সাইন আপ করুন
লগিন করুন
রিসেট পাসওয়ার্ড
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? আপনার ইমেইল এড্রেস দিন। ইমেইলের মাধ্যমে আপনি নতুন পাসওয়ার্ড তৈরির লিংক পেয়ে যাবেন।
আপনি কেন মনে করছেন এই প্রশ্নটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই উত্তরটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই ব্যক্তিকে রিপোর্ট করা উচিৎ?
আমরা মস্তিষ্কের কত শতাংশ ব্যবহার করি?
সুবিশাল এই জীবজগতে অন্যান্য প্রাণিদের সাথে মানুষের সবথেকে বড় পার্থক্য হলো মস্তিষ্ক। মস্তিষ্কের গঠন, কার্যপদ্ধতি, নিউরন ঘনত্বের আধিক্য আর দেহের অন্যান্য অঙ্গের সাথে এর প্রতিক্রিয়া করার ক্ষমতা অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষকে অনন্যতা দান করেছে। অস্তিত্বের সূচনালগ্ন থেকে মানুষ এই মস্তিষ্ক ব্যবহার করে বুদ্ধবিস্তারিত পড়ুন
সুবিশাল এই জীবজগতে অন্যান্য প্রাণিদের সাথে মানুষের সবথেকে বড় পার্থক্য হলো মস্তিষ্ক। মস্তিষ্কের গঠন, কার্যপদ্ধতি, নিউরন ঘনত্বের আধিক্য আর দেহের অন্যান্য অঙ্গের সাথে এর প্রতিক্রিয়া করার ক্ষমতা অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষকে অনন্যতা দান করেছে। অস্তিত্বের সূচনালগ্ন থেকে মানুষ এই মস্তিষ্ক ব্যবহার করে বুদ্ধিকৌশল প্রয়োগে করেছে কালজয়ী সব আবিষ্কার, রচনা করেছে ইতিহাস আর পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়েছে আরো উন্নত জীবন। চিন্তার খোরাক থেকে নতুন কিছু সৃষ্টি করে জন্ম হয়েছে কত কিংবদন্তির।
কিন্তু যে মস্তিষ্ককে ব্যবহার করে করা হয়েছে এত কিছু, সেই মস্তিষ্কের অনেক রহস্য এখনও অধরাই থেকে গেছে বিজ্ঞানীদের কাছে। যুগে যুগে আমরা পেয়েছি মস্তিষ্কের অনেক নতুন নতুন তথ্য, যার কোনোটি আবার পুরানোকে সরিয়ে জায়গা করে নিয়েছে, যেখানে অন্যগুলো প্রমাণের ভিত্তিতে এখনও টিকে আছে। আর তাই এত সংশয়ের জন্যই জন্ম হয়েছে অনেকে গুজব আর আজব সব মিথের। আবার সেসব মিথের অনেকগুলোই অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে ভুল প্রমাণিত হয়েছে, আবার কোনোটির এখনও প্রমাণ মিলেনি।
Source: Visually
পূর্ণবয়স্ক একজন স্বাভাবিক মানুষের মস্তিষ্কে নিউরনের সংখ্যা কত বলতে পারবেন? উত্তরটা হলো প্রায় ৮৬ বিলিয়ন। আর এতগুলো নিউরনের প্রতিটিতে আছে প্রায় ১০ হাজার সিন্যাপটিক যোগাযোগ। আর সব মিলিয়ে মোট সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১০০ ট্রিলিয়নে, যার সর্বোচ্চ হিসেবটা গিয়ে ঠেকতে পারে ১,০০০ ট্রিলিয়নে। এত এত নিউরন আর সিন্যাপসগুলো বৈদ্যুতিক আর রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে মস্তিষ্কের সাথে সারা দেহের যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে প্রতি মুহূর্তে।
Source: Slide Player
আচ্ছা, কোনো গাণিতিক সমস্যা সমাধান কিংবা কঠিন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের সময় ভেবেছেন কি আপনি নিজের মস্তিষ্কের কতটুকু অংশ ব্যবহার করছেন? হয়তো কোনো মোটিভেশনাল স্পিচে, জনপ্রিয় কোনো মুভি, বই কিংবা কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনি দেখে থাকতে পারেন ‘মানুষ কেবল নিজের মস্তিষ্কের দশ শতাংশ ব্যবহার করে!’
আচ্ছা তাহলে তাহলে বাকি নব্বই শতাংশ কি অলস হয়ে বসে থাকে? নাকি কোনো অদৃশ্য দেয়াল তাদের আলাদা করে রেখেছে আপনার মস্তিষ্কের কার্যকর অংশ থেকে? যদি একশো শতাংশই আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকত তবে কি আপনি আপনার পছন্দের সুপারহিরো হয়ে যেতে পারতেন! নাকি টেলিকাইনেটিক শক্তির মতো অতিপ্রাকৃতিক কোনো ক্ষমতার জন্ম হতো আপনার মধ্যে! নাকি আইনস্টাইন আর নিউটনের মতো সেরা বিজ্ঞানীগণ একশো ভাগই ব্যবহার করতে তাদের মস্তিষ্কের!
Source: Ted Ed
মস্তিষ্কের আরো কিছু প্রচলিত মিথের মধ্যে মানব মস্তিষ্কের এই দশ শতাংশের মিথটিও বেশ প্রচলিত। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো এই মিথ কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ আর প্রায় অর্ধেক সংখ্যক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক বিশ্বাস করেন।
এই মিথের জন্মদাতা কে তা স্পষ্টভাবে কারোরই জানা নেই। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর আশির দশকে আমেরিকার বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস একটি ছেলের আইকিউ পরীক্ষার পর বলেন মানুষ তার মস্তিষ্কের সবটুকুই সঠিকভাবে ব্যবহার করে না। আর এই বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যায় মানুষের মনে মস্তিষ্কের সেই দশ শতাংশের ব্যবহার আরো দৃঢ়তা পায়। বিভিন্ন প্রচারণা মাধ্যম, ম্যাগাজিন আর লোকমুখে দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এই অপরীক্ষিত অদ্ভুত তত্ত্ব। শুধু তা-ই নয় লুসি, লিমিটলেস, ফ্লাইট অব দ্য নেভিগেটর এর মতো বিখ্যাত কিছু হলিউড মুভিতেও এই তত্ত্বের দেখা মেলে।
Source: Ted Ed
আদতে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন আমরা অনেকেই আমাদের চিন্তা-ভাবনার কাজে মস্তিষ্ককে সঠিকভাবে উদ্দীপ্ত করতে পারি না বা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি না। আবার শোনা যায় কালজয়ী বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের নামও জড়িয়ে আছে এই ঘটনা অনেকটা এই ধরনের বক্তব্যের জন্য।
কিন্তু আমরা সকলেই আসলে দিনশেষে মস্তিষ্কের একশ শতাংশই ব্যবহার করি। কীভাবে? তার আগে দেখা যাক প্রচলিত এই মিথটি কেন ভুল?
Source: Slide Share
আচ্ছা মস্তিষ্কের নব্বই ভাগই যদি কোনো কাজে না আসে তবে সেগুলোতে আঘাত লাগলে বা ক্ষতি হলেও তো আমাদের শারীরিক বা মানসিকভাবে কোনো সমস্যা হবার কথা না। কিন্তু সত্যিই কি তাই?
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি এখনকার মতো অত্যাধুনিক ছিল না। তাই বেশ দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা জানতেন না আমাদের মস্তিষ্কের বিশাল একটি জায়গা ফ্রন্টাল লোব এবং প্যারাইটাল লোবের ভূমিকা কি ছিল! কোনো ধরনের আঘাতে মস্তিষ্কের স্নায়বিক উদ্দীপনায় কোনো প্রকার প্রভাব না ফেলায় তারা ধরেই নিয়েছিলেন এগুলোর কোনো কাজ নেই। আর তাই কয়েক দশক ধরেই এগুলো বিজ্ঞানীদের কাছে ‘নীরব অঞ্চল’ বা সাইলেন্ট এরিয়া নামেই পরিচিত ছিল, যাতে অনেকে ভেবেছিলেন দশ শতাংশ ব্যবহারের ধারণা বুঝি তাই সত্যি।
কিন্তু এখন আমরা জানি যে এই অঞ্চলগুলো আমাদের যুক্তিবিচারে, পরিকল্পনায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আর পরিস্থিতিনির্ভর অভিযোজনে প্রধান ভূমিকা পালন করে। আর আমাদের পরিপূর্ণভাবে মানুষ হিসেবে প্রকাশ করে। আবার কোনো মস্তিষ্কের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্বাভাবিক জীবনে এর প্রভাব আমরা না দেখলেও আদতে তা কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকতা তৈরি করে।
Source: Dreamstime;
সাধারণত মানব মস্তিষ্ক ওজনের দিক থেকে পুরো শরীরের তুলনায় মাত্র দুই শতাংশ। কিন্তু এই মস্তিষ্ক সারা শরীরের মোট গ্লুকোজের প্রায় বিশ শতাংশই ব্যবহার করে নিজের জ্বালানি হিসেবে। আর একটি শিশুর ক্ষেত্রে সেই পরিমাণ ৫০ শতাংশ এবং একটি নবজাতকের জন্য ৬০ শতাংশ, যেখানে রোডেন্ট এবং কুকুরের প্রজাতিরা পুরো শরীরের মোট গ্লুকোজের প্রায় পাঁচ শতাংশ আর বানর দশ শতাংশ শক্তি ব্যবহার করে। তাহলে যদি নব্বই ভাগই অযথা অব্যবহৃত থাকে তবে এই বিশ শতাংশ শক্তি মস্তিষ্ক কী করে? এত পরিমাণ শক্তি মস্তিষ্কের মাত্র দশ শতাংশের কাজের তুলনায় ঢের বেশি।
Source: Karen Carr Studios;
মানুষের মস্তিষ্কের ওজন আনুমানিক ১.৫ কিলোগ্রাম, যেখানে একটা হাতির মস্তিষ্ক ৫ কিলোগ্রাম আর তিমির ৯ কিলোগ্রাম। কিন্তু এই ১.৫ কিলোগ্রাম মস্তিষ্কে ৮৬ বিলিয়ন নিউরনের উপস্থিতি মস্তিষ্কের ঘনত্ব অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আর সেটাই আমাদের করেছে আরো বেশি চৌকশ।
Source: Ted Ed
কিন্তু চৌকশ এই মস্তিষ্কের জন্য অনেক বেশি পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন তা আগেই বলেছি। প্রতি মিনিটে ৩.৪×১০২১ মলিকিউল এটিপি। এটিপি (অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট) হলো দেহের জ্বালানি।
Source: Wikimedia Commons;
আর স্পার্স কোডিং পদ্ধতির মাধ্যমে কম শক্তি খরচ করে বেশি তথ্য আদানপ্রদান করে মস্তিষ্ক। আর নব্বই ভাগকে অকার্যকর রেখে কখনোই এত পরিমাণ শক্তির দরকার হবে না। এছাড়া মস্তিষ্কের কোনো অংশ অপ্রয়োজনীয় হলে জিনের বিবর্তনের মাধ্যমে সেই অংশটুকু অনেক আগেই বাদ পড়ে যেত।
কিন্তু মস্তিষ্ক কখনোই একইসাথে একশ ভাগ ব্যবহার করে না। নির্দিষ্ট কাজের জন্য মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ উদ্দীপ্ত হয়। কোনো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে মস্তিষ্কের এক থেকে ষোল শতাংশ কার্যকর পাওয়া যাব। এমনকি ঘুমানোর সময়ও যে মস্তিষ্ক সচল থাকে তা-ও পরীক্ষা করে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। আপনি যখন যে কাজটি করবেন আপনার মস্তিষ্কের সেই অংশটির সাথে যোগাযোগ ঐ মুহূর্তে বেশি হবে। আর তাই একইসাথে আপনি দুইয়ের অধিক কাজ করতে গেলে কোনোটিই ঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন না, কারণ আপনার মস্তিষ্ক একসাথে দুটি কাজের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ মনোযোগের যোগান দিতে পারে না।
একবিংশ শতাব্দীর তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে জীবন্ত মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার সু্যোগ আমাদের এই এত এত ভুল ভাঙ্গাতে সক্ষম হয়েছে। ইইজি, পিইটি, এফএমআরআই এর মাধ্যমে আমরা মস্তিষ্কের কোন অঞ্চল কী কাজে সাড়া দেয় তা আমরা জানি এখন। কীভাবে সেই ব্রেইন স্ক্যানিং করা হয় তা না হয় অন্য আরেকদিনের জন্য তোলা থাকুক। মস্তিষ্কের আরো অনেক প্রচলিত মিথ নিয়ে জানতে পড়ে আসতে পারেন রোর বাংলার এই লেখাটি।
তাই নিজের মস্তিষ্ককে অলস বা অকার্যকর ভেবে সময় নষ্ট বন্ধ করুন। ৮৬ বিলিয়নের এই দল আপনাকে কোনো অতিপ্রাকৃতিক শক্তি না দিলেও এরা যথেষ্ট চৌকশ যেকোনো অসাধ্যসাধনে। তাই আর দেরি কেন? ক্ষুধার্ত এই নিউরনগুলোর শক্তির ব্যবস্থা করুন আর কাজে নেমে পড়ুন নতুন উদ্যমে।
সংক্ষেপে দেখুনঅশুভ ঘটনাগুলো কি আসলেই আপনার কপালে লেগে থাকে?
কখনো কি এরকম মনে হয়, দুনিয়ায় যত অলক্ষুণে আর অশুভ জিনিস আছে তার সব ঘটে আপনার সাথেই? এমন প্রশ্ন কখনো কি করেন, “দুর্ভাগ্যগুলো এই মরার কপাল ছাড়া অন্যদেরকে কি দেখে না? আমার কপালেই কেন একের পর এক ‘মরা’ লেগে থাকবে?” আসলে আপনি একা নন, সবার সাথেই এমন ঘটে এবং সবাই-ই তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজেকে দুনিয়ার সবিস্তারিত পড়ুন
কখনো কি এরকম মনে হয়, দুনিয়ায় যত অলক্ষুণে আর অশুভ জিনিস আছে তার সব ঘটে আপনার সাথেই? এমন প্রশ্ন কখনো কি করেন, “দুর্ভাগ্যগুলো এই মরার কপাল ছাড়া অন্যদেরকে কি দেখে না? আমার কপালেই কেন একের পর এক ‘মরা’ লেগে থাকবে?” আসলে আপনি একা নন, সবার সাথেই এমন ঘটে এবং সবাই-ই তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে অভাগা আর পোড়া কপালের অধিকারী বলে মনে করে। কিন্তু আসলেই কি সবাই অভাগা?
অশুভ ঘটনা তো পরের কথা, যদি বলি কোনো ঘটনা কেন ঘটে তার উত্তর কী হবে? শুনতে মামুলী মনে হলেও প্রশ্নটা একেবারেই বেয়াড়া। এর উত্তর কী হবে? ভালোই জটিল বলে মনে হচ্ছে। এর উত্তর জটিল হলেও শিরোনামের প্রশ্নের চেয়ে কিছুটা বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন বলে মনে হবে। কেন এমন কথা বললাম? অশুভ ঘটনা কেন ঘটে, এমন প্রশ্ন করা কি বিচার বুদ্ধিহীন? এখানে এর উত্তর খুঁজে দেখবো।
সত্যি কথা বলতে, সাধারণ ঘটনা ও অশুভ ঘটনা ঘটার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। অশুভ ঘটনাও এক প্রকার ঘটনা। একে আলাদা করে হিসেব করার কোনো কারণ নেই। যদি মনে হয়ে থাকে খারাপ জিনিসগুলো শুধু আপনার বেলাতেই হয়, তাহলে এখানে ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করতে হবে। ‘মার্ফির সূত্র’ নামে একটি নিয়ম আছে। অনেকে একে ‘সডের সূত্র’ও বলে থাকে। অশুভ ঘটনার ক্ষেত্রে তামাশার ছলে মানুষ এই সূত্রটি ব্যবহার করে।
এই সূত্র অনুসারে, মাখন মাখানো কোনো পাউরুটি যদি নিচে পড়ে যায়, তাহলে সবসময় মাখনের পাশটিই নিচের দিকে পড়বে। মেঝেতে যদি রুটিটি পড়ে আর মাখন যদি উপরের দিকে থাকে তাহলে ক্ষেত্রবিশেষে এটি তুলে নিয়ে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু মাখন নিচের দিকে পড়ে মেঝেতে লেপ্টে গেলে তা আর ব্যবহার করার উপায় থাকে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, মানুষের বেলায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন ঘটে। এজন্য তারা মনে মনে বলে, “আমার কপালেই যত নেতিবাচক ঘটনা ঘটে।”
অনেকেই ভাবেন, ‘কপাল পোড়া’ হলে হাত থেকে খসে রুটি পড়ে গেলে মাখনের দিকটাই সবসময় লেপ্টে যায়। ছবি: দ্য মিরর/গেটি
যারা মাঝে মাঝে টেলিভিশনের জন্য প্রামাণ্যচিত্র বা নাটক-সিনেমা নির্মাণ করেন, তাদের কাজে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে শুটিং চলাকালীন অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ। অনেক দূর দিয়ে যদি কোনো উড়োজাহাজ উড়ে যায় তাহলেও তাদেরকে কাজ বন্ধ করে দিতে হয়। এটি চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপর কাজ শুরু করতে হয়। চলমান কোনো কাজে যদি এরকম বাধা কয়েকবার দেখা দেয়, তাহলে তা হয় চরম বিরক্তিকর। অনেকটা বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে দেবার মতোই।
এখন উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার করে অনাকাঙ্ক্ষিত শন্দ অনেকটা কমিয়ে আনা যায়। কিন্তু আগের দিনে সিনেমা নির্মাণে এই সুযোগ ছিল না। এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দের কারণে মাঝে মাঝে পুরো সিনেমাই নষ্ট হয়ে যেত। চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের মাঝে একটি কুসংস্কার প্রচলিত আছে- যখন সিনেমার কোনো মুহূর্তে নীরবতা খুবই প্রয়োজন ,তখন উড়োজাহাজ উড়ে গিয়ে শব্দের জ্বালাতন করবেই করবে। এরকম কিছু ঘটে গেলে তারা বলে সডের সূত্র অনুসারে এই ঘটনা ঘটেছে।
আগে অপ্রত্যাশিত ‘নয়েজ’-এর কারণে পুরো সিনেমাই বরবাদ হয়ে যেতো। ছবি: দ্য ফিল্ম বুক/সিনেফিলিয়া/সিনিসাইন
একজন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতার কথা বলি। তিনি মাঝে মাঝে গবেষণামূলক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। একটি প্রামাণ্যচিত্রের শুটিংয়ের জন্য তারা একটি স্থান নির্ধারণ করেছেন। স্থানটি হলো ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড অঞ্চলের বিস্তৃত এক তৃণভূমি। তাদের ধারণা ছিল, দিনের বেলায় গেলে সেখানে অবশ্যই কোনো না কোনো শব্দ থাকবে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, সকলে মিলে খুব ভোরে চলে যাবেন। ভোরে শব্দ থাকার কথা নয়। যখন তারা সেখানে পৌঁছালেন, তখন আবিষ্কার করলেন, একজন লোক সেখানে একাকী বসে বসে বেলুনের বাঁশি বাজাচ্ছে! সম্ভবত তার স্ত্রীর সাথে রাতের বেলা ঝগড়া হয়েছে এবং স্ত্রী তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। তাই উপায় না দেখে সে উদাস হয়ে ফুঁ দিয়ে বেলুনে বাতাস ভরছে এবং সেই বাতাসে বাঁশি বাজাচ্ছে। আর এই ঘটনাটা ঘটতে হলো তাদের একান্ত প্রয়োজনের সময়টিতেই। তাদের যখন একান্ত নীরবতা প্রয়োজন তখনই এই ‘কুফা’ এসে লাগলো। সডের সূত্র দেখা যায় আসলেই সত্য!
আসলে এখানে অশুভ বা অলক্ষুণে বা কুফা বলতে কিছু নেই। সত্যিকার বাস্তবতা হচ্ছে, এখানে বেশিরভাগ সময়ই শব্দের উৎপাত থাকে। এই শব্দগুলো আমরা খেয়াল করি না বা খেয়াল করার প্রয়োজন হয় না। খেয়াল তখনই করি, যখন এটি আমাদের নিজেদের কোনো কিছুতে ব্যাঘাত ঘটায়। যেমন- সিনেমার জন্য ভিডিও করার সময় অপ্রয়োজনীয় ছায়া ভেসে উঠতে পারে পর্দায়। এর আগে এটির অস্তিত্ব থাকলেও আমাদের নজরে আসে না তেমন। মানুষের একটি জন্মগত স্বভাব হচ্ছে বিরক্তিকর জিনিসকে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেলা। এরকম কোনোকিছু কয়েক বার ঘটলেই আমরা ধরে নেই, সমস্ত পৃথিবীর সবকিছুই বুঝি আমার বিরুদ্ধে লেগে আছে। কোনোকিছু করতে গেলে তারা কোনো না কোনো দিক থেকে ঝামেলা পাকাবেই।
পৃথিবীর সবকিছুই বুঝি আমার বিরুদ্ধে লেগে আছে! ছবি: 123RF
আসলে সত্যিকার অবস্থা এমন না। অসামঞ্জস্যতা সবখানেই থাকে। সবসময়ই থাকে। প্রয়োজন না পড়লে আমরা তা দেখতে পাই না। প্রয়োজন পড়লে অর্থাৎ কাজের সময় আমরা তা দেখতে পাই। মাখন মাখানো রুটির কথাই বিবেচনা করি। মাখন লাগানো অংশটা কেন বেশিরভাগ সময় নিচের দিকে পড়ে, তা উদ্ধার করা খুব কঠিন কিছু নয়। হাতে বা টেবিলে মাখন লাগানো অংশটি উপরের দিকে থাকে। হাত বা টেবিল থেকে পড়ে গেলে এটি অর্ধেক বার ঘোরার সময় পায়। সম্পূর্ণ একবার ঘোরার সময় খুব কম ক্ষেত্রেই পায়। মেঝে বা ভূমি থেকে হাত কিংবা টেবিলের উচ্চতাও সবসময় প্রায় একই থাকে। তাই যখনই রুটি হাত ফসকে নিচে পড়ে যায়, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাখন লাগানো অংশটি নিচের দিকে থাকে। একাধিকবার এরকম হলে আমরা একে রংচঙ দিয়ে বলি, যত কুফা আর অশুভ জিনিস আছে আমার কপালে!
টেবিল সমান উচ্চতা থেকে পড়লে মাত্র অর্ধেক বার ঘোরার সময় পায় রুটি। তাই মাখনের অংশটিই নিচে পড়ে যায়। ছবি: ডেভ ম্যাককেইন
সডের সূত্রের জন্য শুটিং কিংবা পাউরুটির উদাহরণ বাদ দিয়ে সরল একটি উদাহরণ বিবেচনা করতে পারি। কয়েন দিয়ে। যখন কোনোকিছু টস করি, তখন হেড চাইলে ওঠে টেল আর টেল চাইলে ওঠে হেড- নির্মম ভাগ্য। আবার কেউ কেউ আছে আশাবাদী বা ইতিবাচক। তাদের অনুভূতি অনেকটা এরকম, আমি খেলায় যে দলকে মনে মনে সাপোর্ট করি সেই দলই টসে জিতে। আমি ‘সুফা’, আমি অমুক কালারের টি-শার্ট পরলে পক্ষের দল ছক্কা মারে আর বিপক্ষ দলের উইকেট পড়ে। চাহিদামতো ইতিবাচক ঘটার ব্যাপারটিকে বলা হয় ‘পলিয়ানার সূত্র’। কিন্তু সত্যিকার বাস্তবতার কথা বিবেচনা করলে দেখা যাবে, সডের সূত্র আর পলিয়ানার সূত্রের উভয়েই আসলে অযৌক্তিক ব্যাপার।
কুফা সুফা বলতে কিছু নেই। ছবি: ‘নতুন শব্দ‘ নামক ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত
কার মন কী চাইছে, তা টসের কয়েন কিংবা পাউরুটির পৃষ্ঠের কারোরই বোঝার ক্ষমতা নেই। তাছাড়া টসের মতো ব্যাপারগুলোতে ভালো-খারাপ উভয়ই হয়। দুই দলকে নিয়ে টস হয়, কোনো এক দল হেরে গেলে অন্য দল জিতে যায়। একজনের জন্য এটা অশুভ হলে, তার পাশেরই আরেকজনের জন্য এটি আনন্দের ও সফলতার। টেনিস খেলার দুই দলই মনে প্রাণে দোয়া করে জিতে যাবার জন্য। কিন্তু খেলায় জেতা সম্ভব একজন। কাউকে না কাউকে হারতে হবেই। দুজন জিততে চেয়ে কিন্তু একজন জিতেছে। এক্ষেত্রে যে জিতেছে সে মনে মনে বলবে, দোয়ায় যেমন চেয়েছি তেমনই পেয়েছি। আমার রাশি ভালো। যে হেরে গেছে সে বলবে, চেয়েছিলাম, কিন্তু পাইনি। যত অশুভ জিনিস আছে আমার কপালে জোটে!
এখানে খেলায় ভালো কিংবা মন্দ ভাগ্যের কোনো ভূমিকা নেই। প্রত্যেক খেলাতেই এমন হয়। জিত হয়, হার হয়। কিন্তু মানুষ মনে রাখে শুধু অমুক দিন ভাগ্যের দোষে হেরে গিয়েছিলাম। সেজন্য ‘অশুভ ঘটনা কেন ঘটে?’ কিংবা ‘শুভ ঘটনা কেন ঘটে?’ এগুলো আসলে সত্যিকার অর্থে কোনো প্রশ্নই না। তাই এগুলো নিয়ে হতাশ হয়ে বা দুঃখ করে কোনো লাভ নেই। এর চেয়ে বরং কোনো কিছু ঘটলে তাকে স্বাভাবিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করে, মন খারাপ না করে খুশি থাকাই উত্তম।
সংক্ষেপে দেখুননারীর নীরব কষ্ট এন্ডোমেট্রিওসিস কি ধরনের অসুখ?
ক্রিস্টি মিলারের বয়স যখন ১১ হলো, তখন থেকে তার মাসিক আরম্ভ হলো। প্রতিমাসেই রক্তক্ষরণের পাশাপাশি বমি হতে শুরু করলো। অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি না পারতেন খেতে, না পারতেন ঘুমাতে। তার কাছে মনে হতে লাগলো তিনি মারা যাচ্ছেন, কিন্তু কেউ তার তোয়াক্কা করছে না। তখন বিষয়টি না বুঝলেও এর ঠিক দশ বছর পরে গিয়ে ধরা পড়বিস্তারিত পড়ুন
ক্রিস্টি মিলারের বয়স যখন ১১ হলো, তখন থেকে তার মাসিক আরম্ভ হলো। প্রতিমাসেই রক্তক্ষরণের পাশাপাশি বমি হতে শুরু করলো। অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি না পারতেন খেতে, না পারতেন ঘুমাতে। তার কাছে মনে হতে লাগলো তিনি মারা যাচ্ছেন, কিন্তু কেউ তার তোয়াক্কা করছে না। তখন বিষয়টি না বুঝলেও এর ঠিক দশ বছর পরে গিয়ে ধরা পড়লো তার এই অসহ্য যন্ত্রণার কারণ। চিকিৎসক জানালেন, তিনি ‘এন্ডোমেট্রিওসিস’ নামক রোগে আক্রান্ত।
এন্ডোমেট্রিওসিস কী?
জরায়ুর সবচেয়ে ভেতরের স্তরের নাম এন্ডোমেট্রিয়াম। এই এন্ডোমেট্রিয়ামে থাকা বিশেষ কোষগুচ্ছ যদি জরায়ুর বাইরে অবস্থান নেয় তাহলে এই অবস্থাকে বলা হয় এন্ডোমেট্রিওসিস।
উপরে বর্ণিত ক্রিস্টির উপসর্গগুলো তুলে ধরা হয়েছে স্যালি রুনির উপন্যাসের ভিত্তিতে নির্মিত টিভি সিরিজ ’করভারসেশন উইথ ফ্রেন্ডন্স’-এ। এখানে দেখা যায় টিভি সিরিজের একটি চরিত্র ‘ফ্রান্সিস’ এন্ডোমেট্রিওসিসের যন্ত্রণায় কখনো ওয়াশরুমে কাতরান, কখনো বা ভীড়ের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে যান। টিভি সিরিজটি নির্মাণে সহায়তা নেয়া হয়েছে চিকিৎসক ফিওনা রেইডির, যিনি একাধারে একজন নারী রোগবিশেষজ্ঞ এবং এন্ডোমেট্রিওসিস রোগের চিকিৎসায় অভিজ্ঞ। সিরিজের মাধ্যমে একজন এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত নারীর সংগ্রাম সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
যেকোনো বয়সের নারীই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন; এমনকি টিনেজাররাও! প্রতি ১০০ জনে অন্তত ১০ জন নারী রোগটিতে ভুগে থাকেন।
যেসব জায়গায় এন্ডোমেট্রিওসিস হতে পারে
এন্ডোমেট্রিওসিস শরীরের বিভিন্ন স্থানে হতে পারে; image source: wildpixel/Getty Images
লক্ষণসমূহ
এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে শরীরের বিভিন্ন স্থানে তীব্র ব্যথার অনুভূতি হতে পারে; image source: Getty Images photo
এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণ
১. এন্ডোমেট্রিয়াল কোষগুচ্ছ রক্ত বা লসিকার মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে পরিচালিত হলে।
২. জিনগত কারণে হতে পারে। পরিবারের অন্য কারো এন্ডোমেট্রিওসিস থাকলে।
৩. সি সেকশন বা হিস্টেরেক্টমির মতো অপারেশনের কারণে এন্ডোমেট্রিয়াল কোষগুলো অন্ত্র বা অন্য কোনো অঙ্গের প্রাচীরে লেগে যেতে পারে। যার ফলে রোগটি হতে পারে।
৪. শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হলে। এর ফলে জরায়ুর বাইরে তৈরি হওয়া এন্ডোমেট্রিয়াল কোষগুলোকে শরীর ধ্বংস করে দিতে পারে না।
রিস্ক ফ্যাক্টরস
রোগপরবর্তী জটিলতা
এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে গর্ভধারণে জটিলতা বা ওভারিয়ান ক্যান্সার হতে পারে; Image source: Shutterstock
রোগনির্ণয় পদ্ধতি
প্রতিরোধ
এন্ডোমেট্রিওসিস একটি ইডিওপ্যাথিক বা অজানা কারণঘটিত অবস্থা। একে মোকাবেলার নির্দিষ্ট কোনো পন্থা নেই। তবে লক্ষণ দেখা যাবার সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে দ্রুত রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব।

সংক্ষেপে দেখুনলক্ষণ প্রকাশ পেলে ভয় না পেয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন; Image source: drpourzand.com
গর্ভধারণ এবং স্তন্যদান এন্ডোমেট্রিওসিসের হবার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও, প্রাত্যহিক জীবনে ফলমূল খাওয়া, বিশেষ করে সাইট্রাস ফলসমূহ, বিশেষ উপকারী ভূমিকা রাখে।
কেন আমাদের শৈশবের কথা মনে থাকে না?
মাঝে মাঝে কি এমনটা ভেবে আফসোস হয় না যে, “ইশ, যদি আমার খুব ছোটবেলার দুষ্টু-মিষ্টি স্মৃতিগুলো মনে করতে পারতাম!” প্রথম হাঁটা, প্রথম বলা শব্দ কিছুই আমরা মনে করতে পারি না। অনেক সময় আশেপাশের মানুষের মুখে নিজের ছোটবেলার কথা শুনে ভুল করে সেগুলোকে আমাদের স্মৃতি ভেবে বসি। শিশু-বয়সের খুব গুরুত্বপূর্ণ বা আনন্দেবিস্তারিত পড়ুন
মাঝে মাঝে কি এমনটা ভেবে আফসোস হয় না যে, “ইশ, যদি আমার খুব ছোটবেলার দুষ্টু-মিষ্টি স্মৃতিগুলো মনে করতে পারতাম!” প্রথম হাঁটা, প্রথম বলা শব্দ কিছুই আমরা মনে করতে পারি না। অনেক সময় আশেপাশের মানুষের মুখে নিজের ছোটবেলার কথা শুনে ভুল করে সেগুলোকে আমাদের স্মৃতি ভেবে বসি।
শিশু-বয়সের খুব গুরুত্বপূর্ণ বা আনন্দের স্মৃতি মনে না থাকলেও কৈশোরে শোনা বা পড়া কোনো গল্পের লাইন ঠিকই মনে পড়ে। কেন এমন হয়?
শৈশবের এই স্মৃতিলোপ পাওয়ার কারণ নিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা এক শতকেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা করে আসছেন। প্রায় ১০০ বছর আগে, সাইকোঅ্যানালাইসিসের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড এই টার্মটির নাম দেন ‘Infantile amnesia’, বাংলায় যাকে বলা যায় ‘শিশুসুলভ স্মৃতিভ্রংশ’, যা ২-৪ বছর বয়সের অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়ার ও ৭ বছর বয়সের পূর্বের স্মৃতি পূর্ণরূপে মনে না থাকার একটি সহজাত প্রক্রিয়া।

বয়সের সাথে স্মৃতি মনে রাখার হার; Source: This graph is taken from a research article titled “Infantile amnesia: A neurogenic hypothesis”
শৈশবে স্মৃতিশক্তি যেমন থাকে
শিশুরা স্থায়ী স্মৃতি তৈরি করতে পারে না, কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত ও সুব্যক্ত মেমোরি গঠন হয়।
দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি ধারণে সুব্যক্ত ও অন্তর্নিহিত মেমোরির কার্যাবলী; Source: Medium
শিশুরা ঐ অবস্থায় তথ্য মনে রাখতে পারে, যেমন- ৬ মাস বয়সী শিশুরা মনে রাখতে পারে ২৪ ঘন্টায় তাদের করণীয় কী, ৯ মাস বয়সীরা মনে রাখতে পারে এক মাসের কার্যাবলী আর ২০ মাস বয়সীরা পুরো এক বছর পর্যন্ত মনে রাখতে পারে যা তাদেরকে শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল। আরো দেখা যায়, শিশুদের কাছে যে ঘটনাগুলো বেশি আবেগপূর্ণ, ঐ স্মৃতিগুলো তারা তিনগুণ বেশি মনে রাখতে পারে।
অনেক সময় স্মৃতি ধরে রাখার ব্যাপারটি আমাদের সংস্কৃতির উপরও নির্ভর করে। অনেকের ছোটবেলার অনেক অভিজ্ঞতাই মনে থাকে, আবার অনেকের ক্ষেত্রে ৭-৮ বছরের আগের কোনো ঘটনাই মনে থাকে না। আবার আমাদের সংস্কৃতি, পারিপার্শ্বিক এবং সামাজিক অবস্থান এই স্মৃতি গঠন ও ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সংস্কৃতির উপরও শিশুদের স্মৃতি গঠন ও ধারণ ক্ষমতা নির্ভরশীল; Source: Diario de Huelva
কিন্তু কেউ প্রথম ২ বছরের আগের কোনো ঘটনাই মনে রাখতে পারে না। এর পেছনে ২টি উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পারে:
১) মস্তিষ্কের গঠন ও পরিবর্তন: ছোট বয়সে আমাদের মস্তিষ্ক পূর্ণ বিকশিত না থাকায় অনেক তথ্যই জটিল নিউরাল প্যাটার্নে জমা করে রাখতে পারে না, যাকে আমরা মেমোরি বা স্মৃতি বলি। জন্মের সময় মানবশিশুর মস্তিষ্ক থাকে পরিণত বয়সের মস্তিষ্কের এক-চতুর্থাংশ, দুই বছর বয়সে সেটা হয় পূর্ণ মস্তিষ্কের চার ভাগের তিনভাগ। মস্তিষ্কের এই আকার ও গঠনের উপরেই নির্ভর করে নিউরনের বৃদ্ধি ও সংযোগপ্রাপ্তি।

বয়সের সাথে মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ঘটে ও স্মৃতি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়; Source: celinealvarez.org
আমাদের মস্তিষ্কে হিপোক্যাম্পাস নামে একটা অংশ আছে, যেটা মূলত এপিসোডিক মেমোরি (নির্দিষ্ট ঘটনা ধারণকারী মেমোরি) গঠনে জরুরি। এপিসোডিক মেমোরিগুলো (দৃষ্টলব্ধ, স্বাদ এবং শব্দজাত মেমোরি) মস্তিষ্কের বহিরাবণের (Cortex) বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকে। হিপোক্যাম্পাস এই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অংশগুলোকে একত্রিত করে।

হিপোক্যাম্পাসের থ্রিডি চিত্র; Source: Deutsches Ärzteblatt
ইমোরি ইউনিভার্সিটি ইন আটলান্টার গবেষক প্যাট্রিসিয়া বাওয়ার বলেন,
মস্তিষ্কের উপরিভাগে এপিসোডিক মেমোরির অবস্থান এবং হিপোক্যাম্পাসের দ্বারা একত্রীকরণ; Source: semanticscholar.org
২-৪ বছরের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এপিসোডিক মেমোরি গঠন হয় কম, কারণ ঐ সময়ে হিপোক্যাম্পাস পরিপূর্ণভাবে গঠিত হয় না, আর কোনোকিছু মেমোরিতে জমা হতে হলে তাকে অবশ্যই হিপোক্যাম্পাসের মধ্যে গঠিত হতে হয়। এ বয়সে হিপোক্যাম্পাস খন্ডগুলোকে জমা করার কাজ শুরু করে।
হিপোক্যাম্পাস ব্রেনের একমাত্র অংশ যেটা মানুষের জন্মের পর থেকে নতুন নিউরন উৎপাদন চালিয়ে যেতে থাকে পূর্ণবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত, যেখানে ব্রেনের অন্যান্য অংশগুলোর শুধু পরিবর্তন আর বিকাশ ঘটতে থাকে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শৈশবে দ্রুত নিউরন উৎপাদনের হার আমাদের বয়স বাড়ার সাথে আগের কথা ভুলিয়ে দিতে পারে। কারন যত নিউরন উৎপাদন ঘটে তত নতুন কানেকশন বাড়তে থাকে মেমোরি সার্কিটের সাথে এবং নতুন নিউরনগুলোর অধিক নেটওয়ার্কিং আগের গঠিত মেমোরি প্রকাশে বাঁধা দেয়।
বিভিন্ন গবেষণা বলে। এই নিউরন উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি চালিত হয় পূর্বের মেমোরি, যেগুলো এই উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ব্যহত করতে পারে, তা ভুলে যাওয়ার মাধ্যমে। তাই কৈশোরে পৌঁছার আগপর্যন্ত শিশু অবস্থায় আমাদের ব্রেন পূর্বের স্মৃতি পুরোপুরি ধরে রাখতে পারে না এবং খুব ছোটবেলার ঘটনা ধারণে একেবারেই অক্ষম হয়।
২) ভাব প্রকাশের অক্ষমতা: আপনি এমন কোনো বিষয়ের স্মৃতিচারণ করতে পারবেন না যদি সেটা আপনার স্মৃতি বা মেমোরিতেই না থাকে। আর বাক্যে প্রকাশ ছাড়া আমরা কি কোনো ঘটনা দীর্ঘদিন মনে রাখতে পারি?
অনেক সাইকোলোজিস্ট মনে করেন, আত্মজীবনীমূলক স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষমতা আসে ভাব প্রকাশের মাধ্যমেই।
মেমোরিয়াল ইউনিভার্সিটি অব নিউফাউন্ডল্যান্ডের সাইকোলজিস্ট ক্যারল পিটারসন এটাকেই সামাজিক স্মৃতি ধরে রাখতে না পারার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
নোরা নিউকম্ব, ফিলাডেলফিয়ার টেম্পল ইউনিভার্সিটির সাইকোলোজির প্রফেসর, এর ভাষ্যমতে, “এপিসোডিক মেমোরি হয়তো একটি শিশুর জন্য অপ্রয়োজনীয় এবং জটিল, যখন সে মাত্রই শিখতে শুরু করছে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্বন্ধে।” তিনি আরও বলেন,
শৈশবের স্মৃতি উদ্ধার সম্ভব কি না
আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা সেরকম মনে না থাকলেও, ছোটবেলার অনেক ঘটনা আমাদের আচরণে প্রভাব ফেলে। তাহলে সেই অভিজ্ঞতা কিংবা স্মৃতি কি পুনরুদ্ধার সম্ভব?
সেইন্ট জন’স ইউনিভার্সিটিতে মেমরি এন্ড লার্নিং নিয়ে গবেষণারত জেফরি ফেগেন বলেন, “আর্লি চাইল্ডহুডের মেমরিগুলো হয়তো কোথাও সংরক্ষিত আছে যা এখন অপ্রাপ্য, কিন্তু এর প্রায়োগিক ব্যাখ্যা করাটাও কঠিন।” এটাই হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারে কেন আগের কোনো মানসিক আঘাত প্রভাব ফেলতে পারে প্রাপ্তবস্কদের আচরণে এবং ভবিষ্যতে মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

শৈশবের বৈরী অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে; Source: thriveglobal.com
কোন ঘটনার যত বেশি স্মৃতিচারণ হয় তত বেশি তা মনে থাকে। বড়দেরই সময়ের সাথে অনেক তথ্য, ঘটনা বা স্মৃতি হারিয়ে যায় যদি তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালানো না হয়। তাই ছোটবেলার এই স্মৃতিবিলোপকে আমাদের জীবনের এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই বলা চলে।
সংক্ষেপে দেখুনসর্বগ্রাসী দাবানল কেন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না?
আগুনের আবিষ্কার ও ব্যবহার গোটা মানবসভ্যতার ইতিহাসকেই প্রভাবিত করেছে। আগুনকে প্রাচীনকাল থেকেই ক্ষমতা ও পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। আর এটি কোনো ভুল নয়। আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক কিছু করা যায়। কিন্তু এই আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তার ক্ষমতার আসল রূপটি দেখা যায়। সেটি পরিণত হয়বিস্তারিত পড়ুন
আগুনের আবিষ্কার ও ব্যবহার গোটা মানবসভ্যতার ইতিহাসকেই প্রভাবিত করেছে। আগুনকে প্রাচীনকাল থেকেই ক্ষমতা ও পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। আর এটি কোনো ভুল নয়। আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক কিছু করা যায়। কিন্তু এই আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তার ক্ষমতার আসল রূপটি দেখা যায়। সেটি পরিণত হয় এক ভয়াবহ দানবে।
সম্প্রতি আমাদের দেশে কিছু ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গেছে। যেকোনো অগ্নিকাণ্ডেই কিছু ক্ষয়ক্ষতি হলেও যথোপযুক্ত প্রস্তুতি ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে একে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব। কিন্তু দাবানল এমন এক ঘটনা, যেটি একবার ছড়িয়ে পড়লে একে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার, এবং এর ব্যপ্তি ও স্থায়িত্বকাল অনেক বেশি। ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও হয় অনেক বেশি।

দাবানলের আগুন শতশত মাইল জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে; Image courtesy: Wildfire Service Photo
উৎপত্তি
দাবানলের শুরুটা সাধারণত শুষ্ক বনভূমি বা ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ এলাকা থেকেই হয়। কোনোভাবে এরকম একটি জায়গায় আগুন লাগলে আর কিছু বিষয় মিলে গেলে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়া শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার।
প্রাকৃতিকভাবে সাধারণত দুটি উপায়ে দাবানল শুরু হতে পারে; (১) যদি কোনো শুষ্ক বনভূমির উপর বজ্রপাত হয়, (২) কোনো আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত লাভা অথবা বিভিন্ন পদার্থের জ্বলন্ত টুকরা থেকে। এরপর সেটি পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুসারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে সাম্প্রতিককালে মানবসৃষ্ট কারণেই দাবানল বেশি ঘটে থাকে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে ৮৪% ক্ষেত্রেই বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কারণে দাবানল সংঘটিত হয়ে থাকে। মানবসৃষ্ট কতশত কারণ যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই। তবে কিছু কিছু কারণ চিহ্নিত করা যায়। যেমন:
(১) আতশ-বাজি ফাটানোর সময় যদি এর জ্বলন্ত অংশ কোনো শুকনো ঘাস-পাতা কিংবা গাছের উপর পড়ে, সেটি থেকে শুরু হতে পারে দাবানল।
(২) লাইটার বা দিয়াশলাই এর অসতর্ক ব্যবহার। অনেকসময় বাচ্চারা হাতে লাইটার বা দিয়াশলাই পেলে সেটি নিয়ে খেলা করতে গিয়ে দাবানলের সূচনা করতে পারে। আবার বড়দের দ্বারাও অসতর্কতার কারণে ঘটতে পারে এমন দুর্ঘটনা।

জলন্ত সিগারেট বহু দুর্ঘটনার কারণ © Myriam Zilles / Pixabay
(৩) সিগারেটের জ্বলন্ত বাট। ধূমপান করে সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটুকু ভালো করে না নিভিয়েই অনেকে সেটি ছুঁড়ে ফেলে দেন। এর কারণে ইতিহাসে অনেক বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এটি দাবানলেরও কারণ হতে পারে।
(৪) ক্যাম্পফায়ার। অনেকেই বনে-বাঁদাড়ে অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে তাবুতে থাকেন এবং তাবুর সামনে শুকনো কাঠ বা লাকড়ি ব্যবহার করে আগুন জ্বালান (ক্যাম্পফায়ার)। এসব আগুন ঠিকমতো নেভানো না হলে তা থেকেই দাবানল শুরু হতে পারে।
(৫) রেললাইন এর আশেপাশে বা লাইন ঘেঁষেই থাকতে পারে ঘাসজাতীয় কিছু উদ্ভিদ। প্রচণ্ড গরমে সেগুলো শুকিয়ে গেলে সহজেই সেগুলোতে আগুন লেগে যেতে পারে। এক্ষেত্রে আগুনের সূচনা হতে পারে ট্রেন চলার সময় চাকার সাথে লাইনের ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট স্ফূলিঙ্গ থেকে।
(৬) কেউ যদি রাস্তার পাশে শুষ্ক ঘাসে পরিপূর্ণ এলাকায় একটি কাঁচের গ্লাস, বোতল বা এধরনের কোনোকিছু ছুঁড়ে ফেলে, তাহলে সেটিও হতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ। কাঁচের মধ্য দিয়ে সূর্যালোক বিশেষভাবে প্রতিসরিত হয়ে আগুন লেগে যেতে পারে এবং আপাতদৃষ্টিতে অতি ক্ষুদ্র এ ঘটনা ডেকে আনতে পারে মহাবিপদ।

শৈশবে অনেকেই ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে সূর্যালোককে অভিসারী বা একত্রিত করে শুকনো, ঘাস, কাগজ বা দিয়াশলাইয়ের বারুদে আগুন লাগানোর খেলাটি খেলতেন। ফেলে রাখা কাঁচের মধ্য দিয়েও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই ঘটে যেতে পারে এ ধরনের ঘটনা; Image source: storiesofourboys.com
(৭) জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ছে না। তাই কৃষিজমি বাড়ানোর উপায় হলো বন-ভূমি নিধন করা। পৃথিবীর বহু অঞ্চলেই এ কাজটি সহজে করার জন্য একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বনভূমিকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। সে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে দাবানল শুরু হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
(৮) ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগ। শুনতে অস্বাভাবিক লাগলেও এটিকে দাবানলের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাঝেমধ্যে কিছু মানুষ উদ্দেশ্যমূলকভাবেই দাবানলের সূচনা করেন বলে ধারণা করা হয়। এর অনেকগুলো কারণের মাঝে একটি হতে পারে, ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের সম্পদ নষ্ট করে বীমা কোম্পানির কাছ থেকে অর্থ আদায় করা।
এগুলো ছাড়াও আরো অসংখ্য মানবসৃষ্ট কারণ থাকতে পারে, যেগুলোর কথা হয়তো আমরা স্বাভাবিকভাবে ভাবতেও পারি না।
অপ্রতিরোধ্য দুর্যোগ
দাবানলকে বন্যা বা ঘুরনিঝড়ের চেয়েও ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কেননা এগুলোর পূর্বাভাস দেওয়া যায়, এবং সচেতন থাকলে এসব দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়। কিন্তু এগুলো দাবানলের ক্ষেত্রে খাটে না। দাবানলকে অল্পকথায় ‘অপ্রতিরোধ্য’ ও ‘সর্বগ্রাসী’ শব্দ দিয়ে বর্ণনা করার চেষ্টা করা যেতে পারে। একে থামানোর কোনো উপায় নেই এবং এটি যে অঞ্চলকে অতিক্রম করে যায়, আক্ষরিক অর্থেই সেখানে কোনোকিছু অবশিষ্ট থাকে না।


দাবানল যে অঞ্চল দিয়ে যায়, সেখানে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকে না © Jeff Chiu/AP via Yahoo!News
দাবানলের প্রভাব কমানোর জন্য কিছু প্রচেষ্টা চালানো হয়। যেমন- আগুন যেদিকে অগ্রসর হচ্ছে, সে অঞ্চলের কিছু গাছপালা ও ঝোপঝাড় ইচ্ছাকৃত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পুড়িয়ে ফেলা হয় যেন দাবানল ততটুকু পর্যন্ত গিয়ে আর এগোতে না পারে। আবার, দাবানল শহরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকলে তার গতিপথে অগ্নিনির্বাপক বা অগ্নিপ্রতিরোধক রাসায়নিক পদার্থ নিক্ষেপ করে আগুনের তীব্রতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। এ রাসায়নিক পদার্থগুলো গাছপালা বা অন্যান্য জ্বালানীর সাথে মিশে বিক্রিয়া করে সেগুলোর দাহ্যতা কমিয়ে দেয়।
বিমান থেকে অগ্নিপ্রতিরোধক রাসায়নিক ফেলা হচ্ছে © Associated Press via HuffPost
তবে দাবানলের বিশাল আকৃতি ও শক্তির কাছে এ প্রচেষ্টাগুলো বড়ই ক্ষীণ ও অক্ষম। এ প্রচেষ্টা বড়োজোর দাবানল ছড়িয়ে পড়ার গতিকে কমিয়ে দিতে পারে, থামাতে পারে না। মানুষকে অসহায়ের মতো অপেক্ষা করতে হয় কখন প্রাকৃতিকভাবেই এ দুর্যোগটি থেমে যাবে। অনেকেই ভাবতে পারেন, দাবানল হয়তোবা কোনো নদী বা জলাশয়ের পাড়ে এসে থেমে যেতে পারে। এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়, আগুনের এক অদ্ভূত ক্ষমতা আছে নদীর মতো বিশাল বাধা পাড়ি দেওয়ার!
যখন নদীর একপাশে তীব্রভাবে আগুন জ্বলতে থাকে, তখন সেখানকার বাতাস হালকা হয়ে তীব্রবেগে উপরের দিকে উঠে যায়। উঠে যাওয়ার সময় ছাইসহ সেখানকার বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ, যেমন- পাতা, ডালের টুকরা, কাগজ বা অন্য কোনোকিছুর অসংখ্য জ্বলন্ত টুকরা সাথে নিয়ে যায়। সেগুলো যখন নদীর অপর পাড়ে গিয়ে পড়ে, তখন সেখানে শুরু হতে পারে নতুন দাবানল।

আগুনের লেলিহান শিখা অনেক জ্বলন্ত টুকরাকে আকাশে ছুঁড়ে দেয়, সেগুলো কোথাও পতিত হয়ে অগ্নিকান্ড বা দাবানলের সূচনা করতে পারে; © Ionas Nicolae / Pixabay
দাবানলকে আমরা কতটা বুঝি
যেকোনো দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানোর জন্য সেটির প্রকৃতি ভালোমতো বোঝা প্রয়োজন। বিগত এক দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বড় পরিসরে অনেকগুলো দাবানলের ঘটনা ঘটে গেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের মধ্যভাগ থেকে শুরু হয়ে শেষভাগ পর্যন্ত চলা ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানলের ঘটনাটি স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দাবানল। সে বছর ক্যালিফোর্নিয়ায় বিছিন্নভাবে প্রায় সাড়ে আট হাজারটিরও বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে এবং শেষপর্যন্ত সেগুলো বিভিন্ন স্থানে মিলিত হয়ে বড় আকার ধারণ করেছ। ফলে প্রায় পুরো বছরই মার্কিন সরকারকে এই দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে।
এ দাবানলগুলো প্রায় ৮০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় ৮৫ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন এবং ক্ষয়ক্ষতির হিসাবটা প্রাথমিকভাবেই ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগেও মানুষ দুর্যোগের কাছে কতটা অসহায়; বিশেষ করে দুর্যোগটা যখন দাবানল।

স্যাটেলাইট থেকে দেখা ক্যালিফোর্নিয়ার সেই ভয়াবহ দাবানল © Joshua Stevens/NASA Earth Observatory
এ ধরনের ঘটনাগুলোর কারণে বিভিন্ন দেশের সরকার ও গবেষণা সংস্থার টনক নড়েছে। বিগত এক দশকে দাবানল নিয়ে গবেষণার পরিমাণ ও বিনিয়োগ বেড়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দাবানলের বৈজ্ঞানিক মডেল বা সফটওয়্যার তৈরি করার চেষ্টা করছে। সেইসাথে প্রচেষ্টা চলছে এসব মডেলের সাথে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় ঘটানোর। এই মডেলগুলোর উল্লেখযোগ্য দিক হলো এগুলোর সাহায্যে দাবানল সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে, দাবানল শুরু হলে সেটির ছড়িয়ে পড়ার হার ও দিক অনুমান করা যাবে এবং এর স্থায়িত্ব ও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে পূর্বেই আভাস পাওয়া যাবে। তবে এ রকম একটি মডেল পুরোপুরি কার্যকর হবে না। কেননা, এই মডেলটিতে ইনপুট হিসেবে যেসব তথ্য জোগান দিতে হবে, সেগুলো খুবই পরিবর্তনশীল এবং যেকোনো একটি ছোটখাট ব্যাপারের পরিবর্তন পুরো ঘটনাকেই ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পারে।
গবেষকরা দাবানল সৃষ্টি হওয়ার পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে কয়েকটি প্রভাবকের কথা জানতে পেরেছেন। যেমন, দীর্ঘদিন যাবত অধিক তাপমাত্রা, তুলনামূলক কম আর্দ্রতা, বজ্রপাতের আধিক্য, খরা এবং অধিক পরিমাণ পুরোনো ও শুষ্ক বনভূমির উপস্থিতি একটি অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তোলে।

খরার সময়ে শুষ্ক বনাঞ্চল দাবানলের ঝুঁকিতে থাকে; Image source: yapdryforests.weebly.com
আবার, দাবানল একবার তৈরি হয়ে গেলে সেটি কোনদিকে বিস্তৃত হবে, তা অনুমান করা খুবই কঠিন। সবসময় বাতাসের দিকেই যে তার বিস্তার ঘটবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, বিপরীতটাও ঘটতে দেখা যায়। আবার একদমই ঝড়ো বাতাসের উপস্থিতি ছাড়াই দ্রুত দাবানল ছড়িয়ে পড়ার মতো নজিরও আছে।
আগুনের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি যখন বৃহৎ আকার ধারণ করে, তখন সে তার আশেপাশে এমন পরিবেশ তৈরি করে নেয়, যেন আগুন সহজেই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যেমন- দাবানলের ফলে যে তাপের সৃষ্টি হয়, তা আশেপাশের পরিবেশে থাকা পদার্থসমূহের দাহ্যতা বাড়িয়ে তুলতে পারে, ফলে সহজেই সেগুলোতে আগুন ধরে যায়।
আবার, আগুন যেখানে জ্বলছে, সেখানকার বাতাসকে হালকা করে তুলছে, অর্থাৎ ঘনত্ব কমিয়ে দিয়ে উপরের দিকে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তাই আশেপাশের অঞ্চল থেকে সেদিকে বাতাস ছুটে গিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করছে এবং একইসাথে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে অক্সিজেন, যা আগুনকে আরো জ্বলতে সাহায্য করছে।। আবার এই বাতাসের প্রবাহ আগুনকে ছড়িয়ে পড়তেও সহায়তা করছে। এভাবে প্রক্রিয়াটি চক্রাকারে চলতেই থাকে আর আগুন বাড়তে থাকে।
বৃহৎ পরিসরে দাবানল কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, সেটা নিয়ে যেমন গবেষণা হচ্ছে, তেমনি ক্ষুদ্র পরিসরে দাবানলের আগুন কীভাবে একটি গাছ থেকে আরেকটি গাছে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেটি কীভাবে রোধ করা যায়, তা নিয়েও করা হচ্ছে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। স্বাভাবিকভাবে মনে হতে পারে, বয়স্ক ও শুষ্ক উদ্ভিদের তুলনায় সবুজ ও কঁচি ডালপালাযুক্ত উদ্ভিদ কম দাহ্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, পাইন জাতীয় ও চিরহরিৎ জাতের কিছু উদ্ভিদ শুষ্ক না হলেও ভালো জ্বালানী হিসেবে কাজ করে। কেননা, এদের কাণ্ডে বিশেষ প্রকার তেল সঞ্চিত থাকে, যা প্রকারান্তে এদেরকে আরো দাহ্য করে তোলে। তবে সবুজ উদ্ভিদগুলো শুধুমাত্র দাবানল ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখতে পারে, দাবানল শুরুর ক্ষেত্রে নয়।

পাইন জাতীয় উদ্ভিদের বনে সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে আগুন; Image source: wallpaperplay.com
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনও ঘন ঘন দাবানল সংঘটনের পেছনে ভূমিকা রাখছে। তাপমাত্রার সামান্যতম বৃদ্ধিও বিভিন্ন অঞ্চলের আর্দ্রতা ও বনভূমির শুষ্কতার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। সেইসাথে তাপমাত্রা নিজেই একটা প্রভাবক। এছাড়া, সমতলের তুলনায় পাহাড়ি অঞ্চলে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমন আরো অসংখ্য প্রভাবক নিয়ে অনুসন্ধান চলছে।
দাবানল ও বাস্তুসংস্থান
স্বাভাবিকভাবে দাবানল প্রাকৃতিক ভারসাম্যেরই একটা অংশ। কিন্তু কীভাবে? অনেকভাবেই তা হতে পারে। ধরুন, একটা অঞ্চলের পুরোটা বনভূমি জুড়ে বেশিরভাগই পুরোনো গাছপালা। আমরা জানি, বৃহৎ আকারের উদ্ভিদের আয়ু মোটামুটি অনেক বেশি হয়। অর্থাৎ এমন একটা বনভূমিতে বেশিরভাগ গাছপালাই হয়তো কয়েকশো বছরের পুরোনো। দাবানলের ফলে যখন সেসব গাছপালা পুড়ে যায়, তখন সেখানে নতুন গাছ গজানোর সুযোগ পায়।
সে নতুন গাছগুলো শত বছরের পুরোনো উদ্ভিদগুলোর তুলনায় পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে অধিক পরিমাণ অভিযোজিত হয়। তারা এই কয়েকশো বছরে বদলে যাওয়া পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হয় অনেক বেশি, তারা তুলনামূলক প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থেকে ফুল-ফল উৎপাদন ও বংশবিস্তার করতে পারে। অর্থাৎ বদলে যাওয়া ও দূষিত হয়ে উঠা পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য এরা অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন হয়।
এছাড়া বহু বছর ধরে যখন একটি ভূমিতে বনাঞ্চল গড়ে উঠে, তখন সে ভূমির উপরিতল বড় উদ্ভিদের ডালপালা ও পাতায় ছেয়ে যায়। ফলে সেখানকার মাটি ও মাটিতে থাকা ছোট উদ্ভিদগুলো পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় না বড় হবার জন্য। তার উপর দীর্ঘদিন এই প্রক্রিয়া চলার ফলে বিনষ্ট হতে পারে মাটির গুণাগুণ। তাই দাবানলের পর সেখানকার মাটি পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় এবং সেখানে নতুন করে ছোটবড় বিচিত্র প্রজাতির উদ্ভিদ জন্মে। ফলে মাটির উর্বরতা ফিরে আসে। এছাড়াও দাবানলে একটি বনভূমির জন্য ক্ষতিকর অথবা সংখ্যায় মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যাওয়া কীট-পতঙ্গের মৃত্যু ঘটে। ফলে বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষা হয় এবং নতুন করে আরো শক্তিশালী বাস্তুসংস্থান গড়ে উঠে। এর ফলে যে নতুন বনাঞ্চল তৈরি হয়, তাতে দাবানল সংঘটিত হওয়ার আশংকা অনেক কম থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতে দাবানলের পর নতুন করে গড়ে উঠা বনভূমি; Image source: swfireconsortium.org
প্রকৃতপক্ষে দাবানল ঠেকানোর কোনো উপায় নেই; এর হাত থেকে বাঁচতে হলে উপদ্রুত এলাকার মানুষ ও মূল্যবান সামগ্রীগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তবে যেহেতু দাবানলের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষই দায়ী, তাই সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি রোধ করাই সবচেয়ে শ্রেয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ভবিষ্যতে দাবানলকে নিয়ন্ত্রণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে সামনের দিনগুলোতে যদি দাবানল সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা এবং এর গতি-প্রকৃতি পূর্বানুমান করার জন্য উপযুক্ত কোনো মডেল তৈরি করা যায়, তাহলে হয়তো যথাসময়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে কমিয়ে আনা যাবে। এ কাজটি আপাতদৃষ্টিতে দুঃসাধ্য মনে হলেও মানুষের প্রচেষ্টা থেমে নেই।
সংক্ষেপে দেখুনঅ্যাপেন্ডিসাইটিস: কী, কেন এবং কীভাবে হয় ?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের ‘সার্ফেস মার্কিং’ নামক একটি পরীক্ষা হয়ে থাকে। এই পরীক্ষাতে একজন শিক্ষার্থীকে জীবিত মানুষের শরীরে নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গ, ধমনী, শিরা কিংবা স্নায়ু এঁকে দেখাতে বলা হয়। প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী শরীরের প্রধান অঙ্গগুলো শরীরের যেখানে থাকে প্রায় হুবহু সেভাবে এঁকে দেখাতে পারে।বিস্তারিত পড়ুন
চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের ‘সার্ফেস মার্কিং’ নামক একটি পরীক্ষা হয়ে থাকে। এই পরীক্ষাতে একজন শিক্ষার্থীকে জীবিত মানুষের শরীরে নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গ, ধমনী, শিরা কিংবা স্নায়ু এঁকে দেখাতে বলা হয়। প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী শরীরের প্রধান অঙ্গগুলো শরীরের যেখানে থাকে প্রায় হুবহু সেভাবে এঁকে দেখাতে পারে। চলচ্চিত্রে অপারেশন থিয়েটারের কোনো দৃশ্যে দেখে থাকবেন আপনারা, অপারেশনের শুরুতেই মার্কার দিয়ে কিছু জায়গা চিহ্নিত করা হয়, এগুলো হচ্ছে অপারেশনের নিয়ম। কোথায় কীভাবে কাটতে হবে, একজন সার্জন ভালোমতোই জানেন।
জীবিত মানুষের বুকে অঙ্কিত রয়েছে হৃৎপিণ্ড। এমনিভাবে শরীরের সকল অঙ্গ, ধমনী, শিরা, স্নায়ু সবকিছু চিহ্নিত করা যায়; Source: web.duke.edu
ম্যাকবার্নি’স পয়েন্ট (McBurney’s Point) নামক একটি জায়গা রয়েছে মানুষের শরীরে, এই বিন্দুতে কাটা হলেই মাংসপেশী সরানোর পর অ্যাপেন্ডিক্স পাওয়া যাবে। দেখা যাবে, ছোট্ট একটি থলির ন্যায় বাড়তি অংশ সিকামের (বৃহদান্ত্রের একটি অংশ) সাথে জুড়ে আছে।
১ নম্বর পয়েন্টটি হলো ম্যাকবার্নি’স পয়েন্ট; Source: Wikimedia Commons
উপরের ছবিতে ১ নম্বর পয়েন্টটি হলো ম্যাকবার্নি’স পয়েন্ট। আপনি কোমর বরাবর হাত দিয়ে দেখুন, দু’পাশে দুটি জায়গাতে শক্ত হাড়ের উপস্থিতি টের পাবেন। Ilium নামক হাড়ের একটি অংশ এটি, একে বলা হয় Anterior Superior Iliac Spine। ৩ নম্বর পয়েন্টটি হলো এই Anterior Superior Iliac Spine। ২ নম্বর পয়েন্টটি দেয়া হয় একদম নাভীতে। ২ আর ৩ নম্বরকে সংযুক্ত করে একটি লম্বা রেখা আঁকা হয়, এই রেখাকে যদি উপরে দুই ভাগ আর নিচে এক ভাগ রেখে বিভক্ত করা হয়, তবেই আমরা পাবো ১ নম্বর পয়েন্ট তথা ম্যাকবার্নি’স পয়েন্ট।
অ্যাপেন্ডিক্স এর ব্যাসার্ধ ৭-৮ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে সাধারণত, আর দৈর্ঘ্য হয় ২-২০ সেন্টিমিটার। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অ্যাপেন্ডিক্স ৯ সেন্টিমিটার হয়। এছাড়াও অ্যাপেন্ডিক্সের অবস্থান অনুযায়ী এর বিভিন্ন ধরনও রয়েছে। সাধারণত তলপেটের ডান পাশে অবস্থান করে অ্যাপেন্ডিক্স, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে Right Iliac Fossa নামে ডাকা হয়।
অবস্থানভেদে অ্যাপেন্ডিক্সের বিভিন্ন ধরন; Source: jcol.elsevier.es
সিকামের সাথে যুক্ত ছোট্ট থলিটিই হলো অ্যাপেন্ডিক্স; Source: news-medical.net
আমাদের দেহে অ্যাপেন্ডিক্স কোন দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে, সেই ব্যাপারে এখনো নিশ্চিতভাবে বের করা যায়নি। একে ধারণা করা হয় ভেস্টিজিয়াল র্যামনেন্ট হিসেবে। র্যামনেন্ট হলো শরীরের এমন একটি অংশ যা গর্ভে থাকা অবস্থায় কোনো এক দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো, কিন্তু জন্মের পর আর কোনো কাজ নেই তার, একটি অবশিষ্টাংশ হিসেবে দেহে রয়ে গেছে। দেহের কিছু লিগামেন্টও র্যামনেন্ট হিসেবে তৈরি হয়েছে। দেহের সবচেয়ে চাক্ষুষ র্যামনেন্ট হলো আমাদের নাভী (আম্বিলিকাস), এই নাভী আম্বিলিক্যাল কর্ডের র্যামনেন্ট। আর ভেস্টিজিয়াল র্যামনেন্ট বলা হয় সেসব অংশকে যা বিবর্তনের মাধ্যমে তার দায়িত্ব হারিয়ে ফেলেছে। আমাদের পূর্ব পুরুষদের কোনো একসময় হয়তো খাদ্য পরিপাকে এর প্রয়োজনীয়তা ছিলো, দিন দিন বিবর্তনে এই অ্যাপেন্ডিক্স ছোট হয়ে তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে এবং র্যামনেন্ট হিসেবে দেহে রয়ে গিয়েছে। মানবদেহে এমন ভেস্টিজিয়াল র্যামনেন্টের নাম প্রায় একশোটি বলা যাবে।
আম্বিলিক্যাল কর্ড, যার সাহায্য গর্ভাবস্থায় সন্তান মায়ের প্লাসেন্টার সাথে যুক্ত থাকে; Source: open.edu
তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দেহের কিছু লিম্ফয়েড কোষ অ্যাপেন্ডিক্সে রয়েছে, যার দরুন অ্যাপেন্ডিক্স ইনফেকশনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলায় সাহায্য করতে পারে। একটি সময় ছিলো, যখন সার্জনরা কোনো সার্জারির উদ্দেশ্যে কারো পেট কাটলে, এমনি অ্যাপেন্ডিক্স কেটে ফেলে দিতেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা তৈরি না করতে পারে। তবে পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, অ্যাপেন্ডিক্সবিহীন ব্যক্তিদের ক্যান্সার হবার ঝুঁকি খানিকটা বেড়ে যায়। ২০০৬ সালের পর থেকে তাই এমন ফ্রি অপারেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
অ্যাপেন্ডিক্স কেটে দেহ থেকে সরিয়ে ফেলা খুবই সাধারণ একটি অপারেশন। এই অপারেশনটির নাম হলো অ্যাপেন্ডেকটোমি, আর সমস্যাটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয়ে থাকে অ্যাপেন্ডিসাইটিস। মানুষ প্রায়ই বলে থাকে, অমুকের অ্যাপেন্ডিক্স হয়েছে, এখানে শব্দের প্রয়োগটি ভুল। শরীরের এই অংশটির নাম অ্যাপেন্ডিক্স, কিন্তু এতে যখন ব্যাকটেরিয়াল আক্রমণ ঘটে, প্রদাহ (জ্বলুনি) শুরু হয়, তখন একে বলা হয় অ্যাপেন্ডিসাইটিস। ঠিক সেই মুহূর্তেই দেহের অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যাথা শুরু হয়, ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে, একসময় অসহ্য হয়ে দেখা দেয়। অ্যাপেন্ডেকটোমি ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না তখন।
ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে প্রদাহ সৃষ্টি হয় অ্যাপেন্ডিক্সে, এতে করে অ্যাপেন্ডিক্স ফুলতে শুরু করে; Source: news-medical.net
এখানে একটি মজার ব্যাপার রয়েছে, অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যাথাটা হয়ে থাকে সাধারণত রেফার্ড পেইন (Referred Pain) হিসেবে। এক স্থানের ব্যথার অনুভূতি তৈরি হয় অন্য স্থানে। কম-বেশি সকলেরই ঠাণ্ডা লেগেছে নিশ্চয়ই, নাক-গলাতে ব্যথার বদলে সামান্য ব্যথা হয় কানে, লক্ষ্য করে দেখবেন। এটাও একধরনের রেফার্ড পেইন। আমাদের স্পাইনাল কর্ডের বিভিন্ন অংশ রয়েছে পুরো মেরুদণ্ড জুড়ে, এই অংশগুলোর নামকরণ করা হয়েছে মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলোর নামে। অ্যাপেন্ডিক্সের স্নায়বিক অনুভূতি মস্তিষ্কে বহন করে থাকে দশম থোরাসিক স্পাইনাল সেগমেন্টটি।
স্পাইনাল কর্ডের সবগুলো সেগমেন্ট, কশেরুকার নামে নামকরণ করা হয় প্রতিটি সেগমেন্টের; Source: humananatomylibrary.com
Regions of Anterior Abdominal Wall; Source: web.duke.edu
দশম থোরাসিক সেগমেন্টটি একইসাথে আবার আম্বিলিক্যাল রিজিওনের অনুভূতি মস্তিষ্কে বহন করে থাকে। পেটকে মানচিত্রের গ্রিডের ন্যায় নয়টি রিজিওনে ভাগ করা হয়ে থাকে অপারেশনের সময় অঙ্গগুলোকে খুঁজে বের করার সুবিধার্থে। নাভী ও নাভীর চার পার্শ্বস্থ বর্গাকার অল্প অংশকে আম্বিলিক্যাল রিজিওন বলা হয়।
অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা তাহলে সবসময় অনুভূত হবে নাভীর চারপাশের দিকে, তবে আবার নাভীর দিকে ব্যথা করলেই ভয় পেয়ে যাবেন না আপনার অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছে ভেবে। দশম থোরাসিক স্পাইনাল সেগমেন্ট আরো অনেক অঙ্গের অনুভূতি বহন করে থাকে।
খাদ্যের পরিপাক সমস্তই সম্পন্ন হয়ে যায় ক্ষুদ্রান্ত্রে, পরিপাক না হওয়া অংশই ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে বৃহদান্ত্রে প্রবেশ করে। বৃহদান্ত্রের প্রথম অংশই হলো সিকাম। সিকাম একটি থলির মতো, এই সিকাম থেকে অপরিপাককৃত খাদ্যাংশ উপরের দিকে কোলনে প্রবেশ করবে। পেরিস্ট্যালসিসের মাধ্যমে এমনটি হয়ে থাকে, পেরিস্ট্যালসিস ছাড়াও অনেক ধরনের মুভমেন্ট ব্যবস্থা রয়েছে আমাদের দেহের পরিপাকতন্ত্রের। এই মুভমেন্টগুলো খাবারকে পুরো পরিপাকতন্ত্র ঘুরে বেড়াতে সহায়তা করে। অভিকর্ষের টানে সিকামের নিচের দিকে সংযুক্ত অ্যাপেন্ডিক্সে খাদ্যাংশ যখন প্রবেশ করতে যায়, অ্যাপেন্ডিক্সের মাংসপেশি তখন সংকুচিত হয়ে একটি ধাক্কার মতো তৈরি করে দেয়, এর দরুন অ্যাপেন্ডিক্সের দিকে ধাবিত খাদ্যাংশ উপরের দিকে কোলনে প্রবেশ করে।
সিকাম আর অ্যাপেন্ডিক্সের সংযোগস্থলে একটি ছিদ্রসদৃশ অংশ রয়েছে, এতে যদি অল্প পরিমাণে খাদ্যাংশ জমা হয়ে যায়, একসময় জমতে জমতে ছিদ্রটি বন্ধ হয়ে যায়, তখন ভেতরে থাকা কোনোকিছু আর বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না। এভাবেই শুরু হয় প্রদাহ, প্রদাহ বাড়তে শুরু করে, ব্যাকটেরিয়াও বাড়তে শুরু করে। সরু নালীর মতো অ্যাপেন্ডিক্স তখন ফুলে উঠতে থাকে। যদি অ্যাপেন্ডেকটোমি সময়মতো করা না হয়, একসময় অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে বেরিয়ে আসে ভেতরের সমস্ত কিছু। পেটের ফাঁকা স্থানগুলোর সব জায়গায় তখন সমস্ত ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে।
আপনার শরীরের ছোটখাট একটি অংশ, যা প্রায় কার্যক্ষমতাবিহীন; সেটিও আপনার এত বড় ক্ষতি করতে সক্ষম। তাই সচেতনতা তৈরি করুন, অ্যাপেন্ডিসাইটিসকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করুন।
সংক্ষেপে দেখুনঘূর্ণিঝড়ের হরেক নামকরণ করা হয় কেনো?
মনে আছে ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ এর তাণ্ডবের কথা? ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ আঘাত হানে। সরকারি হিসেবে প্রায় ছয় হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটায় খুলনা-বরিশাল উপকূলীয় এলাকায় ১৫-২০ ফুট উচ্চতায় আঘাত হানা প্রবল এই ঘূর্ণিঝড়। এরপর গত ১৩ বছরে প্রায় ৬২টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে বঙ্গোপসাগরবিস্তারিত পড়ুন
মনে আছে ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ এর তাণ্ডবের কথা? ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ আঘাত হানে। সরকারি হিসেবে প্রায় ছয় হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটায় খুলনা-বরিশাল উপকূলীয় এলাকায় ১৫-২০ ফুট উচ্চতায় আঘাত হানা প্রবল এই ঘূর্ণিঝড়। এরপর গত ১৩ বছরে প্রায় ৬২টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। এদের প্রত্যেকের একেকটি নির্দিষ্ট নাম ছিল।
নামকরণের ভাবনা কেন?
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের চর্চা কয়েকশো বছর আগেই শুরু হয়। নামকরণের কারণ হিসেবে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ওয়েবসাইট বলছে, নামকরণের ফলে ঝড়গুলো দ্রুত শনাক্ত করে সে অনুযায়ী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হয়। তাছাড়া, সবরকম ব্যবস্থাতেই সংখ্যা অথবা প্রযুক্তিগত শর্তের চেয়ে নাম মনে রাখাটাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। অনেকেই সম্মত হন যে, ঝড়ের সাথে নাম যুক্ত করায় ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষে প্রতিবেদন করা আরও সহজ করে দেয়, সতর্কতার প্রতি আগ্রহ বাড়ায় এবং সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও এটা বেশ সহায়ক।
সাইক্লোন সিডর; Image Courtesy: Wikimedia Commons
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম সময়ে দ্রুত যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত ও স্বতন্ত্র প্রদত্ত নামগুলোর ব্যবহার পুরোনো জটিল অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ শনাক্তকরণ পদ্ধতির তুলনায় অনেকাংশেই সুবিধা দেয়। এই সুবিধাগুলো বিশেষত কয়েক শতাধিক বিস্তৃত স্টেশন, উপকূলীয় ঘাঁটি এবং সমুদ্রের জাহাজগুলোর মধ্যে বিশদ ঝড়ের তথ্য বিনিময় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, ঝড়ের নাম দেওয়া থাকলে কাছাকাছি সময়ে সৃষ্টি হওয়া একের অধিক ঝড়ের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ঝামেলা পোহাতে হয় না।
নামকরণের ইতিহাস
শুরুতে ঝড়ের নাম রাখায় কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা হতো না। তারপরে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ঝড়ের জন্য নারীসূচক নাম ব্যবহারের অনুশীলন শুরু হয়েছিল। ইভান রে টানেহিল তার লেখা বই দ্য হারিকেনে অস্ট্রেলিয়ান আবহাওয়াবিদ ক্লিমেন্ট রেগের নাম উল্লেখ করেন, যিনি ঊনিশ শতকের শেষ দিকে ঘূর্ণিঝড়ের জন্য ব্যক্তিবিশেষের নাম দেয়া শুরু করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের জন্য তিনি গ্রিক বর্ণমালা, গ্রিক এবং রোমান পৌরাণিক তত্ত্ব ও নারীসূচক নাম ব্যবহার করতেন।
১৯৭৭ সালে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা হারিকেন (আটলান্টিক মহাসাগর এলাকা তথা আমেরিকার আশেপাশে ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ যখন ঘণ্টায় ১১৭ কিলোমিটারের বেশি হয়, তখন জনগণকে এর ভয়াবহতা বোঝাতে ‘হারিকেন’ নামে অভিহিত করা হয়) কমিটি গঠন করে। এই কমিটির প্রথম বৈঠক হয় ১৯৭৮ সালের মে মাসে। বৈঠকে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের দায়িত্ব পায় এই কমিটি।
১৯৭৮ সাল থেকে এই কমিটির সিদ্ধান্তে পূর্ব-উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় ঝড়ের তালিকায় মতো নারীদের পাশাপাশি পুরুষদের নাম ব্যবহার শুরু হয়। পরের বছর মেক্সিকো এবং আটলান্টিক উপসাগরীয় অঞ্চলেও পুরুষদের নাম ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে বার্ষিক ও দ্বিবার্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বিশ্বব্যাপী পাঁচটি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় আঞ্চলিক সংস্থা বা প্যানেল কর্তৃক ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের নামের তালিকা নির্ধারণ করা হয়। বিশ্ব জুড়ে ঘূর্ণিঝড় নামকরণে দশটি আলাদা অঞ্চলে বিভক্ত রয়েছে:
১. ক্যারিবিয়ান সাগর, মেক্সিকো উপসাগর এবং উত্তর আটলান্টিক
২. পূর্ব-উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর
৩. মধ্য-উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর
৪. পশ্চিম-উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণ চীন
৫. অস্ট্রেলিয়ান ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা কেন্দ্রের আওতাভুক্ত
৬. আঞ্চলিক বিশেষায়িত আবহাওয়া কেন্দ্র নাদি’র আওতাভুক্ত, ওয়েলিংটন
৭. মরেসবি বন্দর ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা কেন্দ্রের আওতাভুক্ত, পাপুয়া নিউগিনি
৮. জাকার্তার ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা কেন্দ্রের আওতাভুক্ত
৯. উত্তর ভারত মহাসাগরের আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগর
১০. দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত মহাসাগর
উপমহাদেশে নামকরণ
ভারতীয় উপমহাদেশ ও এর আশপাশের অঞ্চলগুলোয় সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয় বঙ্গোপসাগর থেকে। এই অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের প্রচলন শুরু হয় ২০০৪ সালে।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি আঞ্চলিক সংস্থা বা প্যানেলের একটি হচ্ছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা- জাতিসংঘ এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন। ২০০০ সালে ওমানে এই প্যানেলের ২৭তম বৈঠকে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়। ২০০৪ সালে আটটি সদস্য দেশের (বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, মায়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড) প্যানেলের মাধ্যমে নামকরণ শুরু হয়।
২০০৪ সালের নামের তালিকা; Courtesy : WMO
সে সময় আটটি দেশ থেকে আটটি করে মোট ৬৪টি নামের তালিকা করা হয়। বাংলাদেশ যে আটটি নাম দিয়েছিল, সেগুলো হচ্ছে অনিল, অগ্নি, নিশা, গিরি, হেলেন, চপলা, অক্ষি ও ফণী। পরবর্তী সময়ে আরও পাঁচটি দেশ এই প্যানেলের সদস্য হয়। এগুলো হচ্ছে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান ও ইয়েমেন। বাংলাদেশে ২০০৭ সালে প্রথম নামকরণকৃত ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। সিডর নামে আঘাত হানা প্রলয়কারী সেই ঘূর্ণিঝড়ের নাম দিয়েছিল শ্রীলঙ্কা।
নামকরণের বিষয়টি সমন্বয় করে ভারতের দিল্লির ‘রিজিওনাল স্পেশালাইজড মেটেরিওলজিক্যাল সেন্টার’ (আরএসএমসি)। আরএসএমসি তার সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে নামের তালিকা চেয়ে থাকে। তালিকা পেলে দীর্ঘ সময় যাচাই-বাছাই করে সংক্ষিপ্ত তালিকা করে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার কাছে পাঠানো হয় অনুমোদনের জন্য। এই প্যানেলের নামকরণে বেশ কিছু নিয়ম অনুসরণ করা হয়। প্যানেল সদস্যদের তালিকা হয় ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে।
এজন্য বাংলাদেশ এই তালিকায় প্রথমে আছে। প্রত্যেক দেশ থেকে নামের তালিকা থেকে একটি করে নাম নিয়ে কলাম তৈরি করা হয়। নামকরণ করা শুরু হয় এই কলামে থাকা ওপরের নামটি দিয়ে। এভাবে একটি কলাম শেষ হলে পরের কলাম থেকে নামকরণ করা হয়। একটি নাম শুধুমাত্র একবারই ব্যবহার করা যায়। দক্ষিণ চীন সমুদ্র থেকে যদি কোনো গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় হিসাবে বঙ্গোপসাগরে আসে, তবে আগে থেকে নাম দেয়া থাকলে নতুন করে আর নামকরণ করা হয় না।
নতুন ১৬৯ নাম
২০০৪ সালে ৬৪টি ঘূর্ণিঝড়ের নামের তালিকা করার পর এখন পর্যন্ত আর তালিকা করার প্রয়োজন পড়েনি। তালিকার সর্বশেষে থাকা থাইল্যান্ডের দেওয়া নাম ‘আম্ফান’ ২০২০ সালের মে মাসের শুরুতে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়ে মায়ানমার ও বাংলাদেশের কক্সবাজার–চট্টগ্রাম উপকূলের দিকে আঘাত হানতে পারে। তালিকায় নাম শেষ হয়ে যাওয়ায় গত এপ্রিলে সদস্য ১৩টি দেশ থেকে ১৩টি করে মোট ১৬৯টি নতুন নামের তালিকা করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা।
নতুন নামের তালিকা; Courtesy: WMO
বাংলাদেশ যে ১৩ টি নাম দিয়েছে, সেগুলো হলো নিসর্গ, বিপর্যয়, অর্ণব, উপকূল, বর্ষণ, রজনী, নিশীথ, ঊর্মি, মেঘলা, সমীরণ, প্রতিকূল, সরোবর ও মহানিশা। আম্ফানের পর বাংলাদেশের দেওয়া নাম ‘নিসর্গ’ই হবে পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়ের নাম।
সংক্ষেপে দেখুনগণিতের যোগ, বিয়োগ, গুন ও ভাগ চিহ্ন এলো কীভাবে?
গণিত হচ্ছে বিশ্বের ভাষা। তাই আপনি যত বেশি সমীকরণ জানবেন, তত বেশি মহাজগতের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন।- নিল ডিগ্রেস টাইসন শুধু মার্কিন এই জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী নন, পৃথিবীর অনেক বিজ্ঞানীই গণিত নিয়ে করে গেছেন এমন অনেক উক্তি। না করেই বা উপায় কী? আসলেই তো আমরা সবাই প্রাত্যহিক জীবনে গণিত ছাড়া অচল। এই যেমন,বিস্তারিত পড়ুন
শুধু মার্কিন এই জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী নন, পৃথিবীর অনেক বিজ্ঞানীই গণিত নিয়ে করে গেছেন এমন অনেক উক্তি। না করেই বা উপায় কী? আসলেই তো আমরা সবাই প্রাত্যহিক জীবনে গণিত ছাড়া অচল। এই যেমন, সকালে কখন ঘুম থেকে উঠবেন, সেটাও ঠিক করেন সংখ্যা দিয়ে। ঘুম থেকে উঠে প্রথমে কী কাজ করবেন, দ্বিতীয় কাজ কী হবে; এই ‘প্রথম’, ‘দ্বিতীয়’ও গণিতের অংশ। এই গণিতের ইতিহাস সুবিশাল। তবে আজকের গল্পটা গণিতকে নিয়ে না, গণিতের একটি অংশ নিয়ে; ‘গাণিতিক চিহ্ন’ নামেই তার পরিচয়।

গণিতের চিহ্ন অগণিত; Image Source: IB Community Blog
গণিতের এ অংশের সদস্য সংখ্যা মোটেও কম না। যোগ, বিয়োগ, গুন, ভাগ, সমান, বর্গমূল, পাই, বন্ধনী, সমানুপাতিক, ব্যস্তানুপাতিক আরও কত কী! চিহ্নের প্রচলনের অনেক আগেও সে চিহ্নের যে কাজ, তার প্রচলন ছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়াটি কথায় লিখে প্রকাশ করতে সময় ও শ্রম দুটিই বেশি প্রয়োজন হতো। তাই সময় অপচয় রোধের উদ্দেশ্যেই চিহ্নের ব্যবহার শুরু। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ২ ও ৩ এর যোগ করতে আমরা কত সহজেই লিখে ফেলি ‘২ + ৩’। কিন্তু যখন এই যোগ চিহ্নের উৎপত্তি হয়নি, তখন লিখতে হতো, ‘২ এর সাথে ৩ যোগ করো’।
আবার ‘২ + ৩’ এর ফলাফল ৫, যা আমরা সহজেই প্রকাশ করতে পারি ২ + ৩ = ৫ লিখে। কিন্তু যখন পর্যন্ত ‘সমান’ চিহ্নের উৎপত্তি হয়নি, তখন এর পরিবর্তে লিখতে হতো ‘ইজ ইকুয়ালস টু’, যা অপেক্ষাকৃত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। তাই ওয়েলসের গণিতজ্ঞ রবার্ট রেকর্ড তার বই ‘দ্য ওয়েটস্টোন অব উইট’ লিখতে গিয়ে প্রচলন ঘটালের সমান (=) চিহ্নের। এবার তবে আলাদা আলাদা করে চিহ্নদের গল্প করা যাক।
যোগ
দুই বা ততোধিক সংখ্যাকে একসাথে গণনা করতে যে চিহ্ন ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তা-ই যোগ চিহ্ন। আরও বাড়ানোর নিমিত্তেই যোগ করার প্রক্রিয়া। যোগ শব্দের আগমন ল্যাটিন শব্দ Plus থেকে, যার অর্থ ‘আরও’। ল্যাটিন ‘Et’ থেকে & (And)-এর আগমন। এই ‘and’ এর পরিবর্তেই ‘+’ চিহ্ন ব্যবহার করা শুরু হয়। যতদূর জানা যায়, যোগ চিহ্ন হিসেবে ‘+’ এর ব্যবহার শুরু হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে। নিকোলাস ওরেসমে তার ‘অ্যালগোরিসমাস প্রোপোর্শনাম’-এ প্রথমবার ‘+’ চিহ্ন ব্যবহার করেন বলে জানা যায়। তবে সে সময়েই এটি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে, এমনটা নয়। অনেকেই আরও অন্য অনেক ধরনের প্রতীক ব্যবহার করতেন। যেমন, ইতালিয় গণিতবিদ ‘লুকা প্যাসিওলি’ যোগ বোঝাতে ব্যবহার করতেন ইংরেজি ‘p’ এর উপর একটি ছোট দাগ দিয়ে। ‘+’ চিহ্নের প্রচলন ব্যপকভাবে ঘটে জোহানেস উইডম্যান নামক জার্মান গণিতবিদ তার ‘মার্সেন্টাইল অ্যারিথমেটিক’ বইয়ে এ চিহ্ন ব্যবহার করলে।

লুকা প্যাসিওলির ব্যবহৃত চিহ্ন; Image Credit: Author
বিয়োগ
বাদ দেওয়াকেই বিয়োগ বোঝায়। ‘বিয়োগ’ শব্দের উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ ‘minus’ থেকে, যার অর্থ ‘less’ বা কম। লুকাস প্যাসিওলি যোগের মতো বিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ‘p’-এর স্থলে ‘m’ ব্যবহার করতেন। তবে বিয়োগ চিহ্ন হিসেবে ‘–‘ এর ব্যবহার ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে, তা স্পষ্ট জানা যায় না। খুব সম্ভবত চতুর্দশ শতাব্দীতেই যোগের সাথে বিয়োগেরও উৎপত্তি। বিয়োগ ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে ‘মার্সেন্টাইল অ্যারিথমেটিক’ বইয়ে এর ব্যবহারের পরেই। উল্লেখ্য, ইংরেজদের কাছে যোগ এবং বিয়োগ চিহ্ন প্রথম তুলে ধরেন রবার্ট রেকর্ড’ তার বই ‘দ্য ওয়েটস্টোন অব উইট’-এ ব্যবহারের মাধ্যমে।

এখন শুধু +, – চিহ্ন ব্যবহৃত হয়; Source: Walls Haven
গুন
(×) কিংবা (.); বর্তমান সময়ে গুন বোঝাতে এই দুটি চিহ্নই বহুল ব্যবহৃত। যদিও দ্বিতীয়টির ডট প্রোডাক্ট হিসেবে আলাদা ব্যবহার আছে, তবে প্রথমটিই অধিক ব্যবহৃত হয় সাধারণ গুন বুঝাতে। এ চিহ্নের ব্যবহার শুরু হয় ষোড়শ শতাব্দীতে। বলা হয়ে থাকে, ইংরেজ গণিতবিদ উইলিয়াম অটরেড সর্বপ্রথম এ চিহ্নের ব্যবহার করেন। তবে ঠিক কী কারণে এটির মাধ্যমেই গুন প্রক্রিয়াকে চিহ্নায়িত করা হয়, তা নিশ্চিত নয়। বলা হয়ে থাকে, তিনি সেন্ট এন্ড্রু ক্রস থেকে এর ব্যবহার করেন।
আবার অনেকেরই ধারণা, যেহেতু গুন মূলত অনেক বড় যোগ প্রক্রিয়াকেই সহজতর করেছে, তাই যোগ চিহ্নকেই আড়াআড়িভাবে ব্যবহার করে গুন চিহ্নের ব্যবহার শুরু করা হয়েছে। তবে এটি ইংরেজি ‘x’-এর সাথে মিলে যাওয়ায় জার্মান দার্শনিক ও গণিতবিদ গটফ্রিড এ চিহ্নকে প্রত্যাখ্যান করে শুধু একটি ডট ব্যবহার করেন, যা এখনো অনেকটাই প্রচলিত।
ভাগ
ভাগ চিহ্ন হিসেবে আমরা অনেক চিহ্নের ব্যবহারই দেখে থাকি এই একবিংশ শতাব্দীতেও। এদের মধ্যে সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে ‘÷’, ‘/’, ‘x) y (z’ এবং ‘।’; সবশেষে উল্লেখ করা ধরনটির ব্যবহারই হয়তো সবার আগে শুরু হয়েছে, আনুমানিক ত্রয়োদশ শতাব্দীরও আগে। তবে ব্যবহারে ব্যাপকতা লাভ করে ষোড়শ শতাব্দীতে এসে। এটি সামনে আনে আরবীয়রা, এবং পরবর্তী সময়ে ইয়োরোপীয় গণিতবিদ ফিবোনাচ্চি এটি ব্যবহার করেন ষোড়শ শতাব্দী। ‘/’ চিহ্ন দিয়ে ভাগ বোঝানো শুরু হয় ১৮৪৫ সালে ডি মরগানের হাত ধরে।
তবে বহুল প্রচলিত ভাগ চিহ্ন (÷)-এর ব্যবহার প্রথমবার করেন সুইস গণিতবিদ জোহান রাহন, ১৬৫৯ সালে তার Teutsche Algebra নামক বইতে। যদিও এই চিহ্নটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই বর্তমানে। ভাগ চিহ্ন হিসেবে ‘/’-এর ব্যবহারই বর্তমান সময়ে আদর্শ হিসেবে স্বীকৃত।

ভাগ চিহ্নের ব্যবহার; Image Source: Teutsche Algebra
সমান
১৫৫৭ সালে ওয়েলসের গণিতবিদ রবার্ট রেকর্ড তার বই ‘দ্য ওয়েটস্টোন অব উইট’ লিখেছিলেন তার ইংরেজ ছাত্রদের জন্য। সে বইয়ে উনি বারবার ‘is equals to’ লিখতে লিখতে বিরক্ত বোধ করার ফলে দু’টি সমান, আনুভূমিক এবং সমান্তরাল দাগ (=) ব্যবহার করেন, যা পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় এবং এখনো ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কেউ কেউ তখন দু’টি উল্লম্ব সমান ও সমান্তরাল দাগকেও সমান চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে ‘=’ চিহ্নটিই অধিক গ্রহণযোগ্যতা পায়।

রবার্ট রেকর্ডের বই থেকে; Image Source: The Whetstone of Witte
যোগ, বিয়োগ, গুন, ভাগ এবং সমান চিহ্নের উৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করা আপাতত শেষ, তবে গণিতের চিহ্ন আছে আরও অগণিত। সেসবের কয়েকটি নিয়ে খানিক কথা বলে শেষ করা যাক।
ব্রিটিশ জন ওয়ালিস ১৬৫৫ সালে অসীম বা ইনফিনিটি চিহ্ন প্রথম ব্যবহার করেন। ১৭০৬ সালে পাই চিহ্নের (π) চিহ্নের প্রচলন ঘটান উইলিয়াম জোনস। ১৫২৫ সালে রুডলফ সামনে আনেন স্কোয়ার রুট বা বর্গমূল চিহ্নকে। বীজগণিতের প্রথম জার্মান পাঠ্যবই তারই লেখা। sin, cos, tan এর ব্যবহার শুরু করেন ইউলার, সময়কাল ১৭৪৮ থেকে ১৭৫৩। ১৮০৮ সালে ক্র্যাম্প ফ্যাক্টোরিয়াল চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন ‘!’-কে।

স্কোয়ার রুট বা বর্গমূল চিহ্ন; Image Source: Graphemica
এভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অগণিত মানুষের হাত ধরে বিবর্তিত হয়ে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে এসকল গাণিতিক চিহ্ন। এসব চিহ্ন আমাদের জীবনযাত্রাকে করেছে সহজতর। আর বিশ্বব্যাপী এখনো একই চিহ্নকে আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করতে কাজ করে যাচ্ছে আইএসও বা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অভ স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন।
হাবল টেলিস্কোপ কি কাজে ব্যবহৃত হয়?
মহাকাশের বিচিত্র অনবদ্য ছবি দেখে মুগ্ধ হয় না, এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহ থাকুক বা না থাকুক, মহাকাশের এসব চিত্তাকর্ষক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে সত্যিই পারা যায় না। আজ কথা হবে মহাকাশের এসব হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য ধারণের পেছনের যন্ত্রটি নিয়ে। জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য নামটি নিঃসন্দেহে অতবিস্তারিত পড়ুন
মহাকাশের বিচিত্র অনবদ্য ছবি দেখে মুগ্ধ হয় না, এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহ থাকুক বা না থাকুক, মহাকাশের এসব চিত্তাকর্ষক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে সত্যিই পারা যায় না। আজ কথা হবে মহাকাশের এসব হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য ধারণের পেছনের যন্ত্রটি নিয়ে। জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য নামটি নিঃসন্দেহে অতি পরিচিত। চমকপ্রদ এই যন্ত্রের নাম ‘হাবল টেলিস্কোপ’। এই টেলিস্কোপ গ্রহ-উপগ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথের দৃশ্য ধারণ করে থাকে। হাবল টেলিস্কোপ নক্ষত্রের জন্ম হতে দেখেছে, নক্ষত্রকে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছে, বহু দূরবর্তী ছায়াপথের দৃশ্য মুঠোয় এনে দিয়েছে, ধূমকেতুকে খণ্ড খণ্ড হয়ে যেতে দেখেছে, এবং সেই সাথে আরও অনেক ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছে।
তবে এর নিজের ইতিহাসটা কী? কীভাবে উদ্ভাবিত হয়েছিল এই টেলিস্কোপ? কীভাবেই বা এটি ধারণ করে থাকে সুদূর মহাকাশের বিচিত্র চিত্র? আজকে সেই গল্পটাও আপনাদের জানানো হবে।
এর ভিত্তি মূলত গড়ে তুলেছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও। অনেকেই নিশ্চয়ই গ্যালিলিওর স্পাইগ্লাসের কথা শুনে থাকবেন। স্পাইগ্লাসের উদ্ভাবক গ্যালিলিও না হলেও এর কার্যক্রমের উন্নতিসাধন ও ব্যবহারে তার অবদান কম নয়। সহজ ভাষায়, স্পাইগ্লাস এমন একটি যন্ত্র, যা দূরবর্তী বস্তুকে কাছে থেকে দেখতে সহায়তা করে। ১৬১০ সালের দিকে গ্যালিলিও যখন স্পাইগ্লাস নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন তিনি শনির বলয়ের চিত্র টেলিস্কোপে ধরতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হন।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে গ্যালিলিওর অবদান স্মরণীয়; Image Source: Biography.com
অপটিকসের উন্নতির সাথে সাথে ধীরে ধীরে গ্রহ-নক্ষত্রের চিত্রধারণেরও উন্নতি ঘটে। কিন্তু বহুদিন ধরে একটি সমস্যা থেকে যায়। আমাদের পৃথিবীকে ঘিরে যে বায়ুমণ্ডল রয়েছে, তা মহাকাশ থেকে আগত আলোকে বাধা দেয়ার কারণে সুনিপুণভাবে চিত্রধারণ সম্ভব হচ্ছিল না। এ সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজন ছিল এমন একটি টেলিস্কোপ, যা ভূমিতে অবস্থিত টেলিস্কোপগুলোর সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সক্ষম। ১৯৬৪ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর, জ্যোতির্বিদ লাইম্যান স্পিটজার এমন একটি টেলিস্কোপ উদ্ভাবনের প্রস্তাবনা দেন। তবে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অভ সায়েন্স থেকে সমর্থন পেতে এ প্রস্তাবনার কয়েক দশকের মতো সময় লেগে যায়। ১৯৬৯ সালে সংস্থাটি স্পেস টেলিস্কোপের রূপরেখা প্রদান করে এবং এর নির্মাণের নির্দেশনা দেয়।
এদিকে আমাদের অতি সুপরিচিত সংস্থা নাসা থেকেও এর জন্য পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে সংস্থাটি বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিল। অবশেষে ১৯৭১ সালে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অভ সায়েন্সের প্রশাসক জর্জ ল স্পেস টেলিস্কোপ টিমকে প্রস্তাবনার বাস্তবায়নের জন্য অনুমতি দেন এবং নাসা শীঘ্রই এ প্রচেষ্টার জন্য অর্থ তহবিলের তদবির করে। এ ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথমদিকে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়। পরবর্তীকালে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি ও কংগ্রেসের প্রচেষ্টায় আর্থিক সংকটের সমস্যার অনেকটা সমাধান হয়। কিন্তু সমস্যা যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছিল না। ১৯৮৬ সালে স্পেস শাটল চ্যালেঞ্জারের ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাতজন নভোচারীর মৃত্যু হয়।




Image source: AP
এ ঘটনার কারণে টেলিস্কোপের প্রকল্প আরও পিছিয়ে পড়ে। কেননা, শাটল ফ্লাইট আবার শুরু না করা পর্যন্ত টেলিস্কোপের প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে স্পেস শাটলের উদ্ভাবনের মাধ্যমে ১৯৯০ সালের ২৪ এপ্রিল, পৃথিবীর সর্বপ্রথম স্পেস টেলিস্কোপের অবতারণা হয়।
Image Source: space.com
যা-ই হোক, প্রথম প্রচেষ্টাতেই কিন্তু মহাকাশের নিখুঁত চিত্রধারণ করা যায়নি। যন্ত্রপাতির বিভিন্ন ত্রুটির কারণে ধারণকৃত ছবিগুলো ছিল ঝাপসা। এর পেছনে মূল কারণ ছিল লেন্সের ত্রুটি। ১৯৯৩ সালে স্পেস শাটল সাতজনের একটি দলকে এ সমস্যা দূর করার জন্য পাঁচদিনের একটি মহাকাশযাত্রায় পাঠায়। এ সময় ওয়াইল্ড ফিল্ড প্ল্যানেটরি-২ সহ আরও দুটি নতুন ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে হাবল টেলিস্কোপ থেকে নতুন ছবি তোলা হয়, যেগুলো ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও চমকপ্রদ। এরপর থেকে সৌরজগতের বিভিন্ন চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান ক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ করেছে হাবল টেলিস্কোপ।
হাবল টেলিস্কোপের তোলা মিল্কিওয়ের ছবি; Image Source: scitechdaily.com
হাবল টেলিস্কোপ ভূমিতে অবস্থিত অন্যান্য টেলিস্কোপের থেকে আলাদা নানা কারণেই। টেলিস্কোপটি দৈর্ঘ্যে প্রায় একটি স্কুল বাসের মতো, এবং ওজনে প্রায় দুটি হাতির সমতুল্য! বায়ুমণ্ডলের বাধাকে অতিক্রম করে এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ঊর্ধ্বে আবর্তন করতে সক্ষম। একটি ডিজিটাল ক্যামেরার মাধ্যমে এই টেলিস্কোপ চিত্র ধারণ করে। পরে রেডিও কম্পাঙ্কের মাধ্যমে এসব চিত্র পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়।
হাবল টেলিস্কোপের চোখে ‘স্নো এঞ্জেল’; Image Source: space.com
এডউইন হাবল
প্রকৃতপক্ষে হাবল টেলিস্কোপের নামকরণ করা হয়েছে একজন ব্যক্তির নামে। তাহলে নিশ্চয়ই এমন কারও নামে করা হয়েছে, যিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানে কোনো বিশাল অবদান রেখে গিয়েছিলেন? ঠিক তা-ই। এর নামকরণ করা হয়েছে আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবলের নামানুসারে। হাবলকে আধুনিক কসমোলজির জনক বলা হয়। একসময় এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে, আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ ‘মিল্কিওয়ে’ ব্যতীত অন্য কোনো ছায়াপথের অস্তিত্ব নেই। মহাকাশের নেবুলাকে সুনিপুণভাবে পর্যবেক্ষণ করে হাবল এ ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেন। তিনি দেখিয়েছেন, মহাকাশ আমাদের কল্পনার চেয়েও বহু দূর বিস্তৃত।


হাবল টেলিস্কোপের তোলা নেবুলার ছবি; Image Source: hyperaxion.com
আফসোসের ব্যাপার এ-ই যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিশাল অবদান রাখার পরও তিনি নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে পারেননি। তবে মহাকাশের বিচিত্র চিত্র ধারণকারী যন্ত্রটি আজ এডউইন হাবলের নামানুসারে উচ্চারিত হচ্ছে, এখানেই তার বিরাট সার্থকতা।
এডউইন হাবল; Image Source: Britannica
যেভাবে কাজ করে হাবল
হাবল টেলিস্কোপের নির্মাণের ইতিহাস তো জানা হলো। এখন পাঠকের নিশ্চয়ই জানার কৌতূহল হচ্ছে, কীভাবে এই টেলিস্কোপ কাজ করে? যারা জটিল বৈজ্ঞানিক জিনিসপত্র দেখলে ঘাবড়ে যান, তাদের ভয় পাবার কিছু নেই। এখানে মূলত টেলিস্কোপের প্রাথমিক কার্যকলাপ নিয়েই আলোচনা করা হবে।
প্রতি ৯৭ মিনিটে হাবল টেলিস্কোপ চার কিলোমিটার/সেকেন্ড বেগে পৃথিবীকে একবার আবর্তন সম্পন্ন করে, যা ১০ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রকে একবার প্রদক্ষিণ করার সমতুল্য। এই টেলিস্কোপ মূলত সৌরশক্তি দ্বারা পরিচালিত। ঘূর্ণনের সময় টেলিস্কোপটির দর্পণ আলো ধারণ করে এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে তড়িৎরূপে এই আলো প্রেরণ করে। এক্ষেত্রে প্রাথমিক দর্পণে আলো আঘাত করে, যা পরবর্তী দর্পণে বাধা পেয়ে একটি ছিদ্রের মধ্য দিয়ে অন্যান্য যন্ত্রপাতিতে এ আলোকে প্রেরণ করে। প্রতিটি যন্ত্রই ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য নিযুক্ত।
যন্ত্রপাতি
১) ওয়াইল্ড ফিল্ড ক্যামেরা: অতিবেগুনী, দৃশ্যমান এবং অবলোহিত রশ্মির অঞ্চলের আলো দেখতে পায়। ডার্ক এনার্জি, ডার্ক ম্যাটার, নক্ষত্রের জন্ম, ছায়াপথ গবেষণায় সহায়তা করে।
২) কসমিক অরিজিন্স স্পেকটোগ্রাফস: অতিবেগুনী রশ্মি শনাক্ত করতে পারে; প্রিজমের ন্যায় আচরণ করে ভিন্ন ভিন্ন আলো শনাক্ত করতে পারে।
৩) অ্যাডভান্সড ক্যামেরা ফর সার্ভে: দৃশ্যমান আলো দেখতে পারে, সৌরজগতের অপেক্ষাকৃত পূর্ববর্তী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে সহায়তা করে।
৪) স্পেস টেলিস্কোপ ইমেজিং স্পেকটোগ্রাফ: তিন ধরনের আলোই দেখতে পারে এবং ব্ল্যাকহোল গবেষণায় সহায়ক।
৫) নিয়ার ইনফ্রারেড ক্যামেরা অ্যান্ড মাল্টি অবজেক্ট স্পেকট্রোমিটার: হিট সেন্সর হিসেবে কাজ করে। ইন্টারস্টেলার ডাস্ট দিয়ে ঘেরা বস্তু দেখতে সহায়তা করে।
৬) ফাইন গাইডেন্স সেন্টার: মূলত নক্ষত্রের মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং নক্ষত্রের গতি মাপতে সহায়ক।

হাবল টেলিস্কোপের যন্ত্রপাতি; Image Source: spacetelescope.org
পৃথিবীতে যেভাবে পৌঁছায় ছবি
একটি অ্যান্টেনার মাধ্যমে এসব তথ্য রেডিও কম্পাঙ্ক আকারে সংগৃহীত হয়। এ কাজে নিযুক্ত প্রকৌশলীরা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিস্কোপের সাথে যোগাযোগ সম্পন্ন করেন এবং বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। এর জন্য মূলত দুটি প্রধান কম্পিউটার নিযুক্ত থাকে। এর মধ্যে একটি নির্দেশনা পরিচালনা করে এবং আরেকটি তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণের কাজ করে থাকে। অর্থাৎ, বিশাল যান্ত্রিক সমন্বয় ও কর্মীদের বাহিনী দ্বারা পরিচালিত হয় এ টেলিস্কোপের কার্যক্রম।
২০০৯ সালে জ্যোতির্বিদরা পঞ্চমবারের মতো হাবল টেলিস্কোপ পরিদর্শনে যাত্রা করেন এবং এতে নতুন যন্ত্রপাতি ও ক্যামেরা স্থাপন করেন। ২০২০ সালে টেলিস্কোপটির বয়স হলো ৩০ বছর, এবং এটি এখনও মহাকাশের চিত্তাকর্ষক চিত্র ধারণ করতে সক্ষম। তবে নাসা ‘জেমস ওয়েব’ নামের আরও অধিক উন্নতমানের একটি স্পেস টেলিস্কোপ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। সেটি হাবল টেলিস্কোপের স্থান দখল করবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে হাবল টেলিস্কোপ যে বিশাল অবদান রেখেছে এবং এটি যে মহাকাশ গবেষণায় একটি মাইলফলকের নাম, তা নিঃসন্দেহে স্বীকার করতেই হবে।
সংক্ষেপে দেখুননিদ্রাহীনতা সমাধানের ভিন্নধর্মী পন্থা ক্যানাবিস কি সত্যিই কাজ করে?
সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর আমাদের মন আর শরীর দুটোই ক্লান্ত থাকে, প্রয়োজন হয় বিশ্রামের। বাসায় ফেরার পর সবচেয়ে আপন করে নিতে ইচ্ছা হয় পরিপাটি করে গোছানো বিছানাটাকেই। খাওয়া-দাওয়া করে এরপর ঘুমের রাজ্যে আমাদের প্রবেশ ঘটে। দৈনন্দিন জীবনে পরিশ্রমের পর আমাদের প্রত্যেকেরই একটা নির্দিষ্ট সময় ঘুমের প্রয়োজন হয়।বিস্তারিত পড়ুন
সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর আমাদের মন আর শরীর দুটোই ক্লান্ত থাকে, প্রয়োজন হয় বিশ্রামের। বাসায় ফেরার পর সবচেয়ে আপন করে নিতে ইচ্ছা হয় পরিপাটি করে গোছানো বিছানাটাকেই। খাওয়া-দাওয়া করে এরপর ঘুমের রাজ্যে আমাদের প্রবেশ ঘটে। দৈনন্দিন জীবনে পরিশ্রমের পর আমাদের প্রত্যেকেরই একটা নির্দিষ্ট সময় ঘুমের প্রয়োজন হয়। যখন এই গুরুত্বপূর্ণ ঘুমেরই সমস্যা হয়, তখন তো আমাদের নড়েচড়ে বসতেই হয়। তবে সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা সবসময়ই কি যৌক্তিক কিছু করি অথবা যা করি তা কি আদৌ চিরস্থায়ী সুফল বয়ে আনে?
ঘুমের সমস্যা বলতে সাধারণত ঘুমের স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হওয়াকেই বোঝানো হয়। এগুলোর মাঝে সবচেয়ে প্রচলিত সমস্যাটি হল ইনসমনিয়া বা নিদ্রাহীনতা। স্লিপ অ্যাপনিয়াতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ঘুমের সময় সঠিকভাবে শ্বাস নিতে পারেন না। কেউ কেউ আবার ঘুমের মাঝে পা এক জায়গায় স্থির রাখতে পারেন না। একে রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম (RLS) বলে। পায়ে এক ধরনের অস্বস্তি বা মৃদু খোঁচা খাওয়ার অনুভূতির কারণে এমন সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু সমস্যাটা পায়ে না, স্নায়ুতন্ত্রে। স্নায়ুতন্ত্রের যে অংশ ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে বিশৃঙ্খলার কারণে এই সমস্যার উদ্ভব হয়। আবার অনেকের নার্কোলেপসির কারণে দিনের বেলায় হুট করেই অস্বাভাবিক রকমের ঘুম পায়।
এতসব ঘুমের সমস্যার সাথে মাদকের সম্পর্কটা ঠিক কেমন? সেটা নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।
কর্মব্যস্ত দিনের পর দরকার পরিমিত ঘুম; Source: renkligaste.com
প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে নিদ্রাহীনতায় ভুগছেন এমন অনেকের সাথে কথা বলে দেখা গেছে যে, তাদের অনেকেই সমাধানের পথ হিসেবে মারিজুয়ানা বা ক্যানাবিস (গাঁজা) সেবনকে বেছে নিচ্ছেন। এই চর্চাটা এখন প্রতিফলিত হচ্ছে বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। ক্যানাবিসকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন ওষুধ যেমন ন্যাবিলোন, ড্রোনাবিনল এবং ম্যারিনল ইত্যাদি প্রস্তুত হচ্ছে। এছাড়াও ক্যানাবিস সেবনকারীদের অনেকেই মেডিক্যাল মারিজুয়ানা কার্ড নিয়ে থাকেন।
ক্যানাবিস পাতা; Source: commons.wikimedia.org
প্রশ্ন হলো- ঘুমের সমস্যা সমাধানে ক্যানাবিস কতটা কার্যকরী? বিভিন্ন রোগীর মাঝে এর ব্যবহার থেকে প্রাপ্ত ফলাফল কখনোই ঢালাওভাবে কোনো উত্তরকে সরাসরি সমর্থন করে না। অর্থাৎ নিদ্রাহীনতার সমাধান হিসেবে মারিজুয়ানা বা ক্যানাবিসের ব্যবহার বহুলাংশেই স্বতন্ত্র। ঘুমের সমস্যা সমাধানে মারিজুয়ানা সেবন করা কতটা কার্যকর হবে সেটা নির্ভর করে ব্যক্তি বিশেষের উপর, মারিজুয়ানার পরিমাণ এবং এর সেবনের মাত্রার উপর।
সমস্যা সমাধানে ক্যানাবিস বা মারিজুয়ানা
কিছু কিছু গবেষণায় দেখে গেছে, ক্যানাবিস আক্ষরিক অর্থেই ঘুমে সাহায্য করে। নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপর এর প্রভাব বিভিন্ন রকম। কারও কারও ক্ষেত্রে এর ব্যবহার যথেষ্ট কার্যকরী। কার্যকরী এই অর্থে যে তারা খুব দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়তে পারছেন এবং ভাল ঘুমও হচ্ছে। আবার কেউ কেউ হয়তো খুব দ্রুত ঘুমাতে পারছেন না, কিন্তু তাদের ঘুমের গভীর পর্যায়টা বেশ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। তবে যখনই ক্যানাবিস সেবন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন স্পষ্টতই ঘুম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটা প্রমাণিত যে, ক্যানাবিস ঘুমের মান এবং সময়কাল নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। ক্যানাবিস থেকে প্রাপ্ত ক্যানাবিনয়েডসমূহের মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (THC), যা নিদ্রাহীনতা দূর করতে দারুণ কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল সেবনকারীদের মাঝে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার হার, যারা সেবন করছেন না তাদের চেয়ে অনেকংশেই বেশি। এছাড়াও গভীর রাতে হঠাৎ ঘুমে ভেঙে দীর্ঘ সময় ধরে জেগে থাকার সমস্যাটাও টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল এর মাধ্যমে দূর করা যায়।
Tetrahydrocannabinol; Source: Wikimedia Commons
প্রাণীদের উপর চালানো এক গবেষণায় (অ্যানিমেল ট্রায়াল) সংশ্লেষিত একটি ক্যানাবিনয়েডের (টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনলের অনুরূপ) ব্যবহার, সেরোটোনিন- প্রণোদিত অ্যাপনিয়ার সমাধানে আশাব্যঞ্জক ফলাফল এনে দিয়েছে। ক্যানাবিনয়ডের ব্যবহারের ফলে চিবুক এবং মুখের কিছু পেশীর শিথিলতা আসে এবং এর মাধ্যমেই অ্যাপনিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে (PTSD) আক্রান্ত সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের দুঃস্বপ্নের চিকিৎসায় ক্যনাবিনয়েডসমূহ বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
ঘুম এবং ক্যানাবিস; Source: semprequestione.com
টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্যনাবিনয়েডের সমন্বয়ে গঠিত একটি ওষুধ হচ্ছে ক্যানাবিডাইঅল (CBD), যেটি ঘুমের সমস্যা সমাধানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়াও তীব্র ক্যানাবিডাইঅল ব্যবহারের মাধ্যমে সার্বিকভাবে ঘুমের সময় বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
Cannabidiol; Source: chicagonow.com
ঢালাওভাবে মারিজুয়ানা বা ক্যানাবিস নামগুলো সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হলেও ঘুমের সমস্যা সমাধানে এদের কাজ করার পদ্ধতি কিন্তু এক নয়। ক্যানাবিসের অসংখ্য প্রজাতিগুলোর মাঝে পার্থক্যের কারণ টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল এবং ক্যানাবিডাইঅলের পরিমাণ। ক্যানাবিসের কিছু প্রজাতি আছে যেগুলোতে টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনলের উপস্থিতি অত্যন্ত বেশি। মারিজুয়ানারও এরকম কিছু প্রজাতিতে ক্যানাবিডাইঅলের পরিমাণ কম, আবার অন্যগুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি।
ঘুম চক্রে ক্যানাবিসের প্রভাব
ঘুমের মাঝে র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM ) নামক একটি পর্যায় আছে। ঘুমের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরা স্বপ্ন দেখি। ঘুমের আগে ক্যানাবিস সেবনের ফলে REM পর্যায়ে ব্যায়িত সময়ের পরিমাণ কমে আসে। ফলে ঘন ঘন স্বপ্ন দেখা অনেকটাই কমে যায়। তবে দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততার পর হুট করে ক্যানাবিস সেবন বন্ধ করে দিলে REM এর পুনরাবৃত্তি হওয়ার বেশ ভাল রকমের ঝুঁকি থেকে যায়।
ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়; Source: quora.com
কিছু সতর্কতা
ক্যানাবিস গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, দীর্ঘকাল সেবনের পর হুট করে ক্যানাবিসকে বিদায় জানানো যাবে না। বেশ লম্বা একটা সময় ধরে ক্যানাবিস সেবনের ফলে একজন মানুষের ঘুমের অভ্যাস বা ধরণ পরিবর্তিত হয়, এক ধরণের নির্ভরতা তৈরী হয়। হঠাৎ করেই যদি অভ্যস্ততায় ব্যাঘাত ঘটে, তখন এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বিভিন্ন সমস্যার উদ্ভব হয়। দেখা যায় যে, একজন ব্যক্তি হয়তো সারাদিনই ক্লান্ত অনুভব করছেন অথবা ঘুম থেকে উঠার পরও তার মনে হচ্ছে যে ঘুম ঠিকভাবে হয় নি। এছাড়াও অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে কখনোই ক্যানাবিস ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি করা উচিত নয়। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ১৫ বছর বয়সের আগে ক্যানাবিস অনেক সময় তারুণ্যের পুরোটা জুড়েই নিদ্রাহীনতা ডেকে আনে।
মেডিক্যাল মারিজুয়ানার বিশেষত্ব
মজার ব্যপার হচ্ছে, ঘুমের সমস্যা ছাড়াও আরও অনেক অসুখের চিকিৎসা হিসেবে মেডিক্যাল মারিজুয়ানা বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন-·
এখন পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বে ক্যানাবিস বা মারিজুয়ানার এসব উপকারী দিক সর্বজন স্বীকৃত নয়। হ্যাঁ, এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে চিকিৎসাক্ষেত্রে মেডিক্যাল মারিজুয়ায়ানা ব্যবহারের সাফল্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তবে মানুষের উপর এর প্রভাব তেমন ভাল নয়। তাই এখনও বিস্তর গবেষণা চলছে এর ভূমিকা নিয়ে। এতসব অসুখের সমাধান হিসেবে যদি একটি প্রাকৃতিক উপাদান সাফল্যের পথ দেখাতে পারে, সেটা নিঃসন্দেহে স্বস্তির বার্তা বয়ে আনবে রোগী ও তার স্বজনদের জন্য।
সংক্ষেপে দেখুনবিজ্ঞানীরা দূরবর্তী গ্রহ-নক্ষত্রের দূরত্ব নির্ণয় করেন কীভাবে?
পত্র পত্রিকায় খবর আসছে, প্রতিনিয়ত গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি প্রভৃতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। কোটি কোটি কিলোমিটার কিংবা শত শত আলোক বর্ষ দূরে এসব মহাকাশীয় বস্তুর অবস্থান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এরা যে এত দূরে অবস্থান করে তা কীভাবে নির্ণয় করেন বিজ্ঞানীরা? বেশ নিশ্চিত হয়ে বিজ্ঞানীরা কীভাবে বলেন “এত আলোক বর্ষ দূরে অববিস্তারিত পড়ুন
পত্র পত্রিকায় খবর আসছে, প্রতিনিয়ত গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি প্রভৃতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। কোটি কোটি কিলোমিটার কিংবা শত শত আলোক বর্ষ দূরে এসব মহাকাশীয় বস্তুর অবস্থান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এরা যে এত দূরে অবস্থান করে তা কীভাবে নির্ণয় করেন বিজ্ঞানীরা? বেশ নিশ্চিত হয়ে বিজ্ঞানীরা কীভাবে বলেন “এত আলোক বর্ষ দূরে অবস্থান করছে অমুক গ্যালাক্সিটি”?
দূরের গ্রহ নক্ষত্রের দূরত্ব বোঝাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘আলোক বর্ষ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। সৌরজগতের বাইরে মহাকাশের বস্তুগুলোর দূরত্ব মাপতে সাধারণ কিলোমিটার একক ব্যবহার করা সুবিধাজনক নয়। এত বিশাল দূরত্ব পরিমাপ করতে ‘আলোক বর্ষ’ নামক বিশেষ এই এককটি ব্যবহার করা হয়। আলোক বর্ষের (Light year) বিশালত্ব মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। আলো যদি এই বেগে টানা এক বছর ভ্রমণ করে, তাহলে যে দূরত্ব অতিক্রম করবে, তাকে বলে এক আলোক বর্ষ। কিলোমিটারের মাধ্যমে আলোক বর্ষকে প্রকাশ করলে দাঁড়াবে, এক আলোক বর্ষ সমান ৯ মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার (৯×১০^১২ কিলোমিটার)। আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টারির দূরত্ব ৪.২ আলোক বর্ষ। দূরের গ্যালাক্সিগুলো শত শত কিংবা হাজার হাজার আলোক বর্ষ পর্যন্ত দূরে অবস্থান করে। এত বিশাল দূরত্ব মাপার কৌশলটা কী?
সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রের দূরত্বও ৪ আলোকবর্ষের চেয়ে বেশি। ছবি: ন্যাশনাল স্কুল অবজারভেটরি ইউকে
অকল্পনীয় দূরে অবস্থান করলেও আমাদের পক্ষে এদের দূরত্ব পরিমাপ করা সম্ভব। গ্যালাক্সিগুলোতে অবস্থান না করেও চমৎকার কিছু কৌশল ব্যবহার করে তাদের দূরত্ব বের করে ফেলা যায়। তুলনামূলকভাবে নিকটবর্তী নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব পরিমাপে ‘প্যারালাক্স’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। শব্দটি শুনতে অন্যরকম মনে হলেও, এটি আসলে একদমই সহজ একটি ট্রিক। এই ট্রিকটি হাতে কলমে এখনই আমরা শিখে ফেলতে পারি।
প্রথমে মুখের সামনে হাতের একটি আঙুল তুলে ধরতে হবে। এরপর বাম চোখ বন্ধ করে শুধুমাত্র ডান চোখ দিয়ে আঙুলটির দিকে তাকাতে হবে। এরপর আবার ডান চোখ বন্ধ রেখে বাম চোখ দিয়ে আঙুলের দিকে তাকাতে হবে। একবার ডান চোখ আরেকবার বাম চোখ, এভাবে কয়েকবার করলে মনে হবে আঙুলটির অবস্থান এদিক ওদিক হচ্ছে। আদতে আঙুলটি কিন্তু একই স্থানে আছে, দুই চোখের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণে আঙুলটিও ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে আছে বলে মনে হয়।
বুড়ো আঙুলের সাহায্যে প্যারালাক্স। ছবি: এস্ট্রোনমি নোটস
আঙুলকে চোখের আরো কাছে নিয়ে আসলে আঙুলের নড়াচড়া আরো বেড়ে যাবে। কাছে না এনে যদি আঙুলকে দূরে নেয়া হয় তাহলে নড়াচড়া অল্প স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারছি, দুই চোখের দুই ভিন্ন অবস্থানের সাপেক্ষে আঙুলের অবস্থান পাল্টে যাবার পরিমাণ বেশি হলে, সেটি নিকটে অবস্থিত আর অবস্থান পরিবর্তনের পরিমাণ কম হলে, সেটি দূরে অবস্থিত। যদি কোনোভাবে আমরা দুই চোখের পারস্পরিক দূরত্ব ও লক্ষ্যবস্তুর বিচ্যুত হবার পরিমাণ বের করতে পারি, তাহলে ত্রিকোণমিতির সূত্র প্রয়োগ করে বের করতে পারবো লক্ষ্যবস্তুর দূরত্ব কত। নক্ষত্রদের বেলাতেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে তাদের দূরত্ব পরিমাপ করা সম্ভব।
এই পদ্ধতিতে নক্ষত্রের দূরত্ব পরিমাপ করার জন্য আঙুলের বদলে নক্ষত্রকে লক্ষ্য করে ডান চোখ ও বাম চোখ দিয়ে তাকালে দেখা যাবে, কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। কারণ নক্ষত্র এতই বেশি দূরে অবস্থান করে যে, দুই চোখের কাছাকাছি অবস্থান তেমন কোনো কৌণিক বিচ্যুতি তৈরি করতে পারে না। দুই চোখ যদি পরস্পর থেকে কয়েক মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করতো, তাহলে এদের দ্বারা প্যারালাক্স পদ্ধতিতে নক্ষত্রদের দূরত্ব পরিমাপ করা যেত।
খালি চোখে নক্ষত্রের প্যারালাক্স পর্যবেক্ষণ করতে হলে দুই চোখকে পরস্পর থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করতে হবে। ছবি: মাই কিউট গ্রাফিক্স
চোখকে হয়তো মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করানো সম্ভব না, কিন্তু বিজ্ঞানীরা এর বিকল্প পদ্ধতি খুঁজে নিয়েছেন। আসলে কোনো কিছুকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণ করলে, তার মধ্যে হাজার রকমের সমস্যা দেখা দেয় এবং এসব সমস্যার বিপরীতে হাজার রকমের চমকপ্রদ সমাধানও এসে ধরা দেয়। বিজ্ঞানীরা মহাকাশীয় বস্তুর দূরত্ব মাপতে পৃথিবীর কক্ষপথীয় ঘূর্ণনকে ব্যবহার করেন। সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর কক্ষপথের ব্যাস ১৮৬ মিলিয়ন মাইল। আজকে পৃথিবী কক্ষপথের যে অবস্থানে আছে এবং ঠিক ছয় মাস পরে যে অবস্থানে থাকবে তাদের পারস্পরিক দূরত্ব হবে ১৮৬ মাইল। এটি মোটামুটি যথেষ্ট লম্বা দূরত্ব। এত পরিমাণ দূরত্বে দূরবর্তী নক্ষত্রের প্যারালাক্স অনায়াসেই শনাক্ত করা যাবে।
কক্ষপথের কোনো অবস্থান থেকে নক্ষত্রের অবস্থানের মাপ নিয়ে, ছয় মাস পর আবারো ঐ নক্ষত্রের মাপ নিলে প্যারালাক্স পদ্ধতির মাধ্যমে তার দূরত্ব নির্ণয় করা যাবে। এখানে যেহেতু ছয় মাস আগে ও ছয় মাস পরে পৃথিবীর দুই অবস্থানের দূরত্ব জানা আছে এবং নক্ষত্রের অবস্থান চ্যুতি জানা আছে, তাই ত্রিকোণমিতির সূত্রের মাধ্যমে এখান থেকে নক্ষত্রের দূরত্ব বের করা খুব কঠিন কিছু নয়।
বড় পড়িসরে প্যারালাক্স। ছবি: ইএসএ ইন্টারন্যাশনাল
কিন্তু এত বিশাল দূরত্বকে ব্যবহার করার পরেও সকল নক্ষত্রের দূরত্ব এর মাধ্যমে বের করা যায় না। এই পদ্ধতিতে শুধুমাত্র নিকট দূরের নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব পরিমাপ করা যায়। অতীব দূরের নক্ষত্রগুলোর বেলায় এই পদ্ধতিতে দূরত্ব বের করা যায় না। এরা এতটাই দূরে যে, ১৮৬ মিলিয়ন মাইলের প্যারালাক্স দুূরত্বও এখানে কিছু না।
এদের দূরত্ব পরিমাপ করতে হলে প্যারালাক্স পদ্ধতির বিকল্প কিছু একটা ভাবতে হবে। এর বিকল্প হতে পারে উজ্জ্বলতা। কোনো নক্ষত্র বা কোনো গ্যালাক্সি কতটুকু উজ্জ্বল তার মাধ্যমে দূরত্ব বের করা যেতে পারে। কোনো নক্ষত্র যদি কাছে থাকে তাহলে তাকে অধিক উজ্জ্বল দেখাবে আর কোনো নক্ষত্র যদি দূরে থাকে তাহলে তাকে কিছুটা অনুজ্জ্বল দেখাবে।
উজ্জ্বলতা বিবেচনা করে দূরত্ব পরিমাপ করার ব্যাপারটি আপাতভাবে সুন্দর হলেও, এতে বেশ কিছু ঝামেলা আছে। সব নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা সমান নয়। নক্ষত্রের আকার ও ভরের উপর তার উজ্জ্বলতা নির্ভর করে। অনুজ্জ্বল নক্ষত্রটি যদি কাছে থাকে আর উজ্জ্বল নক্ষত্রটি যদি দূরে থাকে, তখন এই ব্যাপারটির মীমাংসা কীভাবে করা হবে? মৃদু উজ্জ্বল মোমবাতি যদি কাছে থাকে আর অধিক উজ্জ্বল মোমবাতি যদি দূরে থাকে, তাহলে আপেক্ষিকভাবে তাদের উজ্জ্বলতা সমান বলে মনে হতে পারে। কিংবা এমনও হতে পারে, অবস্থানের কারণে হালকা উজ্জ্বলতার মোমবাতিটিকেই বেশি উজ্জ্বল বলে প্রতিভাত হচ্ছে। নক্ষত্রদের বেলাতেও এরকম ব্যাপার প্রযোজ্য। তাই উজ্জ্বলতা দিয়ে দূরত্ব পরিমাপ করতে গেলে তা সমস্যার সৃষ্টি করবে।
সৌভাগ্যক্রমে, বিজ্ঞানীরা বিশেষ ধরনের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে দূরবর্তী নক্ষত্রের দূরত্ব পরিমাপ করতে পারেন। তারা বিশেষ কিছু নক্ষত্রকে ‘প্রমাণ নক্ষত্র’ হিসেবে ধরে নেন এবং এদের সাপেক্ষে অন্য নক্ষত্রের দূরত্ব পরিমাপ করতে পারেন। এসব নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা ও তীব্রতা নির্দিষ্ট থাকে। বিজ্ঞানীরা এও জানেন, কীভাবে এরকম প্রমাণ নক্ষত্র (Variable Star) খুঁজে বের করতে হবে। এরকম নক্ষত্রের সাহায্যে, প্রতিষ্ঠিত কিছু গাণিতিক সূত্রাবলি প্রয়োগ করে বের করা যায় দূরবর্তী নক্ষত্রগুলো কত দূরে অবস্থিত।
ট্রিফিড নীহারিকায় কয়েকটি প্রমাণ নক্ষত্র। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স/ESO/D. Minniti
গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র যত দূরেই থাকুক, কোনো না কোনো ভাবে আমরা তাদের অবস্থান ও দূরত্ব বের করতে পারি। নিকটবর্তী নক্ষত্রের জন্য আমাদের আছে প্যারালাক্স পদ্ধতি আর দূরবর্তী নক্ষত্রের জন্য আমাদের আছে ‘প্রমাণ নক্ষত্র’ পদ্ধতি।
বিজ্ঞান এই একটা দিক থেকে অনন্য। কোনো একটা ব্যাপার যতই ধরাছোঁয়ার বাইরে হোক না কেন, বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে মানুষ কিছু একটা উপায় ঠিকই খুঁজে নেয়। বিজ্ঞানের মারপ্যাঁচে সমস্যার সমাধান বের হয়ে যায় ঠিকই।
সংক্ষেপে দেখুনপৃথিবী থেকে মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে কী ঘটবে ?
কোথাও কেউ নেই। পরিত্যক্ত শহরে বাতাসে উড়ে বেড়ানো কিছু কাগজপত্র আর পলিথিনের ব্যাগের শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দও নেই। একটু পরপর ভূতুড়ে কঙ্কালের মতো যেন দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নদশার পরিত্যক্ত বহুতল ভবনগুলো। মাঝে মাঝে এ গলি থেকে ও’ গলিতে দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে হ্যামেলিনের গল্পের মতো বিশালাকৃতির ইঁদুর অথবা অন্য কোনবিস্তারিত পড়ুন
কোথাও কেউ নেই। পরিত্যক্ত শহরে বাতাসে উড়ে বেড়ানো কিছু কাগজপত্র আর পলিথিনের ব্যাগের শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দও নেই। একটু পরপর ভূতুড়ে কঙ্কালের মতো যেন দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নদশার পরিত্যক্ত বহুতল ভবনগুলো। মাঝে মাঝে এ গলি থেকে ও’ গলিতে দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে হ্যামেলিনের গল্পের মতো বিশালাকৃতির ইঁদুর অথবা অন্য কোনো নাম না জানা বিদঘুটে প্রাণী। আর এই পরিত্যক্ত শহরেই হয়তো বাঁচার চেষ্টা করছে বিচ্ছিন্ন একটি-দুটি পরিবার।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: Entertainment One
এই দৃশ্য আমাদের অত্যন্ত পরিচিত। শত শত পোস্ট অ্যাপোক্যালিপ্টিক চলচ্চিত্র আছে, যেখানে এ ধরনের দৃশ্য দেখানো হয়। কোনো ভাইরাসের আক্রমণে, রহস্যময় কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে, কিংবা বিষাক্ত কোনো রাসায়নিক দুর্ঘটনায় বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের মৃত্যুর পর অল্প কিছু বেঁচে থাকা মানুষের ভাগ্যে কী ঘটতে পারে, সেটাই এ ধরনের চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সত্যিই যদি কখনো হঠাৎ করে বিশ্বের সব মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীতে কী কী ঘটতে পারে? মানব সভ্যতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হতে কীরকম সময় লাগতে পারে?
উৎসাহী বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময় এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেল বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গবেষকের সাহায্যে মনুষ্য পরবর্তী যুগের পৃথিবীর চিত্র আঁকার চেষ্টা করেছেন। সামান্য কিছু পার্থক্য থাকলেও তারা অধিকাংশই মোটামুটি একই ধরনের সম্ভাবনা এবং আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। চলুন জেনে নিই কী ঘটতে পারে পৃথিবীর ভাগ্যে, যদি আমরা হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে যাই।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: tokyogenso
মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পৃথিবীর অধিকাংশ এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। বিশ্বের অধিকাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় জ্বালানি তেলের মাধ্যমে। মানুষ না থাকলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মতো কেউ না থাকায় কয়েক ঘন্টার ব্যবধানেই বিশ্বের অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। কেবলমাত্র উইন্ডমিল, সোলার প্যানেল এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরবরাহকৃত এলাকাতেই বিদ্যুৎ প্রবাহ অবিচ্ছিন্ন থাকবে।
উইন্ডমিলের লুব্রিক্যান্ট শেষ হয়ে গেলে এবং সোলার প্যানেলের উপর ধুলোবালি পড়ে তা আচ্ছাদিত হয়ে গেলে কয়েক মাসের মধ্যে সেগুলোও অকার্যকর হয়ে যাবে। শেষপর্যন্ত শুধুমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত থাকতে পারে। এগুলো কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর পর্যন্তও কার্যকর থাকতে পারে। অব্যবস্থাপনায় সেগুলোও নষ্ট হয়ে গেলে কয়েক শত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পৃথিবী সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: tokyogenso
প্রথম কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আরেকটি বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। বিশ্বের তেল এবং গ্যাস শোধনাগারগুলোতে বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি হবে। নিয়ন্ত্রণ করার কেউ না থাকায় সেগুলো মাসের পর মাস ধরে জ্বলতে পারে। লোকালয় কিংবা বনাঞ্চল থেকে বেশি দূরে অবস্থিত না হলে অগ্নিকান্ড ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। এছাড়াও প্রথম ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই শক্তি গ্রহণের মাত্রায় ব্যাপক হ্রাস হওয়ায় বিশ্বের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেফ মোডে চলে যাবে।
দুই-তিন দিনের মধ্যেই বিশ্বের অধিকাংশ ভূগর্ভস্থ রেললাইন এবং টানেল পানিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে যাবে। নিয়মিত পানি নিষ্কাশনের জন্য অধিকাংশ ভূগর্ভস্থ রেললাইন এবং টানেলেই পাম্প ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এবং জেনারেটরের জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় সেগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এবং পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব না হওয়ায় ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে পড়বে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
১০ দিনের মধ্যেই অধিকাংশ পোষা প্রাণী অনাহারে মৃত্যুবরণ করবে। ইলেক্ট্রিক গেটগুলো অকেজো হয়ে পড়ায় প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই বিশ্বের শত কোটি গরু, ছাগল, শূকর, মুরগিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণী তাদের খামার থেকে বেরিয়ে পড়বে। যারা বের হতে পারবে না, তারা খামারের ভেতরেই মারা যাবে। আর যারা বের হতে পারবে, তারাও বাইরের পরিবেশের সাথে অভ্যস্ত না হওয়ায় এবং খাবারের সংকট থাকায় ধীরে ধীরে মারা পড়বে। বেঁচে থাকবে কেবল আগে থেকেই বাইরে থাকা হিংস্র বন্য পশুরা। বিভিন্ন জাতের ইঁদুর এবং তেলাপোকা বেঁচে থাকলেও যেগুলো মানুষের ফেলে দেওয়া ময়লার উপর নির্ভরশীল ছিল, খাদ্যের অভাবে তাদের সংখ্যাও বিপুলভাবে হ্রাস পাবে।
এক মাসের মধ্যেই নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলোকে ঠান্ডা করার জন্য ব্যবহৃত পানি বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার ফলে রিঅ্যাক্টরগুলোতে বিস্ফোরণ শুরু হবে। নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এর প্রতিক্রিয়া হবে চেরনোবিল এবং ফুকুশিমার সম্মিলিত বিপর্যয়ের চেয়েও মারাত্মক। বিশাল এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে যাবে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত পৃথিবীর বড় একটি অংশ জুড়ে এর প্রভাব বজায় থাকবে। আশেপাশের এলাকার প্রচুর প্রাণী দীর্ঘকাল পর্যন্ত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ছাড়াও প্রাকৃতিক কারণেও নিয়মিত অগ্নিকান্ড ঘটবে। সামান্য বজ্রপাতের কারণে কোনো এলাকায় অগ্নিকান্ডের সূচনা হলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। অগ্নিকান্ডের কারণে বিশ্বের প্রচুর গ্রামের কাঠের নির্মিত ঘরবাড়ি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আগুনের হাত থেকে বেঁচে গেলেও কাঠের অধিকাংশ ঘরবাড়ি ধীরে ধীরে ঘুণপোকা এবং ছারপোকার আক্রমণে ধ্বসে পড়তে থাকবে। মোটামুটি ৭৫ বছরের মধ্যে কাঠের বিম এবং কলামগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করবে এবং ১০০ বছরের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ কাঠের স্থাপনা ধ্বসে পড়বে।
২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে ফুটপাথ এবং রাস্তাঘাটগুলোতে ফাটল ধরে সেখানে আগাছা এবং গাছপালা জন্মাতে থাকবে। এ সময়ের মধ্যে ফুটপাত এবং খোলা চত্বরগুলোর তিন-চতুর্থাংশই ঘাস এবং আগাছায় আবৃত হয়ে যাবে। বিশ্বের অনেক রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাবে। শীত প্রধান দেশে শীতকালে পানি জমে বরফ হয়ে যাবে এবং গরমকালে আবার বরফ গলে পানিতে রূপান্তরিত হবে। এই তারতম্যের কারণে রাস্তাঘাটের ভাঙণ ত্বরান্বিত হবে। বৃষ্টির পানি ছাদের উপর জমে কনক্রিটের ভবনগুলোরও একই দশা সৃষ্টি করবে। মোটামুটি ২০০ বছরের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ কনক্রিটের বিল্ডিং ভেঙে পড়তে শুরু করবে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
ব্যবস্থাপনার অভাবে স্টিলের তৈরি ভবন এবং ব্রিজগুলোতে বৃষ্টির পানি এবং বাতাসের অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় মরচে ধরতে শুরু করবে। মোটামুটি ৩০০ বছরের মধ্যে আইফেল টাওয়ার, গোল্ডেন গেট ব্রিজসহ বিশ্বের অধিকাংশ স্টিলের স্থাপনা ভেঙে পড়তে শুরু করবে। মরুভূমিতে এই প্রক্রিয়া একটু মন্থর হবে, কিন্তু তার আগেই আরব আমিরাত, কাতারসহ বিশ্বের অধিকাংশ মরুময় এলাকা পুনরায় বালিতে ডুবে যাবে। যত মজবুতই হোক, ব্যবস্থাপনা না থাকায় কয়েকশো বছরের মধ্যে বাঁধগুলোও ভেঙে পড়বে এবং প্রচুর এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। প্রকৃতি ধীরে ধীরে মানব সভ্যতাকে গ্রাস করে নিতে থাকবে।
মানুষের কারণে যেসব বন্যপ্রাণী, পাখি এবং সামুদ্রিক মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল, তাদের সংখ্যা পুনরায় বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে। চিড়িয়াখানা থেকে বের হয়ে যাওয়া বন্য এবং বিরল প্রজাতির প্রাণীরাও নতুন করে বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করবে। মানুষের অনুপস্থিতিতে দূষণ হ্রাস পাবে, বায়ুমন্ডল পরিষ্কার হয়ে উঠতে থাকবে। কয়েক হাজার বছর পরে মানুষের নির্মিত শহরগুলোর খুব কম চিহ্নই অবশিষ্ট থাকবে। শহরের রাস্তাগুলো নদীতে এবং শহরগুলো বনাঞ্চলে পরিণত হয়ে যাবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে মানুষ যে কৃত্রিম আবাসস্থল তৈরি করেছিল, প্রকৃতি সেগুলো আবার অধিগ্রহণ করে নিবে।

সংক্ষেপে দেখুনশিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
মানুষের নির্মিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে শেষপর্যন্ত টিকে থাকবে প্রাচীনকালে পাথর কেটে তৈরি করা বিশালাকৃতির স্থাপনাগুলোই। ১০ হাজার বছর পর কেবলমাত্র চীনের মহাপ্রাচীর, মিসরের পিরামিড এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট রাশমোর ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ছাড়া বলতে গেলে মানুষের নির্মিত আর কোনো স্থাপনাই টিকে থাকবে না। মাউন্ট রাশমোরে পাহাড় কেটে প্রেসিডেন্টদের তৈরি মূর্তিগুলোই হয়তো সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হবে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত না হলে সেগুলো সাত মিলিয়ন বছর পর্যন্ত অক্ষত থাকতে পারবে। দশ থেকে পনেরো মিলিয়ন বছর পর যদি কোনো এলিয়েন পৃথিবীতে ভ্রমণ করে, তবে কেবলমাত্র কিছু প্লাস্টিকের অবশেষ ছাড়া মানুষের তৈরি কোনো কিছুই তারা খুঁজে পাবে না।
পৃথিবীটা যদি সমতল হতো তাহলে কেমন হতো?
কেমন হতো যদি আমাদের পৃথিবীটা বর্তুলাকার না হয়ে সমতল চাকতির মতো হতো? যেরকমটি ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটির সদস্যরা বিশ্বাস করে থাকে? আমাদের জীবনে এই সমতল চাকতির মতো পৃথিবীর প্রভাব কীরকম হতো? আমরা যদি হাঁটতে হাঁটতে সেই চাকতির একেবারে প্রান্তে পৌঁছে যেতাম, তাহলে কি সেখান থেকে বাইরের মহাশূন্যে ছিটকে পড়ে যেতাম?বিস্তারিত পড়ুন
কেমন হতো যদি আমাদের পৃথিবীটা বর্তুলাকার না হয়ে সমতল চাকতির মতো হতো? যেরকমটি ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটির সদস্যরা বিশ্বাস করে থাকে? আমাদের জীবনে এই সমতল চাকতির মতো পৃথিবীর প্রভাব কীরকম হতো? আমরা যদি হাঁটতে হাঁটতে সেই চাকতির একেবারে প্রান্তে পৌঁছে যেতাম, তাহলে কি সেখান থেকে বাইরের মহাশূন্যে ছিটকে পড়ে যেতাম?
পৃথিবী বা অন্য কোনো গ্রহের পক্ষেই আসলে সমতল হওয়া সম্ভব না। মহাকর্ষ শক্তির প্রভাবেই গ্রহ-নক্ষত্রগুলো প্রায় বৃত্তাকার হতে বাধ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির গ্রহ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভ স্টিভেনসনের মতে, এই মুহূর্তে যদি পৃথিবীকে জোর করে প্যানকেকের মতো সমতল করে দেওয়া হয়, তাহলে যা ঘটবে তা হচ্ছে, মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে এটি আবার গোলকে রূপান্তরিত হওয়ার চেষ্টা করবে। সমতল বানিয়ে ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথেই পৃথিবী এত প্রবলভাবে গোলক রূপে ফিরে যেতে চাইবে যে, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এমন কোনো পদার্থ নেই, যা দিয়ে পৃথিবীর পুনরায় গোলকে রূপান্তরিত হওয়ার প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে রাখা যাবে। তার মতে, মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই পৃথিবী গোলকে রূপান্তরিত হতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।
সমতল পৃথিবীর প্রান্ত থেকে বাইরে পড়ে যাওয়ার ধারণা @ Antar Dayal / Getty
লন্ডনের রয়্যাল অবজারভেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী ম্যারেক কুকুলাও স্টিভেনসনের মতো একই ধারণা পোষণ করেন। তার মতে, পৃথিবীকে যদি সমতল অবস্থায় রাখতে হয়, তাহলে এমন একটি সুইচের প্রয়োজন হবে, যার মাধ্যমে মহাকর্ষকে গায়েব করে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে পৃথিবীতে বায়ুমণ্ডল বলে কিছু থাকবে না; বায়ুমণ্ডল সহ পৃথিবীর সাথে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত নয়, এমন সব কিছুই ভাসতে ভাসতে মহাশূন্যে উড়ে যাবে। তাছাড়া বায়ুমণ্ডল না থাকায় অক্সিজেনের অভাবে সেখানে কোনো প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকাও সম্ভব হবে না।
কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয় যে, কোনো অলৌকিক ক্ষমতা বলে পৃথিবীকে সমতল করে ফেলা হলো এবং এর আকর্ষণ শক্তিও বজায় রাখা হলো, সেক্ষেত্রে কী ঘটতে পারে?
মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রকৃতি
গোলাকার পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির দিক; Source: TheHUB
সমতল পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির দিক; Source: TheHUB
সমতল পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কেন্দ্র হবে চাকতিটির পৃষ্ঠের কেন্দ্রবিন্দুতে। ফলে আপনি যদি চাকতির মতো আকৃতি বিশিষ্ট পৃথিবী পৃষ্ঠের কেন্দ্রে বা এর আশেপাশে অবস্থান করেন, তাহলে অনেকটা এখনকার মতোই আকর্ষণ অনুভব করবেন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে যত দূরে যেতে থাকবেন, পৃথিবী সমতল হওয়ার কারণে মাধ্যাকর্ষণ বল আপনাকে তত তীর্যকভাবে আকর্ষণ করতে থাকবে। ফলে আপনার হাঁটতে কষ্ট হবে এবং মনে হবে, আপনি বুঝি ঢালু পথ বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করছেন। কেন্দ্র থেকে যত বেশি প্রান্তের দিকে যেতে থাকবেন, আপনার কাছে ঘর-বাড়ি, পাহাড়-পর্বত সব কিছুকে তীর্যকভাবে তৈরি বলে মনে হতে থাকবে।
পৃথিবী পৃষ্ঠের পুরুত্বের উপর নির্ভর করে কেন্দ্রের দিকে অভিকর্ষের মান মোটামুটি স্বাভাবিক হতে পারে। চাকতিটির পুরুত্ব কীরকম হতে পারে, সেটি নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। তবে এর পুরুত্ব বর্তমান পৃথিবীর ব্যাসার্ধের এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ প্রায় ২,১২৩ কিলোমিটার ধরে নেওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে, গোলকের পৃষ্ঠকে যদি ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ব্যাসার্ধের এক-তৃতীয়াংশ পুরুত্ব নিলেই কেবল গোলকের সমান আয়তন পাওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে পৃথিবীর কেন্দ্র অভিকর্ষের মান বর্তমানের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হতে পারে। তবে কেন্দ্র থেকে দূরে যেতে থাকলে এই মান ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকবে।
পৃথিবীর প্রান্ত থেকে ছিটকে পড়ে যাওয়া
পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরে যেতে থাকলে পথগুলোকে ঢালু মনে হবে; Source: VSauce/YouTube
পৃথিবীর একেবারে প্রান্তে পৌঁছানো আপনার পক্ষে অসম্ভব না হলেও খুবই কঠিন একটি কাজ হবে। কারণ, একেবারে প্রান্তে পৃথিবীর অভিকর্ষ বল প্রায় ভূমির সমান্তরালে কাজ করবে। ফলে আপনি যদি প্রান্তের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করেন, তাহলে আপনার কাছে মনে হবে, আপনি বুঝি একেবারে খাড়া পাহাড় বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন।
যদি কোনোভাবে আপনি পৃথিবী নামক চাকতিটির একেবারে প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারেন, তাহলে আপনি তো বাইরের মহাশূন্যে ছিটকে পড়বেনই না, বরং সম্ভাবনা আছে কেন্দ্রের দিক থেকে ভূমির সমান্তরাল আকর্ষণ শক্তির প্রভাবে আপনি ভেতরের দিকেই পড়ে যাবেন। আর একবার যদি চাকতির প্রান্তের ধারের উপর উঠে যেতে পারেন, তাহলে আপনার কাছে সেটিকেই স্বাভাবিক মাটি বলে হবে। সেখানে আপনি খুবই স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারবেন, অনেকটা এখনকার মতোই।
পৃথিবীর প্রান্তে পৌঁছালে ভেতর দিকে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে; Source: VSauce/YouTube
দিবারাত্রির পরিবর্তন
পৃথিবী গোলক হওয়ায় নিজ অক্ষের উপর আবর্তের ফলে দিবারাত্রি সংঘটিত হয়। কিন্তু পৃথিবী যদি সমতল হয়, তাহলে দিন বা রাত বলে পৃথক কিছু থাকবে না। সবসময় সমগ্র পৃথিবী একই রকমের আলো পাবে। অবশ্য আমরা যদি কল্পনা করে নেই যে, পৃথিবী না, বরং সূর্যই পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, সেক্ষেত্রে অবশ্য ভিন্ন কথা। সেক্ষেত্রে দিন এবং রাত সংঘটিত হবে ঠিকই, কিন্তু সমগ্র পৃথিবীতে একই সাথে দিন হবে, আবার একই সাথে রাত হবে।
ঋতু পরিবর্তন
পৃথিবী তার অক্ষের উপর তীর্যকভাবে হেলে থাকা অবস্থায় সূর্যের চারদিকে আবর্তন করার ফলে দিবারাত্রির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে এবং ঋতু পরিবর্তিত হয়। কিন্তু পৃথিবী সমতল হলে ঋতুর কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। পুরো বছর জুড়ে পৃথিবীর সকল স্থান একই রকম সূর্যের আলো পাবে। ফলে গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকাল বা শীতকাল বলে পৃথক পৃথক কোনো ঋতু থাকবে না। সমগ্র পৃথিবীর তাপমাত্রা মোটামুটি একই রকম থাকবে। উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু নামে কিছু না থাকায় কোথাও কোনো বরফও থাকবে না।
সাগর-মহাসাগরের অবস্থান
গোলাকার পৃথিবী বনাম সমতল পৃথিবী; Source: TheHUB/ Youtube
যেহেতু পৃথিবী নামক চাকতিটি সবকিছুকে তার কেন্দ্র বরাবর আকর্ষণ করবে, তাই পৃথিবীর সব সাগর-মহাসারের অবস্থান হবে পৃথিবীর কেন্দ্রে। অন্য কোথাও কোনো জলাধারের অস্তিত্ব থাকবে না। অর্থাৎ পুরো পৃথিবীর শুধুমাত্র যে দুটো জায়গায় স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বিরাজ করবে, তার একটি (কেন্দ্র) হবে মহাসাগর, আর অন্যটি (চাকতির প্রান্তের ধারের উপর) হবে পানিবিহীন সম্পূর্ণ মরুময়।
দৃষ্টিসীমা
পৃথিবী গোল হওয়ার কারণে আমরা মাটিতে থাকা অবস্থায় যতদূর পর্যন্ত দেখতে পারি, উঁচু স্থানে উঠলে তার চেয়ে আরো অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পারি। কিন্তু পৃথিবী সমতল হলে পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে খুব বেশি লাভ হবে না। পৃথিবী গোল বলেই সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ালে দূর থেকে কোনো জাহাজ যখন আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়, তখন আমরা প্রথমে তার মাস্তুলের চূড়াটি দেখি, এরপর পুরো জাহাজটির বিভিন্ন অংশ উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। কিন্তু সমতল পৃথিবীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ জাহাজ একসাথে আমাদের চোখের সামনে ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকবে। এখন যেরকম প্লেনে চড়লে আমরা পৃথিবীর বক্রতা বুঝতে পারি, তখন সেরকম ঘটবে না। প্লেন থেকেও দিগন্তকে সমতল বলে মনে হবে।
প্লেন থেকে দেখলে পৃথিবীর বক্রতা বোঝা যায়: Source: TheHUB
চন্দ্রগ্রহণ
সূর্য, চাঁদ এবং পৃথিবী যদি একই সমান্তরালে আসে, তখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়লে সেটাকে আমরা চন্দ্রগ্রহণ বলি। পৃথিবী গোলাকার বলেই পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে দিন বা রাতের যেকোনো সময় চন্দ্রগ্রহণ উপভোগ করার সময় চাঁদের উপর গোলাকার পৃথিবীর ছায়া পড়তে দেখা যায়। কিন্তু যদি পৃথিবী সমতল হয়, তাহলে চাঁদের উপর গোলাকার ছায়া পড়ার ঘটনাটি, অর্থাৎ পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হবে খুবই বিরল ঘটনা।
কারণ, অধিকাংশ সময়ই পৃথিবী-চন্দ্র-সূর্য একই সমান্তরালে আসার পরেও দেখা যাবে, পৃথিবীর সাথে তাদের অবস্থান এমন এক কৌণিক তলে যে, চাঁদের উপর গোলাকার পৃথিবীর ছায়া পড়া পড়ছে না, কেবলমাত্র একটি সরু দাগ দেখা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে পূর্ণ গ্রহণ কেবলমাত্র তখনই ঘটবে, যখন এদের অবস্থান একই সমান্তরালে অবস্থিত হবে এবং একইসাথে সূর্যের অবস্থান হবে পৃথিবীর উপরি পৃষ্ঠের ঠিক বিপরীত দিকে। অর্থাৎ পূর্ণগ্রহণ হবে শুধুমাত্র মাঝরাতে।
খেলাধুলার উপর প্রভাব
পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরে যেতে থাকলে অভিকর্ষ তীর্যকতর হতে থাকবে; Source: VSauce/YouTube
পৃথিবী সমতল হলে খেলাধুলার উপরেও বিশাল প্রভাব পড়বে। ফুটবল খেলার সময় বল যেদিকেই নিক্ষেপ করা হোক না কেন, মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে সেটি সব সময়ই গড়িয়ে পৃথিবী পৃষ্ঠের কেন্দ্রের দিকে ছুটে চলে আসতে চাইবে। কাজেই মাঠগুলোর দিক যদি হয় পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে এর প্রান্তের মধ্যবর্তী ব্যাসার্ধের অভিমুখে, তাহলে যে দল প্রান্তের দিকে থাকে থাকবে, তারা বেশি সুবিধা পাবে। ফলে সবগুলো মাঠের দিক হতে হবে ব্যাসার্ধের সাথে লম্ব অভিমুখে।
গাছপালার বৃদ্ধি
পৃথিবীতে গাছপালা বৃদ্ধি পায় মাধ্যাকর্ষণ বলের বিপরীত দিক অভিমুখে। ঋণাত্মক গ্র্যাভিট্রোপিজম নামক এক প্রকার বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি ঘটে থাকে। পৃথিবী সমতল হলে কেবলমাত্র কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থিত গাছপালার বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবে হবে। কেন্দ্র থেকে দূরত্ব যত বেশি হবে, গাছপালা তত তীর্যকভাবে বেড়ে উঠতে থাকবে।
সংক্ষেপে দেখুনসূর্য কিভাবে পৃথিবীর সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখছে?
বেঁচে থাকতে এবং বেঁচে থাকার তাগিদে করা প্রত্যেকটি কাজের পেছনে আছে সূর্যের হাত। দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো এক দিক থেকে সূর্যের উপস্থিতি পাওয়া যাবেই। আমাদের জীবন ধারণ করতে সূর্য কেমন ভূমিকা পালন করছে সে সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা হবে এখানে। আমরা এখনো জানি নাবিস্তারিত পড়ুন
বেঁচে থাকতে এবং বেঁচে থাকার তাগিদে করা প্রত্যেকটি কাজের পেছনে আছে সূর্যের হাত। দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো এক দিক থেকে সূর্যের উপস্থিতি পাওয়া যাবেই। আমাদের জীবন ধারণ করতে সূর্য কেমন ভূমিকা পালন করছে সে সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা হবে এখানে।
আমরা এখনো জানি না পৃথিবীর বাইরে মহাবিশ্বের কোনো স্থানে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা। তবে এটা জানি, যদি বহির্বিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব থেকে থাকে তাহলে তা অবশ্যই হবে কোনো নক্ষত্রের কাছাকাছি কোনো স্থানে। অন্তত এটা বলা যায়, পৃথিবীতে যে ধরনের প্রাণ আছে সে ধরনের প্রাণ যদি বাইরের বিশ্বে থাকে তাহলে তারা তাদের নক্ষত্রের কাছে থাকবে। কারণ এরকম প্রাণের টিকে থাকতে হলে নিকটবর্তী নক্ষত্র থেকে শক্তি সংগ্রহ করতে হবে। শক্তি ছাড়া কোনো প্রাণ টিকে থাকতে পারে না, শক্তি ছাড়া কোনো সভ্যতার বিকাশ হতে পারে না।
পৃথিবী যেমন সূর্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে অনেকটা তেমনই কাছে অবস্থান করবে প্রাণ ধারণকারী সেই গ্রহটি। কাছাকাছি বলতে একদম নিকটে বোঝানো হয়নি, আপেক্ষিকভাবে কাছাকাছি থাকবে অর্থাৎ প্রাণবান্ধব এলাকার মাঝে অবস্থান করবে। খুব কাছেও নয়, যার কারণে অধিক উত্তাপে পানি বাষ্প হয়ে উবে যাবে, আবার খুব দূরেও নয় যার কারণে অধিক শীতলতায় পানি সর্বদা বরফ হয়ে থাকবে। এরকম এলাকাই হচ্ছে প্রাণ ধারণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ।
প্রাণবান্ধব অঞ্চলটি দূরবর্তী কক্ষপথেও থাকতে পারে, আবার কাছের কক্ষপথেও হতে পারে। যেমন R136a1 নামে একটি নক্ষত্র আছে, যা আকারে বেশ বড়। নক্ষত্রের প্রাণ ধারণকারী গ্রহটির অবস্থান হবে এর থেকে দূরে, কারণ বড় বলে তার উত্তাপ বেশি হবে, তাই এমন দূরত্বে থাকতে হবে যেন উত্তাপে প্রাণ কোনো হুমকির মুখে না পড়ে। আবার সূর্যের চেয়েও ছোট কোনো নক্ষত্রের বেলায় প্রাণ ধারণকারী গ্রহ থাকবে নক্ষত্রের একদম কাছে, কারণ এর চেয়ে বেশি দূরে চলে গেলে গ্রহের পরিবেশ হবে অত্যধিক শীতল।
নক্ষত্রের আকার অনুসারে প্রাণ বান্ধব অঞ্চলের অবস্থান (গাঢ় আকাশী রঙ), মূল ছবি: পেগাসাস/বাংলায় রূপান্তর: লেখক
এবার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নে প্রবেশ করা যাক। প্রাণ ধারণকারী গ্রহকে কেন নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থান করতে হবে? কারণ প্রত্যেক প্রাণেরই টিকে থাকার জন্য শক্তি দরকার। আর শক্তির চমৎকার ও সহজলভ্য উৎস হচ্ছে নক্ষত্র। কোনো প্রকার কর্মযজ্ঞ ও অর্থ বিনিয়োগ না করেই নক্ষত্র বছরের পর বছর ধরে শক্তি সরবরাহ করে যায়। ফ্রি ফ্রি পাওয়া উন্নতমানের সুবিধা, এটার সদ্ব্যবহার করাই বেশি যৌক্তিক।
পৃথিবীর কথা বিবেচনা করি। পৃথিবীতে উদ্ভিদেরা সূর্যালোক থেকে শক্তি সংগ্রহ করে এবং তা সরবরাহ করে সমগ্র জীবজগতকে। উদ্ভিদ সূর্যালোক থেকে নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে। খাদ্য তৈরির জন্য অবশ্য সূর্যের আলোর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইডেরও প্রয়োজন হয়। এদের পাশাপাশি মাটির নিচ থেকে পানি ও খনিজেরও দরকার হয়। মূল শক্তিটুকু সূর্যের আলো থেকেই সংগ্রহ করে এবং এর সাহায্যেই স্যুগার বা চিনি তৈরি করে। চিনির শক্তিকে ভেঙেই সকল প্রাণী ও উদ্ভিদেরা চলাফেরা ও নড়াচড়া করে।
পাতার মধ্যে ঘটে যাওয়া প্রক্রিয়াগুলো হাজার হাজার সোলার প্যানেলের সমন্বয়ে তৈরি বিশাল এক ফ্যাক্টরির মতো। বাড়তি উপযোগ পাবার জন্য পাতাগুলো চ্যাপ্টা হয়ে থাকে। চ্যাপ্টা হলে এর ক্ষেত্রফলের পরিমাণ বাড়ে, ক্ষেত্রফল বাড়লে তাতে অধিক পরিমাণ সূর্যালোক আপতিত হয়। ফলে অধিক পরিমাণ খাদ্য উৎপন্ন হয়। বায়ু থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ে, ভূগর্ভ থেকে পানি ও খনিজ নিয়ে সূর্যের আলোকে ব্যবহার করে যে রেসিপির প্রক্রিয়া করা হয় তার চূড়ান্ত উৎপাদ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের চিনি।
পাতায় উৎপন্ন হওয়া বিভিন্ন ধরনের চিনি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চলে যায় উদ্ভিদের সমগ্র দেহে। দেহের বিভিন্ন অংশ আবার চিনি থেকে স্টার্চ বা শ্বেতসার তৈরি করে। শক্তি হিসেবে এটি আবার চিনি থেকেও বেশি সুবিধাজনক। উদ্ভিদের দেহের এই শ্বেতসার ও চিনি থেকে তৈরি হওয়া শক্তি ব্যবহার করেই বেঁচে থাকে দুনিয়ার সকল প্রাণী।
সূর্যালোকের শক্তির সাহায্যে বেঁচে থাকে উদ্ভিদ, আর উদ্ভিদের পাতায় উৎপন্ন হওয়া শক্তি ব্যবহার করে বেঁচে থাকে তাবৎ প্রাণিজগৎ। ছবি: গুড হাউজ কিপিং
তৃণভোজী (হার্বিভোরাস) কোনো প্রাণী, যেমন হরিণ বা খরগোশ, যখন কোনো উদ্ভিদকে খায়, তখন উদ্ভিদের শক্তিগুলোও তাদের দেহে যায়। এসব প্রাণীরা তাদের দেহ ও পেশি গঠন করতে শক্তিগুলো কাজে লাগায়। দেহের ও পেশির মাঝে শক্তিগুলো দরকার হয় মূলত খাদ্য সংগ্রহ করা, সঙ্গীর সাথে মিলন করা, বিপদে দৌড় দেয়া, অন্যের সাথে যুদ্ধ করা ইত্যাদি কাজে। এই শক্তিগুলোর আদি বা মূল উৎস হচ্ছে সূর্য, যা উদ্ভিদকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে তাদের মাঝে এসেছে।
মাংসভোজী (কার্নিভোরাস) প্রাণীরা আবার তৃণভোজী প্রাণীদেরকে খায়। ফলে এখানেও তৃণভোজী প্রাণীর শক্তি স্থানান্তরিত হয়ে চলে আসছে মাংসভোজী প্রাণীর মাঝে। এই শক্তিও মাংসভোজী প্রাণীর দেহ ও পেশি গঠন করতে কাজে লাগে। তারাও বিবাদে, দৌড়ে, মিলনে, গাছের চরণে শক্তি ব্যয় করে। মাংসভূক প্রাণীটি যদি স্তন্যপায়ী হয়, তাহলে তার কিছুটা শক্তি শিশুর জন্য দুধ উৎপাদন করতেও চলে যায়। এখানেও শক্তির মূল উৎস হিসেবে থাকছে সূর্য। যদিও এই শক্তি বেশ কতগুলো ধাপ পার হয়ে এই অবস্থানে আসে।
অন্যান্য প্রাণী ও পরজীবীরা মাংসভোজী প্রাণীর দেহে বসবাস করে আরো পরোক্ষভাবে শক্তি সংগ্রহ করে। এখানেও পরজীবীর শক্তির মূল উৎস হচ্ছে সূর্য।
জীবন অতিক্রম করে যখন কোনোকিছু মারা যায়, হোক সেটা প্রাণী, উদ্ভিদ, মাংসভোজী, তৃণভোজী কিংবা কোনো পরজীবী- তারা মৃত্যুর পর মাটিতে বিয়োজিত হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো আবর্জনাভূক প্রাণীরা এদের দেহাবশেষ খেয়ে ফেলে। এমন ধরনের আবর্জনাভূক প্রাণীর উদাহরণ হচ্ছে গোবরে পোকা। ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকও মৃতদেহটিকে খেয়ে শেষ করে ফেলতে পারে। ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকও মূলত এক প্রকার আবর্জনাভূক। এখানেও সেই আগের কথা, শক্তির মূল উৎস হচ্ছে সূর্য। এ কারণেই কম্পোস্টের স্তুপগুলো গরম হয়ে থাকে। কম্পোস্ট মূলত এক ধরনের জৈব সার। গোবর, আবর্জনা, বর্জ্য ইত্যাদি একত্র করে কোনো গর্তে ফেলে ঢেকে রাখলে কয়েকদিন পর যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তা-ই কম্পোস্ট। বছরখানেক আগে যে শক্তি উদ্ভিদের পাতায় আটকা পড়েছিল, সেটি এখন টগবগ করছে পচা কম্পোস্টের স্তূপে।
আবর্জনাভুক গুবরে পোকা, ছবি: esquire.com
‘মেগাপড’ নামে অস্ট্রেলীয় অঞ্চলের একটি পাখি আছে, এরা এদের ডিমে তা দেয় কম্পোস্ট স্তূপের তাপকে ব্যবহার করে। অন্যসব পাখিদের থেকে এরা একটু ব্যতিক্রম। অন্যান্য পাখিরা ডিমের উপর বসে নিজের গায়ের তাপ ব্যবহার করে ডিমে তা দেয়, কিন্তু অস্ট্রেলীয় মেগাপড পাখি তা দেবার জন্য বিচিত্র কারণে কম্পোস্টের স্তূপকে বেছে নেয়। এর জন্য তারা প্রথমে কম্পোস্টের একটি ক্ষেত্র তৈরি করে নেয় এবং পরে তার উপর ডিম পাড়ে। প্রয়োজন অনুসারে তারা তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণও করে। যখন তাপমাত্রা বাড়ানো দরকার, তখন উপর থেকে আরো কম্পোস্ট এনে যোগ করে, যখন তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলা দরকার, তখন কিছু পরিমাণ কম্পোস্ট সরিয়ে নেয়। পাখিগুলো এখানেও কিন্তু আদতে সূর্যের শক্তিকেই ব্যবহার করছে।
অস্ট্রেলীয় মেগাপড, ছবি: ডি কাউয়েল/উইকিমিডিয়া কমন্স
আবর্জনার স্তূপ থেকে মেগাপডের ডিম সংগ্রহ করছেন একজন ব্যক্তি, ছবি: মাইকেল রাংকেল
মাঝে মাঝে কিছু গাছ অনেকদিন ধরে টিকে থাকে। এই গাছগুলো বিয়োজিত হয় না বা কেউ এদের খেয়ে ফেলে না। তবে কারো খাদ্য না হলেও এরা স্তরীভূত অঙ্গারে পরিণত হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলমান এই প্রক্রিয়ায় স্তরের উপর স্তর জমা হয়ে বড় স্তর গঠন করে। পশ্চিম আয়ারল্যান্ড সহ অন্যান্য অঞ্চলের মানুষেরা বড় ইটের আকৃতিতে এসব অঙ্গার কেটে কেটে তুলে নিয়ে আসে।
ইট আকৃতির অঙ্গারগুলো তারা শীতের দিনে ঘর গরম রাখতে ব্যবহার করে। বরফের দেশগুলোতে ঘর গরম রাখতে ঘরের ভেতরে কিছু না কিছু জ্বালাতে হয়, বাংলাদেশ বা উষ্ণ অঞ্চলীয় দেশগুলোতে এভাবে জ্বালাতে হয় না। ঘরের ভেতর ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচতে তাপের যে শক্তি ব্যবহার করা হয় তার মূল উৎসও সূর্য, যা হাজার হাজার বছর আগে গাছের পাতায় আটকা পড়েছিল।
এই অঙ্গারগুলো উপযুক্ত পরিবেশ ও প্রভাবকের মধ্যে যদি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে থাকে, তাহলে সেগুলো কয়লায় পরিণত হয়। কয়লা অঙ্গারের চেয়ে ভালো মানের জ্বালানী। কয়লা পুড়িয়ে অধিক পরিমাণ উত্তাপ পাওয়া যায়। কয়লার এমন তাপীয় উপযোগিতার কারণেই আঠারো ও ঊনিশ শতকে শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল।
তেল, গ্যাস ও কয়লার শক্তি আদতে সূর্যেরই শক্তি; ছবি: সিটি অব পিটস্টোন
স্টিল মিলের উত্তপ্ত মেশিনের চালিকাশক্তি, স্টিম ইঞ্জিনের ধোঁয়া উড়ানো প্রবল বেগ, পানি কেটে জাহাজের ছুটে চলা এগুলোর সমস্ত শক্তিই আসলে আসছে সূর্য থেকে। হোক প্রত্যক্ষভাবে কিংবা হোক পরোক্ষভাবে। হতে পারে সেই শক্তি ১ হাজার বছর আগে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে কিংবা হতে পারে সেই শক্তির প্রক্রিয়াকাল ৩০০ মিলিয়ন বছর আগের।
শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিকে কিছু কিছু ইন্ডাস্ট্রি চলতো স্টিম ইঞ্জিনে। বাদ বাকি অধিকাংশ কটন মিলই চলতো পানি চালিত এক ধরনের যন্ত্রের মাধ্যমে। এই যন্ত্রকে বলা হয় ‘ওয়াটার হুইল’। এই যন্ত্রে চালিত মিল-ফ্যাক্টরিগুলো স্থাপন করা হতো তীব্র স্রোত সম্পন্ন নদীর পাশে। স্রোতের পানির মধ্যে হুইলকে বসানো হতো, এই স্রোতে হুইল ঘুরতো। এই শক্তিকে ব্যবহার করেই চলতো পুরো ফ্যাক্টরি। এখানে ইঞ্জিনের শক্তি কোথা থেকে আসছে? দেখতে সূর্যের সাথে সম্পর্কহীন মনে হলেও আসলে এখানেও শক্তি আসছে মূলত সূর্য থেকেই। কীভাবে?
চাকা বা হুইল ঘুরে পানির স্রোতে, পানির স্রোত তৈরি হয় অভিকর্ষীয় শক্তির প্রভাবে- যার মানে হচ্ছে পানিকে নীচে থেকে উপরে উঠতে হয়। কারণ নীচের পানি উপরে না গেলে উপরে পানির যে সাপ্লাই আছে তা কয়েক দিনেই শেষ হয়ে যাবে। পানিগুলো উপরে উঠতে হলে অবশ্যই বাষ্পে রূপ নিয়ে বায়ুতে ভর করে উঠতে হবে। আর পানি থেকে বাষ্প তৈরি করার কাজটা করে সূর্যের তাপশক্তি। সুতরাং যে ইঞ্জিনই হোক, আর যে শক্তিই হোক- সকল শক্তির উৎসই হচ্ছে মূলত সূর্য।
ওয়াটার হুইলের শক্তিও ঘুরে ফিরে সূর্য থেকেই আসে, ছবি: হামাহিস্ট্রি
কয়লার মাধ্যমে শিল্প বিপ্লব সাধিত হলে কটন মিলগুলো পানির পরিবর্তে কয়লা ব্যবহার করে ইঞ্জিন চালানো শুরু করেছিল। কয়লাও মূলত সূর্যেরই শক্তি। এখন এদের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে, এ প্রকার শক্তি তৈরি হয়েছিল মিলিয়ন বছর আগে, আর আরেক প্রকার শক্তি সঞ্চিত হয়েছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। পানি বাষ্প হয়ে উপরে উঠে কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বৃষ্টি আকারে ঝরে পড়ে কিংবা পর্বতের চূড়া থেকে বরফ হতে গলে পড়ে। এ ধরনের শক্তিকে বলা হয় ‘বিভব শক্তি’। নিচে থেকে উপরে উঠানোর ফলে এতে শক্তি জমা হয় বা বিভব জমা হয় বলে একে বিভব শক্তি বলে। বস্তু যত উপরে উঠবে, অভিকর্ষের প্রভাবে ভূমির সাপেক্ষে তার বিভব শক্তি ততই বাড়বে।
পুরো বিশ্ব কীভাবে সূর্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এর মাধ্যমে আমরা তা বুঝতে পারি। উদ্ভিদ যখন আলোর উপস্থিতিতে খাদ্য-চিনি উৎপন্ন করে, তখন সূর্য সাহায্য করছে। যখন কোনো তৃণভোজী বা মাংসভোজী প্রাণী খাদ্য হিসেবে অন্য প্রাণী বা উদ্ভিদকে খাচ্ছে, তখনও শক্তির উৎস হিসেবে থাকছে সূর্য।
আমরা যদি আমাদের আশেপাশে মাটি, পানি, পাতা, লতা, কাঠ, কয়লা, তেল কাগজ, কাপড়, ফার্নিচার, হিটার, ফ্যান ইত্যাদির দিকে তাকাই, তাহলে সবখানেই দেখতে পাবো সূর্যের অবদানের উপস্থিতি। প্রত্যেকটা মিনিটে মিনিটে আমরা সূর্যের অবদানের কাছে ঋণী। পৃথিবীর সকল প্রাণই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সূর্যের কাছে ঋণী। সূর্য যে এতকিছু উপহার দিচ্ছে মানুষকে তার অল্প স্বল্পও হয়তো মানুষ জানতো, তার কারণেই সূর্যকে পূজা করতো প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা। অ্যাজটেকরা সূর্যকে খুশি করার জন্য হাজার হাজার মানুষকে ভয়াবহভাবে বলিদান করেছিল।
সূর্য কোনো দেবতা নয়, তবে দেবতা না হলেও পৃথিবীর মানুষকে যা উপকার করছে তা হাজার দেবতাকেও হার মানায়; ছবি: নাসা
আমরা আজকের মানুষেরা সত্যিই ভাগ্যবান। সূর্যকে আমাদের পূজা করতে হচ্ছে না। বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ আমরা জানি সূর্য আসলে একটা মহাজাগতিক বস্তু মাত্র, যা পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম কানুন মেনে তৈরি হয়েছিল এবং পদার্থবিজ্ঞানেরই কিছু নিয়মের প্রভাবে এক সময় মরে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
সংক্ষেপে দেখুনকাঁচ একটি কঠিন পদার্থ হওয়া সত্ত্বেও স্বচ্ছ কেন?
কাচ স্বচ্ছ পদার্থ, এটি স্বচ্ছ বলেই এর মধ্য দিয়ে আলোকরশ্মি ভেদ করে চলে যেতে পারে। কাচ, আয়না কিংবা কাচের সামগ্রী আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য পদার্থ। কাচের এত ব্যবহার হবার একটিই কারণ, এটি সহজলভ্য। কিন্তু কখনো কি আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, কাচ কেন স্বচ্ছ? কেন এর ভেতর দিয়ে আলোকরশ্মি অনায়াসে পার হয়ে যবিস্তারিত পড়ুন
কাচ স্বচ্ছ পদার্থ, এটি স্বচ্ছ বলেই এর মধ্য দিয়ে আলোকরশ্মি ভেদ করে চলে যেতে পারে। কাচ, আয়না কিংবা কাচের সামগ্রী আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য পদার্থ। কাচের এত ব্যবহার হবার একটিই কারণ, এটি সহজলভ্য। কিন্তু কখনো কি আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, কাচ কেন স্বচ্ছ? কেন এর ভেতর দিয়ে আলোকরশ্মি অনায়াসে পার হয়ে যেতে পারে?
ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির স্মার্টফোনে কাচের ব্যবহার; Source: inverse.com
কাচ কেন স্বচ্ছ এবং আলোকরশ্মি কেন একে ভেদ করে চলে যেতে সক্ষম এটি বুঝতে হলে বুঝতে হবে একটি কাচের গঠন সম্পর্কে। কাচ তৈরির প্রধান উপাদান হচ্ছে বালু। বালুর সাথে আরো অন্যান্য উপাদান মেশানো হয়। সামান্য অবাক লাগছে কি? বালুর মতো পদার্থ দিয়ে তৈরি হচ্ছে অতি প্রয়োজনীয় কাচ! বালুকে নিকৃষ্ট ভাববেন না, বালুও একটি প্রয়োজনীয় পদার্থ। বালুর প্রধান উপাদান হলো সিলিকা অর্থাৎ সিলিকন-ডাই-অক্সাইড। এই সিলিকার সাথেই সোডা অ্যাশ আর লাইমস্টোন মিশিয়ে ১,৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গলানো হয়। এই উপাদানগুলোর সাথে কাচে বাড়তি কোনো রঙ কিংবা বৈশিষ্ট্য যোগ করতে নির্দিষ্ট বস্তুকে যুক্ত করা যেতে পারে। গলিত পদার্থটি পুরোপুরি তরলের ন্যায় আচরণ করে না, বিশেষ ধরনের কঠিন পদার্থে পরিণত হয় তখন এটি, যাকে বলা হয় ‘অ্যামোরফাস সলিড’।
১,৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় চলছে গলানোর কাজ; Source: darkroom.baltimoresun.com
কাচের গঠন থেকে সরে এসে এবার একে ভেদনকারী আলোকরশ্মি নিয়ে বলা যাক। আলোকরশ্মি কণা নাকি তরঙ্গ, সেদিকে না গিয়ে আলোচনার সুবিধার্থে ধরা যাক, আলোকরশ্মি হলো কণা, অর্থাৎ একক পরিমাণ শক্তি সম্বলিত ফোটন। কাচ ভেদ করে আলো চলে যাচ্ছে মানে হলো, ফোটনগুলো গতিশীল অবস্থায় কাচে কোনো বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে না, কিংবা কাচ ফোটনটিকে শোষণ করে রেখে না দিয়ে নিজের ভেতর দিয়ে সঞ্চালিত হবার সুযোগ দিচ্ছে।
দৃশ্যমান আলোকরশ্মির ফোটনগুলো শোষিত হচ্ছে না। কারণ, কাচের মাঝে এমন কোনো পদার্থ নেই যা দৃশ্যমান আলোকরশ্মিকে শোষণে সক্ষম। অদৃশ্যমান আলোকরশ্মিগুলো আবার ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্ন আচরণ করে থাকে। আমাদের দেহ কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে কোনো স্বচ্ছ পদার্থ নয়, এক্স-রশ্মির নিকট আবার আমাদের দেহ একটি প্রায় স্বচ্ছ পদার্থ, এক্স-রশ্মি আমাদের দেহকে ভেদ করে যেতে পারে। স্কায়াগ্রাফের মাধ্যমে খুব সহজেই এক্স-রশ্মি ব্যবহার করে শরীরের ভেতরের অংশ দেখা যায়।
Source: commons.wikimedia.org
আলো আসলে দ্বৈত আচরণ করে, একই সঙ্গে কণা ও তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে থাকে আলো। যেহেতু আলোকরশ্মি একটি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ, সেহেতু অবশ্যই এর একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকবে। তরঙ্গদৈর্ঘ্য কিংবা কম্পাঙ্ক হিসেব করে বলা যায় একটি ফোটন কী পরিমাণ শক্তি বহন করছে কিংবা করবে। একটি ফোটন কী পরিমাণ শক্তি পরিবহন করছে, সেই পরিমাণকে ভিত্তি করেই বলে দেওয়া সম্ভব কোন পদার্থ এই ফোটনকে শোষণ করবে আর কোনটি করবে না।
বাম পাশে দেখা যাচ্ছে কাচের গঠন, অণুগুলো এলোমেলোভাবে সজ্জিত হয়ে আছে, সাধারণত একটি অস্বচ্ছ কঠিন পদার্থে অণুগুলো ডান পাশের মতো সুসজ্জিত হয়ে থাকে; Source: acs.org
আর শুরুতেই বলা হয়েছে যে, কাচ একটি কঠিন পদার্থ, কঠিন পদার্থ মানেই আমাদের চোখে হয়তো খুব শক্ত, অস্বচ্ছ পদার্থের ছবি ভেসে উঠবে। প্রথম সেকেন্ডেই কাচের কথা মনে হবে না যে, এটি একটি কঠিন পদার্থ। কাচ কোনো তরল কিংবা গ্যাসীয় পদার্থ নয়, এটি একটি বিশেষ ধরনের কঠিন পদার্থ, আগে যাকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘অ্যামোরফাস সলিড’ হিসেবে।
গলিত সিলিকা; Source: italyxp.com
গলিত সিলিকা থেকে প্রস্তুত করা হচ্ছে কাচের বোতল; Source: youtube.com
কঠিন পদার্থের সংজ্ঞা নিশ্চয়ই মনে আছে, অণুগুলো পরস্পরের সবথেকে কাছে অবস্থান করে। অণুগুলোর আন্তঃআণবিক দূরত্ব কম এবং এরা একটি সুনির্দিষ্ট সজ্জায় সজ্জিত হয়ে পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করে। কিন্তু কাচের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি হয় উল্টো। আন্তঃআণবিক দূরত্ব কম বলে কঠিন পদার্থ হবার যোগ্যতা কাচের রয়েছে। কিন্তু ব্যতিক্রম হলো, অণুগুলোর অবস্থানে কোনো সুনির্দিষ্ট সজ্জা নেই। কাচের মাঝে অণুগুলো অবস্থান করে এলোমেলোভাবে। এলোমেলোভাবে অবস্থান করেও আন্তঃআণবিক দূরত্ব একটি কঠিন পদার্থের ন্যায় সর্বনিম্ন হওয়ায় কাচ একটি কঠিন পদার্থ, আর কাচ সহজেই ভেঙে যাবার পেছনেও দায়ী অণুগুলোর এলোমেলো অবস্থান।
একটি পরমাণুর গ্রাফিক্যাল চিত্র; Source: chemistryworld.com
স্কুল পর্যায়ে রসায়নে শেখা কিছু তথ্য এবার মনে করতে হবে। রসায়ন বইতে আমাদের শেখানো হয়েছিলো পরমাণুর গঠন সম্পর্কে। পরমাণুর কেন্দ্রে রয়েছে একটি অতি ক্ষুদ্র নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করেই চারপাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে রয়েছে বিভিন্ন বৃত্তাকার শক্তিস্তর। শক্তিস্তর অনুযায়ী সেখানে আবর্তন করছে ইলেকট্রন। নিলস বোরের সংশোধিত পারমাণবিক গঠনের তথ্যানুযায়ী, একটি ইলেকট্রনকে যদি শক্তি প্রদান করা হয় তবে সেটি সেই শক্তি শোষণ করে আরো উচ্চ শক্তির স্তরে আরোহণ করবে। আবার ইলেকট্রন যদি শক্তি বিকিরণ করে, তবে ইলেকট্রনটি অবস্থানরত শক্তিস্তর ছেড়ে দিয়ে নিচের দিকে নিম্নশক্তির স্তরে গমন করবে।
বোর পারমাণবিক মডেল অনুযায়ী ইলকট্রন শক্তি শোষণ করে উত্তেজিত অবস্থায় উচ্চ শক্তিস্তরে গমন করে কিংবা শক্তি বিকিরণের মাধ্যমে নিম্ন শক্তিস্তরে গমন করে; Source: youtube.com
বোরতত্ত্বের ভিত্তিতে একটি পরমাণু একটি ফোটনের সাথে তিন ধরনের আচরণ করতে পারে।
১) ফোটন যে পরিমাণ শক্তি বয়ে নিয়ে এলো পরমাণুর ইলেকট্রনের কাছে, ইলেকট্রনটি সেই পরিমাণ শক্তিকে শোষণ করে নিয়ে উচ্চ শক্তিস্তরে আরোহণ করতে পারে, আর বাহিত শক্তি দান করে ফোটনটিও নিঃশেষ হয়ে যায়।
২) এক্ষেত্রেও প্রথম ঘটনাটি ঘটে থাকে, তবে ফোটনটি নিঃশেষ হয়ে যাবার সাথে সাথে অপর একটি ফোটন তৈরি হয়ে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যায় আলোকরশ্মির উৎসের দিকে। অর্থাৎ একটি আলোকরশ্মি শোষিত না হয়ে প্রতিফলনের সৃষ্টি করে।
৩) এক্ষেত্রে একটি পরমাণু আলোকরশ্মিকে পুরোপুরি অপরিবর্তিত অবস্থায় সঞ্চালিত হতে দেয়। এর কারণ হলো, ফোটনের শক্তি পরমাণুর কোনো ইলেকট্রন শোষণ করে নেয়নি, আলোকরশ্মিটি ততক্ষণই গতিশীল থাকবে, যতক্ষণ এর ফোটনগুলোর মাঝে শক্তি বিরাজমান থাকবে।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন, তিন নম্বর ঘটনাটিই ঘটে থাকে একটি কাচের মধ্যে। কাচের অণু কিংবা পরমাণুগুলো আলোকরশ্মিকে শোষণ না করে চলমান রাখে। এমনটি হয় কেবলমাত্র এই কারণে যে, ফোটনে যে পরিমাণ শক্তি রয়েছে, কাচের মাঝে উপস্থিত পরমাণুগুলোকে শক্তি দিয়ে উত্তেজিত করার মাধ্যমে উচ্চস্তরে প্রেরণের জন্য তা যথেষ্ট নয়। পদার্থবিজ্ঞানে এই ব্যাপারটি সুন্দরমতো ব্যাখ্যার জন্য ‘ব্যান্ড তত্ত্ব’ ব্যবহার করা হয়। এই তত্ত্বের বিস্তারিত বলা হবে না এখানে, শুধু এটুকু বলা যায় যে, এই তত্ত্বানুযায়ী যে পদার্থের ব্যান্ড গ্যাপ যত বেশি, তার মধ্য দিয়ে তত ভালোভাবে আলোকরশ্মি সঞ্চালিত হয়ে যাবে। কাচও একটি এমন পদার্থ। কাচের পরমাণুগুলোকে উত্তেজিত করতে হলে অধিক শক্তির প্রয়োজন, যা দৃশ্যমান আলোর ফোটনের থাকে না। ফলে দৃশ্যমান আলোকরশ্মি অতি সহজেই কোনোরূপ শোষণ কিংবা বিকিরণ না ঘটিয়ে কাচকে ভেদ করে চলে যায়।
তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালী, এতে দৃশ্যমান আলোকরশ্মির সাথে অন্যান্য তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকরশ্মিও দেখানো হয়েছে; Source: civilengineerlearn.blogspot.com
দৃশ্যমান আলোর চেয়ে ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য সম্পন্ন আলোকরশ্মি হলো অতিবেগুণী রশ্মি, এক্স-রশ্মি ও গামা রশ্মি। এই রশ্মিগুলোর ফোটনে একটি ইলেকট্রনকে উত্তেজিত করবার মতো পর্যাপ্ত শক্তি বিরাজ করে। তাই এই রশ্মিগুলো কাচকে ভেদ করে যেতে সক্ষম নয়। কাচ এই রশ্মিগুলোর কাছে অস্বচ্ছ পদার্থ।
সংক্ষেপে দেখুনসৌরজগতের জন্ম হয়েছিল কিভাবে ?
চীনের উপকথায় প্যান গু নামের এক দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। আকৃতিতে তিনি মানুষের মতো, মুখটি তার কুকুরের মতো, সারা দেহ লোমে আবৃত। মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে স্বর্গ ও মর্তের সকল কিছু একটি ডিমের ভেতর আবদ্ধ ছিল। তিনি নিজেও ডিমের ভেতর ঘুমন্ত ছিলেন টানা আঠারো বছর। ঘুম ভাঙলে তিনি সেখান থেকে বের হতে চাইলেন। হাতে থাকাবিস্তারিত পড়ুন
চীনের উপকথায় প্যান গু নামের এক দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। আকৃতিতে তিনি মানুষের মতো, মুখটি তার কুকুরের মতো, সারা দেহ লোমে আবৃত। মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে স্বর্গ ও মর্তের সকল কিছু একটি ডিমের ভেতর আবদ্ধ ছিল। তিনি নিজেও ডিমের ভেতর ঘুমন্ত ছিলেন টানা আঠারো বছর। ঘুম ভাঙলে তিনি সেখান থেকে বের হতে চাইলেন। হাতে থাকা একটি কুঠার দিয়ে সজোরে আঘাত করলেন ডিমের দেয়ালে। ডিম ভেঙে গেলে তিনি সেখান থেকে বের হন। ডিম থেকে কিছু দৃঢ় ও থলথলে পদার্থও বের হয়। দৃঢ় পদার্থ দিয়ে তৈরি হয় পৃথিবী।
ডিম থেকে বেরিয়ে দেখেন পৃথিবী আর আকাশ একসাথে লেগে যাচ্ছে। তাই তিনি শক্ত করে আকাশকে ধরে উপরের দিকে ঠেলে রাখছিলেন। এতে তার সকল শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। মৃত্যুর পর তার দুই চোখ থেকে চাঁদ ও সূর্যের জন্ম হয়। নিঃশ্বাস থেকে বায়ুমণ্ডল, কণ্ঠ থেকে বজ্রপাত, পেশি থেকে উর্বর ভূমি, শিরা থেকে নদী ও রাস্তা তৈরি হয়।
পৃথিবী ও সূর্য তথা সৌরজগতের জন্ম নিয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নানা ধরনের পৌরাণিক উপকথা প্রচলিত আছে। সেগুলো শুনতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবতার সাথে মিল বহুদূর। বাস্তবতা জানতে হলে অনুসন্ধান করতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক কারণ।

প্যান গু’র এক চোখ থেকে তৈরি হয়েছে সূর্য আর এক চোখ থেকে তৈরি হয়েছে চাঁদ; Credit: Devine Art/testabuddy05
সৌরজগতের উৎপত্তি নিয়ে এখন পর্যন্ত যে মতবাদ প্রচলিত আছে তা অনেকটা এরকম- সূর্য ও অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহ জন্মের আগে বিস্তৃত এলাকা ব্যাপী গ্যাসীয় মেঘ হিসেবে বিদ্যমান ছিল। একদম শুরুতে কয়েক আলোক বর্ষ ব্যাপী এলাকা নিয়ে মহাজাগতিক গ্যাস ও ধূলি বিদ্যমান ছিল। কয়েক আলোক বর্ষ এই এলাকাটা কতটুকু বিশাল? শুনতে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এর বিশালতা ব্যাপক। আলো এক সেকেন্ডে অতিক্রম করে ৩ লক্ষ কিলোমিটার। ১ মিনিটে যায় এর ৬০ গুণ। এক ঘণ্টায়? আরো ৬০ গুণ। এক দিনে? এক মাসে এক বছরে? এভাবে গুণ গিয়ে আসলে দেখা যাবে কল্পনাতীত পরিমাণ বড় এক এলাকা নিয়ে ছিল সৌরজগতের প্রাথমিক গাঠনিক উপাদানগুলো।
এরপর কিছু একটা হলো যার কারণে গ্যাসের মেঘগুলো পরস্পরের কাছে আসতে শুরু করলো। কী হতে পারে সেটা? হতে পারে পাশ দিয়ে ভারী কোনো নক্ষত্র অতিক্রম করে গিয়েছে যার মহাকর্ষীয় আকর্ষণের কারণে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বস্তুগুলো একটা দিকে এসে একত্রিত হওয়া শুরু করেছিল। কিংবা এমনও হতে পারে কোনো শক ওয়েভের ধাক্কায় বস্তুগুলো একদিকে সংকুচিত হওয়া শুরু করেছিল। শক ওয়েভ যেদিক দিয়ে যায় সেদিকের বস্তুগুলোকেও নাড়িয়ে যায় কিংবা সাথে নিয়ে যায়। ভূমিকম্পের সময় মাটিতে আন্দোলন হয় শক ওয়েভের কারণেই। সেখানে কীভাবে শক ওয়েভ তৈরি হতে পারে? সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে কিংবা বড় কোনো মহাজাগতিক ঘটনায় শক ওয়েভ তৈরি হতে পারে।

বিস্তৃত মহাজাগতিক মেঘ একত্রিত হয়ে তৈরি করেছিল সৌরজগৎ; Credit: NASA, ESA/Hubble
তো একত্রীকরণের পেছনে যে কারণই থাকুক, কোনোএকভাবে বস্তুগুলো একত্রিত হওয়া শুরু করেছিল। এরপর আর কিছু করতে হয়নি। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে নিজেই গঠন করে ফেলেছে সৌরজগৎ। একবার পথ দেখানোর পর পথিক নিজেই নিজের আলোতে বাকি পথ চিনে নিয়েছে।
যখন বস্তুগুলো একটুখানি কাছে আসা শুরু করেছে তখন একটির সাথে আরেকটি মিলে বড় বস্তু তৈরি করেছে। এখানে কাজ করেছে মহাকর্ষ। বস্তু ভর কম হলেও মহাশূন্যে কম ভরের আকর্ষণেরও ভালো প্রভাব থাকে। এখন বস্তুটি একটু বড় বা ভারী হওয়া মানে এর মহাকর্ষীয় আকর্ষণ আরো বেশি হবে। ফলে আশেপাশের আরো বস্তুকে নিজের দিকে টেনে নিতে পারবে। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র বলছে বস্তুর ভর যত বেশি হবে আকর্ষণের পরিমাণ তত বেশি হবে। ফলে একসময় ভারী হতে হতে বিস্তৃত এলাকা ব্যাপী মহাকর্ষীয় প্রভাব বিস্তার করবে।
সৌরজগতের ক্ষেত্রে যে অংশে সবচেয়ে বেশি বস্তু জমা হয়েছিল সেটি বর্তমানে সূর্য। সূর্যের মধ্যে এত বেশি বস্তু জমা হয়েছিল যে প্রবল মহাকর্ষের চাপে ভেতরের বস্তুগুলো আর স্বাভাবিক থাকতে পারেনি। সংঘটিত হওয়া বস্তুগুলোর মাঝে বেশিরভাগই হাইড্রোজেন গ্যাস। প্রবল চাপে পড়ে তারা উত্তপ্ত হয়ে উঠে। গ্যাসের সূত্র অনুসারে চাপ বাড়লে তাপমাত্রা বাড়ে। এখানে সেটিই হয়েছে। তাপমাত্রা বেড়ে এতই উত্তপ্ত হয়ে গিয়েছিল যে এক পরমাণু আরেক পরমাণুর ভেতর ঢুকে ফিউশন বিক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল।
ফিউশন বিক্রিয়ায় প্রচুর তাপ ও আলোক শক্তি অবমুক্ত হয়। তার ফলে সূর্যটি জ্বলে উঠে। সেই যে জ্বলেছে এখনো নেভেনি। ভেতরে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটাবার মতো জ্বালানি শেষ হবার আগ পর্যন্ত জ্বলতেই থাকবে।
সূর্য ছাড়া অন্য কোনো গ্রহেরও সুযোগ ছিল জ্বলে উঠার। যেমন বৃহস্পতি, এর ভর তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। কিন্তু জ্বলে উঠতে হলে ন্যূনতম যে ভর অর্জন করতে হয় তা অর্জন করতে পারেনি সে। তাই আর জ্বলে উঠতে পারেনি। যদি বৃহস্পতি গ্রহও জ্বলে উঠতো তাহলে সৌরজগতে সূর্য থাকতো দুটি। আর একে বলা হতো বাইনারি স্টেলার সিস্টেম। মহাবিশ্বে এরকম যুগল নক্ষত্রের অনেক উদাহরণ আছে। স্টার ওয়ার্স চলচ্চিত্রগুলোতে এরকম যুগল নক্ষত্র দেখা যায় প্রায়ই।

সূর্যের মতো তাপ ও আলো ছড়ানোর একটি সম্ভাবনা ছিল বৃহস্পতি গ্রহের; Credit: JAXA / ISAS / DARTS / Damia Bouic
সূর্য যখন চারপাশ থেকে বস্তু ধারণ করছিল তখন তার পাশাপাশি অন্যান্য স্থানেও টুকটাক ছোট ছোট বস্তুর সংগ্রহ হতে থাকে। যে যার মতো করে পেরেছে নিজের দিকে আকর্ষণ করেছে। এদের মধ্যে যারা বেশি ভারী হয়ে গিয়েছিল তারা গ্রহ কিংবা উপগ্রহ হিসেবে বিদ্যমান আছে। আর যারা খুব বেশি ভারী হতে পারেনি তারা শেষমেশ সূর্যে গিয়ে ঠেকেছে কিংবা পার্শ্ববর্তী গ্রহে গিয়ে মিশেছে। উদাহরণ, পৃথিবীতে প্রায় সময় ঘটে যাওয়া উল্কাপাত।
সূর্য তো গ্রহগুলোকে আকর্ষণ করছে, তাহলে গ্রহগুলো কেন সূর্যের বুকে পড়ে যায় না কিংবা উপগ্রহগুলো কেন গ্রহে গিয়ে ঠেকে না? আসলে গ্রহদের দিক থেকে গ্রহগুলো ঠিকই সূর্যের উপর পড়ছে কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের একটা নিয়মের প্রভাবে সেই পড়া আর সূর্যের গা পর্যন্ত যায় না। খুব সহজ করে বললে এভাবে বলা যায়, সৌরজগৎ গঠনের সময় গ্রহগুলোতে একটি বহির্মুখী বল তৈরি হয়, আবার অন্যদিকে সূর্যের আকর্ষণের ফলে একটি কেন্দ্রমুখী বলও বিদ্যমান। দুই বলের টানাটানিতে গ্রহগুলো না যেতে পারে বাইরের দিকে না আসতে পারে ভেতরের দিকে।
দুই বল (ভেক্টর রাশি) যদি দুই দিকে টানাটানি করে তাহলে বস্তুটি দুই দিকের কোনো দিকে না গিয়ে ৩য় একটি দিকে যাবে (লব্ধি ভেক্টর)। এটা পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম। গ্রহগুলোর ঘূর্ণনের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়। দুই বলের টানাটানিতে লব্ধি হিসেবে ঘুরতে থাকে।

সংক্ষেপে দেখুনপৃথিবী সহ অন্য গ্রহগুলো কেন সূর্যে পতিত হয় না? Source: shodor.org
পৃথিবী গঠনের পর এতে কোনো পানি ছিল না। গনগনে উত্তপ্ত ছিল পুরো গ্রহ। গ্রহাণু ধূমকেতুরা এসে আছড়ে পড়তে লাগলো পৃথিবীর পৃষ্ঠে। ধূমকেতুতে প্রচুর পানি ও বরফ থাকে। এই পানি ও বরফের প্রভাবে শীতল হয়ে এলো পৃথিবীর উপরিপৃষ্ঠ। শুধু শীতলই হয়নি, সাগর মহাসাগরের পানিগুলোর উৎসও এরাই। অন্তত সাম্প্রতিক গবেষণা তা-ই বলে। পানি থাকাতে তার মাঝে প্রাণ ধারণ করার পরিবেশ অনুকূল হয়। সেখানে জন্ম নেয় এক কোষী প্রাণ। তারপর ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবী ছেয়ে যায় প্রাণিবৈচিত্র্যে। সেখানে বাস করছি আমরা মানুষেরা।
ভাষার উৎপত্তি হয় কিভাবে?
১ মানব সভ্যতা ও সমাজের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মূলত ভাষা। নিজেদের মধ্যে অর্থপূর্ণভাবে ঠিক করে যোগাযোগ করতে না পারলে এই সভ্যতা গড়ে তোলা আদৌ সম্ভব হতো বলে মনে হয় না। অন্যান্য প্রাণীর দিকে তাকালেই এটা আমরা বুঝতে পারি। এই ভাষার প্রচলন কীভাবে হলো সেটা নিয়ে অনেক গল্প আছে। এরকম বিখ্যাত গল্পগুলোর একটিবিস্তারিত পড়ুন
১
মানব সভ্যতা ও সমাজের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মূলত ভাষা। নিজেদের মধ্যে অর্থপূর্ণভাবে ঠিক করে যোগাযোগ করতে না পারলে এই সভ্যতা গড়ে তোলা আদৌ সম্ভব হতো বলে মনে হয় না। অন্যান্য প্রাণীর দিকে তাকালেই এটা আমরা বুঝতে পারি।
এই ভাষার প্রচলন কীভাবে হলো সেটা নিয়ে অনেক গল্প আছে। এরকম বিখ্যাত গল্পগুলোর একটি আমরা প্রায় সবাই সম্ভবত ছোটকালে পড়েছি বা শুনেছি। বিশেষ করে ব্যাকরণ বইগুলোতে এই গল্পটা থাকত। তবে এই গল্পটা সরাসরি ভাষার উৎপত্তি নিয়ে না, বরং বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি নিয়ে।

শিল্পির চোখে টাওয়ার অফ ব্যাবিলন; Image Source: Phillip Medhurst
গল্প মতে, প্রাচীন ব্যবিলনের মানুষ ভেবেছিল একটা টাওয়ার বানাবে। সেই টাওয়ার দিয়ে ছুঁয়ে ফেলবে আকাশ। মানুষ ভাবত, নীল আকাশের ওপারেই স্রষ্টার বাস। তাই টাওয়ার বানালে স্রষ্টার কাছে সরাসরি পৌঁছানো যাবে, কথা বলা যাবে। কিন্তু টাওয়ারের কাজ অনেক দূর হওয়ার পরে স্রষ্টা ভাবলেন, এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না!
একদিন লোকজন ইট-পাথর আনতে গিয়েছিল। টাওয়ারের কাছে এসে ওরা টের পেল, কেউ আর কারো কথা বুঝতে পারছে না। স্রষ্টা আসলে একেকজনকে একেক ভাষা শিখিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু কেউ কথা না বুঝলে টাওয়ারের কাজ কীভাবে এগোবে! ভেস্তে গেল টাওয়ার বানানো। স্রষ্টা আকাশের ওপারে অধরাই রয়ে গেলেন। আর এদিকে, মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ল নানা ধরনের ভাষা।
এই গল্পের অনেক ফাঁক-ফোঁকর আছে। চাইলেই গল্পটা নিয়ে নানারকম প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু সেসব প্রশ্ন করা আমাদের উদ্দেশ্য না। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, এই ব্যাপারটাকে তলিয়ে দেখা। বুঝতে চেষ্টা করা, আসলেই ঠিক কী হয়েছিল। তবে এই কাজটা আমরা করব বিজ্ঞানের চোখে, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে।
সেজন্য অবশ্যই আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাচীন পৃথিবীতে। যে পৃথিবীর কথা ঘুরে ফিরে এসেছে মানুষের ইতিহাসে, কল্পে-গল্পে।
২
কথা হলো, আমরা কি শুরু থেকেই শুরু করব? চট করে ফিরে যাব সেই পৃথিবীতে? ভাবার চেষ্টা করব, সে সময়ের মানুষ তখন কী করছিল? উঁহু, সেটা করা যাবে না। যুক্তি আমাদের বলে, উল্টো দিক থেকে পুরো জিনিসটা দেখার চেষ্টা করতে হবে আমাদের। ধীরে ধীরে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ফিরে যেতে হবে সেই সময়টায়, যখন ভাষার শুরু হয়েছিল।
কথা হলো, বিজ্ঞানীরা এটা কীভাবে করেন? মানে, ভাষা তো আর ফসিল রেখে যায়নি যে, ফসিল বিশ্লেষণ করে, কার্বন ডেটিং করে এর ইতিহাস বের করে ফেলা যাবে। কথা সত্য। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের দেহের গঠণ বিশ্লেষণ করলে সেটা দেখা যায় যে, ধীরে ধীরে তারা যোগাযোগের দিকে ঝুঁকছে। তাদের দেহে সেই চিহ্ন ফুটে উঠছে ধারাবাহিকভাবে। সেই সঙ্গে তাদের রেখে যাওয়া বিভিন্ন জিনিসেও আমরা এর ছাপ দেখতে পাই। এসব সূত্র ধরে ধরেই বিজ্ঞানীরা ভাষার শুরুর গল্পটা বোঝার চেষ্টা করেছেন।
আগেই বলেছি, সেটা করতে হবে উল্টোভাবে। এই হিসেবে, প্রথম প্রমাণটা পাওয়া যায় মানুষের লেখালেখির। যে লিখতে পারে, সে যে ভাষা পারবে, সেটা তো আর আলাদা করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মানুষের লেখার ইতিহাসের সূচনা হয়েছে মাত্র কয়েক হাজার বছর আগে। তার মানে, এটা আমাদের খুব বেশি দূরে নিয়ে যেতে পারে না। সেজন্য উনিশ শতকের বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, ভাষার উৎপত্তি বের করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। শুধু ভেবেই ক্ষান্ত দেননি। ১৮৬৬ সালে প্যারিস ল্যাঙ্গুইস্টিক সোসাইটি এ বিষয় নিয়ে আলোচনা-গবেষণাও নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। উঁহু, গবেষণা করলে পাপ হবে, এমন না। ওদের মনে হয়েছিল, এই নিয়ে কাজ করাটা কেবলই সময় নষ্ট।
আশার কথা হলো, সময় বা অর্থ নষ্ট হবে ভেবে কৌতূহলী মানুষ কখনোই থেমে যায়নি। সেজন্যেই মানুষ চাঁদে পা রাখতে পেরেছে। মানুষের হাতে গড়া মহাকাশযান পেরিয়ে গেছে সৌরজগতের সীমানা। একইভাবে একশ বছরের মতো পরে এসে জীববিজ্ঞানী ও ইভোলিউশনারি থিওরিস্টরা ভাবলেন, এভাবে তো ভাষাকে ফেলে রাখার কোনো মানে হয় না। আমাদের জীবন ও সভ্যতার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ইতিহাস জানতে হবে। সেজন্য কাজে নামা দরকার। কিন্তু কীভাবে?
ফসিল নেই, নেই যথেষ্ট সূত্র। লেখালেখিও শুরু হয়েছে অল্প কিছুদিন আগে। তাহলে উপায়? বিজ্ঞানীরা ভাবেন। ভেবে ভেবে তারা সেই আপ্ত বাক্যের কাছে ফিরে গেলেন। দশে মিলে করি কাজ, হারি-জিতি নাহি লাজ! শুধু জীববিজ্ঞানের হাত ধরে হয়তো হবে না। কিন্তু বিজ্ঞানের বাকি সব শাখা আছে কী করতে? শেষমেষ প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, ভাষা বিজ্ঞান ও কগনিটিভ সায়েন্স- সব কিছু একসঙ্গে নিয়ে মাঠে নামলেন বিজ্ঞানীরা। অবশেষে ফল পাওয়া গেল৷ এর মধ্যে দিয়ে শুধু একটি নয়, মানুষের ভাষা খুঁজে পাওয়া নিয়ে দু-দুটো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান মিলে গেল একসঙ্গে।

প্রাচীন মানুষের আঁকা গুহাচিত্র; Image Source: frontiersin.org
৩
চল্লিশ হাজার বছর আগের কথা। মানুষ তখন গুহাচিত্র আঁকত। এ ধরনের ছবি আমরা দেখেছি। সেসব ছবির পেছনে চিন্তা, সংস্কৃতি ও বিমূর্ত ভাবনা ছিল, এটা আমরা বুঝতে পারি। ভাষার জন্যে তো ঠিক এই জিনিসগুলোই দরকার, তাই না? তাহলে, কয়েক হাজার বছর থেকে চল্লিশ হাজার বছর পর্যন্ত পিছিয়ে এলাম আমরা। কথা হলো, এই সময়েই কি ভাষার আবির্ভাব হয়েছিল?
হতে পারে। না-ও হতে পারে! সহজ কথায়, সবই ঠিক আছে, কিন্তু এককভাবে এই ব্যাখ্যাটি যথেষ্ট না। অর্থাৎ আরো প্রমাণ দরকার। সেজন্যে আমরা সে সময়ের মানব-সমাজের দিকে তাকাতে পারি।
মানুষের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব, চল্লিশ হাজার বছর আগে মানুষ কিন্তু এক জায়গায় নেই। গোত্র বা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে নানাদিকে ছড়িয়ে গেছে। তার মানে, এই সময়ে যদি ভাষার উৎপত্তি হয়, তাহলে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় একইসঙ্গে বা অল্প সময়ের ব্যবধানে সব মানুষদের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসতে হবে। চিন্তার ক্ষমতা তৈরি হলেই শুধু হবে না, সেটা প্রকাশের মানসিক ও শারীরিক ক্ষমতা এবং সেজন্য দেহে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও হতে হবে। এ থেকে আমরা একটা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসতে পারি।
মানুষ নিশ্চয়ই আরো আগেই ভাষা শিখে গিয়েছিল। সেজন্যই তারা বিমূর্ত চিন্তা করতে শিখেছে এবং সেসব গুছিয়ে আঁকতে শিখেছে গুহার দেয়ালে। তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? তখনকার পৃথিবীতেও ভাষা ছিল, হয়তো বিভিন্ন গোত্র বা দলের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলত; কিন্তু উৎপত্তিটা তখন হয়নি। হয়েছে আরো আগে, আরো অনেক আদিম পৃথিবীতে।
৪
আদিম পৃথিবীতে মানুষের আগেই এসেছিল এপরা। এই এপদের গলায় বড় আকারের বায়ুথলী ছিল। এটা দিয়ে তারা ‘গোঁ গোঁ’ ধরনের শব্দ করে প্রতিপক্ষ বা অন্যান্য প্রাণীকে ভয় দেখাত। সমস্যা হচ্ছে, এ ধরনের বায়ুথলী স্বরবর্ণের উচ্চারণে বাধা দেয়। এটা কিন্তু বিজ্ঞানীরা ইচ্ছেমতো বলে দেননি। বেলজিয়ামের ফ্রি ইউনিভার্সিটি অফ ব্রাসেলসে বিজ্ঞানী বার্ট দ্য বোর সিমুলেশন করে দেখিয়েছেন। কিন্তু মানুষের ভাষার পেছনে স্বরবর্ণ, যাকে বলে, আবশ্যক।
এপদের মধ্যে এ ধরনের বায়ুথলী ছিল ঠিকই, কিন্তু হোমো হাইডেলবার্জেনিস প্রজাতীর দেহে এরকম কিছু দেখা যায় না। এই হোমো হাইডেলবার্জেনিস থেকেই পরে নিয়ান্ডারথাল ও স্যাপিয়েন্সরা এসেছে বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা। হোমো হাইডেলবার্জেনিস পৃথিবীতে ছিল প্রায় সাত লাখ বছর আগে। অর্থাৎ এ সময় পৃথিবীতে ভাষা না থাকলেও, ভাষা তৈরি হওয়ার বেশ কিছু প্রয়োজনীয় উপাদান ততদিনে চলে এসেছে।

নিয়ান্ডারথাল; Image Source: theguardian.com
আধুনিক মানুষের কথা যদি ভাবি, মস্তিষ্ক থেকে মেরুদণ্ড হয়ে অনেক অনেকগুলো স্নায়ু ডায়াফ্রাম এবং পাঁজরের মধ্যকার পেশীতে এসে যুক্ত হয়েছে। ঠিকভাবে শ্বাস নিয়ন্ত্রণ ও যথার্থ শব্দ করার জন্য এগুলো জরুরি ভূমিকা রাখে। এই একই জিনিস নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও দেখা যায়।
এই দুই প্রজাতির কানের ভেতরের অংশেও একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। ফলে, মানুষের উচ্চারিত শব্দের কম্পাংকের যে পরিসীমা আছে- এই সীমায় প্রজাতি দুটির কানের ভেতরে দারুণ সংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে। কথা বলার জন্য শোনা ও এর ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বোঝাটা জরুরি। এটার খুব সহজ একটা উদাহরণ আমরা বর্তমানেই দেখতে পারি। যারা কথা বলতে পারেন না, তারা কানেও শুনতে পান না। কারণ, শুনে সেটা প্রকাশ না করতে পারলে, এই ভার মস্তিষ্ক নিতে পারবে না। আবার, না শুনলে বলার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি হওয়া একরকম অসম্ভব।
এরপরেও, কথা বলার জন্য আরেকটা জিনিস দরকার। FOXP2 জিন। মস্তিষ্কের যে অংশ কথা নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে কারিকুরি ফলায় এটি। অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যেই এটা থাকে। কিন্তু মানুষের ভেতরে এই জিনটি কিছুটা উন্নত। সেজন্যই আমরা মুখ ও চেহারায় ভাষার জন্য প্রয়োজনীয় নড়াচড়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও এই জিন ছিল, কিন্তু এতটা উন্নত ছিল না।
এসব তথ্য আমাদেরকে একটা সময়ের দিকে ইঙ্গিত করে। এ থেকে বলা যায়, মোটামুটি চার লাখ বছর আগে পৃথিবীতে ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল। ততদিনে মানুষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা চলে এসেছে তার ভেতরে। ধীরে ধীরে চিন্তার ক্ষমতাও বাড়ছে। সেজন্যই এই ভাবনাগুলো প্রকাশ করা জরুরি হয়ে গেছে। ফলে তৈরি হয়েছে ভাষা।

হোমো ইরেক্টাস; Image Source: resonance.is
কিন্তু আরো আগে, প্রায় দুই মিলিয়ন বছর আগে হোমো ইরেক্টাসরা যখন শিকার করত, তখন তারা নানারকম যন্ত্র বানাত সেজন্যে। তাহলে তারাও কি ভাষা জানত? হয়তো জানত। হয়তো জানত না। কিন্তু সেই ভাষা যে আধুনিক মানুষের ভাষা ছিল না, এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত। মানুষের ভাষার আদিম রূপ, হয়তো ঠিক ভাষা হয়েও ওঠেনি- এমন কিছু থাকলেও থাকতে পারে সে সময়।
এ সব মিলে ধরে নেওয়া যায়, মানুষের মাঝে ভাষার উদ্ভব হয়েছিল চার লাখ বছর আগে। আর, সেই ভাষাই দিনে দিনে আরো পরিণত হয়েছে। আবার, মানুষ দল বা গোত্রে ভাগ হয়ে যাওয়ার ফলে বিকৃত হয়ে গেছে ভাষা। সেভাবেই তৈরি হয়েছে নানা ধরনের এত সব ভাষা। কিন্তু যতই আলাদা হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি না কেন, ভালোভাবে খুঁজলে আজও আমরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মধ্যেও মিল খুঁজে পাই, কাছাকাছি উচ্চারণ ও অর্থের শব্দ খুঁজে পাই। এই সব কিছুই আমাদের একটি সাধারণ ভাষার দিকে ইঙ্গিত করে। সাধারণ এক প্রজাতির ভাষার শুরুটাও যে একটা সাধারণ ভাষা দিয়েই হবে, তা আর আশ্চর্য কী!

ভাষার উৎপত্তির সময়কাল; Image Source: Writer
৫
ভাষার উদ্ভবের সময়কাল নাহয় পাওয়া গেল। কিন্তু কথা হলো, এই ভাষাটা এলো কীভাবে? ভাষার উৎপত্তি যে যোগাযোগের জন্য, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু এই তাড়নাটা মানুষ অনুভব করা শুরু করল কেন? এই প্রশ্নটাই মানুষের ভাষা খুঁজে পাওয়া নিয়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন। (প্রথম প্রশ্নটা কী ছিল, সেটা কি আলাদা করে আর বলা লাগবে? তা-ও বলে দেই। প্রশ্নটা হলো, ভাষার উৎপত্তিটা কখন হয়েছিল? আসলে, এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে না পারলে, সে সময় মানুষ কী কারণে এই তাড়নাটা অনুভব করেছিল, সেটা বের করা কঠিন।)
এই প্রশ্নের তিনটি সম্ভাব্য উত্তর আছে। প্রথম উত্তরটা দিয়ে গেছেন চার্লস ডারউইন। ভদ্রলোক বলেছিলেন, বিভিন্ন প্রাণীকে সঙ্গী নির্বাচনের কৌশল হিসেবে অদ্ভুত সব কাজকর্ম করতে দেখা যায়। মানুষও সেরকম কিছু করতে চাইত। এর ফলে প্রোটোল্যাঙ্গোয়েজ বা ‘আদিভাষা’ ধরনের একটা কিছু একটা গড়ে ওঠে। অবশ্য, এই আদিভাষার সরাসরি কোনো অর্থ ছিল না। যেমন- পাখিদের ডাক।

গিবন; Image Source: nationalgeographic.com
পুরুষরা সেই আদিভাষা ব্যবহার করে নারীদের আকর্ষণ করতে চাইত। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য তারা আদিভাষা নিয়ে আরো ভাবতে থাকে, এবং আরো জটিল ও সুমধুর কোনো ধ্বনি প্রকাশের চেষ্টা করতে থাকে। এভাবেই ভাষা গড়ে ওঠে। ডারউইন উদাহরণ হিসেবে গিবনদের কথা বললেন। এই প্রাইমেটরাও এভাবে গেয়ে গেয়ে নারী গিবনদের আকৃষ্ট করতে চায়। কেউ কেউ পরে এই অনুমানের ওপরে ভিত্তি করে বলেছেন, শুধু পুরুষরাই এমনটা না-ও করতে পারে। নারীরাও হয়তো একইভাবে পুরুষদের আকৃষ্ট করতে চাইত।
কিন্তু এরকম হলে, এর ফলে জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের বাকিদের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে থাকার কথা। বাড়তি কোনো বৈশিষ্ট্য বা সুবিধা পাওয়ার কথা তাদের। আবার, একই জিনিস বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়া সবগুলো গোত্র বা দলের মধ্যেই ঘটতে হবে। এসব কিছু বিবেচনা করে ডারউইনের এই উত্তরকে ঠিক জুতসই মনে হয় না।
কিন্তু এই আইডিয়ার ওপরে ভিত্তি করেই দ্বিতীয় উত্তর বা ধারণাটি গড়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা খেয়াল করে দেখলেন, মানুষ, এমনকি অন্ধরাও সাধারণত হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলার চেষ্টা করে। তাহলে, ‘আদিভাষা’টা হয়তো স্বর নির্ভর না, বরং ভঙ্গিনির্ভর হয়ে গড়ে উঠেছিল। সেই ব্যাপারটাই এখনও আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। হয়তো সেজন্যই এখনো আমরা কিছু বোঝাতে না পারলে হাত বা কাঁধ নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করি। আবার, সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই ভঙ্গি ভালোরকম প্রভাব রাখতে পারে। যেমন- বক্তব্যের সময় মানুষের ভঙ্গি দেখে আকৃষ্ট হই আমরা। নাচের মুদ্রা দেখে আকৃষ্ট হই। এই ব্যাপারগুলোর ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় কিছুটা করে।
আবার খেয়াল করলে দেখা যাবে, অন্যান্য বেশ কিছু প্রাণীও টুকটাক অঙ্গভঙ্গি করে। মানুষ হয়তো ভাবতে শেখার কারণে এই ভঙ্গিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছিল আরো অনেক দূর। আর, অঙ্গভঙ্গি করে যে পুরোপুরি যোগাযোগ করা যায়, সেটা তো আমরা জানিই। মূক-বধির অনেকেই এভাবে যোগাযোগ করেন।
দারুণ চিন্তা-ভাবনা হলেও, এই প্রস্তাবনারও একটা বড় ঝামেলা আছে। ভঙ্গিনির্ভর এই ভাষা থেকে স্বরনির্ভর ভাষা এলো কীভাবে?
ফলে, তৃতীয় আরেকটি আইডিয়া বা উত্তর নিয়ে ভাবলেন বিজ্ঞানীরা। এই আইডিয়াটিই বর্তমানে সবচেয়ে ভালোভাবে ভাষাকে ব্যাখ্যা করতে পারে। এটাকে বলে ওনোম্যাটোপিয়া (onomatopoeia)। মানে, কোনো শব্দ শুনে সেটাকে নকল করার চেষ্টা। এখনও মানব শিশুদের এরকম শব্দ শুনে শুনে বলার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
মানুষের যদি ভাষা বলার মতো যথেষ্ট বোধ না-ও থেকে থাকে, তবু শুনে শুনে এই নকল করতে পারাটা খুব জটিল কিছু না। আগেই বলেছি, ভাষা আসতে আসতে ততদিনে মানুষের মধ্যে ধ্বনি উচ্চারণের শারীরিক সক্ষমতা চলে এসেছে। তাছাড়া, নতুন কিছু গবেষণা থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, অন্যান্য প্রাইমেটও বেশ ভালোভাবেই শ্বাস এবং গলার নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
যৌক্তিকভাবে ব্যাপারটা থেকে আমরা একটা কল্পনা দাঁড় করাতে পারি। বিভিন্ন প্রাণীর ডাক শুনে শুনে মানুষ সেটাকে নকল করতে শিখেছে। সেসব প্রাণীর বিরুদ্ধে টিকে থাকতে গিয়ে বানাতে হয়েছে সরঞ্জাম। সেই সাথে, সেরকম কোনো প্রাণী, যেমন- বাঘকে আসতে দেখলে বাকিদের সাবধান করে দেওয়ার প্রয়োজনীতা তৈরি হয়েছে। বাঘের গর্জন নকল করে নিজেদের লোকজনকে সতর্ক করে দেওয়ার চেয়ে সহজ আর কী আছে? তাতে করে ভিন্ন ভিন্ন প্রানিকে শনাক্ত করতে পারছে মানুষ। আবার, ধীরে ধীরে এসব ধ্বনি বা ডাকের মধ্যে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে। আরেকটা ভালো ব্যাপার হলো, বিভিন্ন প্রাণির ডাক নকল করে শিকারের জন্য তাদেরকে প্রলুব্ধ করে ফাঁদেও ফেলা সম্ভব ছিল। এভাবে ধীরে ধীরে অর্থবোধক ধ্বনি বুঝতে শিখেছে মানুষ। বুঝতে শিখেছে, ধ্বনির মাধ্যমে চাইলে অন্যদেরকে কিছু বোঝানো যায়।
সেই সাথে অঙ্গভঙ্গিও শিখছিল মানুষ। এটা অবশ্য অনেকটাই সহজাত (মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও এটা দেখা যায়)। তাছাড়া, সরঞ্জাম বানাতে গিয়েও হাত-পা অর্থবোধকভাবে নাড়ানোর কৌশল বুঝতে পারছিল মানুষ। এভাবেই, সময়ের সাথে সাথে গড়ে উঠতে শুরু করেছিল ভাষা।
একটা সময়, হয়তো রাতের বেলা আগুনের পাশে বসে মজা করে প্রাণীদের ডাক নকল করতে গিয়ে, বা নিজেদের মতো করে কিছু বোঝাতে গিয়ে মানুষ গাইতে শিখেছে। টের পেয়েছে, গলার তাল-লয় নিয়ন্ত্রণ করে অর্থবোধক ধ্বনিকে আরো সুমধুর করে তোলা যায়।

কাউকে গান গাইতে শুনলে আমরাও গলা মেলাই; Image Source: pinkvilla.com
এই গান গাওয়াটার খুব বড় একটা ভূমিকা আছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সাধারণ বাক্যে ‘আমরা’ বা দলগত বোধটা সেভাবে প্রকাশ পায় না। গানে সেটা সহজেই করা যায়। একজন গাইতে থাকলে বাকিরা গলা মেলাতে পারে। এটাও আসলে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তির অংশ। এখনও সেজন্যই গান শুনলে আমরাও গলা মেলাই, মেলাতে চাই। শব্দ করে না হলেও মনে মনে গেয়ে উঠি একই বাক্য।
ইউনিভার্সিটি কলেজ, লন্ডনের নৃতত্ত্ববিদ জেরোম লুইস মনে করেন, এভাবেই গড়ে উঠেছে ভাষা। আর, এই প্রস্তাবনা সত্যি হলে এটি যেমন ভাষা ও গানের উৎপত্তির ব্যাখ্যা দিতে পারবে, তেমনি বলতে পারবে এদের উৎপত্তির সময়কালও। আর, এই উৎপত্তির সময়টা পেলে দিনে দিনে ভাষার ওপরে কী প্রভাব পড়েছে এবং ভাষা কীভাবে বদলেছে- তার একটা মোটামুটি হিসেব আমরা দাঁড় করাতে পারব।
শব্দ হয়তো ফসিল রেখে যায় না, রেখে যায় না কোনো চিহ্ন। কিন্তু এত বছর পরে হলেও, আমরা এর ইতিহাস লেখার সূত্র খুঁজে পেয়েছি। হয়তো আরো কিছুটা সময় লাগবে, কিন্তু আমরা নিশ্চয়ই লিখে ফেলতে পারব ভাষার ইতিহাস। মানুষের ইতিহাসের ওপরে এর প্রভাব ও সময়ের বাঁকে বাঁকে এর দিক বদল। আসলে, বিজ্ঞানীরাও সেজন্যই ভাষার গল্পটা বোঝার চেষ্টা করে গেছেন নিরন্তর।
কারণ, ভাষার ইতিহাস ছাড়া মানুষের ইতিহাস কোনোভাবেই পূর্ণতা পায় না।
ডগ স্কোয়াড ট্রেনিংয়ে কুকুরগুলোকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় কিভাবে ?
র্যাবের সাথে বা পুলিশের সাথে অভিযানে যেতে দেখা যায় সুঠাম দেহগঠনের আরেকটি বাহিনী, তাদের নাম ডগ স্কোয়াড। গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে তাদের দক্ষতা এবং পারফরমেন্স প্রশংসার দাবিদার। তবে এক্ষেত্রে তাদেরকে দক্ষ করে যারা গড়ে তোলেন, তাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না। কুকুরকে আর্মি ট্রেনিংয়ের মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং ট্রেনবিস্তারিত পড়ুন
র্যাবের সাথে বা পুলিশের সাথে অভিযানে যেতে দেখা যায় সুঠাম দেহগঠনের আরেকটি বাহিনী, তাদের নাম ডগ স্কোয়াড। গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে তাদের দক্ষতা এবং পারফরমেন্স প্রশংসার দাবিদার। তবে এক্ষেত্রে তাদেরকে দক্ষ করে যারা গড়ে তোলেন, তাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না। কুকুরকে আর্মি ট্রেনিংয়ের মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং ট্রেনিং দেয়া হয়, সেটা সকলেরই কম-বেশি জানা আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে যে মনোবিজ্ঞানের থিওরিগুলোকে ব্যবহার করা হয়, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। চলুন জেনে নেয়া যাক কীভাবে ডগ স্কোয়াড ট্রেনিংয়ে মনোবিজ্ঞানের থিওরি ব্যবহৃত হয়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডগ স্কোয়াড; source: Dhaka Tribune
সাধারণ নির্বাচন প্রক্রিয়া
ডগ স্কোয়াডের কাজ মূলত গন্ধ শুঁকে বোমা বা মাদকদ্রব্য শনাক্ত করা। জন্মগতভাবেই এ ক্ষমতা সব কুকুরের মধ্যে থাকে। তারপরও বিশেষ কয়েকটি জাতের কুকুরের মাঝে এ ক্ষমতা প্রবল; যেমন- ল্যাব্রাডোর, ব্লাডহাউন্ড বা জার্মান শেপার্ড। একদম ছানা অবস্থায় সুস্থ দেখে কয়েকটি কুকুর নির্বাচন করে পাঁচ থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মনিটর করা হয়। তারপর শুরু হয় ট্রেনিং। আর হ্যাঁ, মনিটরের সময়েই বাধ্য হতে শেখানো, টয়লেট ট্রেনিং ইত্যাদি টুকটাক শিক্ষাদান চলতে থাকে। যেহেতু সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ করবে, তাই প্রথমেই বিকট শব্দের সাথে মানিয়ে নেয়া শেখানো হয়। প্রথমে শব্দের মাত্রা কম থাকবে এবং ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে এবং শেষে সত্যিকারের গুলির শব্দের সাথে মানিয়ে নেয়া শেখানো হয়। মোটামুটি এ ট্রেনিংগুলো শেষ হবার পর যে কুকুর ছানাগুলোর পারফরমেন্স ভালো থাকে, তারা ডগ স্কোয়াডে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হয়।
ছানা অবস্থায় নির্দিষ্ট জাতের কুকুর এনে সেগুলোকে মনিটরিং করা হয়; source: Daily mail
এরপর থেকে প্রতিদিন কিছু লুকোচুরি খেলা খেলতে হবে তাদের সাথে। মানুষের ছোঁয়া জিনিস গন্ধ শুঁকে খুঁজে বের করতে হবে। পরবর্তী ধাপে যে মানুষের ছোঁয়া জিনিস খুঁজে পেয়েছে, সে মানুষটাকেই খুঁজে বের করা লাগে। এ ট্রেনিংয়ের সময় কুকুরের মুখে মুখবন্ধ দিয়ে নেয়া ভালো, কেননা অনেক সময় এরা আক্রমণাত্মক হয়ে পড়ে।
স্কোয়াড ডগ ট্রেনিংয়ের মুহূর্তে; source: You Tube
মনোবৈজ্ঞানিক থিওরি এবং স্কোয়াড ট্রেনিং
কুকুরকে ট্রেনিং দেবার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো আচরণের পরিবর্তন আনা। আচরণে পরিবর্তন আনতে মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত মনোবিজ্ঞানের থিওরিগুলোই কাজে লাগানো হয়। যেমন-
প্যাভলভের ক্লাসিক্যাল শর্তারোপ থিওরি
মনোবিজ্ঞানে আচরণ পরিবর্তনে ব্যবহৃত অন্যতম থিওরিগুলোর একটি হলো এই থিওরি। স্বাভাবিক একটি আচরণকে অন্য কিছু দ্বারা পরিবর্তন করাই এই থিওরির উদ্দেশ্য। প্যাভলভ এই থিওরিটি কুকুরের উপর প্রয়োগ করেই দিয়েছিলেন।
মাংস দেখলে স্বাভাবিকভাবেই কুকুরের লালাক্ষরণ হয়। তিনি প্রথমে একটি ঘন্টা বাজান এবং এরপর একটি কুকুরকে মাংস খেতে দেন। বেশ কয়েকবার এমন করার পর দেখলেন ঘন্টা দিয়ে মাংস না দিলেও কুকুরটির লালাক্ষরণ হচ্ছে। অর্থাৎ ঘন্টা দ্বারা লালাক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে।
প্যাভলভের ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং; source: SlideShare
তো কীভাবে ডগ স্কোয়াডে এর ব্যবহার হতে পারে? একটি হতে পারে কুকুরকে স্পটে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। অনেক কুকুরই যেতে চায় না বা অস্থিরতা প্রকাশ করে। সেগুলো নিয়মের মাঝে আনতে প্রতিদিন যেকোনো একটি স্পটে নিয়ে যেতে হবে এবং ফেরার পর খাবার দিতে হবে। এভাবে কিছুদিন করলে সে বুঝে যাবে যে, স্পটে গেলেই খাবার পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে এটা রপ্ত হয়ে গেলে তখন খাবার না দিলেও পরের দিন যাবে। তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে আচরণ আবার আগের মতো হয়ে যেতে পারে।
ট্রেনিং এ গুলির শব্দের সাথে পরিচিত করানো হচ্ছে; source: You Tube
স্কিনারের অপারেন্ট কন্ডিশনিং
উদ্দীপক পেলে সাড়া দেবে- এমনই এক মূল কথা মাথায় রেখে দেয়া হয় অপারেন্ট কন্ডিশনিং। যেমন ধরুন, একটি বাচ্চা পড়তে চাচ্ছে না। আপনি তাকে বললেন পড়লে চকোলেট পাবে- এই ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি ঠিক তেমন। কুকুরদেরকে নির্দিষ্ট টাস্ক দেয়া হয়। যদি টাস্ক সম্পন্ন করতে পারে তবে পুরষ্কার পাবে, যদি না পারে তাহলে শাস্তি পাবে, যেমন- আঘাত করা, ধমকানো ইত্যাদি। তবে বিজ্ঞানীরা বলেন, শাস্তি দিয়ে ভালো কিছু আদায় করা সম্ভব নয়। তার চেয়ে কোনো টাস্ক না পারলে পুরস্কারটি না দেওয়াই তার জন্য শাস্তি হবে। এটিকে নেগেটিভ রি-ইনফোর্সমেন্ট বলা হয়। এই কন্ডিশনিংয়ের উদ্দেশ্য হলো ভালো আচরণকে পুরষ্কৃত করে সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটানো।
source: Pinterest
স্কিনার আরো একটি পদ্ধতির কথা বলেছেন, তা হলো শেপিং। কোনো কঠিন একটি টাস্ককে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নেয়া এবং প্রতিটি অংশ সফলতার সাথে কমপ্লিট করার জন্য পুরষ্কৃত করাই হলো শেপিং। ডগ স্কোয়াড ট্রেনিংয়ে এ বিষয়টি প্রত্যেক ট্রেইনার মোটামুটি অনুসরণ করে থাকেন।
বান্দুরার সোশাল লার্নিং থিওরি
ছোট বাচ্চাদের সহজাত শিক্ষার প্রক্রিয়া খেয়াল করেছেন কি? তারা দেখে শেখে। অন্যরা কী করছে তা খেয়াল করে দেখে এবং তারপর তা নিজে করার চেষ্টা করে। অর্থাৎ খেয়াল করে দেখা এবং অনুকরণের সমন্বয়ই হলো আমাদের আচরণ। এই থিওরিকে সোশাল লার্নিং থিওরি বলে। আলবার্ট বান্দুরা এই বিষয়টি নিয়ে একটি পরীক্ষাও করেন।
ডগ ট্রেনিংয়ে সোশাল লার্নিং থিওরি এর ব্যবহার অনেকটা এমন; source: E-Learning-Provocateur
কুকুরের ট্রেনিংয়ের সময়ও এই থিওরি কিছুটা প্রয়োগ করা হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ট্রেইনারকে অনুকরণের বদলে অভিজ্ঞ কুকুরকে মডেল হিসেবে অনুকরণ করানো হয়।
মাসলোর চাহিদা সোপান থিওরি
মাসলোর মতে, প্রতিটি প্রাণীর প্রয়োজনীয়তার একটি সোপান বা সিঁড়ি রয়েছে। এটি অনেকটা পিরামিড আকৃতির। প্রতিটি প্রাণীর ক্ষেত্রে এই সোপানের ব্যাখ্যা আলাদা আলাদা হলেও কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে সকলের মাঝে, যেগুলো হলো মৌলিক চাহিদা, যেমন- খাদ্য, পানি, ভালোবাসা ইত্যাদি। অর্থাৎ ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং আনন্দ লাভ হলো প্রতিটি প্রাণীর প্রথম চাহিদা। আর এ কারণেই পোষা প্রাণীর আচরণ পরিবর্তনে পুরষ্কারের ব্যবস্থা করা হয়।
কুকুরের চাহিদা সোপান; source: thoseclevercanines.com
তাই ডগ ট্রেনিংয়ে কুকুরের ছোটখাটো একটি টাস্ক দেওয়া হয়। ভালো আচরণকে মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয়। এতে করে কুকুরটি কাজে উৎসাহিত হবে এবং শান্ত হয়ে বসবে। এরপর আরেকটু হার্ড টাস্ক দেওয়া হবে এবং পারলে আবারো মৌলিক চাহিদার একটি পূরণ করা হয়। এতে করে কুকুরটি আনন্দিত হবে এবং পরবর্তী টাস্কগুলো সফলতার সাথে করার চেষ্টা করবে।
হার্ড টাস্ক ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে ডগ স্কোয়াডকে; Source: BBC.com
টলম্যানের ল্যাটেন্ট লার্নিং
বারবার পুরস্কার না দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর বা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাস্ক কমপ্লিটের পর দিলে লার্নিংয়ের ফলাফল ভালো হয়। এই থিওরিটি টলম্যান ইঁদুরের উপর কাজ করে দিলেও, তা কুকুরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
ধরুন, কুকুরকে কোনো উঁচু পাঁচিল লাফিয়ে পার হওয়া শিখাতে হবে। তাহলে কুকুরকে চেষ্টা করতে দিন। অনেকবার চেষ্টার পর তাকে খাবার দিন পুরষ্কার হিসেবে। তাহলে দেখবেন পুরষ্কার পাবার পর খুব দ্রুত এবং সঠিকভাবে টাস্ক কমপ্লিট করতে পারছে। আর তাই এটিকে ল্যাটেন্ট লার্নিং বলে।
ট্রেনিংপ্রাপ্ত স্কোয়াড; source: news.mongabay.com
ডগ ট্রেনিংয়ে মাঝে মাঝেই কুকুরগুলোকে মানুষ এবং অন্যান্য কুকুরের সংস্পর্শে সামাজিক করার চেষ্টাও করা হয়, যেন স্পটে গিয়ে মানুষ বা অন্য পরিবেশ দেখে ভীত না হয়ে পড়ে। আর ডগ ট্রেনিং কখনো শেষ হবার নয়। অভিজ্ঞ কুকুরগুলোকেও নিয়মিত প্র্যাকটিস করাতে হয়। পরিশেষে, ডগ ট্রেনিংয়ে মনোবিজ্ঞানের এসব থিওরি ব্যবহৃত হয় খুবই দক্ষ হাতে। একজন অভিজ্ঞ ডগ ট্রেইনারের পক্ষেই তা সম্ভব।
সংক্ষেপে দেখুনভ্যাম্পায়ার: লোককথা নাকি বাস্তব?
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীতে প্রচলিত আছে ভ্যাম্পায়ারদের গল্প। কিছু গল্প হয়তো মজার, কিন্তু কিছু গল্প গায়ে কাঁটা দেবার মতোই। এবং সব গল্পেই ভ্যাম্পায়ারদের চরিত্রটা একইরকম- মৃত মানুষ তারা, ফ্যাকাশে চামড়ার রক্তপিপাসু সব, সূর্যের আলোতে আসলেই ঝলসে যায় তাদের শরীর। তবে সত্যিই কি এগুলো শ্রুতিকথা? যেকোনো সবিস্তারিত পড়ুন
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীতে প্রচলিত আছে ভ্যাম্পায়ারদের গল্প। কিছু গল্প হয়তো মজার, কিন্তু কিছু গল্প গায়ে কাঁটা দেবার মতোই। এবং সব গল্পেই ভ্যাম্পায়ারদের চরিত্রটা একইরকম- মৃত মানুষ তারা, ফ্যাকাশে চামড়ার রক্তপিপাসু সব, সূর্যের আলোতে আসলেই ঝলসে যায় তাদের শরীর। তবে সত্যিই কি এগুলো শ্রুতিকথা? যেকোনো সজ্ঞান ব্যক্তিই বলবে, “হ্যাঁ, অবশ্যই, ভ্যাম্পায়ারের কাহিনীর কি আবার বাস্তব ভিত্তি আছে নাকি?” কিন্তু মজার বিষয় কি জানেন? বিজ্ঞান কিন্তু ভ্যাম্পায়ারকে স্রেফ শ্রুতিকথা বলে উড়িয়ে দিচ্ছে না। হ্যাঁ, অদ্ভুত হলেও সত্য, ভ্যাম্পায়ের এসব লোককথার রয়েছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
বেশিরভাগ সংস্কৃতিতেই ভ্যাম্পায়ার বা ভ্যাম্পায়ারের মতোই কোনো চরিত্র নিয়ে লোককথা আছে। চীনের লোককথায় আছে অন্যের জীবন থেকে শক্তি নেয়া প্রেতের কথা। ভারতে আছে শ্মশানের ভূতের গল্প। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় মেসোপটেমিয়া, হিব্রু, গ্রিক বা রোমান- সবার উপকথাতেই আছে ভ্যাম্পায়ারদের মতো কোনো অপদেবতার গল্প।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব উপকথা যাচাই করলে দেখা যায়, এসব শ্রুতির জন্ম হয়েছে রোগবিস্তার সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা থেকে। যেমন- প্লেগ যখন ইউরোপে মহামারি রূপে ছড়িয়েছিল, তখন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বেশ ভীত হয়ে গিয়েছিল, বের করেছিল এই রোগ এবং রোগ বিস্তারের অদ্ভুত সব ব্যাখ্যা। অনেকে বলেছিলো, ইহুদীরা ছড়াচ্ছে এই রোগ, অনেকে ভেবেছিল ঈশ্বর তাদেরকে পাপের শাস্তি দিচ্ছে। অথচ এই মহামারীরও ছিল সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কিত লোককথাগুলোর সাথে যেসব সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো জড়িয়ে আছে, বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এগুলোও আসলে সত্যিকারের কিছু মেডিকেল কন্ডিশনেরই অতিকথন।
একটি সম্ভাব্য সংযোগ হিসেবে বিজ্ঞানীরা ভাবছেন পোরফিরিয়াকে। পোরফিরিন নামক রক্তের এক অণুর আতিশায্যের ফলে এই ব্যাধি হয়।
আমরা জানি, রক্তের লোহিত কণিকায় বড়সড় একটি প্রোটিন থাকে, হিমোগ্লোবিন যার নাম। এর মাধ্যমেই অক্সিজেন আর কার্বন ডাইঅক্সাইড সঞ্চালিত হয় আমাদের দেহে। আর এই হিমোগ্লোবিনের মাঝে থাকে কার্বন, নাইট্রোজেন আর হাইড্রোজেনের একটি রিং, পোরফিরিন রিং। সাধারণত এনজাইম এই পোরফিরিনকে হেম গ্রুপে রূপ দেয়, হিমোগ্লোবিনের কাজ শুরু হয়ে সেখান থেকে। কিন্তু পোরফিরিয়ার রোগীদের এই এনজাইমের ঘাটতি থাকে, ফলশ্রুতিতে তাদের দেহে পোরফিরিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই পোরফিরিন জমে তাদের দেহে নানা সমস্যার তৈরি করে।


পোরফিরিন; image source: commons.wikimedia.org
তাদের ত্বক তখন সূর্যের আলোর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, আলো লাগলেই ফুসকুড়ি হয় দেহে, ব্যথা করে সেগুলো। এই অতিরিক্ত পোরফিরিনগুলো তাদের দাঁতে-মুখে জমা হয়, সেখানকার ত্বকগুলো লাল হয়ে যায়। দেখে এটাও মনে হতে পারে যে, মানুষটা হয়তো রক্ত চুষে এসেছে কোনো জায়গা থেকে!
পোরফিরিয়ায় আক্রান্ত একজন ব্যক্তি; image source: Acute Porphyrias- Youtube
এখন এই পোরফিরিয়া এত বড় ব্যাধি হিসেবে আর নেই, এর প্রকৃতিও আমরা বুঝি, একে সারানোও যায়। তখন মানুষের কাছে এই ব্যাধি ছিল রহস্যময়, তাই হয়তো মানুষ একে ঘিরে এত গল্প বানিয়েছিল।
আর পোরফিরিয়াগুলো বংশ পরম্পরায় পরিবাহিতও হয়। এ কারণে একজন ভ্যাম্পায়ার তার পরিবারের সবাইকে ভ্যাম্পায়ার বানিয়ে ফেলছে এমন গল্পও তাই এখন আর ব্যাখ্যাতীত নয়।
পেলাগ্রা নামক আরেকটি ব্যাধি দিয়েও এই উপকথাকে ব্যাখ্যা করা যায়। ভিটামিন বি-৩ আর ট্রিপ্টোফ্যান নামক এক অ্যামিনো এসিডের অভাবে এ রোগ হয়।
আমাদের দেহ ভিটামিন বি-৩ কে ব্যবহার করে খাবারকে শক্তিতে রুপান্তর করে। আর আমাদের খাবারে যদি ভিটামিন বি-৩ যথেষ্ট না-ও থাকে, আমাদের দেহ ট্রিপ্টোফ্যান থেকে ভিটামিন তৈরি করে নেয়, যাতে দেহের কার্যকলাপ ঠিক থাকে। কিন্তু কারো দেহে যদি এই দুটোরই অভাব থাকে, তখনই আসলে সমস্যার সূত্রপাত হয়।

ভিটামিন বি৩ বা নায়াসিন; image source: poultrydvm.com
আজ থেকে ৩০০ বছর আগে, গমের স্থানে ভুট্টা ইউরোপিয়ানদের প্রধান খাদ্য হিসেবে উত্থিত হতে শুরু করে। ভুট্টার ফলন তখন খুব ভালো হতো এবং দামেও ছিল সস্তা। এজন্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে ভুট্টা। তবে ভুট্টার কিন্তু গমের মতো পুষ্টিমান ছিল না। এর মাঝে ভিটামিন বি-৩ থাকলেও ছিল গমের থেকে কিছুটা ভিন্ন রূপে, সেটা হজম করার ক্ষমতা আমাদের দেহে ছিল না। ইউরোপে ভুট্টা আসে মেক্সিকানদের থেকে, মেক্সিকানরা ভুট্টাকে খাবার হিসেবে ব্যবহার করার আগে চুন-পানির মিশ্রণে একটু ভিজিয়ে নেয়। এ সময়ে হওয়া কিছু বিক্রিয়ার জন্য তখনই আসলে ভুট্টার পুষ্টিগুণ বেড়ে যায় অনেকগুণ। ইউরোপিয়ানদের মাঝে এ চর্চা ছিল না। তাই ভিটামিন বি-৩ থেকেও তারা বঞ্চিত হতো। এর মধ্যে আবার ভুট্টায় ট্রিপ্টোফ্যানের অস্তিত্বই নেই। এ কারণে যত ভুট্টাই খান, প্রয়োজনীয় ভিটামিনের অভাব আপনার কোনোভাবেই পূরণ হচ্ছে না। তাই এই পরিবর্তনের সময়েই ইউরোপে বেশ দ্রুত পেলাগ্রা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
পেলাগ্রা আর পোরফিরিয়ার উপসর্গগুলো বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। সূর্যের আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা, বাহিরে বের হলেই ফুসকুড়ি- এসব তো আছেই। এই ফুসকুড়ি আবার এ রোগের ক্ষেত্রে বেশ ভয়ংকর। ত্বক পুরো ফ্যাকাশে কাগজের মতো হয়ে যায় এক্ষেত্রে।
এই রোগাক্রান্তদেরও মুখ লাল হয়ে যায়, জিহ্বাও ফুলে যায়। জিহ্বায় দাঁতের দাগ পড়ে যায় তখন, দেখে মনে হয় মুখের ভেতর বোধহয় অনেক বড় বড় দাঁত। ভ্যাম্পায়ারদেরকেও তো আমরা এমনটাই ভাবি, তাই না?
এছাড়াও পেলাগ্রায় মস্তিষ্কের নিউরন ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ফলে দেখা যায় রোগীরা বিভিন্ন মানসিক রোগ কিংবা ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। সূর্যের আলোর প্রতি এলার্জি আর ইনসমনিয়ায় দুটোর সমন্বয় যদি হয় কারো মাঝে, তবে কি আর সে মানুষটাকে ঘুমাতে দেখা যাবে? গল্পের ভ্যাম্পায়াররা এ কারণেই রাতে ঘুমায় না।
তবে এই পেলাগ্রা আর পোরফিরিয়া হয়তো ভ্যাম্পায়ারদের কিছু বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু “মৃত মানুষ হেঁটে বেড়াচ্ছে”- এই গল্পের ব্যাখ্যা কোথায় পাবো আমরা? হ্যাঁ, বিজ্ঞানেই আছে সেই ব্যাখ্যা।
কোনো কোনো বিজ্ঞানীর মতে, ক্যাটালেপ্সি নামক এক স্নায়বিক ব্যাধি থেকে উৎপত্তি এই গল্পের। এপিলেপ্সির মতোই সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম বাধাগ্রস্থ হয় এ সময়। রোগী তখন নড়তে পারে না, হৃদস্পন্দন আর শ্বাসপ্রশ্বাস এতটাই ধীর হয়ে যায় যে রোগীকে দেখে যে কারো মনে হতে পারে, সে হয়তো মৃত। এখন মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের হাতে বর্তমানে আছে অনেক সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি, যেগুলো দিয়ে কারো মাঝে যদি জীবিত থাকার ক্ষুদ্রতম লক্ষণও থেকে থাকে, তা আমরা বের করে ফেলতে পারি। আগে কিন্তু এমনটা ছিল না। ক্যাটালিপ্টিক সিজারে থাকা কাউকে মৃত ভেবে ফেলাটা আসলে অনেকটা স্বাভাবিকই ছিল। আর মৃত ব্যক্তিদেরকে কী করা হয়? কবর দেয়া হয়। এমনকি কোমায় থাকা মানুষদেরও কবর দিয়ে দেয়াও তো সেসময়ের জন্য খুব অস্বাভাবিক কিছু না। কবরে গিয়ে কিন্তু ঠিকই এই অসুস্থ মানুষগুলো সম্বিত ফিরে পেতে পারে।

ক্যাটালেপ্টিক সিজারে থাকা একজন ব্যক্তি; image source: pinterest.com
আর কেউ যদি দেখে কবর থেকে কেউ উঠে এসে হেঁটে বেড়াচ্ছে, তাকে কি আর কোনোভাবে বোঝানো সম্ভব যে এ ব্যক্তি জীবিতই আসলে, কোনো ভ্যাম্পায়ার নয়?
এই তিনটি ব্যাধিই এখনো টিকে আছে পৃথিবীতে, কিন্তু সবগুলোই চিকিৎসা সম্ভব। আর চিকিৎসা হতে হতে ব্যাপ্তিও কমে গিয়েছে এখন। তাহলে দেখা গেলো, ভ্যাম্পায়ার আসলে শুধু হরর বইয়ের গল্পের চরিত্র বা লোককথার পিশাচই নয়, রীতিমতো বাস্তব কিছু মেডিকেল কন্ডিশন। মানবসভ্যতা জ্ঞান-বিজ্ঞানে এতটা এগিয়ে যাবার পর কত মজার মজার ব্যাপারই আমাদের সামনে আসছে এখন। ইতিহাসের অদ্ভুততম লোককথাগুলোকেও যখন বিজ্ঞান ব্যখ্যা করে দিচ্ছে, তখন প্রজন্ম হিসেবে নিজেদেরকে ভাগ্যবানই বলতে হয়!
সংক্ষেপে দেখুনআঙুলের নখ কিভাবে বৃদ্ধি পায়?
যারা হাতের আঙুলে নখের উপর মেহেদী দিয়েছেন কখনো, তারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, মেহেদীর রঙ কীভাবে ধীরে ধীরে মুছে যায়। রঙ আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে থাকে। প্রথমে নখের গোঁড়ায় ফাঁকা হতে শুরু করে। কখনো কি ভেবেছেন কেন এমনটা হয়? আঙুলের নখ তিনদিকে আবদ্ধ, শুধুমাত্র সামনের দিক উন্মুক্ত, এই সামনের দিকটিই নখ বৃদ্বিস্তারিত পড়ুন
যারা হাতের আঙুলে নখের উপর মেহেদী দিয়েছেন কখনো, তারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, মেহেদীর রঙ কীভাবে ধীরে ধীরে মুছে যায়। রঙ আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে থাকে। প্রথমে নখের গোঁড়ায় ফাঁকা হতে শুরু করে। কখনো কি ভেবেছেন কেন এমনটা হয়? আঙুলের নখ তিনদিকে আবদ্ধ, শুধুমাত্র সামনের দিক উন্মুক্ত, এই সামনের দিকটিই নখ বৃদ্ধি পাবার জন্য যথেষ্ট নয় কি?
এমনটা হতেও পারতো, তবে সেক্ষেত্রে অনেক সমস্যা দেখা যেতো। উদাহরণ হিসেবে মেহেদীর রঙের কথাই ধরা যাক। এই রঙ কখনো নখ থেকে মুছে যেতো না, সামনের মুক্ত অংশে নখ বৃদ্ধি পেতো, আর আমরা কেটে ফেলতাম বাড়তি অংশটুকু। হয়তো আঙুলের নখ নিয়ে কিংবা মাথার চুল নিয়ে কখনো ভাবনা জাগেনি মনে। জীবদেহে থাকা কোনোকিছুই ফেলনা নয়, সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে। নখের প্রয়োজনীয়তা নখ কাঁটার পর উপলব্ধি করতে পারেন নিশ্চয়ই। সৌন্দর্যবর্ধন এবং সূক্ষ্ম কোনো বস্তু ধরা ছাড়াও আরো অনেক কাজ রয়েছে নখগুলোর।

আঙুলের অগ্রভাগে উপস্থিত হলুদ অংশের কুটুরিগুলোই পাল্প স্পেস নামে পরিচিত; Image Source: Atlas of Dermatologic Ultrasound
আঙুলে পাল্প স্পেস নামে ছোট ছোট কুঠুরীর মতো রয়েছে, সবধরনের আঘাত থেকে আঙুলের অগ্রভাগে অবস্থিত এ পাল্প স্পেসটিকে রক্ষা করে থাকে নখ। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মাঝে কেবল প্রাইমেট বর্গের প্রাণীদেহে নখ পাওয়া যায়। এই নখ জন্মের পর নয়, বরং মাতৃগর্ভে থাকাকালেই তৈরি হয়ে যায়। কেরাটিন জাতীয় প্রোটিন নির্মিত এই নখ শক্ত এক আবরণের মতো আবৃত করে রাখে আঙুলের অগ্রভাগকে।
মাতৃগর্ভে একটি শিশুর বয়স যখন ২০ সপ্তাহ পূর্ণ হয়, আঙুলগুলোর অগ্রভাগে শক্ত একটি আবরণের মতো তৈরি হতে শুরু করে। মাতৃগর্ভে ২৮০ দিন পূর্ণ করে একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হতে হতে সেই আবরণগুলো পরিপূর্ণ নখে পরিণত হয়।

একটি নখের বিভিন্ন অংশ©Lineage
আঙুলের গোঁড়ায়, নখ যেখানে ত্বকের সাথে মিশে গেছে, এই অংশটুকুকে বলা হয় কিউটিকল, এর ভেতরের দিকে, আঙুলের আরো গভীরে থাকে নখের মূল; একে ম্যাট্রিক্স বলা হয়। এই ম্যাট্রিক্স থেকেই অনবরত নখের সৃষ্টি হতে থাকে। নখগুলো গোড়ার দিকে যেখানে গিয়ে ত্বকে মিশেছে, সেখানে সম্পূর্ণ সাদা অর্ধচন্দ্রাকৃতির একটি অংশ দেখা যায়। না দেখতে পেলেও সমস্যার কিছু নেই, সাধারণত দেখা যাবার কথা নয়। বৃদ্ধাঙ্গুলির দিকে তাকালে হয়তো স্পষ্ট দেখা যেতে পারে। এই অংশটুকুকে বলা হয় লুনুলা, এটি ত্বকের নিচে ম্যাট্রিক্সের বাড়তি অংশ। অর্ধচন্দ্রাকৃতির হওয়ায় এর নাম হয়েছে লুনুলা।
নখ এবং চুল মৃত কোষ দিয়ে তৈরি। কোনো ধরনের স্নায়ু সংযোগ থাকে না বলে নখ কিংবা চুল কাঁটলে আমরা ব্যথা পাই না। কিন্তু এই যে নখের ম্যাট্রিক্স অংশটুকু, এটি মৃত নয়, জীবিত কোষ দ্বারা তৈরি হয়েছে, ত্বকের নিচে এর সাথে রক্তবাহিকা এবং স্নায়ু সংযুক্ত থাকে। রক্তবাহিকার মাধ্যমে পর্যাপ্ত পুষ্টি পেয়ে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নতুন নতুন কোষ তৈরি করে এই ম্যাট্রিক্স, নতুন তৈরি হওয়া কোষগুলোকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়, যা কিউটিকল পার করে বাইরের দিকে উন্মোচিত হয়।
নখ হিসেবে আমরা যে অংশটুকুকে চিনি, এই শক্ত আবরণটুকুকে বলা হয় ‘নেইল প্লেট’। ম্যাট্রিক্স কোষ থেকে অনবরত কেরাটিন কোষ তৈরি হয়ে বাইরে এসে নেইল প্লেট তৈরি করে। এই কোষগুলো কেরাটিন জাতীয় প্রোটিন তৈরি করে বলেই এরা শক্ত হয়ে যায় মারা যাবার পর। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন কোষগুলো তৈরি হয়ে সামনের দিকে সমভাবে বণ্টিত হয় কীভাবে?
সমতা রেখে রেলগাড়ি চলার জন্য যেমন একটি রেল ট্র্যাক বা রেল লাইন রয়েছে, তেমনিভাবে নখেও একটি ট্র্যাক থাকে, একে বলা হয় নেইল বেড। নখের ঠিক নিচে একস্তর জীবিত কোষের আবরণ থাকে; এটি নেইল বেড নামে পরিচিত। এতে রক্তবাহিকা এবং স্নায়ু রয়েছে। এজন্যই নেইল বেডে কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমরা ব্যথা পাই।

ক্লাবিং উপস্থিত থাকলে হাতের নখগুলো এমন দৈত্যাকার ধারণ করে থাকে; Image Source: Drug Development Technology
নখ হিসেবে আমরা যেটুকু দেখছি পুরোটাই মৃত কোষে তৈরি। কিন্তু আমরা নখ কাঁটার সময় অগ্রভাগে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কাঁটতে পারি, ভেতরের দিকে কাটতে গেলেই ব্যথা লাগবে। মৃত কোষে নির্মিত নখ প্লেটে ব্যথা হয় না, যদি নখ উপড়ে ফেলা হয় কিংবা কাঁটা হয়, নেইল বেডে থাকা স্নায়ুর জন্যই আমরা ব্যথা পেয়ে থাকি। যদি কোনো দুর্ঘটনায় আঙুলে ক্ষতি হয়, নখ উপড়ে ফেলে দিতে হয়, একজন চিকিৎসক সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন নেইল বেড এবং ম্যাট্রিক্স অংশটুকুকে ঠিকমতো বসিয়ে দিতে। কারণ তাহলেই নতুন করে নখ গজিয়ে উঠবে। মোটকথা, নেইল বেড যদি অক্ষত থাকে, নেইল প্লেট ঠিকমতো পুনরায় তৈরি হয়ে যাবে।
বারংবার কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নখের বেড়ে উঠাটাকে স্রষ্টার একটি উপহার হিসেবেই ভাবা যেতে পারে। নখগুলো যদি দাঁতের মতো স্থায়ী হতো, হয়তোবা আমাদের কষ্ট করে নখ কাটা লাগতো না। আর নখ কাটা নিয়ে এত ভাবতেও হতো না। কোনো দুর্ঘটনায় নখ পড়ে গেলেও সেখানে পুনরায় গজানোর সুযোগ থাকে। দাঁতের মতো স্থায়ী কিছু হলে এই সুযোগ আর থাকতো না। একবার নষ্ট হলে কিংবা উপড়ে গেলে বাকি জীবন নখ ছাড়াই থাকতে হতো।
নখের বেড়ে উঠা খুবই ধীরগতির। পায়ের নখগুলো হাত থেকে আরো ধীর গতিতে বেড়ে উঠে। হাতের নখ প্রতি মাসে ৩ মিলিমিটারের মতো বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। অর্থাৎ ছয় মাসের ভেতর একটি আঙুলের সম্পূর্ণ নেইল প্লেটটি প্রতিস্থাপিত হয়ে যাবে নতুন নেইল প্লেট দ্বারা। কোনো দুর্ঘটনায় যদি নখের কোনো ক্ষতি হয়, চিন্তার কোনো কারণ নেই, নেইল বেড ঠিক থাকলে ৫-৬ মাসেই নতুন নখ তৈরি হয়ে যাবে। আর পায়ের নখগুলো প্রতিমাসে ১ মিলিমিটারের মতো বাড়ে, পুরো নেইল প্লেট প্রতিস্থাপিত হতে সময় প্রয়োজন প্রায় এক থেকে দেড় বছরের মতো।



সংক্ষেপে দেখুনপায়ের নখ থাকুক সুস্থ সবল; Image Source: Podiatry Belmont
নখ যে শুধু সৌন্দর্যের অংশ তা, আঙুলের অগ্রভাগকে সুরক্ষিত রাখার অস্ত্র তা নয়। মানুষের হাত পরীক্ষা করেই অনেক রোগ নির্ণয় সম্ভব। শরীরের অনেক রোগের লক্ষণই হাতে, আঙুলের ও নখে প্রকাশ পায়। উল্লেখযোগ্য লক্ষণগুলোর মধ্যে ক্লাবিং, লিউকোনাইকিয়া, কইলোনাইকিয়া বিশেষ। দেহের বিশেষ রোগে এই লক্ষণগুলো নখে দর্পণস্বরূপ প্রকাশিত হয়।
নখ কাটতে অসাবধানতায় এমন ইনফেকশন তৈরি হতে পারে; Image Source: Medical News Today
সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি সঠিক পদ্ধতিতে নখের যত্ন নিন। অনেকেই ম্যানিকিউর-প্যাডিকিউর করে থাকেন। এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করলে নখে ইনফেকশন তৈরি হতে পারে। অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিন, যেসমস্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পার্লারগুলো, সেখানে প্রতিবার কাজ শেষে পরিষ্কার করা হয় কিনা। নখ কাটার ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করুন। আঙুলের অগ্রভাগে নেইল বেডের সীমারেখার সামান্য সামনে পর্যন্ত কাটুন। একেবারে নেইল বেড পর্যন্ত কাঁটা হলে নেইল বেড উন্মোচিত হয়ে পড়ে, যেহেতু জীবিত কোষ রয়েছে, এর নিচেই অজস্য রক্তবাহিতা, দ্রুত ইনফেকশন তৈরি হবার সুযোগ থেকে যায়।
ছোট শিশুদের নখে ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকে। তাই বেশি গভীর করে নখ কাটবেন না; Image Source: The Irish Times
নিয়মিত নখ কাঁটুন, বাড়তি অংশে দেখা-অদেখা হাজারো ময়লা বা জীবাণু জমে থেকে মুখে চলে যায়, খাবারে মিশে যায়। খাবার গ্রহণের পূর্বে সঠিক ভাবে ভালোমতো হাত ধুয়ে নিন, নির্দিষ্ট সময় পর পর নখ কেটে ফেলুন। এতে অনেক রোগ থেকেই বেঁচে যাবেন আপনি। পায়ের নখের দিকেও নজর দিন, ওয়াশরুম থেকে জীবাণুগুলো পায়ের নখ হয়েই আপনার ঘরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। পা পরিষ্কার করা হলেও নখ কদাচিৎ পরিষ্কার করা হয়, তার চেয়ে বরং নিয়ম করে কেঁটে রাখুন। পরিবারে ছোটদের মাঝেও নখ কাঁটার এই সুন্দর অভ্যাসগুলো গড়ে তুলুন।