সাইন আপ করুন
লগিন করুন
রিসেট পাসওয়ার্ড
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? আপনার ইমেইল এড্রেস দিন। ইমেইলের মাধ্যমে আপনি নতুন পাসওয়ার্ড তৈরির লিংক পেয়ে যাবেন।
আপনি কেন মনে করছেন এই প্রশ্নটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই উত্তরটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই ব্যক্তিকে রিপোর্ট করা উচিৎ?
ইউনিকর্ন: উপকথার অলৌকিক আকর্ষণ। কোথায় উদ্ভব এর?
তাকে নিয়ে মানুষ যতটা বুঁদ হয়েছে ইতিহাস জুড়ে, অন্য কোনো প্রাণী নিয়ে ততটা হয়নি। বিভিন্ন সংস্কৃতির উপকথায় দুর্দান্ত সব আখ্যানের অন্যতম আকর্ষণ এটি। প্রাচীন গ্রীস থেকে ভারত, মেসোপটেমিয়া থেকে চীন- কোথায় আলোচিত হয়নি? এরিস্টটল, টিসিয়াস, প্লিনি, স্ট্র্যাবো কিংবা মার্কো পলোর মতো পণ্ডিতেরা পর্যন্ত তার অস্তিত্ববিস্তারিত পড়ুন
তাকে নিয়ে মানুষ যতটা বুঁদ হয়েছে ইতিহাস জুড়ে, অন্য কোনো প্রাণী নিয়ে ততটা হয়নি। বিভিন্ন সংস্কৃতির উপকথায় দুর্দান্ত সব আখ্যানের অন্যতম আকর্ষণ এটি। প্রাচীন গ্রীস থেকে ভারত, মেসোপটেমিয়া থেকে চীন- কোথায় আলোচিত হয়নি? এরিস্টটল, টিসিয়াস, প্লিনি, স্ট্র্যাবো কিংবা মার্কো পলোর মতো পণ্ডিতেরা পর্যন্ত তার অস্তিত্বের পক্ষে সাফাই গেয়ে গেছেন।

উপকথার অন্যতম নায়ক ইউনিকর্ন
ইউনিকর্ন, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পৌরাণিক প্রাণী। তার মধ্যে এমন অনেক গুণাবলি বিদ্যমান, যা যে কারো কাছে পরম মূল্যবান। তাদের গতি আলোর গতির সাথে তুলনীয়। সাধারণ সময়ে শান্ত ও পবিত্র হলেও প্রয়োজনে প্রচণ্ড বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী। শক্তিতে কোনো ইউনিকর্নকে আটক করা একেবারেই অসম্ভব।
মোটা দাগে ইউনিকর্ন
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মতামত দেওয়া হয়েছে ইউকর্নকে উপস্থাপন করার জন্য। খুব সাধারণ বর্ণনা মতে, সাদা বড় ঘোড়ার মতো দেখতে এরা। ঠিক কপালের মাঝখানটাতে আছে পেঁচানো লম্বা শিং, যার অগ্রভাগের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে উঠে গেছে। পৌরাণিক লেখকদের প্রথম দিকের লেখকেরা কেউ কেউ তাকে বেগুনী বর্ণের মাথার অধিকারী বলেছেন। কেউ বলেছেন, সিংহের লেজের মতো লেজের কথা। সেই সাথে ছাগলের দাঁড়ির মতো দাঁড়িও সংযুক্ত করা হয়েছে কারো বর্ণনায়। গ্রীক পণ্ডিত টিসিয়াস বলেছেন- প্রাণীটা গাধার মতো। যার লাল মাথা, নীল চোখ এবং সাদা শরীর। তিরিশ সেন্টিমিটার লম্বা শিংয়ের গোড়ায় সাদা, মাঝখানে কালো এবং ডগায় লাল। প্লিনির বর্ননা মতে, ইউনিকর্নের মাথা হরিণের ন্যায়। শূকরের লেজের মতো লেজ এবং শিং এক মিটার লম্বা।

ইউনিকর্নের ধারণায় তফাৎ ছিল যুগ ভেদে ও সংস্কৃতি ভেদে
তারপরেও একটা বিষয়ে প্রায় সবাই একমত। ইউনিকর্নের অলৌকিক ক্ষমতার জন্য মানুষ তাকে খুঁজেছে হন্যে হয়ে। অভিজাতরা তাদের আভিজাত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য কিংবা শত্রুর কুনজর থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য কৌতূহলী হয়ে উঠেছে তার শিং-এর আশায়। সামর্থহীনরাও প্রত্যাশা করেছে নিজেদের ভাগ্য উন্নোয়নে। গড়ে উঠেছে অন্যরকম এক ব্যবসা। যদিও প্রায়শ শিংগুলো হয় গণ্ডার ধাঁচের। কিন্তু তারপরেও তা অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি করেছে ভিন্নভাবে। জিনিসটার আশির্বাদ তখন ছিল স্বর্ণ কিংবা যেকোনো মূল্যবান পাথরের চেয়েও মূল্যবান।
চীনের ইউনিকর্ন
চীনা উপকথায় বিশেষ এক জন্তুর নাম কি-লিন। কি-লিনকে নেওয়া যায় চীনের ইউনিকর্ন হিসেবে। যদিও গ্রীক উপকথার কাইমেরার সাথেও কি-লিনের মিল বিদ্যমান। কি-লিনের শরীর দেখতে হরিণের মতো কিন্তু মাথাটা সিংহের। সবুজ আঁশ দিকে ঢাকা শরীর। একটা লম্বা শিং মাথার ঠিক মধ্যভাগে স্থিত। জাপানি উপকথায় কিরিন নামে যে জন্তুর ধারণা, তা চীনা কি-লিন থেকেই এসেছে বলে মনে করা হয়।

কি-লিন, চীনা উপকথার ইউনিকর্ন
কি-লিনকে শান্তিপ্রিয় এবং অলৌকিক হিসাবে গণ্য করা হয়। সে সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে যাবার সময় একটা পাতাও ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। তারপরেও তাদের যাতায়াত অধিকাংশ সময় মেঘ কিংবা পানির উপর দিয়ে। একটা মানুষ ভালো না খারাপ, তার দিকে তাকিয়েই বুঝে নিতে সক্ষম তারা। সাধারণ সময়ে শান্ত হলেও মন্দ লোকদের শাস্তি দেবার জন্য তারা নিজের অমেয় শক্তির প্রকাশ ঘটায়। ইউনিকর্নের মতোই তাকে উর্বরতা ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসাবে দেখা হয়। তারা শিল্পকলায় উঠে এসেছে নবদম্পতির জন্য সন্তান দানকারী হিসাবে।
আফ্রিকান সংস্কৃতি
কঙ্গো উপকথায় আবাদা নামে ইউনিকর্ন সদৃশ প্রাণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। আকারে গাধার মতো এবং শূকরের লেজের মতো লেজ বিদ্যমান। তবে একটি না, এদের শিং দুটি। এই শিং নানা রোগের প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করে। বিশেষ ভাবে তার শিং বিষের প্রতিষেধক হিসাবে সবথেকে ফলপ্রসূ। যেমনটা বর্ণনা করা হয়েছে ইউনিকর্নের ক্ষেত্রে।
দক্ষিণ আমেরিকা
চিলির উপকথায় ক্যামাহুয়েতো অনেকটা ইউনিকর্নের কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। একে বর্ণনা করা হয়েছে অনেকটা ষাঁড়ের মতো। ক্যামাহুয়েতোর শিং অজস্র রোগের প্রতিষেধক। এ কারণে তাদেরকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করতো মাচি বা চিকিৎসক শ্রেণি। ইউনিকর্নের মতো তারও একটা শিং। জন্তুটাকে প্রথমে ধরে এনে বন্দী করে রাখা হতো। তারপর খুব সতর্কতার সাথে শিং কেটে নেওয়া হতো। আলগোছে জায়গাটা বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হতো বনে। নপুংষকতা দূরীকরণে কিংবা বৃদ্ধ বয়সেও সন্তান জন্মদানে সক্ষমতা অর্জনের জন্য এই শিং ভূমিকা রাখতো বলে প্রচলিত ছিল।

দক্ষিণ আমেরিকার উপকথায় ক্যামাহুয়েতোর ছিল বিশেষ অবস্থান
ইউরোপীয় সংস্কার
ইউনিকর্নের ধারণা নানাভাবে প্রভাবিত করেছে ইউরোপীয় জীবনকে। এমনকি পরবর্তী খ্রিষ্টধর্মেও একে গ্রহণ করা হয়। সাদা ঘোড়ার মতো বড় প্রাণী। মাথার ঠিক মাঝখান থেকে উঠে গেছে দীর্ঘ শিং। ভাবা হতো, ইউনিকর্ন অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী। যেকোনো ধরনের রোগ থেকে মুক্তি, অপবিত্র পানিকে পবিত্রকরণ কিংবা ভয়াবহ বিষের প্রতিষেধক হিসাবে শিংকে ভেবে নেওয়া হয়েছিল প্রধান সমাধান। শিং দ্বারা নির্মিত কাপে পানি পান ছিল সীমাহীন উপকারের। আর তাই তার চাহিদাও ছিল আকাশচুম্বী। যেহেতু ইউনিকর্ন খুব পবিত্র ও নিষ্পাপ। শুধুমাত্র কুমারীই তাকে আবদ্ধ করতে পারবে।

ভিঞ্চির প্রথম দিকের খসড়ায় ইউরিকর্ন
ইতিহাসে ইউনিকর্ন
ইউনিকর্নের প্রথম প্রকাশ দেখা যায় গ্রীক চিকিৎসক ও ঐতিহাসিক টিসিয়াসের লেখায়। বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইন্ডিকা’য় তিনি তার অভিমত প্রকাশ করেন। ভারতের এই প্রাণী বুনো গাধার মতো। আলোর গতির মতো দ্রুত চলে। মাথার মাঝখান থেকে আটাশ ইঞ্চি লম্বা শিং তাকে অন্য জন্তু থেকে আলাদা করেছে। শিংগুলো সাদা, লাল কিংবা কালো হতে পারে।
টিসিয়াস খুব সম্ভবত তথ্যগুলো তৎকালীন পারস্য থেকে পান। জীবনের বেশ কিছু সময় তিনি পারস্যে কাটিয়েছেন। প্রায় কাছাকাছি বর্ণনা দেন এরিস্টটল। তার মতে,
এছাড়া স্ট্র্যাবো, প্লিনির মতো অন্য অনেকেই বর্ণনা করে গেছেন। প্রাচীন নগরী পার্সিপোলিসে ইউনিকর্নের ভাস্কর্য দেখেও তার প্রভাব অনুমেয়। কসমাস ইন্ডিকোপ্লেসটেস নামে আলেকজান্দ্রিয়ার এক ব্যবসায়ীর লেখা থেকেও বেশ তথ্য পাওয়া যায়। তিনি ভারত ও ইথিওপিয়া ভ্রমণ করেন। তার দাবি ছিল ইউনিকর্নের সমস্ত ক্ষমতা থাকে শিংয়ের মাঝে।

প্রাচীন পার্সিপোলিসের দেয়ালে ইউনিকর্ন
মার্কো পলোর বর্ণনা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও উল্লেখ করার মতো। তিনি খুব কাছ থেকে দেখার দাবি করেন। আকারে হাতির মতো। চুলগুলো অনেকটা মহিষের সাথে তুলনীয়। মাথার মধ্যখানে কালো শিং আছে। প্রাণীটা বেশিরভাগ সময় কাদাতে থাকতে পছন্দ করে। অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত মনে তিনি বলেছেন, বহুদিন থেকে শুনে আসা ইউনিকর্নের সাথে চোখে দেখার কত পার্থক্য। তার বর্ণনা থেকে মনে হয়, তিনি যে প্রাণীকে দেখে বিহ্বল হয়েছেন, তা আসলে গণ্ডার ছিল।
মধ্যযুগের বিবর্তন
মধ্যযুগে বিশেষ করে খ্রিষ্টধর্মের প্রভাবে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন ঘটলো ইউনিকর্নের ধারণায়। চার্চের নির্দেশনায় থাকা চিত্রকরেরা ফুটিয়ে তুললো ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে। ঠিক এই সময়েই কুমারী মেয়ের সংশ্লিষ্টতা আসে। প্রচলিত হতে থাকে নানা উপকথা। শিকারীরা যেহেতু কোনোভাবেই বন্দী করতে পারতো না। সুতরাং কোনো কুমারী মেয়েকে বুঝিয়ে গাছের নিচে বসিয়ে রাখা হতো। ইউনিকর্ন প্রশান্ত মনে কুমারীর কোলে মাথা রেখে বসতো। যখন ঘুমিয়ে পড়তো, তখন শিকারীরা চারপাশে ঘিরে ধরতো এবং আবদ্ধ করতো। ত্রয়োদশ ও চতু্র্দশ শতকে প্রচুর রোমান্টিক আখ্যান গড়ে উঠেছে ইউনিকর্নকে জড়িয়ে।

ইউকর্নের সাথে কুমারীর আখ্যান দারুণভাবে প্রচলিত হয় ইউরোপে
খ্রিষ্টিয় চার্চের আগ্রহ
চার্চ আগ্রহের সাথেই গ্রহণ করেছিল ইউনিকর্নের ধারণা। যীশু খ্রিষ্টের সাথে রূপকার্থে সংশ্লিষ্টতা খুঁজে বের করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য যীশুর অবতার হিসেবে। ইউনিকর্নের কুমারী মেয়ের নিকটবর্তী হওয়া যীশু খ্রিষ্টের কুমারী মা মেরীর নিকটবর্তী হওয়াকেই রূপকভাবে উপস্থাপন করে। এবং একারণেই কুমারীর কোলে ইউনিকর্নের ঘুমিয়ে পড়ার পেছনে যীশু খ্রিষ্টের ঘুমিয়ে পড়ার তাৎপর্য নিহিত। এমনটাই দাবি করতেন সে সময়কার প্রচারকেরা।

চার্চ ইউনিকর্নকে গ্রহণ করেছে যীশুর রূপক হিসাবে
অন্য একটি রূপক যীশুর জীবনের শেষের দিনগুলো। ইউনিকর্ন চাইলে শিকারীদের উচিৎ শিক্ষা দিতে পারে। সে শক্তি ও সক্ষমতা তার আছে। কিন্তু তা না করে সে কুমারীর কোলে গিয়ে ঘুমায়। তারপর শিকারীরা এসে তাকে বধ করে। যেন নিষ্পাপ জন্তুটা নিজেকে এক পবিত্র পন্থায় উৎসর্গ করে দিলো। অনুরূপ যীশু খ্রিষ্ট চাইলেই পাপীদের উচিৎ শিক্ষা দিতে পারতেন। অথচ তিনি প্রথমে কুমারী মেরির কোলে আসলেন। তারপর করলেন আত্মোৎসর্গ। এ থেকে অন্তত এটা স্পষ্ট যে, শুধুমাত্র উপকথাতে সীমাবদ্ধ না থেকে ইউনিকর্ন ধর্মের মূলেও একটা জায়গা করে ফেলেছিল।
সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
সত্যিই কি ইউনিকর্ন ছিল? যদি উপকথাই হয়ে থাকে তবে কীভাবে গড়ে উঠেছে এরকম একটা প্রাণীর ধারণা? বলা হয়, ইতিহাস পরিণত হয় কিংবদন্তিতে আর কিংবদন্তি পরিণত হয় উপকথায়। খুব সম্ভবত প্রাকৃতিক কিছু প্রাণীর ধারণা থেকে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইউনিকর্নের ধারণা জন্ম লাভ করেছে। আবার এটাও হতে পারে ঘোড়ার মতো, গাধার মত দেখতে এরকম প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিদ্যমান প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে যৌক্তিক অবস্থানে আছে গণ্ডার। তার বৈশিষ্ট্য এবং দেহের আকৃতিই শুধু না, মার্কো পলোর দাবি অনুযায়ী সেরকমই সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। গণ্ডারের অতিরঞ্জিত বর্ণনা থেকে ইউনিকর্নের জন্ম লাভ অসম্ভব না। এছাড়া ঔরক্স কিংবা নাওয়েলের মতো কিছু প্রাণী বিশেষত ইউরোপে ইউনিকর্নের উপকথার পেছনে প্রভাবক হতে পারে।

সংক্ষেপে দেখুনগণ্ডার কিংবা নাওয়েল অনেকের কাছেই ইউনিকর্ন সৃষ্টির অনুপ্রেরণা
সে যা-ই হোক, সত্য কিংবা মিথ্যার মাপকাঠি দিয়ে উপকথা বিচার করা যায় না। বিচার করতে হয় তার প্রভাব দিয়ে। ইউনিকর্ন যে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের বহু সংস্কৃতিকে অণুরিত করেছে, সেখানেই তার সফলতা।
বান্দরবানের বগা লেকের ড্রাগন: গল্প নাকি সত্যি?
রাগত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক উড়ছে আর ক্ষণে ক্ষণে মুখ থেকে আগুনের হলকা বের করছে- ড্রাগনকে তো এই রূপেই চিনি আমরা। যুগে যুগে ড্রাগন নিয়ে কম মিথের সৃষ্টি হয়নি, যদিও আদৌ তাদের অস্তিত্ব ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্কেরও কোনো কমতি নেই। একদিকে পৃথিবীর বুকে তাদের বিচরণের ইতিহাস প্রমাণের জন্য আজও নিরলসভাবে খেটে চলেছেন ইতিবিস্তারিত পড়ুন
রাগত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক উড়ছে আর ক্ষণে ক্ষণে মুখ থেকে আগুনের হলকা বের করছে- ড্রাগনকে তো এই রূপেই চিনি আমরা। যুগে যুগে ড্রাগন নিয়ে কম মিথের সৃষ্টি হয়নি, যদিও আদৌ তাদের অস্তিত্ব ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্কেরও কোনো কমতি নেই। একদিকে পৃথিবীর বুকে তাদের বিচরণের ইতিহাস প্রমাণের জন্য আজও নিরলসভাবে খেটে চলেছেন ইতিহাসবেত্তারা, অপরদিকে নিত্যনতুন মুখরোচক সব গল্পের ঝুলি ভর্তি হচ্ছে মানুষের মুখে মুখে। সে যা-ই হোক, ড্রাগনের কথা আমরা সাধারণত চীন, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার উপকথায় পেয়ে থাকলেও মজার বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের বগা লেককে ঘিরেই রয়েছে একটি ড্রাগন মিথ। চলুন তবে জেনে আসা যাক বান্দরবানের বগা লেকের সাথে ড্রাগনের সম্পর্কটা আসলে কোথায়?
সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি বান্দরবান আর সেখানকার প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি বগা লেক, দ্য লেক অফ মিস্ট্রি বা ড্রাগন লেক নামেও সুপরিচিত এটি। যুগে যুগে অভিযাত্রিকদের তা আকৃষ্ট করেছে দুর্নিবারভাবে। বগা লেকের আসল নাম ‘বগাকাইন হ্রদ’, যা স্থানীয়ভাবে ‘বগা লেক’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির একটি হ্রদ এটি। কেওক্রাডং পর্বতের গা ঘেঁষে, বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে বগা লেকের অবস্থান। প্রশাসনিক হিসেবে হ্রদটি রুমা উপজেলায় পড়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৪০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত লেকটি। ফানেল বা চোঙাকৃতির আরেকটি ছোট পাহাড়ের চুড়ায় বগা লেকের অদ্ভুত গঠন অনেকটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের কথা মনে করিয়ে দেয়।
হতে পারে এই সেই বগা!
আজ থেকে প্রায় ২,০০০ বছর আগে উৎপত্তি হয় বগা লেকের। এর উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত আছে বেশ কিছু মিথ। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত গল্পটি অনেকটা এরকম।
অনেক অনেক দিন আগে বান্দরবানে একটি চোঙাকৃতির পাহাড় ছিল। তখনকার বান্দরবান আর এখনকার বান্দরবানের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক বিদ্যমান। সে সময় বান্দরবান মানেই ছিল দুর্গম পাহাড়ে ঘেরা ঘন অরণ্যের বসতি। সে পাহাড়ের আদিম কোলে বাস করত আদিবাসীর দল। ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা সহ আরও বেশ কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়ের আবাস ছিল সেথায়। হঠাৎ করে সেসব গ্রাম থেকে হারিয়ে যেতে থাকে গবাদিপশু থেকে শুরু করে ছোট ছোট বাচ্চারাও।
দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে গ্রামপ্রধান, সাধারণ মানুষ সবাই। খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেল, বাচ্চাগুলোর কিংবা গবাদিপশুর সর্বশেষ পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে ঐ চোঙা আকৃতির পাহাড়ে। সবাই ধারণা করতে শুরু করলো, অতিপ্রাকৃত কিছু একটি বাসা বেঁধেছে রহস্যময় ঐ পাহাড়ের কোলে, তারই আক্রমণের শিকার হচ্ছে নিরীহ এই প্রাণী আর বাচ্চারা। আসল রহস্য উদঘাটন করতে এগিয়ে আসে গ্রামের একদল সাহসী পুরুষ। তারা চোঙা আকৃতির পাহাড়ের মাথায় উঠে দেখে, সেখানে বসে আছে বিশাল এক ড্রাগন। তাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না এই ড্রাগনের খপ্পরেই পড়েছে এতোগুলো প্রাণী!
ড্রাগনের উপস্থিতি নিয়ে অবশ্য ভিন্ন একটি মত প্রচলিত আছে। সেই মতানুসারে, বর্তমানে যেখানে বগা লেক অবস্থিত, সেখানে একদিন আকাশ থেকে নেমে আসে আজব এক প্রাণী। এমন কোনো প্রাণী যে পৃথিবীতে থাকতে পারে, স্থানীয়রা তা কল্পনাও করতে পারেনি। বিশাল পাখাওয়ালা সেই প্রাণী যখন-তখন আগুনের হলকা বের করে ধ্বংস করে দিতে থাকে তাদের ঘরবাড়ি। প্রচণ্ড ঘাবড়ে যায় তারা। কী করে এই উদ্ভট জীবটিকে খুশি করা যাবে, সে উপায় খুঁজতে থাকে গ্রামবাসী। ইতোমধ্যে ড্রাগনটি চোঙা আকৃতির ঐ গুহায় নিজের আস্তানা বানিয়ে নেয়। এলাকার লোকজন তার নাম দেয় ‘বগা’। বগাকে খুশি করতে নিয়মিত বিভিন্ন জীবজন্তু ধরে নিয়ে উপঢৌকন হিসেবে পরিবেশন করতে থাকে তারা। বেশ নিরুপদ্রবভাবেই দিন কাটতে থাকে সবার।
এমনই কোনো এক আগুনের হলকায় হয়তো সৃষ্টি হয় বগা লেক
এর মধ্যে হঠাৎ করে গ্রামের শিশুরা নিখোঁজ হতে থাকে একের পর এক। শুরুতে এক সম্প্রদায়ের মানুষ অন্য সম্প্রদায়কে দোষারোপ করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তারা টের পায়, এটি কোনো নির্দিষ্ট গোত্রের সাথে নয়, বরং সবার সাথেই ঘটছে। এবার সবার সন্দেহের তীর এসে পড়ে বগার দিকে। বগাকে উৎখাত করতে না পারলে বাঁচানো যাবে না শিশুদের, এটুকু বুঝতে কারো বাকি থাকে না। কাজেই প্রতিটি গোত্র থেকে বেছে বেছে সাহসী জওয়ানদের নিয়ে গঠন করা হলো একটা দল। যুদ্ধ করেই হোক আর নিজের জীবন বাজি ধরে ড্রাগনের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়েই হোক- শিশুদের তারা উদ্ধার করে আনবেই এই ব্রত নিয়ে বেরিয়ে গেল যোদ্ধারা।
তীর, ধনুক, বল্লম, লাঠি আর মশাল হাতে নিয়ে রাতের অন্ধকারে তারা হানা দিল বগার গুহায়। গুহার মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মানুষের রক্ত আর হাড়গোড় দেখে তারা বুঝে নিল কী ঘটেছে এখানে। ক্ষেপে গিয়ে একসঙ্গে ঘুমন্ত বগার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল যুবকরা। কোনো জাদুবিদ্যা দেখানো বা আগুনের ফোয়ারা ছোটানোর আগেই বগাকে কুপোকাত করে ফেললো সবাই মিলে। এতজন যোদ্ধার সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে কোনোমতে গা ঝাড়া দিয়ে পালানোর রাস্তা খুঁজতে লাগলো সে। যে রথে করে একদিন তার উদয় হয় বগা লেকের পাড়ে, সেই রথে উঠে পালানোর চেষ্টা করল বগা। কিন্তু গ্রামের ক্ষিপ্ত যুবকরা বগার রথে আগুন ধরিয়ে দিল।
যোদ্ধাদের ধরিয়ে দেয়া সে আগুনে পুড়ে মরল বগা। তবে তার আগে শেষবারের মতো মুখ থেকে আগুনের ফোয়ারা ছুটাল সে। সেই আগুনের তাপে আর প্রচণ্ড বিস্ফোরণে থর থর করে কেঁপে উঠল চোঙা আকৃতির পাহাড় আর বগার তৈরি করা গুহা। ভেঙে পড়তে শুরু করলো পাহাড়, তৈরি হলো বিশাল এক গর্ত। এই গর্তটিই বর্তমানে বগা লেক হিসেবে পরিচিত, যার অপর নাম ড্রাগন হ্রদ।
কে বলবে শান্ত এই নিরিবিলি হ্রদে এক সময় ড্রাগন ছিল?
এ ব্যাপারে তৃতীয় যে মতটি প্রচলিত রয়েছে, তা অনেকটা এরকম।
আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে বান্দরবান অঞ্চলে বসবাস করতো খুমী নামক আদিবাসী একটি গোত্র। অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীর মতো তাদেরও নিজস্ব কিছু প্রাচীন দেবতা ছিল। আঞ্চলিক উপকথা অনুযায়ী, এই দেবতাদের মধ্যে একজন স্থানীয়দের উপর রেগে গিয়ে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তিনি একটি ড্রাগনের রূপ ধারণ করেন এবং পূজারীদের ধরে ধরে খাওয়া শুরু করেন। ড্রাগনরূপী সে দেবতা এক পর্যায়ে খুব জোরে হুংকার ছাড়েন, আর তার ফলে একটি অবিশ্বাস্য ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। এই ভূমিকম্পের কারণেই যেখানে গরীব গ্রামবাসীরা বসবাস করত, সেখানে তৈরি হয় একটি হ্রদ। এই হ্রদটিই যে বগা লেক, তা বলাই বাহুল্য! অচিরেই বৃষ্টির পানিতে ভরে ওঠে গর্তটি। এরপর থেকে বাইরের কোনো সাহায্য পাওয়া না গেলেও, এই লেকের পানি কখনো শুকায়নি। প্রতি বসন্তে হ্রদের স্বচ্ছ পানি ঘোলা হয়ে যায় আর রঙ পরিবর্তন করতে থাকে। এই ঘটনা আদিবাসীদের বিশ্বাসকে আরো বদ্ধমূল করে তোলে আর তার সাথে সাথে আরো নানা ধরনের উপকথার জন্ম দেয়।
উৎপত্তিগত দিক থেকে, বগা শব্দটি নেয়া হয়েছে ‘বাগা’ থেকে। বাগা অর্থ রাগান্বিত ড্রাগন। এবার আসা যাক বগা লেকের উৎপত্তি সম্পর্কে ভূতাত্ত্বিকেরা কী বলছেন, সে প্রসঙ্গে। তাদের মতে, হয় মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ নয়তো মহাশূন্য থেকে উল্কাপিণ্ডের পতনের কারণে সৃষ্টি হয়েছে বগা লেক। এর পানি অম্লধর্মী। কোনো জলজ প্রাণীর পক্ষে এখানে বেঁচে থাকা সম্ভব না। বাইরের কোনো পানি এখানে ঢুকতেও পারে না, আবার এর আশপাশে পানির কোনো দৃশ্যমান উৎসও নেই। কাজেই আশেপাশে পানির কোন উৎস না থাকলেও এই বিশাল জলরাশি কীভাবে সৃষ্টি হলো, তা এক রহস্যই বটে। তবে তারচেয়েও বড় রহস্য হচ্ছে বগা লেকের পানির রঙ পরিবর্তন। প্রতি বছর অদ্ভুত কোনো এক কারণে বগা লেকের পানির রঙ কয়েকবার পাল্টায়।
শান্ত-স্নিগ্ধ বগা লেক
অলৌকিক সৌন্দর্যের বগা লেক নিয়ে রয়েছে অজস্র রহস্য। এর আশেপাশে কোনো ঝর্ণা না থাকলেও, লেকের মতোই চারপাশের অন্যান্য জলাশয়ের পানির রঙেও দেখা দেয় একই পরিবর্তন। এর বেশ কিছু সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, লেকটির তলদেশে একটি উষ্ণ ঝর্ণা রয়েছে। ঝর্ণা থেকে যখন পানি বের হয়, তখনই হ্রদের পানির রঙ বদলে যায়। আবার পাহাড়িদের মধ্যে প্রচলিত ড্রাগন বা আগুনের মিথ অনুযায়ী অনেকেই একে মৃত আগ্নেয়গিরি বলে সন্দেহ করেন। এই মৃত আগ্নেয়গিরির প্রভাবেও লেকের পানির রঙে পরিবর্তন আসতে পারে। ঝর্ণা বা লেক কোনোটার গভীরতাই এখনো পর্যন্ত নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের মতে গভীরতা ২০০-২৫০ ফুট হলেও ইকো মিটারে ১৫১ ফুট পর্যন্ত গভীরতার হদিস পাওয়া গেছে।
অনেকেই ভাবতে পারেন এগুলো নিছকই গল্প। তবে যাহা রটে তাহার কিছু তো বটে! কাপ্তাই হ্রদ, মহামায়া হ্রদ, ফয়েজ লেক আরও কত হ্রদ তো আছে, কোনোটি নিয়েই তো এমন কাহিনীর প্রচলন নেই। সত্যিটা জানার তো আর কোনো উপায় নেই, আপাতত নাহয় বহুল প্রচলিত এই মিথগুলোই জানা থাকুক আমাদের সবার।
সংক্ষেপে দেখুনবিশাল সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ : সৌভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্যের প্রতীক?
অ্যালবাট্রোজ Diomedeidae গোত্রের অন্তর্গত একপ্রকার সামুদ্রিক পাখি, যা মূলত অ্যান্টার্কটিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরের আশেপাশে পাওয়া যায়। প্রাচীনকাল থেকে নাবিকদের মধ্যে এই পাখি নিয়ে রয়েছে নানা রকম বিশ্বাস। কারো মতে- এই পাখি সৌভাগ্যের বাহক, কেউ বা ভাবত ঘোর বিপদের চিহ্ন হিসেবে। কেন এমন ভাবনা তবিস্তারিত পড়ুন
অ্যালবাট্রোজ Diomedeidae গোত্রের অন্তর্গত একপ্রকার সামুদ্রিক পাখি, যা মূলত অ্যান্টার্কটিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরের আশেপাশে পাওয়া যায়। প্রাচীনকাল থেকে নাবিকদের মধ্যে এই পাখি নিয়ে রয়েছে নানা রকম বিশ্বাস। কারো মতে- এই পাখি সৌভাগ্যের বাহক, কেউ বা ভাবত ঘোর বিপদের চিহ্ন হিসেবে। কেন এমন ভাবনা তৈরি হলো? আসলেই কি ভাগ্যের সাথে এর কোনো সম্পর্ক আছে? এ ব্যাপারে জানার আগে অ্যালবাট্রোজ নিয়ে সাধারণ কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক।
দৈত্যাকার এই পাখিকে মনে করা হয় মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ ভ্রমণকারী। এরা শত শত মাইল একটানা উড়ে পাড়ি দিতে পারে। জীবনের বেশিরভাগ সময় এরা আকাশেই ব্যয় করে, প্রজননের সময় ভূমিতে নেমে আসে। এর বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে এর বিশালাকার ডানার কথা। একেকটি ডানা প্রায় ১২ ফুট পর্যন্ত লম্বা। এরা স্কুইড, মাছ, কাঁকড়া এবং আরো কিছু জলজ প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। এখন পর্যন্ত এর মোট ২২টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি প্রজাতি বিলুপ্তির পথে এবং আরো কয়েকটি সংকটাপন্ন। অ্যালবাট্রোজ বছরে কেবল একটি ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা বেরোয়, এবং আরো তিন সপ্তাহ বাবা-মা ছানার দেখভাল করে। প্রায় ৩-১০ মাসের মধ্যে বাচ্চাগুলো উড়তে শিখে যায়, এবং একসময় বাসা ছেড়ে উড়ে চলে যায়।



বাচ্চাসহ অ্যালবাট্রোজ
এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা সবচেয়ে বয়স্ক পাখিটিও একটি অ্যালবাট্রোজ। ৭০ বছর বয়স্ক পাখিটির নাম উইসডম। ১৯৫৬ সালে প্রাণীবিদ Chandler Robbins এর পায়ে রিং পরান। পাখিটি তার জীবদ্দশায় প্রায় সাত লক্ষ মাইলের মতো সামুদ্রিক পথ পাড়ি দিয়েছে, এবং বর্তমানে তীরে ফিরে এসেছে ডিম পাড়ার জন্য। রিং পরানোর পর প্রায় ৪০ বার ডিম পেড়েছে পৃথিবীর বয়স্কতম এই পাখি, যার সর্বশেষ ডিমটি পেড়েছে ২০২১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি ।
উইসডম
অ্যালবাট্রোজ সম্পর্কে প্রচলিত একটি প্রবাদ হচ্ছে- ‘An albatross around your neck’ , যা মূলত ভয়ানক দুর্ভাগ্য বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। অ্যালবাট্রোজ মূলত একটি সামুদ্রিক পাখি, যাকে প্রাচীনকালে নাবিকরা সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করত। তখন বেশিরভাগ নাবিক ছিল কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তারা বিশ্বাস করত- অ্যালবাট্রোজ মৃত নাবিকদের আত্মা ধারণ করে এবং জাহাজগুলোকে যেকোনো দুর্ভাগ্য থেকে রক্ষা করে। কিছু নাবিক আবার একে দুর্ভাগ্যের প্রতীকও মনে করত। তারা ভাবত- অ্যালবাট্রোজ জাহাজের পিছু নেয়া মানে কোনো না কোনো নাবিকের মৃত্যু হওয়া। সৌভাগ্য হোক বা দুর্ভাগ্য, অ্যালবাট্রোজ হত্যা করা ছিল নিষিদ্ধ। সবাই বিশ্বাস করত- অ্যালবাট্রোজকে হত্যা করলে জাহাজের ওপর অভিশাপ নেমে আসবে। ব্রিটিশ লেখক স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের কবিতা ‘The Rime of the Ancient Mariner’ অ্যালবাট্রোজের সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্যের দিক একইসাথে তুলে ধরে।
স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ
কবিতার শুরুতে এক বৃদ্ধ নাবিক একজন যুবককে ডাকে তার গল্প শোনানোর জন্য। যুবকটি একটি বিয়ের দাওয়াতে যাচ্ছিল। মাঝপথে বৃদ্ধ নাবিক তার পথ আটকে ফেলে। শুরুতে শুনতে না চাইলেও নাবিকের উজ্জ্বল চোখ দেখে যুবকটি আর না করতে পারেনা। লেখকের ভাষায়,
বৃদ্ধ নাবিক তার কোনো এক সমুদ্রযাত্রার গল্প শুরু করে। সেই যাত্রায় শুরুতে সমুদ্র ছিল শান্ত। আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল এবং আবহাওয়া একদম অনুকূলে ছিল। হঠাৎ করে প্রকৃতি উত্তাল হয়ে ওঠে। সমুদ্রে দৈত্যাকার একটি ঝড় ওঠে, আর জাহাজটি তার পথ থেকে দক্ষিণ দিকে সরে যায়। ঝড়ের কবলে পড়ে তারা কুয়াশা আর বরফে ঢাকা সমুদ্রের মধ্যে গিয়ে আটকা পড়ে।

শিল্পীর তুলিতে ঝড়ের কবলে পড়া জাহাজ
তখনই একটি অ্যালবাট্রোজ জাহাজের চারপাশে উড়তে শুরু করে। নাবিকরা একে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে খুশি হয়ে ওঠে। পাখিটিকে নাবিকরা খাবার দেয়া শুরু করে, একইসাথে বরফ কেটে এগিয়ে চলে জাহাজ। কিন্তু কুয়াশা তখনো কেটে যায়নি। এর মধ্যে একদিন বৃদ্ধ নাবিকটি তার ক্রস বো দিয়ে পাখিটিকে মেরে ফেলে। প্রথমে নাবিকরা ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে এমন কান্ডের জন্য। কিন্তু পাখিটিকে মেরে ফেলার পরপরই দেখা যায় আবহাওয়া ভাল হতে শুরু করে এবং কুয়াশা কেটে যায়। এতে নাবিকরা আবার তাকে বাহবা দিতে থাকে।
এরপর একদিন বাতাস থেমে যায়। জাহাজের পালে বাতাস না থাকায় সমুদ্রে আটকা পড়ে নাবিকেরা। দিনের পর দিন তারা সমুদ্রের বুকে ভেসে বেড়ায়। তাদের পানীয় জল শেষ হয়ে যায়। চারপাশে পানি থাকা সত্ত্বেও পান করার মতো এক ফোঁটা পানি থাকে না। লেখকের বর্ণনার এই অংশটুকু অনেকেরই চেনা।
নাবিকেরা তাদের দুর্দশার জন্য অ্যালবাট্রোজের হত্যাকারীকে দায়ী করে। তাকে বার বার অভিশাপ দেয় এবং তার গলায় মৃত অ্যালবাট্রোজটি ঝুলিয়ে দেয়। এখান থেকেই ‘An albatross around your neck’ প্রবাদের উৎপত্তি।

বৃদ্ধ নাবিকের গলায় মৃত পাখিটি ঝোলানো হয়
তখন পশ্চিম দিক থেকে একটি জাহাজকে তাদের দিকে আসতে দেখা যায়। জাহাজ নিকটবর্তী হবার পর দেখা গেল তা ছিল জীবন-মৃত্যুর জাহাজ। জাহাজের মধ্যে নাবিকদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা হচ্ছিল। খেলায় সিদ্ধান্ত হয় সকল নাবিককে মৃত্যু দেয়া হবে এবং যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করা হবে। কিন্তু পাখি হত্যাকারী বৃদ্ধ নাবিককে বাঁচিয়ে রাখা হবে। বেঁচে থাকাই হবে তার জন্য শাস্তি। একে একে জাহাজের সকলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বেঁচে থাকে শুধু সেই বৃদ্ধ নাবিক, গলায় ঝোলানো মৃত অ্যালবাট্রোজ নিয়ে। চারপাশের মৃত চোখগুলো যেন তাকে অভিশাপ দিচ্ছিল, আশেপাশে অদ্ভুত সব জীব ভেসে বেড়াচ্ছিল, দুর্বিষহ এক জীবন নিয়ে নাবিক ভেসে বেড়ায় সমুদ্রে।
এরপর একদিন জাহাজের পাশে কিছু সাপ ভেসে বেড়াতে দেখে নাবিক। কোনো অজানা কারণে সাপগুলোর প্রতি তার মনে ভালবাসা জন্মায়, এবং পাপের চিহ্ন মৃত অ্যালবাট্রোজ তার গলা থেকে খুলে পড়ে। শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে নাবিক তার জন্মভূমিতে ফিরে আসে। পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তার এই ঘটনা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালবাসার মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করা সম্ভব- এই বাণী সকলের কাছে পৌঁছে দেয়।
প্রকৃতপক্ষে, ভাগ্যের সাথে পাখির সম্পৃক্ততা কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রাচীনকাল থেকে নাবিকদের মুখে মুখে চলে আসা মিথগুলো থেকে ‘অ্যালবাট্রোজ সৌভাগ্যের প্রতীক’ এই চিন্তার উৎপত্তি। লেখক স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের কবিতায় পাখির সাথে সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যের সম্পর্ক ছাপিয়ে স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালবাসার বার্তাই ফুটে উঠেছে।
সংক্ষেপে দেখুনমূর্খ কালিদাস কিভাবে মহাকবি হলেন?
বাংলা ভাষার প্রধান উৎস হচ্ছে সংস্কৃত ভাষা। আরও সহজভাবে বললে সংস্কৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি। আর সেই সংস্কৃত ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হলেন মহাকবি কালিদাস। প্রাচীন ভারতেরও তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। এটাই কালিদাস পণ্ডিতের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তবে আমাদের সাথে কালিদাস পণ্ডিতের পরিচয়টা হয়ত ঘটেছে অন্যভাবে। আর সবিস্তারিত পড়ুন
বাংলা ভাষার প্রধান উৎস হচ্ছে সংস্কৃত ভাষা। আরও সহজভাবে বললে সংস্কৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি। আর সেই সংস্কৃত ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হলেন মহাকবি কালিদাস। প্রাচীন ভারতেরও তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। এটাই কালিদাস পণ্ডিতের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তবে আমাদের সাথে কালিদাস পণ্ডিতের পরিচয়টা হয়ত ঘটেছে অন্যভাবে। আর সেটা হচ্ছে ‘ধাঁধাঁ’।
বর্তমানে ধাঁধাঁর প্রচলন কমে গেলেও আমাদের বাল্যকাল কেটেছে মজার মজার ধাঁধাঁর খেলায়। আর কালিদাসের ধাঁধাঁ ছাড়া যেন ধাঁধাঁর আসর জমতোই না। যেমন, কালিদাস পণ্ডিতে কয় বাল্যকালের কথা/ নয় হাজার তেঁতুল গাছে কয় হাজার পাতা? কিংবা, কালিদাস পন্ডিতের ফাঁকি/ আড়াইশ থেকে পাঁচ পঞ্চাশ গেলে/ আর কত থাকে বাকী? যদিও এসব ধাঁধাঁ আদৌ কালিদাস পণ্ডিতের কিনা তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ আছে, তবে এতটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তিনি প্রতিভাধর ছিলেন বিধায়ই তার নামে এসব ধাঁধাঁ প্রচলিত হয়ে আসছে।

কালিদাসের উপমা আর যুক্তিতে মুহ্যমান হয়ে এভাবেই তাকে কুর্নিশ করতেন সবাই
কালিদাসের জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না, মানে ইতিহাসবিদগণ তার জন্ম সম্পর্কিত তথ্যের ব্যাপারে কোনো ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেননি। তার জন্মস্থান এবং জন্ম সন নিয়ে নানা মতামত প্রচলিত আছে। এজন্য আমরা ইতিহাসবিদদের অভিযুক্ত না করে বরং স্বয়ং কালিদাসকেই অভিযুক্ত করতে পারি! এত এত কবিতা লিখে গেলেন, অথচ একটি বইয়ের পেছনে নিজের জন্মবৃত্তান্তটা একটু লিখে যেতে পারলেন না? হা হা, আজকাল লেখকরা তো নিজের পরিচয়টা নিজেই লিখে দেন বইয়ের পেছনে!
কালিদাসের মতো একজন মহাকবির জন্ম-মৃত্যু কিংবা জন্মভূমি সম্পর্কে জানার শখ হয়তো রবীন্দ্রনাথেরও ছিল। এজন্যই রবীন্দ্রনাথ তার ক্ষণিকা কাব্যের সেকাল কবিতায় লিখেছেন-
হারিয়ে গেছে সে-সব অব্দ, ইতিবৃত্ত আছে স্তব্ধ-
হায় রে গেল সঙ্গে তারি সেদিনের সেই পৌরনারী
কালিদাস কবে জন্মেছেন আর কোথায় জন্মেছেন তা নিয়ে দেশি-বিদেশি গবেষকরা অসংখ্য বই লিখেছেন। একেকজনের একেক রকমের দাবী! কেউ বলেছেন, যিশুখ্রিস্টের জন্মের অনেক আগেই কালিদাসের জন্ম হয়েছে। তাদের মতে, কালিদাসের ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম’ গ্রন্থের নায়ক অগ্নিমিত্র ছিল শুঙ্গ বংশীয় রাজা, বাস্তবে এ রাজার শাসনামল ছিল যিশুখ্রিস্টের জন্মের অনেক আগে, আর এই নাটকটি অগ্নিমিত্রের জীবদ্দশায়ই রচিত হয়েছিল, তাই কালিদাসের জন্য অবশ্যই যিশুখ্রিস্টের জন্মের আগে।

কালিদাসের ভাস্কর্য
আবার কেউ কেউ বলেছেন, না, যিশুখ্রিস্টের জন্মের অনেক পরে কালিদাসের জন্ম। তাদের মতে, কালিদাসের জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টীয় চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি। কেননা, কালিদাস বিক্রমাদিত্য নামে পরিচিত এক গুপ্ত সম্রাটের সভাকবি ছিলেন। কালিদাসের অনেক রচনায় চন্দ্রগুপ্তের রাজ্য, রাজধানী উজ্জয়িনী ও রাজসভার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানেও সমস্যা হচ্ছে, ‘বিক্রমাদিত্য’ নাম দ্বারা আসলে সুনির্দিষ্ট কিছু বোঝার উপায় নেই। ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসে অন্তত ছয়জন রাজা ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধি ধারণ করে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। ফলে, আমাদের জন্য কালিদাস সম্বন্ধীয় বিক্রমাদিত্যকে খুঁজে বের করাও বেশ কঠিন কাজ। তবে অধিক প্রচলিত মত হচ্ছে, গুপ্ত সাম্রাজ্যের সর্বাধিক খ্যাতিমান নৃপতি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, যার উপাধি ছিল ‘বিক্রমাদিত্য’, তার সভাকবি ছিলেন কালিদাস। আর এই রাজার রাজত্বকাল ছিল ৩৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪১৪ খ্রিস্টাব্দ। তারপরেও মূল কথা হচ্ছে, কালিদাস কবে জন্মেছিলেন সেই তথ্য কেউই সঠিক ভাবে বলতে পারবে না। তাই আমরা সেসব তর্ক থেকে নাহয় দূরেই থাকলাম।
জন্মসালের মতো তার জন্মস্থান নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, উজ্জয়িনী। সেকালে মালব রাজ্যের রাজধানী ছিল, যা এখন মধ্যপ্রদেশের একটি জেলা ও শহর। আবার অনেক গবেষকের মতে, বিদিশা, আধুনিককালে যার নামকরণ করা হয়েছে ভিলশা, এটিও মধ্যপ্রদেশের একটি শহর। আবার কেউ বলেন, দেবগিরি পাহাড়ের কাছে দশোর গ্রামে কালিদাসের জন্ম। কেউ কেউ বলেন, বিদর্ভ, যা এখন ‘বেয়ার’ বলে সকলে চেনে, এটিও এখন মহারাষ্ট্রের একটি প্রদেশ। আবার সংস্কৃত গবেষক লক্ষ্মী ধর কল্লার মতে, তিনি কাশ্মীরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে এসব তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কালিদাস জন্মেছিলেন ভারতের কোনো এক জায়গায়। এছাড়া এর পেছনে আরেকটি যুক্তি দেয়া যেতে পারে কালিদাসের কাব্যের ভেতর থেকেই; তা হলো, কালিদাস অন্ততপক্ষে চার বার ভারত পরিভ্রমণ করেছিলেন এবং কখনো একই পথে দ্বিতীয়বার যাননি। সব মিলিয়ে এ ধারণায় উপনীত হওয়া যায় যে, মধ্যপ্রদেশ বা এর আশেপাশে তার জন্ম হয়েছিল।
তবে মজার ব্যাপার হলো কালিদাস বাস্তবে একজন অশিক্ষিত-মূর্খ মানুষ ছিলেন। নিজের স্ত্রীও তার বোকামি নিয়ে হাসি-তামাশা করত। রাগে ক্ষোভে তিনি একবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। কথিত আছে, এমতাবস্থায় তিনিও দস্যু রত্নাকরের মতো ‘কালি দেবী’র মতান্তরে সরস্বতীর আশীর্বাদ পেয়েছিলেন। এতেই মূর্খ কালিদাস হয়ে উঠলেন মহাকবি কালিদাস!
ছোটবেলায় বাবা-মা হারান কালিদাস। সর্বহারা শিশু কালিদাসের লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাখাল গোত্রের লোকজন। রাখালদের কাছে লালিত-পালিত হওয়ায় কালিদাসের লেখাপড়ার কোনো সুযোগ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু তিনি দেখতে-শুনতে ছিলেন খুবই সুদর্শন। এতটাই সুদর্শন ছিলেন যে তাকে রাজপুত্রের মতো লাগত। আর সে কারণেই তার বিয়ে হয় এক সুন্দরী রাজকন্যার সঙ্গে। এ বিয়ে নিয়েও একটি মজার ঘটনা প্রচলিত আছে। কথিত আছে, উক্ত রাজকন্য নাকি রাজার খুবই অবাধ্য ছিলেন, তাই মন্ত্রীর পরামর্শে রাজা তার কন্যাকে শায়েস্তা করার জন্য কালিদাসের সাথে বিবাহ দিয়ে দেন।
রাজপুত্রের মতো চেহারা থাকলেও বাস্তবে কালিদাস ছিলেন লেখাপড়া না জানা এক মূর্খ যুবক। নিজের ভাল-মন্দ বিচার করার মতো ক্ষমতাও ছিল না তার। একদিন কিছু লাকড়ির দরকার হলে কালিদাস গাছে উঠে গাছের যে ডালে বসে আছেন সেই ডালটিই কাটতে শুরু করলেন। উক্ত গাছের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় এক পথিক কালিদাসের এমন বোকামি দেখে তাকে ডাল কাটার সঠিক উপায় বলে দিলেন, কিন্তু কালিদাস এতটাই মূর্খ ছিলেন যে, ঐ পথিকের পরামর্শও তিনি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। ডাল কাটতে গিয়ে ডালের সাথে কালিদাস নিজেও মাটিতে পড়ে আহত হন। বোকামির এমন সংবাদ সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

মূর্খ কালিদাসের ডাল কাটার দৃশ্য
এমনিতেই বোকামির জন্য কালিদাস প্রতিদিন স্ত্রীর কাছে বকা-ঝকা শুনতেন। ডাল কাটার বোকামি যেন তা আরও উস্কে দিল। স্ত্রীর এমন ব্যবহারে কালিদাস একদিন রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে, অপমানে ঘর থেকে বের হয়ে আত্মহত্যা করার জন্য নদীতে ঝাপ দিলেন। কিন্তু তিনি সেখানেও ব্যার্থ। নদী থেকে তাকে উদ্ধার করলেন দেবী কালি, আর সেই কৃতজ্ঞতায় তিনি হয়ে গেলেন দেবীর ‘কালি’র দাস। সে অনুসারেই তার নাম হয়ে গেল কালিদাস। শুধু যে দেবী কালি তার জীবন বাঁচালেন তা-ই নয়, তাকে দিলেন জ্ঞান ও বুদ্ধির আশীর্বাদ, তাতেই কালিদাস হয়ে উঠলেন মহাকবি। রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকির দস্যু থেকে সাধক হয়ে ওঠার গল্পের মতো কালিদাস মূর্খ থেকে হয়ে উঠলেন মহাকবি। তার বুদ্ধির তারিফ করতে গিয়ে তার নামে আজও প্রচলিত আছে হাজার হাজার জটিল ধাঁধাঁ। তিনি হয়ে উঠলেন প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার।
কালিদাস দুটি মহাকাব্য লিখেছেন- ‘রঘুবংশম্’ এবং ‘কুমারসম্ভবম্’। নাটক রচনা করেছেন তিনটি- ‘বিক্রমোর্বশীয়ম্’, ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম্’ আর ‘অভিজ্ঞানশকু্ন্তলম্’। গীতিকাব্য লিখেছেন দুটি- একটি হলো ‘মেঘদূতম্’, যাকে আমরা বাংলায় ‘মেঘদূত’ বলে জানি এবং অন্যটির নাম ‘ঋতুসংহারমা’।

‘মালবিকাগ্নিমিত্রম্’ নাটকের একটি দৃশ্য
কালিদাসের রচনাবলীর মধ্যে আমাদের কাছে দুটি গ্রন্থ সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এর মধ্যে আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গল্পের আকারে ‘শকুন্তলা’ লিখেছিলেন ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ থেকে ভাবানুবাদ করে। আর অন্যটি হচ্ছে ‘মেঘদূতম’ বা ‘মেঘদূত’। বাংলায় এ পর্যন্ত বহুজন এই ছোট্ট কাব্যগ্রন্থটির অনুবাদ করেছেন। সংক্ষিপ্ত হলেও এটিই তার অমর কীর্তি; তার শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে স্বীকৃত। ‘মেঘদূতে’র বিষয়বস্তু নিয়ে হায়াৎ মামুদ লিখেছেন,
কালিদাস শুধু কবিতা বা নাটকের কারণেই আজকের দিনে গুরুত্বপূর্ণ নন। তার লেখালেখিতে রয়েছে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, ভূগোল ও রাজনৈতিক নানা উপাদান। তিনি আজও আমাদের অনুপ্রেরণার কারণ। ১৯৬৬ সালে তাকে নিয়ে ‘মহাকবি কালিদাস’ নামে একটি তামিল সিনেমাও নির্মিত হয়েছে। তাকে নিয়ে হয়ত গবেষণা চলতে থাকবে আরও দীর্ঘকাল।

সংক্ষেপে দেখুনকালিদাসকে স্মরণীয় করে রাখতে তার নাটক অবলম্বনে নির্মিত ডাকটিকিট
জম্বি: এক ভৌতিক সত্তার আদ্যোপান্ত !! আসলেই রয়েছে কি এর কোন সত্যতা ?
হলিউড সিনেমার কল্যাণে জম্বি এখন আমাদের খুব পরিচিত একটি ভৌতিক সৃষ্টি। অসংলগ্ন পদক্ষেপ, পচন ধরা দেহাবশেষ, গোঁ-গোঁ শব্দ, ছেঁড়া পোশাক, মানুষের মৃতদেহ থেকে মাংস খুবলে খাওয়া, হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কামড়ে শরীর থেকে মাংস আলাদা করে নেওয়া; জম্বি কথাটি শুনলে আমাদের মনে এসব দৃশ্যপটই ফুটে ওঠে। কখনো খুব ধীর, আবার কবিস্তারিত পড়ুন
হলিউড সিনেমার কল্যাণে জম্বি এখন আমাদের খুব পরিচিত একটি ভৌতিক সৃষ্টি। অসংলগ্ন পদক্ষেপ, পচন ধরা দেহাবশেষ, গোঁ-গোঁ শব্দ, ছেঁড়া পোশাক, মানুষের মৃতদেহ থেকে মাংস খুবলে খাওয়া, হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কামড়ে শরীর থেকে মাংস আলাদা করে নেওয়া; জম্বি কথাটি শুনলে আমাদের মনে এসব দৃশ্যপটই ফুটে ওঠে। কখনো খুব ধীর, আবার কখনো উসাইন বোল্টকে হারিয়ে দেওয়ার মতো দৌড়- সিনেমায় জম্বির প্রকাশে এগুলো চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য। কোথা থেকে এলো জম্বি চরিত্র, প্রথম কবে কোথায় জম্বির উৎপত্তি? অথবা জম্বি কি হলিউডের নিজস্ব উদ্ভাবন? মগজখেকো জম্বিকে নিয়ে এসব প্রশ্ন কি কখনো আপনার মগজে খেলে গিয়েছে? সেসব প্রশ্নেরই উত্তর দেওয়া হবে এই লেখায়।

THE WALKING DEAD
জম্বি কী?
‘জম্বিল্যান্ড’-এ ডুব দেওয়ার আগে জম্বি সম্বন্ধে একটু জেনে নেওয়া যাক। এক কথায় বলতে গেলে, জম্বি মানে জিন্দালাশ। যে লাশ মৃত্যুর পর আবার জেগে ওঠে তা-ই জম্বি হিসেবে পরিণত হয়। জম্বি শব্দটির উৎপত্তি পশ্চিম আফ্রিকার দুটো ভাষা থেকে। গ্যাবন-এর মিতসোগো ভাষায় ‘জুম্বি’ (ndzumbi) মানে হলো ‘লাশ’। আবার কঙ্গো ভাষায় ‘জাম্বি’ (nzambi) মানে হচ্ছে ‘মৃত ব্যক্তির আত্মা’। জম্বি না মৃত, না জীবিত; বলা যায় জীবন্মৃত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবিত ও মৃত ছোটগল্পটির মূল আভাসের সাথে জম্বির ধারণার বেশ মিল রয়েছে। ওই গল্পের প্রোটাগনিস্টকে ভুলে মৃত ভেবে শ্মশানে পাঠানো হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি জেগে উঠে নিজের বাড়িতে ফিরে যান। তবে তার আচরণ ওপরে বর্ণিত জম্বির মত হয়ে যায়নি কারণ তিনি প্রকৃত অর্থে কখনো মৃত্যুবরণ করেননি।
জম্বি কিংবদন্তির দুটো আলাদা আলাদা রূপ (Archetype) রয়েছে। এর আদি উৎপত্তিতে দেখায় যায়, ন্যাক্রোমেন্সার বা জাদুকরেরা মৃত ব্যক্তিকে মন্ত্রবলে পুনরুজ্জীবিত করে নিজেদের দাস হিসেবে ব্যবহার করতেন। অধুনা পশ্চিমা জম্বি ন্যারেটিভে জম্বি সৃষ্টির জন্য জাদুবিদ্যার প্রয়োজন পড়ে না। এখানে জম্বির উত্থান হতে পারে ভাইরাসের কারণে, তেজস্ক্রিয়তার কারণে, অন্য জম্বির কামড়ের কারণে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ভুলের কারণে ইত্যাদি। তবে দু’ধরনের জম্বিরই কিছু সমধর্মী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো জম্বির নিজের ইচ্ছায় পরিচালিত হওয়ার অপারগতা, সারাক্ষণ মানুষের মাংস খেতে চাওয়া, স্খলিতপদ ইত্যাদি।
জম্বির উৎপত্তি
আপনি যদি জম্বি নামের এই ভীতিকর সৃষ্টিকে হলিউড থেকে চিনে থাকেন তাহলে আপনার মনে হতেই পারে জম্বি হয়তো পশ্চিমা ফোকলোরের নিজস্ব দানব। মূলত জম্বির ধারণাটি বৈশ্বিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে পশ্চিমা শিল্পমাধ্যমই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। তবে জম্বির শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদেরকে যেতে হবে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশ হাইতিতে। সতের বা আঠার শতকের হাইতি তখন ‘সেইন্ট-ডমিংগ’ নামে পরিচিত ছিল। ফ্রান্সের অধীনে থাকা হাইতিতে আখের আবাদ ও চিনিকলে কাজ করার জন্য আফ্রিকা থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের দাস হিসেবে আনা হতো। সেসময়ের আর সব শ্বেতাঙ্গ দাসমালিকের মতো ফরাসিপ্রভুরাও ছিল নিষ্ঠুর প্রকৃতির। তাদের নিষ্ঠুরতার মাত্রা এতটাই নির্মম ছিল যে আফ্রিকা থেকে আনা শ্রমিকদের অর্ধেকই কাজ করতে করতে অল্প কয়েক বছরের মধ্যে মারা গিয়েছিলেন।
এই হতভাগ্য শ্রমিকেরা বিশ্বাস করতেন মৃত্যুই ছিল তাদের একমাত্র মুক্তি। তারা মনে করতেন মৃত্যুর পর তাদের পুনর্জন্ম হবে ‘ল্যান গিনি’ তথা গিনি বা আফ্রিকাতে। সেখানে তারা মুক্ত মানুষ হিসেবে জন্ম নেবেন। কিন্তু এই স্বাধীনতা লাভের জন্য আত্মহত্যা করা যাবে না। কারণ আত্মহত্যা করলে মুক্তি তো মিলবেই না বরং ওই পুরনো দেহপিঞ্জরেই আত্মাছাড়া অবস্থায় অনন্তকালের জন্য আটকে থাকতে হবে। আত্মহত্যার এই শাস্তিটুকুই হচ্ছে জম্বিতে রূপান্তরিত হওয়া।

জম্বিকে জনপ্রিয় করেছে হলিউড
‘আত্মারাম খাঁচাছাড়া’ বলে বাংলায় একটা প্রবাদ রয়েছে। জম্বি মানেও একটি দেহরূপ খাঁচা যার ভেতরে প্রাণ বা আত্মার অস্তিত্ব নেই। কিন্তু বাংলায় প্রবাদটি কিছুটা হাস্যরসের ছলে বলা হলেও হাইতিয়ান জম্বির ক্ষেত্রে এটি বেশ করুণ একটি বিষয়।
১৭৯১ সালে হাইতিতে বিপ্লবের মাধ্যমে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তিকে উৎখাত করা হয়। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ১৮০৪ সালে সেইন্ট-ডমিংগো নাম থেকে পরিবর্তিত হয়ে হাইতি প্রথম স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। জম্বি কিংবদন্তি তখন হাইতিয়ান লোকগাথার অংশ হয়ে যায়। ভুডু ধর্মবিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত এই কিংবদন্তিতে মনে করা হয়, জম্বি তৈরির কারিগর হচ্ছেন খারাপ জাদুকর বা ডাইনি। এই জাদুকরেরা বকর (Bokor) নামে পরিচিত। বকররা মৃত মানুষকে জড়িবুটি দিয়ে জীবিত করে জম্বি বানিয়ে নিজেদের দাস হিসেবে ব্যবহার করতেন।
ভুডু বকর ও কালাজাদু বিশ্বাসের জম্বির এই রূপান্তরিত রূপটিই আমেরিকান সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে। কালো জম্বি এরপর সাদা জম্বিতে পরিণত হয়। কিছু বই ও কয়েকটি হলিউড সিনেমার মাধ্যমে জম্বি ধীরে ধীরে মার্কিন সমাজে বিস্তার লাভ করে। এরপর সময়ের সাথে সাথে ইউরোপ পেরিয়ে এশিয়াতেও পৌঁছে যায় জম্বি কিংবদন্তি।

আখ ক্ষেতে জম্বি; হাতে আঁকা ছবি
জম্বির ‘গ্রিন কার্ড’
ইউরোপের কাছে স্বাধীন হাইতি তখন লজ্জা ও পরাজয়ের জ্বলজ্বলে বাস্তবতা। তাই হাইতিকে ইউরোপীয়রা দেখতে থাকে নৃশংসতা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, মৃত্যুর দেশ হিসেবে। বিশ শতকের শুরুতে, ১৯১৫ সালে আমেরিকা হাইতি দখল করে। ‘আধুনিকায়নের’ উদ্দেশে সেখানে গেলেও দেখা যায় হাইতির নিজস্ব জম্বি সংস্কারকেই সাথে করে নিয়ে এসেছে আমেরিকানরা। ১৯২০ ও ‘৩০-এর দশকের মার্কিন পাল্প ম্যাগাজিনগুলোর বর্ণনায় ফুটে ওঠে কীভাবে প্রতিহিংসাপরায়ন জিন্দালাশ কবর থেকে উঠে তাদের খুনীদের তাড়া করছে সে গল্প। কিন্তু জম্বিকে মার্কিন মুলুকে আরও পাকাপোক্ত আসন দেওয়ার কাজটা করে কয়েকজন লেখক, ও হলিউড।
’২০-এর দশকের শেষের দিকে দুজন মার্কিন লেখক হাইতি ভ্রমণ করেন। ১৯২৭ সালে হাইতিতে যান উইলিয়াম সিব্রুক। তিনি যথেষ্ট গুণধর ছিলেন এবং ভ্রমণ-লেখক, সাংবাদিক, অকাল্টিস্ট ইত্যাদি গুণের সাথে সাথে মদ্যপানেও তার বিশেষ প্রতিভা ছিল। হাইতি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি দ্য ম্যাজিক আইল্যান্ড (১৯২৯) নামে একটি বই লিখেন। সিব্রুক নিজেকে ‘নিগ্রোফাইল’ হিসেবে পরিচয় দিতেন। নিগ্রোফাইল তাদেরকে বলা হয় যারা নিজের সুখী জীবনকে ত্যাগ করে ‘আদিমতা’কে আঁকড়ে ধরে আরাম পান। অন্য অর্থে বলা যায়, যেসব শ্বেতাঙ্গ নিজেদের আয়েসী জীবনের চেয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের কষ্টের জীবনকে বেশি পছন্দ করেন তারাই নিগ্রোফাইল। সিব্রুক হাইতিতে গিয়ে ভুডু ধর্মের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তার বইয়ের একটি চ্যাপ্টার, ‘ডেড ম্যান ওয়ার্কিং ইন কেইন ফিল্ডস’, এ তিনি জম্বি দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। হাইতিয়ান-আমেরিকান সুগার কর্পোরেশন-এর আখের আবাদে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় জম্বি দেখানোর জন্য। এই জম্বিরা রাতের বেলায় ওই বাগানে কাজ করে।
আখখেত থেকে আখ সংগ্রহ করছেন দাসেরা
কিছুক্ষণের জন্য থমকে যান সিব্রুক। তার মনে হলো এতদিন যা শুনেছিলেন হাইতির জম্বি কুসংস্কার নিয়ে, তার সবটাই সত্যি। পরে ধাতস্ত হয়ে এর ব্যাখ্যায় পৌঁছান তিনি: জম্বিটম্বি কিছুই নয়, স্রেফ একদল নির্বোধ, উন্মাদ মানুষ যাদেরকে দিয়ে জোর করে কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
হাইতি ভ্রমণকারী দ্বিতীয়জন ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ ঔপন্যাসিকা জোরা নিল হার্সটন। ’২০-’৩০-এর দশকের হার্লেম নবজাগরণের অনেক প্রথিতযশা কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্যিকই হাইতিকে নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। ভুডু ধর্মযাজক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য পেশাদার নৃতাত্ত্বিক হার্সটন হাইতিতে তিন মাস অবস্থান করেন। ১৯৩৭ সালে লেখা তার বই টেল মাই হর্স-এ হার্সটন জম্বির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং স্পষ্ট করে তিনি কীভাবে জম্বিকে ছুঁয়ে দেখেছিলেন তার বর্ণনা দিয়েছিলেন।
কিন্তু যার ছবি হার্সটন তুলেছিলেন তিনি অবশ্য একজন সাধারণ মানবিই ছিলেন। বেচারীর নাম ছিল ফেলিসিয়া ফেলিক্স-মেন্টর। তাকে সমাজ থেকে একঘরে করা হয়েছিল। তার জায়গা হয়েছিল মানসিক হাসপাতালে।
এ প্রসঙ্গে বাংলা অঞ্চলের ডাইনিদের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সমাজে ডাইনিদের খুব একটা সমাদর ছিল না। তারাশঙ্করের লেখা স্বর্ণ ডাইনির গল্প-এর প্রথম কয়েকটা লাইন এখানে তুলে দিচ্ছি।
অথবা পথের পাঁচালী‘র আতুরি বুড়ির কথা? সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, গাঁয়ের বাইরে একান্তে নীরবে, নিভৃতে বাস করা এক অশীতিপর বৃদ্ধা। সমাজের নির্মম দুনিয়ার এই বাসিন্দারা আমাদের এখানে ডাইনি আর অনেক অনেক দূরের হাইতিতে জম্বি হয়ে যান।

জোরা নিল হার্সটন-এর তোলা ছবি
হাইতি থেকে হলিউড
সিব্রুক আর হার্সটন-এর লেখার হাত ধরেই জম্বির আগমন মার্কিন মুলুকে। এর পরের কাজটি করে হলিউড।
দ্য ম্যাজিক আইল্যান্ড প্রকাশের তিন বছর পর হোয়াইট জম্বি (১৯৩২) নামে একটি সিনেমা মুক্তি পায়। এরপর জম্বি নিয়ে রিভল্ট অভ দ্য জম্বিজ (১৯৩৬), কিং অভ দ্য জম্বিজ (১৯৪১), আই ওয়াকড উইদ আ জম্বি (১৯৪৩) মুক্তি পায় পর্যায়ক্রমে।
তবে হলিউডের জম্বির জনক হিসেবে পরিচালক জর্জ এ. রোমেরো-কে মানা হয়। ১৯৬৮ সালে তার পরিচালনায় নাইট অভ দ্য লিভিং ডেড সিনেমায় অ্যান্টাগনিস্ট হিসেবে এক দঙ্গল নরমাংসভোগী মানুষকে দেখানো হয় যাদেরকে ‘ঘোউল’ (ghouls) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। জম্বিকে নিয়ে প্রথম এ সিনেমাটি বানানো হলেও এতে কখনোই জম্বি শব্দটি উচ্চারণ করা হয়নি। এরপর দশ বছর পরে আরেকটি সিনেমা, ডন অভ দ্য ডেড (১৯৭৮)-এ প্রথমবারের মতো জম্বি শব্দটি ব্যবহার করেন রোমেরো। এর পরের কয়েক দশকে রোমেরো আরও কয়েকটি জম্বি সিনেমা পরিচালনা করেন।
এরপর ধীরে ধীরে জম্বি ফিল্ম জনপ্রিয়তা লাভ করে মার্কিন দর্শকদের কাছে। জম্বির বৈশিষ্ট্যেও ক্রমশ নতুন নতুন পরিবর্তন আনা হয়। প্রথমদিকে জম্বিকে ধীরপদ হিসেবে দেখানো হলেও পরবর্তী সময়ের সিনেমা ইত্যাদিতে আমরা জম্বিকে দৌড়াতেও দেখি। সিনেমার বাইরে জম্বিকে নিয়ে টিভি সিরিজ, গেইম তৈরি করা হয়। দ্য ওয়াকিং ডেড (২০১০) সিরিজ, বা রেসিডেন্ট ইভল গেমের ভয়ধরানো জম্বিওয়ার্ল্ড থেকে শুরু করে কমেডি-হরর শন অভ দ্য ডেড (২০০৪) বা জম্বিল্যান্ড (২০০৯)- জম্বি এখন বৈশ্বিক বিনোদন জগতের অন্যতম অনুষঙ্গ।

নাইট অভ দ্য লিভিং ডেড-এ দেখানো জম্বি
চাইলেই বানানো যাবে জম্বি?
ভুডু ধর্ম এখনো ক্যারিবিয়ান, ব্রাজিল, দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে চালু আছে। বকরেরা ‘কুপ পুদ্রে’ নামক একধরনের সাদাটে পাউডার তৈরি করেন। এই পাউডার একজন সুস্থসবল মানুষকেও ‘জম্বি’ বানিয়ে দিতে পারে। ১৯৮০’র দশকে হার্ভার্ডের এথনোবোটানিস্ট ওয়েড ডেভিস ‘জম্বি পাউডার’ নিয়ে গবেষণা করার জন্য হাইতি ভ্রমণ করেন। তার অনুসন্ধানে তিনি খুঁজে পান বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূলত মানবদেহের পোড়া হাড়, কয়েকধরণের ব্যাঙ, পোকা, পাফারফিশ ইত্যাদি মিশিয়ে এ পাউডার তৈরি করা হয়। এই পাফারফিশের ভেতর থাকা মারাত্মক বিষ (toxin) টেট্রডোটক্সিন (Tetrodotoxin) মানুষকে মৃত্যুর দ্বার অব্দি পৌঁছে দিতে পারে।
অল্প পরিমাণ টেট্রডোটক্সিন শরীরে প্রবেশ করলে মানুষের শরীর অসাড় হয়ে যেতে পারে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় থাকে না ব্যক্তি বেঁচে আছেন কী মরে গেছেন। শ্বাস-প্রশ্বাস প্রায় থেমে যায়, হৃদস্পন্দন শূন্যের কাছাকাছি নেমে যায়। তবে ব্যক্তির জ্ঞান বজায় থাকে কিন্তু তিনি কথা বলতে পারেন না।
ডেভিস মনে করেন এই টক্সিনই হচ্ছে জম্বি পাউডারের মূল ভিত্তি। ডেভিসের ব্যাখ্যা হলো, কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ পরিমাণে এই বিষ দেওয়া হলে ব্যক্তি এমন একটি অবস্থায় পৌঁছান যে দেখে মনে হয় তিনি মরে গেছেন। এরপর তাকে কবর দেওয়ার পর সেই ‘লাশ’ কবর থেকে তোলেন বকর। এরপর ওই জম্বিকে দ্বিতীয় আরেকটি ড্রাগ দেওয়া হয়। জিমসন উইড ((Datura stramonium) থেকে তৈরি এই ঔষধ রোগীর স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রমকে ব্যহত করে।
তবে হাইতিতে গিয়ে চাইলেই আপনি জম্বি বানাতে পারবেন না। জম্বিফিকেশন ও দেশে এতটাই বাস্তব ব্যাপার যে এটি প্রতিরোধের জন্য আইন পর্যন্ত করতে হয়েছে। হাইতিয়ান পেনাল কোডের ২৪৯ আর্টিকেলে বলা আছে কেউ যদি জম্বি তৈরি করতে চায় তবে তা হত্যাচেষ্টা বলে পরিগণিত হবে। আর এ উদ্দেশে কাউকে কবর দেওয়া হলে সেটা খুন বলে গণ্য করা হবে।

ক্লেয়ারভায়াস নারসিস
‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ও অন্যান্য
১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল ল্যান্সেট তিনটি জম্বিফিকেশনের কথা জানায়। একটি ঘটনায় একজন মহিলাকে মৃত্যুর পর কবর দেওয়া হলেও তিন বছর পর তিনি আবার ফিরে আসেন। পরে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার কবর খোঁড়া হলে সেখানে পাথর ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। তার পরিবার তাকে গ্রহণ করবে কিনা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকলে পরে তাকে একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই ভদ্রমহিলার সাথেই দেখা হয়েছিল জোরা নিল হার্সটন-এর।
আমেরিক্যান কেমিক্যাল সোসাইটি’র প্রকাশনা কেমম্যাটার্স-এ আরেকটি জম্বিবৃত্তান্ত জানা যায়। ১৯৬২ সালে ক্লেয়ারভায়াস নারসিস শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ডাক্তারেরা তাকে পরে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর পরপরই তাকে কবর দেওয়া হয়। এর ১৮ বছর পর আঞ্জেলিনা নারসিসের দরজায় এক লোক এসে নিজেকে তার ভাই ক্লেয়ারভায়াস নারসিস হিসেবে দাবী করেন। তিনি জানান তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার পর কবর থেকে তোলা হয়েছিল। এরপর তাকে জম্বি বানিয়ে দূরের কোনো এক আখের আবাদে দাস করে রাখা হয়। যে ডাক্তার নারসিস-কে মৃত ঘোষণা করেছিলেন, তিনি সহ গ্রামের অনেকেই এই নবাগতকে ক্লেয়ারভায়াস নারসিস বলে শনাক্ত করেন।
সংক্ষেপে দেখুনবিখ্যাত ট্রয় নগরীর গোড়াপত্তন হলো কিভাবে?
সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। তখন এশিয়া মাইনরের উত্তরে অবস্থিত ছিল বিখ্যাত এক নগরী। ইতিহাস হোক বা উপকথা, এই নগরীর নাম বিবিধ কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। সমুদ্র উপকূল থেকে খানিক দূরে এই অবস্থিত বর্ণিল সৌন্দর্যমণ্ডিত এই নগরীর নাম ছিল ‘ট্রয়’। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আছরে পড়ত ট্রয় বন্দরের সুবিস্তারিত পড়ুন
সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। তখন এশিয়া মাইনরের উত্তরে অবস্থিত ছিল বিখ্যাত এক নগরী। ইতিহাস হোক বা উপকথা, এই নগরীর নাম বিবিধ কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। সমুদ্র উপকূল থেকে খানিক দূরে এই অবস্থিত বর্ণিল সৌন্দর্যমণ্ডিত এই নগরীর নাম ছিল ‘ট্রয়’। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আছরে পড়ত ট্রয় বন্দরের সুদীর্ঘ বেলাভূমিতে। জ্যোৎস্না রাতে চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করতো সাগরের নীল জলরাশি, সাথে অন্ধকারের নীরবতা ভেঙে দিত সমুদ্রের মুহুর্মুহু গর্জন।

ট্রয় নগরী
ট্রয় নগরী উত্থানের আখ্যান বর্ণনা করতে হলে ফিরে যেতে হবে সম্রাট ড্যারডানাসের আমলে। ড্যারডানাস হলেন গ্রিক পুরাণে বর্ণিত পৃথিবীর একদম শুরুর দিকের একজন বাদশাহ। পৃথিবীতে মহাপ্লাবন সংঘটিত হবার আগে তিনি অ্যারকাডিয়া সাম্রাজ্যের মসনদে আসীন ছিলেন। তবে পরিচালনার দায়ভার শুধু তার একার ছিল না। ড্যারডানাসের অগ্রজ ইয়াজিনও ছোট ভাইয়ের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাম্রাজ্য দেখাশোনা করেছেন। এই দুজন ছিলেন দেবরাজ জিউস এবং ইলেক্ট্রার ঔরসজাত সন্তান। সেই হিসেবে তারা ছিলেন টাইটান অ্যাটলাসের দৌহিত্র।
গ্রিক পুরাণ অনুসারে, এই ধরণী অধার্মিক, ঝগড়াটে ও হিংসুক মানুষ দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গেলে দেবরাজ জিউস এক মহাপ্লাবনের পরিকল্পনা করেন। জিউসের উদ্দেশ্য ছিল, তিনি পৃথিবী থেকে সকল পাপী ও পাপের চিহ্ন মুছে ফেলবেন। মহাপ্লাবনের সময় বেঁচে থাকা অ্যারকাডিয়ানরা আশ্রয় নিয়েছিল এক পাহাড়ের চূড়ায়। জিউসের আদেশেই ড্যারডানাস এবং ইয়াজিয়ন সিদ্ধান্ত নিলেন, অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হবার জন্য তারা বিশাল এক নৌকা নির্মাণ করবেন। সবাই হাত লাগালে দ্রুতই ফুরিয়ে এলো নৌকার কাজ। ভ্রমণের জন্য মহাপ্লাবনের বুকে প্রজাদের নিয়ে তরী ভাসালেন ড্যারডানাস। বলে রাখা ভালো, আইডাস ও ডেইমাস নামে দুই পুত্র সন্তান ছিল ড্যারডানাসের। আইডাস তার বাবার সাথে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলেও ডেইমাস ওখানেই থেকে গেলেন। মহাপ্লাবনের সমাপ্তি ঘটার পর ডেইমাস হয়ে উঠেছিলেন ওই জায়গার শাসনকর্তা।

মহাপ্লাবন
এভাবে দিনের পর দিন গড়িয়ে যেতে লাগল। চলতে চলতে তরী গিয়ে ঠেকল স্যামোথ্রেসের এক দ্বীপে। সবাই সেই দ্বীপে কিছুদিন অবস্থান করল। অনুর্বর জমির জন্য সেই দ্বীপ মনে ধরেনি ড্যারডানাসের। এছাড়াও দ্বীপটিতে বড় ভাই ইয়াজিয়নকে হারিয়ে ফেলেছিলেন ড্যারডানাস। তবে ইয়াজিয়নকে নিয়ে অন্যরকম আরেকটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। ক্যাডমাস ও হারমোনিয়ার বিয়েতে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল ড্যারডানাস এবং ইয়াজিয়নকে। বিবাহ ভোজনের সময় দেবী ডিমিটার ভুলিয়ে ভালিয়ে মোহের মায়ায় আচ্ছন্ন করে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন ইয়াজিয়নকে। রঙ-তামাশার পর যখন তারা বিবাহ ভোজনে ফিরে আসলেন, তখন পুরো ব্যাপারটি জানতে পারেন দেবরাজ জিউস। ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে তিনি বজ্রাঘাতে সাথে সাথে খুন করে ফেলেন ইয়াজিয়নকে।
যা-ই হোক, ড্যারডানাস এবং তার পুত্র আইডাস স্যামোথ্রেস ত্যাগ করার পর এশিয়া মাইনরের নিকটবর্তী শহর অ্যাবিডসে এসে পৌঁছলেন। আগন্তুক হিসেবে তাদের সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন ওখানের বাদশাহ টিউকার। তারপর ড্যারডানাসের সাথে বাদশাহ টিউকার তার নিজ কন্যা বাটেয়াকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেন। উত্তরাধিকারসূত্রে টিউকাস তার রাজ্যের কিছু অংশ ড্যারডানাসকে দিয়ে দেন। ওই স্থানে ড্যারডানাস নতুন এক বসতি গড়ে তুললেন, এবং ওই অঞ্চলের নামকরণ করলেন নিজের নামানুসারেই।
সময়ের সাথে সাথে সেই ড্যারডানিয়া নগরীর ক্রমশ বিস্তৃতি ঘটতে লাগল। সম্রাট ড্যারডানাস এবং বাটেয়ার কোল আলো করে আইরাস ও এরিক্টোনিয়াস নামে দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করে, যাদের উত্তরসূরিরাই গ্রিক উপকথার পাতায় পাতায় সুবিদিত হয়ে আছেন। এরিক্টোনিয়াসের সাথে নদীর দেবী সিমোয়েসের কন্যা অ্যাস্টিওসির বিয়ের ফলে তাদের ঘরে জন্ম নেয় ট্রস নামক এক সন্তান। এই ট্রসের পুত্রের মধ্যে আবার আইলাস, গ্যানোমিড এবং অ্যাসারাকাস অন্যতম। এই আইলাস ইলিয়ান নামে এক নগরীর নির্মাণে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। বাবা ‘ট্রস’ এর সম্মানার্থে পরবর্তীতে ইলিয়ান নগরীর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ট্রয়’।


ট্রস
কিংবদন্তি অনুসারে, গ্যানোমিডকে দেখে প্রচণ্ড ভালো লেগে যাওয়ায় তাকে অপহরণ করেন দেবরাজ জিউস। ছেলে হারানোর শোকে পাথর হওয়া ট্রসকে সান্ত্বনাস্বরূপ জিউস তখন উপহার পাঠালেন। তিনি দেবদূত হারমেসকে দিয়ে দুটি স্বর্গীয় ঘোড়া ট্রসের নিকট উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করলেন, যেগুলো ছুটতে পারত হাওয়ার বেগে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, স্বর্গীয় সামগ্রী হওয়ায় দুটি ঘোড়াই ছিল অমর। হারমেস ট্রসকে এ বলেও আশ্বস্ত করে দিয়েছিল যে, গ্যানোমিডকে নিযুক্ত করা হয়েছে দেবতাদের মদ্য পরিবেশক হিসেবে। যেহেতু সে দেবতাদের সেবায় সরাসরি নিযুক্ত, তাই সে অমরত্বও লাভ করে ফেলেছে।
গ্যানোমিডকে অপহরণ করছেন ঈগলরূপী জিউস
ট্রয় নগরীর বর্ণনা দিতে হলে সম্রাট লাওমেডনের পরিচিতিও খোলাসা করার প্রয়োজন। লাওমেডন ছিলেন আইলাসের সন্তান এবং গ্যানোমিড এবং অ্যাসারাকাসের ভ্রাতুষ্পুত্র। লাওমেডনের মায়ের নাম ছিল ইউরিডাইসি, যিনি ছিলেন অ্যারগসের বাদশাহ অ্যাড্রাস্টাসের কন্যা। থেমিস্ট ও টেলেক্লিয়া নামে দুই বোনও ছিল লাওমেডনের। একাধিক স্ত্রী নিয়ে রাজমহল আলোকিত করে রেখেছিলেন সম্রাট লাওমেডন।
তাদের মধ্যে পটামই স্ক্যামান্ডারের কন্যা স্ট্রেইমো এবং রিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্য স্ত্রীদের নাম হলো প্ল্যাসিয়া, থোসা, এবং লিওসিপ। এই স্ত্রীদের গর্ভেই জন্ম নিয়েছিল লাওমেডনের সন্তান থিটোনাস, ল্যাম্পাস, ক্লাইটিয়াস, হাইসটাও, পোডারসেস প্রমুখ। এদের মধ্যে উপকথায় প্রথম জনপ্রিয়তার মুখ দেখে থিটোনাস, যাকে দেবী ইয়োস অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য পোডারসেসের কপালেই জনপ্রিয়তার মুকুট চিরস্থায়ী হয়। লাওমেডনের কন্যাদের মধ্যে হেসিওনি, সিলা, অ্যাস্টিওসি, অ্যান্টিগন, প্রোক্লিয়ার নাম উপকথার পাতায় অক্ষয় হয়ে আছে।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, ট্রয় নগরীর সুবিশাল প্রাচীর তৈরিতে হাত লাগিয়েছিল খোদ দেবতারাও। প্রাচীর নির্মাণের কাহিনীটাও বেশ চমৎকার। দেবরাজ জিউস একবার ষড়যন্ত্রের অপরাধে সঙ্গীতের দেবতা অ্যাপোলো এবং সমুদ্র দেবতা পসেইডনকে এক বছরের জন্য অলিম্পাসের চূড়া থেকে নির্বাসিত করে দিলেন। ফলে মর্ত্যলোকে এসে ঠাঁই নিলেন দেবতা অ্যাপোলো এবং পসেইডন।




পসেইডন
পৃথিবীতে এসে জনসাধারণের মতোই কর্মসন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন দুই দেবতা। তারা কাজ পেয়ে গেলেন তৎকালীন ট্রয়ের অধীশ্বর রাজা লাওমেডনের কৃপায়। অ্যাপোলোকে নিযুক্ত করা হলো পশুসম্পদ দেখভালের জন্য, আর পসেইডন পেলেন ট্রয়ের প্রাচীর নির্মাণের কাজ। পসেইডন একা হাতে কাজ সামলাতে পারছিলেন না বলে তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন অ্যাগিনার মরণশীল রাজা অ্যাকাস। লাওমেডন সমুদ্র দেবতা পসেইডন এবং দেবতা অ্যাপোলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হলেন যে, দুই দেবতা মিলে যদি ট্রয়ের দুর্ভেদ্য এক প্রাচীর নির্মাণ করে দেন তাহলে বাদশাহ তাদেরকে বিপুল পারিতোষিকে তুষ্ট করবেন। কিন্তু প্রাচীর নির্মাণের পর শঠতার কালো ছায়ায় আশ্রয় নিলেন লাওমেডন। তিনি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে ফেললেন। ফলে দারুণ ক্ষোভে ফেটে পড়লেন দেবতা অ্যাপোলো এবং পসেইডন। ক্রুদ্ধ হয়ে অ্যাপোলো পুরো ট্রয়ের মাটিতে মড়ক বিস্তার করে দিলেন।
পসেইডন এবং অ্যাপোলোকে পুরষ্কার দিতে অস্বীকার করছেন লাওমেডন
ওদিকে ট্রয়ের ধ্বংস কামনা করে সমুদ্র থেকে ‘ট্রোজান সিটাস‘ নামে বিশালাকার এক দানব পাঠালেন পসেইডন। লাওমেডন সেই দানব বধের জন্য সৈন্য পাঠালেও আদতে কোনো লাভ হয়নি। ওই দানবের সামনে একমুহূর্তও টিকতে পারেনি লাওমেডনের ফৌজ। দানবটা একে একে নগরবাসীর বাড়িঘর, শস্য, ফসল সবকিছুই ধ্বংস করে ফেলতে লাগল। প্রজাদের জন্য কেঁদে উঠল বিশ্বাসঘাতক লাওমেডনের মন। তিনি মন্দিরে গিয়ে বিষণ্ণ মনে নিজ প্রজাদের জন্য দয়া ভিক্ষা চাইলেন। লাওমেডনের জন্য খানিক দয়া উদয় হলো দেবতাদের মন কোণে। তাই মন্দির থেকে দৈববাণী হলো, প্রতি বছর ট্রয়ের একজন কুমারীকে ওই দানবের কাছে দিয়ে আসতে হবে, তবেই দেবতাদের সন্তুষ্টি মিলবে। এভাবে প্রতি বছর লটারির মাধ্যমে বেছে নেয়া হতো একজন কুমারীকে, এবং তাকে উৎসর্গ করা হতো ওই সমুদ্র রাক্ষসের নিকট।
ট্রোজান সিটাস
লাওমেডনের বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষতিপূরণ চুকাতে গিয়ে একে একে বলি হলো পাঁচজন কুমারী। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে ষষ্ঠ বছরে লটারি পরীক্ষায় উঠে এলো স্বয়ং লাওমেডন কন্যা রাজকুমারী হেসিওনির নাম! কপাল চাপড়াতে থাকলেন বাদশাহ লাওমেডন, মানসিকভাবে একেবারেই ভেঙে পড়লেন তিনি। তখন রাজা গিয়ে আবারও তার ললাট ঠেকিয়ে পড়ে রইলেন দেবতাদের মন্দিরে। ফের দেবতারা সম্রাটের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে বিপদ থেকে পরিত্রাণের জন্য এক সাহায্যের ব্যবস্থা করলেন। বীরযোদ্ধা হেরাক্লিস (হারকিউলিস) তখন রাজা অ্যারিসকাসের রাজদরবার থেকে সঙ্গীদের সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তার জাহাজ ট্রয় নগরীর বন্দরে এসে থামার পর হঠাৎ তিনি দেখলেন, রাজকন্যা হেসিওনিকে নিয়ে সমুদ্রপাড়ে বিরাট শোকের মাতম চলছে। বাদশাহ লাওমেডন এবং তার রানী অঝোরে অশ্রুবর্ষণ করে যাচ্ছেন। কৌতূহলপরবশ হয়ে সমাগমের দিকে এগিয়ে গেলেন হেরাক্লিস, ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলেন লাওমেডনের কাছে। বাদশাহর কাছ থেকে সমস্ত বিবরণ জানার পর ওই দানবের সাথে যুদ্ধ লড়তে সম্মত হলেন হেরাক্লিস।
হেরাক্লিস
যুদ্ধে লড়ার আগে হেরাক্লিস শর্ত জুড়ে দিলেন, সেই দানবকে বধ করলে তাকে যেন সম্রাটের সেই স্বর্গীয় ঘোড়া জোড়া উপহার দেয়া হয়। রাজা সানন্দে মেলে নিলেন সেই শর্ত। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন হেরাক্লিস। যেই তিনি তার সিংহচর্মে নির্মিত বস্ত্র খুলে শক্ত হাতে মুগুরটা পাকরাও করলেন, তখন বীরত্ব যেন তার ইস্পাত সদৃশ শরীর থেকে ঠিকরে পড়ছিল। খানিক পরেই বিশাল জলরাশির বুক চিড়ে বেরিয়ে এলো বিশালাকার সেই দানব। বড় বড় দাঁতের ফাঁকে ফেনা গড়িয়ে পড়ছে তার, ভারিক্কি ও ভয়ংকর চেহারার জন্য পুরো সমুদ্রটাকে মৃত্যুপুরী মনে হচ্ছে। দুঃসাহসী হেরাক্লিসের মুগুরের এক আঘাতেই ধরাশায়ী হলো দানব, অচেতন হয়ে গেলো সে। পরবর্তীতে হেরাক্লিস তার তরবারি দাবনটার হৃৎপিণ্ড বরাবর ঢুকিয়ে দিতেই সমুদ্রের নীল জলরাশি টকটকে লাল শরবতের রূপ নিলো।
এই যাত্রায় বেঁচে গেলো রাজকন্যা হেসিওনি। সকলেই ভাবল, পূর্বের বিশ্বাসঘাতকতার ফল ভোগ, পাপের প্রায়শ্চিত্ত এবং হেরাক্লিসের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রাজা লাওমেডন হয়ত তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। কিন্তু সকলের ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করে এবারেও বেঁকে বসলেন রাজা লাওমেডন। কিছুদিন পর একটি পরীক্ষা শেষ করে রাজা লাওমেডনের কাছে ফিরে এলেন হেরাক্লিস। কিন্তু হেরাক্লিসের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিলেন লাওমেডন। তিনি দুটো ঘোড়া পাঠালেন ঠিকই, তবে সেগুলো দেবরাজ জিউসের দেয়া স্বর্গীয় ঘোড়া নয়। প্রবঞ্চনার শিকার হওয়ায় হেরাক্লিস ক্রোধে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, লাওমেডনকে তিনি উপযুক্ত শাস্তি দিয়েই ছাড়বেন।
ট্রাকিসে যুবতী স্ত্রী ডিয়ানিরাকে রেখে ভ্রাতুষ্পুত্র আইওলাসকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন হেরাক্লিস। সাহায্যে পাওয়ার আশা নিয়ে প্রথমেই দ্বারস্থ হলেন পুরনো বন্ধু টেলামন এবং পেলিয়াসের কাছে। টেলামন মাত্র কিছুদিন আগেই অ্যাথেন্সের স্যালামিসে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন। সাংসারিক সকল ব্যস্ততার পাট চুকিয়ে মোট ছ’টা জাহাজের ব্যবস্থা করলেন টেলামন। সাথে যোগ দিলেন পেলিয়াস, ওইক্লিস, আইওলাস, ডাইমাকাসের মতো গ্রীক বীরেরা। প্রত্যেককে একটি করে জাহাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হলো।
মহাবীর হেরাক্লিসের নেতৃত্বে সমুদ্রের বুক চিরে আপন গতিতে ট্রয়ের দিকে এগিয়ে চলল যুদ্ধজাহাজগুলো। ট্রয়ের উপকূলে এসে ওইক্লিসকে জাহাজের পাহারায় রেখে বাকিরা আক্রমণ চালালেন নগরীতে। অকস্মাৎ এই হামলার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না রাজা লাওমেডন। তবে তৎক্ষণাৎ তিনি ফন্দি আঁটলেন। কিছু সৈন্য যোগাড় করে গোপন পথে এগোতে থাকলেন জাহাজগুলোর দিকে। প্রথমেই কব্জায় পেয়ে গেলেন অপ্রস্তুত ওইক্লিসকে, নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো তাকে। ওই গোপন পথের বাঁক ধরেই ট্রয়ে ফিরে এলেন লাওমেডন। পথে অবশ্য হেরাক্লিসের কিছু সৈন্যের সাথে হালকা যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি, কিন্তু সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেন। সুস্থ দেহে নগরীতে পৌঁছানোর সাথে সাথেই বন্ধ করে দিলেন নগরীর দরজা।
ওদিকে, পুরো ট্রয় নগরীকেই চারদিক থেকে অবরোধ করে রাখলেন হেরাক্লিস। তবে তাকে বেশিদিন এ নগরী অবরোধের বেষ্টনীতে রাখতে হয়নি। ট্রয় নগরীর প্রাচীর দেবতা অ্যাপোলো এবং পসেইডন নির্মাণ করলেও, তাদের সাহায্য করেছিলেন টেলামন আর পেলিয়াসের বাবা সম্রাট অ্যাকাস। মরণশীল মানুষের হাত লেগেছে বলে প্রাচীরটি পুরোপুরি অমর হতে পারেনি। বাবার মুখে ট্রয়ের বিখ্যাত প্রাচীরের গল্প শুনতে শুনতেই বড় হয়েছেন পেলিয়াস। প্রাচীরের কোথায় ফাঁকফোকর আছে, তা পেলিয়াস ভালো করেই জানতেন। বাকিদের জানিয়ে দিলেন সেই দুর্বলতার কথা, গর্ত দিয়ে পঙ্গপালের মতো প্রবেশ করল তার অনুসারীরা। হেরাক্লিস নগরীর প্রধান দুর্গে আক্রমণ শুরু করলেই দু’পক্ষের মাঝে বাধে মরণপণ লড়াই। খানিক বাদে দেখা গেলো মৃত লাওমেডনের নিথর দেহ লুটিয়ে আছে মাটিতে। রাজার ছোট সন্তান পোডারসেস বাদে আর কেউ বেঁচে নেই তখন। যুদ্ধের পর সকল বন্দীদের সামনে এনে দাঁড় করালেন হেরাক্লিস। বন্দীদের মধ্যে রাজকুমারী হেসিনওনিও ছিল। তখন হেরাক্লিস বললেন,
বেদনায় জর্জরিত হেসিওনি তখন ক্রন্দনরত কণ্ঠে জবাব দিলো,
প্রত্যুত্তরে হেরাক্লিস জানান দিলেন,
সাথে সাথে নিজের স্বর্ণ-খচিত মুখাবরণ খুলে দিলো হেসিওনি, মুক্ত করল পোডারসেসকে। এরপর থেকেই পোডারসেসের নাম হয়ে গেলো ‘প্রায়াম’, যার অর্থ ‘মুক্তিপণ দেয়া হয়েছে’। হেসিওনিকে অনুচর টেলামনের সাথ বিয়ে দিয়ে, প্রায়ামকে ট্রয়ের মসনদে বসিয়ে আসলেন হেরাক্লিস। তারপর তিনি দলবল নিয়ে চিরদিনের জন্য ট্রয় ছেড়ে চলে আসেন। রাজা লাওমেডন চিরনিদ্রায় শায়িত ছিলেন ট্রয়ের সিয়ান ফটকের কাছে। কথিত আছে, লাওমেডনের কবর যতদিন অক্ষত ছিল, ততদিন ট্রয় নগরীতে কোনো শত্রুর অনুপ্রবেশ হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখব গ্রিস ও ট্রয়ের টানা দশ বছরের যুদ্ধ শেষে কাঠের ঘোড়া নগরীতে ঢোকানোর সময় নগরীর প্রধান ফটক বড় করার প্রয়োজন পড়ে। ফলে উচ্ছেদ করা হয় লাওমেডনের অক্ষত কবর। এরপরেই পতন ঘটে শত বছর শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত ট্রয় নগরীর।


সংক্ষেপে দেখুনহেকুবা এবং প্রায়াম
ওদিকে, ধীরে ধীরে শৌর্যবীর্য নিয়ে ট্রয়ের নির্মল আলো-বাতাসে বেড়ে উঠতে লাগলেন প্রায়াম। একসময় তিনি হেকুবার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রাজা প্রায়াম এবং তার রানী হেকুবার রাজত্বকালে ট্রয় ক্রমশ সম্পদ ও শক্তিতে ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে। নগরীর কল্যাণ এবং সেটাকে সংঘাত-সংঘর্ষের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুললেন, নির্মাণ করলে বিশাল বিশাল সুউচ্চ এবং সুদৃঢ় দুর্গ। ট্রয়ের পাশ দিয়ে কোনো জাহাজ গেলে সেটা থেকেও কর আদায়ের ব্যবস্থা করলেন। ক্রমে ক্রমে প্রায়ামের শাসনামলে ট্রয় নগরী হয়ে উঠলো তৎকালীন প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর এবং পরাক্রমশালী এক রাষ্ট্রে। রাজা প্রায়াম এবং রানী হেকুবার কোল আলো করে মোট উনিশজন সন্তান জন্ম নিয়েছিল।
নিজ স্ত্রীর সাথে হেক্টর
তাদের মধ্যে হেক্টর, প্যারিস, হেলেনাস, ক্যাসান্ড্রা, ডেইফোবাস, ট্রলিয়াস, পলিক্সেনা, ক্রিউসা, পলিডোরাস অন্যতম। তবে পৃথিবীজোড়া খ্যাতি অর্জন করতে পারা একমাত্র সন্তান ছিল হেক্টর। মহাবীর অ্যাকিলিসের নাম নিলে হেক্টরের নামও শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করা হয়। তার যুদ্ধনীতির জ্ঞান এবং যুদ্ধকৌশলে পারদর্শিতা তৎকালীন ট্রয়ের আর কারও ছিল না। মনের উদারতা, এবং আনুগত্যেও তিনি সকলের নজর কেড়ে নিয়েছিলেন। যদি গুণের দিকগুলো তুলনা করা হয়, তবে প্রেমের দেবী আফ্রোদাইতির সন্তান এবং প্রায়ামের ভ্রাতুষ্পুত্র ইনিয়াস ছাড়া তার সমকক্ষ আর কেউ ছিলেন না। এই ইনিয়াসই রোমান জাতির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডের নাম কেন এমন হল?
গ্রিনল্যান্ড সবুজে ঢাকা কোনো জায়গা নয় এবং আইসল্যান্ডও নামের মতোই বরফাবৃত নয়। শুনলে সত্যিই অবাক হবেন, গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮০ ভাগ অঞ্চলই স্থায়ী বরফে আবৃত। অন্যদিকে, আইসল্যান্ডের মাত্র ১১ ভাগ অংশ বরফে ঢাকা। গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের এই ‘প্যারাডক্স’ ধরনের নাম ও বৈশিষ্ট্য খুব স্বাভাবিক কারণেই বিখ্যাতবিস্তারিত পড়ুন
গ্রিনল্যান্ড সবুজে ঢাকা কোনো জায়গা নয় এবং আইসল্যান্ডও নামের মতোই বরফাবৃত নয়। শুনলে সত্যিই অবাক হবেন, গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮০ ভাগ অঞ্চলই স্থায়ী বরফে আবৃত। অন্যদিকে, আইসল্যান্ডের মাত্র ১১ ভাগ অংশ বরফে ঢাকা। গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের এই ‘প্যারাডক্স’ ধরনের নাম ও বৈশিষ্ট্য খুব স্বাভাবিক কারণেই বিখ্যাত গোটা পৃথিবী জুড়ে। আপনি কি কখনো ভেবেছেন, কেন এই রকম অদ্ভুত নামকরণ?
স্যাটেলাইট থেকে আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ড যেমন দেখা যায়
নামকরণের এই ব্যাপারটি ছিলো সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত। ভাইকিংরা যখন প্রথম এই ভূখণ্ড দুটিতে পা রাখে, তখনই নিজেদের খাতিরে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে সবকিছু বিপরীত দিকে পরিচালিত করলো। ভাইকিংরা সবুজ ভূখণ্ডটির নাম দিলো আইসল্যান্ড। কারণ উর্বর ও অনুকূল আবহাওয়ার অঞ্চলটি যেন সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এবং খুব বেশি লোকারণ্যে পরিণত না হয়। অন্যদিকে কঠিন বরফে আবৃত ভূখণ্ডটির নামকরণ করা হলো গ্রিনল্যান্ড, এই প্রতিকূল পরিবেশের দ্বীপটি কে দখল করতে গেলো কিংবা বসবাস করতে লাগলো তা নিয়ে খুব একটা মাথা না ঘামালেও চলতো। কিন্তু বাস্তবতা মাত্র তিন-চার বাক্যের মতোই সহজ নয়, নামকরণের পিছনে রয়েছে জটিল ঘটনাবলী, যার সাথে জড়িত রয়েছে জলবায়ুর পরিবর্তন ও ভাইকিং প্রথা। নামকরণের এই উপাখ্যান লোকগাঁথা ও উপকথার মতো প্রচলিত।
গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের নামকরণ হয়েছে ভাইকিংদের ইতিহাস থেকে
নরওয়েজিয়ান ভাইকিংদের প্রথা ছিলো, প্রথমে যা তাদের দৃষ্টিগোচর হবে, সেই অনুসারে তার নামকরণ করা। ভূখণ্ডের নামকরণের ক্ষেত্রে শেষে শুধুমাত্র ‘ল্যান্ড’ যুক্ত করে দিলেই হলো। যেমন বিখ্যাত নরওয়েজিয়ান ভাইকিং এরিক দ্য রেডের ছেলে লিফ এরিকসন কানাডার একটি অঞ্চলের নামকরণ করেছিলো ভিনল্যান্ড (Vinland)। ‘Vin’ শব্দটি এসেছে ফরাসি ভাষা থেকে, যার অর্থ ওয়াইন। সম্ভবত যে অংশে এরিকসন প্রথম নোঙর করেছিলেন সেখানে প্রচুর বন্য আঙুর দেখতে পেয়েছিলেন। তাই এমন নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
লিফ এরিকসনের কল্পিত চিত্র
উত্তর আটলান্টিক সাগরের একটি দ্বীপ রাষ্ট্র আইসল্যান্ড, মোট আয়তন ১,০২,৭৭৫ বর্গ কিলোমিটার। উপসাগরীয় প্রবাহের দরুন আইসল্যান্ডের সাধারণ তাপমাত্রা যথেষ্ট উষ্ণ। বর্তমানে আইসল্যান্ডের তাপমাত্রা ফেব্রুয়ারিতে সাধারণত গড়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও জুলাই থেকে আগস্টে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে উঠানামা করে। আইসল্যান্ড এক সময় ছিলো বিরান ভূমি। লোককাহিনী অনুসারে, ভাইকিংদের হাত ধরে সেখানে জনপদ গড়ে উঠেছিলো।
আইসল্যান্ড নামকরণের ইতিহাস নবম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে নিহিত। লোককাহিনী অনুযায়ী, নরওয়েজিয়ান ভাইকিং নাদাদর প্রথম আইসল্যান্ড আবিষ্কার করেন এবং যখন এই দ্বীপের উপকূলে তিনি পৌঁছান তখন সেখানে তুষারপাত হচ্ছিলো। প্রথা অনুযায়ী, নাদাদর দ্বীপটির নামকরণ করলেন ‘Snow land‘। নাদাদরের পর আইসল্যান্ডে পা রাখেন সুইডিশ ভাইকিং গারোর সভাভারোসন। সভাভারোসন বসতি স্থাপন করার পর সেটি নিজের নামে নামকরণ করেন ‘Garðarshólmur‘ বা গারোর দ্বীপ (Garðar’s Isle)। আজও এই নাম টিকে রয়েছে, আইসল্যান্ড আরেকটি যে নামে পরিচিত তা হলো ‘Garðarshólmur‘। গারোর পরে দ্বীপে যে ভাইকিং বসতি স্থাপন করেছিলেন, তার ভাগ্য ছিলো দুঃখ-দুর্দশায় পূর্ণ।
গারোর সভাভারোসন
আইসল্যান্ডের পথে ভাইকিং ফ্লোকি ভিলগারোরসন পাড়ি জমানোর পথে তার মেয়ে নৌকা থেকে পড়ে গিয়ে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। যতদিনে আইসল্যান্ডে পৌঁছান ফ্লোকি, ততদিনে দ্বীপের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া সকল পশু-পাখিও মারা যায়। সবকিছু হারিয়ে খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন ফ্লোকি। প্রচলিত উপকথা অনুসারে, এরপর সমুদ্রের ধারে কোনো এক পর্বতশীর্ষে আরোহণ করেন ফ্লোকি। পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এক বিশাল বরফ খণ্ড নজরে আসে ফ্লোকির। রাগে ও হতাশায় নিঃস্ব ফ্লোকি তখন দ্বীপটির নাম বদলে নতুন নাম দেন আইসল্যান্ড। সেই থেকে আজও এই নামেই পরিচিত উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের এই দ্বীপটি।
যেখানে সব হারিয়েছেন ফ্লোকি, সেখানে আর কোনো ধরনের বসতি গড়ে উঠুক তা বোধ হয় আর চাননি তিনি। তাই মাতৃভূমি নরওয়েতে ফিরে গিয়ে ফ্লোকি গুজব রটাতে থাকে দ্বীপটি বসবাসের একেবারে অনুপযোগী ও বরফে ঢাকা। কিন্তু ফ্লোকির সাথে থাকা নাবিকদলের একজন থরোফ প্রচার করে বেড়ায় যে দ্বীপটি দারুণ উর্বর এবং সবুজ ঘাসে ভরপুর। ক্রমেই লোকারণ্যে পরিণত হয় আইসল্যান্ড। ফ্লোকির পরে যারা আইসল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেন, তারা আর পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করেননি।
সমুদ্র অভিযানে ভাইকিংদের নৌকা
আইসল্যান্ডের নামকরণ নিয়ে আরেকটি উপকথা প্রচলিত রয়েছে। নরওয়েজিয়ান ভাইকিংদের দুই দলের মধ্যে যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধ থেকে একদল পালিয়ে নৌকায় পাড়ি জমায়, শেষপর্যন্ত তারা সত্যিকার অর্থেই সবুজ এক দ্বীপে পৌঁছায়। ভাইকিংদের এই দলটির আশংকা ছিলো শত্রুপক্ষ ও বিরোধীগুলো এমন সবুজ দ্বীপের কথা জানতে পারলে বার বার আক্রমণ করে দখল করা চেষ্টা করবে।
তাই তারা দ্বীপটির নাম দিলো আইসল্যান্ড এবং বাইরের পৃথিবীতে গুজব রটিয়ে দিলো যে দ্বীপটি বরফাচ্ছাদিত ও বসবাসের অযোগ্য। বিরোধী দলগুলোকে তাদের সবুজ দ্বীপ থেকে আরও দূরে সরিয়ে রাখতে তারা আরও প্রচার করেছিলো যে দূরে দারুণ সুন্দর সবুজ ও বিশাল একটি দ্বীপ রয়েছে। আসলে বিশাল এই দ্বীপটি ছিলো বরফে ঢাকা ও খুবই প্রতিকূল ভূখণ্ড। এই বিশাল দ্বীপটিই আজ গ্রিনল্যান্ড নামে পরিচিত।
আইসল্যান্ডের সবুজে ঢাকা পাহাড়, পুরো আইসল্যান্ডে বরফাঞ্চল মাত্র ১১ ভাগ
২১,৬৬,০৮৬ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে থাকা গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ। গ্রিনল্যান্ড যদিও উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত কিন্তু দ্বীপটির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইউরোপের হাতে। গ্রিনল্যান্ডের তাপমাত্রা আজকে যত কম, একসময় এত হিমশীতল ছিলো না। বরফ ও শামুকের খোলসের প্রাপ্ত অংশ নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৮০০-১৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ অংশ বর্তমানের তুলনায় অনেক উষ্ণ ছিলো।
কঠিন বরফে ঢাকা গ্রিনল্যান্ড, দ্বীপটির ৮০ ভাগ অঞ্চলই বরফে আবৃত
‘ভিনল্যান্ড’ নামকরণের হোতা ভাইকিং এরিকসনরের বাবা এরিক দ্য রেডের আসল নাম এরিক থরভালদসন। এরিকই ছিলো প্রথম ইউরোপিয়ান যিনি সর্বপ্রথম পা রাখেন গ্রিনল্যান্ডে এবং সেখানে বসতি স্থাপন করে। গ্রিনল্যান্ডে এরিকের পা রাখার ঘটনা ছিলো ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। প্রচলিত রয়েছে, নরওয়েতে থাকাকালীন সময়ে কোনো এক বিবাদে জড়িয়ে তিনজনকে হত্যা করে এরিক। তৎকালীন আইনানুসারে, হত্যার শাস্তি ছিলো মৃত্যদন্ড কিংবা নির্বাসন। এরিক বেছে নিয়েছিলেন নির্বাসন, যা তাকে পথ দেখিয়েছিলো সমুদ্র অভিযানে এবং নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের।
এরিক তার দলবল নিয়ে গ্রিনল্যান্ডের যে অংশে পা রাখেন, তা ছিলো দ্বীপটির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ এবং সময়টি ছিলো গ্রীষ্মকাল। এই উষ্ণ অংশটি একেবারে কঠিন বরফে আবৃত ছিলো না। যদিও বসবাসের জন্য এটি কিছুটা অনুকূলে থাকলেও, একেবারে সহজও ছিলো না এখানে বসতি স্থাপন করা। উষ্ণ তাপমাত্রা ফসল ও সবুজ প্রকৃতির জন্য সহায়ক ছিলো। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ অংশে জুন মাসের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবিষ্কারের সময়, ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে গ্রিনল্যান্ডের ঘাস হয়তো যথেষ্ট সবুজ ছিলো। এই বিবেচনায় ভাইকিংদের দেওয়া এই নাম সম্ভবত সময়ের বিবেচনায় সঠিক ছিলো। অবশ্য উপকথা অনুযায়ী, বসতি স্থাপনের জন্য এরিক তখন অন্যান্যদের আকৃষ্ট করার জন্য দ্বীপটির নাম দিয়েছিলো গ্রিনল্যান্ড।
এরিক দ্য রেড
কিন্তু চৌদ্দ শতকের দিকে দ্বীপটির তাপমাত্রা কমে যেতে থাকে, তখন বাইরে থেকে এসে সেখানে বসতি স্থাপন করা লোকদের সংখ্যা কমে গেলো। গ্রিনল্যান্ডে মাসের উষ্ণতম সময়েও তাপমাত্রা ০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের আশেপাশে বিরাজ করে। শীতকালে উত্তর-পূর্ব উপকূলের তাপমাত্রা -৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে আসে, অনেক সময় এটি -৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াসও হয়। ভাইকিংরা বসতি স্থাপনের আগে থেকেই গ্রিনল্যান্ডে বসবাস করতো সেখানকার স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী ইনুয়িত। স্থানীয় ইনুয়িতদের কাছে গ্রিনল্যান্ড পরিচিত ‘কালালিত নুনাত’, অর্থ ‘দ্য ল্যান্ড অব দ্য পিপল’।
জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলতে শুরু করেছে, অন্যদিকে আইসল্যান্ডের দিকে উপসাগরীয় উষ্ণ প্রবাহও ধীর গতির হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে হাজার বছর পূর্বে ভাইকিংদের দেওয়া নাম হয়তো সার্থকতা পাবে অদূর ভবিষ্যতে। কারণ তাহলে আইসল্যান্ডের তাপমাত্রা কমে হিমাংকের নিচে নামবে ও কঠিন বরফ জমতে শুরু করবে সমুদ্র উপকূলে। অন্যদিকে, গ্রিনল্যান্ড উষ্ণ হতে শুরু করবে, বরফ গলে যাবে এবং হয়তো আরও বেশি সবুজের সমারোহ দেখা যাবে। কিন্তু এমন আমূল পরিবর্তন বয়ে আনবে বিশাল বিপর্যয়, যা হবে কল্পনাতীত।
সংক্ষেপে দেখুনবাবা ইয়াগা কে?
রুশ দেশের ডাইনি বুড়ি বাবা ইয়াগা ডাইনি বুড়ি নামক চরিত্রটার সাথে আমাদের বিলক্ষণ পরিচয় আছে। ছোটবেলা থেকেই আমরা ডাইনিদের গল্প শুনি। ওরা কামরুপ কামাক্ষা থেকে মন্ত্র তন্ত্র শিখে এসেছে, বিবস্ত্র হয়ে গোটা একেকটা গাছ নিয়ে বাতাসে উড়ে বেড়ায় এমনতর আজগুবি কাহিনী নিয়ে চমৎকার সব গল্প বাংলা সাহিত্যে অনেক আছে। তারাশবিস্তারিত পড়ুন
রুশ দেশের ডাইনি বুড়ি বাবা ইয়াগা
ডাইনি বুড়ি নামক চরিত্রটার সাথে আমাদের বিলক্ষণ পরিচয় আছে। ছোটবেলা থেকেই আমরা ডাইনিদের গল্প শুনি। ওরা কামরুপ কামাক্ষা থেকে মন্ত্র তন্ত্র শিখে এসেছে, বিবস্ত্র হয়ে গোটা একেকটা গাছ নিয়ে বাতাসে উড়ে বেড়ায় এমনতর আজগুবি কাহিনী নিয়ে চমৎকার সব গল্প বাংলা সাহিত্যে অনেক আছে। তারাশংকর বন্দোপাধ্যায় তো ডাইনিদের নিয়ে দু’টি খাসা গল্প লিখে গিয়েছেন। তারাবাবুর ডাইনিরা স্রেফ চোখের দৃষ্টি দিয়েই মানুষের ভবলীলা সাঙ্গ করে দিতে পারতেন।
তা ডাইনি ব্যাপারটা আমাদের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। পৃথিবীর সব নৃগোষ্ঠী্র লোককথাতেই এরকম চরিত্রের দেখা মেলে। এমনই একটি চরিত্র হচ্ছে বাবা ইয়াগা।
বাবা ইয়াগার আবাস
কোথায় থাকেন বাবা ইয়াগা? সেক্ষেত্রে আমাদের নজর ফেরাতে হবে উত্তর দিকে। আমাদের পরিচিত পরিমণ্ডল ছেড়ে আরো বহু মাইল দূরে।
পূর্ব ইউরোপ। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এখানে থাকে স্লাভিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। এই স্লাভরা আবার পূর্ব স্লাভ, পশ্চিম স্লাভ, দক্ষিণ স্লাভ- এমন নানা ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে রুশ জাতির লোকেরা পড়েছে পূর্ব স্লাভ জনগোষ্ঠীর মধ্যে। আমাদের বাবা ইয়াগা থাকেন এই রুশ জাতির সুবিশাল আবাস ভূমিতে ছড়িয়ে থাকা গহীন সব বনের মধ্যে। যদিও পোলিশ এবং বুলগেরীয়সহ অন্যান্য স্লাভ দেশীয় লোককথাগুলোতেও তার কথা পাওয়া যায়।
বাবা ইয়াগা
কেন এই নাম?
বাবা ইয়াগার নাম শুনলে বাংলাভাষীদের ধন্দে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। ‘বাবা’ শব্দটার তো আলাদা অর্থ আছে বাংলা ভাষায়। তবে রুশী বুড়ি বাবা ইয়াগার নামের অর্থ পুরোটাই আলাদা। হরেক রকমের স্লাভ ভাষায় হরেক রকমের অর্থ করা যায় বলে আমরা প্রধানত রুশ ভাষাতেই আমাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখবো।
কিছু কিছু শব্দ আছে না যেগুলো শুনলে পুংলিঙ্গ আর স্ত্রী লিঙ্গ আলাদা করা যায় না? এই যেমন শিশু। শিশু বললে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের কথাই মনে হতে পারে। বাবা ইয়াগার ‘বাবা’ এমনই একটি লিঙ্গহীন শব্দ। তবে খাস রুশীতে ‘বাবা’ শব্দটার আক্ষরিক অর্থ করা যেতে পারে দিদিমা বা দাদী।
আর ইয়াগা অর্থ? নানা ভাষায় ইয়াগার নানা অর্থ আছে। তবে মোটামুটিভাবে বলা যেতে পারে- রাগ, নৃশংসতা, আতংক ইত্যাদি যেকোনো কিছু বোঝাতেই ইয়াগা শব্দটা পারঙ্গম। এর আরেকটা অর্থ হতে পারে সাপ। সে যা-ই হোক, ভাষাতত্ত্ববিদদের কচকচানি এড়িয়ে আমরা বলতে পারি, বাবা ইয়াগার মানে হচ্ছে ‘রাগী দিদিমা’। প্রধানত পূর্ব আর দক্ষিণী স্লাভদের মধ্যেই বাবা ইয়াগার কথা শোনা যায়। পশ্চিমী স্লাভদের জেজিবাবা নামের আরেকটি নিজস্ব দিদিমা আছেন। তিনিও অনেকটা বাবা ইয়াগার মতোই। হতে পারে প্রাচীনকালে দুজনে একই চরিত্র ছিলেন। অন্যান্য স্লাভ জাতিদেরও বাবা ইয়াগা সদৃশ দিদিমা আছেন। বুলগেরিয়ার গোর্শকা মাজকা (বনের মা), সার্বিয়ার বাবা করিজমা, ক্রোয়েশিয়ার বাবা রোগা, হাঙ্গেরির ভাসোরু বাবা এবং রোমানিয়ার মুমা পাদুরি অনেকটা একই চরিত্র বলা চলে। ১৭৫৫ সালের রুশী ব্যাকরণ বইয়ে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাবা ইয়াগার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয়, যদিও তার বিষয়ে বহু শত বছর ধরেই গল্পগাথা প্রচলিত আছে।
বাবা ইয়াগার হালচাল
প্রাচীন রুশ বর্ণনা ঘেটে দেখা যাচ্ছে, আমাদের বাবা ইয়াগার বাস গহীন বনে। লোকালয় থেকে অনেক দূরে। সেখানে সচরাচর মানুষের পা পড়ে না। ঘুরে বেড়ায় যতসব মস্ত মস্ত ভাল্লুক আর নেকড়ের দল। এহেন ভয়াল জঙ্গলের মাঝে একটু ফাঁকা জায়গায় বাবা ইয়াগার বাড়ি। তা সেটাও বড়ই বিদঘুটে। স্রেফ একটা মুরগীর পা। আর সেই মুরগীর পায়ের ওপরে লাট্টুর মত বনবন করে ঘুরে একটা কুড়েঘর। কুড়েতে কোনো দরজা-জানালার বালাই নেই। মেঝেতে লুকনো এক ফুটো দিয়েই কেবল প্রবেশ করা যায়। বাবা ইয়াগা সেই কুড়েঘরে থাকেন।
বাবা ইয়াগার কুড়ে
বাবা ইয়াগা দেখতে কেমন? কেমন আবার। ডাইনি বুড়ি যেমন হয় তেমনই। শতচ্ছিন্ন জামাকাপড়, হদ্দ ময়লা, মাথায় শণের মতো চুল, প্যাকাটির মত হাত-পা, ইস্পাতের দাঁত। সব মিলিয়ে খুব একটা মনোরম নন। আর দশটা রুশী মানুষের মতো বাবা ইয়াগার বাসাতেও আছে প্রকান্ড এক চুল্লী। উনি সেটার ওপরে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকেন। লম্বা নাক গিয়ে ঠেকেছে বাড়ির ছাদে। পা গিয়ে পড়েছে চৌকাঠে। মাঝে মধ্যে একটু হাওয়া খাওয়ার শখ হলে বুড়ি বেরিয়ে পড়েন স্রেফ একটা হামানদিস্তা নিয়ে। তা সে হামানদিস্তাও আকারে বিশাল বড়। ইয়াগা তাতে চড়ে ঘুরে বেড়ান। কখনো কখনো আবার ঘরের ঝাঁটাতেো চড়ে বসেন। সংগে প্রায়ই দেখা যায় পোষা একটা দাঁড়কাককে। অনেক গল্পে দেখা যায়, বাবা ইয়াগার বাসার চারপাশে মানুষের হাড়ের বেড়া, তাতে মশাল জ্বলছে। এরই ফাঁকে ফাঁকে খুটিতে গাঁথা রয়েছে নরমুণ্ডু।
বেশ ভীতিপ্রদ চরিত্র এই বাবা ইয়াগা
বাবা ইয়াগার পরিবার পরিজন নিয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে অনেক গল্পে দেখা যায় তার দুটি বোন আছে। ভয়াল নাগপুত্র জমেই গরিনিচ সম্পর্কে তার বোনপো হয়। আবার এক গল্পে দেখা যায় আন্দ্রেই নামক জনৈক রুশীর সাথে বাবা ইয়াগার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। কালো, লাল আর সাদা রঙ এর তিন রহস্যময় ঘোড়সওয়ার দিদিমাকে সাহায্য করে। এরা যথাক্রমে রাত, সূর্য আর দিনকে নির্দেশ করে। এছাড়া বাতাসে ভেসে থাকতে পারে এমন তিনজোড়া হাত তার কাজকর্ম করে দেয়। বলা হয়, তার কাছে আছে মৃতকে বাঁচিয়ে তুলতে পারার শক্তিশালী এক দাওয়াই- মন্ত্রপূত পানীয়।
বাবা ইয়াগা চরিত্র কেমন
বাবা ইয়াগাকে শুরুতেই ডাইনি বুড়ি গোত্রীয় বলে দেওয়ায় তার চরিত্র যে বিশেষ হিতকর হবে না, সেটা বোঝা যায়। তবে বাবা ইয়াগা কিন্তু সব সময়ই খারাপ বেশে আসেন না। হ্যাঁ, এটা ঠিক, কোনো পথভুলো রুশী আচমকা ওনার বাসাতে গেলে তিনি বঙ্গীয় ডাইনিদের মতোই হাউ মাউ খাউ জাতীয় হুংকার দিয়ে তেড়ে আসেন। তবে একবার বুড়িকে সামলে নিয়ে দরকারের কথাটা খুলে বললে অনেক সময় দেখা যায় তিনি অনাহূত অতিথিকে গোসল করিয়ে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় এর ব্যবস্থা করবার জন্য উতলা হয়ে পড়েছেন। শুধু তা-ই না, অতিথি কিসের সন্ধানে বন জঙ্গল ঢুড়ে বেড়াচ্ছে সেটারও যথাযথ খোঁজ নিয়ে কোনো না কোনো উপায় বাতলে দেন। অনেক সময় একটা সুতার বল দিয়ে দেন। সেটা গড়াতে গড়াতে অতিথিকে লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে তার মধ্যে দয়া-দাক্ষিণ্যের কমতি নেই। সাক্ষাত দিদিমা বলা চলে। এই যেমন সওদাগর পুত্র ইভানকে রাজার রোষ থেকে বাঁচানোর বুদ্ধি বাতলে দেওয়ায় বেচারা সে যাত্রা পার পেয়ে গিয়েছিলো, মার্যুশকা খোঁজ পেয়েছিলো নিজের স্বামীর। বিশুদ্ধ মনের মানুষ দেখলে বুড়ি সাহায্য না করে থাকতে পারেন না।
দিদিমা হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন
তবে রেগে গেলে এই বাবা ইয়াগাই ভয়ংকর। মানুষের মাংসে তার অরুচি নেই। মন যদি হয় কলুষিত, যদি থাকে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য- তাহলেই কর্ম সারা। অতিথিকে তৎক্ষণাত কেটেকুটে রান্না চড়িয়ে দেন গহীন বনের বাসিন্দা এই বিদঘুটে দিদিমা। অনেক সময় হামানদিস্তায় পিষে গুড়ো করে ফেলেন দুষ্টু পথিককে।
তবে দয়ালু বা নিষ্ঠুর যা-ই হন না কেন, বাবা ইয়াগা যে জ্ঞানী- এ কথাটা অস্বীকার করবার হিম্মত কারো হবে না। পৃথিবীর সবকিছু নিয়েই তিনি কিছু না কিছু জানেন। বিচিত্র সব দায়ে ঠেকে মানুষ যায় তার কাছে। বাবা ইয়াগাও তাদের হরেক রকমের বুদ্ধি বাতলে দেন। এই যেমন সুন্দরী ভাসিলিসাকে কিভাবে ফেরত আনা যায় বা আপনি বাজা বাদ্য, রগুঢ়ে বেড়াল, নাচিয়ে হাঁস প্রভৃতি বিচিত্র বস্তুর সন্ধান তিনি দিয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে ভালো মন্দ মিশিয়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায় তার চরিত্রে।
অবশেষে
বাবা ইয়াগার মতো পুরাকথার চরিত্রগুলোর ভালো-মন্দ বিচার আসলে অসম্ভব। তবে প্রাচীন স্লাভ জাতির অনেক কিছুই বাবা ইয়াগার কাহিনীগুলো থেকে জানা যায়। বাবা ইয়াগার কুড়েটির কথাই ধরা যাক। অনেকের ধারণা, আদি স্লাভেরা মৃত মানুষকে পোড়ানোর জন্য এমনিধারা খুঁটির ওপরে বসানো কুড়েঘর ব্যবহার করতো।
বাবা ইয়াগা এবং অতিথি
রুশদেশে বাবা ইয়াগা বরাবরই বেশ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তাকে নিয়ে বাঁধা হয়েছে পিয়ানোর সুর, সোভিয়েত আমলে বানানো হয়েছে চলচ্চিত্র। রুশ লোকগাথার এই খুনখুনে বৃদ্ধাকে অনেকে প্রকৃতি দেবীর একটি প্রতিরুপ হিসেবেও কল্পনা করেন। প্রকৃতি যেমন পরিশ্রমী আর ভালো মানুষকে দু’হাত ভরে উপহার দেয় এবং লোভী লোকদেরকে দেয় চরম শাস্তি, বাবা ইয়াগার চরিত্রটি যেন ঠিক সেদিক লক্ষ্য রেখেই বানানো হয়েছে। শত শত বছর ধরে তাতে যোগ হয়েছে নানা উপাদান। দাঁড়িয়ে গিয়েছে এক বর্ণিল চরিত্র।
কাজেই কেউ যদি রুশ দেশের বিরাট বনগুলোতে যান, আর সেখানে কোনো এক সন্ধ্যা রাতে বার্চের বন ফুড়ে হামানদিস্তায় চড়ে এই ভয়ানক বুড়িকে উড়ে আসতে দেখেন, তাহলে ভয় পাবেন না যেন! আপনি যদি নিষ্কলুশ হৃদয়ের অধিকারী হন, রহস্যময়ী দিদিমা আপনাকে মাথায় তুলে রাখবেন। অবশ্য মনে অসৎ মন্ত্রণা থাকলে স্রেফ চুল্লীতে সেদ্ধ হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই! এভাবেই ভালো-মন্দ, সু আর কু এর ধারণাগুলো নিয়ে টিকে আছেন রুশভূমির এই বিখ্যাত দিদিমা- বাবা ইয়াগা।
সংক্ষেপে দেখুনমুষলধারে বৃষ্টির সঙ্গে ‘ক্যাটস এন্ড ডগস’ এর সম্পর্ক কী?
অফিস শেষে বাসায় ফিরছেন। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি নামলো তো নামলোই, আর থামাথামির কোনো নামগন্ধ নেই। এমন বৃষ্টিকে আমরা বলি মুষলধারে বৃষ্টি। ইংরেজরা একে বলে, “It’s raining cats and dogs.” আক্ষরিক অর্থ করলে দাঁড়ায়, বিড়াল-কুকুরের বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ঝুম বৃষ্টির সাথে বিড়াল-কুকুরবিস্তারিত পড়ুন
অফিস শেষে বাসায় ফিরছেন। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি নামলো তো নামলোই, আর থামাথামির কোনো নামগন্ধ নেই। এমন বৃষ্টিকে আমরা বলি মুষলধারে বৃষ্টি। ইংরেজরা একে বলে, “It’s raining cats and dogs.” আক্ষরিক অর্থ করলে দাঁড়ায়, বিড়াল-কুকুরের বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ঝুম বৃষ্টির সাথে বিড়াল-কুকুরের সম্পর্ক কোথায়? কেন এমন নামকরণ করা হয়েছে?
কুকুরে বিড়ালে বৃষ্টি হচ্ছে!
সর্বপ্রথম এই বাগধারাটির মতোই একটি বাগধারার ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় ১৬৫১ সালে প্রকাশিতওলর ইস্কানাস নামের এক কবিতা সংকলনে। ব্রিটিশ কবি হেনরি ভাউঘান এই বইয়ের এক কবিতায় একটি বাড়ির ছাদের কথা উল্লেখ করেন। এটি নাকি কুকুর-বিড়ালের ‘বৃষ্টি’ থেকে সুরক্ষিত ছিল। এক বছর পর রিচার্ড ব্রোম নামক এক ইংরেজ নাট্যকার তার সিটি উইট নামের কমেডি নাটকে ‘It shall rain dogs and polecats’ লাইনটি উল্লেখ করেন। এখানে পোলক্যাট হলো একধরনের বিড়ালজাতীয় প্রাণী।
এরপর ১৭৩৮ সালে বিখ্যাত ইংরেজ লেখক জোনাথন সুইফট Complete Collection of Genteel and Ingenious Conversation নামে সমাজের উচ্চশ্রেণীর কথোপকথন নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক লেখা প্রকাশ করেন। এই লেখায় একটি চরিত্রের কথোপকথনে সর্বপ্রথম এই বাগধারাটির বর্তমান রূপ ‘raining cats and dogs’ কথাটি উঠে আসে, যা ছিল নিম্নরূপ-
তবে বাগধারার এই রূপটি হয়তো সুইফট নিজে উদ্ভাবন করেননি। বরং আগে থেকেই প্রচলিত এই বাগধারাটিকে সুইফট নিজের মতো পরিবর্তন করে নিয়েছিলেন। সুইফটের লেখার পর থেকেই বাগধারাটির বর্তমান রূপ বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য ব্রিটিশ লেখকদের মধ্যেও এই বাগধারাটির ভিন্ন ভিন্ন রূপ ব্যবহার করতে দেখা যায়। যেমন It’s raining pitchforks কিংবা it’s raining stair-rods। এগুলোর সবই মুষলধারে বৃষ্টি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সুইফটের বাগধারাটিই সর্বত্র ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
জোনাথন সুইফট
ব্যঙ্গাত্মক লেখাটি ছাড়াও সুইফট City Shower নামে ১৭১০ সালে একটি কবিতা লিখেন। সেখানে ভারি বর্ষণের পর বন্যার বর্ণনা দেন তিনি। এই কবিতায় বন্যার ফলে রাস্তাঘাটে বিড়াল, কুকুরের মতো মৃত প্রাণীর একটি বর্ণনা রয়েছে। এর সাথে হয়তো এই বাগধারাটির একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। ঠিক কীভাবে এই বাগধারাটি এলো তার সঠিক কোনো তথ্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবে গবেষকরা এর উৎপত্তির পেছনে কয়েকটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। প্রথম তত্ত্ব অনুসারে, এই বাগধারার উৎপত্তি আসলে পৌরাণিক কাহিনী থেকে। নর্স পুরাণে ঝড়ের দেবতা ওডিনকে সবসময় নানা প্রাণীর সাথে চিত্রায়িত করা হয়েছে। বিশেষ করে কুকুর ও নেকড়ের সাথে তাকে বেশি দেখা যায়। ফলে নর্সরা কুকুরকে ঝড়ের প্রতীক হিসেবে মানতো।
ওডিনের পাশে কুকুর
আবার লোককাহিনী অনুসারে, ডাইনিরা ঝড়ের মাঝে ঝাড়ুতে চড়ে আকাশে ওড়াওড়ি করে। আর তাদের সাথে থাকে কালো বিড়াল। ডাইনি ও কালো বিড়াল একসময় সমুদ্রের নাবিকদের কাছে ভারী বৃষ্টির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। গবেষকদের মতে, Raining cats and dogs এর মাঝে থাকা বিড়াল দ্বারা ভারী বর্ষণ এবং কুকুর দ্বারা ঝড়ো বাতাসকে বোঝানো হয়। এগুলো এসেছে উপরের দুই পৌরাণিক প্রেক্ষাপট থেকে।
বিড়াল সহ ডাইনীদের প্রতীক
আবার আরেকদল গবেষকের মতে, Cats and dogs শব্দ দুটি এসেছে গ্রিক Cata doxa থেকে। এই গ্রিক শব্দযুগল অনেকটা ইংরেজি শব্দযুগলের মতোই শোনায়। গ্রিক ঐ শব্দযুগলের অর্থ হলো, যা বিশ্বাস করা যায় না, অর্থাৎ যখন অবিশ্বাস্য রকম জোরেশোরে বৃষ্টি হচ্ছে; তখন সেটিকে বলা হয় Raining cats and dogs।
আরেকটি ধারণা অনুসারে, Cats and dogs আসলে বর্তমানে অপ্রচলিত শব্দ Catadupe-এর বিকৃত রূপ। প্রাচীন ইংরেজি সাহিত্যে Catadupe-এর অর্থ ছিল ঝর্ণা বা জলপ্রপাত। এ শব্দটি দিয়ে নীলনদের জলোচ্ছ্বাস বোঝানো হতো। সেই অর্থে, Raining cats and dogs এর মানে ছিল ঝর্ণার মতো বৃষ্টি। এই বাগধারাটির উৎপত্তির পেছনে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে গল্পটি প্রচলিত রয়েছে সেটি এসেছে লোকসাহিত্য থেকে।
এই গল্প অনুসারে, বহুকাল আগে মানুষ খড়ের ঘরে বাস করতো। সেসময় কুকুর বিড়ালের মতো গৃহপালিত প্রাণীরা এসব খড়ের ঘরের চালে উঠে বিশ্রাম নিতো। খুব জোরে বৃষ্টি নামলে বৃষ্টির তোড়ে ঘরের ছাদ থেকে কুকুর বিড়াল মাটিতে গড়িয়ে পড়তো। সেখান থেকেই হয়তো মুষলধারে বৃষ্টির নামের সাথে কুকুর বিড়াল জড়িয়ে যায়। লোকসাহিত্য ছাড়াও এই গল্পের আরেকটি বড় উৎস হলো Life in the 1500s নামে ১৯৯৯ সালে গোটা ইন্টারনেট জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ইমেইল। এই ইমেইলে বলা হয়,
তবে একটু বাস্তবতা বিচার করলেই বোঝা যাবে, এ গল্পটি আসলে ভিত্তিহীন। কারণ বিড়াল হয়তো লাফিয়ে ঘরের চালে উঠে আশ্রয় নিতে পারে, কিন্তু কুকুরের জন্য তা প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া ঝড়বৃষ্টির মধ্যে কুকুর কিংবা বিড়াল ঘরের চালের মতো উন্মুক্ত স্থানে আশ্রয় নেবে এমনটা ভাবাও আসলে অযৌক্তিক। গবেষকদের মতে, এ গল্পটির আসলে কোনো ভিত্তি নেই।
শিল্পীর কল্পনায় বৃষ্টিতে কুকুর ও বিড়াল ঝরে পড়ার দৃশ্য
এই বাগধারা নিয়ে এমন আরেকটি গল্প প্রচলিত আছে। সপ্তদশ কিংবা অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে ব্রিটিশ শহরগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। সেসময় ভারী বৃষ্টি হলেই শহরগুলোতে ছোটখাট বন্যার সৃষ্টি হতো। ফলে বন্যার পানিতে ডুবে কুকুর-বিড়ালের মতো অনেক প্রাণী মারা যেত। বৃষ্টির পর এগুলোরই মৃতদেহ ভেসে থাকতো পানিতে। কেউ কেউ মনে করতেন, এই প্রাণীগুলো বাইবেলে উল্লেখিত সেই ব্যাঙ ঝরে পড়া বৃষ্টির মতোই আকাশ থেকে ঝরে পড়েছে।
আকাশ থেকে মাছ ও পাখির মতো ছোটখাটো প্রাণী বৃষ্টির সাথে ঝরে পড়ার অনেক ঘটনা থাকলেও কুকুর বিড়াল ঝরে পড়ার মতো ঘটনা বেশ বিরল। তবে আকাশ থেকে না পড়লেও রাস্তায় ভেসে থাকা কুকুর কিংবা বিড়ালের মৃতদেহ থেকেই হয়তো এই বাগধারাটি এসেছে। পূর্বে উল্লেখিত জোনাথন সুইফটের সেই কবিতাটিতেও ঠিক এমনটির উল্লেখ পাওয়া যায়।
এমন বৃষ্টিতে ছাতা নিতে ভুলবেন না!
শুধু ইংরেজিতেই এই বাগধারাটি ব্যবহার হয় এমন কিন্তু না। পৃথিবীর অনেক দেশের অনেক অঞ্চলে এই বাগধারাটির ভিন্ন ভিন্ন রূপ প্রচলিত রয়েছে। যেমন, দক্ষিণ আফ্রিকায় মুষলধারে বৃষ্টি হলে বলা হয় It’s raining old women with clubs। আর্জেন্টিনায় বলা হয় It’s raining dung head-first। স্লোভাকিয়ায় বলা হয় Tractors are falling। আয়ারল্যান্ডে বলা হয় It’s throwing cobblers’ knives।
সংক্ষেপে দেখুনমাওলানা জালাল উদ্দীন রুমি কে ছিলেন?
মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমি: স্রষ্টার প্রেমে মাতাল এক সুফি কবি প্রচলিত সকল ধর্ম ও ধর্মীয় গুরু’রা যেখানে স্রষ্টার পরিচয় দিচ্ছেন রূঢ়তা, হিংস্রতা, কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা দিয়ে। সেখানে তিনি স্রষ্টাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন প্রেম দিয়ে। তার রচিত ‘মসনবী’ কে আজো ফার্সি ভাষার শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বলে ভাবা হয়। মসনবী নিবিস্তারিত পড়ুন
মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমি: স্রষ্টার প্রেমে মাতাল এক সুফি কবি
প্রচলিত সকল ধর্ম ও ধর্মীয় গুরু’রা যেখানে স্রষ্টার পরিচয় দিচ্ছেন রূঢ়তা, হিংস্রতা, কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা দিয়ে। সেখানে তিনি স্রষ্টাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন প্রেম দিয়ে।
তার রচিত ‘মসনবী’ কে আজো ফার্সি ভাষার শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বলে ভাবা হয়। মসনবী নিয়ে পারস্য দেশের গুণী-জ্ঞানীরা বলেন, আল্লাহ যদি আরবি ভাষায় কোরান প্ৰকাশ না করে ফার্সিতে করতেন, তবে মৌলানা জালালউদ্দীন রুমির ‘মসনবি’ কেতাবখানাকে কোরান নাম দিয়ে চালিয়ে দিতেন।
মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি জন্মগ্রহণ করেন ১২০৭ সালে বালখে (যা বর্তমানে আফগানিস্তান)। তার বাবা বাহা উদ্দিন একজন সুপরিচিত আলেম। সেই সাথে তিনি বালখের একজন ধর্মতাত্ত্বিক ও আইনজ্ঞও ছিলেন। রুমির অনুসারীদের কাছে তিনি ‘সুলতান আল-উলামা’ নামেই পরিচিত। আর এর ফলেই শৈশব থেকেই রুমির সুযোগ হয়েছিল জ্ঞান আর জ্ঞানীদের সাথে মিলেমিশে বড় হওয়ার, যার স্পষ্ট ছাপ পাওয়া তার প্রতিটি কথায়।
রুমির জন্মভূমি বালখ
রুমির বাবার লেখা একটি আলোচনার সংকলন পাওয়া যায়, যার নাম ‘মাআরিফে বাহা ওয়ালাদ’ যার অর্থ ‘বাহা ওয়ালাদের শিক্ষা’। সেখানে খোদার প্রতি সমর্পণ, নৈষ্ঠিক মরমি জীবন ও মরমি তত্ত্ব সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট যুক্তি দেখতে পাওয়া যায়। তরুণ রুমি বাবার লেখা এই সংকলন পড়তে খুব ভালোবাসতেন। বাবার এই লেখাই হয়তো রুমির মধ্যে শৈশবেই সুফি হওয়ার বীজ বপন করেছিল।
অপরদিকে মাওলানা রুমির মা মুইমিনা খাতুনের পরিবার ছিল সেসময়ে বেশ সম্মানিত। তার পরিবার বহু যুগ ধরেই ইসলামের হানাফি মাযহাবের প্রচারকের ভূমিকায় কাজ করে যাচ্ছিল, যা পরে মাওলানা রুমিও জারি রাখেন।
রুমির শৈশব সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। রুমির শৈশবে চেঙ্গিসখানের সাম্রাজ্যের উত্থানের শুরু হয়। মঙ্গোলরা একে একে দেশ,রাজ্য ও সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকে। একের পর এক নগরী ধ্বংস করে শ্মশানে পরিণত করে। আর তাই বধ্য হয়ে ১২১৬ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সী রুমি নিষ্ঠুর মঙ্গোলীয় বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে পরিবার ও বাবার শিষ্যদের সাথে বলখ থেকে পশ্চিমে রওনা হন।
১২২৮ সালের দিকে সেলজুক সাম্রাজ্যের শাসক সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ মাওলানা রুমির বাবা বাহাউদ্দিন এবং তার পরিবারকে আনাতোলিয়ার কোনিয়ায় নিমন্ত্রণ করে আনেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুরোধ করেন, যার ফলশ্রুতিতে রুমির পুরো পরিবার সেখানে থেকে যায়। আর সেখানেই তার বাবা বাকি জীবন সেলজুক সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদের তৈরি করে দেওয়া প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে কাটান।
বলখে রুমির একজন শিক্ষক ছিলেন। তার নাম ছিল বুরহানুদ্দিন মুহাক্কিক তিরমিজি । তিনি রুমির বাবার শিষ্য ছিলেন। রুমির বাবা মারা গেলেন ১২৩১ সালে তখন তার বয়স ৮০ বছর। আর সেই সময়েই বুরহানুদ্দিন কোনিয়ায় এসে পৌঁছালেন। তিনি রুমির শিক্ষার ভার নিলেন।

তুরস্কের বুকাতে রুমির ভাস্কর্য
বুরহানুদ্দিনের নির্দেশে রুমি সিরিয়ার আলেপ্পো ও দামেস্কে কয়েক বছর থাকেন। উদ্দেশ্য ছিল সেখানে থাকা বড় পণ্ডিতদের কাছে শিক্ষা লাভ করা। দামেস্কে থাকার সময় সম্ভবত তিনি বিখ্যাত সুফি গুরু ইবনে আরাবির বক্তৃতা শোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। ইবনে আরাবি বলতেন ওয়াহদাতুল ওয়াজুদের কথা। এর মানে ‘সত্তার একত্ব’। এই ধারণাই হয়ে উঠে রুমির কবিতার দার্শনিক ভিত্তি। মানে, সেই এক ও অনন্য বাস্তবতা, যা সবার উৎস ও প্রকাশ। সেখানেই সবার প্রত্যাবর্তন ঘটে।
এমনি করে রুমি ফারসি-আরবি ভাষা ও সাহিত্যে উঁচু শিক্ষা লাভ করেছেন। সঙ্গে ছিল ধর্মীয় শাস্ত্র, দর্শন ও আইনশাস্ত্রে শিক্ষা। বুরহানুদ্দিন তাকে চিল্লা, মানে চল্লিশ দিনের নির্জন সুফি-সাধনায় শিক্ষা দিয়েছিলেন। সেকালে বাবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রুমি এক নামী শিক্ষক ও গুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।
রুমি, শামস তাবরেজি ও আধ্যাত্মিকতা
রুমির বয়স তখন ৩৭। ১২৪৪ সালের ২৯ নভেম্বর। রুমি দেখা পান তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির। তিনি একজন ভবঘুরে দরবেশ। তার বয়স তখন ৬০। নাম শামস তাবরেজি। মানে তাবরেজের সূর্য। তাবরেজ উত্তর-পশ্চিম ইরানের এক শহর। শামস ছিলেন এক রহস্যময় পুরুষ। শামস তাবরেজি নিরক্ষর ছিলেন বলে প্রচলিত মতাদর্শ রয়েছে। কিন্তু কি করে এমন একজন নিরক্ষর মানুষ রুমির মতো এতো নামী পন্ডিত কে আত্মহারা কবি বানিয়ে দিতে পারলেন তা আজো পাঠকদের বিস্মিত করে।
শামস তাবরিজি ছিলেন সমাজ থেকে একটু আলাদা, যিনি নিজেকে সম্পদ থেকে সবসময় দূরে রেখেছেন। আধ্যাত্মিকতা আর সম্পদের মোহ থেকে মুক্ত থাকার দরুণ তিনি সবসময় কিছু মানুষের কাছে অন্যরকম মর্যাদা পেতেন। মানুষ তাকে ‘পাখি’ বলে ডাকত, কারণ তিনি এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকতেন না, দ্রুত জায়গা পরিবর্তন করতেন। লোক মুখে প্রচলিত ছিল, তিনি একজন শিষ্য খুঁজতেন যে কি না তার পরে আধ্যাত্মিকতার কাজটি এগিয়ে নেবে।
শামস তাবরিজি
কী ঘটেছিল তাঁদের দুজনের মধ্যে? কে ছিলেন গুরু? কে শিষ্য?
এই কথার উত্তর খুঁজতে গেলে দুটি ব্যাপার বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, শামস নিরক্ষর বিরাগী দরবেশ ছিলেন না। তিনি পণ্ডিতও ছিলেন না। তবে পণ্ডিত আর সুফি সাধকদের কাছে তার পাঠ নেওয়ার নজির আছে। তার আলোচনার একটি সংকলন বই আকারে পাওয়া যায়; নাম মাকালাতে শামস, মানে শামসের আলোচনা। আর এই আলোচনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন মওলানা রুমির পুত্র। সেই বইয়ের আলোচনাই বলে দেন কতোটা সূক্ষ্ম দৃষ্টির মানুষ ছিলেন।
রুমির মন ভালোবাসা, সৃষ্টির মূল্য নিশ্চিত করে স্রষ্টা তথা পরম সত্যকে ধারণ করার জন্য তাঁর হৃদয়-প্রাণ উন্মুখ হয়েই ছিল। প্রয়োজন ছিল একটি আগুনের ছোঁয়া। শামস তাবরেজ শুধু সেই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ খুলে দিলেন। আর বের হয়ে এল আশ্চর্য সুন্দর, আকুল করা, অন্তর্দৃষ্টিতে সতেজ রুমির কবিতাগুলো। সারাদিনমান আমি এই নিয়ে ভাবি তারপর রাতে আমি তা বলি”আমি কোথা হতে আগত?”
আর আমার লক্ষ্যটি তাহলে কী?আমার আত্মাটি অন্য কোথাও হতে আগত আমি তাতে নিশ্চিত!
শামস আর রুমির দেখা না হলে দুজনের কেউই ইতিহাসে জায়গা করে নিতেন না। এই দুইয়ের সাক্ষাৎকে এর চেয়ে কম কিছু দিয়ে মাপা যায় না । তবে তাঁদের সম্পর্কের ধরন কেমন ছিল?
শামসের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরই রুমি তার গীতিকবিতা, মানে গজলগুলো বলা শুরু করলেন। তার সাধারণ কক্ষে তিনি সন্ধ্যার পর শিষ্যদের নিয়ে বসতেন । সেখানে ‘সামা’, মানে ভাবসংগীতের আসর হতো। সে আসরের মাঝে একখানা খুঁটি ছিল। হাল বা ভাবে এসে মওলানা সেই খুঁটি ধরে চক্রাকারে ঘুরতেন । বাহ্যজ্ঞানরহিত মওলানা একের পর এক গজল বলে যেতেন। শিষ্যরা সেগুলো লিখে রাখতেন। গুরু শামস তাবরেজ স্মরণে বলা এই কবিতাগুলোর সংকলনের নাম দিওয়ানে শাম তাবরেজ। একে ‘দিওয়ানে কবির’ বা মহান সংকলন নামেও ডাকা হয়। এই সংকলনে আছে ৩৫০০ গজল, ২০০০ রুবাই বা চতুষ্পদী। সব মিলিয়ে ৪২,০০০ লাইন। প্রতিটি কবিতা আকুল প্রেমের। অনেকগুলো সরাসরি রুমির মুর্শিদ শামস তাবরেজের নাম উল্লেখ করেই বলা।

দেওয়ান-এ শামস-এ তাবরেজী” ১৫০৩ সালের একটি পৃষ্ঠার অনুকরণ
প্রেক্ষাপট বিচ্ছিন্ন হয়ে এই কবিতা পাঠ করার মারাত্মক পরিণাম হতে পারে। এর প্রমাণ হতে পারে এই যে পশ্চিমে রুমির কবিতা জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণাও গজিয়ে উঠল যে এই কবিতাগুলো সমকামী প্রেমের আবেগের নিদর্শন। এই ভাবনা হচ্ছে ইতিহাসের জমিনে না দাঁড়িয়ে কেবল নিজের কাল আর সমাজের সাপেক্ষে কিছুকে ধারণ করতে চাওয়ার ফল।
অন্য সংস্কৃতির প্রথা নিজ সংস্কৃতি দিয়ে বুঝতে চাওয়া ভুল। যেমন মধ্যপ্রাচ্যে সাক্ষাতে পুরুষেরা পুরুষের আর নারীরা নারীদের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে অভিবাদন জানায়। পশ্চিমা দেশে এর প্রত্যক্ষ মানে সমকামিতা ছাড়া আর কিছু নয়। অপর দিকে পশ্চিমা সমাজে প্রথাটা ঠিক বিপরীত। প্রাচ্যে যা অকল্পনীয়। জাপানে ঘরের বাইরে চুমু দেওয়া খুবই অস্বাভাবিক। এমনকি জাপানি মায়েরাও তাঁদের শিশুকে বাইরে চুমু দেন না।
সুফিদের একটি ঐতিহ্যের নাম ‘সোহবাত’। যার মানে সাহচর্য। যেখানে দুই অন্বেষণকারীই একে অপরকে শ্রদ্ধা আর ভালোবেসে নিয়মিত সাক্ষাৎ করেন। নিজেদের অনুভূতি আর অভিজ্ঞতা একে অপরকে জানান। এই দুজন গুরু ও শিষ্য হতে পারেন। দুজনই গুরুস্থানীয় হতে পারেন কিংবা দুজনেই বন্ধু হতে পারেন। এই চর্চা মরমি পথের পথিকদের পথের সুলুক সন্ধান জানতে কাজে লাগে। এতে করে নিজেদের জানা-বোঝা বাড়ে। শামস ছিলেন রুমির ‘হাম-সোহবাত’, সাহচর্য সঙ্গী। রুমি আর শামসের মতো দুজন মানুষ সহসা একে অপরের কাছে আসেন না। এমন ঘটনা কালেভদ্রে হয়। এ যেন দুই মহানদীর এক হয়ে প্রেমের সমুদ্রে মিশে যাওয়া।
ফারসিভাষী সুফি কবিদের মধ্যে রুমি প্রথম প্রেমের কবিতা লেখেননি। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি সেই জায়গায় এক অতি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের মধ্যে জন্মেছেন। সেই প্রেম কখন মানব থেকে পরম আর কখন পরম থেকে মানবে আসে, তা দ্রুত বোঝা কঠিন।
রুমির মৃত্যু
রুমি মারা যান ১২৭৩ সালের ৭ ডিসেম্বর, রোববার সন্ধ্যাবেলা। তার সমাধি তখন থেকে প্রেমিকদের তীর্থভূমি। পশ্চিমে তিনি পরিচিত রুমি নামে। কারণ, তিনি বাস করতেন যেখানে, সেই স্থানকে বলা হতো ‘রুম’। আনাতোলিয়ার বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে পারস্যবাসীরা রুম নামে ডাকত। আফগান বা তুর্কিরা তাকে বলেন জালালউদ্দিন বলখি। কারণ, তার জন্ম বলখ নগরে। তবে পুবের মানুষেরা তাকে সেই জন্ম বা আবাসের বেড়া পার হয়ে ডাকেন ‘মওলানা’ বলে। তবে ফারসিভাষী তথা অনারব মুসলমানরা রুমিকে ‘মওলানা’ বলেই ডাকতে ভালোবাসে । যার অর্থ গুরু, শিক্ষক।
১৯৮১-১৯৯৪ সালের তুরস্কের ৫০০০ লিরা(টাকা) নোটের পিছনে রুমি এবং তার সমাধিস্তম্ভ।
রুমিকে তার পিতার কাছে কোনিয়ায় সমাহিত করা হয় এবং যেটি একটি চমকপ্রদ ঘর, “ইয়াসিল তুর্ব”(সবুজ সমাধি, যা বর্তমানে মাওলানা মিউজিয়াম), তার কবরের উপর দাঁড়িয়ে আছে। তার সমাধিফলকে লেখাঃ
জর্জিয়ার রাণী গুরসু খাতুন ছিলেন রুমির উৎসাহদাতা এবং কাছের বন্ধু। তিনি কোনিয়াতে রুমির সমাধি নির্মানে তহবিল প্রদান করেন। ১৩ শতকের মাওলানা মিউজিয়ামসহ তার মসজিদ, থাকার জায়গা, বিদ্যালয় এবং মৌলভি তরীকার অন্যান্য ব্যক্তিদের সমাধি দেখতে আজকেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম-অমুসলিমরা ছুটে যান।
তুরস্কের কোনিয়াতে রুমির সমাধি।
জালাল উদ্দিন যিনি রুমি নামে পরিচিত, তিনি ছিলেন ইসলামের একজন দার্শনিক এবং মরমী। তার উপদেশ সমর্থন করে ভালবাসার মাধ্যমে অসীম পরমতসহিষ্ণুতা, ইতিবাচক যুক্তি, ধার্মিকতা, দানশীলতা এবং সচেতনতা। তিনি এবং তার শিষ্যদের কাছে সকল ধর্মই অধিক বা কম সত্য। মুসলিম, খৃষ্টান এবং ইহুদীকে একই দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন, তার শান্তিপূর্ণ এবং সহিষ্ণু শিক্ষাদান বা উপদেশ সকল ধর্মের মানুষের অন্তর স্পর্শ করেছে।
দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স উপন্যাসের আড়ালে মাস্কেটিয়ার্সদের বাস্তব জীবন কেমন?
দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স: উপন্যাসের আড়ালে মাস্কেটিয়ার্সদের বাস্তব জীবন বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক আলেকজান্ডার দ্যুমার বিখ্যাত এডভেঞ্চার উপন্যাস ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’। ১৮৪৪ সালে আলেকজান্ডার দ্যুমা তার সহযোগী আরেক লেখক অগাস্ট ম্যাক কে নিয়ে ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ শিরোনামে Le Siècle নামক একটি সাপ্তাবিস্তারিত পড়ুন
দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স: উপন্যাসের আড়ালে মাস্কেটিয়ার্সদের বাস্তব জীবন
বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক আলেকজান্ডার দ্যুমার বিখ্যাত এডভেঞ্চার উপন্যাস ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’। ১৮৪৪ সালে আলেকজান্ডার দ্যুমা তার সহযোগী আরেক লেখক অগাস্ট ম্যাক কে নিয়ে ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ শিরোনামে Le Siècle নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত করতে থাকে। এই উপন্যাসের মাধ্যমে আলেকজান্ডার দুমা তার পাঠকদের ১৭ শতকের ফ্রান্সের কিছু মাস্কেটিয়ার্সদের এডভেঞ্চারময় জীবনে নিয়ে যান।
গল্পটি পত্রিকায় প্রতি সপ্তাহে ১ টি অধ্যায় বা অনুচ্ছেদ আকারে প্রকাশিত হতো। যেহেতু সেসময় সাধারণ মানুষের পক্ষে একটা গোটা বইয়ের দাম বহন করার সক্ষমতা ছিলো কম, তাই তারা দৈনিক পত্রিকার প্রতি এতোটাই ঝুঁকে পড়ে যে Le Siècle পত্রিকা কেনার জন্য সংবাদপত্রের দোকানগুলোতে দীর্ঘ লাইন লেগে থাকতো
ফরাসি ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার আলেকজান্ডার দ্যুমা
দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স উপন্যাসটি ১৭ শতকের ফ্রান্সের প্রেক্ষাপটে রচিত। উপন্যাসের শুরু হয় ফ্রান্সের গ্যাসকনের ডার্টানিয়ান নামক এক যুবক ছেলেকে দিয়ে। ডার্টানিয়ান গ্যাসকন ছেড়ে প্যারিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। তার জীবনের উদ্দেশ্য সে রাজার রক্ষীবাহিনী মাস্কেটিয়ার্সের দলে যোগ দিয়ে নিজের জীবনের ক্যারিয়ার গড়বে। আর প্যারিসে এসেই বিভিন্ন ঘটনাবহুল দৃশ্যপটের মাধ্যমে তার বন্ধুত্ব হয় ফ্রান্সের রাজা লুই ত্রয়োদশ এর তিন অনুগত মাস্কেটিয়ার অ্যাথোস, পোর্থোস এবং আরামিসের সাথে।
এই চার মাস্কেটিয়ার্স একসাথে অনেক এডভেঞ্চারময় ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন। রাজা লুই ত্রয়োদশের রাণী অ্যান-অস্ট্রিয়ার সম্মান বাঁচাতে মন্ত্রী ও তার সহযোগীদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বেঁচে গিয়েছেন। কিন্তু এই উপন্যাসের প্লট ও চরিত্রগুলো কিন্তু আলেকজান্ডার দ্যুমা ১৭ শতকের ফ্রান্সের বাস্তব জীবন থেকেই নিয়েছিলেন। আজ আপনার উপন্যাসের নায়কদের বাস্তব জীবন সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দেবো এই লেখার মাধ্যমে।
মাস্কেটিয়ার্সদের উৎপত্তি
থ্রি মাস্কেটিয়ার্সদের নায়কদের সম্পর্কে জানার আগে আমাদের মাস্কেটিয়ার্স সম্পর্কে জানা উচিত। মাস্কেটিয়ারদের উৎপত্তি হয় ১৬ শতকের গোঁড়ার দিকে, যখন রাজা ষষ্ঠ হেনরি একটি ছোট অশ্বারোহী বাহিনী তৈরি করেছিলেন। মাস্কেটিয়ার্স বাহিনী আর্কেবাস নাম এক ধরনের লম্বা বন্দুক দিয়ে সজ্জিত থাকতো। তারা তাদের সঠিন নিশানায় লক্ষভেদের জন্য পুরো রাজ্য জুড়ে বিখ্যাত ছিলেন।
একজন অশ্বারোহী মাস্কেটিয়ার
১৬১৫ সালে ফ্রান্সের রাজা লুই ত্রয়োদশ মাস্কেটিয়ার্সদের কাজকর্ম ও সাজসজ্জায় বিশেষ পরিবর্তন আনেন। তিনি তার নিরাপত্তার জন্য এই বিশেষ বাহিনীর ব্যবহার শুরু করেন।
শুরু থেকেই, মাস্কেটিয়ার্সরা ছিলো একটি অভিজাত রেজিমেন্ট। মাস্কেটিয়ার্স দলে প্রায় সব নিয়োগকারীই ছিলো আভিজাত বংশের মানুষজন, যদিও সামরিক দক্ষতাই ছিল প্রধান। মূল মাস্কেটিয়ার্স দলে যোগ দেওয়ার আগে তাদের ট্রেনিং দেওয়ানো হতো। তবে সদ্য যোগ দেওয়া সকল মাস্কেটিয়ার্সরা ছিলো বয়সে তরুন। তাদের সকলের বয়সই ১৬ থেকে ১৮ বছরের মাঝামাঝি।
মাস্কেটিয়ার্সরা অশ্ব,তলোয়ার ও আগ্নেয়াস্ত্র চালানোতে বেশি দক্ষ ছিলো। ফ্রান্সে যখন যুদ্ধ চলতো না তারা রাজা সহচারী হিসেবে যুক্ত থাকতো। রাজার বিনোদন বা মনোরঞ্জনের দায়িত্ব ছিলো তাদেরই হাতে। আবার দেশে যুদ্ধ লাগলে রাজার সঙ্গে তারা রাজার সঙ্গে যুদ্ধে সম্মুখভাগে কাজ করতো। এছাড়াও তারা রাজার দরজায় সেন্ট্রি হিসেবেও কাজ করতো।
বাস্তবে উপন্যাসের চরিত্র ডার্টানিয়ান
বাস্তবে ডার্টানিয়ানের নাম চার্লস ডি ব্যাটজ দে ক্যাস্টেলমোর। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৬১৩-১৫ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের লুপিয়াকের কাছের শ্যাটো কাস্টেলমোরে। তার পরিবার ছিলো দরিদ্র আর তিনি ছিলেন সেই পরিবারে ছোট ছেলে। তিনি খুবই কম বয়সে ফ্রান্সের একটি অভিজাত রেজিমেন্টে যোগ দেন। তিনি ১৬৩৫ সালে ফ্রাঙ্কোয়েস ডি গুইলনের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন। তার মায়ের পারিবারিক পদবির নাম ছিলো ডার্টানিয়ান, উপন্যাসে আলেকজান্ডার দ্যুমা তাকে আমাদের সামনে এই নামেই পরিচয় করিয়েছেন।
ডার্টানিয়ান ১৬৪০ এর দশকে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ১৬৪১ সালে তিনি ইংল্যান্ডে একটি মিশনে গিয়েছিলেন আর ফিরে আসেন যখন ফ্রান্সের রাজা লুই ত্রয়োদশ পরলোকগমন করেন। ডার্টানিয়ান ১৬৪৪ সালে মাস্কেটিয়ার্স দলে যোগ দেন। মাস্কেটিয়ার্সের রেজিমেন্ট ভেঙে গেলে তিনি মন্ত্রী কার্ডিনাল মাজারিনের সাথে কাজ শুরু করেন। এ সময় তিনি বেশ কয়েকটি গোপন মিশন পরিচালনা করেন। তবে ডার্টানিয়ান সবচেয়ে বেশি কুখ্যাত দূর্নীতিবাজ অর্থমন্ত্রী নিকোলা ফুকে কে গ্রেফতার করার জন্য।
চার্লস ডি ব্যাটজ দে ক্যাস্টেলমোর স্ট্যাচু যিনি পাঠকদের কাছে ডার্টানিয়ান নামে পরিচিত
ডার্টানিয়ান একসময় রাজ পরিবারের বিশেষ অংশ হয়ে উঠেন। তিনি রাজার হরিণ শিকারী দলের অধিনায়কের দায়িত্ব নেন। রাজা লুই ত্রয়োদশের পুত্র রাজা লুই চতুর্দশের ভ্রমণের সময় সবসময় রাজার সঙ্গেই থাকতেন।
১৬৫৯ সালে ডার্টানিয়ান শার্লট অ্যান ডি চ্যানেলেসি নামের এক বিধবা নারীকে বিয়ে করেন, যার সাথে আগের স্বামীর ২ জন পুত্র সন্তানও ছিলো। কিন্তু ১৬৬৫ সালেই তাদের এই বিবাহ ভেঙে যায়।
সাংসারিক হতে না পারলেও তিনি ছিলেন একজন সফল সৈনিক। ১৬৫৬ সালে তিনি গার্ডস দলের ক্যাপ্টেন হন। এর দুই বছর পর ১৬৫৮ সালে আবারো পুনরায় গঠিত হওয়া মাস্কেটিয়ার্স দলের সাব-লেফটেন্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৬৬৭ সালে তিনি সেই মাস্কেটিয়ার্স ব্রিগেডিয়ার হন। এছাড়াও তিনি সাময়িক সময়ের জন্য ফ্রান্সের লীলের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ডার্টানিয়ান ১৬৭৩ সালের ২৫ জুন যুদ্ধচলাকলীন শত্রুর আঘাতে নিহত হন।
বাস্তব জীবনে অ্যাথোস
অ্যাথোসের আসল নাম আরমান্ড ডি সিলেগু ডি’অথস ডি’আউটভিল। আলেকজান্ডার দ্যুমার মাস্কেটিয়ার্স সদস্যদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে আভিজাত্যপূর্ণ সেই সাথে ছিলেন জ্ঞানী মানুষ। তিনি সবসময় মদ্যপান করতেন। উপন্যাসে তার এই প্রচুর মদ পানের পেছনে ছিলো এক করুন প্রেমে আঘাত পাওয়ার ঘটনা। যা সবসময় তিনি তার বন্ধুদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র অ্যাথোস জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৬১৫ সালে। অ্যাথোসরা ছিলেন ২ ভাই, আর তিনিই ছিলেন কনিষ্ঠ। বাস্তব জীবনের অ্যাথোসের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। তিনি ১৬৪০ বা ৪১ সালে মাস্কেটিয়ার্সদের দলে যোগ দিয়েছিলেন। আর যোগ দেওয়ার মাত্র ২ বছর পর ১৬৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর প্যারিসে মারা যান।
ইতিহাসবিদদের মতে অ্যাথোসের এই অল্প বয়সে মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। তার সাথে কারো দ্বন্দ্ব ছিলো আর সেই দ্বন্দ্ব ভায়োলেন্সে রূপ নেয়, আর তাতেই অ্যাথোসের মৃত্যু হয়।
বাস্তব জীবনের পর্থোস
পর্থোসের আসল নাম আইজ্যাক ডি পুর্তো। দ্যুমা তার উপন্যাসে পর্থোসকে দেখিয়েছিলেন অনুগত, সাহসী এবং একজন প্রেমিক পুরুষ রূপে। পর্থোস ১৬১৭ সালে ফ্রান্সের একটি প্রোটেস্টেন্ট খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৬৪০ এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি একটি সামরিক দলে যোগ দেন। অনেক ইতিহাসবিদ ধারণা করেন যে তিনি পরবর্তীতে মাস্কেটিয়ার্সদের দলে যোগ দিয়েছিলেন। পর্থোস ১৬৫০ সাল নাগাদ তার জন্মভূমি বার্নে ফিরে আসেন। আর সেখানেই তাকে নাভারেক্সের যুদ্ধাস্ত্র গার্ডের সাবঅল্টার্ন হিসাবে কাজ করতে দেখা যায়। এছাড়াও তাকে তার ভাই জিনের সাথে কাজ করতে দেখা যায়, যিনি সেই শহরের একটি সামরিক পোস্টও অধিষ্ঠিত ছিলেন।
পর্থোসের বাকি জীবনটা রহস্যময়। তবে স্থানীয় তথ্য মতে তিনি ১৬৭০ সালে মারা যান। দ্যুমার মাস্কেটিয়ার্স চরিত্রগুলোর মধ্যে দ্যুমার সবচেয়ে প্রিয় মাস্কেটিয়ার্স ছিলো পর্থোস। দ্যুমার বাবাও ছিলেন একজন সফল সৈনিক। নিজের বাবার রূপটাই তিনি পোর্থোসের মাধ্যমে উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন।
বাস্তব জীবনের অ্যারামিস
অ্যারামিসের আসল নাম হেনরি ডি অ্যারামিস। আলেকজান্ডার দ্যুমা তার উপন্যাসে অ্যারামিস কে দেখিয়েছেন, একজন যুবক যিনি মাস্কেটিয়ার্স দলে যোগ দেওয়ার আগে পুরোহিত হওয়ার জন্য ধর্মের উপর অধ্যায়ন করেছেন। থ্রি মাস্কেটিয়ার্স সিরিজের পরের বই গুলোতে তাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। আর সিরিজের শেষ পর্যন্ত ৪ জন মাস্কেটিয়ার্সদের মধ্যে বেঁচে যাওয়া শেষ মাস্কেটিয়ার্স ও তিনিই।
দ্যুমার থ্রি মাস্কেটিয়ার্স উপন্যাসের মধ্যে সবচেয়ে জটিল চরিত্রটির নাম অ্যারামিস। অ্যারামিস ফ্রান্সের একটি অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অ্যারামেস খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের মঠে তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন। উপন্যাসের শুরুতে দ্যুমা অ্যারামেসের ধর্মের ব্যাপার সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না।

আলেকজান্ডার দ্যুমার সেই ৪ মাস্কেটিয়ার্সদের স্ট্যাচু ফ্রান্সের কোনো এক শহরে
অ্যারামিজ ১৬৪০ সালের গ্রীস্মে মঁসিয়ে ট্রেভিয়েলের অধিনস্থ মাস্কেটিয়ার্সের দলে যোগদান করেন। তিনি বেশ কয়েক বছর মাস্কেটিয়ার্স দলে কাজ করেছিলেন। মাস্কেটিয়ার্স দলে তার পদবি কি ছিলো বা কি পদমর্যাদা অর্জন করেছিলেন সে-সব বিষয়ে তথ্য জানা যায় না। ১৬৫০ সালে তিনি বার্নে ফিরে আসেন; আর সেখানেই তিনি জিন ডি বার্ন-বোনাসেকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির ২ ছেলেও ২ মেয়ে হয়েছিল। অ্যারামিস কে প্যারিসে শেষবার ১৬৫৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে দেখা যা, যখন তিনি এবং তার স্ত্রী তার শ্যালকের বিবাহের সাক্ষী হতে উপস্থিত হয়েছিলেন। ১৬৮১ সালে অ্যারামিস কোনো প্রকার দূর্ঘটনা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেন।
বাস্তব জীবনের মঁসিয়ে ডি ট্র্যাভিল
মঁসিয়ে ট্র্যাভিলের নাম ছিল জিন-আর্নড ডু পেয়ার ডি ট্রয়েসভাইলস। মঁসিয়ে ট্র্যাভিল ১৫৯৮ সালে বার্নের ওলোরন-সাইন্ট-মেরিতে জন্মগ্রহণ করেন। মঁসিৈ ট্র্যাভিল ১৬১৬ সালে গার্ডসের একটি রেজিমেন্টে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। আর মাস্কেটিয়ার্স দলে যোগ দেন ১৬২৫ সালে।১৬৩৪ সালে তিনি মাস্কেটিয়ার্স দলের ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন। মাস্কেটিয়ার্স দল ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ১২ বছর তিনি সেই পদেই ছিলেন।
মঁসিয়ে ট্র্যাভিল রাজার প্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন। রাজার শুভাকাঙ্ক্ষী হওয়ায় মন্ত্রী কার্ডিনাল রুশেলৌর শত্রুতে পরিণত হন। কার্ডিনাল রুশলৌর ষড়যন্ত্রের ফলে তাকে মাস্কেটিয়ার্স দল থেকে সাময়িকভাবে নির্বাসিত করা হয়।
মাস্কেটিয়ার্স দল পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও মঁসিয়ে ট্র্যাভিলি আর ফিরে আসেন নি। তিনি তার জন্মস্থান বার্নে নিজের সম্পত্তি দেখাশোনা করেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেন। মঁসিয়ে ট্র্যাভিলি ১৬৭২ সালে মারা যান।
থ্রি মাস্কেটিয়ার্স একে-অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্য নয়, কিন্তু সম্পর্কিত
আলেকজান্ডার দ্যুমা তার থ্রি মাস্কেটিয়ার্স ট্রিওলজিতে যেমটা ৪ মাস্কেটিয়ার্স ডার্টানিয়ান,অ্যাথেস,পর্থোস ও অ্যারামিস কে দেখিয়েছিলেন বাস্তবে সেই বর্ণার সাথে তাদের জীবনে তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। তারা একে অপরকে আদৌও চিনতেন কিনা সে ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের অনেক সন্দেহ আছে। তবে এদের সকলের একটা বিষয়ে খুব কমন জিনিস হচ্ছে মঁসিয়ে ট্র্যাভিল। এদের সকলে একজন আরেকজনের সাথে সম্পর্কিত না হলেও মাস্কেটিয়ার্স থাকাকালীন সময়টায় তারা সকলেই মঁসিয়ে ট্র্যাভিলের সাথে যুক্ত ছিলেন।
ডার্টানিয়ানের সাথে অন্য তিন মাস্কেটিয়ার্সের যোগসূত্র নিয়ে সন্দেহ থাকলেও ঐতিহাসিক নথিপত্র মতে অ্যাথোস,পরর্থোস, অ্যারামেসের সাথে মঁসিয়ে ট্র্যাভিলির আত্মীয়ের সম্পর্ক ছিলো। এরা প্রত্যেকেই একে অপরের কোনো না কোনোভাবে কাজিন ছিলেন। এদের সকলের মাস্কেটিয়ার্স দলে আসার পেছনে কারণ হিসেবে মনে করা হয় মঁসিয়ে ট্র্যাভিলি কারণ সে সময় তিনি ছিলেন মাস্কেটিয়ার্স দলের প্রধান আর সে সময়টায় নিজেদের আত্মীয়দের সরকারি দল বা চাকরিতে নেওয়ার ব্যাপার খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ছিল।
গ্রীক মিথলজির সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ কে ছিলেন?
অ্যাডোনিস: গ্রীক মিথলজির সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ অ্যাডোনিস গ্রীক মিথলজির সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ, তিনি এতোটাই সুন্দর ছিলেন যে প্রেমের দেবী আফ্রোদিতিও সেই সৌন্দর্যে ডুবে ছিলেন। তবে তাদের এই প্রেম দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বন্য জন্তুর আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিলেন অ্যাডোনিস। অ্যাডোনিসের এমন আকষ্মিক মৃত্যুতে দীর্ঘদিন বিবিস্তারিত পড়ুন
অ্যাডোনিস: গ্রীক মিথলজির সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ
অ্যাডোনিস গ্রীক মিথলজির সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ, তিনি এতোটাই সুন্দর ছিলেন যে প্রেমের দেবী আফ্রোদিতিও সেই সৌন্দর্যে ডুবে ছিলেন। তবে তাদের এই প্রেম দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বন্য জন্তুর আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিলেন অ্যাডোনিস। অ্যাডোনিসের এমন আকষ্মিক মৃত্যুতে দীর্ঘদিন বিষাদে ডুবে ছিলেন স্বয়ং প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি।
অ্যাডোনিসের জন্ম ও মৃত্যু খুবই আশ্চর্যজনক ও বিষ্ময়কর। এজন্য আমাদের যেতে হবে গ্রীক উপকথায়। যে উপকথার জগতে রয়েছে অজাচার,অলৌকিকতা, প্রেম, কিংবা করুন মৃত্যুর এক আশ্চর্য সমাহার।
অ্যাডোনিসের জন্ম হয়েছিলে অজাচারের মাধ্যমে
গ্রীক মিথলজিতে অজাচার খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। তেমনই স্মার্না নামে একটি তরুণী বাবার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। স্মার্নার বাবার নাম সিনাইরাস, কারও কারও মতে তার নাম থিয়াস। সে কালের পুরুষেরা ছিল বহু নারীর দ্বারা তুষ্ট। বোধহয় এই আধুনিক যুগেও পুরুষরা তার ব্যাতিক্রম মানুষিকতা খুবই কম পোষণ করেন। যাই হোক থিয়াসের এক ঘনিষ্ট সেবিকা ছিল। সেই সেবিকার নাম ছিল হিপ্পোলিটা। হিপ্পোলিটার মনে বিপর্যস্ত স্মার্নাকে দেখে দয়ার উদ্রেক হয়। হিপ্পোলিটা বুদ্ধি খাটিয়ে স্মার্নার সুপ্ত বাসনা পূর্ণ করবার একটা উপায় বের করেন।
অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত্রিবেলায় স্মার্না কে থিয়াস এর ঘরে নিয়ে যায় হিপ্পোলিটা… এবং ছল করে কন্যাকে বাবার শয্যায় উঠিয়ে দেয়। অন্ধকার ঘরে মদ পান করছিল থিয়াস। হিপ্পোলিটা থিয়াস-এর কাছে যায় এবং ফিসফিসে আদুরে কন্ঠে বলে: প্রভু, আপনার শয্যায় একজন অপেক্ষা করছেন। থিয়াস কৌতুহলী হয়ে উঠে। হিপ্পোলিটা মৃদু হেসে বলে সে আপনাকে ভালোবাসে।
নতুন নারীদেহের লোভে থিয়াস পানপাত্র রেখে শয্যার দিকে যেতে থাকে। অতপর নিজ আপন কন্যার সঙ্গে মিলিত হয়। পরপর কয়েক রাত মদ্যপ বাবার সাথে মেয়ের নিষিদ্ধ যৌনসুখ চলতে থাকে। এই ঘটনা চাপা থাকেনি। থিয়াস যখন জানতে পারে সে তার কন্যার সুপ্ত মনোবাসনার শিকার হয়েছে, তখন সে ক্রোধে উম্মাদ হয়ে ওঠে এবং দ্রুত তরবারী টেনে নেয়। তারপর মেয়েকে ধাওয়া করে। আর সেই দৃশ্য দেখে মৃদুহাসি হাসছিল হিপ্পোলিটা স্মার্না প্রাণ ভয়ে ছুটছে। ছুটন্ত স্মার্না প্রার্থনায় রত হয়। যেন সে হতে পারে অদৃশ্য, যেন বাবা তাকে না দেখতে পারে। হয়ত স্বর্গের দেবদেবীগন মেয়েটিকে ভালোবাস। দেবতাগন দয়ার বশবর্তী হয়ে ছুটন্ত মেয়েটিকে একটি স্মার্না বৃক্ষে রূপান্তরিত করে দেন।
গ্পরীক উপকথার কাহিনী অনুসারে ধারণা করা হয় এই ঘটনাটি বর্তমানকালের সিরিয়া-লেবাননের কোথাও ঘটেছিল। যাই হোক দশ মাস পর বৃক্ষটি বিস্ফোরিত হয় ও একটি সুন্দর শিশুপুত্র বেরিয়ে আসে। আর এই হল অ্যাডোনিস-এর জন্মকথা।
অ্যাডোনিস এর জন্ম হয়েছিলো যে বৃক্ষ হতে তার পাশেই সদ্য জন্মানো শিশু অ্যাডোনিস কে ঘিরে গ্রীক দেবতারা
মানচিত্রে লেবানন। এখানেই ছিল প্রাচীন ফিনিসিয় সভ্যতা। বিবলস নগর। অ্যাডোনিস নামে একটি নদী, যে নদীর উৎপত্তি স্থলে এককালে সুগন্ধী স্মার্না বৃক্ষ বিস্ফোরিত হয়ে অ্যাডোনিস এর জন্ম হয়েছিল।
এই ঘটনার পর গ্রীক দেবতাদের মধ্যে হুলুস্থুল অবস্থার সৃষ্টি হয়।
একটি সুগন্ধী স্মার্না বৃক্ষের কাছে সদ্য প্রসূত একটি শিশুকে কে দেখতে পান দেবী। থমকে যান দেবী। শিশুটি দেখতে অসম্ভব ফুটফুটে ছিল। দেবীর বুক কাঁপে। একে যেন দেবতারা কোনওমতেই দেখতে না পায়। এই ভেবে আফ্রোদিতি শিশুটিকে একটি আলমারীর ভিতরে লুকিয়ে রাখে। তবে অ্যাডোনিস নামটি দেবী আফ্রোদিতি রেখেছেন কিনা সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।
এরকম চাঞ্চল্যকর একটি ঘটনা চেপে রাখতে ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল দেবীর। কথাটা শেষমেশ দেবী ফাঁস করে দেয় পাতালের রানী পার্সিফোনে-র কাছে। পার্সিফোনে যখন অ্যাডোনিস কে দেখল তখন আফ্রোদিতি থেকে অ্যাডোনিস থেকে কেড়ে নিল! আর ফেরৎ দিল না।
বিচারের আশায় বিবাদমান দু’পক্ষ জিউসএর দরবারে গেল। বিজ্ঞ জিউস এই বিচারের ভার দেন আর্ফিউসের উপর। আর্ফিউস বৎসরকে ভাগ করলেন তিন ভাগে। এক ভাগ অ্যাডোনিস-এর নিজের। অপর ভাগে দেবী আফ্রোদিতি আর অ্যাডোনিস একত্রে থাকবে ; এবং শেষ ভাগে পাতালের রানী পার্সিফোনে আর অ্যাডোনিস একত্রে থাকবে। এই রায়ের ফলে আফ্রোদিতি ক্রোধে উন্মক্ত হয়ে যায়। অর্ফিউস সে সময় ছিল থ্রাসে । থ্রাসের নারীদের ওপর আফ্রোদিতির ছিল দারুণ প্রভাব। অর্ফিউস এর বিরুদ্ধে থ্রাসের নারীদের লেলিয়ে দেয়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে ফেলে।
যাই হোক বিচারে বৎসরে যে তিনটি ভাগ হয়েছিল। তারমধ্যে নিজের ভাগটি অবশ্য অ্যাডোনিস ভালোবেসে দিল দেবী আফ্রোদিতি কে। এই কারণেই অ্যাডোনিস কে দেবলোকের একজন মনে করা হয়। একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন এই সময়টায় অ্যাডোনিস আর শিশুটি নেই, তিনি হয়ে উঠেছে সুন্দর তরুণ।

প্রেমিক প্রেমিকার মতোই অ্যাডোনিস ও আফ্রোদিতি বহুবছর একত্রে কাটিয়েছিল। বনপাহাড়ে শিকার করে করে আর একে অন্যকে নানারকম গল্প বলে বলে।
অ্যাডোনিস ও দেবী আফ্রোদিতি
এর পরের ঘটনা ভীষণ রকম বাঁক নিল। মনে রাখতে হবে রায়ের ফলে আফ্রোদিতি ক্রোধে উন্মক্ত হয়ে যায়। অর্ফিউস সে সময় ছিল থ্রাসে । থ্রাসের নারীদের ওপর আফ্রোদিতির ছিল দারুণ প্রভাব। অর্ফিউস এর বিরুদ্ধে থ্রাসের নারীদের লেলিয়ে দেয়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। …গ্রিক উপকথায় দেখতে পাই একের পর এক প্রতিশোধের পালা।
এবার আফ্রোদিতির দুঃখ পাবার সময় হল!
কী কারণে আফ্রোদিতি হিংস্র বন্য জন্তু শিকার করতে নিষেধ করেছিল অ্যাডোনিস কে। কেবল নিরাপদ জন্তু শিকার করতে বলেছিল। যেমন, খরগোশ, হরিণ ইত্যাদি। হায়। বনাঞ্চলে একদিন একটি বন্য শূকর দেখামাত্র অ্যাডোনিস প্রলুব্দ হয়। অ্যাডোনিস ধারালো বর্শা ফলক ছুড়ে শূকরটিকে আহত করে। শূকরটিও বিদ্যুৎ গতিতে প্রতিআক্রমন করে। ফলে অ্যাডোনিস ক্ষতবিক্ষত হয়। সে আর্ত চিৎকার করে। তার গোঙ্গানি শুনে ছুটে আসে আফ্রোদিতি । রক্তাক্ত প্রেমিককে দেখে বিলাপ করল।

অ্যাডোনিসের মৃত্যু
আফ্রোদিতির বাহুতে মাথা রেখে মৃত্যুবরণ করে অ্যাডোনিস ।
মৃত্যুর পর অ্যাডোনিস-এর রক্ত নির্যাস ও অ্যানিমোন ফুলের সঙ্গে মিশিয়ে ছিটিয়ে দেয় শোর্কাত দেবী…আফ্রোদিতি ও অ্যাডোনিস এর মিলনে এক কন্যার জন্ম হয়েছিল। সে কন্যার নাম বিরৌ।লেবাননের বৈরুত নগরের নাম সেই কন্যার নামেই নাকি রাখা হয়েছিল। এবং দেবতা ডায়ানিসাস ও পোসাইদোন সে মেয়ের প্রেমে পড়েছিল।ফিনিসিয় নগর বিবলসের নিকট অ্যাডোনিস নামে একটি নদী আছে।
প্রতি বসন্তে সে নদীর জল লাল হয়ে ওঠে। ওই অঞ্চলের লোকের বিশ্বাস অ্যাডোনিস নদীর উৎপত্তি স্থলেই নাকি এককালে সুগন্ধী স্মার্না বৃক্ষ বিস্ফোরিত হয়ে অ্যাডোনিস এর জন্ম হয়েছিল।
নিকোলা টেসলারের আলোর মুখ দেখতে না পাওয়া আবিষ্কার কোনগুলো?
নিকোলা টেসলার আবিষ্কার: আলোর মুখ দেখতে না পাওয়া আবিষ্কার গত শতাব্দীতে মানুষ যখন বিদ্যুৎ কে রহস্য মনে করে ভয় পেতো, তিনি তখন বিদ্যুৎ কে নিয়ন্ত্রণ করেছেন হাতের তালুতে রেখে। পৃথিবীতে তিনিই প্রথম শুরু করেছিলেন সহজলভ্য বিদ্যুৎশক্তির যুগ, যাঁর উদ্ভাবিত এসি জেনারেটর ও মোটরের শক্তি দিয়ে শুরু হয় ব্যাপক শিল্পবিস্তারিত পড়ুন
নিকোলা টেসলার আবিষ্কার: আলোর মুখ দেখতে না পাওয়া আবিষ্কার
গত শতাব্দীতে মানুষ যখন বিদ্যুৎ কে রহস্য মনে করে ভয় পেতো, তিনি তখন বিদ্যুৎ কে নিয়ন্ত্রণ করেছেন হাতের তালুতে রেখে।
পৃথিবীতে তিনিই প্রথম শুরু করেছিলেন সহজলভ্য বিদ্যুৎশক্তির যুগ, যাঁর উদ্ভাবিত এসি জেনারেটর ও মোটরের শক্তি দিয়ে শুরু হয় ব্যাপক শিল্পোৎপাদন। তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়েছে রোবট ও অটোমেশনের যুগ, যা মানুষের কায়িক শ্রম হ্রাস করে যন্ত্রকে মানুষের দাসে পরিণত করেছে।
আজ কথা বলবো বিদ্যুৎ মানবের এমন কিছু প্রকল্প নিয়ে যা তিনি অর্থের অভাব ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারনে বাস্তবায়ন করতে পারেন নি।
ভূমিকম্প যন্ত্র
১৮৯৩ সালে টেসলা একটি বাষ্প-চালিত যান্ত্রিক অসিলেটর পেটেন্ট করেছিলেন, যা বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে উচ্চ গতিতে উপরে এবং নীচে কম্পন সৃষ্টি করবে।
তার আবিষ্কারের পেটেন্ট করার কয়েক বছর পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে একদিন তার নিউ ইয়র্ক সিটির গবেষণাগারে থাকা বিল্ডিংয়ের কম্পনের সাথে তার যান্ত্রিক অসিলেটরটি মধ্যে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করার সময় তিনি ভূমি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।
পরীক্ষার সময় তিনি দেখতে পান তার আশেপাশের জিনিসপত্র নড়তে শুরু করে দিয়েছে। আশেপাশের বিল্ডিং গুলোতেও ভূকম্পন অনুভূত হয়।
ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার সাথে সাথেই সেখানে পুলিশ, এম্বুলেন্স ও মানুষের হট্টগোল লেগে যায়। টেসলা তার সহকারীদের চুপ থাকতে বলেছিল এবং পুলিশকে বলেছিল যে এটি অবশ্যই একটি ভূমিকম্প ছিল।
টেসলা পরবর্তীতে এই যন্ত্রটি হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ফেলেন। বড় পরিসরে এই যন্ত্র ব্যবহার করে পুরো পৃথিবীতেই ভূমিকম্প সৃষ্টি করা সম্ভব হতো। কিন্তু এই আবিষ্কারে কেবল ধ্বংসই হতো। মানব জাতির ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি নিজের আবিষ্কার নিজেই ধ্বংস করেছেন।
চিন্তা রেকডিং করা ক্যামেরা
১৮৯৩ সালে নিজের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষানিরীক্ষা করার সময় ‘থট ক্যামেরা’-র তৈরির কথা ভেবেছিলেন টেসলা। যদিও তার দীর্ঘকাল পরে এ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে টেসলা বলেন, ‘‘আমি নিশ্চিত যে আমাদের চিন্তা-ভাবনার ছবি চোখের মণিতে ফুটে ওঠে।’’ তর্কের খাতিরে টেসলার কথায় বিশ্বাস করা গেল। তবে সে ছবি কী ভাবে ক্যামেরাবন্দি করা যাবে? সে উত্তরও দিয়েছেন টেসলা। তাঁর কথায়, ‘‘প্রতিবর্ত ক্রিয়ার দ্বারাই আমাদের চিন্তা-ভাবনার ছবি মণিতে দেখা যায়। যথাযথ যন্ত্রের সাহায্য সেই ছবি দেখা সম্ভব।
কী সেই যন্ত্র? এখানেই ‘থট ক্যামেরা’র প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন টেসলা। তিনি জানিয়েছেন, চোখের মণিতে ভেসে ওঠা মনের ভাবনার প্রতিচ্ছবি একটি কৃত্রিম অক্ষিপটে (রেটিনায়) ফেলে তার ছবি তোলা যায়। এবং সেই ছবি কোনও পর্দায় ভাসিয়ে দিলে ওই মানুষটির মনের কথা জেনে ফেলা সম্ভব।‘থট ক্যামেরা’ প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে টেসলা বলেছেন, ‘‘যদি মনের ছবি এ ভাবে পর্দায় ভাসিয়ে তোলা যায়, তবে ওই মানুষটি কী চিন্তা-ভাবনা করছেন তা সহজেই জেনে ফেলা যাবে।’’
অনেকের দাবি, ১৮৯৩ সালে নয়, গত শতকের তিরিশের দশকে ‘থট ক্যামেরা’-র কথা ভেবেছিলেন টেসলা। ওই ক্যামেরার সাহায্যে মানবমনের চিন্তা-ভাবনার ছবিও স্লাইডশোয়ের মতো দেখা যাবে। সাল-তারিখ নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে টেসলার এই উদ্ভাবনী চিন্তা যে অভূতপূর্ব, তা নিয়ে দ্বিমত ছিল না। টেসলার কথায়, ‘‘এ ধরনের ক্যামেরার সাহায্যে প্রতিটি মানুষের মনের কথা পড়ে ফেলা যাবে। এবং তা করা গেলে আমাদের মন আক্ষরিক অর্থেই খোলা বইয়ের আকার নেবে। যা সকলেই পড়তে পারবেন।’’ যদিও টেসলার এই ভাবনা সাফল্য পায়নি।
তারবিহীন বিদ্যুৎ
১৯০১ সালে টেসলা টেসলা লং আইল্যান্ডের উত্তর তীরে একটি ১৮৫ ফুট লম্বা, মাশরুম আকৃতির টাওয়ার নির্মাণের জন্য আমেরিকান অর্থলগ্নিকারী জেপি মরগানের থেকে ১,৫০,০০০ মার্কিন ডলার নেন। তার লক্ষ ছিলো বাতাসের মাধ্যমে পুরো শহরে বিদ্যুৎ সেবা দেওয়া। কিন্তু এই টাওয়ারের অর্ধেক কাজ চলার সময় মর্গান অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দেন। কারণ ছিলো সেসময় যারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরবরাহ করতো তারা প্রচুর দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে জনগণের কাছ থেকে বিশাল মুনাফা আয় করতো।

টেসলার সেই টাওয়ার যা ১৯১৭ সালে ভেঙে দেওয়া হয়
টেসলার এই প্রজেক্ট সফল হলে তাদের ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যেতো। ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তারা টেসলার অর্থের যোগান বন্ধ করে দেন, যেনো সে সফল হতে না পারে।
১৯০৬ সালে টেসলা এই প্রজেক্টে হাত দিয়েছিলেন আর বেশকিছুদিন পরই তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯১৭ সালে টেসলার তারবিহীন বিদ্যুৎ এর ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার ভেঙে দেওয়া হয়।
কৃত্রিম জোয়ার ঢেউ
নিকোলা টেসলা বিশ্বাস করতেন যে যুদ্ধ প্রতিরোধে বিজ্ঞানের শক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
১৯০৭ সালে নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড টেসলার আরেকটি সামরিক উদ্ভাবনের বিষয়ে তথ্য দেয়, সেখানে বলা হয় ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফি সমুদ্রে উচ্চ বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে যাতে এত বিশাল জোয়ারের তরঙ্গ তৈরি হয় যে তা শত্রুর সমস্ত নৌবহরকে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম।

সংবাদপত্রটি আরো জানিয়েছে যে কৃত্রিম জলোচ্ছ্বাস নৌবাহিনীকে কাগজের নৌকার মতো অকেজো করে তুলতে পারার সক্ষমতা থাকবে। অনেকটা শিশুদের বাথটব বা পুকুরে কাগজের নৌকোর মতো।
দুর্ভাগ্যক্রমে সে সময় মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষণা প্রধান ছিলেন টমাস আলভা এডিসন। তিনি ‘এটি কোনো কাজে লাগবে না’ বলে নাকচ করে দেন। ১৯৩০-এর দশকে এমিলি গিয়ারডিউ একই নীতিতে রাডার (জঅউঅজ) উদ্ভাবন করেন।
বৈদ্যুতিক চালিত সুপারসনিক এয়ারশিপ
নিকোলা টেসলা চিন্তা-ভাবনায় তার সময়ের থেকে কয়েক দশক এগিয়ে ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বর্তমান সময়ে আমাদের প্রজন্ম তাদের ট্যাবলেট এবং স্মার্টফোনগুলো ওয়্যারলেস টেকনোলজিতে চার্জ দিতে পেরে ভাবছে এটি একটি প্রযুক্তির যুগান্তকারী ব্যবহার; কিন্তু, সেই ১৯১৯ সালে টেসলায় মাথায় খেলা করেছিল কিভাবে এমন একটি সুপারসনিক বিমান বানানো যেগুলোকে বিনা তারের বৈদ্যুতিক চার্জ দেয়া যেতে পারে।
মোবাইলের টাওয়ারের মাধ্যমে রেডিও সিগন্যাল ব্রডকাস্টের ধাঁচে বিদ্যুৎকেও ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ঐ বিমানগুলোকে চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা – এটাই ছিল নিকোলা টেসলার পরিকল্পনা।
বিমানগুলো ভূপৃষ্ট হতে ৪০,০০০ হাজার ফুট উপরে ঘণ্টায় ১,০০০ মাইল বেগে চলার উপযোগী করে তৈরী করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল – এই গতিতে ছুটে নিউইয়র্ক থেকে রওয়ানা দিয়ে লন্ডন পৌঁছাতে সময় লাগত ৪ ঘণ্টারও কম।
দ্য ডেথ রে (মৃত্যুর রশ্মি)
টেসলার সৃজনশীল মন তার জীবনের শেষের দিকে নতুন এক ভাবনা জাগিয়েছিল। তিনি তার ৭৮ তম জন্মদিনে, ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ কে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তিনি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি নিয়ে এসেছেন। যা “লক্ষ লক্ষ সৈন্যদলকে তাদের ট্র্যাকে মারা যেতে পারে।

আবিষ্কারটি? একটি সামরিক অস্ত্র যা একটি ভ্যাকুয়াম চেম্বারের অভ্যন্তরে শব্দের 48 গুণ গতিতে পারদ কণাকে ত্বরান্বিত করবে এবং একটি উচ্চ-বেগের রশ্মিকে “মুক্ত বাতাসের মধ্য দিয়ে গুলি করবে, এমন প্রচণ্ড শক্তিতে যে এটি মুহূর্তে ১০,০০০ শত্রু বিমানের বহরকে নিমেষে শেষ করে দেবে।
প্রেস মিডিয়া তাদের সংবাদপত্রে এটিকে “মৃত্যুর রশ্মি” বলে অভিহিত করেছেিল। কিন্তু টেসলা এই রশ্মির নাম দিয়েছিলেন “শান্তির রশ্মি” বা Peace Ray।
পৃথিবী যদি গোল না হয়ে সমতল হত, তবে এই রশ্মি সক্ষমতা ছিল পৃথিবীর পরিধি ভেদ করে যেতে পারত সুদূরে; আর এর সামনে যা পড়ত, সবই ধূলিসাৎ হয়ে যেত।
তার এই নতুন আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য তিনি অনেকের দারস্ত হয়েছিলেন; এমনকি তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন এক গবেষণাগারে ১৯৩৯ সালে এটির পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। কিন্তু, বিধি বাম! তার এই আইডিয়াকে তিনি সফলতার মুখ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
আধুনিক তড়িৎ বিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামটি তার- নিকোলা টেসলা। সমগ্র জীবনব্যাপী সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে থাকা এক মহৎ হৃদয়ের মহাপুরুষ টেসলা। তাকে ধরা হয় পৃথিবীর সর্বকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবকদের একজন। পৃথিবীর কথিত শক্তি সংকট (Power Crisis) ধারণার অবসান ঘটিয়ে মানুষের জীবন আরও বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে একজন টেসলাই যথেষ্ট ছিলেন; যদিও চিরন্তন পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা তা হতে দেয় নি।
নিকোলা টেসলা, বিদ্যুতের বিস্ময়
১৮৫৬ সালের ১০ জুলাই, এক ভয়াল ঝড়বৃষ্টি আর বজ্রপাতের রাতে টেসলার জন্ম। পরিবেশের ভয়াবহতা দেখে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধাত্রী বলেছিলো, “এ বাচ্চা হবে অন্ধকারের সন্তান” কিন্তু সদ্যোজাত টেসলার ফুটফুটে মুখটার দিকে তাকিয়ে তার মা বলেছিলেন, “না, এ হবে আলোর সন্তান।” প্রকৃতই এই সন্তান পরিণতকালে গোটা বিশ্বে আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলো।
টেসলার জন্ম বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার মিলজান নামক স্থানে। তার পিতা মিলুটিন টেসলা ছিলেন সার্বিয়ান প্রথাগত চার্চের যাজক ও লেখক। বাবার ইচ্ছে ছিলো ছেলেকেও যাজক হিসেবে তৈরী করা, কিন্তু টেসলার বরাবরই বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ ছিলো। টেসলার মা জুকা ম্যান্ডিক ছিলেন গৃহিনী। গৃহস্থালির কাজের সুবিধার্থে তার মায়ের ছোটখাটো উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রয়োগ পরবর্তীকালের একজন সফল উদ্ভাবক টেসলার উপরে যথেষ্ট প্রভাব রেখেছিলো।
অস্ট্রিয়াতে গ্র্যাজ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় টেসলা তড়িৎচৌম্বকক্ষেত্র ও এসি কারেন্ট চালিত মোটর নিয়ে ভাবতে থাকেন। জীবনের পরবর্তী ছয়টি বছর তিনি এই ভাবনাতে নিমগ্ন থাকেন। ১৮৭০ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ প্রাগে পড়াশুনা শুরু করেন। এখানে প্রতিদিন টানা দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণার কাজ করতে গিয়ে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, পড়াশোনারও ব্যাঘাত হতে থাকে। এক সময় টেসলা জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বছরে পড়াশুনার খরচ সব জুয়ায় হারিয়ে আর প্রস্তুতির অভাবে পরীক্ষা দিতে না পেরে টেসলা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং পড়াশুনা শেষ না করেই ১৮৮১ সালে বুদাপেস্ট চলে যান। সেখানে সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসে কর্মরত অবস্থায় তার মাথায় প্রথম আবেশী মোটর (Induction Motor) এর ধারণা আসে। এখানেই তিনি ঘূর্ণায়মান তড়িৎক্ষেত্রের মূলনীতির একটি স্কেচ তৈরী করেন, যা আজও বহু বৈদ্যূতিক যন্ত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। তার এই সাফল্য তাকে দিকপরিবর্তী তড়িৎ প্রবাহ বা এসি কারেন্টসহ ভবিষ্যতের আরও অনেক উদ্ভাবনের ভিত্তি গড়ে দেয়।
২৩ বছর বয়সী টেসলা, ১৮৭৯
১৮৮৪ সালের জুনে, টেসলা টমাস আলভা এডিসনের সাথে কাজ করার জন্যে নিউ ইয়র্ক পাড়ি জমান। তার পকেটে ছিলো শুধু ৪ সেন্ট আর একটা সুপারিশপত্র। সুপারিশপত্রটি লিখেছিলেন এডিসনের প্রাক্তন নিয়োগকর্তা চার্লস ব্যাচেলর। এতে লিখা ছিলো, “প্রিয় এডিসন, আমি দুজন মহান ব্যাক্তিকে চিনি। একজন আপনি, আরেকজন এই তরুণ।”
এডিসন ছিলেন একই সাথে একজন সফল উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ী। অপরদিকে টেসলা উদ্ভাবনে যতটা ভালো ছিলেন, ঠিক ততোটাই দুর্বল ছিলেন ব্যবসায়। ডিসি কারেন্টের ব্যবসা করে এডিসন তখন রীতিমত একজন সফল পুঁজিপতি। সঙ্গত কারণেই এডিসনের সাথে টেসলার পদ্ধতিগত ও নীতিগত বিরোধ লেগেই থাকতো। টেসলার এসি কারেন্ট প্রকৌশল নিয়ে এডিসনের সন্দেহ থাকলেও তিনি তাকে ৫০,০০০ ডলার দেবার শর্তে এই প্রকল্প শেষ করার একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। কয়েক মাসের মধ্যেই কাজ সেরে ফেলার পরে প্রাপ্য অর্থ দাবী করলে এডিসন বলেন, “ওটা তো কৌতুক ছিলো। তুমি আমেরিকান কৌতুক বোঝো না। যখন পুরোদস্তুর আমেরিকান হয়ে উঠবে, তখন ঠিক বুঝবে।” টেসলা তৎক্ষণাৎ এডিসনের চাকরী ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। অবশ্য পারষ্পারিক বিভেদের দেয়াল ছাড়িয়ে এই দুই মহান উদ্ভাবক একে অপরের যথেষ্ট গুণগ্রাহী ছিলেন, একজন আরেকজনের কাজের প্রতি সবসময় শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
‘টাইম’ ম্যাগাজিনের কভারে এডিসন ও টেসলা
এডিসনের কোম্পানি থেকে বেরিয়ে আসার পর অবশ্য তার মূল্যবান প্রকল্পে অর্থলগ্নী করার লোকের অভাব পড়ে নি। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন কোম্পানী, এডিসনের অফিসের অনতিদূরেই টেসলার জন্যে একটি ল্যাব এর ব্যবস্থা করে দেয়। সেখানে টেসলা তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনা পরিচালনা করেন। এখানে তিনি এক্স-রে প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক অনুনাদ, তারবিহীন তথ্য সরবরাহ পদ্ধতিসহ আরও অনেক উদ্ভাবনা নিয়ে কাজ করেন। এখানেই টেসলা এসি মোটর আর এসি পাওয়ার সিস্টেমের উন্নতি ঘটিয়ে নিজের নামে পেটেন্ট করে দেন। এই পেটেন্ট এর ফলে তিনি ৬০,০০০ ডলার ও আরও কিছু আনুষঙ্গিক সুবিধা লাভ করেন। এডিসন ও তার মাঝে চলা “কারেন্টের যুদ্ধ” তিনি অনতিবিলম্বে জিতে যান। ডিসি কারেন্ট এর চেয়ে এসি কারেন্ট অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এসি কারেন্ট ছিলো অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য আর সস্তা। প্রায় বিনামূল্যে এক বিশাল এলাকাজুড়ে জনসাধারণের জন্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রকল্পও তৈরি করেছিলেন তিনি, যদিও তা আর হয়ে ওঠে নি। ১৯০১ সালে এই নিমিত্তে তিনি ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার নির্মান করেন, যা পরে অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার
আধুনিক উদ্ভাবনগুলোর কোনটিতে হাত নেই তার! ফ্লুরোসেন্ট বাল্ব থেকে শুরু করে এক্স-রে, লেজার, ইলেকট্রিক মোটর, রিমোট কন্ট্রোল, ওয়্যারলেস বা তারহীন যোগাযোগ ব্যবস্থা, রোবটিক্স, এমনকি আধুনিক স্মার্টফোনের প্রাথমিক ধারণাও তার দেয়া। সমগ্র পৃথিবী ভালোভাবে তারযুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা লাভ করার আগেই তিনি তারবিহীন যোগাযোগ ব্যবস্থার চিন্তা শুরু করে ফেলেছিলেন। নিজের সময়ের থেকে অনেক বেশি অগ্রসর ছিলেন টেসলা। এখনও তার বিভিন্ন মূলনীতি আর সূত্র অনুসরণ করে নিত্য নতুন উদ্ভাবনা চলছে। মার্কনীর অন্তত ৬ বছর আগে টেসলা বেতার সম্প্রচারে সফল হন। তার বেশিরভাগ উদ্ভাবনী ধারণাই অন্যেরা নিজের নামে চালিয়ে পেটেন্ট করে নিয়েছে। তাদের সম্পর্কে টেসলা বলেন, “তারা আমার ধারণা চুরি করুক, এতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি শুধু বলি, তাদের নিজেদের কোনো ধারণা আসে না কেন?”
টেসলার ছিলো এক অনন্য সাধারণ ক্ষমতা। যেকোনো ডিজাইন তৈরী হবার আগে তিনি সেটির ত্রিমাত্রিক একটি প্রতিরুপ মানসচক্ষে দেখতে পেতেন। বুদাপেস্টে থাকাকালীন একদিন পার্কে বন্ধুর সাথে হাঁটছিলেন আর কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। অকস্মাৎ তার মনে একটি ছবি ভেসে উঠলো। সেখানেই কাঠি দিয়ে ধূলোর উপরে এঁকেছিলেন তার অনেক সাধনার ধন, সেই বিখ্যাত এসি মোটরের চিত্র। পরবর্তীতে এসি মোটর উদ্ভাবনের পর তিনি বলেছিলেন, তিনি আসলে নতুন কিছু করেন নি, তার সেই মানসপটের প্রতিলিপিকেই বাস্তব রুপ দান করেছেন মাত্র!
টেসলার হাতে ছিলো এই মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যের চাবি। তিনি জানতেন এর গোপনীয়তার গোপনতর সূত্র। আর সে রহস্য উন্মোচনের মূলমন্ত্রও তিনি বলে গেছেন। তিনি বলেন, “যদি তুমি ৩, ৬, ৯ এই তিনটি সংখ্যার মাহাত্ম্য বোঝ, তো তোমার হাতে মহাবিশ্বের চাবি থাকবে।” তিনি আরও বলেন, “যদি মহাবিশ্বের রহস্য জানতে চাও, তাহলে শক্তি, কম্পন আর কম্পাঙ্কের ব্যাপারে চিন্তা করো।”
নিউ ইয়র্কে নিকোলা টেসলা কর্ণার
আজীবন অবিবাহিত টেসলা কখনো কোনো নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছেন বলে জানা যায় নি। নারীদের তিনি সবদিক দিয়ে পুরুষের চেয়ে উচ্চতর মনে করতেন। নিজেকে কখনো কোনো নারীর যোগ্য মনে করেন নি তিনি। আর তাছাড়া তার মতো কাজপাগল মানুষের জন্যে একটি একাকী জীবন জরুরীও ছিলো। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যবিহীন টেসলা সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন শুধু মানুষের কল্যাণের জন্য। তাই উদ্ভাবনে তৎকালীন সবার সেরা হলেও আর্থিক দিক দিয়ে তিনি স্বচ্ছল ছিলেন না। ১৯৪৩ সালের ৭ জানুয়ারি, ঋণবদ্ধ ও একাকী অবস্থায়, নিউ ইয়র্কার হোটেলের ৩৩২৭ নাম্বার কক্ষে টেসলা মৃত্যুবরণ করেন।
বেলগ্রেডে রক্ষিত টেসলার দেহভস্ম
টেসলা ছিলেন মানবতার সেবায় নিবেদিতপ্রাণ এক মহতী আত্মা। তার একমাত্র প্রচেষ্টা ছিলো প্রকৃতির নিগুঢ়তম রহস্য আবিষ্কার করে মানুষের জীবনকে সহজতর করা। কোনো ব্যবসায়িক লক্ষ্য নিয়ে তিনি কখনো চালিত হন নি। বিদ্যুতকে অপেক্ষাকৃত সহজ ব্যবহার্য বস্তুতে পরিণত করে তিনি এক জাদুকরী পরিবর্তনের সূচনা করেন। বিস্ময়কর কল্পনাশক্তি আর অমূল্য মেধার দ্বারা যুগ যুগ ধরে কল্পনাপ্রবণ ও আত্মত্যাগী মানুষদের অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন নিকোলা টেসলা।
ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া ৬ টি ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড কোনগুলো?
ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া ৬ টি ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড মানুষ সময়ের সাথে সাথে সভ্য হয়েছে। কিন্তু অতীতে এমন সব প্রথা বা পদ্ধতি প্রচলন ছিলো যা তখনকার সময়ে ছিলো স্বাভাবিক কিন্তু বর্তমান সময়ে তা আমাদের কাছে এখন তা মনে হবে নৃশংস ও নিষ্ঠুর। সময়ের সাথে সাথে অতীতের সেই ঘটনা গুলোও প্রায় ইতিহাস থেকে হারিয়ে যেতে চলেছে।বিস্তারিত পড়ুন
ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া ৬ টি ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড
মানুষ সময়ের সাথে সাথে সভ্য হয়েছে। কিন্তু অতীতে এমন সব প্রথা বা পদ্ধতি প্রচলন ছিলো যা তখনকার সময়ে ছিলো স্বাভাবিক কিন্তু বর্তমান সময়ে তা আমাদের কাছে এখন তা মনে হবে নৃশংস ও নিষ্ঠুর। সময়ের সাথে সাথে অতীতের সেই ঘটনা গুলোও প্রায় ইতিহাস থেকে হারিয়ে যেতে চলেছে।
আজ ইতিহাস থেকে তেমনই ৬ টি প্রায় হারিয়ে যেতে চলেছে এমন নেতিবাচক বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানাচ্ছি।
হারিয়ে যাওয়া ধর্ম
Manichaeism একটি বিলুপ্ত ধর্ম। যা এখন সাধারণ মানুষের কাছে একটি প্রাচীন ইতিহাস মাত্র। এই ধর্ম সে সময়ে মানুষ কে কতোটা প্রভাবিত করেছিলো তা সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষই জানে না।
ব্যাবিলন (বর্তমান ইরাক) এর একজন নবী, ‘মানি’, তিনি এক অদ্ভুত ভাবধারায় বিশ্বাস নিয়ে তার ধর্ম প্রচার করতে শুরু করেন।
ধর্ম এক দেবতা বা শয়তানের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। তার পরিবর্তে তিনি জগতের ভালে ও মন্দ বিষয়গুলো কিভাবে কাজ করে তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সেসময় এই ধর্ম প্রচারের জন্য রাজার আদেশে মণি কে বন্দী করা হয়। ২৬ দিন বন্দী থাকার পর তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। কিন্তু তার মৃত্যুর পরেও শত বছর ধরে মানুষ তার শিক্ষা গ্রহণ করে চলছিল। মণির মতে, জগৎ হচ্ছে ভালো এবং মন্দের মধ্যে পছন্দের বিষয়ে, এবং এটিই ঐশ্বরিক। এই ধর্ম দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং অনেক লোক তা অনুসরণ করতে শুরু করে।
পারস্য থেকে শুরু করে মিশর, রোম, ফ্রান্স হয়ে সমস্ত পথ মানুষ ধর্মের বিশ্বাস অনুসরণ করতে থাকে। এটি সমস্ত খ্রিস্টানদের জন্য একটি প্রতিদ্বন্দ্বী কারণ হয়ে ওঠে কারণ তাদের একেশ্বরবাদের বিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছিল, এবং লোকেরা নতুন ধর্মের প্রতি বিশ্বাস নিয়ে ধর্মান্তরিত হতে শুরু করেছিল।
এই ধর্মের প্রচার শতাব্দী থেকে শতাব্দী পর্যন্ত চলছিল। সেসময় রেমান সম্রাট থেওডোসিয়াস প্রথম ঘোষণা করেন, যে বা যারা এই ধর্ম পালন করবে তাকে হত্যা করা হবে। এই আদেশ জারি করার ফলে এই ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা কমতে থাকে। সম্রাট থিওডোসিয়াস সেসময় এই ধর্ম পালনে জড়িত লোকদের সমস্ত নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। অনেকের ধারণা মতে এই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে চীনে তাদের সংখ্যা ছিলো সবচেয়ে বেশি।
মানব চর্বি বিক্রি
শুনতে অদ্ভুত ও ভীতিকর মনে হলেও এটা সত্যি! যে ১৬ শতকের ইউরোপেও মানুষের চর্বি বিক্রি হতো এবং তার চাহিদা ও উচ্চ ছিল। মানুষের এই চর্বি সেসময় Axungia Hominis বা “দরিদ্র পাপের চর্বি” নামেও পরিচিত ছিল।
সেসময় যারা বন্দী ছিলো যাদের মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করে তাদের দেহ কেটে টুকরো টুকরো করে তাদের শরীর থেকে চর্বি আলাদা করা হতো। এবং সেই চর্বি বিক্রি করা হতো। যারা প্রচুর অর্থের মালিক ছিলেন, কেবল তারাই এই চবি কেনার সামর্থ্য রাখতেন।
এই চর্বি প্রধানত চিকিৎসা উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো। তাই বেশিরভাগ চর্বিই ফার্মেসিতে পাঠানো হতো এবং তা দিয়ে শরীর ও দাঁতের ব্যথা, বাতের মতো রোগ ইত্যাদির জন্য ওষুধ তৈরি করতে ব্যবহার করা হতো। সহজ কথায়, এটি তখন হাড় মজবুত করার জন্য একটি শক্তিশালী খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হতো
সেসময় ডাক্তার ও শল্যচিকিৎসকরা এই চর্বির জন্য যুদ্ধে মৃত সৈন্যকে এই কাজে ব্যবহার করতেন। ধারণা করা হয় ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়েও এই জঘন্য প্রথাটি প্রচলিত ছিল।
নরখাদক ইউরোপীয়
ইউরোপের ইতিহাসের প্রচুর অন্ধকার দিক রয়েছে। প্রাচীন ইউরোপের মানুষরা নিজেদের স্ত্রী কে নিলামে বিক্রি করা থেকে শুরু করে নরখাদক হওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত।
১২ শতক থেকে ১৯ শতকের গোড়ার দিক পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বছর ইউরোপীয়রা প্রকাশ্যে নরমাংস ভক্ষন করতো।
প্রথমে, তারা মিশর থেকে সংরক্ষিত মমি নিয়ে যেতো এবং সেগুলোকে শুষ্ক ত্বক পাউডার এর মতো করত। এই পাউডার তারা খেতো ও গায়েও মাখতো। এর স্বাদ ছিলো অতি ভয়ানক! তা সত্ত্বেও মাথাব্যথা থেকে শুরু করে ক্ষত নিরাময় পর্যন্ত প্রায় সমস্ত কিছুর নিরাময় বলে মনে তা তারা ব্যবহার করতো।
মমি খাওয়া থেকে শুরু হয় সত্যি সত্যি মানুষ খাওয়ার অভ্যাস, তাও প্রকাশ্যে। যারা নরমাংস খেতো তাদের ধারণা ছিলো যে ব্যক্তির মৃত্যু যত বেশি নৃশংস হবে, তার মাংস তত বেশি শক্তিশালী হবে।
সে সময় চিকিৎসার জন্য রক্ত বন্ধ করার জন্য মানুষের রক্ত ব্যবহার করা হতো, কিংবা মানুষের চর্বি এবং মাথার খুলি গুঁড়ো করে মাইগ্রেন এবং মাথাব্যথার ওষুধ তৈরি করা হত।
ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়ার সময়েও এই কর্মকাণ্ড প্রচলিত ছিল। সাধারণ মানুষ থেকে রাজসভার সদস্যরাও নরখাদকের সাথে জড়িত ছিলো। এমনকি প্লেগ রোগের থেকেও নিরাময় পেতে মানব অঙ্গ ভক্ষণ করা হতো।
স্ত্রী কে নিলামে বিক্রি করা
বর্তমানে স্ত্রী কে নিলামে তোলা ঘোরতর অপরাধ বলা হবে। কিন্তু মধ্যযুগ থেকে শুরু করে রাণী ভিক্টোরিয়ার সময়েও স্ত্রী কে নিলামে তোলে বিক্রি করা ছিলো অতি সাধারণ বিষয়।
ইংল্যান্ডে বিবাহবিচ্ছেদ তখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল, এবং শুধুমাত্র ক্ষমতাশালী এবং ধনী লোকেরাই সেই ব্যায়ভার বহন করতে পারতো।
যে স্বামী তার স্ত্রীকে নিলামে তুলতো তাকে প্রথমে স্ত্রীকে পণ্য হিসেবে নথিভুক্ত করতে হতো। তারপর সেই নারীকে একটি জনসভার মাঝে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হতো।
নিলামগুলো সাধারণত সরাইখানা, মেলা বা বাজারের মতো সর্বজনীন স্থানে করা হতো। কিছু পুরুষ তাদের স্ত্রীদের গলায় দড়ি দিয়ে বাঁধা হতো, এ যেনো ছিলো কোনো কোনো পশুকে বাজারে বিক্রি করার মতো ব্যাপার!
নিলামে তোলার আগে ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হতো। নিলামের সভাপতিত্ব করার জন্য একজন নিলামকারীও উপস্থিত থাকতো।
নিলামের সময় সাক্ষীদের উপস্থিতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। স্বামী নিলামের সময় দর্শকদের কাছে তার স্ত্রীর গুণাবলী গুলো জোরে চিৎকার করে ঘোষণা করতো।
অনেক ব্যবসায়ী ও দালাল সেই নিলামে অংশ নিতো। দালালরা বিশেষত নিলামে কিনে তাকে আবার কোনো ধনী ব্যাবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দিত যৌনদাসী হিসেবে।
কখনও কখনও, স্ত্রীর পরিবারের সদস্যরাও সেই দর্শকদের ভিড়ের অংশ হয়ে যেতো। আবার কোনো কোনো মহিলার প্রেমিক থাকলে সে নিলামের মাধ্যমে সেই মহিলাকে কিনেও নিতো।
নববধূ কে অন্যের সাথে শেয়ার করা
মেসোপটেমিয়ায় (আধুনিক ইরাক) জুস প্রাইমা নকটিস নামে একটি প্রথা ছিল, যার অর্থ “প্রথম রাতের অধিকার”, এই প্রথায় ধনী প্রভু বা রাজারা তাদের প্রজা বা ভৃত্যের বিবাহিত স্ত্রীর সাথে বিয়ের দিন রাতে তাকে শয্যাসঙ্গী করতেন।
অর্থাৎ স্বামীর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির আগেই, অন্য পুরুষ তার সাথে শারিরীক সম্পর্ক সৃষ্টি করতে বাধ্য করতো।
এই অভ্যাসটি সেই সময়ে পুরুষ শক্তি এবং আধিপত্যের প্রতিফলন ছিল; যাইহোক, এর অনুশীলনের কোন বিশিষ্ট প্রমাণ বা রেকর্ড নেই।
অনেক লোক এটাকে প্রতারণা এবং বানোয়াট গুজব বলে বিশ্বাস করে। যদি অনুশীলনটি সত্যিই ঘটে থাকে তবে এটি অবশ্যই সর্বকালের সবচেয়ে খারাপ কর্মকান্ডগুলোর একটি ছিল।
জোহান ডি উইট
জোহান ডি উইট ছিলেন নেদারল্যান্ডসের সবচেয়ে মহান ও সমৃদ্ধশালী নেতা। তার বাবাও একজন মহান নেতা ছিলেন। তার বাবা ছিলেন নেদারল্যান্ডসের একটি শহরের মেয়র, সকলেই তার খুব প্রশংসা করতো।
জোহান ১৬২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের সময় ডাচদের ক্ষমতা ও গৌরব ছিলো একদম শীর্ষে। জোহান ১৬৫৩ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে একজন কাউন্সেল হন। তিনি এতটাই মহান নেতা ছিলেন যে তিনি তিনবার তার পদের জন্য পুনর্নির্বাচিত হন।
জোহানের সময়ে নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের মধ্যে সম্পর্ক ছিলো না। কিন্তু জোহান তার প্রচেষ্টা ও আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সেসময় নেদারল্যান্ডসে ‘হাউস অব অরেঞ্জ’ নামে একটি প্রভাবশালী পরিবার ছিলো। তারা জোহান তার বাবাকে প্রচন্ড ঘৃণা করতেন। পরিবারটি তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বছরের পর বছর ধরে কখনোই একত্রিত হয়নি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে গেছে।
বেশকিছু বছর ধরে পরিস্থিতি ভাল ছিল, এবং লোকেরা জোহানের প্রচেষ্টার জন্য প্রশংসা এবং ভালবাসত, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ইংল্যান্ড ১৬৬৫ সালে ডাচদের সাথে যুদ্ধ শুরু করে।
শীঘ্রই, ফ্রান্স এই যুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৬৭২ সালে রাজা লুই চতুর্দশ নেদারল্যান্ডের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরিস্থিতি এবং জনগণের চাপ এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে জোহান একই বছর আগস্টে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।
সাধারণ জনগণ নেদারল্যান্ডস এর সাথে এই যুদ্ধের জন্য জোহানকে দোষারোপ করতে শুরু করে এবং সাধারণ জনগণ হাউস অফ অরেঞ্জের সদস্য উইলিয়াম তৃতীয়কে তাদের নেতা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
জোহানের ভাই কর্নেলিয়াসকে উইলিয়ামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। জোহান তার ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য কারাগারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ক্ষিপ্ত জনতা তার ভাই জোহান উভয়কেই আক্রমণ করে এবং শরীর টুকরো টুকরো করে হত্যা করে।
তারা তাদের (দুই ভাই) নগ্ন দেহ টেনে নিয়েছিল, তাদের হত্যা করেছিল এবং তাদের মাংস ও খেয়েছিল। এককালের বিখ্যাত ও শ্রদ্ধেয় এই নেতার মৃত্যু হয় এক কলঙ্কজনক ও ভয়াবহ মৃত্যু।
তিনশ বছর পরে, তাদের ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য তাদের অনুশোচনা দেখানোর জন্য, ডাচরা মহান নেতাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বেশ কয়েকটি মূর্তি তৈরি করেছিল এবং তাকে দেখানো হয়েছিল যে তারা তার সাথে যা ঘটেছে তার জন্য তারা কতটা গভীরভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।
এপ্রিল ফুলের প্রকৃত ইতিহাস কি?
এপ্রিল ফুলের ইতিহাস: মুসলিমদের ভুল বিশ্বাস ও আসল সত্যি ঘটনা পহেলা এপ্রিল সারা বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘এপ্রিল ফুলস ডে’। এই দিনের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে নিজের আশেপাশের মানুষদের সাথে প্রাঙ্ক করা মানে বোকা বানানো। তবে বোকা বানানোর এই পশ্চিমা সংস্কৃতি নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমবিস্তারিত পড়ুন
এপ্রিল ফুলের ইতিহাস: মুসলিমদের ভুল বিশ্বাস ও আসল সত্যি ঘটনা
পহেলা এপ্রিল সারা বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘এপ্রিল ফুলস ডে’। এই দিনের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে নিজের আশেপাশের মানুষদের সাথে প্রাঙ্ক করা মানে বোকা বানানো। তবে বোকা বানানোর এই পশ্চিমা সংস্কৃতি নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের মাঝে বেশ কিছু গল্প প্রচলিত আছে। এই গল্প গুলো মোটেই সত্যি নয়।
সচরাচর এপ্রিল ফুল নিয়ে ঘুরেফিরে ৩ এটি গল্প শোনা যায়।
গল্প ১
৭১১ সাল থেকে স্পেনে মুসলিমদের দখলে যাওয়ার পর থেকেই স্পেন জ্ঞান- বিজ্ঞান ও সভ্যতায় ইউরোপের অন্য অঞ্চলে তুলনায় বহুগুণে এগিয়ে যায়। দীর্ঘ দিন মুসলিম শাসনের পর প্রায় ৮০০ বছর পর ১৫ শতকের শেষ দিকে রাজা ফার্ডিনান্ড ও রাণী ইসাবেলার নেতৃত্বে স্পেনের বিভিন্ন শহর দখন করে নিতে থাকে সৈন্যরা। তবে প্রায় সব শহর হাতছাড়া হয়ে গেলে গ্রানাডা তখনো মুসলিমদের দখলেই ছিল।
রাজা ফার্ডিনান্ড
রাণী ইসাবেলা
দীর্ঘদিন শহরে অবরুদ্ধ থাকার পর ১৪৯২ সালে মুসলিম শাসকগণ সিদ্ধান্ত নেন তারা আত্মসমর্পণ করবেন। আত্মসমর্পণের সময় স্প্যানিশদের পক্ষ থেকে বলা হয়, যেসকল মুসলিম মসজিদে আশ্রয় নেবে। তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না। ফলে দলে দলে মুসলিম রা মসজিদে প্রবেশ করে। আর স্পেনিশরা মসজিদের দরজা বন্ধ করে দিয়ে মসজিদে আগুন দিয়ে লক্ষ লক্ষ মুসলিম পুড়িয়ে মারে। আর বাহিরে আনন্দে চিৎকার করতে থাকে বোকাদের দল! বোকাদের দল।
মুসলমানদের বোকা বানিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ইউরোপ থেকে মুসলিমদের বিতাড়িত করার দিন হিসেবে এখনো এপ্রিলের ১ তারিখকে বোকা বানাবার দিন হিসেবে পালন করে পশ্চিমারা।
গল্প ২
দীর্ঘদিন যুদ্ধ করেও যখন স্পেনিশরা গ্রানাডা দখল করতে পারছিলো না, তখন স্পেনিশরা ভারী চিন্তায় পড়ে যায়। তখন তারা শুরু করে এক ষড়যন্ত্রের। তারা নানান ছলচাতুরী করে শহরে ভেতর প্রচুর মদ ও সিগারেট শহরের ভেতর পাঠায়। এসব মদ সিগারেট পেয়ে মুসলিমরা নেশায় বুদ হয়ে যায়। একসময় আল্লাহর উপর ভয়ভীতি ও হারিয়ে ফেলে।
এরপর এপ্রিলের ১ তারিখ গ্রানাডার পতন হয়। মুসলমানদের পানীয় এবং সিগারেট দিয়ে বোকা বানিয়ে গ্রানাডা দখল করার দিবস হিসেবে পশ্চিমারা এখনো এই দিনটিকে ‘এপ্রিল ফুল’স ডে’ হিসেবে পালন করে।
গল্প ৩
১৪৯২ সালে রাজা ফার্ডিনান্দ ও রাণী ইসাবেলার বাহিনী গ্রানাডা প্রবেশের আগে মুসলিমদের সাথে চুক্তি করে যে তাদেরকে জাহাজে করে আরবে পাঠিয়ে দেয়া হবে। পরে শহর দখল করে যখন জাহাজে করে সবাইকে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছিল ভূমধ্যসাগর দিয়ে, তখন মাঝসাগরে এসে সবগুলো জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়। লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে সাগরে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।
কোথাও কোথাও বলা হয় জাহাজেই স্প্যানিশরা সব মুসলিমকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেয়। দিনটি ছিল ১ এপ্রিল। এখনো পশ্চিমারা মুসলমানদের বোকা বানাবার দিনকে ‘এপ্রিল ফুলস ডে’ হিসেবে পালন করে।
যেভাবে স্পেন থেকে মুসলিমদের পতন ও গ্রানাডা দখল হয়েছিল
৭১১ সাল থেকে শুরু করে ১৫ শতক পর্যন্ত প্রায় ৮০০ বছর স্পেন শাসন করেছে মুসলিমরা। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই ক্ষমতা আর জৌলুশও হারাতে থাকে। ক্ষমতা হারানোর নেপথ্যে ছিলো রাজা ফার্ডিনান্ড ও রাণী ইজাবেলার যৌথ শক্তি। ১৪৮২ সাল থেকে ফার্ডিনান্ড ও ইজাবেলা ইউরোপের অন্য দেশগুলো থেকে আর্থিক ও সৈন্য সাহায্য নিয়ে একে একে স্পেনের বিভিন্ন শহর দখল করতে থাকেন।
প্রায় সব শহর দখল করে ফেললেও গ্রানাডা দখল করতে পারছিল না। গ্রানাডা তখনো তৎকালীন মুসলিম শাসক দ্বাদশ মুহাম্মদের অধীনে ছিল।
১৪৯১ সালে গ্রানাডার বিভিন্ন জায়গা দখল করতে করতে তার শহরের প্রধান গেটের সম্মুখে চলে আসে। বেশ কিছুদিন অবরুদ্ধ থাকার পর দ্বাদশ মুহাম্মদ আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি ইসাবেলা এবং ফার্ডিনান্দ শহরে প্রবেশ করেন এবং দ্বাদশ মুহাম্মদের কাছ থেকে নগরের চাবি নেন।
দ্বাদশ মোহাম্মদ
এপ্রিল ফুল সত্য নাকি মিথ্যা?
পেগি লিসের লেখা ‘ইসাবেল দ্য কুইন’, জন এডওয়ার্ডের লেখা ‘ফার্ডিনান্দ এন্ড ইসাবেলা’ কিংবা আই.এল.প্লাঙ্কেটের লেখা ‘আ হিস্ট্রি অফ মেডিভাল স্পেন’ এসব বই থেকে জানা যায় যে, ২ জানুয়ারিতেই গ্রানাডা নগরীর পতন হয়। ঐদিন মসজিদে মানুষদের আটকিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়ার কোন প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি। এমনকি ঐদিন কোন গণহত্যা হয়েছে সেটাও কোন সমর্থিত সূত্র থেকে কখনো পাওয়া যায়নি।
মানব ইতিহাসের যখনি কোনো শহরে আক্রমণ হয়েছে তখনি রক্তপাত হয়েছে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বেশ কিছু সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায় ১৬০৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলমানদের একটা অংশকে স্পেন থেকে ফেরত পাঠানো শুরু হয়। তবে অনেককে জোর করে খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার প্রচেষ্টাও চলেছে বেশ অনেক জায়গায়।
এপ্রিল ফুল নিয়ে যে জাহাজ ডুবি, মসজিদে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে হত্যা এসবের কোনো প্রমান নেই। এমনকি মদ সিগারেট দিয়ে মুসলিমদের পথভ্রষ্ট করার ঘটনাটিও মিথ্যা। মদ্যপানের সাথে বাকি পৃথিবীর মতো আরবরাও পরিচিত ছিল হাজার বছরের বেশি সময় ধরে। আর সিগারেট তো সেদিনের আবিষ্কার।
এপ্রিল ফুল তাহলে কিভাবে এলো?
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যমতে প্রাচীন রোমান উৎসব হিলারিয়া (যা উদযাপিত হত ২৫শে মার্চ) থেকেই এপ্রিল ফুল’স ডের উৎপত্তি।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে বছর শুরু হত ২৫ মার্চ। আর টানা ৮ দিনের উৎসবের শেষ দিন অর্থাৎ এপ্রিলের ১ তারিখ নববর্ষ উদযাপন হত। এরপর ষোল শতকে যখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু হয়, তখন নববর্ষ সরে যায় ১ জানুয়ারি। কোন কোন সূত্রমতে, ক্যালেন্ডার বদলাবার খবর অনেকেই না জানায় তারা ১ এপ্রিলেই নববর্ষ উদযাপন করতে যেয়ে বোকা বনে যায়। তখন থেকেই এই এপ্রিলের ১ তারিখে নিজেরা নিজেদের বোকা বানিয়ে মজা নেয়।
নারকীয় হত্যাযজ্ঞ দ্য রেপ অব নানকিন কোথায় ও কবে সংঘটিত হয়?
দ্য রেপ অব নানকিন: চীনের উপর চালানো জাপানিদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চ্যাং ঝি কিয়াং; বয়স মাত্র নয় বছর। মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। পথে তাদেরকে আটকে ফেলে জাপানি সৈন্যরা। তার মাকে ওরা (জাপানি সৈন্যরা) ধর্ষণ করতে চায়। কিয়াং বাধা দিলে তাকে ধরে ছুঁড়ে ফেলে দেয় সৈনিকরা। তারা তার মাকে বিবস্ত্র হতবিস্তারিত পড়ুন
দ্য রেপ অব নানকিন: চীনের উপর চালানো জাপানিদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ
চ্যাং ঝি কিয়াং; বয়স মাত্র নয় বছর। মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। পথে তাদেরকে আটকে ফেলে জাপানি সৈন্যরা। তার মাকে ওরা (জাপানি সৈন্যরা) ধর্ষণ করতে চায়। কিয়াং বাধা দিলে তাকে ধরে ছুঁড়ে ফেলে দেয় সৈনিকরা। তারা তার মাকে বিবস্ত্র হতে বলে। কিয়াংয়ের মা তা না করলে তাকে স্তনে বেয়োনেটে দিয়ে সজোরে আঘাত করে আর তার মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মৃত ভেবে সৈন্যরা চলে গেলে কিয়াং গিয়ে তার মাকে ডেকে তোলার চেষ্টা করে। তাঁর বুকের ক্ষত পরিমাপ করতে বস্তু সরাতেই ক্ষুধার্ত ছোট ভাইটি মায়ের স্তনে মুখ দেয়। কিন্তু তার মুখ ভরে উঠে রক্তে। ততক্ষণে তাঁর মা সত্যিই না ফেরার দেশে চলে গেছে।
ঘটনাটি ১৯৩৭ সালের, চীনের নানকিন শহরের। শুধু এটিই নয়, এটি শুধুমাত্র চীনে জাপানিদের চালানো লক্ষ লক্ষ হত্যা ধর্ষণের মাত্র একটি ঘটনা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হওয়ার ২ বছর আগে ১৯৩৭ সালের শেষদিকে চীনের পূর্ব জিয়াংসু প্রদেশের রাজধানী শহর নানকিং এ হামলা শুরু করে। হামলায় শহরের সৈন্য এবং নিরীহ বেসামরিক সহ হাজার হাজার লোককে হত্যা করে; আর মহিলাদের করা হয় ধর্ষণ ও নির্যাতন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের মিত্র জাপানীদের চালানো এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নাম ‘দ্য রেইপ অব নানকিং’। এই তান্ডবকে নানকিং ম্যাসাকার ও বলা হয়ে থাকে।
আক্রমণের প্রস্তুতি
চিন ও জাপানের রক্তাক্ত লড়াইয়ে জাপানীদের হাতে সাংহাইয়ের পতন হওয়ার পর চীনা সৈন্যরা পিছু হটতে শুরু করে। জাপানীদের হাতে পুরো সৈন্য বাহিনী হারানোর ভয়ে চীনা সৈন্যদের নানকিং থেকে সরিয়ে আরও ভেতরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। জাপানীদের এগিয়ে আসার খবর শুনে নানকিংয়ের অধিবাসীরা পালাতে শুরু করলে চীনা সরকার তাতে বাঁধা দেয়। জাপানীরা যখন নানকিং এসে পৌঁছায়, তখন শহরের ভেতর ৫ লক্ষ অধিবাসী বসবাস করছিল।
নানকিন আক্রমণ করার আগে জাপানিরা পথ যা পেয়েছে তাই হামলা করে ধ্বংস করেছে। পথেঘাটে সকল গ্রামের বাড়ি জ্বালিয়ে পুরিয়ে ছাড়খাড় করেছে। মহিলাদের ধর্ষণ করেছে, আর পুরুষদের কোনো কথা ছাড়াই হত্যা করেছে। মহিলাদের ধর্ষণ করার পর নির্যাতন করে হত্যা করেছে। যুবতী মেয়েদের দিনে ৬ থেকে ৭ বার ধর্ষণ করেছে।
জাপানি সৈনিকরা এক প্রকার হাটতে হাটতে নানকিন দখল করেছে। তবুও কেনো তাদের এতো নিঃসংশতা তার কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন বিচিত্র উপায়ে তারা বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করতো।
মুকাই এবং নদার নামে ২ জাপানিজ নিজেদের মাঝে ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতাও শুরু করেছিলেন।
এই প্রতিযোগিতায় কে কয়টি খুন করেছে তার অগ্রগতির প্রতিবেদন শীর্ষস্থানীয় জাপানী পত্রিকাগুলো প্রতিদিনের আর্কষণীয় সংবাদ হিসেবে প্রচার করেছিল, এ যেন ছিল এক আন্তর্জাতিক খেলার ফলাফল।
সেই বর্বর দুই সেনা অফিসার মুকাই এবং নদা
১৯৩৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর নানকিন দখলের পর টানা ৬ সপ্তাহ জাপানিজরা সেখানে দানবীয় তান্ডব চালিয়েছে। এই ৬ সপ্তাহে তারা প্রায় ৮০,০০০ নারী ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণ করার পর তারা তাদের খুন করেছে অধিকাংশ কে। আর পুরুষদের সামনে পেলে সরাসরি হত্যা করেছে।
কেবল খুন করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। খুনের আগে যতভাবে মহিলাদের কষ্ট দেওয়া সম্ভব তার প্রায় সব বর্বরতাই জাপানীরা দেখিয়েছিল। গর্ভবতী মহিলাদের পেট কেটে খালি হাতে গর্ভের শিশুকে বের করে ফেলতো সৈন্যরা। যুবতী মেয়েদের দিনে ছয়-সাতবারও ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। তরুণীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য নানকিং থেকে বিভিন্ন জাপানী ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়েছিল। শিশুরাও জাপানী বর্বরতা থেকে রেহাই পায়নি। বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বহু শিশুকে হত্যা করা হয়।
জাপানিরা শহরটিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার জন্য দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ, নানজিংয়ের অর্ধেক ভবন লুট ও পুড়িয়ে ফেলেছিল তারা। তারা প্রথমে সম্মত হয়েছিল যে তারা নানজিং শহরের সেফটি এরিয়ায় আক্রমণ করবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, তারা তা করেনি।
রবার্ট ও. উইলসন, সেফটি জোনে কর্মরত একজন ডাক্তার তার পরিবারকে একটি চিঠিতে লিখেছেন,
বেসামরিকদের হত্যা ভয়ঙ্কর। আমি প্রায় বিশ্বাসের বাইরে ধর্ষণ এবং নৃশংসতার ঘটনাগুলি কয়েকশত পৃষ্ঠায় বর্ণনা করলেও শেষ করতে পারবো না। জাপানিজরা আমার ৭ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মীর মধ্যে ৫ জনকেই মেরে ফেলেছে। আর ২ জন বেয়নেট এর আঘাতে আধমরা হয়ে আছে।
এছাড়াও গত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চীনা স্টাফ সদস্যের বাড়িতে ভাঙচুর করা হয় এবং দুই নারী, তার আত্মীয়কে ধর্ষণ করে জাপানি সৈনিকরা। একটি ৮ বছরের বাচ্চা ছেলেকে বেয়নেট দিয়ে মেরেছে। ছেলেটির শরূরে ৫ টি বেয়নেটের ক্ষত ছিল যার একটি তার পেটে প্রবেশ করেছিল, ওমেন্টামের একটি অংশ পেটের বাইরে ছিল। আমি মনে করি সে বাঁচবে।
১৯৩৮ সালের জানুয়ারিতে জাপানি বাহিনী ঘোষণা করে যে নানজিং-এ আদেশ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং তারা নিরাপত্তা অঞ্চলটি ভেঙে দিয়েছে। তবে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত হত্যা-ধর্ষণ বন্ধ হয়নি। শহরটির নিয়ন্ত্রণ একটি পুতুল সরকারকে দেওয়া হয়েছিল যেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ অবধি শাসন করেছিল।
ভবিষ্যৎ ফলাফল
আজ অবধি, নানজিং গণহত্যায় নিহতের সঠিক সংখ্যা আমাদের কাছে নেই। অনুমান করা হয় প্রায় ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ নিরীহ মানুষ হত্যা করেছিল জাপানি সৈনিকরা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুদিম পরে, দূরপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধের জন্য মাতসুই এবং তার লেফটেন্যান্ট তানি হিসাওকে বিচার করে দোষী সাব্যস্ত করে।
নানজিং-এর ঘটনা নিয়ে চরম ক্ষোভ ও বিতৃষ্ণা আজ পর্যন্ত চীন-জাপান সম্পর্ককে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।
জাপান সরকার বহু বছর এ বর্বরতার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। বরং বিভিন্ন সময় চীনের প্রকাশিত সংবাদ ও তথ্যকে একপেশে হিসেবে দাবী করেছে। ১৯৯৫ সালের ১৫ আগস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তৎকালীন জাপান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তমিচি মুরায়ামা চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জাপান যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল তার জন্য আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু জাপান কখনোই লিখিতভাবে নানকিং গণহত্যার জন্য চীনের কাছে দুঃখ প্রকাশ কিংবা ক্ষমা চায়নি।
২০১৫ সালে জাপানী প্রধানমন্ত্রী শিনজো এ্যাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ৭০ বছর উপলক্ষ্যে যে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেন তাতে চীনে জাপানের এই বর্বরতার বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়, যা চীন-জাপান সর্ম্পকে টানাপোড়ন সৃষ্টি করে।
চীন ও জাপানের সম্পর্কের টানা পোড়নে আজও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানী গণহত্যার প্রভাব সুস্পষ্ট।
নকার-আপার্স বা মানব অ্যালার্ম ঘড়ির ইতিহাস কি?
নকার-আপার্স : মানব অ্যালার্ম ঘড়ির ইতিহাস আজকের এই সময়ে দাড়িয়ে আপনি খুব ভোরে উঠতে চাইলে কি করবেন? হয়তো মোবাইল ফোনে অ্যালার্ম সেট করবেন কিংবা অ্যালার্ম ঘড়িতে আপনার নির্দিষ্ট সময়ে অ্যালার্ম সেট করবেন। আচ্ছা কখনো কি আপনার মনে এই প্রশ্নটি উঁকি মেরেছে? যখন এলার্মঘড়ি বা মোবাইল ফোন ছিলো না তখন মানুষ কিভাবেবিস্তারিত পড়ুন
নকার-আপার্স : মানব অ্যালার্ম ঘড়ির ইতিহাস
আজকের এই সময়ে দাড়িয়ে আপনি খুব ভোরে উঠতে চাইলে কি করবেন? হয়তো মোবাইল ফোনে অ্যালার্ম সেট করবেন কিংবা অ্যালার্ম ঘড়িতে আপনার নির্দিষ্ট সময়ে অ্যালার্ম সেট করবেন।
আচ্ছা কখনো কি আপনার মনে এই প্রশ্নটি উঁকি মেরেছে? যখন এলার্মঘড়ি বা মোবাইল ফোন ছিলো না তখন মানুষ কিভাবে ঘুম থেকে উঠতো।
আমার দাদা-দাদিরা ঘড়ির শব্দে ঘুম থেকে উঠতেন ঘড়ির টিক, টিক, টিক শব্দ শুনে কিংবা তারা নিজেদের অধিকাংশ সমই গ্রামে কাটিয়েছেন, তাই মোরগের শব্দ শুনেও ঘুম ভেঙেছে। গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেলে আমার নিজের ঘুমই খুব ভোরে মোরগের ডাকেই ভাঙে।
আচ্ছা সেদিকে আর কথা না বাড়াই। আচ্ছা আগের শতকে তো শহরাঞ্চলের মানুষদের ঘুম ভাঙার জন্য এলার্মঘড়ি বা শহরাঞ্চলের মানুষদের ঘরে মোরগ ও ছিলো না। তাদের অ্যালার্ম কে দিত? উত্তর টা হলো ‘মানুষ আগে অ্যালার্ম ঘড়ি ছিল’।
১৮ ও ১৯ শতকে ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ডে বিশেষ কর্মীরা সকালে মানুষকে ঘুম থেকে জাগাতেন, তাদের বলা হত নকার-আপার।
চলুন পুরানো যুগের মানব ঘড়ির ইতিহাসে একটু ডুব দেওয়া যাক!
নকার-আপার্স কারা ছিলেন?
শিল্প বিপ্লবের সময় নকার-আপার ছিল ১৮ শতকের মাঝামাঝি থেকে ১৯ শতকের মাঝামাঝি শতকের একটি পেশা যখন অ্যালার্ম ঘড়ি জনপ্রিয় ছিল না এবং সেগুলি সস্তা বা নির্ভরযোগ্যও ছিল না। ব্রিটেনের কারখানার শ্রমিকদের সেসময় অ্যালার্ম ঘড়ি ক্রয় করা ছিলো দুঃসাধ্য ব্যপার। যেহেতু সেসময়টায় শিল্পায়ন ক্রমবর্ধমান ছিলো তাই কল-কারখানাগুলি আরও বেশি শ্রমিক এবং আরও বেশি ওয়ার্কিং আওয়ারের প্রয়োজন অনুভব করে।

সেসময় শ্রমিকরা খুবই ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করত এবং কাজে যোগ দেয়ার সময়ের ব্যাপারে কল-কারখানা গুলো কঠিন ছিল। দেরি করলে চাকরি চলে যাওয়া কিংবা মাইনে থেকে বেতন কেটে নেয়ার ভয় ছিল, এমনিতেই ছিল অল্প বেতনের চাকরি, জরিমা কেটে নিলে বেতনের থাকেই বা কি? তাই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে তারা ভাড়া করতো নকার- আপারদের।
নকার-আপাররা প্রধানত বড় শহর বা ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে কাজ করত।
প্রথমে, নক-আপাররা দরজায় ধাক্কা মেরে মানুষকে জাগিয়ে তুলত কিন্তু এটি ছিলো অকার্যকর এবং ভুল পদ্ধতি। দরজায় ধাক্কা দেয়ার ফলে ঐ পরিবারের সবার ঘুম ভেঙে যেতো, এমনকি প্রতিবেশীরাও অভিযোগ করতে থাকে এ ব্যাপারে। কারণ তাদের ভোর ৫-৬ টা বাজে ঘুম থেকে উঠার কোনো প্রয়োজন নেই। পরবর্তীতে তারা শ্রমিকদের জাগানোর একটি ভাল উপায় খুঁজে পেয়েছিল। যেহেতু বেশিরভাগ শ্রমিকদের বেডরুম উপরের তলায় অবস্থিত ছিল, তারা একটি দীর্ঘ লাঠি ব্যবহার করে এবং সেই শ্রমিকের জানালায় সেই লাঠি দিয়ে আঘাত করতো। কিছু নকার আপার জানালায় দু-তিনবার ধাক্কা দিয়ে চলে যেতো আবার কেউ ধাক্কা দিতেই থাকতো যতক্ষণ না কর্মী জানালায় উঠে এসে জানালা খুলতো। প্রতিটি নকার-আপার প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ জনকে জাগিয়ে তুলতেন।
কয়েকজন নকার-আপারের নাম এবং তারা কত উপার্জন করতো?

চার্লস নেলসন: চার্লস নেলসন ২৫ বছর ধরে নকার-আপার হিসাবে কাজ করেছেন। তিনি ইস্ট-লন্ডনের কর্মীদের যেমন ডাক্তার, বাজারের ব্যবসায়ী এবং ড্রাইভারদের জাগিয়ে তুলতেন।
ডরিস উইগ্যান্ড: তিনি ছিলেন ব্রিটিশ রেলওয়ের প্রথম নকার-আপার। তিনি শর্ট নোটিশে শ্রমিকদের জানাতেন যাদের শিফটে জরুরি প্রয়োজন ছিল।
মেরি স্মিথ: তিনি শ্রমিকদের জাগানোর জন্য আরেকটি কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। তিনি ইস্ট-লন্ডনে শ্রমিকদের জাগানোর জন্য তাদের জানালায় শুকনো মটর ছুঁড়ে মারতেন। তিনি সপ্তাহে ছয় পেন্স আয় করতেন। অন্যান্য সমস্ত নকার-আপাররা প্রতি সপ্তাহে কয়েক পয়সা উপার্জন করতো।
যাইহোক, তখনকার প্রতিটি কর্মী তাদের নিয়োগ করা নকার-আপারের কাছে কৃতজ্ঞ ছিল না, তারা তাদেরকে কখনো পাত্তা দিত না। মাঝেমাঝে তারা উপর থেকে নকার-আপারের উপর বালতি দিয়ে পানি নিক্ষেপ করত।
নক আপার কে জাগিয়ে তুলতো?
কর্মীদের জাগানোর জন্য একজন নকার-আপারকে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে হতো। কিন্তু তারা কিভাবে এতো ভোরে ঘুম থেকে উঠতো?
নকার-আপাররা তাদের সকালের দায়িত্ব শেষ করে তারা দিনের বেলা সারাদিন ঘুমাতো আর পেঁচার মতো সারারাত জেগে থাকতো। ১৯৪০ ও ৫০ এর দশকে অ্যালার্ম ঘড়ি কেনা সহজলভ্য হলে নকার আপার রা তাদের চাকরি হারায়।
১৯৭০এর দশক পর্যন্ত উত্তর ইংল্যান্ডের কিছু শহরে নকার-আপারদের নিয়োগ করেছিল, যাতে এই পেশাটা কালের স্রোতে হারিয়ে না যায়।
১৮ ও ১৯ শতকের মানুষরা এভাবেই জেগে উঠত। নকার-আপারের পুরানো ইতিহাস চিরকাল স্মরণীয়। কারণ তাদের কাজটি তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যা ইংল্যান্ডের লোকেদের সময়মতো কাজে পাঠানোর ভূমিকা পালন করতো।
পেন্ডোরার বাক্স এর রহস্য কি?
প্যান্ডোরার বাক্স: যে বাক্স পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে দুঃখ দূর্দশা গ্রীক মিথলজি মতে প্যান্ডোরা হলেন পৃথিবীর প্রথম নারী। আর এই মিথের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় খ্রীস্টপূর্ব ৭০০ বছর আগের গ্রীক লেখক হেসিওদের লেখা থেকে। অলিম্পাসের দেবতারা যখন টাইটানদের কাছ থেকে স্বর্গ ছিনিয়ে নেয়, তার ও কিছু কাল পরে জিউস ওবিস্তারিত পড়ুন
প্যান্ডোরার বাক্স: যে বাক্স পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে দুঃখ দূর্দশা
গ্রীক মিথলজি মতে প্যান্ডোরা হলেন পৃথিবীর প্রথম নারী। আর এই মিথের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় খ্রীস্টপূর্ব ৭০০ বছর আগের গ্রীক লেখক হেসিওদের লেখা থেকে।
অলিম্পাসের দেবতারা যখন টাইটানদের কাছ থেকে স্বর্গ ছিনিয়ে নেয়, তার ও কিছু কাল পরে জিউস ও অন্যান্য দেবতারা পৃথিবীতে নতুন প্রাণী সৃষ্টি করার কথা ভাবে। আর এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় দুই টাইটান এপিমেথেউস ও প্রমিথিউস নামের দুই ভাইকে। প্রমিথিউস সৃষ্টি করতে থাকেন মানুষ আর তার ভাই এপিমেথিউস সৃষ্টি করতে থাকেন অন্যান্য প্রাণী। জেনে রাখা ভালো প্রমিথিউস যেসব মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন সবই ছিলো পুরুষ মানুষ, পৃথিবীতে তখন কোনো নারী মানুষ সৃষ্টি করা হয়নি। প্রমিথিউস মানুষদের খুব ভালোবাসতেন আর এই অতিরিক্ত মানবপ্রেম জিউস একদমই পছন্দ করতেন না। প্রমিথিউস এজন্য দেবতাদের সভায় এ নিয়ে দেবতা জিউসকে অপমান ও করতেন।
মানব সৃষ্টির পর পৃথিবীতে মানুষের জন্য আগুন খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে। প্রমিথিউস যেহেতু মানুষদের খুব ভালোবাসতেন তাই স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে মানুষদের হাতে তুলে দিলেন। দেবতা জিউস মানুষদের হাতে আগুন দেওয়াটা একদমই পছন্দ করেননি। কারন মানুষের হাতে আগুন গেলে পুরো পৃথিবী তারা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাঁড়খাড় করে দেবে। আর এজন্য ক্রুদ্ধ হয়ে জিউস প্রমিথিউস কে শৃঙ্খলে বদ্ধ করে রাখলেন। জিউসের ক্রোধ তাতেও শেষ হয়নি। যে মানব জাতীর জন্য প্রমিথিউস জিউসকে এতো অপমান করেছেন। তিনি সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে সৃষ্টি করতে চাইলেন এক নারী মানুষের।
জিউস বিশ্বকর্মা হেফাস্টাসকে আদেশ দিলেন এক নারী মানুষ তৈরি করতে। হেফাস্টাস কাদামাটি দিয়ে তৈরি করলেন এক অপূর্ব মানবীর, তারপর তাতে প্রাণ সঞ্চার করলেন। দেবলোকের প্রত্যেক দেবতাই এই নারী মানবীর তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন। এই নারী মানবীকে তৈরি করার সময় বিশ্বকর্মা হেফাস্টাস প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি কে মডেল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
নারী মানব সৃষ্টির পর প্রত্যেক দেব দেবী সেই নারীকে কিছুনা কিছু উপহার দিয়েছেন। দেবী আফ্রোদিতি দিয়েছিলেন সৌন্দর্য্য, লাবন্য আর আকাঙ্খা। দেবতা হার্মিস দিয়েছেন চাতুর্য ও দৃঢ়তা, অ্যাপোলো তাকে সঙ্গীত শিখিয়েছেন। এমনিভাবেই প্রত্যেক দেবতাই তাকে কোনো না কোনো উপহার দিয়েছেন। সর্বশেষে দেবতা জিউসের স্ত্রী হেরা উপহার দেয় কৌতুহল। আর এই অপরূপ সুন্দরী মানবীর নাম দেওয়া হয় পেন্ডোরা। গ্রীক ভাষায় পেন্ডোরা অর্থ সবার উপহার। কারণ সব দেবতার উপহার দিয়েই এই নারীর সৃষ্টি করা হয়েছে। দেবতা জিউসের এই অসাধারণ সুন্দরী ও কোমল মেয়েকে দেখে দেবলোকের সবাই মুগ্ধ হন।
গ্রীক মিথলজির মতে পেন্ডোরা পৃথিবীর প্রথম নারী। ছবিতে দান্তে গ্যাব্রিয়েলের আঁকা প্যান্ডোরা
প্রমিথিউসের প্রতি প্রতিশোধের ভাসনায় দেবতা জিউস সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি পেন্ডোরাকে প্রমিথিউসের ভাই এপিমিথিউসের সাথে বিবাহ দেবেন। এপিমিথিউস এই প্রস্তাব শুনে বুঝতে পারলেন দেবতা জিউসের নিশ্চয়ই কোনো খারাপ অভিসন্ধি আছে। কিন্তু অপরুপ সুন্দরী মানবী পেন্ডোরাকে দেখে তিনি পেন্ডোরার প্রেমে পড়ে যান এবং জিউসের দেওয়া বিবাহের প্রস্তাবে রাজী হয়ে যান।
এরপর প্রচন্ড জাঁকজমকভাবে দেবতা এপিমিথিউসের সাথে প্রথম মানবী পেন্ডোরার বিয়ে হয়ে যায়। সবার উপহার দিয়ে অপূর্ব সাজে সাজেন প্যান্ডোরা। প্রবেশ করেন এপিমিথিউসের গৃহে অর্থাৎ দেবলোক থেকে পৃথিবীতে।
এপিমিথিউসকে তার ভাই প্রমিথিউস অনেক আগেই জিউসের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছিল, আর তাই বিয়েতে সে জিউস থেকে কোনে উপহার গ্রহণ করে নি। এপিমিথিউস কোনো উপহার গ্রহণ না জরলেও জিওস তার মানব কন্যা পেনৃডোরাকে একটি অদ্ভুত বাক্স উপহার দেন। পরবর্তীকালে এই বাক্সই পরিচিতি পেয়েছে পেন্ডোরার বাক্স।
জিউসের দেওয়া এই বাক্সটি ছিলো খুবই অদ্ভুত। অদ্ভুত এই কারনে বলছি যে বাক্সে লেখা ছিলো ‘কখনে খোলো না’ জিউস এই বাক্সের সাথে একটি চাবিও পেন্ডোরার হাতে তুলে দেয়। কারণ জিউস নিজেই চাইছিলেন পেন্ডোরা কৌতুহলী হয়ে সেই বাক্সটি খুলুক।
বিয়ের পর প্যানডোরা-এপিমিথিউস দম্পতি পৃথিবীতে বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছিলো। কিন্তু একদিন সেই সুখের সমাপ্তি ঘটে সেই সাথে নেমে আসে পুরো মানবজাতির উপর অভিশাপ।
এপিমিথিউস একদিন কাজের জন্য ঘরের বাহিরে গিয়েছেন। পেন্ডোরা তখন ঘরে একা। দেবতা জিউসের দেওয়া সেই অদ্ভুত বাক্স নিয়ে সে ভাবছে কি থাকতে পারে এই বাক্সে? নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানবজাতীয় কৌতূহল সবসময়ই বেশি। পেন্ডোরা তার কৌতূহল আর ধরে রাখতে পারলেন না। চাবি দিয়ে খুলে ফেললেন বাক্সটির মুখ। ঠিক এরপরেই বাক্স থেকে বেরিয়ে এলো শক্তি,হিংসা,ঘৃণা,দুঃখ জরা, শোকের মতো অশুভ সব শক্তিগুলো। পেন্ডোরা সাথে সাথেই বাক্সটি বন্ধ করে দিলেন কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। এসব অশুভ শক্তিগুলি ততক্ষণে মিশে গেছে পুরো পৃথিবীতে মানুষদের মনের অন্তরে।
এপিমিথিউস ঘরে ফিরে দেখলেন তার স্ত্রী পেন্ডোরা কাঁদছে। এপিমিথিউসকে এই ঘটনা দেখানোর জন্য প্যান্ডোরা আবারো বাক্স খুললেন। এবার বাক্স থেকে বেরিয়ে এলো শুভ শক্তি আশা। আশা পেন্ডোরা তাকে মুক্ত করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে মিশে গেলো পুরো পৃথিবীর মানুষের মাঝে।
আর এই আশাই মানুষকে এতো দুঃখ শোক আর প্রতিকূলতা থেকে মানুষকে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে টিকিয়ে রেখেছে। এই আশার জন্যই মানুষ বেঁচে আছে।
যে মানবের জন্য প্রমিথিউস দেবতা জিউসকে অপমান করেছে ভৎসনা করেছেন। তাদের উপর এবং প্রমিথিউসের উপর এমন ছল চাতুরী ও সূক্ষ্মতার মাধ্যমেই জিউস তার রাগের প্রতিশোধ নিলেন। গ্রীক মিথলজির পেন্ডোরার বাক্স মূলত আমাদের নির্দেশ করে নারীদের অতিরিক্ত কৌতূহল সম্পর্কে। আর এই অতিরিক্ত কৌতূহলই জিউসকে সু্যোগ করে দিয়েছে মাবজাতীর জন্য চির অশুভকে দুয়ার খুলে দিতে।
কোন এক সময়ে আলুকে মনে করা হতো শয়তানের আপেল, কেনো ?
আজকের দিনে আলু ছাড়া জীবন অসহায়। যে কোনো খাবারের আলুর মিশ্রণ থাকবেই। তবে শুনে হয়তো অবাক হবেন ইউরোপীয়রা একটা দীর্ঘ সময় আলু খেতে ভয় পেতো। আপনার মন কি এ ব্যাপারে জানতে খচমচ করছে? চলুন একটু ইতিহাসের পাতায় ডুব দেই… ইতিহাসের পাতা উল্টােলে দেখায় যায় আলুর উৎপাদন শুরু হয়েছিল ১০ হাজার বছর আগে দক্ষিণবিস্তারিত পড়ুন
আজকের দিনে আলু ছাড়া জীবন অসহায়। যে কোনো খাবারের আলুর মিশ্রণ থাকবেই। তবে শুনে হয়তো অবাক হবেন ইউরোপীয়রা একটা দীর্ঘ সময় আলু খেতে ভয় পেতো। আপনার মন কি এ ব্যাপারে জানতে খচমচ করছে? চলুন একটু ইতিহাসের পাতায় ডুব দেই…
ইতিহাসের পাতা উল্টােলে দেখায় যায় আলুর উৎপাদন শুরু হয়েছিল ১০ হাজার বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার পেরুতে।
১৬ শতকে স্প্যানিশরা এই আলুকে সর্বপ্রথম ইউরোপে নিয়ে আসে। তবে আলু খাওয়া শিখতে ইউরোপীয়দের লেগে গেছে ২ শতাব্দী! ১৮ শতকে আলু ইউরোপে প্রচুর জনপ্রিয় হয়ে উঠে, সাথে এই গ্রহের প্রধান খাদ্যর একটি।
শুরুতে, আলু জনপ্রিয় ছিল না। মানুষজনের আলুকে এড়িয়ে যাওয়ার অনেক কারণ ছিল।উদাহরণস্বরূপ বলা যায় স্প্যানিশরা বিশ্বাস করত যে আলু তাদের জন্য অযোগ্য এবং শুধুমাত্র নেটিভ আমেরিকানদের খাওয়া উচিত।
অনেকে আবার বিশ্বাস করতো আলুগুলো খ্রিস্টান নয়। এগুলো খেলে পাপ হবে।
হাসি পাচ্ছে এসব শুনে?
তাহলে আরো শুনুন, রাশিয়ানরা এই আলুকে বলতো শয়তানের আপেল! চমকে যাচ্ছেন? চমকে যাবার মতোই তথ্য বটে।
যেহেতু আলু মাটির নিচে জন্মাতো তাই রাশিয়ানদের মনে এমন উদ্ভট চিন্তা ভর করেছিল, শয়তানের আপেল খাওয়া মানে শয়তান কে সঙ্গ দেওয়াই তাই রাশিয়ানরা আলু থেকে সবসময় দূরেই রেখেছে।
ফ্রান্সে ১৭৪৮ সাল থেকে ১৭৭২ সাল পর্যন্ত আলু অবৈধ ছিল। ফরাসিরা বিশ্বাস করতো আলু মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে, বিশেষ করে কুষ্ঠ রোগ!
ডাচ চিত্রশিল্পী ভিনসেণ্ট ভ্যানগগ এর বিখ্যাত চিত্রকর্ম আলু খাদক
ইউরোপে দীর্ঘ একটা সময় আলু কেবল পশু প্রাণীদের খাদ্য ছিলো। খাদ্য হিসেবে প্রাণীদের এটা বেশ পছন্দের ছিল।
অল্প জায়গায় অধিক ফলনের ফলে বিশেষ করে ১৮ ও ১৯ শতকে কোটি মানুষকে ক্ষুধা থেকে মুক্তি দিয়েছে আলু। আর সময় বাড়ার সাথে সাথে আলু হয়ে উঠেছে মানুষের রন্ধনপ্রণালীর একটি প্রধান উপাদান।
আলু প্রতি একরে ১৪ মিলিয়ন ক্যালরি দেয় যেখানে গম দেয় ৪ মিলিয়ন ক্যালোরি। ক্যালোরি ছাড়াও, তাদের প্রচুর প্রোটিন, ফাইবার এবং এমনকি ভিটামিন সি রয়েছে।
দেহকে শক্তিশালী করতে বিশেষ করে প্লীহা আর পাকস্থলীর কর্মক্ষমতা বাড়াতে আলু বিশেষ কার্যকর। এছাড়াও বৃক্কের কার্যক্ষমতায় ঘাটতির সমস্যায় এই উদ্ভিদ কাজে লাগে। রাতকানা রোগের ক্ষেত্রেও এর উপকারিতা লক্ষ করা যায়। সে ক্ষেত্রে রোগীকে প্রাণীর, বিশেষ করে খাসির কলিজার সাথে মিষ্টি আলু খাওয়াতে হয়। গ্রামে, এমন কি শহরেও আগুনে পুড়িয়ে কিছুটা পোড়া পোড়া করে মিষ্টি আলু খাওয়ার প্রচলন আছে। এই পদ্ধতি সাধারণ সর্দি-কাশির উপশমে কার্যকর।
প্রুশিয়ান (বর্তমানে এটি জার্মানির একটি অঙ্গরাজ্য) রাজা ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট (১৭১২-১৭৮৬) এবং ফরাসি ফার্মাসিস্ট আন্টোইন পারমেন্টিয়ার (১৭৩৭-১৮১৩) সর্বপ্রথম আলুর উৎপাদন ও সম্ভাবনা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্ররিশ্রম করেছেন। তারা মানুষের মধ্যে আলুর সম্পর্কে থাকা ভুল ধারণা গুলো ভাঙতে চেয়েছিলেন।
রাজা ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট আলু চাষের জন্য আদেশ জারি করেছিলেন,এজন্য তিনি ‘পটেটো কিং’ উপাধি মানু আলু রাজা ডাকনাম অর্জন করেছিলেন। নিজেকে “আলু রাজা” ডাকনাম অর্জন করেছিলেন।


রাজা ফেড্রিক আলু চাষের তদারকি করছেন
ফরাসি সেনাবাহিনীর ফার্মাসিস্ট এন্টোইন পারমেন্টিয়ার সাত বছরের যুদ্ধে (১৭৫৬-১৭৬৩) প্রুশিয়ানদের দ্বারা বন্দী হন। কারাগারে থাকাকালীন, তাকে আলু খাওয়ানো হয়েছিল এবং বুঝতে পেরেছিলেন যে আলু মোটেও বিষাক্ত নয়। মুক্তি পেয়ে ফ্রান্সে ফিরে আসার পর, আলুর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করা তার লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
ফার্মাসিস্ট এন্টোইন পারমেন্টিয়ার
পারমেন্টিয়ার বেশ কিছু কৌশল ব্যবহার করেছিলেন যেমন আলুর চাষ বাড়ানো এবং আলু ক্ষেত পাহারা দেওয়ার জন্য সৈন্য নিয়োগ করা। যাতে লোকজনের মনে হতে থাকে আলু খুবই মুল্যবান একটি খাদ্য।
এমনকি তিনি বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের মতো উল্লেখযোগ্য অতিথিদের সাথে বিখ্যাত ডিনারের আয়োজন করেছিলেন, যেখানে খাবার হিসেবে শুধুমাত্র আলু পরিবেশন করা হয়েছিল
আলু সম্পর্কে প্রথম দিকে সাধারণ মানুষের এমন ধ্যানধারনা হওয়ার মূল কারণ ছিলো, এটি সম্পূর্ণ এককালে ফ্রান্সে, আলু অবৈধ ছিল। আজকাল, তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় আলুর খাবারের নাম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই।
জাতিসংঘ এফএও-এর রিপোর্ট মতে সারা পৃথিবীতে আলু উৎপাদন ২০১৩ সালে ছিল ৩৬৮ মিলিয়ন টন। একজন ব্যক্তি প্রতিবছর প্রায় ৩৩ কেজি আলু খায়।
‘ভিক্টোরিয়ান’ যুগের মানুষ তাদের চোখের জল বোতলের মধ্যে রাখতো কেনো?
‘ভিক্টোরিয়ান’ যুগের মানুষ তাদের চোখের জল বোতলের মধ্যে রাখতো ঐতিহাসিক কিছু তথ্য অনুসারে, ‘Tear Catcher’ ( যে বোতলে চোখের জল রাখা হতো) এর ব্যবহার প্রায় ৩ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো, প্রাচীন রোমেও এটির বেশ প্রচলন ছিল। এই বোতল শোক/ দুঃখের পরিমাপ করতে ব্যবহৃত হত এবং আর যখন সেই বোতলের চোখের পানি বাষ্পীভূত হবিস্তারিত পড়ুন
‘ভিক্টোরিয়ান’ যুগের মানুষ তাদের চোখের জল বোতলের মধ্যে রাখতো
ঐতিহাসিক কিছু তথ্য অনুসারে, ‘Tear Catcher’ ( যে বোতলে চোখের জল রাখা হতো) এর ব্যবহার প্রায় ৩ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো, প্রাচীন রোমেও এটির বেশ প্রচলন ছিল।
এই বোতল শোক/ দুঃখের পরিমাপ করতে ব্যবহৃত হত এবং আর যখন সেই বোতলের চোখের পানি বাষ্পীভূত হয়ে একেবারে উড়ে যাবে, এর মানে হলো যে ব্যাক্তির দূর্ঘটনা বা মৃত্যুর জন্য শোক করা হচ্ছিল। তাকে নিয়ে শোক/ দুঃখ করার সমাপ্তি হয়েছে।
একটি ‘Tear Catcher’ বোতল
‘Tear Catcher’ এর ব্যবহার মাঝখানে শতবছর ধরে অপ্রচলিত থাকলে তা ভিক্টোরিয়ান যুগে এসে পুনরায় প্রচলন শুরু হয়। সেসময় বেশিদিন শোক পালনের জন্য অনেকে টিয়ার দীর্ঘ সময়ের জন্য কালো পোশাক পরিধান করতো।
কালো কাপড় পড়ে শোক পালন
মৃত ব্যাক্তির জন্য শোক পালন করার সময় তারা সূক্ষ্ণ কাঁচের বোতল ব্যবহার করতো। তারা শোক পালনের সময় মৃত ব্যাক্তির জন্য যতটুকু চোখের জল ফেলতো সেটাকে সেই কাঁচের বোতলে রেখে দিতো।
এই বোতল টি সেসময় মানুষজনের কাছে ‘Tear Catcher’ নাম ছাড়াও ‘Lachrymatory’ নামে বেশ প্রচলিত ছিল।

বিভিন্ন ডিজাইনের ‘Tear Catcher’
ভিক্টোরিয়ানরা ছাড়াও, প্রাচীন মিশর এবং রোমের বাসিন্দারাও টিয়ার বোতল ব্যবহার করত। তখন প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, যে ব্যাক্তির চোখের জল বেশি পরিমাণ হবে এর মানে হলো মৃত ব্যক্তি বেঁচে থাকাকালীন তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কিছু ‘আমেরিকার গৃহযুদ্ধের’ গল্পেও উল্লেখ করা হয়েছে, যে যুদ্ধে যাওয়া সৈন্যদের কিছু স্ত্রী ‘Tear Catcher’বেতলে তাদের চোখের জল জমাতেন যতদিন না তাদের স্বামীরা ঘরে ফিরে আসে। আর যদি স্বামী যুদ্ধে মারা যেতো, যখন বিধবা তাদের মৃত্যুর প্রথম বার্ষিকীতে স্বামীর কবরে তার চোখের জল ছিটিয়ে দিতো।
‘Tear Catcher’ বোতলে কি সত্যিই চোখের জল ছিল নাকি শুধুমাত্র সুগন্ধি বোতল ছিল?
বছরের পর বছর ধরে, কিছু ইতিহাসবিদ কাঁচের বোতলগুলিতে আসলেই অশ্রু ছিল কিনা তা নিয়ে তারা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। অনেকেই এই ব্যাপারগুলো সহজভাবে নিতে পারেন না।
সত্যি বলতে ‘Tear Catcher’ আসলেই চোখের জল রাখার জন্য ব্যবহার হতো কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ অবশ্যই রয়েছে।
এই বোতলগুলিতে রাসায়নিক পরীক্ষা করে, কিছু বিজ্ঞানী দাবি করেছেন যে বোতলগুলিতে সুগন্ধি রয়েছে, যদিও সেসকল বিজ্ঞানীরা এই সত্যটি অস্বীকার করেছেন যে সেগুলি চোখের জল সংগ্রহ করতে ব্যবহৃত হয়েছিল।
এই বোতলগুলি সম্পর্কে সেসময়কার লেখা কোনো বিশ্বাসযোগ্য নথি পাওয়া যায় না। বর্তমানে আমরা জানি তা হয়তো অর্ধসত্য বা পুরোপুরি সত্য কিংবা অন্য কিছু।
ভিক্টোরিন যুগে ‘Tear Catcher’ এর ব্যবহার সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহের জায়গা থাকলেও, এটি নিয়ে সন্দেহ নেই যে ভিক্টোরিয়ান যুগে বোতলগুলির বেশ গুরুত্বপূর্ণতা ছিল।