সাইন আপ করুন
লগিন করুন
রিসেট পাসওয়ার্ড
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? আপনার ইমেইল এড্রেস দিন। ইমেইলের মাধ্যমে আপনি নতুন পাসওয়ার্ড তৈরির লিংক পেয়ে যাবেন।
আপনি কেন মনে করছেন এই প্রশ্নটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই উত্তরটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই ব্যক্তিকে রিপোর্ট করা উচিৎ?
আইকিউ কি সত্যিই মানুষের বুদ্ধিমত্তা নির্দেশ করে?
বুদ্ধি অভিনয়ের একটি উপায়। আপনি যদি বুদ্ধিমানের মতো অভিনয় করেন, তবে আপনি আপনার আইকিউ নির্বিশেষে একজন চৌকস ব্যক্তি। – আমেরিকান লেখক ব্রায়ান ট্রেসি। আইকিউ আসলে কী? আইকিউ টেস্টের বাংলা মানে করলে দাঁড়ায় বুদ্ধিমত্তা বা বুদ্ধাঙ্ক নির্ণয়। এই বুদ্ধাঙ্ক হলো মানসিক বয়স ও প্রকৃত বয়সের অনুপাত। মানসিক বয়সকে পবিস্তারিত পড়ুন
আইকিউ আসলে কী?
আইকিউ টেস্টের বাংলা মানে করলে দাঁড়ায় বুদ্ধিমত্তা বা বুদ্ধাঙ্ক নির্ণয়। এই বুদ্ধাঙ্ক হলো মানসিক বয়স ও প্রকৃত বয়সের অনুপাত। মানসিক বয়সকে প্রকৃত বয়স দিয়ে ভাগ করে ১০০ দ্বারা গুণ করলে বুদ্ধাংক পাওয়া যায়।
আইকিউ নির্ণয়ের সূত্রটি হলো:
বুদ্ধাংক (I.Q) = (মানসিক বয়স /প্রকৃত বয়স) * ১০০
এখানে ১০০ দ্বারা গুণ করা হয় ভগ্নাংশ এড়ানোর জন্য এবং ১০০ কে ধ্রুবক হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু মানসিক বয়স বের করার জন্য নির্দিষ্ট বয়সের জন্য নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন নিয়ে প্রশ্নমালা তৈরি করা হয়। কোনো ব্যক্তি যদি সবগুলো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারে, তবে তার মানসিক বয়স সেই নির্দিষ্ট বয়সের সমান হবে। যেমন ১০ বছরের শিশু যদি ১০ বছরের জন্য নির্দিষ্ট করে সাজানো প্রশ্নমালার উত্তর সঠিকভাবে দিতে পারে, তার মানসিক বয়স হবে ১০, যা তার প্রকৃত বয়সের সমান। আবার যদি সে ১৩ বছর বয়সের জন্য নির্দিষ্ট প্রশ্নমালার সঠিক উত্তর দিতে পারে, তবে তার মানসিক বয়স হবে ১৩।

Caption
এই সূত্র থেকে প্রাপ্ত মান অনুযায়ী পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীকে অনেকভাবে শ্রেণিভুক্ত করা যায়। সাধারণত মান ৭০ এর নিচে হলে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন, ৭০-৯০ এর মধ্যে হলে স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন, ৯০ থেকে ১২০ এর মধ্যে হলে স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন, ১২১ থেকে ১৪০ এর মধ্যে হলে অত্যন্ত বুদ্ধি সম্পন্ন এবং ১৪০ এর উপরে হলে তাকে একজন জিনিয়াস বলেই ধরা নেওয়া যাবে।
আইকিউ এর ইতিবৃত্ত
১৮৮২ সালে ব্রিটিশ পরিসংখ্যানবিদ ফ্রান্সিস গাল্টন প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা নির্ণয়ের জন্য কিছু সাধারণ পরীক্ষা তৈরি করেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফ্রান্সের একটি স্কুলে কোন কোন শিক্ষার্থীদের বিশেষ যত্ন দরকার, এটি ঠিক করার জন্য কর্তৃপক্ষ মনোবিদ আলফ্রেড বিনে এবং থিওডর সাইমনের শরণাপন্ন হয়। ১৯০৫ সালে আলফ্রেড বিনে এবং থিওডর সাইমন মস্তিষ্কের বিকাশের কিছু প্রকাশমাধ্যম যেমন মৌখিক যুক্তি, কাজের স্মৃতিশক্তি এবং চাক্ষুষ-স্থানিক দক্ষতা ইত্যাদি যাচাই করার জন্য বেশ কিছু পরীক্ষামালা উদ্ভাবন করেন এবং প্রাপ্ত ফলাফলকে স্কোরিং করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

আইকিউ টেস্টের পথিকৃৎ আলফ্রেড বিনে; Image Source: researchgate.net
প্রতিটি বয়সের শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট প্রশ্নমালা তৈরি করে দেখা হয় যে, শিশুটি তার বয়সের বাকি শিশুদের থেকে বেশি, সমান না কম বুদ্ধিমান। তাদের উদ্ধাবিত পদ্ধতিটি বিনে-সিমন টেস্ট নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়। এরপর স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এল. এম. টারম্যান ১৯১৬ সালে বিনে-সিমন টেস্টকে কিছুটা পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন করেন, যা স্ট্যানফোর্ড-বিনে ইন্টেলিজেন্স স্কেল নামে পরিচিতি পায়। এই টেস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং বুদ্ধিমত্তা পরিমাপক পদ্ধতি হিসেবে অদ্বিতীয় মর্যাদা পায়। এর আগে ১৯১২ সালে জার্মান মনোবিদ উইলিয়াম স্টার্ন Intelligence এবং Quotient শব্দজোড়া থেকে IQ শব্দটি তৈরি করেন, যা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় শব্দ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
আইকিউ পরীক্ষার অন্ধকার অধ্যায়
যদিও আইকিউ টেস্ট ফ্রান্সের একটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রথম তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি জনপ্রিয় হতে হতে অনেকটাই মানুষের বুদ্ধিমত্তা বিচারের একমাত্র মাধ্যমে পরিণত হয়। আইকিউ ধীরে ধীরে মানুষকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করার মাধ্যমেও পরিণত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনাবাহিনীর নিয়োগের সময় বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা হিসেবে এ পরীক্ষার ব্যবহার করে। সেই সময় অনেক বিজ্ঞানী এবং রাজনীতিবিদরা ইউজেনিকস মতবাদে বিশ্বাস করতেন। ইউজেনিকস অনুযায়ী, যেসব মানুষ পশ্চিমাদের চোখে অধিকতর সুন্দর, বুদ্ধিমান (অর্থাৎ তারা নিজেরা)- তাদের মধ্যেই প্রজনন প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ রেখে মানবজাতির মধ্যে একটি বিশুদ্ধ জাতি তৈরি করা।
এ মতবাদ পুরো পৃথিবীতেই গণহত্যা এবং জাতিগত বিশুদ্ধিকরণকে উৎসাহিত করে। ইউজেনিকসের সমর্থকরা আইকিউ টেস্টকে বুদ্ধিমত্তার পরিমাপক হিসেবে ধরত। স্বভাবতই তারা সেসময় প্রথাগত পড়াশোনায় এগিয়ে থাকার কারণে আইকিউ টেস্টে ভালো করত এবং একসময় তারা সেটিকে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা শুরু করল। এমনকি ১৯২৪ সালে ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে কম আইকিউধারী মানুষদের সন্তান গ্রহণে অক্ষম করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল, যা পরে আদালত পর্যন্ত গড়ালে আদালতও সে সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে ঘোষণা করে।
ভার্জিনিয়ায় ১৯২৪ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত নিম্ন আইকিউ’র অজুহাতে প্রায় ৭,০০০ লোককে বিভিন্নভাবে প্রজননে অক্ষম করা হয়। ধীরে ধীরে এর হার কমে আসে এবং ২০০১ সালে এটিকে বর্ণবাদী আখ্যায়িত করে ভার্জিনিয়া। নাৎসি শাসিত জার্মানিতে কম আইকিউ সম্পন্ন শিশুদের হত্যার অনুমতি পর্যন্ত দেয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মানবাধিকার আন্দোলনের প্রভাবে আইকিউ বিচার করে মানুষকে শ্রেণিভুক্ত করা কমে আসে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেখা যায়, সামগ্রিকভাবেই মানুষের গড় আইকিউ বেড়েছে। কিন্তু এর কারণ হিসেবে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ নয়, বরং জীবনযাত্রার মানবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক পরিবেশের উন্নয়ন দায়ী বলে গবেষকরা মত দিয়েছেন। এই ঘটনাটিকে ফ্লিন ইফেক্ট বলা হয়।
আইকিউ কি সত্যিই মানুষের বুদ্ধিমত্তা নির্দেশ করে?
আইকিউ টেস্ট বুদ্ধিমত্তা যাচাইয়ের একমাত্র পদ্ধতি নয়; Image Source: mountbanyanglobalschool.com
আইকিউ টেস্ট এমনভাবে ডিজাইন করা হয়, যা মানুষের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সাধারণ জ্ঞান, গাণিতিক যুক্তি, স্মৃতিশক্তি, দৃষ্টিগত বিশ্লেষণ ক্ষমতা ইত্যাদি বিচার করে ফলাফল নির্ধারণ করে। কিন্তু বুদ্ধিমত্তা শুধুমাত্র এ ক’টি বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়। যেমন, আবেগ কিংবা সামাজিক বুদ্ধিমত্তা আইকিউ দিয়ে বিচার করা যায় না। আবার উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সচেতনতা, স্বকীয়তা, আধ্যাত্মিক বোধ ইত্যাদি আইকিউ দিয়ে বিচার করা হয় না। কানাডার টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মানব বিকাশ এবং প্রায়োগিক মনোবিদ্যার অধ্যাপক স্ট্যানোভিচের মতে, আইকিউ পরীক্ষাকে এককভাবে গুরুত্ব দেবার কিছু নেই। তার মতে, আইকিউ পরীক্ষাগুলো কিছু মানসিক অনুষঙ্গকে পরিমাপ করার ক্ষেত্রে খুব ভালো; যেমন- যুক্তি, বিমূর্ত যুক্তি, শেখার ক্ষমতা এবং কর্ম-স্মৃতি ক্ষমতা সহ মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা ইত্যাদি।
কিন্তু, বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এটি কতটুকু কার্যকর, তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি আরো বলেন, আইকিউ পরীক্ষাগুলো মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিমাপ করে এবং সেটি মোটামুটিভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে এবং কর্মজীবনে সাফল্যের পূর্বাভাস দিতে পারে। তবে সে পূর্বাভাস অসম্পূর্ণ এবং ততটা ভরসার যোগ্য না-ও হতে পারে। স্বাস্থ্যকর মানবিক চিন্তাশৈলী এবং মস্তিষ্কের পরিপূর্ণ দক্ষতা আইকিউ দ্বারা বিচার করাই যথেষ্ট নয়। তাই বুদ্ধিমত্তা নির্ণয়ে আইকিউ টেস্টই সবকিছু নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইকিউ এর বিকল্প কী?
১৯৯০ সালে পিটার সালোভে এবং জন ডি মায়ার সাধারণ বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ধারণার প্রবর্তন করেন। এ ধারণা থেকে পরবর্তী সময়ে সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক বৈশিষ্ট্যের সাথে মস্তিষ্কের আবেগ এর কার্যক্ষমতাকে পরীক্ষা করার পদ্ধতি আবিষ্কার করা হয়। এর নাম দেয়া হয় Emotional Quotient. এ পদ্ধতিটি বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এছাড়া Cultural Quotient নামে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমাপক বেশ সমাদৃত। ২০০২ সালে ক্রিস্টোফার আর্লি এবং অ্যাং সুন সাধারণ বুদ্ধিমত্তা এবং আবেগীয় গুণাবলীর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অভিযোজন এবং সাংস্কৃতিক আচরণ যোগ করে একটি সামগ্রিক পরীক্ষামাধ্যম হিসেবে এ পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। বলা হয়ে থাকে, এখন পর্যন্ত এটিই বুদ্ধিবৃত্তির জগতে সবচেয়ে সম্পূর্ণ নির্ণায়ক পরীক্ষা।

মানবমস্তিষ্কের রহস্য ভেদ করা কোনো একক পরীক্ষার কাজ নয়; Image Source: Article1000
মানুষ কোনো যন্ত্র নয়। তাই শুধু সংখ্যা দিয়ে একটা মানুষকে বিচার করার অবকাশ নেই। যদিও এসব পরীক্ষা মানুষের বুদ্ধিমত্তার কিছুটা পূর্বাভাস দিতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, এসব পরীক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই মিতব্যয়ী এবং সতর্ক হতে হবে।
নিজেদের আইকিউ যাচাই করতে চাইলে ইন্টারনেটে অনেক বিশ্বাসযোগ্য ওয়েবসাইট পেয়ে যাবেন, তবে মনে রাখবে, এ পরীক্ষার ফলাফলই শেষ কথা নয়!
সংক্ষেপে দেখুনকি ধরনের কলকব্জা রয়েছে আমাদের মগজ ঘরে ?
প্রাণীদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কথা বললে নিঃসন্দেহে চলে আসবে মস্তিষ্কের নাম। আর সমস্ত প্রাণিজগতে মানুষ যে একটি আলাদা জায়গা দখল করে আছে তার পেছনেও কারিগর হিসেবে আছে তার উন্নত মস্তিষ্ক। মানবদেহের কোষ, টিস্যু, অঙ্গ, তন্ত্র ইত্যাদির কাজ ঠিকভাবে চলার জন্য তাদের মাঝে সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের দরকার আছে।বিস্তারিত পড়ুন
প্রাণীদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কথা বললে নিঃসন্দেহে চলে আসবে মস্তিষ্কের নাম। আর সমস্ত প্রাণিজগতে মানুষ যে একটি আলাদা জায়গা দখল করে আছে তার পেছনেও কারিগর হিসেবে আছে তার উন্নত মস্তিষ্ক। মানবদেহের কোষ, টিস্যু, অঙ্গ, তন্ত্র ইত্যাদির কাজ ঠিকভাবে চলার জন্য তাদের মাঝে সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের দরকার আছে।
ব্যাপারটিকে একটি উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার করা দরকার। ধরা যাক, আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ একটি সাপ দেখলেন। তারপর লাফ দিয়ে দূরে সরে গিয়ে ঐ জায়গা থেকে দৌড়ে পালিয়ে এলেন। এখানে কয়েকটি অঙ্গ একসাথে কাজ করেছে। প্রথমে চোখ দিয়ে দেখলেন। তারপর আপনার পায়ের পেশি ও অস্থিকে কাজে লাগিয়ে ঐ জায়গা থেকে দৌড়ে এলেন। এতে আপনার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের পরিমাণ বেড়ে গেল। এই যে এতগুলো অঙ্গ একসাথে কাজ করলো, এর পেছনে কাজ করেছে আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র। মস্তিষ্ক এবং সুষুম্না স্নায়ু দিয়ে আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র গঠিত। এদের নিয়েই কথা হবে আজ।

যুক্তরাষ্ট্রে মস্তিষ্কের ভাস্কর্য। গঠনগত দিক থেকে সঠিকভাবে তৈরি; Source: indiana.edu
অ্যারিস্টটল মনে করতেন, হৃৎপিণ্ড বুদ্ধিমত্তার কাজ করে। আর মস্তিষ্ক রক্ত ঠাণ্ডা রাখে। কিন্তু এখন আমরা সবাই জানি, তিনি ভুল ছিলেন।
মস্তিষ্ক আমাদের করোটির ভেতরে অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে। ভর প্রায় ১.৩৬ কেজি। দেহের ভরের অনুপাতে মানুষের মস্তিষ্ক অন্য যেকোনো প্রাণীর চেয়ে বড়। মানুষের সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তার কার্যকরিতার প্রমাণ আমরা প্রতিনিয়তই দেখি। এতে প্রায় দশ বিলিয়ন নিউরন আছে। স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও কার্যগত একক নিউরন। আমরা যদি নিউরনের গঠনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব নিউরনের দুটি প্রধান অংশ আছে। একটি কোষ দেহ (Soma), আরেকটি প্রলম্বিত অংশ (Process)। প্রলম্বিত অংশ আবার অ্যাক্সন ও ডেনড্রাইট এই দুই ভাগে বিভক্ত।
একটি নিউরনে সাধারণত একটি অ্যাক্সন থাকে। অ্যাক্সনগুলো মায়োলিন সিথ দিয়ে আবৃত থাকে। কিছু জায়গায় মায়োলিন সিথের আবরণ থাকে না। একে র্যানভিয়ারের পর্ব বলে। অ্যাক্সনের শেষ প্রান্তে টার্মিনাল নব থাকে। মস্তিষ্কের মধ্যে নিউরনগুলো সিন্যাপ্স তৈরির মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে। সিন্যাপ্সের মাধ্যমে ইলেকট্রিক সিগন্যাল এক নিউরন থেকে আরেক নিউরনে চলাচল করে। এই সিগন্যাল সবসময় একমুখী। এটি ডেনড্রাইট দিয়ে প্রবেশ করে আক্সন দিয়ে গিয়ে অবশেষে টার্মিনাল নব দিয়ে আরেকটি ডেনড্রাইটে প্রবেশ করে। এভাবেই এক নিউরন থেকে আরেক নিউরনে ইলেকট্রিক সিগন্যাল চলে যায়।


নিউরনের চিত্র: Source: Wikimedia
সিনাপ্স তৈরির প্রক্রিয়া; Source: Wikimedia
সিন্যাপ্স তৈরির সময় দুটি নিউরন কাছাকাছি আসে, কিন্তু তারা কেউ কাউকে স্পর্শ করে না। মাঝখানে একটি খালি জায়গা থেকে যায়। একে বলা হয় সিন্যাপ্টিক ক্লেফট। এটি দৈর্ঘ্যে ২০ ন্যানোমিটার হয়। তারপর আয়ন বিনিময়ের মাধ্যমে নিউরোট্রান্সমিটার এক নিউরন থেকে আরেক নিউরনে প্রবেশ করে। এভাবেই সিন্যাপ্স সংঘটিত হয়। দশ বিলিয়ন নিউরন সিন্যাপ্সের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে।
গঠন অনুযায়ী নিউরনকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। ইউনিপোলার, বাইপোলার এবং মাল্টিপোলার। ইউনিপোলার নিউরনে একটি অ্যাক্সন থাকে। বাইপোলার নিউরনে একটি অ্যাক্সন এবং একটি ডেন্ড্রাইট থাকে। মাল্টিপোলার নিউরনে একটি অ্যাক্সন এবং অনেকগুলো ডেন্ড্রাইট থাকে। কিছু কিছু ইউনিপোলার নিউরন আছে, যাদের দেখলে মনে হয় দুটি অ্যাক্সন আছে। কিন্তু আসলে তাদের অ্যাক্সন একটিই। এদের সিউডোপোলার নিউরন বলে।




গঠনভেদে নিউরনের প্রকারভেদ; Source: Dreams time
সিউডোপোলার নিউরন; Source: Anatomy zone
নিউরনের কাজের ধরন অনুযায়ী সেনসরি নিউরন বা সংবেদী নিউরন এবং মোটর নিউরন নিউরন এই দু’ভাগে ভাগ করা যায়। ধরা যাক, আপনি হাতের আঙুল জলন্ত মোমবাতির উপর ধরলেন। সাথে সাথে আপনার হাতের ত্বকের কোষের রিসেপ্টর থেকে সেই তথ্য আপনার মস্তিষ্কে চলে যাবে এবং আপনি জ্বালা অনুভব করবেন। এই যে হাত থেকে মস্তিষ্কে তথ্যটি গেল একে বলা হয় সেন্সরি নিউরন। এখন মস্তিষ্ক আপনার হাতকে মোমবাতির উপর থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিল। এই যে মস্তিষ্ক থেকে হাতে নির্দেশটি গেল একে বলা হয় মোটর নিউরন।
জ্বলন্ত মোমবাতিতে হাত দেয়ার ফলে মোটর ও সেনসরি নিউরনের কার্যকলাপ; Source: youtube
মস্তিষ্কের বাইরে একটি আবরণ থাকে যা মস্তিষ্ককে রক্ষা করে। একে মেনিনজেস বলে। মেনিনজেস পর্দার তিনটি স্তর আছে। প্রথম স্তরকে ডুরা ম্যাটার, দ্বিতীয় স্তরকে আরাকনয়েড ম্যাটার এবং তৃতীয় স্তরকে পায়া ম্যাটার বলে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্তরের মাঝের জায়গাকে সাব আরাকনয়েড স্পেস বলে। সাব আরাকনয়েড স্পেসে একধরনের স্বচ্ছ তরল থাকে। একে সেরেব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড বা সিএসএফ বলে। এই তরল পদার্থ থাকার ফলে একধরনের সুবিধা হয়। আমরা তরলের প্লবতা নীতির কথা জানি। প্লবতায় তরলের উপরিমুখী বলের ফলে বস্তু হালকা অনুভূত হয়। ঠিক এই কারণে আমাদের ঘাড়ে প্রায় দেড় কেজি ভরের মস্তিষ্ক থাকার পরেও আমরা এর ওজন অনুভব করি না। আমাদের শরীরে কোনো সংক্রমণ হলে আমরা রক্ত পরীক্ষা করি। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কে কোনো সংক্রমণ হলে সিএসএফ পরীক্ষা করতে হয়।
মেনিনজেসের তিনটি স্তর; Source: thoughtco
মস্তিষ্ককে গঠন অনুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করা যায়। অগ্র মস্তিষ্ক বা Procensencephalon, মধ্য মস্তিষ্ক বা Mesencephalon এবং পশ্চাৎ মস্তিষ্ক বা Rhombencephalon। নাম শুনে মনে হতে পারে অগ্র মস্তিষ্ক করোটির সামনের অংশ অগ্র মস্তিষ্ক, মাঝের অংশ মধ্য মস্তিষ্ক এবং পেছনের অংশ পশ্চাৎ মস্তিষ্ক। কিন্তু আদতে ব্যাপারটি এমন নয়। মস্তিষ্কের উপরের অংশকে অগ্র মস্তিষ্ক, মাঝের অংশকে মধ্য মস্তিষ্ক এবং তার নিচের অংশকে পশ্চাৎ মস্তিষ্ক বলে।
অগ্র মস্তিষ্কেও তিন ভাগে ভাগ করা যায়। সেরেব্রাম, থ্যালামাস এবং হাইপোথ্যালামাস। সেরেব্রাম মানব মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় অংশ। সমগ্র মস্তিষ্কের প্রায় আশি ভাগ হলো সেরেব্রাম। আমরা সবাই জানি আমাদের মস্তিষ্কের বাম দিককে বাম মস্তিষ্ক এবং ডান দিককে ডান মস্তিষ্ক বলে। তাই সেরেব্রামেও ডান ও বাম দিক আছে। সেরেব্রামের ডান অংশকে ডান সেরেব্রাল হেমিস্ফেয়ার এবং বাম অংশকে বাম সেরেব্রাল হেমেস্ফিয়ার বলে। হেমি কথাটার অর্থ হলো অর্ধেক আর স্ফেয়ার কথাটার অর্থ হলো গোলক। ডান সেরেব্রাল হেমিস্ফেয়ার আমাদের শরীরের বাম দিককে এবং বাম সেরেব্রাল হেমিস্ফেয়ার আমাদের শরীরের ডান দিককে নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের বাম মস্তিষ্কে থাকে যুক্তি, অঙ্ক কষা, জাগতিক চিন্তাভাবনা আর আমাদের ডান মস্তিষ্কে থাকে কল্পনা, সৃজনশীলতা।


বাম এবং ডান মস্তিষ্ক; Source: Creative Jaunt
সেরেব্রাল হেমিস্ফেয়ার অনেক বড় বিধায় একে নিয়ে কাজ করার সুবিধার জন্য পাঁচটি লোবে বিভক্ত করা হয়েছে। এই পাঁচটি লোবের মধ্যে চারটির নাম দেয়া হয়েছে করোটির অস্থির অবস্থানের উপর ভিত্তি করে। এরা হলো ফ্রন্টাল, প্যারাইটাল, অক্সিপেটাল এবং টেম্পোরাল। আরেকটি লোব হলো লিম্বিক। সেরেব্রামের উপরের অংশ কিন্তু সমতল নয়। এটার কিছু জায়গা উঁচু, আবার কিছু জায়গা নিচু। উঁচু জায়াগাকে বলা হয় জাইরাস আর নিচু জায়গাকে বলা হয় ফিসার। আমাদের মস্তিষ্কে তিনটি প্রধান ফিসার আছে। সেন্ট্রাল ফিসার, প্যারাইটো-অক্সিপেটাল ফিসার এবং ল্যাটারাল ফিসার। বাম ও ডান সেরেব্রাল হেমিস্ফেয়ারকে আলাদা করেছে সেন্ট্রাল ফিসার। তবে বাম ও ডান সেরেব্রাল হেমিস্ফেয়ার সম্পূর্ণরূপে আলাদা নয়। তারা কর্পাস ক্যালোসামের সাহায্যে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত। এর মাধ্যমেই আমাদের বাম ও ডান মস্তিষ্কের কার্যকলাপে সমন্বয় রক্ষিত হয়। সেরেব্রামের বাইরের দিক ধূসর এবং ভেতরের দিক সাদা। সেরেব্রাম আমাদের সৃজনশীল চিন্তা, কথা বলা সহ অনেক কাজে সাহায্য করে।
অগ্র মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ
অগ্র মস্তিষ্কের আরেকটি অংশ হলো থ্যালামাস। সেরেব্রামের ঠিক নিচেই থ্যালামাস অবস্থিত। থ্যালামাসের মাধ্যমে আমরা চাপ, তাপ, অনুভূতি অনুভব করি। রাতে হঠাৎ জেগে ওঠার ক্ষেত্রেও থ্যালামাসের ভূমিকা আছে।
হাইপোথ্যালামাস থ্যালামাসের ঠিক নিচে অবস্থিত। আকারে থ্যালামাসের চেয়ে অনেক ছোট হলেও এটা মস্তিষ্কের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ হাইপোথ্যালামাসের সাথে যুক্ত আছে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড। এখান থেকে ভ্যাসোপ্রেসিন এবং অক্সিটোসিন নামের দুটি হরমোন নিঃসৃত হয়। ভ্যাসোপ্রেসিনকে অ্যান্টি ডাই ইউরিটিক হরমোন বলা হয়। নাম থেকে বোঝা যাচ্ছে এর কাজ পানি স্বল্পতার সময় মূত্র তৈরির প্রক্রিয়াকে কমিয়ে দেয়। আর অক্সিটোসিনের কাজ প্রসবের সময় মহিলাদের জরায়ুর সংকোচন নিয়ন্ত্রণ করা। হাইপোথ্যালামাস আমাদের ভালোবাসা, রাগ, দুঃখ, অভিমান নিয়ন্ত্রণ করে।
মধ্য মস্তিস্কের তিনটি অংশ রয়েছে। কোর্পোরা কোয়াড্রিজেমিনা, সেরেব্রাল পেডাংকল এবং সেরেব্রাল অ্যাকুইডাক্ট। কোর্পোরা কোয়াড্রিজেমিনা হাইপো থ্যালামাসের নিচে অবস্থিত। সেরেব্রাল অ্যাকুইডাক্ট একটি নালী, যা মস্তিষ্কের ৩য় ও ৪র্থ গহ্বরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। এখানে বলে রাখি, মস্তিষ্কে চারটি গহ্বর বা ভেন্ট্রিকল রয়েছে।

সংক্ষেপে দেখুনমস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ; Source: kids press magazine
পশ্চাৎ মস্তিষ্কেরও অংশ তিনটি। সেরেবেলাম, পনস এবং মেডুলা অবলংগাটা। সেরেবেলাম মস্তিষ্কের দ্বিতীয় বৃহৎ অংশ। এর ভর ১৫০ গ্রাম। সেরেবেলামেরও বাম ও ডান অংশ রয়েছে। এই দুটি অংশ যুক্ত থাকে ভার্মিস নামক যোজক কলা দিয়ে। এই অংশটি আমাদের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। পনস সেরেবেলাম ও মেডুলা অবংগাটার সাথে সংযোগ রক্ষা করে। পনস বমন, শ্বসন হার, পাকস্থলির প্যারিস্টালসিস নিয়ন্ত্রণ করে। মেডুলা অবলংগাটা সুষুম্না কান্ডের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। এভাবেই মস্তিষ্ক আমাদের সারা দেহের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করে চলছে। বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের নিত্য নতুন তথ্য আবিষ্কার করে চলেছেন।
মশার অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন করে দেওয়া কি আদৌ সম্ভব?
বাংলায় একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে, “মশা মারতে কামান দাগা”। যার আভিধানিক অর্থ সামান্য কাজের জন্য অত্যধিক পরিশ্রম করা। আসলে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে মশা মারার জন্য সত্যি সত্যিই কামান দাগতে হবে। বিগত কয়েক মাস যাবত আমাদের দেশে ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণ করেছিল। হাসপাতালে প্রতিদিন রোগীদের ভীড় যেন কোনোভাবেবিস্তারিত পড়ুন
বাংলায় একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে, “মশা মারতে কামান দাগা”। যার আভিধানিক অর্থ সামান্য কাজের জন্য অত্যধিক পরিশ্রম করা।
আসলে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে মশা মারার জন্য সত্যি সত্যিই কামান দাগতে হবে। বিগত কয়েক মাস যাবত আমাদের দেশে ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণ করেছিল। হাসপাতালে প্রতিদিন রোগীদের ভীড় যেন কোনোভাবেই কমছিল না। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল মশা নিধনের জন্য। কিন্তু কোনো পদক্ষেপই যেন কাজে আসছিল না। এখন পরিস্থিতি কিছুটা শিথিল হলেও পুনরায় এই রোগ ফিরে আসবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।


সম্প্রতি ডেঙ্গুজ্বর মহামারী আকার ধারণ করেছে বাংলাদেশে; Image Source: thedailystar.net
মশা নামক এই পতঙ্গটি আক্ষরিক অর্থেই আমাদের কোনো উপকারে আসে না। উল্টো প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে নানা মশাবাহিত রোগের কারণে। মশার কারণে সৃষ্ট রোগ ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া তো আছেই। এর সাথে চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাসের মতো নতুন নতুন মহামারী রোগ যুক্ত হচ্ছে। একটি সামান্য মশার কামড়ের কারণে প্রতি বছর অসংখ্য সুস্থ মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। অবস্থা এতটাই আশংকাজনক যে, মশার কারণে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা মানুষের কারণে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যার চেয়েও বেশি।
একটি মশার কামড় থেকেই অনেক বড় রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; Image Source: adventuremumma.com
গেটস ফাউন্ডেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর মশাবাহিত রোগের কারণে মারা যায় প্রায় ৭,২৫,০০০ জন। যেখানে কেবল ম্যালেরিয়ার কারণেই মৃত্যুবরণ করে প্রায় ৬,০০,০০০ জন। আর জিকা ভাইরাসের আগমন এই বড় সংখ্যার সাথে আরো ভয়াবহতা যোগ করেছে। এই ভাইরাসের কারণে গর্ভবতী মায়ের নবজাতক বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নেয়। আর এই বিরাট সংখ্যক মৃত্যুর জন্য দায়ী কেবল মশার কামড়।
চলুন, আগে জেনে নেওয়া যাক মশার কামড়ের পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী। রক্ত মশার খাদ্যের চাহিদা মেটায় না। অন্য প্রাণীর রক্ত শুষে নেওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো বংশবিস্তার। একটি মশাকে ডিম উৎপন্ন করার জন্য পুষ্টির প্রয়োজন হয়। রক্ত থেকে তারা সেই পুষ্টি সংগ্রহ করে। আর ঠিক এ কারণেই কেবল স্ত্রী মশাগুলো কামড় দিয়ে থাকে, পুরুষ মশা নয়। তবে সকল প্রজাতির মশাই মানুষের রক্ত শোষণ করে না। পৃথিবীতে মোট ৩,৫০০ প্রজাতির মশা রয়েছে। আর এদের মধ্যে কেবল ২০০ প্রজাতির মশাই মানুষকে কামড় দিয়ে বিরক্ত করে থাকে। এদের মধ্যে ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু বহন করে অ্যানোফেলিস গণের মশা, ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসের জন্য দায়ী এডিস এজেপ্টাই এবং চিকুনগুনিয়ার জন্য দায়ী এডিস অ্যালবোপিক্টাস ও এডিস এজেপ্টাই দুটোই।

জিকা ভাইরাসের কারণে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নিচ্ছে; Image Source: businessinsider.com
এখন প্রশ্ন হলো, যে প্রাণী মানুষের কোনো উপকারেই আসে না, বরং অকাল মৃত্যু বয়ে আনতে মানুষকেও হারিয়ে দিয়েছে, আমাদের নিজেদের বেঁচে থাকার স্বার্থে এদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ঠিক কতটা যুক্তিযুক্ত? লিভারপুল স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের জীববিজ্ঞানী প্রফেসর হিলারি র্যানসন বলেন,
পৃথিবী থেকে মশার অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়। ৩,৫০০ প্রজাতির মধ্যে কেবল ২০০ প্রজাতিই মানুষকে বিরক্ত করে। আর এর পেছনের মানবিক ব্যাখার সাথে সাথে দার্শনিক ব্যাখাও মাথায় রাখতে হবে। মানুষের কি সত্যিই উচিত নিজের সুবিধার জন্য প্রকৃতি থেকে ১০০ মিলিয়ন বছরেরও পুরনো এক প্রাণীকে একেবারে বিলীন করে দেওয়া? প্রকৃতির উপর এমন সেচ্ছাচারী মনোভাব প্রদর্শন আপাতদৃষ্টিতে আমাদেরকে প্রকৃতির শত্রু বানিয়ে দেয়। তাছাড়া এজন্য প্রকৃতিকেও অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে।


মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের জন্য চলছে বিস্তর গবেষণা; Image Source: time.com
আমাদের কাছে মশা নানা বিরক্তির কারণ হলেও, অন্যান্য নানা প্রাণীর নিকট এটি খাদ্যের উৎস। বিভিন্ন মাছ মশার লার্ভা খেয়ে বেঁচে থাকে। ছোট ছোট পাখি, ব্যাং ও কিছু বড় বড় পতঙ্গের খাবার মশা। এরা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেলে তা প্রাকৃতিক খাদ্য শৃঙ্খলের উপর প্রভাব ফেলবে। আরেকটি বড় কথা হলো, ফুলের পরাগায়ণেও মশা অংশগ্রহণ করে। কিছু কিছু মশা ফুলের নেকটার খেয়ে জীবনধারণ করে। এছাড়া গাছের জন্য কিছু ক্ষতিকর প্রোটোজোয়া মশার খাদ্য। মশা না থাকলে যেমন উদ্ভিদের পরাগায়ণ ব্যাহত হবে, তেমনি কিছু গাছের যথাযথ বৃদ্ধি হবে না। কাজেই আমাদের প্রয়োজন না হলেও প্রকৃতির মশার প্রয়োজন রয়েছে।
মশার লার্ভা নানা প্রাণীর প্রাথমিক খাদ্য; Image Source: thoughtco.com
প্রকৃতির উপর আমরা যে সবসময় সদয় থাকি তা কিন্তু নয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা, বন ধ্বংস, নগরায়ন ইত্যাদির জন্য অনেক প্রাণীই বিলুপ্ত হয়েছে কিংবা বিলুপ্তির পথে। আমাজনে আগুন লাগার পেছনে মূল কারণ সবাই জানে। নিজেদের সুবিধার জন্য আমরা প্রকিতির উপর অনেক আগে থেকেই স্বেচ্ছাচার করে আসছি। তাই অনেকের মনে হতে পারে মশাই তো, এদের সরিয়ে ফেললে কী এমন ক্ষতিই বা হবে। তবে কিছু প্রকৃতিবিজ্ঞানী এই বিষয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোকপাত করেছেন। মানুষের বন-জঙ্গলে রাত না কাটানোর পেছনে এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রোগ বহনকারী মশা। মশা না থাকলে মানুষের এই ভয়ও থাকবে না। আর বন-জঙ্গলে মানুষের অবাধ চলাফেরার একটা সহজ রাস্তা তৈরি হয়ে যাবে। এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল বনগুলোর জন্য ভালো না-ও হতে পারে।
প্রকৃতির সাথে বিরুদ্ধাচরণ ও মানবিক আবেগ- এই দুটি জিনিসের মাঝে মানুষ পড়তে চায় না। আবেগের মূল্যই আমাদের কাছে বেশি। ডেঙ্গু কিংবা ম্যালেরিয়ার কারণে মারা যাওয়া সন্তানের বাবা-মায়ের কথা চিন্তা করুন। কিংবা জিকা ভাইরাসের কারণে মানসিক বা শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়া বাচ্চাটার কথাই চিন্তা করুন। এসব রোগের সাথে লড়াই করা মানুষদের সাথে এ বিষয়ে তর্কে যাওয়াটা বোকামি। তাছাড়া গবেষকরাও মশার বিলুপ্তিকরণের পক্ষে রয়েছেন। আর এ বিষয়ে তারা যথাযথ পদক্ষেপও নিচ্ছেন।


গবেষণাগারে তৈরি রূপান্তরিত পুরুষ মশা ; Image Source: sciencemag.org
মশা মারার জন্য আমরা সাধারণ জনগণ কয়েল, অ্যারোসল, ধোঁয়া, তেল ইত্যাদি ব্যবহার করি। কিন্তু এদের পুরোপুরি উচ্ছেদ করে দেওয়ার জন্য আরো বড় অস্ত্রের প্রয়োজন। আমাদের মূল শত্রু হলো এডিস মশা। এই মশাগুলো মানুষের বসবাসের জায়গার সাথে খুব ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে। আমাদের নিজেদের উদাসীনতার কারণে এদের খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা আমরাই করে দিয়েছি। তাই এদের বিনাশ করতে কোনো ছোটখাট পদক্ষেপে কাজ হবে না। পুরোপুরি সকল প্রজাতির মশা বিলুপ্ত না হলেও অন্তত এডিস, অ্যানোফেলিস ও কিউলক্স জাতের মশাগুলো বিলুপ্তিকরণের জন্য কাজ করা হচ্ছে। আর এদের উচ্ছেদ করার মূল অস্ত্র হলো প্রযুক্তি।
বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব কমানোর জন্য ফগার মেশিন ব্যবহার করা হয়; Image Source: maagicpest.com
একটি এলাকায় মশার উপদ্রব চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার এক উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হলো জেনেটিক মোডিফিকেশন। এর মাধ্যমে পুরুষ মশাগুলোর জিনে বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়। যার কারণে স্ত্রী মশার সাথে মিলনের পর এরা যে মশাগুলোর জন্ম দেয় তারা বংশবিস্তারে অক্ষম বা স্টেরাইল হিসেবে জন্ম নেয়। এতে করে নতুন মশা আর বংশবিস্তার করতে পারে না। মশা না মেরে মশার বংশবিস্তার আটকে দেওয়ার এ পদ্ধতি অনেক চমৎকার একটা উপায়। তবে বৃহৎ পরিসরে এই কাজটা করা অনেক চ্যালেঞ্জিং। কারণ তা বাস্তবায়নের জন্য মিলিয়ন সংখ্যক পুরুষ মশার প্রয়োজন।
২০০৯-২০১০ সময়কালে ইংল্যান্ডের কেম্যান আইল্যান্ডস নামক দ্বীপ শহরে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০ লক্ষ পুরুষ মশা ছাড়া হয়। এতে পার্শ্ববর্তী এলাকার তুলনায় ঐ শহরে মশার সংখ্যা ৯৬ শতাংশ হ্রাস পায়। ২০১৬ সালের দিকে ব্রাজিলের এক শহরে একই পরীক্ষা চালিয়ে মশার উপদ্রব ৯২ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। তবে ঐ শরগুলোতে মশার উপর জীবন ধারণ করা প্রাণীগুলোও এর ভুক্তভোগী গয়েছিল। গবেষকরা দাবী করেছেন, এই পরীক্ষা চালানোর পর কিছু পাখির বাচ্চা জন্মদানের সংখ্যা তিন থেকে দুইয়ে নেমে আসে।
মশার অস্তিত্ব পুরোপুরি বিনষ্ট করা সম্ভব নয়। কিন্তু ক্ষতিকর মশাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এতে করে প্রকৃতি সাময়িক সময়ের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এমনটিই দাবী করেছেন গবেষকরা। যেসব প্রাণী খাদ্যের জন্য মশার উপর নির্ভরশীল তারা প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী ঠিকই বিকল্প খুঁজে নিবে। অনেকগুলো জীবন রক্ষার জন্য প্রকৃতিকে সামান্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তাছাড়া সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তির উন্নতি ঘটছে। প্রযুক্তিবিদরা এমন যন্ত্র তৈরি করছেন, যা দিয়ে মশার পাখার কম্পাঙ্ক হিসাব করে ক্ষতিকর মশা শনাক্ত করা সম্ভব।
একেবারে মশাহীন পৃথিবী কল্পনা করা যায় না। তবে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে না আনলে নানা নতুন রোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা থেকে যায়। মশা থেকে পুরোপুরি নিস্তার পেলে হয়ত মশার কয়েল, অ্যারোসল ও রিপেলেন্ট ক্রিম বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখ দেখবে। তবে প্রতি বছর এক বিরাট সংখ্যক নিরীহ প্রাণকে অকালমৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সংক্ষেপে দেখুনছারপোকা: এক দুঃসহ যন্ত্রণার নাম। প্রতিকার কি আছে?
ছারপোকার নাম শোনেনি, এমন মানুষ খুব কমই আছে। তবে অনেকেই হয়তো শুধু নামই শুনেছেন ছারপোকার, কিন্তু রক্তচোষা এই পোকাটিকে চোখে দেখার সৌভাগ্য (কিংবা দুর্ভাগ্য) এখনো হয়নি। আর যারা ছারপোকাকে ইতোমধ্যে চেনেন, নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তাদের সাথে ছারপোকার পরিচয় পর্বটা মোটেই সুখকর কিছু ছিলো না। যারা নিজস্ব অভিজ্ঞতাবিস্তারিত পড়ুন
ছারপোকার নাম শোনেনি, এমন মানুষ খুব কমই আছে। তবে অনেকেই হয়তো শুধু নামই শুনেছেন ছারপোকার, কিন্তু রক্তচোষা এই পোকাটিকে চোখে দেখার সৌভাগ্য (কিংবা দুর্ভাগ্য) এখনো হয়নি। আর যারা ছারপোকাকে ইতোমধ্যে চেনেন, নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তাদের সাথে ছারপোকার পরিচয় পর্বটা মোটেই সুখকর কিছু ছিলো না। যারা নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে ছারপোকা চেনেন কিংবা ছারপোকার বিষয়ে লোকমুখে কিছু কথা অন্তত শুনেছেন, তাদের অবশ্যই জানার কথা, এ পোকাটি দৈনন্দিন জীবনে, বিশেষ করে ব্যাচেলরদের জীবনে এক সাক্ষাৎ আতঙ্কের নাম!
চলুন, রক্তপিপাসু এ প্রাণীটি সম্পর্কে জানা-অজানা অনেক তথ্য আবার নতুন করে জেনে নেওয়া যাক।
পরিচয়
ছারপোকার বেশ কয়েকটি প্রজাতির মধ্যে আমাদের ঘরবাড়িতে যে দুটি প্রজাতিকে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তারা হলো Cimex lectularius ও Cimex hemipterus।

দুটি ভিন্ন প্রজাতির প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ছারপোকা। বাঁ-পাশেরটি Cimex lectularius এবং ডান পাশেরটি Cimex hemipterus প্রজাতি; Image Courtesy: Brittany Campbell/ResearchGate
ছারপোকার একমাত্র খাদ্য রক্ত। তবে এটি শুধু স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখি সদৃশ প্রাণীদের রক্তই পান করে থাকে। এরা উড়তে অক্ষম। কখনো কখনো ছারপোকাকে তেলাপোকার বাচ্চা বা উঁইপোকা মনে করে ভুল হতে পারে। তবে ছারপোকাকে আঘাত করে মেরে ফেললে কিংবা পিষে ফেলা হলে তীব্র ও কটু গন্ধ পাওয়া যায়, যা তেলাপোকার বাচ্চা বা উঁইপোকার সাথে এদের স্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করে।
আবাস, জীবনচক্র ও বংশবিস্তার
ছারপোকারা নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশে বাস করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। এরা অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে পারে না; তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে এদের জন্য টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে ওঠে। ২১-২৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছারপোকাদের বসবাসের জন্য সবচেয়ে অনুকূল। ৪৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় কিছুক্ষণের মধ্যেই এরা মারা যায়।

ছারপোকার জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়; Image Courtesy: bedbugfoundation.org
ছারপোকার প্রজনন ক্ষমতা মধ্যম প্রকারের। অর্থাৎ, অন্যান্য পোকামাকড়ের মতো খুব বেশি না, আবার তাচ্ছিল্য করার মতো নিতান্ত কমও নয়। অনুকূল পরিবেশ ও পর্যাপ্ত খাদ্য পেলে একটি প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী ছারপোকা যৌনমিলনের পর প্রতিদিন ২-৮টি করে ডিম দিতে পারে এবং তার গোটা জীবদ্দশায় মোট ২০০-৫০০টি পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে ৬-১৫ দিন সময় লাগে, এবং সে বাচ্চাটি প্রায় ৫-৭ সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণবয়স্ক ছারপোকায় পরিণত হয়। একটি ছারপোকা মোটামুটি ৬-১২ মাস কিংবা অনুকূল পরিবেশ পেলে তারচেয়েও বেশি সময় বাঁচতে পারে।
একটি প্রাপ্তবয়স্ক ছারপোকার সাধারণত ৬-১০ দিন পর পর রক্ত খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে, একদমই রক্ত পান না করেও একটি ছারপোকা প্রায় ২-৩ মাস পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। আবার, পরিবেশ খানিকটা ঠান্ডা হলে এরা না খেয়ে ১০-১২ মাসও বেঁচে থাকে!
শিশু অবস্থায় একটি ছারপোকার রঙ থাকে ঈষদচ্ছ ও কিছুটা হলদেটে-সাদা। ডিম থেকে বের হওয়ার পর একটি ছারপোকা তার জীবনের পাঁচটি পর্যায় অতিক্রম করে পূর্ণবয়স্ক ছারপোকায় রূপান্তরিত হয়। প্রতিটি পর্যায়ে এটি তার পুরনো খোলস ত্যাগ করে। ছারপোকার বয়স যতই বাড়তে থাকে, তার গায়ের রঙ ততই লালচে-খয়েরী বর্ণের হতে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক ছারপোকার গায়ের বর্ণ সাধারণত কালচে-খয়েরী হয়।
এরা একটি ঘরের প্রায় সকল স্থানেই বসবাস করতে পারে। দেয়ালের ফাটল বা ছিদ্র, কাঠের ফার্নিচারের ফাঁক-ফোকরে বা চিপায়, কাপড়-চোপড়, ব্যাগ, লাগেজ, স্যুটকেস, বালিশ, কুশনের কভারের ভেতর, লেপ, কম্বল, কাঁথার ভাজে এদেরকে বসবাস করতে দেখা যায়। তবে এদের সবচেয়ে প্রিয় আবাসস্থল হচ্ছে তোশকের নিচে ও মশারির কিনারায়।

একই ফ্রেমে বিভিন্ন বয়সী ছারপোকা ও ছারপোকার ডিম; Image Courtesy: M.F. Potter/USA Today
আবার গণপরিবহন, যেমন- বাস-ট্রেন বা প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, লঞ্চ, জাহাজ, এমনকি বিমানের সিটেও ছারপোকা বসবাস করতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন আবাসিক হোটেলেগুলোর আসবাবপত্র বা সিনেমা হলের বসার আসনও ছারপোকার আবাসস্থল।
উপদ্রব
ছারপোকার কাছে দেশ বা মহাদেশ, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সীমারেখা বলে কিছু নেই; বিশ্বের প্রায় সকল প্রান্তে, সকল পরিবেশে ছারপোকার দেখা মিলবে। এমনকি উন্নত দেশগুলোর কিছু শহরেও ছারপোকার উপদ্রব অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে।
সাধারণত কোনো ঘরবাড়িতে ছারপোকার উপদ্রব শুরু হওয়ার পর সাথে সাথেই সে ঘরের বাসিন্দারা তা টের পায় না। এটা যে ছারপোকারই উপদ্রব, তা বুঝে উঠতে তাদের কিছুটা সময় লাগে। তবে এই সময়টুকুর মধ্যেই সাধারণত ছারপোকারা সে ঘরটিতে তাদের আবাস অনেকটাই পাকাপোক্ত করে নেয়।

ছারপোকার কামড়ের একটি ভিন্নধর্মী প্যাটার্ন রয়েছে, এরা সাধারণত পাশাপাশি কয়েকটি স্থানে কামড় বসায়; Image Courtesy: nozzlenolen.com
কয়েকটি প্রাথমিক লক্ষণ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ঘরে ছারপোকা আছে:
এসব লক্ষণ দেখা দিলে সামনের বেশ কয়েক সপ্তাহ, এমনকি বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত প্রচন্ড রকমের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক দুর্ভোগ পোহানোর মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। কারণ, ছারপোকা একবার আবাস গেড়ে বসলে, তাদেরকে চিরতরে নির্মূল করাটা খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার! তবে অসম্ভব নয়।
ছারপোকা যে স্থানে কামড়ায়, সেই স্থানটি সাধারণত লাল হয়ে যায় (সবার ক্ষেত্রে না)। কারও কারও ত্বক ফুলেও যায়। ছারপোকার কামড়ের একটি বিশেষত্ব হলো, এরা ত্বকের একই স্থানে পাশাপাশি কয়েকটি কামড় বসিয়ে রক্ত পান করে। ফলে যে অঞ্চলে কামড়ায়, সেখানে কয়েকটি দাগ দেখা যায়। আবার, ছারপোকারা প্রতি রাতেই কামড়াবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। তাই একই জায়গায় কয়েকটি ছারপোকার কামড় পড়তে পারে। ছারপোকারা সাধারণত কনুই ও কাঁধের আশেপাশে, পিঠে এবং পায়ে বেশি কামড়ায়। এছাড়াও ঘুমন্ত মানুষের শরীরের খোলা ত্বকের যেকোনো জায়গায় এরা সহজেই কামড় বসাতে পারে।
রোগ ও ক্ষতিকর প্রভাব
একবার পেটপুরে রক্ত খেতে ছারপোকাদের গড়পড়তা ১০ মিনিটের কিছু কম-বেশি সময় লাগতে পারে; Image Courtesy: imaginecare.co.ke
দিনের পর দিন ছারপোকার কামড় খাওয়াটা খুব যন্ত্রণাদায়ক। তবে গবেষকরা এমন কোনো প্রমাণ পাননি যে, ছারপোকা বড় ধরনের কোনো মহামারী বা সংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটায়।
তবে এর কামড়ের ছোট ছোট কিছু ক্ষতিকর প্রভাব বিদ্যমান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
বিস্তার
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারের ঘটনা ঘটেছিলো। অনেকগুলো কার্যকরী কীটনাশক আবিষ্কৃত হয়েছিলো তখন। বিভিন্ন দেশের সেনারা প্রতিকূল পরিবেশে, বনে-জঙ্গলে বা দুর্গম অঞ্চলে অবস্থান করার সময় ক্ষতিকর পতঙ্গের হাত থেকে বাঁচতে নানা ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করতো। এ সময় থেকে বিভিন্ন ধরনের কীট-পতঙ্গের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করে বা কমে যায়। ছারপোকার উপদ্রবও তখন থেকে কমে এসেছিলো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত শক্তিশালী কীটনাশক DDT (ডাইক্লোরো ডাইফিনাইল ট্রাইক্লোরো ইথেন) একসময় ছারপোকা দমনে কার্যকর ছিলো। কিন্তু বর্তমানে এর চেয়ে শক্তিশালী কীটনাশকের বিরুদ্ধেও ছারপোকা জেনেটিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে; Image Credit: © Zerbor/Fotolia via ScienceDaily
সাম্প্রতিককালে, একদম নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে মোটামুটি ১৯৯৫ সালের পর থেকে ছারপোকারা পুনরায় শক্তভাবেই তাদের অস্তিত্বের কথা জানান দিয়ে আসছে এবং তাদের বিস্তার আশংকাজনকভাবে বেড়ে চলেছে।
এর পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে বলে গবেষকগণ মনে করেন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে, বর্তমান যুগে যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রসার ও সহজতর যাতায়াতব্যবস্থা। এই দ্রুততর যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে মানুষের যাতায়াতের সাথে ছারপোকারাও অঞ্চল থেকে অঞ্চলে, দেশ থেকে দেশে, এমনকি মহাদেশ থেকে মহাদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে।
আরেকটি কারণ হলো, বর্তমানকালে মানুষের মধ্যে পুরনো বা সেকেন্ড হ্যান্ড পণ্য, বিশেষ করে ব্যবহৃত ফার্নিচার ও অন্যান্য ঘরোয়া ব্যবহার্য জিনিসপত্র ক্রয় করার প্রবণতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। এসবের মাধ্যমে এক বাসা থেকে আরেক বাসায়, এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে ছারপোকারা ছড়িয়ে পড়ছে।
পর্যটক বা অতিথিরাও ভ্রমণের সময় একস্থান থেকে আরেক স্থানে নিজের অজান্তেই ছারপোকা বহন থাকেন।
আবার ছারপোকা দমন করার জন্য কার্যকর কীটনাশকেরও অভাব রয়েছে। বিদ্যমান কীটনাশকগুলো ছারপোকা দমনে খুব একটা কার্যকর নয়। আবার কিছু কিছু কীটনাশক পরিবেশ ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় বিভিন্ন দেশের সরকার সেগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। এটাও একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, যার জন্য ছারপোকার বিস্তার রোধ করাটা দিন দিন কষ্টকর হয়ে উঠছে।
সতর্কতা
এতদিন আপনার ঘরে ছারপোকা ছিলো না, কিন্তু হঠাৎ একদিন ছারপোকার উপস্থিতি টের পেলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে এলো ছারপোকা? কোত্থেকেই বা এলো?
খোঁজ নিয়ে দেখুন, আপনার প্রতিবেশীদের কারও ঘরে ছারপোকা নেই তো?
কিংবা এমনও তো হতে পারে, কিছুদিন আগে আপনার বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন আপনারই কোনো আত্মীয় বা বন্ধু। তিনি ট্রেনে বা বাসে চড়ে আসার সময় ছারপোকা বহন করে নিয়ে আসেননি তো?
কিংবা আপনিই কি সম্প্রতি কারও বাসায় বেড়াতে গিয়ে ছারপোকা সাথে করে নিয়ে এসেছেন?
এক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করে ছারপোকার আক্রমণের সম্ভাবনা অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়।
গণপরিবহনে চড়ে দূরপাল্লার ভ্রমণ থেকে কিংবা সিনেমা হল থেকে, অথবা আত্মীয়স্বজনদের বাসা, যেখানে ছারপোকা থাকার সম্ভাবনা আছে, সেখান থেকে ফিরে এসে সরাসরি শোবার-রুমে না ঢুকে গোসলখানা বা বাইরের কোনো রুম যেমন গ্যারেজ বা স্টোররুমে পোশাক ত্যাগ করতে হবে এবং সে পোশাকগুলো দ্রুতই গরম পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। এভাবে ঘরবাড়িতে ছারপোকার আগমন ঠেকানো যাবে।
ছারপোকা গরম সহ্য করতে পারে না বলে আমাদের গায়ের সাথে সেঁটে থাকে না সারাক্ষণ। তবে আমাদের পরনের কাপড়-চোপড় কিংবা ব্যাগ-লাগেজে লুকিয়ে থাকতে পারে ছারপোকা। এবং এভাবে আমাদের সাথেই ফ্রিতে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ভ্রমণ করতে পারে তারা।
আবার কোনো ফার্নিচার, বিশেষ করে কাঠের ও পুরনো বা ব্যবহৃত ফার্নিচার ক্রয় করার সময় নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে যে, তাতে ছারপোকা নেই। যদি থাকে, তাহলে তা ঘরে নিয়ে আসার পূর্বে অতি অবশ্যই পুরোপুরি ছারপোকামুক্ত করে নিতে হবে।
প্রতিকার
ম্যাট্রেসের কিনারা ছারপোকাদের অন্যতম পছন্দের বাসস্থান; Image Courtesy: Pest Control Toronto
ছারপোকার উপদ্রব চরম পর্যায়ে পৌঁছালে এর কামড় থেকে মুক্তি পাবার সহজ কোনো উপায় নেই। একমাত্র রাস্তা হচ্ছে ছারপোকা দমন করা। তবে ছারপোকা দমন সময়সাধ্য এবং অত্যন্ত জটিল ও কঠিন একটি ব্যাপার।
বিশ্বব্যাপী ছারপোকার হাত থেকে মুক্তি পেতে অনেকগুলো পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়। সবগুলো পদ্ধতিই যে সমানভাবে কার্যকর, তা কিন্তু নয়। একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে ছারপোকা দমন করা সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করে আবহাওয়া, তাপমাত্রা, ঘরের পরিবেশ ইত্যাদিসহ আরও অনেকগুলো বিষয়ের উপর।
আসুন, জেনে নেওয়া যাক বিশ্বব্যাপী ছারপোকা দমন করার জন্য ব্যবহৃত সাধারণ ও সহজ কিছু পদ্ধতি (জটিল, স্বাস্থ্যের জন্য অতিমাত্রায় ক্ষতিকর ও যথেষ্ট ব্যয়বহুল পদ্ধতিগুলো পরিহার করা হলো এবং লেখকের নিজস্ব কিছু অভিজ্ঞতাও শেয়ার করা হলো):
গঠনগত কারণে ছারপোকার পা শিমপাতার সূক্ষ্ম ট্রাইকোমে আটকে যায়। ফলে ছারপোকা চলাচল করতে পারে না; Image Courtesy: University of California, Irvine via ScienceDaily
উপরোক্ত উপায়গুলোর কোনোটিই পুরোপুরি ছারপোকা দমন করার নিশ্চয়তা প্রদান করে না। তবে এগুলোর মধ্যে কয়েকটি একসাথে প্রয়োগ করা গেলে এবং ধৈর্য্য ও অধ্যবসায়ের সাথে অনেকদিন যাবত ছারপোকার সাথে লড়াই করে গেলে একসময় মুক্তি মিলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যখন ফার্নিচারগুলোকে ছারপোকামুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন একইসাথে কাপড়গুলো সব গরম পানিতে ধুয়ে নিলে এবং গোটা কক্ষকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরিষ্কার করা হলে প্রথম প্রচেষ্টাতেই হয়তো সব ছারপোকা চলে যাবে না, তবে নিশ্চিতভাবেই তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। অর্থাৎ প্রথম প্রচেষ্টাতেই ছারপোকাদের সাথে যুদ্ধে অনেকটা এগিয়ে গেলেন আপনি। এটা এমন এক যুদ্ধ, যেখানে হয় আপনি হাল ছেড়ে দেবেন, কিংবা হাল ছাড়বে ছারপোকারা। এবার বাকিটা আপনার হাতে; হার মেনে নেবেন, নাকি চূড়ান্ত জয় ছিনিয়ে আনবেন। পর পর বেশ কয়েক সপ্তাহ (কিংবা মাস) চেষ্টা করতে থাকলে অনেকটা নিশ্চিতভাবেই একসময় মুক্তি মিলবে ছারপোকার হাত থেকে।
ছারপোকা দমনের ক্ষেত্রে রাসায়নিক ব্যবহার করার বদলে অন্যান্য উপায়গুলো অবলম্বন করাই শ্রেয়। অনেক গবেষক দেখেছেন, কীটনাশক আবিষ্কৃত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত কীটনাশকের বিরুদ্ধে ছারপোকাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কয়েক হাজার গুণ বেড়ে গেছে! এছাড়া কীটনাশকগুলো শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য ভয়ানক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা ভ্যানগাড়িতে চড়ে রীতিমতো মাইকিং করে তেলাপোকা, উঁইপোকা, ইঁদুর, ছারপোকা ইত্যাদির বিষ বিক্রি করে থাকেন। তাদের কাছেই মিলবে এই অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড বা তাদের ভাষায় ‘ছারপোকার যম’; Image Credit: lokaantar.com
আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, এমন কৌশল অবলম্বন করা উচিত, যেন ছারপোকারা পালাতে না পারে; এদেরকে মেরে ফেলা উচিত। কেননা, যদি এরা পালিয়ে পাশের কোনো বাসায় গিয়ে বসবাস করা শুরু করে, তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে। অর্থাৎ, তাদের উপদ্রব আরো বেড়ে যাবে এতে। পরবর্তীতে সুযোগ পেলেই আবারও আপনার বাসায় হানা দেবে এবং আশেপাশের অন্যান্য বাসা-বাড়িতেও ছড়িয়ে পড়বে।
শেষকথা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ছারপোকাদের বিস্তার সাম্প্রতিককালে অনেক বেড়ে গেলেও সামনে আরও ভয়ানক সময় অপেক্ষা করছে; ছারপোকারা হয়তো সামনে বিপ্লবই ঘটাতে যাচ্ছে।
দীর্ঘসময় যাবত এই রক্তখেকো পতঙ্গটি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলেও ইদানীং এটি আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অন্যান্য অনেক কারণের পাশাপাশি এই যন্ত্রণাদায়ক প্রাণীটির বিষয়ে মানুষের সচেতনতার অভাব একে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করছে।
যদিও এটি মানুষের বড় ধরনের কোনো ক্ষতি করে না, তবুও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সকাল আটটায় উঠে অফিস বা ক্লাসে যেতে হবে, অথচ রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে আসার পরও আপনি সামান্য ঘুমের জন্য ছারপোকার সাথে যুদ্ধ করেই যাচ্ছেন- ভাবতে পারেন!
সংক্ষেপে দেখুনপ্লাস্টিকখেকো ছত্রাক সত্যি সত্যি কি আছে?
পরিবেশ দূষণের অন্যতম একটি কারণের নাম বলতে বললে কার্বন-ডাই-অক্সাইড এর পরেই পলিথিনের নাম আসবে। মাটিতে না মেশা, মাটির উর্বরতা নষ্ট করা, আবার পুড়িয়ে ধ্বংসের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় বিষাক্ত গ্যাস উৎপাদন যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ; শুধু পলিথিন নয়, প্লাস্টিকজাতীয় সব বস্তুর ক্ষেত্রেই এসব তথ্য সত্য। প্রতি বছরবিস্তারিত পড়ুন
পরিবেশ দূষণের অন্যতম একটি কারণের নাম বলতে বললে কার্বন-ডাই-অক্সাইড এর পরেই পলিথিনের নাম আসবে। মাটিতে না মেশা, মাটির উর্বরতা নষ্ট করা, আবার পুড়িয়ে ধ্বংসের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় বিষাক্ত গ্যাস উৎপাদন যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ; শুধু পলিথিন নয়, প্লাস্টিকজাতীয় সব বস্তুর ক্ষেত্রেই এসব তথ্য সত্য। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক তৈরি হচ্ছে এবং কাজের শেষে তাদের গন্তব্য হয় সাগর, নদী-নালা, নর্দমা বা মাটি। প্লাস্টিক যে ধ্বংস হয় না তা নয়, তবে সময় লাগবে বহু বছর। বহু বছর পর রায়ায়নিক বন্ধন শিথিল হয়ে টুকরো টুকরো হয়। এ সময় এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরিত হয় যেগুলো মাছ এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণীরা খাবার ভেবে বিভ্রান্ত হতে পারে। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিক নিয়ে মানুষের যখন হাঁসফাঁস অবস্থা, তখন সামান্য একটি ছত্রাক দেখাচ্ছে মুক্তির সম্ভাবনা।
ইসলামাবাদের এমনই একটি ময়লার ভাগাড় থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষায় দেখা মেলে এই ছত্রাকের; source: glorilist.com
হ্যাঁ, এমনই এক ছত্রাকের দেখা মিলেছে যেগুলো খুব সহজেই প্লাস্টিকের দৃঢ় বন্ধনগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারে কয়েক সপ্তাহেই! চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সের গবেষকগণ পাকিস্তানের বিজ্ঞানীদের সাথে একজোট হয়ে পাকিস্তানের ইসলামাবাদের একটি ময়লার ভাগাড় থেকে আবিষ্কার করেছেন এই ছত্রাক। এর বৈজ্ঞানিক নাম Aspergillus tubingenesis (অ্যাসপারগিলাস টুবিনজেনেসিস)। অনেকটা শকুনি দৃষ্টি দিয়ে গবেষকগণ নমুনা জোগাড় করেন ময়লার ভিতর থেকে। নানা প্রকারের ময়লা তারা সংগ্রহ করেন। বিশ্বাস একটিই, নিশ্চয়ই এমন কোনো অণুজীবের দেখা মিলবে যেটি প্লাস্টিককে মিশিয়ে দিতে।
অ্যাসপারগিলাস টুবিনজেনেসিস; source: zee news
সংগৃহীত নমুনাগুলোকে অত্যাধুনিক অণুবীক্ষণ যন্ত্র এবং বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করে তারা একধরনের ফাঙ্গাস বা ছত্রাকের দেখা পান, যেগুলো এদের দেহের মাইসেলিয়ার (অণুজীবের দেহ থেকে বের হওয়া শিকড়ের ন্যায় সূত্রবিশেষ) শক্তি ব্যবহার করে পলিমারকে ভেঙে দিতে পারে। গবেষকদল বলেন, প্রাকৃতিকভাবে পলিমার বন্ধন ভাঙতে যেখানে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে, সেখানে এই ছত্রাকগুলো কয়েক সপ্তাহেই ভেঙে দিতে পারে।
অ্যাসপারগিলাস টুবিনজেনেসিস
অ্যাসপারগিলাস টুবেনজেনেসিস এমন একধরনের ছত্রাক যা সাধারণত মাটিতে থাকে। তবে গবেষণাগারে এগুলোকে প্লাস্টিকের উপর বেড়ে উঠতে দেখা গিয়েছে। ২০১৭ সালের এই গবেষণাটিতেই প্রথম জানা গেল এর সম্পর্কে তা কিন্তু নয়। ১৯৩০ সালে রাউওল মোজেরে নামক একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম এই ছত্রাকটির বর্ণনা দিয়েছিলেন। বৈজ্ঞানিক নামটিও মোজেরেরই দেওয়া। তার মতে, এই ছত্রাকটি ‘বর্ডারলাইন এক্সট্রেমোফাইল’ অর্থাৎ এটি অতি প্রতিকূলতায়ও বেঁচে থাকতে পারে। এটি অতিবেগুনী রশ্মি সহনশীল এবং অত্যাধিক তাপমাত্রা (৩০-৩৭ ডিগ্রি সে.) এর বৃদ্ধি ঘটে, যেখানে অন্যান্য প্রজাতিগুলো ২১-৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ছাড়া পারে না। তবে এর লৈঙ্গিক ধরণ সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে কিছু জানা যায় নি। ধারণা করা হচ্ছে, অযৌন জনন প্রক্রিয়ায় এদের বংশবৃদ্ধি ঘটে। তবে কালো অ্যাস্পারগিলাসদের সাথেও এটি সম্পর্কযুক্ত। শুধু তা-ই নয়, এর যৌন বৈশিষ্ট্যের সাথে পেক্টোমাইসিস গোত্রের যৌন বৈশিষ্ট্যেরও মিল পাওয়া গিয়েছে।
a) জাপেক মিডিয়ামে ৭ দিন রাখার পর সৃষ্টি কলোনি, b) অ্যাগার মিডিয়ামের বিপরীত পাশে হলদে কলোনি, c) স্পোরোফোর, d) কনিডা এবং স্পোরাঞ্জিয়াম; source: foto-bass.com
অ্যাস্পারগিলাস টুবিনজেনেসিস নামক ছত্রাকটির কনিডিয়াগুলোর ব্যাস মোটামুটি ৩-৫ মাইক্রোমিটার এবং সেগুলো খুব বেশি অমসৃণ। কখনো কখনো সাদাটে বা গোলাপী বর্ণের ০.৫-০.৮ মি.মি. ব্যাসবিশিষ্ট স্ক্লেরোশিয়ার সৃষ্টি হয়। এটি অক্রাটক্সিন, অ্যাসপারাজিন, পাইরানোগ্রিন এ, পারোফেন, ফিউনালেনান এবং কোটানিনের মতো এক্সটোলাইট তৈরি করতে পারে। এছাড়াও এই ছত্রাকগুলোকে ক্রিয়েটিন সুক্রোজ আগার (CREA) মাধ্যমে কালচার করলে খুব ভালভাবে এসিড সৃষ্টি করে এবং বৃদ্ধির গতিও মোটামুটি ভালোই থাকে। ১৫-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এরা মাইকোটক্সিন এবং অক্রাটক্সিন উৎপাদন করতে পারে।
অ্যাসপারগিলাস গোত্রের আরেকটি সদস্য Aspergillus niger এর সাথে এর যথেষ্ঠ মিল থাকায় অত্যাধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার না করে এদেরকে আলাদা করা কঠিন। এমনই একটি পদ্ধতি হলো এরলিক বিক্রিয়া (Ehrlich reacton)। এছাড়া অ্যাসপারজিন উৎপাদন দেখেও অ্যাসপারগিলাস গোত্রের অন্যান্য প্রজাতি থেকে টুবিনজেনেসিসকে আলাদা করা যায়।
Aspergillus niger; source: inspq.qc.ca
অ্যাসপারগিলাস টুবিনজেনেসিস এর pH এর মান অনেক কম, অর্থাৎ এটি এসিডীয় এবং কম পানিযুক্ত স্থানকে বসবাসের জন্য উপযুক্ত মনে করে। থাইল্যান্ড এবং চীনে এর প্রাদুর্ভাব বেশি হলেও পৃথিবীর উষ্ণতম দেশগুলোতে দেখা মিলবে এই ছত্রাকের। কখনো কখনো ঘরের মধ্যেও দেখা দিতে পারে এই ছত্রাক, বিশেষ করে ক্রোয়েশিয়া এবং তুরস্কে। এছাড়াও নেদারল্যান্ড, হাঙ্গেরি এবং আলজেরিয়াতেও এর উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
উপকারিতা
– এই ছত্রাকটি যেহেতু মাইকোটক্সিন উৎপাদন করতে পারে তাই জৈবপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এবং শৈল্পিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা হচ্ছে।
– এছাড়াও এটি অ্যামাইলেজ, লাইপেজ, গ্লুকোজ, গ্লুকোজ অক্সাইড, ফাইটেজ, জিলানেজ, এবং এসিড ফসফেটের মতো প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদানগুলো তৈরি করতে পারে। অবিশুদ্ধ পানি এবং চিটাগুড়ের অবশিষ্টাংশ থেকে বায়ো-ইথানল প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে এই টুবেনজেনেসিসের উৎপাদিত অ্যামাইলেজ।
– এ টুবেনজেনেসিস ছত্রাকটি কিছু জৈবিক এসিডও উৎপাদন করতে পারে, যেমন- সাইট্রিক এসিড, অ্যাসকরবিক এসিড ইত্যাদি, যেগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
– শস্য উৎপাদনে, বিশেষ করে ভুট্টা উৎপাদনের জন্য মাটি প্রস্তুতিতে এটি খুবই কার্যকরী একটি ছত্রাক হিসেবে পরীক্ষিত। এটি মাটির ফসফেট মুক্ত করে এবং মাটির ক্ষারত্ব কমিয়ে দিতে পারে।
– টমেটো গাছকে প্যাথোজেনিক রোগসৃষ্টিকারী ছত্রাক থেকে মুক্ত রাখে এই টুবেনজেনেসিস। এছাড়াও আঙুর উৎপাদনেও রয়েছে এর উল্লেখযোগ্য উপকারী ভূমিকা।
– বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ভূমিকা এই ছত্রাকটি পালন করছে তা হলো প্লাস্টিক ধ্বংস করা। প্লাস্টিকের মধ্যে যে অসংখ্য পলিমার বন্ধন আছে তা খুব সহজেই ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে পারে।
প্লাস্টিকের উপর ছত্রাকগুলো রাখার পর সেগুলো এনজাইম ক্ষরণ করে পলিমার বন্ধন ভাঙা শুরু করে; source: forestfloornarrative.com
অপকারিতা
আশার পরেও রয়ে যায় হতাশা। খুব বেশি নয়, ভাবুন তো গত ৭০ বছরে ঠিক কত প্লাস্টিক, কত পলিমার বন্ধন পৃথিবীতে কৃত্রিম উপায়ে বানানো হয়েছে শুধুমাত্র মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাবার জন্য? প্লাস্টিকের বালতি, জগ, গামলা, মগ, চকলেটের কৌটা, ফোম, সিনথেটিক লেদার, রঙ, রেফ্রিজারেটরের ইনসুলেশন, পলিথিন ব্যাগ ইত্যাদি অসংখ্য প্লাস্টিক পণ্যে পলিমার বন্ধনের সংখ্যাও কম নয়। অথচ এই ক্ষুদ্র ছত্রাকগুলো সংখ্যা সর্বোচ্চ পাঁচ মিলিয়ন হবে। এছাড়া বিজ্ঞানীরা বলছেন, সব ধরনের প্লাস্টিককে ভেঙে দেবার ক্ষমতাও এদের নেই।
মানুষের উপর একেবারেই খারাপ প্রভাব নেই তা-ও নয়। যদিও আমেরিকার খাদ্য এবং ঔষধ প্রশাসন (FDA) এর তথ্যানুযায়ী এই ছত্রাকটি নিরাপদ। অ্যাসপারগিলাস টুবিনজেনেসিসের দ্বারা ‘কেরাটাইটিস’ নামক কর্নিয়াল ইনফেকশন হবার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া এরা ম্যাক্সিলারি হাড়ে ইনফেকশনও সৃষ্টি করতে পারে যার প্রভাবে দাঁত পড়ে যেতে পারে বা তুলে ফেলতে হতে পারে। সম্প্রতি একটি গবেষণায় ফুসফুসীয় রোগে আক্রান্ত রোগীদের শ্বাসনালীতে ধরা পড়েছে এই অ্যাসপারগিলাস টুবিনজেনেসিস।
source: forestfloornarrative.com
শেষ কথা
বিজ্ঞানীরা এখনো জোর গবেষণা চালাচ্ছেন। অ্যাসপারগিলাস টুবিনজেনেসিসের মতো আরও প্রাকৃতিক অণুজীবের দেখা নিশ্চয়ই মিলবে, যেগুলোকে সম্মিলিতভাবে ব্যবহারের ফলে পরিবেশ দূষণের মতো সমস্যার সমাধান করে প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করা যাবে।
সংক্ষেপে দেখুননোবেল পুরষ্কার পাওয়া অপটিক্যাল টুইজার মূলত কী?
বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষায় নমুনা বা স্যাম্পল খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো কোনো নমুনা আছে অহরহ পাওয়া যায় সবখানে। কোনো নমুনা আছে খুব দুর্লভ আবার কোনো কোনো নমুনা আছে খুব ভঙ্গুর। নয় থেকে ছয় হয়ে গেলেই সে নমুনা নষ্ট হয়ে যায় কিংবা তার স্বাভাবিকতা হারায়। যেমন ডিএনএ কিংবা ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাস। এগুলো জগতেবিস্তারিত পড়ুন
বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষায় নমুনা বা স্যাম্পল খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো কোনো নমুনা আছে অহরহ পাওয়া যায় সবখানে। কোনো নমুনা আছে খুব দুর্লভ আবার কোনো কোনো নমুনা আছে খুব ভঙ্গুর। নয় থেকে ছয় হয়ে গেলেই সে নমুনা নষ্ট হয়ে যায় কিংবা তার স্বাভাবিকতা হারায়। যেমন ডিএনএ কিংবা ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাস। এগুলো জগতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেলেও গবেষণার সময় পান থেকে চুন খসলেই এদের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যাওয়া কোনো নমুনা থেকে যে ফলাফল আসবে তা তো আর সঠিক হবে না।
ডিএনএ কিংবা ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাসকে যদি কেউ পর্যবেক্ষণ করতে চায় তাহলে সেটিকে কোনো স্লাইড জাতীয় জিনিসের উপর রেখে করতে হবে। এরকম পর্যবেক্ষণে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কোনো নমুনাকে যদি এপিঠ-ওপিঠ, উপর-নিচ সবদিক থেকে পর্যবেক্ষণ করতে হয় তাহলে ঝামেলা বেধে যায়। নমুনাকে অক্ষত রেখে উল্টে পাল্টে দেখা সম্ভব হয় না। দেখতে গেলে নমুনা নষ্ট হয়ে যায় কিংবা পূর্বের অবস্থা থেকে বিচ্যুত (manipulated) হয়ে যায়।

স্লাইডে রেখে নমুনা পর্যবেক্ষণ করায় আছে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা; Source: 123RF
এ পরিস্থিতিতে এমন কোনো উপায় কি বের করা সম্ভব যার মাধ্যমে নমুনাকে অক্ষত রেখেই উল্টে পাল্টে দেখা যাবে? এ বেলায় যেতে হবে পদার্থবিজ্ঞানের কাছে। হেন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে পদার্থবিজ্ঞান মাথা ঘামায় না। এর সমাধানও হয়তো মিলতে পারে পদার্থবিজ্ঞানের কাছে। পদার্থবিজ্ঞান হয়তো এমন কোনো চিমটা তৈরি করে দেবে না যেটা নমুনাকে ধরে রাখবে, তবে এমন কোনো পদ্ধতি তৈরি করে দেবে যা দিয়ে নমুনাকে ভাসিয়ে রেখে উল্টে পাল্টে দেখা যাবে।
পদার্থবিজ্ঞান কীভাবে এ ক্ষেত্রে কাজে লাগলো সেটা জানতে হলে একদম মূল থেকে শুরু করতে হবে। প্রথমে বস্তুকে ধরে রাখার কথা চিন্তা করি। ক্যামেরা ধরে রাখার ট্রাইপড নিশ্চয় দেখেছেন। তিন দিকে তিনটা খুঁটি মিলে একটা জায়গায় স্থায়ী করে রাখে ক্যামেরাকে। এখন ট্রাইপডের খুঁটিগুলোকে সরু পাইপ বলে বিবেচনা করুন, যেগুলোর মধ্য দিয়ে একই বেগে বাতাস বের হয়ে আসছে। তিন দিকের বাতাস একটি বিন্দুতে মিলিত হচ্ছে। ঐ মিলন বিন্দুতে যদি একটি পাতলা বল রেখে দেওয়া হয় তাহলে তিন দিকের চাপে বলটি সেখানে ভাসতে থাকবে। ব্যাপারটি পরিষ্কার হবার জন্য নিচের ছবিটি দেখুন।

Source: giphy
একটা সময় জানা যায় ফোটন কোনো বস্তুকে ধাক্কা দিতে পারে। আমরা প্রতিনিয়তই ফোটনের মুখোমুখি হচ্ছি কিন্তু ধাক্কা অনুভব করছি না কেন? আসলে ধাক্কা আমরা ঠিকই পাই কিন্তু তার পরিমাণ এতই নগণ্য যে সেটা দৃশ্যমান কোনো ফলাফল দেয় না। তাছাড়া আমরা পৃথিবীর শক্তিশালী মহাকর্ষে বাধা। যেখানে এমন একটি বল টেনে রাখছে আমাদের সেখানে ফোটনের ধাক্কার কোনো ফল পাওয়া যাবে না এটাই স্বাভাবিক।
যেখানে মহাকর্ষের শক্তিশালী প্রভাব নেই সেখানে ফোটনের ধাক্কার বিষয়টি ঠিকই পর্যবেক্ষণ করা যায়। ধূমকেতুর কথা হয়তো শুনে থাকবেন। এর ভারী অংশটাকে বলে নিউক্লিয়াস আর হালকা অংশটাকে বলে পুচ্ছ। ধূমকেতু যখন সূর্যের দিকে আসে কখনোই পুচ্ছের অংশটা সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে না। সবসময়ই সূর্যের বিপরীত দিকে অবস্থান কর। কারণ সূর্যের আলোকের ফোটনের ধাক্কায় হালকা পুচ্ছটি পেছনের দিকে সরে গিয়েছে।


ধূমকেতুর পুচ্ছ সবসময় সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে; Pinterest
ফোটনের ধাক্কার বিষয়টিকে বিজ্ঞানীরা খুব গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন। এমনকি একে ব্যবহার করে মহাকাশযানের ডিজাইনও করেন, যে যান ফোটনের ধাক্কায় এগিয়ে যাবে অল্প অল্প করে। ১৯৭৫ সালে যখন ভাইকিং মহাকাশযান পাঠানো হয় তখন ফোটনের ধাক্কার বিষয়টি হিসেবের মধ্যে আনা হয়। ফোটন কর্তৃক প্রদত্ত চাপ হিসেব করে ভাইকিংকে মঙ্গলের দিকে প্রেরণ করা হয়েছিল। যদি এই হিসাবটি করা না হতো তাহলে ভাইকিং যান গণনাকৃত দূরত্বের ১৫ হাজার কিলোমিটার বাইরে দিয়ে চলে যেতো।
বিজ্ঞানীরা নৌকার পালের মতো করে এমন একটি মহাকাশযান ডিজাইন করেছেন যেটি আলোর (ফোটনের) ধাক্কায় সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা এই যানের নাম দিয়েছে LightSail বা আলোকপাল; Image: The Planetary Society
তো এই ব্যাপারটাকে পৃথিবীতেও কাজে লাগানো যায় কিনা? পৃথিবীর কোনো ভারী বস্তুকে ফোটনের ধাক্কায় ভাসানো যাবে না, তা ঠিক আছে। কিন্তু খুবই ক্ষুদ্র কোনোকিছু যেমন কোনো অণু কিংবা কোনো অঙ্গাণু কিংবা কোনো এককোষী প্রাণী?
এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে থাকেন আর্থার অ্যাশকিন নামের একজন মার্কিন গবেষক। তার সময়কালে স্টার ট্রেক সিরিজ কিংবা স্টার ওয়ার্স চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, না ছুঁয়ে না ধরে কীভাবে লেজার বিম ব্যবহার করে কীভাবে অনেক দূর থেকে শত্রুর যান উড়িয়ে ফেলা যায় যায়, মুহূর্তের মাঝে কোনো গ্রহাণু কিংবা এমনকি আস্ত গ্রহই ধ্বংস করে ফেলা যায়।
সে সময়টায় লেজার উদ্ভাবিত হয়েছে। উদ্ভাবনের পরপরই তিনি লেজার নিয়ে গবেষণায় নেমে যান। শীঘ্রই তিনি অনুধাবন করতে পারেন ক্ষুদ্র বস্তুকে না ধরে না ছুঁয়ে ভাসিয়ে রাখার ক্ষেত্রে লেজার কাজে আসতে পারে। তিনি নেমে পড়লেন এই কাজে। কয়েক মাইক্রোমিটারের অতি ক্ষুদ্র স্বচ্ছ বল তৈরি করেন এবং দেখেন সেটিকে লেজারের রশ্মি ভাসিয়ে রাখছে। সে সময় তিনি লক্ষ করেন স্বচ্ছ বলগুলো লেজার বিমের একদম মাঝে এসে স্থায়ী হচ্ছে। মাঝে বলতে লেজারকে যদি প্রস্থচ্ছেদ করা হয় সেই প্রস্থচ্ছেদের মাঝে।
এমনটা কেন হয় তার পেছনে পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম কাজ করে। জটিলতা পরিহার করে বললে পলা যায়, এই অংশটাতে লেজারের তীব্রতা বেশি থাকে। পাশের এলাকাগুলোতে তীব্রতার হেরফের হয়, যার কারণে স্বচ্ছ বলের অবস্থান নড়েবড়ে হয়ে যায়। তাই যে অংশে হেরফের হয় না সেখানেই এসে স্থায়ী হয়।
এখানে আরেকটু সমস্যা আছে। লেজারের বিম যত দূর পর্যন্ত লম্বা, ততদূর পর্যন্ত বলটি চলাচল করতে পারে। হয়তো বিমের মাঝখানেই থাকে কিন্তু তারপরেও এক স্থানে আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থায় আর্থার অ্যাশকিন বিমের মাঝে একটি লেন্স বসিয়ে দিলেন। লেন্সের কারণে আলো বেকে গিয়ে একটি বিন্দুতে মিলিত হয়। যে অংশে সবগুলো আলোক রশ্মি মিলিত হয় সে অংশের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। আর ঐ অংশটি মাত্র একটি বিন্দু। তার মানে দাঁড়াচ্ছে ঐ বিন্দুতেই স্থির হয়ে আটকে থাকবে স্বচ্ছ বলটি। আর এর মাধ্যমেই তৈরি হয়ে গেল আলোকের ফাঁদ। ধরা লাগলো না, ছোঁয়া লাগলো না, বস্তুকে ভাসিয়ে রাখা গেল ঠিকই। একেই বলা হয় অপটিক্যাল টুইজার।

বিশেষ প্রক্রিয়ায় এক জায়গায় ভাসিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে একটি বস্তুকে; Credit: Nobel Media
এরপর এটি নিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেল। নানা বিজ্ঞানী নানাভাবে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর অণু পরমাণু নিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু আর্থার অ্যাশকিন এই ব্যাপারটিকে দেখলেন অন্য দিক থেকে। তিনি জীববিজ্ঞানে এর প্রয়োগ নিয়ে মাথা ঘামালেন। অণু-পরমাণুর বদলে তিনি এই পরীক্ষায় ব্যবহার করলেন ক্ষুদ্র ভাইরাস। এক পর্যায়ে ভাইরাস থেকে যান ব্যাকটেরিয়ায়। ব্যাকটেরিয়ারা ভাইরাসের চেয়ে বড় ও ভারী। তার মানে এটিকে ফোটনের শক্তিতে ভাসিয়ে রাখা চ্যালেঞ্জিং। তিনি লক্ষ করেন ব্যাকটেরিয়াগুলো ভেসে থাকছে ঠিকই কিন্তু সেগুলো মারা যাচ্ছে।
মারা গেলে তো আর পরীক্ষা সম্পন্ন করা যাবে না। মারা যাচ্ছে লেজারের তীব্রতার কারণে। এমতাবস্থায় তিনি ইনফ্রারেড আলোর হালকা লেজার ব্যবহার করলেন। এতে ব্যাকটেরিয়াগুলো ভেসেও থাকলো এবং টিকেও থাকলো। এভাবে পরীক্ষা করতে করতে তিনি এমন একটি উপায় বের করেন যেখানে ব্যাকটেরিয়ার গায়ের কোনো ক্ষতি না করে এমনকি কোষ ত্বক (প্লাজমা মেমব্রেনেরও) কোনো ক্ষতি না করে ভাসিয়ে রাখা যায়। এর মাধ্যমে নতুন একটি জগতে প্রবেশ করে জীববিজ্ঞান। পরীক্ষণের জন্য রাখা খুব স্পর্শকাতর নমুনাকে কোনো স্পর্শ ছাড়াই উপর-নিচ, নাড়াচাড়া, এদিক-সেদিক করা যায়।
জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, রসায়নের বিভিন্ন শাখা ও পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এই পদ্ধতি ব্যবহার হতে থাকে।

সংক্ষেপে দেখুননোবেল জয়ী অর্থার অ্যাশকিন; © Niklas Elmehed/Nobel Media
২০১৮ সালে আর্থার অ্যাশকিনের অবদানের জন্য তাকে নোবেল পুরষ্কার প্রদান করা হয়। পুরষ্কারের অর্ধেক পাবেন তিনি আর বাকি অর্ধেক পাবেন কানাডার ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড এবং ফ্রান্সের জেরার্ড মরো। লেজারের প্রয়োগ নিয়ে একটি জটিলতায় ভুগছিলেন বিজ্ঞানীরা। লেজার দিয়ে অনেক কিছু করা গেলেও একটা জায়গায় এসে আর কিছু করা যাচ্ছিল না, কোনোভাবেই সেই সীমাবদ্ধতা থেকে বের হওয়া যাচ্ছিল না। এই অংশটিকে কাজ করেন স্ট্রিকল্যান্ড ও মরো। তাদের কাজের ব্যাখ্যা করতে গেলে স্বতন্ত্র একটি লেখা লিখতে হবে। পরবর্তী কোনো লেখায় সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। নোবেল পুরষ্কার অর্জনের জন্য তাদেরকে অভিনন্দন। আর তাদের কাজের মাধ্যমে আমাদের জীবন যাপনকে উন্নত করার জন্য তাদেরকে ধন্যবাদ।
স্লিপওয়াকিং কি ধরনের রোগ?
কল্পনা করুন তো, রাতে ঠিকমতোই ঘুমিয়েছিলেন নিজের ঘরে। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। নিজেকে আবিষ্কার করলেন ঘন জঙ্গলে, চারপাশে জমাট বাধা বিদঘুটে অন্ধকার, শিয়াল ডাকছে। আপনি কিভাবে এখানে এলেন সেটা হাজার চেষ্টাতেও মনে করতে পারছেন না। অথবা ঘুম ভাংলে দেখলেন গাড়িতেই বসে আছেন এবং গাড়িটি কোনো এক গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে উবিস্তারিত পড়ুন
কল্পনা করুন তো, রাতে ঠিকমতোই ঘুমিয়েছিলেন নিজের ঘরে। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। নিজেকে আবিষ্কার করলেন ঘন জঙ্গলে, চারপাশে জমাট বাধা বিদঘুটে অন্ধকার, শিয়াল ডাকছে। আপনি কিভাবে এখানে এলেন সেটা হাজার চেষ্টাতেও মনে করতে পারছেন না। অথবা ঘুম ভাংলে দেখলেন গাড়িতেই বসে আছেন এবং গাড়িটি কোনো এক গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে উলটে পড়ে আছে। আপনি মনেই করতে পারলেন না যে, ঘুমিয়েছিলেন নিজের ঘরে অথচ জেগে উঠলেন ঘন জঙ্গলে বা ধাক্কা খাওয়া গাড়ির ভেতর। অনেকটা ভৌতিক কিংবা অনেকটা সিনেমার মতোই মনে হবে বিষয়টি। তবে যা ঘটেছে তা কিন্তু আপনিই ঘটিয়েছেন। কিন্তু কিভাবে সম্ভব?
ব্যোমকেশপ্রিয় মানুষেরা কলকাতা বাংলা আর্টফিল্ম ‘শজারুর কাঁটা’ দেখেননি, এমনটি হওয়ার কথা নয়। এই সিনেমায় প্রায়শ রাতে একের পর এক মানুষ খুন হয়ে যায়। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে প্রতিটি খুনই করা হয় শজারুর কাঁটা দিয়ে এবং পিঠের একটি বিশেষ অংশে এই কাঁটা বসিয়ে। তো ব্যোমকেশ বাবুর উপর এই তদন্তের ভার পড়লে অবশেষে তিনি খুনিকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। কিন্তু যেটা রোমাঞ্চকর সেটা এই শজারুর কাঁটা নয়, ওটা ছিলো নিছক হাতিয়ার। রোমাঞ্চকর ব্যাপার হচ্ছে খুনি প্রবাল খুনের সময় টেরই পায় নি যে সে খুন করেছে বা করছে। ব্যোমকেশ বাবুর মতে প্রবাল ঘুমের ভেতরই এই খুন করেছে। এই অবস্থাকেই বলা যায় নিদ্রাভ্রমণ বা স্লিপওয়াকিং (Sleepwalking)। প্রেমিকাকে হারাবার দুশ্চিন্তা, নাটকদলের জন্য দুশ্চিন্তা ইত্যাদিই প্রবালকে এই সমস্যার সম্মুখীন করেছিলো। তাছাড়া শেক্সপীয়র তাঁর ‘ম্যাকবেথ’ নাটকেও স্লিপওয়াকিং সম্বলিত একটি দৃশ্য তৈরী করেছেন।
স্লিপওয়াকিং; Image Source: activemomsnetwork.com
নাটকে বা সিনেমায় দেখে বিষয়টিকে অনেকটা ফিকশন মনে হলেও বাস্তবে স্লিপওয়াকিং-এর অনেক প্রমাণ পাওয়া যায় যার দুই-একটি ক্ষেত্রে ফলাফল সিনেমার মতোই ভায়াবহ পর্যায়ে গিয়েছে। মূলত ৪-৮ বছর বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা সচরাচর দেখা গেলেও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা হতে পারে। এই লেখাটিতে থাকছে স্লিপওয়াকিং নিয়ে কিছু অজানা তথ্য।
স্লিপওয়াকিং বা নিদ্রাভ্রমণ কী?
স্লিপওয়াকিং বা নিদ্রাভ্রমণ (বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় Somnambulism অথবা Noctambulism) বলতে বোঝায় ঘুম এবং ভ্রমণের অর্থাৎ চলাফেরার যৌগিক রূপ। সহজে বলতে গেলে ঘুমের ভেতর স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করা, যদিও সেটা স্বাভাবিক না। চিকিৎসকেরা একে প্যারাসোমনিয়া (Parasomnia) গোত্রভূক্ত করে থাকেন। প্যারাসোমনিয়া একটি ঘুম সংক্রান্ত ব্যাধিগোত্র, যেখানে মূলত ঘুমের ভেতর মানুষের বিভিন্ন আচরণগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়ে থাকে; যেমন ঘুমের ভেতর কথা বলা, চলাফেরা করা, কাঁদা, দাঁত কিড়মিড় করা ইত্যাদি। তবে এক্ষেত্রে সব সময় গভীর ঘুমেরও আবশ্যকতা নেই। আধা ঘুম, পূর্ণ ঘুম অথবা ঘুম থেকে জেগে ওঠার পূর্বমুহূর্তেও এসব ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে স্লিপওয়াকিং সাধারণত গভীর ঘুমের সময়েই হয়ে থাকে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Slow Wave Sleep Stage (SWSS)। এই সময়ে ঘুমন্ত ব্যক্তির চেতনা থাকে খুবই ক্ষীণ, অর্থাৎ বাহ্যিক জগৎ থেকে বলা যায় প্রায় সম্পূর্ণ যোগাযোগবিহীন। কিন্তু একই সময়ে স্লিপওয়াকিং-এ আক্রান্ত ব্যক্তি মনের অজান্তেই এমন কাজ করে ফেলেন, যা দেখে বোঝার উপায় থাকে না যে তিনি জেগে আছেন না ঘুমিয়ে আছেন। যেমন- তিনি বিছানার উপর উঠে বসলেন, তারপর বাথরুমে গেলেন কিংবা রান্নাঘরে গেলেন অথবা গাড়ি ড্রাইভিং এর মতো বিপদজনক কাজও করে ফেলতে পারেন!

Image Source: mediologiest.com
স্লিপওয়াকিং এর ক্ষেত্রে এই রোগে (অবশ্য একে রোগ বলা যাবে কিনা এ নিয়ে মতবিরোধ আছে) আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুমন্ত অবস্থায় করা কাজগুলো পুনরাবৃত্তিক ধরণের হয়ে থাকে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি ঘুমের ভেতর তার রান্নাঘর পর্যন্ত যদি যান, তবে পরে প্রায় প্রতিবারই তার রান্নাঘরে যাওয়ার সম্ভাবনা সব থেকে বেশি। যদিও ঘুমন্ত অবস্থায় সাধারণ কাজ করার কথা থাকলেও, রিপোর্টে দেখা যায় মাঝেমধ্যে কিছু জটিল আচরণও ওই ব্যক্তি করতে পারেন।
সব থেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি জানতেই পারেন না যে তিনি আসলে কি করছেন বা করেছেন। কারণ প্রায় অচেতন অবস্থায় করা কাজ যেমন তিনি অনুভব করতে পারেন না, তেমনি মস্তিষ্ক এই কাজের কোনো স্মৃতি রাখতে পারে না। কারণ এই সময় মস্তিষ্কের চেতনার অংশ বিশ্রাম অবস্থায় থাকে। অর্থাৎ বিষয়টি তার কাছে অজানাই থেকে যায়। কিন্তু তাদের চোখ খোলা থাকতে পারে। যদিও দেখে মনে হতে পারে মদ্যপান বা ঘুমের কারণে ঢুলছেন।
গবেষণায় দেখা যায় যে, স্লিপওয়াকিং এর সময়কাল সর্বনিম্ন ৩০ সেকেন্ড থেকে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট পর্যন্ত হয়ে থাকে। সাধারণত রাতের প্রথম তৃতীয়ার্ধে এই সমস্যাটি ঘটতে দেখা যায়। কারণ এই সময়ই ঘুম গভীর হতে থাকে এবং যদি এই ধরণের অবস্থার সৃষ্টি হয়েই থাকে তবে প্রতি রাতে একবারই হয়।
স্লিপওয়াকিং-কে ২টি শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে আছে ঘুমের ভেতর চলাফেরার করার সাথে সাথে ঘুম সংক্রান্ত খাওয়া-দাওয়া (Sleep-eating)। এই ক্ষেত্রে ঘুমের ভেতরই ব্যক্তি খাওয়া-দাওয়া করতে পারে। ধারণা করা হয় অতিরিক্ত মানসিক চিন্তা করা বা ঘুমের ওষুধ (যেমন Ambien) ব্যবহারের কারণে এ ধরণের সমস্যা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রান্না করে খাওয়ারও প্রবণতা দেখা যায়। দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্ষেত্রে দেখা যায় ঘুমের ভেতর ঘুম সংক্রান্ত যৌন আচরণ (বা sexsomnia)।
পরিসংখ্যান কী বলে?
পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ৫ থেকে ১২ বছর বয়সের শিশুদের মধ্যে প্রায় ১৫% শিশুই ঘুমের ভেতর ভ্রমণ করে এবং কারো কারো ক্ষেত্রে এই সমস্যা আস্তে আস্তে প্রকট হতে থাকে। পৃথিবীর মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৮-১৯% মানুষই স্লিপওয়াকার (Sleepwalker), যাদের মধ্যে শিশু-কিশোর এবং পূর্ণবয়স্ক মানুষ আছে- প্রায় ৬.৯% মেয়ে শিশু, ৫.৭% ছেলে শিশু, ৩.১% পূর্ণবয়স্ক মহিলা এবং ৩.৯% পূর্ণবয়স্ক পুরুষ। সবথেকে বেশি স্লিপওয়াকিং এর রেকর্ড আছে ১১ থেকে ১২ বছর বয়সের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে, যা প্রায় ১৬.২%।
গবেষণায় দেখা যায় শিশু (যাদের বয়স ২ থেকে ১২ বছর) ও প্রাপ্তবয়স্করা রাতের ৮০%-ই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, যেখানে ২ বছর বা তার কম বয়সের বাচ্চাদের (Infant) ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ৫০%। দুশ্চিন্তাজনিত কারণে কোনো মানুষের স্লিপওয়াকিং-এর সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের থেকে ৩.৫ গুণ হয়ে থাকে।
স্লিপওয়াকিং এর কারণ
স্লিপওয়াকিং এর সঠিক কারণ জানা এখনও সম্ভব না হলেও গবেষক ও চিকিৎসকের ধারণমতে বেশ কয়েকটি কারণ পাওয়া যায়। যদিও কারণগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে এখনো প্রমাণিত নয়। অর্থাৎ এই কারণগুলো এখনো প্রকল্পিত (Hypotheses) হিসেবে ধরে নেয়া হয়। ধারণা করা হয় সঠিক সময়ে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের পূর্ণতার অভাবে এই সমস্যা হতে পারে। এই সমস্যা প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে শিশুদের মধ্যে বেশি লক্ষ্য করা যায়।
স্লিপওয়াকিং-কে গবেষকরা তৃতীয় পর্যায়ের (Stage-3) Rapid Eye Movement (REM) Disorder ধরণের ঘুমের কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। REM ঘুমের সময় সাধারণত আমরা স্পষ্টভাবে স্বপ্ন দেখে থাকি। এই সময়ে মস্তিষ্কের মোটর অংশ বাঁধাপ্রাপ্ত হয় এবং এর ফলে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো হঠাৎ ঝাঁকি খায় যা পরবর্তীতে জটিল গতিবিধির সৃষ্টি করে। এতে করে ব্যক্তি তার স্বপ্ন অনুযায়ী অবচেতনভাবে হাঁটাচলা করে থাকে। আবার শিশুদের ক্ষেত্রে Stage-3 তে বৃদ্ধি হরমোন নিঃসৃত হয়ে থাকে। যতই বয়স বাড়ে, এই হরমোন নিঃসরণের পরিমাণ তত কমে যেতে থাকে। মূলত শিশুদের ক্ষেত্রে এই Stage-3 হরমোনের কারণেই স্লিপওয়াকিং এর মাত্রা বেশি দেখা যায়।
আরো জানা যায় যে, এই সমস্যাটি বংশানুক্রমিক ভাবে প্রবাহিত হতে পারে, অর্থাৎ জীনগত হয়ে থাকে। যেমন কোনো ব্যক্তির পিতা-মাতা, ভাই অথবা বোনের যদি এই সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে ওই ব্যক্তির স্লিপওয়াকিং এ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের থেকে ১০ গুণ বেশি হয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে প্রায় ৪৫% শিশু যারা স্লিপওয়াকিং এ আক্রান্ত, তাদের পিতা-মাতার যেকোনো একজন এই সমস্যায় আক্রান্ত। এই পরিমাণ ৬০% পর্যন্ত হতে পারে যদি পিতা-মাতার দুজনই স্লিপওয়াকিং সমস্যায় ভোগে।
কিন্তু কেবল জীনগত কারণেই যে এই সমস্যা দেখা দেবে এমন না। বাহ্যিক পরিবেশের প্রভাবে বা মানসিক সমস্যার কারণেও এই সমস্যা হতে পারে। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আরো কিছু কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- (১) অপর্যাপ্ত ঘুম, (২) বিশৃঙ্খল পরিবেশে ঘুমানো, (৩) অতিরিক্ত অবসাদ, (৪) মদ্যপান, (৫) ঘুমের ওষুধ সেবন ইত্যাদি। কতিপয় ক্ষেত্রে ব্যক্তির স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যাও এই সমস্যার সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকতে পারে। যেমন- (১) হৃদস্পন্দনজনিত সমস্যা, (২) অতিরিক্ত জ্বর, (৩) রাত্রিকালীন অ্যাজমা বা হাঁপানি বা হৃদরোগের সমস্যা, (৪) ঘুমানোর সময় দম আটকে যাওয়ার সমস্যা কিংবা (৫) মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা (যেমন ভয়ভীতি)
উপসর্গ
স্লিপওয়াকিং এর সমস্যা মূলত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অবস্থায় হয়ে থাকলেও কখনো কখনো হালকা ঘুমের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। অনেকে আবার একে অ্যালকোহল বা মাদক সেবনজনিত সমস্যার সাথে মিলিয়ে ফেলেন। কারণ সেক্ষেত্রেও স্মৃতিবিলোপের (amnesia) সম্ভাবনা থেকে থাকে যা স্লিপওয়াকিং এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে মাদক সেবনজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তির চেতনা থাকে অনেকখানি, ফলে সহজেই সে সাড়া দিতে পারে।
যেহেতু স্লিপওয়াকিং এ আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুমন্ত অবস্থায় ভ্রমণকালের কোনো স্মৃতি থাকে না, ফলে সে হয়তো কখনো কখনো জানতেই পারে না তার সমস্যা কি। এক্ষেত্রে রোগ ধরবার উপায় কেবল পাশের মানুষটিরই থাকে, অর্থাৎ পিতা-মাতা বা সাথে থাকা বন্ধুই সমস্যাটি জানতে পারে।
এই ব্যাধির উপসর্গ খুব সহজে চিহ্নিতও করা যায় না। কারণ ঘুমিয়ে থাকলেও তার চলাফেরা স্বাভাবিক মানুষের মতো হয়ে থাকে এবং একই সাথে চোখ খোলা থাকে। তবে ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, চোখজোড়া ঘুমে অনেকটাই আচ্ছন্ন এবং খুব সম্ভবত চোখের পলক পড়ে না। এই অবস্থায় তাকে কোনো প্রশ্ন করা হলে সাড়া পাওয়া যায় না বা সাড়া পাওয়া গেলেও সাড়া দিতে অনেক সময় নিয়ে থাকে।
যাদের এই সমস্যা খুব পুরাতন হয়ে যায়, তারা বেশ তাড়াতাড়িই জেগে ওঠে। কিন্তু যারা এই সমস্যায় নতুন আক্রান্ত হয়, তারা সহজে জেগে উঠতে পারে না। স্লিপওয়াকিং এর সময়ে আরো কিছু লক্ষণ দেখা যায় যার মধ্যে আছে (১) ঘুমের ভেতর কথা বলা, (২) অযাচিত আচরণ যেমন বিছানায় প্রস্রাব করা (যেহেতু সমস্যাটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে) কিংবা (৩) ঘুমের ভেতরই চিৎকার করা ইত্যাদি।
চিকিৎসা বা প্রতিকার
সাধারণত স্লিপওয়াকিং এর প্রতিরোধ বা প্রতিকারের জন্য এখনো কোনো সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। তবে স্বাস্থ্যকরভাবে ও নিয়ম মেনে সঠিক সময়মতো পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস করলে আস্তে আস্তে এই সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ হতে পারে। যদি কেউ উপলব্ধি করে যে, তার স্লিপওয়াকিং এর সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলতে পারে।

সম্মোহন পদ্ধতি; Image Source: lightwarriorslegion.com
আবার মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এই সমস্যার প্রতিকারে মনোবিশ্লেষণ পদ্ধতি বা সম্মোহন পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। বয়ঃপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে সাধারণত এই সমস্যার সমাধান হিসেবে সম্মোহন (Hypnosis) পদ্ধতিরই আশ্রয় নেয়া হয়। আবার তারা (মনস্তত্ত্ববিদেরা) নিয়ম করে রাতে ঘুম ভাঙ্গা (Anticipatory waking) যেন স্লিপওয়াকিং এর সুযোগ না থাকে, মনকে কেন্দ্রীভূত করতে যোগব্যায়াম (Meditation) ইত্যাদির পরামর্শও দিয়ে থাকেন।
যেহেতু অতিরিক্ত অবসাদ বা দুশ্চিন্তা থেকে এই সমস্যা হতে পারে, ফলে সেক্ষেত্রে অবসাদ বা চিন্তামুক্ত হলেই এই সমস্যা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অবশ্য এক্ষেত্রে ফার্মাকোলজিক্যাল থেরাপি হিসেবে Sedative-hypnotics বা Anti-depressants ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয় যেখানে প্রথমটি প্রশান্তিমূলক ঘুমের জন্য এবং দ্বিতীয়টি দুশ্চিন্তা থেকে ব্যক্তিকে মুক্ত রাখার জন্য কার্যকর।
স্লিপওয়াকিং সম্পর্কিত কতিপয় ঘটনা
স্লিপওয়াকিং এর কারণে ব্যক্তির আহত হওয়ার সম্ভাবনা যেমন থাকে, তেমনি অন্য ব্যক্তির জন্যও তা মাঝেমধ্যে বিড়ম্বনার কারণ হতে পারে। এই সমস্যা কখনো কখনো খুন পর্যন্তও গড়াতে পারে। ফলে সহজেই স্লিপওয়াকিং-কে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অ্যালীবাই হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কারণ সেক্ষেত্রে স্লিপওয়াকিং-এর জন্য যেমন উপসর্গ নিরূপণের কোনো সঠিক উপায় নেই, তেমনি এর বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন-কানুনও নেই।
১৯৬৩ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের একজন বিচারক, লর্ড মরিস (John William Morris) স্লিপওয়াকিং এর বিষয়ে একটি আইন প্রণয়ন করেন, যেখানে বলা আছে যে প্রত্যেকটি ঘটনার ক্ষেত্রে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু যদি এমন প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ব্যক্তি অপরাধমূলক কাজের সময়ে স্লিপওয়াকিং অবস্থায় ছিলো অর্থাৎ অবচেতন ছিলো, তাহলে তাকে সেই অপরাধের দায় থেকে মুক্ত করা হবে।
উদাহরণ হিসেবে কিছু ঘটনার কথা বলা যায় যেখানে স্লিপওয়াকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে-
১) ১৮৪৬ সালে অ্যালবার্ট টিরেল (Albert Tirrell) নামক ব্যক্তি মারিয়া বিকফোর্ড নামক বোস্টন পতিতালয়ের একজন পতিতার খুনের মামলার ডিফেন্স হিসেবে স্লিপওয়াকিং এর কথা তুলে ধরে এবং অবশেষে মুক্তি পায়। যদিও মারিয়ার সাথে টিরেলের প্রণয়ের সম্পর্ক ছিলো, যার জন্য টিরেল তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে দেয়। টিরেলই প্রথম ব্যক্তি যে মামলার ডিফেন্স হিসেবে স্লিপওয়াকিং-এর কথা আনে।
২) ১৯৮১ সালে স্টিভেন স্টেইনবার্গ (Steven Steinber) নামক ব্যক্তিকে তার স্ত্রীকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত করা হলেও ডিফেন্স হিসেবে স্লিপওয়াকিং-কে দাঁড় করালে শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়।
৩) ১৯৯১ সালে বার্গেস (Burgess) নামক ব্যক্তিকে তার প্রেমিকার মাথায় ওয়াইনের বোতল দ্বারা আঘাত করার ঘটনায় অভিযুক্ত করা হলেও সিসি ক্যামেরা ফুটেজে তার অবচেতন ব্যবহার বা নিদ্রাভ্রমণ এর প্রমাণ পেয়ে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
৪) ১৯৯২ সালে কেনেথ পার্কস (Kenneth Parks) নামক ব্যক্তি তার শাশুড়িকে খুন করা ও শ্বশুরকে খুন করতে উদ্যত হওয়ার কারণে এবং আহত করার কারণে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে মুক্ত করা হয়। ২০ বছর বয়সে পার্কস তার চাকরি হারানোর পর ইনসোমনিয়াতে ভুগতে শুরু করে এবং জুয়াতে আসক্ত হয়। যদিও তার স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে তার সম্পর্ক যথেষ্ট ভালো ছিলো এবং তার স্ত্রী তার পক্ষেই ছিলো।
৫) মধ্যবয়সী এক অস্ট্রেলীয়ান নারীও (গোপনীয়তার কারণে তার নাম অদ্যাবধি প্রকাশ করা হয় নি) এই সমস্যায় ভুগতো। যদিও তার কোনো খুনের ইতিহাস নেই। তবে তার ঘটনা অন্যরকম। সে প্রতি রাতেই ঘুমের ভেতর ঘর থেকে বের হয়ে যেত এবং একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তির সাথে যৌনতায় লিপ্ত হতো। কিন্তু সে নিজে, তার স্বামী বা সেই আগন্তুক কেউই বিষয়টা আন্দাজ করতে পারে নি। পরবর্তীতে একদিন তার স্বামীর ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর তার স্ত্রীকে খুঁজতে গিয়ে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে।

স্লিপ ইটিং নমুনা চিত্র; Image Source: listverse.com
৬) এছাড়া লেসলি কুস্যাক (Lesley Cusack) নামক এক মহিলার ঘুমের ভেতর রান্না করা এবং খাওয়ার (Sleep eating) ঘটনাও পাওয়া যায়। ভদ্রমহিলা নিজের ফিটনেস ধরে রাখতে ডায়েট করতেন। কিন্তু রাতে ঘুমের ভেতরই তিনি প্রায় ২,৫০০ ক্যালোরির মতো খাবার খেয়ে ফেলার ইতিহাস তৈরী করেন। তবে যেটা ভয়ের সেটা ছিলো ঘুমের ভেতর তার রান্না করা। কারণ সারা রাত গ্যাসের চুলা জ্বালানো থাকতো।
৭) ১৯৯৪ সালে রিক্সজার (Ricksger) এবং ১৯৯৯ সালে ফালাটার (Falater) নামক ব্যক্তিদের ঘুমের ভেতর তার স্ত্রীকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয় এবং যাবজ্জীবন কারাবাস দেয়া হয়। এক্ষেত্রে তাদের কাউকেই মুক্তি দেয়া হয় নি।
৮) ১৯৯৮ সালে জেমস কারেন (James Currens) নামক এক ব্যক্তি ঘুমের ভেতরই হাতে তার লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু যখন তার ঘুম ভাঙে, তখন সে নিজেকে কোনো এক পুকুরে বুকজলে আবিষ্কার করে, যেখানে সে কাদায় আটকে পড়েছিলো। তবে ভয়ংকর ব্যাপার তখনই হলো যখন সে আবিষ্কার করলো যে, সে কয়েকটি কুমির দ্বারা বেষ্টিত। যদিও পুলিশের আগমনে সেই যাত্রায় বেঁচে যায় কারেন।
৯) ২০০৩ সালে জ্যান লুডেক (Jan Luedecke) নামক এক ব্যক্তিকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। জ্যান কোনো একটি পার্টিতে উপস্থিত ছিলো এবং অতিরিক্ত মদ্যপানের একপর্যায়ে সে ঘুমিয়ে পড়ে। কয়েক ঘন্টা পর যখন সে ওঠে তখন পার্টিতে উপস্থিত এক মহিলাকে সে ধর্ষণ করে। যদিও সে বলে যে সে এই ব্যাপারে কিছুই জানে না কারণ সে তখনও ঘুমের ভেতর ছিলো।
১০) ২০০৮ সালে ব্রায়ান থমাস (Brian Thomas)-কে তার স্ত্রীকে হত্যার দায়ে আটক করা হয়। তার ভাষ্যমতে সে স্বপ্নে দেখছিলো যে কেউ একজন তার ঘরে অনধিকার প্রবেশ করছে এবং সে তাকে হত্যা করেছে। আদালত তাকে মুক্তি দেয়।

মৃত অবস্থায় পাওয়া টিমোথি; Image Source: buzzfeed.com
১১) সর্বশেষ টিমোথি বার্গম্যান (Timothy Brueggeman) নামক ব্যক্তি ঘুমের ভেতরই তার পিক-আপ ভ্যানটি চালিয়েছিলো এবং অবশেষে একটি গাছের সাথে ধাক্কা লাগিয়ে দিয়েছিলো। এই সময় সে Ambien নামক ঘুমের ওষুধ সেবন করেছিলো। যদিও টিমোথি সে যাত্রায় বেঁচে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে ২০০৯ এর জানুয়ারীতে কোনো এক রাতে সে শুধুমাত্র আন্ডারওয়্যার পরেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পরদিন তাকে বরফের ভেতর মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
স্লিপওয়াকিং-এর জন্য অদ্যাবধি কোনো সম্পূর্ণ ফলপ্রসূ চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার হয় নি। কারণ ব্যক্তি নিজেও কখনো টের পান না যে আসলে তার ঘুমের ভেতর কি হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ছেড়ে বা ঘুমের প্রতি নিয়মানুবর্তী হলেই অনেকাংশে এই সমস্যা থেকে দূরে থাকা সম্ভব। নতুবা নিজেই না কবে ঘুমিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে উল্টে যাবেন কিংবা খুনই না করে ফেলবেন কবে কাকে!
সংক্ষেপে দেখুনঅতি সংক্ষেপে মহাবিশ্বের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত কিছু ইতিহাস কে জানে?
আমাদের এই মহাবিশ্ব বড়ই অদ্ভুত। এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে বিস্ময়। বিশাল এই মহাবিশ্বের খুব অল্পই আমরা জানতে পেরেছি। অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে এখন মানুষের গন্তব্য হয়ে উঠেছে বিভিন্ন নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ। নানা যান পাঠানো হচ্ছে সেসব ঠিকানায়। নতুন নতুন তথ্য আসছে সেসব অভিযানের কল্যাণে। কিন্তু এই মহাবিশ্ব এতটাইবিস্তারিত পড়ুন
আমাদের এই মহাবিশ্ব বড়ই অদ্ভুত। এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে বিস্ময়। বিশাল এই মহাবিশ্বের খুব অল্পই আমরা জানতে পেরেছি। অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে এখন মানুষের গন্তব্য হয়ে উঠেছে বিভিন্ন নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ। নানা যান পাঠানো হচ্ছে সেসব ঠিকানায়। নতুন নতুন তথ্য আসছে সেসব অভিযানের কল্যাণে। কিন্তু এই মহাবিশ্ব এতটাই বিশাল যে এর কোনো কূলকিনারা নেই, জানারও শেষ নেই। আমাদের মাথার উপর যে আকাশ আছে তাতেই রয়েছে বিস্ময়ে ভরা কোটি কোটি উপাদান। এসব একেকটি উপাদান যেমন বিস্ময়ে ভরা, তেমনি অদ্ভুত তার গঠন, ক্রিয়া এবং প্রভাব। মহাকাশের এমন বিস্ময়কর উপাদানের কয়েকটি সম্পর্কে জানানো হবে এ লেখায়।
রহস্যময় রেডিও সিগন্যাল
হাবল স্পেস টেলিস্কোপে তোলা প্রক্সিমা সেন্টেরাইয়ের ছবি; Image credit: ESA/Hubble & NASA
২০০৭ সালে মহাকাশ গবেষকরা রহস্যময় কিছু রেডিও সিগন্যালের সন্ধান পান। রহস্যময়তার কারণ হলো সেই সিগন্যালগুলো পৃথিবীর কোনো রেডিও সিগন্যাল ছিল না। বহির্জাগতিক কোনো তারকা থেকে আসছিল। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়েই গবেষকরা রহস্যময় রেডিও সিগন্যালের সন্ধান পেয়ে আসছেন। এখন পর্যন্ত ৬০টির মতো রেডিও সিগন্যাল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে। আল্ট্রাস্ট্রং, আল্ট্রাব্রাইট এই সিগন্যালগুলো মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ড স্থায়ী হয়, যার নাম দেওয়া হয়েছে ফাস্ট রেডিও বার্স্টস (এফআরবি)।
প্রথম যখন পৃথিবীর মানুষ এই সিগন্যাল সম্পর্কে জানতে পারে তখন ধারণা করেছিলে এগুলো হয়তো এলিয়েনদের পাঠানো সংকেত। যদিও সেই রহস্যের এখনও সমাধান হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা এখন জানতে পেরেছেন, সংকেতগুলো আসছে ৪.২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত প্রক্সিমা সেন্টেরাই থেকে। সায়েন্টিফিক আমেরিকানের তথ্যমতে, বিজ্ঞানীরা উপগ্রহ এবং মহাকাশযানের মতো মানবসৃষ্ট ডিভাইস থেকে যেসব সংকেত পর্যবেক্ষণ করতে পারেন তার চেয়ে এই সংকেতটি খুবই সংকীর্ণ ফ্রিকোয়েন্সির। তবে রহস্যময় এ সিগন্যালের উৎস নিয়ে বেশ মতপার্থক্য আছে।
কোনো কোনো বিজ্ঞানী বলছেন, শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র নিয়ে কোনো নিউট্রন তারকার খুব দ্রুত ঘূর্ণনের ফলে এই সিগন্যাল তৈরি হচ্ছে। কারো মতে, দুটি নিউট্রন তারকার একত্রে মিশে যাওয়ার ফলেই এমন সিগন্যাল পৃথিবীতে আসছে। তবে অনেকেই আবার এসব সিগন্যালকে ভিনগ্রহের প্রাণীর মহাকাশযান থেকে আসা তরঙ্গ বলে উল্লেখ করেছেন। ২০১৯ সাল থেকে বহির্জাগতিক সিগন্যালের রহস্য সমাধান করতে আমেরিকাসহ পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন রেডিও সিগন্যাল ধারণ করতে পেরেছেন যেটি অল্প সময়ে পর পর ছ’বার সংকেত পাঠিয়েছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে শীঘ্রই এ রহস্যের সমাধান করা সম্ভব হতে পারে।
মহাকাশের বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল
সাউথ আটলান্টিক অ্যানোমালি; Image credit: Division of Geomagnetism, DTU Space
ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের নভোচারীরা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এসেই হঠাৎ আলোর তীব্র ঝলক দেখতে পান। বেশ কয়েকজন নভোচারী এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। তবে এই ঘটনাটি ঘটে দক্ষিণ আটলান্টিক অ্যানোমালি (এসএএ) দিয়ে যাওয়ার সময়। এটি পৃথিবীর বিশেষ একটি ম্যাগনেটিক ফিল্ড। চিলি থেকে জিম্বাবুয়ের আকাশের ১,০০০-৬০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। আমাদের পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ড পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের সাথে সব জায়গায় সমানভাবে অবস্থান করছে না। ফলে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনটি যখন পৃথিবীর বিশেষ এই জায়গার উপর দিয়ে যায় তখন স্টেশনের ইলেক্ট্রনিক সিস্টেমে প্রভাব পড়ে এবং কম্পিউটারও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। সেই সাথে নভোচারীরা বিশেষ আলোর ঝলক দেখতে পান। এজন্য এই জায়গাকে বলা হয় ‘মহাকাশের বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল’।
নিউক্লিয়ার পাস্তা
নিউক্লিয়ার পাস্তা; Image credit: NASA/JPL-Caltech
আমরা জানি, পৃথিবীতে পাওয়া সবচেয়ে শক্ত পদার্থ হচ্ছে হীরা। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্ত পদার্থ কোনটি? সেটি হচ্ছে নিউক্লিয়ার পাস্তা। মহাকাশের কোনো মৃতপ্রায়/নিউট্রন তারকার অবশেষ থেকে নিউক্লিয়ার পাস্তা গঠিত হয়। নিউট্রন তারকা হচ্ছে সূর্যের চেয়েও ভারী কিন্তু ব্ল্যাকহোলের মতো বড় নয় এমন বৃহৎ তারার ধ্বংসের মাধ্যমে সৃষ্ট অবশিষ্টাংশ। ধ্বংসের আগে নিউট্রন তারকার ভর হয়ে থাকে ১০ থেকে ২৯ সৌর ভরের সমান। আর এমন বৃহৎ নিউট্রন তারকার অবশিষ্টাংশই হচ্ছে নিউক্লিয়ার পাস্তা। উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন, নিউট্রন তারকা থেকে সৃষ্ট নিউক্লিয়ার পাস্তা ঠিক কতটা শক্তিশালী। নির্দিষ্ট পরিমাণ স্টিলকে চুর্ণবিচূর্ণ করতে আপনাকে যতটুকু শক্তি প্রয়োগ করতে হয় সমপরিমাণ নিউক্লিয়ার পাস্তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করতে তার চেয়ে ১০ বিলিয়ন গুণ বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হবে! নিউক্লিয়ার পাস্তা এতটা শক্তিশালী হওয়ার কারণ এর ভেতরে অবস্থিত পদার্থের ঘনত্ব। এখন পর্যন্ত মানুষের জানা সবচেয়ে শক্ত পদার্থ এটিই।
আয়তাকার লাল নীহারিকা
আয়তাকার লাল নীহারিকা; Image Credit: NASA
ছায়াপথের মধ্যে বিভিন্ন গ্যাস এমনভাবে অবস্থান করে যেন সেগুলো কোনো বিশেষ আকার ধারণ করে আছে। তবে এসব নীহারিকার মধ্যে অদ্ভুত আকার ধারণা করে আছে একটি নীহারিকা যা দেখতে আয়তাকার। এরকম জ্যামিতাকৃতির নীহারিকা খুব কমই দেখা যায়। এই আয়তাকার লাল নীহারিকাটি পৃথিবী থেকে ২,৩০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এ ধরনের আকার তৈরি হওয়ার পেছনে বিজ্ঞানীরা যে কারণ দাঁড় করিয়েছেন সেটি হচ্ছে এই নীহারিকার ঠিক মাঝখানে দুটি তারকা রয়েছে। এই দুই তারকা থেকে উজ্জ্বল আলো নির্গত হওয়ার কারণে এই নীহারিকার রঙ লাল দেখায় এবং আকৃতি দেখায় আয়তাকার। তবে কিছু গবেষক মনে করেন তারকা দুটি থেকে অতিবেগুনি রশ্মি নির্গত হয় যেগুলো নীহারিকার কার্বনসমৃদ্ধ ধূলিকণার সাথে মিশে লাল রঙের সৃষ্টি করে।
রহস্যময় নিউট্রিনো
নিউট্রিনোর কল্পিত রুপ; Image Credit: DESY, Science Communication Lab
নিউট্রিনো হচ্ছে বৈদ্যুতিক চার্জবিহীন, কম সক্রিয় পারমাণবিক কণা। এসব কণা ইলেক্ট্রন এবং প্রোটনের সাথে দুর্বলভাবে যোগাযোগ করে। এই কণার বিশেষত্ব হচ্ছে এগুলো যেকোনো পদার্থের মধ্য দিয়ে অবিকৃতভাবে চলাচল করতে পারে। যে বস্তুর ভেতর দিয়ে এগুলো চলাচল করে সেই বস্তু টেরও পায় না। এই যেমন- মানুষের শরীর দিয়ে লাখ লাখ নিউট্রিনো চলে যাচ্ছে, কিন্তু মানুষ টের পাচ্ছে না। তবে কোথা থেকে আসে এই কণাগুলো সেই রহস্য এখনও সমাধান করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। তবে এসব কণা যে মহাজাগতিক কণা সে বিষয়ে সকল বিজ্ঞানীই একমত। তাদের ধারণা, মহাজাগতিক ঘটনা, যেমন- ছায়াপথের সংঘর্ষ কিংবা ব্ল্যাক হোলের মধ্যে নক্ষত্রের পতনের ফলে এসব নিউট্রিনো জন্ম নিতে পারে।
২০১০ সাল থেকে নিউট্রিনো শনাক্তে কাজ করা আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি প্রায়শই এ ধরনের কণার সন্ধান পাচ্ছেন। কিন্তু ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তারা এমন এক নিউট্রিনোর সন্ধান পান যেটি নিউট্রিনোর উৎস সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। এ কণার ব্যাপারে গবেষণা করে তারা জানান, এটি ৪ বিলিয়ন বছর আগে ছায়াপথের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল থেকে পৃথিবীর দিকে প্রবাহিত হয়েছিল। ২০১৫ সালে নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণা করে পদার্থে নোবেল পুরস্কার পান জাপানের তাকাআকি কাজিতা এবং কানাডার আর্থার বি. ম্যাকডোনাল্ড।
অদ্ভুত নক্ষত্র
উজ্জ্বলতা কমে আসা নক্ষত্র; Image credit: NASA/JPL-Caltech
এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত নক্ষত্রটির নাম KIC 846285। লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী তাবেথা বয়াজিন এবং তার দল যখন প্রথম এই নক্ষত্রের সন্ধান পান তখন সবাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। কারণ এটি এমন একটি নক্ষত্র যার উজ্জ্বলতা ক্ষণে ক্ষণেই কমে যায় যা একে অন্যান্য নক্ষত্র থেকে আলাদা করেছে। সূর্যের চেয়ে অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল এবং ১,৪০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই নক্ষত্রকে ট্যাবিস স্টার নামেও ডাকা হয়। এর উজ্জ্বলতা মাঝে মাঝেই ২০ শতাংশের মতো কমে যায়। এ থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এর চারপাশে কিছু উপাদান রয়েছে যা এর আলোকে বাইরে আসতে বাঁধা দেয়। এই নক্ষত্রকে নিয়ে নানা মতবাদ প্রচলিত আছে। কোনো কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানী একে বলছেন এলিয়েনদের তৈরি মেগাস্ট্রাকচার। তাদের মতে এর বাইরের দিকে সোলার প্যানেলের কক্ষপথ তৈরি করা আছে যার কারণে এর উজ্জ্বলতা মাঝে মাঝে কমে যায়। তবে আধুনিক গবেষকরা জানাচ্ছেন, বাইরের দিকে ধূলি-বলয় থাকার ফলেই এটি অন্যান্য নক্ষত্র থেকে আলাদা।
মহাকাশ থেকে আসা ইনফ্রারেড প্রবাহ
ইনফ্রারেড প্রবাহের কল্পিত চিত্র; Image Credit: NASA, ESA, and N. Tr’Ehnl (Pennsylvania State University)
কোনো তারকা যখন মরে যায় তখন তাকে বলা হয় নিউট্রন তারকা। এ ধরনের নিউট্রন তারকা এক্স-রে’র মতো উচ্চশক্তির রেডিয়েশন বা রেডিও তরঙ্গ নির্গত করে। কিন্তু ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ৮০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি নিউট্রন তারকা থেকে ইনফ্রারেড লাইটের লম্বা প্রবাহ লক্ষ্য করেন। এ ধরনের ঘটনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর আগে কখনোই দেখেননি। তাদের মতে, তারকাটি ঘিরে থাকা ধুলির ডিস্ক এ ধরনের ইনফ্রারেড সিগন্যাল তৈরি করছে। তবে এর সঠিক ব্যাখ্যা এখনও অজানা।
গ্রহ সাদৃশ বস্তুতে অরোরা
গ্রহসদৃশ বস্তুতে অরোরা; Image credit: Chuck Carter; NRAO/AUI/NSF/Caltech
আমাদের এই মহাবিশ্বে এমন কিছু গ্রহসদৃশ বস্তু রয়েছে যেগুলো মহাকর্ষীয় শক্তির দ্বারা তাদের মাতৃ-নক্ষত্র থেকে দূরে সরে গেছে। এগুলো অন্যান্য তারকার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। সম্প্রতি এ ধরনের বেশ কিছু বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ২০১৬ সন্ধান পাওয়া এ ধরনের একটি হচ্ছে SIMP J01365663+0933473। এটি আমাদের জানা গ্রহগুলোর আকারের মতোই। আমাদের পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব ২০০ আলোকবর্ষ। তবে এর চৌম্বকক্ষেত্র বৃহস্পতি গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র থেকে ২০০ গুণ বেশি। এটি এতটাই শক্তিশালী যে এটি অরোরা সৃষ্টি করতে পারে। পৃথিবী থেকে এর অরোরা দেখা যায় রেডিও টেলিস্কোপের মাধ্যমে।
হাউমিয়ার বলয়
বামন গ্রহ হাউমিয়াকে ঘিরে থাকা বলয়; Image credit: IAA-CSIC/UHU
যেসব গ্রহের ভর সাধারণ গ্রহের সমান কিন্তু গ্রহও নয়, উপগ্রহও নয়, সূর্যকে সরাসরি প্রদক্ষিণ করে কিন্তু কক্ষপথকে অন্যান্য বস্তু থেকে আলাদা করতে পারেনি, তাদেরকে বামন গ্রহ বলা হয়। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল ইউনিয়ন প্লুটোকে বামন গ্রহের তালিকাভুক্ত করার পর থেকে বর্তমানে মোট বামন গ্রহের সংখ্যা পাঁচ। তেমনই একটি বামন গ্রহ হচ্ছে হাউমিয়া যেটি কুইপার বেল্টে নেপচুনের বাইরে ঘুরে বেড়ায়। এটি দেখতে ডিমের মতো। এর দুটি চাঁদ রয়েছে এবং দিনের দৈর্ঘ্য মাত্র ৪ ঘন্টা। ফলে সোলার সিস্টেমের সবচেয়ে দ্রতগতির বস্তু এটি। তবে এর চেয়ে বিস্ময়কর তথ্য সামনে আসে যখন বিজ্ঞানীরা এটিকে একটি নক্ষত্রের সামনে দিয়ে প্রদক্ষিণ করতে দেখেন। সেসময় তারা দেখতে পান ডিম্বাকৃতির এই বামন গ্রহটিকে কেন্দ্র করে একটি বৃত্তাকার বলয় রয়েছে।
ডার্ক-ম্যাটারবিহীন ছায়াপথ
Image credit: NASA, ESA, and P. van Dokkum (Yale University
আমাদের এই মহাবিশ্বের খুব অল্প কিছুই আমরা দেখতে পারি। বাকি সব পদার্থই অদৃশ্য। কিন্তু এই অদৃশ্য পদার্থগুলো কেবল মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে অন্যসব পদার্থের সাথে ক্রিয়া করে। ফলে মহাকর্ষ বল ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে তাদের শনাক্ত করা যায় না। ধারণা করা হয়, মহাবিশ্বের মোট যে ভর তার পাঁচ ভাগের চার ভাগই হচ্ছে এই ডার্ক-ম্যাটার। অর্থাৎ মহাবিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ পদার্থই ডার্ক ম্যাটার। এসব পদার্থ তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ নিঃসরণ বা শোষণ কোনাটাই করে না। ফলে দূরবীক্ষণ দিয়ে এদের সরাসরি দেখা যায় না। কিন্তু এমন কোনো ছায়াপথ কি আছে যেখানে ডার্ক ম্যাটার নেই? এমন ছায়াপথের সন্ধান করতে করতে ২০১৮ সালে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের একটি দল এমন একটি অদ্ভুত ছায়াপথের সন্ধান পান যেখানে ডার্ক ম্যাটার নেই বললেই চলে। যদিও তাদের সে আবিষ্কার নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে।
বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত হাইপেরিয়ন
শনি গ্রহ; Image credit: NASA/JPL-Caltech/Space Science Institute
মহাকাশের অদ্ভুত উপগ্রহ হয়তো অনেকগুলোই আছে। কিন্ত এসবের মধ্যে অদ্ভুতুড়ে উপগ্রহটি হলো শনি গ্রহের হাইপেরিয়ন। এটি দেখতে অনেকটা আলুর মতো। এর অদ্ভুত আকৃতির জন্য একে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। এই উপগ্রহে পাথরের তুলনায় কঠিন বরফের পরিমাণ বেশি বলে ধারণা করা হয়। এটি শনি গ্রহকে কেন্দ্র করে টাইটান উপগ্রহেরও বেশি ব্যাসার্ধ নিয়ে প্রদক্ষিণ করছে। এর অরবিটাল বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত। তবে অবাক করা বিষয় হলো- এই উপগ্রহটি নিজেই বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত। ২০০৪ থেকে ২০০৭ সালে নাসার নভোযান ক্যাসিনি যখন শনি গ্রহে অনুসন্ধান চালাচ্ছিল, তখন এতে ধরা পড়ে যে শনির উপগ্রহ হাইপেরিয়ন বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত ।
আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এম. এল. হিউমাসন লাল সরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেকগুলো নাক্ষত্রিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করেন। এই পর্যবেক্ষণের সাহায্যে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেন যে, আকাশপটে দৃশ্যমান অধিকাংশ ক্ষীণ বস্তুই আসলে আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি। দেখতে স্বল্প উজ্জ্বলতার হলেও বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্রের সমন্বয়ে একেকটি গ্যালাক্সি গঠিত। খুব বেশি দূরে অবস্থান করছে বলে তাদেরকে ক্ষীণ বলে প্রতিভাত হয়।
তখন পর্যন্ত এটি পরিষ্কার যে, সমস্ত মহাবিশ্বই গ্যালাক্সি দিয়ে পরিপূর্ণ। সবচেয়ে শক্তিশালী অপটিক্যাল টেলিস্কোপ বা সবচেয়ে শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে সবচেয়ে দূরে পর্যবেক্ষণ করলেও দেখা যাবে সে অংশটি গ্যালাক্সি দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। বিস্তৃত শূন্যস্থানের মাধ্যমে এসব গ্যালাক্সি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। মহাবিশ্ব নিয়ে আলোচনার গভীরে যাবার আগে পরিষ্কার হওয়া উচিত ‘মহাবিশ্ব’ বলতে কী বোঝায়।
শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানেও আমরা গ্যালাক্সির অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছি। এমনটা মনে করা অযৌক্তিক হবে না যে পর্যবেক্ষণকৃত সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সির বাইরেও আরো অনেক গ্যালাক্সি বিদ্যমান আছে। ধারণা করা হয়, আমাদের চোখে দৃশ্যমান সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব থাকে এবং তারাও যদি টেলিস্কোপ দিয়ে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে আমাদের মতোই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে। যেদিকেই তাকাক না কেন, যত দূরেই তাকাক না কেন, সবদিকে সবখানেই গ্যালাক্সির অস্তিত্ব খুঁজে পাবে। এভাবে হিসাবকৃত সকল গ্যালাক্সির সমষ্টিকে বলা যেতে পারে ‘মহাবিশ্ব’।
চিত্র: প্রত্যেকটি বিন্দুই এক একটি স্বতন্ত্র গ্যালাক্সি; Source: NASA
উপরের বক্তব্যকে মহাবিশ্বের সংজ্ঞা বলে ধরে নিলে এখান থেকে একটি প্রশ্নের জন্ম হয়। এমন কোনো গ্যালাক্সির অস্তিত্ব থাকতে পারে কি যারা এই সমষ্টির বাইরে অবস্থিত? এই প্রশ্ন আবার মহাবিশ্বের আরেকটি বিকল্প সংজ্ঞার সাথে সাথে সম্পর্কিত- জগতে অস্তিত্বমান সকল বস্তুকে একত্রে মহাবিশ্ব বলে। সংজ্ঞা দুটির মাঝে মিল থাকলেও তারা উভয়ে এক নয়। আমরা এখানে প্রথম সংজ্ঞাটিকেই ব্যবহার করবো, কারণ দ্বিতীয় সংজ্ঞাটি কিছুটা জটিলতার জন্ম দেয়।
কিছু কিছু গ্যালাক্সি একত্রে একটি গ্রুপ তৈরি করে। এধরনের গ্রুপকে বলে ক্লাস্টার। একেকটি ক্লাস্টারে কয়েকটি থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত গ্যালাক্সি থাকতে পারে। কিছু তথ্য-উপাত্ত বলছে ক্লাস্টারগুলোও একটি আরেকটির সাথে মিলে গ্রুপ তৈরি করে। এধরনের গ্রুপকে বলা হয় সুপারক্লাস্টার। কয়েকটি সুপার ক্লাস্টার মিলে আবার আরো বড় গ্রুপ তৈরি করে কিনা? সুপার ক্লাস্টারের গ্রুপ কিংবা তার চেয়েও বড় কোনো গ্রুপের সন্ধান এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
গ্যালাক্সির অনেকগুলো ক্লাস্টার মিলে তৈরি করে সুপারক্লাস্টার, ছবিতে লানিয়াকিয়া সুপারক্লাস্টারে লাল চিহ্নিত অংশে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির অবস্থান; Image: Nature
পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গড়পড়তাভাবে মহাবিশ্বের সকল স্থানে গ্যালাক্সিগুলো সমানভাবে বণ্টিত। আমরা যদি মহাবিশ্বের দুটি অংশকে বিবেচনা করি এবং গড়পড়তাভাবে তুলনা করি তাহলে তাদেরকে একইরকম বলে মনে হবে। দুই ভিন্ন অংশে গ্যালাক্সির পরিমাণ এবং গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে গড় দূরত্ব প্রায় একই থাকবে।
হিসাব অনুসারে এক গ্যালাক্সি থেকে আরেক গ্যালাক্সির গড় দূরত্ব প্রায় এক মিলিয়ন আলোক বর্ষ। এখন আমরা যদি এই মহাবিশ্বের মাঝে একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ দৈর্ঘ্য, একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ প্রস্থ এবং একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ উচ্চতার দুটি ঘনক কল্পনা করি এবং তাদেরকে তুলনা করি তাহলে দেখা যাবে তারা প্রায় একইরকম। দেখা যাবে উভয়ের মাঝে মোট গ্যালাক্সির পরিমাণ প্রায় একই এবং গ্যালাক্সিগুলোর মাঝে গড় দূরত্বও প্রায় একই।
Source: Paolo Bottarelli
ঘনক দুটি মহাবিশ্বের যে স্থানেই অবস্থান করুক না কেন তাদের মাঝে গ্যালাক্সির বণ্টন গড়পড়তা একই হবে। এটি শুধু বর্তমান কালের জন্যই নয়, অতীত বা ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ের বেলাতেও তারা এরকম সদৃশ হবে। এখানে ‘যেকোনো সময়’-এর নামে মহাবিশ্বের গঠনবিন্যাস সম্পর্কে যে শর্তটি উল্লেখ করা হয়েছে সেটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মহাবিশ্ব পরিবর্তনশীল এবং মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানে গ্যালাক্সির সংখ্যাও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।
পাশাপাশি দূরের গ্যালাক্সির বর্তমান অবস্থা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। দূরের গ্যালাক্সি থেকে অবমুক্ত হওয়া আলো অনেক অনেক পথ অতিক্রম করে আমাদের চোখে এসে ধরা দেয়। এই দূরত্ব অতিক্রম করতে আলোর মিলিয়ন মিলিয়ন বছর লেগে যায়। বর্তমানে গ্যালাক্সিকে যেরকম দেখছি তা আসলে গ্যালাক্সির মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগের রূপ। সেসব গ্যালাক্সির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্যই নেই আমাদের কাছে।
আমাদের সাপেক্ষে গ্যালাক্সির বিন্যাস আইসোট্রপিক। এর মানে যেভাবেই পর্যবেক্ষণ করি না কেন, সবদিক থেকে গ্যালাক্সির বিন্যাস একইরকম বলে মনে হবে। আর যদি মেনে নেই মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান বিশেষ কোনো স্থানে নয়, ‘শ্রেষ্ঠ’ তকমার কোনোকিছু দখলও করে রাখছি না, আমাদের গ্যালাক্সিও অন্যান্য সকল গ্যালাক্সির মতোই সাধারণ, তাহলে আরো চমকপ্রদ কিছুর প্রত্যক্ষ করবো। তাহলে দেখতে পাবো গ্যালাক্সিসমূহের বিন্যাস মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানের সাপেক্ষেই আইসোট্রপিক। শুধু আমাদের সাপেক্ষেই নয়, মহাবিশ্বের যেকোনো কিছুর সাপেক্ষেই গ্যালাক্সিগুলো সমরূপে বিন্যস্ত। শুধু বর্তমানের কালের জন্যই নয়, অতীত ও ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ের জন্যই এটি প্রযোজ্য।
তার উপর গ্যালাক্সির বিন্যাস ও বিস্তৃতি যদি মহাবিশ্বের যেকোনো স্থান থেকেই আইসোট্রপিক হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবে দেখানো যায় যে, গ্যালাক্সিগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
গ্যালাক্সিগুলো আইসোট্রপিক; Source: phy.olemiss.edu
১৯৩০ সালের দিকে হাবল আবিষ্কার করেন দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। শুধু এতটুকুই নয়, তিনি তাদের মধ্যে সুস্থিত কিছু নিয়মবদ্ধতাও খুঁজে পান। তিনি দেখতে পান, কোনো গ্যালাক্সি আমাদের কাছ থেকে যত দূরে অবস্থিত তার অপসরণের বেগ তত বেশি। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর অপসরণের এই বেগ একটি নিয়ম মেনে চলে। একে বলা হয় হাবলের নীতি বা Hubbles’ Law।
এই নীতি বলছে যে, গ্যালাক্সির দূরত্ব কত সেটি জানলেই তার অপসরণ বেগ বের করা যাবে। দূরত্বকে বিশেষ একটি ধ্রুবক দিয়ে গুণ করলেই তার বেগ পাওয়া যাবে। বিশেষ এই ধ্রুবককে বলা হয় হাবল ধ্রুবক। এই ধ্রুবক সকল গ্যালাক্সির জন্য এবং সকল সময়ের জন্য একই থাকে।
গ্যালাক্সির অপসরণের এই ব্যাপারটিকে অন্যাভাবেও বলা যায়। গ্যালাক্সির অপসরণ বেগ তার দূরত্বের সমানুপাতিক। উদাহরণ হিসেবে দুটি গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করতে পারি। একটি গ্যালাক্সি আমাদের কাছ থেকে কোনো এক বেগে দূরে সরে যাচ্ছে। অপর গ্যালাক্সির অবস্থান প্রথম গ্যালাক্সির দ্বিগুণ দূরে। দ্বিগুণ দূরত্বে অবস্থানের কারণে তার অপসরণ বেগও হবে প্রথম গ্যালাক্সির দ্বিগুণ।
হাবলের এই নীতিটি সকল প্রেক্ষাপটে সঠিক নয়, এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যেসকল গ্যালাক্সি আমাদের নিকটে অবস্থান করছে তাদের বেলায় এই নীতি কাজ করে না। সকল গ্যালাক্সিতেই অপসরণ বেগের পাশাপাশি আরো কিছু বেগ কাজ করে। যেমন এক গ্যালাক্সির প্রতি আরেক গ্যালাক্সির আকর্ষণ বেগ। আমাদের নিকটবর্তী গ্যালাক্সিগুলোতেও এরকম কিছু বেগ ক্রিয়াশীল আছে। হয়তো এই ক্রিয়াশীল বেগ এবং অপসরণ বেগ পরস্পর কাটাকাটি হয়ে যায়, যার কারণে তারা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যায় না। এর অন্যতম একটি উদাহরণ হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এটি দূরে সরে তো যায়ই না উপরন্তু আরো কাছে ধেয়ে আসছে ধীরে ধীরে।
আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কি ওয়ের কাছে চলে আসছে প্রতিবেশী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি; Source: Pop Science
অন্যদিকে খুব নিকটের গ্যালাক্সির পাশাপাশি খুব বেশি দূরের গ্যালাক্সির বেলাতেও হাবলের নীতি কাজ করে না। কারণ, অতি-দূরের গ্যালাক্সিগুলোর বেলায় যদি হাবলের সূত্র প্রয়োগ করা হয় তাহলে দেখা যাবে এদের অপসারণ বেগও হয়ে গেছে অকল্পনীয় পরিমাণ বেশি। এতই বেশি যে এর পরিমাণ হবে আলোর বেগের চেয়েও অধিক। কিন্তু আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে কোনোকিছুই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না। বেগের এই সমস্যার অবশ্য সুরাহা আছে, তবে এই সুরাহা অনেক সূক্ষ্ম ও জটিলতাপূর্ণ।
সংক্ষেপে দেখুনহেডফোনের তারে কেন প্যাঁচ লাগে? জুতোর ফিতে কেন খুলে যায়? কারন কি এক ই?
যদি জিজ্ঞেস করা হয় “বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী গিঁট কীভাবে লাগাবেন?” তাহলে অনেকেই হয়তো অনেক পদ্ধতির কথা বলবেন। তবে এই প্রশ্নের উত্তরে বিখ্যাত কৌতুকাভিনেতা বিল মারে বলেছিলেন, “প্রথমে একটি হেডফোন পকেটে রেখে দিন, তারপর এক মিনিট অপেক্ষা করুন”। অর্থাৎ হেডফোনে লাগা প্যাঁচটাই হবে বিশ্বের সবচাইতে শক্ত গিঁট।বিস্তারিত পড়ুন
যদি জিজ্ঞেস করা হয় “বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী গিঁট কীভাবে লাগাবেন?” তাহলে অনেকেই হয়তো অনেক পদ্ধতির কথা বলবেন। তবে এই প্রশ্নের উত্তরে বিখ্যাত কৌতুকাভিনেতা বিল মারে বলেছিলেন, “প্রথমে একটি হেডফোন পকেটে রেখে দিন, তারপর এক মিনিট অপেক্ষা করুন”। অর্থাৎ হেডফোনে লাগা প্যাঁচটাই হবে বিশ্বের সবচাইতে শক্ত গিঁট।
অপরদিকে অনেকেই জুতো ব্যবহার করেন বা এই শীতে অনেকেই জুতো পরবেন। হয়তো খেয়াল করে থাকবেন, আপনি যত শক্ত করেই জুতোর ফিতে বাঁধেন না কেন, কিছুদূর হাঁটাহাঁটি করলে বা দৌড়াদৌড়ি করলে হঠাৎ করেই ফিতে খুলে যায়। এর পেছনের রহস্যটা কী?
চলুন আজ তাহলে দেখা যাক, কেন পকেটে থাকা হেডফোনের তারে আপনা আপনি প্যাঁচ লেগে যায়, অথচ শক্ত করে বাঁধলেও জুতোর ফিতে খুলে যায়?
হেডফোনের তারে প্যাঁচ লাগার কারণ
আমরা যারা গান শুনতে ভালোবাসি, তাদের জন্য হেডফোন একটি অবিচ্ছেদ্য সাথী। আর হেডফোন থাকলে হেডফোনের তারে প্যাঁচ লাগা দেখাটাও আমাদের জন্য একটা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। হেডফোন আছে অথচ হেডফোনের তারের প্যাঁচ খুলতে হয়নি এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না কোথাও। আমরা কি কখনো এ সম্পর্কে ভেবে দেখেছি কেনই বা এমনটি হয়?
ব্যাগের ভেতর নিজে নিজেই প্যাঁচ লেগে যায়; Source: s3.amazonaws.com
আমরা অনেকেই হয়তো দোষটা আমাদের উপরেই দিয়ে থাকি এটা ভেবে যে, হয়তো এলোমেলোভাবে পকেটে ঢুকিয়ে রাখার কারণে হেডফোনের তারে প্যাঁচটা লেগেছে। কিন্তু দেখবেন আপনি সুন্দরভাবে গোল করে পেঁচিয়ে পকেটে ঢুকালেও কিন্তু তারে প্যাঁচ লাগে। তো এমন হবার কারণ বের করতে বিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণাও কিন্তু করেছেন। প্রথমত তারা যে পরীক্ষা চালিয়েছেন তা হলো, তারা বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের কিছু তার একটি বাক্সে রেখে ভালভাবে ঝাঁকিয়েছেন এটা দেখতে যে তাদের মধ্যে প্যাঁচ লাগে কিনা! তারা এই পরীক্ষা একবার দু’বার করেননি, করেছেন মোট ৩,৪১৫ বার!
বিভিন্ন রকমের প্যাঁচ; Source: indiegogo.com
ডোরিয়ান এম. রেমার এবং ডগলাস ই. স্মিথ; দুজন গবেষক তাদের ‘Spontaneous knotting of an agitated string’ নামক গবেষণা পত্রে, খুব কম সময়ের মধ্যে যেকোন জটিল গিঁট লাগার দুটি মূল বিষয়ের উপরে আলোকপাত করেছেন। প্রথমটি হলো, ‘তারের তুলনামূলক দৈর্ঘ্য’ এবং দ্বিতীয়টি, ‘আলোড়ন সময়’। আলোড়ন বলতে এখানে ঝাঁকুনির ফলে তারগুলোর মধ্যে যে নড়াচড়ার সৃষ্টি হয় তা বুঝিয়েছেন।
তাদের মতে, তার যত বড় হবে এবং সেখানে আলোড়ন যত বেশি হবে, তত তারের নিজেদের ভেতর আপনা-আপনি গিঁট লাগার সম্ভাবনাও বাড়বে। প্যাঁচ লাগার ক্ষেত্রে মাঝেমাঝে তারের গুণগত মান; যেমন তারের দৃঢ়তা এবং ব্যাসও দায়ী থাকে তবে তারের দৈর্ঘ্য এবং ঝাঁকির ফলে তাদের মাঝে সৃষ্ট আলোড়নই মূলত গিঁট লাগার পেছনে বেশি দায়ী। দুর্ভাগ্যবশত, এগুলোর খুব একটা সমাধানও নেই।
তারের দৈর্ঘ্যের সাথে গিঁট লাগার সম্ভাব্যতা; Source: img.technews.tw
রেমার এবং স্মিথ তাদের পরীক্ষায় বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের তার এবং তাদের মাঝে বিভিন্ন সময়ব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে দেখেছেন। দেখা গেছে, ৪৬ সেন্টিমিটার এবং এর থেকে ছোট তারে আপনা আপনি গিঁট লাগেনি এবং লাগার সম্ভাবনাও একদম নেই। কিন্তু ৪৬ সেন্টিমিটার থেকে যত বেশি দৈর্ঘ্যের তার নেয়া হয়েছে তত তাদের মধ্যে গিঁট লাগার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। সর্বোচ্চ ২ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত তারগুলো নিজেরাই নিজেদের মধ্যে গিঁট লাগিয়েছে। ২ মিটারের বড় তারগুলো সাধারণত বেশি দৈর্ঘ্যের কারণে পকেট জুড়ে থাকে। এজন্য ঝাঁকি পেলেও নিজেদের ভেতর আলোড়িত হবার মত জায়গা পায় না, তাই এদের মধ্যে আপনাআপনি গিঁট লাগে না।
বর্তমানে প্রচলিত হেডফোনগুলো যেগুলোর গড়ে দৈর্ঘ্য ১৩৯ সেন্টিমিটার তাদের নিজেদের ভেতরে প্যাঁচ লাগার সম্ভাবনা ৫০%। অর্থাৎ আপনার পকেটসমান জায়গা আছে এমন আবদ্ধ স্থানে এরকম দৈর্ঘ্যের হেডফোন রাখলে প্রতি দুইবারে অন্তত একবার সেই হেডফোনের তারে প্যাঁচ লাগার সম্ভাবনা থেকে যায়।
মুক্ত প্রান্ত শুধু একবার নিজের ভেতর ঢুকতে পারলেই তৈরি হয়ে যাবে শক্ত গিঁট; Source: news.in.gr
রেমার এবং স্মিথ আরো দেখেছেন, Y আকারের হেডফোনগুলোয় প্যাঁচ লাগার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। কারণ এ ধরনের হেডফোনের শুধু একটি তারের মাথা নিজের ভেতর একবার ‘ডিগবাজি’ দেয়ার মতো করে ঢুকতে পারলেই জটিল প্যাঁচের সৃষ্টি করে ফেলে। দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমানে প্রচলিত সব তারের হেডফোনই দেখতে Y আকারের।
তারা তাদের পরীক্ষায় তারগুলোর মধ্যে প্রায় ১২০ রকমের গিঁটের দেখা পেয়েছেন, যেখানে অধিকাংশ গিঁটে তারগুলো নিজেদের মধ্যেই প্রায় ৭ বার করে প্যাঁচ লাগিয়েছে।
তাই এরপর থেকে কখনো পকেট থেকে হেডফোন বের করে যদি দেখেন সেটার তারগুলোয় প্যাঁচ লেগেছে, তাহলে অবশ্যই নিজেকে আর দোষ দেবেন না!
জুতোর ফিতে কেন খুলে যায়?
ফুটবল খেলায় দেখবেন মাঝে মাঝেই খেলোয়াড়রা তাদের জুতোর ফিতে ঠিক করছে। কারণ তাদের সব সময়ে দৌড়ের উপর থাকতে হয় এবং যার জন্য জুতোর ফিতের গিঁট একসময় আলগা হয়ে গিয়ে তা খুলে যায়। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়?
ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের জুতোর ফিতে খুলে যায় প্রায়ই; Source: ©gettyimages
বিজ্ঞানীরা এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে পেরেছেন। গিঁট আলগা হয়ে হঠাৎ করে জুতোর ফিতে খুলে যাবার কারণ অনুসন্ধান করতে বিজ্ঞানীরা এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে একটি প্রামাণ্যচিত্রে রূপ দিয়েছিলেন, যা সম্ভব হয়েছিলো একটি ক্যামেরাতে স্লো-মোশন ভিডিও রেকর্ডের মাধ্যমে। তাদের মতে, জুতোর ফিতে খুলে যাওয়ার পেছনে একধরনের শক্তিশালী বল দায়ী।
বাম পাশের মতো করে গিঁট দিলে ফিতে সহজে খুলবে না; Source: scontent.cdninstagram.com
পরীক্ষাটি করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রফেসর অলিভার ও’রেইলি। তিনি একটি উচ্চগতি সম্পন্ন ক্যামেরা ধার করেছিলেন। তারপর একজন দৌড়বিদকে জুতো পায়ে একটি ট্রেডমিলে দৌড়াতে বলেছিলেন। তিনি সেই দৌড়টা ভিডিও করেছেন। এ সম্পর্কে ও’রেইলি বলেন, “বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করার পরও কিছু ঘটলো না, তারপর হঠাৎ করেই একসময় ঘটে গেলো ব্যাপারটা! জুতোর ফিতে দুটো খুলে গেলো আপনা-আপনি। এতো দ্রুত ঘটে গেলো পুরো ব্যাপারটা যে আমরা এতে খুব অবাকই হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা আরও উৎসাহিত হলাম এর পেছনের কারণটা বের করার জন্য।”
ফিতে বাঁধার প্রচলিত গিঁট; Source: dbstatic.no
দৌড়ের ফলে কীভাবে জুতোর ফিতে খুলে গেলো সেটা বের করার জন্য তিনি একটি এক্সেলেরোমিটার ব্যবহার করলেন। সেটার সাহায্যে জুতোর উপর জি-ফোর্স বা মহাকর্ষীয় বল পরিমাপ করে দেখলেন। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, জুতোর ফিতের সেই গিঁটের উপর যে মহাকর্ষীয় বল কাজ করছিলো, তা ৭ জি-এরও বেশি। ৭ জি কেমন শক্তিশালী বল সেটা বুঝাতে হলে পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী রোলার-কোস্টার, জোহানসবার্গের ‘দ্য টাওয়ার অব টেরর’ এর কথা বলা যেতে পারে। যেটি সর্বোচ্চ ৬.৩ জি মহাকর্ষীয় বল সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ এর থেকে জুতোর ফিতের উপরে কাজ করা বলের পরিমাণই ছিল বেশি!
এ থেকে বোঝা যায়, যত দৌড়ানো হয়, মহাকর্ষীয় বলের প্রভাব তত জুতোর ফিতে ও তার গিঁটের উপর গিয়ে পড়ে। এই প্রবল বলের প্রভাবে একসময় ফিতের গিঁট আলগা হয়ে যায়। পাশাপাশি, দৌড়াতে থাকলে ফিতে দু’টির মুক্ত প্রান্ত বার বার উপরে-নিচে এবং সামনে-পেছনে ঝাঁকি খেতে থাকে। মহাকর্ষীয় বল এবং এই ঝাঁকির ফলে ফিতে দুটির মুক্ত প্রান্তে একধরনের গতির সৃষ্টি হয়। এই গতিই ফিতে দুটির মাথায় এক অদৃশ্য হাতের কাজ করে, যা ফিতে দুটির মুক্ত প্রান্ত টেনে ধরে; ফলাফলস্বরূপ ফিতে দুটি পুরোপুরিভাবে খুলে যায়।
সংক্ষেপে দেখুননিশীথ সূর্যের দেশ শুধুই কি নরওয়ে?
কল্পনা করুন তো, গভীর রাত। সুনসান নীরবতা চারদিকে। আপনি কোনো কারণে বাইরে বের হয়ে দেখতে পেলেন সূর্যটা ডুবে না গিয়ে ঝুলে আছে দিগন্তে। সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত কমলা আলোকরশ্মিতে আলোকিত হয়ে আছে দিগন্ত। অপার্থিব সেই আলোর আভায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে প্রকৃতি, চারপাশ। মধ্যরাতের সেই সূর্যের আলোয় আপনি পথে হাঁটছেন! অবিশ্বাবিস্তারিত পড়ুন
কল্পনা করুন তো, গভীর রাত। সুনসান নীরবতা চারদিকে। আপনি কোনো কারণে বাইরে বের হয়ে দেখতে পেলেন সূর্যটা ডুবে না গিয়ে ঝুলে আছে দিগন্তে। সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত কমলা আলোকরশ্মিতে আলোকিত হয়ে আছে দিগন্ত। অপার্থিব সেই আলোর আভায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে প্রকৃতি, চারপাশ। মধ্যরাতের সেই সূর্যের আলোয় আপনি পথে হাঁটছেন! অবিশ্বাস্য, তাই না? মধ্যদিবসের সুনীল আকাশে প্রজ্জ্বলিত সূর্য দেখতেই আমরা অভ্যস্ত। সেই আমাদেরকে যদি মধ্যরাতের অন্ধকার আকাশে জ্বলন্ত সূযের কথা বলা হয় তাহলে চোখ কপালে উঠতেই পারে।
কিন্তু গভীর নিশীথে সূর্যের দর্শন কোন অবাস্তব বা অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা নয়। ‘নিশীথ সূর্য (Midnight Sun)’ একটি অত্যাশ্চর্য প্রাকৃতিক ঘটনা। এক্ষেত্রে সূর্য দিনশেষে দিগন্তের ওপারে টুপ করে হারিয়ে যায় না, দিগন্তে স্থির থাকে। মানে এই ঘটনায় সাধারণত দিনের ২৪ ঘন্টাই সূর্যের আলো পাওয়া যায়। কখনো যদি সূর্য ডোবেও, তাহলে সেটা মাঝরাতে। ভোরে আবার সূর্য উদিত হতে দেখা যায়। নিশীথে সূয্যিমামার দেখা পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে ইউরোপের দেশ নরওয়েতে।
নরওয়ের নিশীথ সূর্য; Source: pinterest
আমাদের অনেকেরই জানা আছে নিশ্চয়ই, নরওয়েকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বলা হয়। উত্তর নরওয়েতে প্রতিবছর গ্রীষ্মকালের কিছু সময়ে মাঝরাত্রেও সূর্য দেখা যায় বলেই এই আজব উপনামটি জুটেছে দেশটির কপালে ।
নরওয়েই কি একমাত্র ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’?
মানুষ শুধু নরওয়েকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ হিসেবে চিনলেও পৃথিবীতে আরো অনেক স্থান আছে যেখানে সূর্য সারারাত জেগে থাকে। আসলে সুমেরুবৃত্ত (উত্তর মেরু থেকে ২৩.৫ ডিগ্রী অক্ষাংশ দূরে আঁকা একটি কাল্পনিক রেখা) থেকে উত্তরে অবস্থিত এবং কুমেরুবৃত্ত (দক্ষিণ মেরু থেকে ২৩.৫ ডিগ্রী অক্ষাংশে কল্পিত রেখা) থেকে আরো দক্ষিণে অবস্থিত স্থানগুলোতে গ্রীষ্মকালে অস্ত যায় না। এজন্য এই জায়গাগুলোতে স্থানীয় সময় যখন মধ্যরাত, তখনও আকাশের দিকে তাকালে সূর্য দেখতে পাওয়া যায়। কুমেরুবৃত্তের পরে গবেষকদের তাঁবু ছাড়া আর কোনো জনবসতি নেই। তাই আমরা সেই এলাকার কোনো জায়গার কথা জানি না। তবে সুমেরুবৃত্ত পেরিয়ে গেলে অনেক জায়গা আছে যেখানে লোকবসতি আছে। আমরা জানবো সেই স্থানগুলোর কথা।
সুইডেনের সূর্যালোকস্নাত রাত; Source:Sofia wellness journeys
উত্তর মেরুর আগে, সুমেরুবৃত্তের পর আছে কানাডার বেশ কিছু এলাকা- আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, গ্রীনল্যান্ড, রাশিয়ার কিছু অংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা।
ফিনল্যান্ডের নৈশ সূর্য ; Source:indrashishghosh.com
ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে উত্তরের স্থানে প্রায় দুই মাস সূর্য অস্ত যাওয়ার কথা ভাবেও না। আর ইউরোপের সর্বউত্তরের লোকবসতি নরওয়ের ভালবার্দ দ্বীপপুঞ্জে মোটামুটি ১৯ এপ্রিল থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সূর্যমামা দিগন্তে গা এলিয়ে বিশ্রাম নেন।
নর্থ কেপ, নরওয়েতে রাতের সূর্য দেখার ভীড়; Source: nordic travel
তাহলে, দেখা যাচ্ছে নরওয়ে ছাড়াও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সবগুলো দেশ, এমনকি স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বাইরের অনেক এলাকায় নিশীথ সূর্যের দেখা মেলে। ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই মূলত নরওয়েতে এই আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। নরওয়ের অধিবাসীরা রাতে সূর্য দেখে আর আমরা দিনে দেখি। নরওয়ের গ্রীষ্মকালটা হয় দারুণ সুন্দর। কড়া রোদে বরফ গলে হিমবাহ বয়ে যায়, পাহাড়ি ঝর্ণারা গান গায়। রঙ-বেরঙের ফুলে রঙিন হয়ে ওঠে প্রকৃতি। যেহেতু এ সময় সূর্য ডোবে না। তাই চাইলে সারাদিনই আপনি ঘুরে বেড়াতে পারবেন। গ্রীষ্মে নরওয়েতে ‘মিডনাইট সান’ নামক উৎসবের আয়োজন করা হয়।
আচ্ছা, নিশ্চয়ই আপনার সাথে এমন ঘটনা ঘটেছে যে দিনে কোনো উৎসবে গিয়েছেন, কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় বাসায় চলে আসতে হয়েছে। তখন আফসোস করে ভেবেছেন, দিনটা যদি শেষ না হতো! আপনার এই ইচ্ছা পূরণ হতে পারেন নরওয়েতে! এখানে যেহেতু সূর্য ডোবে না, প্রাকৃতিকভাবে রাত হয় না। তাই এখানেই কেবল সম্ভব অফুরন্ত দিবস উৎসব। ‘মিডনাইট সান ফেস্টিভ্যাল’ হচ্ছে এমনই একটি উৎসব। এই সময় নরওয়ে থাকে উল্লাসে পরিপূর্ণ। তবে কি নরওয়ের মানুষজন ঘুমায় না? ঘুমায় তো। এখানে রাত হয় ঘড়ির কাঁটায়। কাজকর্ম চলে ঘড়ি ধরে। কারণ আবহাওয়া আর সূর্য দেখে সময় বোঝার উপায় থাকে না। আর রাতে সূর্য আসলে কতটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তা নির্ভর করে আবহাওয়া, কুয়াশা, আকাশের মেঘ প্রভৃতি বিষয়গুলোর উপর।
নিশীথ সূর্য দীর্ঘসময় থাকলে
আমরা জেনেছি, দুই মেরু থেকে অগ্রবর্তী এলাকায় বছরের বিশেষ সময়ে মধ্যরাতে সূর্য দেখতে পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি মেরুর কাছাকাছি বা মেরুতে যাওয়া যায় তাহলে কী ঘটবে? সুমেরু বা কুমেরুবৃত্ত থেকে যতই মেরুর কাছাকাছি যাওয়া যায় ততই দীর্ঘদিন ধরে মাঝরাতে সূর্য দেখতে পাওয়া যায়। উত্তর বা দক্ষিণ মেরুতে সবচেয়ে বেশিদিন রাতে সূর্য আলো দেয়। আর এই সময়টা হচ্ছে ছয় মাস। এই ব্যাপারটিকেই বলা হয় মেরুদিবস। মেরুর বরফঢাকা প্রান্তরে কমলা রঙের বলের মতো সূর্য দিগন্তে ঠায় দাড়িয়ে থাকে যেন কার অপেক্ষায়।
দক্ষিণ মেরুতে সূর্যরাঙা রাত; Source: twanight
ক্ষীণ অন্ধকারে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে নানা আকৃতির বরফখন্ডের আনাচে-কানাচে। অপার্থিব সুন্দর হয়ে প্রতিভাত হয় সেই দৃশ্য! সেই সাথে রহস্যময়ও বটে! একসময় সূর্যের অপেক্ষার পালা শেষ হয়। আসে মেরুরাত্রি। দীর্ঘ ছয় মাস অন্ধকারে ডুবে থাকে মেরু। সময় বয়ে চলে। আবার সূর্য ওঠে। তাহলে বলা যায়, নরওয়ের নিশীথ সূর্য মেরুদিবসের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ মাত্র।
শুভ্র রাত্রি (White night)
রাতে তো থাকে অন্ধকারের রাজত্ব। চন্দ্র বা নক্ষত্রের আলো না থাকলে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই রাত কিভাবে সাদা হতে পারে? অবাস্তব শোনাচ্ছে, তাই না? সাদা রাত্রি বা হোয়াইট নাইট আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্য না ঠেকলেও নিশীথ সূর্যের মতোই এটিও একটি বাস্তব ঘটনা। একটি প্রাকৃতিক বিস্ময়। সুমেরুবৃত্ত বা কুমেরুবৃত্ত থেকে কিছুটা আগে, নিরক্ষরেখা থেকে ষাট ডিগ্রী চৌত্রিশ মিনিট অক্ষাংশের একটু পরে অবস্থিত স্থানগুলোতে গ্রীষ্মকালে মধ্যরাতে সূর্য না দেখা গেলেও মধ্যরাতে গোধূলীর (Midnight Twilight) দেখা মেলে। এ স্থানগুলো দিগন্ত থেকে ৬ বা ৭ ডিগ্রী নিচে থাকে। এই জায়গাগুলোতে সারারাত গোধূলীর আকাশের মতো মৃদু সূর্যের আলো থাকে। এ আলোয় পড়াশোনা বা দিনের অন্যান্য কাজ করা যায়। রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গ সাদারাত্রির জন্য বিখ্যাত।
সেইন্ট পিটার্সবার্গের শ্বেতরজনী; Source: private russia
বছরের ১১ জুন থেকে ২ জুলাই সময়টাতে এখানে স্থানীয় সময় যখন মাঝরাত, তখন গোধূলী প্রত্যক্ষ করা যায়। জুন মাসের শেষ ১০ দিন এখানে বিশেষ আয়োজন থাকে, নাম White Night Festival। হোয়াইট নাইট ফেস্টিভ্যালে নানারকম জমকালো উৎসবের আয়োজন করা হয়।
হোয়াইট নাইট ফেস্টিভ্যাল,সেইন্ট পিটার্সবার্গ; Source: lonely planet
এ উপলক্ষ্যে আকাশে চোখ ধাঁধানো আতশবাজির প্রদর্শনী চলে। আর রক্তলাল রঙের পালতোলা নৌকা নানা রঙের আলোয় সাজিয়ে পানিতে ভাসানো হয়।
চোখধাঁধানো সাজের স্কারলেট সেইল; Source: saintpetesburg.com
এ সময়টাতে স্কুলের শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়ায় নিশ্চিন্তে আনন্দে মাতে ছেলেমেয়েরা। উচ্ছ্বাস-আনন্দে বিভোর থাকে সেন্ট পিটার্সবার্গ।
নিশীথ সূর্যের ঘটনা কেন ঘটে?
আসলেই কৌতুহলউদ্দীপক ব্যাপার, তাই না? মাঝরাতে সূর্য! এমনটা হয় কেন? সূর্যটা ডোবে না কেন? তবে কি সূর্য ডুবতে ভুলে যায়? উত্তরটা জানি চলুন। আমরা জানি, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে পশ্চিম-পূর্বে আবর্তন করছে। আবর্তন করার সময় পৃথিবী নিজ অক্ষের উপর একটু হেলে থাকে। একটু বলতে পৃথিবী এর মেরুরেখার সাথে ২৩.৫ ডিগ্রী কোণ করে হেলে থাকে। কখনো হেলে থাকে উত্তর গোলার্ধের দিকে, কখনো দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে। যখন যে গোলার্ধ সূর্যের দিকে থাকে সেই গোলার্ধে সূর্যরশ্মি খাড়াভাবে পড়ে এবং দীর্ঘসময় সূর্যের আলো পাওয়া যায়। ফলে দিন বড় হয়, রাত ছোট হয়। অক্ষাংশ যত বেশি হয় দিন তত বড় হয়। সূর্যের গ্রীষ্মকালীন উত্তরায়নের বা দক্ষিণায়নের সময় অনেক বেশি অক্ষাংশে অবস্থিত জায়গাগুলোতে গ্রীষ্মকালে সূর্য অস্ত যায় না।
তখন মেরু থেকে ১০০ কি.মি. এর মধ্যে অবস্থিত জায়গাগুলোতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত টানা সূর্যাস্ত ঘটে না, আর মেরুতে ছয় মাস। এর বিপরীত ঘটনা ঘটে শীতকালে। মেরুতে পূর্ব দিগন্তে উঁকি দিতেই পারে না ছয় মাস পর্যন্ত। আর মেরুর আগের স্থানগুলোতে কয়েক সপ্তাহ টানা রাত থাকে। উত্তর মেরুতে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর টানা ছয় মাস দিন থাকে আর এ সময় দক্ষিণ গোলার্ধে টানা ছয় মাস থাকে রাত। আর দক্ষিণ গোলার্ধে যখন দিন তখন উত্তর গোলার্ধে রাত। এই এতসব আশ্চর্য ঘটনার কারণ একটাই, পৃথিবীর হেলে থাকা। এজন্যই পৃথিবী ঋতু বৈচিত্র্যের কল্যাণে একেক রুপে সাজে, এজন্যই নিশীথ সূর্য বা নিশীথ গোধূলীর মতো বিস্ময়কর ঘটনার অবতারণা ঘটে।
সংক্ষেপে দেখুনআপনার রক্তের গ্রুপ অনাগত সন্তানের মৃত্যুশঙ্কার কারণ হতে পারে, কিন্তু কিভাবে?
মানুষের জন্মের এমন একটি পরিস্থিতি নিয়ে আজকের লেখায় আলোচনা করা হবে, যেটি জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলেও অনেকেই জানেন না। আমাদের দেশে বিয়ের সময় দুই পক্ষের অনেক কিছুই পরস্পরের বোঝাপড়ার বিষয় হয়ে থাকে, কিন্তু এই ব্যাপারটি উপেক্ষিত হয় সবসময়। শুরুতেই জানা যাক লেখার সেই মূল বিষয়টি- স্বামী-স্ত্রীবিস্তারিত পড়ুন
মানুষের জন্মের এমন একটি পরিস্থিতি নিয়ে আজকের লেখায় আলোচনা করা হবে, যেটি জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলেও অনেকেই জানেন না। আমাদের দেশে বিয়ের সময় দুই পক্ষের অনেক কিছুই পরস্পরের বোঝাপড়ার বিষয় হয়ে থাকে, কিন্তু এই ব্যাপারটি উপেক্ষিত হয় সবসময়। শুরুতেই জানা যাক লেখার সেই মূল বিষয়টি- স্বামী-স্ত্রীর রক্তের একটি কম্বিনেশনে সন্তানের জন্ম হতে পারে মারাত্মক প্রাণঘাতী জন্ডিস রোগ নিয়ে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে বলা হয় ইরাইথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস (Erythroblastosis Fetalis)।
মায়ের রক্ত নেগেটিভ আর গর্ভের সন্তানের রক্ত পজিটিভ; Source: http://www.medindia.net
এই রোগটি সন্তানে কেবল তখনই হয়, যখন পিতার রক্ত হয় পজিটিভ গ্রুপের, আর মায়ের রক্ত নেগেটিভ গ্রুপের। Rh Factor-এর রক্তে উপস্থিতি-অনুপস্থিতির ভিত্তিতে এই পজিটিভ-নেগেটিভ নির্ণয় করা হয়ে থাকে। Rh Factor উপস্থিত থাকলে রক্তটি পজিটিভ গ্রুপের, অনুপস্থিত থাকলে রক্তটি নেগেটিভ। পজিটিভ রক্তবাহী স্বামী ও নেগেটিভ রক্তবাহী স্ত্রী ব্যতীত অন্য কোনো ক্ষেত্রে সমস্যাটি দেখা দেয় না। তাছাড়া আমাদের দেশে নেগেটিভ রক্তবাহী খুবই কম, নারীর ক্ষেত্রে সেই হিসেব আরো কমে আসে। তাই না জেনে বিয়ে করলেও দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই পজিটিভ রক্তবাহী। আমাদের দেশের মানুষের জন্য বিষয়টি শাপে-বর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যেহেতু সচরাচর চোখে পড়ে না মানুষের মাঝে রোগটি, আমরা রয়ে যাই অজ্ঞতার মাঝে। আমাদের আর জানা হয়ে উঠে না, আমাদেরই অবিবেচনায় সন্তানের শরীরে দেখা দিতে পারে প্রাণঘাতী এক রোগ, এই রোগ নিয়েই সে জন্মায়, আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেখানে তাকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। সন্তানের শরীরের পুরো রক্ত বদলে দিয়ে যদিও বাঁচানো সম্ভব, আপনিই ভেবে বলুন, এমন জটিল পদ্ধতি আপনার সন্তানের জন্য বেছে নেবেন কিনা। চিকিৎসা বিজ্ঞান চিকিৎসা বাতলে দিয়েছে, সমাধান দিয়েছে। তবে এই সমাধানের চেয়ে প্রতিরোধ করে নেওয়াটাই সর্বোত্তম।
এই রোগের ব্যাপারটি বুঝতে হলে আপনাকে বুঝতে হবে অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি বিষয়গুলো। এগুলো আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত। একজন মানুষের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক শক্তিশালী। আমরা প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ জীবাণু আর ধুলাবালি নাক-মুখ, হাত, খাবার, কিংবা পানির মাধ্যমে গ্রহণ করে থাকি, আমাদের এতদিন পর্যন্ত বাঁচা সম্ভব হতো না যদি শরীরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকতো। আমাদের যে সামান্য জ্বর হয়, যাকে আমরা রোগ বলে জানি, এটি আসলে রোগ নয়, রোগের লক্ষণ। শরীরের তৃতীয় এবং সর্বশেষ স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর একটি হলো এই জ্বর। জ্বর হলো শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে জীবাণুগুলো ধ্বংস করার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। প্রতিরক্ষার ব্যাপারে বিস্তারিত বলা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তবে আজকে যে রোগটি নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি তা পুরোপুরি বুঝতে হলে অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি ব্যাপারগুলো নিয়ে ধারণা থাকা প্রয়োজন।
এই রোগটি সন্তানে কেবল তখনই হয়, যখন পিতার রক্ত হয় পজিটিভ গ্রুপের, আর মায়ের রক্ত নেগেটিভ গ্রুপের; source: hotelwkrakowie.info
শরীরের কোনো অংশ কিংবা অঙ্গ হলো শরীরের নিজস্ব সম্পত্তি। আপনি কারো শরীরের একটি কিডনি সরিয়ে অন্য কারো থেকে কিডনি নিয়ে বসিয়ে দিলেন। কিডনি তো কিডনি, তার তো আর বোধশক্তি নেই, সে কীভাবে বুঝবে তাকে অন্য শরীরে নেওয়া হয়েছে, সে তার মতো করে কাজ করে যাবে। কিন্তু কাজে বিঘ্ন ঘটাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি। দেহের T-lymphocyte তাকে শনাক্ত করে ফেলবে যে, এই বস্তু এই শরীরের নয়। তখন সেটি অ্যান্টিবডি সিস্টেমকে সজাগ করে তুলবে। অ্যান্টিবডি সিস্টেমকে নির্দেশ দেওয়াই আছে, কোনো বস্তুকে নিজস্ব সম্পত্তি বলে শনাক্ত না করা গেলেই সেটিকে ধ্বংস করে ফেলার উদ্যোগ নিতে হবে। শরীরে জীবাণু প্রবেশ করলে এভাবেই ব্যবস্থা নেয় অ্যান্টিবডি। এখন অ্যান্টিবডি কীভাবে বুঝবে যে, তার ভালোর জন্যেই খারাপ কিডনী পাল্টে ভালো কিডনী রাখা হয়েছে শরীরে, সে তো তার দায়িত্ব পালন করে যাবে।
শরীরে বাইরে থেকে যা প্রবেশ করলো কিংবা প্রবেশ করানো হলো, জীবাণু হোক অথবা কোনো অঙ্গ, তারা হলো অ্যান্টিজেন। অ্যান্টিবডি অ্যান্টিজেনকে শনাক্ত করা মাত্রই আর বাঁচতে দেবে না।
এই অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডির সংঘর্ষেই তৈরি হয় Erythroblastosis Fetalis নামক রোগটি। বিষয়টি পুরোটাই রক্তের সাথে সম্পর্কিত।সন্তানের দেহে এই রোগ তৈরি হবে কিনা, তা নির্ভর করে পিতা-মাতার রক্তের গ্রুপের উপর। রক্তের গ্রুপগুলো তৈরি করে রক্তে অবস্থানকারী কিছু অ্যান্টিজেন। কথা উঠতে পারে যে, তাহলে এই অ্যান্টিজেনগুলো অবস্থান করে কীভাবে। সেটা অন্য ব্যাপার; সংক্ষেপে বলা যায়, শরীরের কিছু নিজস্ব অ্যান্টিজেন রয়েছে, যা মানুষে মানুষে ভিন্নরূপে থাকে, এগুলোকে শনাক্ত করে মনে রাখাটাও T-lymphocyte-এরই কাজ।
মায়ের রক্তে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি গর্ভের সন্তানের রক্তে প্রবেশ; Source: citybeauty.info
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, পিতা-মাতার মাঝে যেকোনো একজন পজিটিভ রক্তবাহী হলেই সেটি সন্তানের রক্তে সঞ্চালিত হবে। এই কারণটিই সন্তানের রক্তে জটিলতা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। একজন নেগেটিভ রক্তবাহী নারীর অবশ্যই উচিৎ একজন নেগেটিভ রক্তবাহী পুরুষকে বিয়ে করা। কেবলমাত্র তখনই সন্তানের রক্ত সম্পর্কিত কোনো রোগের ঝুঁকি থাকে না। নেগেটিভ রক্তবাহী নারী যদি পজিটিভ রক্তবাহী পুরুষকে বিয়ে করে, তাহলে সন্তানের রক্তে জটিলতাটি দেখা দেয়। উল্টোটা যদি হয়, মানে পুরুষ নেগেটিভ, নারী পজিটিভ, তবে কোনো ভয় নেই। কেননা সন্তান থাকে মাতৃগর্ভে। সন্তানের রক্ত পজিটিভ গ্রুপের, মায়ের রক্তও পজিটিভ, এখানে অ্যান্টিবডি সিস্টেম কিছুই করতে পারবে না। কেননা সন্তানের রক্তে যেমন পজিটিভ সৃষ্টিকারী অ্যান্টিজেন রয়েছে, তা মায়ের রক্তেও রয়েছে। সুতরাং অ্যান্টিবডি সিস্টেম এখানে পার্থক্য করতে পারবে না।
অ্যান্টিবডি সিস্টেম তখনই কার্যকর হয়, যখন সে কোনো অ্যান্টিজেনের উপস্থিতি টের পায়। ধরা যাক, পিতার রক্ত পজিটিভ আর মায়ের রক্ত নেগেটিভ হওয়াতে সন্তানের রক্ত পজিটিভ। পজিটিভ রক্ত নিয়ে সন্তান মাতৃগর্ভে অবস্থান করে আছে। মায়ের সাথে সন্তানকে যুক্ত করে Placenta, Umbilical Cord দিয়ে। এই Umbilical Cord একপ্রান্তে মায়ের Placenta-তে আর অপরপ্রান্তে সন্তানের Umbilicus অর্থাৎ নাভীর সাথে যুক্ত থাকে। এটাই মাতৃগর্ভে আমাদের সবার পরিবহন ব্যবস্থা। মায়ের শরীর থেকে রক্ত-পুষ্টি সবই সন্তানে আসে এর দ্বারা। এখন এই অবস্থায় মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে আসা রক্ত যদি পুনরায় ফিরে যায় মায়ের প্রবাহে, তখনই বিপত্তি বাঁধে, এমনটা হয় সাধারণত সন্তান জন্মের সময়তেই।
রক্তের লোহিত কণিকা মূলত প্রধান পরিবাহক রূপে কাজ করে থাকে; Source: wallpaperscraft.com
প্রত্যেক জীবিত প্রাণীর শরীরে সবকিছু পরিবহনের দায়িত্ব পালন করে থাকে রক্ত। মা ও সন্তানে যোগাযোগ রক্ষা করে তাদের দু’জনের রক্ত। মায়ের রক্ত যখন নেগেটিভ আর সন্তানের রক্ত পজিটিভ, তখন মায়ের রক্ত সন্তানের রক্তে খাবার নিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসবে এক নতুন অ্যান্টিজেনের তথ্য নিয়ে। অ্যান্টিবডি সিস্টেম কিন্তু এটা সহ্য করবে না। সেই অ্যান্টিজেনকে হত্যা করতে উপযুক্ত অ্যান্টিবডি তৈরিতে হাত দেবে। এটাই একমাত্র কারণ এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথম সন্তানটির কোনো ক্ষতি না হওয়ার। কেননা পূর্ব থেকে অ্যান্টিবডি সিস্টেমের জানা নেই যে, এমন পজিটিভ কোনো অ্যান্টিজেন থাকতে পারে। সে অ্যান্টিজেনের সংস্পর্শে গিয়েই তবে চিনতে পারে, সাথে সাথে উপযুক্ত হত্যাকারী অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শুরু করে। প্রথম সন্তানের অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করা কিছু সময়সাপেক্ষ ও ধীরগতির ব্যাপার। কিন্তু একই অবস্থায় দ্বিতীয় সন্তান হলে তখন কিন্তু আর অ্যান্টিবডি প্রস্তুতের প্রয়োজন নেই, অ্যান্টিবডি আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখা আছে।
মানুষের এমন কিছু রোগ হয়, যেগুলো জীবনে একবার হলে আর হয় না। এমন অনেকগুলো রোগের নাম আপনারাই বলতে পারবেন। এই রোগগুলো শরীরে দেখা দিলে, অ্যান্টিবডি সিস্টেম উপযুক্ত অ্যান্টিবডি তৈরি করে সেই রোগগুলোকে প্রতিহত করে। সেই সাথে রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুগুলোকেও চিনে রাখে ভালোমতো। পরের বার এদের উপস্থিতি শরীর টের পেলেই ধ্বংস করে দেয়, কারণ অ্যান্টিবডি আগে থেকেই যে তৈরি হয়ে আছে।
প্রথম সন্তান গর্ভে থাকাকালীন মায়ের রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, সেই অ্যান্টিবডি মায়ের রক্ত হয়ে দ্বিতীয় রক্তে প্রবেশ করছে; Source: nursetecmilenio.blogspot.com
যে রোগটি নিয়ে আজকের লেখা, ফিরে আসি সেটির ব্যাপারে। রোগটি মূলত নবজাতকের দেহে জন্ডিস আর অ্যানিমিয়ার সংমিশ্রণ। মানুষের শরীরের রক্তে লোহিত কণিকা রয়েছে, এগুলোর কারণেই রক্ত লাল দেখায়। লোহিত কণিকা যদি পরিমাণে স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে, তখন তাকে অ্যানিমিয়া বলা হয়। ইরাইথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিসের ক্ষেত্রেও লোহিত কণিকা কম থাকে। মা-সন্তানের পজিটিভ-নেগেটিভ জটিলতায় সন্তানের রক্তের লোহিত কণিকাগুলো ভাঙতে শুরু করে। লোহিত কণিকার ভেতর হিমোগ্লোবিন অবস্থান করে। হিমোগ্লোবিনগুলো মুক্ত হয়েই বিলিরুবিনে পরিবর্তিত হয়ে যায়। আর এই বিলিরুবিনের উপস্থিতি কীভাবে বোঝা যায়, সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই আপনাদের জানা আছে। বিলিরুবিনের রং হলুদ, তাই এটি ত্বকের নিচে যখন জমা হয়, ত্বক কিংবা চোখ হলুদ দেখি আমরা। বিলিরুবিনের উপস্থিতিতে হলুদ রঙের আবির্ভাবই কিন্তু জন্ডিস রোগ। মা-বাবার রক্তসংক্রান্ত জটিলতায় সন্তানটি মারাত্মক প্রাণঘাতী জন্ডিস রোগ নিয়ে জন্ম নেয় এভাবে। এই রোগ হলে অধিকাংশ সময়েই বাচ্চাকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। যদি সন্তান মাতৃগর্ভে থাকাকালীন টের পাওয়া যায় সন্তানে জন্ডিসের আবির্ভাব ঘটেছে, তখন বাচ্চাটিকে নির্দিষ্ট সময়ের যতটুকু পূর্বে সম্ভব ডেলিভারির ব্যবস্থা করা হয়, জন্মের পর তাকে বাঁচাতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাতৃগর্ভে অবস্থানকারী একটি সন্তানের Viable Age হলো আটাশ সপ্তাহ। অর্থাৎ আটাশ সপ্তাহের পূর্বে সন্তান জন্মালে সেই সন্তানকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।
গর্ভবতী অবস্থায় যদি একজন নেগেটিভ রক্তবাহী নারী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, চিকিৎসক প্রথমেই রক্ত পরীক্ষা করতে চাইবেন। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে, পূর্ববর্তী সন্তান জন্মদানের কারণে রক্তে অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি রয়েছে কিনা। নারীর রক্তে যদি চিকিৎসক এই অ্যান্টিবডি খুঁজে পান, তবে তিনি বুঝে নেবেন, উনার বর্তমান সন্তান মৃত্যুঝুঁকির মাঝে রয়েছে, অতিসত্ত্বর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। মাতৃগর্ভে অবস্থানকারী সন্তানকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফিটাস বলা হয়। ফিটাসের আটাশ সপ্তাহ পূর্ণ হলে, মায়ের রক্তে Rh Immunoglobulin ইনজেকশন দেয়া হয়। মায়ের শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টি-Rh-কে প্রতিহত করে এই ইনজেকশন। সন্তান জন্মের পর ৭২ ঘণ্টার মাঝে আবারো এই ইনজেকশন প্রদান করা হয়, এটি দেওয়া হয় নিশ্চিতকারকরূপে। কারণ সন্তান জন্মদানের সময় Umbilical Cord কাটার কারণে রক্তক্ষরণ হয়, তখন যেন মায়ের রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি না হতে পারে তাই ইনজেকশন আবার দেওয়া হয়।
ইরাইথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস এর লক্ষণ; source: medindia.net
আর একটি ফিটাসের যদি Viable Age এর আগেই অ্যানিমিয়া দেখা দেয়, তখন ফিটাসের শরীরে রক্ত সঞ্চালন করা হয়। হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি এমন প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো গঠিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা হয়। এগুলো গঠিত হলেই ফিটাসের নির্দিষ্ট সময় পূর্বেই ডেলিভারি করা হয়।
সন্তানকে বাঁচাতে সর্বশেষ যে চিকিৎসা দেওয়া হয়, তা হলো শরীরের রক্ত পরিবর্তন। আগেই বলা হয়েছে, প্রথম সন্তানটি কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হয় না এক্ষেত্রে। দ্বিতীয় সন্তানটি যদি প্রচণ্ড মাত্রায় জন্ডিস নিয়ে জন্মায়, পুরো শরীর হলুদ হয়ে থাকবে তার, দেখেই বোঝা যাবে। সেই সন্তানের রক্ত পজিটিভ গ্রুপের, প্রতিনিয়ত লোহিত কণিকা ভেঙে যাচ্ছি অ্যান্টিবডির উপস্থিতিতে। এমতাবস্থায় শিশুটিকে বাঁচাতে এক জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। শরীর সমস্ত রক্ত বের করে নেগেটিভ রক্ত দিয়ে পূর্ণ করা হয়; তবু যদি বাঁচানো যায়। সম্পূর্ণ রক্ত একেবারে বের করা হয় না, অল্প অল্প রক্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে এই অসাধ্য সাধন করা হয়। এছাড়াও বেশ কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় সন্তানটি যদি প্রচণ্ড মাত্রায় জন্ডিস নিয়ে জন্মাতে পারে; source: citybeauty.info
মায়ের শরীরে যদি একবার অ্যান্টি-Rh উৎপন্ন হয়ে যায়, তাহলে Rh Immunoglobulin ইনজেকশন কোনো কাজে আসবে না। এটাই প্রথম চিকিৎসা, এর মাধ্যমে প্রতিহত করা মঙ্গলজনক। তাই স্বামী-স্ত্রীর রক্ত যদি এই পজিটিভ-নেগেটিভ কম্বিনেশনের হয়ে থাকে, তবে প্রথম থেকেই চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নিন।
দিন যতই যাবে, বিজ্ঞান নিত্য-নতুন পদ্ধতি উপহার দেবে আমাদের। একসময় এর সমাধান ছিলো না, সন্তান তীব্র জন্ডিসের কারণে জন্মের পর পরই মারা যেত কিংবা মায়ের গর্ভপাত হয়ে যেত। এখন সমাধান এসেছে এই জটিল রোগের। বলছি না যে, সমাধানগুলো কার্যকর নয়, যথেষ্ট কার্যকর। তবু ঝুঁকি ও কৃত্রিমতা থেকে বেরিয়ে এসে সমস্যাটি প্রতিরোধ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
বিষাক্ত মাকড়সা কোনগুলো?
নিজের ঘরেই হোক কিংবা বনে-জঙ্গলে, মাকড়সা দেখে আঁতকে ওঠেন না বা এই প্রাণীকে এড়িয়ে চলে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে আট পা এবং ষোলো হাঁটুর এই প্রাণীটির প্রজাতির সংখ্যা প্রায় চল্লিশ হাজার। কাজেই এত সব প্রজাতির মধ্যে থেকে খুঁজে-বেছে সঠিক করে বলা মুশকিল যে, কোন মাকড়সাগুলো সবথেকে বেশি মারাত্মবিস্তারিত পড়ুন
নিজের ঘরেই হোক কিংবা বনে-জঙ্গলে, মাকড়সা দেখে আঁতকে ওঠেন না বা এই প্রাণীকে এড়িয়ে চলে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে আট পা এবং ষোলো হাঁটুর এই প্রাণীটির প্রজাতির সংখ্যা প্রায় চল্লিশ হাজার। কাজেই এত সব প্রজাতির মধ্যে থেকে খুঁজে-বেছে সঠিক করে বলা মুশকিল যে, কোন মাকড়সাগুলো সবথেকে বেশি মারাত্মক। আবার বিভিন্ন মানুষের শরীরে একই মাকড়সার প্রভাব ভিন্নভাবে পড়তে পারে। এটি সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মাকড়সা বিষের প্রতি সংবেদনশীলতার উপরে।
আর্থ্রোপোডা (Arthropoda) পর্বভূক্ত এই প্রাণীটির প্রতি মানুষের মনে একপ্রকার ভীতি জন্ম নেয়। মাকড়সার প্রতি এই ভীতিকে বলা হয় আরাকনোফোবিয়া (Arachnophobia)। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫% এই মাকড়সাভীতিতে ভুগে থাকেন। জাস্টিন টিম্বারলেক কিংবা জে. কে. রাওলিং এর মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরাও এই তলিকার বাইরে নন। যদিও মাকড়সার চল্লিশ হাজার প্রজাতির মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক প্রজাতি আছে, যাদের নিয়ে মানুষের সত্যিকারের ভয় পাওয়ার কারণ আছে।
মাকড়সার সকল প্রজাতিরই দুটি বিষদাঁত থাকে। এই বিষদাঁতের মাধ্যমে মাকড়সা এর জালে আটক শিকারের শরীরে বিষ প্রয়োগ করে। এই বিষের প্রভাবে শিকার পতঙ্গের অভ্যন্তরের সবকিছু তরল হয়ে যায়। মাকড়সা এই তরল শুষে নিজের ক্ষুধা নিবৃত্ত করে। উল্লেখ্য, মাকড়সার বিষ মাকড়সার কোনো ক্ষতি করে না।
এখন জানা যাক সামগ্রিকভাবে বিষাক্ত কিছু মাকড়সা সম্বন্ধে যাদের নিয়ে মানুষের চিন্তার কারণ আছে।
ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডারিং স্পাইডার
এই তালিকার প্রথমেই আছে ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডারিং স্পাইডার (Brazilian wandering spider)। অনেকটা দক্ষিণ আমেরিকার উলফ স্পাইডারের মতো দেখতে হলেও ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডারিং স্পাইডার আকারে বড় এবং এর বিষের শক্তিমাত্রা বেশি। এই ধরনের মাকড়সার বিষ স্নায়বিকভাবে খুবই সক্রিয়। একে মাকড়সাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিষধর এবং বিপদজনক বলে মনে করা হয়ে থাকে।

ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডারিং স্পাইডার; Source: pexels.com
সাধারণত শিকারী প্রজাতির এই মাকড়সা প্রচুর ভ্রমণ করে থাকে। দিনের বেলায় এদের চলাচল কম হলেও রাতে এরা যথেষ্ট চলাচল করে। এরা যদি কখনো বিপদের আভাস পায় বা কোনো প্রাণীর স্পর্শ পায় সেক্ষেত্রে এরা নিজেকে বাঁচানোর জন্য কামড় বসাতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে এই কামড়ের মাধ্যমে কোনো বিষ প্রয়োগ করে না। এরা বিষ প্রয়োগ করে তখনই যখন এরা আঘাতপ্রাপ্ত হয় বা এদেরকে কোনোভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। সাধারণত এই প্রজাতির মাকড়সা প্রতিটি কামড়ের সাথে শক্তিশালী সেরোটনিন (Serotonin) সমৃদ্ধ বিষ প্রয়োগ করে যা মাংসপেশীতে তীব্র চোটের (Muscle shock) সৃষ্টি করে। এরপর আস্তে আস্তে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় যা একপর্যায়ে পক্ষাঘাতের সৃষ্টি করে।
এদের বিষকে কতিপয় বিপদজনক সাপের বিষের সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে। মাকড়সা জগতের দ্বিতীয় ভয়ংকর প্রজাতি ব্ল্যাক উইডোর বিষের থেকে এদের বিষ প্রায় বিশগুণ শক্তিশালী। বিষের শক্তিমাত্রা এতটাই বেশি যে, কামড়ের পর বিষের এন্টিডট অর্থাৎ এন্টিভেনম দেয়ার পরেও কামড়ের এক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যুর রেকর্ড আছে। শিশু এবং বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরো বেশি। কারণ তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে কম।
ব্ল্যাক উইডো স্পাইডার
মাকড়সা জগতে ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডারিং স্পাইডারের পরেই ব্ল্যাক উইডো স্পাইডারকে (Black widow spider) স্থান দেয়া হয়। এই কুখ্যাত প্রজাতির মাকড়সাকে এদের পেটে রঙিন বালিঘড়ির চিহ্ন দেখে শনাক্ত করা যায়। এই প্রজাতির মাকড়সা সাধারণত নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে বসবাস করে থাকে। পুরোনো ধাঁচের বাড়ি, কাঠের বাড়ি অথবা কাঠের স্তূপ এদের জন্য উপযুক্ত বসবাসের জায়গা। মজার ব্যাপার হলো, এই প্রজাতির স্ত্রী মাকড়সাই বেশি দেখা যায়, কারণ পুরুষ মাকড়সার সাথে মিলনের পরেই স্ত্রী মাকড়সা এদের খেয়ে ফেলে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই এই প্রজাতির নাম হয়েছে উইডো অর্থাৎ বিধবা।

ব্ল্যাক উইডো স্পাইডার; Source: jenniferharmancpt.com
ব্ল্যাক উইডো প্রজাতির মাকড়সার বিষ র্যাটলস্নেকের বিষের থেকে প্রায় ১৫ গুণ বেশি শক্তিশালী। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৯ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এই মাকড়সার কামড়ের জন্য প্রায় ৬৩ জনের মৃত্যুর রেকর্ড আছে। একই সাথে জানা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর বিষ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে (Poison Control Center) প্রায় ২,৫০০ জন ভর্তি হয় শুধুমাত্র এই প্রজাতির মাকড়সার কামড়ের কারণে। তবে এখন ভবন নির্মাণ কৌশলের আধুনিকতার কারণে এবং এন্টিভেনম আবিষ্কারের কারণে এই মৃত্যু নেই বললেই চলে।
এরা সাধারণত উগ্র প্রজাতির নয়। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কামড়ের সাথে বিষ প্রয়োগ করে না। কিন্তু কোনো কারণে বিষ প্রয়োগ করলে সেটি মাংসপেশীতে ব্যথার সৃষ্টি করে। এরপর আস্তে আস্তে ডায়াফ্রাম প্যারালাইজড হয়ে যায়, যার ফলে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে কেউ কেউ দাবী করেন, তারা এই অবস্থা থেকে সেরে উঠেছেন কয়েকদিন পরেই। এদের বিষের ফলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকে বলা হয় ল্যাট্রোডেকটিজম (Latrodectism)। উল্লেখ্য, ব্ল্যাক ঊইডো স্পাইডার, রেড ব্যাক স্পাইডার এবং ব্রাউন উইডো স্পাইডারের প্রকৃতি ও বিষক্রিয়া প্রায় একই রকম।
সিডনি ফানেল ওয়েব স্পাইডার
অস্ট্রেলিয়ার পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী এই প্রকার মাকড়সাকে প্রথম শ্রেণীর বিষাক্ত মাকড়সাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এদেরকে সাধারণত কোনোভাবে উত্তেজিত করার চেষ্টা করলে এরা বেশ উগ্ররূপ ধারণ করে। অর্থাৎ এই মাকড়সা অনেকটা বদমেজাজি ধরনের হয়ে থাকে। স্ত্রী মাকড়সা অধিকাংশ সময় এদের জালেই জীবন কাটায়। পুরুষ মাকড়সা গ্রীষ্মকালে মিলনের জন্য ঘোরাঘুরি করে থাকে।
সিডনি ফানেল ওয়েব (Sydney Funnel Web) মাকড়সার বিষদাঁত মাকড়সা জগতের মধ্যে সবথেকে বেশী নিখুঁত। এদের বিষদাঁত কতিপয় প্রজাতির সাপের থেকে উন্নত। তীক্ষ্ণ, সূচালো এই দাঁতের সাহায্যেই এই মাকড়সা এদের শিকারকে বা উত্যক্তকারীকে কামড় দেয় এবং বিষ প্রয়োগ করে। এদের দাঁত এতটাই তীক্ষ্ণ যে, চামড়ার জুতার ভেতর দিয়ে, এমনকি নখের উপর দিয়ে এরা কামড়াতে পারে।

সিডনি ফানেল ওয়েব স্পাইডার; Source: bbc.com
এদের বিষে অ্যাট্রাকোটক্সিন (Atracotoxin) নামক একপ্রকার যৌগ থাকে, যা স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলে। এদের বিষ পূর্বে বর্ণিত মাকড়সাদের থেকে খুব শক্তিশালী নয়। তবে এরা যখন কামড় দেয় তখন আক্রান্ত প্রাণীর সঙ্গে লেগে থেকে একের পর এক কামড় দিতে থাকে এবং প্রতি কামড়েই বিষ প্রয়োগ করতে থাকে। এভাবে যতক্ষণ না বিষের পুরো ডোজ প্রয়োগ করা না হয় ততক্ষণ কামড় চলেতে থাকে।
১৯২৭ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে এই প্রকার মাকড়সার কামড়ে নিশ্চিত মৃত্যুর রেকর্ড আছে ১৩ জনের এবং এদের কামড়ের পনেরো মিনিটের মধ্যে একটি বাচ্চার মৃত্যুর কথাও জানা যায়। তবে ১৯৮০ সালে এদের এন্টিভেনম আবিষ্কারের পর আর কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
রিক্লজ স্পাইডার
রিক্লজ স্পাইডারের (Recluse spider) মধ্যে দুই ধরনের মাকড়সার উল্লেখ পাওয়া যায় যারা বিষাক্ত। এরা হলো ব্রাউন রিক্লজ স্পাইডার এবং চিলিয়ান (Chilean) রিক্লজ স্পাইডার। মাথায় বেহালার মতো চিহ্ন থাকায় ব্রাউন রিক্লজ স্পাইডার ‘ভায়োলিন স্পাইডার’ বা ‘ফিডলার’ নামেও পরিচিত। অলস প্রকৃতির এই মাকড়সা সাধারণত জুতার মধ্যে বা কাপড়চোপড়ের মধ্যে বাসা বাধে। এর ফলে এরা সহজেই মানুষের সংস্পর্শে আসে এবং যদি কোনোভাবে এরা চাপ অনুভব করে তখন কামড় দেয়।

ব্রাউন রিক্লজ স্পাইডার; Source: phys.org
ব্রাউন রিক্লজ স্পাইডারের কামড় বিষাক্ত হয়ে থাকে। যদিও এদের কামড়ের ফলে কোনো মৃত্যুর রেকর্ড পাওয়া যায় না। এদের বিষ সাধারণত ক্ষয়কারী। এদের কামড়ের ফলে অত্যধিক টিস্যুক্ষয় এবং সংক্রমণ দেখা দেয়। এই অবস্থাকে বলা হয় লক্সোসেলিজম (Loxoscelism)। এদের বিষের কোনো সঠিক প্রতিষেধক না থাকায় সম্পূর্ণ সারতে প্রায় এক মাস সময় লেগে যায়। কখনো কখনো টিস্যু অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্থ হলে গ্রাফটিং করার প্রয়োজন পড়ে।
এরপর আসে চিলিয়ান রিক্লজ স্পাইডার। এরাও ব্রাউন রিক্লজের মতো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে এবং এদের বিষক্রিয়াও মাংসপেশী ও টিস্যুর ক্ষয় করে থাকে।
সিক্স আইড স্যান্ড স্পাইডার
এই প্রকার মাকড়সা সাধারণত আফ্রিকার মরুভূমি অঞ্চলে পাওয়া যায়। এদের রিক্লজ মাকড়সাদের নিকটাত্মীয়ও বলা যেতে পারে। আকারে খানিকটা কাকড়ার মতো চ্যাপ্টা হওয়ার কারণে এদের ‘ক্র্যাব স্পাইডার’ও বলা হয়ে থাকে। মরুভূমির বালির মধ্যে আত্মগোপন করে থাকা এই মাকড়সা যেকোনো প্রাণীর জন্যেই আততায়ীর মতো ভূমিকা পালন করে।

সিক্স আইড স্যান্ড স্পাইডার; Spurce: realmonstrosities.com
মানুষের ক্ষেত্রে এদের কামড়ের ক্ষেত্রে কোনো সঠিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। ফলে এরা মানুষের জন্য কতটা বিষধর তা জানার উপায় নেই। তবে এখন পর্যন্ত দুজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এদের কামড়ের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা হয়। একজনের ক্ষেত্রে নেক্রোসিস অর্থাৎ মাংসপেশীর ক্ষয়ের ফলে একটি হাত পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে। অন্যজনের ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণের ফলে মৃত্যুর কথা জানা যায়। তবে খরগোশের ক্ষেত্রে এদের বিষের প্রভাব থেকে জানা যায় যে, ৫-১২ ঘন্টার মধ্যে খরগোশের মৃত্যু হতে পারে। এদের বিষে সাইটোটক্সিন (Cytotoxin) নামক যৌগের উল্লেখ পাওয়া যায় যা ক্ষয়কারী।
মাকড়সাভীতির বাইরেই অধিকাংশ মানুষের কাছেই মাকড়সা একটি ছোটখাট পতঙ্গ ছাড়া আর কিছুই না। এটা হতে পারে এই কারণে যে, আমাদের আশেপাশে যেসব মাকড়সা আছে তারা নিরীহ প্রকৃতির বা অতটা বিষাক্ত নয়। কিন্তু অবশ্যই সাবধান থাকা উচিত, কারণ কখন কোন মাকড়সার কামড়ে কী ক্ষতি হয়ে যায়!
অনুশোচনায় ভোগা আবিষ্কারকের তালিকায় কার কার নাম রয়েছে? কেনইবা তারা অনুশোচনায় ভুগেছেন সারাজীবন?
মানুষ নিত্যনতুন সমস্যার সমাধানের জন্য প্রতিনিয়তই নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে চলছে। ছোটখাট আবিষ্কার থেকে বড় বড় আবিষ্কারগুলোও মানুষের জীবনযাত্রা করে তুলছে আরো সহজ। ক্ষুদ্র সেফটি পিনও আজকাল জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ। আবিষ্কারকদেরও তাই স্মরণ করা হয় শ্রদ্ধাভরে। তবে কিছু কিছু আবিষ্কারক নিজেদের আবিষ্কার নবিস্তারিত পড়ুন
মানুষ নিত্যনতুন সমস্যার সমাধানের জন্য প্রতিনিয়তই নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে চলছে। ছোটখাট আবিষ্কার থেকে বড় বড় আবিষ্কারগুলোও মানুষের জীবনযাত্রা করে তুলছে আরো সহজ। ক্ষুদ্র সেফটি পিনও আজকাল জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ। আবিষ্কারকদেরও তাই স্মরণ করা হয় শ্রদ্ধাভরে।
তবে কিছু কিছু আবিষ্কারক নিজেদের আবিষ্কার নিয়ে ভুগেছেন হতাশায়। তাদের মতে, সেগুলো আবিষ্কার করাই ছিলো তাদের ভুল কাজ। আজ আমরা জানবো এমন সব আবিষ্কারের কথা, যেগুলোর জন্য পরবর্তীতে অনুতাপ করে গেছেন তারা।
ইথান জুকারম্যান – পপ আপ
এমআইটি’র অধ্যাপক ইথান জুকারম্যান তরুণ বয়সেই কোডিংয়ের উপর দক্ষ ছিলেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই ট্রাইপড ডট কম নামে এক ইন্টারনেট স্টার্ট আপের সাথে কাজ শুরু করেন তিনি।
১৯৯৬ সালে জুকারম্যানকে নতুনভাবে সাইটে বিজ্ঞাপন দেখানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর তখনই তিনি তৈরি করে বসেন পপ আপ অ্যাডস। পপ আপ এর আভিধানিক অর্থ হছে আকস্মিক বা হঠাৎ দৃশ্যমান। পপ আপ অ্যাডগুলো যেকোনো মূহুর্তে আপনার ব্রাউজকৃত সাইটে অনুমতি ছাড়া চলে আসবে। আর তাতে করেই মানুষের বিরক্তির উদ্রেক হয়। বেশিরভাগ মানুষই পপ আপ অ্যাডে নিজেদের বিরক্তির কথা জানান। সেই পরিপেক্ষিতে অপেরা মিনি সর্বপ্রথম পপ আপ অ্যাড ব্লক করার অপশন চালু করে। পরবর্তীতে মজিলা ফায়ারফক্স ও অন্যান্য ব্রাউজারগুলোতেও পপ আপ অ্যাড ব্লক করার সুবিধা যুক্ত করা হয়।
অবশ্য ইথান জুকারম্যান পরবর্তীতে নিজেই পপ আপ অ্যাড আবিষ্কারের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার কোডিংয়ের উদ্দেশ্য ছিলো ভিন্ন। কিন্তু শেষপর্যন্ত এভাবে ব্যাপারটা শেষ হওয়াও তিনি সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

মানুষের বিরক্তির উদ্রেক করা পপ আপ অ্যাডস; Image Source: The Times
ওয়েলি কনরন – ল্যাব্রাডুডল
অস্ট্রেলিয়ার রয়্যাল গাইড ডগ অ্যাসোসিয়েশন কুকুর ছানার বেড়ে তোলার জন্য এক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন ওয়েলি কনরন। ১৯৮০ সালে কনরনকে একজন অন্ধ মহিলাকে গাইড করানোর জন্য একটি নন শেডিং কুকুরছানার নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কনরন একটি গোল্ডেন ল্যাব্রাডরের সাথে একটি পোডল কুকুর ছানার সংকরায়নে ল্যাব্রাডুডল নামে নতুন এক প্রজাতির কুকুর ছানার আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে ল্যাব্রাডুডল নামে নতুন এই প্রজাতির এই কুকুর হয়ে ওঠে সবচেয়ে আকাঙ্খিত কুকুর ছানা। আপনি হয়তো ভাবছেন, এতে কনরন অনেক খুশি হয়েছিলেন। আদতে মোটেও তা নয়।
তার দেখাদেখি অন্য অনেকেই নতুন প্রজাতির কুকুর ছানা আবিষ্কারের নেশায় সব ধরনের প্রজাতির সংকরায়ণ শুরু করে। গোল্ডেনডুডল থেকে শুরু করে রোডলস, শিফুস ও আরো নানা জাতের হাইব্রিড কুকুরের উৎপত্তি হয়। যার ফলে নতুন প্রজাতির কুকুরগুলো বেশিরভাগই বিভিন্ন দৈহিক সমস্যা নিয়ে জন্মাতে শুরু করে।
এই প্রসঙ্গে পরে কনরন বলেছেন, তিনি একটি প্যান্ডোরার বক্স খুলেছেন। আর শত শত মানুষ টাকার লোভে নানা প্রজাতির কুকুর ছানা সংকরায়ন শুরু করে। অথচ কেউই অক্ষম কুকুর জন্মানোর হারের দিকে কর্ণপাত করলো না। নিজের আবিষ্কার নিয়ে বাকি সময় ধরে অনুতাপই করে গেছেন কনরন।

সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ল্যাব্রাডুডল কুকুর ছানা; Image Source: Wagberg
আনা জারভিস – মাদার্স ডে
উনিশ শতকের দিকে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে বসবাসরত আনা জারভিস নামে এক ভদ্রমহিলা ‘মাদার্স ডে ওয়ার্কস ক্লাব’ নামে একটি সংঘ গড়ে তোলেন। সংঘটির দায়িত্ব ছিলো সন্তানদের কীভাবে দেখভাল করতে হবে তা শিখিয়ে দেওয়া। পরবর্তীতে এই সংঘটির দ্বারাই সূচিত হয় মাদার্স ডে পালন করার প্রথা।
১৯০৫ সালে আনা জারভিসের মায়ের মৃত্যুর পর তিনি এই প্রস্তাব উত্থাপিত করেন। ১৯০৮ সালের ১০ মে আনা বিশেষভাবে তার মাকে স্মরণ করার জন্যে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার চার্চে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। ১০ মে-কে সরকারিভাবে মাদার্স ডে হিসেবে পালন করার জন্য ছুটিরও আবেদন করেন তিনি। ১৯১৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মাদার্স ডের জন্য সরকারি ছুটির ঘোষণা করেন।
সারাজীবন ক্যালেন্ডারে মাদার্স ডে-কে স্থান দেওয়ার জন্য লড়ে যাওয়া আনা জারভিস কিছুদিন পরই বেঁকে বসেন। তিনি চেয়েছিলেন মাদার্স ডে পালিত হবে পরিবার সহ ঘরোয়াভাবে। কিন্তু ক্রমেই পুরো দিনটি হয়ে ওঠে বাণিজ্যিক। সবাই ফুল কিংবা উইশকার্ডে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তিনি লোকজনকে এসব কিনতে নিষেধ করেন। কিন্তু সময়ের সাথে ব্যাপারটা হয়ে ওঠে আরো বাণিজ্যিক। ১৯২০ সালে তাই আবার সোচ্চার হয়ে ওঠেন জারভিস। এবার ঠিক উল্টো কারণে। আমেরিকান ক্যালেন্ডার থেকে মাদার্স ডে বাদ দেওয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করেন তিনি। অবশেষে তার মৃত্যুর পর ১৯৪৮ সালে ছুটির দিনটি উঠিয়ে নেওয়া হলেও মাদার্স ডে এখনো বিশ্বজুড়ে আড়ম্বরের সাথেই পালিত হয়।

পুরো বিশ্বজুড়ে বেশ আড়ম্বরের সাথেই পালিত হয় মা দিবস; Image Source: India .com
মিখাইল কালাশনিকভ – একে ৪৭
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মারণাস্ত্রের দিক দিয়ে জার্মানদের থেকে বেশ পিছিয়ে ছিলো রাশিয়ানরা। মিখাইল কালাশনিকভ নামে এক লোক, যিনি কি না ট্যাংক ইউনিটে কাজ করতেন, এক নতুন উদ্ভাবনী ক্ষমতা নিয়ে আবির্ভূত হন। ইতিমধ্যেই ট্যাংকের উন্নতি সাধন করে নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতার জানান দেন মিখাইল।
নাৎসি বাহিনীর সাথে পাল্লা দেওয়ার জন্য মিখাইল তৈরি করেন নতুন এক ধরনের মারণাস্ত্র। স্বয়ংক্রিয় সেই অস্ত্রটি টেকসই এবং হালকা হওয়ায় ক্রমেই তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একে ৪৭ নামের এই অস্ত্রটি হয়ে ওঠে সন্ত্রাসীদের প্রধান হাতিয়ার।
পরবর্তীতে নিজের এই আবিষ্কারের জন্য অনুতাপে ভোগেন মিখাইল। দ্যা গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিখাইল কালাশনিকভ বলেন, তিনি এমন যন্ত্র আবিষ্কারে খুশি হতেন যা লোকজন যুদ্ধে ব্যবহার করার পর প্রয়োজনে চাষাবাদেও ব্যবহার করতে পারতো।

নিজের আবিষ্কার হাতে কালাশনিকভ; Image Source: Business Insider
স্কট ফ্যালমান – ইমোটিকন
আজকাল অনলাইন চ্যাটিংয়ে ইমোটিকন হয়ে উঠেছে জনপ্রিয় একটি বিষয়। মানুষ এখন শব্দের চেয়ে সুন্দর একটি ইমোজি ব্যবহারকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। আর এই বহুল ব্যবহৃত ইমোজির উদ্ভাবক স্কট ফ্যালমান। তবে হঠাৎ করে প্রচুর জনপ্রিয়তা পাওয়া এই ইমোটিকন আবিষ্কার করে মোটেই খুশি নন এই ভদ্রলোক।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নিজেকে তার মাঝে মাঝে ডক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো মনে হয়। কিছু জায়গায় কথা বলা প্রয়োজন। কিন্তু মানুষ ইমোজি ব্যবহারে বেশিই আসক্ত হয়ে পড়েছে। যার জন্য নিজের আবিষ্কার নিয়ে মোটেই সন্তুষ্ট নন ফ্যালমান।

ইমোটিকনের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে; Image Source: Wall Street Journal
অ্যালবার্ট আইনস্টাইন – পারমাণবিক বোম
পারমাণবিক বোমের সরাসরি আবিষ্কারক না হলেও স্বনামধন্য বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের বিখ্যাত সুত্র E = mc^2 এর উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে ভয়াবহ এটি। নিজের আবিষ্কারে প্রথমে খুশিই ছিলেন আইনস্টাইন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা তাকে মর্মাহত করে। বিশেষ করে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমটির বিস্ফোরণ পৃথিবীর অন্যান্য মানুষের মতো আইনস্টাইনকেও হতভম্ব করে দেয়।
নিজের এই আবিষ্কার নিয়ে পরবর্তীতে অনুতাপও করেন বিংশ শতাব্দীর এই শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। ১৯৪৭ সালে নিউজউইককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পারমাণবিক বোমের এই ভয়াবহতা আগে টের পেলে কখনোই এমন কিছু আবিষ্কার করতেন না তিনি।

হিরোশিমাতে পারমাণবিক বোমা হামলার ভয়াবহতা; Image Source: Getty Image
রবার্ট ওপেনহেইমার: পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারে যার অন্যতম অবদান ছিল
জে. রবার্ট ওপেনহেইমারকে বলা হয় ‘দ্য ফাদার অফ এটমিক বোম্ব’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ‘লস এলামস ল্যাব‘ এর পরিচালক ছিলেন। সে সময়ে এক দেশ আরেক দেশের সাথে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত ছিল এবং প্রত্যেকদিন প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছিলো। নিজেদের এবং দেশের নাগরিকদের জন্য একটি নিরাপদ বিশ্ব তৈরি করতে তারা আইনস্টাইনের ফর্মুলা ব্যবহার করে পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন এমন আবিষ্কারের ফলে হয়তো এক দেশ আরেক দেশকে আক্রমণ করার সাহস পাবে না।

রবার্ট ওপেনহেইমার; Source: media.ws.irib.ir
কিন্তু তাদের অনুশোচনার শেষ রইলো না যখন তারা দেখলেন তাদের এই বোমাটিকেই বরং ধ্বংসাত্মক কাজে জাপানে ব্যবহার করা হলো। লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেলো। তাই ওপেনহেইমার তার জীবনের শেষকালে অনুতাপ করে বলেছিলেন, যুদ্ধ তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ভোতা করে দিয়েছিলো। তা না হলে এমন নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর বোমা বানানোর মত ভুল তারা কীভাবে করলেন!
ডং গুয়েন: ফ্ল্যাপি বার্ড গেমের নির্মাতা
চলুন এবার একটু কম গুরুতর বিষয়ের দিকে যাওয়া যাক। কয়েক বছর আগেই ইন্টারনেট জগতে এক ছোট্ট গেমের আগমন ঘটে যা পুরো বিশ্বকেই প্রায় গেমটির মাঝে আসক্ত করে ফেলে। গেমটির নাম ‘Flappy Bird’। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো ডং গুয়েন তার সৃষ্ট গেমটির বিশাল জনপ্রিয়তার জন্য উল্টো একেই ঘৃণা করা শুরু করেন। যেখানে অন্যান্য নির্মাতারা তাদের সৃষ্ট পণ্য জনপ্রিয় হলে সেটা উপভোগ করেন; গুয়েন ছিলেন তার একদম উল্টো।

গুয়েন এবং ফ্ল্যাপি বার্ড; Source: static.standard.co.uk
এমনকি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় গেমটি প্রতিদিন প্রায় ৫০,০০০ ডলার করেও আয় করছিলো, যা ছিল একজন ছোট এবং স্বাধীন গেম ডেভেলপারের জন্য বিরাট কিছু। তবুও তিনি গেমটি তৈরির জন্য নিজের প্রতিই ছিলেন বিরক্ত। কারণ ফ্ল্যাপি বার্ডের জনপ্রিয়তার জন্য তাকে সবাই আলাদা করে চেনা শুরু করে, বিভিন্ন মিডিয়া তার পেছনে ছুটতে শুরু করে। কিন্তু তিনি তার সরল সোজা জীবনকেই বেশি পছন্দ করতেন। তিনি অন্যদের মনোযোগ নিজের প্রতি টেনে আনতে চাননি। কিন্তু গেমটির জনপ্রিয়তা তার স্বাভাবিক জীবনযাপনকে শুধু ব্যাহতই করছিলো।
কামরান লোমান: পিপার স্প্রের উদ্ভাবক
(বামে) কামরান লোমান; Source: harrywalker.com
কামরান লোমান আরেকজন ব্যক্তি যিনি তার উদ্ভাবিত পিপার স্প্রের অপব্যবহারে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি FBI এ কর্মরত থাকা অবস্থায় এই পিপার স্প্রের আবিষ্কারে মূল ভূমিকা রাখেন। সাময়িকভাবে কোনো দুষ্কৃতিকারীকে অকেজো এবং অন্ধ করে দেওয়ার জন্যই এটি আবিষ্কার করা হয়েছিল। পিপার স্প্রে প্রয়োগে প্রথমে ব্যক্তির চোখে প্রচণ্ড জ্বালা করে এবং পরে চোখ দিয়ে অনর্গল পানি পড়া শুরু হয়। ফলে যে কেউ নিজের আত্মরক্ষা করার পাশাপাশি নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যেতে পারে।

পুলিশের পিপার স্প্রের যাচ্ছেতাই ব্যবহার; Source: images.vice.com
লোমান এমনকি একটি গাইডলাইনও লিখেছিলেন কীভাবে পিপার স্প্রে ব্যবহার করা উচিত। কারণ কিছু পরিস্থিতিতে এর প্রতিক্রিয়া বিপদজনকও হতে পারে। কিন্তু দেখা গেলো মানুষের থেকে পুলিশই পিপার স্প্রের বেশি অপব্যবহার করছে। শুধু সন্ত্রাসীদের কাবু করার ক্ষেত্রেই নয়, তারা বিভিন্ন মিছিল, মিটিং, বিভিন্ন প্রকারের আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতেও এর যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে। গাইডলাইন অনুসরণ না করেই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে অনেকের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে আরো ভয়াবহ। আবার অনেক সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারীরাও এটি পথচারীদের উপর ব্যবহার করা শুরু করে। ফলে লোমান মনে করেন তার পিপার স্প্রে আবিষ্কার করাটাই একটি ভুল পদক্ষেপ ছিল।
আলফ্রেড নোবেল: ডিনামাইটের আবিষ্কারক
আলফ্রেড নোবেল; Source: raikfcquaxqncofqfm.stackpathdns.com
আলফ্রেড নোবেল ছিলেন মূলত একজন শিল্পপতি, প্রকৌশলী এবং আবিষ্কারক। ১৮৬০ সালে তিনি পাথর ভাঙার সহজ উপায় খুঁজতে গিয়ে নাইট্রো-গ্লিসারিনের সাথে সিলিকার মিশ্রণে একধরনের উদ্বায়ী পেস্ট তৈরি করেন যা ডিনামাইট নামে পরিচিত হয়। প্রাথমিকভাবে তার উদ্দেশ্য সফল হলেও পরবর্তীতে লক্ষ্য করে দেখলেন, যে কাজের জন্য তিনি ডিনামাইট আবিষ্কার করেছিলেন সে কাজের পরিবর্তে মানুষ বরং অপর মানুষকে পঙ্গু এবং হত্যা করার জন্যই তা বেশি ব্যবহার করছে। এসব দেখে তিনি খুবই ব্যথিত হন এবং ডিনামাইট আবিষ্কারের জন্য অনুতপ্ত হন।
ডিনামাইট; Source: cdn-a.william-reed.com
বিশ্বের জন্য ভাল কিছু করে যাবার তাগিদ থেকে তিনি তার দলিলে বলে যান, পুরো বিশ্বের কল্যাণে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় যারা অবদান রাখবে তাদেরকে যেন তার অধিকাংশ সম্পদ থেকে পুরষ্কৃত করা হয়। ফলে বর্তমানে তার ‘নোবেল অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন’ থেকে বিশেষ অবদানের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মানসূচক নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়। আলফ্রেড নোবেল বেঁচে থাকলে হয়তো দেখতে পেতেন কীভাবে নিজের সেই অনুশোচনাকে তিনি মানবজাতির জন্য এক বিশেষ সম্মান ও মর্যাদায় রূপান্তরিত করতে পেরেছেন।
বর্ণালীবীক্ষণ’ বা Spectroscope কি ? এটা কি কাজে ব্যবহৃত হয়?
পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বা উদ্ভাবনগুলোর তালিকা করলে তার মাঝে অবশ্যই রাখতে হবে ‘বর্ণালীবীক্ষণ’ বা Spectroscope নামে একটি যন্ত্রকে। চাকা, প্রিন্টিং প্রেস, টেলিফোন, কম্পিউটার সহ অন্যান্য পরিচিত জিনিসের পাশে স্থান করে নেবে এটি। মানব সভ্যতার প্রেক্ষাপটে যন্ত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের কাবিস্তারিত পড়ুন
পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বা উদ্ভাবনগুলোর তালিকা করলে তার মাঝে অবশ্যই রাখতে হবে ‘বর্ণালীবীক্ষণ’ বা Spectroscope নামে একটি যন্ত্রকে। চাকা, প্রিন্টিং প্রেস, টেলিফোন, কম্পিউটার সহ অন্যান্য পরিচিত জিনিসের পাশে স্থান করে নেবে এটি। মানব সভ্যতার প্রেক্ষাপটে যন্ত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের কাছে বেশি পরিচিত নয়। গণহারে মানুষ এই যন্ত্রটিকে ব্যবহার করে না বলে অনেকেই এর গুরুত্ব নিয়ে ভাবে না। কেন এটি সেরা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার-উদ্ভাবনের মাঝে থাকবে, তা এই লেখাটিতে পরিষ্কার হবে।
রংধনু ও লাল সরণ
বর্ণালীবীক্ষণকে বলা যায় এক প্রকার রংধনু তৈরি করার যন্ত্র। দূরবর্তী নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোক রশ্মি এর ভেতরে প্রবেশ করলে এটি ঐ আলোকে বিস্তৃত বর্ণালীতে রূপান্তর করে দেয়। অনেকটা প্রিজমের মাধ্যমে সাদা আলো থেকে সাত রংয়ের আলোতে বিশ্লিষ্ট হবার মতো। তবে বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রটি নিউটনের প্রিজম থেকে আরো বেশি বিস্তৃত ও পরিশীলিত। এটি ব্যবহার করে এমনকি দূর-নক্ষত্রের আলো নিয়ে সূক্ষ ও সঠিক পরিমাপ করা যায়।
একটি বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র। ছবি: ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো
কীসের পরিমাপ? রংধনু আর বর্ণালীতে আবার মাপামাপির কী আছে? এখান থেকেই মজার জিনিসটা শুরু হয়। ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্র থেকে আসা আলো ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে, ভিন্ন ভিন্ন বর্ণালী তৈরি করে। বর্ণালীর এই বিষয়গুলো নক্ষত্র সম্পর্কে আমাদেরকে অনেক তথ্য প্রদান করে।
সচরাচর আমরা যে রং দেখি তার বাইরে কি আরো রং থাকতে পারে? দূরের নক্ষত্রগুলো কি আমাদের পরিচিত কোনো রঙের চেয়ে ভিন্ন ও অচেনা কোনো রঙের হতে পারে? না, সাধারণ মানুষের ক্ষমতায় এমন দেখা সম্ভব নয়। চোখের পক্ষে যতটুকু দেখার সামর্থ্য আছে, তার বাইরে দেখা সম্ভব নয়। রংধনুর সাত রং বেগুনী, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল আমরা দেখতে পাই। এর বাইরেও অনেক বৈচিত্র্যময় রং দেখে থাকি, তবে এগুলো ভিন্ন কোনো রং নয়। তিনটি মৌলিক রংয়ের বিভিন্ন আনুপাতিক মিশ্রণের মাধ্যমে এরকম হাজার হাজার বৈচিত্র্যময় রং তৈরি করা যায়। জগতে যত ধরনের রং দেখি, তার সবই আসলে তিনটি মৌলিক রঙের বিভিন্ন আনুপাতিক সমাবেশ মাত্র। এমনকি রংধনুর অতিরিক্ত চারটি রংও এই তিন রং থেকে তৈরি করা যায়। মৌলিক রং তিনটি হচ্ছে লাল, নীল ও সবুজ।
তিন মৌলিক রং লাল, নীল ও সবুজ (বড় বৃত্ত) এবং তাদের সমাবেশে তৈরি অন্যান্য রং (ছেদকৃত অংশ)। ছবি: স্টাডি ব্লু
নক্ষত্রে আমরা ব্যতিক্রম কোনো রং দেখতে পাবো না, অথচ পূর্বে উল্লেখ করেছিলাম ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্র ভিন্ন ভিন্ন রংধনু-বর্ণালী প্রদান করে। তাহলে এই বাক্য দিয়ে কী বোঝানো হয়েছিল? নক্ষত্র থেকে আগত আলো যখন বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রের ভেতর দিয়ে বিশ্লিষ্ট হয় তখন বারকোডের (Barcode) মতো অনেকগুলো সরু লাইনের সৃষ্টি করে। বিভিন্ন পণ্যের গায়ে পণ্যের পরিচিতি হিসেবে বারকোড ছাপানো থাকে। নক্ষত্রের আলো থেকে বিশ্লিষ্ট রেখা বর্ণালীকে আক্ষরিক অর্থেও ‘বারকোড’ বলা যায়। কারণ, বারকোড যেমন পণ্যের উৎপাদন, মেয়াদ, মূল্য, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে, তেমনই নক্ষত্রের আলোক বর্ণালী থেকেও নক্ষত্রের বয়স, গঠন, উপাদান ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
বারকোড। ছবি: বারকোড গ্রাফিক্স
এমন না যে শুধুমাত্র দূরবর্তী নক্ষত্র থেকে আগত আলোক রশ্মিই বারকোড লাইন তৈরি করে, বিশেষ ক্ষেত্রে পৃথিবীতে উৎপন্ন আলোক রশ্মিও বারকোড লাইন তৈরি করতে পারে। সেই হিসেবে ল্যাবরেটরিতে এই আলোক রশ্মি বিশ্লেষণ করে আমরা কোনো অজানা পদার্থের পরিচয়ও বের করতে পারবো। এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে বিভিন্ন অজানা পদার্থের পরিচয় বের করা হয়ও। যেমন, সোডিয়াম থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন আলোর বর্ণালীতে হলুদ রং বেশি প্রকট আকারে থাকে। সেই কারণে সোডিয়ামের আলো হলদেটে হয়ে থাকে।
স্পেকট্রোস্কোপের বর্ণালী। ছবি: ই-মেইজ
ঢাকার রাস্তায় রাতের বেলা ভ্রমণ করলে দেখা যাবে, অনেক স্থানে রাস্তা আলোকিত করে রেখেছে হলুদাভ একধরনের বাতি। কেউ যদি মাঝরাতে বিমানবন্দর থেকে রামপুরা যায়, তাহলে রাস্তা ফাঁকা পাবে। বাসে চড়লে একটার পর একটা হলুদ বাতি অতিক্রম করবে আর এর পেছনের বৈজ্ঞানিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবে। এই হলুদ বাতিগুলো মূলত সোডিয়াম বাষ্পের আলো প্রদান করে। অন্যান্য মৌল অন্য রংয়ের আলো প্রদান করে। মৌল ভেদে আলোর রংয়ের তারতম্য কেন ঘটে কিংবা বিশেষ উপায়ে এসব মৌল কেন বর্ণালী প্রদান করে তা আবার পদার্থবিজ্ঞানের আরেক গল্প।
রাস্তায় ব্যবহার করা সোডিয়ামের আলোগুলো হলদেটে হয়ে থাকে। ছবি: নর্থ কোস্ট কারেন্ট
প্রথম উদাহরণ হিসেবে হাইড্রোজেন বর্ণালীর দিকে খেয়াল করি। নিচের ছবিটি হাইড্রোজেনের বর্ণালী নির্দেশ করছে। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে, হাইড্রোজেন চারটি রেখার সৃষ্টি করে। একটি বর্ণালীর বেগুনী অংশে, আরেকটি কালচে নীল অংশে, আরেকটি মলিন নীল অংশে এবং আরেকটি লাল অংশে।
হাইড্রোজেন বর্ণালী। ছবি: ডেভ ম্যাককেইন
বর্ণালীবীক্ষণ দিয়ে পরীক্ষা করলে কোন ধরনের বর্ণালী পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে উৎস কোন অবস্থায় আছে কিংবা কীসের সাথে সংযুক্ত আছে তার উপর। তবে এসব ছাপিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, নির্দিষ্ট কোনো মৌলের জন্য রেখাগুলো সবসময় একই অবস্থানে থাকে। রেখা রঙিন হোক আর কালো হোক, তার অবস্থান সবসময় বর্ণালীর একই অবস্থানে থাকে।
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে বসে সকল মৌলের বর্ণালী রেকর্ড করে রেখেছেন। তাই দূর নক্ষত্র থেকে আগত আলোক রশ্মির বর্ণালী বিশ্লেষণ করে এবং পরে তা রেকর্ড থেকে মিলিয়ে নিয়ে তারা বলে দিতে পারেন, নক্ষত্রটি কোন কোন উপাদান দিয়ে তৈরি।
বিজ্ঞানীরা সকল মৌলের বর্ণালী নির্ণয় করে রেখেছেন। ছবি: জিওফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি
তবে আপাত দৃষ্টিতে এখানে কিছু সমস্যার কথাও মনে হতে পারে। নক্ষত্র একাধিক মৌল দিয়ে গঠিত হতে পারে এবং এসব মৌল একসাথে তালগোল পাকিয়ে খিচুড়ি অবস্থা করে ফেলতে পারে। এমতাবস্থায় এদের থেকে আগত আলোক রশ্মি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে কিছু সমস্যা হবার কথা ছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র বিশেষ উপায়ে এদেরকে আলাদা করে নিতে পারে। ফলে বড় একটি সমস্যার একদম জলের মতো সহজ সমাধান আমরা পেয়ে যাই। স্বীকার না করে উপায় নেই যে, এটি খুবই চমৎকার একটি যন্ত্র!
যে সকল নক্ষত্র আমরা দেখতে পাই, তাদের বেশিরভাগই আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে অবস্থিত। রাতের আকাশে নক্ষত্রমণ্ডলীর বেশিরভাগই অবস্থিত আমাদের কাছাকাছিই অর্থাৎ আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সিতে। অল্প কিছু উজ্জ্বল বস্তু দেখা যায়, যারা দূরের অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে অবস্থিত। দূরের গ্যালাক্সির কোনো নক্ষত্রের সোডিয়াম বর্ণালী পরীক্ষা করে দেখলে অবাক করা কিছু পার্থক্য দেখা যাবে। নিচের ছবিটিতে তিনটি ভিন্ন স্থানের সোডিয়ামের বারকোড বর্ণালী দেখানো হয়েছে- উপরেরটি আমাদের পৃথিবীর, মাঝেরটি কাছের গ্যালাক্সির যেকোনো নক্ষত্রের এবং নিচেরটি দূরবর্তী নক্ষত্রের।
তিনটি ভিন্ন অবস্থানে সোডিয়াম বর্ণালীর পার্থক্য। ছবি: ডেভ ম্যাককেইন
উপরে পৃথিবীর বারকোডের সাথে নীচে দূরবর্তী নক্ষত্রের বারকোড তুলনা করলে তাদের অবস্থানের বেশ পার্থক্য দেখা যায়। অথচ উপরে বলা হয়েছিল বারকোডের অবস্থান সবসময় একই হবে। কিন্তু এখানে বারকোডের অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন দেখাচ্ছে। এরকম হলে কীভাবে আমরা নিশ্চিত হবো যে, এগুলো আসলেই সোডিয়াম মৌলের বর্ণালী?
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার খেয়াল করতে হবে যে, বর্ণালীর রেখাগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব একই। দূরে সরলে সম্পূর্ণ প্যাটার্নটিই দূরে সরেছে, কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যবর্তী দূরত্ব আগের মতোই আছে। শুধু সোডিয়ামের বেলাতেই নয়, অন্যান্য মৌলের বেলাতেও এরকম হয়। দূরবর্তী নক্ষত্রের বেলায় সেসব মৌলের বর্ণালীর সবটাই দূরে সরে যায় কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যবর্তী দূরত্ব সবসময় ঠিকই থাকে। সেই হিসেবে বর্ণালীর রেখা বা বারকোডের মধ্যবর্তী দূরত্ব বিশ্লেষণ করেও কোনো অজানা মৌলের পরিচয় জানা সম্ভব।
উপরের ছবিটির দিকে খেয়াল করলে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দেখা পাওয়া যাবে। পৃথিবীর প্যাটার্নের নিচে, মাঝের প্যাটার্নটি আমাদের গ্যালাক্সির কাছের নক্ষত্রগুলোর। এই নক্ষত্রগুলো থেকে আগত বর্ণালীরেখা লাল রঙের দিকে সরে যাচ্ছে। যদিও কাছের নক্ষত্রগুলোর বর্ণালী লালের দিকে সরে যাবার পরিমাণ খুব বেশি নয়। অন্যদিকে দূরের নক্ষত্রগুলোর বর্ণালীও লালের দিকে সরে যাচ্ছে, আর এখানে সরে যাবার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি।
সোডিয়ামের পাশাপাশি অন্য কোনো মৌলকে নিয়ে বিশ্লেষণ করলেও একই ঘটনার দেখা পাওয়া যাবে। সকলেই লালের দিকে সরে যাবে। গ্যালাক্সি যত দূরে অবস্থিত হবে, তাদের বর্ণালী লালের দিকে সরে যাবার পরিমাণ তত বেশি হবে। নক্ষত্রের বর্ণালীরেখা লাল রঙের দিকে সরে যাবার এই ঘটনাকে বলা হয় ‘লাল সরণ’। একে Hubble Shift বা হাবল সরণও বলা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবলের নামানুসারে এরকম নামকরণ করা হয়েছে। হাবলই দূরবর্তী নক্ষত্রের বেলায় প্রথম লাল সরণ আবিষ্কার করেছিলেন। বিভিন্ন গ্যালাক্সির অনেক বিখ্যাত ছবি হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে তোলা, হাবল টেলিস্কোপের নামকরণও করা হয়েছে এডউইন হাবলের নামানুসারে।
এডউইন হাবল। ছবি: ই-মেইজ
এই লাল সরণ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সম্পর্কে আমাদেরকে ধারণা দেয়। ব্যাপারটি হচ্ছে বিগ ব্যাং। বিগ ব্যাংয়ের ফলে যে গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর দূরে সরে যাচ্ছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় লাল সরণ পর্যবেক্ষণ করে। গ্যালাক্সি যত দূরে অবস্থিত হবে, তার বর্ণালী লালের দিকে সরে যাবার পরিমাণও বেশি হবে। তাই কোনো গ্যালাক্সি যদি ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যেতে থাকে, তাহলে তার বর্ণালীও ধীরে ধীরে লালের দিকে সরে যেতে থাকবে। যদি কোনো গ্যালাক্সির বর্ণালী পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, এর বর্ণালী লালের দিকে সরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, তাহলে ধরে নিতে হবে যে এই গ্যালাক্সিটি দূরে সরে যাচ্ছে। বর্ণালী লালের দিকে যত দ্রুত অগ্রসর হয়, সেটি তত বেশি বেগে দূরে সরে যায়।
বিজ্ঞানী এডউইন হাবল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখেছিলেন যে দূরবর্তী গ্যালাক্সির বর্ণালী লালের দিকে অগ্রসর হয়। গ্যালাক্সিগুলো যত দূরে অবস্থান করছে, লালের দিকে অগ্রসরের পরিমাণ তাদের তত বাড়ছে। তিনি ধরে নেন, যেহেতু লালের দিকে সরণ হচ্ছে, সেহেতু গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর দূরে সরে যাচ্ছে। এবং এটা হচ্ছে আনুপাতিক হারে। যেহেতু আনুপাতিক হারে সরে যাচ্ছে, তার মানে উল্টোদিকে গেলে এমন একটা সময়ের দেখা পাওয়া যাবে, যেখানে সমস্ত মহাবিশ্ব একত্রিত অবস্থায় ছিল। আর তাদের একত্র অবস্থা থেকে মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিল বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে।
মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের চিন্তাধারাই পালটে দিয়েছিল এই আবিষ্কার। একই সাথে এ আবিস্কার মানুষের বাস্তবিক জগত এবং আত্মিক জগতেও অনেক প্রভাব রেখেছিল। আর অবশ্যই এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র বা স্পেকট্রোস্কোপ, তাই চাকা, প্রিন্টিং প্রেস, টেলিফোন কিংবা কম্পিউটারের মতোই সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন বলা যায় এই যন্ত্রটিকে।
সংক্ষেপে দেখুন‘পিংক মুন’ আসলে কি?
আচ্ছা, ‘পিংক মুন’ বা গোলাপি চাঁদের নাম শুনেছেন কখনো? নাম শুনে কী মনে হয়? ব্লাড মুন যেভাবে নিজের নামের অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রক্তের মতো লাল রঙ নিয়ে আকাশে উদিত হয়, ঠিক তেমনি পিংক মুনও তার নামের সাথে মিল রেখে গোলাপি রঙ ছড়িয়ে উদিত হয়? সত্যি বলতে, পিংক মুনের সাথে ‘পিংক’ বা গোলাপি রঙের কোনো সম্পর্কইবিস্তারিত পড়ুন
আচ্ছা, ‘পিংক মুন’ বা গোলাপি চাঁদের নাম শুনেছেন কখনো? নাম শুনে কী মনে হয়? ব্লাড মুন যেভাবে নিজের নামের অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রক্তের মতো লাল রঙ নিয়ে আকাশে উদিত হয়, ঠিক তেমনি পিংক মুনও তার নামের সাথে মিল রেখে গোলাপি রঙ ছড়িয়ে উদিত হয়?
সত্যি বলতে, পিংক মুনের সাথে ‘পিংক’ বা গোলাপি রঙের কোনো সম্পর্কই নেই। একটি সাধারণ চাঁদ বা পূর্ণিমা দেখতে যেমন হয়, পিংক মুনও দেখতে ঠিক একই রকম। তবে নামের কারণ বা ভিন্নতা রয়েছে এই নাম দেওয়ার ইতিহাস বা তাৎপর্যের ক্ষেত্রে। এপ্রিলের পূর্ণিমাকেই বলা হয় ‘পিংক মুন’ বা ‘ফুল পিংক মুন’।

এপ্রিলের পূর্ণিমাকেই বলা হয় ‘পিংক মুন’; Image source: narcity.com
পিংক মুন নামটি যেভাবে এলো
প্রাচীনকালে চন্দ্রপঞ্জিকা দেখেই মৌসুম বা মাস ঠিক করা হত। তখন সৌরপঞ্জিকার মতো স্থির কোনো পঞ্জিকা ছিল না যা দেখে সহজেই বারো মাসের হিসাব বোঝা যাবে।

চন্দ্রপঞ্জিকা ২০১৯; Image source: vertex42.com
পূর্ণিমা মানেই নতুন মাসের আগমন ধরে নেওয়া হত। সেই সময়ে জুলিয়ান বা গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা তারা অনুসরণ করতো না। এই ভিন্ন ভিন্ন পূর্ণিমার মাধ্যমেই তারা মাসের হিসাবটা করে নিত। যুগের পর যুগ ইউরোপ এবং আদি আমেরিকান আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো এই নিয়মই মেনে চলেছে। ইউরোপিয়ান বা স্থানীয় আমেরিকান জনগণ নিজেদের সুবিধার্থে প্রত্যেকটি পূর্ণিমার আলাদা আলাদা নামও নির্ধারণ করে দেয়। নামগুলো তারা উত্তর গোলার্ধে ঘটে যাওয়া সাধারণ ঘটনা বা কোনো মাসের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই ঠিক করা হয়। যেমন- জানুয়ারির ‘ফুল ওলফ মুন’, ফেব্রুয়ারির ‘ফুল স্নো মুন’, মার্চের ‘ফুল ওর্ম মুন’, এপ্রিলের ‘ফুল পিংক মুন’, মে মাসের ‘ফুল ফ্লাওয়ার মুন, জুনের ‘ফুল স্ট্রবেরি মুন’, জুলাইয়ের ‘ফুল বাক মুন’, আগস্টের ‘ফুল স্টার্জন মুন’, সেপ্টেম্বরের ‘ফুল কর্ন মুন’, অক্টোবরের ‘ফুল হান্টার্স মুন’, নভেম্বরের ‘ফুল বীবর মুন’ এবং ডিসেম্বেরের ‘ফুল কোল্ড মুন’। এগুলো ছাড়াও কোনো কোনো বছর ১৩টা ‘ফুল মুন’ বা পূর্ণিমা দেখা যায়। অতিরিক্ত একটি পূর্ণিমার নাম ‘ব্লু মুন’।
কেন এই চাঁদকে ‘পিংক মুন’ বলা হয়?
এপ্রিল মাসের পূর্ণিমাকে ‘পিংক মুন’ বলা হয়। তবে চাঁদটি দেখতে একদমই ‘পিংক’ বা ‘গোলাপি’ রঙের নয়। আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে হালকা হলুদ, কমলা, লাল বা সাদা হতে পারে।

চাঁদটি দেখতে হালকা হলুদ, কমলা, লাল বা সাদা হতে পারে; Image source:wyso.org
তবে গোলাপি কোনোভাবেই হবে না। নিতান্তই কাকতলীয় বিষয় হবে যদি কোনো বছর লাল এবং সাদা মিলে হালকা গোলাপি দেখায় এই ‘পিংক মুন’। স্বাভাবিক কারণেই তাহলে প্রশ্ন আসে- গোলাপি চাঁদ না হলে এর নাম ‘পিংক মুন’ হয় কেন? নামটি আসলে এই মাসের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে আসে। বসন্তের এই সময়ে বিভিন্ন নতুন ও সুগন্ধি ফুলের আগমন ঘটে। এর মধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকায় ‘মস পিংক’ বা ‘ওয়াইল্ড গ্রাউন্ড ফ্লক্স’ ফুল ফোঁটা খুব সাধারণ একটি বিষয়। এটি আদি আমেরিকার একপ্রকার বন্য ফুল। সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত প্রতি বছরই এ সময়ে এই ফুলে চারপাশের পরিবেশ ভরে ওঠে। আর এসব ফুলের গোলাপি রঙের আভা যেন এ সময়ে ভূমি থেকে আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।
পিংক মুনের আধ্যাত্মিক অর্থ
আধ্যাত্মিক অর্থে, পিংক মুন বা গোলাপি চাঁদ হলো পুনর্জাগরণ এবং নবজীবনের প্রতীক। মার্চের ফুল মুন বা পূর্ণিমাকে বলা হয় ফুল ওর্ম মুন। এটা হলো শীতের মৌসুমের শেষ পূর্ণিমা। একনাগাড়ে লম্বা সময়ের জন্য ঠাণ্ডা, বেরঙ, নীরস এবং করুণ শীতকালের কারণে পরিবেশটা কেমন জানি মরা মরা হয়ে যায়। ফলে এপ্রিল আসতে আসতে বসন্তের আগমন যে আনন্দ ও সৌন্দর্য আশেপাশের বাতাবরণে ছড়িয়ে দেয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই এপ্রিলের প্রথম পূর্ণিমা যে পরিবেশের নতুন জন্ম ও সৌন্দর্যের প্রতীক তা অনেকটা বোধগম্য। অনেকের বিশ্বাস, পিংক মুনের আলো সকলের শক্তি ও প্রাণ আবার ফিরিয়ে আনবে। পিংক মুন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন হলো উত্থান-পতন, শীতযাপন এবং পুনর্জাগরণের একটি চক্র যা মৃত্যু অবধি চলতেই থাকে। যেমন- প্রতি বছর এই সময়ে গোলাপি রঙের ওয়াইল্ড গ্রাউন্ড ফ্লক্সের আগমন ঘটে এবং কিছু সময় পর তা চলে যায়। পরবর্তীতে নতুন রূপে ও নতুন সৌন্দর্যে আবার ফিরে আসে।


ওয়াইল্ড গ্রাউন্ড ফ্লক্স; Image source:gardenia.net
এই মুনের অন্য নামগুলো হলো স্প্রাউটিং গ্রাস মুন, হেয়ার মুন, ফিশ মুন ও এগ মুন। প্রত্যেকটি নামের পেছনেই এই মৌসুমের কোনো বৈশিষ্ট্যের ছাপ দেখা যায় । যেমন- এই সময়ে নতুন করে ঘাস গজানো শুরু করে। তাই এর নাম ‘স্প্রাউটিং গ্রাস মুন’। আরেক নাম ‘এগ মুন’, কারণ বসন্তে পাখিরা ডিম পাড়ে। ফিশ মুনও বলা হয়, কেননা মাছের ফলন এই মৌসুমে অধিক। খরগোশ এই ঋতুতেই সন্তান জন্ম দেয়। আর এজন্য এপ্রিলের পূর্ণিমাকে ‘হেয়ার মুন’ও বলা হয়। উল্লেখ্য যে, মে মাসের পূর্ণিমাকেও ‘হেয়ার মুন’ বলা হয়। তাছাড়া এপ্রিল মাসের এই প্রথম পূর্ণিমা যাজকীয় বা খ্রিস্টানদের পঞ্জিকায় ‘প্যাসচেল মুন’ নামেও পরিচিত। পিংক মুন খ্রিস্টানদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ‘ইস্টার সানডে’র তারিখ নির্ধারণে সহায়তা করে বিধায় এর নাম ‘প্যাসচেল মুন’ দেওয়া হয়।
পিংক মুন খ্রিস্টানদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ‘ইস্টার সানডে’র তারিখ নির্ধারণে সহায়তা করে; Image source: visitrenotahoe.com
এপ্রিলের পূর্ণিমার পর প্রথম যে রবিবার আসে সেই দিনই পালিত হয় ইস্টার সানডে। জ্যোতির্বিদরা বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি পূর্ণিমাই আমাদের উপর কোনো না কোনো প্রভাব ফেলে। সবসময় বিষয়টি আমরা বুঝতে না পারলেও প্রতিনিয়ত এরকমই হচ্ছে বলে তাদের ধারণা। জ্যোতির্বিদ সিন্ডি ম্যাককিয়ান বলেন, “জ্যোতির্বিদ্যায় চাঁদ আমাদের অনুভূতি, চক্র, উর্বরতা এবং এরকম আরো কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে।” তিনি আরো বলেন, “এপ্রিলের পূর্ণিমা হলো উজ্জীবনের প্রতীক। এর প্রভাবে মানুষের মধ্যে স্থির অনুভূতি এবং আনন্দ পরিলক্ষিত হয়।” জ্যোতির্বিদ প্যাভলোভার মতে, “পিংক মুন আমাদের অনুভূতিকে মার্চের ফুল মুন থেকে অধিক প্রভাবিত করে। এ সময় সবকিছুতে একপ্রকার ভঙ্গুরতাও দেখা যায়, আবার একপ্রকার নতুনত্বও দেখা যায়। নতুন সম্পর্ক গড়ার এবং নতুন কোনো বিবর্তনও ঘটতে পারে এই সময়।” তার মতে, পিংক মুনের আলোর দরুণ সবকিছু একেবারে নতুন করে গড়তে শুরু করে।
প্রতিটি পূর্ণিমাই কোনো না কোনো রাশিতে উদিত হয়। আর পিংক মুন বৃশ্চিক নক্ষত্রপুঞ্জে উদিত হয়। পূর্ণিমা সাধারণত কোনো কিছুর পরিপূর্ণতা লাভ করা বা পরিসমাপ্তি বোঝায়। আর বৃশ্চিক রাশির কথা বললে এই অর্থটি আরো সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১২টি রাশিকে মোট চার ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- আগুন, মাটি, বায়ু এবং জল রাশি। এই বৃশ্চিক হলো জল রাশির অন্তর্ভুক্ত। তাই এটি স্বভাবতই জল রাশির সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো বহন করে। যথা- ইচ্ছাশক্তি, আত্মসংযম, অনুভূতির গভীরতা। অর্থাৎ এই বিষয়গুলো আমাদেরকে নির্দেশ করে যে মনের ভেতর যত দুঃখ বা অপ্রীতিকর ঘটনা চাপা পড়ে আছে তা ভুলে গিয়ে জীবনটাকে আবার নতুন করে শুরু করাই শ্রেয়। এপ্রিলের পূর্ণিমা যেন একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে যাওয়ার জন্যই বারবার পথপ্রদর্শন করে।

সংক্ষেপে দেখুন‘স্প্রিং ক্লিনিং’ বা বসন্তকালীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জীবনের আরম্ভ করা যায়; Image source: destorage.com
বসন্তের আগমনে গাছপালার পাতা থেকে শুরু প্রায় সকল জীবজন্তুই নতুন করে নিজেদের জীবনটাকে সাজানো শুরু করে। আবার ‘পিংক’ বা গোলাপি রঙ হলো পুনর্জাগরণের রঙ। এসব কিছুর প্রেক্ষিতে বসন্তের এই ‘পিংক মুন’ও যে আমাদের নবজীবন শুরু করার দিকে যেতে বলে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ব্যাপারটি যে শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক বা মনস্তাত্ত্বিক সেরকমও নয়। শুধু মনের মনের ময়লা দূর করার মধ্যেই ‘পিংক মুন’-এর ব্যাপারটি শেষ হয় না। ‘স্প্রিং ক্লিনিং’ বা বসন্তকালীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে ঘরবাড়ি এবং আশেপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রেখে নতুন এবং পরিচ্ছন্ন জীবনের আরম্ভ করা যায়।
মানুষের মাথায় টাক পড়ার কারণ কি?
দীঘল কালো চুল রমণীয় শোভার অলংকার হলেও ঘন চুলের আবেদন কিংবা প্রয়োজনীয়তা পুরুষদের নিকট কম নয় মোটেই। চুলের আবেদন ও প্রয়োজনীয়তা তারাও হাড়ে হাড়ে টের পান যখন মাথার ওপর দৃশ্যমান হয় আস্ত ফাঁকা ময়দান তথা আবির্ভাব হয় টাকের। ‘টেকো’ কিংবা ‘টাকলু’ উপাধি তো জোটেই, পাশাপাশি চুলবিহীন চেহারা ক্ষণে ক্ষণে ববিস্তারিত পড়ুন
দীঘল কালো চুল রমণীয় শোভার অলংকার হলেও ঘন চুলের আবেদন কিংবা প্রয়োজনীয়তা পুরুষদের নিকট কম নয় মোটেই। চুলের আবেদন ও প্রয়োজনীয়তা তারাও হাড়ে হাড়ে টের পান যখন মাথার ওপর দৃশ্যমান হয় আস্ত ফাঁকা ময়দান তথা আবির্ভাব হয় টাকের। ‘টেকো’ কিংবা ‘টাকলু’ উপাধি তো জোটেই, পাশাপাশি চুলবিহীন চেহারা ক্ষণে ক্ষণে বয়ে আনে চাপা দীর্ঘশ্বাস। পৃথিবীর অধিকাংশ লোকেরই একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর চুল কমে যেতে থাকে। বছর পঞ্চাশের পর টাক পড়ে যায় অনেকেরই। কিন্তু এই টাকের আগমন বয়োবৃদ্ধদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। বছর ত্রিশের যুবাও টাকের প্যাঁচে ঘায়েল হয়েছে – এ নজিরও কিন্তু আজ মোটেই কম নয়।
বস্তুত টাকঘটিত নানা দুঃখের পাশাপাশি টাকের নেপথ্যের কারণও নেহায়েত কম নয়। পৃথিবীর শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ মানুষ ত্রিশ বছরের মধ্যে মাথায় টাক গজিয়ে বসেন। টাকের কারণ, আর কেনই বা এর ভুক্তভোগীর তালিকায় সর্বাধিক অগ্রগণ্যতা পেয়েছে পুরুষ সে গল্প নিয়েই লেখা আজকের এই টাক সমাচার।
টাকের বিড়ম্বনা! ছবিসূত্র- (cbsnews.com)
প্রথমেই বলে রাখি, দিনে গড়ে প্রায় ১০০টির মতো চুল পড়া স্বাভাবিক এবং এটা প্রাকৃতিক ও সাধারণ নিয়মবশতই ঘটে। তবে এর বেশি চুল পড়তে থাকাটা খুব স্বাভাবিক না। টাক পড়ে যাওয়াকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘Pattern Baldness’, বৈজ্ঞানিকভাবে যা অ্যানড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া (Androgenetic Alopecia), অ্যানড্রোজেনিক অ্যালোপেসিয়া (Androgenic Alopecia) ইত্যাদি নামে পরিচিত। টাক পড়ার পেছনে দুটি কারণকে দায়ী করা হয়- জীনগত (জীন হলো মানুষের ক্রোমোজমের ডিএনএ এর সেই অংশ যা প্রোটিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে) এবং ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন নামক এক প্রকার অ্যানড্রোজেন হরমোন যা পুরুষের মধ্যে পাওয়া যায়। কারো কারো মাথার দু’পাশে কিংবা পেছনে কয়েক গোছা চুল রয়ে যায় ,আবার কারো কারো সম্পূর্ণ মাথাটাই হয়ে যায় ফাঁকা মাঠ।
কেন পড়ে টাক?
টাকের প্রক্রিয়া জানার আগে চুলের গোড়ার দিকে একটু আলোকপাত করা যাক। আমাদের প্রিয় চুলগুলো তৈরি হয় ‘হেয়ার ফলিকল’ নামক অংশে। এই হেয়ার ফলিকল মাথার চামড়ার নিচের একটি গহ্বর সদৃশ অংশ যেখানে চুল তৈরি হয়, সেখানে বৃদ্ধি পায় প্রায় ২ থেকে ৬ বছর, অতঃপর প্রকৃতির নিয়ম মেনে কিছুদিন বৃদ্ধি রহিত হয়ে স্থিতাবস্থায় থাকে এবং তারপর ঝরে পড়ে। এরপর সেখানে আবার নতুন চুল গজায় এবং চক্রটি পুনরায় চলতে থাকে। এভাবে চুল গজানো, বৃদ্ধি, ঝরে যাওয়া এবং আবারও গজানোর প্রক্রিয়া চলতে থাকে মানুষের জীবনে।
মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ এনজাইমসমূহের ক্রিয়ায় পুরুষের দেহের হরমোন টেস্টোস্টেরন পরিণত হয় ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরনে। চর্মবিশেষজ্ঞ ও গবেষক কাটো মর্কের মতে, “এই ধরণের এনজাইমগুলো একজনের শরীরে কী পরিমাণে বিদ্যমান তার কারণ বংশগত। তবে এটি পিতার নাকি মাতার জীন কিংবা উভয়েই নির্ধারণ করে কিনা তা এখনও অজানা।” ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন এমন একটি হরমোন যা চুলের বৃদ্ধির স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত ও ধীর করে এবং চুলগুলোকে খাটো ও পাতলা করে দেয়। চুলগুলোকে কৃশকায় বানানোর পাশাপাশি ঝরে যাওয়া চুলকে নতুন চুল দিয়ে প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াকেও ব্যাহত করে এই হরমোনটি।
টাক পড়ার নানা ধাপ। ছবিসূত্র- independent.co.uk
বিজ্ঞানীরা মনে করেন হরমোনটি তৈরিকারী এনজাইমগুলো এশিয়ান পুরুষে কম তৈরি হয় বিধায় তাদের চুল পড়ার হারও ককেশিয়ান পুরুষদের থেকে কম। এছাড়াও টাক পড়ে যাওয়া অনেকাংশে নির্ভর করে মাথার ত্বকে কতগুলি রিসেপ্টর আছে তার ওপর। এই রিসেপ্টর যত বেশি হবে চুলও তত দ্রুত পড়বে। এমনকি পর্যাপ্ত পরিমানে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন এবং এটি তৈরিকারী এনজাইম থাকা সত্ত্বেও এগুলোর গ্রহীতা রিসেপ্টরের অপ্রতুলতা থাকলে মাথায় টাক পড়বে না!
চুল পড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় হেয়ার ফলিকলগুলোর ক্রমসংকোচনের মাধ্যমে। এই কুঁচকে যাবার দরুন ফলিকলগুলো স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অনেক ছোট হয়ে যায়। ফলে এখান থেকে গজানো চুলগুলোও হয় তুলনামূলকভাবে কৃশকায়। স্বাভাবিক চুলের চেয়ে তাড়াতাড়ি ঝরেও পড়ে এ চুলগুলো। এরূপে ধীরে ধীরে ফলিকলগুলো এতই সংকুচিত হয় যে, তাতে চুলের কিয়দংশ গজায় ঠিকই কিন্তু তা আর মাথার ত্বক অবধি আসে না। ফলাফল মাথার উপরিভাগে সূচনা হয় চুলহীনতার তথা টাকের।
যদিও বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া জনিত টাকের পেছনে অনেকগুলো জীনের ভূমিকা রয়েছে, এখন পর্যন্ত একটি এমন জীন পাওয়া গেছে যার পরিবর্তনের সাথে টাকের সম্পর্ক বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই জীনটি হলো ‘এআর’ জীন (AR) যা কিনা একপ্রকার অ্যানড্রোজেন রিসেপ্টর প্রোটিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এই রিসেপ্টরগুলোই ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন এবং অন্যান্য অ্যানড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে ত্বরান্বিত করে টাক পড়া। এই এআর জীনের কোনো ধরণের পরিবর্তনই বাড়িয়ে দেয় চুল পড়া।
টাকের ইতিবৃত্ত
কারো টাক পড়ে মাথার উপরে পেছনভাগে, আবার কারো বা দুই চোখের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকেই হয় সূত্রপাত। কিছুক্ষে ত্রে ইংরেজি ‘এম’ হরফের ন্যায় অঞ্চল তৈরি হয় মাথায় আবার কারো ক্ষেত্রে পুরো মাথাই হয়ে যায় ফাঁকা। মূলত মাথার ত্বকের তিনটি অঞ্চলে চুল কমে যাওয়াটা বেশি লক্ষণীয়-
১) মাথার একদম সম্মুখভাগের চুলের সারি থেকে চুল পড়া শুরু হয় অনেকের। বলা হয় কিশোর থেকে যুবায় পরিণত হবার সময় মাত্র ৫% লোকেরই সেই কৈশোরকালীন প্রান্তীয় চুলের রেখা বজায় থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই চুল পড়ে যাবার হার মৃদু। তবে অনেকের ক্ষেত্রে দুই চোখের পার্শ্ববর্তী এলাকার চুলগুলো ঝরে যেতে থাকে এবং অনেকের ক্ষেত্রেই ইংরেজি ‘এম’ অক্ষরের ন্যায় চুলবিহীন অঞ্চল তৈরি হয়।
মাথার সম্মুখভাগের টাক। ছবিসূত্র- independent.co.uk
২) মাথার পেছনের উপরিভাগে চুল কমে যায় অনেকের যা আস্তে আস্তে বিস্তৃত হতে থাকে চারিদিকে।
মাথার পেছনের উপরিভাগে পড়া টাক। ছবিসূত্র- independent.co.uk
৩) মাথার মধ্য-সম্মুখভাগে চুল পাতলা হতে থাকা বিশেষত এশিয়ান পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এমনকি যে সকল মহিলাদের চুল পাতলা হয়ে যায় বয়সের সাথে, তাদের মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষ্যণীয়।
মাথার মধ্য ও সম্মুখভাগে চুল পাতলা হয়ে যায়। ছবিসূত্র- arochahairrestoration.com
এই টাকজনিত চুল পড়ে যাওয়া এক হেয়ার ফলিকল থেকে অন্য হেয়ার ফলিকলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মধ্যবর্তী কোনো অঞ্চলই এর থেকে রেহাই পায় না। এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যেন কোনো ব্যাপন প্রক্রিয়ায় কোনো রাসায়নিক বস্তু এটি ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু টাকের পেছনে দায়ী এমন কোনো রাসায়নিক পদার্থের হদিs পাওয়া যায়নি। এমনকি টাকসংলগ্ন মাথার চুলযুক্ত এলাকা থেকে কিছু অংশ শরীরের অন্য অংশে প্রতিস্থাপন করা হলেও চুলগুলোর ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে যাওয়াটা চলতে থাকে, দেখলে মনে হয় যেন তারা শরীরের অন্য কোনো অংশে নয় বরং এখনও মাথায়ই রয়ে গেছে। এতে বোঝা যায় যে হেয়ার ফলিকলগুলোর ডিএনএতেই এমন কোনো পরিবর্তন হয়েছে যা এগুলোকে এরূপ আচরণে বাধ্য করছে।
চুল কমে যাবার এ ধারার বাইরেও অন্য এক প্রকারেও চুল কমে যায় যা সচরাচর আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। মাথায় যে চুলগুলো গজায় তা দেহের অন্যত্র গজানো লোমগুলো থেকে আলাদা। অসংখ্য ফলিকল একক থেকে জন্মানো এক গুচ্ছ চুল একটি নির্দিষ্ট গহ্বর থেকে মাথার উপরিভাগে বের হয়। প্রতিটি গুচ্ছে ২-৫ টি চুল থাকে। প্রতিটি ফলিকল একক থেকে একটি প্রাথমিক চুল বের হয়। জন্মের সময় শুধু এই প্রাথমিক চুলগুলো থাকে বলেই নবজাতকের চুলগুলো পাতলা এবং নমনীয় হয়। পরবর্তী দু-তিন বছরে অন্য চুলগুলোও গজিয়ে গেলে চুলের ঘনত্ব ও আয়তন বেড়ে যায়।
যেভাবে হেয়ার ফলিকল হতে চুল গজায়। ছবিসূত্র- independent.co.uk
অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া হলে তা পরবর্তী সময়ে গজানো চুলগুলোর উপর সর্বপ্রথম প্রভাব ফেলে। চুলগুলো ছোট হতে হতে একসময় প্রতিটি গহ্বর থেকে একটি মাত্র চুল ছাড়া অন্যান্য কোনো চুলই আর অবশিষ্ট থাকে না। এভাবে চুল পাতলা হয়ে যায়। যখন সেই একমাত্র চুলটিরও একই পরিণতি হয় তখনই টাক পড়তে শুরু করে। এক্ষেত্রে এমনও হতে পারে যে মাথার চুলের শতকরা ৫০ ভাগ পড়ে যাওয়া সত্ত্বেও টাক নাও পড়তে পারে। মেয়েদের বেণী বা খোঁপার ঘনত্ব দেখে যদিওবা চুল পড়ে যাচ্ছে আঁচ করা যায়, ছেলেদের চুল ছোট হওয়ায় এক্ষেত্রে টাক পড়ার আগ পর্যন্ত সেটি বোঝা বেশ দুষ্কর। এক্ষেত্রে রোদে পোড়া মাথার ত্বক দেখে ব্যাপারটি আঁচ করা যেতে পারে।
আগেই বলেছি এই দু’প্রকার চুল পড়ার পেছনে জীন ও বংশগত কারণই দায়ী। বংশগতভাবে কারো টাক থাকলে তারও টাকের ভুক্তভোগী হবার ঝুঁকি বেশি। আবার পরিবেশের প্রভাবও রয়েছে কিছুটা। সদৃশ জমজদের ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রায় একই বয়সে তাদের চুল পড়ে যায় এবং তা একই হারে ও ধাঁচে ঘটে। তবে অনেকক্ষেত্রে বিভিন্ন রোগের কারণেও টাক পড়তে পারে। যেমন পুরুষের ক্ষেত্রে করোনারি হার্ট ডিজিজ, প্রোস্টেট ক্যান্সার এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম হলে তা অ্যানড্রোজেন বাড়িয়ে দিতে পারে যা অ্যানড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়ার জন্য দায়ী।
পুরুষই কেন হয় টেকোমাথা?
অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়ার ভুক্তভোগী শুধুই ছেলেরা এ ধারণাটি ভুল। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে পুরো মাথায় চুল পড়ে গেলেও একেবারে টাক পড়তে সচরাচর দেখা যায় না। ক্ষেত্রবিশেষে মাথায় চুলহীন এলাকার উদ্ভব হলেও তা অনেক বেশি বয়সের আগে দেখা যায় না। কেন ভুক্তভোগীদের মধ্যে পুরুষের অগ্রগণ্যতা বেশি? উত্তর হলো- চুল পড়ে যাবার জন্য মূলত দায়ী টেস্টোস্টেরন যা পুরুষত্ব নির্ধারণকারী হরমোন। চর্মবিজ্ঞানী কাটো মর্কের মতে, “যেহেতু পুরুষদের হরমোন টেস্টোস্টেরনের চুলের ওপর সর্বোচ্চ প্রভাব আছে, তাই মেয়েরা ঠিক পুরুষদের মতো চুল হারায় না।” তবে মেনোপজের পরে মেয়েদের শরীরের মেয়েলি হরমোন ইস্ট্রোজেন কমে যায় বিধায় মেয়েদের শরীরে আগে থেকেই থাকা টেস্টোস্টেরন আরো বেশি সক্রিয় হয়ে চুল পড়ায় প্রভাব ফেলে। তবে পুরুষের মতো নির্দিষ্ট অঞ্চলে টাক পড়ার পরিবর্তে পুরো মাথায় চুলের ঘনত্ব কমে যাবার নজির পাওয়া যায়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে মেয়েদেরও টাক পড়তে দেখা যায়, যদিও তা অতিমাত্রায় বিরল।
অ্যানড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়ার দরূণ মেয়েদের চুল পড়া
“মেয়েরা যেমন মুটিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন, ছেলেরা তেমনি চুল পড়া নিয়ে”- বলেন প্রাণীবিদ পার জ্যাকবসেন। তবে ছেলেরা সান্ত্বনার বাণী হিসেবে জেনে রাখুন, প্রাণীকুলে কেবলমাত্র আপনারাই এর ভুক্তভোগী নন, বরং অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও পাওয়া যায় এর নজির। শিম্পাঞ্জি, ম্যাকাকুই (পুং ও স্ত্রীলিঙ্গ উভয়েই), পূর্ব কেনিয়ার সাভো সিংহের মধ্যেও টাকের নিদর্শন পাওয়া যায়। কিছু কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে চুলবিহীন পুরুষের আবেদনই স্ত্রী প্রাণীদের কাছে বেশি।
টাক থেকে রেহাই পাবার উপায় কী?
কোনো ফলপ্রসূ চিকিৎসা নেই যা এর নিরাময় করবে। তবে কিছু প্রচলিত পদ্ধতি আছে যেমন- ফিনাস্টেরাইডের মতো ঔষধ সেবন, মিনোক্সিডিল লোশনের ব্যবহার ইত্যাদি। তবে এগুলোর ব্যবহারের নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি নানা বিরূপ প্রভাব ও ঝুঁকি রয়েছে। এগুলোর ফলাফলও খুব কার্যকরী নয় বরং ব্যবহার বন্ধে আবারও ফিরে আসবে টাক। এছাড়াও অনেকেরই পুরো মাথার চুল পড়ে যায় না, বরং মাথার পেছনভাগে কিছু চুল থেকে যায়। অনেকেই এই মাথার পেছনভাগের চুল ও ত্বক নিয়ে মাথার অন্যান্য অংশে ‘হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট’ বা চুল প্রতিস্থাপন সার্জারির মাধ্যমে ফিরে পান নিজের চুল। টাক ঘুচিয়ে ফেলার একটি পন্থা এটি।
চুল পড়ায় মিনোক্সিডিল লোশনের ব্যবহার। ছবিসূত্র- youtube.com
একপ্রকার হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট পদ্ধতি। ছবিসূত্র- quora.com
চুল পড়ে যাওয়া এবং টাকের উদ্ভব বয়ে আনে দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতা। এই সমস্যাটির পাকাপাকি সমাধান আজ অবধি পাওয়া না গেলেও আধুনিক বিজ্ঞান ভবিষ্যতে হয়তো খুঁজে নিয়ে আসবে এর পেছনের প্রকৃত কারণ ও সমাধান।
সংক্ষেপে দেখুনমানব মস্তিষ্ক কি আসলেই সুপারকম্পিউটারের চেয়ে শক্তিশালী ?
আমাদের গোটা শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে ধড়ের উপর বসে থাকা মস্তিষ্কটি। এত জটিল, অসাধারণ আর সুক্ষ্ম মস্তিষ্ক এত নিখুঁতভাবে আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে যে তার বর্ণনা শুনতে গেলে যে কারো চোয়াল ঝুলে পড়তে বাধ্য। তবে মস্তিষ্ক নিয়ে ভ্রান্ত ধারনাও কম নেই একেবারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক সে সব কথা অবিশ্বাস্য তথ্য। মস্তিষবিস্তারিত পড়ুন
আমাদের গোটা শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে ধড়ের উপর বসে থাকা মস্তিষ্কটি। এত জটিল, অসাধারণ আর সুক্ষ্ম মস্তিষ্ক এত নিখুঁতভাবে আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে যে তার বর্ণনা শুনতে গেলে যে কারো চোয়াল ঝুলে পড়তে বাধ্য। তবে মস্তিষ্ক নিয়ে ভ্রান্ত ধারনাও কম নেই একেবারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক সে সব কথা অবিশ্বাস্য তথ্য।
মস্তিষ্কের শরীরবৃত্ত
মস্তিষ্কের মোট ওজন তিন পাউন্ডের মত। সারা শরীরের সাথে তুলনা করলে আমাদের শরীরের মোট ওজনের মাত্র দু’ভাগ দখল করে আছে মস্তিষ্ক। কিন্তু খরচের বেলায় সে মুক্তকচ্ছ। আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি তার শতকরা ২০ শতাংশ একাই খরচ করে। এই খাদ্য এবং অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার জন্য ১,০৪০-৮০ লিটার রক্ত পরিবাহিত হয় চব্বিশ ঘণ্টায়।
মস্তিষ্ক; source: buzzkeys.com
সে কি শুধু খরচ করে? উহু, একদম নয়। প্রতিদিন মস্তিষ্কে ১২ থেকে ২৫ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। লো ভোল্টেজের LED জ্বালানোর জন্য যথেষ্ট নয় কি?
মস্তিষ্কের অধিকাংশই পানি। পরিসংখ্যানে আনলে দাঁড়ায় ৭৩ শতাংশের মত। বাকি সাতাশ ভাগের ৬০ ভাগই আবার চর্বি। সত্যি বলতে কী, আমাদের দেহের সবচেয়ে ফ্যাটি অংশ এই মস্তিষ্কই। চর্বির কথা আরেকটু বলতে গেলে, আমরা সবসময় কোলেস্টেরল ছাড়া খাবার খুঁজি। কিন্তু শরীরের মোট সঞ্চিত কোলেস্টেরলের ২৫ ভাগ মানে প্রতি চার ভাগের এক ভাগই মস্তিষ্কের কোষে থাকে। এই কোলেস্টেরল এতই অত্যাবশ্যকীয় যে এগুলো ছাড়া নিউরন (স্নায়ু কোষ) মারা যাবে।
বিভিন্ন কারণে আমাদের শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কে। মস্তিষ্কে পানির পরিমাণ কমে গেলে আমরা ঠিকভাবে কাজ করতে পারি না। দুই শতাংশ কমে গেলেই আমাদের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাধাপ্রাপ্ত হয়।
একটি নিউরন প্রতি সেকেন্ডে ১,০০০ সংকেত পাঠাতে পারে। প্রতিটি নিউরন অন্যান্য নিউরন এর সাথে প্রায় দশ হাজার বন্ধন তৈরি করে।
নিউরন কোষ source: livescience.com
একটি গমের দানার সমপরিমাণ মস্তিষ্ক টিস্যুতে ১ লক্ষের মতো নিউরন থাকে, যেগুলো পরস্পরের সাথে এক বিলিয়ন বন্ধন তৈরি করে। তাহলে মোট নিউরনের সংখ্যা কত? নিখুঁত হিসেব এখনও পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানিদের ধারণা, সেটা ৮৬ বিলিয়নের কম না। এদের সবাই একরকম তা নয়। প্রায় ১০ হাজার বিভিন্ন রকম নিউরন রয়েছে।
মস্তিষ্ক টিস্যু কিন্তু অক্সিজেনের উপরে খুবই নির্ভরশীল। পাঁচ মিনিট অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে নিউরন মারা যাওয়া শুরু করে। আর নিউরন মারা গেলে সাধারণত তার জায়গা নেয়ার জন্য নতুন কোনো নিউরন তৈরি হয় না। ধূমপান এই অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করার মূল কালপ্রিট। কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছেন তো?
বাচ্চাদের আমরা অনেক সময়ই বলি, এই থাম তো! তোর এখনো বোঝার বয়স হয়নি। ২ বছর বয়সে মস্তিষ্ক ৮০ ভাগ পূর্ণতা পায়। সম্পূর্ণ পূর্ণতা পেতে ২৫ বছর লেগে যায়। সুতরাং আপনি দুই-তিন বছর বয়সের বাচ্চার সামনে যা না তা-ই বলবেন আর ভাববেন সে কিছু বোঝে না, তাহলে কিন্তু ভুল ভাবছেন। বাচ্চারা সব বোঝে!
আমাদের মস্তিষ্ককে সুরক্ষা প্রদান করার জন্য একটি পর্দা রয়েছে যার নাম ব্লাড-ব্রেইন-ব্যারিয়ার। রক্ত থেকে মস্তিষ্কে কী যাবে তা নিয়ন্ত্রণ করে এই পর্দা। ক্ষতিকর পদার্থ এই পর্দা ভেদ করে সাধারণত যেতে পারে না। তবে নিকোটিন কিংবা অ্যালকোহলকে বাধা দিতে পারে না সে।
সারাদিন পঞ্চাশ হাজার বারের বেশি চিন্তা করেন আপনি; source: buzzkeys.com
আপনি সারাদিন সবচেয়ে বেশি কী করেন সেটা কি জানেন? চিন্তা করেন; শুধু চিন্তা করেন আর চিন্তা করেন। সারাদিন প্রায় পঞ্চাশ হাজার বার চিন্তা করেন আপনি! মানে বুঝেছেন? আপনি একজন বড় মাপের চিন্তাবিদ।
কার মস্তিষ্ক কত বড়?
ছেলেদের মস্তিষ্ক মেয়েদের চেয়ে প্রায় ১০ ভাগ বড়। এই তথ্যটি পড়ে ছেলেদের বড় করে হাসি দেয়ার কিছু নেই। যে অংশটি স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করে, সেই হিপোক্যাম্পাস কিন্তু মেয়েদের তুলনামূলক বড়। অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক অন্যদের চেয়ে খানিকটা ছোট ছিলো, প্রায় দশ শতাংশের মত। কিন্তু তাতে নিউরনের ঘনত্ব ছিলো স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে বেশি।
বিগত বিশ হাজার বছরে আমাদের মস্তিষ্কের আকার ক্রমশ ছোট হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে যতটুকু ছোট হয়েছে তা দিয়ে একটি টেনিস বল বানানো যাবে। ভালো কথা, নিয়ান্ডারথালদের মস্তিষ্ক মানুষের চেয়ে বড় ছিলো।
লন্ডনের ট্যাক্সিক্যাব চালকদের হিপোক্যাম্পাস গড়পড়তা মানুষের চেয়ে বড়। কেন? তাদের প্রায় পঁচিশ হাজার রাস্তা মুখস্ত রাখতে হয় যে!
ব্রেনের ক্ষয়
প্রতিনিয়ত চেপে ধরা হতাশা এবং মানসিক অবসাদ মস্তিষ্ক সঙ্কুচিত করে তোলে। আমরা আধুনিক যে ফাস্টফুড খাই তাতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে না। এটি মস্তিষ্কের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। নিয়মিত এই ধরনের খাবার খেলে মস্তিষ্ক সঙ্কুচিত হয়ে যায়।
এই আধুনিক যুগে আমরা একসাথে অনেকগুলো কাজ করতে অভ্যস্ত। কিন্তু মস্তিষ্ক একসাথে দুটি কাজে মনোযোগ দিতে পারে না। ফলে কী হচ্ছে? চটজলদি একটি কাজ সমাধা করে অন্য কাজ মনোযোগ দিতে হচ্ছে। ফলে মনোযোগের সময়সীমা, সক্ষমতা, এমনকি দীর্ঘকালীন স্মৃতি কমে যাচ্ছে আমাদের।
২০০০ সালের দিকে মানুষের মনোযোগের সময়সীমা ছিলো ১২ সেকেন্ড; এখন সেটা কমে ৮ সেকেন্ডে নেমে আসছে।
যখন প্রয়োজনীয় পুস্টি পায় না তখন মস্তিষ্ক কোষগুলো নিজদের ধ্বংস করে ফেলে। আমরা যখন অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার নিয়ন্ত্রণ করি, যেটাকে সবাই ডায়েট বলে, তখন এটা বেশি ঘটে। সুতরাং ডায়েট করার আগে সতর্ক থাকুন।
মস্তিষ্ক নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা
মস্তিষ্ক নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত কথাগুলোর একটি হচ্ছে, আমরা আমাদের মস্তিষ্কের ১০ ভাগ ব্যবহার করি। কথাটি সম্পূর্ণ ভুল। আমরা আমাদের মস্তিষ্কের পুরোটাই ব্যবহার করি। এমনকি ঘুমের সময়ও আমাদের মস্তিষ্ক কার্যকর থাকে। তবে হ্যাঁ, আমরা চর্চার মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্কের সক্ষমতা বাড়াতে পারি।
অ্যালকোহল আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনকে ধ্বংস করে না। তবে অতিরিক্ত অ্যালকোহল মস্তিষ্ক কোষের নিউরনের সাথে থাকা কানেকটিভ টিস্যুকে ধ্বংস করে। আরেকটি ব্যাপার আছে। আপনি যদি আগের দিন পার্টিতে গিয়ে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরে ঘুম থেকে উঠে ভাবেন, “আরে তাই তো! কাল কী করেছিলাম মনে পড়ছে না কেন? কী মুশকিল!” এর মানে এই নয় যে, আপনি গতদিনের স্মৃতি ভুলে গেছেন। এর কারণ ভিন্ন। দেখা গেছে, অ্যালকোহলিক মস্তিষ্ক নতুন কিছু সঠিকভাবে শিখতে পারে না।
মোজার্ট শুনলে মস্তিষ্কের ক্ষমতা বেড়ে যায়- প্রচলিত একটি কথা। শুধু মোজার্ট নয়; এ ধরনের সকল সুরই মস্তিষ্কের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
বলা হয়ে থাকে, মস্তিষ্কে প্রায় ১০ হাজার মাইল লম্বা রক্তনালী রয়েছে। কথাটি অতিরঞ্জিত। সঠিক হিসেবে এটা ৪০০ মাইলের মত। এটাও কিন্তু একেবারে কম নয়।
স্মৃতি
আমরা যখন একটি কাজ করি সেটি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একসাথে মিলে করে। সম্পূর্ণ কাজটি কয়েকটি অংশে ভাগ হয়ে বিভিন্ন অংশে সম্পন্ন হয় এবং শেষে একটি একক কাজ হিসেবে আউটপুট দেয়। আমাদের মস্তিষ্ক পূর্ণতা পাওয়ার পরপরই বুড়ো হতে শুরু করে, অর্থাৎ কম-বেশি পঁচিশ বছরের পর থেকে। সেই হিসেবে বলতে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাধর মস্তিষ্ক এই পঁচিশ বছর বয়সে পাওয়া যায়।
হিপোক্যাম্পাস; source: buzzkeys.com
তবে তার পরে যে মানুষ কোনো কাজে সর্বোচ্চ পরিমাণে নৈপুণ্য দেখাতে পারে না, তা নয়। যেমন মানুষের শব্দজ্ঞান সবচেয়ে পূর্ণতা পায় প্রায় ৭২ বছর বয়সে। দেখাই যাচ্ছে, মস্তিষ্কের দক্ষতার পেছনে অভিজ্ঞতার একটি বড় অবদান রয়েছে।
পৃথিবীতে মিস আর্থ, মিস ইউনিভার্স এর পাশাপাশি আরেকটি প্রতিযোগিতা হয়। সেখানে যাচাই করা হয় কার স্মৃতি সবচেয়ে বেশি প্রখর। এই প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়নরা কিন্তু জন্মসূত্রে মহা স্মৃতিধর না। এটি তাদের চর্চা এবং কৌশলের ফলাফল। বুঝতেই পারছেন কী বলত চাইছি? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। আপনি চাইলে হতে পারেন দারুণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী।
আমাদের প্রায়শই প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এটা সত্যি যে, মস্তিষ্ক নিজে নিজের ব্যথা অনুভব করতে পারে না! সেই কারণে একজন সার্জন রোগীকে জাগিয়ে রেখেই মস্তিষ্কে অপারেশন করতে পারে। তাহলে ব্যথা অনুভূত হয় কীভাবে? এই ব্যথা মূলত আশেপাশের মাথার ত্বক, হাড়ের গিঁট, সাইনাস, মাংসপেশিতে থাকা স্নায়ু উত্তেজনার ফলে।
অন্তর্মুখী এবং বহির্মুখী মানুষের মস্তিষ্কের প্যাটার্ন কিন্তু আলাদা। যারা অন্তর্মুখী তাদের মস্তিষ্কে গ্রে-ম্যাটারের পরিমাণ বেশি। আর যারা বহির্মুখী তাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন লেভেল বেশি কার্যকর।
তুলনা
কম্পিউটার থেকে এগিয়ে আছে মস্তিষ্ক; source: tbn-tv.com
বিভিন্ন সময়ে যত তথ্য-প্রযুক্তিগত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয়েছে তাদের সাথে মস্তিষ্কের তুলনা হয়েছে। এভাবে তাকে সেই লম্বা সময় ধরে পরীক্ষা দিয়ে আসতে হয়েছে, কে বেশি দক্ষ? ঘড়ি নাকি মস্তিষ্ক? কম্পিউটার নাকি মস্তিষ্ক? ইন্টারনেট নাকি মস্তিষ্ক?
সুখের কথা হলো, প্রতিবারই কেল্লাফতে করেছে আমাদের মস্তিষ্কই।
আমাদের মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা কত? কয়েক গিগাবাইট কিংবা টেরাবাইট হবে- এমন ভাবছেন তো? তাহলে ভুল ভাবছেন। আমাদের মস্তিষ্কের কোনো মেমোরি কার্ডের মতো সীমাবদ্ধতা নেই। অর্থাৎ কখনো আমাদের মস্তিষ্ক স্মৃতিতে পরিপূর্ণ হয়ে শেষ হয়ে যাবে না! সুতরাং যদি এমন কেউ থেকে থাকেন, যারা ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে অলস বসে থাকেন, তাহলে কাজে নেমে পড়ুন। যত ইচ্ছা ব্যবহার করুন তাকে।
সংক্ষেপে দেখুনকিভাবে বুঝবো পৃথিবী আসলেই গোলাকার?
অবিশ্বাস্য মনে পারে, কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতেও এমন কিছু মানুষ আছে, যারা মনে করে পৃথিবী গোলাকার না, বরং সমতল। এই তত্ত্বে বিশ্বাসীদের একটি সংগঠনও আছে, যার নাম দ্য ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটি। এদের ধারণা অনুযায়ী, গোলাকার পৃথিবী সম্পর্কিত যত গবেষণা এবং ছবি বা ভিডিও প্রমাণ আছে, সব নাসা এবং উন্নত বিশ্বের সরকারবিস্তারিত পড়ুন
অবিশ্বাস্য মনে পারে, কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতেও এমন কিছু মানুষ আছে, যারা মনে করে পৃথিবী গোলাকার না, বরং সমতল। এই তত্ত্বে বিশ্বাসীদের একটি সংগঠনও আছে, যার নাম দ্য ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটি। এদের ধারণা অনুযায়ী, গোলাকার পৃথিবী সম্পর্কিত যত গবেষণা এবং ছবি বা ভিডিও প্রমাণ আছে, সব নাসা এবং উন্নত বিশ্বের সরকারগুলোর ষড়যন্ত্র। বাস্তবে পৃথিবী একটি চাকতির মতো সমতল পৃষ্ঠ বিশিষ্ট, চন্দ্র এবং সূর্যের আকার খুব বেশি না, সেগুলো মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার উপর দিয়ে পৃথিবীর উপর বিচরণ করে এবং পৃথিবী সহ সমগ্র মহাবিশ্ব প্রচন্ড বেগে উপরের দিকে ছুটে যায় বলেই মাধ্যাকর্ষণের সৃষ্টি হয়।
ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটির সদস্যদের মতে পৃথিবী যেরকম; Source: videoblocks.com
মজার ব্যাপার হচ্ছে, পৃথিবী যে আসলেই গোলাকার, সেটি বোঝার জন্য নাসা বা কোনো দেশের সরকারের উপর নির্ভর করার কোনো দরকার নেই। নাসা বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই মানুষ জানত পৃথিবী গোলাকার। অনেকের ধারণা, আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ক্রিস্টোফার কলম্বাস পৃথিবীকে গোলাকার প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবী যে গোলাকার, তা আরো আগে থেকেই মানুষ জানত। কোনো প্রকার জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়াই অতি সাধারণ কিছু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আপনিও সহজেই বুঝতে পারবেন পৃথিবী আসলে সমতল নয়, বরং গোলাকার।
চাঁদ এবং অন্যান্য গ্রহের আকার
আজ থেকে আড়াই হাজার বছর পূর্বে, পিথাগোরাস সর্বপ্রথম লক্ষ্য করেন যে, চাঁদ বৃত্তাকার। সেখান থেকেই তিনি ধারণা করেন, পৃথিবী সহ অন্যান্য মহাকাশীয় বস্তুও বৃত্তাকার। এখনও যদি আমরা টেলিস্কোপের সাহায্যে অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে নিশ্চিতভাবেই দেখতে পারব, মহাবিশ্বের প্রায় সকল বস্তুই মোটামুটি বৃত্তাকার। চাকতির মতো সমতল কোনো গ্রহের অস্তিত্ব কোথাও নেই। স্বাভাবিকভাবেই আমরা ধরে নিতে পারি, পৃথিবীর আকারও অন্যান্য গ্রহের মতোই হবে।
চন্দ্রগ্রহণ পর্যবেক্ষণ
চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়া; Source: Popsci.com
পিথাগোরাসের মৃত্যুর প্রায় ১৫০ বছর পর, অ্যারিস্টটল সর্বপ্রথম বৃত্তাকার পৃথিবীর পক্ষে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি দেখান। তিনি লক্ষ্য করেন, চন্দ্রগ্রহণের সময় যখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে, তখন ছায়ার আকার অর্ধবৃত্তাকার হয়ে থাকে। এ থেকেই তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, পৃথিবী গোলাকার। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে চন্দ্রগহণের সময় মোটামুটি একই রকম অর্ধবৃত্তাকার ছায়া দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, পৃথিবী শুধু গোলাকারই না, তা প্রায় নিরেট বৃত্তাকার।
দিগন্তে জাহাজের আবির্ভাব
সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে কেউ যদি দূর থেকে কোনো জাহাজের আগমন প্রত্যক্ষ করে, তাহলে তার কাছে মনে হবে জাহজটি যেন সমুদ্রের পানি থেকে উঠে আসছে। পৃথিবী যদি সমতল হতো, তাহলে এরকম মনে হতো না, বরং সেক্ষেত্রে জাহাজটি প্রথমে অস্পষ্ট থাকত এবং ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতো। কিন্তু পানি থেকে উঠে আসতে দেখা যাওয়ার ঘটনা থেকেই বোঝা যায় পৃথিবী বৃত্তাকার।
ব্যাপারটি বোঝার জন্য খুব সহজ একটি পরীক্ষা করা যায়। বৃত্তাকার একটি ফুটবলের উপর একটি পিঁপড়াকে বসিয়ে ফুটবলটিকে ঘুরিয়ে পিঁপড়াটিকে দৃষ্টির বাইরে থেকে ধীরে ধীরে দৃষ্টির আওতায় আনতে থাকলে জাহাজের মতোই সেটিকে দিগন্ত থেকে উদিত হচ্ছে বলে মনে হবে। কিন্তু একই পিঁপড়াকে যদি সোজা একটি লম্বা রাস্তায় দূর থেকে ধীরে ধীরে কাছে আসতে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি অস্পষ্ট থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকবে।
জাহাজ হঠাৎ করে যেভাবে দৃশ্যমান হয়; Source: Popsci.com
পরিবর্তনশীল নক্ষত্র
আজ থেকে প্রায় ২,৩৫০ বছর পূর্বেই গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল লক্ষ্য করেন, বিষুবীয় রেখা থেকে উত্তরে বা দক্ষিণে যেতে থাকলে আকাশের নক্ষত্রগুলোর অবস্থান পরিবর্তিত হতে থাকে। যেসব নক্ষত্রকে বিষুবীয় অঞ্চলে ঠিক মাথার উপরে দেখা যায়, উত্তরে বা দক্ষিণে গেলে সেগুলো একদিকে হেলে পড়ে এবং বিপরীত দিক থেকে নতুন নতুন নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটতে থাকে।
অ্যারিস্টটল যখন মিসর এবং সাইপ্রাস ভ্রমণ করেন, তখনই প্রথম তিনি ব্যাপারটি লক্ষ্য করেন। ভ্রমণ থেকে ফিরে এসে তিনি লিখেন, মিসর এবং সাইপ্রাসের আকাশে এমন কিছু তারা দেখা যায়, যেগুলো গ্রীসের আকাশে দেখা যায় না। তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, পৃথিবীর পৃষ্ঠ গোলাকার হলেই কেবল এরকম ঘটনা ঘটতে পারে।
পরিবর্তনশীল ছায়া
পৃথিবী গোলাকার হওয়ার কারণে ছায়ার পার্থক্য; Source: futurism.com
মাটির উপর একটি খুঁটি পুঁতে রাখলে তার ছায়া পড়বে। যেহেতু সূর্যের অবস্থান পৃথিবী থেকে অনেক দূরে এবং সূর্য থেকে আগত আলোক রশ্মিগুলো প্রায় সমান্তরাল, তাই পৃথিবী সমতল হলে পাশাপাশি দুটো এলাকায় একই সময়ে একই দৈর্ঘ্যের খুঁটির ছায়ার দৈর্ঘ্য একই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।
আজ থেকে প্রায় ২,২০০ বছর পূর্বে মিসরের আলেক্সান্দ্রিয়া লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান এরাতোস্থেনেস সর্বপ্রথম বিষয়টি লক্ষ্য করেন। তিনি একটি নির্দিষ্ট দিনে ঠিক দুপুর বেলা আলেক্সান্দ্রিয়া এবং কয়েকশ কিলোমিটার দূরবর্তী শহর সিয়েনে একই দৈর্ঘ্যের দুইটি খুঁটির ছায়া পরিমাপ করেন। সিয়েনে সূর্য ঠিক মাথার উপরে থাকার কারণে কোনো ছায়া পড়েনি, কিন্তু আলেক্সান্দ্রিয়ায় সামান্য একটু ছাড়া পড়ে। এ থেকে তিনি নিশ্চিত হন যে, পৃথিবী বৃত্তাকার।
এরাতোস্থেনেস ছায়ার দৈর্ঘ্য থেকে সূর্যরশ্মির কোণ পরিমাপ করেন। শহর দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং তাদের ছায়ার কৌণিক পার্থক্য থেকে তিনি প্রায় নিখুঁতভাবে পৃথিবীর পরিধিও নির্ণয় করতে সক্ষম হন। এরাতোস্থেনেস পৃথিবীকে সম্পূর্ণ বৃত্তাকার মনে করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবী উত্তর-দক্ষিণ দিক একটু চাপা হওয়ায় তার হিসেবে সামান্য পরিমাণ ভুল ছিল।
উঁচু স্থান থেকে দূরের দৃশ্য
উঁচু স্থান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়; Source: Popsci.com
কোনো গাছ বা উঁচু ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে খালি চোখে অথবা দূরবীণের সাহায্য সর্বোচ্চ যতদূর পর্যন্ত দেখা যায়, সেই গাছের উপরে অথবা ভবনের ছাদে উঠে তাকালে তার চেয়েও দূর পর্যন্ত দেখা যায়। পৃথিবী সমতল হলে এটি সম্ভব হতো না। সমুদ্রের তীরে সূর্যাস্তের সময় খুব সহজেই এই পরীক্ষাটি করা সম্ভব। সূর্যাস্তের সময় মাটিতে শুয়ে থাকলে ঠিক যে মুহূর্তে সূর্য ডুবে গেছে বলে মনে হবে, তখন উঠে দাঁড়ালেই দেখা যাবে, সূর্য পুরোপুরি ডোবেনি, তার কিছু অংশ তখনও দৃশ্যমান। একই স্থানে যদি আরও উঁচুতে ওঠা যায়, তাহলে সম্পূর্ণ সূর্যাস্তটিই পুনরায় উপভোগ করা সম্ভব হয়। পৃথিবীপৃষ্ঠ গোলাকার বলেই এটি সম্ভব।
দিবা-রাত্রির দৈর্ঘ্য এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সময়ের পার্থক্য
বাংলাদেশে যখন দুপুর ১২টা, অর্থাৎ সূর্য যখন ঠিক মাথার উপরে, বিশ্বের কিছু কিছু এলাকায়, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তখন রাত ১২টা। সূর্যের কোনো অস্তিত্বই সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না। পৃথিবী যদি সমতল হতো, তাহলে সময়ের খুবই সামান্য ব্যবধান হতো। এক দেশে রাত, অন্য দেশে দিন হতো না। পৃথিবী প্রায় বৃত্তাকার বলেই কোনো স্থানে সূর্য যখন মাথার উপরে থাকে, বিপরীত পৃষ্ঠ তখন সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে, অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পর্যায়ক্রমে দিন এবং রাতের আগমন ঘটে। এছাড়াও পৃথিবী গোলাকার বলেই বিষুবীয় অঞ্চলের সাথে উত্তর বা দক্ষিণ গোলার্ধে দিন এবং রাতের দৈর্ঘ্য পার্থক্য দেখা যায়।
সংক্ষেপে দেখুনব্যারোমিটার কি সত্যি বাতাসের চাপ মাপার যন্ত্র?
আজ বাতাসের চাপ কেমন? বৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি? এসব জানার একটি সহজ উপায় হলো ব্যারোমিটারের সাহায্যে বায়ুচাপ নির্ণয়। কী এই ব্যারোমিটার? ব্যারোমিটার হলো মূলত বায়ুচাপ নির্ণয়ের একটি যন্ত্র। আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানতে এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর ব্যবহার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই আবিষ্কারের পেছনে একটি মজবিস্তারিত পড়ুন
আজ বাতাসের চাপ কেমন? বৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি? এসব জানার একটি সহজ উপায় হলো ব্যারোমিটারের সাহায্যে বায়ুচাপ নির্ণয়। কী এই ব্যারোমিটার? ব্যারোমিটার হলো মূলত বায়ুচাপ নির্ণয়ের একটি যন্ত্র। আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানতে এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর ব্যবহার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই আবিষ্কারের পেছনে একটি মজার ইতিহাস আছে যা অনেকেরই অজানা। কী সেই ইতিহাস? চলুন জেনে নেয়া যাক।

Image source: Britannica
‘ব্যারোমিটার’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘ব্যারোস’ এবং ‘মেট্রোন’ থেকে। ‘ব্যারোস’ শব্দের অর্থ ওজন এবং ‘মেট্রোন’ শব্দের অর্থ ‘পরিমাপ’। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইতালিতে অনেক বিজ্ঞানী স্বতন্ত্রভাবে ভ্যাকুয়াম এবং বায়ুচাপ সম্পর্কিত তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যেই একজন হলেন টরিসেলি। তাকেই মূলত ব্যারোমিটারের উদ্ভাবক হিসেবে গণ্য করা হয়।
গ্যালিলিও এর সেই বিখ্যাত ‘ টাওয়ার অব পিজা’-এর কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? তিনি দেখিয়েছিলেন, বায়ুর বাধা না থাকলে ভারী এবং হালকা বস্তু একই সময়ে নিচে এসে পড়ে। এখান থেকে আমরা বায়ুচাপ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাই। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বায়ুচাপের তারতম্য দেখা যায়। সমুদ্র সমতলে বায়ুচাপ সবচেয়ে বেশি। যত উপরে ওঠা যায়, বায়ুচাপ ততই কমতে থাকে। এমনকি একটি স্থানের বায়ুচাপও কখনও ধ্রুবক থাকে না, পরিবর্তিত হতে থাকে। এর কারণ হলো পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ক্রমাগত ঘুরছে। ফলে বিভিন্ন স্থান বিভিন্ন পরিমাণ তাপ গ্রহণ করছে। টরিসেলি বায়ুচাপের তারতম্যের এ বিষয়টি খেয়াল করেন। বায়ুচাপকে যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত করলে প্রতি বর্গক্ষেত্রে প্রযুক্ত বলকে বোঝায়। এ থেকে বোঝা যায়, বায়ুরও ওজন আছে। টরিসেলি প্রকৃতপক্ষে বায়ুচাপকে ওজনে রূপান্তর করেই কাজ করেছিলেন।

টরিসেলি; Image source: Wikimedia Commons
কীভাবে টরিসেলি বায়ুচাপের তারতম্যের বিষয়টি বুঝেছিলেন? প্রকৃতপক্ষে গ্যালিলিও এ ধারণার সূচনা করেন। বহু শতাব্দী পূর্বে অ্যারিস্টটলসহ কয়েকজন প্রাচীন দার্শনিক মতবাদ দেন, প্রকৃতিতে ভ্যাকুয়াম বা বায়ুশূন্য ফাঁকা স্থান থাকা সম্ভব নয়। বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা এ ধারণার সাথে একমত পোষণ করে এসেছিলেন। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে এ ধারণা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা যায়। কী ছিল এই বিভ্রান্তির কারণ?
চোষণ পাম্পে পানি উত্তোলন নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দেখা দেয় চিন্তাশীলতা। যেসকল বিজ্ঞানী পানির ঘনত্ব ও স্তম্ভের উচ্চতা সম্পর্কিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান, গ্যালিলিওকে তাদের মধ্যে অন্যতম ধরা হয়। শোনা যায়, তিনি একটি লম্বা টিউবকে কুয়ায় ডোবান যা একটি পাম্প দ্বারা চালনা করা হয়। কিন্তু তিনি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন, যত পরিশ্রমই করা হোক না কেন, ৯.৭ মিটারের বেশি উচ্চতায় পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি পরীক্ষায় একই ফলাফল পাওয়া যাচ্ছিল। তিনি উপলব্ধি করলেন, প্রকৃতপক্ষে বায়ুচাপই পানির পৃষ্ঠে বল প্রয়োগ করে পানি উত্তোলন করে থাকে। এজন্য প্রথমে পাম্প থেকে বাতাস অপসারণ করে ভ্যাকুয়াম অবস্থার সৃষ্টি করা দরকার।

গ্যালিলিও; Image source: Biography
গ্যালিলিওর শিক্ষার্থী হিসেবে টরিসেলি গ্যালিলিওর পরীক্ষা নিয়ে কাজের জন্য উঠে-পড়ে লাগলেন। তিনি মূলত গ্যালিলিওর ভ্যাকুয়াম তত্ত্ব নিয়েই কাজ করছিলেন। গ্যালিলিওর তত্ত্ব ব্যারোমিটারের উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে অনেকটা সহায়ক ছিল। গ্যালিলিওই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি ভ্যাকুয়াম যন্ত্র নিয়ে কাজ করেন। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ‘ভ্যাকুয়াম তত্ত্ব’-এর অনুমোদন। তবে এক্ষেত্রে তিনি পরিবেশের বায়ুচাপের তারতম্য নির্ণয়ের জন্য কোনো প্রচেষ্টা চালাননি। যদিও তার ভ্যাকুয়াম নীতিই ব্যারোমিটারের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
যা-ই হোক, টরিসেলি তার পরীক্ষায় প্রথমে একটি লম্বা টিউবকে পানিপূর্ণ করলেন। পরবর্তীতে তিনি এ টিউবকে উল্টিয়ে পানির একটি ধারকের মধ্যে রাখলেন। টিউবে পানির ধীর অপসারণ দেখে তিনি বুঝতে পারলেন, পানির উপর যে একমাত্র বল কাজ করছিল সেটি নিশ্চিতভাবে বায়ুর বল বা ওজন। তবে দু’ধরনের বলের মধ্যে ভারসাম্য কাজ করছিল-
১. পরিবেশের বাতাস দ্বারা পানিতে প্রযুক্ত বল।
২. টিউবের অভ্যন্তরে পানির বল।
তবে টরিসেলি তার পরীক্ষার প্রথমেই বিপত্তির শিকার হন। কেননা, তখন তিনি তরল হিসেবে এ পরীক্ষায় পানি ব্যবহার করেন। পানি ব্যবহারে এখানে বিপত্তিটা কোথায়? পানি অপেক্ষাকৃত হালকা হওয়ায় টরিসেলির প্রথম ব্যারোমিটারটির উচ্চতা হওয়া প্রয়োজন ছিল প্রায় ৩৫ ফুট, যা তার বাড়ির ছাদ ফুঁড়ে বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়! এক্ষেত্রে তিনি তার বিশাল পানির স্তম্ভের উপর একটি পুতুল বসান যাতে তার নড়াচড়া থেকে পরিবেশের বায়ুচাপের তারতম্য নির্ণয় করতে পারেন।
কিন্তু এটি আরেক সমস্যার সৃষ্টি করে। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশিরা গুজব শুরু করে। অনেকে সন্দেহ করে, টরিসেলি জাদুবিদ্যার চর্চা শুরু করে দিয়েছেন! এ ধরনের গুজবের মুখোমুখি হলে টরিসেলি উপলব্ধি করেন, তাকে আরও গোপনে কাজ করতে হবে এবং সেজন্য তাকে আরও ভারী কোনো তরল ব্যবহার করতে হবে। ভারী তরল পদার্থ হিসেবে তিনি বেছে নেন পারদ বা ‘মার্কারি’। ফলে এবার আর ৩৫ ফুট লম্বা স্তম্ভের দরকার হলো না, ৩২ ইঞ্চি ছোট টিউব দিয়েই কাজ হলো। এতে করে প্রতিবেশিদের অভিযোগ ছাড়াই গোপনে কার্যক্রম চালাতে পারলেন টরিসেলি।
পারদ দ্বারা পরীক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি দেখলেন, টিউবের মধ্যে পারদ একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় এসে থেমে যায় এবং উপরে কিছু স্থান ফাঁকা থেকে যায়। এ থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায়, পারদের ভারসাম্য ততক্ষণই বজায় থাকে যতক্ষণ বায়ুর ওজন এবং পারদের ওজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। টরিসেলি পরবর্তীতে উল্লেখ করেন, প্রতিদিন টিউবের পারদের উচ্চতা পরিবর্তিত হতো। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, প্রতিদিন পরিবেশে বায়ুচাপের পরিবর্তনের কারণে এ পরিবর্তন হয়। এ সম্পর্কে তিনি লেখেন, “প্রকৃতপক্ষে আমরা একটি বায়ুর সমুদ্রে বাস করি এবং নিঃসন্দেহে এ বায়ুর ওজন আছে।” এদিকে সে ময় অধিকাংশ বিজ্ঞানীই বিশ্বাস করতেন, বায়ুর কোনো ওজন নেই। তাই টরিসেলির এ ধারণা ছিল একেবারেই নতুন।

পারদ ব্যারোমিটার; Image source: johnvagabondscience.com
তবে কেমন ছিল এই ব্যারোমিটারের বায়ুচাপ নির্ণয় প্রক্রিয়া? খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করলে কিছুটা এরকম- একটি বায়ুশূন্য গ্লাস টিউবকে একটি পারদপূর্ণ পাত্রে নেয়া হয়। পাত্রের পারদের উপর পরিবেশের বাতাস চাপের কারণে টিউবে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পারদের স্তম্ভ থেমে যায়। এ উচ্চতা থেকে বায়ুচাপ নির্ণয় করা হয়। এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত সূত্র ব্যবহৃত হয়,
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৬৪৬ সালের দিকে বিজ্ঞানী প্যাসকেলও টরিসেলির পরীক্ষা-কার্যক্রম নিয়ে কাজ শুরু করেন। কথিত আছে, তিনি তার এক আত্মীয়কে পাহাড়ের উপর নিয়ে ব্যারোমিটারের পারদের উচ্চতা নির্ণয় করতে বলেন। ফলাফলস্বরূপ দেখা যায়, পারদের উচ্চতা নিচে নেমে আসে। তবে এ পরীক্ষার তাৎপর্য কী ছিল? এ পরীক্ষা থেকে প্রমাণিত হয়েছে উঁচু স্থানে বায়ুচাপ কমে যায়। অর্থাৎ বায়ুর উল্লম্ব ওজন আছে।
সেসময় বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের প্রায়ই সংঘর্ষ লেগে থাকত। সেই কারণে গ্যালিলিও বাইবেলের বিরুদ্ধে পৃথিবীর সূর্যের চারদিকে ঘূর্ণন নিয়ে মতবাদ দেয়ার কারণে দণ্ডপ্রাপ্ত হন। এদিকে টরিসেলির এ উদ্ভাবনের সাথেও চার্চের সংঘর্ষের উপক্রম হয়েছিল। সেটা কীরকম?
ভ্যাকুয়াম বা শূন্যস্থানের মতবাদ খ্রিস্টধর্মের সাথে সংঘাতপূর্ণ ছিল। কেননা, ধর্মের নীতি অনুযায়ী, সৃষ্টিকর্তার অবস্থান সব জায়গায়। এক্ষেত্রে ভ্যাকুয়াম বা শূন্যস্থান থাকার কোনো অবকাশ নেই। যা-ই হোক, টরিসেলি প্রায় একশো বছর পর তার উদ্ভাবনের স্বীকৃতি পান।

মেরিন ব্যারোমিটার; Image source: Zhuhai Weitong Import & Export Co., Ltd.
১৬৭০ সালের দিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের যন্ত্র হিসেবে ঘর-বাড়িতে ব্যারেমিটারের ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তী দু’শো বছরের মধ্যে মার্কারি ব্যারোমিটার ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। সমুদ্রযাত্রার জন্য ‘মেরিন ব্যারোমিটার’ নামে ব্যারোমিটারের ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। কালের বিবর্তনে বিভিন্ন রকম ব্যারোমিটারের উদ্ভাবন হয়। এমনকি উড়োজাহাজের যে প্রথম অ্যাল্টিমিটার বা উচ্চতা মাপার যন্ত্রবিশেষ, সেগুলো একপ্রকার ব্যারোমিটারই ছিল।
বর্তমানে বিভিন্ন উন্নত সংস্করণের ব্যারোমিটারের ব্যবহার দেখা যায়, যার অধিকাংশই ‘অ্যানিরয়েড’। তবে ব্যারোমিটারের মৌলিক সংস্করণের উদ্ভাবনের জন্য টরিসেলিকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হবে। আর বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যে ব্যারোমিটারের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ তা তো বলাই বাহুল্য।
সংক্ষেপে দেখুননদীগুলো আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হয় কেন ?
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি নদী আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হয়ে আসছে। এমন কোনো নদী নেই যেটা সোজা পথে প্রবাহিত হচ্ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় নদীর এই সর্পিল পথকে Meandering বলা হয়ে থাকে। মাটি থেকে অনেক উপর থেকে বিশেষ করে বিমান কিংবা পাহাড়ের উপর থেকে নিচের দিকে খেয়াল করলে নদীর এই সাপের মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া সহজেই বোঝা যায়বিস্তারিত পড়ুন
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি নদী আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হয়ে আসছে। এমন কোনো নদী নেই যেটা সোজা পথে প্রবাহিত হচ্ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় নদীর এই সর্পিল পথকে Meandering বলা হয়ে থাকে। মাটি থেকে অনেক উপর থেকে বিশেষ করে বিমান কিংবা পাহাড়ের উপর থেকে নিচের দিকে খেয়াল করলে নদীর এই সাপের মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া সহজেই বোঝা যায়। মাঝে মাঝে নদীর কোনো কোনো অংশ সোজা দেখা যায়। কিন্তু সেই সোজা অংশটিও সামনে এগিয়ে গিয়ে আবার বাঁকা পথ ধরে প্রবাহিত হতে থাকে। মাঝে মাঝে কিছু কিছু নদী এত তীব্রভাবে বেঁকে যায় যে নদীর প্রবাহ পথ থেকে অনেক সময় এই বাঁকা অংশ আলাদা হয়ে যায়। এই আলাদা হয়ে যাওয়া অংশকে বলা হয় Oxbow। এই অংশগুলোকে নদীর সর্পিল পথের পাশেই স্থান নিতে দেখা যায়। পৃথিবীর কম বেশি প্রায় প্রত্যেকটি নদীর পাশে Oxbow দেখা যায়।
খুব স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন এখানে চলে আসে, কেন নদীগুলো সোজা প্রবাহিত না হয়ে এঁকেবেঁকে নিজের গতিপথ নির্ধারণ করে? নদীর প্রবাহ পথের এরকম প্যাটার্ন কি নিছক সম্ভাবনা নাকি প্রাকৃতিক কোনো কারণ রয়েছে? যদি প্রাকৃতিক কারণ হয় তাহলে এর পেছনে কোন কোন বৈশিষ্ট্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে? আজকের এই লেখায় এই প্রশ্নগুলোর বৈজ্ঞানিক উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা হবে।
Meandering এবং Oxbow lake এর সমাবেশ; Image Source: Pinterest
নদীর উৎপত্তি হবার পর নদীটি যে বেঁকে যাবে সেটা অনেকটাই নির্ধারিত। কিন্তু এই বেঁকে যাবার শুরুটা ঘটে দৈবক্রমে। নদী তার উৎপত্তির পরপর যেভাবে প্রবাহিত হয়ে বেঁকে যায় সেই গতির ব্যাখ্যা দেয়া খুবই জটিল। কারণ প্রক্রিয়াটির সাথে সম্ভাব্যতা (Probability) জড়িত থাকে। তরল গতিবিদ্যা (Fluid Dynamics) দিয়ে ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু এ ব্যাপারে ভিন্ন মত রয়েছে [১]।
নদীর প্রবল স্রোত নদীর দুই তীরের নদীমাটির ক্ষয় সাধন করে। নদীর দিক পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া খুবই জটিল; Image Source: wyza.com.au
নদীর প্রবল স্রোত এবং প্রবাহ বলের কারণে একবার যদি দিক পরিবর্তন শুরু হয় তাহলে সেই পরিবর্তনের হার খুবই দ্রুত হবে এটা ধরে নেয়া যায়। নদীর স্রোতের প্রবাহের এই পরিবর্তনের জন্য নদীর দুই তীরের মাটির ক্ষয়সাধন (Soil Erosion) হয়। নদীর দিক পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া খুবই জটিল এবং বিশেষ বিশেষ কিছু অবস্থার উপর নির্ভর করে। পদার্থবিজ্ঞানে খুব সহজ করে এই প্রক্রিয়ার একটি ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। ব্যাখ্যাটি এরকম-
স্রোতের কারণে বেঁকে যাওয়া শুরুর প্রক্রিয়া বেশ জটিল। তবে একবার বেঁকে যাওয়ার পর, তা যত অল্পই হোক না কেন, নদীর পানি যখন এই বাঁকের মধ্যে প্রবেশ করে তখন পানির এই প্রবাহের উপর এক ধরনের বল কাজ করে যা পানির স্রোতকে বাইরের দিকে ঠেলে দিতে চায়। কখনো দোলনায় চড়লে খেয়াল করে দেখবেন, দোলনার ঘূর্ণনের সময় একটি বল আমাদেরকে বাইরে ঠেলে নিয়ে যেতে চায়- বিষয়টা অনেকটা এরকম। কিন্তু নদীর তীর এবং নদীর আশেপাশের মাটির কারণে পানি তীরের বাইরে চলে যেতে পারে না। কারণ নদীর পানি এবং তীরের মাটিগুলোর মধ্যে একধরনের ঘর্ষণ বল কাজ করে যা স্রোতকে বাইরে ঠেলতে বাধা দেয়। এই অবস্থায় নদীতে একধরনের প্রবাহ সৃষ্টি হয়, যা নদীর এক তীর থেকে আরেক তীরের দিকে প্রবাহমান হয়। এই প্রবাহকে Secondary Flow বলে [২]।
Image Source: Colorado.com
Secondary Flow কী সেটা পরিষ্কারভাবে এবং সহজ করে বুঝতে হলে চায়ের কাপে চামচ দিয়ে নাড়ানোর উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। চামচ দিয়ে যখন চায়ের কাপের চারদিকে আমরা নাড়াতে থাকি তখন কাপের ভিতরে চায়ের মিশ্রণের আচরণের দিকে একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, কাপের মাঝ বরাবর একটি ঘূর্ণন সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘূর্ণনটি হয় কাপের উপরের দিকেই। নিচের দিকে এই ঘূর্ণন অনেক কম হয় কারণ কাপের তলানির সাথে এবং পাশের দেয়ালের সাথে ঘর্ষণের ফলে ঘূর্ণনের গতি কমে যায়।
কাপের উপরে এবং নিচের দিকের ঘূর্ণনের বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের জন্য উপর থেকে নিচের দিকে তরল চা প্রবাহিত হয়। চামচ দিয়ে ঘোরানোর ফলে প্রথমে ঘূর্ণন গতি বাইরের দিকে একটি বল অনুভব করবে, যে কারণে প্রবাহটি চায়ের উপরের পৃষ্ঠ বরাবর প্রথমে দেয়ালের দিকে যাবে। এরপর দেয়াল বরাবর নিচের দিকে গিয়ে কাপের তলানি বরাবর চারদিকে একবার ঘূর্ণন হবে এবং এই ঘূর্ণন কাপের মাঝ বরাবর উপরের দিকে উঠে যাবে। এই পুরো প্রবাহকে Secondary Flow বলা হয়ে থাকে। চায়ের উপরের দিকে মাঝখানে আমরা যে ঘূর্ণন দেখি, সেটা এই প্রক্রিয়াতেই তৈরি হয়।
আমাজন বনে সৃষ্ট নদীর Meandering; Image Source: Pinterest
নদী বেঁকে যাবার পর দুই তীরের মধ্যবর্তী এবং নদীর মাঝামাঝি জায়গায়ও একই প্রক্রিয়া ঘটে। পানির প্রচণ্ড স্রোত যখন বাঁকের ভিতর প্রবেশ করে তখন চায়ের কাপের ভিতরের অবস্থার অনুরূপ একটা ঘূর্ণন গতির সৃষ্টি হয়, যার দরুন নদীর স্রোতের কিছু অংশ নদীর বাহিরের দিকের তীর (Outer Bank) পর্যন্ত প্রবাহিত হয় এবং সেখান থেকে নদীর তীর ঘেঁষে নিচের দিকে গিয়ে নদীর তলার (River Bed) সাথে সমান্তরালে প্রবাহিত হতে থাকে। সেখান থেকে নদীর অপর পাশের ভিতরের দিকের তীর (Inner Bank) বরাবর উপরের দিকে উঠে যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি সেকেন্ডারি ফ্লোয়ের কারণে হয়।
সেকেন্ডারি ফ্লো মেকানিজম; Image Source: Hindered Settling Blog
এই প্রবাহের কারণে নদীর বাইরের দিকের তীর ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কারণে নদীর মাটি কণাগুলো আলাদা হয়ে যায়। আলাদা মাটির কণাগুলো সেকেন্ডারি ফ্লোয়ের কারণে যে প্রবাহের সৃষ্টি হয় তার দিক বরাবর নদীর পানির সাথে প্রবাহিত হতে থাকে। এভাবে পানির সাথে বহমান মাটির কণাগুলো তলানি হিসেবে কিছু নদীর পানির নিচে এবং কিছু নদীর ভিতরের দিকের তীরে গিয়ে জমা হয়। এভাবে বাইরের তীর থেকে মাটি সরে গিয়ে অপর তীর ক্ষতিগ্রস্থ করে। যে দিকের মাটি সরে যায় সেই দিক বরাবর নদীগুলো বেঁকে যেতে থাকে। একইভাবে নদীর দিক পরিবর্তন হয়ে নদীগুলো সর্পিল আকারে প্রবাহিত হতে থাকে। কোনো কোনো সময় অতিরিক্ত স্রোতের কারণে কিংবা মাটির গঠনের কারণে এই বাঁকগুলো অনেক দীর্ঘ এবং ঘন হতে পারে।
নদীর এই বাঁকগুলো যখন একদিক থেকে গিয়ে আরেক দিকে আবারও বেঁকে যায় অর্থাৎ একটি লুপ তৈরি করে তখন কিছু কিছু নদীর ক্ষেত্রে এই বাঁকগুলো লুপ সহ আলাদা হয়ে যায়। আলাদা হয়ে গিয়ে এরা নদীর এক পাশেই অবস্থান করে। এ ধরনের লুপকে বলা হয় Oxbow Lake; Image Source: thoughtco.com
নদীর এই বাঁকগুলো যখন একদিক থেকে অন্য দিকে আবারও বেঁকে যায় অর্থাৎ একটি লুপ তৈরি করে, তখন কিছু কিছু নদীর ক্ষেত্রে এই বাঁকগুলো লুপ সহ আলাদা হয়ে যায়। আলাদা হয়ে গিয়ে এরা নদীর এক পাশেই অবস্থান করে। এই ধরনের লুপকে বলা হয় Oxbow Lake, যেটা সম্পর্কে আগেই একটু বলা হয়েছিল। এটি দেখতে অনেকটা U আকৃতির হয়ে থাকে। এখানে পানি প্রবাহ থাকে না। পুকুরের মতো স্থির পানি দিয়ে ভরা থাকে। বিভিন্ন জায়গায় কৃত্রিমভাবে Oxbow Lake তৈরি করা হয়। জার্মানির রাইন নদী থেকে একবার এরকম Oxbow Lake তৈরি করা হয়েছিলো। এর ফলে সেই নদী পথে চলাচল করার জন্য সোজা পথ তৈরি হয়।
সংক্ষেপে দেখুন