সাইন আপ করুন
লগিন করুন
রিসেট পাসওয়ার্ড
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? আপনার ইমেইল এড্রেস দিন। ইমেইলের মাধ্যমে আপনি নতুন পাসওয়ার্ড তৈরির লিংক পেয়ে যাবেন।
আপনি কেন মনে করছেন এই প্রশ্নটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই উত্তরটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই ব্যক্তিকে রিপোর্ট করা উচিৎ?
অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার কি নোবেল পুরস্কার, নাকি ভিন্ন?
নোবেল পুরস্কারের ক্যাটাগরির প্রশ্নে আপনি নিঃসন্দেহে ছয়টি বিভাগের কথাই বলবেন হয়তো। তবে অর্থনীতিতে দেয়া পুরস্কার আদৌ নোবেল পুরস্কার কিনা- সেই ধারণা নিয়ে আছে দ্বিমত। কারণ আলফ্রেড নোবেল তার উইলে পাঁচটি বিষয়ে পুরস্কার রেখেছিলেন: রসায়ন, সাহিত্য, শান্তি, পদার্থবিদ্যা, এবং শারীরবিদ্যা বা ওষুধ। তার স্মৃতিতেবিস্তারিত পড়ুন
নোবেল পুরস্কারের ক্যাটাগরির প্রশ্নে আপনি নিঃসন্দেহে ছয়টি বিভাগের কথাই বলবেন হয়তো। তবে অর্থনীতিতে দেয়া পুরস্কার আদৌ নোবেল পুরস্কার কিনা- সেই ধারণা নিয়ে আছে দ্বিমত। কারণ আলফ্রেড নোবেল তার উইলে পাঁচটি বিষয়ে পুরস্কার রেখেছিলেন: রসায়ন, সাহিত্য, শান্তি, পদার্থবিদ্যা, এবং শারীরবিদ্যা বা ওষুধ। তার স্মৃতিতে অর্থনীতিতে পরবর্তীতে যে পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা চালু হয়, তা অপর পাঁচটির অনুরূপ কিনা এবং নতুন একটি বিষয় যুক্ত করার অন্তরালে ইতিহাস ও বিজয়ী নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সাজানো আজকের এই লেখা।
শুরুর ইতিহাস
আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুসারে ১৯০১ সাল থেকে নোবেল কমিটির আয়োজনে ধারাবাহিকভাবে পাঁচটি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। তবে অর্থনীতিকে নতুন কোনো বিষয় হিসেবে যুক্ত করার পেছনে নোবেল কমিটির ভূমিকা নেই। বরং এই পুরস্কারের পেছনে রয়েছে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকারের কোন্দল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সুইডিশ আর্থিক ব্যবস্থা সরকারের স্বল্প সুদের হার নীতি দ্বারা পরিচালিত হতো। কম সুদের হারের লক্ষ্য ছিল কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং নির্মাণকে উদ্দীপিত করা, যা ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। তখন সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বিশ্বের প্রাচীনতম কেন্দ্রীয় ব্যাংক, Sveriges Riksbank) সরাসরি নির্বাচিত সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল।


সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভারিয়াস রিকসব্যাংক
১৯৫৫ সালে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক প্রধানমন্ত্রী টেজ এরল্যান্ডার দ্বারা পার অ্যাসব্রিঙ্ক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিযুক্ত হন। প্রধানমন্ত্রী এরল্যান্ডারের আদেশের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হতে অ্যাসব্রিঙ্ক ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে সরকারের সাথে আলোচনা না করেই ঋণের ওপর সুদের হার ৪ থেকে ৫ এ উন্নীত করার মাধ্যমে ব্যাংকের স্বাধীনতা ঘোষণার চেষ্টা করেন। এটি ‘সুদের হার অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিতি পায়। এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে এবং ক্ষমতাসীন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির অনেক সদস্য রিকসব্যাংকের গভর্নর হিসেবে অ্যাসব্রিঙ্কের পদত্যাগ দাবি করেন। প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা দিয়ে শক্ত কিছু শর্তারোপ করলে সেবারের মতো অ্যাসব্রিঙ্ক পিছিয়ে যান।
রিকসব্যাংকের গভর্নর পার অ্যাসব্রিংক
তবে তিনি রিকসব্যাংকের স্বাধীনতার আরেকটি সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করেন— সরকারি বন্ড হোল্ডিংয়ের থেকে প্রাপ্ত আয়। সুইডিশ পার্লামেন্ট ব্যাংককে সমস্ত অর্থ কোষাগারে হস্তান্তরের জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। কিন্তু ব্যবসা ও ঋণ দেওয়ার জন্য অর্থের প্রয়োজন, এই কারণ দেখিয়ে অ্যাসব্রিঙ্ক তা ফেরত দিতে আপত্তি জানান। এছাড়া একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ফাউন্ডেশন স্থাপন এবং ১৯৬৮ সালে ব্যাংকের ৩০০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও তিনি অবগত করেন। তদুপরি, পার্লামেন্ট কিছু অর্থ ব্যাংকের নিকট গচ্ছিত রেখে বেশিরভাগ ফেরত নিয়ে নেয়।
এত অর্থ হস্তান্তর অ্যাসব্রিঙ্কের মোটেই পছন্দ হয়নি। তিনি ছিলেন পরিবর্তনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং অভ্যুত্থানে বিশ্বাসী একজন মানুষ। পার্লামেন্টের সাথে তার টানাপোড়েনের মধ্যেই ব্যাংকের ৩০০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘনিয়ে আসে। অর্থনীতিতে অসামান্য অবদানকারীদের বিশেষ সম্মাননা প্রদানে এই অর্থ ব্যবহার করা সম্ভব কিনা এ বিষয়ে তিনি তোড়জোড় শুরু করলেন। পাঠকের হয়তো বুঝতে বাকি নেই, রিকসব্যাংকের তদানীন্তন গভর্নর পার অ্যাসব্রিঙ্কই অর্থনীতিতে নোবেল সম্মাননা সৃষ্টির মূল কারিগর। সরকারের সাথে অ্যাসব্রিংকের কলহের ইতিহাস ‘দ্য নোবেল ফ্যাক্টর: দ্য প্রাইজ ইন ইকোনমিক্স, সোশ্যাল ডেমোক্রেসি এন্ড দ্য মার্কেট টার্ন‘ বই থেকে এসেছে, যা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাভনার অফার এবং উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাব্রিয়েল সোডারবার্গের লেখা।


সামাজিক গণতন্ত্র ক্রমশ বাজারব্যবস্থায় উদারনীতিতে রূপান্তরের ভূমিকা নিয়ে রচিত বই
অ্যাসব্রিঙ্কের মাথাতেই আলফ্রেড নোবেলের নাম যুক্ত করে অর্থনীতিতে পুরস্কারের ধারণা জন্ম নেয় এবং তিনি বিষয়টি একজন তরুণ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাসার লিন্ডবেকের কাছে ঘরোয়াভাবে উত্থাপন করেন। প্রস্তাব শোনার সঙ্গে সঙ্গে লিন্ডবেক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখান। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পেশ করেন। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সের সদস্যদের মধ্যে অর্থনীতিবিদরা এই ধারণা পছন্দ করলেও একাডেমির পদার্থবিদরা ঘোর আপত্তি জানান। অনেক বাদানুবাদ ও আলাপ-আলোচনার পর অবশেষে একাডেমির সভায় প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সসের কার্যালয়
পরবর্তীতে প্রস্তাবটি নোবেল ফাউন্ডেশনের কাছে উত্থাপন করা হলে বোর্ড সদস্যদের ধারণাটি পছন্দ হয়, বিশেষ করে যখন রিকসব্যাংক পুরস্কারের অর্থ হস্তান্তরের পাশাপাশি (যা ৮ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার, বা ৯,৩০,০০০ ডলার) একটি বার্ষিক ফি প্রদানের প্রস্তাব দেয়। আয়োজনের সর্বশেষ ধাপ ছিল ডিনামাইট নির্মাতা আলফ্রেড নোবেলের বয়োজ্যেষ্ঠ জীবিত বংশধরের সম্মতি গ্রহণ, এবং তিনি তা দিয়েছিলেন, পাশাপাশি জোর দিয়ে বলেছিলেন, পুরস্কারটিকে বলা হবে, ‘আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতিতে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানের পুরস্কার’।
১৯৬৯ সালে রাগনার ফ্রিশ এবং জ্যান টিনবার্গেনকে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে প্রথম পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কারের মতো একই নীতি অনুসারে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সস, স্টকহোম, সুইডেন দ্বারা অর্থনীতি বিজ্ঞানে পুরস্কার বিজয়ীদের নির্বাচন করা হয়। এই পুরস্কারের পুরো নাম ‘The Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel‘।
মনোনয়ন ও বাছাই প্রক্রিয়া
রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সের ইকোনমিক সায়েন্স প্রাইজ কমিটি অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে পুরস্কারের জন্য প্রার্থীদের নির্বাচন করে। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নাম এবং মনোনয়ন সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য পরবর্তী ৫০ বছর পর্যন্ত প্রকাশ করা হয় না। অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে পুরস্কারের জন্য তারাই প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন যারা যোগ্য ব্যক্তিদের দ্বারা মনোনীত এবং অর্থনৈতিক বিজ্ঞান পুরস্কার কমিটি থেকে বিবেচনার জন্য নাম জমা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছেন। কেউ নিজেকে মনোনয়ন দিতে পারে না। ইকোনমিক সায়েন্স প্রাইজ কমিটি এমন ব্যক্তিদের কাছে গোপনীয় ফর্ম পাঠায় যারা মনোনীত করার জন্য যোগ্য। যোগ্য মনোনয়নকারী সদস্যরা হলেন:
মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হতে পুরস্কার বিতরণী সময়কাল
মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হয় সেপ্টেম্বর মাসে মনোনয়ন ফর্ম পাঠানোর মাধ্যমে। ইকোনমিক সায়েন্সেস প্রাইজ কমিটি প্রায় তিন হাজার মনোনয়নকারীকে গোপনীয় ফর্ম পাঠায়। ফর্মগুলো পূরণ করে অবশ্যই পরের বছরের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে কমিটির কাছে জমা দিতে হবে। কমিটি ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৫০-৩০০ জন প্রার্থী বাছাই করে যাদের নাম একাধিক মনোনীতকারী জমা দেন। পরবর্তীতে ইকোনমিক সায়েন্সেস প্রাইজ কমিটি প্রাথমিকভাবে বাছাইকৃত প্রার্থীদের কাজের মূল্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়। এই পর্যন্ত আসতে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সময় লাগে।
জুন থেকে আগস্টের মধ্যে একাডেমিতে জমা দেওয়ার জন্য সুপারিশসহ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে কমিটির সকল সদস্যের স্বাক্ষর থাকে। সেপ্টেম্বরে কমিটি চূড়ান্ত প্রার্থীদের সুপারিশসহ প্রতিবেদন একাডেমির সদস্যদের কাছে জমা দেয়। একাডেমির অর্থনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের দুটি সভায় প্রতিবেদনটি নিয়ে আলোচনা হয়। অক্টোবরের শুরুতে, একাডেমি অব সায়েন্সেস সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে বিজয়ীদের নির্বাচন করা হয় এবং বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ ইকোনমিক সায়েন্স পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান স্টকহোমে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পুরস্কার বিজয়ীরা তাদের পুরস্কার পান, যার মধ্যে একটি নোবেল পুরস্কার পদক ও ডিপ্লোমা এবং পুরস্কারের পরিমাণ নিশ্চিত করে একটি ডকুমেন্ট থাকে।
ইকোনমিকস নোবেল আদতেই নোবেল?
আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুসারে ১৯০১ সাল থেকে যে পাঁচটি সুপ্রসিদ্ধ ও আকর্ষণীয় পুরস্কার দেয়া হয়, আর অর্থশাস্ত্রে প্রদত্ত এ পুরস্কার এক নয়। এর টাকাটাও ‘নোবেল’ ফাউন্ডেশনের মূল পুঁজি থেকে আসে না, আসে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া একটি বড় অনুদান থেকে। নোবেল ফাউন্ডেশন অনুষ্ঠান আয়োজন ও পুরস্কার প্রদানের দায়িত্বে থাকে। সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নামের সাথে নোবেল যুক্ত করে পুরস্কারকে অতিরিক্ত মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। এমনকি নোবেল ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে লেখা আছে:
অর্থনীতি নোবেল স্মারক পুরস্কার এবং নোবেল পুরস্কারের মেডেল ভিন্ন
অপর পাঁচটি পুরস্কারের মতো এ পুরস্কার সম্পর্কেও যাবতীয় তথ্য নোবেলপ্রাইজ ওয়েবসাইটে দেয়া হয়। অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে নোবেল মেমোরিয়াল মূল ধারার নোবেল প্রাইজের একই নীতি অনুসরণ করে প্রদান করা হয় বলে একে নোবেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সহজ ভাষায়, নোবেল ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত একই নীতিতে ভিন্ন একটি পুরস্কার। মিডিয়া ও অর্থনীতি পেশা একে নোবেল পুরস্কারের মর্যাদা দেয়। তবে নিয়মের নাম যা-ই হোক, সারা বিশ্বে এটি নোবেল পুরস্কার নামেই পরিচিত।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সুইডেনের আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক ঐক্যমতের সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল তার পরিধি ছিল অভ্যন্তরীণ, কিন্তু প্রভাব রেখেছিল বিশ্বব্যাপী। Sveriges Riksbank অবশেষে ১৯৯৯ সালে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং সারা বিশ্বে নীতি নির্ধারকদের ফোকাস বেকারত্বের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দিকে স্থানান্তরিত হয়, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।
পাইরেট ব্ল্যাকবিয়ার্ড কেনো বিখ্যাত?
হলিউডের ‘পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান’ মুভি কিংবা ইউবিসফটের অ্যাসাসিন্স ক্রিড গেইম সিরিজের সুবাদে ‘পাইরেট’ বা জলদস্যু তকমাটা বেশ খ্যাতি পেয়ে গিয়েছে। ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো অনেকেরই ‘প্রিয়’ জলদস্যু। কিন্তু ঐতিহাসিক দিক থেকে চিন্তা করলে দস্যুপনা আদৌ কখনো ‘প্রিয়’ খেতাব পাবার কথা না। তবে প্রিয়-অপ্রিয় যেবিস্তারিত পড়ুন
হলিউডের ‘পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান’ মুভি কিংবা ইউবিসফটের অ্যাসাসিন্স ক্রিড গেইম সিরিজের সুবাদে ‘পাইরেট’ বা জলদস্যু তকমাটা বেশ খ্যাতি পেয়ে গিয়েছে। ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো অনেকেরই ‘প্রিয়’ জলদস্যু। কিন্তু ঐতিহাসিক দিক থেকে চিন্তা করলে দস্যুপনা আদৌ কখনো ‘প্রিয়’ খেতাব পাবার কথা না। তবে প্রিয়-অপ্রিয় যেমনই হোক না কেন, ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত জলদস্যু ছিল ব্ল্যাকবিয়ার্ড। আজকের লেখা তাকে ঘিরেই।
অ্যাসাসিন্স ক্রিড গেইমে চিত্রায়িত দস্যু ব্ল্যাকবিয়ার্ড
কেউ জানে না তার জন্ম কবে। যখন তিনি মারা যান তখন তার বয়স ছিল ৩৫ থেকে ৪০ এর মাঝে। সে হিসেবে তার জন্ম হতে পারে ১৬৮০ সালের দিকে এবং সেটা ইংল্যান্ডে। তার আসল নাম এডওয়ার্ড টিচ কিংবা এডওয়ার্ড থ্যাচ। কিন্তু আসলেই কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না তার পারিবারিক নাম আসলে কী ছিল। কারণ দস্যুরা দস্যিপনা শুরু করবার সময় নাম পরিবর্তন করে ফেলত যেন পারিবারিক নামের হানি না হয়।
যারা অ্যাসাসিন্স ক্রিড গেইম সিরিজের সাথে পরিচিত, তারা হয়ত গেমটির ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ পর্ব খেলতে গিয়ে ব্ল্যাকবিয়ার্ডের দেখা পেয়েছেন। তারা হয়ত এটাও মনে রেখেছেন যে, সে সময় দাস ব্যবসা খুবই প্রকটভাবে চলছিল। ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে তখন খুব গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বন্দর, যেখান থেকে দাস ব্যবসা চালানো হত। সেখানেই বেড়ে ওঠেন এডওয়ার্ড।
অ্যাসাসিন্স ক্রিড গেইমের ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ পর্বের প্রচ্ছদে ব্ল্যাকবিয়ার্ড
ধারণা করা হয় তিনি খুব উচ্চ বংশ থেকেই এসেছেন, লেখাপড়াও জানতেন। তার মৃত্যুর সময় পকেটে তাকে উদ্দেশ্য করে চিফ জাস্টিস অ্যান্ড সেক্রেটারির লেখা চিঠি পাওয়া গিয়েছিল!
বড় হয়ে এডওয়ার্ড ব্রিস্টল ত্যাগ করেন, চলে যান ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দিকে, যোগদান করেন প্রাইভেটিয়ার হিসেবে। [প্রাইভেটিয়ার হলো সে সকল জাহাজ/জাহাজবাসী যারা শত্রু জাহাজ লুট করে।] তিনি এক ইংলিশ প্রাইভেটিয়ার জাহাজে (কুইন অ্যান’স ওয়ার) কিছুদিন কাজ করেন। তখন তার কাজ ছিল জামাইকা থেকে তরী ছাড়া আর স্প্যানিশ বা ফ্রেঞ্চ জাহাজের সাথে যুদ্ধ করা, যেহেতু সে সকল দেশ ছিল যুদ্ধরত ইংল্যান্ডের শত্রু। সমস্যা দেখা গেল তখনই যখন ১৭১৩ সালে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল এবং রাজা জর্জ প্রাইভেটিয়ারদের ফেরত আনলেন। তখন বেকার হয়ে পড়লেন এডওয়ার্ড।
তখন অনেক প্রাইভেটিয়ার পাইরেট বা জলদস্যু হয়ে গেল। তাদের সাথে এডওয়ার্ডও যোগ দিলেন। কাজ করতে লাগলেন জলদস্যু ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন হর্নিগোল্ডের অধীনে, জাহাজের নাম ছিল রেঞ্জার। এভাবে চার বছর দস্যিপনা করবার পর তিনি ১৭১৭ সালের সেপ্টেম্বরে পেলেন নিজের জাহাজ, ‘রিভেঞ্জ’। সে জাহাজে করে নিজেই ক্রু নিয়ে জাহাজ আক্রমণ করা শুরু করে দিলেন ক্যারোলাইনাস, ভার্জিনিয়া এবং ডেলাওয়ারে।
নভেম্বরের ২৮ তারিখ এডওয়ার্ড এক ফ্রেঞ্চ জাহাজ দখল করেন। নাম ছিল সেটার ‘লা কনকরদ দে নান্তে’- তার দেখা সবচেয়ে বড় জাহাজ, জৌলুশপূর্ণ। তিনি সেটা নিজের জাহাজ করে ফেললেন, নাম দিলেন “কুইন অ্যান’স রিভেঞ্জ”। এখনও পর্যন্ত সেই জাহাজ ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত জলদস্যু জাহাজ!
“কুইন অ্যান’স রিভেঞ্জ” জাহাজের বিস্তারিত অনুমিত চিত্র
এ জাহাজ চালানো শুরু করবার পর এডওয়ার্ড দাড়ি রাখতে লাগলেন, লম্বা কালো দাড়ি। সে থেকেই তার নাম হলো ব্ল্যাকবিয়ার্ড (“কালো দাড়ি”)।
তখনকার সময় জলদস্যুরা ব্যবহার করত জলি-রজার পতাকা, যেখানে থাকত খুলি আর হাড়ের ছবি। যেমনটা নিচে দেখা যাচ্ছেঃ
ক’দিন পর সেইন্ট থমাস দ্বীপের কাছে ব্রিটিশ রয়াল নেভির দানবীয় জাহাজ এইচএমএস সীফোর্ড-এর দেখা পেয়ে যায় ব্ল্যাকবিয়ার্ডের বাহিনী। তাদের সামনে ব্ল্যাকবিয়ার্ডের জাহাজে উড়িয়ে দেয়া হয় ব্রিটিশ পতাকা যেন কেউ সন্দেহ না করে। সত্যি বলতে, ব্রিটিশরা আদৌ ধরতে পারে নি যে এটা কুখ্যাত ব্ল্যাকবিয়ার্ডের জাহাজ (সাথে আরো ছোটোখাটো জাহাজও ছিল তার) এবং তাদের চলে যেতে দেয়। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে পড়ে কীভাবে ব্ল্যাকবিয়ার্ডের দল দানবীয় ব্রিটিশ জাহাজকেও কাবু করে ফেলেছে। এই মিথ্যে ঘটনা ব্ল্যাকবিয়ার্ডের যশ আরো বাড়িয়ে দেয়।
পরের কয়েক মাসে ব্ল্যাকবিয়ার্ড গোটা চল্লিশেক জাহাজ লুট করে নেন উত্তর আমেরিকার উপকূল আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ জুড়ে। যদি কোনো জাহাজ আত্মসমর্পণ করত, তাহলে তার ক্রুদের ছেড়ে দিতেন, কিন্তু বাধা দিলেই জাহাজসহ তাদের পুড়িয়ে ফেলতেন। তিনটি বড় জাহাজ নিয়ে তিনি কিউবা আর ফ্লোরিডার উপকূল চষে বেড়াতে লাগলেন।
১৭১৮ সালের মে মাসে সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লস্টন অবরোধ করেন তিনি। জিম্মি করেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নাগরিককে। তার দাবি ছিল অদ্ভুত- কিছু ওষুধ। ওষুধ আনতে তার প্রতিনিধিদের পাঠান তিনি, কিন্তু ওষুধ নিয়ে ফিরতে তাদের বহু দেরি হয়ে যায়। জিম্মিদের তিনি খুন প্রায় করেই ফেলেছিলেন, যখন শেষ মুহূর্তে ওষুধ এসে হাজির হয়। সে ওষুধ নিয়ে তিনি ফিরে যান। আর হ্যাঁ, জিম্মিদের তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন।
অদ্ভুত এক ব্যাপার হলো, ব্ল্যাকবিয়ার্ড নিজের জাহাজ আর ক্রুদের নিজেই ধ্বংস করতেন। এমনকি কুইন অ্যান’স রিভেঞ্জসহ তিনটি জাহাজ তিনি নিজেই ডুবিয়ে দেন, যেন তার সম্পদে তার ক্রুরা ভাগ বসাতে না আসে। নর্থ ক্যারোলাইনাতে এসে তিনি অবশেষে রাজকীয় ক্ষমা পান এবং সেখানের গভর্নরের উপস্থিতিতে ১৪তম বিবাহ করেন, যেখানে তার ১২ জন স্ত্রী তখনও জীবিত।
পরবর্তীতে ক্ষমার ধার ধারেন নি ব্ল্যাকবিয়ার্ড, তিনি ফিরে যান আবারও দস্যিপনায়। নিজের জাহাজ “অ্যাডভেঞ্চার”-এ করে লুট করতে লাগলেন সমুদ্র জুড়ে।
যখন যুদ্ধ শুরু হতো, তখন ব্ল্যাকবিয়ার্ড তার চুলের গোড়ায় ধীরে ধীরে নেভা আগুন জ্বালিয়ে দিতেন, তাকে দেখে মনে হত তার মাথায় আগুন জ্বলছে কিন্তু তার কিছুই হচ্ছে না- শত্রুরা এমনিতেই ভড়কে যেত যুদ্ধে নামার আগেই।
১৭১৮ সালের নভেম্বরে ভার্জিনিয়ার গভর্নর অ্যালেক্সান্ডার স্পটসউড তার মাথার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেন। লেফটেন্যান্ট রবার্ট মেয়নার্ড-এর নেতৃত্বে ২২ নভেম্বর এক নাটকীয় যুদ্ধে পরাস্ত হয় ব্ল্যাকবিয়ার্ডের বাহিনী। চাতুর্যের প্রয়োগে জয় হয় মেয়নার্ডের। মারা যায় ১২ জলদস্যু আর মেয়নার্ডের ৮ জন ক্রু।
ব্ল্যাকবিয়ার্ডের লাশ পরীক্ষা করে দেখা গেল তার দেহে পাঁচটি গুলি লেগেছিল আর বিশটির মতো তরবারির আঘাত। তার পকেটে পাওয়া গেল চিঠি। তার লাশ থেকে মাথা ছিন্ন করে ফেলা হয় এবং জাহাজের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয় প্রদর্শনের জন্য। বাকি দেহ ফেলে দেয়া হয় সাগরে। গুজব আছে, তার মাথাকাটা লাশ মেয়নার্ডের জাহাজের চারদিকে তিনবার প্রদক্ষিণ করে, এরপর ডুবে যায়। তারপর থেকে হাজারো কুসংস্কার চালু হয়ে যায় তাকে নিয়ে ক্যারিবীয় নাবিকদের মাঝে।
১৯৯৬ সালে নর্থ ক্যারোলাইনার আটলান্টিক বিচের নিকটে গভীর সমুদ্র থেকে ব্ল্যাকবিয়ার্ডের জাহাজ কুইন অ্যান’স রিভেঞ্জ-এর ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়। তবে তখনোও নিশ্চিত হওয়া যায়নি এটিই সে জাহাজ কিনা। নিশ্চিত হওয়া যায় অবশেষে ২০১১ সালে।
অসংখ্য সিনেমা কিংবা বই হয়েছে ব্ল্যাকবিয়ার্ডের ওপর, আর ইতিহাস রচনা তো হয়েছে বটেই। রবার্ট লুই স্টিভেনসনের বিখ্যাত ক্লাসিক “ট্রেজার আইল্যান্ড”-এও উপস্থিত ব্ল্যাকবিয়ার্ডের নাম। পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান আর অ্যাসাসিন্স ক্রিড-এর কথা তো আগেই বলা হয়ে গিয়েছে। এখনও তার নাম আর কুখ্যাতি রয়ে গেছে, এত শতাব্দী পরেও। আর সেই যে তার গুপ্তধনগুলো ব্ল্যাকবিয়ার্ড লুকিয়ে গেছেন কারো সাথে ভাগাভাগি করবেন না বলে, সেগুলোর খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। হয়ত কোনো একদিন দেখা মিলবে অজস্র সেই সম্পদের…
রঙ ও ডাই এর আবিষ্কার হয় কবে ?
লেখার শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে- রঙ আবার কে আবিষ্কার করতে পারে? পৃথিবীর প্রথম থেকেই তো নানা রকম রঙ ছিলো। প্রকৃতপক্ষে, আবিষ্কার শব্দের আভিধানিক অর্থ দুটি। একটির অর্থ যা পৃথিবীতে আগে ছিলো না, কোনো উদ্ভাবক সেটা তৈরি করেছেন। একে আবিষ্কারের থেকে উদ্ভাবন (Invention) বলাটাই ভালো হবে। অন্য একটি অর্থ হলো ‘Diবিস্তারিত পড়ুন
লেখার শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে- রঙ আবার কে আবিষ্কার করতে পারে? পৃথিবীর প্রথম থেকেই তো নানা রকম রঙ ছিলো। প্রকৃতপক্ষে, আবিষ্কার শব্দের আভিধানিক অর্থ দুটি। একটির অর্থ যা পৃথিবীতে আগে ছিলো না, কোনো উদ্ভাবক সেটা তৈরি করেছেন। একে আবিষ্কারের থেকে উদ্ভাবন (Invention) বলাটাই ভালো হবে। অন্য একটি অর্থ হলো ‘Discovery’, যা পৃথিবীতে আগে থেকেই ছিলো, কিন্তু ছিলো অজানা, কোনো এক আবিষ্কারক সেটা খুঁজে বের করেছেন। রঙ বা ডাই বা পিগমেন্ট যা-ই বলি না কেন, এদের আবিষ্কার মূলত এই দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। বাস্তবে আমরা রঙের অস্তিত্ব অনুভব করি তখনই যখন কোনো বস্তু সূর্যরশ্মির নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলিত করে।
ভৌতিক রঙ বা ডাই এর আবিষ্কার হচ্ছে মূলত সেসব বস্তুর আবিষ্কার, যেসব বস্তু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলনের মাধ্যমে আমাদের প্রিয় ও প্রয়োজনীয় বর্ণের প্রদর্শন করে। এসব রং বা ডাইয়ের ব্যবহার আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য, যেমন শার্ট-প্যান্ট, শাড়ি, লিপস্টিক থেকে শুরু করে খাবারদাবার, মাথার হেয়ার ডাই পর্যন্ত অনেক কিছুর সাথেই জড়িত আছে।
এতটুকু পড়ার পরেই আমাদের মনে এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে এই রঙ বা ডাই এর আবিষ্কার হলো কীভাবে? কে বা কারা এটা আবিষ্কার করলো? এখন আমরা সেসব নিয়েই জানবো।
রঙকে আমরা দুভাগে ভাগ করতে পারি; প্রথমত প্রাকৃতিক রঙ এবং দ্বিতীয়ত সিন্থেটিক রঙ। প্রাকৃতিক রঙ সাধারণত প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া যায়। এসব উৎসের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছের পাতা, ফুল, ফল, বাকল, শিকড়; বিভিন্ন ধরনের প্রাণী থেকে, যেমন- সামুদ্রিক ঝিনুক-শামুক; পোকামাকড় কিংবা খনিজ উৎস থেকে, যেমন- পাথর বা কোনো আকরিক প্রভৃতি। ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে এ দেশে যে নীলের চাষ হতো, সেটি এই প্রাকৃতিক রঙের মধ্যে পড়ে।


প্রাকৃতিক ডাই
অন্যদিকে সিন্থেটিক রঙ মূলত কোনো গবেষণাগারে রাসায়নিক বিক্রিয়ার দ্বারা তৈরি করা হয়।
সিন্থেটিক ডাই
প্রাকৃতিক রঙের উৎপত্তি
রাসায়নিকভাবে রঙ বা ডাই তৈরির পূর্বে প্রাকৃতিক উৎসই ছিলো ডাই এর প্রধান উৎস। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এসব প্রাকৃতিক উৎস থেকে রঙ আহরণ ও প্রস্তুত করতো। ঠিক কোন সময়ে এই প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার শুরু হয়েছে তা নিয়ে সঠিক কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। কারো কারো মতে, ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে প্রথম প্রাকৃতিক ডাই এর ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। আবার অন্যদিকে স্পেনের ‘এল কাস্টিলো’ (El Castillo) গুহার ভেতরে আবিষ্কৃত রঙিন গুহাচিত্র থেকে জানা যায় যে, প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে এসব গুহাচিত্র চিত্রিত হয়েছিলো। জর্জিয়া অঞ্চলে ফ্লাক্স ফাইবারে ব্যবহার করা ডাই থেকে জানা যায় যে, এটি প্রায় ৩৪,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রঙিন করা হয়েছিলো।


নীল গাছ এবং প্রাপ্ত নীল বা ইন্ডিগো ডাই
প্রাকৃতিক ডাই এর ক্ষেত্রে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে একেক ভৌগোলিক অঞ্চলে ব্যবহৃত ডাই মূলত সেই অঞ্চলের গাছপালা কিংবা প্রাণী-পোকামাকড় থেকে তৈরি করা হয়। যেমন- ইন্ডিগো (Indigo) বা নীল নামক রঙের উৎস হচ্ছে নীলগাছ (Indigofera), যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতবর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে ওক গাছের পোকা থেকে তৈরি করা হয় ক্রিমসন ডাই, ককিনিয়াল (Cochineal) নামক একপ্রকার পতঙ্গ থেকে পাওয়া যায় কারমিন (Carmine) নামক লাল পিগমেন্ট।
ক্যাকটাসের উপর ককিনিয়াল কলোনি এবং প্রাপ্ত কারমিন ডাই
প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত কয়েকটি ডাই এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে,
ইন্ডিগো বা নীল – যা নীলগাছ থেকে পাওয়া যায় এবং নীল বর্ণ ধারণ করে। একে সবচেয়ে প্রাচীন ও বহুল ব্যবহৃত রং হিসেবে ধরা হয়।
অ্যালিজারিন (Alizarin) – অ্যালিজারিন মূলত ম্যাডার (Madder) নামক লতাবিশেষ গাছ থেকে প্রস্তুত করা লাল ডাই। এই লাল ডাই আবার ক্রেমিস বা ককিনিয়াল নামক পতঙ্গ থেকে আহরণ করা হয়।
টিরিয়ান পার্পল (Tyrian Purple) – এই রঙের মূল উৎস বিশেষ প্রকার শামুকের গ্রন্থি।
হলুদ – হলুদই মনে হয় প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ডাই এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। এর মূল উৎস বিভিন্ন ধরনের গাছের শিকড়, বাকল কিংবা ফুল।



সামুদ্রিক শামুক থেকে প্রস্তুত টিরিয়ান পারপাল
যদিও এসব ডাই প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ও সহজলভ্য, কিন্তু এসব ডাই এর প্রস্তুতি খুবই সময়সাপেক্ষ এবং একইসাথে ব্যয়বহুল। যেমন- ধরা যাক টিরিয়ান পারপালের কথা। এটি সামুদ্রিক শামুকের গ্রন্থি থেকে তৈরি করা হয়। সামুদ্রিক শামুক অবশ্যই সহজলভ্য। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রায় ১২,০০০ শামুক থেকে আহরণ করা ডাই এর পরিমাণ হবে মাত্র ১.৪ গ্রাম। এ কারণে এই ডাই খুবই দামী এবং সেসময়ের রাজপরিবারেই এই ডাই দিয়ে রঙ করা পোষাক ব্যবহার করা হত। অন্যদিকে ১,৫০,৫০০টি ককিনিয়াল পতঙ্গের শুষ্ক দেহ থেকে ১ কেজি কারমিন ডাই প্রস্তুত করা যায়।
আরো কিছু প্রাকৃতিক ডাই এবং তাদের উৎস
অষ্টাদশ শতাব্দীতে জার্মান রসায়নবিদ জোহান জ্যাকব ডিজবাখ ককিনিয়াল থেকে প্রাপ্ত কারমিন ডাই নিয়ে গবেষণাগারে কাজ করছিলেন। তিনি একপর্যায়ে এই অনুসিদ্ধান্তে আসেন যে, তিনি এই লাল কারমিন ডাই এর সাথে অ্যালাম, আয়রন বা পটাশ মেশালে একপ্রকার বিবর্ণ লাল রঙ পাওয়া যাবে। অ্যালাম এবং আয়রন দিয়ে তিনি মোটামুটি সঠিক রঙ পেলেন। কিন্তু পটাশ মেশানোর পর তিনি দেখেন যে, আরো মূল্যবান সামুদ্রিক নীল (Ocean blue) বর্ণ তৈরি হয়েছে। পটাশ মিশ্রণের পরে এটি কারমিন ডাই এর রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটিয়েই নীল রঙ ধারণ করেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে নীল রঙ খুবই দুষ্প্রাপ্য। সেখানে এই নীল রঙের আবির্ভাব সত্যিই চমকপ্রদ। ডিজবাখের আবিষ্কৃত এই ডাই প্রুশিয়ান ব্লু (Prussian Blue) নামেও পরিচিত।
জোহান জ্যাকব ডিজবাখ এবং তার আবিষ্কৃত প্রুশিয়ান ব্লু
এই ঘটনার (বা দুর্ঘটনার) পর থেকে আস্তে আস্তে আরো নানা রঙের আবিষ্কার হতে থাকে। তবে প্রাকৃতিক ডাই এর ঝামেলাপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ প্রস্তুত প্রণালীর কারণে এই ডাই এর দাম ও স্বল্পতা থেকেই যায়। প্রাকৃতিক ডাই এর আরেকটি সমস্যা হচ্ছে এটি সাধারণভাবে ব্যবহার করতে গেলে আরেকটি মধ্যবর্তী যৌগের প্রয়োজন পড়ে, যাদের বলা হয় মর্ডান্ট। মর্ডান্ট ব্যবহার করার ফলে প্রাকৃতিক ডাই ব্যবহৃত বস্তুতে লেগে থাকতে পারে। কিন্তু এর ব্যবহারের ফলে অনেক সময় রঙের রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে অন্য রঙের আবির্ভাব ঘটতে পারে। আবার মর্ডান্ট ব্যবহার করা হলেও কিছুদিন পরেই প্রাকৃতিক ডাই বিবর্ণ হতে শুরু করে। ফলে প্রয়োজন হয়ে পড়ে নতুন কোনো পদ্ধতি, যার সাহায্যে সহজে ডাই প্রস্তুত করা যায় এবং যার স্থায়িত্ব হবে আরো বেশি।
সিন্থেটিক রঙের উৎপত্তি
প্রাকৃতিক ডাই এর এসব নানা সমস্যার কারণে নতুন কোনো পদ্ধতিতে রঙ বা ডাই প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়ে পড়লেও সেটি নিয়ে তখনকার কোনো রসায়নবিদ ততটা মাথা ঘামাননি। সিন্থেটিক ডাই এরও উৎপত্তি হয়েছে বলা যায় একপ্রকার দুর্ঘটনার মাধ্যমেই। আর এই দুর্ঘটনা যিনি ঘটিয়েছিলেন তিনি স্যার ঊইলিয়াম হেনরি পার্কিন।



স্যার উইলিয়াম হেনরি পার্কিন
১৮৫৬ সালে ১৮ বছর বয়সী তরুণ পার্কিন নিজের ল্যাবে কাজ করছিলেন। তিনি মূলত ম্যালেরিয়া রোগের মহৌষধ কুইনাইন নিয়ে কাজ করছিলেন যে, কীভাবে রাসায়নিকভাবে কুইনাইন তৈরি করা যায়। কারণ তখন সিঙ্কোনা উদ্ভিদ থেকে কুইনাইন প্রস্তুত করা হতো। সিঙ্কোনার পরিমাণ অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু ল্যাবে কুইনাইন তৈরি হওয়ার পরিবর্তে তার বীকারে জমা হয় থকথকে আঠালো ময়লা। তিনি যখন বীকার পরিষ্কারের জন্য এর মধ্যে অ্যালকোহল ঢেলে দেন, তখনই ঘটে সেই অবাক করা ঘটনা। তিনি দেখেন, বীকারের মধ্যে প্রস্তুত হয়েছে উজ্জ্বল ফুকসিয়া-পারপাল (Fuchsia-purple) ডাই। এই দুর্ঘটনার মাধ্যমেই প্রথম সিন্থেটিক ডাই এর আবির্ভাব ঘটে। পার্কিন এই রঙের নাম দেন ‘মভেইন’ (Mauveine)। মভেইন পূর্বের প্রাকৃতিক ডাই এর থেকে অনেক বেশি স্থায়ী ছিলো।
স্যার পার্কিনের প্রস্তুতকৃত মভেইন
অষ্টাদশবর্ষী পার্কিন তার এই আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে ব্যবসার চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেন। তিনি এই আবিষ্কারের পেটেন্ট করেন এবং লন্ডনে নিজের ডাই ওয়ার্কশপ খুলে ফেলেন। ১৮৬২ সালে রানী ভিক্টোরিয়াও মভেইন দিয়ে ডাই করা পোষাক পরিধান করেন।
মভেইনে ডাই করা সিল্ক ফেব্রিক
স্যার পার্কিন মভেইন ছাড়াও পার্কিন’স গ্রীন নামক টার্কিস রঙ এবং ব্রিটানিয়া ভায়োলেট নামক অন্য একধরনের রঙ আবিষ্কার করেন। অ্যালিজারিন ক্রিমসন নামক পিগমেন্টের নতুন প্রস্তুত পদ্ধতি আবিষ্কারেও তিনি সহযোগিতা করেন।
মূলত স্যার পার্কিনের এই আবিষ্কারের পরে আস্তে আস্তে বিজ্ঞানীরা সিন্থেটিক ডাই তৈরির কাজ শুরু করেন। আর এখন শত-সহস্র সিন্থেটিক ডাই প্রস্তুত হচ্ছে যা খুবই স্থায়ী। কিন্তু এই ডাই এর আবিষ্কার হয়েছে দুর্ঘটনার মাধ্যমেই।
সংক্ষেপে দেখুনভুল ভুলাইয়া’ নামটির অর্থ কি? কোত্থেকেই বা আসলো এই নাম?
ভুল ভুলাইয়া নামটা শুনে অনেকের মানসপটেই হয়তো ভেসে উঠেছে অক্ষয় কুমারের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘ভুল ভুলাইয়া’ সিনেমাটির কথা। সিনেমাটির নামকরণ করা হয়েছিল ভারতের লক্ষ্মৌ রাজ্যের বড় ইমামবাড়ার অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি গোলকধাঁধা ভুল ভুলাইয়ার নাম অনুসারে। কাবাব এবং নবাবদের শহর লক্ষ্ণৌয়ের এই গোলকধাঁধাটি ঐতিহাসিকবিস্তারিত পড়ুন
ভুল ভুলাইয়া নামটা শুনে অনেকের মানসপটেই হয়তো ভেসে উঠেছে অক্ষয় কুমারের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘ভুল ভুলাইয়া’ সিনেমাটির কথা। সিনেমাটির নামকরণ করা হয়েছিল ভারতের লক্ষ্মৌ রাজ্যের বড় ইমামবাড়ার অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি গোলকধাঁধা ভুল ভুলাইয়ার নাম অনুসারে। কাবাব এবং নবাবদের শহর লক্ষ্ণৌয়ের এই গোলকধাঁধাটি ঐতিহাসিক দিক থেকে বেশ বিখ্যাত।
প্রায় হাজারখানি অলিগলি দিয়ে ঘেরা এই গোলকধাঁধা বিভিন্ন দেশের অভিযাত্রীদের পাশাপাশি স্থপতিদেরও আকৃষ্ট করে আসছে প্রায় দু’শ বছর ধরে। অযোধ্যার চতুর্থ নবাব আসাফ-উদ্-দৌলা ১৭৮৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় সাধারণ মানুষের থাকার একটু জায়গা করে দেয়ার জন্য বড় ইমামবাড়া তৈরি করেন। বাড়িটির কাজ শেষ হওয়ার পর থেকেই তা লক্ষ্ণৌয়ের গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হয়ে আছে। দুর্ভিক্ষ পরবর্তী সময়ে নবাবরা তাদের বিবিদের সাথে লুকোচুরি খেলতে ইমামবাড়ার অভ্যন্তরে তৈরি করেন এই গোলকধাঁধার জটিল রাজ্য। কত শত মানুষ যে ঘুরতে এসে এই গোলকধাঁধায় পথ হারায় তা গুনে শেষ করা যাবে না! একবার এক তরুণ মাতাল অবস্থায় বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে একা ঐ গোলকধাঁধায় প্রবেশ করে পথ হারিয়ে ফেলে। প্রায় দু’দিন পর ভেতরের দিকের এক গলিতে খুঁজে পাওয়া যায় তার লাশ। ইমামবাড়ার অভ্যন্তরে তাই গাইড নিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
বড় ইমামবাড়া
অনেকেই প্রশ্ন করেন ‘ভুল ভুলাইয়া’ নামটির অর্থ কি? কোত্থেকেই বা আসলো এই নাম? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া খুব একটা সহজ কাজ না। মজার ব্যাপার হলো অন্য কোনো ভাষায় এই নামটির অনুবাদ করলেও তা ঠিক যথার্থ হয় না। বাংলা ভাষায় ‘ভুল ভুলাইয়া’র অনুবাদ করার চেষ্টা করুন তো? ভুলিয়ে দেয়া বা এ ধরনের কোনো আক্ষরিক অনুবাদই এক্ষেত্রে যুতসই হবে না। ‘ভুল ভুলাইয়া’ বলতে আসলে এমন একটি জায়গার কথা বলা হয় যেখানে সহজেই যে কেউ পথ হারিয়ে ফেলবে, দিক খুঁজে পাবে না আর পরিচিত দুনিয়ায় ফেরার পথও ভুলে যাবে।
শিল্পীর তুলিতে নবাব আসাফ-উদ্-দৌলা
‘ভুল ভুলাইয়া’ সম্পর্কে জানতে হলে এর নির্মাতাদের কথা অর্থাৎ নবাবদের সম্পর্কে জানাটা খুব জরুরি। আমাদের অনেকের মধ্যেই একটা ভুল ধারণা রয়েছে। আমরা নবাব আর রাজাদের সমগোত্রীয় ভেবে ভুল করি। অনেকে বলেন মোঘল রাজারা যখন মনের সুখে রাজ্য শাসন করছিলেন, ঠিক সেই সময়েই দিল্লীর আশেপাশে থেকে রাজাদের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে সুখে-শান্তিতে রাজত্ব করছিলেন নবাবরা। কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। ‘নবাব’ শব্দটি এসেছে ফার্সি শব্দ ‘নাইব’ থেকে, উৎপত্তিগত দিক থেকে যার অর্থ ‘সহকারী’। ‘নবাব’ ছিল একটি উপাধি, উত্তর ভারতের মুঘল রাজারা তাদের সহকারীদের কাজে খুশি হয়ে তাদেরকে এই উপাধিতে ভূষিত করতেন। এই উপাধিটি শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য ছিল, নারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো ‘বেগম’ খেতাবটি। বেগমদের মধ্যে তখন সবচেয়ে নামকরা ছিলেন ‘বেগম নাজরাত মহল’।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর নবাব এবং তাদের ক্ষমতা উভয়েই বিলুপ্ত হয়ে যায়, শুধু রয়ে যায় তাদের কেতাবি খেতাবটুকু। পরবর্তীতে এটি পারিবারিক পদবীতেও পরিণত হয়। এখনো পর্যন্ত লক্ষ্ণৌতে গেলে প্রকৃত নবাবদের দেখা পাওয়া যায়, যদিও তাদের ক্ষমতা আর অর্থবিত্ত অনেকটাই কমে গেছে। বলিউডের অন্যতম খ্যাতিমান তারকা সাইফ আলী খানের পিতা মনসুর আলী খান পতৌদী, যিনি ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ছিলেন, ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পতৌদীর নবাব হিসেবে সিংহাসন অলংকৃত করেন। পরবর্তীতে ভারতীয় সংবিধানের ২৬ তম সংশোধনীর মাধ্যমে নবাবদের এই উপাধি বর্জন করা হয় এবং তাদের ক্ষমতা লুপ্ত করা হয়।
অযোধ্যার প্রথম নবাব ছিলেন নবাব সাদাত খান (১৭২২-১৭৩৯)। এরপর যথাক্রমে নবাব হন নবাব সফদার জং (১৭৩৯-১৭৫৪), নবাব সুজাউদ্দৌলা (১৭৫৪-১৭৭৫) এবং নবাব আসাফ-উদ্-দৌলা (১৭৭৫-১৭৯৮)। এরপর নবাব ওয়াজের আলী, সাদাত আলী খান, নাসিরুদ্দিন হায়দারসহ আরও অনেকে নবাব হন। আমরা বরং ‘ভুল ভুলাইয়া’র নির্মাতা আসাফ-উদ্-দৌলার দিকে নজর দিই। আসাফ-উদ্-দৌলা সিংহাসনে আরোহণ করার পর থেকে অযোধ্যার রাজনীতিতে বহুবিধ পরিবর্তন আসে। ১৭৭৫ সালে তিনি অযোধ্যার দরবার ফায়জাবাদ থেকে স্থানান্তরিত করে লক্ষ্ণৌতে নিয়ে আসেন। তখনকার দিনে অখ্যাত লক্ষ্ণৌ ক্রমেই শিয়াদের সংস্কৃতিতে নতুন রূপে সজ্জিত হতে থাকে। শিয়া গোত্রীয় এই নবাবরা ইরান এবং ইরাকের অনুসরণে বেশ দাপটের সাথে একটি শিয়াভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলে। অচিরেই ইরানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর শিয়াদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে লক্ষ্ণৌ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার দিক থেকেও বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শুরু করে শহরটি। দৌলত খানা, আসফি মসজিদ, রুমি দরোজা, বড় ইমামবাড়া, ভুল ভুলাইয়া, বিবিয়াপুর কোঠি, চিনহুট কোঠি এগুলো সব তারই কীর্তি। ক্লড মার্টিনের কনস্ট্যানিয়া ভবনটি দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন নবাব। দশ লক্ষ স্বর্ণ মুদ্রার বিনিময়ে ভবনটি কিনে নিতে চান তিনি। সেই সওদা পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৭৯৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন নবাব আসাফ-উদ্-দৌলা।
ভুল ভুলাইয়ার অভ্যন্তরে
ভুল ভুলাইয়ার ইতিহাস জানতে হলে ভ্রমণ শুরু করতে হবে বড় ইমামবাড়ার ইতিহাস থেকে। ইমামবাড়া না কোনো মসজিদ, না দরগাহ। ইমামবাড়া এমন একটি হল যেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিয়া মুসলিমরা একত্রিত হয়, বিশেষ করে মহররম স্মরণে সেখানে ‘মাতম’-এর আয়োজন করা হয়। এশিয়ার অন্যান্য অংশে; যেমন- বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান প্রভৃতি জায়গায়ও ইমামবাড়া আছে, কিন্তু বড় ইমামবাড়া শিয়াদের মধ্যে বেশ প্রসিদ্ধ। ভুল ভুলাইয়ার সাথে মিশে আছে বড় ইমামবাড়ার অস্তিত্ব। ১৮ শতকের শেষদিকে অযোধ্যা দারুণ দুর্ভিক্ষ আর বেকারত্বের সাথে যুঝছিল। জনগণের অন্তত মাথা গোঁজার ঠাই সুনিশ্চিত করতে নবাব আসাফ-উদ্-দৌলা নির্মাণ করান বড় ইমামবাড়া। এটাকে অনেকটা এমজিএনআরইজিএ (মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট)-এর সাথে তুলনা করা যায়। এই একই কারণে ভারতে আরও বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ নির্মিত হয় যার মধ্যে রয়েছে পুনের আগা খাঁর প্রাসাদও।
চৌদ্দ বছর সময় নিয়ে ইমামবাড়া নির্মাণ করা হয়। এরপর হাত দেয়া হয় ভুল ভুলাইয়ার নির্মাণকাজে। বড় ইমামবাড়া এবং ভুল ভুলাইয়ার নির্মাণকাজে অংশ নেয়া শ্রমিকদের পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করে অর্থ সংকট থেকে মুক্তি দেয়াই ছিল নবাব আসাফ-উদ্-দৌলার প্রধান উদ্দেশ্য। একটি কথা প্রচলিত আছে যে, “আম আদমিরা সারাদিন যা গড়তো রাতে রইস আদমিরা তা ধ্বংস করতো।” কথাটি হয়তো নিছকই কথার কথা, তা নাহলে মাত্র ছয় বছরে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। অনেকে আবার ইমামবাড়াকেই ‘ভুল ভুলাইয়া’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। এর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা এতোই বিশাল যে লেখার মাধ্যমে তা হয়তো পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। ভিন্ন ভিন্ন নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে ইমামবাড়ার আটটি ঘরে। প্রতিটি ঘরেই গম্বুজ রয়েছে। ইমামবাড়ার মূল আকর্ষণ অবশ্য এর কেন্দ্রীয় ঘরটি। ৫০x১৬x১৫ মিটার আকৃতির এই ঘরে কোনো খিলান নেই, থাম নেই, কোনো লোহা বা কংক্রিট এতে ব্যবহৃত হয়নি। দেয়ালগুলোর ভার অনেক বেশি হওয়ায় ভেতরটা ফাঁপা রাখা হয়েছে যেহেতু এদের ভার নেয়ার জন্য কোনো পিলারের ব্যবস্থা করা হয়নি। দেয়ালের এই ফাঁপা জায়গাগুলোর ভেতরে ৪৮৯টি গলিপথ তৈরি করা হয়েছে, যা ‘ভুল ভুলাইয়া’ নামে পরিচিত। ১৮৫৭ সালের পর থেকে এই গলিপথগুলো লুকোচুরি খেলার জায়গায় পরিণত হয়েছে।
ভুল ভুলাইয়ার অভ্যন্তরে ঘুরে বেড়ানো অভিযাত্রীরা
লুকোচুরি খেলার আদর্শ এই জায়গাটি এতোটাই চোরাগোপ্তা উপায়ে তৈরি যে, পরবর্তীতে বড় ইমামবাড়াকে ছাপিয়ে পর্যটকদের সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নেয় ‘ভুল ভুলাইয়া’। অনেকে আবার গোলকধাঁধার পাশেই একটি সুড়ঙ্গের অবস্থানও নিশ্চিত করেছেন। নবাবরা তাদের হেরেমের জেনানাদের সাথে এখানে মৌজমাস্তি করতে আসতেন বলে সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজের ‘বাদশাহি আংটি’ গল্পে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংক্ষেপে দেখুনকুকুর কিভাবে মানুষের বন্ধু হলো?
ক্যাপ্টেন নামের একটি জার্মান শেফার্ড কুকুর টানা ১১ বছর ধরে রাত হলেই মনিব মিগুয়েল গুজমানের কবরের পাশে শুয়ে থাকতো। কুকুরটি প্রায়ই তার মনিবের কবরের পাশে চুপচাপ বিষণ্ণ ভঙ্গিতে বসে থাকতো। প্রভুভক্তির দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কুকুরটিকে কখনো প্রয়াত প্রভুর সমাধি থেকে আলাদা করা যেতো না। মানুষ আর কুকুরের এই গভীরবিস্তারিত পড়ুন
ক্যাপ্টেন নামের একটি জার্মান শেফার্ড কুকুর টানা ১১ বছর ধরে রাত হলেই মনিব মিগুয়েল গুজমানের কবরের পাশে শুয়ে থাকতো। কুকুরটি প্রায়ই তার মনিবের কবরের পাশে চুপচাপ বিষণ্ণ ভঙ্গিতে বসে থাকতো। প্রভুভক্তির দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কুকুরটিকে কখনো প্রয়াত প্রভুর সমাধি থেকে আলাদা করা যেতো না। মানুষ আর কুকুরের এই গভীর অনুভূতির সম্পর্কটা প্রভু-ভৃত্য বা মনিব-মান্য দিয়ে বিশেষায়িত করলে একটু কমই হয়ে যাবে।
এমন মানবিক একটি সম্পর্ক কেবল দুই বন্ধুর মাঝেই থাকতে পারে। কিন্তু কুকুরের মতো একটি প্রাণী কীভাবে মানুষের এত কাছাকাছি এলো? কীভাবে তারা মনিবের জন্য প্রাণ দিতে শিখলো? কেন তারা এত প্রভুভক্ত? কত বছরের পরিক্রমায় মানুষের বন্ধুতে পরিণত হয়েছে? কে সর্বপ্রথম কুকুরকে পোষ মানিয়েছিল?

মিগুয়েল গুজম্যানের কবরের পাশে তার কুকুর ক্যাপ্টেন
কুকুরকে পোষ মানানোর ইতিহাস জানতে হলে, প্রাচীনকাল থেকে মানুষ এবং কুকুরের মধ্যকার যে পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে সেই গল্প আগে জানতে হবে। প্রথমদিকে মানুষের শিকার কাজে সঙ্গ দিতে, জিনিসপত্র দেখাশোনার কাজে, পূর্বাভাস ও সংকেত প্রাপ্তির জন্য, খাদ্যের উৎস খোজার কাজে কুকুরের সহযোগিতার সূত্র ধরে মানুষের সাথে এই প্রাণীটির সখ্যতার শুরু হয়। দিনে দিনে তা ভালবাসা এবং বন্ধুত্বে রূপ নিয়েছে। কিন্তু ঠিক কবে থেকে এই সখ্যতা বা বন্ধুত্বের শুরু তা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে।
কুকুরের বিবর্তন পরীক্ষা করার জন্য মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (mtDNA) ব্যবহার করা হয়েছে। এই গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, আজ থেকে প্রায় এক লক্ষ বছর আগে নেকড়ে এবং কুকুর দুটি আলাদা প্রজাতিতে বিভক্ত হয়েছিল। এই গবেষণার আলোকে আরো ধারণা করা হচ্ছে, কুকুরকে পোষ মানানোর প্রথা সর্বপ্রথম চালু হয়েছিল আজ থেকে ৪০ হাজার বছর আগে। কিন্তু গবেষকরা এই ফলাফলের সাথে একমত হতে পারছেন না। কিছু পরীক্ষার বিশ্লেষণ মতে, কুকুরকে পোষ মানানোর সর্বপ্রথম প্রচেষ্টাটি গৃহীত হয়েছিল পূর্ব এশিয়ায়। আবার অনেক বিশ্লেষকের মতে, কুকুরকে সবার আগে পোষ মানানো হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে এবং পরবর্তীতে ইউরোপে কুকুরকে পোষ মানানোর প্রথা চালু হয়েছিল।

প্রাচীন রোমান গ্রাফিতিতে কুকুর
দুটি স্থানে পোষা কুকুরের উৎপত্তি?
২০১৬ সালে জীব প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী গ্রেগর লারসনের নেতৃত্বে একটি গবেষণা দল এমটিডিএনএ গবেষণা প্রকাশ করেছিল। এই গবেষণাপত্রে তারা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, কুকুরকে পোষ মানানোর আদিম রীতির উৎপত্তি একটি স্থানে না। বরং দুটি স্থানে একইসাথে কুকুরকে পোষ মানানোর চেষ্টা চলছিল। একটি ছিল পূর্ব ইউরেশিয়া অঞ্চল, আরেকটি পশ্চিম ইউরেশিয়া অঞ্চল।
প্রকাশিত গবেষণার বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, এশিয়া অঞ্চলের কুকুরগুলো এশিয়ার নেকড়েদের বংশধর। প্রায় ১২,০০০ বছর আগে এই নেকড়েদেরকে পোষ মানানোর মাধ্যমে এশীয় কুকুরদের আগমন হয়। অন্যদিকে ইউরোপের কুকুরদের আদি বংশধর হচ্ছে পুরাতন প্রস্তর যুগের ইউরোপিয়ান নেকড়ে, যাদেরকে ১৫ হাজার বছর পূর্বে মানুষ বশ্যতা স্বীকার করানোর চেষ্টা করেছিল এবং সময়ের পরিক্রমায় সেগুলো আজকের ইউরোপিয়ান কুকুরে পরিণত হয়েছে। এরপর এশিয়ান কুকুরগুলো মানুষের মাধ্যমেই ইউরোপে পৌঁছেছে এবং ইউরোপিয়ান প্রস্তরযুগের কুকুরকে ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপিত করেছে।
এবার তাহলে ব্যাখ্যা করা যাক, আগের ডিএনএ পরীক্ষাগুলো কেন বলেছে যে নেকড়ে থেকে কুকুরের বিবর্তন এবং কুকুর পালনের ঘটনা সর্বপ্রথম শুধু একটি স্থানেই ঘটেছে এবং লারসনের গবেষণা কেন বলছে এই প্রক্রিয়া দুটি স্থানে দু’ভাবে শুরু হয়েছিল! লারসনের মতবাদ অনুসারে, প্রাচীন প্রস্তরযুগে দুই ধরনের কুকুরের অস্তিত্ব ছিল। এদের মধ্যে ইউরোপিয়ান প্রাচীন প্রস্তরযুগের কুকুরগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়। কারণ সেগুলো এশিয়ান কুকুর দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়ে গিয়েছিল। আরো অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। যেমন- প্রাচীন আমেরিকান কুকুরের তথ্য কোনো গবেষণায় পাওয়া যায় না কেন? গবেষক ফ্রানতস এবং অন্যান্যরা বলেন, কুকুরের বিবর্তনের উৎস হিসেবে যে দুটি প্রজাতিকে বলা হচ্ছে তাদের আদি বংশধর একই প্রজাতির নেকড়ে এবং এই দুটো ধীরে ধীরে কমে এসেছে এবং এখন অনেকটাই বিলুপ্ত।

কুকুরের এমটিডিএনএ গবেষক গ্রেগর লারসন
কুকুরের বিবর্তন নিয়ে গবেষণায় অবতীর্ণ অন্যান্য পণ্ডিতরা তদন্ত করে দেখেছেন, এশিয়া অঞ্চলের কিছু কুকুরের অভিবাসন বা মাইগ্রেশনের কিছু প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু সেগুলো ইউরোপের কুকুরকে পুরোপুরিভাবে প্রতিস্থাপন করতে পারেনি। তাই তারা কুকুরের আদি জন্মস্থান হিসেবে ইউরোপকে অগ্রাহ্যও করে পারেননি।
কুকুর পোষার গোড়াপত্তন
স্বীকৃত তথ্য এবং গবেষণালব্ধ উপাত্ত অনুসারে, পোষা কুকুরের সন্ধান সর্বপ্রথম পাওয়া গিয়েছিল ১৪ হাজার বছরের পুরনো জার্মানির বন-ওবারকাসেলের একটি কবরস্থানে, যেখানে মানুষ এবং কুকুরকে কবর দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। চীনে সর্বপ্রথম পোষা কুকুরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল ৭০০০-৫৮০০ খ্রিস্টপূর্বে নব্য প্রস্তরযুগে হেনান প্রদেশে। তবে মানুষ এবং কুকুরের সহাবস্থানের সর্বপ্রথম সন্ধান পাওয়া যায় ইউরোপের প্রস্তরযুগীয় উত্তরাঞ্চলে। সেই কুকুরগুলো যে অবধারিতভাবে পোষ্য কুকুর ছিল এমনটি না-ও হতে পারে। এসব অঞ্চলের মধ্যে বেলজিয়ামের গোয়েত গুহা, ফ্রান্সের চাউভেত গুহা, চেক-রিপাবলিকের প্রেডমস্তি অন্যতম।
ইউরোপে মধ্য প্রস্তরযুগের কিছু কবরস্থানে, যেমন- সুইডেনের স্কটহোমে কুকুরের সমাধির (খ্রিস্টপূর্ব ৫২৫০-৩৭০০) সন্ধান পাওয়া যায়। অর্থাৎ তখন থেকেই শিকারীদের সাথে কুকুরের বন্ধুত্ব রয়েছে।

মানুষের পাশে কবরে সমাধিস্থ কুকুরের ফসিল
দক্ষিণ আমেরিকার উতাহ অঞ্চলের ডেঞ্জার গুহায় ১১ হাজার বছর আগের একটি সমাধিতে একটি কুকুরের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, কুকুরের এই প্রজাতিটিই এশিয়ান কুকুরদের পূর্বসূরি। নেকড়ের সাথে চলমান সংকরায়নের ফলে কুকুরের একটি চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য আমেরিকান কালো নেকড়ের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল। কালো পশম কুকুরের বৈশিষ্ট্য, নেকড়ের নয়।
আদিকালে কুকুরেরও ব্যক্তিত্ব ছিল!
সাইবেরিয়ার সিস বাইকল অঞ্চলে মধ্য প্রস্তরযুগ এবং নব্য প্রস্তরযুগের কিতোই সময়ের কিছু কুকুরের কবর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, কুকুরকে সেই সময়ে মানুষের মতো ব্যক্তিত্ব মর্যাদা (person-hood) দেয়া হতো এবং কুকুরের সাথে মানুষের মতোই আচরণ করা হতো। শামানাকা অঞ্চলের একটি কবরস্থানে মধ্যবয়স্ক একটি কুকুরের সমাধি পাওয়া গিয়েছিল। কুকুরটি মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছিল, আঘাত থেকে সেরেও উঠেছিল সম্ভবত। প্রায় ৬,২০০ বছরের পুরনো সেই সমাধিক্ষেত্রে কুকুরটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। একই উপায়ে সমাধিক্ষেত্রটিতে মানুষকেও সমাধিস্থ করা হতো।
লোকোমোটিভ রাইসোভেতের প্রায় ৭,৩০০ বছরের পুরোনো সমাধিক্ষেত্রে একটি নেকড়ের কবর আছে। এই নেকড়েটি ছিল পুরুষ নেকড়ে। নেকড়েটির রেডিও-কার্বন পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, এর খাদ্যাভ্যাসে হরিণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। নেকড়েটির দাঁতে কোনো দাগ বা ক্ষত ছিল না। ফলে নেকড়েটি তৎকালীন মানব জনগোষ্ঠী ও কুকুর সম্প্রদায়ের অংশ ছিল কি না তার সরাসরি কোনো প্রমাণ নেই। তবে নেকড়েটিকেও আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

রয়্যাল বেলজিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ন্যাচারাল সায়েন্সে একটু প্রাচীন কুকুরের খুলি
এই কবরগুলো ব্যতিক্রম হলেও তেমন একটা বিরল নয়। এরকম আরো কিছু কবর রয়েছে। বৈকাল হ্রদ অঞ্চলের কিছু ঢিবিতে কুকুর এবং নেকড়ের হাড়ের দেহাবশেষ দেখা যায়। ধারণা করা হয়, সেখানকার মৎস্য শিকারিরা তাদের সাথে কুকুর রাখতেন। প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী রবার্ট লুসাই এবং তার সহকারীরা এই গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন, তারা ধারণা করেন, এইসব কবর এবং প্রত্নতাত্ত্বিক চিহ্ন প্রমাণ করে যে, অন্তত এইসব কুকুরগুলোকে তখনকার সময়ে মানুষের মর্যাদা দিয়েছিল।
আধুনিক প্রজাতি এবং প্রাচীন প্রজাতির তুলনা
ইউরোপিয়ান প্রস্তরযুগের কিছু অঞ্চলে কুকুরে প্রজাতিগত বৈচিত্র্যর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। ১৫,৫০০-১১,০০০ বছরের পুরনো মধ্যম আকারের কুকুরের অস্তিত্ব অদূর প্রাচ্যের নাটুফিয়ান অঞ্চলে পাওয়া গিয়েছিল। ১৭,০০০ থেকে ১৩,০০০ বছরের পুরনো মধ্যম বা বড় আকারের কিছু কুকুরের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল জার্মানি, রাশিয়া এবং ইউক্রেনে। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডের কিছু জায়গায় ১৫,০০০ থেকে ১২,৩০০ বছরের পুরনো ছোট আকৃতির কিছু কুকুরের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এসএনপি (সিংগেল নিউক্লিওটাইড পলিমরফিজম) নামক একধরনের ডিএনএ গবেষণা ২০১২ সালে কুকুরের প্রজাতি এবং বিবর্তন সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছিল। এই গবেষণায় বলা হয়েছিল, প্রাচীনকালের বিভিন্ন আকৃতির কুকুরের অস্তিত্বের যে প্রমাণ পাওয়া যায় তার সাথে আধুনিক প্রজাতির কুকুরের কোনো সম্পর্কই নেই! আধুনিক কুকুরের যেসব প্রজাতি দেখা যায় তার মধ্যে সবচাইতে পুরনো প্রজাতিটি খুব বেশি হলে ৫০০ বছরের পুরনো এবং কম করে হলেও ১৫০ বছরের পুরনো প্রজাতি।

অক্সফোর্ড মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে বিভিন্ন আকার আকৃতির কুকুরের হাড় এবং দাঁত
আধুনিক কুকুরের বংশগতি তত্ত্ব
বর্তমানে আমরা কুকুরের যেসব প্রজাতি দেখতে পাই তাদের বেশির ভাগেরই বিকাশ ঘটেছে সাম্প্রতিক সময়ে। এ নিয়ে অবশ্য গবেষকদের মধ্যে তেমন একটা দ্বিমত নেই। তবে কুকুরের প্রজাতিতে যেসব বিশেষ ভিন্নতা দেখা যায় সেটি তাদের আদি প্রজাতির রূপ হিসেবেই ধরা হয়ে থাকে। কুকুরের প্রজাতি আকার এবং আকৃতিতে বিভিন্ন সাইজের এবং ওজনের হয়ে থাকে। বিভিন্ন প্রজাতির আবার মুখাবয়ব, মাথার গড়ন, ঠোঁট আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। দক্ষতার দিক থেকেও একেক প্রজাতির কুকুর একেক রকমের হয়ে থাকে। কোনো কোনো প্রজাতি শিকার শনাক্ত করতে পারদর্শী, কোনোটি ঘ্রাণশক্তিতে দক্ষ, কোনোটি আবার সহকারী হিসেবে দক্ষ।

চারিত্রিক এবং গঠনগত দিক দিয়ে নেকড়ে থেকে আগত আধুনিক কুকুরের প্রকারভেদ
কুকুরের প্রজাতিতে এরকম ভিন্নতা থাকার একটি কারণ হতে পারে প্রাচীনকাল থেকে শিকারী জনগোষ্ঠীর সাথে বসবাস এবং একেক সময়ে একেক স্থানে স্থানান্তরিত হয়ে যাওয়া। তারপর মানুষ এবং কুকুর একইসাথে ভৌগোলিক অবস্থান অনুসারে বিকশিত হতে থাকে। প্রাচীনকালে অল্প সংখ্যক কুকুরের প্রজাতি বিকশিত হলেও, সভ্যতা যত এগিয়েছে এবং মানুষের জনসংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়েছে, সেই সাথে বেড়েছে কুকুরের প্রজাতিও।
কারণ মানুষ যখনই এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়েছে, এক কাজ থেকে আরেক কাজে নিজেদের নিয়োগ করেছে, তখনই এই বন্ধুপ্রতীম প্রাণীটিকে তারা সাথে রেখেছে। ফলে কুকুরের প্রজাতির বিকাশও বেড়েছে আগের চাইতে বেশি হারে। পোষা কুকুরের বিকাশ কবে কোথায় কীভাবে শুরু হয়েছিল তা নিয়ে গবেষকদের নানা রকমের মতামত থাকলেও কুকুর যে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের বন্ধু হিসেবে মানুষকে ভালবেসেছে এবং ভালবাসা পেয়েছে তা নিয়ে কারো দ্বিমত থাকবে না।
সংক্ষেপে দেখুনক্যালকুলাসের প্রথম আবিষ্কারক নিউটন নাকি লিবনিজ?
বিজ্ঞানের হাজার বছরের ইতিহাসে অনেক তত্ত্বই যুগপৎভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন- মাইকেল ফ্যারাডে ও জোসেফ হেনরির ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্ডাকশন আবিষ্কার ছিল সমসাময়িক। এরপর চার্লস ডারউইন ও আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস একই সময়ে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন’ তত্ত্বের ধারণা প্রদান করেন। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।বিস্তারিত পড়ুন
বিজ্ঞানের হাজার বছরের ইতিহাসে অনেক তত্ত্বই যুগপৎভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন- মাইকেল ফ্যারাডে ও জোসেফ হেনরির ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্ডাকশন আবিষ্কার ছিল সমসাময়িক। এরপর চার্লস ডারউইন ও আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস একই সময়ে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন’ তত্ত্বের ধারণা প্রদান করেন।
এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর একটিও আইজ্যাক নিউটন ও গটফ্রেড লিবনিজের ক্যালকুলাস তত্ত্বের মতো বিতর্কিত হয়নি। বর্তমানে নিউটন ও লিবনিজ দুজনকেই ক্যালকুলাসের জনক বলা হয়। কিন্তু একসময় এই তত্ত্ব নিয়ে দুই গণিতবিদ বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। তাদের দুজনের মধ্যে কে সবার আগে ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছেন, সেটি ছিল বিবাদের মূল কারণ। এই বিতর্ককে ঘিরে বেশ কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি হয়েছিল, যেটা বেশ কয়েক বছর চলমান ছিল।

গণিতের বিতর্কিত এক অধ্যায়ের সাথে জড়িয়ে আছে নিউটন ও লিবনিজের নাম
ব্যারো নামে আইজ্যাক নিউটনের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি ক্যালকুলাস সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে কিছু ধারণা প্রদান করেন। কিন্তু তিনি তখন ক্যালকুলাসের তাৎপর্য বুঝতে পারেননি। সেই কারণে তিনি এই বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেননি এবং তার প্রাথমিক ধারণাগুলোও জনসম্মুখে প্রকাশ করেননি। কিন্তু নিউটন যেহেতু ব্যারোর ছাত্র ছিলেন, সেই সূত্রে তিনি তার শিক্ষকের কাছে থেকে ক্যালকুলাসের সামান্য কিছু ধারণা পান। পরবর্তীতে তিনি তার শিক্ষকের দেয়া ধারণাকে কাজে লাগিয়ে ক্যালকুলাসের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব আবিষ্কার করেন।
কিন্তু আইজ্যাক নিউটন প্রথম থেকেই কিছুটা প্রচারবিমুখ ছিলেন। তিনি তার আবিষ্কৃত বিভিন্ন তত্ত্ব জনসম্মুখে প্রকাশ করতে পছন্দ করতেন না। একই কাজ তিনি ক্যালকুলাসের ক্ষেত্রেও করেন। সপ্তদশ শতকের ষাটের দশক থেকে তিনি ক্যালকুলাস নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন এবং ১৬৬৪-৬৬ সালের মধ্যে তিনি ক্যালকুলাসের মূল বিষয়গুলো আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এরপর নিউটন ১৬৬৯, ১৬৭১ ও ১৬৭৬ সালে ক্যালকুলাস নিয়ে ৩টি আলাদা গবেষণাপত্র লেখেন। কিন্তু তিনি সেগুলোর একটিও সেই সময়ে প্রকাশ করেননি। ১৬৬৯ সালে তিনি যে তত্ত্ব লেখেন, সেটি প্রকাশ হয় ১৭১১ সালে, অর্থাৎ ৪২ বছর পর। দ্বিতীয় গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় ১৭৩৬ সালে, তার মৃত্যুরও ৯ বছর পর। তবে সর্বশেষ তত্ত্বকোষটি তিনি ১৭০৪ সালে প্রকাশ করেন।


স্যার আইজ্যাক নিউটন
অষ্টাদশ শতকের আগে ক্যালকুলাস নিয়ে নিউটনের কোনো তত্ত্বই জনসম্মুখে প্রকাশ হয়নি। তবে ১৬৮৪ সালে লেইপজিগ সাময়িকীতে তিনি ক্যালকুলাস নিয়ে ‘অ্যাক্টা এরুডিটোরাম‘ নামে একটি অসমাপ্ত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এছাড়া তিনি তার আবিষ্কৃত তত্ত্বসমূহ গোপনে বন্ধুদের মাঝে চিঠি আকারেও বিলি করতেন। এই চিঠিগুলোর একটি লিবনিজও পেয়েছিলেন। তবে সেই চিঠিতে নিউটন ক্যালকুলাস সম্পর্কে যা লিখেছিলেন, সেটি পুরো অস্পষ্ট ছিল। এছাড়া অনেক বিষয় তিনি ইচ্ছা করে এড়িয়ে যান, যাতে কেউ তার তত্ত্ব চুরি করতে না পারে। অন্যদিকে, সপ্তদশ শতকের সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে লিবনিজও ক্যালকুলাস আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। ১৬৭৪ সালে তিনি ক্যালকুলাস নিয়ে তার চিন্তাভাবনাকে প্রকাশ করতে শুরু করেন এবং ১৬৮৪ তিনি এই বিষয়ে লিখিত আকারে তত্ত্ব প্রকাশ করেন। কিন্তু তার ছয় পৃষ্ঠার সেই তত্ত্বটি বেশ অস্পষ্ট এবং অনেকের কাছে বোধগম্য ছিল না। তবে সেই সময়ে ক্যালকুলাস নিয়ে তার তত্ত্বটি সঠিক ছিল।
গটফ্রেড লিবনিজ
বিতর্কের আদ্যোপান্ত
প্রথমদিকে নিউটন ও লিবনিজ দুজনেই একে অপরকে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক হিসেবে সম্মান করতেন। কিন্তু তাদের একজন বন্ধু বিখ্যাত দুই গণিতবিদকে মুখোমুখি দাঁড় করান। ১৬৯৬ সালে লিবনিজের একজন বন্ধু নিউটনকে তার ক্যালকুলাস তত্ত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে বসেন। তিনি ভেবেছিলেন, নিউটন তার উত্থাপিত সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। কিন্তু নিউটন ও লিবনিজ উভয়ই সেই সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হন। কিন্তু এই ঘটনার পর লিবনিজ এক প্রবন্ধে নিউটনের এক বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক এবং এ বিষয়ে নিউটন তার শিষ্য। নিউটনের বন্ধু বিষয়টি পুরোপুরি হজম করতে পারেননি। তিনি বেশ রাগের সাথে পূর্বে উত্থাপিত সমস্যার বিচার বিশ্লেষণ তুলে ধরেন এবং পরোক্ষভাবে লিবনিজের বিরুদ্ধে নিউটনের লেখা চুরির অভিযোগ করেন।
তিনি প্রমাণ হিসেবে বহু বছর আগে লিবনিজের কাছে ক্যালকুলাস নিয়ে নিউটনের পাঠানো চিঠিকে সামনে আনেন। কিন্তু মূলত সেই চিঠিতে নিউটন ক্যালকুলাস নিয়ে নিজের তত্ত্বের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যাই প্রদান করেননি। এরপর বেশ কয়েক বছর এই বিষয়টি চাপা পড়ে ছিল। কিন্তু ১৭০৫ সালে লিবনিজ নিউটনের ক্যালকুলাস সম্পর্কিত কিছু কাজ রিভিউ করে নিজেদের দুজন বিজ্ঞানীর সাথে তুলনা করেন, যারা উন্নততর কিছু আবিষ্কারের উদ্দেশ্য জুটি বেঁধেছিলেন। কিন্তু নিউটনের একজন বন্ধু লিবনিজের এই বিষয়টিকে লেখা চুরির নতুন ফন্দি হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। সম্ভবত লিবনিজ যে দুজন বিজ্ঞানীর উদাহরণ টেনেছিলেন, তারা একে অপরের তত্ত্ব চুরি করেছিলেন।

লন্ডনের বিখ্যাত রয়্যাল সোসাইটি
এই ঘটনার কিছুদিন পরেই নিউটনের সেই বন্ধু লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি থেকে একটি দলিল প্রকাশ করেন এবং সেখানে তিনি নিউটনকে সন্দেহাতীতভাবে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই সাথে তিনি লেখেন, লিবনিজ নিউটনের তত্ত্ব চুরি করেছেন এবং কিছু কাটছাঁট করে নিজের নামে তা প্রকাশ করেছেন। এই বিষয়টি লিবনিজের জন্য ছিল চরম অপমানজনক। তিনি বেশ ক্রুদ্ধ হয়ে রয়্যাল সোসাইটি বরাবর চিঠি লিখে ক্ষমা চাইতে বলেন। কিন্তু ক্ষমা তো দূরে থাক, প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে লিবনিজকে প্রতি আক্রমণ করে চিঠি পাঠানো হয় এবং সেখানে তার প্রতি সমস্ত অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। জবাবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চেয়ে লিবনিজ আরো একটি চিঠি পাঠান।
রয়্যাল সোসাইটি লিবনিজের দাবির পক্ষে সাড়া দেয়। তারা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই সময়ে রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি ছিলেন আইজ্যাক নিউটন। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি সেই কমিটির সদস্য হিসেবে না থাকলেও, তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সেটি পুরোপুরি তার পক্ষে ছিল। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, তদন্ত প্রতিবেদনটি নিউটন নিজ হাতে লিখেছিলেন। সেখানে তিনি নিজেকে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক হিসেবে তুলে ধরেন এবং লিবনিজ তার তত্ত্ব চুরি করেছেন বলে প্রতিবেদনে লেখেন।

এ নিয়ে রয়েছে অনেক রম্য কার্টুন
লিবনিজ ও তার বন্ধুদের জন্য এটি ছিল অনেক বড় পরাজয়। তারা নিউটনের বিপক্ষে বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহ করে নিজেদের দাবির পক্ষে লিফলেট প্রকাশ করে প্রচার করেন। এর বেশ কয়েক বছর পরও গণিতশাস্ত্রের অন্যতম সেরা দুই বিজ্ঞানী একে অপরের বিপক্ষে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ অব্যাহত রাখেন এবং পূর্বে প্রকাশিত যুক্তিতর্কগুলো পরিমার্জন করে প্রকাশ করতে থাকেন। এমনকি লিবনিজের মৃত্যুর পরও তার বিরুদ্ধে নিউটনের তত্ত্ব চুরির অভিযোগের উপর বিভিন্ন যুক্তিতর্ক ও প্রমাণ প্রচার করা হয়।
এত বিতর্কের পরও বিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত নিউটন ও লিবনিজ উভয়কে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক হিসেবে মানা হতো। কিন্তু গত শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞানীরা একমত হন যে, নিউটন সর্বপ্রথম ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছেন। তিনি ১৬৬৫-৬৬ সালে দিকে ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেন। তবে লিবনিজ নিউটনের সাথে কোনো যোগাযোগ ব্যতিরেকে নিজ প্রচেষ্টায় ১৬৭৫-৭৬ সালে ক্যালকুলাসের মূল নীতিসমূহ আবিষ্কার করেন।

ক্যালকুলাস বিতর্ক নিয়ে ট্রল
তবে দিন শেষে প্রকৃত বিজয় হয়েছে লিবনিজেরই। কারণ নিউটন যে ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছিলেন, সেটি ছিল বড্ড সেকেলে। ফলে সেটি ইতোমধ্যে জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। তবে লিবনিজের ক্যালকুলাস ছিল বাস্তবভিত্তিক। বর্তমানে স্কুল-কলেজে যে ক্যালকুলাস চর্চা করা হয়, তার শতকরা ১০০ ভাগই লিবনিজের আবিষ্কৃত ক্যালকুলাস। ফলে তিনি ক্যালকুলাসের দ্বিতীয় আবিষ্কারক হলেও তার সৃষ্টিকর্মই স্থায়ীত্ব লাভ করেছে।
বিজ্ঞানের সূচনালগ্ন থেকেই হয়তো নানা বিষয়ে নানা বিজ্ঞানী বা গবেষকের মধ্যে মতামত কিংবা তত্ত্বের অমিল হয়েছে, কিংবা কারো কারো ক্ষেত্রে তাঁদের একজনের গবেষণার সাথে হয়তো আরেকজনের গবেষণা কাজের মধ্যে অনেক মিল লক্ষ করা গেছে। এই নিয়ে হয়তো তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বও হয়েছে বেশ। এরকমটা হতেই পারে। বিজ্ঞানের ইতিহাস ঘাঁটলে এরকম অনেকগুলো তত্ত্ব বা আবিষ্কার পাওয়া যাবে যা নিয়ে হয়তো দুই গবেষক বা বিজ্ঞানীর মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়েছে যে, কে সেই তত্ত্ব বা আবিষ্কারের আসল জনক?
সেরকম এক বিতর্কের জন্ম হয়েছিলো ১৭ শতকে। বিষয় হলো ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক কে এই নিয়ে। যারা বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে বা পড়েছে, কিংবা অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন, তারাই ক্যালকুলাস সম্বন্ধে জ্ঞান রাখেন। অনেকের কাছেই গণিতের এই শাখা খুবই জটিল বলে বিবেচিত হয়। তো যে জিনিসের আবিষ্কারক নিয়েই বিতর্ক, সেটা জটিল হলে বেমানান হবে না একেবার। আগের কথায় ফিরে আসা যাক। ১৭ শতকের দিকে বিজ্ঞানী নিউটন ও গণিতবিদ লিবনিজের মধ্যে ইনফিনিটেসিমাল ক্যালকুলাস আবিষ্কার নিয়েই বিতর্কের সৃষ্টি হয়। নিউটন ও লিবনিজ তাঁদের পরবর্তী জীবনে এই দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতায় মোটামুটি একধরনের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে পড়েন।
মহামতি নিউটন
বর্তমানে আমরা সাধারণত কোনো গবেষণাপত্র যিনি আগে প্রিন্ট মিডিয়াতে প্রকাশ করেন, তিনিই হন ঐ গবেষণার স্বত্বাধিকারী। কিন্তু সেসময়ে, অর্থাৎ ১৭ শতকে কিন্তু এই সুযোগ ছিলো না। ফলে সেসময়ে নিউটন এবং লিবনিজের উভয়ের মধ্যে স্বত্বাধিকার নিয়ে ভীতি অবশ্যই ছিলো। আর তাছাড়া সেসময়ে এক গবেষকের লেখা গবেষণাপত্র আরেক নীতিহীন গবেষক হয়তো চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দিতেন। কাজেই নিজেদের গবেষণাপত্র নিয়ে বিজ্ঞানীগণ থাকতেন ভীত।
গণিতবিদ লিবনিজ
তো সেসময়ে কে হবেন গবেষণার জনক, এই বিষয়ে নীতি ছিলো যে নিকট বন্ধু কিংবা সহকর্মীর কাছে এই গবেষণার কথা বলা এবং কখনো কখনো নিজের ব্যক্তিগত নোটটিও দেখানো। এখন সেখানেও রচনা চুরির একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়। এসবের কারণেই মূলত নিউটন এবং লিবনিজের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। তাঁরা দুজনেই মনে করতেন যে একজন আরেকজনের গবেষণা চুরি করেছেন। চলুন জানা যাক যে আসলে কে আবিষ্কার করলো ক্যালকুলাস; নিউটন? নাকি লিবনিজ?
ক্যালকুলাসের সূচনা যেখান থেকে
যদিও এখানে বলা হচ্ছে যে, ক্যালকুলাস আবিষ্কার নিয়ে নিউটন এবং লিবনিজের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কিন্তু তাঁরা আসলে কেউই ক্যালকুলাসকে নিজেদের বুদ্ধিমত্তার দ্বারা আবিষ্কার করেননি। কারণ ক্যালকুলাস আবিষ্কৃত হয়েছে আরো অনেক আগে। বরং বলা যায় যে, পূর্বতন গণিতবিদ, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের কৃত কাজের শেষ পরিণতি দিয়েছেন নিউটন এবং লিবনিজ। তাঁরা ছড়ানো ছিটানো বিষয়গুলোকে একত্রিত করেছেন এবং একটি পরিপূর্ণ গণিতভিত্তিক রূপ প্রদান করেছেন।
প্রাচীনকালের অনেক গণিতবিদের চিন্তাধারাই ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাস বা সমাকলনের ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলো। যদিও সেই ধারণা যথাযথ সুসঙ্গত ও নিয়মতান্ত্রিক ছিলো না। খ্রিস্টপূর্ব ১৮২০ সালের দিকে মিশরে (Egyptian Moscow Papyrus) ক্ষেত্রফল ও আয়তন নির্ণয়ের জন্য ক্যালকুলাসের মতোই পদ্ধতি ব্যবহৃত হত। কিন্তু সূত্রগুলো ছিলো গুটিকয়েক বাস্তবসংখ্যার প্রেক্ষিতে, অর্থাৎ বাস্তবিক কোনো সূত্র ছিলো না। কিছু কিছু পদ্ধতি আপেক্ষিকভাবে সঠিক ছিলো, কিন্তু সেগুলোর সঠিক প্রতিপাদনও ছিলো না। খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতকে ভারতীয় উপমহাদেশের গণিতবিদগণ ত্রিকোণমিতিকে অনেক সমৃদ্ধ করেছিলেন যা ‘সুল্বা সূত্র’ নামক গ্রন্থভুক্ত করা হয়। তাঁরা কয়েকটি ত্রিকোণমিতিক ফাংশনের প্রায় সঠিক ডিফারেন্সিয়েশন বা ব্যবকলন করতে সক্ষম হন।
বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের জন্য আর্কিমিডিসের পদ্ধতি
গ্রিসে ইউডক্সাস ‘মেথড অব এক্সাশন’ বা অবসাদ পদ্ধতি ব্যবহার করে ক্ষেত্রফল ও আয়তন নির্ণয়ের জন্য লিমিট ধারণার সূত্রপাত করেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস এই ধারণাকে আরো সুসংবদ্ধ ও উন্নত করেন এবং ‘হিউরিস্টিক’ (ন্যায়শাস্ত্রগত অনুসন্ধানবিদ্যা) প্রণয়ন করেন, যা ছিলো সমাকলনেরই প্রতিচ্ছবি। এই পদ্ধতির মাধ্যমে তিনি বৃত্তের অন্তর্গত ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে সক্ষম হন। আর্কিমিডিস প্রথম অনিয়মিত বক্ররেখার স্পর্শক নির্ণয়ের জন্য এমন এক পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা ব্যবকলনের সদৃশ। যখন তিনি সর্পিলাকার বক্ররেখা নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন তিনি পয়েন্ট মোশন বা বিন্দুগতিকে ২টি অংশে ভাগ করেন- (১) ব্যাসার্ধ গতি এবং (২) বৃত্তীয় গতি এবং উভয় প্রকার গতিকে সংযুক্ত করতে থাকেন। এভাবে বক্ররেখাটির স্পর্শক বের করেন।
চতুর্থ শতকে চীনে লিউ হু কর্তৃক মেথড অব এক্সাশন পুনরাবিষ্কৃত হয়। পঞ্চম শতকে Zu Chongzhi কর্তৃক আরো এক পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়, যা পরবর্তীতে ক্যাভেলিয়ারি’স প্রিন্সিপাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই নীতির সাহায্যে গোলকের আয়তন নির্ণয় করা সম্ভব ছিলো।
প্রায় ১৭ শতক পর্যন্ত যতদিন না ‘Method of Indivisible’ আবিষ্কৃত হয় এবং সর্বোপরি নিউটন কর্তৃক সমাকলনের কাঠামো হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না হয়, ততদিন বিজ্ঞানীরা একে গ্রহণ করেননি।
নিউটন? নাকি লিবনিজ?
নিউটনের শিক্ষক এবং পূর্বসূরী ছিলেন ক্যামব্রিজের গণিত বিভাগের লুকাসিয়ান অধ্যাপক আইজ্যাক ব্যারো। ব্যারো তাঁর ‘জিওমেট্রিক্যাল লেকচারস’ গ্রন্থে ক্যালকুলাসের মৌলিক ধারণার কথা লিখে গেছেন। পরবর্তীতে নিউটন সেই নীতিগুলো সূত্রবদ্ধ করতে শুরু করেন। বিজ্ঞানী নিউটন ছিলেন গবেষণাপত্রের আবিষ্কার নিয়ে যেকোনো ধরনের বিতর্কবিরোধী। কিন্তু এই মনোভাবের ফলেই তিনি আসলে শেষপর্যন্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। প্রায় ১৬৬০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিজ্ঞানী নিউটন ক্যালকুলাস সম্বন্ধে তাঁর ধারণাগুলো সূত্রবদ্ধ করা শুরু করেন। ১৬৬৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ‘ফ্লাক্সিওন’ সম্পর্কিত তাঁর তত্ত্ব লিপিবদ্ধ করেন। তিনি এরপর ক্যালকুলাসের উপর বেশ কয়েকটি গবেষণাপত্র তৈরি করেন, কিন্তু তিনি সেগুলো কোথাও প্রকাশ করেননি তখন। ক্যালকুলাস সম্পর্কিত তাঁর অধিকাংশ গবেষণাপত্রই তখন অপ্রকাশিত থেকে যায়, যা প্রকাশিত হয় ১৮ শতকের শুরুর দিকে এসে। কিছু কিছু গবেষণাপত্র তাঁর মৃত্যুর পরেও প্রকাশিত হয়।
তো গবেষণা ও গবেষণাপত্রের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, বিজ্ঞানী নিউটন বেশ আগেই ক্যালকুলাস সম্বন্ধে তাঁর গবেষণা ও অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁর গবেষণাপত্রগুলো ১৮ শতকের আগে প্রকাশ হয়নি। যদিও তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মীদের তাঁর কাজের সম্বন্ধে বলতেন। এখন ১৬৬৫-৬৬ সালে যখন নিউটন তাঁর ফ্লাক্সিওন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, তখন লিবনিজের বয়স ছিলো ২০ বছরের মতো। কাজেই তাঁর তখন গণিতের সত্যিকার জ্ঞান থাকা কিছুটা অসম্ভব। অন্ততপক্ষে ক্যালকুলাসের মতো একটা জটিল শাখা নিয়ে গবেষণা করা তো আরো অসম্ভব। তবে কি লিবনিজ নিউটনের গবেষণার মূল ধারণা চুরি করেছিলেন?
কে আবিষ্কার করলেন ক্যালকুলাস- নিউটন? নাকি লিবনিজ?
নিউটনের অনুসারীদের কথা বাদ দিয়ে যদি আমরা নিরপেক্ষ ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যাবে যে আসলে লিবনিজ নিউটনের কোনো তত্ত্ব বা ধারণা চুরি করেননি। তিনি স্বতন্ত্রভাবেই ক্যালকুলাস সম্পর্কে তাঁর ধারণা ও সূত্রসমূহ লিপিবদ্ধ করেন। তিনি এ সম্পর্কে গবেষণা শুরু করেন ১৬৭০ সাল থেকে এবং ১৬৭৪ সালে তিনি এই সম্পর্কে তিনি সবাইকে বলেন। তিনি যে গবেষণাপত্রটি তৈরি করেছিলেন, সেটি প্রকাশিত হয় ১৬৮৪ সালে এসে। অর্থাৎ, প্রায় ১০ বছর পরে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। তাঁর গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিলো ‘A New Method for Maxima and Minima, as Well Tangents, Which is not Obstructed by Fractional or Irrational Quantities’ ৬ পৃষ্ঠার এই গবেষণাপত্রটি ছিলো বেশ অস্পষ্ট এবং দুর্বোধ্য।
কিন্তু চিন্তার ব্যাপার হচ্ছে যে, একদিকে নিউটন লিবনিজের বেশ কয়েক বছর আগেই তাঁর গবেষণা কাজ লিপিবদ্ধ করেছিলেন কিন্ত সেগুলো প্রকাশ পেয়েছিলো ১৮ শতকে এসে। অন্যদিকে লিবনিজ কাজ শুরু করেছিলেন নিউটনের বেশ কয়েক বছর পরে এসে। অথচ গবেষণাপত্র প্রকাশ করে ফেললেন নিউটনের আগে। ব্যাপারটা এখানে গোলমেলে হয়ে গেলো। কিন্তু নিউটন এবং লিবনিজ উভয়েই স্বতন্ত্রভাবে ক্যালকুলাস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখন নিউটন যেহেতু আগে গবেষণা শুরু করেছিলেন, সেহেতু তাঁকে ধরা হলো প্রথম আবিষ্কারক এবং লিবনিজ ২য় আবিষ্কারক। সেটাও অমীমাংসিত থেকে গেলো। কারণ এখানে দুইজনেই আলাদা আলাদা ভাবে আবিষ্কার করেছে ক্যালকুলাস। কাজেই প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বলা হলে তাঁদের কোনো একজনকে হেয় করা হয়। বরং আমরা বলতে পারি তাঁরা দুইজন ক্যালকুলাসের সহ-আবিষ্কারক।
কিন্তু সেসময়ে মহামতি নিউটনের অনুসারীরা লিবনিজের বিরুদ্ধে গবেষণা চুরির অভিযোগ করেন। কেউ কেউ তাঁকে জার্মানির একজন বৈজ্ঞানিক গুপ্তচর হিসেবেও আখ্যায়িত করেন, যিনি কিনা জার্মানির বাইরের বিজ্ঞানীদের গবেষণা চুরি করে জার্মানিতে নিয়ে যান। লিবনিজ লন্ডনে এসেছিলেন কয়েকবার। এই ঘটনাকে তাঁরা গুপ্তচরবৃত্তির কারণ হিসেবেও দেখালেন নিউটনপন্থীরা। এভাবে ১৭ শতকের শেষের দিকে এসে এই দুই বিজ্ঞানী ক্যালকুলাস আবিষ্কার নিয়ে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হন।
এই বিতর্ক খুব জটিল হয়ে ওঠে একসময়। কিন্তু নিউটন সম্পর্কে লিবনিজ বলেন যে,
নিউটনের কাছে লেখা লিবনিজের চিঠি
লিবনিজ মাঝে মধ্যেই লন্ডনে আসতেন। নিউটন তাঁর গবেষণা সম্বন্ধে তাঁর নিকট বন্ধু ও সহকর্মীদের সাথে যে কথা বলতেন সে সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে। এঁদের অনেকেই ছিলো লিবনিজের ঘনিষ্ঠ। কাজেই নিউটনের অনুসারীরা মনে করেন যে লিবনিজ এঁদের কাছে ক্যালকুলাস সম্পর্কে নিউটনের কাজ সম্বন্ধে জেনেছেন। মজার ব্যাপার হলো, নিউটন এবং লিবনিজের মাঝে একসময় চিঠির আদান-প্রদান হতো নিয়মিত। তাঁরা তাঁদের চিঠিতে গণিত সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচনা করতেন। নিউটন চিঠিতে লিবনিজকে তাঁর গবেষণা সম্বন্ধেও জানাতেন। যা-ই হোক, লিবনিজের অপ্রকাশিত গবেষণাপত্র পরীক্ষা করে জানা যায় যে নিউটনের সাথে সাহচর্য থাকার পরেও তিনি ক্যালকুলাসের গবেষণা করেছেন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে, যেখানে নিউটনের গবেষণার প্রভাব নেই।
লিবনিজ যখন গণিতের একজন শিক্ষানবিশ, তখন তিনি লন্ডনে আসেন। সেখানে তিনি নিউটনের সম্বন্ধে অল্প অল্প শোনেন। যদিও তিনি সরাসরি তখন নিউটনের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। কিন্তু রয়্যাল সোসাইটিতে নিউটনের দুজন বিশেষ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, হেনরি ওল্ডেনবার্গ এবং জন কলিনসের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখনো নিউটনের কাজ প্রিন্ট মাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। কাজেই লিবনিজ নিউটনের কাজ চাক্ষুষ দেখেননি। হতে পারে যে তিনি ওল্ডেনবার্গ ও কলিনসের আছে নিউটনের কাজ সম্পর্কে শুনেছিলেন।
লিবনিজ লন্ডন থেকে আইজ্যাক ব্যারোর ‘জিওমেট্রিক্যাল লেকচারস’ বইটি কিনে নিয়ে আসেন। পূর্বেই বলা হয়েছে যে ব্যারো ছিলেন নিউটনের শিক্ষক। তিনি এই বইতে ট্যানজেন্ট সম্পর্কে তাঁর ধারণা ও সূত্র লিপিবদ্ধ করেন যা মূলত ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাসের সাথে সম্পর্কিত। কাজেই নিউটনের অনুসারীরা লিবনিজকে এই দোষেও দোষারোপ করে যে তিনি ব্যারোর বই থেকে সাহায্য নিয়েছেন। অন্যদিকে লিবনিজের অনুসারীরা বলে যে, লিবনিজ এই বই পড়ার আগেই ক্যালকুলাস সম্বন্ধে গবেষণা শুরু করেছিলেন।
১৬৭৬ সালের জুন মাসে নিউটন ওল্ডেনবার্গের কাছে একটি চিঠি লেখেন। এই চিঠিতে তিনি তাঁর দ্বিপদী উপপাদ্য সম্পর্কে বিবৃত করেন, যেখানে তিনি দেখান যে সকল রাশিকে অসীম সংখ্যক অংশে বিভক্ত করা যায়। তিনি এই সূত্রানুসারে বলেন যে, সকল বক্ররেখাকেও অসীম সিরিজে ভাগ করা যায় এবং এর সাহায্যে পদার্থের ক্ষেত্রফল, দৈর্ঘ্য, আয়তন ও এর পৃষ্ঠতল পরিমাপ করা যায়। এই চিঠিতে নিউটন ফ্লাক্সিওন সম্পর্কে কিছুই লিখেননি। যেহেতু তিনি এই সম্পর্কে কোনো কিছুই জানাননি চিঠিতে, কাজেই গাণিতিক ধারা সম্পর্কে তাঁর কাজ এবং লিবনিজ তাঁর নিজের কাজের মধ্যে তেমন কোনো মিল পেলেন না। তিনি নিউটনকে চিঠি লিখলেন এই সম্পর্কে।
এই প্রতিউত্তরে লিবনিজ ধারা সম্পর্কে তাঁর কৃত কাজের বর্ণনা দিলেন এবং প্রথম চিঠিতে নিউটন আসলে ঠিক কোন বিষয়ে মতামত দিয়েছেন, সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে জানাতে বললেন। নিউটন এই চিঠির প্রতিউত্তরে জানালেন যে, তিনি ট্যানজেন্ট অংকনের একটি সাধারণ সূত্র আবিষ্কার করেছেন এবং ম্যাক্সিমা-মিনিমা নির্ণয় করারও পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। গবেষণার বাকি বিষয়ে তিনি জানাতে চান না।
লিবনিজের ব্যক্তিগত নোটে দেখা যায় যে তিনি ইন্টিগ্রেশনে জন্য বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করেন, যা এখনো ব্যবহার হচ্ছে
১৭১৫ সালে, লিবনিজের মৃত্যুর প্রায় বছরখানেক আগে, লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি স্যার আইজ্যাক নিউটনকে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক হিসেবে ঘোষণা করে। এটাও বলা হয় যে, লিবনিজ নিউটনের কতিপয় চিঠি ও গবেষণার প্রেক্ষিতে ক্যালকুলাস নিয়ে গবেষণা করেন। এর বেশ কয়েক বছর পরে লিবনিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় রয়্যাল সোসাইটি নিউটন ও লিবনিজ উভয়কেই ক্যালকুলাসের স্বতন্ত্র আবিষ্কারক হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু তখন লিবনিজ আর জীবিত নেই।
প্রকৃতপক্ষে লিবনিজের মৃত্যুর পরও এই নিয়ে অনেক বিতর্ক তখনো থেকে গিয়েছিলো। এমনকি নিউটন এবং তাঁর অনুসারীরা লন্ডনের কূটনৈতিক পৌরসভায় তাঁর গবেষণার পাণ্ডুলিপি ও লিবনিজের কাছে পাঠানো চিঠি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রস্তাব দেন। লিবনিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিলো এই যে, তিনি ক্যালকুলাসে বিকল্প চিহ্নের ব্যবহার করেন। তিনি সমাকলনের জন্য S এর বর্ধিত রূপ এবং ব্যবকলনের জন্য d চিহ্নের ব্যবহার করেন, যা এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জোহান বার্নোলি আবার লিবনিজের পক্ষ নিয়ে নিউটনের কাজের সমালোচনা করেন এবং বলেন যে নিউটন লিবনিজের গবেষণার ধারণা চুরি করেছেন। তিনি একটি প্রতিযোগিতামূলক সমস্যার অবতারণা করেন যা ব্র্যাকিস্টোক্রোন প্রব্লেম নামে পরিচিত। এই সমস্যা তিনি প্রেরণ করেন নিউটনের কাছে। এই সমস্যার উপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন লিবনিজ। সেই প্রতিবেদনে তিনি লেখেন যে যারা ‘তাঁদের’ গবেষণার সাথে পরিচিত কেবল তাঁরাই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে।
এখানে ‘তাঁদের’ শব্দের অবতারণা করার কারণে একটি নতুন চরিত্রের উদয় হয়। সেই চরিত্রটি ছিলো ফ্যাটিও ডি ডুইলার, একজন সুইস গণিতবিদ। ইনি পূর্বে লিবনিজ এবং হাইগেনস এর কয়েকটি কাজে তাঁদের সহযোগী ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি লিবনিজের বিক্ষেপিত আচরণের কারণে নিউটনীয় দলে যোগ দেন। লিবনিজপন্থীরা মনে করেন যে, নিউটন ডুইলারের থেকে লিবনিজের কাজ সম্বন্ধে জেনেছেন। কিন্তু ডুইলার বলেন যে, ক্যালকুলাস সম্বন্ধে নিউটনের কাজ মৌলিক এবং নিউটন লিবনিজের আগেই সেটি আবিষ্কার করেন। এভাবে এই বিতর্ক আসলে জটিল হতে শুরু করে। কারণ একদিকে নিউটনপন্থীরা, অন্যদিকে লিবনিজপন্থীরা। তারা একদল আরেকদলকে দোষারোপ করতে থাকেন।
দুজনের কাজ একই বিষয়ে হলেও কাজের পথ এবং ফলাফল ছিলো আলাদা
এখন গণিতবিদ ও গবেষকদের গবেষণায় দেখা যায় যে, নিউটন তাঁর আবিষ্কৃত পদ্ধতির দ্বারা কোনো বক্ররেখার অন্তর্গত ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে পারতেন। তাঁর এই গবেষণার মূলভিত্তি ছিলো গতি (Motion)। তিনি ক্যালকুলাস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন মূলত পদার্থবিজ্ঞানে কাজের লাগানোর জন্য। অন্যদিকে লিবনিজ নিজের গবেষণার ক্ষেত্রে গতিকে ব্যবহার করেননি, বরং ব্যবহার করেছেন যোগ ও বিয়োগের ধারণাকে। তাঁর পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় জ্যামিতির ক্ষেত্রে।
তো শেষপর্যন্ত এতসব দ্বন্দ্ব-বিরোধ-বিতর্কের পর রয়্যাল সোসাইটি নিউটন এবং লিবনিজ উভয়কেই স্বতন্ত্রভাবে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক হিসেবে স্বীকৃতি দেন। যদিও ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সমাজ নিউটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন এবং তাঁরা প্রায় এক শতক পর্যন্ত নিজেদের আত্মমর্যাদার কারণে লিবনিজের গবেষণা গ্রহণ করেননি। তাঁরা শুধুমাত্র নিউটনের গবেষণাকেই গ্রহণ করেছিলেন এবং লিবনিজের তত্ত্বকে গ্রহণ করেননি। তাঁরা কেবল নিউটনের গবেষণারই চর্চা করতেন। যদিও পরবর্তীতে তাঁরা লিবনিজের কাজকে স্বীকৃতি দেন। কিন্তু এখনো ক্যালকুলাস কে আবিষ্কার করেছেন, এ নিয়ে নিউটনপন্থী ও লিবনিজপন্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থেকেই গেছে।
সংখ্যা আবিষ্কারের ইতিহাস কি?
হিসাবের দুনিয়ায় সংখ্যা ছাড়া আমাদের কি জীবন চলে? দিন, মাস, বছরের হিসাব রাখা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটা কাজে সংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। আর তাই তো সংখ্যার মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক প্রাচীন সভ্যতায় মানুষ সংখ্যার সাথে ঐশী সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে। কিছু সংখ্যাকে মানুষ মনে করত পবিত্র, আবার কিছুবিস্তারিত পড়ুন
হিসাবের দুনিয়ায় সংখ্যা ছাড়া আমাদের কি জীবন চলে? দিন, মাস, বছরের হিসাব রাখা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটা কাজে সংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। আর তাই তো সংখ্যার মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক প্রাচীন সভ্যতায় মানুষ সংখ্যার সাথে ঐশী সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে।
কিছু সংখ্যাকে মানুষ মনে করত পবিত্র, আবার কিছু সংখ্যা ছিল মানুষের কাছে আতঙ্ক। এমনকি পাশ্চাত্যে আজও অনেক জায়গায় সেই বিশ্বাস টিকে আছে। Unlucky 13 কিংবা Lucky 7 এর মতো বিষয়গুলো অদ্যাবধি অনেক মানুষ বিশ্বাস করে। তবে নিরীহ গোবেচারা সংখ্যাদের মাঝে আদৌ কোনো শুভত্ব বা অশুভত্ব লুকিয়ে আছে কিনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে সেই বিশ্বাস খণ্ডন করা যতটা না আকর্ষণীয়, তার চেয়ে ঢের আকর্ষণীয় সংখ্যা ও গণনা পদ্ধতির ক্রমবিকাশ ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাস সম্পর্কে জানা। এই ফিচারটি সাজানো হয়েছে সংখ্যার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নিয়ে।
শুরুর কথা
সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই গণনার প্রয়োজনীয়তা মানুষ উপলব্ধি করেছে। শিকার করা প্রাণীর সংখ্যা কিংবা দ্রব্য বিনিময় যুগে লেনদেনের সুবিধার্থে হিসাব নিকাশের ধারণা অর্জন করা মানুষের জন্য ছিল অপরিহার্য। তবে শুরুর দিকে সংখ্যা নিয়ে মানুষের ধারণা বেশ অস্পষ্ট ছিল। সংখ্যাগুলো সর্বদাই বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকত, যেমন- একটি পাখি, এক জোড়া জানোয়ার, দুটো হাত, এক হাঁড়ি মাছ।
আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে এক-দুশো বছর আগেও সংখ্যা নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিলো না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় দক্ষিণ আফ্রিকার হটেনটট আদিবাসীর কথা। তাদের ভাষায় শুধু এক থেকে চার পর্যন্ত সংখ্যা ছিল এবং চারের চেয়ে বড় সব সংখ্যাই তাদের ভাষায় অনেক! আবার অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী কামিলারই গোত্রের মানুষ তিনের চেয়ে বড় কোনো সংখ্যা বোঝাতে সেই সংখ্যাকে এক থেকে তিন পর্যন্ত সংখ্যাগুলোর যোগফল আকারে প্রকাশ করত। যেমন তাদের কাছে মাল মানে এক, বুলান মানে দুই, গুলিবা মানে তিন। তাই চারকে তারা বলত বুলান-বুলান (দুই-দুই) পাঁচকে বুলান-গুলিবা (দুই-তিন) আর ছয়কে (গুলিবা-গুলিবা)।
এখন প্রশ্ন চলে আসে কামিলারাই গোত্রের ভাষায় একশ কিংবা এক হাজারকে কীভাবে বলা যায়? খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে হটেনটট কিংবা কামিলারাই গোত্রের গণনা পদ্ধতি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু এতে তাদের কিছুই আসে যায়নি, কারণ একশ পর্যন্ত গণনা করার দরকারই হয়ত তাদের ছিল না। তবে নবপোলীয় যুগে উন্নত সভ্যতাগুলোর বিকাশের সাথে সাথে প্রয়োজন পড়ল আরও উন্নত গণনা পদ্ধতির।
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী
মিশরীয় গণনা পদ্ধতি
মানব সভ্যতা বিকাশের পেছনে মিশরীয়দের অবদান অনস্বীকার্য। প্রাচীন মিশরে ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থাপত্য এবং জীবন যাত্রায় প্রভূত উন্নতির সাথে সাথে একটি উন্নত গণনা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। আর সেই প্রয়োজনীয়তা থেকে বিকশিত হয়েছিল মিশরীয় সংখ্যা পদ্ধতি। প্রকান্ড পিরামিডগুলো নির্মাণের সময় হাজার হাজার শ্রমিকের খোরাক এবং বিপুল পরিমাণ নির্মাণ সামগ্রীর পাকা হিসাব রাখতে তারা সংখ্যা প্রতীক ব্যবহার করত। তবে ধারণা করা হয় মিশরীয়দের সংখ্যা পদ্ধতির সূচনা হয়েছিল পিরামিডেরও আগে, খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের দিকে।
মিশরীয় সংখ্যা পদ্ধতি
কিন্তু আমাদের এখনকার মতো ছিল না মিশরীয়দের সেই সংখ্যাপদ্ধতি। সেখানে ছিল না শুন্যের ব্যবহার। বরং ১০ এর বিভিন্ন গুনিতকের জন্য ছিল আলাদা আলাদা প্রতীক। ধরা যাক, মিশরীয় পদ্ধতিতে আমরা ৮৩৭২ লিখতে চাই। এক্ষেত্রে আমাদের ৮ টি ০০০, ৭টি ১০০, ৩টি ১০ এবং ২টি ১ পাশাপাশি লিখতে হবে। ফলে ৮৭৩২ সংখ্যার প্রাচীন মিশরীয় রূপটি হবে নিচের ছবিটির মতো।
মিশরীয় পদ্ধতিতে ৮৭৩২
ব্যাবিলনীয় পদ্ধতি
গণিতশাস্ত্রে ব্যাবিলনীয়দের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। একদিকে জ্যামিতি শাস্ত্র বিকাশিত হয়েছিল মিশরে, আর অন্যদিকে পাটিগণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যা বিকাশিত হয়েছিল ব্যাবিলনে। ব্যাবিলনীয় বিজ্ঞানের সুদূরপ্রসারী প্রভাব আজও আমাদের মাঝে বিদ্যমান। বৃত্তকে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে বিভক্তকরণ এবং ৬০ মিনিটে ১ ঘন্টা ও ১২ ঘন্টায় ১ দিনের প্রচলন কিন্তু ব্যাবিলনীয়রাই করেছিল অর্থাৎ ব্যাবিলনীয় ১ মিনিট ছিল আমাদের এখনকার ২ মিনিটের সমান। তবে ব্যাবিলনীয়দের অর্জিত জ্ঞানের বেশিরভাগই কালের বিবর্তনের হারিয়ে গেলেও মৃতপাত্রে অঙ্কিত ও পাথরের ফলকে খোদাই করা লেখা থেকে জানা যায় ব্যাবিলনীয়রা পিথাগোরাসের উপপাদ্য ও দ্বিপদী উপপাদ্য সম্পর্কে অবগত ছিল।
মিশরীয়দের মতো ব্যাবিলনীয়রাও শুন্যের ব্যবহার জানত না। তবে মিশরীয়দের সাথে ব্যাবিলনীয়দের সংখ্যা পদ্ধতির মূল পার্থক্য হলো- মিশরীয়রা কোনো সংখ্যাকে প্রকাশ করত ১০ এর গুণিতক আকারে অর্থাৎ উপরে যেটা আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি। অন্যদিকে ব্যাবিলনীয়রা সেই কাজটিই করত ৬০ এর গুণিতক আকারে প্রকাশ করে। তাই ব্যাবিলনীয় সংখ্যা পদ্ধতিকে ষাটমূলক পদ্ধতিও বলা হয়।
ব্যাবিলনীয় ষাটমূলক সংখ্যা পদ্ধতি
উপর্যুক্ত চিহ্নগুলো ছাড়াও তারা আরও বেশকিছু শর্টকাট পদ্ধতি ব্যবহার করত। এখানে একটি প্রশ্ন অবধারিতভাবে চলে আসে- ব্যাবিলনীয়দের ৬০ প্রীতির কারণটা কী? এর কোনো সরাসরি উত্তর পাওয়া যায় না। অনেকগুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ব্যাপার এর সাথে জড়িয়ে আছে। প্রথমত, ৬০ হচ্ছে এমন একটি সংখ্যা যেটি ১,২,৩,৪,৫,৬,১০,১২,১৫,২০ এবং ৩০ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য। তাই ভগ্নাংশ সংক্রান্ত কোনো সমস্যা সমাধানে ৬০ বেশ কাজের সংখ্যা।
ধরা যাক, একটি ব্যবসায় ৩ জন অংশীদার এমনভাবে চুক্তি করল যে তারা প্রত্যেকে যথাক্রমে মোট লাভের ১/২, ১/৩ এবং ১/৬ অংশ পাবে। তাহলে যদি ৬০ টাকা লাভ হয় প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয়জন যথাক্রমে ৩০, ২০, ১০ টাকা পাবে। অর্থাৎ লাভ যত টাকাই হোক না কেন, সেটাকে যদি ৬০ এর গুণিতক আকারে প্রকাশ করা হয়, তাহলে হিসাবটা দাঁড়ায় বেশ সোজা। যদি ১০০০ টাকা লাভ হয় (১৬×৬০+৪০=১০০০), তাহলে প্রথমজন পাবে ১৬টি ৩০ টাকা বা ৪৮০ এবং সাথে বাকি ৪০ টাকার অর্ধেক ২০ টাকা। দ্বিতীয়জন পাবে ১৬টি ২০ টাকা এবং তৃতীয়জন পাবে ১৬টি ১০ টাকা এবং প্রথমজন ৪০ টাকা থেকে অর্ধেক টাকা নেবার পর বাকি অর্ধেক টাকা থেকে দুজনই এমন ভাবে ভাগ পাবে যাতে দ্বিতীয়জন তৃতীয়জনের দ্বিগুণ টাকা পায়। খুব সহজেই কোনো গুণ ভাগ করা ছাড়াই হয়ে গেল নির্ভুল বন্টন।
এখানে একটি জিনিস মনে রাখতে হবে- আমাদের মতো চমৎকার গুণ-ভাগ করার পদ্ধতি সেসময়ে জানা ছিল না। বর্তমানে আমরা যে দশমিক অঙ্কপাতন পদ্ধতিতে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ করি, সেটা আবিষ্কৃত হয়েছে ব্যাবিলনের আরও ৩০০০-৩৫০০ বছর পরে ভারতবর্ষে। এছাড়া ব্যাবিলনীয়রা এক সৌর বৎসরের দৈর্ঘ্য হিসাব করেছিল ৩৬০ দিন, যেটা প্রকৃত দৈর্ঘ্য ৩৬৫ দিনের বেশ কাছাকাছি। তাদের ১২ ঘন্টায় ১ দিন, ৬০ মিনিটে ঘন্টার কথা তো আগেই জেনেছি আমরা। আর এসব কারণে ব্যাবিলনীয়রা ষাটমূলক পদ্ধতিকেই বেছে নিয়েছিল বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করেন।
ব্যাবিলনীয়দের খোদাই করা শিলা লিপি
গ্রীক ও রোমান পদ্ধতি
ব্যাবিলন ও মিশরের মতো গ্রীক ও রোমানরাও শুন্যের ব্যবহার জানত না। এর একটি বড় কারণ গ্রীক ও রোমানরা অনেক ব্যাপারেই তাদের দ্বারা প্রভাবিত। ১০০, ২০০ প্রভৃতি সংখ্যাকে আজকের জামানার মতো এক বা দুইয়ের পিঠে দুই শুন্য এভাবে না লিখে তারা বরং ব্যাবিলন ও মিশরের মতো আলাদা প্রতীক ব্যবহার করত। তবে গ্রীকরা সংখ্যার জন্য কোনো আলাদা প্রতীক উদ্ভাবন করেনি, বরং গ্রীক বর্ণমালার অক্ষরের সাহায্যে তারা সংখ্যা প্রকাশ করত। আর রোমান পদ্ধতিতে সংখ্যা লেখা আজও প্রাথমিক স্কুলগুলোতে শেখানো হয়। তাই সেটা নিয়ে নতুন করে বলাই বাহুল্য।
গ্রীক সংখ্যার সারণী
উপরের সারণি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি λ (উচ্চারণ ল্যাম্বডা) দ্বারা বোঝানো হত ৩০ (কারণ λ এর অবস্থান ৩ নম্বর সারিতে এবং ১০ এর কলামে) এবং β (উচ্চারণ বিটা) দ্বারা বোঝানো হত ২। তাই গ্রীক পদ্ধতিতে ৩২ লিখতে চাইলে আমাদের লিখতে হবে λ β। কিন্তু সমস্যা হলো সারণি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি ১ থেকে ৯৯৯৯ পর্যন্ত সংখ্যা লিখতেই গ্রীকরা ৩৬টি আলাদা আলাদা অক্ষর ব্যবহার করত। একইভাবে একলক্ষ পর্যন্ত লিখতে ৪৬টি, দশলক্ষ পর্যন্ত লিখতে ৫৫ এবং এক কোটি পর্যন্ত লিখতে ৬৪টি আলাদা আলাদা হরফ ব্যবহার করতে হত যেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে আমরা পৃথিবীর সকল সংখ্যাকেই ০-৯ এই দশটি প্রতীকের সাহায্যে লিখতে পারি। এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন অক্ষর মনে রাখা একদিকে যেমন দুষ্কর, অন্যদিকে তাদের যোগ,বিয়োগ,গুণ,ভাগ করাও কষ্টসাধ্য।
রোমানদের পদ্ধতিটি ছিল অনেকটা মিশরীয়দের মতো। যেমন কেউ রোমান পদ্ধতিতে ২০১৭ লিখতে চাইলে তাকে দুটি এক হাজার (M), একটি দশ (X) এবং সাত (VII) পাশাপাশি লিখতে হবে। তাই রোমান পদ্ধতিতে ২০১৭ হল MMXVII
মায়া সভ্যতার গণনা পদ্ধতি
এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা যেসব সভ্যতার নাম্বার সিস্টেম নিয়ে আলোচনা করলাম, সেগুলো প্রত্যেকটি প্রত্যেকের সাথে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল অথবা প্রভাবিত হয়েছিল। তবে এই লিস্টের ব্যতিক্রম হলো মায়া সভ্যতা। ল্যাটিন আমেরিকার এই সভ্যতাটি সম্পর্কে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মানুষের জানতে পেরেছে মাত্র ৫০০ বছর আগে। অথচ মায়া সভ্যতার বিকাশকাল আজ থেকে প্রায় পনেরশ বছর আগে। মায়া সভ্যতা সম্পর্কে লোকমুখে অনেক রহস্যময় কাহিনী প্রচলিত থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে ক্যালেন্ডারের জন্য মায়া সভ্যতা সবচেয়ে বেশি পরিচিত। মজার ব্যাপার হল তাদের ক্যালেন্ডারে ২০১২ সালের পর আর কোন সাল ছিল না। এর বাখ্যা অনেকে এইভাবে দিলেন যে মায়ানরা বিশ্বাস করত ২০১২ সালের পর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, যদিও অনেক গবেষক এই মতের সাথে দ্বিমতপোষণ করেছেন। সে যা-ই হোক, মায়া সভ্যতায় সংখ্যা পদ্ধতির বিকাশ ঘটেছিল একদম স্বতন্ত্রভাবে। তাদের সংখ্যাপদ্ধতি ছিল ৫ ভিত্তিক এবং অবাক করা ব্যাপার হলো মায়ারা শুন্যের জন্য আলাদা প্রতীক ব্যবহার করত। শুন্য, এক ও পাঁচ এই তিনটি সংখ্যার জন্য তারা শুধু তারা আলাদা প্রতীক ব্যবহার করত। বাকি সকল সংখ্যাগুলো লিখত এই তিনটি প্রতীক ব্যবহার করে। সেদিক থেকে চিন্তা করলে আধুনিক পদ্ধতির অনেক কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল মায়ানরা। তবে যোগ-বিয়োগের জন্য মায়াদের পদ্ধতিও বিশেষ সুবিধের ছিল না।
মায়া সভ্যতায় ব্যবহৃত সংখ্যা প্রতীক
আধুনিক পদ্ধতি
বর্তমানে যে পদ্ধতিতে আমরা সংখ্যা লিখি সেটা প্রাচীন ভারতীয় এবং আরবদের সম্মিলিত অবদানের ফসল। আহুন্য থেকে নয় পর্যন্ত মোট দশটি প্রতীক ব্যবহার করে যেকোনো সংখ্যা লিখতে পারার বর্তমান পদ্ধতিটি ভারতীয়রা আবিষ্কার করেছিল প্রায় ৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। যদিও খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকেই এই পদ্ধতির যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন, তবে ৬০০ খ্রিস্টাব্দের আগের কোনো লিপিবদ্ধ প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
সে যা-ই হোক, ব্যবসা বাণিজ্য এবং ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে আরবদের আনাগোনা সেই সময় থেকেই ছিল। ভারতীয় পদ্ধতিতে যোগ-বিয়োগের হিসাব সে সময়ে আরবে প্রচলিত সিস্টেমের চেয়ে ছিল অনেক সহজ ও কার্যকরী। এই দারুণ পদ্ধতিটি তাই আরবদের মনে ধরে গেল খুব সহজে। ভারত থেকে শিখে আসা পদ্ধতি আরবরা ছড়িয়ে দিল সারা বিশ্বে। আরবীতে শুন্যকে বলা হয় সিফর। আরব বনিকদের কাছে শেখা শূন্য বা সিফরকে ইতালিয়রা ল্যাটিনে বলত জেপিরো। আর ল্যাটিন জেপিরো থেকেই এসেছে ইংরেজি জিরো শব্দটি। যদিও ইতালিয় বনিকরা জানত ইন্দো-আরবীয় পদ্ধতিতে হিসাব নিকাশ খুব সহজে করা যায়, তারপরও ভিনদেশীদের পদ্ধতি বলে বাণিজ্য ছাড়া আর অন্য কোনো কাজে তারা এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে চাইত না। তবে অচিরেই ইউরোপে জনপ্রিয়তা লাভ করে ইন্দো-আরবীয় পদ্ধতি। আর এই জনপ্রিয়করণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন যে মানুষটি তার নাম লিওনার্দো ফিবোনাচি(১১৭০-১২৫০)। এই ফিবোনাচির নামানুসারেই কিন্তু নামকরণ করা হয়েছে বিখ্যাত ফিবোনাচি সিরিজের, যদিও সংস্কৃত ছন্দ প্রকরণে ফিবোনাচি সিরিজের ব্যবহার বহু শতাব্দী আগে থেকেই ছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না ফিবোনাচি সেখান থেকেই আকৃষ্ট হয়েছিলেন এই ধারাটির প্রতি। সর্বপ্রথম ছন্দ প্রকরণে ফিবোনাচি ধারা ব্যবহার করেন খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের ভারতীয় পন্ডিত পিঙ্গলা। আর এটাই আদ্যবধি জানা ফিবোনাচি সিরিজ ব্যবহারের প্রাচীনতম নজির।
লিওনার্দো ফিবোনাচি
নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায় মানবসভ্যতার আজকের এই অভাবনীয় উন্নতির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে যে শাস্ত্রটি তার নাম বিজ্ঞান। গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের ভাষা। আর এতক্ষণ আমরা সেই ভাষার প্রতীক “সংখ্যা”র সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জানার চেষ্টা করলাম।
একটি কথা আমাদের মনে রাখা উচিত, কোনো সভ্যতার পক্ষেই সম্পূর্ণ শুন্য জ্ঞান থেকে জ্ঞানের সুউচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। প্রতিটি সভ্যতাই কোনো না কোনো ভাবে পূর্বতন সভ্যতাগুলোর কাছে ঋণী। কিন্তু ইতিহাসের ফাঁকতালে হারিয়ে গেছে এদের অনেকের নাম; হারিয়ে গেছে তাদের অবদান। হয়ত তাদেরই কোনো আবিষ্কার অন্য কেউ পুনরাবিষ্কার করে হয়ে গেছেন জগৎবিখ্যাত কিন্তু মূলচিন্তকের নাম পৃথিবীর মানুষ বেমালুম ভুলে গেছে। এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন চলে আসা উচিত, গণিত ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য ইতিহাসে অমর থাকা আদৌ কি খুব জরুরী? হয়ত ইতিহাসের জন্য জরুরী তবে ক্রমবিকাশমান সভ্যতার কাছে সেটি নেহাত কৌতূহল নিবারক তথ্য। কারণ প্রাচীন সভ্যতার অনেক প্রতিভাধর বিজ্ঞানী ও গণিতবেত্তার নাম ইতিহাস থেকে মুছে গেছে, কিন্তু তাদের সুদূর প্রসারী প্রভাব আজও অনুভব করে চলেছে মানবসভ্যতা। তাহলে ইতিহাসের গুরুত্ব কতটুকুই বা রইল? অবশ্যই সেটা ভেবে দেখার বিষয় এবং সেই গুরু দায়িত্ব ন্যস্ত করা হল পাঠকের উপরই।
সংক্ষেপে দেখুনইতিহাসের বিখ্যাত পাঁচটি তরবারির নাম কি?
মানুষের ইতিহাসে তরবারির ব্যবহার শুরু হয় ব্রোঞ্জ যুগে। সর্বপ্রাচীন তরবারির যে নমুনাটি পাওয়া যায় সেটি খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ সালে তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। একসময়কার খাবার সংগ্রহ ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনীতা থেকে মানুষ অস্ত্র নির্মাণ করলেও সময়ের সাথে সাথে অস্ত্রের ব্যবহার হয়ে দাঁড়ায় মানুষের কী ভালো কী মনবিস্তারিত পড়ুন
মানুষের ইতিহাসে তরবারির ব্যবহার শুরু হয় ব্রোঞ্জ যুগে। সর্বপ্রাচীন তরবারির যে নমুনাটি পাওয়া যায় সেটি খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ সালে তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। একসময়কার খাবার সংগ্রহ ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনীতা থেকে মানুষ অস্ত্র নির্মাণ করলেও সময়ের সাথে সাথে অস্ত্রের ব্যবহার হয়ে দাঁড়ায় মানুষের কী ভালো কী মন্দ, কী ন্যয় কী অন্যায়- যাবতীয় চাহিদা পূরণের জন্য ব্যবহৃত অন্যতম উপায়। আগ্নেয়াস্ত্র আবিস্কারের আগ পর্যন্ত তরবারিই ছিল মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত হাতিয়ার। এই লেখায় তুলে ধরা হল পৃথিবীর ইতিহাসে ব্যবহৃত পাঁচটি তরবারির কথা যেগুলো বিখ্যাত হয়েছিল এদের তরবারিসুলভ গুণ ও একই সাথে এদের ব্যবহারকারীর খ্যাতির কারণে।
জুলফিকার
জুলফিকার ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী ইবনে আবু তালিব (রা) এর ব্যবহৃত তরবারি। উহুদ এর যুদ্ধে হযরত মুহাম্মদ (সা) তার চাচাতো ভাই আলী-কে এই তরবারি দিয়েছিলেন।
ইসলামিক বর্ণনা থেকে জানা যায়, উহুদের যুদ্ধে মক্কার সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধার ঢাল ও শিরস্ত্রাণ এক আঘাতে দ্বিখণ্ডিত করেন আলী (রা)। এই আঘাতে তার তরবারিটিও ভেঙে যায়। এই ঘটনার পর হযরত মুহাম্মাদ (সা) তার নিজ তরবারি জুলফিকার আলীকে দেন। শিয়া মতাদর্শ অনুযায়ী, মুসলমানদের বারোতম ইমাম মুহাম্মাদ আল মাহদী’র নিকট সংরক্ষিত ইসলামের ঐতিহাসিক জ্ঞান ও হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর যুদ্ধাস্ত্রের এক গোপন সংগ্রহ যা ‘আল জাফর’ নামে পরিচিত সেখানে এই তরবারিটি রাখা আছে।
মূল জুলফিকার তরবারিটির প্রকৃত অবয়ব জানা যায় না। তবে ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনায় এটিকে চিত্রায়িত করা হয়েছে দুইটি দীর্ঘ ব্লেড জোড়া লাগানো অবস্থায়, যার অগ্রভাগ অনেকটা কাঁচির মত দ্বিখণ্ডিত। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় একে দুটো দীর্ঘ ব্লেড V আকৃতিতে জোড়া লাগানো অবস্থায় চিত্রায়িত করা হয়।
জুলফিকার। মুঘল আমলে তৈরি রেপ্লিকা
অটোমান পতাকায় V আকৃতির জুলফিকার
মধ্য প্রাচ্যীয় যুদ্ধাস্ত্রের বর্ণনায় জুলফিকার-এর এর কথা অবধারিতভাবেই আসে। এর আকৃতির অনুকরণে এক সময় প্রাচ্যের অঞ্চলগুলোতে তরবারি তৈরির সময় অগ্রভাগ দ্বিখণ্ডিত রাখা হত।
অটোমান সাম্রাজ্যের পতাকায় জুলফিকার এর বহুল চিত্রায়ন দেখা যায়। বিশেষত ষোল ও সতের শতকের অশ্বারোহী বাহিনী ‘জেনিসারি’র পতাকায় এর ছবি অঙ্কিত হত। এমনকি জুলফিকার এর নাম সম্বলিত কবচের ব্যবহারও ছিল যা এখনও বিদ্যমান। কবচে খোদাই করা লেখাগুলোর মধ্যে বহুল ব্যবহৃত দুটো লাইন ছিল- “আলী অদ্বিতীয়, জুলফিকার তরবারি অদ্বিতীয়।”
শিল্পীর কল্পনায়, মুঘল সম্রাট শাহজাহান মুঘল বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। উপরের বাম দিকে যুদ্ধের প্রশিক্ষিত হাতি বহন করছে জুলফিকার এর প্রতীক
জুলফিকার এর একটি রেপ্লিকা;
ইতিহাসের বিভিন্ন সময় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ দল, যুদ্ধে ব্যবহৃত জাহাজ এমনকি একটি ট্যাঙ্ক এর নামও জুলফিকারের নাম অনুসারে রাখা হয়েছে। বসনিয়ার যুদ্ধের সময় বসনিয়ান সৈন্যদের একটি বিশেষ ইউনিটের নাম ছিল জুলফিকার।
ওয়ালেস সোর্ড
ওয়ালেস সোর্ড ছিল স্কটিশ স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা উইলিয়াম ওয়ালেস এর তরবারি। স্কটিশদের স্বাধীনতার দাবিতে ১২৯৭ সালের স্টার্লিং এর যুদ্ধ ও ১২৯৮ সালের ফলক্রিক এর যুদ্ধে ওয়ালেস এই তরবারিটি ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়।
ওয়ালেস তরবারিটি সবচেয়ে বিখ্যাত এর বিশাল আকার ও ওজনের জন্য। ৪ ফুট ৪ ইঞ্চি দীর্ঘ ব্লেড সহ পুরো তরবারির দৈর্ঘ্য ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি! এর ব্লেডের প্রস্থ ২.২৫ ইঞ্চি আর অগ্রভাগে ০.৭৫ ইঞ্চি। বিশালাকার এই তরবারির ওজন প্রায় ৩ কেজি!
ওয়েলস মনুমেন্টে সংরক্ষিত ওয়ালেস সোর্ড
স্কটল্যান্ডের স্টার্লিং এর ওয়ালেস মনুমেন্ট এ সংরক্ষিত এই তরবারিটির আকার ও এর গঠনপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে এটি সত্যিকারের উলিয়াম ওয়ালেস এর ব্যবহৃত তরবারি কিনা তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেন, সংরক্ষিত তরবারিটি তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি তরবারির ভিন্ন ভিন্ন অংশ একসাথে করে। সংরক্ষিত তরবারিটি দুই হাতে ধরে ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে তৈরি করা। আর গবেষকদের মতে, এটি ব্যবহারের জন্য উইলিয়াম ওয়ালেস এর উচ্চতা হতে হত অন্তত ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি! অথচ ১৩ শতকের স্কটল্যান্ডের মানুষের গড় উচ্চতা ছিল ৫ ফুট। তাই কথা উঠে, হয় ওয়ালেস সে সময়ের তুলনায় একজন দানবাকৃতির মানুষ ছিলেন নতুবা সংরক্ষিত এই তরবারিটি তার ব্যবহৃত নয়।
ব্রেভহার্ট সিনেমায় উইলিয়াম ওয়ালেস এর ভূমিকায় মেল গিবসন
জানা যায়, ফলক্রিক এর যুদ্ধে আটককৃত ওয়ালেসকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর ১৩০৫ সালে ডুম্বার্টন ক্যাসল এর গভর্নরের নিকট এই তরবারিটি ছিল। যদিও এর কোনো রেকর্ড পাওয়া যায় নি। দু’শো বছর পর ১৫০৫ সালে জানা যায়, স্কটল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জেমস এর নির্দেশে তরবারিটির খাপ, হাতল ও বেল্ট পরিবর্তন করা হয়, কেননা তখন জনশ্রুতি ছিল ওয়ালেস এর তরবারিতে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল স্টার্লিং এর যুদ্ধের ইংরেজ কমান্ডার হিউ ক্রেসিংহাম এর চামড়া থেকে। ১৮৮৮ সালে ওয়ালেস মনুমেন্টে সংরক্ষণের জন্য তরবারিটি দেয়া হয়।
হনজো মাসামুনে
হনজো মাসামুনে সর্বকালের সেরা তরবারিগুলোর একটি হিসেবে খ্যাত যার নির্মাতা ছিলেন মাসামুনে। মাসামুনে ছিলেন একজন জাপানি তরবারি নির্মাতা যাকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধাতুবিদ্যাবিশারদ বলা হয়। আনুমানিক ১২৮৮ সাল থেকে ১৩২৮ সাল পর্যন্ত তার কাজের পরিধি সম্পর্কে জানা যায়। সুক্ষতম ধার ও সৌন্দর্যের কারণে মাসামুনের নির্মিত তরবারিগুলোর মান কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিল।
অস্ট্রিয়ার জাদুঘরে সংরক্ষিত মাসামুন নির্মিত একটি তরবারি
ধারণা করা হয় হনজো মাসামুনে নামটি এসেছে হনজো শিগেনাগা নামক এক জাপানি যোদ্ধার নাম থেকে। হনজো শিগেনাগা ছিলেন ১৬ শতকের উয়েসুগি ক্ল্যান এর একজন জেনারেল। উমানোসুকে নামক একজন বিখ্যাত যোদ্ধার আক্রমণে শিগেনাগার শিরস্ত্রাণ টুকরো হয়ে যায়। কিন্তু তিনি বেঁচে যান সেই লড়াইয়ে এবং পুরস্কার হিসেবে তাকে যে তরবারি দিয়ে আঘাত করা হয় সেটি রেখে দেন। তরবারিটি এর আগে অনেক বিখ্যাত যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরবর্তীতে অর্থাভাবের কারণে তয়োতমি ক্ল্যান এর নিকট তরবারিটি বিক্রি করে দেন শিগেনাগা।
মাসামুনে নির্মিত একটি তরবারি
তয়োতমি ক্ল্যান এর পতনের পর তরবারিটি জাপানের তকুগাওয়া পরিবারের নিকট আসে। জাপানের ‘শগুন’ শাসনামলের অন্যতম শাসক ছিল তকুগাওয়া পরিবার। এই তরবারিটি পরিবারের এক শাসকের পর আরেকজনের নিকট শাসনের প্রতীক হিসেবে দেয়া হত। তকুগাওয়া পরিবারের শাসনামল শেষ হবার পরেও তারা তরবারিটি রেখে দেয়। ১৯৩৯ সালে হনজো মাসামুনেকে জাপানের জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে এর সর্বশেষ মালিকানা ছিল তকুগাওয়া লেমাসা’র নিকট। যুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পনের পর ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে হনজো মাসামুনে সহ আরও ১৪টি তরবারি জাপানের মেজিরো পুলিশ স্টেশনে জমা দেন তকুগাওয়া লেমাসা। ১৯৪৬ সালে পুলিশ এই তরবারিগুলো সার্জেন্ট কোল্ডি বাইমোর নামক একজনের কাছে দেয় বলে জানা যায়। সেই থেকে এই তরবারিটির আর কোনো হদিশ পাওয়া যায় নি। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে সার্জেন্ট কোল্ডি বাইমোর নামক কোনো ব্যক্তি তরবারিগুলো গ্রহণ করেছেন এমন তথ্যের কোনো রেকর্ড জাপানের কোথাও নেই। জাপানের এমন হারিয়ে যাওয়া অনেকগুলো বিখ্যাত তরবারির মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান ছিল হনজো মাসামুনে।
জোয়ায়ুস
শার্লেম্যান, যিনি চার্লস দ্য গ্রেট নামেও পরিচিত, তার ব্যবহৃত তরবারির নাম জোয়ায়ুস। শার্লেম্যান মধ্যযুগের শুরুতে ইউরোপের একটি বড় অংশের নেতৃত্ব দেন যার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে আজকের ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো। ৭৭৪ সালে তিনি ছিলেন ইতালির রাজা। ৮০০ সালে তিনি রোমান সম্রাট হয়েছিলেন। এর তিন শতক আগে পশ্চিম ইউরোপ সাম্রাজ্যের পতনের পর তিনিই ছিলেন প্রথম স্বীকৃত সম্রাট।
ল্যুভর মিউজিয়ামে সংরক্ষিত জোয়ায়ুস
কথিত আছে, ক্রুশবিদ্ধ যিশু মৃত কিনা তা যাচাইয়ের জন্য যে বর্শা ব্যবহৃত হয়েছিল সে ‘পবিত্র বর্শা’ থেকে নেয়া উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে জোয়ায়ুস এর হাতলে। ১৮৬৭ সালে বিখ্যাত ‘বুলফিঞ্চ’স মিথোলজি’ বইয়ে দেখানো হয় শার্লেম্যান জোয়ায়ুস দিয়ে কোর্সাবল নামক একজন আরব সেনানায়কের শিরশ্ছেদ করছেন এবং আরেক বিখ্যাত যোদ্ধা ওজিয়েরের কাঁধে এটি ছুঁয়ে নাইট উপাধি প্রদান করছেন।
১২৭০ থেকে ১৮২৪ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের সম্রাটদের অভিষেক অনুষ্ঠানে জোয়ায়ুস তরবারিটি প্রদর্শিত হত। ১৭৯৩ সালে এটিকে ল্যুভর মিউজিয়ামে নিয়ে আসা হয়।
শিল্পীর কল্পনায় শার্লেম্যান, হাতে জোয়ায়ুস
প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে এসব অভিষেক অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য জোয়ায়ুসের গঠনে পরিবর্তন এসেছে অনেকবার। কোনো গবেষক বলছেন এর ব্লেডটিই কেবল মূল জোয়ায়ুসের ব্লেড, কেউ বলেন ১০ শতকে এর ব্লেড পরিবর্তন করা হয়েছে, কেউ বলেন ১৩ শতকে। আবার কারো মতে, ১০ শতকে পরিবর্তিত ব্লেডটিও ১৮০৪ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অভিষেক অনুষ্ঠানের সময় পাল্টে ফেলা হয়েছিল। ল্যুভরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, বর্তমানে প্রদর্শিত জোয়ায়ুস এর হাতলের মাথাটি তৈরি হয়েছে ১০-১১ শতকে, হাতল ও ব্লেডের সংযোগস্থল ক্রসগার্ডটি তৈরি হয়েছে ১২ শতকে এবং তরবারির খাপ তৈরি হয়েছে ১৩ শতকে।
নেপোলিয়নের তরবারি
মানব ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত এবং একই সাথে বিতর্কিত যোদ্ধা নেপোলিয়ন বোনাপার্ট অমর তার অসামান্য যুদ্ধ পরিকল্পনার জন্য। ফরাসী বিপ্লবের ধারক এবং ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়নের জীবনাবসান ঘটে আটলান্টিক মহাসাগরের সেইন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হয়ে।
নেপোলিয়নের ব্যবহৃত তরবারিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত তার স্বর্ণখচিত তরবারি যেটি ২০০৭ সালে ফ্রান্সের একটি নিলামে সাড়ে ৬ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। ১৮০০ সালে নেপোলিয়ন ইতালির আলেসান্দ্রিয়াতে মারেঙ্গোর যুদ্ধে এই তরবারিটি শেষবারের মত ব্যবহার করেছিলেন অস্ট্রিয় বাহিনীর বিরুদ্ধে। অস্ট্রিয় বাহিনীর অপ্রস্তুত অবস্থায় হঠাৎ আক্রমণ করে এই যুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিলেন নেপোলিয়ন।
নেপোলিয়নের স্বর্ণখচিত তরবারি
তরবারির প্রায় ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি দীর্ঘ ও সামান্য বাঁকানো ব্লেডটিতে স্বর্ণের কারুকাজ করা আছে। ধারণা করা হয়, এটিই নেপোলিয়নের সর্বশেষ তরবারি যেটি সাধারণ মানুষের মালিকানায় আছে।
তরবারিটির ডিজাইনের পেছনে আছে নেপোলিয়নের মিশর অভিযানের সময়কার অভিজ্ঞতা। তিনি দেখেন সেখানকার ব্যবহৃত তরবারিগুলো সামান্য বাঁকানো থাকায় এগুলো ব্যবহারে সুবিধাজনক। এরপর তিনি নিজের জন্য এই ডিজাইনের তরবারি তৈরি করেন।
নিলামে প্রদর্শিত হচ্ছে নেপোলিয়নের তরবারি
মারেঙ্গোর যুদ্ধের পর তার ছোট ভাই জেরোমি বোনাপার্টের বিয়েতে তরবারিটি উপহার দেন নেপোলিয়ন। এরপর থেকে বংশপরম্পরায় তরবারিটি তাদের কাছে ছিল।
১৯৭৮ সালে তরবারিটিকে ফ্রান্সের জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করা হয়। নিয়ম করা হয় ফরাসী নাগরিক নন এমন কেউ এটি কিনলে তার অবশ্যই ফ্রান্সে একটি ঠিকানা থাকতে হবে যেখানে তরবারিটি বছরের অন্তত ৬ মাস রাখতে হবে।
এতক্ষণ পৃথিবীর বিখ্যাত পাঁচটি তরবারি সম্পর্কে জানলেন। এই তরবারিগুলোর কোনোটি ব্যবহৃত হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে, কোনোটি মতাদর্শ প্রচারে, কোনোটি সাম্রাজ্য বিস্তারে। তবে তরবারির মূল কাজ কিন্তু একটাই, মানুষের উপর ব্যবহৃত হওয়া। ‘ফাদার অব ইউরোপ’ খ্যাত শার্লেম্যান এর তরবারি জোয়ায়ুস এর শাব্দিক অর্থ হল উৎফুল্ল! ভাবা যায়, একটা তরবারির নাম উৎফুল্ল! আজকের যুগে তরবারি কেবল সৈন্যদের সাইডআর্ম কিংবা ক্রীড়া সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হলেও একটা সময় এটাই ছিল মানুষের বিধ্বংসী কাজের প্রতীক, কারও কারও কাছে যা ছিল কেবলই উৎফুল্ল হবার নিয়ামক।
সংক্ষেপে দেখুনপ্রথম কে উড়েছিলেন আকাশে ?
পাখির প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়েই হয়ত মানুষ উড়তে চেয়েছিল ডানা মেলে। ইতিহাস যখন থেকে টিকে আছে, তার আগেও হয়তো কত মানুষ চেষ্টা করে গেছেন উড়তে। জানার উপায় নেই কেউ সফলও হয়েছিলেন কি না কিংবা জানা যাবে না কোনো ব্যর্থতার গল্পও। আকাশে ওড়ার ইতিহাসে স্মরণীয় যারা মানুষের আকাশে ওড়ার প্রচেষ্টা নিয়ে জড়িয়ে আছে নানা মানুষবিস্তারিত পড়ুন
পাখির প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়েই হয়ত মানুষ উড়তে চেয়েছিল ডানা মেলে। ইতিহাস যখন থেকে টিকে আছে, তার আগেও হয়তো কত মানুষ চেষ্টা করে গেছেন উড়তে। জানার উপায় নেই কেউ সফলও হয়েছিলেন কি না কিংবা জানা যাবে না কোনো ব্যর্থতার গল্পও।
আকাশে ওড়ার ইতিহাসে স্মরণীয় যারা
মানুষের আকাশে ওড়ার প্রচেষ্টা নিয়ে জড়িয়ে আছে নানা মানুষের নাম। গ্রিক উপকথায় ইকারাসের আকাশে ওড়ার কাহিনী হয়তো কম-বেশি সবার জানা। এরকম নানা উপকথা ছড়িয়ে আছে মানুষের আকাশে ওড়া নিয়ে। উপকথাগুলো আজ না হয় থাক চলুন ঘুরে আসি বাস্তবেই কিছু প্রচেষ্টার কথা।
পঞ্চম শতাব্দীতে ঘুড়ির উদ্ভাবন ঘটে চীনে। ছয় শতাব্দীতে ইয়ান হাংটাও এর কথা জানা যায়, যাকে বিশালাকারের ঘুড়ির সাথে বেধে উড়তে বাধ্য করা হয়েছিল।
তবে প্রথম সফলভাবে আকাশে ডানা মেলেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস ৯ম শতকে। ইবনে ফিরনাসের আকাশে ওড়ার কাহিনী নিয়েই আলোচনা করবো। তার আগে জানা যাক আরো কিছু কাহিনী।

শিল্পীর কল্পনায় ইবনে ফিরনাসের আকাশে ওড়া
সম্ভবত ইবনে ফিরনাসের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই পরের শতকে ওড়ার চেষ্টা করেছিলেন আল জহুরী। ১০০৭ খ্রিস্টাব্দে আল জহুরী তুর্কিস্থানের উলু মসজিদের ১,০০২ ফুট উঁচু মিনার হতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওড়ার প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
পশ্চিমে একাদশ শতকে ইংল্যান্ডের ইলমার অব মালমেসবুরি প্রায় ১,০০০ ফুট উচু থেকে গ্লাইডিংয়ের মাধ্যমে ওড়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি আংশিক সফলতা পেলেও দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন।




দ্য ভিঞ্চির আঁকা অর্নিথপটারের নকশা
ফিরনাসের প্রায় ৭০০ বছর পর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি আঁকেন উড্ডয়ন যন্ত্রের নকশা অর্নিথপটার। যদিও জীবদ্দশায় ভিঞ্চি কখনো সে যন্ত্রের পরীক্ষামূলক ব্যবহার করেননি, তবুও ভিঞ্চিকে উড্ডয়ন যন্ত্রের আধুনিক চিন্তক হিসেবে ধরা হয়। দ্য ভিঞ্চি ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন যন্ত্র সম্পর্কে জেনেছিলেন কি না তা জানার উপায় নেই। যদি না জেনে থাকেন, তবে বলতে হয় কয়েকশ বছর ব্যবধানে থেকেও দুজন বিজ্ঞানী একই প্রশ্নের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন, আর তা হলো কিভাবে পাখির আকাশে ওড়ার দক্ষতা মানুষের মধ্যে প্রতিস্থাপন করা যায়।
গ্যালাটা টাওয়ার হতে গ্লাইডিং করে বসফরাস পাড়ি দিয়েছিলেন আহমেদ সেলেবি
১৬৩০ খ্রিস্টাব্দে ওসমানীয় শাসনামলে আহমেদ সেলেবি ইস্তাবুলের গালাটা টাওয়ার হতে গ্লাইডিং করে বসফরাস পাড়ি দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। আহমদ সেলেবির সাফল্যে অণুপ্রাণিত হয়ে তার তিন বছর পর ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে আহমেদ সেলেবির ভাই লাগারি হাসান সেলেবি গানপাউডার দিয়ে রকেট বানিয়ে তোপকাপি প্রাসাদের নিকটে সফলভাবে আকাশের দিকে প্রায় তিনশ মিটার উপরে উঠে যান। তার রকেটের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে তিনি এখনকার প্যারাস্যুটের মতো পাখার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বসফরাসের পানিতে নেমে আসেন।
শিল্পীর কল্পনায় লাগারি হাসান সেলেবির রকেট
১৮০০ সালের দিকে স্যার জর্জ কেলি প্রথম পাখির মতো ঝাপটানো ডানার বদলে স্থির ডানার কথা বলেছিলেন। বাতাসের চেয়ে ভারী বস্তু কী কী অবস্থায় বাতাসে ভাসতে পারে, তার বৈজ্ঞানিক শর্তাবলী তিনিই প্রথম খুঁটিয়ে দেখেন। অ্যারোডাইনামিকস বা বায়ুগতিবিদ্যার জন্ম তার হাত ধরেই।
১৯০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রথম আকাশে ওড়েন রাইট ভ্রাতৃদ্বয়
যদিও রাইট ভ্রাতৃদ্বয়কেই প্রথম যন্ত্রচালিত উড়োজাহাজ উদ্ভাবনের কৃতিত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু তার আগেও অনেকেই এই লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি গিয়েছিলেন। এমনকি ১৯০১ সালে গুস্তাভ হোয়াইটহেড এবং ১৯০২ সালে রিচার্ড পিয়ার্স উড়োজাহাজ উদ্ভাবনে সফল হয়েছিলেন বলেও মেনে নেন অনেকেই। ১৯০৩ সালেই রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের কয়েক মাস আগে যন্ত্রচালিত উড্ডয়ন যন্ত্রের উদ্ভাবনের দাবি করেন জার্মান উদ্ভাবক কার্ল জথো।
এর আরো আগে ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে মন্টগোলফায়ার ভ্রাতৃদ্বয় বেলুনের সাহায্যে সফলভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করেছিলেন। আর ১৮৫২ সালে হেনরি গিফার্ড তার উদ্ভাবিত এয়ারশিপে করে পাক্কা ২৭ কিলোমিটার পাড়ি দেন। বাষ্পশক্তিতে চলতো তার জাহাজের প্রপেলার। তাছাড়া যার কথা না বললেই নয় তিনি অটো লিলিয়েনথাল, আধুনিক উড়োজাহাজ উদ্ভাবনের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা। উনবিংশ শতাব্দীতে এই অটো লিলিয়েনথালের আকাশে ওড়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা ও তার গবেষণালব্ধ ফল পরবর্তীতে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়কে উদ্বুদ্ধ করেছিল উড়োজাহাজ উদ্ভাবনের জন্য। লিলিয়েনথাল তার উদ্ভাবিত গ্লাইডারে ওড়ার সময় দুর্ঘটনায় মারা যান ১৮৯৬ সালে।

হেনরি গ্রিফার্ড ও তার এয়ারশিপ
যা-ই হোক, ১৭০০ সাল থেকে ১৯০৩ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ব্যক্তি বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন আকাশে উড়তে। তাদের প্রায় অনেকের প্রচেষ্টাই ইতিহাসে সমুজ্জ্বল। এবার চলুন আবার ফিরে যাই ৯ম শতকে ইবনে ফিরনাসের কাছে!
ইবনে ফিরনাস: প্রথম যিনি মেলেছিলেন ডানা
ইতিহাসে প্রথম সফলভাবে আকাশে ডানা মেলেছিলেন যিনি তিনি হচ্ছেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস। তিনি ৯ম শতাব্দীতে উমাইয়া খিলাফতের সময় স্পেনের আন্দালুসিয়ার একজন পলিম্যাথ বা বহুশাস্ত্র বিশারদ ছিলেন। তার উড্ডয়ন প্রচেষ্টা সম্পর্কে ঐতিহাসিক ফিলিপ কে. হিট্টি তার হিস্ট্রি অব আরব গ্রন্থে মন্তব্য করেন, “ইবনে ফিরনাসই প্রথম ব্যক্তি যিনি আকাশে ওড়ার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন বৈজ্ঞানিকভাবে।”
ইবনে ফিরনাসের পরিচয়
আব্বাস ইবনে ফিরনাসের পুরো নাম আব্বাস আবু আলকাসিম ইবনে ফিরনাস ইবনে ইরদাস আল তাকুরিনি। তার জম্ম ৮১০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন মুসলিম জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র স্পেনে। তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রকৌশলী, উদ্ভাবক, উড্ডয়ন বিশারদ, চিকিৎসক, কবি, সুরকার, পদার্থবিদ, সঙ্গীতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী।

বাগদাদে ইবনে ফিরনাসের ভাস্কর্য
তার জম্মস্থান ছিল স্পেনের রোনদায়। রোনদা এখন স্পেনের একটি পর্যটন শহর। তিনি যদিও রোনদায় জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু জ্ঞানের প্রতি তার আসক্তি থেকে তিনি রোনদা থেকে কর্ডোবায় গমন করেন। তবে তার আগে তিনি কিছু সময় ইরাকে ব্যয় করেন। তখন বাগদাদের দারুল হিকমাহ ছিল মুসলিম জ্ঞানপিপাসুদের তীর্থস্থান। তিনি সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর জ্ঞান আহরণ করেন ও ফিরে এসে কর্ডোবায় বসবাস শুরু করেন।
ইবনে ফিরনাসের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব
যদিও ইবনে ফিরনাস ভালো মানের কবি ছিলেন, কিন্তু প্রথম আকাশে ওড়ার কৃতিত্বের জন্য তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
পি. কে. হিট্টি তার হিস্ট্রি অব আরব গ্রন্থে লিখেছেন, “আবু আল কাসিম জাহরাবীর পর স্পেনে প্রাচ্য সংগীত জনপ্রিয় করার পেছনে ইবনে ফিরনাসের অনবদ্য ভূমিকা ছিল। তার উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পাথর থেকে গ্লাস তৈরি। তিনি একটি সৌরমডেলও তৈরি করেছিলেন, যেখানে নক্ষত্র, মেঘ, এমনকি বজ্রপাতের অবস্থাও দেখানো হয়েছিল।”
তিনি আল মাকাতা নামক জলঘড়ির উদ্ভাবন করেছিলেন। প্ল্যানিস্ফিয়ার নামক যন্ত্র ও পাঠের উপযোগী লেন্সও প্রস্তুত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তার বাসস্থানের একটি কক্ষে তিনি গ্রহ-নক্ষত্রের এমন একটি মডেল তৈরি করেছিলেন, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘূর্ণায়মান ছিল।
তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো পাথরের স্ফটিককে কাটার প্রক্রিয়া। স্পেনে এটি তখন সম্ভব হতো না বিধায় স্পেন এ বিষয়ে মিশরের উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ইবনে ফিরনাসের এই উদ্ভাবনের ফলে স্পেন এই নির্ভরশীলতা থেকে রেহাই পায়।
আরমেন ফিরমেন ও ইবনে ফিরনাস
আরমেন ফিরমেন ৮৫২ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোবার একটি মসজিদের মিনার হতে নিজের উদ্ভাবিত পোশাক পরে ওড়ার চেষ্টা করেন। যদিও তা সফল হয়নি, কিন্তু তারপরেও তার পোশাক নিচের দিকে তার পতনের গতিকে কমিয়ে দেওয়ায় তিনি খুব বেশি আঘাত পাননি।

শিল্পীর কল্পনায় কর্ডোবার মসজিদের মিনার হতে আরমেন ফিরম্যানের উড্ডয়ন প্রচেষ্টা
কেউ কেউ মনে করেন, ইবনে ফিরনাস ছিলেন সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং এ ঘটনাই ইবনে ফিরনাসকে আকাশে উড়তে অনুপ্রাণিত করে।
আবার অনেকেই এই মতের বিরোধিতা করেন এবং তারা মনে করেন আরমেন ফিরমেন ও ইবনে ফিরনাস একই ব্যক্তি ছিলেন এবং আরমেন ফিরমেন ইবনে ফিরনাসের নামেরই ল্যাটিন সংস্করণ। তারা মনে করেন, ইবনে ফিরনাস এই ঘটনার পর তার উড্ডয়ন যন্ত্র উন্নয়নে মনোযোগ দেন ও দীর্ঘ ২৩ বছর পর তিনি আবারো আকাশে উড়ার প্রচেষ্টা চালান।
ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রচেষ্টা
বেশ কিছু সূত্রে ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রচেষ্টা বর্ণিত হলেও তার উড্ডয়ন প্রচেষ্টার বিস্তারিত পাওয়া যায় ঐতিহাসিক আল মাকারির লেখায়। তবে আল মাকারি ইবনে ফিরনাসের সমসাময়িক ছিলেন না। তিনি ফিরনাসের বিষয়ে লেখেন প্রায় ৭৫০ বছর পর। তবে ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রচেষ্টার সফলতার বিষয়ে প্রায় সব ঐতিহাসিকই একমত।

শিল্পীর কল্পনায় আব্বাস ইবনে ফিরনাস
ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রসঙ্গে মন্তব্য পাওয়া যায় সমসাময়িক কর্ডোবার আমির প্রথম মুহাম্মদের রাজকবি মুমিন ইবনে সাইদের কবিতায়। ইবনে সাইদ ফিরনাস সম্পর্কে কবিতায় লিখেন, “শকুনের পালক দ্বারা আবৃত হলে তিনি ফিনিক্সের চেয়েও দ্রুত ওড়েন।”
ইবনে ফিরনাস তার উদ্ভাবিত উড্ডয়ন যন্ত্রে পালক ও সিল্কের ব্যবহার করেছিলেন। পঁয়ষট্টি বছর বয়সে তিনি স্পেনের কর্ডোবার নিকটবর্তী রুসাফা এলাকার আরুস পর্বত থেকে তার উদ্ভাবিত উড্ডয়নযন্ত্র সহকারে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
কর্ডোবা থেকে অনেক মানুষ তার আকাশে ওড়া দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছিলেন। ইবনে ফিরনাস তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, এখান থেকে ওড়ার পর যদি সব ঠিক থাকে তবে আমি এখানেই আবার ফিরে আসব। তার উড্ডয়নযন্ত্র সফলভাবেই কাজ করে এবং প্রায় দশ মিনিট তিনি তার যন্ত্রের সাহায্যে উড়তে সমর্থ হন। কিন্তু সফলভাবে উড়লেও তিনি একটু ভুল করেছিলেন।

দুবাইয়ের ইবনে বতুতা শপিংমলে ফিরনাসের রেপ্লিকা
আল মাকারি উল্লেখ করেন, তিনি তার শরীরকে পালক দ্বারা আবৃত করেন এবং তার শরীরে কয়েকটি পাখা যোগ করেন। তারপর শূন্যে ভেসে পড়েন। যারা তার এই উড্ডয়ন প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের লেখনীতে পাওয়া যায়, তিনি পাখার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য দূরত্ব অতিক্রম করেন এবং যেখান থেকে উড্ডয়ন শুরু করেছিলেন আবার সেখানে ফিরে আসেন। কিন্তু সফলভাবে অবতরণ করতে ব্যর্থ হন। এ সময় তিনি গুরুতর আহত হন।
ইবনে ফিরনাস প্রাণে বেঁচে গেলেও পিঠে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। তার বয়স তখন পঁয়ষট্টি বছর। এরপর তিনি তার উড্ডয়নযন্ত্রে ঠিক কী ভুল ছিল তা শনাক্তকরনে মনোনিবেশ করেন। তিনি উপলদ্ধি করেন, পাখি অবতরণের সময় লেজ এবং ডানাগুলোর সমন্বিতভাবে কার্যক্ষমের মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু তিনি তার যন্ত্রে গতি কমানোর জন্য সেরকম কোনো লেজ বা বিকল্প পদ্ধতি রাখেননি।
তারপরেও তিনি প্রায় ১২ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তার পক্ষে আর আকাশে ওড়া সম্ভব হয়নি। কারণ তিনি আর আগের মতো সুস্থতা লাভ করেননি। ৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে ইবনে ফিরনাস ইন্তেকাল করেন।

ইবনে ফিরনাস শিল্পীর চোখে
ইবনে ফিরনাস মানুষের উড্ডয়নের ইতিহাসে কিংবা আকাশে ওড়ার পেছনে মানুষের যে প্রচেষ্টা তার একজন সফল স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে স্বরণীয় হয়ে আছেন। তার প্রচেষ্টাকে বলা যায় আধুনিক উড়োজাহাজ আবিষ্কারের প্রথম ধাপ। মানুষকে ডানা মেলে ওড়ার স্বপ্ন দেখানো ইবনে ফিরনাস তাই ইতিহাসে অমর।
আকাশে ওড়ার এই স্বপ্নদ্রষ্টাকে স্মরণীয় করে রাখতে চাঁদের একটি জ্বালামুখের নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। ২০১৩ সালে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোলস রয়েস ইবনে ফিরনাসের নামে তাদের একটি গাড়ির সংস্করণ বের করে, যার নাম দেয় ইবনে ফিরনাস মোটিফ। স্পেনের কর্ডোবায় ইবনে ফিরনাস সেতু, বাগদাদে ইবনে ফিরনাসের ভাস্কর্য, দুবাইয়ের ইবনে বতুতা মলে ফিরনাসের রেপ্লিকা ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় হয়তো ইবনে ফিরনাসের নামের সাথে পরিচয় ঘটতে পারে আপনার। তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে, তার যুগের চাইতে এগিয়ে থাকা একজন মানুষ হিসেবে ।
সংক্ষেপে দেখুনওষুধের আড়ালে বিষ ! কোনগুলো?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্রমোন্নতির সাথে সাথে মানুষের অসুখ সারানোর কাজটাও সহজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু একটা সময় ছিল পৃথিবীতে মানুষ দৈনন্দিন চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী এমন সব ওষুধের শরাণাপন্ন হত, যেগুলো রোগ সারানোর চেয়ে বরং তাদের শরীরে তৈরি করত বিরূপ প্রতিক্রিয়া। আজকের লেখায় অতীতের এমন কিছু ওষুবিস্তারিত পড়ুন
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্রমোন্নতির সাথে সাথে মানুষের অসুখ সারানোর কাজটাও সহজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু একটা সময় ছিল পৃথিবীতে মানুষ দৈনন্দিন চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী এমন সব ওষুধের শরাণাপন্ন হত, যেগুলো রোগ সারানোর চেয়ে বরং তাদের শরীরে তৈরি করত বিরূপ প্রতিক্রিয়া। আজকের লেখায় অতীতের এমন কিছু ওষুধের কথা জানাবো যেগুলোর ক্ষতিকর দিকের কথা চিকিৎসকদের জানতে সময় লেগেছে বহু বছর।
তামাক
সতের এবং আঠারো শতকে চিকিৎসকেরা মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের চিকিৎসায় কী ব্যবহার করত জানেন? তামাক! জীবন বাঁচানোর জন্য ব্যক্তির পায়ুপথ দিয়ে তামাকের মিশ্রণের ধোঁয়া প্রবেশ করিয়ে দিতেন তারা! আর এজন্য রীতিমতো একটা যন্ত্রও তৈরি করা হয়েছিল যার নলটি প্রবেশ করানো হত পায়ুপথে, যেটার মাধ্যমে ধোঁয়া গিয়ে একেবারে ধাক্কা দিত ফুসফুসে।
যে ধরনের যন্ত্র দিয়ে ধোঁয়া দেয়া হত তার একটি রেপ্লিকা।
আসলে তামাকের ধোঁয়া শরীরের ভেতরে গেলে সেটা মুহূর্তের মধ্যে প্রায়-মৃত শরীরে স্পন্দন সৃষ্টি করত এবং দ্রুত হয়ে যেত ঐ ব্যক্তির শ্বাস-প্রশাস প্রক্রিয়া। প্রথমদিকে পানিতে ডুবে যাওয়াদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হলেও, পরবর্তীতে ঠাণ্ডা লাগা, মাথাব্যথা, হার্নিয়া, টাইফয়েড জ্বর, কলেরা ইত্যাদি সারানোর কাজেও এটি কার্যকরী বলে ধারণা করা হত। এমনকি মৃত্যুর হাত থেকে পর্যন্ত মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারে এটি, এমন ধারণাও বিদ্যমান ছিল।
এভাবেই পায়ুপথ দিয়ে দেয়া হত তামাকের ধোঁয়া।
মূল ব্যাপারটি আসলে নিহিত ছিল তামাকের একটি উপাদান ‘নিকোটিন’ এর ভেতরে। নিকোটিন এমন এক সক্রিয় উপাদান, যেটি শরীরে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। এটি অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিগুলোকে উদ্দীপ্ত করে এগুলোতে এপিনেফ্রিন হরমোন তথা অ্যাড্রিনালিন উৎপন্ন করতে সহায়তা করে। তামাকের ব্যবহার যে আসলে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সেটা নির্ণয় করতে অনেক সময় লেগেছিল গবেষকদের। ১৮১১ সালে নিকোটিনের বিষাক্ত প্রভাবগুলো আবিস্কৃত হবার পর থেকে এই অভিনব চিকিৎসাপদ্ধতিটি বন্ধ হয়।
মরফিন
ব্যথানাশক ওষুধের উপাদান হিসেবে চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিচিত নাম মরফিন। এই লেখার তালিকার মধ্যে একমাত্র মরফিনই এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে চিকিৎসার কাজে, যদিও প্রাচীনকালে এর ব্যবহারপদ্ধতি ছিল অনেক ভয়ানক।
মানুষের মানুষের মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড নিয়ে যে প্রধান স্নায়ুতন্ত্র রয়েছে তার উপরে সরাসরি প্রভাব ফেলে ব্যথার অনুভূতি কমানোর কাজ করে মরফিন। একই সাথে মানুষকে এতে আসক্ত করে তোলে এবং নানান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত করে ফেলে বলে এর ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণও বটে। প্রথমবারের মতো ১৮১৭ সালে মরফিন বাজারজাত করেছিলেন ফ্রেডেরিখ সার্টার্নার।
মরফিন ইনজেকশনের শিশি।
গ্রিক পুরাণের স্বপ্নের দেবতা মর্ফিয়াসের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় মরফিন। আজ থেকে ২০০ বছর আগে ব্যবহার শুরু হওয়া এই ওষুধ এখনো প্রতি বছর ২৩০ টনেরও বেশি উৎপাদিত হয়। পপি গাছ থেকে যে আফিম পাওয়া যায় তার অন্যতম প্রধান উপাদান মরফিন। অথচ প্রথমবার বাজারে আনার পর ব্যথার ওষুধের পাশাপাশি এর পরিচিতি ছিল আফিম ও অ্যালকোহলের প্রতি আসক্তির প্রতিষেধক হিসেবেও!
পপি গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় মরফিন।
পরবর্তীতে জানা যায়, মরফিন আসলে আফিম বা অ্যালকোহলের চেয়েও বেশি নেশা উদ্রেক করে। ব্যথানাশক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এর পার্শ্বঝুঁকি মারাত্মক। কোষ্ঠকাঠিন্য, চুলকানি, বমি বমি ভাব ইত্যাদি দেখা দেয় মরফিন গ্রহীতার শরীরে।
যুদ্ধের ইতিহাসে মরফিনের ব্যবহার হয়েছে ব্যাপক পরিমাণে। মার্কিন সিভিল ওয়ার এবং বিশ্বযুদ্ধে সৈনিকদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হত এটি। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটত উনিশ শতকের শেষ ও বিংশ শতকের শুরুর দিকে। যে যার ইচ্ছেমতো কিনতে পারত মরফিন সমৃদ্ধ ওষুধ। এগুলোর ব্যবহারে ছিল না কোনো বিধি-নিষেধ। ঠাণ্ডা, ঘুমের সমস্যা থেকে মাসিকের খিঁচুনি পর্যন্ত সকল রকমের যন্ত্রণা উপশমের জন্য মানুষ গিলত এসব ওষুধ। মরফিন ভরা ইনজেকশন পাওয়া যেত, যে কেউ ইচ্ছে করলেই সেটা কিনে নিয়ে ঢুকিয়ে দিতে পারত শরীরে।
মিসেস উইনস্লো’স সুদিং সিরাপ এর বিজ্ঞাপন।
এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশুদেরকে পর্যন্ত মরফিন দেয়া হত ঘুম পাড়ানোর জন্য! মরফিন সমৃদ্ধ ‘মিসেস উইনস্লো’স সুদিং সিরাপ’ নামক সিরাপ শিশুদের খাওয়ানো হত ঘুম পাড়ানোর কিংবা দাঁত ওঠার জন্য। এমন ভয়াবহ নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্যের কী যাচ্ছেতাই ব্যবহার!
রেডিয়াম
১৮৯৮ সালে রেডিয়াম আবিস্কার করেন মেরি কুরি এবং পিয়েরে কুরি। ১৯০৩ সালে এ আবিস্কারের জন্য তারা দুজন নোবেল পুরস্কার পান। আবিস্কারের এক যুগের মধ্যেই রেডিয়ামের অদ্ভুত সব ব্যবহার শুরু হয় বিভিন্ন ব্যবহার্য পণ্য, খাদ্য ও পানীয়র মধ্যে একে মিশ্রিত করবার মধ্য দিয়ে, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
রেডিয়াম সমৃদ্ধ পানি।
বিকিরণের কারণে শরীরে কী ধরনের ক্ষতি হয় তা সম্পর্কে জানা না থাকার কারণে রেডিয়ামের যথেচ্ছ ব্যবহার চলত সেসময়। এর রোগ সারাবার জাদুকরি ক্ষমতা নিয়ে অতিকথন চালু হয়ে যায় এবং মানুষ রেডিয়াম সমৃদ্ধ বিভিন্ন দ্রব্য ব্যবহারের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠে।
মানসিক সমস্যা সারানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয় রেডিয়ামের ব্যবহার। ডায়রিয়া এবং ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবেও ডাক্তাররা একে বেছে নেন। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যপার ছিল, বার্ধক্য রোধের কথিত ক্ষমতার জন্যও রেডিয়াম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। রেডিয়াম শরীরের কোষের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে যৌবন ধরে রাখে, এই ছিল যুক্তি।
রেডিয়াম সমৃদ্ধ মাখন।
রেডিয়াম সমৃদ্ধ চকলেট।
আর্থ্রাইটিস কিংবা জনন অক্ষমতার প্রতিকারেও একে ভাবা হত মোক্ষম ওষুধ। রেডিয়াম মিশ্রিত পানি, চকলেট, টুথপেস্ট ব্যবহার করত মানুষ। সাপোজিটরি, সেঁক দেবার কাজে ব্যবহৃত প্যাড, প্রসাধন সামগ্রীতে চলত রেডিয়ামের ব্যবহার। ত্বক ভালো রাখতে রেডিয়াম মিশ্রিত পানি দিয়ে মালিশ করার চলও তৈরি হয়েছিল।
বামপাশের ছবির মতো এভাবে এককালে তেজস্ক্রিয় পানির বিজ্ঞাপন দেয়া হত। ডানের ছবির মত পানির পাত্র রাখা হত বিভিন্ন দোকানে যেখান থেকে ইচ্ছেমত রেডিয়াম সমৃদ্ধ পানি পান করা যেত।
আজকের যুগে আমরা জানি, মানুষ রেডিয়াম গলাধঃকরণ করলে এর শতকরা আশি ভাগ শরীর নিজেই রেচন করে ফেললেও, বিশ ভাগ রয়ে যায় শরীরের ভেতরেই। শরীরের হাড়, রক্ত ও টিস্যুর মধ্যে এই রেডিয়ামের বিকিরণের ফলে ক্যানসার, লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা ইত্যাদি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। সেসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রেডিয়াম সমৃদ্ধ পণ্য ব্যবহার করে ভয়ানক ক্ষতির শিকার হয়ে পরবর্তীতে মারা গিয়েছিল অনেকে, যাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোড়ন তুলেছিল ‘দ্য রেডিয়াম গার্লস’ নামক পাঁচ নারীর ঘটনা, কারণ তারা মৃত্যুর আগে রেডিয়াম মিশ্রিত পণ্য উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে জরিমানা পেয়েছিল। রেডিয়ামের বিকিরণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানার পর বন্ধ হয় এর কল্পিত ঔষধি গুণাগুণ আহরণের ভয়ানক পদ্ধতিগুলো।
পারদ
চীনের উপকথায় হুয়াং অ্যান নামক এক ব্যক্তির গল্প আছে যে কিনা খনিজ সিনাবার খাওয়ার কারণে বেঁচে ছিল ১০,০০০ বছর! খনিজ সিনাবার বা মার্কারি সালফাইড হলো পারদের আকরিক উৎস।
কক্ষ তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে এমন একমাত্র ধাতু হলো পারদ।
গবেষকরা ধারণা করেন, চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং, যিনি অমরত্ব লাভের চেষ্টা করেছিলেন, তিনি মারা গিয়েছিলেন মদ ও মধুর সাথে সিনাবার মিশিয়ে খাওয়ার কারণে। পারদের বিষক্রিয়ার কারণে মারা যাবার পর তাকে সমাহিত করা হয় মাটির তৈরি বিখ্যাত টেরাকোটা আর্মি দিয়ে ঘেরা অবস্থায়। সেই সমাধিস্থলের নকশা করা হয়েছিল তৎকালীন চীন সাম্রাজ্যের অনুকরণে, আর এর মধ্যে চীনের নদীর অনুকরণে যে নদীগুলো তৈরি করা হয়েছিল তাতে বইয়ে দেয়া হয়েছিল পারদের নহর।
কিন শি হুয়াং এর সমাধিস্থলের টেরাকোটা আর্মি।
ইতিহাসে এই বিষাক্ত পারদকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের ভয়ঙ্কর সব নজির রয়েছে। চর্মরোগের প্রতিষেধক এবং পচননিবারক হিসেবে ব্যবহৃত হত পারদ। বিশেষ পানীয়, প্রসাধনী ইত্যাদিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মধ্যেও ব্যবহার করা হত এটি। ১৯৪০ এর দশকের আগ পর্যন্ত সিফিলিসের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হত পারদ সমৃদ্ধ মলম, বড়ি কিংবা পানীয়।
চিকিৎসায় এককালে ব্যবহৃত পারদ সমৃদ্ধ ক্যালোমেল।
দাঁতের চিকিৎসা, টাইফয়েড জ্বর কিংবা শরীরে পরজীবী আক্রমণের চিকিৎসাসহ আরও বিভিন্ন রকমের রোগ সারানোর কাজ করা হত পারদ মিশ্রিত ওষুধ দিয়ে। দাঁত পড়ে যাওয়া, মুখের ভেতর জ্বালাপোড়া, ডায়রিয়া, রক্তশূন্যতা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, হৃদরোগ, রক্তচাপ কমে যাওয়া, চর্মরোগ, দুর্বলতা, নিদ্রাহীনতাসহ হেন কোনো ঘটনা নেই যা এই দীর্ঘমেয়াদী পারদ গ্রহণের কারণে ঘটত না। স্লো পয়জনিং এর মতো ধীরে ধীরে পারদ ধ্বংস করে দিত এর সেবনকারীদের। আঠারো, উনিশ আর বিশ শতক মিলিয়ে অন্তত দেড়শ বছর চিকিৎসকেরা তাদের কাজে অজ্ঞতাবশত ব্যবহার করে গেছেন বিষাক্ত পারদ।
মৃতদেহ ভক্ষণ
আজকের যুগে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের ঘটনা চিকিৎসা জগতে বিস্ময়কর অগ্রগতি এনে দিচ্ছে, এই পদ্ধতি নিয়ে চলছে ক্রমাগত গবেষণা। কিন্তু একটা সময় ছিল দুনিয়াতে সম্পদশালী মানুষ রোগমুক্তির জন্য সরাসরি খেয়ে ফেলত মৃত মানুষের শরীরের নানা অংশ! দ্বাদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত চলেছে এই ধরনের চিকিৎসা।
শিল্পীর কল্পনায় মৃতদেহের অংশ ভক্ষণের ছবি।
বিশেষত মিশরীয় মমির গুঁড়ো ওষুধ হিসেবে অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে উঠেছিল ইউরোপে। মাথা ব্যথা হলে কঙ্কাল থেকে নেওয়া হাড়ের গুঁড়ো খাওয়া, মৃগীরোগের ওষুধ হিসেবে শুকিয়ে যাওয়া হৃৎপিণ্ড খাওয়া, রক্তপাত বন্ধ করা ও নতুন চামড়া তৈরির জন্য মৃতদেহের ক্ষতস্থানে চামড়া লাগানো, বধিরতা কাটানোর জন্য মৃতদেহের শুকিয়ে যাওয়া পিত্তথলী গুঁড়ো করে মদের সাথে মিশিয়ে খাওয়া- এমন অদ্ভুত সব চিকিৎসা পদ্ধতি চালু ছিল সেই আমলের ইউরোপে।
মিশরে এক ব্যক্তি বিক্রির জন্য মমি নিয়ে বসে আছে।
মমিকে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ওষুধের উৎস হিসেবে ধরা হত তখন। কোনো আঘাতের কারণে শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ হলে তা সারানোর ওষুধ হিসেবে বিবেচিত হত হট চকলেটের মধ্যে কঙ্কালের খুলির গুঁড়ো মিশিয়ে খাওয়া। এমনকি ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস নিজেই ‘কিংস ড্রপস’ নামক একটি বিশেষ পানীয় পান করতেন যেটা বানানো হত অ্যালকোহলের সাথে মাথার খুলির গুঁড়ো মিশিয়ে। জার্মানির ডাক্তাররা এমনও ভাবতেন, মৃতদেহের চর্বির সাথে ব্যান্ডেজ ঘষে সেটা গেঁটেবাত আক্রান্ত রোগীর আক্রান্ত স্থানে লাগালে বাতের ব্যথা দূর হবে।
এভাবেই বিক্রি হত বোতলজাত মমির গুঁড়ো।
এসব ভুল ধারণার উৎপত্তি ঘটেছিল মূলত একটি শব্দগত ভুল বোঝাবুঝির কারণে। প্রাচীন চিকিৎসাবিদ্যায় ব্যবহৃত বিটুমিনের একটি পারসিক প্রতিশব্দ ছিল ‘মামিয়া’। এদিকে মিশরীয়রা মমি বানানোর সময় রেসিন বা রজন হিসেবে একটি উপাদান ব্যবহার করত যার নাম ‘মামিয়া’, সেটি অবশ্য বিটুমিন ছিল না। ভুল করে বিটুমিন ভেবেই এই মামিয়া সংগ্রহের জন্য প্রাচীন মিশরীয় কবর থেকে মমি তোলা হত। আর মমিগুলো মামিয়ার উৎস হিসেবে বিক্রি করা হত। মমির সংকট দেখা দিলে কেউ কেউ আবার নতুন লাশকে মমি বানিয়ে ভুয়া মমি হিসেবে বিক্রি করত। এভাবে মমি বিক্রি একটা বড় লাভজনক ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনেকে ভাবত, এই মৃতদেহের অংশ খাওয়ার সময় এর মধ্যকার আত্মাই রোগ সারানোর জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে!
সংক্ষেপে দেখুনবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম কি কি?
বিশ্বের সর্বপ্রথম মোটরগাড়িটি তৈরি হয়েছিল প্রায় ২০০ বছর আগে, ১৮০৮ সালে। এরপর প্রযুক্তির বহু উন্নয়ন ঘটেছে, জন্ম নিয়েছে বহু মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে গোটা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬০ মিলিয়ন গাড়ি তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে নানা রকম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এ গাড়িগুলো তৈরি করে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ গত কবিস্তারিত পড়ুন
বিশ্বের সর্বপ্রথম মোটরগাড়িটি তৈরি হয়েছিল প্রায় ২০০ বছর আগে, ১৮০৮ সালে। এরপর প্রযুক্তির বহু উন্নয়ন ঘটেছে, জন্ম নিয়েছে বহু মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে গোটা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬০ মিলিয়ন গাড়ি তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে নানা রকম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এ গাড়িগুলো তৈরি করে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ গত কয়েক বছরেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, আবার কারো কারো বর্তমানের এই অবস্থায় আসতে সময় লেগে গেছে কয়েকশো বছর! এসব প্রতিষ্ঠানের নাম আমরা জানলেও তাদের এই অবস্থায় আসার পেছনের গল্প আমরা অনেকেই জানি না। চলুন আজকে জেনে নিই এখনও পর্যন্ত চালু থাকা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন কয়েকটি মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে।
১. রোলস-রয়েস
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৯০৬ সাল

বিলাসবহুল গাড়ির জগতে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় গাড়ির নাম রোলস-রয়েস। ১৯০৬ সালে ইঞ্জিনিয়ার হেনরি রয়েস ও যুক্তরাজ্যের প্রথম মোটরগাড়ি ডিলারশিপের মালিক চার্লস রোলস মিলে এই রোলস-রয়েস কোম্পানির সূচনা করেন।
রোলস-রয়েসের প্রথমদিকের গাড়ি ‘সিলভার ঘোস্ট’ এর মাধ্যমেই তাদের কোম্পানির সফলতার দৌড় শুরু হয়। অনেকগুলো রেকর্ড ভাঙা এই গাড়িটি সেসময় ‘বিশ্বের সেরা মোটরগাড়ি’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই গাড়িটি একটানা ২৭ বার লন্ডন থেকে গ্লাসগো ভ্রমণ করে মোট ১৪,৩৭১ মাইল পাড়ি দেয়। এর ফলে বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে একটানা সবচেয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার বিশ্ব রেকর্ড করে এই গাড়িটি। বর্তমানে রোলস-রয়েস বিশ্বের আরেক জনপ্রিয় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিএমডাব্লিউ এর সাথে যুক্ত হয়েছে। এখনও বিশ্বের অন্যতম সম্মানীত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয় রোলস-রয়েসকে।
২. ক্যাডিলাক
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৯০১ সাল

মোটরগাড়ির জগতে অন্যতম এক নাম ক্যাডিলাক। মজার ব্যাপার হলো, এই কোম্পানির জন্ম হয় কিন্তু বিশ্বের অন্যতম এক জনপ্রিয় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ডের মালিক হেনরি ফোর্ডের হাত ধরে। ১৯০১ সালে হেনরি ফোর্ড দ্বিতীয় আরেকটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘হেনরি ফোর্ড কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এই কোম্পানির আর্থিক সাহায্যকারী লিমুয়েল বোয়েন ও উইলিয়াম মার্ফির সাথে কিছু মতের মিল না হওয়ায় হেনরি ফোর্ড এই কোম্পানি ছেড়ে চলে যান।
মার্ফি এবং ব্রাউন প্রথমে হেনরির এই কোম্পানির যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দেয়ার কথা চিন্তা করেন। তবে পরবর্তীতে তারা তা বিক্রি না করে নতুনভাবে গাড়ি নির্মাণ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯০২ সালে নতুন এই কোম্পানি নামকরণ করা হয় ক্যাডিলাক। ১৯০৯ সালে এই কোম্পানিটি জেনারেল মোটরস কিনে নেয়।
এরপর থেকে বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্যাডিলাক ভালোই সুনাম অর্জন করেছে। ১৯০৮ ও ১৯১২ সালে সম্মানজনক ‘ডেওয়ার ট্রফি’ লাভ করে তারা।
৩. ফিয়াট
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৮৯৯ সাল

ইতালির সবচেয়ে বড় মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফিয়াটের জন্ম হয় ১৮৯৯ সালে। ফিয়াট (FIAT) এর পূর্ণরূপ ‘Fabbrica Italiana Automobili Torino’, যার অর্থ ‘ইতালীয় মোটরগাড়ি ফ্যাক্টরি, তুরিন’। ফিয়াট তাদের প্রথম গাড়িটি নির্মাণ করে ১৮৯৯ সালে। এরপর ১৯১০ সালের দিকে কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর জিওভানি অ্যানেল্লি হেনরি ফোর্ডের গাড়ি নির্মাণ কারখানাটি দেখতে আসেন। তিনি ফোর্ডের কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থাপনা দেখে মুগ্ধ হন এবং পরবর্তীতে নিজের কারখানাতেও একই পদ্ধতি চালু করেন।
ফিয়াটের সবচেয়ে জনপ্রিয় গাড়িগুলো প্রধানত ‘সিটি কার’ ও ‘সুপারমিনি’ এ দুই শ্রেণীর। ১৯৭০ সালে ফিয়াট ইলেকট্রিক যানবাহন তৈরি শুরু করে। বর্তমানে মোটরগাড়ি ছাড়াও অস্ত্র নির্মাণে অংশ নিয়েছে ফিয়াট।
৪. ল্যান্ড রোভার
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৮৯৬ সাল

১৮৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রথমে ছিল ‘ল্যানক্যাশিয়ার স্টিম মোটর কোম্পানি’। এরপর বহুবার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে এই কোম্পানিটির। প্রথমদিকে এই কোম্পানিটি শুধুমাত্র বাষ্পীয় ঘাস কাটার যন্ত্র তৈরি করতো। এরপর তারা বাষ্পীয় মালবাহী গাড়ি নির্মাণ শুরু করে। ১৯০৭ সালে কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে ‘লেল্যান্ড মোটরস’ করা হয়।
১৯৭৮ সালে আরো অনেক ধাপ নাম পরিবর্তনের পর শেষমেশ কোম্পানির নাম রাখা হয় ‘ল্যান্ড রোভার’। ১৯৪৮ সালে কোম্পানিটির সবচেয়ে জনপ্রিয় মডেল ‘রোভার’ এর নির্মাণ শুরু করে লেল্যান্ড মোটরস। ব্রিটিশ আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে প্রচলিত এই মডেলের উৎপাদন চালু রয়েছে এখন পর্যন্ত। ১৯৫১ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জ কর্তৃক একটি রাজকীয় সনদ লাভ করে ল্যান্ড রোভার কোম্পানি।
৫. মার্সিডিজ-বেঞ্জ
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৮৮৩ সাল

বিপুল জনপ্রিয় মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মার্সিডিজ বেঞ্জ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৬ সালে। পুরনো দুটি ভিন্ন মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান একীভূত হয়েই কিন্তু গঠিত হয়েছে এই কোম্পানিটি।
এই দুটি প্রতিষ্ঠানের একটি ‘ডাইমলার মোটোরেন গেসেলস্ক্রাফট’। ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিটি প্রথমদিকে শুধুমাত্র পেট্রোল ইঞ্জিন প্রস্তুত করতো। এরপর তারা ছোটখাট রেস কার তৈরি শুরু করে এবং পরবর্তীতে মার্সিডিজ ব্র্যান্ডের নানা মডেল নির্মাণে যোগ দেয়।
একইভাবে, ‘বেঞ্জ অ্যান্ড কোম্পানিজ’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সূচনা হয় ১৮৮৩ সালে। প্রথমদিকে তারা গ্যাস ইঞ্জিন ও শিল্পকারখানার বিভিন্ন যন্ত্র নির্মাণ করতো। এরপর কোম্পানির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কার্ল বেঞ্জ তার বহুদিনের স্বপ্নের মোটরগাড়ি নির্মাণের দিকে মন দেন। ১৮৮৬ সালে তিনি বিশ্বের সর্বপ্রথম পেট্রোল চালিত মোটরগাড়ি নির্মাণ করেন।
১৯২৬ সালে এই দুটি কোম্পানি একত্রিত হয়ে মার্সিডিজ-বেঞ্জ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে।
৬. টাট্রা
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৮৫০ সাল

অন্যতম প্রাচীন মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টাট্রার সূচনা হয় ঘোড়ায়টানা গাড়ি নির্মাণের মাধ্যমে। ১৮৯১ সালে তারা রেলপথে চলার উপযোগী গাড়ি নির্মাণ শুরু করে।
এরপর ১৮৯৭ সালে টাট্রার প্রযুক্তিগত পরিচালক হুগো ফিশার নিজের ব্যবহারের জন্য একটি বেঞ্জ মোটরগাড়ি কেনেন। আর এই গাড়ি থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি পরের বছরেই তার কোম্পানির প্রথম মোটরগাড়ি ‘প্রাসিডেন্ট’ নির্মাণ করেন।
গাড়ি ছাড়াও টাট্রা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাবাহিনীর জন্য ট্যাংক ইঞ্জিন ও ট্রাক তৈরি করতো। তবে এই ট্রাকগুলো চলার সময় এত দ্রুত মোড় নিতো যে বহু জার্মান সৈন্য এই গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা যায়। ফলে পরবর্তীতে জার্মান সৈন্যদের এই টাট্রা ট্রাকগুলো ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
১৯৯৯ সালে এই কোম্পানি তাদের যাত্রীবাহী গাড়ি নির্মাণ বন্ধ ঘোষণা করে। তবে এখনো পর্যন্ত টাট্রা ট্রাক নির্মাণ করে আসছে।
৭. পিউজো
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৮১০ সাল

আজকের প্রাচীন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের তালিকার সবেচেয়ে পুরানো প্রতিষ্ঠানটি হলো পিউজো। প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠানটির শুরু হয় ১৮১০ সালে এক কফি গুঁড়ো করার মিল হিসেবে। ১৮৩০ সালে তারা বাইসাইকেল নির্মাণ শুরু করে। এরপর ১৮৪২ সালে তারা লবণ, মরিচ ও কফি গুঁড়ো করার মেশিন নির্মাণ শুরু করে। তবে এসবের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা পিউজোর মোটরগাড়ি নির্মাণের প্রতি ছিল ব্যাপক আগ্রহ। ফলে ১৮৮২ সালের দিকে তিনি মোটরগাড়ি নির্মাণ শুরু করেন।
১৮৮৯ সালে লিওন সারপোলেটের সহযোগিতায় পিউজোর প্রথম গাড়ি বাজারে আসে। এটি ছিল একধরনের বাষ্পচালিত তিন চাকার গাড়ি। তবে ব্যাপক আকারে উৎপাদনের জন্য এটি ছিল অনুপযোগী। ফলে ১৮৯০ সালে কিছু উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে গাড়িটির উন্নত মডেল বাজারে আনা হয়।
পারিবারিক কিছু সমস্যার কারণে পিউজো তার পূর্বের কোম্পানি ত্যাগ করেন এবং ‘সোসাইটি ডেস অটোমোবাইলস পিউজো’ নামে ১৮৯৬ সালে আরেকটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। এর দু’বছর আগে তিনি গাড়ির পাশাপাশি মোটরসাইকেল নির্মাণ শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯২৬ সালে মোটরগাড়ি ও মোটরসাইকেল নির্মাণের জন্য দুটি ভিন্ন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এ পর্যন্ত বহু পুরষ্কার ও সম্মাননা জিতে নেয়া পিউজো এখনো পর্যন্ত চালু থাকা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান
সংক্ষেপে দেখুনব্ল্যাক প্রিন্সের রুবিকে কেনো অভিশপ্ত রত্নপাথর বলা হয়?
রত্নপাথরের প্রতি মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। ইতিহাসে অনেক রত্নই তাদের আঁকার আকৃতি আর সৌন্দর্য দিয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে। তবে কোনো কোনো রত্ন কুখ্যাতি অর্জন করেছে তাদের মালিকদের দুর্ভাগ্যের সঙ্গী হয়ে। সচেতন বা অসচেতন যেভাবেই হোক এসব রত্নকেই দুর্ভাগ্যের কারণ ধরে নিয়েছে বহু মানুষ। ফলে তাদের কপালে জুটেছে অভিশপ্ত পবিস্তারিত পড়ুন
রত্নপাথরের প্রতি মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। ইতিহাসে অনেক রত্নই তাদের আঁকার আকৃতি আর সৌন্দর্য দিয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে। তবে কোনো কোনো রত্ন কুখ্যাতি অর্জন করেছে তাদের মালিকদের দুর্ভাগ্যের সঙ্গী হয়ে। সচেতন বা অসচেতন যেভাবেই হোক এসব রত্নকেই দুর্ভাগ্যের কারণ ধরে নিয়েছে বহু মানুষ। ফলে তাদের কপালে জুটেছে অভিশপ্ত পাথরের তকমা। আমাদের গল্প তেমন পাথরগুলি নিয়েই। তাদের মধ্যে একটি ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের অন্যতম সম্পদ তাদের রাজকীয় গহনা। নানা দেশ থেকে নিয়ে আসা রত্নপাথর এর অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর মধ্যে একটি এই ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি (Black Prince’s Ruby )।
নামে রুবি হলেও এই রত্নটি ভিন্ন ধরনের একটি পাথর, যার নাম স্পিনেল (spinel)। এটি সম্ভবত পৃথিবীর বৃহত্তম অখণ্ড লাল স্পিনেল। ব্রিটিশ রাজ পরিবার ১৬৩৭ সালের দিকে এটি হাত করে। তখনো একে রুবি বলেই মনে করা হতো। ষোড়শ শতাব্দীর দিকে পরীক্ষা নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয় এটি আসলে স্পিনেল জাতীয় পাথর। রুবির সাথে স্পিনেলের বাহ্যিক মিল থাকায় একে রুবি বলে ভ্রম হচ্ছিল। ওজনের হিসেবে প্রায় ১৭০ ক্যারেট আর লম্বায় প্রায় ৫ সেন্টিমিটার এই পাথরের অবস্থান বর্তমানে ব্রিটিশ রাজমুকুটে। অভিশপ্ত রত্নপাথরের তালিকাতেও এটি স্থান দখল করে রেখেছে।

স্পিনেল দেখতে অনেকটাই রুবির মতো
উৎপত্তি
বলা হয় ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি তোলা হয়েছিল বর্তমান তাজিকিস্তানের অন্তর্গত বাদাখশানের কুহ-ই-লাল খনি থেকে। তবে ইতিহাসের পাতায় এর আবির্ভাব চতুর্দশ শতকে। প্রচলিত গল্প মতে তখন কিংডম অফ গ্রানাডার প্রিন্স আবু সাইদের সম্পত্তি ছিল এই রুবি। সমসাময়িক কাস্টিলের শাসক ছিলেন ডন পেদ্রো। কাস্টিল তখন স্পেনের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তির পথে। এ সময় চলমান রিকনকুইস্তার অংশ হিসেবে পেদ্রো নাকি লাগাতার হামলা চালাচ্ছিলেন গ্রানাডার উপর।

মানচিত্রে গ্রানাডা ও কাস্টিল
১৩৬২ সালে কয়েকটি যুদ্ধে ডন পেদ্রোর হাতে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হয় গ্রানাডা। আলোচনার প্রস্তাব দেন আবু সাইদ। পেদ্রো তাকে কাস্টিলে আমন্ত্রণ জানান। মূল্যবান পরিচ্ছদ আর গহনা পরিধান করে প্রিন্স নিজেই পেদ্রোর ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন।
পেদ্রো কিন্তু আলোচনায় মোটেও আগ্রহী ছিলেন না। তার কানে গিয়েছিল আবু সাইদের সঙ্গে থাকা বিশাল একটি রত্নের কথা। এই পাথর দখল করতে তিনি ফাঁদ পেতেছিলেন। গ্রানাডার লোকেদের নাগালে পেয়েই তিনি সৈনিকদের লেলিয়ে দিলেন। আবু সাইদসহ সবার কপালে জুটল তরবারির কোপ। জনশ্রুতি আছে, পেদ্রো নিজের হাতে প্রিন্সকে হত্যা করেন, তার মৃতদেহ থেকে খুলে নেন রুবি। এরপর থেকেই এর গায়ে সেঁটে যায় অভিশপ্ত তকমা। এই গল্পের সত্যাসত্য নিয়ে সন্দেহ থাকলেও এটা সত্যি যে পেদ্রোর কাছেই প্রথম সুনির্দিষ্টভাবে খবর এই পাথরের খবর পাওয়া যায়।
ডন পেদ্রোর দুর্গতি
পেদ্রোর সৎ ভাই, হেনরি অফ ট্রাস্তামারা কাস্টিলের সিংহাসন দাবি করে বসেন। সৈন্যসামন্ত জুটিয়ে পেদ্রোর উপর আক্রমণ করলেন তিনি। বিপন্ন পেদ্রো পালিয়ে গেলেন ফ্রান্সের বোর্দো শহরে। সেখানে তখন ব্রিটিশ রাজপুত্র এডওয়ার্ড অফ উডস্টকের দরবার। পেদ্রো রাজার সহায়তা প্রার্থনা করলেন। তাকে প্রতিশ্রুতি দিলেন এর বিনিময়ে তিনি মূল্যবান রত্ন আর টাকাপয়সা দিয়ে কোষাগার পূর্ণ করে দেবেন।
এডওয়ার্ড ছিলেন জাঁদরেল সেনাপতি। ইতিহাসে তার বীরত্বের অনেক কাহিনী লেখা আছে। মৃত্যুর দেড়শ বছরের পর থেকে লোকমুখে ব্ল্যাক প্রিন্স উপাধি পেয়েছিলেন তিনি। কেন, তা নিয়ে বেশ কয়েকটি মতবাদ চালু রয়েছে।

এডওয়ার্ড দ্য ব্ল্যাক প্রিন্স
একটি গল্প হল যে তিনি সবসময় কালো বর্ম পরিধান করতেন বলে এই নাম। কারো কারো ধারণা তার প্রতীক, যেখানে তিনটি অস্ট্রিচ পাখির পালক ফুটিয়ে তোলা কালো পটভূমিতে, সেখান থেকেই এই উপাধির জন্ম। অনেকে দাবি করেন যুদ্ধবন্দীদের উপর নির্মমতার ফলে তাকে ডাকা হয় ব্ল্যাক প্রিন্স।
যাই হোক না কেন, এডওয়ার্ড সাড়া দিলেন পেদ্রোর অনুরোধে। দলবল নিয়ে চললেন স্পেনে। ১৩৬৭ সালের ৩ এপ্রিল উত্তর স্পেনে ব্যাটল অফ নাজেরা’তে (Najerá) তার হাতে বিধ্বস্ত হলেন হেনরি ও তার মিত্ররা। পেদ্রোকে সিংহাসনে বসিয়ে দিলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টাকাপয়সা দিয়ে পেদ্রো ব্যর্থ হলেন। কারণ হিসেবে দেখালেন খালি রাজকোষ।
এডওয়ার্ড এবার দাবি করে বসলেন পেদ্রোর সাধের রুবি। পেদ্রোর হাতে কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি অনেকটা বাধ্য হয়েই এডওয়ার্ডকে দিয়ে দিলেন তার রত্ন। সেই সাথে ব্রিটিশ রাজ পরিবার বনে গেল রুবির মালিক।
রুবির অভিশাপ কিন্তু পেদ্রোকে ছাড়েনি। এডওয়ার্ড ফিরে যাবার সাথে সাথেই হেনরি আবার মাথাচাড়া দিলেন। তার সাথে লড়াই করতে করতে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন ডন পেদ্রো। সিংহাসন তো গেলই, ব্যাটল অফ নাজেরার মাত্র তিন বছরের মাথায় অনেকটা নিঃস্ব অবস্থায় প্রাণটাও খোয়ালেন তিনি সৎভাইয়ের হাতে।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিশৃঙ্খলা
এডওয়ার্ডের কাছে ছিল বলে রুবির পোশাকি নাম হয়ে যায় ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি। দুর্ভোগ তাকেও ঘিরে ধরে। রোগে ভুগে সিংহাসনে বসার আগেই মাত্র ছেচল্লিশ বছর বয়সে এডওয়ার্ডের মৃত্যু হয়। ফলে তার ছেলে রিচার্ড হয়ে গেলেন ক্রাউন প্রিন্স। তার দখলে চলে এলো বাবার রুবি। পরবর্তীতে দশ বছর বয়সেই দ্বিতীয় রিচার্ড নামে অভিষেক হল তার।
দ্বিতীয় রিচার্ডের ভাগ্যও খুব ভাল ছিল না। তাকে সইতে হচ্ছিল অভিজাতদের বিরোধিতা। এদের অন্যতম জন অফ গন্টের ছেলে হেনরি বলিংব্রুককে তিনি নির্বাসন দিয়েছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর হেনরি দেশে ফিরে এলেন, সাথে আনলেন একদল সেনা। রিচার্ডের উপর বিরক্ত অনেকেই তার সাথে যোগ দেয়। ফলে দ্রুতই হেনরির দল ভারী হয়ে গেল। রিচার্ডকে গদি থেকে টেনে নামিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দিলেন তিনি। বলা হয় সেখানেই অনাহারে মৃত্যু হয় দ্বিতীয় রিচার্ডের।

দ্বিতীয় রিচার্ড
হেনরি বলিংব্রুক সিংহাসনে বসেছিলেন চতুর্থ হেনরি নামে। ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি তার অধিকারে চলে আসে। তিনি পত্তন করেন ল্যাঙ্কাস্ট্রিয়ান রাজবংশের। দীর্ঘ রোগে ভুগে হেনরি মারা গেলে ছেলে পঞ্চম হেনরি অভিষিক্ত হন। তিনি নিজ শিরস্ত্রাণের উপর সংযুক্ত করেন ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি।
এই শিরস্ত্রাণ পরে ১৪১৫ সালের ২৫ অক্টোবর সংঘটিত বিখ্যাত এজিনকোর্টের যুদ্ধে ফরাসীদের বিপক্ষে নেমেছিলেন হেনরি। ময়দানে ফরাসী রাজপুত্র ডিউক অফ অ্যালঁস প্রথম জনের (Duc d’Alençon) মুখোমুখি হলেন ইংল্যান্ডের রাজার। বলা হয় কুঠারের আঘাতে হেনরির শিরস্ত্রাণ প্রায় ভেঙ্গে ফেলেছিলেন তিনি। আরো অনেক ফরাসীও তার উপর আক্রমণ করে। হেনরি বেঁচে গেলেও তার শিরস্ত্রাণ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়। তবে যুদ্ধে জয় পান তিনি।
লড়াই শেষ হলে এক ফরাসী ভাঙ্গা টুকরোগুলি জোগাড় করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যায়। হেনরি ফিরে পায় তার রুবি। পুরষ্কার হিসেবে ফরাসী ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।


ব্যাটল অফ এজিনকোর্টে চতুর্থ হেনরি
টিউডর এবং স্টুয়ার্ট বংশ
ষোড়শ শতাব্দীতে টিউডররা ইংল্যান্ডের রাজক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। প্রথম এলিজাবেথের শাসনামলে স্কটদের রানী মেরিকে ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি উপহার দেন এলিজাবেথ। পরে এই মেরিকেই মাথা পেতে দিতে হয় জল্লাদের খাঁড়ার নিচে। তার ছেলে জেমসের কাছে রক্ষিত ছিল মায়ের রুবি। তিনি ১৬০৩ সালে ইংল্যান্ডের রাজা হলে টিউডর শাসনের সমাপ্তি ঘটে, সূচনা হয় স্টুয়ার্টদের সময়ের।
জেমসের পর ছেলে প্রথম চার্লস হিসেবে ক্ষমতা পেলেন। উত্তরাধিকার হিসেবে তার কাছেই চলে গেল ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি। চার্লসের দুর্ভাগ্যের জন্ম দিয়ে উত্থান হল অলিভার ক্রমওয়েলের। ১৬৪৬ সালে প্রথম ব্রিটিশ গৃহযুদ্ধের অবসানে চার্লসকে গদিচ্যুত করলেন তিনি। এর দুই বছর পর প্রথম চার্লসকে মৃত্যুদণ্ড দেন ক্রমওয়েল।
চার্লসের রত্ন ক্রমওয়েল জব্দ করে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। বিক্রির তালিকায় ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবির নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। তবে অনেকেই দুটি রুবি পাথরের যেকোনো একটি এই রত্ন হতে পারে বলে মত দেন। একটি রুবি বিক্রি হয়েছিল চার পাউন্ডে, আরেকটি পনেরো পাউন্ডে। ১৬৬০ সালে এই কেনাবেচা সম্পন্ন হয়।
ক্রমওয়েলের মৃত্যুর পর রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে চার্লসের ছেলে রাজা হন। দ্বিতীয় চার্লস ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি পুনরায় কিনে নেন। তিনি নিজ মুকুটে এই পাথর স্থাপন করেন। তার শাসনামলে ডাচদের সাথে যুদ্ধে ব্রিটিশ কোষাগারে টান পড়ে। লড়াইয়ের কোনো সুফল পেতেও চার্লস ব্যর্থ হন।
চার্লসের পর ভাই দ্বিতীয় জেমস সিংহাসনে বসলেও মাত্র তিন বছরের মাথায় বাধ্য হন নির্বাসনে চলে যেতে। এরপর অনেক বছর ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবির তেমন কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।
বর্তমান
ব্রিটিশ রাজপরিবারের গহনাসমূহ দর্শনার্থীদের দেখার জন্য রাখা থাকে টাওয়ার অফ লন্ডনে। ১৮৪১ সালে টাওয়ারে আগুন লাগলে পুলিশ ইন্সপেক্টর পিয়ার্সের সাহসিকতায় রক্ষা পায় সমস্ত গহনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বোমাবর্ষণ থেকেও কোনক্রমে রক্ষা পায় টাওয়ার অফ লন্ডন। বর্তমানে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে টাওয়ার অফ লন্ডন। সেখানে গেলেই দেখা মিলবে ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবির।

সংক্ষেপে দেখুনটাওয়ার অফ লন্ডনে রাখা ব্রিটিশ মুকুটের রত্ন
ভালোভাবে খতিয়ে দেখলে ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবির সাথে জড়িত অনেক দুর্ভাগ্যের কাহিনীর যুক্তিপূর্ণ কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। মূলত মানুষের অনিয়ন্ত্রিত লোভ-লালসা থেকেই এসব ঘটনার সূচনা। তবে মানুষের মনে ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি অভিশপ্ত হিসেবেই থেকে গেছে।
সেপ্পুকু বা হারা-কিরি এর ইতিহাস কি?
শত্রুর হাতে ধরা পড়ার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়- এই মানসিকতা বেশ পুরনো। ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে, অনেক ঐতিহ্যবাহী রীতি আছে, যেখানে পরাজিত যোদ্ধারা শত্রুর হাতে বন্দিত্বের অপমান সহ্যের চেয়ে আত্মহত্যাকে হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন। এমনই এক আনুষ্ঠানিক আত্মহত্যা পদ্ধতি হল ‘সেপ্পুকু’ , যা অনেক ক্ষেত্রে ‘হারা-কিরি’বিস্তারিত পড়ুন
শত্রুর হাতে ধরা পড়ার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়- এই মানসিকতা বেশ পুরনো। ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে, অনেক ঐতিহ্যবাহী রীতি আছে, যেখানে পরাজিত যোদ্ধারা শত্রুর হাতে বন্দিত্বের অপমান সহ্যের চেয়ে আত্মহত্যাকে হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন। এমনই এক আনুষ্ঠানিক আত্মহত্যা পদ্ধতি হল ‘সেপ্পুকু’ , যা অনেক ক্ষেত্রে ‘হারা-কিরি’ নামেও পরিচিত।
আত্মহত্যার এই রীতি আনুষ্ঠানিকভাবে সেপ্পুকু হিসেবেই পরিচিত জাপানের অধিবাসীদের কাছে, হারা-কিরি নামটি জাপানের বাইরের মানুষদের কাছেই বেশি প্রচলিত। তবে নাম দুটি ভিন্ন হলেও অর্থ একই। সেপ্পুকু বা হারা-কিরি অর্থ হল পেট কেটে ফেলা। হ্যাঁ, এই রীতিতে নিজেই নিজের পেট কেটে মৃত্যুবরণ করে আত্মহত্যাকারী।
সেপ্পুকুতে পেট কাটার বিভিন্ন ধরন
স্বেচ্ছামৃত্যুর এই রীতির উৎস জাপান। জাপানের সামুরাই গোষ্ঠীর নাম শোনেনি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। জাপানিজ যোদ্ধাদের বলা হতো ‘সামুরাই’। সামুরাই নামটি অভিজাত যোদ্ধাদের চিহ্নিত করার জন্য মূলত ব্যবহৃত হতো শুরুতে। তবে ১২ শতাব্দীতে জাপানের ক্ষমতায় উত্থিত হওয়া যোদ্ধা গোষ্ঠীর সকলের জন্যই এই নামটি ব্যবহৃত হয়। এই সামুরাই গোষ্ঠীতেই মর্যাদাসূচক জীবনদানের এই পদ্ধতির প্রচলন হয়।
কেন পেট কেটেই মারা যাওয়ার এই রীতি? প্রাচীন জাপানে ধারণা করা হতো, মানুষের আত্মার বাস হল পেটে। তাই পেট সম্পূর্ণ চিরে মৃত্যুটাকে ধরা হতো মারা যাওয়ার সবচেয়ে অকপট ও সাহসী উপায়। আর তাই এই বিশেষ অধিকার কেবল অভিজাত সামুরাই গোত্রেরই ছিল। সাধারণ জনগণ স্বেচ্ছায় মৃত্যু বেছে নিলে ফাঁসিতে ঝুলে বা পানিতে ডুবে মারা যেতে পারত, সামুরাই গোত্রের মেয়েরা নিজের গলা কেটে মৃত্যুবরণ করতে পারত, সেই পদ্ধতিকে বলা হত ‘জিগাই (Jigai)’, কিন্তু সেপ্পুকু পালনের অধিকার ও মর্যাদা একমাত্র সামুরাই পুরুষ যোদ্ধাদের জন্যই সংরক্ষিত ছিল। একমাত্র সেপ্পুকু পালনের মাধ্যমেই একজন সামুরাই যোদ্ধা তার এবং পরিবারের সম্মান বাঁচাতে বা বজায় রাখতে পারতেন বলে মনে করা হতো। পরাজিত বা অসম্মানিত সামুরাই, যে আত্মহত্যার বদলে আত্মসমর্পণ বেছে নিত, সে সমাজের কাছে তিরস্কারের পাত্রে পরিণত হতো।
সেপ্পুকু রীতি
হারা-কিরির প্রথম নজির দেখা গিয়েছিল ১১৮০ সালে, ‘ইউজি (Uji)’র যুদ্ধের পর। প্রথম হারা-কিরি কার্যকর করেন মিনামোটো নো ইয়োরিমাশা। তিনি শত্রুর হাতে ধরা পড়ে নির্যাতনের স্বীকার হয়ে মূল্যবান তথ্য দেয়ার চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নেন। এর আগপর্যন্ত সামুরাইদের মধ্যে এই ধারণা অত প্রচলিত ছিল না। কিন্তু এর পর থেকেই প্রাণত্যাগের এই নিয়মের প্রতি এক অসুস্থ জনপ্রিয়তা দেখা যায়। এমন পদ্ধতি আমাদের কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু মান-সম্মানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া জাপানের ঐতিহ্যে এটি খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
মিনামোটো নো ইয়োরিমাশার প্রতিকৃতি
মোটামুটি ১২ শতাব্দীর দিকে সেপ্পুকু বেশ বড় পরিসরে পরিচিতি পায়। কিন্তু ১৭ শতাব্দী পর্যন্ত এই রীতি বেশ অগোছালোভাবেই পালিত হত। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম মেনে করা হতো না, মৃত্যুর প্রক্রিয়াও মানুষভেদে বিভিন্ন ছিল। সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি ছিল ‘ট্যানটো’ নামে ছোট একধরনের ধারালো ছুরি ব্যবহার করে লম্বালম্বিভাবে পেট চিরে ফেলা, আর সবচেয়ে কম প্রচলিত পদ্ধতি ছিল যেকোনো ছুরিকে এক জায়গায় বসিয়ে তার উপর পতিত হওয়া। এই অসামঞ্জস্যের আমূল পরিবর্তন আসে ‘এডো’ পিরিয়ডে (প্রায় ১৬০৩ থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত)। অর্থাৎ যেসময় তোকুগাওয়া শোগুনেট আর তাদের অধীনস্ত প্রায় ৩০০ ‘দাইমিয়ো’দের রাজত্ব ছিল জাপানিজ সমাজে।
সেপ্পুকুতে ব্যবহৃত একটি ট্যানটো
এই সময়ে এসে সমাজের উপর স্তরের বাসিন্দারা বিভিন্ন জটিল ধাপ সংযোজনের মাধ্যমে সেপ্পুকুকে বেশ কঠোর একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করে। প্রথম সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে সেপ্পুকু কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, সে জায়গা নিয়ে। সাধারণত সেপ্পুকু পালন করার কথা যুদ্ধক্ষেত্রে, যখন যুদ্ধ জেতার সকল আশা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এডো পিরিয়ডে এই ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মহত্যার পরিবর্তে পরাজিত যোদ্ধাকে পরে বিশাল জনসমাগমে সেপ্পুকু পালন করতে হতো। এই ধরনের সেপ্পুকু ছিল বাধ্যতামূলক। অসম্মান থেকে পরাজিত সামুরাই যোদ্ধাকে বাঁচাতে মুখ্য শাস্তি হিসেবে এটি পালন করা হতো। বেশ আয়োজন করেই পালিত হতো এই রীতি। প্রথমে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় সাদা কুশন বিছানো হতো। পরাজিত যোদ্ধাকে ধবধবে সাদা একটি কিমোনো (জাপানের ঐতিহ্যবাহী পোশাক) পরে কুশনের উপর হাঁটু গেড়ে বসতে হতো। তাকে তার প্রিয় খাবার দেয়া হতো শেষ খাবার হিসেবে। পাশে ‘ট্যানটো’ অর্থাৎ পেট চেরার জন্য ছুরিটি নিয়ে শান্তভাবে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে যোদ্ধা লিখত ‘মৃত্যু-কবিতা’, যা তার শেষ কথা ও সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হতো। এর পূর্বেই যোদ্ধা একজন ‘কাইশাকুনিন’ বা সাহায্যকারী বেছে নিতেন, যে তার পেছনে বামদিকে তলোয়ার নিয়ে প্রস্তুত থাকত। ট্যানটো দিয়ে পেট কাটার সাথে সাথেই কাইশাকুনিন মাথার পেছন দিকে তলোয়ারের আঘাতের মাধ্যমে যোদ্ধার মৃত্যু নিশ্চিত করত।
কাইশাকুনিনকে হতে হত বেশ দক্ষ তলোয়ারবাজ, কেননা তাকে মাথাটা এমনভাবে কাটতে হতো যেন সম্পূর্ণ মাথা ধড় থেকে আলাদা না হয়ে পড়ে। কিছুটা মাংস ধড়ের সাথে যুক্ত থেকে এমনভাবে মাথার অবস্থান নিশ্চিত করতে হতো যেন দেখে মনে হয় পরাজিত ঐ যোদ্ধা সামনের দিকে মাথা নত করে আছে। ১৮০০ সালের দিকে পুরো সেপ্পুকু পদ্ধতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে চলে আসে কাইশাকুনিন। যদিও নিয়ম ছিল, প্রথমে যোদ্ধা পেট কাটবে এবং এর নির্দিষ্ট সময় পর কাইশাকুনিন তার মাথার পেছনে আঘাত করবে, কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যেত, পেটে আঘাতের সাথে সাথেই মাথায় আঘাত হয়ে গেছে। যত সময় যেতে লাগল, দেখা গেল যে যোদ্ধা তার পেটে ছুরি বসানোর আগেই কাইশাকুনিন মাথায় আঘাত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দিচ্ছে।
শিল্পীর তুলিতে কাইশাকুনিনের তলোয়ার
বাধ্যতামূলক সেপ্পুকুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন বলা যায় ৪৭ রনিনের ঘটনাকে। রনিন বলা হত প্রভুহীন সামুরাই যোদ্ধাদের, যারা প্রায়ই থাকত ভবঘুরে ও সক্রিয়ভাবে বিদ্রোহী। ৪৭ রনিন প্রভুহীন হয়ে পড়ে, যখন তাদের প্রভু ‘আসানো নাগানোরি’কে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে হত্যা করা হয়। আসানোকে হত্যার জন্য তারা শোগুন (জাপানের তৎকালীন সামরিক একনায়ক) তোকুগাওয়া সুনায়োশির অধীনস্ত দাইমিয়ো ‘কিরা ইয়োশিনাকা’কে দায়ী ধরে তাকে হত্যা করে। এই ঘটনার পর শোগুন সেই ৪৭ রনিনকে সেপ্পুকু পালনের নির্দেশ দেয়।
প্রভুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়া ৪৭ রনিনের সমাধি
আরেক ধরনের সেপ্পুকু ছিল স্বেচ্ছাকৃত। এটি ছিল মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত যোদ্ধাদের শত্রুর হাতে পড়ার চেয়ে মৃত্যু বেছে নেয়া। ধীরে ধীরে কোনো সামুরাই তার প্রভুর প্রতি বিশ্বস্ততার নজির হিসেবে কিংবা কোনো সরকার বা রাজনৈতিক নেতার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ হিসেবে বা নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে স্বেচ্ছায় সেপ্পুকু পালন শুরু করে। আধুনিক জাপানেও স্বেচ্ছা সেপ্পুকুর বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য নজির আছে, যার একটি হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর বেশ কিছু সামরিক সেনার সেপ্পুকু পালনের মাধ্যমে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া। প্রায় ১৫ সেন্টিমিটারের একটি চাকু দিয়ে পেটের বাম থেকে ডান দিকে কাটার মাধ্যমে তারা আত্মহত্যা করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এক সেনার সেপ্পুকু পালন
আরেকটি বিখ্যাত সেপ্পুকুর ঘটনা ঘটে ১৯৭০ সালে, যখন জাপানের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক মিশিমা ইউকিয়ো নিজের পেট কেটে জনসম্মুখে মৃত্যুবরণ করেন। জাপানের ঐতিহ্যের মূল্য হারানোর ব্যাপারে তার চিন্তাভাবনাকে সমর্থন দিতেই তিনি এই পথ বেছে নেন।
মিশিমা ইউকিয়ো
বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু চলচ্চিত্র, লেখা ও নাটকে সেপ্পুকুর বিভিন্ন রূপ উঠে এসেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করলে স্বেচ্ছা সেপ্পুকুকে আরো কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। সাধারণত চলচ্চিত্রে এই সেপ্পুকুর নতুন একটি ধরন প্রকাশ পায়, যাকে বলা হত ‘কানশি’, যেখানে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা ভূস্বামীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে সেপ্পুকু পালন করা হতো। তবে অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ সেপ্পুকুর চেয়ে পার্থক্য থাকত যে, এক্ষেত্রে সামুরাই যোদ্ধারা পেটে বেশ গভীর ক্ষত সৃষ্টি করত এবং যত দ্রুত সম্ভব তা ব্যান্ডেজ করে ফেলত। পরবর্তীতে জনতার সামনে সে তার বক্তব্য রাখত এবং সেই ক্ষত উন্মোচন করত প্রতিবাদের প্রতি তার একাত্মতা হিসেবে।
এই ধরনটি ‘ফুনশি’ বা ধিক্কারের মৃত্যু থেকে একদম আলাদা। ফুনশিকে ধরা হত সেপ্পুকুর বিশেষভাবে চিত্রায়িত করা এক মাধ্যম। কোনো অসন্তোষ বা প্রতিবাদের পক্ষে শক্তিশালী পক্ষ রাখতে গিয়ে সামুরাই যোদ্ধারা এই সেপ্পুকু পালন করত। জাপানের নাট্যশালায় আবার সেপ্পুকুর এক কল্পিত সংস্করণ ছিল, যাকে ‘কাজিবারা’ বলা হত। আবার কিছু সামুরাই ‘জুমোঞ্জি গিরি’ নামে সেপ্পুকুর এক ধরন বেছে নিত। এই পদ্ধতিতে কোনো কাইশাকুনিন মঞ্জুর করা হতো না। পেট আনুভূমিকভাবে কেটে ট্যানটো দিয়ে আবার বুক থেকে নিচের দিকে লম্বা ক্ষত করা হয় এ পদ্ধতিতে। এটি বিশেষভাবে সেপ্পুকুর বেদনাদায়ক পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত, কারণ এতে ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটে।
সম্রাট মেইজি (Meiji) দ্বারা মেইজি সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের পর ১৮৭৩ সালের দিকে বিচারিক শাস্তি হিসেবে সেপ্পুকুর প্রচলন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। তবে প্রশাসনিকভাবে প্রচলিত না থাকলেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে এর অনুশীলন জাপানে চলতেই থাকে।
যদিও সামুরাই গোত্রে সেপ্পুকু বা হারা-কিরি বেশ সম্মানজনক মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা হয়, কিন্তু বেশ অনেকবারই প্রশ্ন ওঠে যে আসলেই এটি সম্মানজনক নাকি নিছকই ঠুনকো গর্ব বজায় রাখার চেষ্টা? পরিচালক কোবায়াশি পরিচালিত ‘হারা-কিরি’ নামের চলচ্চিত্রে হারা-কিরি বা সেপ্পুকুর অন্য আরেকটি রূপ ফুটে ওঠে। প্রভুহীন সামুরাই যোদ্ধা অর্থাৎ রনিনদের অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা পরিচালক চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলেন। চলচ্চিত্রটিতে দেখা যায়, মোটোমি নামক এক তরুণ রনিন লি গোত্রের প্রাসাদের সামনে সেপ্পুকু পালনের অনুমতি চায়।
হারা-কিরি চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য
তখনকার সময়ে রনিনদের অবস্থা বেশ করুণ ছিল, কাজ নেই, তাই নেই উপার্জনও। মোটোমি শুনেছিল, আগে একজন রনিন এভাবে সেপ্পুকু পালন করতে চাওয়ায় তাকে বেশকিছু পয়সাকড়ি দিয়ে বিদায় করে দেয়া হয়। অসুস্থ স্ত্রী ও বাচ্চার চিকিৎসার জন্য সে একইভাবে কিছু অর্থ পাওয়ার আশায় এই কাজটি করে। কিন্তু এরকম রনিনদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে ও তা কমানোর জন্য একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে- এমন চিন্তা থেকে গোত্রের তিন বয়োজ্যেষ্ঠ সামুরাই মোটমিকে শিক্ষা দেয়ার চিন্তা করেন। তাকে জোর করা হয় সেপ্পুকু পালনে। তার বাঁশের তলোয়ার দিয়েই তাকে সেপ্পুকু পালনে বাধ্য করা হয়। আসলেই সেপ্পুকু বা হারা-কিরির মর্যাদা রক্ষা ব্যাপারটি কতটুকু যুক্তিসঙ্গত তা-ই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে। জোর করে বা শাস্তি হিসেবে এই পীড়াদায়ক পদ্ধতিতে কাউকে মরতে বাধ্য করা কতটা যুক্তিসঙ্গত ছিল সে প্রশ্ন রয়েই যায়।
সংক্ষেপে দেখুনকিভাবে এলো মজার চুয়িং গাম?
আধুনিক সময়ে চুয়িং গাম শিশু-কিশোরদের কাছে অতি পরিচিত একটি খাবার। প্রতিটি মুদি দোকানেই বিভিন্ন স্বাদের, রংয়ের, আকার কিংবা মূল্যের চুয়িং গাম দেখতে পাওয়া যায়। শিশুরা এসব দেদারসে কেনে। আমাদের দেশে মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি কিংবা বৃদ্ধদের কাছে এর তেমন আবেদন না থাকলে ইউরোপে বা আধুনিক দেশগুলোতে সময় কাটানোরবিস্তারিত পড়ুন
আধুনিক সময়ে চুয়িং গাম শিশু-কিশোরদের কাছে অতি পরিচিত একটি খাবার। প্রতিটি মুদি দোকানেই বিভিন্ন স্বাদের, রংয়ের, আকার কিংবা মূল্যের চুয়িং গাম দেখতে পাওয়া যায়। শিশুরা এসব দেদারসে কেনে। আমাদের দেশে মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি কিংবা বৃদ্ধদের কাছে এর তেমন আবেদন না থাকলে ইউরোপে বা আধুনিক দেশগুলোতে সময় কাটানোর মাধ্যম হিসেবে এটি দারুণ এক খাদ্য। খেলোয়াড়েরা খেলার বা অনুশীলনের সময় যেন গলা শুকিয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে প্রায়শই চুয়িং গাম চিবিয়ে থাকেন। সেলিব্রিটি ব্যক্তিত্বদের ফেলে দেয়া চুয়িং গাম কুড়িয়ে এনে পরবর্তীতে নিলামে বিশাল অংকে বিকোনোর খবরও শোনা গিয়েছে বেশ কয়েকবার। এই খাবারটির রয়েছে এক মজাদার ইতিহাস।
ইতিহাস বলছে, চুয়িং গাম চিবানো হতো সেই প্রাচীনকাল থেকেই। আজ থেকে নয় হাজার বছর পূর্বে উত্তর ইউরোপের বাসিন্দারা একধরনের গাছের ছাল চিবোতেন। গবেষকদের মতে, সম্ভাব্য দুটি কারণে সেই সময় তারা গাছের ছাল চিবাতেন। একটি হচ্ছে সেটি চিবানোর ফলে তারা একটি আলাদা স্বাদ লাভ করতেন, আরেকটি হচ্ছে দাঁতের ব্যথা সারানোর জন্য তারা এরকমটা করে থাকতেন৷ আমেরিকা মহাদেশের প্রাচীন মায়া সভ্যতায়ও চুয়িং গাম চাবানোর নিদর্শন পাওয়া যায়। মায়া সভ্যতায় স্যাপোডিল্লা গাছ থেকে উৎপন্ন হয়ে জমে যাওয়া রস চিবানো হতো। সাধারণত ক্ষুধা মেটাতে কিংবা তৃষ্ণা নিবারণ করতেই এমনটা করতো মায়ানরা। এরপর মেক্সিকোর বিখ্যাত আজটেক সভ্যতায়ও একইভাবে স্যাপোডিল্লা গাছ থেকে উৎপন্ন চুয়িং গাম খাওয়া হতো।
ইতোপূর্বে চুয়িং গাম চর্বণের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ নিয়মের চিহ্ন পাওয়া না গেলেও আজটেক সভ্যতায় চুয়িং গাম চিবানোর নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল। শিশু ও অবিবাহিত নারীরা প্রকাশ্যেই চিবোতে পারতেন। বিবাহিত নারী এবং বিধবাদের ক্ষেত্রে নিয়ম ছিল ব্যক্তিগত পরিসরে উপভোগ করার। তারা মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে এমনটা করতেন। অপরদিকে পূর্ণবয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে একেবারেই আড়ালে চিবোনোর কঠোর নিয়ম ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দাঁত পরিষ্কার করা।

উত্তর আমেরিকায় পাইন গাছের সদৃশ ‘স্প্রুস ট্রি’র সর্জরস চিবানোর চল ছিল। পরবর্তীতে ইউরোপীয়রা সেখানে উপনিবেশ স্থাপন করলে তারাও চিবানোর সংস্কৃতি অব্যাহত রাখে। ১৮৪০ সালের দিকে প্রথমবারের মতো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে জন কার্টিস নামের একজন ব্যক্তি চুয়িং গাম শিল্পের সূচনা করেন। তিনি স্প্রুস গাছের রস সংগ্রহ করে সেটি গরম পানিতে সিদ্ধ করতেন। এরপর সেই রস জমিয়ে সুবিধা মতো কাটা হতো। কেটে ছোট টুকরো করার পর সেগুলোতে ভুট্টা থেকে উৎপন্ন ময়দা মাখানো হতো, যাতে একসাথে অনেকগুলো রাখলে একটির সাথে আরেকটি লেগে না যায়। এভাবে বানানো চুয়িং গামের স্বাদ খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না। ফলে তিনি ও তার পরের চুয়িং গাম উৎপাদকরা প্যারাফিন তেলসহ বিভিন্ন উপাদান যোগ করার সিদ্ধান্ত নেন।
নিউ ইয়র্কের থমাস অ্যাডামস নামের একজন ব্যক্তির সাথে নির্বাসিত মেক্সিকান প্রেসিডেন্ট এ্যান্টনিও লোপেজ ডি সান্তা আন্নার দেখা হয়। নির্বাসিত প্রেসিডেন্টের কাছে থাকা স্যাপোডিল্লা গাছের নির্যাস থেকে উৎপাদিত চুয়িং গাম ‘চিকল’ থমাস অ্যাডামসের নজরে আসে। তারা দুজনে ‘চিকল’ নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা করেন। নির্বাসিত প্রেসিডেন্ট লোপেজ চেয়েছিলেন রাবারের বিকল্প হিসেবে আমেরিকায় তারা চিকলের প্রসার ঘটাবেন। কিন্তু পরীক্ষাগুলোতে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না আসায় তারা হতাশ হয়ে পড়েন। থমাস অ্যাডামস দেখতে পান, চিকল যদি উন্নতমানের চুয়িং গাম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে ভালো সম্ভাবনা আছে। ১৮৮০ সালের দিকে তিনি একটি কোম্পানি তৈরি করেন, যেটি পুরো আমেরিকায় চিকল থেকে তৈরিকৃত চুয়িং গাম সরবরাহ করতো।
বিশ শতকে চুয়িং গামের বাজার বড় হতে থাকে। আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় উইলিয়াম রিংলে জুনিয়র নামের একজন ব্যক্তি সাবানের বিপণন করতেন। তিনি তার পণ্য বিপণনের জন্য বিক্রেতাদের বিভিন্ন বাড়তি সুবিধা দেয়া শুরু করেন। যেমন- কোনো বিক্রেতা যদি পাইকারি হারে নির্দিষ্ট পরিমাণ সাবান ক্রয় করতো, তবে তিনি বেশ কিছু বেকিং পাউডারের ক্যান ফ্রি দিতেন। পরবর্তীতে দেখা গেল বাজারে সাবানের চেয়ে বেকিং পাউডারই বেশি বিকোচ্ছে৷ এরপর তিনি সাবান বাদ দিয়ে বেকিং পাউডারের বিপণন শুরু করেন এবং বাড়তি সুবিধা হিসেবে বিক্রেতাদের কিছু চুয়িং গামের প্যাকেট ফ্রি দিতেন। একপর্যায়ে বাজারে চুয়িং গামের বিশাল চাহিদা তৈরি হয়। ১৮৯৩ সালের দিকে তিনি চিউয়িং গাম তৈরির দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন (জ্যুসি ফ্রুট এবং রিংলে’জ স্পিয়ারমিন্ট)। চুয়িং গামের বিজ্ঞাপনের পেছনে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন। এটি তাকে আমেরিকার অন্যতম সেরা ধনী ব্যক্তিতে পরিণত করে।

এদিকে ১৮৮৫ সাল থেকেই চুয়িং গাম উৎপাদন করে যাচ্ছিল ফ্র্যাঙ্ক ফ্লিয়ার নামের একজন ব্যক্তির নিজস্ব কোম্পানি। তিনি চেয়েছিলেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো যেরকম চুয়িং গাম বিক্রি করছে, তার চেয়ে ভিন্ন ঘরানার কিছু বিক্রি করবেন। ১৯০৬ সালে তিনি বাবল গাম বাজারে আনেন, যার নাম দিয়েছিলেন ‘ব্লিবার-ব্লাবার’৷ কিন্তু এটি সেভাবে আলোড়ন তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। ১৯২৮ সালে ফ্র্যাঙ্ক ফ্লিয়ারের প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী ওয়াল্টার ডাইমার আরও উন্নত বাবল গাম তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করেন। ওয়াল্টার ডাইমারের উদ্ভাবিত কৌশলের বাবল গামের নাম দেয়া হয় ‘ডাবল বাবল’। এই বাবল গাম বাজারে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন স্বাদের ও বর্ণের চুয়িং গাম তৈরি করে চলেছে।
সংক্ষেপে দেখুনজেন্দাবেস্তা কি?
বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৪,০০০ ধর্মীয় মতবাদ বা বিশ্বাস চালু আছে। এসবের মধ্যে একটি হলো জরথুস্ত্রবাদ। প্রায় ৪,০০০ বছর পূর্বে পারস্যে (ইরান) উদ্ভব হওয়া এই ধর্মকে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। অতিপ্রাচীন এই ইরানীয় ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন জরথুস্ত্র। তাদের ধর্মগ্রন্থ জেন্দাবেস্তবিস্তারিত পড়ুন
বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৪,০০০ ধর্মীয় মতবাদ বা বিশ্বাস চালু আছে। এসবের মধ্যে একটি হলো জরথুস্ত্রবাদ। প্রায় ৪,০০০ বছর পূর্বে পারস্যে (ইরান) উদ্ভব হওয়া এই ধর্মকে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। অতিপ্রাচীন এই ইরানীয় ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন জরথুস্ত্র। তাদের ধর্মগ্রন্থ জেন্দাবেস্তা বা আবেস্তা নামে পরিচিত। খ্রি.পূ. ১৫০০ অব্দ – খ্রি.পূ. ১০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে ধর্মপ্রবক্তা জরথুস্ত্রের মুখ নিঃসৃত বাণীসমূহ বংশপরম্পরা ও ঐতিহ্যগতভাবে কেতাবে লিপিবদ্ধ হয়ে তা রূপ নিয়েছে জেন্দাবেস্তায়। জেন্দাবেস্তার মৌলিক প্রার্থনা এবং স্তবগান রচিত হয়েছে আবেস্তা ভাষায়। সাসানীয় সাম্রাজ্যের আগপর্যন্ত (২৪৪ খ্রি. – ৬৫১ খ্রি.) এই ভাষা মৌখিকভাবে সংরক্ষিত থাকে। সাসানীয় সাম্রাজ্যের আমলে আরামীয় লিপির ওপর ভিত্তি করে আবেস্তা ভাষার জন্য তৈরি করা হয় নিজস্ব বর্ণমালা। বর্তমানে এটি একটি অধুনা-লুপ্তপ্রায় ভাষা।








জেন্দাবেস্তা
জরথুস্ত্রীয় প্রথা অনুযায়ী, সর্বজ্ঞানী দেবতা অহুর মাজদা জরাথুস্ত্রের নিকট দিব্যজ্ঞান প্রকাশ করেছিলেন। জরথুস্ত্র তা পাঠ করে শুনিয়েছিলেন সম্রাট বিশতাসপারকে। সেই শ্লোকসমূহ মোট ২১ খানা বইয়ে লিপিবদ্ধ করা আছে, যা নাস্ত নামে পরিচিত। জরথুস্ত্রবাদ রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত এবং বিকশিত হবার পর ধর্মসংক্রান্ত মূল রচনার পাশাপাশি ধর্মীয় রীতিনীতি, ভাষ্য, প্রথা- এসবের ধারণা উন্নতিসাধন ঘটে। আবেস্তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়গুলো লালিত হয়েছে আকেমেনিড সাম্রাজ্য ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের আমলে, জরথুস্ত্রীয় পারসিকদের দ্বারা।
অহুর মাজদা
প্রাচীন ইরানের প্রধান ধর্ম ছিল বহুঈশ্বরবাদী এবং সেই ধর্মে অহুর মাজদা ছিলেন দেবসম্রাট। এই দেবতারা জোটবদ্ধভাবে লড়তেন সত্যের পক্ষে, বাধা হয়ে দাঁড়াতেন অশুভ শক্তি ‘আংগ্রা মন্যু’ ও তার দলবলের বিরুদ্ধে। অহুর মাজদা ও তার দলের সেবক হিসেবে পূজা-অর্চনায় নিয়োজিত ছিলেন একদল পুরোহিত। সম্ভবত খ্রি.পূ. ১৫০০ অব্দ – খ্রি.পূ. ১০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে জরথুস্ত্র নামে এক পুরোহিত অহুর মাজদা থেকে দিব্যজ্ঞান প্রাপ্ত হন। অহুর মাজদা তাকে দর্শন দেন এক নদীর তীরে। ঐশ্বরিক সেই সত্তা নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন ‘বহু মানাহ’ (সৎ উদ্দেশ্য) নামে। তিনি জরথুস্ত্রকে জানিয়েছিলেন, প্রকৃত ঈশ্বর একজনই, তিনি হলেন অহুর মাজদা। তার থেকে প্রাপ্ত দৈববাণীসমূহ মানুষের মধ্যে প্রচার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জরাথুস্ত্রকে।
অহুর মাজদা বনাম আঙ্গ্রা মন্যু
জরাথুস্ত্রের সেই ধর্মীয় বাণী প্রচারের প্রচেষ্টা শুরুতে কেউ ভালো নজরে দেখেনি। একসময় জীবননাশের হুমকি পাওয়ায়, তিনি নিজ গৃহ ত্যাগ করে হাজির হন সম্রাট বিশতাসপার রাজ দরবারে। প্রথমে সম্রাট নয়া ধর্মমতের জন্য তাকে বন্দি করলেও, রাজার প্রিয় ঘোড়াকে সুস্থ করে দিলে জরাথুস্ত্রের প্রতি সদয় হন তিনি। একসময় জরথুস্ত্রীয় ধর্মে ধর্মান্তরিত হন সম্রাট। এরপর সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজ্যজুড়ে শুরু হয় এই ধর্মের প্রচার ও প্রসার।
সম্রাট বিশতাসপাসের রাজদরবারে জরথুস্ত্র
আবেস্তার প্রাচীনতম অধ্যায়ের নাম হলো গাথা। মনে করা হয়, অহুর মাজদার প্রশংসা সংবলিত এই স্তুতিসমূহ রচিত হয়েছিল স্বয়ং জরাথুস্ত্রের দ্বারা। এই অংশে সঠিক ও সুপথে জীবন পরিচালনায় রাস্তা দেখানোর জন্য অহুর মাজদার নিকট মিনতি করা হয়েছে। কিংবদন্তি অনুসারে, এই স্তবগানগুলো রচনা করা হয়েছিল সম্রাট বিশতাসপাসের আদেশে। যদিও এর কোনো মজবুত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
জরথুস্ত্র
এই ধর্ম রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত হয়েছিল আকেমেনিড সাম্রাজ্যকালে, সম্ভবত সম্রাট প্রথম দারিয়ুসের আমলে। সাইরাস দ্য গ্রেটের আমলে বিভিন্ন নথিতে অহুর মাজদার উল্লেখ পাওয়া গেলেও, তখন বহু-ঈশ্বরবাদী বিশ্বাস চালু ছিল। কথিত আছে, আকেমেনিডরা আবেস্তার একটি সংস্করণ রচনা করেছিলেন, যা খ্রি.পূ. ৩৩০ অব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের অভিযানে পার্সিপোলিস পুড়িয়ে দেওয়ার সময় ধ্বংস হয়ে যায়। যদিও বর্তমানে বহু পণ্ডিত সে বিষয়কে অস্বীকার করে থাকেন।
সম্রাট প্রথম দারিয়ুস
হেলেনিস্টিক সেলূসিড সাম্রাজ্যের দ্বারা আকেমেনিড সাম্রাজ্য প্রতিস্থাপিত হলে, শুধুমাত্র উচ্চশ্রেণীর গ্রিকরা ছাড়া মোটামুটি বাকি সবার মাঝে জরথুস্ত্রীয় ধর্মের অনুশীলন অব্যাহত ছিল। এরপর ক্ষমতার গদিতে পার্থীয় সাম্রাজ্য আসীন হলে, তাদের উচ্চশ্রেণীও গ্রহণ করে জরথুস্ত্রীয় মতবাদ। জানা যায়, সেসময় আবেস্তার একটি সংস্করণ রচিত হয়েছিল। আকেমেনিড সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে সেটিও হারিয়ে যায়। আধুনিক যুগের বহু ইতিহাসবিদ সেই দাবিকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন।
পার্থীয় যোদ্ধা
প্রাচীনকালে আবেস্তা রচনার স্বর্ণযুগ ছিল সাসানীয় সাম্রাজ্য। সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম আর্দাশির (রাজত্বকাল: ২২৪ খ্রি.-২৪০ খ্রি.) জরথুস্ত্রীয় পুরোহিতদের রাজদরবারে তলব করে আবৃত্তি করিয়েছিলেন সেই স্তুতিগাথা, যাতে তা লিপিবদ্ধ করে রাখা যায়। মৌখিক ধর্মীয়জ্ঞান তখন রূপ নিয়েছিল লিখিতরূপে। প্রথম আর্দাশিরের পুত্র প্রথম শাপুর (রাজত্বকাল: ২৪০ খ্রি.-২৭০ খ্রি.) এই কাজ চলমান রাখেন। এরপর দ্বিতীয় শাপুর (রাজত্বকাল: ৩০৯-৩৭৯ খ্রিঃ), এবং প্রথম খসরুর (রাজত্বকাল: ৫৩১ খ্রি.-৫৭৯ খ্রি.) শাসনামলে গিয়ে শেষ হয় লিপিবদ্ধকরণের এই মহাকর্ম।
সম্রাট প্রথম আর্দাশির
আবেস্তা ও বৈদিক সাহিত্যের মাঝে সাদৃশ্য
গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, ঋগ্বেদ এবং আবেস্তার লেখক-পূর্বপুরুষ একই ছিলেন এবং তারা ছিলেন প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয়। তবে ঋগ্বেদ এবং আবেস্তা রচনার বহু পূর্বেই তারা পৃথক হয়েছিলেন। প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয়দের আদি বাসভূমি ছিল উত্তর-পশ্চিম ইরান ও আনাতোলিয়ার পূর্বাংশ। আদি তাম্র যুগে (Early Copper Age) তাদের কয়েকটি গোষ্ঠী ভারতে প্রবেশ করে, এরাই ছিলেন ঋগ্বেদ রচনার পূর্বপুরুষ ভারতীয়-আর্য (Indo-Aryans)।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের মতে, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষীদের আবাসস্থল ছিল মধ্য এশিয়া এবং ধীরে ধীরে বহু শতাব্দী ধরে তারা চারণভূমির সন্ধানে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার মতে, এই মধ্য এশিয়ার অভিবাসীরাই ইরানে আবেস্তা এবং ভারতে ঋগ্বেদ রচনা করেছেন।


১৯ শতকে পারসি পুরোহিতদের একটি চিত্র
পারসিক ভাষা সম্পর্কের দিক থেকে উত্তর ভারতের ভাষার খুব কাছাকাছি। দুই অঞ্চলের ভাষাই ব্যুৎপত্তিগতভাবে ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীভুক্ত। ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, দেব, নাসত্য শব্দগুলোর উল্লেখ রয়েছে আবেস্তায়। সনাতন ধর্মের অসুরই আবেস্তায় বর্ণিত অহুর। তবে ইন্দ্রকে আবেস্তায় খলনায়ক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর অসুর বা অহুর পেয়েছে সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান। আচার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও উপনয়ন, সোম পানীয় পান এসবের ক্ষেত্রে দুই ধর্মে যথেষ্ট মিল লক্ষ্য করা যায়।
ফেস রিকন্সট্রাকশন প্রযুক্তিতে প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয় একজন নারীর মুখাবয়ব
আবেস্তা
আবেস্তার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশের নাম গাথা। এগুলো হলো ব্যক্তিগত প্রশংসাস্তুতি, যা প্রার্থনা-নিবেদন এবং উপাসনা-আরাধনার সমন্বয়ে গঠিত। দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা জন্য কীভাবে জরথুস্ত্রীয় রীতিনীতি পালন করতে হয়, গাথা সে সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করে থাকে। গাথার সাথে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নির্দেশনা পুস্তকগুলো হলো জেন্দ, বেন্দিদাদ ইত্যাদি।
যশ্ন গাথা
যশ্ন (ভক্তি) হলো জরথুস্ত্রীয় ধর্মের আরাধনা, যা আবার কতগুলো গাথা অংশে বিভক্ত। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো, অহুর মাজদার মহিমাকে কেন্দ্র করে নিজ মনকে আলোর দিকে ধাবিত করা।
যশ্ন গাথা মূলত পাঁচ ভাগে বিভক্ত:
যশ্ন গাথা
বিশপেরাদ
২৩টি প্রার্থনাস্তব নিয়ে গঠিত বিশপেরাদ, যা যশ্নসমূহের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে থাকে। মূলত বিশপেরাদ হলো একটি জরথুস্ত্রীয় ধর্মানুষ্ঠান, যেখানে এই প্রার্থনাসমূহ পাঠ করা হয়। তবে যশ্নকে বাদ দিয়ে আলাদাভাবে বিশপেরাদের প্রার্থনাবাক্য পাঠের কোনো উপায় নেই।

যশ্ত্
যশ্ত্
যশ্ত্ হলো একুশটি স্তুত সংবলিত বর্ণনা, যা পারলৌকিক এবং পবিত্র উপাদান জল এবং অগ্নিকে নির্দেশ করে। প্রাচীন ধর্মীয় রীতি সংস্কার করার সময় জরথুস্ত্র জনপ্রিয় কিছু দেবদেবীকে এই ধর্মে স্থান দিয়েছিলেন – যেমন অনহিতা (জল, উর্বরতা, স্বাস্থ্য এবং জ্ঞানের দেবী) এবং মিথ্র (সূর্যোদয়, চুক্তির দেবতা) প্রমুখ। যদিও বর্তমানে শুধু অহুর মাজদাকে সর্বশক্তিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তারপরেও কেউ অনহিতার নিকট সন্তানলাভের মানত করলে, তা অহুর মাজদার নিকটই মানত করার সমতুল্য। কারণ, এখানে দেবী অনহিতা শুধুমাত্র একজন মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকেন। এইসকল প্রার্থনার রীতি লিপিবদ্ধ করা আছে যশ্ত্ খণ্ডে।

দেবী অহনিতা
বেন্দিদাদ
সর্বমোট ২২টি খণ্ড নিয়ে বেন্দিদাদ গঠিত। পুরাণ, প্রার্থনা, ধর্মানুষ্ঠান, গ্রহণীয় এবং বর্জনীয় আচার-ব্যবহার, অশুভ শক্তির হাত থেকে প্রতিরক্ষা, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শেষকৃত্য, অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, দান-খয়রাতসহ বহু বিষয় আলোচনা করা আছে এতে। একজন আদর্শ জরথুস্ত্রীয় হিসেবে কীভাবে জীবনযাপন করতে হবে, সে বিষয়ের দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় বেন্দিদাদে। বেন্দিদাদ নিয়ে জরথুস্ত্রীয়রা দুইভাগে বিভক্ত। একদলের কাছে এটি প্রত্যাখ্যাত হলেও আরেকদল তা সাদরে গ্রহণ করেছে। তবে এই বেন্দিদাদে লিপিবদ্ধ আছে সুপ্রাচীন কিছু জরথুস্ত্রীয় কাহিনি, যা খ্রিঃপূঃ অষ্টম সহস্রাব্দের বলে ধারণা করা হয়। সৃষ্টিপুরাণ, মহাপ্লাবনের আখ্যান ইত্যাদির বর্ণনা আছে এই অংশে।

বেন্দিদাদ
পুনরুদ্ধার
৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমদের পারস্য বিজয় পতন ঘটায় সাসানীয় সাম্রাজ্যের। এই বিজয়ে পারস্যে ক্রমশ ম্লান হয়ে আসে জরথুস্ত্রীয় ধর্মের প্রভাব। এরপর পারসিকদের একটি অংশ পালিয়ে আসে ভারতবর্ষে, আরেকদল থেকে যায় নিজ মাতৃভূমিতেই। জরথুস্ত্রীয়দের গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মন্দিরগুলো ধ্বংস করা হয়। ফলে হারিয়ে যায় আবেস্তার ধর্মীয় প্রভাব। ৮ম-১০ শতাব্দীর মাঝে অনেক পারসি পালিয়ে আসে ভারতে। সাথে করে নিয়ে আসে তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ধর্মগ্রন্থ। ভারতীয় ওই পারসিদের বর্তমান বংশধর হলো শিল্পপতি টাটা ও গোদরেজ পরিবার, ফিল্ড মার্শাল শ্যাম মানেকশ, পরমাণু বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা, রাজনীতিবিদ ফিরোজ গান্ধি, অভিনেতা বোমান ইরানি, প্রযোজক রনি স্ক্রুভালা, জন আব্রাহাম, ফারহান আখতার, ফারাহ খান, জিম শরভ, আফতাব শিবদাসানিরা।

ফারহান আখতার, ফারাহ খান, আফতাব শিবদাসানি, জন আব্রাহাম, জিম শরভ, বরুন তুর্কি
১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দে একজন বণিক ভারত থেকে আবেস্তীয় পাণ্ডুলিপি নিয়ে আসেন ব্রিটেনে। ইউরোপীয়রা তখন বুঝতে পারে, খণ্ডিত আকারে হলেও এই গ্রন্থের অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান। ১৭৫৫ সালে এই পাণ্ডুলিপিটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়, ‘Bodleian Library of Oxford University’ নামক এক গ্রন্থাগারে। একসময় এটি নজরে আসে যুবকবয়সী ফ্রেঞ্চ পণ্ডিত অঁকিতেল দুপেরঁর। আবেস্তা পুনরুদ্ধারে তিনি তার মহাকাব্যিক যাত্রা করেন ভারতের উদ্দেশ্য, এবং ১৭৬২ সালে ফ্রান্সে ফিরে আসেন ১৮০ খানা আবেস্তীয় পাণ্ডুলিপি নিয়ে। এরপর তার হাত ধরেই শুরু হয় এর অনুবাদকর্ম।
জলদানব নেসি কি সত্যিই আছে?
বিচিত্র পৃথিবীতে রয়েছে অবারিত রহস্যের হাতছানি। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল, এরিয়া-৫১‘র মতো বাস্তবিক রহস্য যেমন রয়েছে, তেমনি আছে ইয়েতি, ক্রাকেন, সাসকোয়াশ, বুনিপ, লক নেস মনস্টার, চুপাকাবরা ইত্যাদির মতো রহস্যময় কল্পদানব। এদের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে না থাকলেও মানুষ এদের নিয়ে সবসময় উৎসাহ দেখিয়েছে। জাঁবিস্তারিত পড়ুন
বিচিত্র পৃথিবীতে রয়েছে অবারিত রহস্যের হাতছানি। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল, এরিয়া-৫১‘র মতো বাস্তবিক রহস্য যেমন রয়েছে, তেমনি আছে ইয়েতি, ক্রাকেন, সাসকোয়াশ, বুনিপ, লক নেস মনস্টার, চুপাকাবরা ইত্যাদির মতো রহস্যময় কল্পদানব। এদের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে না থাকলেও মানুষ এদের নিয়ে সবসময় উৎসাহ দেখিয়েছে। জাঁকজমক করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এদের খোঁজার জন্য। কিন্তু চিরকালই অধরা থেকে গেছে এই কিংবদন্তিতুল্য জীবগুলো, তারপরও এদের সম্পর্কে মানুষের আগ্রহের কোনো কমতি হয়নি।
স্কটল্যান্ডের ইনভার্নেসের কাছে এক বিশাল হ্রদের নাম নেস। স্কটিশ গেলিক ভাষায় হ্রদকে লক (Loch) বলা হয়, আর উচ্চারণ করা হয় ‘লখ’। এই লক নেসেই এক রহস্যময় কল্পিত দানবের বাস বলে কিংবদন্তী প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই তাকে দেখেছে বলে দাবি করলেও প্রাণীটির অস্তিত্ব সম্বন্ধে এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নেস হ্রদের এই দানবকে ‘নেসি’ বলেও ডাকা হয়। নেসি শব্দের অর্থ হলো ‘পবিত্র’। লক নেস মনস্টারকে আক্ষরিক বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘নেস হ্রদের দানব’। গ্রেট ব্রিটেইনের স্বাদুপানির সবচেয়ে একক বৃহত্তম উৎস এ হ্রদটির আয়তন ২২ বর্গ কিলোমিটার, গভীরতা ৮০০ ফুটেরও বেশি।

নেসি’র উৎস
নেসি’র কিংবদন্তির উৎস খুঁজতে হলে আমাদেরকে অনেক পেছনে ফিরে যেতে হবে, একেবারে সেই প্রথম শতকে। রোমানরা নর্দার্ন স্কটল্যান্ডে পদার্পণ করার পর স্থানীয় পিক্ট জাতির তৈরি পাথরচিত্রে তারা এক অচেনা প্রাণী দেখতে পায়। রোমানরা প্রাণীটিকে বর্ণনা করে ‘পায়ের বদলে ফ্লিপার (সাঁতার কাটার ডানা) বিশিষ্ট দীর্ঘচঞ্চু অদ্ভুত জানোয়ার’ হিসেবে। সে সময় অবশ্য স্কটল্যান্ডে নেসি’র মতো আরও অনেক জলদানবের উপস্থিতির কথা জানা যায়। পুরনো অনেক নথিপত্রেই সাগরে বাস করা বিশালকার সাপ, কেলপি (ঘোড়াকৃতির প্রেতাত্মা), সাগরচারী ঘোড়া ইত্যাদি কাল্পনিক জন্তুর উল্লেখ পাওয়া যায়।
নেসি’র প্রথম লিখিত উল্লেখ দেখা যায় আজ থেকে ১,৫০০ বছর আগে সন্ত কলম্বা নামক এক মিশনারির জীবনীতে। ষষ্ঠ শতকে এ ধর্মপ্রচারক স্কটল্যান্ডে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করেন। তিনি দানবটির মোকাবেলা করেন বলে তার জীবনীগ্রন্থে বর্ণনা করা আছে। একদিন ইনভার্নেসের কাছে নর্দার্ন পিক্টের রাজার সাথে দেখা করতে যাওয়ার পথে সেইন্ট কলম্বা নেস লকের ধারে কয়েকজন লোককে একটি লাশ কবর দিতে দেখেন। মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে সঙ্গীরা সেই লকের কোনো এক দানবকে দায়ী করে। সাধুবাবা ‘মন্ত্রবলে’ মৃত লোকটিকে জীবিত করে দেন। এরপর তিনি তার এক চেলাকে সাঁতরে লক পাড়ি দিয়ে অপর পাড় থেকে একটি নৌকা আনতে আদেশ করেন। শিষ্যটি সাঁতার কাটতে গিয়ে সেই জলদানবের মুখে পড়ে।
এবার আবারও নিজের শক্তি দেখান কলম্বা। প্রার্থনার জোরে তিনি দানবটিকে বশ করেন। তার হুকুমে জলদানব শিষ্যকে ছেড়ে দিয়ে গভীর পানিতে অন্তর্ধান করে। চোখের সামনে এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা দেখে উপস্থিত লোকজন তৎক্ষণাৎ সাধুর চরণে আশ্রয় নিয়ে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়। তবে সেইন্ট কলম্বা’র এ ঘটনার কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। কলম্বাকে স্কটল্যান্ডে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কৃতিত্ব দেওয়া হয়। মনে করা হয়- তাকে মহৎ, অলৌকিক, শক্তিশালীরূপে প্রচার করার জন্য তার জীবনীতে এমন একটি জলদানবের মিথ্যে গল্প ফাঁদা হয়েছে।

লক নেস
আধুনিক সময়ে নেসিকে নিয়ে আবারও আলোড়ন সৃষ্টি হয় ১৯৩৩ সালে। সে বছর লক নেসের পাড় ঘেসে একটি নতুন রাস্তা তৈরি করা হয়। মে মাসের দুই তারিখ স্থানীয় পত্রিকা দ্য ইনভার্নেস কুরিয়ার এক প্রতিবেদনে জানায়, এক দম্পতি ওই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় নেসিকে দেখেছেন। ব্যবসায়ী জর্জ স্পাইসার ও তার স্ত্রী’র ভাষ্যে-
কয়েক সপ্তাহ পরে আরেক মোটরসাইকেল আরোহী একই দাবি তোলেন। এরপর স্বভাবতই চারদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। এক সার্কাস-মালিক তো বিশ হাজার পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করেন দানবটি জ্যান্ত ধরে দেওয়ার জন্য। লন্ডনের পত্রিকাগুলো লক নেস এলাকায় সাংবাদিক পাঠাতে শুরু করে। ডেইলি মেইল শিকারী মার্মাডুক ওয়েদেরেলকে নিয়োগ করে নেসিকে ধরবার জন্য। কিছুদিন সন্ধান করার পরে ওয়েদেরেল, ‘নরম পা বিশিষ্ট প্রায় কুড়ি ফুট দীর্ঘ খুব শক্তিশালী’ চৌপেয়ে এক প্রাণীর বড় আকারের পায়ের ছাপ পাওয়ার কথা জানান। তার ওপর ভিত্তি করে ডেইলি মেইল খবর ছাপে এরূপ শিরোনামে: MONSTER OF LOCH NESS IS NOT LEGEND BUT A FACT
পরে অবশ্য ওয়েদেরেলের পায়ের ছাপগুলো ব্রিটিশ মিউজিয়াম অভ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করে জানা যায়, সেগুলো আসলে জলহস্তীর পায়ের ছাপ। একই বছরের নভেম্বর মাসে হিউ গ্রে নামক আরেকজন ব্যক্তি নেসি’র আরেকটি ছবি তোলেন। ছবিটিতেও লম্বা ঘাড়বিশিষ্ট কোনো বড় আকারের প্রাণীর অস্পষ্ট অবয়ব ফুটে ওঠে। সমালোচকেরা দাবি করেন, এটি ছিল মুখে লাঠি আঁকড়ে ধরে কোনো কুকুরের সাঁতার কাটার ছবি।

হিউ গ্রে’র তোলা ছবি
পরের বছর আবারও নেসি’র ‘দেখা’ মেলে। এবার ডেইলি মেইলে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপানো হয় ১৯৩৪ সালের ২১ এপ্রিল। পত্রিকাটির প্রথম পাতায় ছাপানো ‘সার্জনের ফটোগ্রাফ’ নামে খ্যাত এ ছবিতে দেখা যায়, লম্বা ঘাড়সম্বলিত একটি সরু আকৃতির মাথা পানির ওপরে উত্থিত হয়ে আছে। ছবিটি ডেইলি মেইলকে সরবরাহ করেন লন্ডনের সেই সময়ের বিখ্যাত ডাক্তার রবার্ট কেনেথ উইলসন। এ ছবি দেখেই অনেকে নেসিকে প্লেসিওসর বলে মনে করেন। প্লেসিওসর হচ্ছে একধরনের সামুদ্রিক সরীসৃপ। ২০৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ালেও ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে ডাইনোসরদের সাথে এই প্রজাতিটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়।
নেসি হয়তো কোনোক্রমে ওই গণবিলুপ্তি থেকে বেঁচে গিয়েছে। কিন্তু এখানেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। প্লেসিওসররা ছিল শীতল রক্তের প্রাণী। তাই লক নেসের বরফশীতল পানিতে এ প্রাণীটির এত বছর টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। যা-ই হোক, অনেক বছর পরে ১৯৯৪ সালে প্রমাণিত হয়, ছবিটি আসলে ভুয়া ছিল। সে আরেক গল্প!
ক্রিস্টিয়ান স্পার্লিং নামক এক ব্যক্তি জানান যে, ছবিটি ভুয়া এবং তিনি ঘটনাটির সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। আসলে এই স্পার্লিং ছিলেন দানোশিকারী মার্মাডুক ওয়েদেরেলের সৎপুত্র। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম যখন তার ছবিকে জলহস্তীর বলে প্রমাণ করে, তখন ওয়েদেরেলকে মানুষের অনেক দুয়ো শুনতে হয়। এমনকি খোদ ডেইলি মেইল পত্রিকায়ও তাকে উপহাস করা হয়। রাগে, দুঃখে বেচারা জনসমক্ষে আসা বন্ধ করে দেন। অপমানের শোধ নেওয়ার জন্য তিনি এক দুষ্টু ফন্দি আঁটেন। উলওয়র্থসের দোকান থেকে কেনা খেলনা টিনের সাবমেরিনের সাথে নকল ঘাড় ও মাথা সংযুক্ত করে সেটিকে লক নেসে স্থাপন করে নিজের পুত্র ইয়ান ও সৎপুত্র স্পার্লিংয়ের সহায়তায় একটি ছবি তোলেন। ছবি তোলার পর মডেলটি ডুবে যায় এবং খুব সম্ভবত এটি এখনো হ্রদের তলায় কোথাও ঘুমিয়ে আছে।
কিন্তু সে ছবি ডাক্তার উইলসনের কাছে কী করে পৌঁছাল? আসলে রবার্ট উইলসন তখনকার বিখ্যাত ডাক্তার ছিলেন। তাই গণমাধ্যমে ছবিটি পাঠানোর জন্য ওয়েদেরেল তাকেই নির্বাচন করেন। কিন্তু ডাক্তার কেন এই মজায় নিজেকে শরিক করলেন, তা রহস্যই থেকে গেছে।

বাঁয়ে ডেইলি মেইলে প্রকাশিত ক্রপ করা ‘সার্জনের ফটোগ্রাফ’, ডানে মূল ছবি
দেখতে কেমন নেসি?
ভিজিটস্কটল্যান্ড ওয়েবসাইটে নেসি’র এমন বর্ণনাই দেওয়া আছে। কিন্তু যেহেতু নেসিকে স্পষ্টভাবে দেখার কোনো প্রমাণ নেই বা কোনো বিশ্বাসযোগ্য ছবিও আজ অব্দি কেউ তুলতে পারেনি, তাই নেসি যে আদতে কী জন্তু- তা জানা অসম্ভব। তবে স্পাইসার দম্পতি নেসিকে লম্বা ঘাড়বিশিষ্ট বলে উল্লেখ করেছিলেন। স্কটিশ দ্য ইনভার্নেস কুরিয়ার পত্রিকার সম্পাদক ইভান ব্যারন তাদের প্রতিবেদনে নেসিকে ‘দানব’ হিসেবে অ্যাখ্যা করেন বলে নেসি’র পরিচয় আজও জলদানবই রয়ে গেছে।
জলদানবের খোঁজে
সেই ১৯৩৪ সালেই সংগঠিত হয়ে নেসিকে খোঁজা আরম্ভ হয়। ২০ জন লোককে দৈনিক দুই পাউন্ড করে দেওয়া হয়েছিল দানবটিকে ‘পাহারা’ দেওয়ার জন্য। কিন্তু কেউই কিছু দেখতে পায়নি। তারপরও নেসি’র পেছনে আরও অনেক অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অনেক শৌখিন তদন্তকারী প্রায় বিরামহীন রাত্রিজাগরণ করে নেসিকে খুঁজেছেন। ১৯৬০-এর দশকে অনেক ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় সোনার (Sonar) প্রযুক্তি ব্যবহার করে লেকটিতে অভিযান পরিচালনা করে। অকাট্যভাবে কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলেও সোনার যন্ত্রে পানির নিচে এমন সব বড় মাপের বস্তুর নড়াচড়া ধরা পড়েছিল, যার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এরপর ১৯৭৫ সালে বোস্টনের অ্যাকাডেমি অভ অ্যাপ্লাইড সায়েন্স আরেকটি উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করে। এবার সোনারের পাশাপাশি আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। একটি ছবি বিশ্লেষণ করার পর প্লেসিওসরের মতো কোনো প্রাণীর বিশালাকৃতির ফ্লিপারসদৃশ বস্তু ধরা পড়ে। ১৯৮০ ও ‘৯০-এর দশকে আরও সোনার সন্ধান করেও এ রহস্যের কোনো মীমাংসা হয়নি। ২০০৩ সালে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (বিবিসি) আগ্রহ ও অর্থায়নে ৬০০টি সোনার বিম ব্যবহার করেও কারও ভাগ্যে কোনো শিকে ছেঁড়েনি। কেলডোনিয়ান খাল নামক একটি প্রশস্ত চ্যানেলের মাধ্যমে লক নেস উত্তর সাগরের সাথে সংযুক্ত থাকায় অনেকে মনে করেন, নেসি বা নেসিসদৃশ প্রাণী হয়তো সাগরে চলে গেছে।

প্লেসিওসর
ডিএনএ গবেষণা
নিউজিল্যান্ডের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক লক নেসের পানি থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তার ডিএনএ পরীক্ষা করেন। এনভায়রনমেন্টাল ডিএনএ শনাক্তের এ পদ্ধতিতে সাবজেক্ট জলাশয়ের বিভিন্ন অংশ থেকে পানি সংগ্রহ করা হয়। পানিতে বাস করা জীবগুলো যখন চলাচল করে তখন এগুলো শরীরের ত্বক, আঁশ, লোম, মল, প্রস্রাব ইত্যাদি থেকে ডিএনএ’র ক্ষুদ্র অংশ পেছনে রেখে যায়। এরপর এই ডিএনএগুলো বিদ্যমান বৃহৎ তথ্যভাণ্ডারের সাথে মিলিয়ে দেখে জানা যায়, জলাশয়ে কী কী জীব বাস করছে।
অধ্যাপক নিল গেমেলের নেতৃত্বে লক নেসের পরীক্ষায় তিন হাজার ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। এগুলোর বেশিরভাগই ছোট ছোট প্রাণী। এর বাইরে মানুষ, শূকর, হরিণ, কুকুর, গবাদিপশু, পাখি, খরগোশ ইত্যাদির ডিএনএ-ও পাওয়া যায়। কিন্তু প্লেসিওসর বা এরকম কোনো প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর ডিএনএ পাওয়া যায়নি। একইভাবে ক্যাটফিশ বা হাঙরের দাবিও ধোপে টেকে না।
ডিএনএ পরীক্ষায় বোঝা যায়, লক নেসে যথেষ্ট পরিমাণে ইল মাছের উপস্থিতি রয়েছে। এ থেকেই গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, লক নেস মনস্টার আসলে একটি বিশালাকৃতির ইল। অধ্যাপক গেমেল বলেন,
তিনি বলেন,
ইল প্রসঙ্গে তার মত হলো,
অধ্যাপক নিল গেমেল
কিন্তু ওই হ্রদে কখনো কোনো বিশাল ইল ধরা পড়েনি। আর সবচেয়ে বড় আকারের ধৃত ইউরোপিয়ান ইলটির ওজন ৫.৩৮ কিলোগ্রাম। গেমেলের অভিমত, হয়তো ইলের আকার আশ্চর্যজনকরকম বড় নয়; কিন্তু তাদের গবেষণায় যে ফলাফল পাওয়া গিয়েছে, তাতে সম্ভাবনাটিকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে দানব পাওয়া যাক বা না যাক, লক নেসের সবরকম প্রজাতির একটি শক্তিশালী তথ্যভাণ্ডার যে গবেষণাটির মাধ্যমে তৈরি হয়েছে, তাতে আর সন্দেহ নেই। এ হ্রদের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে এখন আরও বেশি বৈজ্ঞানিক তথ্য আহরণ করা সম্ভব হয়েছে গবেষণাটি দ্বারা।
দাবি নাকচ
লক নেস মনস্টার একটি দানবাকৃতির ইল মাছ- এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছেন স্টিভ ফেল্থাম নামক একজন ‘পেশাদার দানো-শিকারী’। ১৯৯১ সাল থেকে নেসি’র খোঁজ করছেন এই ভদ্রলোক। ২৯ বছর ধরে চোখে বাইনোকুলার আর টেলিস্কোপ লাগিয়ে নেসি’র খোঁজে লক নেস তন্নতন্ন করে ফেলার জন্য গিনেস বইয়েও নাম উঠেছে তার। ৫৬ বছর বয়সী এই অনুসন্ধিৎসু নতুন গবেষণাটিকে ‘অ্যান্টি-ডিসকভারি’ বলে অভিহিত করেছেন।
টাইমস অভ লন্ডনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অবশ্য তিনি জানান, জীবনের ২৯ বছর নেসি’র পেছনে ব্যয় করেও তার এতটুকু আফসোস নেই। ফেল্থামের মতে, নেসি খুব সম্ভবত ওয়েলসের স্থানীয় জাতের ক্যাটফিশ, যেটি দৈর্ঘ্যে ১৩ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে।

স্টিভ ফেল্থাম
উল্লেখ্য, রিভার মনস্টার্স টিভি সিরিজের জেরেমি ওয়েডের বিশ্বাস লক নেসে গ্রিনল্যান্ড শার্কের আবাস রয়েছে। এ হাঙর ২০ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে আর এদের কোনো পৃষ্ঠপাখনা থাকে না।
লক নেসে সাঁতার কাটতে চান?
চাইলেও পারবেন না। কে জানে, যদি নেসি এসে পা কামড়ে ধরে! অবশ্য আপনি যদি দুঃসাহসী হন, নেসিকে কুছ পরোয়া না করেন, তবুও এ হ্রদে সাঁতার কাটা খুব একটা সম্ভব হবে না। কারণ, নেসের পানি আপনার হাড় কাঁপিয়ে দেবে। বছরে এখানে গড় তাপমাত্রা থাকে ৫° সেলসিয়াস। এ নিম্ন তাপমাত্রার পানিতে সাঁতার কাটতে গেলে নেসি’র কামড় না খেলেও হাইপোথার্মিয়া ঠিক জেঁকে বসবে।
নেসি’র দর্শন পাওয়ার আশা নিয়ে প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ লক নেসে ঘুরতে যান। স্কটল্যান্ডের অর্থনীতিতে তা বছরে প্রায় ৪১ মিলিয়ন পাউন্ড অবদান রাখে। আপনিও লক নেস দেখতে যেতে পারেন, কিন্তু খুব সম্ভবত নেসি’র সাথে মোলাকাত হবে না। তাতে ষোলকলা পূর্ণ না হলেও লেকপাড়ের হরিৎশোভা আর লেকের ‘কাকচক্ষুর ন্যায় টলটলে’ পানির অনিন্দ্যসৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। সেইসাথে ছবির মতো সুন্দর, সবুজে মোড়া স্থানীয় গ্রামগুলোতো আছেই।
তবে আপনার কপালগুনে যদি নেসি’র দেখা পেয়ে যান, তাহলে ‘লক নেস মনস্টার সাইটিং রেজিস্টার’-এ তা লিখে রাখতে ভুলবেন না যেন। ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে গ্যারি ক্যাম্পবেল নামক এক ভদ্রলোক নেসি’র সঙ্গে মোলাকাত করেন। পানিতে আলোড়ন দেখে তার বিশ্বাস জন্মে, ওটা নেসি’র অবদান। সে দর্শনের কথা লিখে রাখতে গিয়ে তিনি একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। তার এই রেজিস্টারে এখন পর্যন্ত ১১১৮টি দর্শনের কথা উল্লেখ করেছেন বিভিন্নজন। এগুলোর মধ্যে নিউজপেপার রিপোর্ট, পুরনো নথিপত্র, সরাসরি দেখার রিপোর্ট রয়েছে।

‘দ্য প্রাইভেট লাইফ অভ শার্লক হোমস’ (১৯৬৯) সিনেমায় দেখানো নেসি
অবিনাশী নেসি
গেমেলের পরীক্ষাতে লক নেস দানবের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্যান্য পরীক্ষার মতো এর ফলও ‘নেগেটিভ’ এসেছে। তার ফলে নেসি’র অস্তিত্বের সম্ভাবনা আরও ফিকে হয়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে নেসিকে প্রামাণিকভাবে বাতিল করে দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম অভ ন্যাচারাল হিস্ট্রি’র মতে, আজ পর্যন্ত নেসি’র অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেই যে তার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিতে হবে, তা কিন্তু মোটেও নয়। কারণ, একজন বৈজ্ঞানিক বা অনুসন্ধিৎসু মানুষ হিসেবে যথেষ্ট পোক্ত প্রমাণ ছাড়া কোনোকিছুরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। স্মিথসোনিয়ান এনসাইক্লোপিডিয়ায় লেখা আছে, দানবটির কঙ্কাল বা জীবিত আটক হওয়ার মতো শক্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা উচিত।
সংক্ষেপে দেখুনআরব সংস্কৃতির বিখ্যাত পৌরনিক কাহিনীগুলোর মধ্যে অন্যতম কোনগুলো?
বিশ্বের যেকোনো সভ্যতার পৌরাণিক কাহিনীগুলো সেসব এলাকায় মানুষের মাঝে যুগের পর যুগ টিকে থাকে। বংশপরম্পরায় মানুষ তা পরের প্রজন্মকে বলে যায়। আর এভাবেই এই কাহিনীগুলো মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের বজ্রদেবতা থরের নর্স পুরাণ বলি বা ভারতীয় উপমহাদেশের পৌরাণিক কাহিনী, এসব কিছুই যুগের পর যুগ ধরে মুবিস্তারিত পড়ুন
বিশ্বের যেকোনো সভ্যতার পৌরাণিক কাহিনীগুলো সেসব এলাকায় মানুষের মাঝে যুগের পর যুগ টিকে থাকে। বংশপরম্পরায় মানুষ তা পরের প্রজন্মকে বলে যায়। আর এভাবেই এই কাহিনীগুলো মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের বজ্রদেবতা থরের নর্স পুরাণ বলি বা ভারতীয় উপমহাদেশের পৌরাণিক কাহিনী, এসব কিছুই যুগের পর যুগ ধরে মুখে মুখে টিকে আছে আর পরবর্বতীতে বই আকারে লিখিত হয়েছে। প্রাচীন আরবেও এরূপ কিছু বৈচিত্র্যময় এবং অবিশ্বাস্য পৌরাণিক কাহিনী, গল্প আর কিংবদন্তি রয়েছে। আর এসব গল্প হাজার হাজার বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিকভাবে রক্ষিত হয়েছে।
আরবের প্রাচীন সভ্যতাগুলোর জনগণের মধ্যে বিশ্বের কিছু বিশুদ্ধ পৌরাণিক কাহিনী ও রূপকথা প্রচলিত আছে। এসব কাহিনীতে যেমন রয়েছে মানুষের বীরত্বের কথা, তেমনি রয়েছে দৈত্য দানবের ক্ষমতা ও রাজত্বের কথা। বিশ্বের অন্যান্য সভ্যতার যেমন নিজস্ব কাহিনী তাদের সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে, আরবেও তেমনটা ঘটেছে। যখন আমরা প্রাচীন আরবের পুরাণ সম্পর্কে বলি তখন আমরা বেশিরভাগই মধ্যযুগীয় উৎসগুলোর উপর নির্ভর করি, কারণ এর আগে লিখিত আকারে এসব লিপিবদ্ধ ছিল না। বলে রাখা ভালো, এখানে ধর্ম, লোককাহিনী ও উপকথার মিশেল ঘটেছে। এসব কাহিনীর অনেক কিছুই পরবর্তীতে আরবের বিভিন্ন ধর্মের সাথে মিশে গিয়েছে আর সেগুলোর অংশ হয়ে যায়। আজকের লেখায় এমনি কিছু পৌরাণিক কাহিনী ও রূপকথার বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
বাহামুত, এক পৌরাণিক প্রাণী
বিশ্বাস করা হয়, এটি গভীর সমুদ্রে থাকা একটি দৈত্যাকার এবং দানবীয় মাছ। প্রাচীন আরবের লোকেরা বিশ্বাস করত যে এই পৌরাণিক প্রাণী পৃথিবীকে ধরে রেখেছে। পৌরাণিক কাহিনী মতে, দৈত্যাকার এই মাছটি তার পিঠে একটি দৈত্যাকার ষাঁড়কে বহন করে আছে এবং এর উপর একটি রত্নপাথর আছে, যাতে একটি দেবদূত পৃথিবী এবং সমুদ্রের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে।


বিশ্বাস অনুযায়ী বাহামুত এভাবেই পৃথিবীকে ধরে রেখেছে
বাহামুতের কল্পিত চিত্র
দানব নাসনাস
এটি আরবের পৌরাণিক কাহিনীর একটি ভয়ঙ্কর দানব। নাসনাসকে রাক্ষস এবং মানুষের সম্মিলিত সন্তান বলে মনে করা হতো। কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করা আর কেবল স্পর্শ করেই তাদেরকে শুকিয়ে বা মেরে ফেলা বা তাদের শরীর থেকে মাংস নিয়ে ফেলা ছিল এর ক্ষমতার উদাহরণ। এটি বিশ্বাস করা হতো যে নাসনাসের শুধুমাত্র অর্ধেক মাথা, এবং শরীরের প্রতিটি অংশ অর্ধেক আছে। শুধুমাত্র একটি পা দিয়েই বিশাল লাফ দিতে পারত এই দানব, যার মাধ্যমে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে মানুষকে ধরত আর হত্যা করত।

পৌরাণিক প্রাণী শাদ’হাওয়ার
মধ্যযুগীয় আরবের একটি পৌরাণিক প্রাণী শাদ’হাওয়ার। মনে করা হতো, এটি ইউনিকর্নের মতো একটি প্রাণী, যার একটি বিশাল শিং আছে। এই শিং থেকে ৪২টি শাখা ছড়িয়ে থাকে। কিংবদন্তি অনুযায়ী, এর জাদুকরী শিং থেকে বাতাসের সাথে শক্তিশালী সঙ্গীত বাজত, যা এর শাখাগুলোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। এই প্রাণীর শিং রাজাদের উপহার দেওয়া হতো, যা বাঁশির মতো বাজানো হতো। এর একদিকে বাজানো হলে তা একটি মনোমুগ্ধকর সুর উৎপন্ন করে, এবং যখন অন্যদিকে বাজানো হয়, সুরটি এতই দুঃখের হয় যে এটি মানুষকে কাঁদায়।

পৌরাণিক প্রাণী রক
প্রাচীন আরবদের একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক প্রাণী রক হলো একটি বিশাল কিংবদন্তি শিকারি পাখি। বিভিন্ন নাবিক, জেলে এবং অনুসন্ধানকারীরা এর সম্পর্কে লিখে গেছেন। তারা শপথ করেছিলেন যে, তাদের অভিযানে থাকাকালীন এই জাদুকরী প্রাণীকে দেখেছিলেন। এর কথা এসেছে বিখ্যাত অভিযাত্রী ইবনে বতুতা ও মার্কো পোলোর লেখায়। এছাড়া আরব্য রজনীর এক হাজার এক রাত ও সিনবাদের গল্পেও এর কথা এসেছে। রককে প্রায়ই পশ্চিমা পৌরাণিক প্রাণী, যেমন- ফিনিক্স বা থান্ডারবার্ডের সাথে তুলনা করা হয়েছে। রকের শরীর এত বৃহৎ ও এর শক্তি এত বেশি যে এটি তার পা দিয়ে অনায়াসে একটি বড় হাতিকেও তুলে নিতে পারে।

আনকা আল-মুগরিব
আনকা বা আনকা মুগরিব বা আনকা আল-মুগরিব আরবীয় পৌরাণিক কাহিনীর একটি রহস্যময় কল্পিত বৃহৎ স্ত্রী পাখি। বলা হয়ে থাকে, এটি অনেক দূর পর্যন্ত উড়ে যায়, এবং জীবদ্দশায় মাত্র একবারই দেখা দেয়। এটাও বলা হয় যে, একে ‘সূর্য অস্ত যাওয়ার জায়গায়’ দেখতে পাওয়া যায়। আনকা শব্দটি আনাক এর স্ত্রীলিঙ্গ, যার অর্থ ‘লম্বা ঘাড়’। এটি দিয়ে সম্ভবত বোঝায় যে পাখিটি একটি সারস বা অন্যান্য লম্বা গলার পাখির মতো বা কেবল একটি ঈগলের মতো একটি বড় শক্ত ঘাড় রয়েছে, যার মাধ্যমে একে চিহ্নিত করা যায়। মুগরিব শব্দের বেশ কিছু অর্থ রয়েছে: অদ্ভুত, বিদেশী, দূরবর্তী, পশ্চিম, সূর্যাস্ত, বিচ্ছিন্ন, অজানা, সাদা, ভোর ইত্যাদি।

আনকা নামটি ‘দুর্ভাগ্য বা কঠিন ব্যাপার’ এর সাথেও সম্পর্কযুক্ত এবং আনকা মুগরিব নামটি দিয়ে বিপর্যয়কে বোঝানো হতো। এটি হয়েছিল কারণ পাখিটিকে মূলত বেশ নিখুঁতভাবে সাথে সৃষ্ট বলা হয়েছিল, কিন্তু এটি প্লেগে পরিণত হয়েছিল, এবং তাই একে হত্যা করা হয়েছিল। জাকারিয়া আল-কাজউইনির মহাজাগতিক বই ‘দ্য ওয়ান্ডার্স অব ক্রিয়েশন’-এ আনকা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, “পাখিদের আত্মীয় যারা কাফ পর্বতে একা বাস করত“, এবং “অনেক যুগে অর্জিত অভিজ্ঞতাসহ একটি জ্ঞানী পাখি যা নৈতিক উপদেশ দেয়।” কাজউইনি আরও বলেছেন, পাখিটি ১,৭০০ বছর বেঁচে থাকে, ৫০০ বছর বয়সে মিলন করে, ডিম ভাঙার পর ছানা ভেতরে থাকে, এবং ১২৫ বছর পরে বের হয়ে আসে। এদের কখনও কখনও আধুনিক সময়ে ফিনিক্সের মতো প্রাণী হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এদের ৪টি ডানা থাকে। কথিত আছে যে আনকা হাতি এবং বড় মাছ ছাড়া কিছুই খায় না। আর্মেনিয়ান ও বাইজেন্টাইন ঈগল এবং তুর্কি কোনরুল ও পারস্য পুরাণের সিমুর্গের সাথে আনকাকে প্রায়শই সাদৃশ্য মনে করা হয়।
ঘুল
ঘুল বা ঘুওল হলো একটি দানব-সদৃশ সত্তা বা পৌরাণিক দানবীয় প্রাণী। ঘুলের ধারণা প্রাক-ইসলামিক আরবের ধর্মগুলোতে তৈরি হয়েছিল, যে প্রাণীকে কবরস্থানে দেখা যায়, এবং বিশ্বাস করা হতো- এটি মানুষের মাংস খায়। ঘুল একটি আরবি শব্দ, যা এসেছে ঘালা থেকে, এর অর্থ ‘জব্দ করা’। আরবি লোককাহিনী মতে, কবরস্থান এবং অন্যান্য জনবসতিহীন স্থান ঘুলের বসবাসের জায়গা হিসেবে। পুরুষদের ঘুল বলা হয়, আর মহিলাদের ঘুলা বলা হয়। একে অনেক গল্পে দেখানো হয়েছে, যে অসহায় মানুষদের প্রলুব্ধ করে, সাধারণত পুরুষদের, আর যাতে করে এটি তার বাড়িতে গিয়ে তাদের সবাইকে খেতে পারে।

কেউ কেউ বলে যে, ঘুল হলো মরুভূমিতে বসবাসকারী দানব, যা আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে, বিশেষ করে হায়েনার ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে। এটি অসতর্ক লোকদেরকে মরুভূমির বর্জ্য বা পরিত্যক্ত জায়গায় হত্যা করে খাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করে। প্রাণীটি ছোট বাচ্চাদেরও শিকার করে, তাদের রক্ত পান করে, মুদ্রা চুরি করে এবং মৃতকে খায়। তারপরে যে ব্যক্তিকে এটি খায় তার রূপ ধারণ করে।
ওয়্যারহায়েনা
ওয়্যারহায়েনা নামের এই পৌরাণিক প্রাণী একটি নিওলজিজম যা হায়েনাদের সাথে জড়িত, যা ওয়্যারউলফের ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। আরব উপদ্বীপ, উত্তর আফ্রিকা, হর্ন অফ আফ্রিকা এবং নিকট প্রাচ্যের পাশাপাশি কিছু সংলগ্ন অঞ্চলের সাধারণ লোককাহিনীতে এর দেখা মেলে। ওয়্যারউলফের মতো, যেগুলো সাধারণত মানুষের বিবর্তনের ফলে হয় বলে বিশ্বাস করা হয়, ওয়্যারহায়েনার কাহিনীগুলোও বলে যে তারা কীভাবে মানুষের ছদ্মবেশে হায়েনা হতে পারে।
সোমালিয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে এটি বিশ্বাস করা হয় যে, কোরি ইসমারিস এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি রাতের বেলা নিজেকে একটি একটি জাদুর লাঠি দিয়ে ঘষে হায়েনা-মানবে রূপান্তরিত করতে পারতেন এবং ভোরের আগে মানব অবস্থায় ফিরে যেতেন। ইথিওপিয়াতে ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয় যে প্রতিটি কামার, যাদের ব্যবসা বংশগত, তারা সবাই একেকজন জাদুকর বা ডাইনি আর তারা তাদের ক্ষমতা হায়েনায় পরিণত হয়। এই কামার ওয়্যারহায়েনারা মধ্যরাতে কবর লুট করে বলে বিশ্বাস করা হয়, তাদের বওদা বলা হয়ে থাকে। অধিকাংশ দেশবাসী তাদের সন্দেহের চোখে দেখে। এই বিশ্বাস বর্তমানে সুদান এবং তানজানিয়ার পাশাপাশি মরক্কোতেও রয়েছে। অনেক ইথিওপিয়ান খ্রিস্টান সেখানকার ইহুদিদের বওদা হিসেবে চিহ্নিত করে, তাদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের মৃতদেহ খুঁজে বের করার এবং সেগুলো খাওয়ায় অভিযোগ তোলে।

পশ্চিম সুদানের জনগণের লোককাহিনী অনুযায়ী একটি হাইব্রিড প্রাণী রয়েছে, যে একজন মানুষ, আর রাতে একটি নরখাদক দানবে রূপান্তরিত হয়। এটি মানুষদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। প্রাণীটিকে প্রায়শই একটি শক্তিশালী জাদুকর বা নিরাময়কারী, কামার, বা কাঠুরে হিসেবে তার মানব আকারে চিত্রিত করা হয়, যার একটি লোমশ শরীর, লাল এবং জ্বলজ্বল চোখ থাকে।
আল-মিরাজ
আল-মিরাজ হলো একটি পৌরাণিক প্রাণী, যা মধ্যযুগীয় আরবি সাহিত্যে উল্লিখিত এক শিংওয়ালা খরগোশ বা খরগোশের মতো। এই নামটি ইস্কান্দারের কিংবদন্তির একটি সংস্করণে লেখা হয়েছে, যিনি ভারত মহাসাগরের ড্রাগন দ্বীপের ড্রাগনকে পরাজিত করার পরে বাসিন্দাদের কাছ থেকে উপহার হিসেবে প্রাণীটি পেয়েছিলেন। প্রাণীটির দিকে দৃষ্টি পড়লে অন্যান্য সব প্রাণীও পালাতে বাধ্য হয়।
কাজউইনির মারভেলস অব থিংস ক্রিয়েটেড এবং মিরাকুলাস অ্যাসপেক্টস অব থিংস এক্সিস্টিং (দ্য ওয়ান্ডার্স অব ক্রিয়েশন) অনুসারে, আল-মিরাজ হলো ভারত মহাসাগরের জাজিরাত আল-তিনিন যা সি-সার্পেন্ট আইল্যান্ড বা ড্রাগন আইল্যান্ড নামে পরিচিত একটি দ্বীপে বসবাস করা কথিত একটি জন্তু। এর রয়েছে একটি কালো শিং। এর গায়ের রং হলুদ, আর এটি দেখতে খরগোশের মতো। এটি দেখে সমস্ত বন্য জানোয়ারও পালিয়ে যায়। দ্বীপবাসীরা ইস্কান্দারকে (আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট) একটি ড্রাগন (বা বড় সাপ) হত্যা করতে সাহায্য করার পরে একে উপহার দিয়েছিল, যেটি গবাদি পশু খেয়েছিল।

দানব কুতরুব
আরবীয় লোককাহিনীর জনপ্রিয় প্রাণী কুতরুব, ওয়্যারউলফের মতো এই দানব একধরনের রাক্ষস। কুতরুবকে প্রায়শই পশ্চিমা সংস্কৃতির পিশাচের সাথে তুলনা করা হয়। সেখানে একে কবরস্থানের বাসিন্দা বলা হয়েছে, যা মৃতদেহ ভক্ষণ করে।

ফালাক
আরবের পৌরাণিক কাহিনী মতে, ফালাক হলো এক বিশালাকার পৌরাণিক সাপ। এটি বাহামুত নামে পরিচিত একটি মাছের নিচে বাস করে। ‘ওয়ান থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান নাইটস’ বা ‘আরব্য রজনীর এক হাজার এক রাত’-এ একে বিপজ্জনক দানব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি বলা হয়ে থাকে যে, এই সাপ কেবল সৃষ্টিকর্তার শক্তিকেই ভয় করে যা একে জগতের সমস্ত সৃষ্টিকে গ্রাস করতে বাধা দেয়। ফালাক খুব বিপজ্জনক প্রাণী। তবে এরা সাধারণত পৃথিবীতে খনন করা সুড়ঙ্গে থাকে। এদের দেহ অতিবৃহৎ নয়, তবুও পর্যাপ্ত খাবার এবং পানি পেলে এদের দেহ বিশাল আকারে বৃদ্ধি পেতে পারে।
ফালাক খুব ঘনিষ্ঠভাবে নর্স জর্মুনগান্ডারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ফালাককে অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পৌরাণিক বিশ্বাসমতে, এটি পৃথিবী, স্বর্গ এবং তার উপরে থাকা ছয়টি নরককে গ্রাস করতে পারে। এদের অগ্নি প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রয়েছে। সেই সাথে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে তাপ সহ্য করার সক্ষমতা।

‘ওয়ান থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান নাইটস’ অনুযায়ী একটি বিশাল ফালাক পৃথিবী পৃষ্ঠের নীচে বাস করে, তবে এটি সৃষ্টিকর্তার ভয়ে এর নীচে থাকা সবকিছু গ্রাস করা থেকে এড়িয়ে থাকে। যদিও এই পৌরাণিক কাহিনীকে প্রায় আমেরিকান এবং ইউরোপীয় ম্যাজিজুওলজিস্টরা অস্বীকৃতি জানান, তবে তারা আজকের ম্যাগমা পাইথনের বিবর্তনীয় প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আলাদিনের বিস্ময়কর প্রদীপের কিংবদন্তি
আরবের সবচেয়ে বিখ্যাত লোককাহিনীগুলোর মধ্যে একটি হলো কিংবদন্তি আলাদিনের জাদুর প্রদীপের গল্প। সারা বিশ্বের শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে এই গল্পটি পরিচিত ও বহুল প্রচলিত। এটি আজও মানুষের কল্পনা ও আবেগকে ধারণ করে রেখেছে। মূলত এই গল্পটি ‘আরব্য রজনীর এক হাজার এক রাত’-এর একটি অংশ। গল্পে এক যুবক ছেলে আলাদিনের কথা বলা হয়েছে যে ছিল দরিদ্র। সে একটি দুষ্ট জাদুকরের দ্বারা প্রতারিত হয়। পরে সে একটি জাদুকরী প্রদীপের মালিক হয়ে যায়। প্রদীপের মধ্যে থাকা একটি জিনি বা জ্বিনের মাধ্যমে একের পর এক দুঃসাহসিক কাজ শুরু করে। এভাবে সে জিনির সাহায্যে রাজকন্যার মন জয়ে সক্ষম হয়।

কিংবদন্তি অনুসারে আলাদিন ছিল জাদুর প্রদীপের মালিক
আলীবাবা এবং চল্লিশ চোরের গল্প
কিংবদন্তি ‘আরব্য রজনীর এক হাজার এক রাত’-এর আরেকটি বিখ্যাত গল্প এটি। এই গল্পে আলীবাবা নামে এক দরিদ্র কাঠুরির কথা উঠে এসেছে। বনে একটি দুঃসাহসিক অভিযানের সময় তিনি চোরের লুকানো আস্তানা আবিষ্কার করেন, আর জাদুকরী শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে সেই গুহার দরজা খুলতে সক্ষম হন। আলীবাবা অবশেষে দুষ্ট চোরদের হাত থেকে রক্ষা পান এবং তাদের বিশাল ধনভান্ডারের মালিক হয়ে যান।

জারকা’ আল-ইয়ামামার কিংবদন্তি
আরব্য পৌরাণিক কাহিনী মতে, জারকা’ আল-ইয়ামামা ছিল অবিশ্বাস্য শক্তি, এবং জাদুবিদ্যার অধিকারী একজন শক্তিশালী মহিলা। কিংবদন্তি মতে, তার উজ্জ্বল নীল চোখ তাকে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিতে এবং ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করতে সাহায্য করত। কিন্তু তার ঈর্ষান্বিত উপজাতি শত্রুরা শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যা করে। তার চোখ উপড়ে নেয়, এবং তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে।

কিংবদন্তি নাবিক সিন্দবাদ
আরেকটি বিখ্যাত কিংবদন্তি গল্প, যা বর্তমান ইরাক থেকে আরম্ভ হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই কিংবদন্তি অনুসারে সিন্দবাদ ছিল একজন বিখ্যাত নাবিক ও অভিযাত্রী। তার দুঃসাহসিক অভিযাত্রা আর কাজের অসংখ্য গল্প রয়েছে। সিন্দবাদের সাতটি দুঃসাহসিক অভিযানের গল্পের কথা পাওয়া যায়। এসব গল্পের বেশিরভাগই যাদুকরী প্রাণী আর শক্তিশালী দানবদের নিয়ে তৈরি, যাদের মুখোমুখি হয়েছিল সিন্দবাদ। আর তাদের সাথে মোকাবিলা করে বিজয় লাভ করেছিল।
হারিয়ে যাওয়া শহর মরুভূমির আটলান্টিস
হারিয়ে যাওয়া শহর মরুভূমির আটলান্টিস, যা এখন আরবের একটি পৌরাণিক কাহিনী এবং কিংবদন্তি। পৌরাণিক কাহিনী মতে এটি ছিল আরবের একটি প্রাচীন শহর, যা সৃষ্টিকর্তা একটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটিয়ে ধ্বংস করে দেয়। ফলে এই শহরটি বালির নিচে চাপা পড়েছিল। শহরটিকে ওয়াবার, ইরাম, উবার এবং পিলার অব ইরামসহ অনেক নামে উল্লেখ করা হয়। এই স্থানটি সত্যিই কি পৌরাণিক কাহিনী নাকি বাস্তবে এর অস্তিত্ব আছে কিনা তা নিয়ে পণ্ডিত, ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং অনুসন্ধানকারীদের মধ্যে বেশ বিতর্ক রয়েছে। যদিও এটি দাবি করা হয়েছিল যে শহরটি ১৯৯২ সালে ওমানে আবিষ্কৃত হয়েছিল, তবে খুব কম লোকই বিশ্বাস করে যে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি উবারই ছিল। অনেক অভিযাত্রী এই গল্পের উপর এখনো বিশ্বাস করে চলেছেন এবং হারিয়ে যাওয়া শহরটির অনুসন্ধান করছেন। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে এটি আধুনিক সৌদি আরবের দক্ষিণ মরুভূমির কোথাও অবস্থিত।

পৌরাণিক কাহিনী, রূপকথা, লোককাহিনী, উপকথা বা দৈত্য দানো যা-ই বলি না কেন, এসব তৈরি হয়েছিল মানুষের কল্পনা, বা কল্পকাহিনীর উপর ভিত্তি করে। যদিও এসব কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাক বা না যাক, তারপরও মানুষের মনোব্যাঞ্জনা, আকাঙ্ক্ষা আর আনন্দের জন্য প্রাচীন আরবে এসবের বেশ গুরুত্ব ছিল তা বলাই যায়।
সংক্ষেপে দেখুনলবণ নিয়ে পৃথিবী জুড়ে কত রকম সংস্কার-কুসংস্কার রয়েছে?
লবণের এক জীবাণুনাশক ধর্ম আছে। অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীই তাদের খাদ্যে প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে লবণ ব্যবহার করে থাকে। অল্পমাত্রায় হলেও শরীর রক্ষার জন্য এই যৌগিক পদার্থটি গ্রহণ করা আবশ্যক। শারীরবৃত্তীয় কাজে লবণের এই গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতির জন্যই সেই প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে এসেও মানুষের মনবিস্তারিত পড়ুন
লবণের এক জীবাণুনাশক ধর্ম আছে। অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীই তাদের খাদ্যে প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে লবণ ব্যবহার করে থাকে। অল্পমাত্রায় হলেও শরীর রক্ষার জন্য এই যৌগিক পদার্থটি গ্রহণ করা আবশ্যক। শারীরবৃত্তীয় কাজে লবণের এই গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতির জন্যই সেই প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে এসেও মানুষের মনে আপনা থেকে লবণ নিয়ে কিছু সংস্কার তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে লবণের প্রচলন
প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে লবণ ব্যবহার করতে শুরু করে। হয়তো কিছুটা প্রতীকী ব্যাপার হিসেবেই এটা চালু হয়েছিল। তখনও লোহা এবং লবণ এই দুটো জিনিসের উৎস সম্পর্কে মানুষের তেমন কোনো ধারণা ছিল না। তারা মনে করতো কোনো আধিদৈবিক, অলৌকিক কারণে এসব উপাদান প্রকৃতিতে সৃষ্টি হয়েছে। বস্তুত ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো লবণ ছাড়া চলতোই না। এখনো অনেক ধর্মীয় প্রথায় সে সংস্কার মেনে চলা হয়।

প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে লবণ নিয়ে গড়ে ওঠে নানা সংস্কার
দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে একসময় যেসব প্রাণীকে ‘বলি’ দেওয়া হতো, তাতে নুন মাখিয়ে রাখা হতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, এর ফলে সেই মাংস কখনো বাসী হতো না, তাতে পচন ধরতো না। মায়া সভ্যতায় হিংস্র ও বর্বর অ্যাজটেকরা লবণের এক দেবীকে পুজো করতো। খ্রিস্ট ধর্মে ব্যাপটিজম বা দীক্ষার সময় যে পবিত্র জলে গোসল করানো হয়, সেই জলে লবণ মেশানো থাকে। দীক্ষার পর দীক্ষিত ব্যক্তির মুখে লবণ ছোয়ানোর প্রথা রয়েছে।
বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্য অনুসারে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্নের পর বাড়িতে প্রবেশের পূর্বে কাঁধের উপর দিয়ে লবণ ছিটিয়ে তবেই গৃহে প্রবেশ করতে হয়। কোনো অশুভ আত্মা যাতে তার ওপর ভর করতে না পারে সেজন্যই বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা এই প্রথা মেনে চলেন। শিন্টো মতালম্বীরা তাদের ধর্মীয় কোনো কাজ শুরু করার পূর্বে স্থানটিকে শুদ্ধ করা জন্য লবণপানি ছিটিয়ে দেন।

বৌদ্ধ ধর্মে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্নের পর বাড়িতে প্রবেশের পূর্বে কাঁধের উপর দিয়ে লবণ ছিটানো হয়ে থাকে
ইহুদী উপকথায় লবণের চুক্তিনামার কথা আছে। ঈশ্বর ও ইজরায়েল নামক পবিত্র ভূমির শাশ্বত বন্ধনের কথা নাকি ওই চুক্তিপত্রে বর্ণিত আছে।
বিভিন্ন সমাজে লবণ নিয়ে যত কুসংস্কার
বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সমাজের মানুষের মাঝে লবণ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা সংস্কার। অনেক সমাজে বিয়ের সময় কনের পোশাকের পকেটে একটু লবণ রেখে দেওয়ার রীতি আছে। ওই সামান্য লবণ ভবিষ্যতে নাকি বিশাল সৌভাগ্য নিয়ে আসবে বর-কনের দাম্পত্য জীবনে। গুজরাটিরা নববর্ষে কিংবা বিয়ের কেনাকাটার শুরুতে প্রথমে লবণ কিনে থাকেন, যাতে নববর্ষের অনুষ্ঠান বা বিয়ের অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হতে পারে। দক্ষিণ ভারতীয় অনেক হিন্দুর মধ্যে নব বিবাহিত দম্পতিকে বা কোনো নতুন গৃহে প্রবেশের সময় দম্পতিকে লবণ ছিটিয়ে গৃহে অভ্যর্থনা জানানো হয়।


নব বিবাহিত দম্পতিকে লবণ ছিটিয়ে গৃহে অভ্যর্থনা জানানো হয়
জাপানের সুমো কুস্তিগররা কুস্তির খেলার মঞ্চটিকে লবণ ছিটিয়ে শুদ্ধ করে থাকেন। জীবনে সৌভাগ্য আনয়নের জন্য যুবক জেলে বা নাবিকরা তাদের সমুদ্রযাত্রার আগে পকেটে একটু লবণ ছিটিয়ে নিতো। শুধুই যুবক জেলে বা নাবিকদের জীবনেই লবণ সৌভাগ্য আনে না, সদ্যোজাত শিশুর ক্ষেত্রেও লবণের ওরকম প্রভাব আছে বলে ভাবা হতো। কোনো সদ্যোজাত শিশুর ওপর যাতে ডাইনীর প্রভাব না পড়ে, সেজন্য উপহার হিসেবে লবণ দেয়ার প্রচলন ছিল একসময়। পরবর্তীকালে ধনী ব্যক্তিরা অনেকেই লবণের বদলে শিশুকে একটু রুপো উপহার দিতেন। ধারণা ছিল রুপোর মধ্যেও লবণের এই গুণটি আছে; ডাইনীকে দূরে সরিয়ে রাখার গুণ।
সংস্কার হিসেবে সুমো কুস্তিগিররা খেলার মঞ্চটিকে লবণ ছিটিয়ে শুদ্ধ করে নেন
জেলেদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও মাছ ধরার জালে একটু লবণ ছড়িয়ে দেন। যারা নৌকো তৈরি করেন, তাদের মধ্যেও এ ধরনের একটি প্রথা আছে। নতুন নৌকোর দুটো কাঠের তক্তার মাঝে একটু লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে। তাদের অনেকেই জানেন না, কেন তারা এমন করেন। প্রাচীন সংস্কার থেকেই মূলত তারা এটি করে থাকেন। জেলেদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, নৌকো, জাল নিরাপদে রাখার জন্য এটি তাদের এক নীরব প্রার্থনা। এই প্রার্থনা শক্তিমান সমুদ্র দেবতার প্রতি। তাকে তুষ্ট করার জন্যই এভাবে লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হয়।
মিশরীয়রা তপ্ত মরুভূমির ওপর যাত্রার প্রাক্কালে লবণ পুড়িয়ে তা মরুভূমির বালির ওপর ছিটিয়ে দিতেন। প্রাচীনকালে সন্ধি স্থাপনের সময় পূর্বতন দুই বিবদমান পক্ষই একসঙ্গে মুখে একটু লবণ পুরে দিতেন। দুজনের একসঙ্গে লবণ খাওয়ার অর্থই হলো এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্বের বন্ধনে বাঁধা পড়া। প্রাচীন জাদুকর ও অ্যালকেমিস্টরা ব্ল্যাক ম্যাজিক, বিভিন্ন ভূতের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বোতল ভর্তি লবণ ব্যবহার করতেন। তাদের বিশ্বাস লবণ সেই ভূতদের অবসাদগ্রস্ত ও নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
পাশ্চাত্যে লবণ নিয়ে যত সংস্কার
পাশ্চাত্যের লোকদের মনেও লবণ নিয়ে নানা সংস্কার আছে। ১৪৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরে প্রচুর পরিমাণে লবণ উৎপাদিত হতো। প্রাচীন মিশরে রাজ পরিবারের মৃত ব্যক্তিদেরকে মমি তৈরির কাজে লবণ ব্যবহৃত হতো। একসময় লবণ বেশ মূল্যবান দ্রব্য ছিল। মুদ্রা হিসেবে একসময় লবণের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। প্রাচীন গ্রিসে দাস বেচাকেনায় লবণকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এমনকি রোমান সৈন্যদের বেতন হিসেবে লবণ প্রদান করা হতো। সেখান থেকেই লবণ নিয়ে এক অদ্ভুত ধারণা তৈরি হয়।


প্রাচীনকালে রোমান সৈন্যদের বেতন হিসেবে লবণ প্রদানের প্রথা চালু ছিল
লবণের অপব্যবহার মানে অমঙ্গলকে ডেকে আনা। হঠাৎ খাওয়ার টেবিলে লবণ পড়ে যাওয়ার অর্থ শয়তান ধারেকাছেই কোথাও আছে। অদৃশ্য বাতাসে ভর করে সে কাছে চলে আসবে, কানে ফিস ফিস করে কু মন্ত্রণা দেবে। অমঙ্গল বা শয়তানের অবস্থান বাঁ কাঁধে। তাই লবণের পাত্র থেকে হঠাৎ লবণ পড়ে গেলে শয়তান যাতে কোনো সুযোগ নিতে না পারে, যাতে সে কাছে ঘেঁষতে না পারে, সেজন্য তার চোখ দুটো অন্ধ করে দেওয়ার জন্য এক চিমটি লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হয় বাঁ কাঁধে।
অশুভকে কাছে ঘেঁষতে না দেওয়ার জন্য বাঁ কাঁধে এক চিমটি লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হতো
জার্মানি ও স্কটল্যান্ডের কিছু কিছু জায়গায় পশুপালকরা তাদের গৃহপালিত পশু থেকে উৎপাদিত মাখনের কিছু অংশে লবণ মেখে খামারের আশেপাশে ছড়িয়ে দেন। খামারের পশুদের ওপর কোনো অশুভ প্রভাব যাতে না পড়ে এবং মাখন ও দুধের উৎপাদন যাতে ব্যহত না হয় এজন্য খামার মালিকেরা কাজটি করে থাকেন।
আইরিশদের এবং ইউক্রেনীয়দের বিভন্ন লোকগাঁথা থেকে জানা যায়, অপদেবতার পুজারী, ভয়ঙ্কর জিপসিদের দেখে ভয় পাওয়া বা তাদের দেওয়া কোনো অভিশাপ কাটানোর জন্য জিপসিদের চলে যাওয়ার পর রাস্তায় একটু লবণ ছিটিয়ে দেওয়ার প্রচলন ছিল।

সংক্ষেপে দেখুনমিশরে রাজপরিবারের মৃত ব্যক্তিকে মমি করার সময় লবণ পানিতে মৃতদহেকে গোসল করানো হতো
লবণ নিয়ে এসব সংস্কার বা কুসংস্কার সেই প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে আসছে, যার কিছু কিছু এখনো বিভিন্ন সমাজে চালু রয়েছে। মানুষের এসব সংস্কার এক আদিম বিশ্বাস হতে জাত। এসব বিশ্বাস অধিকাংশ মানুষই না জেনেই আজও বহন করে চলেছে যুগের পর যুগ। যদিও সেই বিশ্বাসের অনেকটুকুই এখন শুধু মজার গল্প হিসেবে ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।
আনুবিস: প্রাচীন মিশরের শিয়াল দেবতা। কি তার ইতিহাস ?
সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট ফেলুদা সিরিজের প্রথমদিকের একটি গল্পের নাম ছিল ‘শিয়াল দেবতা রহস্য’। সেই গল্পে প্রাচীন মিশরীয় দেবতা ‘আনুবিস’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বিখ্যাত লেখকদের গল্প, উপন্যাস বা মিশরীয় উপকথাই হোক, ইতিহাসের পাতায় আনুবিস সুপরিচিত ও জনপ্রিয় এক নাম। কিংবদন্তিতে বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন তিনি। শিবিস্তারিত পড়ুন
সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট ফেলুদা সিরিজের প্রথমদিকের একটি গল্পের নাম ছিল ‘শিয়াল দেবতা রহস্য’। সেই গল্পে প্রাচীন মিশরীয় দেবতা ‘আনুবিস’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বিখ্যাত লেখকদের গল্প, উপন্যাস বা মিশরীয় উপকথাই হোক, ইতিহাসের পাতায় আনুবিস সুপরিচিত ও জনপ্রিয় এক নাম। কিংবদন্তিতে বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন তিনি। শিয়ালের মুখাবয়ব ও মানুষের দেহ সম্বলিত দেবতা আনুবিস হচ্ছেন মমিকরণ প্রক্রিয়া ও মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের মিশরীয় দেবতা। এছাড়াও তিনি হারানো আত্মা ও অসহায়দের সাহায্য করে থাকেন। ধারণা করা হয়, তিনি সম্ভবত পূর্বের শিয়াল দেবতা ওয়েপওয়াটেট থেকে বিকশিত হয়েছেন, এবং ওয়েপওয়াটেটের সাথে তাকে প্রায়শই গুলিয়ে ফেলা হয়। মিশরে তখন শিয়ালেরা কবর খুঁড়ে মৃতদেহ ছিন্নভিন্ন করে ফেলত। সেজন্য প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, শেয়াল দেবতা সেই শেয়ালদের হাত থেকে কবরের লাশগুলোকে রক্ষা করতে পারবেন। মিশরের প্রাক-রাজবংশীয় যুগের কোনো একসময় বন্য কুকুর এবং শিয়ালের হাত থেকে রাজকীয় কবরগুলোতে সর্বোত্তম সুরক্ষা দেওয়ার জন্য দেবতা আনুবিসের ধারণার উদ্ভব ঘটে।
আবার অনেক মিশর-তত্ত্ববিদ বলেন, মিশরের অধিবাসীরা বিশ্বাস করত- কোনো ব্যক্তির মৃতদেহের সাথে কুকুর সমাহিত করা হলে ওই কুকুর তার হয়ে আনুবিসের কাছে সুপারিশ করবে। সেই কারণে ব্যক্তির মৃতদেহের সাথে কুকুরকেও সমাহিত করত তারা। খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০ থেকে ৩০ অব্দ পর্যন্ত এই পশু-সমাধি প্রথায় বিশ্বাসী ছিল মিশরীয়রা। মিশরের প্রথম রাজবংশের রাজকীয় সমাধিতেও আনুবিসের মূর্তির সন্ধান মেলে। ওসাইরিস পুরাণ বিকশিত হবার আগপর্যন্ত আনুবিস ছিলেন মৃতদের দেবতা। কিন্তু ওসাইরিস পরবর্তীতে এই দায়িত্ব নেবার পর আনুবিস মমিকরণ দেবতার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।



দেবতা আনুবিস
মিশরীয় উপকথা অনুযায়ী, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মমি তৈরি করেছিলেন দেবতা আনুবিস। কাহিনিটি এমন- দেবতা গেব এবং তার বোন আকাশ ও স্বর্গদেবী নুট বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের গভীর প্রণয়ের ফলে জন্ম হয় আইসিস, ওসাইরিস, সেথ, ও নেপথিস নামক চার দেব-দেবীর। এদের মধ্যে নেপথিস সেথকে এবং আইসিস বিয়ে করেন ওসাইরিসকে। সূর্যদেবতা ‘রা’-কে যখন বার্ধক্য কিছুটা নুইয়ে ফেলে, তখন তিনি ওসাইরিসকে শাসনকার্যের ভার বুঝিয়ে দিয়ে সূর্যরথে চড়ে পাড়ি দেন স্বর্গে। ওসাইরিসের রাজত্বকালে মিশরের সবখানেই সুখ-শান্তি ছড়িয়ে ছিল। প্রচণ্ড ভ্রমণপিপাসু হওয়ায় ওসাইরিস প্রায়শই রানী আইসিসকে সাময়িকভাবে রাজ্যভার অর্পণ করে ভ্রমণে বের হতেন। এমনি এক ভ্রমণে ওসাইরিস তার সহোদর সেথের স্ত্রী নেপথিসের সঙ্গে গোপনে মিলিত হন। ফলে নেপথিসের গর্ভে আসেন আনুবিস। জানতে পেরে সেথ ক্ষিপ্ত হয়ে ওসাইরিসকে হত্যা করেন। হত্যার পর তার শরীর ৪২ টুকরা করে মিশরের ৪২টি অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে দেন। এরপর সেথ সিংহাসন দখল করে ফেলেন। শান্তিভূম মিশরে নেমে আসে ঘোর অশান্তির কালো ছায়া।
আনুবিস, আইসিস, এবং ফারাও তুতেনখামুন
ওসাইরিসের স্ত্রী দেবী আইসিস জানতেন, শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান ছাড়া তার স্বামীর আত্মা স্বর্গে আরোহণ করতে পারবে না। তাই, আইসিস ও নেপথিস বাজপাখির রূপ নিয়ে, পুরো মিশর খুঁজে ওসাইরিসের শরীরের ৪২টি অংশ উদ্ধার করেন। এরপর জাদু দিয়ে ৪২টি টুকরা একত্র করা হয়। আইসিস তার স্বামী ওসাইরিসের মৃতদেহ উদ্ধার করার পর, সূর্যদেবতা আনুবিসকে মৃতদেহটি মমি করার নির্দেশ দেন। জ্ঞানের দেবতা থোথের সহায়তায় আনুবিস ওসাইরিসের শবদেহ কাপড়ে মুড়িয়ে দেন। তারপর আনুবিস তার পিতার লাশ সংরক্ষণের জন্য প্রথম মমি তৈরি করেন। এভাবেই মিশরের মাটিতে তৈরি হয় প্রথম মমি। যথারীতি ‘Opening of the mouth’ অনুষ্ঠানটি সম্পন্নের পর ওসাইরিসকে সমাহিত করা হয়। এই ঘটনার পর থেকেই আনুবিসকে মমিকরণের দেবতা বলা হয়।
মৃতদেহ মমি করছেন আনুবিস
এই মমিকরণ প্রক্রিয়ার সময় সেথের সাথে আনুবিসের প্রচণ্ড লড়াই বেধে গিয়েছিল। মমিকরণের সময় ওসাইরিসের মৃতদেহ মমি করার স্থানে রাখেন আনুবিস। যেহেতু মমিকরণ প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ সময়ের এক কাজ, তাই প্রতি রাতেই আনুবিস কাজ শেষ করে ওই স্থান ত্যাগ করতেন। ব্যাপারটা সুচতুর দৃষ্টিতে পরখ করলেন দেবতা সেথ। তার উদ্দেশ্য ছিল ওসাইরিসের মৃতদেহ চুরি করা। তাই একরাতে তিনি আনুবিসের রূপ ধারণ করে সেখান থেকে ওসাইরিসের মৃতদেহ চুরি করেন। তবে সেথ মৃতদেহ নিয়ে বেশিদূর যেতে পারেননি। এর আগেই টের পেয়ে যান আনুবিস, এবং সেথকে ধাওয়া করেন। আনুবিসের হাত থেকে বাঁচতে ষাঁড়ের রূপ ধারণ করেন সেথ। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। আনুবিস তাকে ধরে নিয়ে নপুংসক বানিয়ে দেন। তারপর বন্দী করে রাখেন মিশরের সপ্তদশ নোমে সাকারাতে।
বন্দিত্বের দশা বরণ করে নেবার পর সেখান থেকে পালানোর ফন্দি আঁটতে থাকেন সেথ। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি বিশাল এক বিড়ালের রূপ ধারণ করলেন। কিন্তু এবারও তিনি আনুবিসকে ফাঁকি দিয়ে বের হতে পারলেন না। ধরা খাওয়ার পর আনুবিস তাকে টকটকে লাল লোহা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সেঁক দিলেন। চিতাবাঘের শরীরে কীভাবে ছোপ ছোপ দাগের জন্ম হয়েছে- প্রাচীন মিশরের এই কিংবদন্তি থেকেই সে কাহিনী বর্ণনা করা হতো।
এরপরেও ক্ষান্ত হননি সেথ। তিনি বিভিন্ন কায়দা ও কৌশলে ওসাইরিসের মৃতদেহ চুরির চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এবারও তিনি ব্যর্থ হয়ে আনুবিসের হাতে ধরা পড়লেন। তবে, এবার আর আনুবিস ছোটখাট শাস্তির ধার ধারেননি। তিনি হত্যা করলেন সেথকে। তার শরীর থেকে চামড়া ছাড়িয়ে শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। এরপর সেথের পুরো ফৌজকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে তিনি সেথের শিবিরে প্রবেশ করে তরবারির এক কোপে সেথের পুরো বাহিনীর শিরশ্ছেদ করলেন।

আনুবিসের মূর্তি (আনুমানিক ১০০ খ্রিস্টাব্দ – ১৩৮ খ্রি.পূ.)
কিছু জনশ্রুতি অনুসারে, আনুবিস ছিলেন দেবতা রা-র পুত্র। প্রথমদিকে তিনি মৃতদের প্রাথমিক দেবতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সময়ের সাথে সাথে ওসাইরিসের ধর্মীয় উপাসনার গুরুত্ব বাড়তে থাকলে, আনুবিসের কাহিনী ওসাইরিস পুরাণের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে নয়া ওসাইরিস পুরাণ (খ্রি.পূ. ২০০০ অব্দ নাগাদ) অনুসারে, আনুবিস হয়ে উঠেছিলেন ওসাইরিস এবং নেপথিসের জারজ সন্তান। নেপথিস তার স্বামী সেথের ভয়ে আনুবিসকে গোপনে পরিত্যাগ করেন। এতিম আনুবিসকে তখন পরিত্যক্ত অবস্থায় খুঁজে পান দেবতা আইসিস। তাকে দেখে মনের কোণে মায়া জাগে আইসিসের। পরবর্তীতে তিনি আনুবিসকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে, বেশ কিছু প্রাচীন মিশরীয় কিংবদন্তি অনুসারে, আনুবিস সত্যিকার অর্থেই সেথের ঔরসজাত সন্তান ছিল। সেসকল কিংবদন্তি অনুযায়ী, সেথের দ্বারা গর্ভবতী হবার পর নেপথিস সেথের কাছ থেকে সে খবর লুকিয়ে রাখে। কারণ, সন্তানসম্ভবা নেপথিস ভাবতেন, সেথের সংস্পর্শে এলে তার সন্তানও সেথের মতো রূঢ় ও বেপরোয়া স্বভাবের হয়ে উঠবে। তখন তিনি গোপনে আনুবিসকে আইসিসের কাছে দত্তক দেন।
আনুবিসকে নিয়ে ‘দুই ভাইয়ের গল্প’ নামে আরও একটি গল্প চালু আছে। সেই গল্পে আনুবিসের বাটা নামে এক অনুজ ছিল। বাটা ছিলেন প্রাচীন মিশরের একজন আঞ্চলিক দেবতা, যিনি সময়ের সাথে সাথে মিশরীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনের কারণে কালের গর্ভের হারিয়ে গেছেন। যেসব পুরাণে আনুবিসকে ওসাইরিসের সন্তান হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেসব পুরাণে, আনুবিসের ভাই হিসেবে হোরাস, সোপডেপ, বাবি, এবং ওয়েপওয়াওয়েটের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

আনুমানিক ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শবাধারে অঙ্কিত আনুবিসের চিত্র
মিশরীয় জনশ্রুতি অনুসারে, মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির সামনে প্রথমেই যে দেবতা হাজির হন, তিনি হলেন মৃতের জগতের অধিকর্তা দেবতা আনুবিস। মারা যাওয়ার পর মৃত ব্যক্তি বাকশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। আনুবিস তাকে সেই ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন। মৃতের গ্রন্থের ১২৫ নং মন্ত্র অনুযায়ী, সেই মৃত ব্যক্তিকে অনন্তকালের পথ প্রদর্শনের কাজটা করে থাকেন দেবতা আনুবিস। মৃত ব্যক্তি আকাশের তারায় পরিণত হতে পারবেন কি না, তা বিচারের ভার আনুবিসের ওপরে। আনুবিসের হাতে থাকে পালকযুক্ত দণ্ড, যা দিয়ে মূলত মৃতের বিচার করা হয়।
সহজে চেনার জন্য আনুবিসের মধ্যে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও চিহ্ন বিদ্যমান ছিল। অধিকাংশ মিশরীয় দেবতাদের মতো তার একটি মানবদেহ ছিল, তার ঘাড়ের উপর বসানো ছিল শিয়ালের মাথা। পেছন দিক দিয়ে শেয়ালের মতো একটি লেজও ছিল তার। তার শরীরের রঙ ছিল কালো। তাঁকে প্রায়শই একটি আসনে বসা অবস্থায় চিত্রিত করা হয়। অধিকাংশ মিশরীয় দেবতাদের মতো তিনিও নিজ আকৃতি মুহূর্তেই পরিবর্তন করতে পারতেন। দেবতা ওসাইরিসের মৃতদেহ দেখে তিনি এতটাই মর্মাহত হয়েছিলেন যে, তখন সাথে সাথে তিনি নিজেকে গিরগিটিতে রূপান্তর করে ফেলেন।

দেবতা আনুবিসের মূর্তি
প্রাচীন মিশরীয় সংস্কৃতি শেষদিকে এসে অনেকটা গ্রিক সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়েছিল। আজ মিশরীয় দেবতারা যেসকল নামে ইতিহাসের পাতায় পরিচিত, তার অধিকাংশই গ্রিকদের দেওয়া, এবং তা এসেছে গ্রিক অনুবাদ থেকে। গ্রিকরা মিশরীয় দেবতাদের পৃষ্ঠপোষকতা করলেও, দেব-দেবীদের নামকরণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতার পরিচয় দেয়নি। এর অন্যতম এক কারণ হতে পারে, প্রাচীন মিশরীয়দের মধ্যে স্বরবর্ণহীন লিখনপদ্ধতি চালু ছিল। তাই গবেষকদের অনুমান অনুযায়ী, তৎকালীন প্রাচীন মিশরে আনুবিসকে ‘আনপু’ বা ‘ইনপু’ বলে ডাকা হতো। দেবতা আনুবিসের কন্যা কেবেচেতকে প্রাচীন মিশরীয়রা ক্বেবেহেত, কেবহুত, কেবেহুত, ক্বেবেহুত ও কাবেচেত নামেও ডাকত। তিনি ছিলেন সজীবতা ও বিশুদ্ধতার দেবী।
সম্ভবত আনুবিসের প্রার্থনার জন্য প্রাচীন মিশরে আলাদাভাবে কোনো মন্দির নির্মাণ করা হয়নি। কারণ, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই দেবতার প্রতি নিবেদিত কোনো মন্দির খুঁজে পাননি। তাই কবরস্থান ও সমাধিগুলোকেই তার মন্দির হিসেবে ধরা হয়। প্রাচীন মিশরের প্রথম রাজবংশের মাস্তাবাতে তার নামের সন্ধান মিলেছে। যেমন, সাক্কারার পূর্ব দিকে অবস্থিত আনুবিয়নের এক উপাসনালয়ে মমি-কৃত কুকুর ও শিয়ালের অস্তিত্ব মিলেছে। ধারণা অনুযায়ী, প্রথম রাজবংশের রাজত্বকালে তাকে ওসাইরিসের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরবর্তী রাজবংশগুলোতে ধর্মীয় ভাবধারা বা দেবপূজার পরিবর্তন ঘটলেও, আনুবিস ছিলেন সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ দেবতাদের মধ্যে অন্যতম।

সংক্ষেপে দেখুনআনুবিস হুনেফারকে বিচারসভায় নিয়ে আসছেন
মিশরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে নয়জন আদি দেব-দেবীর কথা বলা হয়েছে। এদেরকে একত্রে এননিয়াড নামে অভিহিত করা হয়। আনুবিস ছিলেন এননিয়াডের মধ্যে অন্যতম। টলেমি শাসনামলে (৩০০ খ্রিস্টাব্দ – ৩০ খ্রি.পূ.), যখন মিশর গ্রিক ফারাওদের অধীনস্থ ছিল, তখন আনুবিসের নাম গ্রিক দেবতা হারমেসের সাথে মিশিয়ে ‘হারমানুবিস’ নামে এক দেবতার উৎপত্তি ঘটে। কারণ, দুজন দেবতার কাজের মাঝে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুজনেই মৃত্যুর পর আত্মাকে পরকালের পথ দেখাতেন। দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচীন রোমে এই দেবতার পূজা করা হতো, এমন তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে।
আফ্রোদিতি কে ছিলেন ?
সৃষ্টিজগতের অন্যতম আরাধ্য বোধহয় রূপ ও গুণ! দেব-দেবী থেকে শুরু করে মানুষ, সবাই রূপ ও গুণের পূজারী। সৃষ্টির সবাই সৌন্দর্যের প্রতি চরমভাবে আকৃষ্ট। নারীর সৌন্দর্যে ডুব দিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায় জগতের প্রতিটি পুরুষই। সুন্দরী নারীর প্রতি যৌনতা ও ভালোবাসা অনুভব করা পুরুষের সহজাত প্রবৃত্তি। সুন্দরী নবিস্তারিত পড়ুন
সৃষ্টিজগতের অন্যতম আরাধ্য বোধহয় রূপ ও গুণ! দেব-দেবী থেকে শুরু করে মানুষ, সবাই রূপ ও গুণের পূজারী। সৃষ্টির সবাই সৌন্দর্যের প্রতি চরমভাবে আকৃষ্ট। নারীর সৌন্দর্যে ডুব দিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায় জগতের প্রতিটি পুরুষই। সুন্দরী নারীর প্রতি যৌনতা ও ভালোবাসা অনুভব করা পুরুষের সহজাত প্রবৃত্তি। সুন্দরী নারীর প্রতি ভালোবাসা ও কামনা অনুভব করে না এমন পুরুষ নেই। গ্রিক উপকথা সৌন্দর্য ও ভালোবাসার ধারণাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। সেখানে সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও যৌনতা যার মাধ্যমে অন্য মাত্রা পেয়েছে তিনি আফ্রোদিতি। রোমান উপকথায় আফ্রোদিতিকে ভেনাস নামে অভিহিত করা হয়েছে।

সৌন্দর্য, কাম ও ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি গ্রিক পুরাণের অন্যতম প্রভাবশালী দেবী
গ্রিক মিথোলজির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিখ্যাত ১২ দেব-দেবীকে অলিম্পিয়ান নামে অভিহিত করা হয়। প্রথম যুগের টাইটানদের পর এই ১২ জন দেব-দেবী ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেন। অলিম্পাস পাহাড়ে তাদের বসবাস ছিল বলে তাদের অলিম্পিয়ান নামে ডাকা হয়। তারা গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রাচীন গ্রীকদের জীবনে দারুণ প্রভাব রেখেছেন।
গ্রিক পুরাণের এই অলিম্পিয়ান দেবদেবীদের অন্যতম হলেন সৌন্দর্য ও ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি। তার রূপে, গুণে মুগ্ধ হয়েছে দেবতা থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত সকলেই। তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা করেছে স্বর্গ থেকে শুরু করে মর্ত্যের অনেকেই। আফ্রোদিতিও স্বর্গ-মর্ত্যের অনেককে যৌনসুখ দিয়েছেন। প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি প্রেমও করেছেন অনেক দেবতা ও মানুষের সঙ্গে।
হেসিয়ডের বর্ণনানুযায়ী, আফ্রোদিতি হলেন সবচেয়ে প্রাচীন অলিম্পিয়ান। তিনি সমুদ্রকে শান্ত করেন, তৃণভূমিগুলোকে ফুল দিয়ে সতেজ করেন। এমনকি, তার কথায় ঝড় থেমে যায়। বন্য প্রাণীরাও তার বশ্যতা স্বীকার করে। এই কারণেই তার প্রধান প্রতীকগুলো সাধারণত প্রকৃতি থেকে আসা, যার মধ্যে রয়েছে গোলাপ, ঘুঘু, চড়ুই এবং রাজহাঁস।
সমস্ত দেব-দেবীর মধ্যে আফ্রোদিতি সবচেয়ে বেশি কামুক এবং যৌনতায় পরিপূর্ণ। এজন্য অনেক ভাস্কর্য ও চিত্রকর্মে তাকে নগ্নভাবে দেখানো হয়। লম্বা সোনালি চুলগুলো তার পিঠের নিচে প্রবাহিত হয়।
আফ্রোদিতির জন্ম নিয়ে বেশ কয়েকটি গল্প প্রচলিত রয়েছে। অনেকে বলে, তিনি দেবরাজ জিউসের কন্যা, আবার কারো কারো মতে জিউসের আগেই আফ্রোদিতির অস্তিত্ব ছিল। সবচেয়ে প্রচলিত ও বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, আফ্রোদিতি ছিলেন ইউরেনাসের কন্যা। উপকথা অনুযায়ী, দেব-দেবীদের জন্মের আগে আদিম বিশৃঙ্খলা ছিল। সেই আদিম বিশৃঙ্খলা থেকে গাইয়া, আর্থ বা পৃথিবীর দেবীর জন্ম হয়। একসময় ইউরেনাস গাইয়ার সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে এবং বারোজন টাইটান, তিনটি সাইক্লোপস, এক চোখের দৈত্য এবং পঞ্চাশটি মাথা ও ১০০ হাতসহ তিনটি দানবীয় হেকাটোনচায়ার জন্ম হয়। কিন্তু ইউরেনাস তার সন্তানদের ঘৃণা করতেন। তিনি তার এই সন্তানদের অস্তিত্বে খুশি ছিলেন না, বরং ক্ষুব্ধ ছিলেন।
এরপরও ইউরেনাস গাইয়াকে বার বার তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করতে বাধ্য করে। কিন্তু যখন তাদের মিলনের ফলে দানব শিশুর জন্ম হতে থাকে, তখন সেই শিশুদের তিনি গ্রহণ করতেন না। ফলে গাইয়া ইউরেনাসকে ঘৃণা করতে শুরু করেন। শেষে নিরুপায় হয়ে গাইয়া তার শিশুদের কাছে সাহায্য চায়। আর্থের শিশুদের মধ্যে ক্রোনাস অত্যন্ত সাহসী ছিল। যখন ইউরেনাস এসে আবার গাইয়ার সাথে শুয়ে পড়ে, তখন অদম্য সাহসী ক্রোনাস তার পিতার যৌনাঙ্গ কেটে সমুদ্রে ফেলে দেয়।

সর্বকনিষ্ঠ টাইটান ক্রোনাস তার পিতার যৌনাঙ্গ কেটে সমুদ্রে ফেলে দেন
আরেক মত অনুযায়ী, ইউরেনাস যখন ঘুমিয়ে ছিল তখন গাইয়া ক্রোনাসের হাতে একটি কাস্তে তুলে দেন এবং ক্রোনাস সেই কাস্তে দিয়ে ইউরেনাসের যৌনাঙ্গ কেটে দেয়। ইউরেনাসের সেই যৌনাঙ্গ সাইথেরার কাছে গিয়ে পড়ে এবং সমুদ্রের স্রোতে সেই যৌনাঙ্গ সাইপ্রাস দ্বীপের উপকূলে চলে যায়। ইউরেনাসের যৌনাঙ্গ থেকে সৃষ্ট সমুদ্রের ফেনা থেকে একটি সুন্দরী মেয়ের জন্ম হয়। সেই কন্যা যখন দ্বীপে পা রাখে, তার পায়ের নীচ থেকে ঘাস ঝরছিল। সেই কন্যাই সৌন্দর্য ও ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি।
গ্রিক ভাষায় ‘আফ্রোস’ শব্দের অর্থ ‘ফেনা’। সমুদ্রের ফেনা থেকে জন্ম হয়েছিল বলে তাকে আফ্রোদিতি নামে ডাকা হয়। গ্রিক ভাষায় আফ্রোদিতি শব্দের অর্থই হলো ‘সমুদ্রোদ্ভুতা’, মানে যার জন্ম সমুদ্র থেকে হয়েছে। এভাবে সাইথেরার লেডি, সাইপ্রাসের লেডি এবং প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি প্রথম আদিম দেবী হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রিক কবি হিসিওড এই মতের পক্ষে। আরেক বিখ্যাত গ্রিক কবি হোমারের মতে, আফ্রোদিতি দেবরাজ জিউস ও দেবী ডিওনের কন্যা। দার্শনিক প্লেটো আফ্রোদিতি সম্পর্কে আরেক তত্ত্ব দেন। তার মতে, দেবালয়ে আফ্রোদিতি নামে দুজনের অস্তিত্ব ছিল। এর একজন ছিল ‘স্বর্গীয় প্রেমের দেবী’, অপরজন ‘দৈহিক প্রেমের দেবী’।
প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির অনেক পুরুষের সঙ্গে প্রেম ছিল। তিনি যদিও বিয়ে করেছিলেন শিল্পের দেবতা হেফাস্টাসকে, তথাপি তিনি অনেকের সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন। আফ্রোদিতি যখন অলিম্পাসে অবতরণ করেন, তখন সেখানকার সবাই আফ্রোদিতির সৌন্দর্যে দিশেহারা। সেখানে তখন এক বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়। এমতাবস্থায় বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে এবং কোনোরকম যুদ্ধ এড়াতে দেবরাজ জিউস ও বিয়ের দেবী হেরা আফ্রোদিতিকে শিল্প ও আগুনের দেবতা হেফাস্টাসের সঙ্গে বিয়ে দেন। হেফাস্টাস ছিলেন খোঁড়া এবং কুৎসিত চেহারার। আফ্রোদিতি তার সঙ্গে সুখী ছিলেন না। ফলে তিনি শুরু করলেন পরকীয়া।

কামার দেবতা হেফাস্টাস ছিলেন আফ্রোদিতির স্বামী
স্ত্রীর পরকীয়ার কথা জানতে পেরে হেফাস্টাস তাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করতে থাকেন। দেবালয়ের কামার এবং শিল্পের দেবতা হেফাস্টাস এমন একটি বিছানা তৈরি করেন যেখানে কেউ শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হলে সোনার শেকলে আটকা পড়বে। আফ্রোদিতির প্রেমিক ছিলেন যুদ্ধের দেবতা অ্যারিস। অ্যারিস ও আফ্রোদিতির অনেক সন্তানও ছিল। একদিন হেফাস্টাসের তৈরি সেই বিছানায় আফ্রোদিতি ও অ্যারিস যৌনসম্পর্কে আবদ্ধ হলে তারা সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় শেকলে আটকা পড়েন। শেষপর্যন্ত সমুদ্রদেবতা পসাইডন তাদের এই অপ্রীতিকর অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন।
এছাড়াও আফ্রোদিতি আরো অনেক দেবতার সঙ্গে প্রেম ও শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন পসাইডন ও হার্মিস। শুধু দেবতাই নয়, মানুষের সঙ্গেও প্রেমের সম্পর্ক ছিল আফ্রোদিতির। অ্যাডোনিসসহ কয়েকজন মানুষের সঙ্গে তার প্রেম ছিল।

গ্রিক উপকথার সমুদ্রদেবতা পসাইডন ছিলেন আফ্রোদিতির প্রেমিক
ট্রোজান যুদ্ধের জন্য পরোক্ষভাবে হলেও আফ্রোদিতি অনেকাংশেই দায়ী ছিলেন। এই ঘটনার সূত্রপাত দেবতাদের এক বিয়েতে। দেবতা পেলেউস ও থেটিসের বিয়েতে ‘বিবাদের দেবী ইরিস’ একটি সোনার আপেল নিয়ে আসেন এবং সবচেয়ে সুন্দরী দেবীকে দেওয়ার কথা জানান। এই প্রতিযোগিতায় অ্যাথেনা, হেরা এবং আফ্রোদিতিই ছিলেন সবার শীর্ষে। দেবরাজ জিউসের আদেশে ট্রোজান রাজপুত্র প্যারিসের উপর এই প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্ব বর্তায়।
সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতি নিজেকে এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী নারী বলে বিশ্বাস করতেন। অন্য কেউ তার চেয়ে বেশি সুন্দরী হতে পারে এটা তিনি মানতেই পারতেন না। ফলে এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার জন্য তিনি উঠে-পড়ে লাগেন। আফ্রোদিতি প্যারিসকে বলেন, প্যারিস যদি তাকে সেরা সুন্দরী হিসেবে ঘোষণা দেয় তবে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে তার প্রেম করিয়ে দেবে। প্যারিসও এই প্রস্তাব ফেলতে পারেনি।

ট্রয়ের যুবরাজ প্যারিসকে স্বর্গের দেবীদের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার বিচারক করা হয়
সেই প্রতিযোগিতায় প্যারিস আফ্রোদিতিকে সেরা সুন্দরী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে দেবীও তার কথামতো স্পার্টার রানী হেলেনের সঙ্গে প্যারিসের প্রেম ঘটিয়ে দেন। হেলেন ছিলেন স্পার্টার রাজা মেনেলাওসের স্ত্রী। হেলেনের প্রেমে অন্ধ প্যারিস তখন তাকে নিয়ে নিজের শহর ট্রয়ে পালিয়ে আসেন। মেনেলাওস তার ভাই আগামেমননকে ট্রয় দখল করে হেলেনকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়। ফলস্বরূপ শুরু হয় ট্রয়ের যুদ্ধ।
গ্রিক উপাখ্যানের সৌন্দর্য ও ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতিকে নিয়ে যুগ যুগ ধরে বহু গল্প ও আখ্যান তৈরি হয়েছে। সেই প্রাচীন গ্রিস থেকে এখনো পর্যন্ত শিল্পী ও সাহিত্যিকরা আফ্রোদিতির রূপ নিয়ে মাতামাতি করেন। নিঃসন্দেহে আফ্রোদিতি গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেব-দেবীদের অন্যতম একজন। তিনি গ্রিক তথা পশ্চিমা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক চিত্তাকর্ষক চরিত্র।
সংক্ষেপে দেখুন