সাইন আপ করুন
লগিন করুন
রিসেট পাসওয়ার্ড
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? আপনার ইমেইল এড্রেস দিন। ইমেইলের মাধ্যমে আপনি নতুন পাসওয়ার্ড তৈরির লিংক পেয়ে যাবেন।
আপনি কেন মনে করছেন এই প্রশ্নটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই উত্তরটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই ব্যক্তিকে রিপোর্ট করা উচিৎ?
কিভাবে সান্ত্বনা দেবেন হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে ?
কখনো কি খুব হতাশাগ্রস্ত কোনো ব্যক্তির সান্নিধ্যে এসেছেন? নিশ্চয়ই এসেছেন। এই দুঃখময় জগতে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির সংখ্যা তো নেহাত কম নয়। মাঝেমধ্যেই আমাদের আশেপাশের অনেক ব্যক্তিকে চরম হতাশাগ্রস্ত সময় পার করতে হয়। আমাদের কোনো বন্ধু হয়তো পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সিজিপিএ অর্জন করতে পারেনি, কোনো সহকর্মীর হয়তো প্রেমবিস্তারিত পড়ুন
কখনো কি খুব হতাশাগ্রস্ত কোনো ব্যক্তির সান্নিধ্যে এসেছেন? নিশ্চয়ই এসেছেন। এই দুঃখময় জগতে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির সংখ্যা তো নেহাত কম নয়। মাঝেমধ্যেই আমাদের আশেপাশের অনেক ব্যক্তিকে চরম হতাশাগ্রস্ত সময় পার করতে হয়। আমাদের কোনো বন্ধু হয়তো পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সিজিপিএ অর্জন করতে পারেনি, কোনো সহকর্মীর হয়তো প্রেমিকা বা স্ত্রীর সাথে বাদানুবাদ হয়েছে, কিংবা কোনো নিকটাত্মীয়ের হয়তো হঠাৎ করেই মৃত স্বামীর কথা ভেবে খুব মন খারাপ হয়ে গেছে।
এরকম পরিস্থিতিতে যদি আমরা তাদের কাছাকাছি থাকি, কিংবা অন্য কোনোভাবে তাদের সাথে যোগাযোগ ঘটে, তখন প্রচন্ড বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তারা তাদের দুঃখের কথা আমাদের সাথে ভাগ করে নেয়, এবং আশা করে আমরা হয়তো তাদেরকে যথাযথ সান্ত্বনা দিতে পারব, তাদের মন হালকা করতে পারব।
কিন্তু আমরা সবাই কি তা পারি? হতাশাগ্রস্ত মানুষকে সান্ত্বনা দেয়া এমন একটি শিল্প, যেটির উপর আমাদের অধিকাংশেরই ভালো দখল নেই। আমরা হয়তো বুঝি ঠিকই যে মানুষটা কষ্ট পাচ্ছে, তার পাশে আমাদের থাকা উচিৎ, তাকে মানসিক সমর্থন যোগানো উচিৎ। কিন্তু ঠিক কীভাবে যে সেটি সম্ভব, তা বুঝে উঠতে পারি না। ফলে তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে উল্টো এমন কিছু একটা বলে বসি, যাতে তার মন ভালো হওয়ার পরিবর্তে আরো বিষিয়ে যায়।
আর কোনো ব্যক্তিকে যদি তার দুঃসময়ে আমরা সান্ত্বনা দিতে না পারি, তবে তার মনে আমাদের ব্যাপারে বেশ খারাপ একটা ধারণা জন্মে যায়, এবং পরবর্তীতে সে আমাদেরকে আর নিজের খুব আপন কেউ বলে ভাবতে পারে না। এভাবেই একসময় যার সাথে ঘনিষ্ঠ সখ্যতা বা আত্মীয়তা ছিল, তার সাথেই আমাদের দূরত্ব তৈরি হয়ে যেতে শুরু করে।
এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা একজন হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে সান্ত্বনা দিতে পারি? তার সকল দুঃখ-কষ্ট দূর করতে না-ই বা পারলাম, কীভাবে অন্তত তাকে কিছুটা হলেও ভালো বোধ করাতে পারি? এ লেখায় আমরা সে বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করব।

প্রথমে শুনতে হবে; Image Source: WikiHow
শোনা
কাউকে সান্ত্বনা দেয়া বা ভালো বোধ করানোর প্রাথমিক শর্ত হলো, তাকে মন খুলে কথা বলতে দেয়া, এবং মনোযোগ দিয়ে তা শোনা। অধিকাংশ ব্যক্তিই কষ্ট পায় নিজের মনের কথা কাউকে খুলে বলতে পারে না বলে। তাই আমাদের উচিৎ হবে, তাকে এমনটা বোঝানো যে আমরা তার ব্যাপারে আসলেই জানতে চাই, এবং সে নিঃসংকোচে নিজের সকল সমস্যার কথা আমাদের সাথে ভাগ করে নিতে পারে।
যদি সে নিজে থেকে বলতে না চায়, তাহলে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে টুকটাক প্রশ্ন করে আমরা সে সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা লাভ করতে পারি। তাছাড়া, সাধারণত দেখা যায় যে, আগ্রহী শ্রোতা পেলে যেকোনো মানুষই নিজেকে মেলে ধরে।
সুতরাং আমাদের কর্তব্য হবে আগ্রহ প্রকাশ করা, সে কথা বলতে শুরু করলে মাঝেমধ্যে ‘হ্যাঁ’, ‘ঠিক’, ‘তাই তো’ জাতীয় কথা বলে তাল দেওয়া, এবং সে কোনো কথা বলতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেলে বিভিন্ন প্রশ্ন করে বিষয়টি সম্পর্কে ভালো করে জেনে নেয়া।
যদি কোনো হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি একজন আগ্রহী ও বিশ্বাসী শ্রোতার কাছে নিজের সমস্যার কথা কোনো রাখঢাক না রেখেই প্রকাশ করতে পারে, তাহলে তার খারাপ লাগার প্রায় অর্ধেকই দূর হয়ে যায়।

দেখাতে হবে সঠিক প্রতিক্রিয়া; Image Source: WikiHow
সঠিক প্রতিক্রিয়া দেখানো
একজন হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি যখন আমাদেরকে বিশ্বাস করে তার সব মনের কথা খুলে বলল, তখন কিন্তু আমাদের দায়িত্বও বহুগুণে বেড়ে গেল। ওই ব্যক্তির যখন নিজের তরফ থেকে সব বলা শেষ হয়ে যাবে, তখন সে অপেক্ষা করতে থাকবে আমাদের কী প্রতিক্রিয়া তা জানার। সুতরাং প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রে বিচক্ষণ হতে হবে।
অনেক সময় এমন হতে পারে যে, ওই ব্যক্তির সমস্যাটা আমাদের কাছে তেমন বেশি গুরুতর মনে হলো না। এটি খুবই স্বাভাবিক, কেননা সকলের বিবেচনাবোধ তো আর সমান নয়। তবে মনে রাখতে হবে যে, আমাদের কাছে যা-ই মনে হোক না কেন, ওই ব্যক্তি কিন্তু এই সমস্যাটি নিয়েই পীড়িত হয়ে আছে।
তাই কোনোভাবেই এমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না যাতে মনে হয়, “আরে, এটা কোনো সমস্যা হলো নাকি!” বরং জোর দিয়ে তাকে বলতে হবে, “হ্যাঁ, সমস্যাটা আসলেই গুরুতর, এবং কষ্ট পাবার মতোও।”

হতে হবে সহানুভূতিশীল; Image Source: WikiHow
সহানুভূতিশীল হওয়া
হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির মানসিক অবস্থা যদি আমরা উপলব্ধি করতে না পারি, তাহলে সকল চেষ্টাই মাঠে মারা যাবে। তাই এবার আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে, তার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে ভাবা, “আমার সাথে এমন কিছু হলে আমি কেমন বোধ করতাম।”
যখন আমরা তৃতীয় পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ছেড়ে ওই ব্যক্তির জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে নতুন করে সমস্যাটি নিয়ে ভাবতে পারব, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব বেড়ে যাবে। শুরুতে যেটিকে হয়তো আমাদের কাছে নিতান্তই হাস্যকর মনে হয়েছিল, সেটিকেই এখন বৃহত্তর কোনো সমস্যা বলে মনে হবে।
এই ব্যাপারটির নামই হলো সহানুভূতি। এবং এই সহানুভূতি কেবল নিজের ভেতর চেপে রাখলেই হবে না, বরং ওই ব্যক্তির সামনে তা দেখাতেও হবে। তাকে বলতে হবে, “আমি বুঝতে পারছি তুমি কতটা কষ্ট পাচ্ছো। তোমার মনের জোরের তারিফ করতেই হয়। তোমার জায়গায় আমি থাকলে কিছুতেই এত কষ্ট সহ্য করতে পারতাম না।”
মনে রাখবেন, আমাদের এই কথায় তার সমস্যা মিটে যাবে না ঠিকই, কিন্তু নিজের উপর কিছুটা হলেও আত্মবিশ্বাস সে ফিরে পাবে। এই মুহূর্তে আত্মবিশ্বাস যে তার খুবই প্রয়োজন।

দিতে হবে ভরসা; Image Source: WikiHow
ভরসা দেওয়া
এবার হলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন আমরা হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে ভরসা দিতে শুরু করব, সব ঠিক হয়ে যাবার আশ্বাস দেব।
কিন্তু এই পর্যায়ে এসেই অনেকে ভুলটা করে বসে। তারা কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব দেখিয়ে বলে, “আরে, এটা নিয়ে চিন্তা করার কোনো দরকারই নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।” অনেকে তো আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বিভিন্ন অসম্ভব সমাধানও বাতলে দিতে শুরু করে।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, হতাশাগ্রস্ত মানুষের মনে জেঁকে বসা দুঃখ-কষ্ট এত পলকা না যে আমাদের দুই-একটা কথাতেই তা দূর হয়ে যাবে। তাছাড়া আমরা হুট করে যেসব সমাধান বাতলে দিচ্ছি, ওই ব্যক্তি নিজে কি সেগুলো নিয়ে আগে ভেবে দেখেনি? অবশ্যই দেখেছে, এবং তার কাছে সেগুলোকে ভরসাযোগ্য মনে হয়নি। তাই নতুন করে সেগুলোই তাকে বললে, তার মানসিক অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হবে না।
তাহলে আমাদের করণীয় কী? আমাদের করণীয় হলো খুবই বুঝে শুনে পা ফেলা। এভাবে বলা, “সমস্যাটা তো যথেষ্ট জটিল। চাইলেই সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে সমাধান যে অসম্ভব, এমনটাও নয়। চলো, কী সমাধান বের করা যায় তা নিয়ে আমরা ভাবতে থাকি।”
এরপর আমাদেরকে বাস্তবিকই সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে, এবং শেষ পর্যন্ত যেটিকে সবচেয়ে জোরালো বলে মনে হয়, সেটি তার সামনে উপস্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি যে, হুট করে বের করা সমাধান হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির উপর যতটা প্রভাব ফেলবে, ভেবেচিন্তে বের করা সমাধান সে তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব ফেলবে।”

প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা বলতে হবে; Image Source: WikiHow
কথা বলা
কখনো কখনো এমন হয় যে, অনেক খুঁজে-পেতেও কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা যায় না। এমন ক্ষেত্রে অনেকেই চেষ্টা করেন প্রসঙ্গ বদলে ফেলার। তাদের ধারণা, সমস্যার কথা ভুলে গিয়ে অন্য কিছু নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে হয়তো হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির ভালো লাগবে।
কিন্তু আদতে তা ঘটে না। সমস্যাটি যেহেতু আমাদের নিজেদের না, তাই আমরা চাইলেই যত সহজে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে অন্য কিছু নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিতে পারব, ওই ব্যক্তি কিন্তু তা পারবে না। তার অবচেতন মনে ওই সমস্যাটির কথাই বারবার ঘুরপাক খেতে থাকবে। এমতাবস্থায় যখন সে খেয়াল করবে আমরা তার সমস্যাটিকে পাশ কাটিয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছি, তখন তার মনে হবে, আমরা হয়তো তার সমস্যাটিকে আর গুরুত্ব দিচ্ছি না। এমন মনে হওয়ার ফলে সে আরো বেশি অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়বে।
তাই কোনো অবস্থাতেই পলায়নপর মানসিকতা দেখানো চলবে না। অন্য প্রসঙ্গে আলোচনার বদলে, আমাদের উচিৎ হবে সমস্যাটি নিয়েই টুকটাক আলাপ করতে থাকা, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির উপর আলোকপাত করা। এতে ওই ব্যক্তির মনের চাপ যেমন ধীরে ধীরে কমতে থাকবে, তেমনই জোরালো সম্ভাবনা থাকবে আলোচনার একপর্যায়েই কোনো একটি সমাধান বের হয়ে আসার।
তাই আবারো বলছি, সমস্যা থেকে পালিয়ে বেড়ালে চলবে না, সেটিকে মোকাবেলা করতে হবে কথার মাধ্যমে।

কিছু সময় নীরবতাও কাম্য; Image Source: WikiHow
নীরবতা
আগের ধাপটি অনুসরণের ক্ষেত্রেও কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। যদি এমন দেখা যায় যে কথা অব্যহত রেখেও কোনো সমাধান খুঁজে বের করা যাচ্ছে না, বরং হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির উপর তা আরো চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন আমাদেরকে থেমে যেতে হবে। জোর করে কিছু করা যাবে না। এমনও হতে পারে যে, এই মুহূর্তে ওই ব্যক্তির কিছুটা নীরবতা কাম্য। তাকে সেই নীরবতা লাভের সুযোগ করে দিতে হবে। এমন হতে পারে যে, সে আমাদেরকে তার পাশে চাচ্ছে, কিন্তু একই সাথে সে আর কথা চালিয়ে যেতে আগ্রহী নয়। সেক্ষেত্রে আমাদের উচিৎ হবে নিশ্চুপ হয়ে তার পাশে বসে থেকে, তাকে নীরব সমর্থন যোগানো।

আলিঙ্গনে মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়; Image Source: WikiHow
স্পর্শ
মৌখিক সান্ত্বনা যখন আর কাজ করে না, তখন শারীরিক স্পর্শ বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো, হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিটির সাথে আমাদের সম্পর্ক কতটা গভীর, এবং কী ধরনের।
যদি তার সাথে আমাদের সম্পর্ক এমন হয় যে তাকে আমরা জড়িয়ে ধরলেও সে বিব্রতবোধ করবে না, তাহলে তাকে জড়িয়ে ধরা যেতে পারে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানসিক চাপে ভুগতে থাকা ব্যক্তিকে জড়িয়ে ধরলে, তার চাপ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।
কিন্তু যদি এমন হয় যে ওই ব্যক্তির সাথে আমাদের এমন সম্পর্ক যে তাকে জড়িয়ে ধরা উপযুক্ত নয়? তাহলে আমরা তার কাঁধে হাত রাখতে পারি, কিংবা নিজেদের কাঁধ তার দিকে বাড়িয়ে দিতে পারি। কাঁধ হলো নির্ভরতার প্রতীক। কারো কাঁধে হাত রাখা মানে হলো নীরবে এমনটি বলা যে, “চিন্তা কোরো না, আমি তোমার পাশে আছি।” আবার নিজের কাঁধে কাউকে মাথা রাখতে দেয়া মানেও তার ভরসাস্থল হয়ে ওঠা।
কিন্তু সম্পর্কের খাতিরে যদি এগুলোও উপযুক্ত না হয়? সেক্ষেত্রে আমরা অন্তত তার হাত ধরতে পারি। হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির হাত ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকলেও তার যন্ত্রণা অনেকাংশে লাঘব হয়।

ফোনে কিংবা ফেসবুকে যোগাযোগ রাখতে হবে; Image Source: WikiHow
যোগাযোগ বজায় রাখা
এমনটা হতেই পারে যে, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির মন ভালো করতে পারলাম না। তার সমস্যা শুরুতে যেমন ছিল, শেষ পর্যন্ত তা-ই থাকল। কিন্তু এখন সময় হয়ে গেছে আমাদের ওই স্থান ত্যাগ করার, কিংবা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার।
সেক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হলো, কিছু সময় পর আবারো তার সাথে যোগাযোগ করা। অন্তত তাকে ফোন করা কিংবা ফেসবুকে নক দেওয়া, এবং তার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া।
আমাদের মনে রাখতে হবে, হতাশাগ্রস্ত মানুষ যদি অনেক লম্বা সময় ধরে একা থাকে, তাহলে তার মধ্যে অবসাদ আরো জেঁকে বসে, এমনকি তার ভেতর আত্মহত্যার প্রবণতাও জাগতে পারে। তাই যোগাযোগ বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই।
আমরা তার সমস্যার সমাধান করতে পারিনি কিংবা তার মন ভালো করতে পারিনি, তাতে কী হয়েছে! অন্তত আমরা যে তার সমস্যাটি নিয়ে চিন্তিত, তার ভালো-মন্দ নিয়ে আমরা ভাবিত, এই বিষয়গুলো বোঝাতে পারলেও তাকে অনেক নেতিবাচক চিন্তা থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব।
সংক্ষেপে দেখুনপৌরাণিক গল্পের অস্তিত্ব নেই কেন?
মানবজাতির ইতিহাসে মানুষ কাজে ব্যস্ত থেকেছে, অলসতায় সময় কাটিয়েছে, অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করেছে। আশেপাশে কোনো ঘটনা ঘটলে সেগুলোর কারণ উদঘাটন করে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তখন বিজ্ঞান ছিল না, তাই স্বভাবতই সেসব ব্যাখ্যা পরবর্তীতে অযৌক্তিক হিসেবে গণ্য হয়েছে। ব্যাখ্যাগুলো যৌক্তিক দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য হলেও শবিস্তারিত পড়ুন
মানবজাতির ইতিহাসে মানুষ কাজে ব্যস্ত থেকেছে, অলসতায় সময় কাটিয়েছে, অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করেছে। আশেপাশে কোনো ঘটনা ঘটলে সেগুলোর কারণ উদঘাটন করে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তখন বিজ্ঞান ছিল না, তাই স্বভাবতই সেসব ব্যাখ্যা পরবর্তীতে অযৌক্তিক হিসেবে গণ্য হয়েছে। ব্যাখ্যাগুলো যৌক্তিক দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য হলেও শিল্পমানে অনন্য ছিল। একজন লেখক যখন ফ্যান্টাসি গল্প ও কল্পবিজ্ঞান লিখেন, তখন আমরা পাঠকেরা সেগুলো পড়ে বিমোহিত হই, লেখককে বাহবা দেই, কারণ সেগুলো শিল্পমানে উন্নত। হোক না কাল্পনিক, কিন্তু মনের আনন্দের খোরাক তো জোগায়। তেমনই প্রাচীনকালের মানুষদের ব্যাখ্যাগুলো বিজ্ঞানের দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য হলেও, সেগুলো এখন পর্যন্ত বেঁচে রয়েছে শিল্প-সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে। সেগুলো টিকে আছে উপকথা ও পৌরাণিক কাহিনী হিসেবে।
জগতে ঘটমান অনেক ক্ষেত্রেই পৌরাণিক গল্প-কাহিনীর দেখা পাওয়া যায়। যেমন- পৃথিবীতে মানুষ কীভাবে আসলো তা নিয়ে গ্রিক, তাসমানীয়, ভাইকিং প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। প্রাণের বৈচিত্র্য কেন আছে, তা নিয়ে উত্তর আমেরিকার হোপি, নাভাহো, পিউরো প্রভৃতি অঞ্চলে নানা উপকথা প্রচলিত আছে। মানুষ কেন এত এত ভাষায় কথা বলে তা নিয়েও পৌরাণিক ব্যাখ্যা আছে। শীত কেন আছে, গ্রীষ্ম কেন আছে, শীত-গ্রীষ্ম কেন চক্রাকারে চলতে থাকে, রাত কেন আছে, দিন কেন আছে, রাত-দিনের কেন সুনির্দিষ্ট চক্র আছে- এসব নিয়ে অস্ট্রেলীয়, কানাডীয়, গ্রিক প্রভৃতি অঞ্চলে আলাদা আলাদা উপকথা প্রচলিত আছে। সূর্য আসলে কী, সূর্য কেন উঠে, চাঁদ কেন আকৃতিতে সূর্যের সমান হয়েও সূর্যের মতো তীব্র নয় তা নিয়েও অনেক অঞ্চলে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। রংধনু, মহাবিশ্বের উৎপত্তি, ধূমকেতু, সমুদ্র, নদী, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি, বন্যা, খরা ইত্যাদি অনেক কিছু নিয়েই পৌরাণিক উপকথা বিদ্যমান আছে।
ইকারাস, উড়োজাহাজ সম্পর্কিত উপকথার নায়ক; Credit: Musée Antoine Vivenel
কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে যেগুলো সম্পর্কে অনেক খোঁজাখুঁজি করলেও কোনোপ্রকার পৌরাণিক উপকথার দেখা পাওয়া যাবে না। এমন অনেক অনেক বিষয়ের উদাহরণ দেয়া যায়। এর মধ্যে চমৎকার একটি হচ্ছে, ক্ষুদ্র জগৎ তথা মাইক্রোস্কোপিক লেভেল। ক্ষুদ্র জগৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো পৌরাণিক কাহিনী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যে সকল প্রাচীন মানুষ পৌরাণিক কাহিনীগুলোর জন্ম দিয়েছিল, তাদের ধারণাতেই আসেনি ক্ষুদ্র জগৎও চমৎকারিত্বে ভরা এবং এই জগৎ নিয়েও প্রচুর কাহিনী তৈরি করা যায়। এই ব্যাপারটি নিয়ে যদি চিন্তা-ভাবনা করা হয়, তাহলে দেখতে পাবো, এটি খুব একটা অবাক করা বিষয় নয় যে, কেন তাদের মনে ক্ষুদ্র জগৎ নিয়ে কোনো কাহিনীর জন্ম হয়নি।
রোগ শোক তথা ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাস, যৌগ, মৌল, অণু, পরমাণু ইত্যাদির ক্ষুদ্র জগৎও যে চমৎকার একটি মহাবিশ্ব, এ সম্বন্ধে জানার কোনো উপায় ছিল না তখনকার মানুষের। পৌরাণিক কাহিনী তৈরি হয়েছে বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে। যেহেতু তখনকার মানুষ ক্ষুদ্র জগত সম্বন্ধে জানতোই না, সেহেতু এই জগতের ব্যাখ্যারও প্রয়োজন পড়েনি এবং তাই কোনো পৌরাণিক কাহিনীরও জন্ম হয়নি।
ক্ষুদ্র জগত সম্বন্ধে জানার কোনো উপায় ছিল না তখনকার মানুষের; source: Chemical Oceanography Unit
ষোড়শ শতাব্দীতে অণুবীক্ষণ যন্ত্র (মাইক্রোস্কোপ) উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত ক্ষুদ্র পরিমণ্ডলে বিস্তার করা এই জগৎ সম্পর্কে কেউই জানতো না। ষোড়শ শতাব্দীর পরে মানুষ আবিষ্কার করেছে যে, পুকুর-ডোবা-খাল, মাটি-ধূলো-বালি এমনকি আমাদের নিজেদের শরীরে অতিক্ষুদ্র প্রাণেরা বসবাস করছে। এগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে, এদের আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। কিন্তু তারপরেও এরা প্রাণ বা জীব, ক্ষুদ্র বলে এদের গঠনও যে সরল হয়ে যাবে এমন না। যথেষ্ট পরিমাণ জটিল এদের গঠন ও কর্মপ্রক্রিয়া। আর এদের সকলেই বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে সৌন্দর্যময় কিংবা ভয়ঙ্কর। সুন্দর দেখাবে নাকি ভয়ঙ্কর দেখাবে, তা নির্ভর করবে আমরা তাদেরকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি তার উপর।
নিচের ছবির জীবটি ধূলোবালিতে বাস করা একধরনের অতিক্ষুদ্র প্রাণ (Mites)। শারীরিক গঠনে কিছুটা মাকড়সার মতো কিন্তু ক্ষুদ্র বলে, এদেরকে কণা বা ফুটকীর মতো বলে মনে হয়। এরকম হাজার হাজার ক্ষুদ্র জীব বাস করছে আমাদের ঘরে, কার্পেটে, বিছানায়।
ধূলোর পোকা; source: NerdHeist
আদিম মানুষেরা যদি তাদের সম্পর্কে জানতো বা ধারণা রাখতো, তাহলে এটা বলা বাহুল্য যে, তারা কী পরিমাণ পৌরাণিক গল্প আর উপকথার জন্ম দিতো এদেরকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। কিন্তু মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, ক্ষুদ্র স্কেলে এমন আশ্চর্য এক জগৎ লুকিয়ে আছে আমাদেরই চারপাশে।
এই জীবগুলো অনেক ক্ষুদ্র হলেও এরা একশত ট্রিলিয়নেরও বেশি পরিমাণ পরমাণু ধারণ করে। এর থেকে অনুমান করা যায় পরমাণু কতটা ক্ষুদ্র। দৃষ্টিগোচর হবার জন্য ধূলোর পোকা যথেষ্ট ক্ষুদ্র হলেও, এর চেয়েও অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণের অস্তিত্ব আছে। যেমন- ব্যাকটেরিয়া, এরাও একধরনের জীব এবং এরা ধূলিপোকার দেহের অভ্যন্তরে বসবাস করে। আমাদের দেহেও এরকম ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া আছে প্রচুর পরিমাণে। ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও আরো ক্ষুদ্র প্রাণের অস্তিত্ব আছে এবং এসব ক্ষুদ্র প্রাণ প্রচুর পরিমাণে বাসও করছে আমাদের শরীরে। শুধু আমাদের শরীর কেন, ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার শরীরেও বাস করছে আরো ক্ষুদ্র ভাইরাস।
কথায় আছে, বাঘের উপরেও টাগ থাকে। ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার ভেতরেও বাস করে ক্ষুদ্রতর ভাইরাস; source: John Creech Scientific
পুরো পৃথিবীটাই অবিশ্বাস্য রকমের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণ দিয়ে পরিপূর্ণ। এদের কাউকেই খালি চোখে দেখা যায় না এবং পৃথিবীর কোনো পৌরাণিক গল্পেই এদের কোনো ব্যাখ্যা নেই। প্রাচীন মানুষেরা বিশ্বাস করতো, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণবৈচিত্র্যই তৈরি করেছেন মর্ত্য ও নক্ষত্রলোকে বসবাসকারী এবং সর্ববিষয়ে জ্ঞানী দেব-দেবীরা। তাদের পুঁথিতে ক্ষুদ্র জগৎ সম্পর্কে কোনো কিছুরই কোনো দেখা নেই।খেয়াল করলে দেখা যাবে, আধুনিক বিজ্ঞানের আবিস্কার-উদ্ভাবনগুলোর কোনো উল্লেখই নেই দেবতাদের গল্প-কাহিনীতে। দেব-দেবীদের গল্প বা গ্রন্থগুলো বলে না বা বলতে পারে না যে, এই মহাবিশ্ব কত বড় কিংবা এই মহাবিশ্ব কত বছর বয়সী; তারা বলে না কীভাবে ক্যান্সারের প্রতিরোধ করতে হয়; তারা মহাকর্ষের কোনো ব্যাখ্যা দেয় না; অন্তর্দহন ইঞ্জিনের কার্যপ্রণালীর ধারণা দেয় না; তারা আমাদেরকে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু বা নিউক্লিয়ার ফিশন বা বিদ্যুৎ বা এনেস্থেটিক সম্পর্কে কোনোকিছুই বলে না।
সত্যি কথা বলতে কী, এসব গল্পকাহিনী বা গ্রন্থগুলো যখন কারো দ্বারা রচিত হয়েছিল, এগুলো তখনকার সময়ের পরের কোনো তথ্যই ধারণ করে না। রচয়িতাদের পক্ষে ভবিষ্যৎ জ্ঞানের কোনোকিছু লিপিবদ্ধ করা সম্ভব নয়। ঐ গ্রন্থগুলোতে যা আছে তা তখন পর্যন্ত প্রাপ্ত জ্ঞানের বাইরে নয়। আর ঐ সময়গুলোতে বিজ্ঞানের কোনো অগ্রগতিই ছিল না, তাই এটি খুবই স্বাভাবিক যে, এসব গ্রন্থ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুব একটা গ্রহণযোগ্য বা নির্ভুল হবে না। বাস্তবেও দেখা যায় সেটি, পৌরাণিক গল্পকাহিনীগুলোতে প্রচুর বৈজ্ঞানিক অসামঞ্জস্যতা পাওয়া যায়।
পৌরাণিক রচনায় পরবর্তী সময়ের তথ্য বা ব্যাখ্যা না থাকাটাই স্বাভাবিক; source: CILIP
আবার অন্যদিকে বিজ্ঞানও কোনো আরাধ্য বিষয় নয়। বিজ্ঞানের সাথে কোনো কিছু না মিললে সেটা অচ্ছুৎ হয়ে যাবে ব্যাপারটা এমন নয়। পৌরাণিক কাহিনীগুলো বেঁচে থাকবে তাদের কল্পনা-শিল্প-সাহিত্যের আবেদনের মাধ্যমেই। আর আধুনিক যে যে বিষয়ের উপকথা নেই, সেগুলো নিয়ে যে উপকথা তৈরি হবে না তা কিন্তু নয়। প্রশ্ন আসতে পারে, এই আধুনিক কালেও কীভাবে পুরাণ আর উপকথার জন্ম হতে পারে? আসলে উপকথা তো কোনো না কোনো কালের মানুষেরাই বানায়। প্রাচীনকালে জন্ম নেয়া উপকথাগুলোও তো তাদের সময় ‘আধুনিক’ ছিল। তাদের সময়ের প্রেক্ষিতে সেগুলো ছিল ‘বর্তমান’। এখন আমরা সেগুলোর বাস্তবতা-অবাস্তবতা নিয়ে হাসাহাসি করি। ঠিক একইভাবে আমাদের আজকের যুগের কোনো অন্ধবিশ্বাসও তো হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হাস্যকর উপকথা।
সংক্ষেপে দেখুনসবুজ পৃথিবীর স্বপ্নে বাগানের ধারণা কতটা গুরুত্ব রাখে?
ছোটবেলায় ইংরেজি বিষয়ে অনুচ্ছেদ লেখায় যখন শখের কথা বলতে হতো আমাদের, তখন একটি বহুল প্রচলিয় শখের কথা শোনা যেত মুখে মুখে- বাগান করা। বাড়ির সামনে একটি ছোট্ট বাগান, সেখানে নানা রঙের ফুল আর সবজির সমারোহ। এমন ভাবনা স্বপ্নে দেখা আর সেটা সত্যি করে তোলায় আজকাল ফারাক থেকে যায় শহুরে বাস্তবতায়। কংক্রিটের নগরীতে সবিস্তারিত পড়ুন
ছোটবেলায় ইংরেজি বিষয়ে অনুচ্ছেদ লেখায় যখন শখের কথা বলতে হতো আমাদের, তখন একটি বহুল প্রচলিয় শখের কথা শোনা যেত মুখে মুখে- বাগান করা। বাড়ির সামনে একটি ছোট্ট বাগান, সেখানে নানা রঙের ফুল আর সবজির সমারোহ। এমন ভাবনা স্বপ্নে দেখা আর সেটা সত্যি করে তোলায় আজকাল ফারাক থেকে যায় শহুরে বাস্তবতায়। কংক্রিটের নগরীতে সংকীর্ণ জায়গায় বাগান করার ধারণা বেশ চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ঠেকে। কিন্তু পৃথিবী যখন জলবায়ু সংকটের মতো ভয়াবহ এক পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তখন সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তব করে তোলা বেশ জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই ভাবনায় বাগান করা ঠিক কতটা গুরুত্ব বহন করতে পারে- এই লেখায় জানা যাক সেই ব্যাপারে।
গাছ লাগানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
গাছের ছাউনিগুলো একটি শারীরিক ছাকঁনি হিসেবে কাজ করে। এরা ধুলো আটকায়, এবং বায়ু থেকে দূষক শোষণ করে। গাছ সৌর বিকিরণ থেকে ছায়া প্রদান করে এবং শব্দ কমায়।
গবেষণা বলছে, আপনি যদি গাছ এবং সবুজে ঘেরা স্থানে মিনিটখানেকও অবস্থান করেন, তাহলে আপনার রক্তচাপ কমতে থাকবে, এবং হৃদস্পন্দন ধীর হবে। একইসাথে আপনাকে মানসিক প্রশান্তিও এনে দিতে সক্ষম গাছ।

আপনি যদি গাছ এবং সবুজে ঘেরা স্থানে মিনিটখানেকও অবস্থান করেন তাহলে মানসিক প্রশান্তি পাবেন। Image Courtesy : http://www.birstall.co.uk Caption
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি গাছ লাগানোর মতো উদ্যোগ জলবায়ু সংকট মোকাবেলা করার জন্য বায়ুমণ্ডল থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাইঅক্সাইড বের করে নেওয়ার সবচেয়ে বড়, এবং সুলভ উপায়গুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিটি পৃথক গাছ প্রতি বছর ১.৭ কেজি পর্যন্ত কার্বন অপসারণ করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই গাছ লাগানোর উদ্যোগে ফসলি জমির ক্ষতি করা যাবে না। শহুরে এলাকায় বাস্তবায়ন করতে হবে সবুজায়নের এই প্রচেষ্টা। বাগান করা তাই হতে পারে এই উদ্যোগের সহজ সমাধান।
কার্বন ডাইঅক্সাইডকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হয়। মানুষের নানা কার্যকলাপের দরুন বায়ুমন্ডলে এর উপস্থিতি ক্রমশই বাড়ছে। একটি গাছ যত বড় হতে থাকে, এই কার্বন ডাইঅক্সাইড সঞ্চয় ও শোষণের ক্ষমতা বাড়তে থাকে তার।
গাছ বাতাসের গতি কমিয়ে একে শীতল করে। এর পাতা সূর্যের তাপ প্রতিফলিত করে। এতে কমে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা। অনুমান করা হয়, গাছ একটি শহরের তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে পারে।

গাছ শহরের তাপমাত্রাও কমাতে সক্ষম; Image Courtesy : Asean Foundation
শুধুই গাছ লাগানো বাগান করা নয়
দেখতে যেমনই হোক, পৃথিবীর সকল বাগানই প্রায় একই ভিত্তির উপরই তৈরি। বাগান করার মূল উপাদানগুলো সেখানে থাকবেই।
বাগান করার অর্থ শুধু চারা লাগানোই নয়। কিংবা সৌন্দর্যের ভাবনা থেকেই বাগান করা হয়- এমন ভাবনাও অমূলক। বরং এর সংজ্ঞা বেশ বিস্তৃত পরিসর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। সংশ্লিষ্ট স্থানের মাটি, পোকামাকড়, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ এসব কিছুই একটি বাগানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। একটি বাগান স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের উন্নতিতে দারুণ প্রভাব রাখতে পারে। একইসাথে এটি দূষণ কমাতে এবং উষ্ণায়নের বিরুদ্ধেও বেশ কার্যকর। প্রকৃতির প্রতিটি বিষয়ের সাথে নিবিড় সম্পর্কে মিশে থাকে বাগানের নাম।
এ কারণেই যদি আপনার লক্ষ্য হয়ে থাকে শুধু গাছের বৃদ্ধি, তাহলে সেটি হবে হতাশার। কারণ সেখানে অর্থনৈতিক চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ ফুটে ওঠে। কিন্তু প্রকৃতির ভাবনায় লক্ষ্যের জায়গাতে আনতে হবে পরিবর্তন, চিন্তার পরিধিকে করে তুলতে হবে বিস্তৃত। জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে এবং সবুজ পৃথিবীর স্বপ্নকে সত্যি করে তুলতে বাগানকে করে তুলতে হবে পরিবেশ ও প্রাণীবান্ধব।
বাগানে গাছ লাগানো কতটা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে?
বৈশ্বিক উষ্ণতা কার্বন ডাইঅক্সাইডের মতো অত্যধিক গ্রিনহাউজ গ্যাসের কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই গ্যাস বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখে। সময়ের সাথে সাথে এই উষ্ণতা ব্যাপক জলবায়ু পরিবর্তনে অবদান রাখে, যার ফলে বরফের টুকরো গলে যেতে পারে, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে পারে, এবং ক্রমবর্ধমান তীব্র ঝড় ও দাবানল হতে পারে।
আপনার ছোট্ট জমিতে কয়েকটি গাছ, গুল্ম, ফুল এবং শাকসবজি রোপণ করা এই প্রভাবকে প্রশমিত করতে সহায়তা করতে পারে। বাড়ির উঠোনে করা বাগানের গাছগুলো পরিমাণে কম হলেও কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণে সক্ষম। এমন ছোট্ট জায়গায় বপন করা গাছের চারা খুব একটা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে না। কিন্তু আমরা এখন যে পরিস্থিতিতে আছি, সেটা আমলে নিলে প্রতিটি সামান্য পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একটি গাছের চারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে; Image Courtesy : Billion Tree Initiative
যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম বনভূমি সংরক্ষণ বিষয়ক দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘উডল্যান্ড ট্রাস্ট’ এর উডল্যান্ড আউটরিচ ডিরেক্টর জন টাকার বলছেন, “একটি গাছের চারা হয়তো কোনো পার্থক্য তৈরি করবে না, কিন্তু যদি ১ কোটি মানুষ একটি করে গাছ লাগায় তাহলে সেটি অবশ্যই পার্থক্য গড়ে দিতে সক্ষম। ” লোকেরা যদি মনে করে যে তারা কিছু করতে চায়, তাহলে সঠিক জায়গায় একটি গাছ লাগানো একটি ভালো কাজ বলে মত দিয়েছেন টাকার।
আপনার নিজের জন্য খাদ্যের জোগান দেওয়া আপনার পরিবেশগত প্রভাবকেও কমিয়ে দিতে পারে, কারণ এর অর্থ হলো মুদি দোকানে কম যেতে হয়। বাজারে কিংবা সুপারশপ থেকে কেনা সবজি ও ফল প্রায়ই দূরের এলাকা থেকেই আসে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য আমদানি করা পণ্যের চেয়ে পরিবেশের জন্য সর্বদা ভাল।
এগুলোর পরিবহনে জ্বালানী শক্তি ব্যয় হয়। এটি একইসাথে উচ্চ কার্বন ফুটপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিবেশে দূষণ ছড়াচ্ছে। কিন্তু নিজের বাগানেই যদি সেই সবজি বা ফল উৎপাদন করা সম্ভব হয়, তাহলে নিজের খাবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পরিবেশেও রাখা যাবে ইতিবাচক প্রভাব।
জন টাকার মানুষকে আমদানির মাধ্যমে এসেছে এমন গাছ কেনা থেকে বিরত থেকে নিজ দেশ বা এলাকায় জন্মানো গাছের চারা লাগানোর উপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলছেন, “আমদানী করা গাছ কিনতে লোকেদের উৎসাহিত করা এড়াতে চাই। কারণ এটি রোগের ঝুঁকি নিয়ে আসে।”
চাইলেই বাগানে সব গাছ লাগানো যায় না। আবার বাগানের আকারভেদেও চারা লাগানো নির্ভর করে। আপনি যেখানে থাকেন, সেখানে কোন প্রজাতির গাছের বৃদ্ধি ভালো হবে, এবং এটি কত বড় হতে পারে সেই সম্পর্কে আপনাকে ভাবতে হবে। জন টাকার বলছেন, “আপনার পেছনের দরজার বাইরে দুই ফুট একটি ওক গাছ লাগিয়ে কোনো লাভ নেই- এটি আপনার বাড়ির ক্ষতি করবে।”

বাগানে কী গাছ লাগাচ্ছেন সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত; Image Courtesy :cwf-fcf
তার মতে, বাগান করার ক্ষেত্রে বাড়ির ভিত্তি, ভূগর্ভস্থ ড্রেন, ওভারহেড পাওয়ার লাইন সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে, এবং নিশ্চিত করতে হবে যে গাছটি এমন জায়গায় থাকবে যেখানে এটি বাড়তে পারে, এবং কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। আপনার প্রতিবেশীদের উপর প্রভাব সম্পর্কেও চিন্তা করতে হবে। ছোট প্রজাতির মধ্যে আপেল গাছ বা রোয়ান অন্তর্ভুক্ত।
শুধু রোপণের কাজকে এই প্রক্রিয়ার শেষ হিসেবে দেখা উচিত নয়। সদ্য রোপণ করা গাছের জন্য পরিচর্যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যত্ন ছাড়াই আমরা এমন অনেক গাছ রোপণ করতে পারি যেগুলো অকালেই মারা যায়, বা এমন আকারে বাড়ে না যেখানে তারা কার্বন শোষণ করার মতো সুবিধা প্রদান করতে পারে।
সংক্ষেপে দেখুনসময় পরিভ্রমণ কি সম্ভব?
কেমন হতো, যদি টাইম মেশিনে করে সহজেই ফিরে যেতে পারতাম ছেলেবেলায়। আবার পেতাম নির্ঝঞ্ঝাট সহজ-সরল জীবন। কিংবা যদি এক লাফে দশ বছর পরের ভবিষ্যতে চলে যেতাম, আর পড়াশোনার ঝামেলায় পড়তে হতো না, তা-ই না? কিন্তু, সেরকম কি আসলে সম্ভব? ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া সাড়া জাগানো মুভি Predestination নিশ্চয়ই অনেকেই দেখেছেন। বিস্তারিত পড়ুন
কেমন হতো, যদি টাইম মেশিনে করে সহজেই ফিরে যেতে পারতাম ছেলেবেলায়। আবার পেতাম নির্ঝঞ্ঝাট সহজ-সরল জীবন। কিংবা যদি এক লাফে দশ বছর পরের ভবিষ্যতে চলে যেতাম, আর পড়াশোনার ঝামেলায় পড়তে হতো না, তা-ই না? কিন্তু, সেরকম কি আসলে সম্ভব?
২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া সাড়া জাগানো মুভি Predestination নিশ্চয়ই অনেকেই দেখেছেন। টাইম মেশিনে করে সহজেই কীভাবে অনেক বছর অতীতে চলে যাওয়া যায়, কীভাবে নিজের বাচ্চাকালকে চোখের সামনে দেখা যায়। যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই ধরেই নিয়েছেন যে, এসব নিছকই সায়েন্স ফিকশন! বাস্তবে অতীত বা ভবিষ্যতে আবার যাওয়া যায় নাকি! সে প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবো আজ আমরা। বিজ্ঞানের আলোকে বোঝার চেষ্টা করবো- আসলেও সময় পরিভ্রমণ সম্ভব কি না।

সময় পরিভ্রমণ- সম্ভাবনা ও বাস্তবতা; image source: writeup.in
সময় পরিভ্রমণ বলতে সহজ ভাষায় অতীতে বা ভবিষ্যতে যেতে পারাকে বোঝায়। আমি যদি ২০০০ সালে ফিরে যেতে পারি বা ২০৩০ সালের পৃথিবীতে চলে যেতে পারি, তবে তাকে সময় পরিভ্রমণ বলবে। শুনতে যতটা সহজ লাগছে বাস্তবে কিন্তু সেটা ততটা সহজ না। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন! ততটা সহজ না, তবে অসম্ভব কিছুও না! টাইম ট্রাভেল কীভাবে সম্ভব তা জানতে হলে আমাদের একটু গভীরে যেতে হবে। জেনে আসতে হবে সময় পরিভ্রমণ নিয়ে বিজ্ঞানের কিছু তত্ত্ব।
সময় পরিভ্রমণ বোঝার জন্য আপনাকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা ও আলোর গতিসূত্র বুঝতে হবে। আইনস্টাইন সময় জিনিসটাকে আলোর মাধ্যমে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন। কোনো বস্তু যত দ্রুত গতিতে চলবে, তার সাপেক্ষে সময় তত স্থির হয়ে থাকবে। অর্থাৎ, আপনি যদি আলোর কাছাকাছি গতিতে চলতে পারেন, তবে আপনার সাপেক্ষে সময় প্রায় স্থির থাকবে। আপনি দুই ঘন্টা ভ্রমণ করে আসার পর দেখবেন পৃথিবীতে হয়তো এর মাঝে দুই বছর সময় চলে গিয়েছে! এ তো গেল আলোর কাছাকাছি গতিতে ভ্রমণ করতে পারলে কী হবে সেই কথা। আর আলোর চেয়ে দ্রুতগতিতে যেতে পারলে আপনি সময়কেই অতিক্রম করে ফেলতে পারবেন!
একটি সহজ উদাহরণ দেয়া যাক। মনে করুন, আপনি পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের কোনো একটি নক্ষত্রকে টেলিস্কোপ দিয়ে দেখছেন। এই মুহূর্তে আপনি যে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রটি দেখছেন সেটি কিন্তু নক্ষত্রটির বর্তমান অবস্থা না। আমরা কোনো বস্তু তখন দেখতে পাই যখন সেটি থেকে আলো এসে আমাদের চোখে পড়ে। অর্থাৎ, এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে থাকা সেই নক্ষত্রটি থেকে আলো এসে পৃথিবীতে পৌঁছাতে এক লক্ষ বছর লেগেছে। আপনি এই মুহুর্তে নক্ষত্রটিকে যেমন দেখছেন সেটি আপনার কাছে বর্তমান হলেও, নক্ষত্রটির কাছে সেটি এক লক্ষ বছর অতীতের ঘটনা।
এখন, কল্পনা করে নিন, সেই নক্ষত্রটি ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সেখানে বাস করা একটি এলিয়েন ১ লক্ষ আলোকবর্ষ/সেকেন্ড গতিতে পৃথিবীতে চলে আসলো। সে আসার পরও কিন্তু সে নক্ষত্রটিকে একই অবস্থায় দেখতে পাবে পৃথিবী থেকে। তারও এক লক্ষ বছর পর পৃথিবীবাসীরা সেই নক্ষত্রকে ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে যেতে দেখবে। তাহলে এ থেকে আমরা কী বুঝলাম? পৃথিবীবাসীরা যা এক লক্ষ বছর পর দেখবে, যা তাদের কাছে এক লক্ষ বছর ভবিষ্যতের ঘটনা, সেই ঘটনাটি পৃথিবীতে চলে আসা এলিয়েনের কাছে নিকট অতীত!

স্পেস-টাইম ফেব্রিক; image source: nasa.org
এখন, এখানে একটি ছোট সমস্যা রয়ে গেছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তো খুব করে বললাম, এলিয়েনটি এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরত্ব এক সেকেন্ডে চলে আসবে। কিন্তু, তা কি আদৌ সম্ভব? উত্তর, সম্ভব নয়। আইনস্টাইনের সূত্রমতে, আলোর গতি ধ্রুব এবং কোনো কিছুই আলোর চেয়ে অধিকতর গতিশীল হতে পারবে না। সেই হিসেবে এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরত্বও এক মুহূর্তে অতিক্রম করা সম্ভব না। তাহলে ভবিষ্যতে পরিভ্রমণ করার উপায় কী? আসুন, এবারে আর দ্বিধায় না রেখে সহজে বুঝিয়ে দেই।
আমরা কোনো বিন্দুর অবস্থান বের করি XYZ অক্ষ দ্বারা। অর্থাৎ, দৈর্ঘ্য নির্ণয়ে X, প্রস্থ নির্ণয়ে Y আর উচ্চতা নির্ণয়ে Z অক্ষ ব্যবহার করি। কিন্তু কোনো ঘটনার প্রকৃত অবস্থান জানতে এ তিনটি মাত্রা বাদেও আরেকটি মাত্রার প্রয়োজন। তা হলো সময়। এ চতুর্থ মাত্রাকে আইনস্টাইন স্পেস-টাইম বলেছেন। এখন, মহাবিশ্বে জালের মতো ছড়ানো যে স্পেস টাইম ফেব্রিক রয়েছে, তা দিয়ে সময়/আলো প্রবাহিত হয়। যেহেতু আলোর গতিকে অতিক্রম করা সম্ভব না, সেহেতু আমাদের সময় পরিভ্রমণের জন্য বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে। একটি ব্যবহারিক উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি। একটি কাগজের পৃষ্ঠা হাতে নিন। পৃষ্ঠাটির বরাবর উপরে নিচের দুই প্রান্তে দুটি আলাদা ফুটো করুন। এবারে মাঝ বরাবর পৃষ্ঠাটি দুই ভাঁজ করে কী দেখতে পেলেন? ফুটো দুটি একসাথে লেগে আছে, তাই তো? এবার পৃষ্ঠাটি আবার আগের মতো খুলে ধরুন। খুলে রাখা পৃষ্ঠায় দুটি ছিদ্র যতটা দূরে, ভাঁজ করা পৃষ্ঠার ক্ষেত্রে বলতে গেলে তা একদমই নেই।

ওয়ার্মহোল; image source: sciencenews.uk
এখন যদি এই পৃষ্ঠাটিকে আমরা একটি স্পেস-টাইম ফেব্রিক হিসেবে কল্পনা করি তাহলে বুঝতে পারি, স্বাভাবিকভাবে দুটি ঘটনা বিন্দু অনেক দূরত্বে থাকলেও, ফেব্রিকের সংকোচনের ফলে দুটি ঘটনা বিন্দুকে খুব অল্প দূরত্বে নিয়ে আসা সম্ভব। অর্থাৎ, সাধারণভাবে যে ঘটনা বিন্দুটি অনেক পরে দেখতে পাওয়ার কথা, সেখানে শর্টকাটে অনেক আগেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। এ ধারণার উপর ভিত্তি করেই ওয়ার্মহোল বা সময় সুড়ঙ্গের ধারণাটি এসেছে।
ওয়ার্মহোল হচ্ছে এমন একটি ক্ষুদ্র সুড়ঙ্গ, যা অনেক অনেক আলোকবর্ষ দূরের দুটি ঘটনা বিন্দুকেও স্পেস ফেব্রিকের সংকোচনের মাধ্যমে খুব কাছাকাছি দূরত্বে নিয়ে আসে। সুতরাং, ওয়ার্মহোলের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে আলোর অধিক গতিবেগ ছাড়াই ভবিষ্যৎ পরিভ্রমণ সম্ভব। প্রশ্ন থাকতে পারে, এখন পর্যন্ত কেউ ওয়ার্মহোলে করে কেন তাহলে ভবিষ্যত ভ্রমণ করেনি। এর উত্তর হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, মহাবিশ্বে ওয়ার্মহোল খুব মাঝে মাঝে সামান্য কিছু সময়ের জন্য আবির্ভূত হয়। তাছাড়াও এ ওয়ার্মহোলগুলোর ব্যাস হয় এক সেন্টিমিটারের লক্ষ কোটি ভাগের কম। সুতরাং এত কম সময় স্থায়ী ও এত ক্ষুদ্র ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করা প্রায় অসম্ভব! সুতরাং, ভবিষ্যত পরিভ্রমণ তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবিকভাবে এখন পর্যন্ত ভবিষ্যত পরিভ্রমণ করার মতো প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি।

চতুর্থ মাত্রা; image source: space.org
ভবিষ্যত পরিভ্রমণ নিয়ে আলোচনা গেল। এবার আসা যাক অতীত পরিভ্রমণে। তাহলে তো অতীত পরিভ্রমণও একইভাবে ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে করা যাবে, তাই না? উত্তর, না। এখানে দুটি ঝামেলা আছে। এই ঝামেলাগুলোকে ‘সেলফ কনসিস্টেন্সি থিওরি’ ও ‘গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স থিওরি’ বলে।
আমি ভবিষ্যতে গিয়ে যদি সব ভেঙেচুরে একাকার করে ফেলি, তাহলে সেটি বড় কোনো প্রাকৃতিক সমস্যা দাঁড় করাবে না। আমি ১০০ বছর ভবিষ্যতে গিয়ে ভাংচুর করে চলে আসার পর, স্বাভাবিকভাবে ১০০ বছর পরের ভবিষ্যতে এই ঘটনাটিই হবে। কিন্তু সমস্যা হবে অতীতে গিয়ে কোনো অদ্ভুত ঘটনা ঘটালে। মনে করুন, ১৯৪৬ সালের ৬ জুলাইয়ে আমি গিয়ে যদি সদ্য জন্ম নেয়া জর্জ বুশকে মেরে ফেলি, তাহলে আবার বর্তমানে এসে বুশকে কীভাবে দেখবো? সে তো জন্মের দিনই মারা গিয়েছিল, তা-ই না? জটিল লাগছে খুব? এ প্রশ্নের উত্তরই আছে দুটি থিওরিতে।
আসুন দেখে নেই থিওরি দুটির মূলকথা।
সেলফ কনসিস্টেন্সি থিওরি: এ থিওরি অনুযায়ী, কেউ অতীত ভ্রমণ করলেও সে প্রকৃতির কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না। প্রকৃতি তাকে কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে দেবে না। কেউ চাইলে ওয়ার্মহোলে করে অতীতে গিয়ে ঘুরে আসতে পারবে, সবকিছু দেখতে পারবে, কিন্ত কোনো ঘটনায় প্রভাব রাখতে পারবে না। ছায়ার মতো শুধুই দর্শনার্থী হয়ে থাকতে হবে। সুতরাং, এক্ষেত্রে কোনো ঘটনার পরিবর্তন বা কোনো ধরনের প্যারাডক্স সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।

প্যারালাল ইউনিভার্স; image source: space.com
গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স: ধরে নিচ্ছি, আমি ৮০ বছর অতীতে গিয়ে দেখলাম আমার দাদা কাদা মাখামাখি করে হা-ডু-ডু খেলছে। এখন, আমি যদি সাথে করে নিয়ে যাওয়া রিভলবার দিয়ে আমার দাদাকে গুলি করে মেরে ফেলি, তাহলে আমি আসবো কোথা থেকে? আমার দাদা যদি শিশু বয়সে মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে তো তার আর বিয়েও হবে না। তার ছেলে, মানে আমার বাবাও পৃথিবীতে আসবে না কোনোদিন। আমার বাবা যদি জন্মই না নেয় তাহলে তো আমারও জন্ম নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্ত আমি তো আছি! তাহলে আমি আসলাম কোথা থেকে! অতীত পরিভ্রমণ সম্পর্কিত এই গোলমেলে সমস্যাকে বলে গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স।
এ সমস্যা সামনে আসার পর বিজ্ঞানীরা এর আপাত সমাধান হিসেবে প্যারালাল ইউনিভার্সের কথা বলেছেন। প্যারালাল ইউনিভার্স থিওরি মতে, প্রতিটি ঘটনার অসংখ্য সম্ভাবনা থাকতে পারে। অর্থাৎ, একই ধরনের ঘটনা আরো অনেকগুলো ইউনিভার্সে থাকা সম্ভব। দুটি সমান্তরাল রেখার যেভাবে কখনো দেখা হয় না, একইভাবে দুটি প্যারালাল ইউনিভার্সেরও কখনো দেখা হবে না। দুটি সমান্তরাল রেখার মাঝে ছোট আরেকটি রেখা টেনে যেভাবে দুটি রেখাকে যুক্ত করা যায়, একইভাবে ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে দুটি প্যারালাল ইউনিভার্সের মাঝে ভ্রমণ করা হয়। সুতরাং, আপনি অতীতে যেতে চাইলে কখনোই আপনার নিজের ইউনিভার্সের অতীতে যেতে পারবেন না। আপনি ওয়ার্মহোলে ঢোকামাত্র অন্য কোনো প্যারালাল ইউনিভার্সে চলে যাবেন। সেখানে গিয়ে আপনি আপনার দাদাকে হত্যা করলেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ সেই ইউনিভার্সের ভবিষ্যতে আপনার কোনো অস্তিত্বই নেই!

গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স; image source: alltop.com
এই ছিলো মোটামুটি সময় পরিভ্রমণ নিয়ে আলোচনা। XYZ অক্ষের মতো হয়তো বা একদিন সময়কেও মানুষ নিজের মতো করে ভ্রমণের কাজে ব্যবহার করতে পারবে। বিজ্ঞানের বহুর্মুখী অগ্রযাত্রার নিরিখে বলতে পারি, আপাতত সম্ভব না হলেও, হয়তো সেই দিন আর বেশি দূরে নয়!
উদ্ভিদরা নাকি রান্না-বান্না করে খায়!! ঘটনা কি সত্যি ?
উদ্ভিদের রান্না-বান্না? নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে? কিন্তু সত্যিই উদ্ভিদের রয়েছে নিজস্ব রসুইঘর বা রান্নাঘর। যেখানে রান্না হয় উদ্ভিদের খাদ্য উৎপাদনের জন্য। আমাদের রান্নাঘরের মতো সে রান্নায়ও প্রয়োজন হয় নানা উপাদানের। রান্নার প্রয়োজনে উদ্ভিদকেও বাজার সারতে হয়, মানে খাবারের কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়। সেটাকে আবাবিস্তারিত পড়ুন
উদ্ভিদের রান্না-বান্না? নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে? কিন্তু সত্যিই উদ্ভিদের রয়েছে নিজস্ব রসুইঘর বা রান্নাঘর। যেখানে রান্না হয় উদ্ভিদের খাদ্য উৎপাদনের জন্য। আমাদের রান্নাঘরের মতো সে রান্নায়ও প্রয়োজন হয় নানা উপাদানের। রান্নার প্রয়োজনে উদ্ভিদকেও বাজার সারতে হয়, মানে খাবারের কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়। সেটাকে আবার রান্নাঘরেও পৌঁছে দিতে হয়। সেই রান্নায় তাপের প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় জ্বালানীরও।
তো কোথায় সেই রসুইঘর? কীভাবেই বা রান্না হয় তাতে? আর জীবজগৎ সেই রান্নার উপর নির্ভরশীলই বা কীভাবে?
উদ্ভিদের রসুইঘরের অবস্থান উদ্ভিদের পাতায়। বাজার মানে খাদ্য সংগ্রহ করে উদ্ভিদের শেকড়। আর বিভিন্ন কোষ-কলা তা পৌঁছে দেয় রান্নাঘর মানে পাতায়। সেখানে সূর্যের তাপে চলে রান্না। সেই রান্নায় জ্বালানীর মতো প্রয়োজন হয় কার্বন ডাই অক্সাইড। সেই রান্না থেকেই উৎপাদিত হয় অক্সিজেন মানে আমাদের নিঃশ্বাস!
জাইলেম ও ফ্লোয়েম টিস্যু: খাবার আনা নেওয়া যাদের কাজ
তো বলছিলাম উদ্ভিদকে বাজার করতে হয়, আবার সে বাজার যেমন পাতায় পৌঁছে দিতে হয়, তেমনি পাতা থেকে সরবরাহ করতে হয় পুরো উদ্ভিদের আনাচে-কানাচে। এই কাজটি করে জাইলেম ও ফ্লোয়েম টিস্যু। জাইলেম টিস্যুগুলোকে বলা হয় জটিল টিস্যু, কারণ এই টিস্যুগুলো নির্দিষ্ট কোনো কাজ নিয়ে বসে থাকে না, বরং একাধিক কাজ করে থাকে। জাইলেম শব্দটি এসেছে গ্রিক Xylos থেকে, যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘কাঠ’। উদ্ভিদের কাণ্ডকে দৃঢ়তা দেওয়ার জন্য এই টিস্যুর ভূমিকা আছে। জাইলেম টিস্যু মাটি থেকে শেকড়ের সংগ্রহ করা পানি ও খনিজ পাতায় বহন করে নিয়ে আসে।

উদ্ভিদের বিভিন্ন জায়গায় জাইলেম ও ফ্লোয়েম টিস্যুর অবস্থান; Image Source: bbc.co.uk
আবার ফ্লোয়েম টিস্যুুর কাজ হচ্ছে পাতায় উৎপাদিত খাবার উদ্ভিদের আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেওয়া। জাইলেম ও ফ্লোয়েম টিস্যুুকে একত্রে বলা হয় ভাস্কুলার বান্ডল বা সংবহনতন্ত্র। আর এই সংবহনতন্ত্র যে পদ্ধতিতে খাবার পৌঁছে দেয়, সে পদ্ধতিকে বলা হয় অসমোসিস বা অভিস্রবণ পদ্ধতি।
স্টোমেটা: রসুইঘরের দুয়ার
স্টোমেটা (একবচনে স্টোমা) হচ্ছে পাতার উপরে এবং নিচের ত্বকে অবস্থিত সূক্ষ্ম দুয়ার, বাংলায় যাকে বলা হয় পত্ররন্ধ। এই পত্ররন্ধ দুইটি রক্ষীকোষ দিয়ে পরিবেষ্টিত থাকে। উদ্ভিদের বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যেমন- প্রস্বেদন ও সালোকসংশ্লেষণ সমাধা হওয়ার পেছনে এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। স্টোমেটার মাধ্যমেই উদ্ভিদ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড ভেতরে নেয় এবং উৎপাদিত অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে পাঠায়। আবার এর মাধ্যমেই উদ্ভিদের শ্বসন বা প্রস্বেদন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়।

চিত্রের ছোট ছোট দুয়ারগুলোই স্টোমেটা; Image Source: socratic.org
সালোকসংশ্লেষণ: উদ্ভিদের রান্নার রেসিপি
সালোকসংশ্লেষণ বা ফটোসিনথেসিসকে তুলনা করা যায় উদ্ভিদের রান্নার রেসিপি হিসেবে। এককথায় উদ্ভিদের খাবার তৈরির পদ্ধতিকেই বলা হয় সালোকসংশ্লেষণ। যদিও সালোকসংশ্লেষণের দু’টি পদ্ধতি আছে, অক্সিজেনিক ও অ্যানোক্সিজেনিক, তবে অ্যানোক্সিজেনিক পদ্ধতির ব্যবহার নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়া ছাড়া অন্য কোথাও দেখা যায় না। এবার তাহলে জানা যাক অক্সিজেনিক সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের খাবার তৈরির কথা।

যেভাবে উৎপাদিত হয় উদ্ভিদের খাবার; Image Source: ducksters.com
উদ্ভিদের খাবার রান্নায় যা যা প্রয়োজন হয়,
১) কার্বন ডাই অক্সাইড,
২) পানি,
৩) সূর্যের আলো।
সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় ছয় অণু কার্বন ডাই অক্সাইড ও বারো অণু পানির সাথে সূর্যালোকের সংশ্লেষণের পর উৎপন্ন হয় এক অণু কার্বোহাইড্রেট বা গ্লুকোজ, ছয় অণু পানি ও ছয় অণু অক্সিজেন। বিক্রিয়াটি হচ্ছে-
এখানে দেখা যাচ্ছে, উদ্ভিদ যে কয়টি কার্বন ডাই অক্সাইড অণু গ্রহণ করেছে, তার সমপরিমাণ অক্সিজেনে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রভাবক হলো ক্লোরোফিল। এর অবস্থান ক্লোরোপ্লাস্ট নামক সবুজ প্লাস্টিডের অভ্যন্তরে। তবে সবুজ বর্ণের উদ্ভিদ ছাড়া অন্য উদ্ভিদগুলো আরো বিভিন্ন ধরনের যৌগ- ক্যারোটিন, জ্যান্থোফিল ইত্যাদির মাধ্যমে সালোকসংশ্লেষণ ঘটাতে পারে।
ক্লোরোপ্লাস্ট: উদ্ভিদের রান্নাঘর
ক্লোরোপ্লাস্টকে তুলনা করা যায় রান্নার সুপরিকল্পিত কাঠামো কিংবা রান্নাঘরের সাথে, যেখানে উদ্ভিদের খাবার উৎপাদনের মূল কার্যটি সমাধা হয়। ক্লোরোপ্লাস্টের অবস্থান পাতার মেসোফিল টিস্যুর ভেতরে। মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন প্রায় একই রকম। এর রয়েছে তিনটি মেমব্রেন সিস্টেম- আউটার মেমব্রেন, ইনার মেমব্রেন ও থাইলাকোয়েড মেমব্রেন। আউটার মেমব্রেন ও ইনার মেমব্রেনের মধ্য সামান্য ফাঁকা জায়গা থাকে, যাকে বলা হয় ইন্টারমেমব্রেন স্পেস। আর থাইলাকোয়েড মেমব্রেনটি জটিল আকারে ভাঁজ হয়ে ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করে, যাকে বলা হয় থাইলাকোয়েড। বেশকিছু থাইলাকোয়েড স্তুপাকারে টেবিলে সাজিয়ে রাখা বইয়ের আকার ধারণ করে, একে একত্রে বলা হয় গ্রানাম।

ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন; Image Source: venngage.com
ক্লোরোপ্লাস্টের এই থাইলাকোয়েডগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ক্লোরোফিল নামক রঞ্জক পদার্থ অবস্থান করে। উদ্ভিদের রান্নার মূল কারিগর তারাই। এই ক্লোরোফিলের সবুজ রঙের জন্যই ক্লোরোপ্লাস্ট এমনকি গাছের পাতার রং সবুজ দেখায়।
ক্লোরোফিল: রান্নার মূল কারিগর
উদ্ভিদের রান্নার আয়োজনে ক্লোরোফিলের ভূমিকা মুখ্য। ক্লোরোফিলের দু’টি অংশের একটি হচ্ছে পোরফাইরিন রিং। এই রিং গঠিত হয় চারটি নাইট্রোজেন পরমাণু ও একটি ম্যাগনেসিয়াম পরমাণুর সমন্বয়ে। ম্যাগনেসিয়াম পরমাণুটি অবস্থান করে চারটি নাইট্রোজেন পরমাণুর কেন্দ্রে। আরেকটি অংশ হচ্ছে হাইড্রোকার্বন লেজ। এই লেজের মাধ্যমে ক্লোরোফিল থাইলাকোয়েড ঝিল্লির সাথে যুক্ত থাকে।


ক্লোরোফিলের গঠন; Image Source: chem.ucla.edu
থাইলাকোয়েড ঝিল্লির উপর তিন থেকে চারশো’ ক্লোরোফিল এবং অন্য কিছু রঞ্জক অণু মিলে একটি স্বতন্ত্র ফটোসিস্টেম তৈরি করে। প্রতিটি ফটোসিস্টেমে থাকে একটি রিঅ্যাকশন সেন্টার বা বিক্রিয়া কেন্দ্র।
ক্লোরোফিলের একটি ফটোসিস্টেম; Image Source: writeopinions.com
ক্লোরোফিল প্রথমত যে কাজটি করে, তা হচ্ছে সূর্যের আলো থেকে ফোটন শোষণ। ক্লোরোফিলের ইলেকট্রনগুলো যখন ফোটন শোষণ করে, তখন সেগুলোর শক্তিস্তরে পরিবর্তন আসে এবং ইলেকট্রন উচ্চ শক্তিস্তরে উন্নীত হয়।
এসময় উচ্চ শক্তিস্তরে থাকা ইলেকট্রনগুলো তাদের অতিরিক্ত শক্তি ফোটন আকারে বের করে দেয় এবং পাশের ক্লোরোফিলগুলো সেই ফোটন গ্রহণ করে। এই গ্রহণকৃত ফোটন আবার তারাও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় আরেকটি ক্লোরোফিলের দিকে ছুঁড়ে দেয়। ছোঁড়াছুঁড়ির এক পর্যায়ে তা এসে পৌঁছায় ফটোসিস্টেমের বিক্রিয়া কেন্দ্রে, যেখানে রয়েছে বিশেষ ধরনের রঙ্গক অণু প্রাথমিক ইলেকট্রন গ্রাহক (Primary electron acceptor)। এখানে ফোটন পৌঁছার সাথে সাথে বিজারণ বিক্রিয়া শুরু হয়। এই বিক্রিয়ার ফলে বিক্রিয়া কেন্দ্রের ক্লোরোফিলগুলো প্রাইমারি ইলেকট্রন গ্রাহকের দিকে ফোটনের বদলে ইলেকট্রন ছুঁড়ে দেয়। যার ফলে সূর্যের আলোর বিপরীতে পাওয়া যায় ইলেকট্রন।

কেলভিন সাইকেলের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার পর উৎপাদিত হয় গ্লুকোজ; Image Source: nationalgeographic.org
এভাবেই এগিয়ে চলে খাদ্য উৎপাদনের প্রথম ধাপের কাজ। এই ধাপকে বলা হয় লাইট রিঅ্যাকশন (Light reaction), এ ধাপে উদ্ভিদ সূর্যালোকের ফোটন থেকে শক্তি উৎপাদন করে। তারপরের ধাপের নাম ডার্ক রিঅ্যাকশন যা কেলভিন চক্র (Calvin cycle) নামে পরিচিত। এই ধাপে সূর্যালোক থেকে পাওয়া শক্তি কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে জটিল প্রক্রিয়ায় জি৩পিতে (Glyceraldehyde 3-phosphate) রূপান্তরিত করা হয়। তারপর কেলভিন চক্রের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে উৎপন্ন হয় উদ্ভিদের খাবার গ্লুকোজ (C6H12O6)। সেই সাথে উপজাত হিসেবে উৎপন্ন হয় অক্সিজেন।
যেভাবে জীবজগৎ টিকে আছে এই রান্নার উপর
যদিও এই রান্নায় সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিতে হয় সূর্যকে, কারণ গ্লুকোজ উৎপাদনে উদ্ভিদ যে শক্তি ব্যয় করে, তা উৎপাদিত গ্লুকোজের শক্তির থেকেও বেশি!
যা-ই হোক, যদি কোনো কারণে উদ্ভিদের এই খাদ্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, তবে প্রথমত উদ্ভিদ নিজেই ধ্বংস হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে গেলে মানুষ কিংবা অন্যান্য প্রাণীদেরও ধ্বংসের পরিণতি নেমে আসবে, কারণ জীবজগৎ শ্বাসকার্য পরিচালনার জন্য অক্সিজেন ও খাবারের জন্য নির্ভরশীল উদ্ভিদের উপর। জীবজগৎ উদ্ভিদের এই রান্নার উপর প্রচণ্ডরকম ঋণী। প্রকৃতির সৃশৃঙ্খল চক্রে উদ্ভিদের এই রান্নার ঋণ বেড়েই চলছে শুধু।
সংক্ষেপে দেখুনঘণ্টা-মিনিট কেন ৬০ ভিত্তিক, আর দিন কেন ২৪ ভিত্তিক?
আমাদের সংখ্যা পদ্ধতি ১০ ভিত্তিক। প্রায় সব কিছু পরিমাপের জন্যই আমরা দশমিক পদ্ধতির একক ব্যবহার করি। কিন্তু সময়ের ক্ষেত্রে আমাদের এককগুলো খুবই অদ্ভুত। ৩৬৫ দিনে ১ বছর, ৩০ দিনে ১ মাস, ৭ দিনে ১ সপ্তাহ, ২৪ ঘণ্টায় ১ দিন- কোনোটির সাথে কোনোটির মিল নেই। এর পেছনে অবশ্য কারণও আছে। ১ বছর বা ৩৬৫ দিন হচ্ছে সূর্যেরবিস্তারিত পড়ুন
আমাদের সংখ্যা পদ্ধতি ১০ ভিত্তিক। প্রায় সব কিছু পরিমাপের জন্যই আমরা দশমিক পদ্ধতির একক ব্যবহার করি। কিন্তু সময়ের ক্ষেত্রে আমাদের এককগুলো খুবই অদ্ভুত। ৩৬৫ দিনে ১ বছর, ৩০ দিনে ১ মাস, ৭ দিনে ১ সপ্তাহ, ২৪ ঘণ্টায় ১ দিন- কোনোটির সাথে কোনোটির মিল নেই। এর পেছনে অবশ্য কারণও আছে। ১ বছর বা ৩৬৫ দিন হচ্ছে সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর একবার ঘুরে আসার সময়, ১ মাস বা ৩০ দিন হচ্ছে চাঁদের পৃথিবীকে আবর্তন করার সময় এবং ১ দিন হচ্ছে পৃথিবীর নিজ অক্ষের উপর ঘুরতে পৃথিবীর প্রয়োজনীয় সময়।
কিন্তু এরপর দিনের ভগ্নাংশগুলোর পেছনে কোনো প্রাকৃতিক কারণ নেই। অর্থাৎ ১ দিন সমান যে ২৪ ঘণ্টা, এর পেছনে চন্দ্র, সূর্য বা পৃথিবীর আবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই। ১ দিন সমান ২৪ ঘণ্টা না হয়ে ১০ ঘণ্টা বা ২০ ঘণ্টাও হতে পারত। কেন হয়নি? অথবা ১ ঘণ্টাকে কেন ৬০ মিনিট, বা ১ মিনিটকে কেন ৬০ সেকেন্ড ধরা হয়েছে? কেন ১০০ মিনিট বা ১০০ সেকেন্ড ধরা হয়নি? সংক্ষেপে উত্তরটি হচ্ছে, হাজার হাজার বছর ধরে এই পদ্ধতি চলে আসছে। কেন ঠিক এই ২৪ এবং ৬০ এর পদ্ধতিই চালু হয়েছে, তার পেছনে ইতিহাসবিদরা কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন।
দিন কেন ১২ ঘণ্টা?
সরল সূর্যঘড়ি; Source: Getty Images
১২ ঘণ্টা ভিত্তিক দিন প্রথম ব্যবহার করতে দেখা যায় প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায়। মিসরীয়দের তৈরি প্রথম দিকের সূর্যঘড়ি ছিল খুবই সাধারণ একটি কাঠি, যার ছায়ার দৈর্ঘ্য দেখে দিনের বিভিন্ন সময়ের হিসেব বের করা হতো। তবে আজ থেকে অন্তত ৩,৫০০ বছর পূর্বেই মিসরীয়রা উন্নততর সূর্যঘড়ি আবিষ্কার করে, যেখানে দিনকে ১২টি ভাগে ভাগ করা হয়। কেন তারা দিনকে ১২ ভাগ করেছিল, ইতিহাসবিদরা তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
কারো মতে, ১২ সংখ্যাটি নেওয়া হয়েছিল বছরের ১২টি মাস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ১২ সংখ্যার ধারণাটি রাশিচক্রের ১২টি নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে প্রভাবিত। অবশ্য অনেকে মনে করেন, প্রাচীন মিসরীয়রা ব্যাবলনীয়দের ১২ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ১২ ঘণ্টার দিন চালু করেছিল। তবে মিসরীয়রা ঘণ্টাগুলোকে আর মিনিট বা সেকেন্ডে ভাগ করেনি, এবং তাদের ঘণ্টাগুলোও গ্রীষ্মকালে বড় এবং শীতকালে ছোট হতো।
১২ ঘন্টা সময় বিশিষ্ট সূর্যঘড়ি; Source: timecenter.com
প্রাচীন চীনারাও দিন এবং রাতকে পৃথক পৃথক ১২ ঘণ্টায় হিসেব করতো, যা দ্বৈত ঘণ্টা নামে পরিচিত ছিল। তবে চীনে একইসাথে আরেকটি পদ্ধতিও চালু ছিল, যেখানে দিনকে ১০০টি ভাগে ভাগ করা হতো। প্রতিটি ভাগকে চীনা ভাষায় ‘কে’ বলা হতো। কিন্তু ১০০ সংখ্যাটি ১২ এর মতো ৩ দ্বারা বিভাজ্য না হওয়ায় দুই পদ্ধতির মধ্যে সময়ের রূপান্তর জটিল ছিল। ফলে পরবর্তীতে ১৬২৮ সালে ১০০ ভাগকে সংশোধন করে ৯৬ ভাগে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। ৯৬, ১২ এর গুণিতক হওয়ায় দুই পদ্ধতির মধ্যে সমন্বয় করা সহজ হয়।
রাত কেন ১২ ঘণ্টা?
দিনের বেলাকে সূর্যঘড়ির সাহায্যে ১২ ভাগে ভাগ করা সম্ভব হলেও রাতে তা সম্ভব ছিল না। ফলে প্রাচীন মিসরীয় জ্যোতির্বিদরা রাত্রিবেলাকে ভাগ করার জন্য নক্ষত্রের সাহায্য নিতেন। তারা সে সময় ডেকান্স নামে ৩৬টি নক্ষত্রপুঞ্জকে ব্যবহার করতেন, যার মধ্যে ১৮টি রাত্রিবেলা দৃশ্যমান থাকতো। এর মধ্যে ৩ করে ৬টিকে দেখা যেত সন্ধ্যা এবং ভোরের আলো-আঁধারির সময়টুকুতে, আর বাকি ১২টি দেখা যেত গাঢ় অন্ধকারের সময়ে। এই ১২টি নক্ষত্রের উদয়ের সময়ের মাধ্যমেই মিসরীয়রা রাত্রিবেলাকে ১২টি ভাগে ভাগ করত।
নক্ষত্র ব্যবহার করে রাতের ঘণ্টাগুলোর দৈর্ঘ্য নির্ণয়ের এই পদ্ধতির নমুনা সে সময়ের কিছু কফিনের ঢাকনাতেও পাওয়া গেছে। সম্ভবত মিসরীয় বিশ্বাস করত, মৃত ব্যক্তিরও সময়ের হিসেব রাখার দরকার হতে পারে। তবে এ পদ্ধতিতে বছরের বেশিরভাগ সময়ই রাতের ঘণ্টাগুলো এখনকার ১ ঘণ্টার সমান হতো না। সেগুলো হতো প্রায় ৪০ মিনিট দীর্ঘ।
রাতের বেলা ডেকান্স তারকাপুঞ্জের চিত্রায়িত দৃশ্য; Source: scienceabc.com
২৪ ঘন্টার একীভূত দিবারাত্রির ধারণা
পৃথক পৃথকভাবে ১২ ঘণ্টার দিন এবং ১২ ঘণ্টার রাত নির্ধারণের পর ২৪ ঘণ্টার দিনরাত্রির ধারণাটি তৈরি হয়। কিন্তু বছরের সব সময় সমান দৈর্ঘ্যের ঘণ্টার কৃত্রিম ধারণাটি প্রথম ব্যবহার হতে দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে, যখন গ্রীক জ্যোতির্বিদরা তাদের তত্ত্বীয় হিসেব-নিকেশের জন্য এ ধরনের আদর্শ সময়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ১২৭ থেকে ১৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রীক জ্যোতির্বিদ হিপারকাস সর্বপ্রথম সমান দৈর্ঘ্যের ২৪ ঘণ্টার দিন ব্যবহার করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু চতুর্দশ শতকে ইউরোপে যান্ত্রিক ঘড়ি আবিস্কার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার প্রস্তাব কার্যকর হয়নি।
১ ঘণ্টায় কেন ৬০ মিনিট?
সংখ্যাপদ্ধতি
আমাদের ১০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি এসেছে হাতের ১০টি আঙ্গুল ব্যবহার করে গণনা করার সুবিধার্থে। কিন্তু আজ থেকে অন্তত ৫,০০০ বছর আগে, সুমেরীয় সভ্যতায় জটিল গাণিতিক এবং জ্যামিতিক হিসাবের জন্য দশমিক সংখ্যা পদ্ধতির পরিবর্তে ১২ এবং ৬০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করতো। ১০ ভিত্তিক পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা হলো, ১০ কে শুধুমাত্র ২ এবং ৫ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ভাগ করা যায় না। সেই তুলনায় ১২ কে ২, ৩, ৪, ৬ দ্বারা এবং ৬০ কে ২ থেকে ৬ পর্যন্ত সবগুলো সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায় বলে এসব পদ্ধতিতে ভগ্নাংশের কাজ হিসেব করা বেশ সহজ ছিল।
কফিনের ভেতরে পাওয়া সময়ের হিসাব; Source: Wikimedia Commons
এছাড়াও সুমেরীয়রা এবং পরবর্তী ব্যাবলনীয়রা হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে বাকি চারটি আঙ্গুলের তিনটি করে বিভাজন হিসেব করে এক হাতে মোট ১২ পর্যন্ত গণনা করত। এক হাতের ১২টি সংখ্যাকে অন্য হাতের ৫টি আঙ্গুল দ্বারা গুণ করলে দুই হাতে সর্বোচ্চ ৬০ পাওয়া যায়। এটিও মিনিট-সেকেন্ডে ৬০ সংখ্যাটি নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যা
সুমেরীয় সভ্যতার পতনের পর খ্রিস্টপূর্ব অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্যাবলনীয়রা কোণ পরিমাপের জন্য ডিগ্রী আবিস্কার করে। সে সময় তাদের ধারণা ছিল পৃথিবী ৩৬০ দিনে একবার সূর্যকে আবর্তন করে। অর্থাৎ যদি প্রতিদিনের কৌণিক আবর্তনকে ১ ডিগ্রী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তাহলে পূর্ণ আবর্তনে ৩৬০ ডিগ্রী সম্পন্ন হয়। ইতিহাসবিদরা ধারণা করেন, এখান থেকেই বৃত্তের ৩৬০ ডিগ্রীর ধারণাটি আসে। বৃত্তের এক ষষ্ঠাংশ, অর্থাৎ ৬০ ডিগ্রী প্রকৃত কোণ গঠন করে। অর্থাৎ ৬০ ডিগ্রী করে বৃত্তের অভ্যন্তরে ছয়টি ত্রিভুজ আঁকলে প্রতিটি ত্রিভুজ সমবাহু হয়। এ কারণে তখন থেকেই জ্যামিতি এবং জ্যোতির্বিদ্যায় ৬০ সংখ্যাটির বিশেষ গুরুত্ব ছিল।
৩৩৫ থেকে ৩২৪ খ্রিস্টপূর্বের মধ্যে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের বিশাল এলাকা বিজয়ের ফলে ব্যাবিলনের জ্যোতির্বিদ্যা গ্রীসে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলিম বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদরাও রোম এবং ভারত থেকে ১২ এবং ৬০ ভিত্তিক সময় পরিমাপের পদ্ধতি গ্রহণ করেন। এভাবে ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী এই পদ্ধতি বিস্তার লাভ করে।
সংক্ষেপে দেখুনচীনাদের আবিষ্কৃত পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন ভূমিকম্প নির্ণায়ক যন্ত্রের নাম কি?
আধুনিক ক্যালেন্ডারের হিসাবে দ্বিতীয় শতাব্দীতে চীনের রাজ দরবারে এক অদ্ভুত যন্ত্র তৈরি হয়েছিল। দূর থেকে দেখতে সেটি এক বিশাল পাত্রের মতো দেখতে। সেই পাত্রের ঘাড় থেকে বেরিয়ে এসেছে চীনা ঐতিহ্যের প্রতীক ড্রাগনের মোট ৮টি মাথা। আবার সেই ড্রাগনের মাথার ঠিক নিচেই ক্ষুধার্ত অভিব্যক্তি নিয়ে আকাশের পানে হা করে তাবিস্তারিত পড়ুন
আধুনিক ক্যালেন্ডারের হিসাবে দ্বিতীয় শতাব্দীতে চীনের রাজ দরবারে এক অদ্ভুত যন্ত্র তৈরি হয়েছিল। দূর থেকে দেখতে সেটি এক বিশাল পাত্রের মতো দেখতে। সেই পাত্রের ঘাড় থেকে বেরিয়ে এসেছে চীনা ঐতিহ্যের প্রতীক ড্রাগনের মোট ৮টি মাথা। আবার সেই ড্রাগনের মাথার ঠিক নিচেই ক্ষুধার্ত অভিব্যক্তি নিয়ে আকাশের পানে হা করে তাকিয়ে আছে ৮টি ধাতব ব্যাঙ। ব্যাঙ আর ড্রাগনের নকশা করা এই যন্ত্রটি দেখে অনেকে তা সম্রাটের আমোদ ফূর্তির মাধ্যম বা শৈল্পিক নিদর্শন ভেবে ভুল করে। কিন্তু একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই যন্ত্র কোনো শিল্পকার্য নয় এবং এর সাথে সম্রাটের মনোরঞ্জনেরও কোনো সম্পর্ক নেই। তারপরেও বেশ দীর্ঘ সময় ধরে সম্রাটের দরবারের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাজপ্রহরীদের কঠোর নজরদারিতে সংরক্ষিত রয়েছে যন্ত্রটি। প্রহরীদের কাজ ছিল যন্ত্রের গায়ে জুড়ে দেয়া ড্রাগনের মুখের দিকে নজর রাখা। তারা দিনের পর দিন সেই ড্রাগনগুলোর মুখের দিকে নজর রেখে চলেছেন। এই নজরদারির যেন কোনো শেষ নেই।
কিন্তু একদিন প্রহরীদের চোখের সামনে যন্ত্রের একটি ড্রাগনের মুখ থেকে একটি ধাতব গোলক বের হয়ে আসলো। সেটি গিয়ে সোজা পতিত হলো এক ক্ষুধার্ত ব্যাঙের মুখে। সাথে সাথে কাসায় চামচ দিয়ে আঘাত করার মতো শব্দে সেই সংরক্ষিত কুঠুরির দেয়াল প্রকম্পিত হয়ে উঠলো। রাজপ্রহরীরা তৎক্ষণাৎ ছুটে চললেন সম্রাটের দরবারে। যাওয়ার পথে লোকের কানে কানে পৌঁছে দিলেন সেই সংবাদ, “‘হু-ফ্যাঙ দিদোং ই’-র ড্রাগনেরা জেগে উঠেছে।”
হু-ফ্যাঙ দিদোং ই
সুপ্রিয় পাঠকগণ ইতোমধ্যে প্রবন্ধের শিরোনাম পড়ে জেনে গিয়েছেন সেই ড্রাগন আর ব্যাঙের মূর্তি সম্বলিত যন্ত্রটি মূলত ভূমিকম্প নির্ণায়ক যন্ত্র। আর এই যন্ত্র তৈরি হয়েছিল ১৩২ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন চীন সাম্রাজ্যে। তখনও মানব সভ্যতা ভূপৃষ্ঠের প্লেট তত্ত্ব আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়নি। তখনকার পৃথিবীতে মানুষ ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাসসহ যেকোনো দুর্যোগকে মহাজাগতিক ইন এবং ইয়াং এর মাঝে অসামঞ্জস্যতার পরিণাম হিসেবে গণ্য করতো। তাদের নিকট প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল এক রহস্য। বিশাল চীন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং প্রদেশে প্রায়ই ভূমিকম্প সঙ্ঘটিত হতো। ভূমিকম্পের কারণে প্রাণহানী এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কম ছিল না। তাই চীন সম্রাট এই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা লাঘব করার লক্ষ্যে দুর্যোগ কবলিত স্থানে অতিসত্বর সাহায্য প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তাছাড়া সেই আমলের ধর্মীয় বিশ্বাসে ভূমিকম্পকে স্বর্গীয় ঘটনার নির্দেশক হিসেবে গণ্য করা হতো।


জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে হু-ফ্যাঙ দিদোং ই’র রেপ্লিকা; Sky Alert USA
কিন্তু দ্রুত সাহায্য প্রেরণ করা বেশ কঠিন কাজ। তৎকালীন সমাজে যোগাযোগ মাধ্যমে ছিল না কোনো টেলিফোন, টেলিগ্রাফ কিংবা ডাক ব্যবস্থা। দেখা যেত সম্রাটের নিকট ভূমিকম্পের খবর পৌঁছুতে সপ্তাহখানেক দেরি হয়ে যেত। তাই সম্রাট রাজ্যের বিজ্ঞানীদের ফরমান জারি করলেন, দ্রুত ভূমিকম্পের খবর জানার উপায় বের করতে। সম্রাটের ফরমানে সাড়া দিয়ে বিজ্ঞানীরা আদা জল খেয়ে কাজে নেমে পড়লেন। শত শত বিজ্ঞানীদের মাঝে ঝাং হ্যাং নামক এক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম ভূমিকম্প নির্ণায়ক এক অভিনব যন্ত্র নিয়ে সম্রাটের দরবারে হাজির হন। তিনি সেই যন্ত্রের নাম দিয়েছিলেন হু-ফ্যাঙ দিদোং ই বা ‘ভূমিকম্প নির্দেশক’।
সম্রাট ফরমান জারি করলেন বিজ্ঞানীদের প্রতি; Image Source: Universal Images Group/Getty Images
ঝাং হ্যাং এক প্রতিভার নাম
চীনা সাম্রাজ্যকে ভূমিকম্প নির্ণায়ক যন্ত্র উপহার দেয়া বিজ্ঞানী ঝাং হ্যাং ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে জ্যোতির্বিদ, গাণিতিক, প্রকৌশলি, কবি, ভূতাত্ত্বিক এবং চমৎকার একজন উদ্ভাবক। সাঁঝের আঁধারে যখন চীনের সকল কর্মকাণ্ড থেমে যেত, তখন জেগে উঠতো তার উৎসুক মন। তিনি রাতের পর রাত আকাশ পানে তাকিয়ে প্রায় আড়াই হাজারের মতো তারকারাজির অবস্থান লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এছাড়া তিনি পৃথিবীর প্রথম পানিচালিত অ্যাস্ট্রোলেইব উদ্ভাবন করেন।

বিজ্ঞানী ঝাং হ্যাং-এর স্মরণে প্রচলিত ডাকটিকিট; Photograph: Tristan Tan
প্রথম শতাব্দীতে তিনি হান সাম্রাজ্যের শাসনামলে চীনে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু ঠিক কত সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন সে সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা সম্ভব হয়নি। তার কর্মদক্ষতা অচিরেই তাকে চীনা রাজ দরবারের প্রধান বিজ্ঞানীর সম্মানে ভূষিত করেছে। তবে ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে পৃথিবীর প্রথম সিসমোস্কোপ হু-ফ্যাঙ দিদোং ই আবিষ্কারের জন্য।
যন্ত্রের কলাকৌশল
ঝাং হ্যাং-এর যন্ত্রটি বাইরে থেকে দেখতে একটি ৬ ফুট পরিধির ব্রোঞ্জের পাত্রের মতো। তৎকালীন চীনে সাধারণত এধরনের পাত্র ব্যবহার করা হতো মদ এবং পানীয় রাখার জন্য। পাত্রের গায়ে ৮টি ড্রাগন লাগানো ছিল। চীনা সংস্কৃতিতে সর্বমোট ৮টি দিক ব্যবহার করে বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করার প্রচলন ছিল। প্রতিটি ড্রাগনের মুখ সেই ৮টি দিক নির্দেশ করতো। ড্রাগনের মাথার একদম নিচে ৮টি ধাতব ব্যাঙ অবস্থান করতো। এই গেলো পাত্রের বাইরের বর্ণনা। পাত্রের ভেতরে ঝাং হ্যাং একটি সূক্ষ্ম পেন্ডুলাম জুড়ে দিয়েছিলেন। পাত্রের ভেতরের ফাঁকা জায়গা তিনি এক প্রকার তরল পদার্থ দিয়ে পূর্ণ করেছিলেন যা সম্পর্কে এখনও বিজ্ঞানীরা অন্ধকারে আছেন। প্রাচীন চীনা পাণ্ডুলিপির অস্পষ্ট পাঠ থেকে এই যন্ত্রের কলাকৌশল এবং এর ধারণকৃত তরলের প্রকৃতি সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়নি।

সিসমোস্কোপের অভ্যন্তরীণ কলাকৌশল; Image Source: Science & Society Picture Library
যন্ত্রের সূক্ষ্ম কলকব্জা সম্পর্কে গবেষকগণ এখনও ধোঁয়াশায় আছেন। তবে সহজ কথায় তারা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট কম্পন অনুভূত হওয়া মাত্র পাত্রের ভেতরের পেন্ডুলাম নির্দিষ্ট দিকে আন্দোলিত হতো। এর ফলে সেই দিকে রাখা ধাতব গোলক পেন্ডুলামের আঘাতে ড্রাগনের মুখ দিয়ে নিচে রাখা ব্যাঙের মুখে পতিত হতো। তবে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এই যন্ত্র এর আশেপাশে ভূমিকম্প ব্যতীত সৃষ্ট কম্পন দিয়ে প্রভাবিত হতো না। কিন্তু সেই সময়ে ঝাং হ্যাং কীভাবে এই জটিল কাজ সম্পন্ন করেছেন, তা বিজ্ঞানীদের বোধগম্য নয়। ধাতব গোলক ব্যাঙের মুখে পড়ার পর বেশ জোরালো শব্দের মাধ্যমে তা প্রহরীদের সতর্ক করে দিতো। এর মাধ্যমে শুধু ভূমিকম্প নির্দেশিত হতো না, বরং এর দিক এবং অবস্থানও জানা যেত।
সতীর্থদের প্রতিহিংসা এবং অপেক্ষা
সম্রাট যখন বিজ্ঞানীদের নিকট সিসমোস্কোপ নির্মাণের ফরমান জারি করেছিলেন, তখন শত শত বিজ্ঞানী সম্রাটকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কাজে নেমেছিলেন। কিন্তু তারা সকলেই ব্যর্থ হয়েছিলেন শুধু ঝাং হ্যাং ছাড়া। তাই স্বাভাবিকভাবে তিনি সহকর্মীদের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন। তারা তাকে পথেঘাটে হেয় করা শুরু করে। সবাই বলাবলি করতো, ঝাং হ্যাং খ্যাতির লোভে সম্রাটকে বোকা বানানোর চেষ্টা করেছে। ওদিকে সম্রাটের দরবারে সেই যন্ত্র পড়ে আছে মাসখানেক ধরে। শুনতে হাস্যকর লাগলেও সবাই অপেক্ষা করছিল পরবর্তী ভূমিকম্পের জন্য। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ফলাফল না হওয়ায় সবাই ধরে নিয়েছিল এই যন্ত্রের কোনো কার্যকারিতা নেই।

সহকর্মীদের প্রতিহিংসা আর তিরস্কারের শিকার হন ঝাং হ্যাং; Artist: Darani Vasudeva
ঝাং হ্যাং-এর অপেক্ষার পালা শেষ হয় ১৩৮ সালের এক সুন্দর সকালে। রাজপ্রহরীরা তাকে সম্রাটের নির্দেশে রাজ দরবারে নিয়ে যায়। তিনি সেখানে পৌঁছে আবিষ্কার করেন পশ্চিম দিকে মুখ করা এক ব্যাঙের মুখে ধাতব গোলকটি আটকে আছে। কিন্তু রাজধানী শহরের পশ্চিম দিকে কেউ ভূকম্পন অনুভব করেননি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল যন্ত্রটি প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় থাকা হ্যাং জানতেন তার অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়ে এসেছে। কয়েকদিন পর পশ্চিমের শহর লং (বর্তমান গানসু) থেকে দূত এসে সম্রাটকে জানালেন ভূমিকম্পের কথা। এমনকি ভূমিকম্প সঙ্ঘটনের সময়কাল গোলক পতনের সাথে মিলে যায়। এই বিস্ময়কর মুহূর্ত শুধু ঝাং হ্যাং-এর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পুরো বিজ্ঞানের জয়জয়কার হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। দেখা গেলো যারা তাকে তিরস্কার করেছিল, সেই সতীর্থরাই ঝাং হ্যাং-কে সেরাদের আসনে বসিয়ে দিলো। প্রতিভার কাছে হেরে গেল বিষাক্ত প্রতিহিংসা।
রেপ্লিকা বানানোর প্রচেষ্টা
সিসমোস্কোপ নির্মাণের এক বছর পর ঝাং হ্যাং মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার শিষ্যরা সফলভাবে হু-ফ্যাঙ দিদোং ই’র রেপ্লিকা বানাতে সক্ষম হন। কিন্তু কালের আবর্তে সবগুলো রেপ্লিকা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। কারণ, কীভাবে সেই যন্ত্র শত শত মাইল দূরের ভূকম্পন নির্ণয় করার সময় পারিপার্শ্বিক কম্পন অগ্রাহ্য করতো তা এখনও জানা যায়নি। আধুনিক যুগে ১৯শ এবং ২০শ শতাব্দীতে পৃথক পৃথক গবেষণাগারে বহুবার এই যন্ত্রের রেপ্লিকা নির্মাণের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন গবেষকরা। ২০০৫ সালে চীনের একাডেমি অফ সায়েন্সের ভূমিকম্প বিশারদগণ এর কার্যকর রেপ্লিকা নির্মাণ করেছেন বলে দাবি করেছেন। কিন্তু সেই যন্ত্রে নেই ঝাং হ্যাং-এর অসাধারণ সূক্ষ্মতার ছোঁয়া।


সংক্ষেপে দেখুন২০০৫ সালে নির্মিত একটি রেপ্লিকা; Image Source: Beijing Times
চীনা রেপ্লিকায় ৮টি আলাদা গোলকের বদলে মাত্র একটি গোলক ব্যবহৃত হয়েছে। গোলক স্পর্শ করে ঝুলে আছে একটি পেন্ডুলাম। ভূকম্পনের প্রভাবে পেন্ডুলাম নির্দিষ্ট দিকে আন্দোলিত হয়ে গোলকটিকে ড্রাগনের মুখে ঠেলে দেয়। বিজ্ঞানীরা এই যন্ত্র নিয়ে আরো কাজ করে যাচ্ছেন। তারা আশাবাদী অদূর ভবিষ্যতে তারা চীনা পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত যন্ত্রের সূক্ষ্মতার কাছাকাছি রেপ্লিকা নির্মাণ করতে পারবেন।
ঝাং হ্যাং-এর প্রাচীন সিসমোস্কোপের হাত ধরে এসেছে আধুনিক সিসমোগ্রাফ; Image Source: Ha Civilizaciones
ঝাং হ্যাং-এর পৃথিবী এখন অনেকটাই বদলে গেছে। যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে বিপ্লব। ভূমিকম্প নিয়ে মানুষ প্লেট তত্ত্ব আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসমোগ্রাফের মাধ্যমে ভূমিকম্প নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। প্রয়োজনে দ্রুততার সাথে আক্রান্ত স্থানে ত্রাণ সরবরাহ করা হচ্ছে বছরজুড়ে। কিন্তু এই ১৮০০ বছরের ব্যবধানেও ঝাং হ্যাং-এর নাম মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। এমনকি আধুনিক যুগের যন্ত্রগুলোতেও দেখা যায় সেই প্রাচীন হু-ফ্যাঙ দিদোং ই’র ছোঁয়া। বর্তমান সিসমোস্কোপে ব্যবহৃত সেন্সরটি একটি ঝুলন্ত দেহ যা সেই পেন্ডুলামের কাজ করে যাচ্ছে। পেন্ডুলামের পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে চুম্বকীয় শক্তি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি ধীরে ধীরে এই যন্ত্রকে আরো উন্নত করবে, কিন্তু এসব কিছুই শুরু হয়েছিল হান সাম্রাজ্যের চীনে একজন প্রতিভাবানের হাত ধরে। সেই প্রতিভাবান ঝাং হ্যাং-এর প্রতি মানব সভ্যতা চির কৃতজ্ঞ।
পৃথিবীতে যা কিছু দুষ্প্রাপ্য, তা-ই কি মূল্যবান?
বিখ্যাত লেখক রলফ ডবেলি (Rolf Dobelli) একবার এক বন্ধুর বাসায় কফির দাওয়াতে গেলেন। সেখানে একদিকে বড়রা মিলে গল্প করছিল, আরেক দিকে তিনটে গ্যাদাপোনা এক অন্যের সাথে কোস্তাকুস্তি করছিল। তার সাথে তো কিছু মার্বেল ছিল। তার মনে হলো মার্বেলগুলো দিয়ে যদি বাচ্চাগুলোকে ঠাণ্ডা করা যায় তাহলে মন্দ হয় না। মার্বেলগুলো তবিস্তারিত পড়ুন
বিখ্যাত লেখক রলফ ডবেলি (Rolf Dobelli) একবার এক বন্ধুর বাসায় কফির দাওয়াতে গেলেন। সেখানে একদিকে বড়রা মিলে গল্প করছিল, আরেক দিকে তিনটে গ্যাদাপোনা এক অন্যের সাথে কোস্তাকুস্তি করছিল। তার সাথে তো কিছু মার্বেল ছিল। তার মনে হলো মার্বেলগুলো দিয়ে যদি বাচ্চাগুলোকে ঠাণ্ডা করা যায় তাহলে মন্দ হয় না। মার্বেলগুলো তিনি ছড়িয়ে দিলেন মেঝেতে। ভাবলেন, এবার শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
কীসের কী? অশান্তি আরো বাড়লো। বাচ্চাগুলো নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়ল। কেন এই বিবাদ? দেখা গেল, মার্বেলগুলোর মধ্যে একটার রঙ নীল। আর বাচ্চারা সেটা নিয়েই কাড়াকাড়ি করছে। সবগুলো মার্বেলের আকার, আকৃতি, ঔজ্জ্বল্য একইরকম ছিল। নীল মার্বেলটার তাহলে বিশেষত্ব কী ছিল? একটাই বিশেষত্ব ছিল। নীল মার্বেলটা ছিল অন্যগুলো থেকে আলাদা। আর কোনো নীল মার্বেল ছিল না সেখানে। এই শিশুসুলভ আচরণ দেখে তিনি মনে মনে হেসে দিলেন। আর ভাবলেন, শিশুদের চিন্তাভাবনা কতই না মজার আর অযৌক্তিক হয়।
এই ঘটনা যে তার নিজের জীবনেও আসবে, এটা তখন তিনি ভাবেননি। কয়েক বছর পর। ২০০৫ সাল। সোশ্যাল মিডিয়া না আসলেও ইন্টারনেট তখন পুরোদমে মানুষের জীবনে জায়গা করে নিচ্ছে। ইমেইল সার্ভিস বলতে তখনো ইয়াহু, হটমেইল এদের বোঝাতো। গুগল তখনো মাঠে নামেনি। আগস্ট মাসে গুগল ঘোষণা দেয়, তারা নিজস্ব ইমেইল সার্ভিস চালু করবে। এ খবর শোনামাত্রই রলফ ডবেলি একটা জিমেইল একাউন্টের জন্য পাগল হয়ে গেলেন।
সে সময় জিমেইল একাউন্ট খোলাতে ছিল খুব কড়াকড়ি। আগে থেকে একাউন্ট আছে এমন কারো ইনভাইটেশন পেলেই কেবল এখানে একাউন্ট খোলা যেত। এ কারণে জিনিসটা আরো মহার্ঘ হয়ে গেল। এমন না যে তার সে সময় কোনো ইমেইল একাউন্ট ছিল না। এমনও না যে জিমেইল তার সার্ভিসের দিক দিয়ে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে ছিল। কেবল অল্প কিছু মানুষ বিশেষ এই সুবিধা পাচ্ছে- এই ভাবনাই মানুষকে এর জন্য আরো বেশি করে লালায়িত হতে প্রণোদিত করে। এই ঘটনা মনে করে তিনি এখনো মনে মনে হেসে উঠেন, আর ভাবেন, সেদিনের সেই শিশুদের তুলনায় তিনি ব্যতিক্রম কিছু নন। আমাদের সবার মধ্যেই হয়তো একটা শিশু সত্ত্বা লুকিয়ে আছে।

প্রথম দিকে জিমেইলের লুক; Image: Time.com
Rara sunt cara নামে রোমান একটা বচন আছে। যা কিছু দুষ্প্রাপ্য, তা-ই মূল্যবান। Scarcity error বা দুষ্প্রাপ্যতার ভ্রান্তি মানুষের ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। আপনি একজন রিয়েল এস্টেট এজেন্টের কাছে গেলেন ঢাকার অদূরে একটা প্লট কিনতে। জায়গাটা এখন পানির নিচে। কিন্তু সে আপনাকে বললো, পাঁচ বছরের মধ্যে এখানে বাড়ি তো বাড়ি, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল সব গজিয়ে উঠবে। সে আপনাকে আরো বললো, এই প্লট গতকালই আমেরিকায় বসবাসরত এক ইঞ্জিনিয়ার এসে দেখে গেছে। আপনি কি তার কথা বিশ্বাস করবেন? সে হয়তো শুধুমাত্র আপনাকে বাজিয়ে দেখার জন্যই এই মিথ্যেটুকু বলেছে। মিথ্যেটুকু হয়তো সামান্য, কিন্তু এর প্রভাব ব্যাপক। আপনি বাসায় এসে কই মাছের ঝোল আর ইলিশের ডিমটুকু তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেতে পারবেন না। চোখের সামনে আপনি দেখতে পাবেন, এক টুকরো পছন্দ করা জমি কোথাকার কোন এক ইঞ্জিনিয়ার এসে নিয়ে যাচ্ছে। তড়িঘড়ি করে আপনি তখন প্লটটা বুকিং দিয়ে দেবেন।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমি আর আমার স্ত্রী, দু’জনেরই টক খুব পছন্দ। আমরা যখন আমড়া মাখা বা কাঁচা আম মাখা বা এরকম কিছু খেতে বসি, আমাদের মনোমালিন্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায় মাখার শেষ অংশুটুকু। শুরুটকুও নয়, মাঝের টুকুও নয়। পাতের শেষ ঝোলটুকু খাবার যে মজা, তা আর কোন কিছুর সাথেই তুলনীয় নয়।
দুষ্প্রাপ্যতার ভ্রান্তি পরীক্ষা করার জন্য উদ্যোগ নেন অধ্যাপক স্টিভেন ওরচেল। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের দুই ভাগে ভাগ করলেন। প্রথম গ্রুপকে পুরো এক বাক্স বিস্কুট খেতে দিলেন। আর দ্বিতীয় গ্রুপকে দিলেন মাত্র দুটি বিস্কুট। খাওয়া শেষে অংশগ্রহণকারীদের বললেন, বিস্কুটকে রেটিং দিতে। দেখা গেলো, দ্বিতীয় গ্রুপের লোকজন বিস্কুট খেয়ে বেশি মজা পেয়েছে। এই পরীক্ষা বেশ কয়েক বার করা হলো। প্রতিবারই একই ফলাফল পাওয়া গেল।
বিশেষ কোনো ইভেন্টের পোস্টার আমাদের বলে, ‘শুধু মাত্র আজকের জন্য’। আর্ট গ্যালারির মালিকরা এই দুষ্প্রাপ্যতার ভ্রান্তির সুযোগ নেয়। তারা অধিকাংশ পেইন্টিংইয়ের উপর লাল মার্কারে করে ‘Sold’ লিখে রাখে। এর ফলে বাকি পেইন্টিংগুলোকে আমাদের কাছে মনে হয় খুব দামী আর দুষ্প্রাপ্য কিছু।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ তাদের ব্রশিউরে লিখে রাখে, ‘শেষ সুযোগ বিরল প্রজাতির এক জলহস্তী দেখার’। আপনার কিন্তু কখনোই জলহস্তি দেখার কোনো শখ ছিল না। বিরল প্রজাতির জলহস্তী তো নয়-ই। কিন্তু শেষ সুযোগ বলে কথা। এই শেষ সুযোগের ফাঁদে পড়ে আপনি প্লেনের টিকেট করে তানজানিয়া চলে গেলেন জলহস্তী দেখতে।
আমরা ডাকটিকেট, কয়েন, পুরানো গাড়ি সংগ্রহ করি। জানি যে এগুলো কোন কাজের না। পোস্ট অফিস পুরানো ডাকটিকেট নেয় না, ব্যাঙ্ক পুরানো কয়েন নেয় না, পুরানো গাড়ি নিয়ে রাস্তায় চলা যায় না। তারপরও আমরা এগুলো কিনি। একটাই কারণ- এদের যোগান কম।


দুষ্প্রাপ্যতা দাম বাড়িয়ে দেয় চিত্রকর্মের; Painting by Harish Bhoyar
আরেকটা পরীক্ষায় ছাত্রছাত্রীদের বলা হলো, দশটা পোস্টারকে আকর্ষণীয়তার ভিত্তিতে র্যাংক করতে। র্যাংক করা হয়ে গেলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পুরস্কারস্বরূপ তারা একটা পোস্টার নিজেদের কাছে রেখে দিতে পারবে। পাঁচ মিনিট পর বলা হলো, যে পোস্টারটি র্যাংকিংয়ে তিন নম্বরে আছে, তা কাউকে দেওয়া হবে না। এখন তোমরা আবার দশটা পোস্টারকে র্যাংক করো। যে পোস্টারটি সরিয়ে ফেলা হলো, হঠাৎ করে সেটাই সবার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হিসেবে দেখা দিল। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় Reactance। কোনোকিছু যখন আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়, হঠাৎ সেটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হিসেবে দেখা দেয়। বিখ্যাত ইংরেজি টিভি সিরিজ FRIENDS-এর শুরুর দিকে র্যাচেল রসকে খুব একটা পাত্তা দিত না। যখনই রস অন্য একজনের প্রেমে পড়লো, তখনই র্যাচেল তার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া শুরু করলো।
FRIENDS সিরিজে রস ও র্যাচেল; Image: Bustle.com
এই ঘটনাকে রোমিও এ্যান্ড জুলিয়েট ইফেক্টও বলা হয়। ভালোবাসা মানে না কোন বাঁধা। আর যা কিছু নিষিদ্ধ, তার প্রতি ভালবাসাও জন্মায় বেশি। কেবল যে ভালোবাসার ক্ষেত্রেই এটা হয়, তা না। আমেরিকায় আন্ডারগ্র্যাড ছাত্রদের পার্টিগুলোতে মদ্যপানের এতো ছড়াছড়ি কেন? বেসামাল মদ্যপের সংখ্যাই বা এতো বেশি কেন এই পার্টিগুলোতে? সেই একই কারণ। ২১ বছরের নিচে এখানে মদ্যপান করা নিষেধ। আর যা কিছু নিষেধ, তার প্রতি আকর্ষণও তো বেশি।
দুষ্প্রাপ্যতা ভ্রান্তির কারণে আমরা পরিষ্কার মাথায় চিন্তা করতে পারি না। পণ্য হোক আর সেবাই হোক, মূল্যায়ন হওয়া উচিত কেবল তার দাম আর সে কী উপযোগিতা দিচ্ছে আমাকে, তার উপর। পণ্যটা দ্রুত মার্কেট থেকে আউট হয়ে যাচ্ছে কিনা, এর ভিত্তিতে না।
সংক্ষেপে দেখুনচোরাবালি কি সত্যিই আমাদের মেরে ফেলতে পারে?
একটু ভাবুন তো, আপনি এরকম ক’টি সিনেমা দেখেছেন যেখানে নায়ক চোরাবালির মধ্যে পড়ে যায়, আর ঠিক শেষ মুহূর্তে হয়তো গাছের ডাল ধরে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে বের হয়ে আসে? সিনেমাতে যদি না-ও দেখে থাকেন, গল্পে চোরাবালির কথা পড়েননি কিংবা চোরাবালির নাম অন্তত শোনেননি এমন কাউকে হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে সিনেমাতে দেখেবিস্তারিত পড়ুন
একটু ভাবুন তো, আপনি এরকম ক’টি সিনেমা দেখেছেন যেখানে নায়ক চোরাবালির মধ্যে পড়ে যায়, আর ঠিক শেষ মুহূর্তে হয়তো গাছের ডাল ধরে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে বের হয়ে আসে? সিনেমাতে যদি না-ও দেখে থাকেন, গল্পে চোরাবালির কথা পড়েননি কিংবা চোরাবালির নাম অন্তত শোনেননি এমন কাউকে হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে সিনেমাতে দেখে থাকা চোরাবালির দৃশ্যকে সত্যি ভেবে বসলে হয়ত কারও কাছে একে কোনো মারাত্মক গভীর কোনো গহ্বর মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে চোরাবালির গভীরতা কয়েক ফুটের বেশি হয় না। বলা বাহুল্য, এই কয়েক ফুট গভীরতাই যে কারো মনে মৃত্যু-শঙ্কা তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। আপনি যদি চোরাবালিতে কখনো পড়েও যান, সেখানে কেউ কিন্তু আপনাকে ভেতরের দিকে নিয়ে যাবে না। চোরাবালিতে তলিয়ে যাওয়ার কাজটি করবেন আপনি নিজেই! অদ্ভুত ঠেকছে না ব্যাপারটা?
Source: bournemouthecho.co.uk
চোরাবালি কী?
চোরাবালি আসলে সাধারণ বালির মতোই এক ধরনের বালি। কিন্তু সাধারণ বালির সাথে একটি বড় পার্থক্যও আছে এর। পার্থক্য হলো এই বালি পানি দ্বারা অতি-সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। আমরা যখন সাধারণ বালির উপরে দাঁড়াই, তখন পা কিছুটা ভেতরে ঢুকে গেলেও বেশিদূর যেতে পারে না। এর কারণ, বালিতে থাকা ঘর্ষণ বল আমাদেরকে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। অন্যদিকে পানি দ্বারা প্রচুর পরিমাণে সম্পৃক্ত হবার দরুন চোরাবালিতে এই বল সাধারণ বালির তুলনায় অনেক কমে যায়। এর ফলে পানি ও মাটি মিশ্রিত হয়ে স্যুপের মতো হয়ে যায়। যখন পানি ঝরঝরে-আলগা বালির মধ্যে আটকা পড়ে, তখন এটি তরলীকৃত মাটি তৈরি করে। ফলে এই মাটি কোনো ধরনের ভার বহন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আর এরকম প্রাকৃতিক কারণেই মূলত তৈরি হয় ‘চোরাবালি’ নামক ফাঁদের।
যেভাবে চোরাবালির সৃষ্টি হয়; Source: quoracdn.net
বাঁচার উপায়
চলচ্চিত্রে দেখা চোরাবালির দৃশ্যকে সম্পূর্ণ সত্যি মনে করে আপনি হয়তো ধরেই নিয়েছেন যে, এর থেকে পরিত্রাণের সহজ কোনো উপায় নেই। আবার কেউ হয়তো এর থেকেও ভয়াবহ কিছু ভাবছেন, কল্পনা করছেন মৃত্যু! কিন্তু বাস্তবে এমনটা হওয়ার সুযোগ অনেক কম, যদি আপনি নিজে শান্ত থাকেন।
চোরাবালিতে পানি-বালির যে স্যুপ তৈরি হয়, তা অনেক সময় প্রাথমিকভাবে দেখে বোঝা খুব কঠিন। চোরাবালিতে পানি নিচের দিকে চুয়ানোর কারণে এর উপরের অংশ কখনো কখনো সাধারণ বালির মতোই দেখায়। আবার মাঝে মাঝে সাধারণ কাদা বলেও মনে হতে পারে। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রেই এমন হয় যে সেটার উপর পা রাখার আগে পর্যন্ত কেউ বুঝতে পারবে না সে চোরাবালিতে পা দিতে যাচ্ছে!
একটু চেষ্টা করলেই চোরাবালি থেকে উঠে আসতে পারবেন; Source: ytimg.com
আপনি যদি ঘটনাক্রমে চোরাবালিতে পড়েও যান, তাহলে আপনার প্রথম কাজটি হবে- আতঙ্কিত না হওয়া। আগেই বলেছি, চোরাবালি কয়েক ফুটের বেশি গভীর হয় না। তাই চোরাবালিতে পড়ে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপনার জুতা জোড়া হারানোর সম্ভাবনাই প্রকট!
চোরাবালির ফাঁদে পড়লে যে কয়টি ব্যাপার মনে রাখবেন:
১. আপনি মারা যাচ্ছেন না, এটা নিশ্চিত!
২. আপনি যতটা বল প্রয়োগ করবেন, ততটাই ঐ ফাঁদে ফেঁসে যাবেন। তাই নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন। কখনোই হাত-পা ছোঁড়ার চেষ্টা করবেন না। এই কাজ করলে আপনি শুধু একটাই সাফল্য পাবেন- আপনি নিজেকে চোরাবালির আরও গভীরে নিয়ে যাবেন!
৩. মানবদেহের ঘনত্ব প্রতি ঘনফুটে ৬২.৪ পাউন্ড। আর এই ঘনত্ব নিয়েই আমরা দিব্যি পানিতে ভেসে থাকতে পারি। অন্যদিকে চোরাবালির ঘনত্ব প্রতি ঘনফুটে ১২৫ পাউন্ড। তার মানে বুঝতেই পারছেন, পানির চেয়েও অনেক সহজে ভেসে থাকা যাবে চোরাবালিতে!
এখন তাহলে চোরাবালি থেকে পরিত্রাণ পাবার পদ্ধতিতে যাওয়া যাক। প্রথমত, আপনার কাঁধে কোনো ব্যাগ থাকলে তা খুলে ফেলার চেষ্টা করুন। আপনার ভর যত কমবে ততই ভালো। একইসাথে চেষ্টা করুন পায়ের জুতাও খুলে ফেলতে। জুতা থাকলে সেটা আংটার মতো কাজ করতে পারে এবং আপনাকে চোরাবালি থেকে বের হতে একটু বেশিই পরিশ্রমে পড়তে হতে পারে। অবশ্য পায়ের জুতা খুলে ফেলা সম্ভব না হলেও নিরাশ হওয়ার কিছু নেই, একটু বেশি পরিশ্রম করতে হবে, এ-ই যা!
প্রসঙ্গত একটা কথা বলে রাখা ভালো, চোরাবালিতে পুরো শরীর নিয়ে না পড়ে যদি কখনো এক পা পড়ে যায়, তাহলে সাথে সাথে পিছনে ফিরে আসুন। চোরাবালি প্রায় এক মিনিট সময় নেয় তরলিত হওয়ার জন্য। আপনি সচেতন থাকলেই নিজের পা-কে ঐ সময়ের মধ্যে বের করে নিয়ে আসতে পারবেন।
আর আপনি যদি চোরাবালিতে পুরো দেহসমেত পড়েই যান, তাহলে আরো কিছু কাঠখড় পোড়াতেই হবে। চলুন অন্য একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করি। ধরুন, আপনি চোরাবালিতে না পড়ে একটি বিশাল বড় পুকুরে পড়ে গেছেন। তখন আপনি কী করবেন? সাঁতরে পাড়ে ওঠার চেষ্টা করবেন অবশ্যই। একই কাজ করতে হবে চোরাবালির ক্ষেত্রেও। নিজের দেহকে আনুভূমিক করে পিঠের উপর ভর দেয়ার চেষ্টা করুন। এতে আপনার শরীরের ভর সমানভাবে বণ্টন হবে। এর ফলে আপনি সহজে ভেসে থাকতে পারবেন। এরপর মূলত আপনাকে চিৎসাঁতার দিতে হবে! নিজের পা দুটোকে ঝাঁকিয়ে পায়ে লেগে থাকা বালিগুলোকে আলগা করার চেষ্টা করুন এবং ধীরে ধীরে সেগুলোকে উপরে নিয়ে আসার চেষ্টা করুন। সাঁতারে যেভাবে হাতকে কাজে লাগান ঠিক সেভাবে এখানেও করার চেষ্টা করুন। তবে সাবধান! নিজের হাত দুটোকে ডুবিয়ে একসাথে করবেন না যেন। তাহলে ওগুলো আবার চোরাবালিতে আটকে যেতে পারে! এভাবে সাঁতরে আপনি যখন একটু শক্ত মাটির নাগাল পাবেন, নিজেকে টেনে বের করে নিয়ে আসুন।
হলিউডের একটি মুভিতে নায়কের চোরাবালিতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য; Source:slate.com
তাহলে কি চোরাবালিকে একদম ভয় পাবেন না?
চোরাবালি যে একদম অহিংস- এমন বলা যাবে না। আবার অত্যন্ত বিপদজনক- এ কথাও বলা যাবে না। নিজে নোংরা হওয়া, জুতা কিংবা কাঁধের ব্যাগ হারানোর থেকে তেমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা এতে তেমন নেই। কিন্তু ব্যাপারটা মারাত্মক হতে পারে এতে আটকা পড়ার জায়গার পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। চোরাবালিতে আটকা পড়ার পর মৃত্যুর খবরও শোনা যায়নি, এমন বলা যাবে না। সমুদ্রের তীরে চোরাবালিতে আটকা পড়ে পরবর্তীতে সমুদ্রে ঢেউয়ের কারণে মারা যাওয়ার ঘটনাও শোনা গেছে। আবার জনমানবহীন জায়গায় চোরাবালিতে আটকা পড়ে যদি নিজেকে উপরে তুলে আনতে কেউ ব্যর্থ হন, তাহলে সেটাকেও যথেষ্ট বিপদজনক বলতে হবে। তাই বলা যায়, মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করলে আপনার তেমন কোনো ক্ষতিই হবে না চোরাবালি থেকে।
এবারে আপনাদেরকে একটু চমকে দেয়া যাক! চোরাবালি যে পানি আর বালির সংমিশ্রণেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। চোরাবালি শুষ্কও হতে পারে। শুষ্ক চোরাবালি তখনই তৈরি হয়, যখন বালুকণা অত্যন্ত আলগা গঠন ধারণ করে। এর এমন পরিস্থিতি হয় যে, এটি খুব কষ্টে নিজের ভরই ধরে রাখে। তাহলে ভাবুন আপনি পড়ে গেলে কী হবে? তাসের ঘর যেভাবে পলকের মধ্যে ভেঙে যায়, ঠিক সেভাবেই টুপ করে এর ভেতরে হারিয়ে যাবেন আপনি! এখন মনে মনে আপনি হয়তো ভাবছেন, তাহলে চোরাবালিকে বিপদজনক বলবো না কেন? সৌভাগ্যবশত শুষ্ক চোরাবালির অস্তিত্ব গবেষণাগার ছাড়া প্রকৃতিতে কখনো পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা বিশেষ পদ্ধতিতে বালির মধ্য দিয়ে বায়ু প্রবাহিত করার মাধ্যমে শুষ্ক চোরাবালি তৈরি করেন। তবে বিজ্ঞানীরা শুষ্ক চোরাবালির অস্তিত্ব একেবারেই নাকচ করে দেন না। তবে কখনো যদি এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়, ভাগ্যের উপর ভরসা করা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না বৈকি!
সংক্ষেপে দেখুনকি কারণে মশাকে প্রাণীদেহের রক্ত শুষে নিতে হয় ?
বাংলায় একটি সুন্দর প্রবাদ রয়েছে, ‘মশা মারতে কামান দাগানো’। আপনি মশা মারতে কামানের ব্যবস্থা করুন আর না-ই করুন, মশারা কিন্তু কামড়ানো ছাড়বে না। প্রাণীর ত্বকে কামড়ানোটাই তাদের জৈবিক চাহিদা, বংশবৃদ্ধির মূলমন্ত্র। মানুষসহ কোনো প্রাণীই চায় না তার প্রজাতি সামনের দিকে না এগিয়ে বিলীন হয়ে যাক। এই বিলীন হওয়ার হবিস্তারিত পড়ুন
বাংলায় একটি সুন্দর প্রবাদ রয়েছে, ‘মশা মারতে কামান দাগানো’। আপনি মশা মারতে কামানের ব্যবস্থা করুন আর না-ই করুন, মশারা কিন্তু কামড়ানো ছাড়বে না। প্রাণীর ত্বকে কামড়ানোটাই তাদের জৈবিক চাহিদা, বংশবৃদ্ধির মূলমন্ত্র। মানুষসহ কোনো প্রাণীই চায় না তার প্রজাতি সামনের দিকে না এগিয়ে বিলীন হয়ে যাক। এই বিলীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতেই প্রতিটি প্রাণীর জীবনচক্রে রয়েছে নিজস্ব ধরন কিংবা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে নতুন উত্তরাধিকারের সূচনা করে থাকে প্রাণিরা।

আমাদের পরিবেশে থাকা ক্ষতিকারক তিনটি প্রধান মশা; Image Source: weatherstem.com
মশার ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য, তাদের বংশবৃদ্ধির জন্যও রয়েছে ভিন্ন এক ব্যবস্থা। আর সেই ব্যবস্থাকে পূর্ণতা দিতে মশাদের প্রয়োজন হয় প্রাণীদেহের তাজা রক্তের। স্ত্রী মশা কিংবা মশকীর দেহে ডিম তৈরি হয়। এই ডিমের পুষ্টি ও পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্যই রক্ত চুষে খেতে হয় মশকীকে।
এখন কথা হলো, ডিম তো থাকে মশকীর দেহে, তাহলে রক্ত প্রয়োজন হওয়া উচিত মশকীর। কিন্তু কেন আমরা বলি ‘মশার কামড়’! পুরুষ মশারা আসলে কামড়ায় না, রক্তের পরিবর্তে বিভিন্ন ফলের রস খেয়ে জীবন ধারণ করে থাকে, স্ত্রী মশা অর্থাং মশকীরাই কেবল মানুষ ও নির্বাক প্রাণীদের কামড়ে থাকে রক্তের আশায়।
যদিও আমরা মশার এই রক্ত খাওয়াকে কামড়ানো বলি, কিন্তু রক্ত শুষে নেবার পুরো প্রক্রিয়াকে ইঞ্জেকশন দিয়ে রক্ত সংগ্রহের সাথে তুলনা করা যায়। মশার শোষক ছয়টি সূঁচের তৈরি একটি সিরিঞ্জের মতো অংশ। এর মাধ্যমেই ত্বকের নিচে থাকা রক্তনালী থেকে রক্ত শুষে নেয় মশারা।

এই হলো মশার সূঁচ; Image Source: gigazine.net
ইঞ্জেকশন যদি দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনারা ‘হেক্সিসল’ এর সাথে বেশ পরিচিত। অক্ষত ত্বকে জীবাণু ধ্বংস করার ক্ষমতা রয়েছে এই হেক্সিসলের। ইঞ্জেকশন দেবার পূর্বে তুলায় করে নীল রঙের একটি তরল পদার্থ দিয়ে ত্বককে মুছে নেয়া হয়। ত্বকে থাকা অসংখ্য জীবাণু ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ত্বকে যে ছিদ্র হয় তা দিয়ে দেহের ভেতর প্রবেশ করতে পারে। তাই আগেই হেক্সিসল দিয়ে ইঞ্জেকশনের স্থানটি পরিষ্কার করে নেয়া হয়।
মশারা হেক্সিসল পাবে কোথায়! তারা যে আমাদের দেহের ত্বকে ছিদ্র করে নিজেদের উদরপূর্তি করছে, ক্ষতি তো ষোলো আনা আমাদেরই। আমাদের রক্ত নিচ্ছে, উপহার হিসেবে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু রেখে যাচ্ছে, সেই সাথে আমাদের ত্বকীয় জীবাণুগুলোকে সুযোগ করে দিচ্ছে জনসমুদ্র নিয়ে রক্তে প্রবেশ করবার।
কিন্তু তৃতীয় ঘটনাটি আসলে ঘটে না। এটি বাঁধা দিতে মশারাই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মশারা অত্যন্ত দায়িত্বের সঙ্গে হেক্সিসলের মতো জীবাণুনাশক দিয়ে ত্বককে পরিষ্কার করে নেয় কামড়ানোর পূর্বে। ত্বকের যেখানে বসে, সেখানে তাদের একপ্রকার থুতুর মাধ্যমে জীবাণুনাশের কাজটি সম্পন্ন করে। সেই সাথে, আমরা যাতে বুঝতে না পারি যে কামড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে একটি মশা, সে ত্বকের সংবেদী স্নায়ুকে অবশ করে নেয় এই থুতুর মাধ্যমে। লক্ষ্য করে দেখবেন, মশা কামড়ানোর পরই আমরা টের পাই, কেননা ততক্ষণে ধারালো সূঁচ রক্তনালীতে ঢুকে গেছে।
এই তো গেলো কামড়ানোর পর্যায়, এবার আসা যাক রক্ত শোষণকার্যে। শোষক প্রবেশ করিয়ে মশা রক্তনালী খুঁজতে থাকে। প্রয়োজনবোধে স্থান পরিবর্তন করতে হতে পারে। রক্তনালী খুঁজে পেলেই মশার মস্তিষ্কে তথ্য চলে যায় যে, রক্তের সন্ধান পাওয়া গেছে। রক্ত খাওয়ার পূর্বে মশাকে আরো একটি প্রস্তুতিমূলক কাজ করতে হয়।
আমাদের শরীরের কোথাও কেঁটে গেলে ২-৬ মিনিটের ভেতর কিন্তু সেই অংশের রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়। রক্তের মাঝে হেপারিন নামক একটি পদার্থের উপস্থিতির দরুন রক্ত তরল অবস্থায় শরীরে সঞ্চালিত হয়, জমাট বাঁধে না শরীরের ভেতর। যখন কেঁটে যাওয়া ত্বকের নিচে উপস্থিত হেপারিন বাতাসের সংস্পর্শে এসে ভেঙে যায়, অণুচক্রিকা নামক কিছু ক্ষুদ্র রক্তকণিকা এসে সেখানের রক্তকে জমাট বাঁধিয়ে ফেলে। ফলে রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়। হেপারিন জাতীয় পদার্থগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট, যা রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না। রক্তনালী খুঁজে পেলে মশারাও এমন অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট প্রয়োগ করে রক্তের মাঝে। ফলে শান্তি মতো মশা তখন রক্ত শোষণ করে নিতে পারে। রক্ত খেতে পেটকে তিনগুণ ফুলিয়ে নিতে পারবে একটি মশা।
মশার রক্তশোষণের কারণ জানা হলো, এবার জানা যাক মশাদের জীবনে এরপর কী কী ঘটে সেই সম্পর্কে।
প্রায় সকল পোকামাকড়ের মতো পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠতে একটি মশাকে চারটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়।

ডিম ফুঁটে লার্ভা বেরিয়ে পূর্ণাঙ্গ মশাতে পরিণত হওয়ার চক্র; Image Source: nsmad.com
১) নিষিক্ত ডিম
একটি মশকী তার পুরো জীবদ্দশায় প্রায় ৫০০টির মতো ডিম পাড়তে পারে। প্রতিবারে ৫০-১০০টি করে করে ৫০০টির মতো ডিম পাড়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর। তারপর ধীরে ধীরে স্ত্রী মশারাও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ডিম ফেটে পানির ভেতরেই অবমুক্ত হয় লার্ভাগুলো। ডিম ভেঙে বেরিয়ে আসার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। এটি নির্ভর করে পানির তাপমাত্রা এবং পানিতে উপস্থিত পুষ্টি উপাদানের উপর। এছাড়াও প্রজাতিভেদে এই সময়টুকু বিভিন্ন হয়ে থাকে।
২) লার্ভা
লার্ভা পানিতে ঘুরে বেড়ায় এবং বারবার পানির উপর পৃষ্ঠে আসে শ্বসনের জন্য। একটি লার্ভা এই ধাপে মোট চারবার ত্বক পরিবর্তন করে, প্রতিবারই অল্প অল্প করে বেড়ে ওঠে। ত্বক পরিবর্তনের এই ঘটনাকে বলা হয় মোল্টিং। পানিতে থাকা ক্ষুদ্র অণুজীব ভক্ষণের মাধ্যমে পুষ্টি আহরণ করে থাকে লার্ভা। চতুর্থবার মোল্টিং এর মধ্য দিয়েই একটি লার্ভা হয়ে ওঠে পিউপা।

মশার ‘লার্ভা’ দশাটি; Image Source: wikimedia.org
৩) পিউপা
এই লার্ভাগুলো উপযুক্ত পুষ্টি পেয়ে একসময় পিউপা ধাপ শুরু করে। অতঃপর পরবর্তী ২-৭ দিনের মাঝে ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে উঠে পূর্ণাঙ্গ মশাতে, যার বাঁচার জন্য পানির প্রয়োজন নেই। সে এখন উড়তে সক্ষম।
৪) পূর্ণ মশা
পিউপা ধাপ পেরিয়ে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই পানি ছেড়ে উড়াল দেয় না, কিছুটা সময় পানির পৃষ্ঠে অবস্থান করে। এই সময়ের মাঝে নিজের দেহকে বাতাসে শুকিয়ে নেয়, অপেক্ষা করে পাখা আর পা কিছুটা দৃঢ় হয়ে ওঠার জন্য। পাখাগুলো ভালোমতো শুকালে একটি মশা উড়তে শুরু করে। প্রজনন ও রক্ত শোষণের জন্য আরো কয়দিন অপেক্ষা করে।
একটি পূর্ণাঙ্গ মশাতে দুটি পুঞ্জাক্ষীসমৃদ্ধ একটি মাথা থাকে, বুক, পেট, একজোড়া পাখা আর ছয় জোড়া পা থাকে। মশাদের একটি অ্যান্টেনা ও শুঁড়ও থাকে।
পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হবার পর তাদের মাথায় দুটো নির্দেশই ঘুরতে থাকে- বংশবৃদ্ধি আর পুষ্টি আহরণ।
মশার জীবনচক্রের প্রথম তিনটি ধাপের জন্য পানির উপস্থিতি প্রয়োজন। অর্থাৎ একদম শুরুতে ডিম ভেঙে লার্ভা বেরিয়ে আসতে হলে মা মশাকে পানিতে ডিম পাড়তে হবে। মশকীরা সাধারণত স্থির জমে থাকা পানি কিংবা পানির নিকটবর্তী কোনো স্থানে ডিম পেড়ে থাকে। শুকনো স্থানে কয়েক মাস পর্যন্ত ডিমগুলো অক্ষত থাকতে পারে। এ কারণেই বলা হয়, বাসস্থানের আশেপাশে যদি কোনো স্থির পানির উৎস থাকে, তবে তা সরিয়ে ফেলতে।
সাধারণত ডিম পাড়া থেকে শুরু করে দুই সপ্তাহের মাঝেই একটি মশা উড়তে ও বংশবৃদ্ধিতে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। সবকিছুই নির্ভর করে পরিবেশের অনুকূলতা আর পুষ্টির উপস্থিতির উপর।
পুরুষ মশারা পানি থেকে উঠে এসে একদিনের মতো অপেক্ষা করে। এই সময়েই তাদের জননাঙ্গ কর্মক্ষম হয়ে উঠে। তারপর স্ত্রী মশাদের পাখার শব্দ শুনে খুঁজে বের করে তাদের। মশকীদের সাথে যৌন জননে মিলিত হয়। ডিমকে নিষিক্ত করতে শুক্রাণু স্থানান্তর করে দেয় স্ত্রী দেহে। প্রজননের শেষে পুরুষ মশাগুলো বড়জোড় ৩-৫ দিনের মতো বেঁচে থাকে। কেননা বাকি সব কাজ স্ত্রী মশারাই করে নিতে পারে, স্ত্রী মশারা প্রায় একমাসের মতো বেঁচে থেকে।

শোষকের আবরণ সরিয়ে কেবলমাত্র শোষকটিকেই ত্বকে প্রবেশ করিয়ে রক্ত শুষে নিচ্ছে; Courtesy: James Gathany
প্রজনন শেষে, এবার নিষিক্ত ডিমের পূর্ণতা ও পুষ্টির জন্য প্রয়োজন রক্ত, উত্তপ্ত রক্ত। উত্তপ্ত রক্তের সন্ধানে স্ত্রী মশারা সূর্যাস্তের পরপরই ধেয়ে আসতে শুরু করে জীবন্ত প্রাণীদের দিকে। প্রায় ১০০ ফুট দূরত্ব থেকে মশারা টের পায়, ঠিক কোথায় উত্তপ্ত রক্তের সন্ধান পাওয়া যাবে। নিঃশ্বাসের সাথে যে আমরা কার্বন ডাইঅক্সাইড ত্যাগ করি, এই কার্বন ডাইঅক্সাইড ও ত্বকের ঘর্মগ্রন্থি থেকে নিঃসৃত ল্যাকটিক এসিডের কারণেই মশারা বুঝতে পারে প্রাণীদের অবস্থান।
লেখার দ্বারপ্রান্তে একটি মজার জিনিস সম্পর্কে জানানো যাক আপনাদের। রক্ত শোষণের সাথে সাথে মশারা আপনার গায়ের উপর বর্জ্য নিষ্কাশন অর্থাৎ প্রস্রাব করে দিয়ে যায়। এর কারণ হলো, শরীরে আরো বেশি পরিমাণ রক্ত রাখার জন্য জায়গা খালি করে মশারা। আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত না তাড়িয়ে দেবেন, মশা কিন্তু রক্ত খেতেই থাকবে, পেট ভরে রক্ত খেয়ে ঢোল হয়ে পড়ে থাকলেও তাদের সেটি নিয়ে মাথাব্যথা নেই। রক্ত খাওয়া সীমাহীন হারে চলবে, যতক্ষণ না নড়ন চড়নে অক্ষম হয়ে পড়বে। এত রক্ত খেতে গিয়েই প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীরের অপ্রয়োজনীয় পানি বের করে দেয় মশারা।

সংক্ষেপে দেখুনফোঁটা ফোঁটা করে শরীরের বর্জ্য সমৃদ্ধ পানি বের করে দেবার দৃশ্য; Image Source: stackexchange.com
কামান দাগান কিংবা না দাগান, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মশার কামড় থেকে নিজেকে বাঁচান। রক্ত শোষণ করে নেয়া তেমন কোনো ক্ষতি নয়। তবে সেই সাথে বিভিন্ন জীবাণুকে দেহে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে যাওয়াটা খুব খারাপ। এতে জীবনহানি পর্যন্ত হতে পারে। তাই মশার কামড় থেকে বাঁচুন। আমাদের জন্য সুখবর হলো, মশাগুলো খুব বেশি দিন বাঁচে না, নাহয় আরো অত্যাচার করে যেত মরতে মরতে!
অতিরিক্ত ঘাম থেকে মৃত্যু ঘটানো রহস্যময় মহামারি কি নামে খ্যাত?
বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ করে মানুষ দুজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। অথচ তারা দুজন কয়েক মুহূর্ত আগেও রাস্তায় দাঁড়িয়ে খোশগল্পে মত্ত ছিল। আমরা দুজনকে একসাথে মরতে দেখলাম। এরপর শুনলাম পাড়ার দর্জির স্ত্রীও নাকি হুট করে মরে গেছে। রাস্তায় হেঁটে যাওয়া আরেক তরুণের মৃত্যুর খবরও শোনা গেল।” ১৪৮৫ সালের এক বিভীষিকাময় দিনবিস্তারিত পড়ুন
১৪৮৫ সালের এক বিভীষিকাময় দিনে লন্ডনের বুকে হানা দেয় এক অদ্ভুত এবং রহস্যময় রোগ। এই রোগের নেই কোনো ভয়ঙ্কর লক্ষণ। মধ্যযুগের অন্যান্য ভয়াবহ কলেরা, প্লেগ, ম্যালেরিয়া, পীতজ্বর, কালাজ্বর, স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির মতো অসহনীয় ক্ষত বা জখম সৃষ্টি হতো না এই রোগে। দেখতে সুস্থ-সবল হাসিখুশি মানুষ এই রোগের কবলে পড়লে ঘণ্টা খানেকের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। আর মৃত্যুর পূর্বে মানুষের দেহ থেকে নির্গত হতে থাকত ঘাম।
শুধু ঘাম থেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকায় এই রহস্যজনক মহামারির নামকরণ করা হয় ‘ইংরেজ স্বেদন রোগ’ (English Sweating Sickness) হিসেবে। পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের বাইরে এই রোগ হানা দিলে এর নাম সর্বসাধারণের নিকট শুধু ‘স্বেদন বালাই’ (Sweating Sickness) হিসেবে পরিচিত হয়। এই রোগের আগমন ঘটত কোনো আগাম অশনি বার্তা ছাড়াই। দ্রুততার সাথে বিশাল জনগোষ্ঠীর একাংশের মৃত্যু ঘটিয়ে ফের হাওয়া হয়ে যেত এই রোগ।
সোয়েটিং সিকনেস কী?
ড্যান্স অফ ডেথ চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে মহামারির ভয়াবহতা; Image Source: Wikimedia Commons
মধ্যযুগের পৃথিবীতে কয়েক বছর পর পর একটি মহামারি আঘাত হানত। গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহরে মৃত্যুর ঢল বসিয়ে দিত সেসব মহামারি। তখনকার মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এবং সঠিক ঔষধ না থাকায় মৃত্যুর হার ছিল বেশি। যুগের পর যুগ ধরে ত্রাস সৃষ্টিকারী এসব রোগ জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে ধীরে ধীরে মানুষের নিকট তার রহস্য খোলাসা করেছে। রোগের কারণ, প্রতিকার সবকিছু নির্ণয়ের মাধ্যমে মানুষ এসব মহামারিকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এই তালিকা থেকে বাদ যাবে একটি মহামারির নাম, তা হচ্ছে Sweating Sickness বা স্বেদন বালাই। নিতান্ত অদ্ভুত এই মহামারি তার রহস্য নিয়েই পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিয়েছে।
ঘর্মাক্ত, তৃষ্ণার্ত রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে; Image Source: MavCure
পঞ্চদশ এবং ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপের বুকে আগমন ঘটে এই স্বেদন রোগের। বিভিন্ন ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি ঘেঁটে এই রোগের সম্ভাব্য লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। রোগের শুরুতে জ্বর এবং কাঁপুনি হতো রোগীর দেহে। অনেকের দেহে জ্বরের সাথে মাথা, ঘাড়, গলা ও পায়ের পেশিতে ব্যথা এবং দুর্বলতা অনুভূত হতো। জ্বর এবং ব্যথার এই পর্ব ত্রিশ মিনিট থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতো। এই পর্বকে ‘শীতল পর্ব’ বলা হয়। এরপর শুরু হতো ‘উষ্ণ পর্ব’। এই উষ্ণ পর্বের উপসর্গের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঘন ঘন ঘাম নির্গত হওয়া, তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠা ও বুক ধড়ফড় করা।
এই পর্বের পর আসতো চূড়ান্ত পর্ব। এই পর্বে রোগী ক্লান্ত হয়ে জ্ঞান হারাত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী জ্ঞান হারানো অবস্থায় মৃত্যুবরণ করত। তবে রোগী যদি প্রথম ২৪ ঘণ্টার ধকল সহ্য করে বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়, শুধু সেক্ষেত্রে তার আরোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিত। এই রোগের সবচেয়ে ভীতিকর ব্যাপার ছিল, অত্যন্ত দ্রুততার সাথে রোগটি আক্রান্তদের মৃত্যু ঘটিয়ে দিত এবং আশেপাশের লোকজনের দেহে ছড়িয়ে পড়ত।
স্বেদন বালাই এর পাঁচ মহামারি
পৃথিবীর বুকে স্বেদন রোগ মহামারি হিসেবে আঘাত হেনেছে মোটে ৫ বার। ১৪৮৫ সালে সর্বপ্রথম ইংল্যান্ডের বুকে এই রোগের দেখা মিলে। সর্বশেষ মহামারীর সময়কাল ছিল ১৫৫১ সাল। এর দু’শ বছর পর ‘পিকার্ডি সোয়েট’ নামে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি রোগ ফ্রান্সে মহামারি ঘটিয়েছিল, কিন্তু এই দুই রোগের মধ্যে শক্ত যোগসূত্রতা এখনও প্রমাণিত হয়নি।
প্রথম মহামারির সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মসনদে ছিলেন সপ্তম হেনরি। সেবার মাত্র এক মাসে প্রায় ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। এরপর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় মহামারির দেখা মেলে ১৫০৭ সালের শুরু এবং শেষের দিকে। দ্বিতীয় ধাক্কা কিছুটা সামলে উঠতে পারলেও তৃতীয় মহামারির সময় বেশ কিছু অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। মানুষ এই রহস্যময় রোগের প্রতি এক চাপা ভয় নিয়ে দিন-রাত গুজরান করত। ভয়ের মাত্রা এতটাই ছিল যে, ১৫২৮ সালের মহামারির সময় স্বয়ং সপ্তম হেনরি লন্ডন থেকে পালিয়ে যান। ঐতিহাসিকদের তথ্যমতে, তিনি প্রতিনিয়ত নিজের বাসস্থান বদলাতে থাকেন, যেন এই বালাই তাকে স্পর্শ করতে না পারে।

রাজা সপ্তম হেনরি; Image Source: Royal UK
ইংল্যান্ডের বাইরে প্রথম মহামারির শিকার হয় জার্মানির শহর হামবুর্গ। কয়েক সপ্তাহে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর পর এই রোগ যেন ইউরোপ সফরে বের হয়। একে একে আক্রান্ত হতে থাকে সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে, লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ড, রাশিয়ার জনগণ। প্রায় কয়েক হাজার মানুষের রহস্যজনক মৃত্যুর সাক্ষী এই মহামারি সর্বশেষ ১৫৫১ সালে হানা দেয়।
ধনাঢ্যদের যম
ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড হলের ডায়েরি থেকে এই মহামারির সাথে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের আক্রান্ত হওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। অবশ্য হল একাই নন, দেখা গেল সমসাময়িক পাণ্ডুলিপিগুলো একই কথা বলছে। রাজা সপ্তম হেনরি স্ত্রী অ্যান বলেইন নিজে এই রোগের খপ্পরে পড়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্য সহায় হওয়ায় তিনি আরোগ্য লাভ করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি যুবরাজ আর্থার টিউডরের। তার রহস্যজনক মৃত্যুর সাথে অনেকেই স্বেদন বালাইকে দায়ী করে থাকে। যদিও এই দাবির পেছনে শক্ত প্রমাণাদি নেই। ইউরোপের ধনীরা এই রোগের ভয়ে দেশ থেকে পালাতে শুরু করে।

সম্ভ্রান্ত প্রাসাদে হানা দিয়েছিল মহামারি; Image Source: IMDB
এই রোগের আরেকটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসের কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতো না। এমনকি সেসব দেশে বসবাস করা ইংরেজরা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মরতে থাকে। যারা এই রোগে মারা পড়েছিল তাদের সবাই মাঝবয়েসী তরুণ বা তরুণী ছিল। দেখা গেল, অশীতিপর (আশিরও অধিক বয়স্ক) বুড়ো-বুড়ি আর কোলের শিশুরা এই রোগ থেকে মুক্ত ছিল।
এই রোগের কারণ কী?
প্রতিটি মহামারির পেছনে থাকে কোনো ভয়ঙ্কর জীবাণু বা ক্ষতিকারক পদার্থের হাত। স্বেদন রোগও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই রোগের ময়নাতদন্ত করার জন্য যথেষ্ট সুযোগ এবং সময় পায়নি তৎকালীন বিজ্ঞানীগণ।
তখনকার সীমিত জ্ঞান এবং প্রযুক্তি এই রোগের কারণ ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল। তবে সর্বশেষ মহামারির শত বছর পর এই রোগ নিয়ে গঠনমূলক গবেষণা শুরু হয়, যার পুরোটাই মহামারি চলাকালীন চিকিৎসক এবং ইতিহাসবিদদের পাণ্ডুলিপি নির্ভর ছিল। ১৮৮১ সালে আর্থার বর্ডিয়ার নামক এক চিকিৎসক নৃবিজ্ঞান বিষয়ক এক জার্নালে বেশ চাঞ্চল্যকর এক তথ্য পরিবেশন করেন। সেখানে তিনি বর্ণনা করেন, এই রোগ কেবলমাত্র অ্যাংলো-স্যাক্সন বংশোদ্ভূতদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু পৃথিবীর বহু চাঞ্চল্যকর তথ্যের মতো এই তথ্যও যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত এবং প্রমাণহীনতার কারণে ধোপে টেকেনি।



সংক্ষেপে দেখুনহান্টা ভাইরাস এবং এর বাহক ইঁদুর; Image Source: MGN
এই রোগের কারণ হিসেবে আধুনিক বিজ্ঞানীদের প্রথম সন্দেহ পড়েছে হান্টা ভাইরাসের ওপর। এই ভাইরাসটি ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর দেহে কোনো রোগবালাই না ঘটিয়ে অবস্থান করতে পারে। তখন সেই প্রাণীটি ভাইরাসের সক্রিয় বাহক হিসেবে কাজ করে। হান্টা ভাইরাসের প্রভাবে আক্রান্তের দেহে জ্বর, সর্দি, পেশী ব্যথা, ক্লান্তি ইত্যাদি ফ্লু জাতীয় উপসর্গ দেখা দেয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, হান্টা ভাইরাসের অজানা কোনো প্রকার থেকে হয়তো এই রোগের উৎপত্তি। হান্টা ভাইরাস ছাড়াও মশা মাছি দ্বারা ছড়ানো আরবো ভাইরাস আছে বিজ্ঞানীদের সন্দেহের তালিকায়। এর কারণ, বেশ কিছু অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমের পর পর দেখা দিত এই মহামারি। বিশেষ করে ভারি বর্ষণ এবং বন্যা আক্রান্ত অঞ্চলে। এধরনের অঞ্চলে মশা মাছির উপদ্রব বেশি থাকে। হয়তো আরবো ভাইরাস দায়ী বলেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শীতল এবং উঁচু অঞ্চল স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এই মহামারি মুক্ত ছিল।
২০০১ এর অ্যানথ্রাক্স আক্রমণের পর প্রেরিত চিঠি; Photograph: FBI
ভাইরাসের বাইরে অ্যানথ্রাক্স রোগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া Bacillus anthracis-কেও অনেকে দায়ী করেছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালে জৈব অস্ত্র হিসেবে অ্যানথ্রাক্স জীবাণুর ব্যবহারের ফলে প্রায় ২২টি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আক্রান্তের দেহে প্রচুর পরিমাণ ঘাম নির্গত হয়েছে এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গে ব্যথার সূত্রপাত ঘটেছে। এডওয়ার্ড ম্যাক সুইগান নামক এক অণুজীববিজ্ঞানীর মতে, ইংরেজ মুলুকে মহামারির পেছনে ওলের মাধ্যমে ছড়ানো অ্যানথ্রাক্স জীবাণুর স্পোর দায়ী থাকতে পারে।
মহামারি মানেই হাজার মানুষের মৃত্যু আর্তনাদ; Image Source: De Agostini
Sweating sickness বা স্বেদন বালাইয়ের আসল কারণ বের করতে বিজ্ঞানীদের আরো তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজন। হয়তো ভবিষ্যতে আমরা এর আসল কারণ জানতে পারবো। প্রশ্ন উঠতে পারে, যে রোগ প্রায় ৫০০ বছর আগে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে, সেই রোগের কারণ জানার যৌক্তিকতা কী? এর উত্তর হচ্ছে, যদি ভবিষ্যতে এই রোগ আমাদের পুনরায় আক্রমণ করে, সেক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি যেন অসম্পূর্ণ না থাকে। মধ্যযুগীয় পাণ্ডুলিপির তথ্যগুলো যদি সত্য হয়, সেক্ষেত্রে বলতে হচ্ছে, এমন ভয়ঙ্কর মহামারি মোকাবেলায় পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই। তাহলে হয়তো আমরা নতুন কোনো মহামারির হাত থেকে পৃথিবীর হাজার হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারব।
বৃষ্টিতে ভেজা মাটির মনমাতানো গন্ধের উৎস কোথায়?
“তখনও এই রকম কালবৈশাখী নামবে, এই রকম মেঘান্ধকার আকাশ নিয়ে, ভিজে মাটির গন্ধ নিয়ে, ঝড় নিয়ে, বৃষ্টির শীকরসিক্ত ঠাণ্ডা জোলো হাওয়া নিয়ে, তীক্ষ্ম বিদ্যুৎ চমক নিয়ে-তিন হাজার বছর পরের বৈশাখ-অপরাহ্নের উপর । তখন কি কেউ ভাববে তিন হাজার বৎসর পূর্বের প্রাচীন যুগের এক বিস্মৃতি কালবৈশাখীর সন্ধ্যায় এক বিস্মবিস্তারিত পড়ুন
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “অপ্রকাশিত দিনলিপি” থেকে নেওয়া কথাগুলো পড়তে পড়তে গ্রামের সদ্য বৃষ্টিতে ভেজা মাটির অন্যরকম গন্ধটা বুক ভরে নিতে ইচ্ছে করছে না? হ্যাঁ! প্রকৃতপক্ষে আমরা প্রায় সবাই বৃষ্টির এই দারুণ গন্ধকে ভীষণ পছন্দ করি। কিন্তু কখনও ভেবেছেন কি, এই ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধের উৎস কোথায় আর কীভাবেই বা এই গন্ধের সৃষ্টি হয়? চলুন আজ সেই কথাই জেনে নেই।
বৃষ্টিতে ভেজা মাটির গন্ধের খুব সুন্দর একটি ইংরেজি শব্দ রয়েছে। ইংরেজিতে এই গন্ধটিকে ডাকা হয় পেট্রিকোর (Petrichor) নামে। বৃষ্টির ফোঁটা যখন শুকনো মাটিতে পড়ে, তখন এই পেট্রিকোরের সৃষ্টি হয়। পেট্রিকোর কথাটি এসেছে গ্রিক শব্দ থেকে, যার আভিধানিক অর্থ পাথরের শোণিতধারা (The blood of stones)।
অস্ট্রেলিয়ান কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (CSIRO) এর দুই বিজ্ঞানী ইসাবেল জয় বিয়ার এবং রিচার্ড থমাস এই শব্দটি প্রথম প্রস্তাব করেন। ১৯৬৪ সালে নেচারে প্রকাশিত তাদের গবেষণা প্রবন্ধে তারা এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। সাধারণত বৃষ্টির আগে শুকনো মাটি বিভিন্ন উদ্ভিদ থেকে একধরনের তেল পরিশোষণ করে থাকে। এই দুই গবেষক সেই পরিশোষিত তেলকে আবার সংশ্লেষ করতে সক্ষম হন। তারা দেখান, যখন বৃষ্টি হয়, তখন এই পরিশোষিত তেল জিওস্মিন নামে আরেক ধরনের যৌগের সাথে মিশ্রিত হয়ে বায়ুতে ব্যাপিত হয়। মূলত এই দুই যৌগের বায়ুতে ব্যাপনের ফলেই বৃষ্টিতে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধের সৃষ্টি হয়।




বাঁয়ে বিজ্ঞানী রিচার্ড থমাস, ডানে বিজ্ঞানী ইসাবেল জয় বিয়ার;
শুকনো মাটি উদ্ভিদ থেকে যে তেল পরিশোষণ করে থাকে, সেই তেলে মূলত মিশে থাকে পামিটিক এসিড, স্টিয়ারিক এসিড এবং আরও নানা প্রকার রাসায়নিক পদার্থ, যার সবগুলোকে বিজ্ঞানীরা এখনো নির্দিষ্ট করতে পারেননি। তবে মাটিতে মিশে থাকা পামিটিক এসিড ও স্টিয়ারিক এসিডের এই বৃহৎ অণু বৃষ্টির সময় বিশ্লিষ্ট হয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র অণু, যেমন- কিটোন, অ্যালডিহাইড প্রভৃতি উৎপন্ন হয়।
পামিটিক এসিড ও স্টিয়ারিক এসিডের বৃহৎ অণু;
অন্যদিকে জিওস্মিন পদার্থটি মাটিতে বাস করতে থাকা এক্টিনোব্যাক্টেরিয়া পর্বভুক্ত অণুজীবদের দ্বারা সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ধরনের সায়ানোব্যাক্টেরিয়া এবং স্ট্রেপ্টোমাইসিস গণের ব্যাকটেরিয়ার মৃত কোষ থেকে মূলত জিওস্মিন সৃষ্টি হয়। ২০০৬ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথম স্ট্রেপটোমাইসিস কোয়েলিকালার (Streptomyces coelicolor) ব্যাকটেরিয়ায় থাকা উৎসেচক থেকে জিওস্মিনের জৈব সংশ্লেষের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারেন।
Actinobacteri
ফার্নেসাইল ডাইফসফেট থেকে দুই ধাপে সম্পন্ন হওয়া একটি বিক্রিয়ার মাধ্যমে জিওস্মিন সিন্থেজ নামর একটি উৎসেচকের প্রভাবে জিওস্মিন উৎপাদিত হয়।
জিওস্মিন উৎপাদী বিক্রিয়া
ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধের পেছনের জীববৈজ্ঞানিক কারণ তো জানা গেল। কিন্তু এরপর বিজ্ঞানীরা চিন্তা করতে লাগলেন, এই গন্ধ আমাদের নাকে এসে পৌঁছায় কী করে। অর্থাৎ এর পেছনে থাকা পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ঠিক কীরূপ?
তাই এই গন্ধের উৎস এবং প্রক্রিয়া সম্বন্ধে আরও জানতে ২০১৫ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির একদল গবেষক ১৮ ধরনের মাটির সংস্পর্শে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে দিয়ে প্রায় ৬০০টি পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। এই ভিডিওটিতে পরীক্ষাটির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
খালি চোখে না দেখা গেলেও আমরা সকলেই জানি, যেকোনো মাটির সমতল থাকে অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত। বৃষ্টির ফোঁটা যখন এই মাটির তলে এসে পড়ে, তখন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্রে আটকে থাকা বাতাস থেকে বুদবুদের সৃষ্টি হয়। এই বুদবুদ যখন মাটির সমতল থেকে বায়ুর সংস্পর্শে এসে ফেটে যায়, তখন এই বুদবুদে আটকে থাকা বিভিন্ন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রাসায়নিক অণু বাতাসে মিশে এই সোঁদা গন্ধের জন্ম দেয়।

বিজ্ঞানীদের উচ্চ শক্তিসম্পন্ন ক্যামেরায় ধরা পড়া ছিদ্রযুক্ত তল থেকে উৎপন্ন হওয়া বুদবুদের বাতাসে মেশার দৃশ্য ( বাতাসের সংস্পর্শে মিশে যেতে থাকা দুটি বুদবুদকে লাল বৃত্ত দ্বারা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে)
শুধু জিওস্মিন কিংবা উদ্ভিজ তেলকণা নয়, মাটিতে থাকা অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস কিংবা অন্যান্য রাসায়নিক অণুও এই বুদবুদে মিশে থাকতে পারে। যত ধীরে বৃষ্টিকণা মাটিতে পড়ে, তত বেশি বুদবুদ বাতাসে মিশে যাওয়ার সুযোগ পায়। আর তাই খুব হালকা এক পশলা বৃষ্টির পরে ভেজা মাটির গন্ধ অপেক্ষাকৃত তীব্রতর বলে মনে হয়।
আমাদের নাসারন্ধ্রে থাকা ঘ্রাণ সংবেদকগুলো জিওস্মিনের গন্ধের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। তাই বাতাসে এর পরিমাণ প্রতি ট্রিলিয়নে ৫ ভাগ, অর্থাৎ প্রতি কেজি বাতাসে মাত্র ৫ ন্যানোগ্রাম (৫ × ১০-৯ গ্রাম) থাকলেই মানুষের নাক তা শনাক্ত করতে পারে। এই সোঁদা গন্ধকে কাজে লাগিয়ে নানা সুগন্ধি তৈরি করার সম্ভাবনা নিয়েও তাই মানুষ অনেক সময় চিন্তা করেছে। স্বাধীনতার বেশ কিছু আগে ভারতীয় উপমহাদেশের নানা স্থানে দেশীয় সুগন্ধি দ্রব্য তৈরির শিল্প গড়ে উঠেছিল। শ্রমিকেরা গরমকালে মাটি শুকিয়ে তারপর বর্ষার আগে বাষ্প-পাতন করে সেই বাষ্প চন্দনের তেলে মিশিয়ে নিত। তারপর সেই তেল বিক্রি করতো বাজারে। উত্তর প্রদেশে এর জনপ্রিয় নাম ছিল মিট্টি আতর। এই মিট্টি আতর এখনও বেশ জনপ্রিয় এবং বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত বিক্রি হয়।

মিট্টি আতর; Source: kazima perfume
শুধু মাটির সোঁদা গন্ধ নয়, জলের স্যাঁতস্যাঁতে ভাব কিংবা মাটির নিচে হওয়া সবজিগুলোর মেটে স্বাদও এই জিওস্মিনের জন্যই হয়ে থাকে। জিওস্মিনের এমন নানা ধরনের উপকারী দিকের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। যেমন- মাটির বিভিন্ন স্তরের ব্যাকটেরিয়ার মৃত কোষ থেকে যেহেতু এই গন্ধের সৃষ্টি হয়, সেহেতু অনেক সময় কোনো স্থানে নলকূপ খননের পর সেই স্থানের পানীয় জলে এই ঘ্রাণ মিশে থাকে। এতে ঐ স্থানের পানি সুপেয় হয় না। অবশ্য বিজ্ঞানীরা এই ঘ্রাণকে কীভাবে দূর করা যায় সেই বিষয়েও বিস্তারিত গবেষণা করছেন।
সোঁদা মাটির গন্ধের পেছনের বিজ্ঞান সম্বন্ধে জানলেন তো? এরপর থেকে যখন বৃষ্টি দেখে রোমান্টিকতায় আক্রান্ত হবেন আর ভেজা গন্ধে নস্টালজিয়া অনুভব করবেন, অবশ্যই সেই কাব্যময়তার মধ্যেও বিজ্ঞানের সৌন্দর্যের কথা স্মরণে রাখতে একদম ভুলবেন না যেন!
বিস্ময়কর মহাকাশীয় ঘড়ি অরলোজ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ক্লক কোথায় অবস্থিত?
১৫শ শতকের দিকে বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রে প্রাগ শহরে এক বিশালাকার অদ্ভুত ঘড়ি নির্মিত হলো। মহাকাশীয় ঘড়ি হিসেবে পরিচিত সেই ঘড়ি দেখতে যত না রহস্যময়, কারুকার্যে তার চেয়েও বেশি মনোমুগ্ধকর। লোকমুখে জানা গেলো এই ঘড়ি তৈরি করেছেন বিখ্যাত নির্মাতা হানোস। প্রাগের নগর কাউন্সিলরদের অনুরোধে তিনি এমন একটি ঘড়ি নির্মাবিস্তারিত পড়ুন
১৫শ শতকের দিকে বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রে প্রাগ শহরে এক বিশালাকার অদ্ভুত ঘড়ি নির্মিত হলো। মহাকাশীয় ঘড়ি হিসেবে পরিচিত সেই ঘড়ি দেখতে যত না রহস্যময়, কারুকার্যে তার চেয়েও বেশি মনোমুগ্ধকর। লোকমুখে জানা গেলো এই ঘড়ি তৈরি করেছেন বিখ্যাত নির্মাতা হানোস। প্রাগের নগর কাউন্সিলরদের অনুরোধে তিনি এমন একটি ঘড়ি নির্মাণ করেছেন যার সাহায্যে সময় নির্ণয় করা ছাড়াও চন্দ্র, সূর্য, গ্রহের অবস্থান জানা যাবে। রাতদিন পরিশ্রম করে হানোস প্রাগের নগরপ্রাঙ্গনে এই অতিকায় ঘড়ি নির্মাণ করেছেন।
নগর কাউন্সিলরগণ যখন এই ঘড়ির দর্শন পেলেন তখন অভিভূত হয়ে পড়েন। এর আগে এমন সুন্দর ঘড়ি আর দ্বিতীয়টি দেখেননি। এই মুগ্ধতার সাথে মনের মাঝে হালকা ভয়ের উদ্রেক হলো। প্রাগের ঘড়ির দেখাদেখি হয়তো অন্য অঞ্চলেও এই ঘড়ি নির্মাণের প্রচেষ্টা হবে। কিন্তু সেটা হতে দেওয়া যাবে না। এমন ঘড়ি আর দ্বিতীয়টি হোক, কেউই চাইছিল না। আর তা নিশ্চিত করতে বেশ ঘৃণ্য একটি সিদ্ধান্ত নিল তারা। নির্মাতা হানোসকে অন্ধ করে দেওয়া যেন সে আর ঘড়ি নির্মাণ করতে না পারে।

ঘড়ির নির্মাতাকে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল
কাউন্সিলের ভাড়া করা গুণ্ডারা রাতের আঁধারে আক্রমণ করলো হানোসকে। লোহার দণ্ড দিয়ে খুঁচিয়ে মহান নির্মাতা হানোসের চোখ উপড়ে ফেলা হলো। প্রাগ শহরকে বাকি শহর থেকে আলাদা করে তোলা এক ঘড়ি নির্মাণের পরিণাম হিসেবে তাকে বরণ করতে হলো অন্ধত্ব। অসহায় অন্ধ হানোস কাউন্সিলের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠলেন। কিছুটা সুস্থ হয়ে তার এক শিক্ষানবিসকে নিয়ে তিনি সেই ঘড়ির নিকট গেলেন। তারপর ঘড়িটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ একে একে অকেজো করে দিলেন। এভাবে প্রতিশোধ এবং হিংসার নিষ্ঠুর পরিণতিতে ইউরোপের অনন্য মহাকাশীয় ঘড়ির টিকটিক করা কাঁটা থেমে গিয়েছিল সেদিন। হানোসের অভিশাপ কিনা কে জানে, এই ঘড়ি পুনরায় চালু করতে প্রাগের লেগে গিয়েছিল সুদীর্ঘ একশত বছর! এরপর কেটে গেছে বেশ কয়েকটি শতক, তবে প্রাগের মহাকাশীয় ঘড়ি টিকটিক করে চলছে এখনও।
প্রাগের মহাকাশীয় ঘড়ি
মহাকাশীয় ঘড়ি (Astronomical Clock) হচ্ছে এমন একটি বিশেষ যন্ত্র, যার সাহায্যে মহাকাশের গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্রের অবস্থান সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য নির্ণয় করা যায়। এর সাহায্যে জ্যোতিষ্কমণ্ডলের তারকারাজির অবস্থানও নির্ণয় করা যায়। এখানে উল্লেখ করা ঘড়িটি চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগের সেই মহাকাশীয় ঘড়ির নাম হচ্ছে অরলোজ। অরলোজের সাহায্য তৎকালীন মানুষ সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র এবং ক্ষেত্রবিশেষে গ্রহের অবস্থান জানতে পারতো। এই তথ্য কাজে লাগিয়ে পঞ্জিকা নির্মাণ, উৎসবের দিনধার্য করাসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্য পরিচালনা করা হতো। তবে অরলোজের কার্যক্ষমতা ছিল আরও ব্যাপক। কারণ, এই ঘড়ি মোটে দুটি অংশ ছিল। এক অংশে মহাকাশের যাবতীয় হিসাব-নিকাশ চললেও অপর অংশে সময়, তারিখ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেত। নির্মাণের পর থেকেই নানান গল্পকাহিনী, গুজব, রহস্য, অভিশাপ নিয়ে ঘেরা এই ঘড়ি আজও সারাবিশ্বের নজর কাড়ছে এর অনন্য নির্মাণশৈলী এবং সূক্ষ্মতার কারণে। প্রাগের দর্শণার্থীদের প্রথম পছন্দ থাকে এই অতিকায় ঘড়ির দর্শন লাভ করা।

একনজরে প্রাগ শহরের অরলোজ
আসল নির্মাতা কে?
প্রাথমিকভাবে এর নির্মাতা হিসেবে হানোস নামক এক প্রাচীন ঘড়ি নির্মাতার নাম প্রচলিত ছিল। তবে ১৯৬১ সালে বেরিয়ে আসলো সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য। নতুন তথ্য অনুযায়ী ১৪১০ সালে কাদান শহরের ‘মিকুলাস’ নামক এক ঘড়ি নির্মাতার হাতে তৈরি হয়েছে এই বিখ্যাত ঘড়ি। জান সিডেল নামক এক জ্যোতির্বিদের গবেষণা থেকে এই তথ্য বেরিয়ে আসে। বিশেষজ্ঞদের নিরীক্ষার পর হানোস নয়, মিকুলাসকেই এই ঘড়ির আসল নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গবেষণায় আরো জানা যায়, হানোস সম্পর্কিত প্রচলিত তথ্যটি নিয়ে যথেষ্ট প্রমাণাদি না থাকায় তাকে আপাতদৃষ্টিতে লোককাহিনী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

১৭৯১ সালে নকশা করা প্রাগের অরলোজ
নির্মাণের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রাগের অরলোজ ঘড়ি যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে অকেজো হয়ে পড়েছিল। তবে এর জটিল কলকব্জা মেরামত করা সহজ ছিল না। বিশেষ করে, ১৮শ শতকের শেষদিকে ঘড়িটি এমনভাবে অকেজো হয়ে পড়ে যে, তৎকালীন মিস্ত্রীরা একে ঠিক করতে ব্যর্থ হয়। তখন স্থানীয় নগর কর্তৃপক্ষ অরলোজকে সরিয়ে নতুন ঘড়ি নির্মাণের কথাও ভেবেছিলেন। তবে শেষপর্যন্ত সেই ভাবনা বাস্তবে রূপান্তরিত হয়নি। পরে ১৮৬৫ সালে ঘড়িটি মেরামত করা সম্ভব হয়েছিল। নতুন মেরামতের সাথে এর মধ্যে দিন-তারিখ হিসাব করার ব্যবস্থা সংযুক্ত করা হয়েছিল।
কীভাবে কাজ করে?
ঘড়ির মূল নির্মাতা এই ঘড়িকে বেশ কয়েকটি অংশে ভাগ করে নির্মাণ করেছেন। প্রতিটি অংশের কাজ ভিন্ন এবং সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। ঘড়িটি যখন নির্মিত হয়েছিল, তখন সৌরজগতের কেন্দ্র হিসেবে পৃথিবীকে গণ্য করা হতো। তাই ঘড়ির কেন্দ্রে রয়েছে আমাদের এই গ্রহ। কারুকার্যখচিত কাঁটা এবং ডায়ালের মাধ্যমে তাই ঘড়ির একটি অংশ পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতে সূর্য এবং চন্দ্রের অবস্থান নির্দেশ করে। প্রাচীন চেক সময় এবং রোমান সময় গণনা- এই দুই পদ্ধতিতেই এই ঘড়ির মান নির্দেশ করা আছে।
ঘড়িটি যত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা যাবে, তত বেশি তথ্য এর থেকে আহরণ করা সম্ভব হবে। ঘড়ির কেন্দ্রের দিকে রোমান হরফের বেশ কিছু ডায়াল চোখে পড়বে। দৈনিক ২৪ ঘণ্টার সময় নির্দেশ করাই এসব ডায়ালের উদ্দেশ্য। এই অংশের মূলদেহে ব্যবহৃত নীল এবং লাল বর্ণের সমন্বয়ে দিন, রাত, সূর্যাস্ত, সূর্যোদয়, অপরাহ্ন, মধ্যাহ্নসহ একদিনের বিভিন্ন ঘটনার সময়কাল নির্ণয় করা সম্ভব হয়। তাছাড়া বিষুবরেখা এবং ক্রান্তিয় রেখার হিসাব রাখতেও সক্ষম এই ঘড়ি। বিভিন্ন গ্রহণের সময় সূর্যের অবস্থান নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন রাশিচিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এই চিহ্নগুলো ঘড়ির কাঁটার বিপরীত ক্রমে সাজানো হয়েছে।


ঘড়ির উপরের অংশ;
ঘড়ির নিচের অংশ;
এর একটি আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে ডায়াল আর কাঁটার বাইরেও এর বেশকিছু অংশ রয়েছে যা দেখতে দর্শণার্থীদের ভিড় জমে। এর গায়ে রয়েছে ৮টি কাঠের মূর্তি বা পুতুল। যা ৪ পুণ্য এবং ৪ অশুভ বা অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ক্যালেন্ডারের ডায়ালের পাশে এদের দেখতে পাওয়া যাবে। ৪ অমঙ্গলের মধ্যে ‘মৃত্যু’কে চিহ্নিত করা এক কঙ্কাল মূর্তির দেখা মিলবে। এছাড়া খ্রিস্টান ধর্মমতে, যিশুখ্রিস্টের বিখ্যাত ‘দ্য লাস্ট সাপার’ এর সময় ১২ জন অনুসারীকে দূত বা বাণীপ্রচারক হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানে সেই ১২ জনের কাঠের মূর্তিও সংযুক্ত রয়েছে।
মূল দেহের ঠিক উপরে দুটি নীল দরজা রয়েছে। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় একবার করে দরজাগুলো উন্মুক্ত হয়। আর তখন এই মূর্তিগুলো দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে সীমিত আকারে চলাচল করে ফের ভেতরে চলে যায়। যেমন, মৃত্যু মূর্তি যখন বেরিয়ে আসে, তখন সে ধাতুর তৈরি একটি ঘণ্টায় আঘাত করে শব্দ উৎপন্ন করে। আপনারা বুঝতেই পারছেন এর দ্বারা মৃত্যুঘণ্টাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

ঘড়ির দেহে থাকা মূর্তিগুলোর একাংশ
গুপ্ত বার্তার সন্ধান
প্রাগের অরলোজকে নিয়ে বিস্ময়ের অন্ত নেই। নির্মাণের কয়েকশত বছর পরেও সূক্ষ্মভাবে মহাকাশের নক্ষত্র, উপগ্রহের অবস্থান নির্ণয় যাচ্ছে এই ঘড়িটি। এছাড়া এর গায়ে ব্যবহৃত বাহারি রঙের কারুকাজ, কাঠের পুতুলের সংক্ষিপ্ত প্রদর্শনী এবং জটিল কলকব্জা শিল্প ও বিজ্ঞানের সমঝদারদের জন্য প্রশান্তির নিদর্শন হয়ে আছে। কয়েক বছর পর পর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এই ঘড়ির সরেজমিন মেরামত এবং সংস্কার সাধিত হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসেও এরকম একটি সংস্কার প্রকল্প পরিচালিত হয়েছিল। নিয়মানুযায়ী কর্মীরা ১২ দূতের মূর্তিগুলো পরিষ্কার করছিল। তখন একজন কর্মী দেখলেন একটি মূর্তি অন্যগুলোর চেয়ে কিছুটা ভারী লাগছে। ভারী মূর্তিটি ছিল সেন্ট থমাস নামক একজন দূতের প্রতিকৃতি। কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলে মূর্তিটি এক্স-রে করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। এক্স-রে প্রতিবেদনে দেখা গেলো এর অভ্যন্তরে ধাতব একটি বাক্স দেখা যাচ্ছে। তৎক্ষণাৎ মূর্তিটি খুলে পরীক্ষা করা হলো। আর তখনই বের হয়ে আসলো শত বছরের লুকানো চিঠি।


যিশুখ্রিস্টের ১২ বাণীপ্রচারকের মূর্তি
এ যেন অতীত থেকে ভবিষ্যতের প্রতি লেখা কোনো বার্তা। কৌতূহলি হয়ে এই চিঠির পাঠোদ্ধার এবং উৎস জানার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হলো। পরীক্ষা করে দেখা গেলো এই বার্তার লেখক ছিলেন ভইতেক সুচার্দা নামক একজন ভাস্কর। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ঘড়ির মূর্তিগুলো সংস্কার এবং মেরামতের জন্য তাকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি একটি চিঠিতে ঘড়ি মেরামত এবং আরও বর্ধিত আকারে সংস্কার করার পরিকল্পনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এছাড়াও দেশের অবস্থা এবং কমিউনিস্ট রাজনীতি নিয়ে বন্ধুসুলভ কিছু মন্তব্য ছিল সেখানে। সেই চিঠিটি পরবর্তীতে সেন্ট থমাসের মূর্তি থেকে উদ্ধার করা হয়। তবে কীভাবে এবং কেন এই চিরকুট এখানে লুকানো হয়েছিল তা বোঝা মুশকিল। এছাড়া চিঠি থেকে ঘড়ির পূর্ব সংস্করণ সম্পর্কে বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। এমনকি ক্যালেন্ডার ডায়ালের কোনায় লুকানো বেশকিছু পাথরের ভাস্কর্যের সন্ধানও পাওয়া গেছে এই চিঠি থেকে।
অধীরে আগ্রহে মৃত্যুঘণ্টার অপেক্ষা করছেন দর্শনার্থীরা
অরলোজকে নিয়ে প্রচলিত রয়েছে শত শত অলৌকিক কাহিনী ও কল্পগাথা। অনেকে ধারণা করেন এই ঘড়ির সাথে নগরীর ভাগ্য নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে। এজন্য কিছুটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষরা এই ঘড়িকে ‘দ্য ডেভিলস আই’ বা শয়তানের চোখ বলে অভিহিত করে। অবশ্য তাদের দোষ দেওয়ারও অবকাশ নেই। ইতিহাসে প্রাগ শহর যখনই কোনো দুর্যোগ বা বিপদের মুখে পড়েছে, অরলোজ ঘড়ি তার স্পন্দন থামিয়ে দিয়েছে। এমন অদ্ভুত কাণ্ড খুব বেশি দেখা যায় না। শেষবার এমনটি ঘটেছে ২০০২ সালের বন্যার সময়। বন্যাকবলিত প্রাগের এই ঐতিহাসিক ঘড়ি ‘অরলোজ’ অকেজো হয়ে পড়েছিল। অবশ্য এর পেছনে শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকেই দায়ী করবেন সবাই। তবে অনেকে বিশ্বাস করে এই ঘড়ি থেমে যাওয়া মানেই অশুভ কিছু। এমনকি ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঘড়িটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

সংক্ষেপে দেখুন২০০২ সালের বন্যাকবলিত প্রাগ
মধ্যযুগে ঘড়িটি ধর্মগুরু, গণিতবিদ, জ্যোতিষীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের নিকট অপরিহার্য যন্ত্র ছিল। বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, এই ঘড়িটি সৃষ্টিকর্তার দৈববাণী প্রকাশের একটি পবিত্র মাধ্যম। তাছাড়া আলকেমির সাধকরাও ঘড়িটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ঘড়ির মূল নকশাতে ডায়াল আর কাঁটা ব্যতীত অতিরিক্ত কিছু ছিল না। তবে কালের আবর্তে এর সাথে যুক্ত হওয়া মূর্তিগুলোই আজ সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। ঘড়ির সামনে ভিড় জমানো দর্শনার্থীরা প্রতি ঘণ্টায় মৃত্যু মূর্তির ঘণ্টা বাজানো প্রদর্শনী দেহে মুগ্ধ হয়। তাছাড়া ঘড়ির দিকে মনোযোগ দিলে এর জটিল বিন্যাস এবং সূক্ষ্মতা দেখে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না।
বিষাক্ত সায়ানাইডের স্বাদ কেমন?
– নতুন কিছু জানা গিয়েছে, অফিসার? – নাহ, কীভাবে তাকে বিষপ্রয়োগ করা হলো তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। – সায়ানাইডেই মৃত্যু হয়েছে তাহলে? – হ্যাঁ, করোনার তো তা-ই বললো। – শরীরের আর কোথাও সায়ানাইডের চিহ্ন পাওয়া যায়নি? – বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর ডগায় সামান্য পাওয়া গিয়েছে। – আঙুলে? আর কোথাও নয়? – না। করোনারের রিপবিস্তারিত পড়ুন
– নতুন কিছু জানা গিয়েছে, অফিসার?
– নাহ, কীভাবে তাকে বিষপ্রয়োগ করা হলো তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
– সায়ানাইডেই মৃত্যু হয়েছে তাহলে?
– হ্যাঁ, করোনার তো তা-ই বললো।
– শরীরের আর কোথাও সায়ানাইডের চিহ্ন পাওয়া যায়নি?
– বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর ডগায় সামান্য পাওয়া গিয়েছে।
– আঙুলে? আর কোথাও নয়?
– না। করোনারের রিপোর্টে বলা হয়েছে, খাবার খাওয়ার অনেক পরে মৃত্যু হয়েছে। সুতরাং, খাবারে সায়ানাইড মেশানোর ফলে মৃত্যু হয়েছে, এটা নাকচ করে দেওয়া যায়। আর ঘরের সব জায়গাতেই দেখা হয়েছে, সায়ানাইডের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি!
“তাহলে সায়ানাইড মুখে প্রবেশ করলো কীভাবে?” বলতে বলতে টেবিলের উপর থেকে লাল বইটা তুলে নিলো প্রাইভেট ডিটেকটিভ। “বাহ, শার্লক হোমস!” হাতে দস্তানা পরে সাবধানে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টোতে লাগলো সে।
– টেবিলের উপরেই মৃতদেহটা পড়ে ছিল না?
– হ্যাঁ, চেয়ারে বসা অবস্থায় ছিল, মাথাটা টেবিলের উপরে পড়ে ছিল।
– অফিসার! এখনই এই বইটা ল্যাবরেটরিতে পাঠান। পৃষ্ঠাগুলো পরীক্ষা করে দেখুন, সম্ভবত এর পৃষ্ঠাতেই সায়ানাইড লাগানো ছিল।
– মানে…? জ্বি, হ্যাঁ, অবশ্যই।
– আর ডেভনশায়ার বুক কর্নারে খোঁজ করুন। এই বইটা কে কিনেছে খুঁজে বের করুন। খুনিকে পেয়ে যাবেন। আমি চললাম।
– কিন্তু খুন হলো কীভাবে?
“এখনো বোঝেননি? বইয়ের পাতায় সায়ানাইড মাখানো ছিল। বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানোর সময়েই তার আঙুলে সায়ানাইড লেগে যায়, তারপর জিহ্বায় হাত লাগতেই সব শেষ। বইয়ের পাতায় উল্টানোর সময় হাতে থুথু লাগানো খুবই খারাপ অভ্যাস, এরপর থেকে খেয়াল রাখবেন বিষয়টা,” বলে অফিসারের দিকে চোখ টিপে বের হয়ে গেলো ডিটেকটিভ।
সায়ানাইড নিয়ে গোয়েন্দা সাহিত্যে উৎসাহের কমতি নেই। আর্থার কোনান ডয়েল কিংবা আগাথা ক্রিস্টি, বিখ্যাত গোয়েন্দা লেখকেরা নিজেদের গল্পে খানিকটা হলেও সায়ানাইড মিশিয়ে দিয়েছেন। এই বিখ্যাত বিষ নিয়ে মানুষের আলোচনাও কম নয়। এমন গুজবও রটেছে যে, মানুষ সায়ানাইড মুখে দেওয়ার সাথে সাথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, এর স্বাদ কেমন তা কেউ বলতে পারেনি। তা বলার আগেই সে মারা গিয়েছে। এরকম একটা খুবই প্রচলিত গুজব হলো কেউ একজন কলম হাতে ধরেই সায়ানাইডের স্বাদ পরীক্ষা করতে যান, কিন্তু ‘S’ শব্দটি লেখার পরপরই তিনি মারা যান। ‘S’ দিয়ে Sour (টক) বা Sweet (মিষ্টি), এমনকি Salty (লবণাক্ত)-ও হতে পারে। এই হচ্ছে সায়ানাইডের স্বাদ সম্পর্কে মানুষের সর্বোচ্চ জ্ঞান। কিন্তু আসলেই কি তা-ই?
বিষাক্ত সায়ানাইডের বোতল
সায়ানাইডের স্বাদ
২০০৬ সাল, ভারতের কেরালা রাজ্যের পালাক্কাদ জেলার ঘটনা। পুলিশের কাছে খবর আসলো প্রসাদ নামক এক স্বর্ণকার আত্মহত্যা করেছেন। কারণ? নকল সোনার গহনা কিনেছিলেন কয়েকদিন আগে, আর এটি কিনতে গিয়েই ব্যাংকের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছিল তাকে। শেষমেশ নকল গহনার মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন এই স্বর্ণকার। তবে প্রসাদ তার মৃত্যুর আগে এক অভাবনীয় কাজ করে গিয়েছেন। ভেঙে দিয়েছেন বিজ্ঞানের এতদিনের কিংবদন্তী, যে কেউ সায়ানাইডের স্বাদ বলতে পারেনি। প্রসাদ যে সায়ানাইডের স্বাদ গ্রহণ করে তা শুধু লিখে গিয়েছেন তা-ই নয়, বরং ডাক্তারদের উদ্দেশ্যেও ছোট একটা নোট লিখে গিয়েছেন, এবং ঠিক তারপরেই মারা গিয়েছেন।
প্রসাদকে সায়ানাইড পাওয়ার জন্য দূরে কোথাও যেতে হয়নি, সোনা নিষ্কাশনের জন্য সায়ানাইড একটি বহুল ব্যবহৃত পদার্থ। প্রসাদ সায়ানাইড বেশ বড় একটা পাত্রে রেখে তার মধ্যে কিছুটা অ্যালকোহল ঢেলে দেন, এরপর লেখার কলমের পিছন দিকটার সামান্য অংশ তাতে চুবিয়ে নিলেন। তারপর কলমে জিহ্বা লাগিয়েই তার চিঠি লেখা শুরু করলেন।
“ডাক্তার, এটা হচ্ছে পটাশিয়াম সায়ানাইড। আমি এটার স্বাদ গ্রহণ করেছি। এটা ধীরে ধীরে শুরু হয়, আর তারপরেই জ্বালা শুরু হয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো জিহ্বা শক্ত হয়ে যায়। এর স্বাদ হচ্ছে অত্যন্ত কটু … আমি এরকম একটা গোয়েন্দা উপন্যাস পড়েছিলাম, যেখানে একজন লোককে সায়ানাইড প্রয়োগে মেরে ফেলা হয়। খুনী একটা বইয়ের পাতায় সায়ানাইড লাগিয়ে রাখে, আর যখনই সে বইয়ের পাতা উল্টানোর সময় তার হাত জিহ্বায় স্পর্শ করে, তখনই সে মারা যায়, এবং এই ঘটনায় কাউকে সন্দেহও করা যায়নি। আমি এখন বুঝতে পেরেছি যে এর সাহায্যে সহজেই কাউকে খুন করে ফেলা সম্ভব…”
প্রসাদের ময়না তদন্তকারী ডাক্তার পিবি গুজরাল মন্তব্য করেছেন, “আমরা এখন জানতে পারলাম যে সায়ানাইডের স্বাদ কেমন। তার সুইসাইড নোটটা একটা দলিল। এর আগে কেউ বলে যেতে পারেনি সায়ানাইডের স্বাদ আসলে কেমন।” প্রসাদের এই কাজের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রসাদের পরিবারের জন্য প্রতি মাসে এক লক্ষ রুপি প্রদান করার ঘোষণা দেয়।
এই ঘটনার কয়েক বছর আগে এক বিজ্ঞানী সায়ানাইডের স্বাদ কেমন তা পরীক্ষা করতে যান, কিন্তু কিছু বলার আগেই তিনি মারা যান। আরেকজন বিজ্ঞানীও একই কাজ করতে কলম ধরার আগেই পরলোকে পাড়ি জমান।
রাসায়নিক ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত পটাশিয়াম সায়ানাইড
সায়ানাইড কীভাবে কাজ করে?
সহজ কথায় বলা যায়, সায়ানাইড দেহকোষগুলোকে অক্সিজেন থেকে শক্তি উৎপাদন করতে বাধা দেয়। সায়ানাইড আয়ন (CN-) মাইটোকন্ড্রিয়ার সাইটোক্রোম সি-তে অবস্থিত লোহার সাথে যুক্ত হয়ে তাকে আটকে রাখে। ফলে সাইটোক্রোম সি অক্সাইডেজ অক্সিজেনে ইলেকট্রন পরিবহণ করতে পারে না। অক্সিজেন ব্যবহার করতে না পারায় মাইটোকন্ড্রিয়াও এটিপি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। শক্তি উৎপাদনে ব্যর্থ হওয়ায় হৃৎপিণ্ডের পেশিকোষ আর স্নায়ুকোষ দ্রুত তাদের শক্তি খরচ করে ফেলে আর মারা যেতে শুরু করে। যথেষ্ট পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ কোষ মারা গেলেই আপনিও মারা যাবেন।
সায়ানাইড আসলে কতটা বিষাক্ত?
এটি নির্ভর করে সায়ানাইড কোন অবস্থায় দেহে প্রবেশ করছে। মুখের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করা কঠিন বা তরল সায়ানাইডের তুলনায় প্রশ্বাসের সাথে টেনে নেওয়া সায়ানাইড গ্যাস আরো বেশি মারাত্মক। প্রতি লিটারে ৩ মিলিগ্রামের চেয়ে বেশি সায়ানাইড কয়েক মিলি সেকেন্ডের মধ্যেই একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। তবে সায়ানাইডই সবচেয়ে বিষাক্ত পদার্থ নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত সারিন গ্যাস, খাদ্যের মধ্যে বিষক্রিয়ার ফলে উৎপাদিত বটুলিনাম টক্সিন, এমনকি পারদও সায়ানাইডের তুলনায় বিষাক্ত।
সায়ানাইড ব্যবহারের ইতিহাস
সোনা নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে একটি বহুল ব্যবহৃত উপাদান এই সায়ানাইড। চিকিৎসাক্ষেত্রেও এটি ব্যবহার করা হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের জরুরি প্রয়োজনে রক্তচাপ কমানোর প্রয়োজন হলে তাদের দেহে স্বল্পমাত্রায় সায়ানাইড প্রয়োগ করা হয়। এছাড়াও প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে জাপানে যক্ষা আর মৃগীরোগের প্রতিকারের জন্য এই রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হতো। কীটনাশক হিসেবেও সায়ানাইড একটি বহুল ব্যবহৃত উপাদান।
আত্মহত্যার জন্যও সায়ানাইডের কুখ্যাতি কম নয়। নাৎসি বাহিনীর হিমলার, গোয়ারিং কিংবা হিটলারের স্ত্রী ইভা ব্রাউন থেকে শুরু করে শ্রীলংকার LTTE এর সদস্যরাও আত্মহত্যার জন্য সায়ানাইডকেই বেছে নিয়েছেন। ধরা পড়ার পর জিজ্ঞাসাবাদ থেকে বাঁচতে গুপ্তচর কিংবা কমান্ডোরাও সায়ানাইড ব্যবহার করতো।
সায়ানাইড সেবন করে আত্মহত্যা করার পর হিমলারের মৃতদেহ
মাকড়শাকে আমরা ভয় পাই কেন? স্পাইডার সিল্ক কি?
অ্যারাকনোফোবিয়া বা মাকড়শার ভয়। এই ভয়ে ভুগে থাকেন পৃথিবীর প্রতি দশজন মানুষের মধ্যে একজন। কিন্তু কেন? আমাদের চারপাশের পরিচিত মাকড়শাগুলোর কোনোটাই কামড়ে দিচ্ছে না, বিষাক্তও না। তাহলে তাদের দেখলেই কেন শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে যায় আমাদের? মাকড়শা যে ভয়ের, সেটা আপনার মাথায় এমনিতেই গেঁথে রেখবিস্তারিত পড়ুন
অ্যারাকনোফোবিয়া বা মাকড়শার ভয়। এই ভয়ে ভুগে থাকেন পৃথিবীর প্রতি দশজন মানুষের মধ্যে একজন। কিন্তু কেন? আমাদের চারপাশের পরিচিত মাকড়শাগুলোর কোনোটাই কামড়ে দিচ্ছে না, বিষাক্তও না। তাহলে তাদের দেখলেই কেন শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে যায় আমাদের?

মাকড়শা যে ভয়ের, সেটা আপনার মাথায় এমনিতেই গেঁথে রেখেছে প্রকৃতি
এমন ভয়ই বা কেন জন্ম নিচ্ছে আমাদের মধ্যে মাকড়শাকে দেখলেই?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভয়টা শুধু মাকড়শা নিয়েই নয়, পোকামাকড় ও এর কাছাকাছি প্রাণী, যেমন– সাপ, বাদুড় ইত্যাদি সবকিছু ঘিরেই এমন ভয় কাজ করে মানুষের মধ্যে। আর আমাদের মধ্যে যারা উপরের তালিকার যেকোনো একটি প্রাণীকে ভয় পান, তারা অন্যান্য পোকা, সরীসৃপ ইত্যাদি দেখেও ভয় পান। চলুন, আজ অ্যারাকনোফোবিয়া নিয়েই বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
মাকড়শা থেকে শুরু করে মাকড়শাল জাল: ভয়টা কোথায়?
মাকড়শাকে ভয় পাওয়া আর মাকড়শার জালকে ভয় পাওয়া, দুটোই একই ফোবিয়ার মধ্যে পড়ে। ঠিক ধরেছেন। অ্যারাকনোফোবিয়ার কথাই বলছি। অন্যান্য অনেক ফোবিয়ার চেয়ে অনেক বেশি এককেন্দ্রীক ভীতি এটা, যা তৈরি হতে পারে যে কারো মধ্যেই। এখানে আসল মাকড়শাও যে থাকতে হবে তা না, অ্যারাকনোফোবিয়ার ভুক্তভোগী হিসেবে শুধু জাল দেখেই মাকড়শা আশেপাশে থাকতে পারে সেই ভীতিতে পড়তেই পারেন।
‘অ্যারাকনে’ আর ‘ফোবোস’ নামের দুটো গ্রিক শব্দকে জুড়ে এই ভয়ের জন্ম। কালের পরিক্রমায় নানারকম ক্ষতিকর প্রাণীর প্রতি সহজাতভাবেই ভয় তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে। এই যেমন সাপ, যা আগেও বিষাক্ত ছিল, এখনও তা-ই। কিন্তু বিষ নেই এমন একটা সাপকেও আশেপাশে দেখলে আপনার শরীর ভয়ে কেঁপে উঠবে। এমন কেন? কারণ, আপনি জানেন, আপনার শরীরের ডিএনএ জানে যে সাপ বিষাক্ত। অনেকটা সহজাত প্রতিক্রিয়া চলে আসে তাই আপনার মধ্যে।

মাকড়শাকে ভয় পাওয়ার জন্য আপনাকে মাকড়শার কামড় খেতে হবে এমনটা কিন্তু না;
একই ঘটনা ঘটে মাকড়শার বেলায়ও। মাকড়শা থেকে বিষ, বিষ থেকে অসুস্থতা- এই চিন্তা থেকেই শুরু হয় অ্যারাকনোফোবিয়া। অনেকটা প্রাকৃতিকভাবেই। কাজেই, মাকড়শাকে ভয় পাওয়ার জন্য আপনাকে মাকড়শার কামড় খেতে হবে এমনটা কিন্তু না। মাকড়শা যে ভয়ের, সেটা আপনার মাথায় এমনিতেই গেঁথে রেখেছে প্রকৃতি। সেখান থেকেই আপনি হয়ে যাচ্ছে অ্যারাকনোফোবিয়ার ভুক্তভোগী।
এই থিওরিকে সামনে ধরেই জার্মানিতে একটি গবেষণা চালানো হয়। শিশুদের মাছ, ফুল, সাপ, মাকড়শা ইত্যাদি দেখানো হয়। আর তাতে দেখা যায় যে, মাকড়শা আর সাপের বেলাতেই বাচ্চাদের চোখের মণির আকৃতি বদলাচ্ছে। ভয় পাচ্ছে তারা। এই ভয় কিন্তু মাকড়শাকে আগে থেকে না দেখেই ওদের মধ্যে তৈরি হয়েছে।
অবশ্য, ভয় ছাড়াও বিরক্তি আর অস্বস্তিও হতে পারে অ্যারাকনোফোবিয়ার কারণ। আপনি শুধু মাকড়শাকে ভয় পেয়ে ওই জায়গা থেকে সরে যান বা মাকড়শাটাকে তাড়িয়ে দেন? এই ভীতির কবলে পড়ে অনেকে নিজের বাসাও ছাড়তে বাধ্য হন কখনো কখনো। মজার ব্যাপার হলো, আজ এই সময়ে এসে ব্যাপারটাকে শুধু একটা ভীতি মনে হলেও এই ভয়ই কিন্তু একটা সময় মানবজাতিকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। বর্তমানে অনেক মাকড়শার মধ্যেই মানুষকে আক্রান্ত করার মতো বিষাক্ত তরল থাকলেও সেটা মানুষের শরীরে প্রবেশ করানোর মতো ধারালো আর লম্বা হুল থাকে না। পৃথিবীর ৬৩,০০০ প্রজাতির মাকড়শার মধ্যেও শুধু ২ শতাংশই মানুষের জন্য বিষাক্ত।

ভয় ছাড়াও বিরক্তি আর অস্বস্তিও হতে পারে অ্যারাকনোফোবিয়ার কারণ
আর হ্যাঁ, এসব বাদেও আপনার পরিবেশটাও আপনার মধ্যে অ্যারাকনোফোবিয়া তৈরি করতে পারে। বাবা-মা, চারপাশের মানুষ যেটাকে ভয় পাচ্ছে, সেটাকে আপনি কেন ভয় পাবেন না? নিজে নিজেই তাই আগে থেকে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও মানুষ হয়ে পড়তে পারেন এই আদিম ফোবিয়ার ভুক্তভোগী!
আপনার অ্যারাকনোফোবিয়া আছে কি?
মাকড়শাকে টুকটাক ভয় পাওয়া কিন্তু যায়ই। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি সেটা। কিন্তু সেই ভয় যে প্রচন্ড ফোবিয়া হয়ে আপনাকে আক্রমণ করেছে, তার লক্ষণ স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব।

অ্যারাকনোফোবিয়া তৈরি হলে একজন মানুষ এই ভয়কে মোকাবেলা করতে মাকড়শা আছে এমন জায়গা এড়িয়ে চলেন
শারীরিকভাবে অ্যারাকনোফোবিয়ার ক্ষেত্রে ভয় বৃদ্ধি পেলে আপনি:
ইত্যাদি দেখতে পারেন নিজের মধ্যে। শুধু তা-ই না, অ্যারাকনোফোবিয়া তৈরি হলে একজন মানুষ এই ভয়কে মোকাবেলা করতে মাকড়শা আছে এমন জায়গা এড়িয়ে চলেন। কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারেন না। সামাজিক নানা ব্যাপার থেকে অনেকটা দূরে চলে যেতে একপ্রকার বাধ্য হন।
ভয় কমাবেন কীভাবে?
মাকড়শার প্রতি এই প্রচন্ড ভীতি কমাতে কিছু ব্যাপার খুব ইতিবাচকভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারে। টুকটাক সমস্যার পাশাপাশি আপনি যদি দেখতে পান অ্যারাকনোফোবিয়ার কারণে আপনি বাইরে যেতেই ভয় পাচ্ছেন, কাজ করতে পারছেন না, রাতে জেগে থাকছেন বা কিছুক্ষণ পর পর চিন্তায় ডুবে যাচ্ছেন, সেক্ষেত্রে আপনার উচিৎ হবে-
১) চিকিৎসকের সাথে কথা বলা। চিকিৎসকেরা এই ভীতির কারণে কোনো ওষুধ দিতে চান না। তবে কাউন্সেলিং করে ভয়কে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসেন।

বারবার মাকড়শাকে সামনে থেকে দেখাটাও অ্যারাকনোফোবিয়া কমিয়ে আনে
২) অন্য অনেক ফোবিয়ার মতো থেরাপি নেওয়ার মাধ্যমেও ধীরে ধীরে ভয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন আপনি। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি থেরাপি এক্ষেত্রে বেশ ভালো কাজ করে। বার বার মাকড়শাকে সামনে থেকে দেখাও অ্যারাকনোফোবিয়া কমিয়ে আনে।
মজার ব্যাপার হলো, স্পাইডারম্যান মুভিও অনেক অ্যারাকনোফোবিয়ার ভুক্তভোগীকে মাকড়শার ভয় কাটাতে সাহায্য করেছে। তাই আপনার মধ্যে বাস করা মাকড়শাকে নিয়ে ভীতিটা ঠিক কোন উপায়ে চলে যাবে সেটা বলা কঠিন। তবে পুরো ব্যাপারটাই যেহেতু আপনি মাকড়শাকে কেমন চোখে দেখছেন তার উপরে নির্ভর করছে, কাউন্সেলিং বা থেরাপি বা অন্য যেকোনো উপায়ে, সেটাকেই যে আপনার বদলাতে হবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই!
সিল্কের কথা বললেই একটি উপকথার গল্প চলে আসে মনে। চীনের সম্রাট হুয়াং তাই বা ইয়েলো এমপেরর-এর স্ত্রী সম্রাজ্ঞী লেই জু যখন বাগানে বসে চা পান করছিলেন তখন উপরের তুঁত গাছ থেকে একটি রেশম পোকার কোকুন এসে পড়ে সম্রাজ্ঞীর চায়ের পেয়ালায়। সম্রাজ্ঞী যখন এটি ধরে বের করে আনতে চাইলেন তখনই ঘটলো আসল ঘটনা। যতই টানেন ততই কোকুন থেকে একনাগাড়ে বেরিয়ে আসতে থাকে সুতা।
ধারণা করা হয়, সম্রাজ্ঞী লেই জু দুর্ঘটনাক্রমে সিল্ক আবিষ্কার করেন
নব্য প্রস্তর যুগের শেষ দিকের ঘটনা। অন্তত ইতিহাস আর ঐতিহাসিকগণ এমনটাই বলেন। তবে কাহিনীটি সত্য না উপকথা এ নিয়েও মতভেদ আছে। তারপরও চীন সিল্ককে নিজেদের একচেটিয়া অধিকারে রাখে প্রায় তিন হাজার বছর। সেই সিল্ক চীনকে এনে দিয়েছিল অনন্য সম্ভাবনার সুযোগ। যদিও পরে নানাভাবে নানা উপায়ে সিল্ক ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়।
সিল্কের কথা সকলেই কমবেশ জানে। প্রাকৃতিক এই সুতাই একমাত্র সুতা যা পুরো কোকুন জুড়েই অবিচ্ছিন্ন থাকে। কোকুনের কথায় চলে আসে রেশম পোকা আর তুঁত গাছের কথা। কারণ রেশম পোকা তুঁত গাছের পাতা খেয়েই একসময় কোকুন তৈরী করে এবং এরপর সেখান থেকেই আসে সিল্ক সুতা।
সিল্ক মূলত প্রোটিন ভিত্তিক প্রাকৃতিক তন্তু যা বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়ার পর সুতা হিসেবে পাওয়া যায়। তবে শুনে অবাক লাগতে পারে, সিল্কের মতো এমন সুতা মাকড়সা থেকেও পাওয়া যেতে পারে। কিছুটা অবাস্তব আর আষাঢ়ে গল্পের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু এটি সত্য যে, মাকড়সা থেকে প্রাপ্ত সুতা স্টিলের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়। চলুন জানা যাক মাকড়সার সিল্ক সম্পর্কে দারুণ কিছু তথ্য।
মাকড়সার সুতাও হতে পারে সিল্কের অন্যতম উৎস
রেশম পোকা ছাড়াও সিল্ক উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সঠিকতা আর পূর্ণাঙ্গতার অভাব রয়ে গেছে এখনও। সব প্রজাতির মাকড়সা থেকে সিল্ক প্রস্তুত করা যাবে এমনটা নয়। বিশেষ প্রজাতির মাকড়সাই এক্ষেত্রে শক্তিশালী সিল্ক তৈরী করতে পারে। মাকড়সার বিশেষত্ব হলো অবিরত সুতা তৈরীর কৌশল ও অসাধারণ জ্যামিতিক জ্ঞান সম্বলিত জাল বোনার ক্ষমতা। এই সূত্রক একইসাথে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত অন্যান্য ফাইবারের থেকে অনেকগুণ বেশি শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক। এমনকি কেভলার নামক কৃত্রিম সুতা, যা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট তৈরীতে কাজে লাগে, তার থেকেও স্পাইডার সিল্ক বেশি দৃঢ়।
আসুন জানা যাক কীভাবে মাকড়সা জাল বোনার জন্য সুতা তৈরী করে। মাকড়সার সুতা কীভাবে উৎপাদিত হয় সেটি নিয়ে গবেষকগণ অনেক গবেষণা করেছেন এ পর্যন্ত। মূলত মাকড়সার উদরের বিশেষ একপ্রকার গ্রন্থি থেকে এই সুতার জন্ম হয়। মাকড়সা সবসময় কেবল একই ধরনের সুতাই তৈরী করে না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকার সুতা তৈরী করে থাকে। উদরে উৎপন্ন এই সুতা মূলত প্রাথমিকভাবে তরল অবস্থায় থাকে এবং স্পিনারেট নামক অঙ্গাণুর সূক্ষ্ম মুখনলের মধ্যে দিয়ে বের হয়ে আসে।
স্পিনারেট সাধারণত উদরের পেছনের দিকে অবস্থান করে এবং দেখতে কোণাকার অথবা হাতের আঙুলের মতো। অধিকাংশ মাকড়সার পশ্চাৎদেশে প্রায় দুই জোড়া অর্থাৎ ৪টির মতো (প্রজাতিভেদে ২ থেকে ৮টি পর্যন্ত) স্পিনারেট থাকে। প্রতিটি স্পিনারেটে থাকে স্পিগট নামক অংশ যার মধ্যে দিয়ে এই সূত্রক বের হয়। কিন্তু তরল প্রোটিনের সুতা দিয়ে তো আর জাল বোনা সম্ভব নয়। তাই এদের স্পিনারেটে পরবর্তীতে এমন একটি পালিশ করার ব্যবস্থা থাকে, যার ফলে এই তরল প্রোটিনের আণবিক গঠনের পরিবর্তন ঘটে ও নতুন করে বিন্যস্ত হয়। এই পরিবর্তনের ফলেই বেরিয়ে আসে কঠিন সূত্রক।
এ অংশে যখন তরল প্রোটিন প্রবেশ করে তখন এ অংশের কোষগুলো প্রোটিন থেকে পানি বের করে ফেলে এবং হাইড্রোজেনকে আলাদা করে ফেলে। ফলে সেটি একপ্রকার অম্লীয় মাধ্যমে পরিণত হয়। এর কারণে তরল প্রোটিন পরিণত হয় কঠিন প্রোটিনে। সাধারণত মাকড়সা নিজেদের আবাসস্থল কিংবা আহারাদির ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে জাল বুনে থাকে। কাজেই এই জাল বা জালের সুতা এমন হতে হবে যেন পোকামাকড় যখন এতে আঘাত করবে তখন সেটা সর্বোচ্চ পরিমাণ আঘাত শোষণ করতে পারে। মূলত প্রকৃতিরই এক বিশেষ আশীর্বাদ বলা যায় একে। আর এই বিশেষ গুণই একে অন্যান্য ফাইবার থেকে আলাদা করেছে।
পাশাপাশি এর আরো একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর সূক্ষ্মতা। অর্থাৎ অন্যান্য ফাইবারের তুলনায় এটি খুবই সূক্ষ্ম এবং এর ভরও অনেক হালকা। এতটাই হালকা যে পুরো পৃথিবী একবার বেষ্টন করতে মাকড়সার যে একটানা লম্বা সূত্রকের প্রয়োজন হবে তার ভর হবে খুব বেশি হলে মাঝারি আকৃতির একটি সাবান খণ্ডের ভরের সমান!
প্রাকৃতিক স্পাইডার সিল্ক দিয়ে তৈরী ফেব্রিক
মাকড়সার সুতা যে শক্তিশালী এবং স্থিতিস্থাপক সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। মুশকিল হচ্ছে এই সুতা আহরণ ও উৎপাদন করার যায় কীভাবে সেটা নিয়ে। সাধারণ রেশম পোকা যেমন আমরা চাষ করতে পারি মাকড়সার চাষ করা আসলে ততটা সহজ নয়। কারণ একে তো সব প্রজাতির মাকড়সাই এই শক্তিশালী সুতা তৈরী করতে পারে না, অন্যদিকে মাকড়সা সবসময় একই প্রকার সুতা প্রদানও করতে পারে না। সবচেয়ে কঠিন সমস্যা এই যে মাকড়সা কলোনিভুক্ত প্রাণী নয়। কাজেই এদের একত্রে চাষ করা অসম্ভব।
অন্যদিকে গবেষকগণও কৃত্রিমভাবে মাকড়সার সুতা গবেষণাগারে তৈরী করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু তরল প্রোটিনকে কঠিন ও দৃঢ় করাটাই এখন তাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এটি মাকড়সার দেহে ঘটে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায়। সেটা কৃত্রিমভাবে তৈরী করতে গেলে আমাদের এখনো অনেক গবেষণা করতে হবে এবং অপেক্ষা করতে হবে।
এখন প্রশ্ন থাকতে পারে যে, আমরা তাহলে স্পাইডার সিল্ক পাবো কীভাবে। কারণ একদিকে মাকড়সা থেকে সবসময় সিল্ক পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, আবার গবেষণাগারে এখনো ঠিক সেভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই এটার আসলে এখনই কোনো উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।
দুর্লভ এই সোনালী ফেব্রিক তৈরী করা হয়েছে এক মিলিয়ন মাকড়সার সুতা দিয়ে
তবু অনেকেই এই মাকড়সার সুতা আহরণে চেষ্টা করেছেন এবং সেই সিল্ক দিয়ে ফেব্রিকও বোনা হয়েছে। ছবিতে যে সোনালী ফেব্রিক দেখানো হয়েছে সেটি প্রস্তুত করতে প্রায় ৭০ জন মানুষের সময় লেগেছে ৪ বছর। এই ফেব্রিক তৈরী করা হয়েছে প্রায় এক মিলিয়ন Golden orb প্রজাতির স্ত্রী মাকড়সা হতে প্রাপ্ত সিল্ক থেকে। ব্যাপারটা মোটেও সহজ ছিল না।
এই ৭০ জন মানুষ প্রায় ৪ বছর ধরে মাদাগাস্কারের বিভিন্ন এলাকার টেলিফোন পোল থেকে মাকড়সা সংগ্রহ করেছেন এবং আরো প্রায় ১২ জন মানুষ এসব মাকড়সা থেকে আহরণ করেছে সিল্ক। প্রতিটি মাকড়সা থেকে আহরণ করা হয়েছে প্রায় ৮০ ফুটের মতো সুতা যা ব্যবহার করে তৈরী হয়েছে এই ১১ ফুট দৈর্ঘ্য আর ৪ ফুট প্রস্থের ফেব্রিকখানি। মূলত এটিই প্রথম ফেব্রিক যা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক মাকড়সার সুতা দিয়ে তৈরী করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে মাকড়সা থেকে সুতা আহরণের যে যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি একসাথে ২৪টি মাকড়সার সুতা আহরণ করতে পারে। মাকড়সার কোনো ক্ষতি না করেই করা হয় এই আহরণ কর্ম। আহরিত সুতা হতে দেখা যায় যে, ১৪ হাজার মাকড়সা থেকে যে পরিমাণ সুতা পাওয়া যায় তার ভর খুব বেশি হলে এক আউন্সের মতোই হবে এবং বয়নকৃত ঐ ফেব্রিকের ভর ছিল প্রায় ২.৬ পাউন্ডের মতো। অর্থাৎ এরা অন্যান্য ফাইবার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হালকা হবে।
মাকড়সা থেকে যেভাবে সিল্ক আহরণ করা হয়
কিন্তু এত বিশেষ সব বৈশিষ্ট্য থাকার পরও মাকড়সা চাষ করার কোনো পদ্ধতি আবিষ্কৃত না হওয়ার কারণে কেবল প্রাকৃতিক মাকড়সার উপর নির্ভর করতে হয় আমাদের। আবার প্রাকৃতিক মাকড়সা থেকে একনাগাড়ে সুতা আহরণ করা হলেও একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতা আহরণ করার পর থেকে যে সুতা পাওয়া যায় তা আগের সুতার মতো কঠিন ও স্থিতিস্থাপক থাকে না।
মাকড়সা আহরণের জন্যও উপযুক্ত মানুষের প্রয়োজন। কারণ মাকড়সার দংশনের ভয়ও থাকে যথেষ্ট। আবার বর্ষার মৌসুম ছাড়া এই বিশেষ প্রজাতির মাকড়সা তাদের বিশেষ ধরনের সিল্ক তৈরী করে না। একবার সিল্ক আহরণ করার পর মাকড়সা প্রায় এক সপ্তাহ সময় নেয় নতুন করে একই প্রকার শক্তিশালী সুতা তৈরী করার জন্য।
গবেষকগণ তাই অবিরত চেষ্টা করে যাচ্ছেন কীভাবে গবেষণাগারে তৈরী করা যায় স্পাইডার সিল্ক। কিন্তু কিছু সমস্যা থেকেই যায়। কারণ এই সিল্কের প্রকৃত জীন অনুক্রম এখনো পুরোপুরি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে সমর্থ্য হননি। যদি সেটা পাওয়া যায় তবে সেটা অন্যান্য অণুজীবের শরীরে স্থাপন করে হয়তো প্রচুর পরিমাণে সিল্ক পাওয়া সম্ভব হবে যা হবে একই সাথে শক্তিশালী ও সহজলভ্য।
না খেয়ে কত দিন বেঁচে থাকা সম্ভব?
৭৪ বছর বয়সে জীর্ণ-শীর্ণ শরীরের মহাত্মা গান্ধী একবার অনশনে ২১ দিন পর্যন্ত না খেয়ে ছিলেন! বিভিন্ন দুর্যোগে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকার নজিরও খুব একটা দুর্লভ নয়। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তির বয়স, ওজন, শারীরিক সুস্থতা, জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশের তাপমাত্রা, দেহে পানি ও চর্বির পরিমাণ প্রবিস্তারিত পড়ুন
৭৪ বছর বয়সে জীর্ণ-শীর্ণ শরীরের মহাত্মা গান্ধী একবার অনশনে ২১ দিন পর্যন্ত না খেয়ে ছিলেন! বিভিন্ন দুর্যোগে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকার নজিরও খুব একটা দুর্লভ নয়। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তির বয়স, ওজন, শারীরিক সুস্থতা, জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশের তাপমাত্রা, দেহে পানি ও চর্বির পরিমাণ প্রভৃতি নিয়ামকের ওপর বেঁচে থাকা নির্ভর করে। তবে না খেয়ে ঠিক কত দিন বেঁচে থাকা যায় এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নেই। কেননা দিনের পর দিন কোনো ব্যক্তিকে না খেয়ে রেখে গবেষণা নৈতিকতার দিক থেকে একটি যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। তবে বিভিন্ন দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, অনশন কিংবা ধর্মঘটের বিভিন্ন ঘটনা থেকে বিজ্ঞানীরা খাবার ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকার একটা ধারণা প্রদান করেন।

কোনো রকম খাবার ও পানি ছাড়া সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মতো বেঁচে থাকা সম্ভব। তবে শুধু খাবার খাওয়া বাদ রেখে শুধু পানি পান করে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকা সম্ভব হতে পারে। অনশন-ধর্মঘটে ঐচ্ছিকভাবে খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে মোটামুটি ৪৫-৬১ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকার নজির পাওয়া যায়। ২০১৮ সালে একটি গবেষণায় দেখা যায়- ১৮.৫ বিএমআই মানের নিচের কোনো ব্যক্তি স্বাভাবিক বিএমআই-এর মানুষের চেয়ে প্রায় ৪ বছর পর্যন্ত কম বাঁচে। তাই ব্যক্তির ওজন, দৈহিক কাঠামো, বয়সের ন্যায় নিয়ামকগুলোও না খেয়ে বেঁচে থাকার সময়ে ঢের পার্থক্যের সৃষ্টি করে।
না খেয়েও কীভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়?
দিনের পর দিন না খেয়ে বেঁচে থাকা অনেকের কাছে এক বিস্ময়ের বিষয়। খাদ্যই আমাদের দৈহিক কার্যকলাপের চালিকাশক্তি। শর্করা জাতীয় খাবার হজমের পর তা গ্লুকোজে পরিণত হয়, যা দেহে শক্তির জোগান দেয়। প্রয়োজনমাফিক শক্তির জোগান দেওয়া শেষে অতিরিক্ত গ্লুকোজ যকৃতে গ্লাইকোজেন রূপে জমা থাকে। মোটামুটি ২৪ ঘণ্টার মতো না খেয়ে থাকার পর দেহের স্বাভাবিক কার্যকলাপে বিঘ্ন ঘটে। দেহে গ্লুকোজের সরবরাহ না থাকায় এক সময় যকৃতে জমা থাকা গ্লাইকোজেন ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়। এই গ্লুকোজই তাৎক্ষণিক শক্তির জোগান দেয়।

যকৃত গ্লুকোজ জমা রাখতে পারে যা প্রয়োজনের সময় শক্তির জোগান দেয়;
কিন্তু একসময় যকৃতের সঞ্চয়ও শেষ হয়ে যায়। এরপর দেহ চর্বি ভেঙে শক্তির চাহিদা মেটায়। এজন্য রোগা-পাতলা ব্যক্তির তুলনায় স্থূল ব্যক্তিরা না খেয়ে বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারেন! এভাবে প্রথম পাঁচ দিনে ব্যক্তির ১-২ কেজি ওজন কমে যায়। দেহে পানিশূন্যতা এই ওজন কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ।
এরপর শক্তির শেষ ভরসাস্থল হিসেবে দেহ মাংসপেশীর ক্ষয় করতে শুরু করে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ না খেয়ে থাকার পর প্রত্যেক দিন ব্যক্তির প্রায় ৩০০ গ্রাম করে ওজন কমতে থাকে। এভাবে ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের চরম ঘাটতি একপর্যায়ে ব্যক্তির মৃত্যু ঘনিয়ে আনে।

দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকলে দেহে কী কী সমস্যা হয়?
দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার ফলে ধীরে ধীরে দেহের স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে। রাজ্যের অবসাদ আর ক্লান্তি ভর করে বসে দেহে। হৃৎপিণ্ড চালু রাখার পর্যাপ্ত শক্তিও থাকে না আর। রক্তচাপ ও নাড়ির গতিও তাই কমে যায়। পাকস্থলীতে খাদ্যের অভাব বমি বমি ভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহসহ নানা জটিলতার সৃষ্টি করে।

সংক্ষেপে দেখুনদীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার প্রভাব
শুষ্ক ত্বক, চুল পড়া, অস্থি ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া কিংবা মেয়েদের অনিয়মিত ঋতুস্রাব হওয়ার মতো হরমোনঘটিত সমস্যাও দেখা যায়। প্রয়োজনীয় শক্তির অভাবে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্মেও যথেষ্ট ব্যাঘাত ঘটে।
গণিতের সর্বোচ্চ সম্মাননা পুরষ্কারের নাম কি?
পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত পুরষ্কারটির নাম, নোবেল পুরষ্কার। যার হাত ধরে এর প্রবর্তন, সেই আলফ্রেড নোবেল মূলত ডিনামাইট উদ্ভাবন করেছিলেন। অস্ত্র ও বিস্ফোরকের ব্যাবসা করে এক জীবনে অনেক অর্থ-বিত্ত করেছিলেন। কিন্তু ১৮৮৮ সালে এসে তিনি অনুধাবন করলেন, বড় এক ভুল হয়ে গেছে। সে সময় তার ভাই লুডভিগ নোবেলের মৃত্যুর খবরবিস্তারিত পড়ুন
পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত পুরষ্কারটির নাম, নোবেল পুরষ্কার। যার হাত ধরে এর প্রবর্তন, সেই আলফ্রেড নোবেল মূলত ডিনামাইট উদ্ভাবন করেছিলেন। অস্ত্র ও বিস্ফোরকের ব্যাবসা করে এক জীবনে অনেক অর্থ-বিত্ত করেছিলেন। কিন্তু ১৮৮৮ সালে এসে তিনি অনুধাবন করলেন, বড় এক ভুল হয়ে গেছে। সে সময় তার ভাই লুডভিগ নোবেলের মৃত্যুর খবর বড় করে ছাপিয়েছে পত্রিকাগুলো। সেই খবরে লুডভিগকে তারা আখ্যায়িত করেছে ‘মৃত্যু ব্যবসায়ী’ নামে। আলফ্রেড নোবেল ভাবলেন, তার নিজের মৃত্যুর পরেও এরকম শিরোনামই প্রকাশ করবে সংবাদপত্রগুলো। তাহলে, এই সমস্যা সমাধান করার উপায় কী?
নিজের সম্পত্তির ৯৪ শতাংশ তিনি লিখে দিয়ে গেলেন একটি পুরষ্কারের জন্য। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, শান্তি এবং সাহিত্যে অবদানের জন্য এই পুরষ্কার দেয়া হবে। একে কি প্রায়শ্চিত্ত বলা যায়? ভালো-খারাপে কাটাকাটি হয়ে যাওয়ার মতো কিছু?

নোবেল পুরস্কার
পরবর্তীতে, ১৯৬৮ সালে সুইডেনের সেন্ট্রাল ব্যাংক ও দ্য রিক্সব্যাংক নিজেদের ৩০০তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে নোবেল ফাউন্ডেশনকে বিশাল অংকের টাকা অনুদান দেয় অর্থনীতিতে আরেকটি পুরষ্কার দেয়ার জন্য। এটি মূলত নোবেল পুরষ্কার না, কারণ নোবেল নিজে এটি চালু করে যাননি, তারপরও এই পুরষ্কারটিকেও নোবেল পুরষ্কার বলেই গণ্য করা হয়।
পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান- সবই নোবেল পুরষ্কারের আওতায় এসেছে, কিন্তু বাদ পড়ে গেছে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র- গণিত। অথচ গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের ভাষা। পুরষ্কার না পেলেও গণিতবিদরা কিন্তু তাদের কাজ থামিয়ে দেননি। বিজ্ঞানীরা নিজেদের কাজের স্বীকৃতি অবশ্যই চান। কিন্তু তারা সাধারণত স্বীকৃতির জন্যে কোনো কাজ করেন না।
বিজ্ঞানীদের কাজের মূল্য পরিশোধ করা কিংবা তাদের ঋণ শোধ করা তো আসলে সম্ভব নয়। যেটুকু করা যায়, তাতে তাদেরকে কিছুটা স্বীকৃতি দেওয়া হয় মাত্র। আর সেই স্বীকৃতি বিজ্ঞানের সব শাখার মানুষ পাবেন, আর গণিতজ্ঞরা পাবেন না, এটা কেমন কথা? এসব ভেবে নরওয়ে সরকার ২০০২ সালে একটি নতুন পুরষ্কারের প্রচলন করে। গণিতজ্ঞ নিলস হেনরিক অ্যাবেলের নামে এর নাম দেওয়া হয় অ্যাবেল পুরষ্কার।
কেউ কেউ ভাবেন, নোবেলের নামের সঙ্গে মিল রেখে এই বিজ্ঞানীর নামকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তবে এ কথার পেছনে কোনো সত্যতা আছে বলে মনে হয় না। এ নিয়ে ঐতিহাসিক কোনো প্রমাণও পাওয়া যায় না। তবে কথা হলো, কে এই নিলস হেনরিক অ্যাবেল? যার নামে তাবৎ গণিতজ্ঞদের সম্মানিত করা হচ্ছে?

নিলস হেনরিক অ্যাবেল
নিলস হেনরিক অ্যাবেল একজন নরওয়েজিয়ান গণিতজ্ঞ। তার জন্ম ১৮০২ সালের ৫ই আগস্ট। আধুনিক গণিতের একাধিক শাখায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছেন তিনি।
বাবা ছিলন দরিদ্র লুথারিয়ান পাদ্রী। দক্ষিণ নরওয়ের এক শহরে থাকতেন তারা। ১৮১৫ সালে অসলোর ক্যাথেড্রাল স্কুলে পড়াশোনা শুরু। ২ বছর পরে নতুন এক গণিত শিক্ষক যোগ দিলেন সেই স্কুলে। বার্ন্ট মিখায়েল হোমবো। তিনিই প্রথম অ্যাবেলের গণিত প্রতিভা চিনতে পেরেছিলেন। গণিতের ক্লাসিক সব বইপত্র, সমস্যা ইত্যাদির সঙ্গে অ্যাবেলকে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি। নিউটন, অয়লার থেকে গাউস- সবার কাজ নিয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা করেছেন অ্যাবেল। তারপর শুরু করেছেন নিজস্ব গবেষণা।
একসময় বাবা মারা গেলেন। পরিবার পড়ল অকুল পাথারে। সব মানুষের জীবনেই এমন কিছু মানুষ থাকে, যারা সব ভুলে এগিয়ে আসে বিপদের দিনে। এই মানুষগুলোর কথা কখনো জানা যায়, কখনো তারা হারিয়ে যান ইতিহাসের আড়ালে। অ্যাবেলের জীবনে সেই ভূমিকায় এগিয়ে এলেন শিক্ষক হোমবো। নিজে যেমন সরাসরি আর্থিকভাবে সাহায্য করলেন, তেমনি কিছুটা ফান্ড সংগ্রহ করে দিলেন অ্যাবেলের জন্য। সেই টাকা দিয়ে অ্যাবেল, অসলোর ইউনিভার্সিটি অব ক্রিশ্চিয়ানায় ভর্তি হলেন ১৮২১ সালে। ১৮২২ সালে পেলেন প্রিলিমিনারি ডিগ্রি। তারপর হোমবোর সাহায্যে নিজের মতো করে চালিয়ে গেলেন পড়াশোনা এবং গবেষণার কাজ।



অ্যাবেলের স্মরণে ডাকটিকেট
ফাংশনাল ইকুয়েশন এবং ইন্টিগ্রাল নিয়ে অ্যাবেলের প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় ১৮২৩ সালে। অর্থাভাবে ভুগছেন তখন তীব্রভাবে। তার বন্ধুবান্ধব নরওয়েজিয়ান সরকারের কাছে আবেদন করল, অ্যাবেলকে যেন জার্মানি বা ফ্রান্সে একটা ফেলোশিপের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। কিন্তু সেই আবেদনের উত্তর আসতে যে দেরী হবে, সেটা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। এদিকে, একটা গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক সমস্যা (দ্য জেনারেল ইকুয়েশন অব ফিফথ ডিগ্রি) যে বীজগাণিতিকভাবে সমাধান করা কখনো সম্ভব হবে না, সেটা প্রমাণ করে ফেলেছেন। নিজের খরচে প্রকাশও করে ফেললেন সেটা। সে সময়ের বিখ্যাত গণিতবিদ কার্ল ফ্রেডরিখ গাউসের কাছে পাঠিয়ে দিলেন এই প্রমাণ। পৃথিবী বিখ্যাত এক অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যার যে সমাধান হয়ে গেছে, সেটা স্বচক্ষে দেখেও বুঝতে পারলেন না গাউস। বাতিল করে দিলেন। কিছুদিন পরে অবশ্য গণিতবিদরা বুঝতে পেরেছিলেন, অ্যাবেল কী করে বসে আছেন!
অ্যাবেলের হাতে লেখা ম্যানুস্ক্রিপ্ট
১৮২৬ সালে অ্যাবেল গেলেন প্যারিসে। উদ্দেশ্য, সেখানে নিজের একটা স্থায়ী গতি করা। সে সময় গণিত চর্চার কেন্দ্র ছিল প্যারিস। সব গণিতজ্ঞের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও পেয়ে গেলেন। থিওরি অফ ইন্টিগ্রালস অফ অ্যালজেবরিক ফাংশনের উপর বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা পেপার লিখে ফেললেন তিনি। ফলশ্রুতিতে তৈরি হলো অ্যাবেলের উপপাদ্য। এর উপরে ভিত্তি করে পরবর্তীতে অ্যাবেলিয়ান ইন্টিগ্রালস এবং অ্যাবেলিয়ান ফাংশনের তত্ত্ব তৈরি হয়। সহজ কথায় বলা যায়, গণিতের আস্ত একটা শাখাই তৈরি হয়েছে এই মানুষটির হাত ধরে। কিন্তু তাতে তার উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা করতে পারেননি নিজের জন্য।
এখানে শায়িত আছেন নিলস হেনরিক অ্যাবেল
কাজেই, ঋণের বিশাল বোঝা কাঁধে নিয়ে অ্যাবেল আবারো নরওয়েতে ফিরে আসলেন। ততদিনে শরীরে বাসা বেঁধেছে টিউবারকোলোসিস। একে সাথে নিয়েই কাজে নামলেন। ১৮২৮ সালে শিক্ষকতা শুরু করলেন ক্রিস্টিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
শরীর খারাপ কিংবা আর্থিক দৈন্যদশা কিছুই দমাতে পারেনি তাকে। ইকুয়েশন থিওরি এবং এলিপটিক ফাংশন নিয়ে প্রচুর কাজ করেছেন এ সময়, লিখেছেন বেশ কিছু পেপার। বিখ্যাত গণিতবিদ গুস্তাব জ্যাকোবির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এলিপটিক ফাংশন তত্ত্ব এগিয়ে নিয়ে গেছেন অনেকদূর। এই সময়ে এসে অ্যাবেলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। ফ্রেঞ্চ একাডেমির একদল বিজ্ঞানী তার জন্যে স্থায়ী একটা কিছু ব্যবস্থা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। এমনকি নরওয়ে-সুইডেনের তৎকালীন রাজার সঙ্গেও তারা কথা বলেছিলেন এ নিয়ে।
কিন্তু ততদিনে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন অ্যাবেল। এর কিছুদিনের মধ্যেই, ১৮২৮ সালে ইহকাল ত্যাগ করেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গণিতবিদদের একজন, নিলস হেনরিক অ্যাবেল।

অ্যাবেল পুরষ্কার স্মারক;
তার ১০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে, ১৯০২ সালে একটি পুরষ্কারের প্রচলন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন নরওয়েজিয়ান গণিতবিদ সোফাস লাই। কিন্তু ১৮৯৯ সালে লাই নিজেই পরলোকগত হন। ১৯০২ সালে রাজা দ্বিতীয় অস্কার আবারো এই পুরষ্কারের কথা বলেন। কিন্তু সুইডেন আর নরওয়ের আলাদা হয়ে যাওয়া, অর্থনীতির উপরে এর প্রভাব ইত্যাদি মিলে সেবারও আর করা হয়ে উঠেনি।
তবে অ্যাবেলের কথা পুরো সময়টুকুতে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। তাবৎ গণিতজ্ঞরা তাকে সম্মানের চোখে দেখে এসেছেন সবসময়ই। সেজন্যেই ২০০২ সালে আবার যখন অ্যাবেল পুরষ্কারের কথা উঠল, ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথমেটিকাল ইউনিয়ন এবং সে সময়ের সব গণিতবিদই একে শতভাগ সমর্থন দিয়েছিলেন। এর অর্থমূল্য নির্ধারণ করা হলো ১ মিলিয়ন ডলার। গণিতের সবচেয়ে বড় পুরষ্কার হিসেবেও একে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হলেও গণিতে যেহেতু দেওয়া হয় না, সেজন্যে মানুষ একে গণিতের নোবেল নামে ডাকা শুরু করে। তবে, দুটো পুরষ্কারের মধ্যে বাস্তবে কোনো সম্পর্ক নেই।


স্যার মাইকেল আতিয়াহ
২০০৩ সালে বীজগাণিতিক টপোলজি নিয়ে কাজের জন্য প্রথম অ্যাবেল পুরষ্কার পান জিন-পিয়েরে সেরে। পরের বছর একুশ শতকের বিখ্যাত গণিতজ্ঞ স্যার মাইকেল আতিয়াহ টপোলজির জন্য এই পুরষ্কার পেয়েছেন। ফি বছর গণিতের শ্রেষ্ঠ কাজের জন্য এই পুরষ্কার দেয়া হয়।
ক্যারেন উলেনবেক
২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো একজন নারী এই পুরষ্কার পেয়েছেন। তার নাম, ক্যারেন উলেনবেক। জ্যামিতিক পার্শিয়াল ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন, গজ তত্ত্ব এবং ইন্টিগ্রাল সিস্টেমস-এ গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্যই পুরষ্কার পেয়েছেন তিনি।
নোবেল যেখানে ‘মৃত্যুর বণিক’ কুখ্যাতি এড়ানোর জন্যে নোবেল পুরষ্কারের প্রচলন করছেন, সেখানে অ্যাবেল ছিলেন একজন সত্যিকারের গণিতবিদ। যিনি জীবদ্দশায় খুব বেশি কিছুর আশায় হিসেব কষেননি। কাজ করেছেন গণিতকে ভালোবাসতেন বলে, গণিতকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন বলে। এখনও, গণিতবিদরা নোবেল পুরষ্কারের মতো বিখ্যাত কিছুতে ভূষিত হওয়ার সুযোগ পান না। তাদের নাম ঘুরে ফেরে না মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু তারা নিজেদের কাজ করে যান চুপচাপ।
আর এই নিঃস্বার্থ মানুষগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় তাদেরই মতো আরেকজন চমৎকার গণিতজ্ঞের স্মরণে। যথার্থ স্বীকৃতি বোধ হয় একেই বলে।
সংক্ষেপে দেখুনএসআই একক কি?
পরিমাপ করতে পারার ক্ষমতা এবং সেজন্য একক নির্ধারণ করা মানব জাতির ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। বিশেষ করে বর্তমান যে বিজ্ঞান, এই বিজ্ঞানের একটি প্রধান ভিত্তি হলো পরিমাপ। এর শুরুটা হয়েছিল মূলত গ্যালিলিওর হাত ধরে। তার আগে বিজ্ঞানী শব্দটা সেভাবে ব্যবহৃত হত না। জ্ঞানীরা নিজেদেরকে বলতেন দার্শনিক (Nবিস্তারিত পড়ুন
পরিমাপ করতে পারার ক্ষমতা এবং সেজন্য একক নির্ধারণ করা মানব জাতির ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। বিশেষ করে বর্তমান যে বিজ্ঞান, এই বিজ্ঞানের একটি প্রধান ভিত্তি হলো পরিমাপ। এর শুরুটা হয়েছিল মূলত গ্যালিলিওর হাত ধরে। তার আগে বিজ্ঞানী শব্দটা সেভাবে ব্যবহৃত হত না। জ্ঞানীরা নিজেদেরকে বলতেন দার্শনিক (Natural Philosopher) । গ্যালিলিওই প্রথম নিজেকে বিজ্ঞানী বলে পরিচয় দেন। ‘বিজ্ঞানী’র কাজ কী, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন,
এ সময় থেকেই বিজ্ঞানে পরিমাপ জিনিসটি আবশ্যক হিসেবে জায়গা করে নেয়। তারই সূত্র ধরে একসময় পরিমাপ করার জন্য কিছু আদর্শ মান নির্ধারণ করা হয়। এই আদর্শ মানগুলোই হচ্ছে একক । পরিমাপের অনেকগুলো পদ্ধতি থাকলেও এসআই (SI) পদ্ধতি জায়গা করে নিয়েছে কেন্দ্রে।

সাতটি মৌলিক একক আছে এসআই পদ্ধতিতে
SI কথাটির পূর্ণরূপ হচ্ছে The International System of Units। এ পদ্ধতিতে মৌলিক একক হলো সাতটি।
কথা হলো, এককগুলোকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার কারণ কী?
দেখা গেছে, বর্তমানে এককগুলোকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা আছে, এরা নিজেরাই পরিবর্তনশীল। যারা নিজেরাই সুনির্দিষ্ট নয়, তাদেরকে কোনো কিছুর আদর্শ মান হিসেবে ব্যবহার করাটা অযৌক্তিক না? কাজেই, সাতটি মৌলিক একককেই প্রাকৃতিক কোনো ধ্রুবকের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রাকৃতিক ধ্রুবকেরা আমাদের জানা সবচেয়ে স্থির সংখ্যা, এদেরকে কখনো কোনোভাবেই পরিবর্তিত হতে দেখা যায়নি। যেমন, আলোর বেগ (c), আভোগ্যাড্রো সংখ্যা (NA) কিংবা প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক (h)। একবার এভাবে সংজ্ঞায়িত করে ফেলার অর্থ, এখন থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে, আর কখনো এদের মধ্যে বিন্দুমাত্র পরিবর্তনও হবে না।
দৈনন্দিন জীবনে এর কোনো প্রভাব আসলে সেভাবে টের পাওয়া যাবে না। তবে এই জিনিসগুলোর নিখুঁত মান থাকাটা আমাদের পরিমাপ পদ্ধতির জন্য আবশ্যক। কারণ, এককের সংজ্ঞা দেয়ার জিনিসটিই যদি অস্থিতিশীল হয়, তাহলে পুরো ব্যাপারটিই অযৌক্তিক হয়ে পড়ে।

কিলোগ্রাম
উদহারণ হিসেবে কিলোগ্রামের বিষয়টিই দেখা যাক।
আগে কিলোগ্রামের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছিল একখণ্ড প্লাটিনাম-ইরিডিয়ামের সঙ্কর ধাতুর টুকরো দিয়ে। এই টুকরোটা প্যারিসের কাছাকাছি একটি জায়গায় আলাদা করে ভ্যাকুয়ামের মাঝে সংরক্ষণ করে রাখা আছে। যেহেতু ভ্যাকুয়ামে বায়ু বা আর কিছু থাকে না, তাই এই খন্ডটির ভর এমনিতে পরিবর্তিত হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে, নির্দিষ্ট সময় পর এরও কিছুটা পরিবর্তন হয়। হিসেবানুযায়ী, কিছুদিন পরেই এর ভর প্রতি ১০০ কোটিতে ১০টি পরমাণু করে বেড়ে যাবে।

সময়ের সাথে বেড়ে বা কমে গেছে অফিসিয়াল কপিগুলোর ভর
এখনো যদিও সেই খন্ডটির ভরের কোনো পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু খন্ডটির বেশ কিছু অফিসিয়াল কপি বানিয়ে কয়েকটি দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। যেহেতু যেকোনো বস্তুই সময়ের সাথে সাথে পরমাণু হারায় কিংবা বাতাসের সংস্পর্ষের কারণে অণু শোষণ করে, তাই অফিসিয়াল কপিগুলোকে বেশ কিছুদিন পরে মূল খন্ডটির সাথে তুলনা করে দেখা গেছে, এদের ভর সামান্য হলেও বেড়ে গেছে, কিংবা কমে গেছে। কিছু কিছু কপির ক্ষেত্রে এক শতকের মাঝে ৫০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত বেড়ে যেতে দেখা গেছে হিসেবে। সেজন্যই, এভাবে সংজ্ঞায়িত করাটা ঠিক মনে হচ্ছে না বিজ্ঞানীদের কাছে। বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, সে উদার এবং উন্মুক্ত। ভুল হলে সেটা মেনে নিয়ে সংশোধন করে, তারপর সামনে এগোয়। সেজন্যেই বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এখন থেকে কিলোগ্রামের নতুন সংজ্ঞা দেয়া হবে প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবকের উপর ভিত্তি করে।
প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবকের মান হলো ৬.৬২৬০৭০ x ১০-৩৪ জুল-সেকেন্ড। জুল-সেকেন্ড এককের সমমানের একক হলো কেজি-মিটার২-সেকেন্ড-১। তাই সংখ্যাটিকে ৬.৬২৬০৭০ x ১০-৩৪ কেজি-মিটার২-সেকেন্ড-১ বলা যেতে পারে। সেই হিসেবে কিলোগ্রামের নতুন সংজ্ঞা হবে-
ফলে, পঞ্চাশ হাজার বছর পরেও আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারবো, কিলোগ্রাম মানেই এটুকুই।
বলে রাখা ভালো, সাতটি এককের মানই কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে না। কিলোগ্রামের মতোই অ্যাম্পিয়ার, মোল এবং কেলভিন- এই চারটি এককের সংজ্ঞাই কেবল নতুন করে দেয়া হচ্ছে।

অ্যাম্পিয়ার
অ্যাম্পিয়ারের সংজ্ঞা দেয়া হবে বৈদ্যুতিক চার্জের উপরে ভিত্তি করে।
মোলের উদাহরণটি বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত এবং যৌক্তিক মনে হবে। মোল বলতে বোঝানো হয় পদার্থের পরিমাণ। তা অণু, পরমাণু, ইলেকট্রন, আয়ন কিংবা আধান- যেকোনো কিছুই হতে পারে। আগের হিসেবে মোলের সংজ্ঞা ছিল এমন-
সংজ্ঞা এটা হলেও মোল বলতে আসলে যে কী বোঝায় তা এ সংজ্ঞা থেকে বোঝা যেত না। সেটা বোঝা যেত অ্যাভোগ্যাড্রো সংখ্যা থেকে। বিজ্ঞানী অ্যাভোগ্যাড্রো একটি পরীক্ষা করে প্রমাণ করেছিলেন, প্রতি মোলে যেকোনো কিছুর ৬.০২২ ১৪০৭৬ x ১০২৩ সংখ্যক কণা থাকে। সংখ্যাটিকে সহজ করে বলা হয় ৬.০২ x ১০২৩।

মোল
দুই ধরনের কথাবার্তা শিক্ষার্থীদেরকে বেশ ধাঁধাঁয় ফেলে দিত সবসময়ই। এখন পুরো ব্যাপারটাকে সহজ করে ফেলা হচ্ছে। সরাসরি মোলের সংজ্ঞাতেই বলা হচ্ছে:
অর্থাৎ, ৪টায় যেমন ১ হালি, ১২ টায় ১ ডজন, তেমনি ৬.০২ x ১০২৩টায় ১ মোল। কী দারুণ না!
একইরকম সহজ এবং চমৎকার একটি সংজ্ঞা দেয়া হচ্ছে তাপমাত্রার একক কেলভিনকে। আগে কেলভিনের সংজ্ঞা দেয়া হতো পানির ত্রৈধ বিন্দুর উপরে ভিত্তি করে। যে তাপমাত্রায় পানি একইসাথে কঠিন, তরল ও বায়বীয় অবস্থায় থাকে, সেই তাপমাত্রাই হলো ত্রৈধ বিন্দু। এই হিসেবে-
এই জিনিসটি পরিবর্তন করা হচ্ছে কেন? প্রথমত, দু’শো বছর আগে ঠিক করে রাখা এই তাপমাত্রা থেকে পানির ত্রৈধ বিন্দু অল্প কিছুটা সরে এসেছে (এবং এটাই স্বাভাবিক!)। দ্বিতীয়ত, পানির এই সংজ্ঞাটি দিয়ে অন্য কোনো পদার্থের পরমাণুগুলোর ঐ নির্দিষ্ট অবস্থা বা তাপমাত্রায় শক্তির পরিমাণ বা অবস্থা তো সেভাবে বোঝা যায় না। কাজেই, এমন একটি ধ্রুবককে এক্ষেত্রে ব্যবহার করার কথা চিন্তা করা হয়েছে, যেটি থেকে এই ব্যাপারগুলো সহজে বোঝাও যাবে, এবং সংখ্যাটিও হবে নিখুঁত। শক্তির পরিমাণটা বোঝা যাওয়াটা এত জরুরি কেন? কারণ, তাপমাত্রা শক্তির অনেকগুলো রূপের একটি!

কেলভিন
ধ্রুবকটির সাথে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীরাও দারুণভাবে পরিচিত- বোল্টজম্যান ধ্রুবক। এর মান ১.৩৮০৬ x ১০-২৩ জুল/কেলভিন। এই হিসেবে বর্তমান সংজ্ঞাটি হবে-
কথাটি থেকে সরাসরি বোঝাই যাচ্ছে, তাপের পরিবর্তন বা শক্তির পরিবর্তনের ফলেই তাপমাত্রার পরিবর্তন হচ্ছে। এবং এই পরিবর্তনেরই একটি মানকে ধরে নেয়া হচ্ছে আদর্শ!
ব্যাপারগুলো একইসাথে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য পরিমাপের কাজকর্ম যেমন দারুণ সহজ করে দেবে, তেমনি হিসেবটাও হবে নিখুঁত।
সময়ের একক সেকেন্ড, দৈর্ঘ্যের একক মিটার এবং আলোর উজ্জ্বলতার একক ক্যান্ডেলা অবশ্য আগের মতোই আছে। এরা আগে থেকেই যথেষ্ট নিখুঁত এবং সহজে অনুভব করা যায় প্রতিদিনের ব্যবহারে। সেজন্যেই এগুলোকে আর পরিবর্তন করা হয়নি।
এসআই একক ব্যবস্থা মানব সভ্যতার জন্যেই বিশাল এক অর্জন। নতুন এই পরিবর্তন এদেরকে নিখুঁত যেমন করবে, তেমনি এদের সার্বজনীনতাও বাড়াবে। বিশেষ করে, ব্যাপারগুলো অনুভব করাটা সহজ হয়ে যাবে সবার জন্যই।
এবং এখন থেকে, শুধু পৃথিবীতেই নয়, মহাবিশ্বের যেকোনো মাথায় বসেই যে কেউ প্রতিটি একককে ব্যবহার করতে পারবে পরম নির্ভরতায়।
মশাবাহিত কতগুলো রোগ রয়েছে?
মশা! ক্ষুদ্র এই প্রাণীটির অত্যাচারে প্রায়ই অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে আমাদের জীবন। চলমান ডেঙ্গুর প্রকোপে মশার দিকেই প্রধানত আঙুল তোলা যায়, কারণ রোগের ভাইরাস ছোট্ট এই পতঙ্গের মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। তবে কেবল ডেঙ্গু নয়, আরো বেশ কিছু রোগের ভাইরাস বহন করে থাকে মশা, যার মধ্যে আছে চিকুনগুনিয়া (Chikungunবিস্তারিত পড়ুন
মশা! ক্ষুদ্র এই প্রাণীটির অত্যাচারে প্রায়ই অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে আমাদের জীবন। চলমান ডেঙ্গুর প্রকোপে মশার দিকেই প্রধানত আঙুল তোলা যায়, কারণ রোগের ভাইরাস ছোট্ট এই পতঙ্গের মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। তবে কেবল ডেঙ্গু নয়, আরো বেশ কিছু রোগের ভাইরাস বহন করে থাকে মশা, যার মধ্যে আছে চিকুনগুনিয়া (Chikungunya ), ম্যালেরিয়া, এনকেফালাইটিস, ফাইলেরিয়াসিস, জিকা ইত্যাদি।
মশার তিনটি প্রজাতি এসব রোগের ভেক্টর, বা জীবাণুর বাহক হিসেবে কাজ করে। এগুলো হচ্ছে কিউলেক্স, এডিস আর অ্যানোফিলিস। কিউলেক্স তো আমাদের ঘরবাড়ির স্থায়ী বাসিন্দাই হয়ে গেছে বলা যায়, এডিস সেখানে মৌসুমি অতিথি। অ্যানোফিলিস আবার একটু ঘরকুণো, পার্বত্য অঞ্চলেই থাকে বেশি।

তিন প্রজাতির মশা;
চিকুনগুনিয়া
একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ভারত উপমহাদেশে অন্তত ১১ বার চিকুনগুনিয়ার ব্যাপক প্রকোপ লক্ষ্য করা গিয়েছে। ২০০৮ আর ২০১১ সালে বাংলাদেশে ছোট আকারে দেখা দিয়েছিল এই অসুখ, আর ২০১৭ সালে তো পরিণত হয়েছিলো অনেকটা মহামারীতে। এরপর থেকে প্রতি বছরেই গরমের সময় চিকুনগুনিয়া হয়ে আসছে।
এর কারণ একই নামের ভাইরাস (chikungunya virus /CHIKV)। নারী এডিস মশা এই জীবাণু বহন করে, রক্তপানের সময় মানবশরীরে প্রবেশ করিয়ে দেয় ভাইরাস। সাধারণত উচ্চমাত্রার জ্বর, শরীরে ফোস্কা আর অস্থিসন্ধিতে ব্যথা (joint pain) এই রোগের অন্যতম লক্ষণ, যা কিনা ডেঙ্গুর সাথেও অনেকাংশে মিলে যায়। চিকুনগুনিয়ার জন্য অস্থিসন্ধিতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়ে দৈনন্দিন কাজকর্ম পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এবং রোগ ভালো হয়ে গেলেও সামান্য ব্যথা থেকে যেতে পারে বছরখানেক।

চিকুনগুনিয়া ভাইরাস
চিকুনগুনিয়া সাধারণত মারাত্মক কিছু নয় এবং এমনিতেই সেরে যায়। তবে স্বল্পসংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে স্নায়ু, হৃদযন্ত্র, লিভার, এমনকি শ্বাসতন্ত্রে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এই ভাইরাস শরীরে ঢুকলে বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়া অথবা ভ্রুনের সংক্রমণ ইত্যাদি সমস্যা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে।
ডেঙ্গু
মশাবাহিত আরেক রোগ ডেঙ্গু, যা কিনা ডেঙ্গু ভাইরাস দিয়ে ঘটে থাকে। চিকুনগুনিয়ার মতো এখানেও বাহক সেই নারী এডিস মশা। মূলত ২০০০ সালের পর থেকে ডেঙ্গু আমাদের দেশে বড় একটা স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে, তবে প্রথম রোগী কিন্তু শনাক্ত হয় ষাটের দশকে। তখন একে বলা হতো ঢাকা’র জ্বর (Dacca fever)। বর্তমানে প্রতি বছরই মহামারী আকারে ডেঙ্গু দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশকে ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের মতে, জনসংখ্যার অন্তত ৫২% লোক এই ভাইরাসের ঝুঁকিতে আছে।’

ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়ার লক্ষণ অনেক সময় একইরকম মনে হতে পারে
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে প্রায় ১০৩-১০৪° ফারেনহাইট জ্বর, শরীর ব্যথা, হাড়গোড়ে আর মাংসপেশীতে ব্যথা, শরীরে ফোস্কা ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। সাধারণত ২-৭ দিনের মধ্যে রোগী ভালো হয়ে যায়। তবে কিছু কিছু লক্ষণ থাকলে রোগীকে অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত, যেমন- প্রচণ্ড পেটব্যথা বা পেট ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, নাক-মুখ দিয়ে রক্ত পড়া, অবিরাম বমি হওয়া ইত্যাদি। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে তাই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
ম্যালেরিয়া
ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়ার আগে মানুষ মশাবাহিত রোগ বলতে বুঝতো ম্যালেরিয়াকেই। পরজীবী বা প্যারাসাইটজনিত এই রোগ ছড়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নারী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ের মাধ্যমে। আমাদের দেশে ভারত আর মায়ানমারের সীমান্তবর্তী ১৩টি জেলায় এই রোগ এন্ডেমিক (endemic)। এর মানে সারা বছরই ঐসব এলাকায় ম্যালেরিয়া দেখা যায়। ফলে কেউ সেখানে ঘুরতে যেতে চাইলে ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিয়ে যাবার উপর জোর দেয়া হয়।

বাংলাদেশের ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার সারা বছর দেখা যায়;
ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রেও রোগের সূচনা জ্বর দিয়ে, তবে এখানে ভয়াবহ রকম কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। সাথে থাকে মাথাব্যথা, মাংসপেশীতে ব্যথা আর ক্লান্তি। রোগীর রক্তশুন্যতা আর জন্ডিসও দেখা যেতে পারে। তবে ভয় পাবার কারণ নেই, কারণ ম্যালেরিয়ার খুব ভালো কিছু ওষুধ রয়েছে। রোগী কী ওষুধ খাবেন সেটা চিকিৎসক ঠিক করে দেবেন।
এনকেফালাইটিস
মস্তিষ্কের ইনফ্ল্যামেশনকে এনকেফালাইটিস বলা হয়। বেশ কিছু ভাইরাস থেকে এই রোগ হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে জাপানিজ এনকেফালাইটিস ভাইরাস বা জেই (Japanese encephalitis), এবং ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস। দুটোই ছড়ায় কিউলেক্স প্রজাতির মশা দিয়ে, যা কিনা তিন প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
এশিয়াতে জেই ভাইরাস ঘটিত এনকেফালাইটিসই বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে ব্যাপক আকারে গবেষণা না থাকলেও একেই মূল কালপ্রিট বলে ধরা হয় জীবাণুবাহক মশা কামড়ানোর ৫-১৫ দিনের মধ্যে রোগীর জ্বর, মাথাব্যথা, বমি এসব দেখা যায়। অনেকসময় ঘাড়ব্যথা বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি ইত্যাদিও হতে পারে। এনকেফালাইটিস মারাত্মক রোগ, সুতরাং রোগীকে অবশ্যই হাসপাতালে নিতে হবে।
জিকা
নারী এডিস কর্তৃক বাহিত আরেকটি ভাইরাস জিকা, যা থেকে উৎপত্তি হতে পারে রোগের। লক্ষণ অন্যান্য ভাইরাস জ্বরের মতোই, সাথে চোখ লাল হতে পারে। এক সপ্তাহ পর রোগী সাধারণত ভালো হয়ে যান।
গর্ভবতী মায়েদের জন্য জিকার সংক্রমণ অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে বাচ্চা জন্ম নিতে পারে নানারকম শারীরিক ত্রুটি নিয়ে, যাকে বলা হয় Congenital Zika Syndrome। অনেক সময় বাচ্চা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, অথবা প্রসব হয়ে যেতে পারে সময়ের অনেক আগেই (preterm birth)।

গর্ভবতী মহিলাদের জন্য জিকা সংক্রমণ মারাত্মক বিপদজনক
লিম্ফেটিক ফাইলেরিয়াসিস
একসময় ঢাকা শহরে দেখা মিলত এমন কিছু মানুষের যাদের হাত অথবা পা ছিল ভয়াবহভাবে ফোলা। এর কারণ লিম্ফেটিক ফাইলেরিয়াসিস নামে পরজীবীঘটিত একটি রোগ। কিউলেক্স, এডিস, অ্যানোফিলিস তিন প্রজাতির মশাই এদের বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে। লসিকা গ্রন্থির সংক্রমণ থেকে এই রোগের উৎপত্তি হয়। বাংলাদেশ একসময় লিম্ফেটিক ফাইলেরিয়াসিসের উচ্চ ঝুঁকিতে ছিল, তবে বিভিন্ন প্রতিরোধক ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত চিকিৎসায় এখন এই রোগ নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। সঠিক ওষুধ প্রয়োগে ভালো হয়ে উঠেছেন বহু লোক।

সংক্ষেপে দেখুনলিম্ফেটিক ফাইলেরিয়াসিস/এলিফ্যান্টিয়াসিস
মশা থেকে ছড়াতে পারে অনেক রকম অসুখ। সেজন্য বাড়িঘর পরিষ্কার রাখা দরকার, যাতে মশা বংশবৃদ্ধির সুযোগ না পায়। ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই হয়তো আমরা থাকতে পারবো সুস্থভাবে।
ট্যাক্সিডার্মি কি?
রুন আপনার আদরের পোষা প্রাণীটি মারা গেল। মৃত্যু প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম হলেও মন মানতে নারাজ। ভাবলেন কোনো উপায় কি নেই যার সাহায্যে প্রাণীটিকে সারাজীবন চোখের সামনে রেখে দেওয়া সম্ভব? আছে, এর নাম ট্যাক্সিডার্মি। মৃত প্রাণীর শরীরকে (প্রধাণত চামড়াকে) কেমিক্যাল ও ট্যানিংয়ের মাধ্যমে সংরক্ষণের প্রক্রিয়া ও তাকবিস্তারিত পড়ুন
রুন আপনার আদরের পোষা প্রাণীটি মারা গেল। মৃত্যু প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম হলেও মন মানতে নারাজ। ভাবলেন কোনো উপায় কি নেই যার সাহায্যে প্রাণীটিকে সারাজীবন চোখের সামনে রেখে দেওয়া সম্ভব? আছে, এর নাম ট্যাক্সিডার্মি। মৃত প্রাণীর শরীরকে (প্রধাণত চামড়াকে) কেমিক্যাল ও ট্যানিংয়ের মাধ্যমে সংরক্ষণের প্রক্রিয়া ও তাকে জীবন্তের ন্যায় দেখানোর উপায়কেই বলা হয় ট্যাক্সিডার্মি।
সাধারণত গবেষণা বা পাঠদানের উদ্দেশ্যে এটা করা হয়ে থাকে। ট্যাক্সিডার্মি শব্দের উৎপত্তি গ্রিক শব্দ ‘ট্যাক্সি’ ও ‘ডার্মা’ থেকে। ট্যাক্সি মানে সংরক্ষণ আর ডার্মা মানে চামড়া। তাহলে ট্যাক্সিডার্মির মানে দাঁড়ায় চামড়ার সংরক্ষণ। স্তন্যপয়ী, পাখি, মাছ, সরিসৃপ সহ অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর উপর ট্যাক্সিডার্মি প্রয়োগ করা হয়। এদের পাশাপাশি বড় আকৃ্তির কীট-পতঙ্গের উপরও প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।
জাদুঘরগুলোতে ট্যাক্সিডার্মিকৃত প্রাণীগুলো মূলত বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর তথ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত। তবে আজকাল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পোষা প্রাণীর স্মৃতি সংরক্ষণেও ব্যবহৃত হয় এ প্রক্রিয়া।
উৎপত্তি
সর্বপ্রথম ১৭৪৮ সালে ফ্রান্সের রিয়াউমুর পাখির দেহ সংরক্ষণের মাধ্যমে ট্যাক্সিডার্মির আবির্ভাব ঘটান। এরপর ১৯৫২ সালে এম. বি. স্টলাস ট্যাক্সিডার্মির আরো কিছু পদ্ধতি আবিস্কার করেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে ফ্রান্স, জার্মানি, ডেনমার্ক, ইংল্যান্ডসহ আরো কয়েকটি দেশের অগ্রদূতদের আবির্ভাব ঘটে। ঊনিশ শতকের শুরুতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রায় সব শহরেই চামড়ার ব্যাবসা শুরু হয়। সে সময় শিকারীরা তাদের শিকার করা পশুপাখি গৃহসজ্জাসামগ্রীর দোকানগুলোতে দিয়ে আসতো। তারা সেগুলো চামড়া ছাড়িয়ে ভিতরে খড় ও তুলা দিয়ে ভরে সেলাই করতো।পরবর্তীতে সময়ের সাথে সাথে এতে বিভিন্ন কেমিক্যালের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।

ট্যাক্সিডার্মির শুরু মূলত ভিক্টোরিয়ান যুগ থেকেই
চর্মসংস্কার ও প্রাণীদেহ প্রস্তুতি
ট্যাক্সিডার্মিস্টরা বর্তমানে গড়ে বছরে ৬০০ মিলিয়ন ডলার আয় করছেন। ট্যাক্সিডার্মির প্রক্রিয়াগুলো যুগের সাথে সাথে আরো উন্নত ও আধুনিক হচ্ছে। শুরুতে মৃত পশুর চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হয় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়। এরপর চামড়ার মানের উপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল প্রয়োগ করা হয়। চামড়া ও লোমকে পোকামাকড় থেকে সুরক্ষিত রাখতে বোরাক্স পাউডার অথবা সোডিয়াম বোরাট ব্যবহৃত হয়।
পরবর্তীতে এটিকে কাঠ অথবা তার এর সাহায্য ম্যানিকুইন বানিয়ে রাখা হয়। এই ম্যানিকুইনকে বলা হয় Voodoo doll। চোখের আকৃ্তির জন্য সাধারণত চীনামাটি ব্যবহার করা হয়। সাধারণত ছোট আকৃতির প্রাণীর ট্যাক্সিডার্মি তৈরিতে ৩-৫ ঘণ্টা সময় লাগে। তুলনামূলক বড় আকৃতির প্রাণীর ক্ষেত্রে ৫-৭ দিন সময় লেগে যায়। ট্যাক্সিডার্মিস্টরা দক্ষতা ও অভিনবত্বের মাধ্যমে তাদের কাজকে আরো সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছেন।


স্কটল্যান্ডের কেল্ভিনগ্রোভ মিউজিয়ামে শিশুরা অবাক দৃষ্টিতে দেখছে ট্যাক্সিডার্মিকৃত প্রাণী;
ট্যাক্সিডার্মিস্টদের কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার ফলেই কাজগুলো নিখুঁত হয়
ট্যাক্সিডার্মির অতীত ও বর্তমান
ট্যাক্সিডার্মির স্বর্ণযুগ বলা হয় ভিক্টোরিয়ান যুগকে। তখন এমন জীবন্তের ন্যায় দেখানো প্রাণীগুলোকে অন্দরমহলের শোপিস হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যেত। পরবর্তীতে অবশ্য এসব ট্যাক্সিডার্মিগুলোকে অন্দরমহলে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং শুধুমাত্র গবেষণার কাজেই ব্যবহার করা হতো। ইংরেজি পক্ষীবিজ্ঞানী জন হ্যানককে আধুনিক ট্যাক্সিডার্মির জনক বলা হয়। তিনি নিজে পাখি শিকার করতেন এবং পরবর্তীতে সেগুলোকে কাদামাটি ও প্লাস্টারের সাহায্য আকৃতি দিতেন। তিনি ১৮৫১ সালে লন্ডনে এক এক্সিবিশনের আয়োজন করেন যেখানে নিজের হাতে তৈরি ট্যাক্সিডার্মি পাখি প্রদর্শিত করেন। স্বয়ং রানি ভিক্টোরিয়া সেগুলো দেখে অভিভূত হয়েছিলেন।

সংক্ষেপে দেখুনএকুশ শতকের তরুণরা অনেকেই ট্যাক্সিডার্মিকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন
বর্তমানে ট্যাক্সিডার্মির জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন দেশের তরুণেরা ট্যাক্সিডার্মিকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে। ট্যাক্সিডার্মিস্ট হতে গেলে আলাদা করে কোনো ডিগ্রী লাগে না তবে কিছু নিদিষ্ট ডিপ্লোমা ও কোর্স করতে হয়। এছাড়া যে স্টেট বা শহরে কাজ করতে আগ্রহী সেখানকার লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। মোটকথা ট্যাক্সিডার্মি হলো আর্ট ও বিজ্ঞানের এক অনন্য সংমিশ্রণ যা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীকুলের পরিচিতি ও তথ্য সম্পর্কে জানতে সাহায্য করছে।