সাইন আপ করুন
লগিন করুন
রিসেট পাসওয়ার্ড
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? আপনার ইমেইল এড্রেস দিন। ইমেইলের মাধ্যমে আপনি নতুন পাসওয়ার্ড তৈরির লিংক পেয়ে যাবেন।
আপনি কেন মনে করছেন এই প্রশ্নটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই উত্তরটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই ব্যক্তিকে রিপোর্ট করা উচিৎ?
নীল রঙের যেসব জিনিস আমরা দেখি সেগুলো কি আসলেই নীল?
প্রকৃতি সবসময়ই আমাদের কাছে এক বিস্ময়। রূপে-রঙে, বর্ণে-গন্ধে প্রকৃতি যেমন আমাদের মনকে ভরিয়ে রাখে তেমনই জীবন ধারণের উপকরণও আমরা পাই এই প্রকৃতি থেকে। মানব মনকে প্রকৃতি সবসময় তার রূপ-সৌন্দর্য দিয়ে আকৃষ্ট করে রাখে। এত রঙ চারদিকে; গাছের সবুজ পাতা, ফুল ও ফলের নানা বর্ণ, বর্ণিল পশুপাখি ইত্যাদি আমাদের মনকে নবিস্তারিত পড়ুন
প্রকৃতি সবসময়ই আমাদের কাছে এক বিস্ময়। রূপে-রঙে, বর্ণে-গন্ধে প্রকৃতি যেমন আমাদের মনকে ভরিয়ে রাখে তেমনই জীবন ধারণের উপকরণও আমরা পাই এই প্রকৃতি থেকে। মানব মনকে প্রকৃতি সবসময় তার রূপ-সৌন্দর্য দিয়ে আকৃষ্ট করে রাখে। এত রঙ চারদিকে; গাছের সবুজ পাতা, ফুল ও ফলের নানা বর্ণ, বর্ণিল পশুপাখি ইত্যাদি আমাদের মনকে নির্মল রাখতে পালন করে এক অনবদ্য ভূমিকা।
প্রকৃতির এত বর্ণিলতার মধ্যেও সামান্য হেরফের আছে। গবেষকরা দেখেছেন, প্রকৃতিতে নীল রঙের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে খুব কম। বিশেষ করে জীবজগতের মধ্যে এ প্রবণতা আরো বেশি। নিশ্চয়ই ভাবছেন যেসব নীল বর্ণ আপনি দেখে থাকেন ফুলে, ফলে কিংবা পাখির গায়ে সেসব কি ভুল? এমনকি মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলেও মনে হয় পুরো পৃথিবীটাই যেন নীল। সেগুলো কি মিথ্যা? আসলে সেসব মিথ্যাও নয়, আবার সত্যও নয়।
প্রজাপতির ডানার নীল বর্ণও আসলে নীল নয়; Source: orkin.com
পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর একভাগ স্থল। জলের আধার সমুদ্রের পানিও নীল বর্ণের দেখায়। সমুদ্রের পানি কি তাহলে নীল রঙ ধারণ করে? সমুদ্রের পানি আসলে কোনো বর্ণ ধারণ করে না। তবে এর নীল বর্ণের কারণ আলোক বিজ্ঞান (Optics) দিয়ে ব্যখ্যা করা যায়। আকাশ যখন নীল থাকে তখন পানিতে আকাশের রঙ প্রতিফলিত হয়। সেজন্য আকাশের রঙে সমুদ্রকে নীল দেখায়।আবার পরিষ্কার পানির ধর্মই হচ্ছে বৃহৎ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করবে এবং ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলিত করবে। নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ক্ষুদ্র। ফলে এটি নীল আলোকে প্রতিফলিত করে, যার কারণে সমুদ্রের পানি নীল মনে হয়।
পরিষ্কার সমুদ্রের পানি সূর্যরশ্মির বৃহৎ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে আর ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলিত করে; Source: wonderopolis.org
অন্যদিকে আকাশের দিকে তাকালেও দেখা যায়, পরিষ্কার ও মেঘমুক্ত আকাশ নীল বর্ণের দেখায়। সূর্য থেকে আলোক রশ্মি যখন পৃথিবীর দিকে আসে তখন বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষিত হয়ে যায় এবং ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো অর্থাৎ নীল আলোকরশ্মি চারদিকে বিক্ষিপ্ত হতে থাকে। ফলে আকাশ পরিষ্কার থাকলে একে আমরা সবসময় নীল দেখি। বৃহৎ পরিসরে আমরা যে নীল দেখি অর্থাৎ সাগরের পানি আর খোলা আকাশ সেখানে আসলে বিশেষ কোনো নীল বর্ণকণিকা নেই।
সূর্যের আলোকরশ্মি বায়ুমণ্ডলে বিক্ষিপ্ত হয় এবং নীল হিসেবে আমাদের চোখে ধরা দেয়; Source: kabar6.com
এবার চোখ ফেরানো যাক প্রকৃতির জীবন্ত উপাদানের দিকে। প্রথমেই আসে প্রকৃতির অপরিহার্য উপাদান বৃক্ষের কথা। গাছের পাতায় থাকে ক্লোরোফিল নামক বর্ণকণিকা (Pigment), যার কারণে গাছের পাতা সবুজ বর্ণের হয়ে থাকে। আবার ফুলের বিভিন্ন বর্ণের জন্য আছে দুটি রাসায়নিক উপাদান। সেগুলো হচ্ছে এন্থোসায়ানিন আর ক্যারোটিনয়েড। একাধিক রঙ যেমন একত্রে মিলিত হলে ভিন্ন রঙের সৃষ্টি হয়ে তেমনই এই উপাদানও যদি ভিন্ন ভিন্ন অনুপাতে একত্রে যুক্ত হয় তখন ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের সৃষ্টি হয়। এ কারণে দেখা যায় ফুলের রঙের অনেক বৈচিত্র্য আছে।
এন্থোসায়ানিন রাসায়নিক গোত্রের মধ্যে মূলত লাল, পার্পেল (বা লালাভ বেগুনী) এবং কিছু মাত্রায় নীল বর্ণ রয়েছে। অন্যদিকে ক্যারোটিনয়েড গোত্রে আছে লাল, হলুদ ও কমলা রঙ। বোঝাই যাচ্ছে যে, এদের মধ্যে লাল বর্ণটি উভয়ের সাধারণ বর্ণ। ফলে এদের সমন্বয়ে যখন নতুন বর্ণ তৈরী হবে তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থাকবে লালের আধিক্য। বাস্তবেও আমরা দেখি যে অধিকাংশ ফুলের বর্ণই লাল বর্ণের বা লালাভ বর্ণের হয়ে থাকে।
প্রাকৃতিকভাবে স্বল্প পরিমাণ পাওয়া যায় নীল বর্ণের ফুল। এর মধ্যে মধ্যে একটি হলো হাইড্রেনজিয়া (Hydrangeas); Source: mnn.com
লাল বা লালাভ হওয়ার কারণে মৌমাছি বা অন্যান্য মধু আহরণকারী পোকা আকৃষ্ট হয় এবং একইসাথে ফুলের পরাগায়ন ঘটে। কাজেই লাল রঙ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ কারণেই যে নীল রঙের ফুল দেখা যাবে না এমন নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যদিও বা ফুল নীল বর্ণের হতে চায় তখনও অনেক বেশি পরিমাণ লাল রঙ থেকে যাবে লুকায়িত অবস্থায়। এন্থোসায়ানিন আর ক্যারোটিনয়েডের মিশ্রণের কারণে নীলাভ হয়তো দেখাবে, কিন্তু লাল রঙের উপাদান ভেতরে ভেতরে ঠিকই রয়ে যাবে। এর ফলে বিশুদ্ধ নীল পাওয়ার পরিবর্তে পাওয়া যাবে বেগুনী বা লালাভ বেগুনী বর্ণ। অর্থাৎ ফুলের ক্ষেত্রে সত্যিকার বিশুদ্ধ নীল বর্ণকণিকা বা নীল পিগমেন্ট বলতে আসলে কিছু নেই।
তারপরও কথা হচ্ছে আমরা নীল বর্ণের ফুল দেখে থাকি। সেগুলো এলো কীভাবে? প্রশ্ন থেকেই যায়।সাধারণত যেসব ফুলকে আমরা নীল দেখে অভ্যস্ত সেসব ফুলের নীল বর্ণের পেছনে উদ্ভিদের এক গোপন কারসাজি আছে। উদ্ভিদ লাল বর্ণের এন্থোসায়ানিনকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বিশেষায়িত করে নীল বর্ণ তৈরি করে।
Plumbago auriculata একপ্রকার গুল্ম যা মূলত উষ্ণ তাপমাত্রা অঞ্চলে জন্মে এবং নীল বর্ণের ফুল ধারণ করে; Source: mnn.com
যারা স্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত তারা এন্থোসায়ানিন ভালো করে চেনেন। কারণ সায়ানিডিন-৩-গ্লুকোসাইড (C-3-G) হচ্ছে একটি অন্যতম এন্টিঅক্সিডেন্ট এবং এটিই সাধারণ লাল বর্ণবিশিষ্ট এন্থোসায়ানিন। উদ্ভিদ আসলে এই C-3-G এন্থোসায়ানিনকেই বিভিন্ন উপায়ে রূপান্তরিত করে। যেমন পিএইচ পরিবর্তন করতে পারে, পিগমেন্ট, অণু বা আয়নের মিশ্রণ ঘটাতেও পারে। এই জটিল মিশ্রণ আর পরিবর্তন প্রক্রিয়া যখন পিগমেন্টের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত আলোর সাথে যুক্ত হয় তখন ফুলের পৃষ্ঠের বর্ণ নীল দেখা যায়।
এমনিতে গবেষকগণ কৃত্রিমভাবে নীল রঙের ফুল তৈরির জন্যে গবেষণা করে যাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে জাপানের একদল বিজ্ঞানী এক্ষেত্রে নার্সারিতে নীল বর্ণের অর্কিড তৈরী করেছেন। কিন্তু আদতে তারা কোনো পিগমেন্ট ব্যবহার করে নয়, বরং জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে ডাই ব্যবহার করেই তৈরী করেছেন এই নীল অর্কিড।
জিন প্রযুক্তির দ্বারা উদ্ভাবিত chrysanthemums প্রজাতির নীল ফুল; Source: nature.com
কারমিট দ্য ফ্রগ-এর একটি গানে তিনি গেয়েছিলেন যে “It’s not that easy being green” (সবুজ হওয়া অতটা সহজ নয়)। সেই সূত্রে ফ্লোরিডা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিদ্যার অধ্যাপক ডেভিড লী বলেছিলেন যে “It’s even harder to be blue” (অর্থাৎ নীল হওয়া আরো বেশি কঠিন)।
এবার উদ্ভিদ ছেড়ে এবার আমরা একটু প্রাণীদের দিকে আসি। এন্থোসায়ানিনের উপস্থিতি এবং উদ্ভিদের নিজস্ব পদ্ধতির দরুণ সেখানে নীলবর্ণ তৈরী করা সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু প্রাণীদের ক্ষেত্রে কীভাবে নীলবর্ণ তৈরী করা সম্ভব? কারণ প্রাণীরা এই বর্ণকণিকা ধারণ করে না বা তৈরি করতে পারে না। তাহলে আমরা যে নীলরঙা পাখি বা প্রজাপতি দেখে থাকি সেগুলো কি তাহলে ভুল দেখি? আসলে ভুল দেখি না। সেখানেও আছে এক বিশেষ কারসাজি।
প্রাণীর শরীরের নীলবর্ণ তাদের শরীরের কাঠামোগত প্রভাবের ফলাফল। খুব সহজ করে বলতে গেলে এই কাঠামোগত প্রভাব মূলত নির্দিষ্ট প্রকারের আলোকের প্রতিফলন ও চিত্রপ্রভার সৃষ্টি করে যা নীলবর্ণের দেখায়। উদাহরণ হিসেবে আমরা নীলকণ্ঠ পাখি বা Morpho প্রজাতির প্রজাপতির কথা বলতে পারি।
নীলকণ্ঠ পাখির ক্ষেত্রে, এরা সাধারণত মেলানিন নামক রঞ্জক পদার্থ তৈরী করে। মেলানিন মূলত কালো বা গাড় ধূসর বর্ণের হয়। ফলে এই পাখির বর্ণও কালো বা ধূসর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এদের পালকের মাঝে মাঝে যে ছোট ছোট বায়ু কুঠুরী আছে আর সেখানে যে বায়ু আছে সেই বায়ুর কারণে আপতিত আলো বিক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের চোখে এসে নীলরূপে ধরা দেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘র্যালে স্ক্যাটারিং’।
নীলকণ্ঠ পাখির শরীরের নীলবর্ণ আসলে নীল নয়; Source: mnn.com
সাধারণত উভচর বা সরীসৃপ প্রজাতির প্রাণী থেকে পাখি বা প্রজাপতির ক্ষেত্রেই এই বিক্ষেপণের পরিমাণ বেশি দেখা যায়। কারণ এই বিক্ষেপণ একদিকে যেমন বায়ুকণার দ্বারাও ঘটতে পারে অন্যদিকে তেমনি আঁশ বা লোমশ অংশ এবং পালকের ক্ষেত্রেও হতে পারে। কতিপয় ব্যাঙের প্রজাতি এবং নিউডিব্র্যাঙ্কিয়া (Nudibranchia) বর্গের সামুদ্রিক শামুকও নীল বর্ণের হয়।
Morpho প্রজাপতি মূলত গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে পাওয়া যায়। এই প্রজাতির প্রজাপতি যখন বিশ্রাম করে তখন তাদের ডানা দুটি উপরের দিকে ভাঁজ করা থাকে যা মূলত ধূসর বর্ণের। প্রজাপতির বাদামী, হলুদ কিংবা কালো বর্ণের পেছনে পিগমেন্টের ভূমিকা আছে। কিন্তু নীল বর্ণের পেছনে আছে এদের কাঠামোগত প্রভাব অনেকটা নীলকণ্ঠ পাখির মতো।
Morpho প্রজাতির প্রজাপতির নীল রঙের আড়ালে আছে ধূসর রঙের আঁশ; Source: laughingsquid.com
প্রজাপতির ডানায় যে আঁশ থাকে সেগুলো আকারে খুবই ক্ষুদ্র এবং এগুলো একেকটি পিক্সেলের মতো কাজ করে, অনেকটা বড় মোজাইকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টাইলের মতো যারা কিছুটা একে অপরের উপর অবস্থান করে। এই অভিলেপিত আঁশের সারিগুলো পরে প্রিজমের মতো কাজ করে। অর্থাৎ এই পৃষ্ঠের উপর যখন আলো পতিত তখন সেখানে গঠনমূলক ব্যাতিচারের সৃষ্টি হয়। গঠনমূলক ব্যাতিচার হলে এসব অভিলেপিত সারিগুলো থেকে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রতিফলিত আলো একে অপরের সাথে মিশে যায় এবং বাকি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো একে অপরকে নাকচ করে দেয়। সাধারণত নীল বর্ণের আলোই এক্ষেত্রে অভিলেপিত হয় এবং আমাদের চোখে এসে তা ধরা দেয়।
সব মিলিয়ে দেখা যায় যে, প্রকৃতিতে অন্যান্য অনেক বর্ণ কম বেশি থাকলেও নীল বর্ণকণিকা আসলেই কম। যেটুকু নীল আমরা দেখে থাকি সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুভংকরের ফাঁকির মতো। তবে প্রকৃতিবিজ্ঞানীরা এখনও সঠিকভাবে তেমন কোনো কারণ খুঁজে পাননি যে কেন প্রকৃতিতে নীল বর্ণকণিকার পরিমাণ এত কম। কিছু তত্ত্ব পাওয়া যায় যেমন উদ্ভিদের ক্ষেত্রে লাল পিগমেন্টের আধিক্য কিংবা প্রাণীর দেহের পালক ও আঁশের মেলানিন নামক রঞ্জক। তারপরও অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। সে প্রশ্নের উত্তর সে রহস্যের সমাধানের জন্য আমাদেরকে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
সংক্ষেপে দেখুনফটোগ্রাফিক মেমোরি বলতে কি আসলেই কিছু আছে?
ধরুন, আগামীকাল আপনার কোনো একটা ফাইনাল পরীক্ষা, আপনি পড়ছেন, আরো পড়ছেন, কিন্তু সিলেবাস শেষ হচ্ছে না। যা-ই পড়ছেন, নতুন কিছু একটা শুরু করতে গিয়েই মনে হচ্ছে আগেরটা ভুলে গিয়েছেন। এমন অবস্থা তো আমাদের সবার জীবনেই হয়েছে, তা-ই না? তখন কি মনে হয় না, ইশ আমার যদি ফটোগ্রাফিক মেমোরি থাকতো, কতই না ভালো হতো! একবারবিস্তারিত পড়ুন
ধরুন, আগামীকাল আপনার কোনো একটা ফাইনাল পরীক্ষা, আপনি পড়ছেন, আরো পড়ছেন, কিন্তু সিলেবাস শেষ হচ্ছে না। যা-ই পড়ছেন, নতুন কিছু একটা শুরু করতে গিয়েই মনে হচ্ছে আগেরটা ভুলে গিয়েছেন। এমন অবস্থা তো আমাদের সবার জীবনেই হয়েছে, তা-ই না? তখন কি মনে হয় না, ইশ আমার যদি ফটোগ্রাফিক মেমোরি থাকতো, কতই না ভালো হতো! একবার দেখতাম, সব ঢুকে যেত মাথায়, পরীক্ষায় গিয়ে শুধু উগড়ে দিয়ে আসতাম! তারপর একদম কেল্লা ফতে! সেরা ফলাফল আর ঠেকায় কে!
শুনতে বেশ সিনেমাটিক লাগছে তাই না? সিনেমাটিকই বটে, সুপারম্যানের লেক্স লুথর, এক্স ম্যানের প্রোফেসর এক্সের মতো চরিত্রের মাঝে ফটোগ্রাফিক মেমোরি দেখতে দেখতেই আমাদের মনে গেঁথে গেছে ফটোগ্রাফিক মেমোরির অস্তিত্ব।
কিন্তু পর্দার বাইরের বাস্তব জীবনে কি আসলেই ফটোগ্রাফিক মেমোরি বলে কিছু আছে? মানুষের ভালো স্মৃতিশক্তি তো আমরা অহরহই দেখতে পাই। দাবার গ্র্যান্ডমাস্টাররা দাবা বোর্ডের দিকে পাঁচ সেকেন্ড তাকিয়েই স্মৃতিতে গেঁথে নিতে পারেন সবার অবস্থান। রুবিক্স কিউব যারা অনেক দ্রুত মেলান, তারাও একবার তাকিয়ে মনে রাখতে পারেন সম্পূর্ণ কিউবটা কীভাবে আছে। অবশ্য তাদের এটা পারেন কারণ তাদের কাছে দাবার ঘুঁটির বিভিন্ন অবস্থান আর রুবিক্স কিউবের সজ্জা মাথায় প্যাটার্নের মতো গেঁথে আছে। তারপর হাইপারথেসমিয়া বা ‘কিছু না ভোলার রোগ’ বলে একটা ব্যাধি আছে, এ রোগ থাকলে মানুষ দৈনন্দিন জীবনের কিছুই ভুলতে পারে না এবং এ ব্যাপারটার উপর সে রোগীর কোনো নিয়ন্ত্রণও থাকে না। কিন্তু ফটোগ্রাফিক মেমোরি বলতে আমরা বুঝি একটু অন্যরকম কিছু- কোনো একজন মানুষ কোনোকিছুর দিকে তাকালো, একটি মানসিক ছবি নিয়ে নিলো, পরে সম্পূর্ণ একটি ছবির মতোই সেই দৃশ্যটাকে মনে করে ফেললো।
এধরনের ফটোগ্রাফিক মেমোরির আসলে কোনো নজির আছে কি না, তা জানতে আমরা একটু পেছনে তাকাই।
১৯৭০ সালে ‘ন্যাচার’ জার্নাল থেকে একটা স্টাডি প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয় এলিজাবেথ নামক এক নারীর কথা, যিনি নাকি অনেকটাই ফটোগ্রাফিক মেমোরির অধিকারী। তার উপরে করা টেস্টটায় তাকে আলাদাভাবে এমন দুটো ডট প্যাটার্ন দেখানো হয়, যেগুলোকে এক করলে একটি পরিচিত চিহ্ন বা অক্ষর দেখা যাবে। এলিজাবেথকে সেগুলো দেখানোর পর তিনি বলে দিতে পারতেন, অক্ষর বা চিহ্নটি আসলে কী। তিনি নাকি বিদেশী ভাষা, অর্থাৎ যেই ভাষা তিনি জানেনই না, সে ভাষার কবিতাও মুখস্থ বলে দিতে পারতেন একবার দেখেই।

এলিজাবেথের উপরে নেয়া হয়েছিল এমনই একটি মেমোরি টেস্ট, এ দুটোর লাল ডট মিলিয়ে ‘F’ অক্ষরটি তৈরি করে; image source: drawinglics.com
এ স্টাডিটি তখন বিজ্ঞানীমহলে হৈচৈ ফেলে দেয়। অন্য বিজ্ঞানীরাও তখন ব্যাপারটি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৭৯ সালে জন মেরিট নামের আরেকজন গবেষক একটি ফটোগ্রাফিক মেমোরি টেস্ট তৈরি করে জনপ্রিয় পত্রিকায় প্রকাশ করেন।
প্রায় দশ লাখের মানুষ তার টেস্টটি সল্ভ করার চেষ্টা করেন, সফল হন মাত্র ৩০ জন। তাদের মধ্যে ১৫ জন মানুষের সাথে তিনি সরাসরি সাক্ষাৎ করেন, কিন্তু সামনাসামনি সেই মানুষগুলো আর ফটোগ্রাফিক মেমোরির প্রমাণ দেখাতে পারেন না। তাই এলিজাবেথ তখনো অদ্বিতীয়ই থেকে যান।
কিন্তু এই এলিজাবেথ গল্পের সত্যতা সম্পর্কেই আসলে কোনো নিশ্চয়তা নেই। তার এই স্টাডিটি প্রকাশ হবার পর, তার উপর আরো টেস্ট করার প্রস্তাব করা হয়, কিন্তু তিনি আর রাজি হননি। এবং, স্টাডিটির লেখক আর এলিজাবেথ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কিছুদিনের মধ্যেই।
সুতরাং, সেই গবেষণাটির ফলাফল যে বৈজ্ঞানিক কৌতূহল ছাড়াও অন্য কোনো আবেগ দ্বারা প্রভাবিত ছিল না, তার নিশ্চয়তা কি আদৌ আছে?
এই ঘটনার পরও, বেশকিছু মানুষই দাবি করেছেন যে তাদের ফটোগ্রাফিক মেমোরি আছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করার পর দেখা গেছে, তাদের কারোরই আসলে এধরনের কিছু ছিল না, কেউ হয়তো ক্ষেত্রবিশেষে খুব ভালো স্মৃতিশক্তির নজির দেখিয়ে ফেলেছিলেন, কারো দাবিটিই ছিল নিতান্ত মিথ্যে।
তবে ফটোগ্রাফিক মেমোরির কাছাকাছি একটা ব্যাপার কিন্তু প্রকৃতিতে আছে। এর নাম ‘আইডেটিক ইমেজারি’। পুরোপুরি ফটোগ্রাফিক মেমোরির মতো না হলেও আইডেটিক ইমেজারি ব্যাপারটাও বেশ মজার।
আইডেটিক ইমেজারি যাদের থাকে, তাদেরকে বলা হয় আইডেটিকারস। তারা বাস্তবে কোনো একটা ছবি দেখার পর চোখ সরিয়ে নিলেও সে ছবিটি দেখা চালিয়ে যেতে পারে, বিবরণ দিতে পারে খুব ছোট ছোট ডিটেইলের। তাদের সেই ছবি দেখার অভিজ্ঞতাও হয় একদম আসলটা যখন দেখেছিল, ঠিক তেমন। এছাড়াও মনের মধ্যেও তারা তৈরি করে ফেলতে পারে এরকম ছবি, যেটা দেখার অভিজ্ঞতার সাথে বাস্তব ছবি দেখার অভিজ্ঞতার কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু ছবিটা সাধারণত ধীরে ধীরে কয়েক মিনিটের মধ্যে উধাও হয়ে যায় চোখের সামনে থেকে, আর চোখ বন্ধ করলে বা পলক ফেললেও উধাও হয়ে যায় এমনিতেই। আর যদি একবার চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে যায়, তখন সেটা আর ফিরেও আসে না। এছাড়া যখন ছবিটা চোখের সামনে থাকেও, এমন না যে সেখান থেকে লেখা পড়ে লিখে ফেলা যাবে খুব, তাই আমরা ফটোগ্রাফিক মেমোরি দিয়ে যা করার কথা ভাবি, তা আসলে আইডেটিক ইমেজারি দিয়ে করা সম্ভব নয়।
তবে অদ্ভুত বিষয় হলো, এই আইডেটিক ইমেজারিটা শুধুমাত্র শিশুদের মধ্যেই দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এর নজির এখনো একবারও পাওয়া যায়নি। আর শিশুদের জন্যেও, তারা যত বড় হতে থাকে, এই ইমেজ দেখার ক্ষমতা কমতে থাকে। তাই গবেষকরা ভাবছেন, আইডেটিক ইমেজারি হারিয়ে যাওয়া সম্ভব স্বাভাবিক বিকাশেরই অংশ। তবে অনেকে এও বলেন যে, আমরা যত বড় হই, আমাদের চিন্তা তত ভাষাভিত্তিক হয়। আমরা শব্দে ভাবি, ছবিতে নয়। আর যখন কোনো একটা বস্তুর জন্য আমরা শব্দ তৈরি করে ফেলি, তখন সে বস্তুর আইডেটিক ইমেজ আর আমরা তৈরি করতে পারি না। এ কারণেই আইডেটিক ইমেজারি হারিয়ে যেতে থাকে ভাষায় দক্ষ হবার সাথে সাথেই।
তবে একটি শিশুর ভাষার দক্ষতা বাড়ার সাথে সাথেই তার আইডেটিক ইমেজারি কমে যাচ্ছে, এটা সবসময়ই হয় না, কিছু স্টাডিতে এর ব্যতিক্রমও দেখা গেছে। তাই এই ব্যাখ্যাটি ভুলও হতে পারে।
আবার এও দেখা গেছে যে, আইডেটিক ইমেজারি মস্তিষ্কের অক্সিপিটাল লোবে আলফা-ওয়েভ অ্যাক্টিভিটির জন্ম দেয়। আলফা-ওয়েভ অ্যাক্টিভিটি সাধারণত মানুষের হয় জাগ্রত অবস্থায় চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেবার সময়, অথচ আইডেটিক ইমেজারি দেখবার সময় চোখ থাকে বন্ধ। এসব তথ্যে বিজ্ঞানীরা বেশ বিভ্রান্তই আছেন এখনো।

আইডেটিক ইমেজারি মস্তিষ্কের অক্সিপিটাল লোবে আলফা-ওয়েভ অ্যাক্টিভিটির জন্ম দেয়; image source: imcreator.com
তাই আইডেটিক ইমেজারির প্রকৃতি ও কারণ এখনো একদম নিশ্চিতভাবে বের করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।
কিন্তু ফটোগ্রাফিক মেমোরি যে আসলে বাস্তবে নেই, সেটা বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত। তাই এক ঝলকেই স্মৃতিতে গেঁথে ফেলব, এরকম শর্টকাটও আসলে নেই। স্মৃতিশক্তিকে তুখোড় করার উপায় তাই নিয়মিত অনুশীলন। এছাড়া নেমোনিক (Mnemonics) ব্যবহার করে মনে রাখাও একটা ভালো উপায়। নেমোনিক হচ্ছে ছড়া, ছন্দ বা কোনো গল্প- এধরনের বিভিন্ন স্মৃতিসহায়ক দিয়ে কিছু মনে রাখার পদ্ধতি। এই নেমোনিক ব্যবহারকে পাকাভাবে রপ্ত করেই বিভিন্ন স্মৃতিশক্তি প্রতিযোগিতার প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতায় সয়লাব করে থাকে। মোদ্দা কথা, চর্চা আর অধ্যবসায় আপনাকে করতেই হবে। তবে এই প্রবন্ধ পড়ার পর থেকে নিশ্চয়ই আপনি আর আপনার ফটোগ্রাফিক মেমোরি থাকার আশা করবেন না। এ নিয়ে আফসোস করারও কিছু নেই, এটা আপনার যেমন নেই, তেমনি পৃথিবীর কারোরই নেই।
সংক্ষেপে দেখুনগণিত কী কখনও একটি পূর্ণ ভাষা হতে পারে?
গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের ভাষা। আমরা ভাষা বলতে যা বুঝি, গণিত কি তেমনই বাংলা, ইংরেজি কিংবা ম্যান্দারিনের মতো কোনো ভাষা? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের দেখতে হবে গণিতের শব্দ ও ব্যাকরণ কীভাবে এক একটি বাক্য রচনা করে। ভাষা কী? ভাষার বহুরকম সংজ্ঞায়ন হতে পারে। ভাষা হতে পারে কিছু শব্দ বা সংকেত, যেগুলো কিছুবিস্তারিত পড়ুন
গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের ভাষা। আমরা ভাষা বলতে যা বুঝি, গণিত কি তেমনই বাংলা, ইংরেজি কিংবা ম্যান্দারিনের মতো কোনো ভাষা? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের দেখতে হবে গণিতের শব্দ ও ব্যাকরণ কীভাবে এক একটি বাক্য রচনা করে।
ভাষা কী?
ভাষার বহুরকম সংজ্ঞায়ন হতে পারে। ভাষা হতে পারে কিছু শব্দ বা সংকেত, যেগুলো কিছু নিয়মের অধীনে থাকে। আবার বলা যেতে পারে, শব্দ কিংবা প্রতীক ব্যবহারের মাধ্যমে যোগাযোগের একটি পদ্ধতি। বিশ্ববিখ্যাত ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি ভাষাকে সংজ্ঞায়ন করেন সসীম সংখ্যক উপাদান দিয়ে গঠিত বাক্যসমগ্র বলে।
যেভাবেই সংজ্ঞায়ন করা হোক, আমরা সার্বিক বিবেচনায় কিছু উপাদানকে ভাষার বৈশিষ্ট্যের সূচক বলে ধরতে পারি।
ভাষা চর্চিত হবে একদল মানুষের মাঝে, আর ভাষাটি তাদের পারস্পরিক বোধ্যগম্যও হতে হবে; Source: Journal of Speech, Language, and Hearing Research – ASHA
এই শর্তগুলো হাতে নিয়ে গণিতের দিকে তাকালে দেখা যায়, গণিত সবগুলো শর্তই পূরণ করে বসে আছে। বিশ্বব্যাপী গণিতের প্রতীক, তার অর্থ, ব্যবহার আর ব্যাকরণ একই। গণিতবিদ, বিজ্ঞানী এবং অন্যান্যরা ধারণার আদান-প্রদানে গণিতকে ব্যবহার করেন। গণিত যেমন একদিকে বাস্তব ঘটনাকে বর্ণনা করতে পারে, তেমনই বিমূর্ত ধারণাকেও বর্ণনা করতে পারে। এমনকি গণিতের এমন একটি শাখা আছে, যেখানে নিজেই নিজেকে বর্ণনা করতে পারে। ঐ শাখাটি হলো মেটা-ম্যাথমেটিকস।
অভিধান, ব্যাকরণ ও পদবিন্যাস
গণিতের অভিধান সাজানো হয়েছে বিভিন্ন বর্ণমালা থেকে। পাশাপাশি এতে আছে বিভিন্ন চিহ্ন, যেমন যোগ কিংবা বিয়োগ। একটি গাণিতিক সমীকরণকে বলা যায় শব্দের সমাহারে তৈরি বাক্য। একটি সরল গাণিতিক সমীকরণ বিবেচনা করি।
3 + 5 = 8
একে পড়া যায়- তিন এর সাথে পাঁচ যোগ করলে আট এর সমান হয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি পরিপূর্ণ বাক্য।
গণিতের ভাষায় বিশেষ্য পদ হলো এগুলো
সংখ্যা ও অংক (0, 2, 5, 9, 17 ইত্যাদি)
ভগ্নাংশ (1⁄4, 5⁄9, 2 1⁄3)
চলক (a, b, c, x, y, z ইত্যাদি)
রাশি (3x, x^2, 4+x ইত্যাদি)
রেখাচিত্র বা দৃশ্যমান উপাদান (বৃত্ত, কোণ, ত্রিভুজ, টেন্সর, ম্যাট্রিক্স ইত্যাদি)
অসীম সংখ্যা (∞)
পাই (π)
কাল্পনিক সংখ্যা (i, -i)
আলোর বেগ (C)
গণিতে ব্যবহৃত প্রতীক দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে বাক্য; Source: Westend61 / Getty Images
গণিতের ক্রিয়াপদগুলো
সমান ও অসমতা চিহ্ন (=, <, >)
গাণিতিক ক্রিয়া, যেমন- যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, বর্গমূল করা। (+, , ×, ÷)
অন্যান্য ক্রিয়া (sin, cos, tan, sec ইত্যাদি)
গণিতের ব্যাকরণ এবং বাক্যগঠন অভিধানের মতোই আন্তর্জাতিক। কেউ যে দেশেরই লোক হোক, যে ভাষাতেই কথা বলুক, গাণিতিক ভাষার গঠন সকল দেশে একই। গাণিতিক সার্বজনীনতা সকলের জন্য সমান।
গণিতের রাশিমালা সবসময় লিখতে হয় বাম দিক থেকে; Source: Emilija Manevska
ভাষা একটি শিক্ষা উপকরণ
কীভাবে গাণিতিক বাক্যগুলো কাজ করে তা জানলে গণিত শেখা ও শেখানো উভয় পক্ষের জন্যই কার্যকরী ভূমিকা রাখে। সংখ্যা এবং প্রতীক প্রায়ই শিক্ষার্থীদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে। তাই কোনো পরিচিত ভাষায় সমীকরণকে বর্ণনা করলে তা সহজে শিক্ষার্থীর কাছে গ্রহণীয় হয়। মূলত, এটা অনেকটা কোনো বিদেশী ভাষাকে নিজের ভাষায় রূপান্তরের মতো।
যেহেতু পৃথিবীব্যাপী গণিত একই, তাই স্বভাবতই গণিত একটি বিশ্বজনীন ভাষা। গণিতের কোনো সংজ্ঞা কিংবা সূত্রের অর্থ বিভিন্ন ভাষায় একই। দুজন মানুষের মধ্যে কথ্য ভাষায় ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু গণিত সেই যোগাযোগ বাধা উৎরে গিয়েও কাজ করতে পারে।
গণিত শুধু সংখ্যা আর সমীকরণ নয়
গণিত বলতে শুরুতেই মোটাদাগে সংখ্যা আর সংখ্যাদের দিয়ে কিছু ক্রিয়া (যেমন, যোগ, বিয়োগ, ভাগ, বর্গমূল ইত্যাদি) বোঝায় না। বিমূর্ততা, ভাবমূলক বর্ণনা, বস্তুনিরপেক্ষ সংজ্ঞায়ন গণিতের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। জ্যামিতির কথাই বিবেচনা করি। একটি বস্তু কেমন হতে পারে তা গণিতের আওতাধীন। এমনকি কোনো বস্তু কেমন হওয়া অসম্ভব তা-ও গণিত শাস্ত্রের আওতাধীন।
সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, মানুষের দ্বারা যত ভাষা সৃষ্টি হয়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে আদিম কিন্তু এই গণিতই। যুক্তি ও যাচাইয়ের ভিত্তি হিসেবে সবসময় কাজ করেছে এই গণিত। ধর্ম, সংস্কৃতি, লিঙ্গ, কাল ইত্যাদি কোনোকিছুই এ ধারণার পরিবর্তন করতে পারেনি।
গণিতকে ভাষা না বলার যুক্তি
গণিতকে ভাষা বলার যুক্তি যেমন আছে, তেমনই একে নিয়ে আছে বিপরীত মত কিংবা ভিন্ন মত। অনেক ভাষাবিদ একে ভাষা হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ। কারণ ‘ভাষা’র কোনো কোনো সংজ্ঞায় যোগাযোগকে কথ্যরূপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। গণিত মূলত যোগাযোগের একটি লিখিত মাধ্যম; যেখানে খুব সরল একটি সমীকরণ সহজেই পড়ে ফেলা সম্ভব (যেমন- 1 + 1 = 2), কিন্তু জটিল কোনো সমীকরণ যেমন, ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ পড়তে গেলে বক্তার মাতৃভাষার সহায়তা নিতেই হবে- যে কারণে গণিত তাদের মতে ভাষা হিসেবে বিশ্বজনীনতা হারায়।
একই যুক্তিতে ইশারা বা সাংকেতিক ভাষার (Sign language) স্বীকৃতিও কেড়ে নেয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ ভাষাতাত্ত্বিকেরা সাংকেতিক ভাষাকে সত্যিকার ভাষা হিসেবে স্বীকার করেন।
ভাষা মাত্রই ভাবের আদান প্রদান জরুরী; Source: Dictaview.com
গণিত দিয়ে আমরা বিশাল মহাবিশ্বের বিবিধ রহস্য থেকে শুরু করে কোষের ক্ষুদ্র জটিল জগত এমনকি ডিএনএ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করতে পারি। শুধু তা-ই নয়, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণুকেও ব্যাখ্যা করতে পারি। গ্রহদের গতি, জটিল রোগের প্রতিকার এমনকি ঘরের দরজা থেকে বেরিয়ে কর্মস্থল বা শিক্ষাঙ্গন, পার্ক যেখানেই যাই না কেন গণিতের অস্তিত্বকে ঝেড়ে ফেলার কোনো উপায় নেই। কম্পিউটার আর তথ্য বিনিময়ের অতিকায় বিপ্লবের বিস্তারিত কথা না-ই বললাম।
দৈনন্দিন জীবনে গণিত আষ্টেপৃষ্ঠে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে আমরা তার খানিকটাও দেখতে পাই না। অনেকটা বাতাসের সমুদ্রে থেকে বাতাসকে না দেখার মতো। আমাদের সহজাত প্রবৃত্তির কারণে আমরা হয়তো অভ্যাসের ভেতর থেকে ছেঁকে এনে ততটা খেয়াল করি না গণিতকে, কিন্তু যদি বলা হয় শুধুমাত্র সংখ্যা ছাড়া একটা দিন চলতে, তাহলে কি কেউ পারবে?
আধুনিক পৃথিবীর কোনো কল্পনায় আপনাকে নাহয় না ভাসালাম। আদিম সমাজের গুহাবাসী কোনো পরিবারের কর্তাকে যদি কেউ বলতো, তোমার কয় ছেলেমেয়ে গো?
কর্তাকে ছেলেমেয়েদের বের করে এনে দেখাতে হতো এই যে এরা! সংখ্যা না থাকলে এছাড়া আর কী উপায় আছে বলার? কর্তা যদি প্রতিকী দাগ দিয়ে, পাথর কিংবা কাঠি দিয়েও ছেলেমেয়ের সংখ্যা বোঝাতে যায় তাহলেও কিন্তু বিপদ! গণিত ঢুকে যাবে এতে!
আমাদের সকল ক্ষেত্রে আষ্টেপৃষ্ঠে এমনভাবে বিজড়িত একটি বিষয়কে ভাষা না বললেও, এর গুরুত্ব ভাষার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
সংক্ষেপে দেখুনমানব ইতিহাসে কোন রোগটি সর্বপ্রথম নির্মূল করা সম্ভব হয়েছিলো ?
১৭৯৬ সালের কথা। ইংল্যান্ডের বার্কলিতে অবস্থানরত একজন চিকিৎসক ডঃ এডওয়ার্ড জেনার একদিন লক্ষ্য করেন যে, বাড়ি বাড়ি গরুর দুধ দিয়ে বেড়ানো মেয়েটির দেহে স্মলপক্স অর্থাৎ গুটিবসন্ত রোগের সংক্রমণ হয়নি। আশেপাশের মানুষজন গুটিবসন্তে আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু প্রচন্ড সংক্রমণশালী এই গুটিবসন্ত মেয়েটিকে কিছুতেই সংক্রমণবিস্তারিত পড়ুন
১৭৯৬ সালের কথা। ইংল্যান্ডের বার্কলিতে অবস্থানরত একজন চিকিৎসক ডঃ এডওয়ার্ড জেনার একদিন লক্ষ্য করেন যে, বাড়ি বাড়ি গরুর দুধ দিয়ে বেড়ানো মেয়েটির দেহে স্মলপক্স অর্থাৎ গুটিবসন্ত রোগের সংক্রমণ হয়নি। আশেপাশের মানুষজন গুটিবসন্তে আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু প্রচন্ড সংক্রমণশালী এই গুটিবসন্ত মেয়েটিকে কিছুতেই সংক্রমণ করতে পারছে না। তখনকার দিনে শতবছর ধরে টিকে থাকা এ রোগে মানুষের মৃত্যুহার ছিলো অনেক বেশি। গত শতাব্দীতেও প্রতি দশজনে তিনজনের মৃত্যু হতো, এতটাই ভয়ানক এক রোগ এই গুটিবসন্ত।
ডঃ জেনার সাহেব সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি এই মেয়েটিকে পরীক্ষা করে দেখবেন, কোনো একভাবে নিশ্চয়ই মেয়েটির শরীরে গুটিবসন্ত সৃষ্টিকারী ভ্যারিওলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা তৈরি হয়েছে। যদি সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি পুনরায় তৈরি করা যায়, তবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানো যাবে। ডঃ এডওয়ার্ড জেনার এই বিষয়টিকে খতিয়ে দেখতে একদিন মেয়েটির বাড়ি যান। তিনি দেখতে পান যে, মেয়েটির বাড়িতে গরুগুলো সবই গোবসন্তে আক্রান্ত। গুটিবসন্তের মতো গরুতেও একধরনের বসন্তরোগ হয়ে থাকে, এরই নাম ছিলো গোবসন্ত। গরুর শরীরেও তরলপূর্ণ ছোট ছোট গুটি দেখা যেতো।
জেনার সাহেব বুঝতে পারেন যে, হয়তো কোনো একভাবে গরুটির সংস্পর্শে থেকে মেয়েটির শরীরে গোবসন্ত সংক্রমিত হয়েছে, গোবসন্ত মানবদেহে কোনো রোগ তৈরি করতে পারেনি, একইসাথে গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।



শিল্পীর কল্পনায় ডঃ এডওয়ার্ড জেনার, গুটিবসন্তের টিকা প্রদান করছেন, Image Source: The New York Academy of Medicine Library
ডঃ জেনার সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি এই ধারণাটি পরীক্ষা করে দেখবেন। ৮ বছর বয়সী একটি বাচ্চা ছেলের দেহে তিনি একটু ক্ষতসৃষ্টি করে সেখানে গোবসন্তের ক্ষত থেকে সংগৃহীত তরল লাগিয়ে দেন। বাচ্চাটির ক্ষতস্থানটি তাৎক্ষণিক ভাবে ফুলে উঠলেও কিছুদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায় সবকিছু।
গত শতাব্দীতে নির্মিত একটি কাঠের টিউব, এতে সংগ্রহ করা হয় গুটিবসন্তের জীবাণু©JOSE ESPARZA
ডঃ জেনার কিছুদিন পর বাচ্চাটির দেহে আবারো একইভাবে জীবাণু প্রবেশ করান। তবে এবার গোবসন্তের জীবাণু নয়, তরতাজা গুটিবসন্তের জীবাণু প্রবেশ করান তিনি। বাচ্চাটি অল্প অসুস্থ হয়ে কয়দিনের ভেতর সুস্থ হয়ে উঠে, গুটিবসন্ত শিশুটিকে আর আক্রান্ত করতে পারছে না। ডঃ জেনার বুঝতে পারেন যে, এভাবে গুটিবসন্তের কবল হতে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে এই টিকা পদ্ধতির খবর দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সব এলাকায় চিকিৎসকরা একইভাবে মানুষকে টিকা প্রদান করতে শুরু করেন।
ধীরে ধীরে গুটিবসন্তের লক্ষণ প্রকাশ©Kathy Mak
দিনে দিনে গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হয়েছে আরো উন্নত ধরনের টিকাপদ্ধতি। শুধু তা-ই নয়, মারণক্ষয়ী ছোঁয়াছে রোগ পোলিও, হাম, যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস-বি, হুপিং কাঁশি, ধনুষ্টংকারসহ প্রভৃতির বিরুদ্ধেও টিকা আবিষ্কৃত হয়। মানবজাতি সভ্য হবার সময়কাল থেকেই ক্ষতিকারক সব জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিকার এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে, চিকিৎসাবিজ্ঞান যখন উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে, জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিকার এবং প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য অর্জন করেছে।
সব রোগেরই প্রতিকার অর্থাৎ কোনো রোগ হলে সেটির চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে। এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা কেউ যদি আক্রান্ত হয় একসময় তার এইডস দেখা দেয়, তার মৃত্যু নিশ্চিত কিন্তু সেখানেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের চিকিৎসা উপস্থিত। ‘অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ড্রাগ’; এর মাধ্যমে একজন এইডস রোগীর জীবনকে কিছু দীর্ঘায়ু করা সম্ভব, রোগী যতদিন বেঁচে থাকবেন, সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করে যেতে পারবেন। আর যে সমস্ত রোগের সমাধা করা যায়নি, সেসব নিয়েও বিশ্বজুড়ে চলছে বিস্তর গবেষণা।

বিশ্বব্যাপী গুটিবসন্তের টিকা অনুমোদন পেলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গুটিবসন্ত নির্মূল কর্মসূচী আরম্ভ করে, Image Source: The Ruin
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি কথা রয়েছে যে, প্রতিকারের চেয়ে কোনো রোগকে প্রতিরোধ করতে পারাটাই সবচেয়ে ভালো। চিকিৎসাবিজ্ঞান সবার পূর্বে এই ব্যাপারে কাজ করেন যে, রোগটির বিরুদ্ধে পুরোপুরি প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় কিনা। এসব নিয়েও চলছে গবেষণা। পৃথিবীর প্রতিটি বিন্দুতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র জীবাণু। খালি চোখে দেখতে পাই না আমরা, কিন্তু এদের অস্তিত্ব অনুভব করি।
প্রাণী কিংবা উদ্ভিদে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয় এসমস্ত অণুজীবেরা। কিছু অণুজীব আমাদের মানবজাতির জন্য নানান বিষয়ে উপকারী, আবার কিছু প্রজাতি অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসমস্ত ক্ষতিকর অণুজীবেরা মানুষের শরীরে কিংবা আমাদের উপকারী প্রাণী কিংবা উদ্ভিদদেহে রোগ সৃষ্টি করে থাকে। সমস্ত অণুজীবের জন্যই তাদের পোষকদেহ নির্দিষ্ট, কেননা নির্দিষ্ট পরিবেশ ছাড়া তারা বাঁচতে সক্ষম নয়। যেমন ম্যালেরিয়া পরজীবী, তার জীবনচক্রের অর্ধেকটা কাটায় মানবদেহে আর বাকি অর্ধেকটা মশকীদেহে। মশকীদেহ বলতে সবধরনের মশার প্রজাতিতে নয়, কেবলমাত্র অ্যানোফিলিস মশকী। কারণ অন্যসব মশকীদেহের লালাগ্রন্থিতে উপস্থিত এক বিষাক্ত এনজাইমের কারণে এরা ধ্বংস হয়ে যায়।
রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাবলীকে নির্ভর করতে হয় মানবদেহে স্রষ্টা প্রদত্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর। মানবদেহের সবচেয়ে বিস্ময়কর একটি ব্যবস্থা হলো এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। খুবই শক্তিশালী এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। নির্দিষ্ট অণুজীব যা দিয়ে প্রতিনিয়ত আমরা রোগে আক্রান্ত হই, কোনোভাবে যদি অণুজীবগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়, তবেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি সেসব অণুজীবের বিরুদ্ধে কাজ করে সক্ষম হবে। মানব ইতিহাসের প্রথম টিকা গুটিবসন্ত টিকা আবিষ্কারের সময়, ঠিক এই ধারণাটিই কাজে লাগিয়েছিলেন ডঃ এডওয়ার্ড জেনার।
ভ্যারিওলা ভাইরাস বসন্ত রোগ সৃষ্টি করে, এর ভিন্ন দুইটি টাইপের (এই ভাইরাসের সর্বমোট ৪টি টাইপ রয়েছে) একটি থেকে গরুদেহে, আরেকটি থেকে মানবদেহে বসন্ত হয়। গরুদেহের ভাইরাস মানবদেহে উপস্থিত থাকার কারণে অন্য টাইপটি বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারে না। আর গোবসন্তের জীবাণুও মানবদেহে রোগ তৈরিতে অক্ষম। কেবলমাত্র এই ধারণাকে ব্যবহার করেই তৈরি করা হয়েছে অন্যান্য রোগের টিকাগুলো। ১৮৮৫ সালে লুই পাস্তুর যখন জলাতংকের প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা করছিলেন, তিনিও ডঃ জেনারের পদ্ধতি অনুসরণ করেন।



লুই পাস্তুর, Image Source: Famous Biography
রোগকে প্রতিরোধ করতে টিকা প্রদান করা হয়। নবজাতককে জন্মের পরপরই ১০টি রোগের বিরুদ্ধে ৬টি টিকা বাংলাদেশ সরকার EPI কর্মসূচীর মাধ্যমে ইতোমধ্যেই নিশ্চিত করেছে। একটি শিশুর জন্মের সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় টিকাদান, ১৫ মাস বয়স পূর্ণ হতে হতে সবগুলো টিকা দিয়ে শেষ করা হয়। গুটিবসন্ত রোগটির ইতিহাস বহু পুরনো, প্রাচীন মিশরীয় মমিতেও গুটিবসন্তের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিলো।
৩০০০ বছরের পুরনো মমি ফারাও ৫ম রামসিসের মাথায় গুটিবসন্তের নিদর্শন দেখা যায়; Image Source: WHO
গুটিবসন্তের গ্রাস থেকে বাঁচাতে মানবজাতিকে টিকাদানের ফলে, গুটিবসন্তের ভাইরাসটিই পৃথিবী থেকে নির্মূল হয়ে গেছে একটাসময়। বিংশ শতাব্দীতেই পুরো বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ মারা যায় এই গুটিবসন্ত রোগে। অবশেষে ১৯৮০ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা দেয় যে, গুটিবসন্ত রোগটি শতভাগ নির্মূল সম্ভব হয়েছে। শেষবার এ রোগে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছিলো ১৯৭৭ সালে।
এই সেই শিশু কন্যা রহিমা বানু, বাংলাদেশে সর্বশেষ মানুষ যে কিনা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়েছিলো©Stanley O. Foster
গুটিবসন্তের সর্বশেষ রোগীদের মাঝে বাংলাদেশী একটি শিশুও ছিলো। তখনকার সময়ে কেউ গুটিবসন্তের সন্ধান দিতে পারলে পুরষ্কার দেবার ঘোষণা করা হয়েছিলো। ১৯৭৫ সালের দিকে, তিনবছর বয়সী শিশুকন্যা রহিমা বানুর খোঁজ যখন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়, রহিমাকে নিজের বাড়িতে সবার থেকে আলাদা করে রাখার উদ্যোগ নেয়া যাতে আশেপাশের মানুষের মধ্যে এ রোগ ছড়াতে না পারে। ঐ এলাকায় দ্রুত সবাইকে গুটিবসন্তের টিকা দেয়া শুরু করা হয়। এছাড়াও পুরো গ্রামে গুটিবসন্ত নির্মূল কর্মসূচী থেকে নিযুক্ত একজন কর্মকর্তা পরীক্ষা করে দেখেন কারো মাঝে গুটিবসন্তের লক্ষণ পাওয়া যায় কিনা। রহিমার সুস্থতা নিশ্চিত হবার পরই কেবল তাকে পরিবারের সবার সাথে মিশতে দেয়া হয়।
পরবর্তীতে সোমালিয়ায় একজনকে খুঁজে পাওয়া যায়, যাকে প্রাথমিকভাবে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ভাবা হয়। বেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গুটিবসন্ত নির্মূল কর্মসূচীর একজন কর্মী নিশ্চিত করেন যে, মানুষটি গুটিবসন্তে আক্রান্ত। পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় চিকিৎসার মাধ্যমে তাকেও সুস্থ করে তোলা হয়।

সংক্ষেপে দেখুনডঃ এডওয়ার্ড জেনার; Image Source: The School Run
ডঃ জেনার সাহেব আবিষ্কৃত প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনুসরণ করে করে গুটিবসন্ত রোগকে পৃথিবী থেকে বিতাড়িত করতে প্রায় ২০০ বছরের মতো সময় লেগে যায়। এই গুটিবসন্তের টিকা ছিলো প্রথম আবিষ্কৃত টিকা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অবদানে টিকাদানের ফলে এই গুটিবসন্তই বর্তমানে প্রথম ও একমাত্র নির্মূলকৃত রোগ।
প্রতি ১০০ বছরেই কেন বিশ্বব্যাপী মহামারি দেখা দেয়?
১৭২০ সালের প্লেগ, ১৮২০ সালের কলেরা, ১৯২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লু, ২০২০ সালের করোনাভাইরাস ...এগুলো কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে? ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে যেখানেই মানুষের আনাগোনা কমেছে, পরিবেশ দূষণও কমতে শুরু করেছে। প্রকৃতি কি তাহলে তার ওপর আরোপিত অযাচিত দূষণ কমাতে নিজের পথ তৈরি করে নবিস্তারিত পড়ুন
১৭২০ সালের প্লেগ, ১৮২০ সালের কলেরা, ১৯২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লু, ২০২০ সালের করোনাভাইরাস… এভাবে প্রতি ১০০ বছরেই কেন বিশ্বব্যাপী মহামারি দেখা দেয়?
ফ্রান্সভিত্তিক ওয়েবপোর্টাল মেজুওল ডট কম একটা ইন্টারেস্টিং আর্টিকেল প্রকাশ করেছে সম্প্রতি। সেখানে তারা বলছে, প্রতি ১০০ বছরে একটা করে বৈশ্বিক মহামারি ছড়িয়ে পড়ছে। অন্তত গত ৪০০ বছরের ইতিহাস সে সাক্ষী দেয়। আসুন সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক সে ইতিহাস, তারপর না হয় প্রাসঙ্গিক আলাপে যাওয়া যাবে।
১৭২০ খ্রিষ্টাব্দ
বৃহৎ আকারে বৈশ্বিক বিবনিক প্লেগ দেখা গিয়েছিলো ১৭২০ সালে। এটাকে ‘দ্য গ্রেট প্লেগ অফ মার্সেইল’ বলা হয়। রেকর্ড অনুযায়ী এ ব্যাকটেরিয়াজনিত এ প্লেগে ১ লাখের বেশী মানুষ মারা গিয়েছিলো। ধারণা করা হয়ে থাকে, এ প্লেগের ব্যাকটেরিয়া মাছির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছিলো।
১৮২০ খ্রিষ্টাব্দ
বিশ্বের সর্বপ্রথম কলেরা মহামারি দেখা দেয় ১৮২০ সালে। এশিয়ার থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া হয়ে বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়েছিলো এ কলেরা। শুধুমাত্র এশিয়াতেই এক লাখের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো। উক্ত ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত পানি পান করেই এ কলেরা ছড়িয়েছিলো।
১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ
ঠিক ১০০ বছর আগে ১৯২০ সালে ঘটে যাওয়া এ মহামারি- পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে ভয়ঙ্কর মহামারি ছিলো। ৫০ কোটি আক্রান্তের মধ্যে ১০ কোটি মারা গিয়েছিলো এ স্প্যানিশ ফ্লুতে। এইচ১এন১ স্ট্রেইনের এই ইনফ্রুয়েঞ্জা জেনেটিক মিউটেশনের মাধ্যমে এ মহামারি ঘটিয়েছিলো। ঠিক এ ঘরানার বাকী স্ট্রেইনের ফ্লুর প্রাদুর্ভাব চীনেও দেখা গিয়েছে সাম্প্রতিককালে করোনাভাইরাস চলাকালে।
২০২০ খ্রিষ্টাব্দ
গত ৪০০ বছরের ইতিহাসে প্রতি শতকে মহামারির প্রাদুর্ভাবের কী শুধুই কাকতালীয়? সম্প্রতি চীনের উহান থেকে বিশ্বজুড়ে ছড়ানো করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ২ লাখেরও বেশি মানুষ। মৃত্যুবরণ করেছেন ৮ হাজারেরও বেশী। না জানি এই লাশের মিছিল কোথায় গিয়ে থামবে।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বিশ্বম্যাপ
গলছে বরফ- উন্মুক্ত হচ্ছে ভাইরাস
অ্যান্টার্কটিকার গ্লেসিয়ারগুলোকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর ‘প্রাকৃতিক ফ্রিজার’, যেখানে কয়েক হাজার বছরের পুরোনো মৃতদেহগুলো অনেকটা অক্ষত অবস্থায় বরফের নিচে চাপা রয়েছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে গ্লেসিয়ারগুলো গলতে শুরু করায় উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে সেই মৃতদেহগুলো। জমাটবদ্ধ বরফে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াগুলো এত বছর যাবত সুপ্ত অবস্থায় থাকলেও বরফ গলার সাথে সাথে সেগুলো পুনরায় জীবন্ত হতে শুরু করেছে।
বিজ্ঞানীরা এই অণুজীবগুলোর নাম দিয়েছেন ‘টাইম ট্রাভেলিং ভাইরাস’, ২০১৫ সালে তিব্বতের গলিত গ্লেসিয়ারের ওপর গবেষণা চালান সালে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের একটি দল। ১৫৪ ফুট গভীর গর্ত করে তারা ১৫ হাজার বছরের পুরোনো নমুনা সংগ্রহ করেন। ল্যাব পরীক্ষার পর সেই নমুনা থেকে ৩৩ ধরণের ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যার মধ্যে ২৮টি ভাইরাস বিজ্ঞানীদের কাছে একদমই নতুন। ২০১৬ সালে সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলে ১২ বছরের এক বালকের মৃত্যু ঘটে এবং একইসাথে আরও কিছু মানুষ অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন, যারা মূলত ‘বরফে জমাটবদ্ধ থাকা অ্যানথ্রাক্স ভাইরাস’ এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। বিবিসির রিপোর্টে তথ্যগুলোর সত্যতা মিলেছে।
কালের বিবর্তনে উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে গলতে থাকবে অ্যান্টার্কটিকার আরও অনেক গ্লেশিয়ার এবং সমুদ্রের পানিতে মিশতে থাকবে নাম না জানা আরও কিছু ভাইরাস, যেখানে এক ‘করোনাভাইরাস’ নিয়ন্ত্রণেই বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সর্বশক্তি ব্যর্থ হচ্ছে।
করোনায় আক্রান্ত হবার আগে ও পরের- পৃথিবীর পরিবেশ দূষণের স্যাটেলাইট থার্মাল ইমেজ
করোনায় আক্রান্ত হবার আগে ও পরের- পৃথিবীর পরিবেশ দূষণের স্যাটেলাইট থার্মাল ইমেজ গুগল করে চেক করে দেখুন প্লিজ। দেখলে মনে হবে, পৃথিবী নিজেই নিজেকে শান্ত করার মরণপণ চেষ্টা করছে। নিজেকে শান্ত করার এই চেষ্টায় একদিন হয়তো পৃথিবী নিজেকেই ধ্বংস করে ফেলবে। কী মনে হয়, কিছুদিন পর পর প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো কি অযথাই হয়? শুধু গজব বলে চালিয়ে দিলে হবে? সেই গজবের কারণ খুঁজে বের করতে হবে না?
প্রাসঙ্গিকভাবে আবারো ঐ একই প্রশ্ন এসে যায়, এগুলো কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে? আরেকটা বিষয় তুলে ধরি তাহলে। গত কিছুদিন ধরে করোনার মহামারিতে ইতালি লকডাউন করে দেয়া হয়েছে। এই লকডাউনের ফলাফল কি জানেন? ভেনিসের নালার পানিগুলো পরিস্কার হতে শুরু করেছে। সেখানে মাছের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। হাঁস সাঁতার কাটছে। কোস্টাল এরিয়াগুলোতে ডলফিনের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে যেখানে মানুষের আনাগোনা কমেছে, পরিবেশ দূষণও কমতে শুরু করেছে। প্রকৃতি কি তাহলে তার ওপর আরোপিত অযাচিত দূষণ কমাতে নিজের পথ তৈরি করে নিয়েছে?
অ্যানিমেইটেড ফিল্ম কুংফু পান্ডায় মাস্টার উগুয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। ‘দেয়ার আর নো অ্যাক্সিডেন্টস্। ওয়ান অফেন মিটস্ হিজ ডেস্টিনি অন দ্য রোড হি টেকস্ টু অ্যাভোয়েড ইট।’
কীটপতঙ্গদের কেনো ধন্যবাদ জানাবেন?
সাধারণ মানুষের কাছে কীটপতঙ্গ কোনো পছন্দনীয় প্রাণী নয়। মানুষমাত্রই কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় এসব থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করে। এই অপছন্দের কারণ কিন্তু খুব বেশি অযৌক্তিক নয়। ফসলে বা উপকারী উদ্ভিদের উপর পোকামাকড় আক্রমণ করে সেগুলোকে নষ্ট করে ফেলে, যে কারণে অনেক সময় মানবজাতির খাদ্যাভাব দেখা দেয়। এসব পোকামাকড়কে ববিস্তারিত পড়ুন
সাধারণ মানুষের কাছে কীটপতঙ্গ কোনো পছন্দনীয় প্রাণী নয়। মানুষমাত্রই কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় এসব থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করে। এই অপছন্দের কারণ কিন্তু খুব বেশি অযৌক্তিক নয়। ফসলে বা উপকারী উদ্ভিদের উপর পোকামাকড় আক্রমণ করে সেগুলোকে নষ্ট করে ফেলে, যে কারণে অনেক সময় মানবজাতির খাদ্যাভাব দেখা দেয়। এসব পোকামাকড়কে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় পেস্ট (Pest)। আবার অনেক পোকামাকড় মানুষের ভিতর নিজেদের রোগজীবাণু ছড়িয়ে দেয়, যা অনেক সময় তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এছাড়া কামড় দেয়া, শরীরের উপর বসে জীবাণু ছড়ানো ইত্যাদি বিভিন্ন কারণ তো আছেই। তাই নিজে থেকে কোনো সাধারণ মানুষ পোকামাকড়কে পছন্দ করবে সেটা ভাবা বোকামি। অথচ এই পোকামাকড় না থাকলে প্রকৃতিতে ভারসাম্য কিন্তু বজায় থাকতো না!

পোকামাকড় না থাকলে হয়তো পৃথিবীতে প্রাণীরা টিকে থাকতে পারতো না; Image Source: AnimalSake
প্রকৃতির এক অনবদ্য দান হচ্ছে এই কীটপতঙ্গ। প্রকৃতির সৃষ্ট কোনো কিছুই অকারণে সৃষ্টি হয় না। তার পেছনে ভারসাম্যতা বজায় রাখার একটা ব্যাপার কাজ করে। প্রকৃতিতে প্রাণীকুলের মধ্যে মানুষ আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে, কিন্তু মানুষের সাথে সাথে আরও যে যে প্রাণীকুল দেখতে পাওয়া যায় সেগুলোকে কি এমনি এমনি সৃষ্টি করা হয়েছে? এই প্রাণীদের কাজ কি শুধু মানুষের ক্ষতি করে বেড়ানো?
প্রত্যেকটি জীবের ভালো এবং খারাপ- দুটি দিকই আছে। তাই শুধু মাত্র ক্ষতি করার জন্যই যে পোকামাকড়ের সৃষ্টি হয়েছে সেটা ভেবে নেয়াটা ভুল। অথচ মানবজাতি তথা পুরো বিশ্বকে টিকিয়ে রাখতে এবং প্রকৃতিতে টিকে থাকতে এই কীটপতঙ্গের অবদান অপরিসীম। কম-বেশি আমরা সবাই প্রকৃতিতে কীটপতঙ্গের অবদান সম্পর্কে জানি। কিন্তু এই ব্যাপারটা আমরা কতটুকু অনুভব করেছি সেটা ভেবে দেখার বিষয়। আমরা যদি সত্যিই ব্যাপারটি অনুভব করতে পারি তাহলে আমরা পোকামাকড়দের ধন্যবাদ দিতে কখনোই পিছপা হবো না।
পরাগায়ন প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়াকলাপ। পরাগায়নের মাধ্যমে একই উদ্ভিদ তাদের ফুলের রেণুর মাধ্যমে আরও একটি জায়গায় একই প্রজাতির উদ্ভিদ উৎপন্ন করতে পারে। উদ্ভিদগুলোর প্রজাতি একই রকম হয়ে থাকে। এই পরাগায়নটা হয় কীটপতঙ্গের মাধ্যমে। যখন কীটপতঙ্গগুলো কোনো প্রজাতির উদ্ভিদ ফুলের উপর বসে তখন সেটার রেণু সেই পতঙ্গের গায়ে লেগে যায় এবং এই পতঙ্গ যখন একই প্রজাতির আরেকটি উদ্ভিদের উপর বসে তখন সেখানে পতঙ্গ থেকে সেই রেণু লেগে যায় এবং পরাগায়ন শুরু হয়। এই পরাগায়ন উদ্ভিদজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দান। বিভিন্ন ধরনের Monarch Butterfly, যেমন- মৌমাছি এবং এরকম আরও কীটপতঙ্গ এই পরাগায়নে সাহায্য করে।

প্রকৃতির এক অনবদ্য দান হচ্ছে এই কীটপতঙ্গ; Image Source: Canadian Geographic
মাদাগাস্কার দ্বীপে একধরনের অর্কিড পাওয়া যায়। এই অর্কিডের পরাগায়ন সম্ভব একধরনের মথের সাহায্যে। এই বিশেষ ধরনের মথ ছাড়া কোনোভাবেই এই অর্কিডের পরাগায়ন সম্ভব নয়। মথ নিজেও একধরনের পোকা। চার্লস ডারউইন প্রথম এই বিশেষ ধরনের অর্কিডের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে পারেন।
আবার এমন কিছু কিছু পোকা আছে যেগুলো অন্য পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে, যেমন- Plant Mantis। এই প্রজাতির পোকা বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে এবং বংশবৃদ্ধি করে। এই ক্ষতিকর পোকামাকড়গুলো আবার আমাদের ফসলের ক্ষতি করে। তাই প্রকৃতি নিজে থেকেই এই Plant Mantis সৃষ্টি করেছে যেটা Pest Control Service হিসেবে কাজ করে এবং যে নিজেই ক্ষতিকর প্রাণীগুলোকে শেষ করে দিচ্ছে, আর তাতে আমাদের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। এই Plant Mantis এর মধ্যে একধরনের জাত আছে যাকে বলে শিকারি ম্যানটিস (Praying Mantis)। এই জাতটি পেস্ট জাতীয় পোকামাকড়গুলোকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, যে কারণে এসব ক্ষতিকর পোকামাকড়ের সংখ্যা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

পরাগায়ন উদ্ভিদজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দান; Image Source: Living in the environment/ John Henry Williams-Bruce Coleman USA
কিছু কিছু পোকামাকড় আবার জৈব যৌগ ভেঙে ফেলতে পারে। যারা জাদুঘরে কাজ করে তারা পোকামাকড়ের এই গুণটি তাদের নিজেদের কাজে ব্যবহার করে। জাদুঘরে পুরনো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের কঙ্কাল দেখতে পাওয়া যায়। এই কঙ্কালগুলোকে পরিষ্কার করার জন্য তারা একটি বিশেষ ধরনের গুবরেপোকা ব্যবহার করে যেটা পশম জাতীয় জিনিসে জন্মায় এবং সেখানেই নিজস্ব কলোনি তৈরি করে। এই পোকাগুলো জৈব যৌগ, পশম, গালিচা ইত্যাদি খেয়ে ফেলতে পারে।
আবার কিছু কিছু পোকামাকড় আছে যারা মাটির নিচে থাকে এবং মাটিকে উর্বর রাখতে এবং নরম রাখতে সহায়তা করে। এই উর্বরতা বৃদ্ধির কারণে গাছপালা সহজে জন্মাতে পারে, যা প্রকৃতির টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন।

৪০০ মিলিয়ন বছর আগে এই পৃথিবীতে পোকামাকড়ের জন্ম হয়; Image Source: Geographical magazine
৪০০ মিলিয়ন বছর আগে এই পৃথিবীতে পোকামাকড়ের জন্ম হয়। অর্থাৎ মানুষের বর্তমান যে অবস্থা তার থেকে প্রায় ২,০০০ গুণ বেশি বছর আগে থেকে কীটপতঙ্গ-পোকামাকড়দের আনাগোনা পৃথিবীতে শুরু হয়। মানুষের থেকে বুদ্ধি এবং প্রজাতিগত উন্নতিতে পিছিয়ে থাকলেও কীটপতঙ্গ যুগ যুগ ধরে নিজেদেরকে প্রকৃতিতে খুব সফলতার সাথে টিকিয়ে রাখছে। তারা খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে। আশেপাশের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলার জন্য নিজেদের ভিতর নতুন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তৈরি করে নিতে পারে।
কিছু কিছু পোকামাকড় প্রকৃতিতে সফলভাবে টিকে থাকার জন্য নিজেদের প্রজাতি পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। প্রকৃতিতে এরকম বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এরকম বৈশিষ্ট্য খুব বেশি প্রাণীর মধ্যে দেখা যায় না। প্রাণীবিদরা এই বৈশিষ্ট্য প্রকৃতিতে সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন। বিখ্যাত বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইলসন, যিনি একাধারে একজন পিঁপড়া বিশেষজ্ঞ এবং জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ, বলেন যে, যদি পৃথিবীর সব ধরনের পোকামাকড়-কীটপতঙ্গ নিঃশেষ হয়ে যায় তাহলে এই পুরো পৃথিবীর প্রাণীকূল ধ্বংসের মুখে পতিত হবে। পৃথিবীতে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব না-ও থাকতে পারে এবং এতে অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীদেরও টিকে থাকতে সমস্যা হবে।

সংক্ষেপে দেখুনPlant Mantis – এই প্রজাতির পোকা বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে; Image Source: Living in the environment/ Peter J. Bryant_Biological Photo Service
বিজ্ঞানীরা কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় ইত্যাদি সংরক্ষণ করার জন্য অনেক ধরনের গবেষণা করছেন। বিখ্যাত একটি জার্নাল আছে, নাম Journal of Insect Conservation। এই জার্নালটিতে প্রতিবছর প্রকৃতি বিশেষজ্ঞরা পরিবেশে পোকামাকড়ের অবদান নিয়ে তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করে থাকেন। এগুলোর মধ্যে কিছু গবেষণাপত্র সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক এবং কিছু ব্যবহারিক। খুবই হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নাল এটি। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদেরকে নিয়েই মূলত লিখতে হয় এই জার্নালটিতে। পোকামাকড়ের শ্রেণীকরণ, তাদের অভ্যাস এবং ব্যবহার, বংশপরম্পরা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে এই জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়ে থাকে।
চোখের রং নীল হয় কেন?
মাঝে মাঝে চোখের রং আলাদা হওয়ার কারণে কেউ অনেক প্রশংসিত হয়, যেমন হয় ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের ছবিগুলো। আবার মাঝে মধ্যে চোখের রংয়ের কারণে কেউ কেউ দুঃখজনক মন্তব্য শুনে থাকে। এই যেমন আমার দেখা এক মেয়ের চোখের রং একটু আলাদা, এ কারণে তাকে রেফারেন্স দিতে গেলে অন্যরা বলে 'আরেহ আছে না ওই যে বিড়বিস্তারিত পড়ুন
মাঝে মাঝে চোখের রং আলাদা হওয়ার কারণে কেউ অনেক প্রশংসিত হয়, যেমন হয় ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের ছবিগুলো। আবার মাঝে মধ্যে চোখের রংয়ের কারণে কেউ কেউ দুঃখজনক মন্তব্য শুনে থাকে। এই যেমন আমার দেখা এক মেয়ের চোখের রং একটু আলাদা, এ কারণে তাকে রেফারেন্স দিতে গেলে অন্যরা বলে ‘আরেহ আছে না ওই যে বিড়ালের চোখের মতো চোখওয়ালী…’। মানুষের জাজমেন্ট করার ধরন আর মন্তব্যের রকমসকম যে কত রংয়ের হয়!
যাইহোক, চোখের রংয়ের এই পার্থক্য কি একেবারেই প্রাকৃতিক, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে? প্রশ্নটার উত্তর হয়ত আমরা অনেকেই জানি না, তাই কারো চোখের রংয়ের ভিন্নতায় আমরা অদ্ভুত মন্তব্য করে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করি।
রং-বেরং
প্রশ্ন হলো অধিকাংশ মানুষের চোখের রং কালো কেন? কারণ, আমাদের চোখে আছে ‘পিগমেন্টেড সেল’। পিগমেন্ট চোখে প্রবেশ করা আলো শুষে নেয়। ফলে চোখের রং কালো দেখায়। একটু ভেঙ্গে বলা যাক।
আপনার চোখের রংয়ের অংশটুকুকে বলা হয় আইরিস। এই আইরিসের গঠন দুই লেয়ারের, পেছনের লেয়ার হলো এপিথেলিয়াম এবং সামনের লেয়ারটি স্ট্রোমা। এপিথেলিয়ামে কালো, বাদামি পিগমেন্ট থাকে। আর স্ট্রোমা রংহীন ফাইবার দ্বারা গঠিত হয়ে থাকে। কখনো কখনো স্ট্রোমাতে মেলানিন নামক ডার্ক পিগমেন্ট থাকতে পারে, অথবা অনেক বেশি কোলাজেন ডিপোজিট থাকতে পারে। মূলত এই দুটি ফ্যাক্টরই চোখের রং কেমন হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে।
কালো, বাদামী, নীল- বিভিন্ন রংয়ের চোখ হয়
যেমন ধরুন, কারো চোখের রং বাদামি। সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে, তার স্ট্রোমায় উচ্চস্তরের মেলানিন বিদ্যমান, যা চোখে প্রবেশ করা আলোকে কৃষ্ণাভ রকমের রং দেয়। আবার ধরুন, কারো চোখের রং সবুজ। সেক্ষেত্রে আপনাকে বুঝতে হবে, সে ব্যক্তির চোখে মেলানিন একেবারে কম এবং কোলাজেন ডিপোজিটও নেই। ফলে, চোখ হয় সবুজ। তবে সবুজ রংয়ের চোখ অনেক বিরল।
নীল চোখ
সবচেয়ে ইন্টেরেস্টিং হলো নীল চোখ। যাদের নীল চোখ, তাদের স্ট্রোমাতে কোনো রং নেই। তাদের কোনো পিগমেন্টও নেই। ফলে পিগমেন্ট দ্বারা বিভিন্ন রংয়ের আলো চোখ শুষে নিতে পারে না। নীল চোখ যাদের তাদের কোলাজেন ডিপোজিটও নেই একেবারেই। এরফলে চোখের ভেতর যখন নানা রংয়ের আলো প্রবেশ করে বিক্ষিপ্তভাবে তারা চোখের পেছনের অংশে টিন্ড্যাল ইফেক্ট তৈরি হয়। এই টিন্ড্যাল ইফেক্ট নীল রং তৈরি করে।
অ্যালবিনিজম কী?
অ্যালবিনিজম বা লিউসিজমকে বলা হয় জন্মগত রোগ। এই রোগে আক্রান্তদের চুল, চোখ, ত্বক বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। আগেই বলেছি, আমাদের পিগমেন্ট সেলের কারণে আমরা স্বাভাবিক রংয়ের ত্বক, চোখ, দেহ পাই। এই পিগমেন্টের অভাবে হয় অ্যালবিনিজম। ফলে, এই রোগে আক্রান্ত মানুষরা কিছুটা ইউনিক রংয়ের চোখ বা ত্বকের অধিকারী হন।
টিন্ডাল ইফেক্টের কারণেই চোখের রং নীল হয়
অকুলার অ্যালবিনিজম
অ্যালবিনিজম দুই প্রকার, এর মধ্যে যে অ্যালবিনিজমের কারণে চোখের রং বদলে যায়, সেটাই অকুলার অ্যালবিনিজম। অকুলার অ্যালবিনিজমে মানুষের চোখের মণির রঙ সবুজ থেকে নীল এমনকি বাদামী রঙ ধারণ করতে পারে। এক্ষেত্রে খুব অল্প পরিমান পিগমেন্ট চোখে থাকে বলে আলো সরাসরি আইরিসে প্রতিফলিত হয়। যা তৈরি করে টিন্ড্যাল ইফেক্ট। বদলে যায় রং। বিজ্ঞান বলে, অকুলার অ্যালবিনিজম বংশানুক্রমে বিস্তার লাভ করে থাকে৷ পিতামাতার দুইজনই যদি অ্যালবিনিজম রোগের বাহক হয়ে থাকেন, তাহলে সন্তানেরও অ্যালবিনিজম হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
একটুখানি ইতিহাস
অকুলার অ্যালবিনিজম ছাড়াও চোখের রং নীল হতে পারে। কীভাবে? জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ধারার কারণে। আপনি যদি ইউরোপের মানুষদের দিকে তাকান, দেখবেন প্রচুর ভিন্নরংয়ের চোখসমৃদ্ধ মানুষ ঘুরছে চারদিকে। তারা কি সবাই রোগী? অবশ্যই না। এটা হয়েছে বংশানুক্রমিকভাবে। বিবর্তনের এক পর্যায়ে জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে যার সূত্রপাত, সেই ধারা অব্যাহত হচ্ছে অনেক সময় ধরে।
কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলে, চোখের রংয়ের এই বদলের উৎস খুঁজতে হলে ফিরতে হবে ১০ হাজার বছর আগে! বিজ্ঞানীরা বলছেন, আনুমানিক ৬ থেকে ১০ হাজার বছর পূর্বে জেনেটিক এক পরিবর্তন ঘটে এক জাতির মধ্যে। এই পরিবর্তন মেলানিন ও পিগমেন্টের উপরে হয় যা আমাদের ত্বক, চুল, চোখের রং নির্ধারণ করে। ক্রমোজমে থাকা OCA2 নামক একটি জিন বিবর্তনের কারণে চোখের রং নীল হতে শুরু করে। তার আগে পৃথিবীতে ছিল না কোনো নীল রংয়ের চোখ।
একটা ইন্টেরেস্টিং তথ্য গবেষণায় দাবি করা হয়। সেটা দিয়েই লেখাটি শেষ করি। গবেষণায় বলা হয়, যাদের চোখের রং নীল তাদের চোখের ডিএনএ প্রায় অনুরুপ, একই। অর্থাৎ, এই নীল চোখের মানুষগুলো সরাসরি সম্পর্কযুক্ত না হয়েও চোখের রংয়ের কারণে অলিখিত এক সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন নিজেদের অগোচরেই!
সংক্ষেপে দেখুনপৃথিবীর সব বরফ যদি গলে যায় তাহলে কী ঘটবে?
প্রকৃতির প্রতিশোধে যদি পৃথিবীর সব বরফ একসাথে গলে যায় তাহলেও কি আমরা পরিবেশ দূষণ বন্ধ করব? সে প্রশ্নের উত্তর অদৃষ্টের উপরেই ছেড়ে দেই। তবে আশা করছি আমাদের সাথে এমন কিছু হবে না, কিন্তু যদি হয়ে যায় তাহলে কি আপনি পুরো শহর সহ পানিতে ডুবে যাবেন? আসুন জেনে নেই পরিবেশ দূষণের প্রভাবে পৃথিবীর সমস্ত বরফ গলে গেলবিস্তারিত পড়ুন
প্রকৃতির প্রতিশোধে যদি পৃথিবীর সব বরফ একসাথে গলে যায় তাহলেও কি আমরা পরিবেশ দূষণ বন্ধ করব? সে প্রশ্নের উত্তর অদৃষ্টের উপরেই ছেড়ে দেই। তবে আশা করছি আমাদের সাথে এমন কিছু হবে না, কিন্তু যদি হয়ে যায় তাহলে কি আপনি পুরো শহর সহ পানিতে ডুবে যাবেন?
আসুন জেনে নেই পরিবেশ দূষণের প্রভাবে পৃথিবীর সমস্ত বরফ গলে গেলে আমাদের সাথে ঠিক কী হতে যাচ্ছে?
বেড়ে যাবে পানির উচ্চতা
আমাদের পৃথিবীর বেশ বড় একটা অংশ বরফে ঢাকা। রাতারাতি যদি সব বরফ গলে যায় তাহলে সমুদ্রের পানি প্রায় ২৫০ ফুট উপরে উঠে যাবে। আর এটুকুই যথেষ্ট আমাদের দেশের বড় বড় সব ব্রিজগুলো পুরোপুরি পানিতে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য। এরই সাথে সাথে ভারত এবং বাংলাদেশের অনেক বড় বড় শহর মুম্বাই, গোয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট এগুলোর সাথে আরো সাত মহাদেশের অনেকগুলো শহর পুরোপুরি পানিতে ডুবে যাবে। আর তখন না থাকবে মায়ামি শহর আর না থাকবে লন্ডন! এমনকি অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ জায়গা পানিতে ডুবে যাবে। এছাড়া আচমকা চলে আসা এই জলস্রোতে ভেনিস এবং নেদারল্যান্ড পৃথিবীর মানচিত্র থেকেই একদম ডুবে যাবে।
আফ্রিকা হয়ে যাবে জনমানবশূন্য
আফ্রিকাকে অন্যান্য দেশের মতো অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে না। আদতে যেটা বলতে চাচ্ছি সেটা হলো, আফ্রিকার অবস্থা তার থেকেও খারাপ অবস্থা হবে। হুট করেই সব বরফ গলে গেছে! তার মানে হলো পানির সাথে সাথে গরমও অনেক বেড়ে গেছে। আর এই অতিরিক্ত তাপমাত্রার সবচেয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে আফ্রিকার উপর। অস্বাভাবিক রকম গরম থাকার কারণে আফ্রিকা মহাদেশের অনেকগুলো অংশ একদম জনমানবশূন্য, এমনকি প্রাণীশূন্যও হয়ে যাবে। অত্যধিক গরমের কারণে সেখানে অনেক প্রাণীই বেঁচে থাকতে পারবে না।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ
অবশ্য এমন অনেক জায়গা থেকে যাবে পৃথিবীতে যেগুলো পুরোপুরি পানিতে ডুবে যাবে না তবে সেই জায়গাগুলোকে অনেক ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হবে। আপনার কি মনে হয়? এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কি মানব সভ্যতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে? না, ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। তবে এই দুর্যোগ থেকে যারা বেঁচে থাকবে তাদেরকে অনেক ধরনের প্রতিকূলতার সামনাসামনি করতে হবে। সব বরফ গলে যাওয়ার পর বাতাসে কার্বনডাইঅক্সাইড বেড়ে যাবে আর এর ফলাফলস্বরূপ বেঁচে থাকা মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীদের নিঃশ্বাস নিতে অনেক সমস্যায় ভুগতে হবে।
অনেক সামুদ্রিক প্রাণী বিলুপ্ত হতে থাকবে ধীরে ধীরে
এদিকে সমুদ্রের স্রোত তার গতিপথ বদলে ফেলবে, যার প্রভাব সামুদ্রিক প্রাণীদের উপরেও যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান থাকবে। এই আচমকা পরিবর্তনের মধ্যে তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে না, এরই মধ্যে অনেক প্রাণী এই পরিবর্তনের কারণে মারা পর্যন্ত যাবে। ফলাফল স্বরূপ অনেক সামুদ্রিক পানি এবং পোলার এনিমেল অর্থাৎ বরফে বাস করা প্রাণীরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর যারা বেঁচে থাকবে তাদের নিজেদের ঠিকানা এবং অভ্যাস বদলাতে হবে অবশ্যই।
ফুড চেনের উপর সরাসরি প্রভাব!
আর প্রকৃতির এই হাজারো পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি আমাদের ফুড সাপ্লাই চেনের উপরে এসে পড়বে। না আমরা নিজেদের জন্য শস্য উৎপাদন করতে পারব আর না অন্য প্রাণীদেরকে নিজেদের খাবারে রূপান্তর করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে প্রাণী খুঁজে পাব। কেননা পুরো প্রকৃতিই বরফ গলার সাথে সাথে অন্য রকম রূপ ধারণ করবে। মরুভূমিতে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হতে থাকবে আর যে সব জায়গায় আগে বৃষ্টি হতো সেখানে বৃষ্টি হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। যার কারণে আমাদের কৃষি কাজ আচমকা বাঁধার সম্মুখীন হবে এবং যার কারণে পুরো বিশ্বে খাদ্যের অভাব পড়ে যাবে।
সুনামির সংখ্যা বেড়ে যাবে
এদিকে বাতাসের গতি প্রকৃতিও পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে যাবে, সমুদ্রে বরফ না থাকার কারণে সূর্যের কিরণ প্রতিফলিত হবে না, যার ফলে সমুদ্রের পানি অনেক গরমের কারণে মেঘ হয়ে আকাশে থাকবে আর সব মেঘ পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে একত্র হয়ে সেখানে ভারী বর্ষণের সৃষ্টি করবে। আর এই ভারী বর্ষণ পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে নিয়ে আসবে অতিরিক্ত বন্যা। আবার এদিকে সমুদ্রের উপর একের পর এক তুফান এবং সাইক্লোনের সৃষ্টি হতে থাকবে, যার ফলে নিচু এলাকাগুলোকেও প্রচুর পরিমাণ বন্যার শিকার হতে হবে। এই ধরনের এলাকাগুলোতে ছোটখাটো একটা ভূমিকম্প অনেক বড় ধরনের সুনামি তৈরি করবে, আর সেই সুনামি আশেপাশের সব এলাকাকে পুরোপুরি নাস্তানাবুদ করে দিবে।
যেই দুনিয়াকে আজ আমরা দেখছি, সেটা ধ্বংসের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। অন্যান্য প্রাণীদের কথা বলা মুশকিল তবে মানব জাতি এভাবে ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে আশার কথা হলো, সবগুলো বরফ এক রাতের মধ্যেই গলে যাচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, খুব দ্রুততার সাথেই সব বরফ গলা শুরু করেছে। এমনকি আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফ এলাকা যেটা পুরো পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করছে, সেটাও গলা শুরু করেছে।
আর ঠিক এই কারণেই আমাদের এখনই থামতে হবে, আমরা যদি এখনই পরিবেশ দূষণ না থামিয়ে দেই তাহলে এই ধ্বংস কোনো ভাবেই থামানো যাবে না। আগামী পাঁচ হাজার বছরের মধ্যেই পৃথিবীর সবগুলো বরফ গলে যাবে। এমনিতে তো পাঁচ হাজার বছর অনেক বড় একটা সময়, তার আগেই কে জানে আমাদের পৃথিবীর উপর যদি কোনো উল্কাপিণ্ডের আঘাত আসে অথবা সমুদ্রের পানি পুরোপুরি শুকিয়ে যায়। কোনো কিছুই পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে না।
সংক্ষেপে দেখুনযুগে যুগে ব্যাটারি দেখতে কেমন ছিলো ?
আজকের যুগে মোবাইলের ভেতর সুদৃশ্যভাবে ব্যাটারি বসানো থাকে। সেসব ব্যাটারির ক্ষমতাও থাকে বেশ। চার্জারের মাথা মোবাইলে লাগিয়ে নিমিষেই চার্জ করে ফেলা যায় সেগুলো। সবার কাছেই এটা ভাত খাওয়া কিংবা জল খাওয়ার মতোই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন ব্যাটারি মোটেই স্বাভাবিক কিছু ছিল না। সামান্য একটু চার্বিস্তারিত পড়ুন
আজকের যুগে মোবাইলের ভেতর সুদৃশ্যভাবে ব্যাটারি বসানো থাকে। সেসব ব্যাটারির ক্ষমতাও থাকে বেশ। চার্জারের মাথা মোবাইলে লাগিয়ে নিমিষেই চার্জ করে ফেলা যায় সেগুলো। সবার কাছেই এটা ভাত খাওয়া কিংবা জল খাওয়ার মতোই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন ব্যাটারি মোটেই স্বাভাবিক কিছু ছিল না। সামান্য একটু চার্জের প্রভাব দেখে তাজ্জব বনে যেত বিজ্ঞানীরা। দিনের পর দিন কৌতূহল নিয়ে এর পেছনে পড়ে থাকত তারা। ব্যাটারি থেকে বের হওয়া বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ দেখার জন্য টিকিট কেটে অডিটরিয়ামে আসত সাধারণ মানুষেরা। আজকের যুগে ব্যাটারি যে অবস্থানে এসেছে তা একদিনে হয়নি। অল্প অল্প করে ধীরে ধীরে উন্নত হতে হতে এই অবস্থানে এসেছে। তারই কিছু টুকরো ইতিহাস নিয়ে এখানের আলোচনা।
১৭৮৬: লুইগি গ্যালভানি
গ্যালভানির ব্যাটারি আবিষ্কারের ব্যাপারটা বেশ মজার। তিনি জানতেনই না যে তিনি ব্যাটারি আবিষ্কার করেছেন। গ্যালভানি পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক। বিভিন্ন প্রাণী কাটাছেরা করা ছিল তার রুটিন মাফিক কাজ। একদিন একটা ব্যাঙ কেটে টেবিলের উপর রেখে দিলেন। ওদিকে তার সহকর্মী একটা ধাতব ছোরা এনে ব্যাঙয়ের গায়ে লাগাতেই কেটে রাখা মৃত ব্যাঙটির পা লাফিয়ে উঠল। এই ঘটনায় গ্যালভানি বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠেন। নানা রকমের বস্তুকে ব্যাঙয়ের গায়ে ছুঁয়ে পরীক্ষা করতে থাকেন।

লুই গ্যালভানি; Image Source: AwesomeStories
তিনি ধরে নিলেন ব্যাঙয়ের ভেতর কোথাও বিদ্যুৎ শক্তি সঞ্চিত থাকে। ধাতব বস্তু ছোঁয়ানো হলে সেটি মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসে, যার কারণে ব্যাঙয়ের পা লাফিয়ে উঠে। তবে এখানে আসলে ঘটছিল অন্য ঘটনা। ব্যাঙটিকে রাখা হয়েছিল একটি ধাতব ক্ষেত্রে। তার উপর রাখা হয়েছিল আরেকটি ধাতু। এক ধাতু থেকে আরেক ধাতুর মধ্যে বিদ্যুতের আদান প্রদান হচ্ছিল। এদের মধ্যে পরিবাহী হিসেবে ছিল ব্যাঙ। ব্যাঙ মরে গেলেও তার পেশীর কোষগুলো সচল ছিল। তাদের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবাহ হতেই সেগুলো নড়াচড়া করে উঠে। এখানে মূলত তৈরি হয়েছিল একটি ব্যাটারি। লিপিবদ্ধ ইতিহাসের প্রথম ব্যাটারিটি তিনিই তৈরি করেন, অথচ এর সম্বন্ধে নিজেই জানতেন না।
ভিডিওতে দেখুন- বিশেষ পরিস্থিতিতে মৃত ব্যাঙয়ের পা নড়াচড়া করে।
১৮০০: আলেসান্দ্রো ভোল্টা
ব্যাটারি বলতে সত্যিকার অর্থে যা বোঝায় সেটি সর্বপ্রথম তৈরি করেছিলেন আলেসান্দ্রো ভোল্টা। তার তৈরি করা ব্যাটারিটি অনেকটা এরকম- কতগুলো তামার পাত ও দস্তার পাত নেয়া হল। কার্ডবোর্ড কিংবা কাপড় দিয়ে এগুলোকে পরস্পর আলাদা করে রাখা। সেগুলো ডোবানো থাকে লবণের দ্রবণে। বর্তনী সংযোগ দিলে তাদের মধ্যে বিদ্যুতের প্রবাহ শুরু হয়। তবে ব্যবহারিক কাজের জন্য এই ব্যাটারি খুব একটা উপযোগী নয়। কাজ করে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তার উপর তামার পাতে হাইড্রোজেনের বুদবুদ জমে গিয়ে পাতের পরিবাহিতা কমিয়ে দেয়। একপর্যায়ে সেটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়।

আলেসান্দ্রো ভোল্টা (১৭৪৫-১৮২৭); Image Source: Time
উল্লেখ্য লুইগি গ্যালভানির কাজ নিয়েও তিনি গবেষণা করেছিলেন। তিনি ছিলেন গ্যালভানির বন্ধু ও শিস্য। তিনি প্রথমে গ্যালভানির ধারণাকে মেনেও নিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর এই ধারণা থেকে ফিরে আসেন।
১৮২০: ড্যানিয়েল সেল
ভোল্টার তৈরি করা ব্যাটারির স্থায়িত্ব কম হওয়ায় সেটি ব্যবহারিকভাবে মানুষের তেমন কাজে আসেনি। কিন্তু প্রয়োজন ঠিকই আছে মানুষের মাঝে। সে লক্ষ্যে ইংরেজ বিজ্ঞানী জন এফ ড্যানিয়েল নতুন ধরনের একটি ব্যাটারি তৈরি করেন। এটি ভোল্টার ব্যাটারি থেকে বেশি স্থায়ী। সেখানে কপার সালফেট ও জিংক সালফেটের তড়িৎদ্বার ব্যবহার করা হয়। এর নাম দেয়া হল ড্যানিয়েল সেল। স্থায়িত্ব বেশি হওয়াতে এটি বাসাবাড়ির টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, ডোরবেল ইত্যাদিতে ব্যবহার হতে লাগল। মানুষের ব্যবহারিক কাজে লাগলেই না কেবল একটি আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের প্রকৃত মাহাত্ম্য বোঝা যায়। ড্যানিয়েল সেল পরবর্তী ১০০ বছর পর্যন্ত মানুষের মাঝে স্থান দখল করে ছিল।

ড্যানিয়েল সেলের সরল রূপ; Image Source: Wikimedia Commons
১৮৫৯: রিচার্জেবল ব্যাটারি
এই পর্যায়ের আগে যত ব্যাটারি উদ্ভাবিত হয়েছে তাদের সবগুলোই ছিল একমুখী। ব্যাটারির ভেতরে যে উপাদান আছে সেগুলো বিদ্যুৎ হিসেবে ব্যবহার হয়ে গেলে সেগুলোকে পুনরায় ব্যবহার করা যায় না। ক্যামেলি আলফোনস ফাউর নামে একজন বিজ্ঞানী এমন একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন যেখানে ব্যাটারিকে পুনরায় ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ রিচার্জ করে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়। এতে তিনি ব্যবহার করেন লেড ও এসিড। এ ধরনের ব্যাটারি পরবর্তীতে ট্রেনে ও গাড়িতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়।

লেড এসিড ব্যাটারির বর্তমান রূপ; Image Source: B&H
১৯৪৯: অ্যালকালাইন ব্যাটারি
১৯৫০ সাল পর্যন্ত জিংক-কার্বন ব্যাটারি ব্যবহৃত হতো সকল ক্ষেত্রে। কিন্তু ব্যবহারের চাহিদা ও প্রয়োজনের তুলনায় এর আয়ু ছিল অনেক কম। যা ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীদের মনে অসন্তোষ নিয়ে আসে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য এগিয়ে আসে একটি ব্যাটারি কোম্পানি। এভ্রিডে ব্যাটারি কোম্পানি এই দিকটি উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দেয় লুইস ইউরি নামে এক বিজ্ঞানীকে। তিনি এই কাজটি বেশ ভালভাবেই সম্পন্ন করেন। এর মাঝে তিনি অ্যালকালাইন ব্যবহার করলেন এবং দেখলেন এটি প্রচলিত জিংক-কার্বন ব্যাটারির চেয়ে প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকেই ভালো ফলাফল দেয়।

অ্যালকালাইন ব্যাটারির বর্তমান রূপ; Image Source: Sportsman’s Guide
১৯৫৪: সৌর কোষ
সূর্যে প্রচুর শক্তি আছে। চেষ্টা করলে সেসব শক্তি মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহার করতে পারে। তার জন্য দরকার শুধু উপযুক্ত ব্যবস্থা। সৌর কোষ এমনই একটি ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় সৌরশক্তি বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সৌর কোষে কয়েক স্তরে সজ্জিত সিলিকনের স্ট্রিপ থাকে। এই স্ট্রিপগুলো সূর্যের আলোর প্রভাবে ইলেকট্রন ও হোল তৈরির মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি করে। ব্যাটারির চমৎকার এই প্রযুক্তিটি ১৯৫৫ সালের অক্টোবরে বাজারে আসে।

একটি সৌর কোষ; Image Source: Bauratgeber-Deutschland
১৯১২: লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি
লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ইতিহাসটা বেশ পুরনো। ১৯১২ সালের দিকে গিলবার্ট নিউটন লুইস লিথিয়াম ব্যাটারি নিয়ে গবেষণা করেন। কিন্তু তখন সেটি বাণিজ্যিকভাবে লভ্য হয়নি এবং একটা সময় পর এটি চাপা পড়ে যায়। পরবর্তীতে এই প্রযুক্তির কথা নতুন করে অনুভব করে গবেষকরা। কয়েক দশক ধরে কয়েক ধাপে উন্নয়নের পর জাপানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সনি ১৯৯১ সালে রিচার্জযোগ্য লিথিয়াম ব্যাটারি বাজারে আনে। ধীরে ধীরে এই ব্যাটারি এখন মোবাইল, ক্যামেরা, ল্যাপটপ সহ গুরুত্বপূর্ণ সব প্রযুক্তি পণ্যে আধিপত্য বিস্তার করছে।

মোবাইলে ব্যবহৃত লিথিয়াম আয়নের ব্যাটারি; Image Source: Pixel Ballads
বিশেষ: বাগদাদ ব্যাটারি
বাগদাদ ব্যাটারি ঠিক ব্যাটারি কিনা সে নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। অনেক অনেক আগের নমুনা বিধায় নিশ্চিত করে বলা বেশ কঠিন। যদি ব্যাটারি হয়ে থাকে তাহলে এটিই ব্যাটারির সবচেয়ে প্রাচীন নমুনা।
১৯৩৮ সালের ইরাক। মাটি খুড়তে গিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা পেলেন গোলকধাঁধাময় এক পাত্র। পাত্রের ভেতরে একটি লোহার পাত ঢুকানো এবং চারপাশে অন্য কোনো বস্তু থাকার জন্য ফাঁকা জায়গা। অনেকটা ব্যাটারির কোষের মতো। হিসেব করে জানা গেল এটি তৈরি করা হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ সালে।

সংক্ষেপে দেখুনবাগদাদ ব্যাটারির নমুনা; Image Source: may.tistory.com
এত আগেকার মানুষ ব্যাটারির মতো কোনোকিছু তৈরি করেছিল? করলে কী কাজের জন্য করেছিল? নাকি ব্যাটারি ছাড়া, ভিন্ন কোনো কারণে এই গঠন তৈরি করেছে? এর উত্তর এখন আর সহজে বলা সম্ভব নয়। দিনে দিলে অনেক বেলা গড়িয়ে গেছে। যদি সত্যিই এটি ব্যাটারি হয় তাহলে সে কালের মানুষদের নিয়ে আমাদের ধারণা পালটে ফেলতে হবে পুরোপুরি।
মানুষ খর্বাকৃতি বা বামন হয় কেন?
‘হ্যারি পটার’ এর বামনদের কথা মনে আছে? কিংবা ‘তিন গোয়েন্দা’র রত্মদানোর কথা? শুধু গল্পে বা রূপকথাতেই নয়, বাস্তবেও হরহামেশাই দেখা মেলে খর্বাকৃতির কিছু লোকজনের। হয়তো আপনার পাশের বাসার বন্ধুটি আপনার সমবয়সী হওয়ার পরও আপনার তুলনায় যথেষ্ট খাটো। অথবা আপনার থেকে বয়সে বড় আপনার কাছের কোনো আত্মীয় এই অবস্থার শিকাবিস্তারিত পড়ুন
‘হ্যারি পটার’ এর বামনদের কথা মনে আছে? কিংবা ‘তিন গোয়েন্দা’র রত্মদানোর কথা? শুধু গল্পে বা রূপকথাতেই নয়, বাস্তবেও হরহামেশাই দেখা মেলে খর্বাকৃতির কিছু লোকজনের। হয়তো আপনার পাশের বাসার বন্ধুটি আপনার সমবয়সী হওয়ার পরও আপনার তুলনায় যথেষ্ট খাটো। অথবা আপনার থেকে বয়সে বড় আপনার কাছের কোনো আত্মীয় এই অবস্থার শিকার। রাস্তায় বেরোলে এরকম মাথা বড়, অস্বাভাবিক খাটো লোকজনদের দেখে আমরা কখনো হাসি, কখনো ব্যঙ্গ করি, কটুক্তি ছুড়ে দিই, কখনোবা অবাক চোখে তাকাই। মানুষ হিসেবে মানবিক আচরণ করতে হয়তো ভুলে যাই ক্ষণিকের জন্য।
এরকম কোনো মানুষকে চোখে পড়লে তাদের প্রতি কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার ফাঁকে কখনো কি আপনার মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, আপনার তুলনায় লক্ষ্যণীয় কম উচ্চতার এসব মানুষজনের খর্বাকৃতির হওয়ার কারণ কি? এই লেখাটিতে জানার চেষ্টা করব এই বিষয়েই।
বামনত্ব (Dwarfism) হলো একটি হরমোনঘটিত রোগ, যা মূলত দেহে বৃদ্ধি হরমোনের অভাবে হয়ে থাকে। বৃদ্ধি হরমোন হচ্ছে একটি বিশেষ ধরনের হরমোন, যা শরীরের সব ধরনের কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। এটি কোষ বিভাজনের মাত্রা বাড়িয়ে কোষকে সংখ্যায় এবং আকারে বৃদ্ধি করে। এই হরমোনের কারণেই মানুষ ছোট থেকে বড় হয়, মানুষের শরীর আকার-আয়তনে বৃদ্ধি পায়। কোনো কারণে যদি শরীরে পর্যাপ্ত বৃদ্ধি হরমোন উৎপন্ন হতে না পারে, তাহলে শরীরের বৃদ্ধি শ্লথ হয়ে আসে। এই সমস্যাটি সাধারণত শৈশবে শুরু হয় আর স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয় বয়ঃসন্ধিকালে। তবে যেকোনো বয়সেই নানা কারণে বৃদ্ধি হরমোন কমে যেতে পারে এবং একজন ব্যক্তি বৃদ্ধি হরমোনঘটিত কোনো রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
শৈশবেই বামনত্ব বোঝা যায়; Source: Gazette Live
বৃদ্ধি হরমোন আপনার মাথার পেছনে অবস্থিত পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়। মহাগুরুত্বপূর্ণ এই পিটুইটারি গ্রন্থির আছে দুটো ভাগ- অগ্র পিটুইটারি এবং পশ্চাৎ পিটুইটারি। আমাদের আলোচ্য বৃদ্ধি হরমোন অগ্র পিটুইটারি থেকে ক্ষরিত হয়। অগ্র পিটুইটারি থেকে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের ক্ষরণ ঘটে থাকে। যেমন- এড্রেনোকর্টিকোট্রপিক হরমোন (ACTH), থাইরয়েড স্টিম্যুলেটিং হরমোন (TSH), ফলিকল স্টিম্যুলেটিং হরমোন (FSH) প্রভৃতি।
শরীরের বৃদ্ধি প্রক্রিয়া শুরু হয় মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে। অন্যভাবে বললে, বৃদ্ধি হরমোন নিঃসরণের ক্ষেত্রে হাইপোথ্যালামাসের বিশেষ ভূমিকা আছে। হাইপোথ্যালামাস থেকে Growth Hormone Stimulating Hormone ক্ষরিত হয়, যা অগ্র পিটুইটারিকে বৃদ্ধি হরমোন (Growth Hormone) নিঃসরণের জন্য উদ্দীপ্ত করে। ফলে বৃদ্ধি হরমোন নিঃসৃত হয়ে রক্তপ্রবাহে চলে আসে এবং যকৃতে পৌঁছে আরেকটি হরমোন Insulin like growth factor-1 ক্ষরণে উদ্দীপনা যোগায়। এই IGF-1 হরমোনটি প্রত্যক্ষভাবে হাড় এবং মাংসপেশীর বৃদ্ধি ঘটায়। বৃদ্ধির পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল বলে এই প্রক্রিয়ার যেকোনো ধাপে যেকোনো সমস্যা যথাযথ বৃদ্ধিকে ব্যাহত করতে পারে।
পিটুইটারি গ্রন্থি; Source: slideshare
বামনত্বের কারণ
বামনত্বের কারণ বড়ই বিচিত্র। বিভিন্ন কারণেই এটি হতে পারে। যেমন-
আরো অজানা (Idiopathic) নানা কারণে বামনত্ব হতে পারে।
বামনত্বের কারণ বিভিন্ন হতে পারে; Source: Starcasm
বামনত্বের প্রকারভেদ
উপসর্গ, বৃদ্ধির ধরন, শারীরিক ও মানসিক দক্ষতা, রোগের কারণ প্রভৃতি বিষয় বিবেচনা করে বামনত্বকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে-
প্যানহাইড্রোপিটুইটারিজ
পিটুইটারি থেকে ক্ষরিত বেশিরভাগ হরমোনই অগ্র পিটুইটারি থেকে আসে। কয়েকটির নামও উল্লেখ করা হয়েছে উপরে। কোনো কারণে যদি পিটুইটারি গ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তাহলে শুধু বৃদ্ধি হরমোনই নয়,অগ্র পিটুইটারি থেকে ক্ষরিত সব হরমোনেরই অভাব দেখা যায়। ফলে শরীরের বৃদ্ধি হ্রাস পায়। উচ্চতা কম হয়, হাত-পা, বাহু শরীরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ছোট হয়। কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আশানুরুপ বাড়তে পারে না, নির্দিষ্ট কাজের উপযোগী হতে পারে না। এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের বয়ঃসন্ধি দেরিতে হয়। প্রজনন অঙ্গগুলো পরিণত না হওয়ার কারণে ব্যক্তি বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। মাথায় বড় ধরনের কোনো আঘাত লাগলে কিংবা পিটুইটারি গ্রন্থিতে টিউমার হলে এই রোগ হতে পারে।
বৃদ্ধি হরমোনের অভাবজনিত বামনত্ব
এই রোগ হয় শরীরে শুধুমাত্র বৃদ্ধি হরমোনের অভাব থাকলে। বৃদ্ধি হরমোন যথেষ্ট পরিমাণে থাকে না বলে আক্রান্ত ব্যক্তি উচ্চতায় বাড়ে না। অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আকারও ছোট হয়। তবে এরা প্রজননে সক্ষম হয়ে থাকে।
লেভিলরেন বামনত্ব
শরীরে যদি বৃদ্ধি হরমোনের জোয়ারও বয়ে যায়, তবু এটি কাজ করতে পারবে না যদি সোমাটোমেডিন সি (IGF-1) এর অভাব থাকে। লেভিলরেন বামনদের শরীরে যথেষ্ট গ্রোথ হরমোন থাকে, তবে থাকে না IGF-1। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়, গ্রোথ হরমোন শরীরের সব জায়গায় পৌঁছে যায় ঠিকই, তবে শরীর তা কাজে লাগাতে পারে না। ফলে বৃদ্ধি হ্রাস পায়। পৃথিবীর সবচেয়ে খর্বাকার আফ্রিকার পিগমি আদিবাসীরা এই শ্রেণীর বামন।
কোনো কোনো বামনত্বের ক্ষেত্রে শরীরের সব অঙ্গ একই অনুপাতে বাড়ে। মাথা, হাত-পা সবকিছুরই বৃদ্ধি রহিত হয়। সবগুলো অঙ্গই ছোট হয়। আবার কখনো দেখা যায়, শরীর ঠিকঠাক বাড়ছে কিন্তু হাত-পা ছোট, মাথা বড়।
কীভাবে বুঝবেন আপনার শিশু বামনত্ব রোগে ভুগছে কিনা?
স্বাভাবিক বাচ্চাদের থেকে বৃদ্ধি হরমোনের ঘাটতি থাকা বাচ্চারা সাধারণত ২০-২৫ শতাংশ কম বাড়ে। ২-৪ বছর বয়সেই ব্যাপারটি বোঝা যায়। হাত-পা অতিরিক্ত খাটো হয়। মুখমণ্ডল ছোট হয়, কারণ মুখমণ্ডলের হাড় ম্যাক্সিলা ও ম্যান্ডিবল তেমন একটা বাড়ে না। দাঁতগুলোও পরিপক্ক হয় না। নাক ছোট হয়, চোখ দুটো কাছাকাছি মনে হয়। শরীরে প্রোটিন উৎপাদন কম হওয়ায় মাংসপেশী কম তৈরি হয়। শরীরে অস্বাভাবিক চর্বি জমতে দেখা যায়। প্রজনন অঙ্গ সুগঠিত হয় না। চামড়া কুঁচকানো হতে পারে। বুদ্ধিমত্তা সাধারণত স্বাভাবিকই থাকে। তবে বিষন্নতা, হীনমন্যতার মতো মানসিক জটিলতা কাজ করতে পারে।
বামনত্বে আক্রান্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ; Source: thinglink
আপনার বাচ্চার মধ্যে উপরের লক্ষণগুলো যদি দেখা যায়, তাহলে কি সে আসলেই বামনত্বে ভুগছে? ভাবছেন, এটি নিশ্চত হবেন কীভাবে? কিছু কিছু পরীক্ষা আছে, যেগুলো করলে বোঝা সম্ভব আপনার বাচ্চা সত্যিই বামনত্বে ভুগছে কিনা। হাতের মুষ্টির এক্স-রে তার মধ্যে একটি। এই এক্স-রে করলে হাতের হাড়ের বয়স (Bone Age) নির্ণয় করা যায়। হাড়ের বয়স এবং বাচ্চার বয়সের তুলনা করে বোঝা যায় শিশুর বামনত্ব আছে কিনা। সাধারণত বামনত্বে আক্রান্ত বাচ্চাদের হাড়ের বয়স মূল বয়সের চেয়ে দু’বছর কম হয়। যেমন- বাচ্চার বয়স ১০ বছর হলে হাড়ের বয়স হবে ৮ বছর।
বামনত্বের প্রতিকার
বৃদ্ধি হরমোন ইনজেকশন; Source: perimeter institute
বয়সের তুলনায় অল্প বাড়া শিশুদের যদি অল্প বয়সে ইনজেকশনের মাধ্যমে গ্রোথ হরমোনের ডোজ দেওয়া হয়, তাহলে বামনত্ব সেরে যায়। শিশুটি স্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। অনেকেই জানেন নিশ্চয়ই, জনপ্রিয় ফুটবল তারকা লিওনেল মেসিকেও বৃদ্ধি হরমোনের অভাব সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগতে হয়েছিল। ছোটবেলায় যখন তার রোগটি ধরা পড়ে, তখন তার উচ্চতা ছিল ৪ ফুট ২ ইঞ্চি। তারপর বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাবের আলোচিত চিকিৎসার পর তার বর্তমান উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি, যা গড়পড়তা আর্জেন্টাইনদের চেয়েও বেশি!
আগে মৃতদেহ থেকে বৃদ্ধি হরমোন সংগ্রহ করা হতো। কিন্তু এতে ভয়ানক একটি রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকায় আর এভাবে বৃদ্ধি হরমোন সংগ্রহ করা হয় না। এখন রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া কোষ থেকে বৃদ্ধি হরমোন উৎপাদন করা হয়। এছাড়া কিছু কিছু ওষুধ আছে, যেগুলো গ্রহণ করলে শরীরের অভ্যন্তরেই বৃদ্ধি হরমোন উৎপাদন বাড়ে।
লিওনেল মেসি; Source: ESPN
আপনার শিশু যদি বামনত্বে আক্রান্ত হয়েই থাকে, তাহলে ভয় পাবেন না। যথাযথ চিকিৎসায় বামনত্ব ভাল হতেও পারে। আর আপনার চারপাশের খর্বাকার লোকদের প্রতি খারাপ আচরণ করবেন না। তাদের এই অবস্থার পেছনে তারা কোনভাবেই দায়ী নন, তারা একটি রোগের শিকার মাত্র।
সংক্ষেপে দেখুনপৃথিবীতে স্বর্ণ এলো কোথা থেকে ?
পৃথিবীতে অন্যান্য মৌলের তুলনায় স্বর্ণের পরিমাণ খুবই কম। স্বর্ণ যে শুধু পৃথিবীতেই কম তা নয়, সমগ্র মহাবিশ্বেই কম। সমগ্র মহাবিশ্বে কেন কম হবে তার পেছনেও কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। সে কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যাবে পৃথিবীতে যত পরিমাণ স্বর্ণ আছে তার সামান্যতম অংশও পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। অল্প-স্বল্প স্বর্ণবিস্তারিত পড়ুন
পৃথিবীতে অন্যান্য মৌলের তুলনায় স্বর্ণের পরিমাণ খুবই কম। স্বর্ণ যে শুধু পৃথিবীতেই কম তা নয়, সমগ্র মহাবিশ্বেই কম। সমগ্র মহাবিশ্বে কেন কম হবে তার পেছনেও কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। সে কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যাবে পৃথিবীতে যত পরিমাণ স্বর্ণ আছে তার সামান্যতম অংশও পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। অল্প-স্বল্প স্বর্ণ যা-ই আছে তার সবই এসেছে সৌরজগৎ তথা পৃথিবীর বাইরের মহাবিশ্ব থেকে। এটা কীভাবে হয়? এর উত্তর পেতে হলে জানতে হবে গ্রহ-নক্ষত্র কীভাবে গঠিত হয় সে সম্পর্কে।
নক্ষত্র গঠনের মূল উপাদান হলো মহাজাগতিক ধূলি। এই ধূলির মাঝে থাকে হাইড্রোজেন গ্যাস, হিলিয়াম গ্যাস, লিথিয়াম গ্যাস সহ আরো অনেক উপাদান। তবে সেসবের মাঝে সবচেয়ে বেশি থাকে হাইড্রোজেন। এই হাইড্রোজেনই নক্ষত্রের ভেতরে প্রক্রিয়াজাত হয়ে ভারী মৌল গঠন করে। বিগ ব্যাং এর পর পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম অনুসরণ করে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও লিথিয়াম মৌলগুলো তৈরি হয়েছে। এরপর মহাবিশ্বও প্রসারিত হয়েছে এবং তারাও ছড়িয়ে পড়েছে মহাবিশ্বের সর্বত্র।
কয়েক আলোক বর্ষ ব্যাপী বিস্তৃত এরকম ধূলিমেঘ থেকে নক্ষত্রের জন্ম হয়। প্রক্রিয়াটি বেশ চমকপ্রদ। কোনো একটি এলাকায় কিছু গ্যাস মহাকর্ষ বলের প্রভাবে একত্র হয়। একত্র হলে ঐ অংশের ভর বেড়ে যায়। মহাকর্ষ বলের নিয়ম অনুসারে কোনো বস্তুর ভর বেশি হলে তার আকর্ষণও বেশি হবে। সে হিসেবে ঐ একত্র হওয়া ধূলির মেঘ আরো বেশি বলে আকর্ষণ করবে পাশের মেঘকে। এভাবে আরো ভর বাড়বে এবং আরো বেশি আকর্ষণ ক্ষমতা অর্জন করবে এবং এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। একপর্যায়ে দেখা যাবে ঐ বস্তুটি এত বড় হয়ে গেছে যে সেখানে প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় চাপ তৈরি হচ্ছে। নিজের মহাকর্ষের শক্তিতেই নিজের পরমাণু লেপ্টে যাচ্ছে। এমন শক্তিশালী আভ্যন্তরীণ চাপে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো একত্র হয়ে যায়। দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু একত্র হয়ে একটি হিলিয়াম পরমাণু তৈরি করে। একাধিক ছোট পরমাণু একত্রে যুক্ত হয়ে একটি বড় পরমাণু তৈরি করার এই প্রক্রিয়াকে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। আমরা যে সূর্যের তাপ শক্তি ও আলোক শক্তি পাচ্ছি তার সবই আসছে এই ফিউশন প্রক্রিয়ায়।
সূর্যের সকল শক্তি আসছে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে; ছবি: Imgur
ফিউশন প্রক্রিয়ায় একত্র হতে হতে সকল হাইড্রোজেনই একসময় হিলিয়ামে পরিণত হয়ে যায়। তখন হিলিয়াম আবার একত্র হওয়া শুরু হয়। এ পর্যায়ে দুটি হিলিয়াম পরমাণু একত্র হয়ে একটি কার্বন পরমাণু তৈরি করে। হিলিয়াম পরমাণু শেষ হয়ে গেলে কার্বনও আরো ভারী মৌল তৈরি করে। এ প্রক্রিয়ায় পর্যায় সারণীর শুরুর দিকের হালকা মৌলগুলো তৈরি হয়। লোহা বা তার চেয়েও বেশি ভারী মৌলগুলো এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় না। কারণ লোহা তৈরি করতে যে পরিমাণ আভ্যন্তরীণ চাপীয় শক্তি প্রদান করতে হবে সাধারণ নক্ষত্রগুলোর সে শক্তি নেই। যেমন আমাদের সূর্যের কথাই বিবেচনা করা যাক। এর এত তেজ ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য নক্ষত্ররে তুলনায় এটি একদমই মামুলী একটি নক্ষত্র। সূর্যের আভ্যন্তরীণ চাপে শুধুমাত্র হিলিয়াম থেকে কার্বন পর্যন্ত চক্র চলবে। এরপর আরো ভারী মৌল তৈরি করতে যে পরিমাণ চাপ থাকা দরকার সূর্যের তা নেই।
তাহলে লোহা এলো কোথা থেকে? বিজ্ঞানীরা হিসাব-নিকাশ ও পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে লোহা তৈরি হতে পারে। কোনো সুপারনোভা যদি বিস্ফোরিত হয় তাহলে বিস্ফোরণকালের প্রবল প্রবল চাপে সেখানে লোহা তৈরি হওয়া সম্ভব।
সুপারনোভা কেন বিস্ফোরিত হবে সেটাও একটা প্রশ্ন। সাধারণ নক্ষত্রে আভ্যন্তরীণ চাপ ও বহির্মুখী চাপ একটি সাম্যাবস্থায় থাকে। আভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি হয় মহাকর্ষের ফলে। আর একাধিক পরমাণু একত্র হয়ে যে প্রবল শক্তি তৈরি করছে তা বাইরের দিকে চাপ দেয়। এই দুই বিপরীতধর্মী চাপের ফলে নক্ষত্র একটি সাম্যাবস্থায় থাকে।
কিছু ক্ষেত্রে নক্ষত্র পুড়তে পুড়তে প্রবল আভ্যন্তরীণ চাপে সংকুচিত হয়ে যায়। সংকুচিত হয়ে সে অবস্থায় আর থাকতে পারে না, প্রবল বিস্ফোরণে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনাকে সুপারনোভা বলে। সংকুচিত হবার সময় কল্পনাতীত যে চাপ দেয় তাতেই লোহের মতো মৌলগুলো তৈরি হয়। একটু বেশি ভারী মৌলগুলো তৈরি হবার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ চাপ পায় তখন।
সুপারনোভা বিস্ফোরণের প্রচণ্ড চাপে তৈরি হয় লোহা; ছবি: Gemini Observatory/Lynette Cook
কিন্তু স্বর্ণ? লোহার পারমাণবিক ভর ৫৬ আর স্বর্ণের পারমাণবিক ভর ১৯৬। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে লোহার চেয়ে স্বর্ণের ভর অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন এরকম কোনো বিস্ফোরণই স্বর্ণ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট নয়। সাধারণ একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণে যে পরিমাণ চাপ তৈরি হয় তার চেয়েও ১০০ গুণ বেশি চাপ প্রয়োজন হবে স্বর্ণের পরমাণু তৈরিতে। এরকম চাপ তৈরি হতে পারে খুব ভারী কোনো নক্ষত্রের সাথে আরেকটি ভারী নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে। সাধারণ নক্ষত্রের সংঘর্ষে এত চাপ তৈরি হবে না। এটি সম্ভব খুব ভারী দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষে কিংবা একটি নিউট্রন নক্ষত্র ও একটি ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষে। উল্লেখ্য ব্ল্যাকহোলও একপ্রকার নক্ষত্র।
তত্ত্ব অনুসারে এভাবে স্বর্ণ তৈরি হবে। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে তো মেনে নেয়া যায় না। কে জানে এই মহাজগতে এমন কোনো প্রপঞ্চ হয়তো লুকিয়ে আছে যার মাধ্যমে ভিন্ন উপায়ে স্বর্ণ তৈরি হচ্ছে, আর সেই প্রপঞ্চ আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। তবে এ অনিশ্চয়তা নিয়ে আর মন খারাপ করতে হবে না। সম্প্রতি (অক্টোবর, ২০১৭) বিজ্ঞানীরা এর একটি সমাধান পেয়েছেন। এই সমাধান সম্প্রতি পেলেও এর জন্ম হয়েছিল অনেক আগেই।
আজ থেকে ১৩০ মিলিয়ন বছর আগে, আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরের এক গ্যালাক্সিতে দুটি নিউট্রন নক্ষত্র পরস্পরের কাছাকাছি চলে এসেছিল। বেশ কিছুটা সময় তারা একে অপরকে সর্পিলাকারে আবর্তন করে, সজোরে আছড়ে পড়ে একটি আরেকটির উপর। অত্যন্ত শক্তিশালী এই সংঘর্ষে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নক্ষত্রের ভগ্ন অংশ। পাশাপাশি আরো ছড়ায় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং অতীব তীব্র আলোক রশ্মি। সূর্যের সাথে তুলনা করলে সে তীব্রতা হবে সূর্যের চেয়ে মিলিয়ন ট্রিলিয়ন গুণ বেশি। এতই তীব্র যে সেগুলো মিলিয়ন মিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরত্ব থেকেও দেখা যায়।
দুই নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে জন্ম নেয়া এসব তরঙ্গ যাত্রা শুরু করে পৃথিবীর দিকে। লক্ষ লক্ষ বছর ব্যাপী ভ্রমণ করতে থাকে পথ। করতে করতে ১৩০ মিলিয়ন বছর পার করে এসে পৌঁছায় পৃথিবীর বুকে। আর ঘটনাক্রমে এই সময়টাতেই বিজ্ঞানীরা তাক করে রেখেছিল টেলিস্কোপ সহ অন্যান্য শনাক্তকরণ যন্ত্র। আর তাক করার দিক ছিল ঠিক ঐ নক্ষত্রের দিকেই। বিজ্ঞানের কল্যাণে তাই আমরা এখানে বসে আজ থেকে দূরের ১৩০ মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে পারছি।
এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এখানে স্বর্ণ জন্ম নিয়েছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন এরকম সংঘর্ষের মাধ্যমে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তা স্বর্ণ ও প্লাটিনামের মতো মৌল তৈরির জন্য সকল শর্ত পূরণ করে।
স্বর্ণ তৈরি হয়েছে সুপারনোভা বিস্ফোরণ কিংবা ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের ফলে; ছবি: Agora Economics
এ তো গেলো এক রহস্যের সমাধান। দূর নক্ষত্রের মিলনে স্বর্ণের জন্ম হয় ঠিক আছে, কিন্তু এভাবে জন্ম নেয়া স্বর্ণ পৃথিবী কিংবা অন্যান্য গ্রহে কীভাবে যায়? দুই মহাজাগতিক দানবের যখন সংঘর্ষ ঘটে তখন সেখান থেকে প্রচুর নাক্ষত্রিক উপাদান বাইরের দিকে ছিটকে পড়ে। সেসব ছিটকে যাওয়া পদার্থের সাথে স্বর্ণও থাকে। আবার এই সংঘর্ষের পর সুপারনোভার বিস্ফোরণ হলে তার উপাদান চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। সেসবের মাঝে স্বর্ণও আছে। এভাবে বিস্ফোরণের টুকরো টুকরো হয়ে গেলেই তার জীবনের সমাপ্তি ঘটে না। মূলত এর মাধ্যমে আরেকটি নতুন জীবনের সূচনা হয়।
এই ছিটকে যাওয়া অংশগুলো আবার মহাজাগতিক ধূলিমেঘের সাথে মিলে আরেকটি নতুন নক্ষত্র গঠনে কাজে লেগে যায়। নক্ষত্রের গঠন প্রক্রিয়ায় নক্ষত্রের সাথে গ্রহও তৈরি হয়, যেমন হয়েছিল সূর্যের পাশাপাশি সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো। ঐ যে সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল স্বর্ণগুলো সেগুলো তখন গ্রহ গঠনের সময় গ্রহের ভেতরে ঢুকে যায়। পৃথিবীতে আমরা যত স্বর্ণ দেখি তার সবই আসলে এসেছে এই দীর্ঘ আন্তঃনাক্ষত্রিক ধাপ পার হয়ে। তাই আমরা যখন নিজেদের হাতে কোনো স্বর্ণ দেখে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবো তখন ভাবতে হবে, এই স্বর্ণ নিছকই কোনো ধাতু নয়। পৃথিবীর কোনো তাপ-চাপই এর কাছে কিছু নয়। কোটি কোটি বছর ধরে নক্ষত্রের চাপ এবং সংঘর্ষের অকল্পনীয় ধাক্কা পার হয়ে আজকের এই অবস্থানে এসেছে এই স্বর্ণ।
স্বর্ণ শুধু মামুলী অলংকার জাতীয় পদার্থ নয়, এর মাঝে লুকিয়ে আছে নক্ষত্রের গান। ছবি: thewallpaper.co
স্বর্ণকে অনেকেই মূল্যবান পদার্থ হিসেবে দেখে, কারণ এটি খুব দুর্লভ। কোনো বস্তু দুর্লভ হলে তার মূল্য বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে স্বর্ণকে সম্পদ হিসেবে তো দেখতে পারে সকলেই, তারাই তো অনন্য যারা স্বর্ণের ভেতরে নাক্ষত্রিক ও মহাজাগতিক কাব্যিকতা খুঁজে পায়।
সংক্ষেপে দেখুনরংধনু কত রকমের হয়?
ঝলমলে আলো সমৃদ্ধ কোনো দিনে হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টির পর আমরা আকাশে বর্ণালীর যে পট্টি বা ব্যান্ড দেখে থাকি এটাই আসলে রংধনু বা রামধনু। অনেকটা ধনুকের মতো বাঁকা (বাস্তবে বৃত্তচাপের ন্যায়) হওয়ায় এবং বর্ণালীর আলোর পট্টি থাকায় রংধনু নামকরণের সার্থকতা নিহিত। রংধনু গঠনের পেছনে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা এখন বিস্তৃতবিস্তারিত পড়ুন
ঝলমলে আলো সমৃদ্ধ কোনো দিনে হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টির পর আমরা আকাশে বর্ণালীর যে পট্টি বা ব্যান্ড দেখে থাকি এটাই আসলে রংধনু বা রামধনু। অনেকটা ধনুকের মতো বাঁকা (বাস্তবে বৃত্তচাপের ন্যায়) হওয়ায় এবং বর্ণালীর আলোর পট্টি থাকায় রংধনু নামকরণের সার্থকতা নিহিত।
রংধনু গঠনের পেছনে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা এখন বিস্তৃত হয়েছে। কারণ বিজ্ঞানী নিউটন প্রমাণ করে দিয়েছেন যে সূর্যের আলো মূলত বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর যৌগিক রূপ। তিনি অন্ধকার ঘরে প্রিজমের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করিয়ে দেখতে পান যে সূর্যের আলো প্রতিসরিত হয়ে পর্দার উপর বর্ণালীর ব্যান্ড তৈরী করে।
রংধনুও মূলত এই নীতির উপরেই গঠিত হয়। সাধারণত এক পশলা বৃষ্টির পরে পানির কণা বায়ুমণ্ডলে ভেসে বেড়াতে থাকে। যখন সূর্যের আলো এসব পানি কণার মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করে তখন প্রতিটি পানি কণা একেকটি প্রিজমের মতো আচরণ করে। যদিও এক্ষেত্রে পানির কণার মধ্যে দিয়ে আলোর প্রতিসরণই রংধনু গঠন করে না। পানির পূর্ণ অভ্যন্তরীন প্রতিফলনের ফলেই সেটা দুবার প্রতিসরণের মাঝে একবার প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে রংধনু হিসেবে ধরা দেয়।
রংধনু গঠনের কৌশল; সূত্র: rebeccapaton.net
যেহেতু বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর প্রতিসরণ ক্ষমতা বা পথ একই নয়, সেহেতু যৌগিক সূর্যালোক বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিভক্ত হয় এবং আলোর পট্টি তৈরী করে।
দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা পানিকণার উপর ভিত্তি করে রংধনুকে শ্রেণীবিভাগ করে আসছেন। কিন্তু আসলে কেবল এই একটি বিষয়ে শ্রেণীবিভাগ করাটা ঠিক পোষায় না। পরবর্তীতে গবেষকরা বিভিন্ন রংধনুর ছবি সংগ্রহ করে এদের প্রায় বারোটি প্রজাতিতে ভাগ করেছেন। অর্থাৎ আমাদের দেখা সাধারণ একপ্রকার রংধনুর বাইরেও আরো প্রায় এগারো প্রজাতির রংধনুর দেখা মেলে। আমরা কি সেসব সম্পর্কে আদৌ জানি? চলুন জেনে নেয়া যাক সেসব রংধনু সম্পর্কে।
মুখ্য বা প্রাথমিক রংধনু
প্রাথমিক রংধনু; সূত্র: freedawn.co.uk
মূলত এই ধরনের রংধনুই সচরাচর আমরা দেখে অভ্যস্ত। প্রাথমিক রংধনু হচ্ছে অর্ধবৃত্তাকার এবং এতে বেগুনী থেকে লাল পর্যন্ত (অর্থাৎ বেগুনী, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল) একক বর্ণালী বা পট্টি দেখা যায়। এক পশলা বৃষ্টির পরেই সাধারণত প্রাথমিক ধরনের রংধনু গঠিত হয়ে থাকে। এ ধরনের রংধনুর উজ্জ্বলতা নির্ভর করে পানিকণার কত বড় বা ছোট তার উপর।
গৌণ রংধনু
গৌণ রংধনু; সূত্র: fullhdwall.com
যদি আপনি প্রাথমিক রংধনু দেখে থাকেন তাহলে আপনার গৌণ রংধনু দেখার সম্ভাবনা অনেক। অর্থাৎ আপনি মুখ্য বা প্রাথমিক রংধনুর সাথে সাথে গৌণটিও দেখে থাকতে পারেন। এদেরকে কখনো কখনো আবার ‘ডাবল রেইনবো’ বা দ্বৈত রংধনুও বলা হয়ে থাকে। মূলত মুখ্য রংধনুর সাথেই এটি গঠিত হয় যখন সূর্যের আলোক রশ্মি ভাসমান পানি কণার মধ্যে দিয়ে একবারের পরিবর্তে দুবার প্রতিফলিত হয়। মুখ্য রংধনুর উপরে বা বাইরের দিকে এই রংধনু গঠিত হয় এবং এদের বর্ণক্রম সাধারণত মুখ্য রংধনুর ঠিক উল্টো। মুখ্য রংধনুর থেকে আকারের দিক থেকে দ্বিগুণ হলেও এদের উজ্জ্বলতা প্রায় এক-দশমাংশ।
আলেক্সান্ডার’স ডার্ক ব্যান্ড
মাঝের কালো ব্যান্ড-ই আলেক্সান্ডার’স ডার্ক ব্যান্ড; সূত্র: flickr.com
যদিও আলেক্সান্ডার’স ডার্ক ব্যান্ডকে বাস্তবিক অর্থে ঠিক রংধনু হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। কিন্তু এই ব্যান্ডে মুখ্য ও গৌণ রংধনুর মতো ব্যান্ড দেখা যায়। মূলত মুখ্য ও গৌণ রংধনুর মধ্যবর্তী এলাকাতেই এই ডার্ক ব্যান্ড গঠিত হয় এবং আকাশের বাকি অংশ থেকে এই অংশ একটু বেশি অন্ধকার দেখা যায়। মুখ্য রংধনু এর ভেতরের অংশ এবং গৌণ রংধনু এর বাইর দিকের অংশ আলোকিত করে রাখে। ফলে আমাদের কাছে আলেক্সান্ডার’স ডার্ক ব্যান্ডকে কালো মনে হয়।
সুপারনিউমেরারি রেইনবো
সুপারনিউমেরারি রংধনু- মুখ্য রংধনুর ভেতরে একাধিক দুর্বল রংধনু; সূত্র: justfunfacts.com
সুপারনিউমেরারি শব্দের অর্থ সংখ্যায় স্বাভাবিকের থেকে অতিরিক্ত। এ ধরনের রংধনুকে স্ট্যাকার রংধনুও বলা হয়ে থাকে যাদের খুব কমই দেখা যায়। স্ট্যাকার রংধনু মূলত গঠিত হয় একাধিক দুর্বল প্রজাতির রংধনুর সমষ্টি নিয়ে যারা প্রাথমিক রংধনুর অভ্যন্তরীণ অংশে অবস্থান করে। এই অংশে পানির কণাগুলোর আকার অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র হলেও আকৃতি একই রকম। সূর্যের আলো যখন একবার প্রতিফলিত হয় তখন সাধারণ পথে না গিয়ে এরা একটু অন্যপথে গমন করে, ফলে দুর্বল প্রকৃতির একাধিক রংধনু গঠন করে।
মনোক্রোমাটিক রংধনু
মনোক্রোমাটিক রেইনবো; সূত্র: digitaljournal.com
মনোক্রোমাটিক রেইনবো অনেক সময় রেড রেইনবো নামেও পরিচিত। মূলত সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময়টিতে এক পশলা বৃষ্টির পর এই ধরনের রংধনু গঠিত হয়ে থাকে। সাধারণত এই সময়ে বর্ণালীর ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো, যেমন নীল বা সবুজ বায়ু ও ধূলিকণা দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয়। এর ফলে তুলনামূলক বৃহৎ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো অর্থাৎ লাল ও হলুদ বর্ণী আলোই এই ধরনের রংধনু গঠন করে। সূর্য যখন অস্তগামী হয় তখন এই রংধনু গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি।
ক্লাউড রেইনবো
ক্লাউড রেইনবো; সূত্র: listverse.com
নামের দ্বারাই বোঝা যায় যে এই ধরনের রংধনুর সাথে মেঘ জড়িত। এই ধরনের রংধনু গঠিত হয় যখন আর্দ্র পরিবেশ বিরাজ করে এবং একইসাথে মেঘের ভেতর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানির কণা অবস্থান করে। এই পানির কণাগুলো বৃষ্টির পানির কণা থেকেও ক্ষুদ্র হয়ে থাকে সাধারণত। ফলে ক্লাউড রেনবো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাদা বর্ণের মতো হয়ে থাকে। কারণ আমরা জানি পানি কণার আকৃতি যত বড় হবে, বর্ণালীর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলন ক্ষমতাও তত বাড়বে। এরা সাধারণ রংধনু থেকে আকৃতিতে বড় হয়ে থাকে। সচরাচর এরা কোনো বড় জলাশয়ের উপরই গঠিত হয়।
ফগ রেইনবো; সূত্র: kathyandmikeadventure2012.wordpress.com
তবে পাতলা কুয়াশার কারণে এদের স্থলভাগেও দেখা যেতে পারে। এদের ফগ বো বা গোস্ট রেইনবোও বলা হয়ে থাকে।
যমজ রংধনু
যমজ রংধনু; সূত্র: listverse.com
যমজ রংধনু বা টুইনড রেইনবো কে ঠিক দ্বৈত রংধনু বলা চলে না। এ ধরনের রংধনু বেশ বিরল হয়ে থাকে। যমজ রংধনু বলতে বোঝায় যখন দুটি রংধনু একই পাদবিন্দু থেকে গঠিত হয়, কিন্তু আলাদা দুটি বৃত্ত তৈরী করে। যমজ রংধনু গঠিত হওয়ার পেছনে পানি কণার আকৃতি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ, ক্ষুদ্র ও অপেক্ষাকৃত বড় পানি কণা যখন একইসাথে অবস্থান করে এবং যেহেতু এদের প্রতিফলন ক্ষমতা একই রকম নয়। আবার বড় পানিকণাগুলো বাতাসের চাপে সমতলীয় হতে শুরু করে আর অন্যদিকে ক্ষুদ্র কণাগুলো এদের পৃষ্ঠটানের জন্য একসাথে থাকে। ফলে এরা দুটি রংধনু গঠন করে, কিন্তু এদের পাদবিন্দু থাকে একই।
প্রতিফলিত রংধনু এবং প্রতিফলন রংধনু
প্রতিফলিত ও প্রতিফলন রংধনু; সূত্র: listverse.com
যদিও এদের নাম প্রায় একই রকম হলেও এরা আসলে এক প্রজাতি নয়। সাধারণত কোনো বড় জলাশয়ের উপরই এদের দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিফলিত রংধনু আসলে প্রাথমিক রংধনুর মতোই, কিন্তু এরা প্রথমে পানির কণার মধ্যে দিয়ে বিচ্ছুরিত হয়ে আমাদের চোখের পৌঁছানোর আগেই পানিতে প্রতিফলিত হয়।
অন্যদিকে প্রতিফলন রংধনুর ক্ষেত্রে বিষয়টা উল্টো হয়ে যায়। অর্থাৎ আগে পানিতে প্রতিফলিত হয়ে তারপর সেটা পানির কণার মধ্যে দিয়ে বিচ্ছুরিত হয় এবং তারপর আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়। তবে এদের উজ্জ্বলতা প্রতিফলিত রংধনুর মত নয়।
রেইনবো হুইল
রেইনবো হুইলের একাংশ; সূত্র: listverse.com
রেইনবো হুইল গঠিত হয় যখন ঘন কালো মেঘ বা ঘন বৃষ্টিপাতের কারণে সূর্যের আলো আমাদের চোখে পৌছাতে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। এই বৃষ্টির ফোটাগুলোর কারণেই রংধনুর বর্ণসমূহ আমরা দেখতে পারি না। ফলে এই ধরণের রংধনু অনেকটা বড় স্পোকওয়ালা ওয়াগন হুইলের মত দেখা যায় যারা একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দু থেকে আসছে বলে মনে হয়। মজার ব্যাপার হলো যখন ঘন মেঘ সরে যেতে থাকে তখন মনে হয় রংধনুর এই হুইলটি যেন ঘুরছে।
লুনার রেইনবো
লুনার রেইনবো; সূত্র: victoriafalls-guide.net
আমরা সচরাচর দিনের বেলাতেই রংধনু দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু কেমন হয় যদি রাতের বেলায় রংধনু দেখা যায়। লুনার রেইনবো সেরকমই এক বিরল প্রজাতির রংধনু। মূলত জ্যোৎস্নালোকিত রাতে এই ধরনের রংধনুর দেখা পাওয়া যায়। যেহেতু জ্যোৎস্নার আলো ঠিক ততটা শক্তিশালী নয় কাজেই লুনার রেইনবো খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। এ ধরনের রংধনু দেখার উপযুক্ত সময় হলো যখন উজ্জ্বল পূর্ণিমা রাতে বৃষ্টি হয়ে থাকে। এ সময়ে আকাশ অবশ্যই কালো হতে হয়। ফলে লুনার রেইনবো কিছুটা বিবর্ণ দেখায়, কারণ এ সময়ে রাত আমাদের রেটিনার কোন কোষগুলোকে উদ্দীপিত করতে সক্ষম হয় না।
পূর্ণ বৃত্তীয় রংধনু
পূর্ণ বৃত্তীয় রংধনু; সূত্র: sciencenews.org
যখন সূর্যের আলো আর পানির কণা মিলে রংধনু গঠন করে তখন এরা পুরোপুরি একটি বৃত্তের আকারেও রংধনু তৈরী করতে পারে। তবে এ ধরনের রংধনু বেশ বিরলতর। কারণ এজন্য প্রয়োজন হয় আকাশের উপযুক্ত পরিবেশ। তবে এ ধরনের রংধনু দেখার জন্য সমতল থেকে কিছুটা উপরে ওঠার প্রয়োজন হয়। কারণ সমতলে থাকাকালীন অবস্থায় দিগন্তরেখা কারণে পুরো বৃত্ত দেখা যায় না।
তো আমরা সচরাচর যে রংধনু দেখে থাকি সেটি মুখ্য বা প্রাইমারি রংধনু। কিন্তু এর বাইরেও আছে আরো অনেক প্রজাতির রংধনু। সব পরিবেশে বা সবসময়ে এদের দেখা মেলা খুবই কঠিন। তবে বায়ুতে যদি কোনো প্রকারে ভাসমান পানি কণার উপস্থিতি থাকে সেখানেই রংধনু দেখার সম্ভাবনা সর্বাধিক।
সংক্ষেপে দেখুনঅসীম কত বড়?
অসীম কত বড়? অসীমের বিশালত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা অসহায় হয়ে দেখবো আমাদের চিন্তার পরিধি কত ছোট! আমাদের তুচ্ছতা আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশালত্ব নিয়ে চিন্তা করলে নিজেদের যে কতটা অসহায় মনে হয়, তার একটা ছোট্ট উদাহরণ এটি। অসীমের বিশালত্ব উপলব্ধি করার জন্য পাঠকের গভীর গাণিতিক জ্ঞান দরকার নেই, তবে নিঃসন্বিস্তারিত পড়ুন
অসীমের বিশালত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা অসহায় হয়ে দেখবো আমাদের চিন্তার পরিধি কত ছোট! আমাদের তুচ্ছতা আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশালত্ব নিয়ে চিন্তা করলে নিজেদের যে কতটা অসহায় মনে হয়, তার একটা ছোট্ট উদাহরণ এটি। অসীমের বিশালত্ব উপলব্ধি করার জন্য পাঠকের গভীর গাণিতিক জ্ঞান দরকার নেই, তবে নিঃসন্দেহে গভীরতম চিন্তাশক্তির প্রয়োজন!
লেখকের ছোটবেলার একটা অভিজ্ঞতা দিয়েই শুরু করা যাক। খুব ছোটবেলায় আমার এক বন্ধুর সাথে একবার তর্ক লেগে গেল, কার কয়টা খেলনা আছে। আমি অনেক কষ্টে গুনে বললাম, আমার সব মিলিয়ে আটটি খেলনা আছে। বন্ধু বলল তার দশটি। এবার তো পড়ে গেলাম বিপাকে! বন্ধুর কাছে হেরে যাওয়া যায় না, আমি বললাম আমার পনেরটা! এবার বন্ধুও চিন্তায় পড়ে গেল! অনেক ভেবে বলল, আমার গুনতে একটু ভুল হয়ে গেছে, আমার আসলে বিশটা! এবার অনেক ভেবে বললাম, আমার একশটা!
আমি তখন মোটে গুনতে পারি বিশ পর্যন্ত! একশো বলে খুব খুশি হয়ে গেলাম। এবার বন্ধু খুব চিন্তায় পড়ে গেল। ঐ বয়সে একশ অনেক বড় সংখ্যা, এর থেকে বড় কোনো সংখ্যা আছে কি না আমাদের কারোরই জানা নেই। এবার বন্ধু একটু চালাকি করে ফেলল! বলল, আমার যতগুলো খেলনা আছে, বন্ধুর নাকি তার চেয়ে এক বেশি! এর পরে আর কোনো কথা থাকে না। মন খারাপ করে বাড়ি ফিরলাম। মাকে জিজ্ঞেস করলাম, একশোর চেয়ে বড় আর কী আছে?
অর্থাৎ একটা শিশু খুব চিন্তা করেও তার পরিধি একশো থেকে বড় করতে পারেনি! আমাদের পূর্বপুরুষদের সংখ্যার ধারণা ছিল এক আর অনেক! গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, অনেক প্রাণী তিন পর্যন্ত গুনতে পারে! আসুন দেখি, আমরা কত পর্যন্ত গুনতে পারি!

খাবার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে শিম্পাঞ্জীরা সংখ্যার ধারণা কাজে লাগায়; Image source: bbc.com
আমাদের পৃথিবী কিন্তু অনেক বড়, প্রায় ৫১০ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। এবার সূর্যের দিকে তাকান। সূর্যের মধ্যে আপনি এক মিলিয়ন পৃথিবী রাখতে পারবেন। আরেকটু বড় পরিসরে ভাবুন, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে সূর্যের মতো প্রায় ৪০০ বিলিয়ন তারা আছে। আর আমাদের জানা মতে, মহাবিশ্বে ১০০ বিলিয়ন শনাক্ত করা যায় এমন গ্যালাক্সি আছে, শনাক্ত করা যায়নি, এমন গ্যালাক্সির সংখ্যা নিশ্চয়ই আরও বেশি। আর আপনি জানেন কি, ইদানীং কিছু গবেষণামতে, মহাবিশ্বও কিন্তু একটি নয়। স্ট্রিং থিওরি মতে, মোটামুটি 10^500 টি (১ এর পর ৫০০টি শূন্য)! তবে এই সংখ্যাটি নিশ্চিত নয়। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন,
আপনি কি ভাবতে পারেন, এই সংখ্যাগুলো কত বড়? এদের কাছে আমরা কতটা তুচ্ছ? আসুন, এবার আমাদের প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। অসীম এই সংখ্যাগুলোর চেয়েও বড়!

মহাবিশ্বে গ্যালাক্সির সঠিক সংখ্যা আমরা আজও জানি না; Iamge source: earthsky.org
আপনাকে যদি বলা হয়, পৃথিবীতে যতগুলো জোড় সংখ্যা আছে, ততগুলোই স্বাভাবিক সংখ্যা আছে, আপনি কি মানবেন? নিশ্চয়ই না (১-১০ এর মধ্যে জোড সংখ্যা ৫টি, স্বাভাবিক সংখ্যা ১০টি)! কিন্তু আমাদের ভাবনার জগত কেবল গণনাযোগ্য সংখ্যা নিয়ে কাজ করে বলেই এটা মানতে আপনার কষ্ট হচ্ছে। আপনি না গুনে কীভাবে বুঝবেন আপনার দু’হাতে সমান সংখ্যক আঙুল আছে? আপনি প্রতিটি আঙুলের বিপরীতে আরেকটি আঙুল রাখতে পারবেন, তাই এরা সমান। একে গণিতে বলে One-one correspondence। এই পদ্ধতিতেই আমরা প্রমাণ করতে পারি, জোড় সংখ্যার সংখ্যা আর মোট সংখ্যার সংখ্যা সমান। (২-১, ৪-২, ৬-৩, ৮-৪….. এরকম জোড়া কিন্তু চলতেই থাকবে)
2 4 6 8 10 12 ……….
1 2 3 4 5 6 ………..
এভাবে প্রতিটি সংখ্যার বিপরীতে আরেকটি জোড় সংখ্যা পাওয়া যাবে, মানে আমাদের বিষয়টি প্রমাণ হয়ে গেল। কিন্তু এখানে একটা ‘কিন্তু’ থেকেই গেল! মোট জোড় সংখ্যা আছে অসীম সংখ্যক। আবার মোট স্বাভাবিক সংখ্যাও আছে অসীম সংখ্যক। আপনার যদি ওপরের প্রমাণে ‘কিন্তু’টাই পছন্দ হয়ে থাকে, তাহলে এই দুই অসীম সমান না! অর্থাৎ অসীমেরও ছোট-বড় আছে, সব অসীম অন্য অসীমের সমান নয়!
অসীমগুলো যে অন্য অসীম থেকে আলাদা এরকম প্রস্তাবনা প্রথম দেন জর্জ ক্যান্টর (তিনি সেট তত্ত্বের জনক)। এর নাম The Continuum Hypothesis।

“Continuum Hypothesis” এর প্রস্তাবনাকারী জর্জ ক্যান্টর; Image source: wikipedia.org
এই তত্ত্বে বলা হয়, প্রত্যেক অসীম অন্য অসীম থেকে আলাদা। এক অসীম অন্য অসীম থেকে ছোট-বড় হতে পারে। ডেভিড হিলবার্টের মতে, গণিতে এই তত্ত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপ্রমাণিত সমস্যা। কেন? কারণ কার্ল গোডেল প্রমাণ করেছেন, এই তত্ত্ব কখনও মিথ্যা প্রমাণ করা যাবে না। অন্যদিকে পল কোহেন প্রমাণ করেছেন, একে সত্য প্রমাণ করাও সম্ভব নয়! এটা প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞানে বা গণিতে এখনও অনেক উত্তর দেয়া সম্ভব হয়নি এমন প্রশ্নের অস্তিত্ব রয়েছে!
এবার আমাদের চিন্তাশক্তির আরেকটু উচ্চস্তরে যাওয়া যাক। এর নাম The infinity Paradox, এর প্রস্তাবনাকারী ডেভিড হিলবার্ট।
চিন্তা করুন একটি হোটেলের কথা যেখানে রুমের সংখ্যা অসীম। কোনো এক রাতে প্রত্যেকটি রুম ভর্তি, কোনো রুম ফাঁকা নেই। হোটেলের নাম আমরা ধরে নিই ইনফিনিটি হোটেল, আর হোটেলের ম্যানেজার গণিতবিদ জেফ্রি। হোটেল ভর্তি করে জেফ্রি রাতে ঘুমিয়েছেন। হঠাৎ একজন নতুন অতিথি আসলো, যে আরেকটা রুম চায়। গণিতবিদ জেফ্রি কিন্তু তাকে ফিরে যেতে দেননি, তার জন্যও ইনফিনিটি হোটেলে আরেকটি রুমের বরাদ্দ করা হলো। কীভাবে? জেফ্রি এক নম্বর রুমের লোককে বলল দুই নম্বরে যেতে, দুই নম্বর রুমের লোককে বলা হলো তিন নম্বর রুমে যেতে। মানে সব রুমের লোককে তার ঠিক পাশের রুমে যেতে বলা হল। এখন আপনি ভাবতে পারেন, শেষ রুমের লোকটি কোথায় যাবে? কিন্তু এটা তো কোনো চল্লিশ রুমের হোটেল না, এটি ইনফিনিটি হোটেল। এখানে শেষ রুম বলে কোনো কথা নেই। n তম রুমের লোকটি n+1 তম রুমে চলে গেল, এক নম্বর রুম খালি করে নতুন লোকটিকে সেখানে থাকার ব্যবস্থা করা হলো।

হিলবার্টের ইনফিনিটি প্যারাডক্স; Image source: ed.ted.com
এবার জেফ্রির জন্য আরেকটু কঠিন সমস্যা, এবার একটা বাস এলো চল্লিশজন মানুষ নিয়ে, এরা আরও চল্লিশটা রুম চায়। চট করে জেফ্রি সমাধান করে ফেলল, এক নম্বর রুমের লোককে বলা হলো একচল্লিশ নম্বর রুমে, দুই থেকে বিয়াল্লিশ নম্বর রুমে, n রুমের লোক চলে গেল (n+40) নম্বর রুমে, চল্লিশটি রুম ফাঁকা হয়ে গেল, চল্লিশজনের জায়গা হয়ে গেল!
আসুন, জেফ্রিকে আরেকটু কঠিন সমস্যা দেয়া যাক। দেখি এবার জেফ্রি কী করে! এবার তার হোটেলে একটা বাস পাঠানো হলো, যেখানে লোকের সংখ্যা অসীম। এবার কী করে তাদের জায়গা দেওয়া হবে? এবার কিন্তু আর জেফ্রি যোগের ধারণা দিয়ে এত লোকের জন্য রুম খালি করতে পারবে না, কারণ n+∞ কোনো নির্দিষ্ট রুমের নম্বর না, জেফ্রি কাউকে গিয়ে হুট করে সেই রুমে যেতে বলতে পারে না। এবার কিছুক্ষণ ভেবে এক অভিনব বুদ্ধি বের করল। এক নম্বর রুমের লোককে বলা হল দুই নম্বরে যেতে, দুই নম্বরের লোক গেল চারে, তিন নম্বর রুম থেকে পাঠানো হল ছয় নম্বর রুমে। n নম্বর রুম থেকে 2n নম্বর রুমে পাঠিয়ে দিলে সব জোড় সংখ্যার রুম ভরে গেল, আর বিজোড় সংখ্যার রুম ফাঁকা হয়ে গেল। এখন নিশ্চয়ই জানেন বিজোড় সংখ্যা আছে মোট অসীম সংখ্যক, তাই অসীম সংখ্যক লোকের জায়গা হয়ে গেল।
পাঠক, এবার সময় এসেছে আপনার সিট বেল্ট টাইট করে নেয়ার। কারণ এবার আঘাত আসবে স্বাভাবিক মানুষের চিন্তার প্রায় সর্বোচ্চ স্তরে! জেফ্রি এবার তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে! এবার অসীম সংখ্যক লোক নিয়ে একটি-দুটি নয়, পুরো অসীম সংখ্যক বাস চলে এসেছে, সবাই গণিতবিদ জেফ্রির কাছে ইনফিনিটি হোটেলে জায়গা চায়!
এবার জেফ্রি পড়ে গেল মহাবিপদে। অনেক চিন্তা করে তার মনে পড়লো গুরু ইউক্লিডের কথা। তিনি বলেছেন, মৌলিক সংখ্যা আছে অসীম সংখ্যক। জেফ্রি আইডিয়া পেয়ে গেল! এক নম্বর রুমের লোককে পাঠানো হলো দুই নম্বর রুমে, দুই নম্বর রুম থেকে চার নম্বর রুমে, তিন থেকে আটে, চার থেকে ষোলতে… বুঝতে পারছেন? এখানে n নম্বর রুমের লোককে 2^n নম্বর রুমে পাঠানো হলো। দুইয়ের ঘাত বাদে সব রুম কিন্তু ফাঁকা হয়ে গেল।
প্রথম বাসের সব লোককে এবার বলা হলো ১ নম্বর ঘরে যেতে। পরের বাসের লোককে পাঠানো হলো ৩, ৯, ২৭, ৮১, …3^n… নাম্বার রুমে। পরের মৌলিক সংখ্যা পাঁচের ঘাতে, পরের বাসে সাতের ঘাতে। এভাবে প্রতিটি বাসের জন্য একটি করে মৌলিক সংখ্যার ঘাতে তাদের জায়গা হলো। অসীম সংখ্যক মৌলিক সংখ্যা থাকায় অসীম সংখ্যক বাসের লোকদের জায়গা হলো। এভাবে জেফ্রি তার অসীমের মধ্যে অসীম সংখ্যক অসীমের জায়গা করে দিল!
কী! প্যাঁচ লেগে গেল? আরেকবার পড়ুন। তা-ও না বুঝলে চিন্তার কারণ নেই, কারণ You are not alone!

ইউক্লিড প্রমাণ করেছিলেন, মৌলিক সংখ্যার সংখ্যা অসীম। তাঁর বই “Elements” এর একটি খণ্ডিত অংশ; Image source: wikipedia.org
এবার আমরা জেফ্রির আয়ের কথা ভাবি, তার তো অনেক বড়লোক হয়ে যাবার কথা। যদি প্রতি রুমের জন্য জেফ্রি এক টাকা করে পায়, তাহলে রাতের শুরুতে জেফ্রির ছিল অসীম টাকা, কিন্তু রাতের শেষেও তার আয় অসীম টাকাই!
আপনি কি আন্দাজ করতে পারছেন, অসীম কত বড়? এতক্ষণ আমরা যে অসীম নিয়ে আলোচনা করলাম, তা হলো অসীমের সর্বনিম্ন স্তর, কারণ আমরা কেবল স্বাভাবিক সংখ্যার ভেতরেই অসীম নিয়ে আলোচনা করেছি! আপনারা যদি অসীম সম্পর্কে সামান্য ধারণাও পেয়ে থাকেন, অসীমের বিশালত্ব আপনাকে নাড়া দেয়, তাহলেই লেখার স্বার্থকতা!
এখন আসুন, আমরা আমাদের প্রশ্ন নিয়ে শেষবারের মতো ভাবি। অসীম তাহলে কত বড়? এর উত্তর আসলে খুবই সহজ। কারণ এর উত্তর হলো,
সংক্ষেপে দেখুনঅ্যাপল সিলিকন কী?
২0২0 সালের ২২ জুন অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয় অ্যাপলের বার্ষিক ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ডেভেলপার কনফারেন্স (WWDC)। মহামারীর কারণে এই প্রথম অ্যাপল কনফারেন্সটি অনলাইনে নেয়। ২২-২৬ জুন পর্যন্ত চলে কনফারেন্সটি। মূলত এই কনফারেন্সে অ্যাপল তাদের প্রোডাক্ট লাইন-আপের বিভিন্ন ফিচার প্রকাশ করে। এবারের WWDC-তে অ্যাপলের সবচেয়ে আলোবিস্তারিত পড়ুন
২0২0 সালের ২২ জুন অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয় অ্যাপলের বার্ষিক ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ডেভেলপার কনফারেন্স (WWDC)। মহামারীর কারণে এই প্রথম অ্যাপল কনফারেন্সটি অনলাইনে নেয়। ২২-২৬ জুন পর্যন্ত চলে কনফারেন্সটি। মূলত এই কনফারেন্সে অ্যাপল তাদের প্রোডাক্ট লাইন-আপের বিভিন্ন ফিচার প্রকাশ করে। এবারের WWDC-তে অ্যাপলের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল তাদের ইন্টেল থেকে নিজস্ব প্রসেসরে শিফট হওয়া। অর্থাৎ অ্যাপল তাদের নতুন ডিভাইসগুলোতে আর ইন্টেলের প্রসেসর ব্যবহার করবে না।
অ্যাপল শুধু প্রসেসরই পরিবর্তন করেনি, করেছে পুরো আর্কিটেকচারের পরিবর্তন। তারা ঘোষণা দিয়েছে ২০২২ সালের মাঝে সকল প্রকার ডিভাইস, অ্যাপস তাদের বর্তমান থেকে নতুন আর্কিটেকচারে শিফট করবে। এখন প্রশ্ন হলো- এর অর্থ ভোক্তাদের জন্য কী দাঁড়াবে? এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে এর প্রভাব কতটুকু? আর কেনই বা ইন্টেলের জন্য এটা দুঃসংবাদ?
প্রসেসর আর্কিটেকচার
মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে মৌলিক ধারণাগুলো পরিষ্কার করে নেয়া যাক। একটি প্রসেসর কীভাবে কাজ করবে, কতটা দ্রুতগতির হবে এসব নির্ভর করে প্রসেসর ডিজাইন বা আর্কিটেকচারের উপর। প্রতিটি প্রসেসর কিছু ইন্সট্রাকশন সেট নিয়ে কাজ করে। ইন্সট্রাকশন সেট প্রসেসরকে বলে দেয় তাকে কী নিয়ে কাজ করতে হবে। আমরা যখন কোনো সফটওয়্যার বা প্রোগ্রাম চালু করি তখন তা মেশিনের ভাষায় (০ এবং ১) রুপান্তরিত হয় এবং ইন্সট্রাকশন সেট তাদের পথ দেখিয়ে দেয় যে কী করলে, কোন ঠিকানায় গেলে প্রোগ্রামটি তার কাজ সম্পন্ন করতে পারবে। বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত দুটি প্রসেসর আর্কিটেকচার, যার দ্বারা পৃথিবীর প্রায় সকল কম্পিউটার পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলো হলো x86 এবং -x86-64। x86 কে ৩২ বিট এবং x64 কে ৬৪ বিট বলে ধরে নেয়া হলেও এর মাঝে আরও কিছু টেকনিক্যাল বিষয় রয়েছে যা বৃহৎ এবং এখানে অপ্রয়োজনীয় হওয়ায় আলোচনা করা হলো না।


ARM এর ব্যবহার; Image Source: Toptal.com
এর বাইরে আমাদের মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে সকল ছোটখাট ডিভাইস চলছে ভিন্ন এক আর্কিটেকচারে। সেটির নাম ARM। ARM প্রসেসরগুলো ভিন্ন আর্কিটেকচারে চলে কারণ ইন্টেলের তৈরি করা X86 আর্কিটেকচার শুধু ইন্টেলের বাইরে এএমডিসহ হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানির ব্যবহারের বৈধতা রয়েছে। X86 একটি অসাধারণ আর্কিটেকচার, যার ফলে আমরা এত দ্রুতগতির কম্পিউটার প্রসেসর পাচ্ছি এবং বিভিন্ন জটিল সমস্যার সমাধান সহজেই করা যাচ্ছে। ARM ব্যবহার করা হয় সোজাসাপ্টা সমস্যা সমাধানের জন্য, যার ফলে এটি অনেক কম এনার্জি খরচ করেই কাজ সমাধা করতে পারে। এজন্য সকল প্রকার ডিভাইস, যেগুলো বিশেষ করে ব্যাটারির উপর নির্ভরশীল, সেগুলোতে ARM ব্যবহার করা হয়। এবং যত কম এনার্জি তত কম হিট উৎপন্ন হবে, এটিও ARM প্রসেসরের একটি সুবিধা। সহজ কথায় X86 আর্কিটেকচার ভারী কাজের জন্য এবং ARM আর্কিটেকচার হালকা কাজের জন্য।
ইন্টেলের সাথে Arm এর তুলনা; Image source: Arm.com
তো আর্কিটেকচার নিয়ে এত বক বক করার কারণ হচ্ছে কোনো প্রোগ্রাম তৈরির আগে সেটি কোন আর্কিটেকচারে চলবে তা নির্ধারণ করে তৈরি করতে হয়। অর্থাৎ X86 আর্কিটেকচারকে লক্ষ্য করে তৈরি কোনো প্রোগ্রাম ARM-এ চলবে না। একই কথা X86 এর ক্ষেত্রেও। এখন আরেকটি বিষয় মাথায় আসতে পারে যে, স্মার্টফোনগুলোতে তো স্নাপড্রাগন, মিডিয়াটেক, বায়োনিক এসব ব্যবহারের কথা শুনেছিলাম, তাহলে ARM আসলো কোথা থেকে! আসলে ARM Holdings (ARM আর্কিটেকচার নির্মাতা) শুধু প্রসেসর ডিজাইন তৈরি করে, তারা কোনো প্রসেসর তৈরি করে না। এই ডিজাইনগুলো স্যামসাং, অ্যাপল, কোয়ালকম কিনে মডিফাই করে তাদের নিজস্ব চিপ তৈরি করে।
অ্যাপল সিলিকন কী?
System On a Chip বা SOC; Image Sourc: MacRumours
মূলত অ্যাপল সিলিকন হচ্ছে একটি SoC (System on a Chip)। এখন SoC আবার কী জিনিস? সাধারণত একটি প্রসেসরে শুধু প্রসেসর কম্পোনেন্টই থেকে থাকে, কিন্তু একটি SoC-তে একটি ডিভাইস পরিচালনার জন্য প্রধান জিনিসসমূহ, যেমন- প্রসেসর, গ্রাফিক্স, মেমোরি, সিকিউরিটি ফিচার সব একসাথে থাকে।
অ্যাপল সিলিকন যে নতুন তা কিন্তু নয়! তারা তাদের আইফোন, আইপ্যাডে এর ব্যবহার করে আসছে অনেকদিন হলো। বর্তমান অ্যাপলের এ১৩ বায়োনিক বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির স্মার্টফোন প্রসেসর। অ্যাপল তাদের Arm প্রসেসর ডিজাইনে এত এগিয়ে গিয়েছে যে কম্পিউটার জগতে তারা অ্যাপল সিলিকন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
অ্যাপল এমন পরিবর্তন আগেও করেছিল। ১৯৯৪ সালে তারা 68K থেকে PowerPC পিসি প্রসেসরে শিফট করে এবং ২০০১ সালে ম্যাক ওএস নতুন করে তৈরি করে প্রকাশ করে তারা। এরপর ২০০৬ সালে PowerPC থেকে ইন্টেলে শিফট করে এবং ইন্টেলভিত্তিক ম্যাকবুক প্রো ও আই ম্যাক রিলিজ করে। PowerPC থেকে ইন্টেলে শিফট হওয়ার কারণ ছিল ইন্টেল প্রসেসরগুলোর সক্ষমতা। এখন পুনরায় এই পরিবর্তনের কারণ শুধু Arm প্রসেসরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিই নয়, আনুষাঙ্গিক আরও দিক রয়েছে। এখন আলোচনা করা যাক সেসব নিয়ে।
এই পরিবর্তনের সুবিধা-অসুবিধা
অ্যাপল তাদের ইকোসিস্টেমের জন্য বিখ্যাত। অ্যাপলের প্রতিটি ডিভাইসের অন্তর্বর্তী কার্যক্রম অত্যন্ত সুগঠিত এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় হওয়ার কারণেই তাদের একটি নির্দিষ্ট ফ্যানবেজ তৈরি হয়েছে। এছাড়া প্রতিনিয়ত মানুষ অ্যাপলের ইকোসিস্টেমে শিফট হচ্ছে। তবে স্মার্টফোনের তুলনায় ম্যাকবুক কিংবা আইম্যাকে এই রূপান্তরের হার অনেক কম। ম্যাকবুক-আইম্যাক ছাড়া অ্যাপল তাদের প্রতিটি ডিভাইসে অ্যাপল সিলিকন ব্যবহার করেছে। ফলে অ্যাপল পেয়েছে তাদের প্রোডাক্টের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও শক্তি সাশ্রয়
Arm-ভিত্তিক প্রসেসরের অগ্রগতি সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রতগতির সুপার কম্পিউটার Arm-ভিত্তিক প্রযুক্তিতে চালিত হচ্ছে। এছাড়া অ্যাপলের বর্তমান A13 Bionic তাদের প্রথম Arm-ভিত্তিক প্রসেসর A4 এর থেকে প্রায় শতগুণ শক্তিশালী। এ থেকে বোঝা যায় যে অ্যাপল তাদের প্রযুক্তিতে কতটা এগিয়েছে এবং উন্নতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছে।
প্রসেসর জগতে একটি টার্ম রয়েছে যাকে বলে Performance per watt, অর্থাৎ প্রতি ওয়াট ক্ষমতায় একটি প্রসেসর কতটুকু পারফরমেন্স দিতে পারে। এই পারফরমান্স পার ওয়াটের কারণেই অ্যাপল PowerPC থেকে ইন্টেলে শিফট করে। যেহেতু Arm প্রসেসর অনেক কম শক্তি খরচ করে অর্থাৎ একটি ৫ ওয়াটের Arm প্রসেসর যদি ১৫ ওয়াটের ইন্টেল প্রসেসরের সমান পারফরমান্স দিতে পারে তাহলে আরও একটি ১৫ ওয়াটের Arm প্রসেসর আরও বেশি পারফরমান্স দিতে সক্ষম হবে।
আর যেহেতু অ্যাপল নিজেই তাদের প্রসেসর তৈরি করবে সেজন্য তারা তাদের অপারেটিং সিস্টেমও সুন্দরভাবে অপ্টিমাইজ করার সুযোগ পাবে। যার ফলে ব্যবহার অভিজ্ঞতা আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়ে উঠবে, যেমনটি হয়েছে তাদের আইফোন, আইপ্যাডগুলোতে।
নতুন ফিচার ও নিউরাল ইঞ্জিন
অ্যাপলের নিউরাল ইঞ্জিনের সুনাম কম নেই। মূলত এটি SOC-এ আলাদাভাবে বসানো থাকে। এটি সিপিউ বা জিপিউ-এর মতোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করার ক্ষমতা রাখে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিংয়ের সহায়তায় এটি ভারি কাজসমূহ আরও দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করতে পারে। ম্যাকবুকে এর সংযোজন হলে ভিডিও রেন্ডারিংয়ের মতো কাজগুলো আরও দ্রুতগতিতে করা যাবে বলে ধারণা করছেন প্রযুক্তিবিদরা। আর নিজস্ব চিপের বদৌলতে অ্যাপল যে নতুন এবং আকর্ষণীয় ফিচার আনবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
অধিক নিরাপত্তা
ইন্টেলের প্রসেসরের নিরাপত্তা ত্রুটির কথা নতুন নয়। এখনও কিছু ত্রুটি রয়েছে যার সমাধান করা সম্ভব হয়নি। আর অ্যাপল তাদের পণ্যের নিরাপত্তায় কোনো অংশেই ছাড় দেয় না। আইফোনের সিকিউরিটি সম্পর্কে আমরা কম-বেশি সবাই জানি। অ্যাপল সিলিকনের মাধ্যমে এমন উচ্চতর নিরাপত্তা এখন ম্যাকবুকেও পাওয়া যাবে যা নিঃসন্দেহে ভোক্তাদের জন্য সুখবর। এবং নতুন ত্রুটির সৃষ্টি হলেও তার সমাধান করার জন্য ইন্টেলের অপেক্ষা করতে হবে না আর তাদের।

অ্যাপলের বর্তমান Arm-ভিত্তিক সিকিউরিটি ও কন্ট্রোলার চিপ; Image Source: MacRumours
পণ্যের দাম কমার সম্ভবনা
প্রসেসর জগতে ইন্টেলের প্রসেসরগুলোর দাম সবচেয়ে বেশি। এজন্য কোম্পানিগুলোকে বিশাল পরিমাণ অর্থ ইন্টেলকে প্রদান করতে হয়, যার ফলে পণ্যের দাম বাড়ে এবং প্রভাব পড়ে ভোক্তাদের উপর। অ্যাপল যেহেতু এখন তাদের নিজেদের প্রসেসর তৈরি করবে এবং Arm প্রসেসরের উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় পণ্যের দাম কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ইন্টেলের প্রসেসর বাজারে ছাড়ার জন্য অ্যাপলকে আর অপেক্ষাও করতে হবে না। তাদের সময় অনুযায়ী তারা প্রোডাক্ট বাজারে ছাড়তে পারবে।
ম্যাকে চলবে আইফোন-আইপ্যাডের অ্যাপ
Arm-ভিত্তিক হওয়ায় ঝামেলা ছাড়াই ম্যাকে চলবে আইফোন এবং আইপ্যাডের অ্যাপসমূহ। ফলে বিশাল আইওএস এর বিশাল অ্যাপ ডেটাবেজ ব্যবহারের সুযোগ পাবে ম্যাক ব্যবহারকারীরা। তবে এর সাথে আরও একটি প্রশ্ন তৈরি হয়। Arm প্রসেসরে তো x86-based অ্যাপ্লিকেশনগুলো চলবে না, কিন্তু বর্তমান সব ম্যাক আপ্লিকেশন তো x86 আর্কিটেকচারের জন্য তৈরি, সেগুলোর কী হবে?
এই সমস্যা সমাধানের জন্য অ্যাপল নিয়ে এসেছে Rosseta 2 এবং Universal 2। বর্তমান x86-ভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন চালাবে Rosseta 2। Rosseta 2 একটি ইমুলেটর, অর্থাৎ যখন কোনো এপ্লিকেশন চালু করা হবে এটি x86 ইন্সট্রাকশন সেটকে Arm এর ইন্সট্রাকশন সেটে রূপান্তর করবে এবং এরপর প্রসেসরে সেটি চালাবে। তারা দেখিয়েছে এর মাধ্যমে গেমও চালানো সম্ভব। Universal 2 দিয়ে তৈরি করা অ্যাপ্লিকেশন ইন্টেল এবং অ্যাপল সিলিকন দুটোতেই চলবে। এজন্যই ২ বছরের সময় বলে দিয়েছে অ্যাপল। এই সময়ে ডেভেলপাররা তাদের সকল আপ্লিকেশন অ্যাপল সিলিকনের জন্য তৈরি করার সুযোগ পাবে। এরই সুবাদে অ্যাপল ডেভেলপারদের ভাড়া দিচ্ছে ডেভেলপার কিট। মাত্র ৫০০ ডলারের এই কীটে থাকছে Apple A12Z প্রসেসর, ১৬ জিবি র্যাম ও ৫১২ জিবি এস এসডি। ডেভেলপারদের জন্য এটি আদর্শ বলছেন প্রযুক্তিবিদরা।

ডেভেলপার কিট; Image Source: Apple Insider
এত সুবিধার মাঝে একটি প্রশ্ন উঠে আসে যে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব কি পড়বে?
আসলে না। বরং ভোক্তাদের জন্যও এটি বেশ ইতিবাচক একটি পরিকল্পনা। তবে যারা বুটক্যাম্প (ম্যাক-এ উইন্ডোজ চালানো) ব্যবহার করেন তাদের জন্য আপাতত অ্যাপল কোনো নির্দেশনা দেয়নি। তবে আশা করা যায় তারা কোনো পদ্ধতি ভবিষ্যতে উন্মুক্ত করবে।
তবে ইন্টেলের জন্য এটি একটি দুঃসংবাদই বটে, এএমডির কারণে তাদের মার্কেট শেয়ার অনেক কমে গিয়েছে এবং অ্যাপলের সাথে তাদের এত বছরের সম্পর্কের ইতি নিশ্চয়ই তাদের জন্য কোনো ভালো সংবাদ হতে পারে না। অ্যাপলের এই পরিবর্তনকে সাধুবাদ দিচ্ছেন অনেকেই। গত কয়েকবছর ধরে ইন্টেলের প্রসেসরের কার্যক্ষমতার ধীরগতির উন্নয়নকে একটু হলেও নাড়া দেবে এটি। অন্যদিকে এএমডিও মোবাইল প্রসেসর আনার আভাস দিয়েছে। অ্যাপল সিলিকনের ঘোষণার মাধ্যমে Arm-ভিত্তিক প্রসেসরের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ভোক্তাদের জন্য খুশির সংবাদ।
সংক্ষেপে দেখুনজৈব জ্বালানী কি?
১৯৯৬ সাল। আজ থেকে ২২ বছর আগে সুইজারল্যান্ডের অণুজীববিজ্ঞানীরা বিস্ময়ের সাথে দেখতে পেলেন, জুরিখ লেকে ব্যাকটেরিয়ার একটি প্রজাতি প্রাকৃতিকভাবে গ্যাসোলিনের অন্যতম উপাদান টলুইন উৎপাদন করে চলেছে। সম্প্রতি গবেষকরা এই প্রক্রিয়ার অন্তর্নিহিত কলাকৌশল ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যাকটেরিয়া কেন টবিস্তারিত পড়ুন
১৯৯৬ সাল। আজ থেকে ২২ বছর আগে সুইজারল্যান্ডের অণুজীববিজ্ঞানীরা বিস্ময়ের সাথে দেখতে পেলেন, জুরিখ লেকে ব্যাকটেরিয়ার একটি প্রজাতি প্রাকৃতিকভাবে গ্যাসোলিনের অন্যতম উপাদান টলুইন উৎপাদন করে চলেছে। সম্প্রতি গবেষকরা এই প্রক্রিয়ার অন্তর্নিহিত কলাকৌশল ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যাকটেরিয়া কেন টলুইন উৎপাদনের প্রতি ধাবিত হয়?
জয়েন্ট বায়ো-এনার্জি ইন্সটিটিউট (Joint BioEnergy Institute) এর এনভায়রনমেন্টাল মাইক্রোবায়োলোজিস্ট হ্যারি বেলারের মতে, বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য Tolumonas auensis টলুইন তৈরির পদ্ধতি বেছে নেয়। আম্লিক পরিবেশে টলুইন তৈরির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া তার নিজের pH নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। টলুইন তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়ার সাইটোপ্লাজমে প্রোটন শোষিত হয়। প্রোটনের আধিক্যের ফলে ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব pH বেড়ে যায়। এভাবে পয়ঃবর্জ্য অথবা জলাশয়ের গভীরে অক্সিজেনশূন্য পরিবেশে জমে থাকা পললের মতো আম্লিক পরিবেশে টিকে থাকা ব্যাকটেরিয়ার জন্য সহজতর হয়।

বার্কলের একটি লেকে গ্যাসোলিনের উপাদান তৈরিকারী ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান মেলে; © YIMING CHEN; Image Source: sciencemag.org
টলুইন মূলত অকটেনের বুস্টার হিসেবে কাজ করে থাকে। জ্বালানীর মূল উৎস ভূগর্ভস্থ পেট্রোলিয়ামের লাগামহীন ব্যবহারের ফলে বিশ্ব এখন জ্বালানী সংকটে। জ্বালানীর উৎস হিসেবে ব্যাকটেরিয়া কতটা ভূমিকা রাখতে সক্ষম, তা নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।
ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেইন যখন জ্বালানীর উৎস
গবেষকরা E. coli ব্যাকটেরিয়ার একটি নতুন স্ট্রেইন তৈরি করেছেন যেটি শর্করাকে তেলে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে প্রাপ্ত তেলের গুণগত মান, প্রচলিত ডিজেলের কাছাকাছি। ইউনিভার্সিটি অভ এক্সটারের অধ্যাপক জন লাভ এই বিষয়ে বলেন,
গুণগত মানের বিষয়ে অধ্যাপক লাভ বলেন,
E. coli মাধ্যমে জৈব জ্বালানী উৎপাদন; Image Source: cell.com
বিশেষায়িত ব্যাকটেরিয়া স্ট্রেইনটি সাধারণত শর্করা বা চিনি জাতীয় বস্তুকে বিক্রিয়ক হিসেবে নিয়ে চর্বিতে পরিণত করে। গবেষকরা ব্যাকটেরিয়া কোষের অভ্যন্তরীণ কলাকৌশল পরিবর্তন করে দেওয়ার ফলে চিনির বদলে এখন সুনির্দিষ্টভাবে জ্বালানী তেলই পাওয়া যাবে। জিনগত পরিবর্তন সাধন করার মাধ্যমে অণুজীব এখন জ্বালানী তেলের কোষাগারে পরিণত হয়েছে। তবে জ্বালানী তেলের চাহিদা যতটা উত্তরোত্তর হারে বেড়েই চলেছে সেই তুলনায় ব্যাকটেরিয়া কর্তৃক উৎপাদিত জ্বালানীর পরিমাণ সন্তোষজনক নয়। অধ্যাপক লাভ ও তার দল ১০০ লিটার ব্যাকটেরিয়া থেকে মাত্র ১ চা চামচ জ্বালানী তেল উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন!
আগামী দিনগুলোতে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাকটেরিয়ার উৎপাদনমুখিতা বৃদ্ধি করা। জৈব জ্বালানীর সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হিসেবে ভাবা হচ্ছে, এর কার্বন নিরপেক্ষতাকে। পরিবেশ দূষণে পেট্রোল বা ডিজেলের মতো বহুল ব্যবহৃত জ্বালানীর দহনে প্রচুর পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসৃত হচ্ছে। এতে অত্যধিক পরিমাণ গ্যাস শোষণ করার জন্য পর্যাপ্ত বনভূমি বর্তমানে পৃথিবীতে নেই। অন্যদিকে অণুজীব থেকে প্রাপ্ত জ্বালানী কার্বন নিরপেক্ষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। কারণ এদের দহনের ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ গাছপালা কর্তৃক শোষিত হওয়ার মতো সীমায় থাকবে।
জৈব জ্বালানী হিসেবে বিভিন্ন পদার্থের ব্যবহার
বায়োডিজেল
বায়োডিজেল উৎপাদনের বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। যেমন মাইক্রোপ্রসেসিং, ব্যাচ প্রোসেসিং, সুপার ক্রিটিকাল প্রসেসিং ইত্যাদি। কর্মপদ্ধতি ভিন্ন হলেও প্রতিটির ক্ষেত্রেই মূলত ট্রাইগ্লিসারাইডসের ট্রান্সএস্টারিফিকেশন করা হয়ে থাকে।


ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারলের সংযোগে গঠিত ট্রাইগ্লিসারাইড; Image Source: biofuel.org.uk
উদ্ভিদ এবং প্রাণীতে খুব সহজলভ্য একটি জৈব অণু হলো ট্রাইগ্লিসারাইড যেটি কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন সহযোগে গঠিত হয়। ট্রাইগ্লিসারাইড অণুর দুইটি অংশ। একটি ট্রাইগ্লিসারাইড অণুতে তিনটি ফ্যাটি অ্যাসিড চেইন থাকে এবং অন্য অংশটিকে বলা হয় গ্লিসারল। ফ্যাটি অ্যাসিড চেইনগুলো সাধারণ হাইড্রোকার্বনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় বিজ্ঞানীরা জৈব জ্বালানী উৎপাদনের ক্ষেত্রে একেই কাজে লাগিয়ে থাকেন।
ট্রান্সএস্টারিফিকেশনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অ্যালকোহল; Image Source: biofuel.org.uk
ট্রান্সএস্টারিফিকেশন পদ্ধতির মাধ্যমে গ্লিসারল ও ফ্যাটি অ্যাসিড চেইন পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পাওয়া যায় তিনটি এস্টার (প্রতি চেইন ফ্যাটি অ্যাসিডের জন্য একটি করে) ও গ্লিসারল। প্রতি ১০ মেট্রিক টন বায়োডিজেলের উৎপাদনে উপজাত হিসেবে ১০০ কেজি গ্লিসারল পাওয়া যায়।
ইনডিরেক্ট ফার্মেন্টেশন
জৈব জ্বালানী হিসেবে ইথানলের রয়েছে প্রসিদ্ধ ব্যবহার। ইনডিরেক্ট ফার্মেন্টেশন পদ্ধতিতে উদ্ভিজ্জ পদার্থকে পাইরোলাইসিসের মাধ্যমে সিনগ্যাস (Syngas) তৈরি করা হয়। প্রাথমিকভাবে সিনগ্যাসে উপস্থিত পদার্থসমূহ হলো কার্বন মনো অক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড ও হাইড্রোজেন।

সিনগ্যাস থেকে পাওয়া যায় জৈব জ্বালানী; Image Source: syngaschem.com
অ্যাসিটোজেনিক ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে সিনগ্যাস রূপান্তরিত হয় ইথানলে। অ্যাসিটোজেন হলো সম্পূর্ণভাবে অ্যানারোবিক ব্যাকটেরিয়া যার মাধ্যমে এই রূপান্তর ঘটে থাকে। Wood–Ljungdahl pathway’র মাধ্যমে অ্যাসিটোজেনিক ব্যাকটেরিয়ারা সাধারণত অ্যাসিটেট তৈরি করে থাকে। তবে মিডিয়ায় pH বৃদ্ধির ফলাফল হিসেবে অ্যাসিটেটের বদলে কাঙ্ক্ষিত বস্তু ইথানল পাওয়া যায়।
কনসলিডেটেড বায়োপ্রসেসিং
জৈব জ্বালানী শিল্পে ব্যয় সাশ্রয় একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পরিমিত ব্যয়ের মাঝে জৈব জ্বালানী উৎপাদনের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো কনসলিডেটেড বা সংকুচিত পদ্ধতি। অন্যান্য পদ্ধতি থেকে এর পার্থক্য হচ্ছে, এটি এক ধাপেই সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ উদিজ্জ পদার্থ থেকে সরাসরি জ্বালানী। এই পদ্ধতিতে কোনো স্যাকারোলাইটিক এনজাইমের প্রয়োজন হয় না। বর্তমানে ব্যবহৃত সকল জৈব জ্বালানীর তুলনায় এই পদ্ধতিতে সবচেয়ে কম খরচে উৎপাদন সম্ভব। এই পদ্ধতির উপর সর্বাধিক সংখ্যক গবেষণায় পাথেয় হিসেবে কাজ করছেন ডার্টমাউথ কলেজের অধ্যাপক লি লিন্ড ও তার দল। তারা এই পদ্ধতির জন্য ব্যবহার করে থাকেন থার্মোফিলিক থার্মোকিউটিস ব্যাকটেরিয়া। এই পদ্ধতিতে জ্বালানী হিসেবে পাওয়া যায় ইথানল।
জৈব জ্বালানীর সুবিধাসমূহ
জৈব জ্বালানীর সুবিধাসমূহ হলো-
· তুলনামূলক স্বল্প খরচে জ্বালানীর উৎপাদন সম্ভব।
· জীবাশ্ম জ্বালানীর উৎস পেট্রোলিয়ামের তুলনায় জৈব জ্বালানীর উৎস অনেক বেশি। বিভিন্ন রকমের শস্য, গাছ কিংবা উদ্ভিদের উচ্ছিষ্ট অংশও হতে পারে জৈব জ্বালানীর কাঁচামাল।
· নবায়নযোগ্যতা জৈব জ্বালানীর সবচেয়ে ইতিবাচক দিক।
· জীবাশ্ম জ্বালানীর তুলনায় জৈব জ্বালানী দহনে যথেষ্ট কম পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ ঘটে।
জৈব জ্বালানীর অসুবিধাগুলো
পরিবেশের সুরক্ষার কথা চিন্তা করলে এক কথায় জৈব জ্বালানীর বিকল্প নেই। তবে একথাও সত্য যে, শক্তির সরবরাহের ক্ষেত্রে জৈব জ্বালানী কখনোই সর্বোত্তম নয়। এর অসুবিধাগুলো হলো।
· জ্বালানীর উৎপাদন খরচ কম হলেও বিভিন্ন পদ্ধতিতে দরকার হয় পরিশোধনের যা একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া।
· জ্বালানী উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল চাষাবাদের জন্য দরকার হয় প্রচুর পরিমাণ পানির। যার ফলে আশঙ্কা থেকেই যায় আঞ্চলিক জলাশয়গুলো শূন্য হয়ে যাবে কিনা।
· যেহেতু উদ্ভিজ্জ পদার্থসমূহকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় তাই বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিশেষায়িত করা হয় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। বৃহৎ পরিসরের জমি যখন শুধু জ্বালানীর কাঁচামাল চাষে ব্যবহৃত হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই খাদ্য ঘাটতি দেখা যায় এবং ফলশ্রুতিতে দামের ঊর্ধ্বমুখিতা লক্ষ্য করা যায়।
জৈব জ্বালানী এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সাফল্য এনে দিতে পারেনি। যদিও জীবাশ্ম জ্বালানীর এক চমৎকার বিকল্প হিসেবে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য এ কথা ভুলে যাওয়া যাবে না যে, জৈব জ্বালানীর উপর পূর্ণ মাত্রায় নির্ভর করা যাবে না। শক্তি উৎপাদনের সম্ভাব্য সকল পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার এবং জৈব জ্বালানীকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপকারী করতে সবার আগে দরকার কাঁচামাল হিসেবে সবচেয়ে উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ পদার্থকে খুঁজে বের করা।
সংক্ষেপে দেখুনকালের বিবর্তনে বইয়ের পৃষ্ঠার রং কেন হলুদ হয়ে যায়?
বাড়িতে বইয়ের তাকে পড়ে থাকা পুরনো বই, স্টোররুমে সংগ্রহে থাকা পুরনো পত্রিকা কিংবা পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কিনে আনা বইগুলোর পৃষ্ঠাগুলো কেমন যেন হলুদাভ রং ধারণ করে, কখনো লক্ষ্য করেছেন? উজ্জ্বল সাদা বইয়ের পাতা সময়ের আবর্তে হলুদ হয়ে যায়, কিংবা কিছুটা হলুদাভ বর্ণ ধারণ করে, এ ঘটনার সাথে মোটামুটি সকলেই পরিচিতবিস্তারিত পড়ুন
বাড়িতে বইয়ের তাকে পড়ে থাকা পুরনো বই, স্টোররুমে সংগ্রহে থাকা পুরনো পত্রিকা কিংবা পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কিনে আনা বইগুলোর পৃষ্ঠাগুলো কেমন যেন হলুদাভ রং ধারণ করে, কখনো লক্ষ্য করেছেন? উজ্জ্বল সাদা বইয়ের পাতা সময়ের আবর্তে হলুদ হয়ে যায়, কিংবা কিছুটা হলুদাভ বর্ণ ধারণ করে, এ ঘটনার সাথে মোটামুটি সকলেই পরিচিত। কিন্তু এরকমটি কেন ঘটে তা ভেবে দেখেন খুব কম সংখ্যক মানুষই। কিংবা বইয়ের পাতার হলুদ হয়ে যাওয়া যে ঠেকানো সম্ভব তাও জানেন না অনেকেই। আর এসব বিষয় জানতে হলে আপনাকে জানতে হবে বইয়ে ব্যবহৃত কাগজের বিকাশ সম্বন্ধে। কারণ বর্তমানে কাগজ যে প্রক্রিয়ায় উৎপাদন করা হয়, একসময় তা এমন ছিল না। আর কাগজ উৎপাদের প্রক্রিয়ার সাথে কাগজের হলুদ হবার আছে সরাসরি সম্পর্ক।

হলুদাভ বর্ণ ধারণ করেছে পুরনো পত্রিকা; Image Source: scoopwhoop.com
অধিকাংশ ইতিহাসবিদই কাগজের উৎপত্তিস্থল হিসেবে চীনের কথাই বলে থাকেন। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ১০০ অব্দের দিকে চীনে কাগজ তৈরি শুরু হয়। প্রথমদিকে কাগজ তৈরির মূল উপকরণ ছিল ভেজা শণ। শণের সাথে গাছের গুঁড়ির বাকল (শল্ক), বাঁশ আর কয়েক প্রজাতির উদ্ভিদের আঁশ দিয়ে একপ্রকার মণ্ড তৈরি করা হতো। এই মণ্ড যত মিহি হতো, কাগজের মান হতো তত উন্নত।
চীনাদের এই উদ্ভাবন এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় নেয়নি। তবে ইউরোপে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল অনেক। একাদশ শতকে প্রথম ইউরোপে কাগজ উৎপাদন শুরু হয়। ইতিহাসবিদগণের বিশ্বাস, ‘মিসাল অব সাইলস’ নামক স্প্যানিশ বইটি ইউরোপের প্রাচীনতম কাগুজে দলিল। আর এই বইটিও একাদশ শতকের। তবে এই বইয়ের কাগজ মোটেও চীনাদের প্রথম দিকের কাগজের মতো ছিল না। সাইলসের কাগজগুলো তৈরি করা হয় পাটের আঁশ থেকে। গুটেনবার্গের ছাপাখানা আবিষ্কারের পর কাগজ উৎপাদনের ধরনে আবারো কিছু পরিবর্তন আসে। তখনকার কাগজগুলো তৈরি হতো পাটের আঁশের সাথে তুলা, ছেঁড়া বস্ত্রাদি আর অন্যান্য আঁশের মিশ্রণে।
সবচেয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ১৯ শতকে। কানাডার নোভা স্কটিয়ায় বসবাসকারী উদ্ভাবক চার্লস ফেনার্টি কাগজের ব্যবসা করতেন তখন। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ কমদামে দীর্ঘমেয়াদি কাগজ তৈরির চেষ্টা করে আসছিলেন। কাগজের ব্যবসার পাশাপাশি তার ছিল কাঠ চেরাইয়ের ব্যবসা। কাঠের ব্যবসা থেকেই তার মাথায় এলো কাগজ উৎপাদনে কাঠ ব্যবহারের কথা। কাঠের সহজলভ্যতা এবং কম দামের কথা মাথায় রেখে তিনি কাঠ থেকে কাগজ উৎপাদনের একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন।
১৮৪৪ সালের অক্টোবরে ফেনার্টি প্রথম কাঠ দিয়ে কাগজ তৈরি করলেন। সেই কাগজের কিছু নমুনা তিনি পাঠিয়ে দিলেন শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত পত্রিকা ‘দ্য আকাডিয়ান রেকর্ডার’ এ। সাথে চিঠিতে লিখে দিলেন তার নতুন উৎপাদিত কাগজের দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং স্বল্প খরুচে গুণের কথা। পত্রিকাটি আগ্রহভরেই ফেনার্টির নতুন কাগজ গ্রহণ করলো। সেই থেকে কাঠ দিয়ে কাগজ উৎপাদনের শুরু।
এ পর্যায়ে এসে একটি বিশেষ তথ্য উল্লেখ না করলেই নয়। অধিকাংশ ইতিহাসবিদই বর্তমানে কাঠ দিয়ে কাগজ উৎপাদনের জন্য জার্মান উদ্ভাবক ফ্রেডরিখ কেলারকে স্মরণ করে থাকেন। কিন্তু কাঠ দিয়ে কাগজ উৎপাদনের প্রক্রিয়া মূলত ফেনার্টিই প্রথমে আবিষ্কার করেছিলেন। সমসাময়িক সময়েই কেলার স্বতন্ত্রভাবে গবেষণা করে কাঠ দিয়ে কাগজ উৎপাদনের একটি প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। কিন্তু পার্থক্য গড়ে দেয় পেটেন্ট। ১৮৪৫ সালে কেলার তার তৈরি কাগজের জন্য একটি জার্মান পেটেন্ট লাভ করেন। আর তাতেই কপাল পোড়ে বেচারা ফেনার্টির!

কাগজ প্রস্তুতের জন্য ফেনার্টির কাঠ পেষণ যন্ত্র; Image Source: wikipedia.org
কাগজের রঙ হলুদ হবার পেছনে যে কারণ রয়েছে তার ঐতিহাসিক পটভূমি আমরা জানলাম। এবার রাসায়নিক আলোচনা শুরু করা যাক। তুলা বা পাট, উভয় উপাদানের চেয়েই কাঠ সস্তা এবং সহজলভ্য। আবার কাঠ দিয়ে তৈরি কাগজ অপরাপর কাগজের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদিও ছিল।
কিন্তু সমস্যা ছিল সূর্যালোক আর অক্সিজেনে। কাঠের তৈরি কাগজ বাতাসে আর সূর্যালোকে বেশ ভালোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এর কারণ লুকিয়ে আছে কাঠের মধ্যে। কাঠ মূলত দুইটি উপাদান থেকে তৈরি। একটি হচ্ছে সেলুলোজ, অপরটি লিগনিন। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত সবচেয়ে সহজলভ্য জৈব পদার্থটি হচ্ছে সেলুলোজ। বর্ণহীন এবং অস্বচ্ছ এ বস্তুটি এর উপর পতিত আলোর প্রায় পুরোটাই শুষে নেয় এবং সামান্য অংশ প্রতিফলিত করে। ফলে সেলুলোজকে দেখতে সাদা দেখায়।
সেলুলোজের একটি রাসায়নিক গুণ হচ্ছে এটি জারণধর্মী। ফলে সূর্যালোকে থাকে সূর্যরশ্মি শোষণের ফলে সেলুলোজে জারণ ঘটে। আর জারণ ঘটা মানে কিছু ইলেকট্রনের নিঃসরণ। ইলেকট্রন নিঃসরিত হবার এই প্রক্রিয়া দ্রুতই কাগজকে দুর্বল করে দেয়। একসময় এর ঔজ্জ্বল্যও কমে আসে। ঔজ্জ্বল্য কমে যাবার সাথে হলুদাভ হয়ে ওঠার সামান্য থাকলেও প্রকৃত হোতা হলো লিগনিন।
লিগনিন হচ্ছে একপ্রকার জটিল জৈব পলিমার যা সাধারণ বিভিন্ন উদ্ভিদের কোষপ্রাচীরে থাকে। লিগনিনের জন্যই কোষ প্রাচীর কঠিন ও দৃঢ় হয়। কাগজেও লিগনিন একই দায়িত্ব পালন করে। দালান নির্মাণে ইট, বালু আর সুরকির সাথে সিমেন্ট না দিলে যেমন তা কখনোই শক্ত হয়ে জমাট বাঁধবে না, ঠিক তেমনি কাগজে সেলুলোজের সাথে লিগনিন না থাকলে সেলুলোজের আঁশগুলো একত্রে থাকবে না।


সেলুলোজ; Image Source: amateurfooddetective.blogspot.com
তবে লিগনিন সেলুলোজের মতো উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করতে পারে না। লিগনিনের রঙ কালো। এ কারণেই হার্ড বোর্ড কিংবা কার্ডবোর্ডের রঙ কালো হয়। কারণ অধিক শক্ত করার জন্য সেগুলোতে অধিক লিগনিন ব্যবহার করা হয় যা রঙ পরিবর্তন করে। তবে মূল সমস্যা হলো, লিগনিনও সক্রিয় জারণক্ষম রাসায়নিক। সূর্যালোকের সংস্পর্শেই এর জারণ ঘটে এবং আণবিক গঠন পরিবর্তিত হয়। ফলে লিগনিন দ্বারা প্রতিফলিত আলোর বর্ণালীতে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তিত তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবুজ ও হলুদ আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাঝামাঝি অবস্থান করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হলুদ আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সাথে মিলে যায় এবং বইয়ের পাতা হলুদাভ বর্ণ ধারণ করে।
লিগনিনের রাসায়নিক গঠনের একটি ডায়াগ্রাম; Image Source: researchgate.net
আরেকটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যাক। লিগনিন হচ্ছে একটি পলিমার। পলিমার সাধারণ একই অণুর পৌনঃপুনিক জটিল বন্ধনের মাধ্যমে গঠিত হয়। উপরে লিগনিনের রাসায়নিক গঠনের একটি ডায়াগ্রাম দেয়া হলো। এতে দেখা যাচ্ছে যে, লিগনিনের পৌনঃপুনিক অণুটি হচ্ছে অ্যালকোহল। এখন অ্যালকোহলে একাধিক অক্সিজেন অণু রয়েছে। আবার, জারণ বিক্রিয়ার সময় লিগনিনও একাধিক অক্সিজেন অণু গ্রহণ করে।
অতিরিক্ত অক্সিজেন অণুগুলো লিগনিনের পলিমার গঠনে বিকৃতি ঘটায়, অ্যালকোহল সাবইউনিটগুলোর বন্ধন ভেঙে সে স্থলে ‘ক্রোমোফোরেস’ সৃষ্টি করে। গ্রিক শব্দ ক্রোমোফোরেস অর্থ ‘রঙবাহী’। এই ক্রোমোফোরেসই সূর্যরশ্মির প্রতিফলনের সময় বর্ণালীর দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের যেকোনো একটি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলিত করে। লিগনিনের ক্ষেত্রে সে তরঙ্গদৈর্ঘ্যটি হলুদ রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য। তবে কখনো কখনো একটু কমে সবুজের কাছাকাছি চলে এলে বাদামী রঙেরও হয়। ঠিক যেমনটি হয় এক টুকরো কাটা আপেল খোলা অবস্থায় রেখে দিলে। আপেলে বিদ্যমান পলিফেনল অক্সিডেজ নামক এনজাইমের জারণের ফলে এতে ক্রোমোফোরেস সৃষ্টি হয় এবং বাদামী বর্ণ ধারণ করে।

লিগনিনের জারণ প্রক্রিয়া; Image Source: pubs.rsc.org
সময়ের আবর্তে কাগজ হলুদ বর্ণ ধারণ করার এ প্রক্রিয়া বইয়ের চেয়ে বেশি পত্রিকার ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। কারণ স্বল্প খরচে কাগজ উৎপাদনে তুলা বা পাটের বদলে কাঠই বেশি ব্যবহৃত হয়। ফলে তাতে লিগনিন থাকে বেশি। তাই পত্রিকার পাতার হলুদাভ হবার প্রবণতা বেশি। তাই জরুরী কাগজপত্র, বই কিংবা পত্রিকার হলুদ বর্ণ ধারণ করা ঠেকাতে একে সূর্যালোক এবং অক্সিজেন থেকে দূরে রাখা যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে।
জাদুঘরে পুরনো দলিল দস্তাবেজ ও প্রাচীন সাহিত্যের কাগজগুলো অল্প আলোয়, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার মধ্যে বায়ুরোধী কাঁচের বাক্সে সংরক্ষণ করা হয়। বাসায় এতকিছু সম্ভব না হলে বইটি পলিথিনে ভরে সূর্যের আলো প্রবেশ করে না এমন ঠাণ্ডা স্থানে রেখে দিলেও চলে। তাছাড়া, কাগজ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোও আজকাল চেষ্টা করেন সর্বনিম্ন পরিমাণ লিগনিন ব্যবহার করে কাগজ তৈরি। সবকিছু দিয়ে মণ্ড তৈরি করা হয়ে গেলে সেটাকে কাগজে রূপান্তরিত করার আগে যথেষ্ট পরিমাণ ব্লিচ করে নিলেই লিগনিনের পরিমাণ কমে যায়। তবে লিগনিনের পরিমাণ বেশি কমে গেলে কাগজের মানও কমে যায়। তাই প্রস্তুতকারকদের পাশাপাশি ব্যবহারকারীদেরও সচেতন হওয়া জরুরী।
প্রত্যেকের আঙ্গুলের ছাপ কি আসলেই আলাদা ?
আপনার হাতের আঙুলের দিকে একবার খেয়াল করে দেখুন। প্রতি আঙুলেই যেন অসংখ্য দাগ বা খাঁজ রয়েছে। যারা টিভি শো দেখেন তারা কোনো না কোনো সময় CID বা CSI জাতীয় ক্রাইম শো দেখেছেন। তারা নিশ্চয় জানেন এই খাঁজ দিয়ে আসামী সনাক্ত করা হয়। এই আঙুলের ছাপকে প্রমাণ হিসেবে সাধারণত অকাট্য বলে বিবেচনাও করা হয়। কিন্তু এ প্রক্রবিস্তারিত পড়ুন
আপনার হাতের আঙুলের দিকে একবার খেয়াল করে দেখুন। প্রতি আঙুলেই যেন অসংখ্য দাগ বা খাঁজ রয়েছে। যারা টিভি শো দেখেন তারা কোনো না কোনো সময় CID বা CSI জাতীয় ক্রাইম শো দেখেছেন। তারা নিশ্চয় জানেন এই খাঁজ দিয়ে আসামী সনাক্ত করা হয়। এই আঙুলের ছাপকে প্রমাণ হিসেবে সাধারণত অকাট্য বলে বিবেচনাও করা হয়। কিন্তু এ প্রক্রিয়া কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য তা নিয়ে অনেকেরই ধারণা নেই। আগে দেখা যাক আঙুলের ছাপ আসলে কী। আমাদের প্রতিটি আঙুলে, হাত বা পায়ের তালুতে বিভিন্ন রকমের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময়েই আমাদের জীবনের সূচনালগ্ন যেমন ছিল তার উপর ভিত্তি করে ছাপ তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে একমত যে গর্ভ ধারণের ১০ সপ্তাহে এই আঙুলের ছাপ তৈরি হওয়া শুরু করে। কিন্তু কোন পদ্ধতিতে ছাপ আঙুলে তার অবস্থান করে নেয়, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত কোনো ধারণা দিতে পারেননি।
সবচেয়ে প্রচলিত যে ধারণা রয়েছে তা হলো আমাদের ত্বকের মধ্যস্তর (Basal layer) অপর দুইটি স্তর অপেক্ষা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যার কারণে বাইরের এপিডার্মিস এবং ভেতরের দিকের ডার্মিস স্তরে চাপের সৃষ্টি হয়। এই চাপের কারণে এপিডার্মিসের কিছু অংশ ডার্মিসে পিষ্ট হয়ে খাঁজের তৈরি করে, যা পরিশেষে আঙুলের ছাপ হিসেবে সাথী হয়ে থাকে। তবে ত্বকের স্তরের চাপের পাশাপাশি আরো কিছু পারিপার্শ্বিক প্রভাব এক্ষেত্রে কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হল রক্তচাপ, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ, মায়ের শরীরে পুষ্টির পরিমাণ এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে ভ্রূণের অবস্থান।
ত্বকের বিভিন্ন স্তর এবং আঙুলের ছাপের গঠন; source: slideshare.net
উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে (১৮৯৬ সালের দিকে) আঙুলের ছাপ সর্বপ্রথম অপরাধী সনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয়। স্যার এডওয়ার্ড হেনরি ১৯০১ সালে আঙুলের ছাপকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। যা ধীরে ধীরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ১৯১১ সালে আমেরিকাতে থমাস জেনিংস নামে এক ব্যক্তিকে আঙুলের ছাপের ভিত্তিতে হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে এ সময়ে মূলত আঙুলের ছাপ মানুষের চোখের আন্দাজের উপরে ভিত্তি করে একই কিনা তা নির্ণয় করতো। এ কাজে কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৯০ এর দশকে।
প্রথম আঙুলের ছাপে শনাক্তকৃত আসামী থমাস জেনিংস; source: gettyimages.com
তবে ব্যাপারটা এমন নয় যে আপনি একটি ডাটাবেজে একটি আঙুলের ছাপ নিয়ে রাখবেন আর তা আপনাকে নিমেষের মধ্যে সে আসামীর সন্ধান করে দেবে। এফবিআই এর ডাটাবেজে প্রায় ৫৩ মিলিয়নের অধিক ফাইল রয়েছে। এফবিআই ল্যাবোরেটরির ল্যাটেন্ট প্রিন্ট সাপোর্ট ইউনিটের প্রধান মাইকেল উইনার্সের মতে, একটি ছাপ ডাটাবেজে মিলিয়ে দেখতে কমপক্ষে ২ ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
আঙুলের ছাপের অনন্যতা কি বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত?
ধারণা করা হয়, পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষের আঙুলের ছাপ অনন্য। এই কথাটি শুরু হয় স্যার ফ্রান্সিস গাল্টনের এক দাবি থেকে। তবে তিনি এই তথ্য সমর্থন করার জন্য এখনও বৈজ্ঞানিক কোন দলিল দেখাতে পারেন নি। আর বর্তমানে সেটাই সত্য বলে বিবেচনা করা হয়। যে সকল পরীক্ষণ করা হয়েছে তার সবই একটি নির্দিষ্ট জনসংখ্যার জন্য। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আপনি এই ফলাফল দেখে হয়ত বলতে পারবেন সেই নির্দিষ্ট জনসংখ্যার মধ্যে কারও আঙুলের ছাপ মিলে না। ধরে নিলাম আপনি একই পরীক্ষাটি পুরা বিশ্বের ৭.৬ বিলিয়ন মানুষের আঙুলের ছাপ নিয়ে পরীক্ষাটি করলেন, তা-ও আপনার দলিল স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে না। এর কারণ আপনি জীবিত মানুষদের ছাপ পরীক্ষা করলেও পৃথিবীতে এতদিনে মৃত্যু হওয়া প্রায় ১০০ বিলিয়ন মানুষের হিসেব আপনি করতে পারছেন না। যার ফলে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক দলিল করাটা সম্ভব হয়ে উঠছে না।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা এটুকু সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়েছেন যে, এই ছাপ প্রতি মানুষের বেলায় ভিন্ন হবে। এমনকি বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এই ছাপ পরিবর্তন হতে পারে। গবেষণায় এটিও নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে যে এই ছাপ অভিন্ন যুগল বা আইডেন্টিকাল টুইনের ক্ষেত্রেও কিছু অংশে ভিন্নতা থাকে।
তাহলে আসামী ধরার ক্ষেত্রে এই ছাপ কি আসলে কাজ করে
আপনারা টিভি শোতে যেমন দেখেন আঙুলের ছাপ এবং অন্যান্য নজির ফরেনসিক ল্যাবের মানুষজন সংগ্রহ করে নেন। কিন্তু ব্যাপারটা এতটা সোজা নয় যতটা আপনি চিন্তা করছেন। একটি অপরাধপটের আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা প্রতিটি চিহ্ন সংগ্রহ করে তার মধ্যে কোনগুলি ব্যবহারযোগ্য তা নির্ণয় করতে হয়। আমাদের আলোচনা আপাতত আঙুলের ছাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। আঙুলের ছাপ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একটি দল মত প্রকাশ করেছেন, তাদের যে সকল ছাপ নিয়ে কাজ করতে হয় তা তাদের কাছে ডাটাবেজে সুন্দরভাবে থাকে না, অধিকাংশই থাকে একটি ছাপের কিছু অংশ বা ঘষে মুছে যাওয়া ছাপ, যার ফলে আসলে ডাটাবেজে কারও আঙুলের ছাপ থাকলেও তা মেলানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এফবিআই এর মাইকেল উইনার্সের মতে, ল্যাবে যে সকল প্রিন্ট আসে তার শুধুমাত্র ২৬ শতাংশ ব্যবহার উপযোগী থাকে।
আঙুলের ছাপের নমুনা; source-fineartamerica.com
তাছাড়া আংশিক ছাপের ক্ষেত্রে কোনরকম বাঁধাধরা নিয়ম নেই বললেই চলে। এরকম ছাপের ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে ছাপ মিলে কিনা তা মিলিয়ে দেখা হয়। একেক দেশ এই ব্যাপারটি একেকভাবে দেখে। যেমন ফ্রান্সে এরকম মিলার জন্য ১৬টি অবস্থানে দুটি ছাপের মিল থাকতে হয়, সেখানে সুইডেনের ক্ষেত্রে এই বিন্দুর সংখ্যা খালি ৭ এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে ১২।
আংশিক ছাপের মিল; source- gautierandcharles.biz
আংশিক ছাপের ক্ষেত্রে যে চিহ্ন লক্ষ্য করা হয়; source- toledotechnology.org
ডিজিটাল ফটোগ্রাফির সহায়তায় এরকম প্রিন্ট মিলানো আগে থেকে তুলনামূলক সোজা হয়ে গেলেও এখনও এই কাজের শেষে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তির চোখে এই চিহ্নগুলি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে আদৌ দুটি ছাপ একই কিনা। এরকম বিবেচনা করতে দিলে দেখা দেয় ত্রুটি যার নামকরণ করা হয়েছে Cognitive bias।
এক গবেষণায় পাঁচজন আঙুলের ছাপ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের একটি আঙুলের ছাপ অন্য একটি ছাপের সাথে মিলে কিনা পরীক্ষা করতে দেন। তাদেরকে যে ছাপগুলি দেয়া সবগুলিই তারা তাদের জীবনের কোনো একসময়ে মিলে গিয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন। গবেষকেরা এসময় যে বিষয়টি পাল্টান তা হল তারা একজন অপরাধীর ব্যাপারে তাদের অবহিত করেন। অবাক করা বিষয় হয়ে দাঁড়ায় যখন পাঁচজনের মধ্যে চারজন তাদের মত পরিবর্তন করেন তাদের বিশ্লেষণ নিয়ে।
আরেকটি গবেষণায় একদল অভিজ্ঞদের কিছু আঙুলের ছাপ দিয়ে বলা হয় যে ডিজিটাল ডাটাবেজ থেকে মিলিয়ে তাদের কিছু আঙুলের ছাপ সাজিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের সে ফলের সত্যতা বিবেচনা করতে হবে। এ গবেষণায় দেখা যায়, তালিকার প্রথম দিকে থাকলে তাদের ছাপ মিলানোর সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়, একইভাবে তালিকার নিচের দিকে আসল ছাপ থাকলে সেটি মিলানোর সম্ভাবনা হ্রাস পেয়েছে।
কিন্তু এর মানে এই নয় যে আইন প্রয়োগকারী সংগঠনের আঙুলের ছাপ ব্যবহার করা বন্ধ করে দেয়া উচিত। তারা অবশ্যই ব্যবহার করবেন, কিন্তু তা অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে সতর্কতা অবলম্বন করে। সেক্ষেত্রে দায়িত্বটা খালি আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠনের থাকেবনা। গবেষকদের কাছে দায়িত্ব থাকে আরও গবেষণা করে আঙুলের ছাপ উত্তোলন থেকে শুরু করে বিশ্লেষণের প্রক্রিয়াকে আরও পরিমার্জিত করা। তাছাড়া অভিজ্ঞদের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে Cognitive bias পরিত্রাণের বিষয়টিও একটু মাথায় রাখা প্রয়োজন। পরিশেষে বলা যায়, আঙুলের ছাপ বিষয়ে অভিজ্ঞগণ তাদের মতামত উপস্থাপন করেন, কোনো সত্য নয়।
সংক্ষেপে দেখুনই সিম কী?
যুগ যুগ ধরে আমরা মোবাইল ফোনে সিম কার্ড ব্যবহার করে আসছি। আমাদের জীবনে সিম কার্ড একটি অপরিহার্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এটি ছাড়া হয়তো মোবাইল অচল হয়ে পড়ে না, কিন্তু মোবাইল ফোন ব্যবহারের অর্থ হারিয়ে ফেলে। ১৯৯১ সালে সিম কার্ড তৈরি হওয়ার পর থেকে একে খুব একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি। নতুন সিম প্রযুক্তবিস্তারিত পড়ুন
যুগ যুগ ধরে আমরা মোবাইল ফোনে সিম কার্ড ব্যবহার করে আসছি। আমাদের জীবনে সিম কার্ড একটি অপরিহার্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এটি ছাড়া হয়তো মোবাইল অচল হয়ে পড়ে না, কিন্তু মোবাইল ফোন ব্যবহারের অর্থ হারিয়ে ফেলে।
১৯৯১ সালে সিম কার্ড তৈরি হওয়ার পর থেকে একে খুব একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি। নতুন সিম প্রযুক্তির সাথে আকারে ছোট হয়ে ন্যানো, মাইক্রোতে পরিণত হলেও এর মূল ধারণার তেমন পরিবর্তন হয়নি। প্রযুক্তির যুদ্ধে কার্ডটি এতটা সময় টিকে থাকলেও এবার তার অবসরের সময় হয়েছে। বর্তমান সিম কার্ডকে প্রতিস্থাপিত করতে যাচ্ছে ই-সিম বা এম্বেডেড (Embedded) সিম। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি ডিভাইসে এটি যুক্ত থাকলেও ভবিষ্যতে এটিই হবে নতুন স্ট্যান্ডার্ড।
ই সিম কী?
ই-সিম নিয়ে বলার আগে সিম কীভাবে কাজ করে এটি নিয়ে কিছু বলা যাক। সিম শব্দটির পূর্ণরুপ সাবস্ক্রাইবার আইডেন্টিটি মডিউল (Subscriber Identity Module), অর্থাৎ এটি ব্যবহারকারীর পরিচয় বহন করে। সিম ক্যারিয়ার বা সিম কোম্পানির কাছে আপনার পরিচয় নিশ্চিত করে একটি সিম কার্ড। ফলে আপনি সেই ক্যারিয়ারের নেটওয়ার্ক ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন। যখন এটি করা সম্ভব হয় না বা কোনো ত্রুটির সৃষ্টি হয় তখনই আপনার ফোনটি নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
একটি সিমের মাঝে থাকে International Mobile Subscriber Identity (IMSI) Number যেটি সম্পূর্ণ ইউনিক বা অনন্য একটি নাম্বার। এই নাম্বারটি মোবাইল ফোন দ্বারা আপনার পছন্দের সিম নেটওয়ার্কের কাছে পাঠানো হয়, যার ফলে তারা আপনাকে চিনতে পারে। এর সাথে একটি অথেন্টিকেশন কি থাকে, যার ফলে ভুল তথ্য পাঠানো সম্ভব হয় না।

ই-সিমের সাথে সাধারণ সিমের পার্থক্য; Source: Thales Group
ই-সিম একইভাবে কাজ করে, কিন্তু এক্ষেত্রে সিমকার্ডের এই প্রযুক্তিগুলো বিল্ট ইনভাবেই ফোনের মধ্যে দেয়া হয়। সহজ কথায়, প্রসেসর যেমন ফোনের চিপসেট-এ বসানো থাকে, তেমনই সিমটিও থাকবে। এজন্যই একে বলা হয় EMBEDDED SIM। সাধাণরত এটি আমরা দেখতে পারবো না কিংবা বেরও করতে পারবো না। একটি সাধারণ সিমে এসব তথ্য একেবারেই লিখে দেয়া থাকে, কিন্তু ই-সিমে এসব তথ্য সিম ক্যারিয়ারভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। অর্থাৎ আপনি আপনার নেটওয়ার্কের তথ্য পরিবর্তন করে সহজেই এক নেটওয়ার্ক থেকে অন্য নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারবেন।
আজকাল কিছু ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে সাইন ইন করে ব্যবহার করতে হয়, সেভাবে সিমের নেটওয়ার্কে তথ্য দিয়ে নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হবে। সাধারণ সিমের চেয়ে আকারেও এটি ক্ষুদ্রাকার। যেখানে একটি রেগুলার সিম ১৫×২৫ মিলিমিটার এবং বর্তমান সবচেয়ে ক্ষুদ্র ন্যানো সিম ৮.৮×১২.৩ মিলিমিটার আকারের, সেখানে একটি ই-সিমের প্রস্থ শুধুমাত্র ৬.০ মিলিমিটার। এই ক্ষুদ্র আকারের জন্য যেমন কোনো ডিভাইসে অন্যান্য কম্পোনেন্টের জন্য জায়গা পাওয়া যাচ্ছে, তেমনই ক্ষুদ্র বা আইওটি ডিভাইসে সিমের ব্যবহারও বাড়ছে।

সিমের প্রকারভেদ; Source: Hologram
ই-সিমের সুবিধা
বর্তমান সিম কার্ডের তুলনায় ই-সিমের সুবিধার পরিধি অনেক বড়। প্রথমত, এর ব্যবহার অনেক ক্ষুদ্র ডিভাইসে করা যাবে। ফোনের ইন্টারনাল ডিজাইন পরিবর্তন করে আরও নতুন ফিচার যোগ করা যাবে কিংবা আরও স্লিম ডিভাইস আমরা পাবো। কোনো ফোন ওয়াটারপ্রুফ না হওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হচ্ছে সিমকার্ড ট্রে। এটি না থাকলে ওয়াটারপ্রুফ ফোন পাওয়া তুলনামূলক সহজ হয়ে উঠবে।
ই-সিম দিয়ে সবচেয়ে বেশি সুবিধা লাভ করবে যারা ভ্রমণ করে বেশি। এক দেশ থেকে অন্য দেশ কিংবা দেশের অভ্যন্তরেই হোক না কেন, সিম পরিবর্তন করা একটি ঝামেলা। একাধিক সিম ব্যবহারে হারিয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া সিমকার্ড কেনার ব্যাপার তো আছেই। আজকাল সিম হারিয়ে গেলে আবার রিপ্লেস করতে হয়, সিমের নাম্বারগুলো আর পাওয়া যায় না। ই-সিম ব্যবহারে এসব কোনো ঝামেলা নেই। এটি পরিবর্তন করতে হয়তো সাইন আপ বা সিম অপারেটরে একটি কলই যথেষ্ট।

ই-সিমের সুবিধাসমূহের ধারণা; Source: Thales Group
সিম বা নাম্বার হারিয়ে যাওয়ার নেই কোনো সম্ভবনা। আমদের থ্রি-জি থেকে ফোর-জি-তে যাওয়ার জন্য সিম পরিবর্তন করতে হয়েছে, কিন্তু একটি ফাইভজি সমর্থিত ই-সিম সম্বলিত ফোনে এই ঝামেলা নেই। অর্থাৎ ফাইভজি আসলে তারা সবার আগে যুক্ত হতে পারবে কোনোপ্রকার ঝামেলা ছাড়াই।
ফোন চুরির ঘটনা অহরহ শোনা যায় এবং প্রতিনিয়ত হচ্ছে। ই-সিমে সংযুক্ত থাকলে ফোন চুরিও কমে যাবে বা চুরি হলেও সহজেই পাওয়া যাবে। ফোন চুরি করেই সিম ফেলে দেয়ার সুযোগ ই-সিমে থাকবে না। প্রতিটি ফোন সিমের সাহায্যে সহজেই ট্র্যাক করা যাবে। শুধু ব্যবহারকারীদের জন্য নয়, সিম কোম্পানিগুলোর জন্যও এটি একটি শ্রমসাশ্রয়ী সংযোজন। সিম উৎপাদন এবং ডিস্ট্রিবিউশনে সময় ও সম্পদ দুটোই বাঁচবে। সিম কেনার জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। অপ্রতুল এলাকাগুলোতে সব সিম পাওয়া যায় না। এ সমস্যার সমাধান হবে।
কোনো অসুবিধা রয়েছে কি?
একটি ই-সিমের কার্যকারিতা নির্ভর করে সিম কোম্পানি সেটি সমর্থন করবে কি না তার ওপর। সারাবিশ্বে এটি সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারোপযোগী করে গড়ে তুলতে সিম কোম্পানিগুলোর সমর্থন অপরিহার্য। এজন্য বর্তমান ফোনগুলোতে এখনও স্ট্যান্ডার্ড সিম ব্যবহার চালু রয়েছে। তবে বিশ্বের সেরা সিম কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই তাদের সার্ভিসে ই-সিম যোগ করেছে। এসবের মাঝে এটিএন্ডটি, টি-মোবাইল, ভেরাইজন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এ বছর ৯০টি দেশের প্রায় ২০০ মোবাইল সিম অপারেটরদের তাদের সেবা ই-সিমে হালনাগাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আশা করা যায় সমর্থিত ফোন বৃদ্ধির সাথে সাথে সমর্থিত সিম নেটওয়ার্কও বৃদ্ধি পাবে।

ই-সিম সমর্থিত ডিভাইস; Source: Thales Group
ই-সিম সমর্থিত ডিভাইসগুলো
সময়ের সাথে সাথে ই-সিম সমর্থিত ডিভাইসের সংখ্যাও বাড়ছে। বর্তমানেও কিছু ফোন এবং পরিধানযোগ্য ডিভাইস ই-সিম সমর্থন করে। এর মাঝে রয়েছে অ্যাপলের আইফোনগুলো। সর্বশেষ আইফোন ১১, ১১ প্রো ও ১১ প্রো ম্যাক্স ই-সিম সমর্থিত। এছাড়া আইফোন এক্সএস, এক্সআর-ও ই সিম সমর্থন করে। শুধু আইফোন নয়, অ্যাপল ওয়াচ ৩, ৪ ও ৫ এবং কিছু আইপ্যাড মডেলও ই-সিম ব্যবহারযোগ্য।
অ্যাপল ছাড়াও গুগলের সর্বশেষ পিক্সেল ফোনগুলো ই-সিম সমর্থিত। এর মধ্যে রয়েছে পিক্সেল ৪, পিক্সেল ৩ ও পিক্সেল ৩এ। এছাড়া স্যামসাং এর গ্যালাক্সি জেড ফ্লিপ, গ্যালাক্সি ওয়াচ, ওয়াচ একটিভ ২ ও গিয়ার এস২-তে ই-সিম সমর্থন রয়েছে। মাইক্রোসফট, লেনোভো ও হুয়াওয়ের কিছু ডিভাইসেও ই-সিমের সমর্থন রয়েছে।
নেটওয়ার্কের সাথে অপারেটিং সিস্টেমেরও এই প্রযুক্তি সমর্থন করতে হয়। ভালো সংবাদ হলো গুগলের অ্যান্ড্রয়েড, আইওএস, ওয়্যার ওএস এবং উইন্ডোজ ১০ ই-সিম সমর্থন করে। আশা করা যায় আগামী ৫ বছরের মধ্যে সারাবিশ্বে ই-সিম বহুলভাবে ব্যবহার করা শুরু হবে। আধুনিকতার ছোঁয়া কোনো ক্ষেত্রেই বাদ পড়ে না!
সংক্ষেপে দেখুনভ্যাক্সিনেশনের পদ্ধতি কি সবসময় একি রকম ছিলো?
টিকা বা ভ্যাক্সিনের খোঁজ পেতে ইতিহাসের পাতা উল্টে চলে যেতে হবে শত শত বছর আগে। জনশ্রুতি আছে- বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা নাকি সাপের কামড়ে পাত্তাই দিতেন না, কারণ তারা আগেই সাপের বিষ বের করে পান করে নিতেন। এভাবে নাকি তাদের মধ্যে সাপের কামড়ের প্রতি প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হত। এর সত্য-মিথ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আজ থেকবিস্তারিত পড়ুন
টিকা বা ভ্যাক্সিনের খোঁজ পেতে ইতিহাসের পাতা উল্টে চলে যেতে হবে শত শত বছর আগে। জনশ্রুতি আছে- বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা নাকি সাপের কামড়ে পাত্তাই দিতেন না, কারণ তারা আগেই সাপের বিষ বের করে পান করে নিতেন। এভাবে নাকি তাদের মধ্যে সাপের কামড়ের প্রতি প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হত।
এর সত্য-মিথ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আজ থেকে প্রায় ছয় সাতশ বছর আগে চীনে ইনঅকুলেশন নামে একটি পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, যাকে আধুনিক ভ্যাক্সিনের আদিরূপ বলা যেতে পারে। তখন মিং রাজবংশের সময়, গুটিবসন্ত মোটামুটি নিয়মিত হানা দিচ্ছে। এর থেকে রক্ষা পেতেই এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। গুটিবসন্তের রোগীর পুঁজ থেকে রোগের উপাদান নিয়ে ঢুকিয়ে দেয়া হতো সুস্থ মানুষের দেহে, দেখা যেত পরবর্তীতে এদের অধিকাংশই গুটিবসন্ত মহামারীর ভেতরেও দিব্যি ভাল থাকেন।

প্রাচীন চীনে ইনঅকুলেশন; Image Source: historyofvaccines.org
রোগসম্বলিত চামড়ার অংশ প্রথমে শুকিয়ে নেয়া হতো, এরপর ভাল করে ছেঁচে বানানো হতো পাউডার। এই পাউডার টেনে নিতে হতো নাক দিয়ে। মেয়েদের জন্য বাম নাক, আর ছেলেদের জন্য ডান নাক দিয়ে পাউডার টেনে নেয়ার বিধান ছিল চীনে।
চীন থেকে এই পদ্ধতি পৌঁছে যায় উসমানি দরবারে। গুটিবসন্তে ইউরোপ তখন কাহিল। উসমানি দরবার থেকে ইংল্যান্ডে খবর চলে যায় ইনুঅকুলেশনের, বিরোধিতা সত্ত্বেও আস্তে আস্তে ইনুঅকুলেশনের জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং রাজপরিবারও তা ব্যবহার করে। কিন্তু সরাসরি রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ, এবং ব্যাপক জনগোষ্ঠীর উপর প্রয়োগও সহজসাধ্য নয়। ফলে চলছিল নতুন পদ্ধতির খোঁজ।

গুটিবসন্তে সাফ হয়ে যাচ্ছিল ইউরোপ; Image Source: vox.com
এগিয়ে এলেন প্রথিতযশা চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার। ১৭৯৬ সালের ১৪ মে জেমস ফিপ্স নামের আট বছরের এক বালকের শরীরে প্রবেশ করালেন গোবসন্তের জীবাণু, যা ছিল গুটিবসন্তের তুলনায় দুর্বল একটি রোগ। তৎকালীন ইংল্যান্ডে অনেকেই জানত যাদের গোবসন্ত বা কাউপক্স হয় তারা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয় না।
তবে জেনারই প্রথম পুরো বিষয়ই একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মধ্যে নিয়ে আসেন। ফিপ্স প্রথম এক সপ্তাহ কিছুটা অসুস্থবোধ করলেও শীঘ্রই সেরে উঠল। পরবর্তীতে গুটিবসন্তের জীবাণু তার উপর প্রয়োগ করে দেখা গেল যে রোগে কাতারে কাতারে মানুষ মরে যাচ্ছে তাতে ফিপ্সের কিছুই হচ্ছে না। জেনার তার গবেষণার ফলাফল নিয়ে প্রকাশ করলেন খটমটে একটি বই, An inquiry into the causes and effects of the variolae vaccinae: a disease discovered in some of the western counties of England, particularly Gloucestershire, and known by the name of the cow pox। গরুর ল্যাটিন নাম ভ্যাক্কা থেকে তিনি তার পদ্ধতির নাম দিলেন ভ্যাক্সিনেশন, যেহেতু গোবসন্তের জীবাণু ব্যবহার করেছেন তিনি। তার এই ওষুধের নাম হলো ভ্যাক্সিন। তখন এটি শুধু গুটিবসন্তের জন্যই পরিচিত ছিল। এর ফলেই জেনার পরে পান ভ্যাক্সিনেশনের জনকের স্বীকৃতি।

এডওয়ার্ড জেনার © DEA Picture Library/Getty Images
তৎকালীন রয়্যাল সোসাইটি জেনারের তথ্য উপাত্তের স্বল্পতার জন্য এই নতুন পদ্ধতিতে আগ্রহ দেখাল না। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেক চিকিৎসক জেনারের ভ্যাক্সিনেশন ব্যবহার করে সুফল পেতে থাকলেন। ১৮০১ সাল নাগাদ প্রায় এক লাখ মানুষ ভ্যাক্সিন পেয়ে যায়। ধীরে ধীরে ইনঅকুলেশনকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দিয়ে ভ্যাক্সিনেশন হয়ে উঠল গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে মূল প্রতিরোধ।
তবে জেনারের প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতাও খুব দ্রুত বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিগোচর হয়। একই পদ্ধতিতে অন্য কোনো রোগের প্রতিরোধক তৈরি করা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখতে পেলেন গুটিবসন্তের মতো যেরকম গরুতে গোবসন্ত, সেরকম তো সব রোগে হয় না। তাছাড়া অনেক পশুবাহিত রোগ তো মানুষের জন্য মারাত্মক হতে পারে। কাজেই তারা মনোযোগী হলেন রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকে নিষ্ক্রিয় করার দিকে। তাহলে হয়তো এগুলো মানবদেহে নিরাপদে প্রবেশ করানো সম্ভব হবে। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মরবে, রোগ হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পাবে, একইসাথে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে।
সুতরাং বিজ্ঞানীরা জোর গবেষণা চালালেন। তারা উপলব্ধি করলেন যে তাদের সামনে দুটি পথ খোলা- ১) জীবাণুকে হত্যা করে সুস্থদেহে প্রবেশ করানো, এবং ২) জীবাণুকে বাঁচিয়ে রাখা, কিন্তু নানা প্রক্রিয়ায় তাকে দুর্বল করে দেয়া যাতে তার মানবদেহে রোগ তৈরির সামর্থ্য কমে যায়। দুই ক্ষেত্রেই তারা একই ফলাফল আশা করছিলেন।
জেনারের আবিষ্কারের প্রায় দেড়শ বছর পর্যন্ত এই নিয়ে বিভিন্ন দেশের নানা বিজ্ঞানি গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ফরাসি অনুজীববিজ্ঞানী লুই পাস্তুর এক অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন। তিনি অ্যানথ্রাক্স আর জলাতঙ্ক, বা র্যাবিসের জীবাণুকে অক্সিজেন আর তাপে রেখে দেখতে পান তাদের প্রাণঘাতী ক্ষমতা কমে গেছে। এই দুর্বল জীবাণু কাজে লাগিয়ে ১৮৮১ সালে অ্যানথ্রাক্স আর ১৮৮৫ সালে জলাতঙ্কের টিকা বানালেন তিনি। ১৮৮৭ সালে তার প্রতিষ্ঠিত পাস্তুর ইন্সটিটিউট পাস্তুরের মৃত্যুর পরও ভ্যাক্সিন নিয়ে কাজ চালিয়ে যায়। বর্তমান পৃথিবীতে ফ্রান্সের এই ইনস্টিটিউট ভ্যাক্সিন নিয়ে কাজ করা অন্যতম একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান।


গবেষণাগারে লুই পাস্তুর © Bettmann Archive / Getty Images
বিংশ শতকের প্রারম্ভে ভ্যাক্সিনের ক্ষেত্রে আরেকটি বিপ্লব সাধিত হয়। ফরাসি চিকিৎসক অ্যালবার্ট কাল্মেট (Albert Calmette) আর পশু চিকিৎসক ক্যামিল গুয়েরিন (Camille Guérin) জেনার আর পাস্তুরের দেখানো পথে তৈরি করলেন তৎকালীন অন্যতম ভয়ানক রোগ যক্ষ্মার টিকা। তারা এজন্য গরুতে যক্ষ্মা সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াকে বারবার বংশবিস্তার করালেন কৃত্রিম পরিবেশে। ২৩০ প্রজন্ম পরে এমন একটি প্রজাতি পাওয়া গেল, যা যক্ষ্মার কারণ ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতি হলেও রোগ উৎপাদনের ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এটা দিয়েই তারা বানিয়ে ফেলেন তাদের ভ্যাক্সিন, তাদের নামানুসারে যা আজও বিসিজি (ব্যাসিলি ক্যাল্মেট গুয়েরিন) নামে পরিচিত।
বিসিজি আজও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে; Image Source: pharmaceutical-technology.com
পাস্তুরের পদ্ধতি বেশ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। হামসহ অন্যান্য বেশ কিছু রোগের জন্য ভ্যাক্সিন প্রস্তুত করা হলো এভাবে। কিন্তু এখানেও সমস্যার শেষ হলো না। বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন দুর্বল ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াও বিভিন্ন কারণে রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আজকের দিনে আমরা জানি মিউটেশনের ফলে এসব জীবাণু অনেক সময় আরো ভয়ানক রোগের জন্ম দেয়। এজন্য মৃত জীবাণু ব্যবহার করা অনেকেই বেশি নিরাপদ মনে করছিলেন।
স্যাল্মন আর স্মিথ নামে দুই গবেষক এবং পাস্তুর ইন্সটিটিউট থেকে প্রায় একই সময় প্রথম মৃত জীবাণু দ্বারা ভ্যাক্সিন তৈরি করা হয়। এই পদ্ধতি প্রথমে প্রয়োগ করা হয় টাইফয়েড, কলেরা আর প্লেগের জীবাণুর উপরে। ইংল্যান্ডে রাইট আর সেম্পল নামে দুজন বিজ্ঞানী প্রথম টাইফয়েডের ভ্যাক্সিন প্রয়োগ করেন। প্লেগের টিকা মানুষের উপর সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন হ্যাফকিন। কোল নামে আরেক বিজ্ঞানী তাপে মৃত কলেরা জীবাণু ভ্যাক্সিন হিসেবে বানান। এর আগে ফেরান আর হ্যাফকিন আলাদা আলাদাভাবে জীবিত জীবাণু দিয়ে কলেরার টিকা বানালেও শেষমেশ টিকে যায় কোলের ভ্যাক্সিনই।
উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে মৃত জীবাণু দ্বারাই কলেরা, ধনুষ্টংকার, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি রোগের ভ্যাক্সিনেশন করা হতো। এভাবে উনবিংশ শতকের শেষদিকে প্লেগের জন্য একপ্রকার ভ্যাক্সিন বানানো হয়েছিল। জীবাণু মারার জন্য প্রথমে উচ্চ তাপ ব্যবহার করাই ছিল চল। তবে ১৯২৫ সালে খ্যাতনামা ব্রিটিশ রোগ প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্সান্ডার গ্লেনি আর হপকিন্স ফরমাল্ডিহাইড দিয়ে টিটেনাসের টক্সিন নিষ্ক্রিয় করেন। পরবর্তীতে ফরমাল্ডিহাইড অথবা ফরমালিনের মিশ্রণ দিয়ে জীবাণু মারার প্রক্রিয়া জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই পদ্ধতিতে ১৯২৬ সালে ডিপথেরিয়ার ভ্যাক্সিন তৈরি হয়। ধনুষ্টংকারের ভ্যাক্সিন বাজারে আসতে লেগে যায় আরো ২২ বছর।
ক্যাল্মেট আর গুয়েরিন কৃত্রিম পরিবেশে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি ঘটিয়ে তা দিয়ে ভ্যাক্সিন বানান। ভাইরাসের জন্য সেরকম কৃত্রিম পরিবেশ আবিষ্কার হতে হতে প্রায় ৩৫ বছর লেগে যায় (১৯৫০-৮৫)। এর সূত্র ধরে ১৯৫৫ সালে আমেরিকান ভাইরাস বিশেষজ্ঞ জোনাস স্যাক প্রস্তুত করেন পোলিওর টিকা, যার মধ্যে ছিল মৃত ভাইরাস। পোলিও ভাইরাস মারতে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ফরমাল্ডিহাইড। ইঞ্জেকশন দিয়ে শরীরে দিতে হতো স্যাকের ভ্যাক্সিন। এর সুবিধা ছিল- মৃত বলে পোলিও হবার কোনো সম্ভাবনা নেই।
স্যাকের সাত বছরের মাথায় দুর্বল পোলিও ভাইরাস ব্যবহার করে মুখে খাবার পোলিও টিকা নিয়ে এলেন আমেরিকান-পোলিশ গবেষক অ্যালবার্ট স্যাবিন। তার পোলিও ভ্যাক্সিনই ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়, কারণ মুখে দেয়া যেত বলে এর প্রয়োগকারীর জন্য কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণের দরকার হতো না। তবে এখানে পোলিও হবার খুব সামান্য একটি ঝুঁকি ছিল, তবে পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয় এই ঝুঁকি প্রায় শূন্য।

জোনাস স্যাক (বামে) এবং অ্যালবার্ট স্যাবিন (ডানে) © Salon/Getty Images
১৯৪০ সালের পর থেকে বিজ্ঞানীরা জীবাণুর দেহের বিভিন্ন অংশ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে থাকেন। তাদের মাথায় ছিল কীভাবে সম্পূর্ণ জীবাণু ব্যবহার না করে সামান্য অংশ দিয়েই ভ্যাক্সিন তৈরি করা যায়। এর পথ ধরেই এলো হেপাটাইটিস বি-র ভ্যাক্সিন।
এর সাথে সাথে বিজ্ঞানীরা কাজ করছিলেন কীভাবে ব্যাকটেরিয়ার মতো ভাইরাসকেও নিষ্ক্রিয় করে ভ্যাক্সিন তৈরি করা যায়, কারণ ততদিন পর্যন্ত মৃত জীবাণু দিয়ে তৈরি ভ্যাক্সিন সবই ছিল ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের বিরুদ্ধে। সর্বপ্রথম এভাবে প্রস্তুত ভ্যাক্সিন হলো ইনফ্লুয়েঞ্জার, এরপর এলো হেপাটাইটিস-এ ভ্যাক্সিন। বর্তমানে অণুজীবের ডিএনএ, আরএনএ, ভেক্টর ভাইরাস ইত্যাদি ব্যবহার করে ভ্যাক্সিন তৈরির কাজ চলছে, যা করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
ভ্যাক্সিন তৈরি এবং বিপণন একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। সরকারিভাবে যতটা প্রণোদনা দেয়া হয়, তার থেকে বেশি অর্থ আসে বহুজাতিক ওষুধ প্রতিষ্ঠান থেকে। তাদের মাধ্যমেই নতুন নতুন ভ্যাক্সিন আবিষ্কার ও প্রয়োগ হচ্ছে। ২০২০ সালের হিসেবে নিম্নের দশটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ভ্যাক্সিন গবেষণা ও প্রস্তুতে শীর্ষে ছিল।
গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন
নামকরা ওষুধ কোম্পানি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের জন্ম ১৮৭৩ সালে জোসেফ এডওয়ার্ড নাথান নামে এক ভদ্রলোকের হাত ধরে, নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে। বর্তমানে লন্ডনভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের তালিকায় রয়েছে জলাতঙ্ক আর চিকেনপক্সসহ আরো অনেক ভ্যাক্সিন।
মার্ক
১৮৯১ সালে জর্জ মার্কের প্রতিষ্ঠিত এই মার্কিন কোম্পানি বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। তাদের অন্যতম ভ্যাক্সিনের মধ্যে আছে নারীদের সারভাইকাল ক্যান্সারের ভ্যাক্সিন, হেপাটাইটিস বি-এর ভ্যাক্সিন ইত্যাদি।
সানোফি
১৯৭৩ সালে আলোর মুখে দেখা ফরাসি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সানোফির ঝুলিতে আছে পোলিওর ভ্যাক্সিনের মতো সফল টিকা।
ফাইজার
করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে আসা ফাইজার মার্কিন কোম্পানি। ১৮৪৯ সালে চার্লস ফাইজার আর চার্লস এরহার্ট মিলে এর ভিত্তি বুনে দেন। অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে মেনিনজাইটিসের ভ্যাক্সিনে তারা অগ্রগামী।
নোভাভ্যাক্স
এটিও ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি মার্কিন কোম্পানি। এরা ভ্যাক্সিন তৈরিতে জৈবপ্রযুক্তি বা বায়োটেকনোলজি নিয়ে কাজ করে। শ্বাসতন্ত্রের কিছু রোগের ভ্যাক্সিন তারা তৈরি করেছে।
এমারজেন্ট বায়োসল্যুশন
বায়োটেকনোলজিভিত্তিক এই মার্কিন কোম্পানির জন্ম ১৯৯৮ সালে। তাদের অ্যানথ্রাক্স ভ্যাক্সিন সুপরিচিত।
সিএসএল
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সিএসএল-এর যাত্রা শুরু ১৯১৬ সালে। ফ্লু, নিউমোনিয়া ইত্যাদি রোগের ভ্যাক্সিন আছে তাদের।
ইনভিয়ো
১৯৭৯ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করা ইনভিয়োর হেড অফিস যুক্তরাষ্ট্রের প্লাইমাউথে অবস্থিত। এইচআইভি-র ভ্যাক্সিন নিয়ে তারা প্রচুর কাজ করছে।
বাভারিয়ান নর্ডিক
ড্যানিশ এই কোম্পানি ১৯৯৪ সাল থেকে কাজ করছে। তারা সারভাইকাল ক্যান্সারের ভ্যাক্সিনসহ আরো কিছু ভ্যাক্সিনের জন্য নাম করেছে।
মিটসুবিশি টানাবে
১৯৮১ সাল থেকে জাপানী এই প্রতিষ্ঠান নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। চিকেনপক্সের ভ্যাক্সিন আছে তাদেরও।
সংক্ষেপে দেখুনরূপকথার আশ্চর্য সেই ফুটন্ত পানির নদী কি সত্যিই আছে বাস্তবে ?
ছোটবেলায় দাদা-দাদীর মুখে রূপকথার গল্প শোনেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। রূপকথার গল্প আমাদের ছোটবেলার চিন্তা-ভাবনার অনেকাংশ জুড়ে থাকে। অনেকে তো আবার স্বপ্নের রাজ্যের রাক্ষসের হাত থেকে জিয়নকাঠি দিয়ে রূপবতী ঘুমন্ত রাজকন্যাকে জাগিয়ে নিজের করে নিতে চায়। কিন্ত কখনও কি বড় হয়ে পরিণত বয়সে গিয়ে রূপকথার সবিস্তারিত পড়ুন
ছোটবেলায় দাদা-দাদীর মুখে রূপকথার গল্প শোনেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। রূপকথার গল্প আমাদের ছোটবেলার চিন্তা-ভাবনার অনেকাংশ জুড়ে থাকে। অনেকে তো আবার স্বপ্নের রাজ্যের রাক্ষসের হাত থেকে জিয়নকাঠি দিয়ে রূপবতী ঘুমন্ত রাজকন্যাকে জাগিয়ে নিজের করে নিতে চায়। কিন্ত কখনও কি বড় হয়ে পরিণত বয়সে গিয়ে রূপকথার স্বপ্নের মতো শোনা গল্পের ঘটনাকে বাস্তবে রূপান্তরের চেষ্টা করেছেন? বড় হয়েও কি জানতে ইচ্ছা করেছিল, মেঘমল্লার গল্পের পাইন গাছগুলো এত তাড়াতাড়ি এত লম্বা কীভাবে হয়? বা রিপভ্যান উইংক্যাল এক ঘুমে কীভাবে এত লম্বা ২০টি বছর সময় কাটিয়েছিল? বড় হয়ে এই ছোটবেলায় শোনা আজব গল্পগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন কি? বলবেন হয়তো, “আরে এসব রূপকথার গল্পের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজতে যাওয়া পাগলামি ছাড়া কিছু?”

স্বপ্নবাজ তরুণ আন্দ্রেজ রুজো; Image Source: Explorer Classroom
আপনি-আমি সেই চেষ্টাকে পাগলামো বলে উড়িয়ে দিলেও উড়িয়ে দিতে পারেননি লিমায় বেড়ে ওঠা আন্দ্রেজ রুজো নামের এক স্বপ্নবাজ তরুণ, যিনি ছোটবেলায় দাদার মুখে শোনা রূপকথার ফুটন্ত পানির নদীর খোঁজ করাকে রীতিমতো নিজের জীবনের লক্ষ্যে পরিণত করেন। পৃথিবীর সামনে নিয়ে আসেন এমন এক আশ্চর্য নদী, যার পানির তাপমাত্রা গড়ে প্রায় ৮৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাঝে কোনো প্রাণীকে জীবন্ত সেদ্ধ করে ফেলতে সক্ষম, যেখানে একটু পা ফসকে পড়ে যাওয়ার ভুল হতে পারে ভয়ানক কষ্টদায়ক মৃত্যুর কারণ।
রূপকথা, রূপকথার মতো এক আবিষ্কারের জননী
আমাজন নানা আশ্চর্য রহস্যে ঘেরা এক জঙ্গল। এর অনেক অংশই এখনও পর্যন্ত মানুষের অজানা রয়ে গেছে। আমাজনের পেরু অংশের একদম মধ্যভাগে সবচাইতে ঘন জঙ্গলে আশ্চর্য এই ফুটন্ত পানির নদীটির অবস্থান। আমাজনের মোট আয়তনের শতকরা ১৩ ভাগ পেরুতে অবস্থিত, যেটি আমাজনের সবচেয়ে ঘন, রহস্যময় এবং ভয়ংকর অংশ। আমাজন জঙ্গল এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভেদ্য জায়গা। আর স্বভাবতই এ জায়গা নিয়ে অনেক রূপকথা বা এমন অনেক অবিশ্বাস্য গল্প মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। আর এ জঙ্গলের এমন দুর্ভেদ্যতার কারণে সেই মুখরোচক গল্পগুলো কি শুধুই গল্প, নাকি বাস্তব- তা বের করা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। মানুষের এই জানার স্বল্পতার কারণে, এ জঙ্গল নিয়ে প্রচলিত অনেক গল্প অনেক সময় বাস্তবে ধরা দেয়।
এমনটাই ঘটেছিল আন্দ্রেজ রুজোর আবিষ্কার করা ফুটন্ত পানির নদীর বেলায়। আন্দ্রেস রুজোর শোনা রূপকথার গল্পটি ছিল এক হারিয়ে যাওয়া শহরের। মেক্সিকো এবং পেরুতে তৎকালীন স্প্যানিশ শাসকের সৈন্যরা শেষ ইনকা শাসককে হত্যা করে আমাজন জঙ্গলে সোনা খুঁজতে বের হয়। কিন্তু আমাজনের অপরিচিত পরিবেশে টিকে থাকা এতটাও সোজা না। কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসার পর তারা জঙ্গলের মানুষখেকো সাপ, বিষাক্ত ও ফুটন্ত পানির নদীর কথা মানুষদের জানায়। এই আশ্চর্য গল্প পেরুতে খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু গল্পের আশ্চর্য নদী বাস্তবে থাকতে পারে, তা কেউ কল্পনা করতে পারেনি। তা মূলত আমাজনকে নানা কল্পকাহিনী এবং এর দুর্গম পরিবেশের কারণেই। আর এমনই অনেক প্রচলিত রূপকথার গল্পের মতো এক গল্প বাস্তবে রূপ নেবে, কে ভেবেছিল?
রূপকথার বাস্তবে রূপায়ণ
ছোটবেলায় শোনা এ গল্প আন্দ্রেস রুজোর চিন্তাধারায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে, যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়েও এ নদীর কথা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। ভূপদার্থ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের সাউদার্ন মেথডিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা আন্দ্রেস রুজো তার পড়াশোনা চলাকালেই এ নদীর অস্তিত্বের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করে জানার চেষ্টা করেন। প্রায় দু’বছর তিনি এ বিষয়ে অভিজ্ঞ অনেকের মতামত জানার চেষ্টা করেন।
কিন্তু সবাই তাকে হতাশ করেন, কারণ কোনো নদীর পানি এমন মাত্রায় গরম হতে হলে আশেপাশে আগ্নেয়গিরির উপস্থিতি জরুরি, কিন্তু পেরুর যে অংশে রুজো এমন নদীর উপস্থিতি দাবি করছিলেন, তার আশেপাশে প্রায় ৪০০-৪৫০ মাইল পর্যন্ত কোনো আগ্নেয়গিরি ছিল না। তাই স্বাভাবিকভাবে সবাই এই রূপকথার নদীকে শুধু মাত্র একটি কল্পকাহিনী বলেই উড়িয়ে দেন। এবং ঐ সময় এই রুপকথার নদী খোঁজার ব্যাপারটা অনেকটাই হাস্যকর হয় দাঁড়ায় সবার সামনে। তিনিও এ বিষয়ে আশা ছেড়ে দেন।

কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বদ্ধপরিকর; Image Source: Explorer Classroom
তিনি চূড়ান্তভাবে এ নদী নিয়ে গবেষণার সিদ্ধান্ত নেন পিএইচডি করার সময়। তার গবেষণা দলের কাজের অংশ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি জিওথার্মাল ম্যাপ তৈরি করেন গুগলের সাহায্যে, যেখানে আগের চেয়ে আরো ভালোভাবে ভূ-অভ্যন্তরস্থ তেল, গ্যাস, পানির প্রবাহ সম্পর্কে জানা যায়। যেহেতু পেরুতে খনিজ সম্পদ খোঁজা তার অন্যতম একটি লক্ষ্য ছিল, তাই গল্পের সেই নদীর কথা মাথায় রেখেই তিনি পেরুর জন্য এমন একটি জিওথার্মাল ম্যাপ তৈরি করেন। যেখানে দেখা যায়, আশেপাশে কোনো আগ্নেয়গিরি না থাকলেও আমাজনের কোনো কোনো ভূমির তাপমাত্রা রহস্যজনকভাবে অস্বাভাবিক হারে বেশি, যা রুজোর মনে অনেক আগ্রহের জন্ম দেয়। কারণ হঠাৎ করে এমন অস্বাভাবিক হারের তাপমাত্রার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তার কাছে ছিল না।
চরম আগ্রহের কারণেই তিনি কোনো এক ছুটিতে বাড়িতে এসে তার পরিবারকে এমন নদীর থাকার সম্ভাবনার কথা জিজ্ঞেস করেন। তার মা এবং ফুফু তাকে অবাক করে দিয়ে জানান, এমন নদীর অস্তিত্ব আসলেই আছে। শুধু তা-ই নয়, তারা ঐ নদী নিজ চোখে দেখেছেন বলে দাবি করেন, যা রুজোর অন্বেষণের জন্য অনেক বড় একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ২০১১ সালে তার ফুফুকে নিয়ে আজব নদী খোঁজার কাজে বেড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে অনেক প্রত্যাশিত সেই নদীর তিনি খোঁজও পেয়ে যান। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা।

নদীর পানির তাপমাত্রা পরিমাপরত আন্দ্রেস রুজো; Image Source: Explorer Classroom
সানাই-টিমপিসকা ও প্রচলিত লোক-কাহিনী
আন্দ্রেস রুজো ছিলেন প্রথম ভূবিজ্ঞানী, যিনি এই আজব নদী খুঁজে পান। কিন্তু ঐ নদী তিনিই সবার আগে খুঁজে পান- সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করবে এ নদীর প্রাচীন নাম। অবাক করা এই নদীটির প্রাচীন নাম ‘সানাই-টিমপিসকা’, যার অর্থ ‘সূর্যের তাপে ফুটন্ত’। স্থানীয়রা সূর্যের তাপকে এই নদীর এমন উষ্ণতার জন্য দায়ী করতেন। তার মানে, উত্তপ্ত নদীটি সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দারা অনেক আগে থেকে জানলেও তা পৃথিবীর সামনে কোনোভাবে আসেনি। নদীটিকে স্থানীয় বাসিন্দারা পবিত্রভূমি ভেবে পূজা করত। নদীর খোঁজ পেলেও সেখানে তার গবেষণা চালানো সহজ ছিল না। স্থানীয় লোককাহিনী এবং পুরোহিতদের কারণে নদীর সম্পর্কে বাইরে প্রচার করা নিষিদ্ধ ছিল। নদীর পাড়ে বসবাস করে মায়ানতুয়াকু ও সাঞ্চুয়ারিও হুইসটিন নামের দুই সম্প্রদায়।
এই দুই সম্প্রদায়কে ঘিরে অনেক লোককাহিনী প্রচলিত রয়েছে, যা স্থানীয়রা যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস করে আসছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মায়ানতু হলো আমাজন জঙ্গলের সেই আত্মা, যার মাথা ব্যাঙের মতো, কিন্তু শরীর টিকটিকির মতো। তার হাত-পা আবার কচ্ছপের মতো। তাদের বিশ্বাস, এই মায়ানতু নামক আত্মা তাদের জন্য উপকারী। আবার ‘ইয়াকু’ অর্থ পানি। এই নদীর পানিতেই মায়ানতুর মতো অনেক শক্তিশালী আত্মার বসবাস। আর শক্তিশালী ধর্মযাজক বাদে অন্য মানুষ তাই ঐ নদীতে যেতে ভয় পায়। এই ধর্মীয় আবেগ আর লোককাহিনীর প্রতি স্থানীয়দের দৃঢ় বিশ্বাসের কারণেই বাইরের পৃথিবী কোনোভাবেই এই নদীর ব্যাপারে জানতে পারেনি। যার কারণে আন্দ্রেস রুজো, ‘মায়েস্ট্রো জোয়ান’ নামের এক ধর্মযাজকের সাহায্য নিয়ে নদীতে পৌঁছান।

ধর্মযাজক মায়েস্ট্রো জোয়ান; Image Source: The Telegraph
ভৌগোলিক অবস্থান এবং অজানা কিছু তথ্য
ফুটন্ত পানির এই আশ্চর্য নদী মূলত আমাজনের পেরু অংশের একদম কেন্দ্রে অবস্থিত। লিমা থেকে ‘পুকালপা’ নগরী আকাশপথে এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। এটি পেরুর অন্যতম বৃহত্তম নগরী। এ নগরী থেকে ‘পাচিটা’ নদীতে যেতে সময় লাগে প্রায় দু’ঘণ্টা, এবং এ নদী দিয়েই সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত বয়েলিং ওয়াটার রিভার বা ফুটন্ত পানির নদীতে পৌঁছাতে হয়। নদীতে গিয়ে আন্দ্রেস রুজোর প্রথম ধাক্কা ছিল নদীর পানির তাপমাত্রা। তিনি উত্তপ্ত পানি ভেবেছিলেন, কিন্তু নদীর পানি আসলেই যে এতটা উত্তপ্ত হবে, তা তার ধারণার বাইরে ছিল। প্রথমেই তিনি থার্মোমিটারে পানির তাপমাত্রা পরীক্ষা করেন, যা ছিল প্রায় ২০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মতো; যা একেবারে সেদ্ধ করার মতো গরম না, কিন্ত কোনো প্রাণীকে মারার জন্য যথেষ্ট।
নদীর পানিতে বিভিন্ন ছোট ছোট প্রাণী, যেমন- ব্যাঙ, সাপ মরে ভেসে যেতে দেখেন আন্দ্রেস রুজো। তার মতে, কোনো প্রাণী নদীর পানিতে পড়ার পরেও সাঁতরে পার হতে চেষ্টা করে। কিন্তু প্রথমেই প্রচণ্ড উত্তপ্ত পানিতে তার চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার কারণে সে কিছু দেখতে পারে না। আস্তে আস্তে বাইরের চামড়া সেদ্ধ হতে শুরু করে, তারপর মুখের মাধ্যমে শরীরে ভেতরের অঙ্গে গরম পানি প্রবেশ করে। ঐ প্রাণীর লিভার, কিডনিসহ অভ্যন্তরীণ প্রায় সব অঙ্গ অকেজো হয়ে পড়ে আস্তে আস্তে; যার কারণে সে আর সাঁতরাতে পারে না। শক্তিহীন হয়ে একসময় প্রাণীটি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।
এই উত্তপ্ত নদীটি আমাজন জঙ্গলের মাঝে বয়ে যাওয়া নদীর একটা অংশ মাত্র। পুরো নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৯ কিলোমিটার, কিন্তু এর মাঝে প্রায় ৬.২৪ কিলোমিটার অংশ উত্তপ্ত। বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে এটা এতটাই গরম হয়, যা যেকোনো প্রাণীকে মেরে ফেলতে সক্ষম। এর তাপমাত্রা ২৭ থেকে ৯৪ ডিগ্রির মাঝে ওঠানামা করে। নদীর পানির তাপমাত্রা বছরের সেই সময়টাতেই একটু সহনীয় পর্যায়ে যায়, যখন প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। স্থানীয় মানুষ এ নদীর পানি চা তৈরি বা অন্যান্য রান্নার কাজে ব্যবহার করে।

গরম পানির কারণে মৃত দুর্ভাগা এক ব্যাঙ; Image Source: The Business Insider
উত্তপ্ততার কারণ কী?
এ নদীর পানি উত্তপ্ত হও্রয়ার পেছনে আন্দ্রেস রুজো তিনটি সম্ভাব্য কারণ দাঁড় করান।
১. তার প্রথম চিন্তা ছিল, এই নদীর পানি প্রাকৃতিক নাকি কৃত্রিম, তা নিয়ে। প্রাকৃতিকভাবে এমন এক নদীর প্রবাহিত হওয়ার জন্য দরকার অনেক পরিমাণ তাপের যোগান, অনেক বড় আকারের পানির প্রবাহ আর এমন কোনো ব্যবস্থা, যা পানিকে একদম উপর থেকে গভীর পর্যন্ত উত্তপ্ত রাখবে। এর কোনোটাই সেখানে ছিল না। তাই এ চিন্তা বাদ দিতে হয়।
২. পৃথিবীতে এ নদীর পানিই শুধু মাত্র উত্তপ্ত নয়। আরো অনেক নদী-হ্রদ আছে, যেখানে পানি উত্তপ্ত; কিন্তু এগুলোর সবগুলোই কোনো না কোনো আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি অবস্থিত। এ কারণে উত্তপ্ত লাভার সাথে উত্তপ্ত ভূ-গর্ভস্থ পানি বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু ঐ নদীর আশেপাশে, প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের মাঝে কোনো আগ্নেয়গিরি ছিল না। তাই এ সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিতে হয়।
৩. তৃতীয় যে কারণটি হতে পারে, তা হলো কাছাকাছি কোনো তেল উত্তোলন কেন্দ্রে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে। এটি ভয়ানক দুর্ঘটনার পূর্বাভাস হতে পারে। আর কাছাকাছি একটি পুরাতন তেল উত্তোলন কেন্দ্রের অবস্থান রুজোর ভয় বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু অনেক গবেষণার পরে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান, নদীর পানি ওরকম কোনো তেল উত্তোলন কেন্দ্রের দুর্ঘটনার কারণে নয়, বরং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক একটি আশ্চর্য ঘটনা।
একজন ভূবিজ্ঞানীর অনুমান ও বিজ্ঞান
গবেষণা চলাকালে তিনি ঐ নদী সম্পর্কে কিছু অবাক করার মতো তথ্য পান। তার গবেষণা দলের মতে, পৃথিবীটাকে একটা মানবদেহের সাথে তুলনা করলে মানবদেহের রক্ত নালী, শিরা উপশিরার মতো ভূ-অভ্যন্তরেও অনেক উত্তপ্ত পাথর ও উত্তপ্ত পানির প্রবাহ বিদ্যমান। যেগুলোকে পৃথিবীর শিরা-উপশিরা বলে ধরা যায়। মানব শরীরের শিরা, উপশিরায় কোনো ছিদ্র হলে যেমন রক্ত বের হয়, ঠিক তেমনি ভূ-অভ্যন্তরেও এসব শিরা-উপশিরায় মাঝে মাঝে এমন ছিদ্র দেখা গেলে, এ উত্তপ্ত পাথর ও পানি ভূ-পৃষ্ঠে উঠে আসে, আর তখনই উত্তপ্ত পানির নদীর মতো বিভিন্ন ভূ-তাপমাত্রার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। উক্ত নদীর পানির রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নদীর পানি মূলত বৃষ্টির পানি। কিন্তু রুজোর অনুমান মতে, বৃষ্টির পানি অনেক দূরের আন্দিজ পর্বতের কাছাকাছি নদীর সৃষ্টির সময়ের, যেখানে নদীটি উৎপত্তি লাভ করেছে, সেখানকার।
আর এ লম্বা পথ পাড়ি দেওয়ার মাঝে নদীর কিছু পানি ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ভূ-তাপীয় শক্তির দ্বারা উত্তপ্ত হয়ে আস্তে আস্তে আবার নদীর মূলধারায় ফিরে আসে উত্তপ্ত পানি রূপে। আর এ থেকেই সৃষ্টি উত্তপ্ত নদীর। তার মানে এই নদীর উত্তপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এক বৃহৎ হাইড্রোথার্মাল সিস্টেম জড়িত আছে, যা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। রুজো স্পেনসার ওয়েলস এবং জনাথন এইসেন নামের আরো দুজন জীববিজ্ঞানীর সাথে কাজ করেন, যারা ঐ নদীতে বা নদীর আশেপাশে বসবাস করা সমস্ত প্রাণীর জিনোম নিয়ে গবেষণা করেন এবং দেখতে পান, তাদের মাঝে উচ্চ তাপমাত্রায় বেঁচে থাকার একধরনের প্রতিরোধ ব্যাবস্থা গড়ে উঠেছে।
পৃথিবীর সামনে আনুষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ
রুজো তার অনেকদিন এর পরিশ্রমের ফসল এ নদীর ব্যাপারে পুরো দুনিয়াকে জানানোর জন্য ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে একটি আর্টিকেল লেখেন। এর মাধ্যমে বাইরের পৃথিবীর মানুষ নদীটি সম্পর্কে জানতে পারে। এরপর তিনি ২০১৪ সালে টেড টকে তার গবেষণার প্রায় সমস্ত তথ্য-উপাত্ত মানুষের সামনে তুলে ধরেন। এই নদীর অনেক রহস্যই এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের অজানা রয়ে গেছে।
আন্দ্রেস রুজো এখন পর্যন্ত নদীটিকে ঘিরে তার গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু এখন তিনি নদী সম্পর্কে জানার চেয়ে নদী রক্ষার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি এই নদী নিয়ে তার গবেষণাপত্র ততদিন বাইরে প্রকাশ করেননি, যতদিন পর্যন্ত পেরু সরকার নদীটি সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নিয়েছে। তাছাড়াও রুজো এ নদীর উপর ‘দ্য বয়েলিং রিভার’ নামে একটি বই লিখেন। বইটিতে তিনি এ নদী নিয়ে তার সমস্ত গবেষণা এবং ধারণা তুলে ধরেছেন।

পৃথিবীর সামনে আত্মপ্রকাশ ঘটছে আশ্চর্য এক নদীর; Image Source; Ted Talk
বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে এই জায়গাটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হলেও এর দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে এটি এখনও সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, নদীটিকে তার নিজ বৈশিষ্ট্যে টিকিয়ে রাখা। আমাজন জঙ্গলের অবাধ বন-নিধনের ফলে নদীটির অস্তিত্ব অনেকটাই হুমকির মুখে। এ নদীর রহস্য সম্পর্কে এখনও অনেক কিছুই জানা বাকি আমাদের। এর মাঝে যদি মানুষের কারণে রূপকথার মতো আশ্চর্য এ নদী হারিয়ে যায়, তাহলে হয়তো হেরে যাবে রূপকথার গল্পেরই মতো অদম্য এক বিজ্ঞানী। প্রকৃতির দান প্রকৃতির কোলেই নিশ্চিন্ত মনে বয়ে যাবে হাজার বছর ধরে, এটাই চাওয়া লাখো-কোটি পরিবেশপ্রেমীর, রূপকথার এক অদম্য রাজপুত্রের। তা কি হতে দেয়া যায় না?