার ঘটনা। যা সবসময় তিনি তার বন্ধুদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র অ্যাথোস জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৬১৫ সালে। অ্যাথোসরা ছিলেন ২ ভাই, আর তিনিই ছিলেন কনিষ্ঠ। বাস্তব জীবনের অ্যাথোসের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। তিনি ১৬৪০ বা ৪১ সালে মাস্কেটিয়ার্সদের দলে যোগ দিয়েছিলেন। আর যোগ দেওয়ার মাত্র ২ বছর পর ১৬৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর প্যারিসে মারা যান।
ইতিহাসবিদদের মতে অ্যাথোসের এই অল্প বয়সে মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। তার সাথে কারো দ্বন্দ্ব ছিলো আর সেই দ্বন্দ্ব ভায়োলেন্সে রূপ নেয়, আর তাতেই অ্যাথোসের মৃত্যু হয়।
বাস্তব জীবনের পর্থোস
পর্থোসের আসল নাম আইজ্যাক ডি পুর্তো। দ্যুমা তার উপন্যাসে পর্থোসকে দেখিয়েছিলেন অনুগত, সাহসী এবং একজন প্রেমিক পুরুষ রূপে। পর্থোস ১৬১৭ সালে ফ্রান্সের একটি প্রোটেস্টেন্ট খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৬৪০ এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি একটি সামরিক দলে যোগ দেন। অনেক ইতিহাসবিদ ধারণা করেন যে তিনি পরবর্তীতে মাস্কেটিয়ার্সদের দলে যোগ দিয়েছিলেন। পর্থোস ১৬৫০ সাল নাগাদ তার জন্মভূমি বার্নে ফিরে আসেন। আর সেখানেই তাকে নাভারেক্সের যুদ্ধাস্ত্র গার্ডের সাবঅল্টার্ন হিসাবে কাজ করতে দেখা যায়। এছাড়াও তাকে তার ভাই জিনের সাথে কাজ করতে দেখা যায়, যিনি সেই শহরের একটি সামরিক পোস্টও অধিষ্ঠিত ছিলেন।
পর্থোসের বাকি জীবনটা রহস্যময়। তবে স্থানীয় তথ্য মতে তিনি ১৬৭০ সালে মারা যান। দ্যুমার মাস্কেটিয়ার্স চরিত্রগুলোর মধ্যে দ্যুমার সবচেয়ে প্রিয় মাস্কেটিয়ার্স ছিলো পর্থোস। দ্যুমার বাবাও ছিলেন একজন সফল সৈনিক। নিজের বাবার রূপটাই তিনি পোর্থোসের মাধ্যমে উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন।
বাস্তব জীবনের অ্যারামিস
অ্যারামিসের আসল নাম হেনরি ডি অ্যারামিস। আলেকজান্ডার দ্যুমা তার উপন্যাসে অ্যারামিস কে দেখিয়েছেন, একজন যুবক যিনি মাস্কেটিয়ার্স দলে যোগ দেওয়ার আগে পুরোহিত হওয়ার জন্য ধর্মের উপর অধ্যায়ন করেছেন। থ্রি মাস্কেটিয়ার্স সিরিজের পরের বই গুলোতে তাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। আর সিরিজের শেষ পর্যন্ত ৪ জন মাস্কেটিয়ার্সদের মধ্যে বেঁচে যাওয়া শেষ মাস্কেটিয়ার্স ও তিনিই।
দ্যুমার থ্রি মাস্কেটিয়ার্স উপন্যাসের মধ্যে সবচেয়ে জটিল চরিত্রটির নাম অ্যারামিস। অ্যারামিস ফ্রান্সের একটি অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অ্যারামেস খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের মঠে তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন। উপন্যাসের শুরুতে দ্যুমা অ্যারামেসের ধর্মের ব্যাপার সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না।

আলেকজান্ডার দ্যুমার সেই ৪ মাস্কেটিয়ার্সদের স্ট্যাচু ফ্রান্সের কোনো এক শহরে
অ্যারামিজ ১৬৪০ সালের গ্রীস্মে মঁসিয়ে ট্রেভিয়েলের অধিনস্থ মাস্কেটিয়ার্সের দলে যোগদান করেন। তিনি বেশ কয়েক বছর মাস্কেটিয়ার্স দলে কাজ করেছিলেন। মাস্কেটিয়ার্স দলে তার পদবি কি ছিলো বা কি পদমর্যাদা অর্জন করেছিলেন সে-সব বিষয়ে তথ্য জানা যায় না। ১৬৫০ সালে তিনি বার্নে ফিরে আসেন; আর সেখানেই তিনি জিন ডি বার্ন-বোনাসেকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির ২ ছেলেও ২ মেয়ে হয়েছিল। অ্যারামিস কে প্যারিসে শেষবার ১৬৫৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে দেখা যা, যখন তিনি এবং তার স্ত্রী তার শ্যালকের বিবাহের সাক্ষী হতে উপস্থিত হয়েছিলেন। ১৬৮১ সালে অ্যারামিস কোনো প্রকার দূর্ঘটনা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেন।
বাস্তব জীবনের মঁসিয়ে ডি ট্র্যাভিল
মঁসিয়ে ট্র্যাভিলের নাম ছিল জিন-আর্নড ডু পেয়ার ডি ট্রয়েসভাইলস। মঁসিয়ে ট্র্যাভিল ১৫৯৮ সালে বার্নের ওলোরন-সাইন্ট-মেরিতে জন্মগ্রহণ করেন। মঁসিৈ ট্র্যাভিল ১৬১৬ সালে গার্ডসের একটি রেজিমেন্টে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। আর মাস্কেটিয়ার্স দলে যোগ দেন ১৬২৫ সালে।১৬৩৪ সালে তিনি মাস্কেটিয়ার্স দলের ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন। মাস্কেটিয়ার্স দল ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ১২ বছর তিনি সেই পদেই ছিলেন।
মঁসিয়ে ট্র্যাভিল রাজার প্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন। রাজার শুভাকাঙ্ক্ষী হওয়ায় মন্ত্রী কার্ডিনাল রুশেলৌর শত্রুতে পরিণত হন। কার্ডিনাল রুশলৌর ষড়যন্ত্রের ফলে তাকে মাস্কেটিয়ার্স দল থেকে সাময়িকভাবে নির্বাসিত করা হয়।
মাস্কেটিয়ার্স দল পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও মঁসিয়ে ট্র্যাভিলি আর ফিরে আসেন নি। তিনি তার জন্মস্থান বার্নে নিজের সম্পত্তি দেখাশোনা করেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেন। মঁসিয়ে ট্র্যাভিলি ১৬৭২ সালে মারা যান।
থ্রি মাস্কেটিয়ার্স একে-অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্য নয়, কিন্তু সম্পর্কিত
আলেকজান্ডার দ্যুমা তার থ্রি মাস্কেটিয়ার্স ট্রিওলজিতে যেমটা ৪ মাস্কেটিয়ার্স ডার্টানিয়ান,অ্যাথেস,পর্থোস ও অ্যারামিস কে দেখিয়েছিলেন বাস্তবে সেই বর্ণার সাথে তাদের জীবনে তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। তারা একে অপরকে আদৌও চিনতেন কিনা সে ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের অনেক সন্দেহ আছে। তবে এদের সকলের একটা বিষয়ে খুব কমন জিনিস হচ্ছে মঁসিয়ে ট্র্যাভিল। এদের সকলে একজন আরেকজনের সাথে সম্পর্কিত না হলেও মাস্কেটিয়ার্স থাকাকালীন সময়টায় তারা সকলেই মঁসিয়ে ট্র্যাভিলের সাথে যুক্ত ছিলেন।
ডার্টানিয়ানের সাথে অন্য তিন মাস্কেটিয়ার্সের যোগসূত্র নিয়ে সন্দেহ থাকলেও ঐতিহাসিক নথিপত্র মতে অ্যাথোস,পরর্থোস, অ্যারামেসের সাথে মঁসিয়ে ট্র্যাভিলির আত্মীয়ের সম্পর্ক ছিলো। এরা প্রত্যেকেই একে অপরের কোনো না কোনোভাবে কাজিন ছিলেন। এদের সকলের মাস্কেটিয়ার্স দলে আসার পেছনে কারণ হিসেবে মনে করা হয় মঁসিয়ে ট্র্যাভিলি কারণ সে সময় তিনি ছিলেন মাস্কেটিয়ার্স দলের প্রধান আর সে সময়টায় নিজেদের আত্মীয়দের সরকারি দল বা চাকরিতে নেওয়ার ব্যাপার খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ছিল।