সাইন আপ করুন
লগিন করুন
রিসেট পাসওয়ার্ড
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? আপনার ইমেইল এড্রেস দিন। ইমেইলের মাধ্যমে আপনি নতুন পাসওয়ার্ড তৈরির লিংক পেয়ে যাবেন।
আপনি কেন মনে করছেন এই প্রশ্নটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই উত্তরটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই ব্যক্তিকে রিপোর্ট করা উচিৎ?
নিদ্রাহীনতা সমাধানের ভিন্নধর্মী পন্থা ক্যানাবিস কি সত্যিই কাজ করে?
সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর আমাদের মন আর শরীর দুটোই ক্লান্ত থাকে, প্রয়োজন হয় বিশ্রামের। বাসায় ফেরার পর সবচেয়ে আপন করে নিতে ইচ্ছা হয় পরিপাটি করে গোছানো বিছানাটাকেই। খাওয়া-দাওয়া করে এরপর ঘুমের রাজ্যে আমাদের প্রবেশ ঘটে। দৈনন্দিন জীবনে পরিশ্রমের পর আমাদের প্রত্যেকেরই একটা নির্দিষ্ট সময় ঘুমের প্রয়োজন হয়।বিস্তারিত পড়ুন
সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর আমাদের মন আর শরীর দুটোই ক্লান্ত থাকে, প্রয়োজন হয় বিশ্রামের। বাসায় ফেরার পর সবচেয়ে আপন করে নিতে ইচ্ছা হয় পরিপাটি করে গোছানো বিছানাটাকেই। খাওয়া-দাওয়া করে এরপর ঘুমের রাজ্যে আমাদের প্রবেশ ঘটে। দৈনন্দিন জীবনে পরিশ্রমের পর আমাদের প্রত্যেকেরই একটা নির্দিষ্ট সময় ঘুমের প্রয়োজন হয়। যখন এই গুরুত্বপূর্ণ ঘুমেরই সমস্যা হয়, তখন তো আমাদের নড়েচড়ে বসতেই হয়। তবে সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা সবসময়ই কি যৌক্তিক কিছু করি অথবা যা করি তা কি আদৌ চিরস্থায়ী সুফল বয়ে আনে?
ঘুমের সমস্যা বলতে সাধারণত ঘুমের স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হওয়াকেই বোঝানো হয়। এগুলোর মাঝে সবচেয়ে প্রচলিত সমস্যাটি হল ইনসমনিয়া বা নিদ্রাহীনতা। স্লিপ অ্যাপনিয়াতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ঘুমের সময় সঠিকভাবে শ্বাস নিতে পারেন না। কেউ কেউ আবার ঘুমের মাঝে পা এক জায়গায় স্থির রাখতে পারেন না। একে রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম (RLS) বলে। পায়ে এক ধরনের অস্বস্তি বা মৃদু খোঁচা খাওয়ার অনুভূতির কারণে এমন সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু সমস্যাটা পায়ে না, স্নায়ুতন্ত্রে। স্নায়ুতন্ত্রের যে অংশ ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে বিশৃঙ্খলার কারণে এই সমস্যার উদ্ভব হয়। আবার অনেকের নার্কোলেপসির কারণে দিনের বেলায় হুট করেই অস্বাভাবিক রকমের ঘুম পায়।
এতসব ঘুমের সমস্যার সাথে মাদকের সম্পর্কটা ঠিক কেমন? সেটা নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।
কর্মব্যস্ত দিনের পর দরকার পরিমিত ঘুম; Source: renkligaste.com
প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে নিদ্রাহীনতায় ভুগছেন এমন অনেকের সাথে কথা বলে দেখা গেছে যে, তাদের অনেকেই সমাধানের পথ হিসেবে মারিজুয়ানা বা ক্যানাবিস (গাঁজা) সেবনকে বেছে নিচ্ছেন। এই চর্চাটা এখন প্রতিফলিত হচ্ছে বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। ক্যানাবিসকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন ওষুধ যেমন ন্যাবিলোন, ড্রোনাবিনল এবং ম্যারিনল ইত্যাদি প্রস্তুত হচ্ছে। এছাড়াও ক্যানাবিস সেবনকারীদের অনেকেই মেডিক্যাল মারিজুয়ানা কার্ড নিয়ে থাকেন।
ক্যানাবিস পাতা; Source: commons.wikimedia.org
প্রশ্ন হলো- ঘুমের সমস্যা সমাধানে ক্যানাবিস কতটা কার্যকরী? বিভিন্ন রোগীর মাঝে এর ব্যবহার থেকে প্রাপ্ত ফলাফল কখনোই ঢালাওভাবে কোনো উত্তরকে সরাসরি সমর্থন করে না। অর্থাৎ নিদ্রাহীনতার সমাধান হিসেবে মারিজুয়ানা বা ক্যানাবিসের ব্যবহার বহুলাংশেই স্বতন্ত্র। ঘুমের সমস্যা সমাধানে মারিজুয়ানা সেবন করা কতটা কার্যকর হবে সেটা নির্ভর করে ব্যক্তি বিশেষের উপর, মারিজুয়ানার পরিমাণ এবং এর সেবনের মাত্রার উপর।
সমস্যা সমাধানে ক্যানাবিস বা মারিজুয়ানা
কিছু কিছু গবেষণায় দেখে গেছে, ক্যানাবিস আক্ষরিক অর্থেই ঘুমে সাহায্য করে। নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপর এর প্রভাব বিভিন্ন রকম। কারও কারও ক্ষেত্রে এর ব্যবহার যথেষ্ট কার্যকরী। কার্যকরী এই অর্থে যে তারা খুব দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়তে পারছেন এবং ভাল ঘুমও হচ্ছে। আবার কেউ কেউ হয়তো খুব দ্রুত ঘুমাতে পারছেন না, কিন্তু তাদের ঘুমের গভীর পর্যায়টা বেশ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। তবে যখনই ক্যানাবিস সেবন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন স্পষ্টতই ঘুম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটা প্রমাণিত যে, ক্যানাবিস ঘুমের মান এবং সময়কাল নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। ক্যানাবিস থেকে প্রাপ্ত ক্যানাবিনয়েডসমূহের মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (THC), যা নিদ্রাহীনতা দূর করতে দারুণ কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল সেবনকারীদের মাঝে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার হার, যারা সেবন করছেন না তাদের চেয়ে অনেকংশেই বেশি। এছাড়াও গভীর রাতে হঠাৎ ঘুমে ভেঙে দীর্ঘ সময় ধরে জেগে থাকার সমস্যাটাও টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল এর মাধ্যমে দূর করা যায়।
Tetrahydrocannabinol; Source: Wikimedia Commons
প্রাণীদের উপর চালানো এক গবেষণায় (অ্যানিমেল ট্রায়াল) সংশ্লেষিত একটি ক্যানাবিনয়েডের (টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনলের অনুরূপ) ব্যবহার, সেরোটোনিন- প্রণোদিত অ্যাপনিয়ার সমাধানে আশাব্যঞ্জক ফলাফল এনে দিয়েছে। ক্যানাবিনয়ডের ব্যবহারের ফলে চিবুক এবং মুখের কিছু পেশীর শিথিলতা আসে এবং এর মাধ্যমেই অ্যাপনিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে (PTSD) আক্রান্ত সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের দুঃস্বপ্নের চিকিৎসায় ক্যনাবিনয়েডসমূহ বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
ঘুম এবং ক্যানাবিস; Source: semprequestione.com
টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্যনাবিনয়েডের সমন্বয়ে গঠিত একটি ওষুধ হচ্ছে ক্যানাবিডাইঅল (CBD), যেটি ঘুমের সমস্যা সমাধানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়াও তীব্র ক্যানাবিডাইঅল ব্যবহারের মাধ্যমে সার্বিকভাবে ঘুমের সময় বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
Cannabidiol; Source: chicagonow.com
ঢালাওভাবে মারিজুয়ানা বা ক্যানাবিস নামগুলো সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হলেও ঘুমের সমস্যা সমাধানে এদের কাজ করার পদ্ধতি কিন্তু এক নয়। ক্যানাবিসের অসংখ্য প্রজাতিগুলোর মাঝে পার্থক্যের কারণ টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল এবং ক্যানাবিডাইঅলের পরিমাণ। ক্যানাবিসের কিছু প্রজাতি আছে যেগুলোতে টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনলের উপস্থিতি অত্যন্ত বেশি। মারিজুয়ানারও এরকম কিছু প্রজাতিতে ক্যানাবিডাইঅলের পরিমাণ কম, আবার অন্যগুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি।
ঘুম চক্রে ক্যানাবিসের প্রভাব
ঘুমের মাঝে র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM ) নামক একটি পর্যায় আছে। ঘুমের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরা স্বপ্ন দেখি। ঘুমের আগে ক্যানাবিস সেবনের ফলে REM পর্যায়ে ব্যায়িত সময়ের পরিমাণ কমে আসে। ফলে ঘন ঘন স্বপ্ন দেখা অনেকটাই কমে যায়। তবে দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততার পর হুট করে ক্যানাবিস সেবন বন্ধ করে দিলে REM এর পুনরাবৃত্তি হওয়ার বেশ ভাল রকমের ঝুঁকি থেকে যায়।
ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়; Source: quora.com
কিছু সতর্কতা
ক্যানাবিস গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, দীর্ঘকাল সেবনের পর হুট করে ক্যানাবিসকে বিদায় জানানো যাবে না। বেশ লম্বা একটা সময় ধরে ক্যানাবিস সেবনের ফলে একজন মানুষের ঘুমের অভ্যাস বা ধরণ পরিবর্তিত হয়, এক ধরণের নির্ভরতা তৈরী হয়। হঠাৎ করেই যদি অভ্যস্ততায় ব্যাঘাত ঘটে, তখন এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বিভিন্ন সমস্যার উদ্ভব হয়। দেখা যায় যে, একজন ব্যক্তি হয়তো সারাদিনই ক্লান্ত অনুভব করছেন অথবা ঘুম থেকে উঠার পরও তার মনে হচ্ছে যে ঘুম ঠিকভাবে হয় নি। এছাড়াও অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে কখনোই ক্যানাবিস ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি করা উচিত নয়। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ১৫ বছর বয়সের আগে ক্যানাবিস অনেক সময় তারুণ্যের পুরোটা জুড়েই নিদ্রাহীনতা ডেকে আনে।
মেডিক্যাল মারিজুয়ানার বিশেষত্ব
মজার ব্যপার হচ্ছে, ঘুমের সমস্যা ছাড়াও আরও অনেক অসুখের চিকিৎসা হিসেবে মেডিক্যাল মারিজুয়ানা বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন-·
এখন পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বে ক্যানাবিস বা মারিজুয়ানার এসব উপকারী দিক সর্বজন স্বীকৃত নয়। হ্যাঁ, এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে চিকিৎসাক্ষেত্রে মেডিক্যাল মারিজুয়ায়ানা ব্যবহারের সাফল্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তবে মানুষের উপর এর প্রভাব তেমন ভাল নয়। তাই এখনও বিস্তর গবেষণা চলছে এর ভূমিকা নিয়ে। এতসব অসুখের সমাধান হিসেবে যদি একটি প্রাকৃতিক উপাদান সাফল্যের পথ দেখাতে পারে, সেটা নিঃসন্দেহে স্বস্তির বার্তা বয়ে আনবে রোগী ও তার স্বজনদের জন্য।
সংক্ষেপে দেখুনবিজ্ঞানীরা দূরবর্তী গ্রহ-নক্ষত্রের দূরত্ব নির্ণয় করেন কীভাবে?
পত্র পত্রিকায় খবর আসছে, প্রতিনিয়ত গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি প্রভৃতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। কোটি কোটি কিলোমিটার কিংবা শত শত আলোক বর্ষ দূরে এসব মহাকাশীয় বস্তুর অবস্থান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এরা যে এত দূরে অবস্থান করে তা কীভাবে নির্ণয় করেন বিজ্ঞানীরা? বেশ নিশ্চিত হয়ে বিজ্ঞানীরা কীভাবে বলেন “এত আলোক বর্ষ দূরে অববিস্তারিত পড়ুন
পত্র পত্রিকায় খবর আসছে, প্রতিনিয়ত গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি প্রভৃতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। কোটি কোটি কিলোমিটার কিংবা শত শত আলোক বর্ষ দূরে এসব মহাকাশীয় বস্তুর অবস্থান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এরা যে এত দূরে অবস্থান করে তা কীভাবে নির্ণয় করেন বিজ্ঞানীরা? বেশ নিশ্চিত হয়ে বিজ্ঞানীরা কীভাবে বলেন “এত আলোক বর্ষ দূরে অবস্থান করছে অমুক গ্যালাক্সিটি”?
দূরের গ্রহ নক্ষত্রের দূরত্ব বোঝাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘আলোক বর্ষ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। সৌরজগতের বাইরে মহাকাশের বস্তুগুলোর দূরত্ব মাপতে সাধারণ কিলোমিটার একক ব্যবহার করা সুবিধাজনক নয়। এত বিশাল দূরত্ব পরিমাপ করতে ‘আলোক বর্ষ’ নামক বিশেষ এই এককটি ব্যবহার করা হয়। আলোক বর্ষের (Light year) বিশালত্ব মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। আলো যদি এই বেগে টানা এক বছর ভ্রমণ করে, তাহলে যে দূরত্ব অতিক্রম করবে, তাকে বলে এক আলোক বর্ষ। কিলোমিটারের মাধ্যমে আলোক বর্ষকে প্রকাশ করলে দাঁড়াবে, এক আলোক বর্ষ সমান ৯ মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার (৯×১০^১২ কিলোমিটার)। আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টারির দূরত্ব ৪.২ আলোক বর্ষ। দূরের গ্যালাক্সিগুলো শত শত কিংবা হাজার হাজার আলোক বর্ষ পর্যন্ত দূরে অবস্থান করে। এত বিশাল দূরত্ব মাপার কৌশলটা কী?
সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রের দূরত্বও ৪ আলোকবর্ষের চেয়ে বেশি। ছবি: ন্যাশনাল স্কুল অবজারভেটরি ইউকে
অকল্পনীয় দূরে অবস্থান করলেও আমাদের পক্ষে এদের দূরত্ব পরিমাপ করা সম্ভব। গ্যালাক্সিগুলোতে অবস্থান না করেও চমৎকার কিছু কৌশল ব্যবহার করে তাদের দূরত্ব বের করে ফেলা যায়। তুলনামূলকভাবে নিকটবর্তী নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব পরিমাপে ‘প্যারালাক্স’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। শব্দটি শুনতে অন্যরকম মনে হলেও, এটি আসলে একদমই সহজ একটি ট্রিক। এই ট্রিকটি হাতে কলমে এখনই আমরা শিখে ফেলতে পারি।
প্রথমে মুখের সামনে হাতের একটি আঙুল তুলে ধরতে হবে। এরপর বাম চোখ বন্ধ করে শুধুমাত্র ডান চোখ দিয়ে আঙুলটির দিকে তাকাতে হবে। এরপর আবার ডান চোখ বন্ধ রেখে বাম চোখ দিয়ে আঙুলের দিকে তাকাতে হবে। একবার ডান চোখ আরেকবার বাম চোখ, এভাবে কয়েকবার করলে মনে হবে আঙুলটির অবস্থান এদিক ওদিক হচ্ছে। আদতে আঙুলটি কিন্তু একই স্থানে আছে, দুই চোখের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণে আঙুলটিও ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে আছে বলে মনে হয়।
বুড়ো আঙুলের সাহায্যে প্যারালাক্স। ছবি: এস্ট্রোনমি নোটস
আঙুলকে চোখের আরো কাছে নিয়ে আসলে আঙুলের নড়াচড়া আরো বেড়ে যাবে। কাছে না এনে যদি আঙুলকে দূরে নেয়া হয় তাহলে নড়াচড়া অল্প স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারছি, দুই চোখের দুই ভিন্ন অবস্থানের সাপেক্ষে আঙুলের অবস্থান পাল্টে যাবার পরিমাণ বেশি হলে, সেটি নিকটে অবস্থিত আর অবস্থান পরিবর্তনের পরিমাণ কম হলে, সেটি দূরে অবস্থিত। যদি কোনোভাবে আমরা দুই চোখের পারস্পরিক দূরত্ব ও লক্ষ্যবস্তুর বিচ্যুত হবার পরিমাণ বের করতে পারি, তাহলে ত্রিকোণমিতির সূত্র প্রয়োগ করে বের করতে পারবো লক্ষ্যবস্তুর দূরত্ব কত। নক্ষত্রদের বেলাতেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে তাদের দূরত্ব পরিমাপ করা সম্ভব।
এই পদ্ধতিতে নক্ষত্রের দূরত্ব পরিমাপ করার জন্য আঙুলের বদলে নক্ষত্রকে লক্ষ্য করে ডান চোখ ও বাম চোখ দিয়ে তাকালে দেখা যাবে, কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। কারণ নক্ষত্র এতই বেশি দূরে অবস্থান করে যে, দুই চোখের কাছাকাছি অবস্থান তেমন কোনো কৌণিক বিচ্যুতি তৈরি করতে পারে না। দুই চোখ যদি পরস্পর থেকে কয়েক মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করতো, তাহলে এদের দ্বারা প্যারালাক্স পদ্ধতিতে নক্ষত্রদের দূরত্ব পরিমাপ করা যেত।
খালি চোখে নক্ষত্রের প্যারালাক্স পর্যবেক্ষণ করতে হলে দুই চোখকে পরস্পর থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করতে হবে। ছবি: মাই কিউট গ্রাফিক্স
চোখকে হয়তো মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করানো সম্ভব না, কিন্তু বিজ্ঞানীরা এর বিকল্প পদ্ধতি খুঁজে নিয়েছেন। আসলে কোনো কিছুকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণ করলে, তার মধ্যে হাজার রকমের সমস্যা দেখা দেয় এবং এসব সমস্যার বিপরীতে হাজার রকমের চমকপ্রদ সমাধানও এসে ধরা দেয়। বিজ্ঞানীরা মহাকাশীয় বস্তুর দূরত্ব মাপতে পৃথিবীর কক্ষপথীয় ঘূর্ণনকে ব্যবহার করেন। সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর কক্ষপথের ব্যাস ১৮৬ মিলিয়ন মাইল। আজকে পৃথিবী কক্ষপথের যে অবস্থানে আছে এবং ঠিক ছয় মাস পরে যে অবস্থানে থাকবে তাদের পারস্পরিক দূরত্ব হবে ১৮৬ মাইল। এটি মোটামুটি যথেষ্ট লম্বা দূরত্ব। এত পরিমাণ দূরত্বে দূরবর্তী নক্ষত্রের প্যারালাক্স অনায়াসেই শনাক্ত করা যাবে।
কক্ষপথের কোনো অবস্থান থেকে নক্ষত্রের অবস্থানের মাপ নিয়ে, ছয় মাস পর আবারো ঐ নক্ষত্রের মাপ নিলে প্যারালাক্স পদ্ধতির মাধ্যমে তার দূরত্ব নির্ণয় করা যাবে। এখানে যেহেতু ছয় মাস আগে ও ছয় মাস পরে পৃথিবীর দুই অবস্থানের দূরত্ব জানা আছে এবং নক্ষত্রের অবস্থান চ্যুতি জানা আছে, তাই ত্রিকোণমিতির সূত্রের মাধ্যমে এখান থেকে নক্ষত্রের দূরত্ব বের করা খুব কঠিন কিছু নয়।
বড় পড়িসরে প্যারালাক্স। ছবি: ইএসএ ইন্টারন্যাশনাল
কিন্তু এত বিশাল দূরত্বকে ব্যবহার করার পরেও সকল নক্ষত্রের দূরত্ব এর মাধ্যমে বের করা যায় না। এই পদ্ধতিতে শুধুমাত্র নিকট দূরের নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব পরিমাপ করা যায়। অতীব দূরের নক্ষত্রগুলোর বেলায় এই পদ্ধতিতে দূরত্ব বের করা যায় না। এরা এতটাই দূরে যে, ১৮৬ মিলিয়ন মাইলের প্যারালাক্স দুূরত্বও এখানে কিছু না।
এদের দূরত্ব পরিমাপ করতে হলে প্যারালাক্স পদ্ধতির বিকল্প কিছু একটা ভাবতে হবে। এর বিকল্প হতে পারে উজ্জ্বলতা। কোনো নক্ষত্র বা কোনো গ্যালাক্সি কতটুকু উজ্জ্বল তার মাধ্যমে দূরত্ব বের করা যেতে পারে। কোনো নক্ষত্র যদি কাছে থাকে তাহলে তাকে অধিক উজ্জ্বল দেখাবে আর কোনো নক্ষত্র যদি দূরে থাকে তাহলে তাকে কিছুটা অনুজ্জ্বল দেখাবে।
উজ্জ্বলতা বিবেচনা করে দূরত্ব পরিমাপ করার ব্যাপারটি আপাতভাবে সুন্দর হলেও, এতে বেশ কিছু ঝামেলা আছে। সব নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা সমান নয়। নক্ষত্রের আকার ও ভরের উপর তার উজ্জ্বলতা নির্ভর করে। অনুজ্জ্বল নক্ষত্রটি যদি কাছে থাকে আর উজ্জ্বল নক্ষত্রটি যদি দূরে থাকে, তখন এই ব্যাপারটির মীমাংসা কীভাবে করা হবে? মৃদু উজ্জ্বল মোমবাতি যদি কাছে থাকে আর অধিক উজ্জ্বল মোমবাতি যদি দূরে থাকে, তাহলে আপেক্ষিকভাবে তাদের উজ্জ্বলতা সমান বলে মনে হতে পারে। কিংবা এমনও হতে পারে, অবস্থানের কারণে হালকা উজ্জ্বলতার মোমবাতিটিকেই বেশি উজ্জ্বল বলে প্রতিভাত হচ্ছে। নক্ষত্রদের বেলাতেও এরকম ব্যাপার প্রযোজ্য। তাই উজ্জ্বলতা দিয়ে দূরত্ব পরিমাপ করতে গেলে তা সমস্যার সৃষ্টি করবে।
সৌভাগ্যক্রমে, বিজ্ঞানীরা বিশেষ ধরনের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে দূরবর্তী নক্ষত্রের দূরত্ব পরিমাপ করতে পারেন। তারা বিশেষ কিছু নক্ষত্রকে ‘প্রমাণ নক্ষত্র’ হিসেবে ধরে নেন এবং এদের সাপেক্ষে অন্য নক্ষত্রের দূরত্ব পরিমাপ করতে পারেন। এসব নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা ও তীব্রতা নির্দিষ্ট থাকে। বিজ্ঞানীরা এও জানেন, কীভাবে এরকম প্রমাণ নক্ষত্র (Variable Star) খুঁজে বের করতে হবে। এরকম নক্ষত্রের সাহায্যে, প্রতিষ্ঠিত কিছু গাণিতিক সূত্রাবলি প্রয়োগ করে বের করা যায় দূরবর্তী নক্ষত্রগুলো কত দূরে অবস্থিত।
ট্রিফিড নীহারিকায় কয়েকটি প্রমাণ নক্ষত্র। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স/ESO/D. Minniti
গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র যত দূরেই থাকুক, কোনো না কোনো ভাবে আমরা তাদের অবস্থান ও দূরত্ব বের করতে পারি। নিকটবর্তী নক্ষত্রের জন্য আমাদের আছে প্যারালাক্স পদ্ধতি আর দূরবর্তী নক্ষত্রের জন্য আমাদের আছে ‘প্রমাণ নক্ষত্র’ পদ্ধতি।
বিজ্ঞান এই একটা দিক থেকে অনন্য। কোনো একটা ব্যাপার যতই ধরাছোঁয়ার বাইরে হোক না কেন, বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে মানুষ কিছু একটা উপায় ঠিকই খুঁজে নেয়। বিজ্ঞানের মারপ্যাঁচে সমস্যার সমাধান বের হয়ে যায় ঠিকই।
সংক্ষেপে দেখুনপৃথিবী থেকে মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে কী ঘটবে ?
কোথাও কেউ নেই। পরিত্যক্ত শহরে বাতাসে উড়ে বেড়ানো কিছু কাগজপত্র আর পলিথিনের ব্যাগের শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দও নেই। একটু পরপর ভূতুড়ে কঙ্কালের মতো যেন দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নদশার পরিত্যক্ত বহুতল ভবনগুলো। মাঝে মাঝে এ গলি থেকে ও’ গলিতে দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে হ্যামেলিনের গল্পের মতো বিশালাকৃতির ইঁদুর অথবা অন্য কোনবিস্তারিত পড়ুন
কোথাও কেউ নেই। পরিত্যক্ত শহরে বাতাসে উড়ে বেড়ানো কিছু কাগজপত্র আর পলিথিনের ব্যাগের শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দও নেই। একটু পরপর ভূতুড়ে কঙ্কালের মতো যেন দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নদশার পরিত্যক্ত বহুতল ভবনগুলো। মাঝে মাঝে এ গলি থেকে ও’ গলিতে দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে হ্যামেলিনের গল্পের মতো বিশালাকৃতির ইঁদুর অথবা অন্য কোনো নাম না জানা বিদঘুটে প্রাণী। আর এই পরিত্যক্ত শহরেই হয়তো বাঁচার চেষ্টা করছে বিচ্ছিন্ন একটি-দুটি পরিবার।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: Entertainment One
এই দৃশ্য আমাদের অত্যন্ত পরিচিত। শত শত পোস্ট অ্যাপোক্যালিপ্টিক চলচ্চিত্র আছে, যেখানে এ ধরনের দৃশ্য দেখানো হয়। কোনো ভাইরাসের আক্রমণে, রহস্যময় কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে, কিংবা বিষাক্ত কোনো রাসায়নিক দুর্ঘটনায় বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের মৃত্যুর পর অল্প কিছু বেঁচে থাকা মানুষের ভাগ্যে কী ঘটতে পারে, সেটাই এ ধরনের চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সত্যিই যদি কখনো হঠাৎ করে বিশ্বের সব মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীতে কী কী ঘটতে পারে? মানব সভ্যতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হতে কীরকম সময় লাগতে পারে?
উৎসাহী বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময় এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেল বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গবেষকের সাহায্যে মনুষ্য পরবর্তী যুগের পৃথিবীর চিত্র আঁকার চেষ্টা করেছেন। সামান্য কিছু পার্থক্য থাকলেও তারা অধিকাংশই মোটামুটি একই ধরনের সম্ভাবনা এবং আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। চলুন জেনে নিই কী ঘটতে পারে পৃথিবীর ভাগ্যে, যদি আমরা হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে যাই।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: tokyogenso
মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পৃথিবীর অধিকাংশ এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। বিশ্বের অধিকাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় জ্বালানি তেলের মাধ্যমে। মানুষ না থাকলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মতো কেউ না থাকায় কয়েক ঘন্টার ব্যবধানেই বিশ্বের অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। কেবলমাত্র উইন্ডমিল, সোলার প্যানেল এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরবরাহকৃত এলাকাতেই বিদ্যুৎ প্রবাহ অবিচ্ছিন্ন থাকবে।
উইন্ডমিলের লুব্রিক্যান্ট শেষ হয়ে গেলে এবং সোলার প্যানেলের উপর ধুলোবালি পড়ে তা আচ্ছাদিত হয়ে গেলে কয়েক মাসের মধ্যে সেগুলোও অকার্যকর হয়ে যাবে। শেষপর্যন্ত শুধুমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত থাকতে পারে। এগুলো কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর পর্যন্তও কার্যকর থাকতে পারে। অব্যবস্থাপনায় সেগুলোও নষ্ট হয়ে গেলে কয়েক শত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পৃথিবী সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: tokyogenso
প্রথম কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আরেকটি বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। বিশ্বের তেল এবং গ্যাস শোধনাগারগুলোতে বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি হবে। নিয়ন্ত্রণ করার কেউ না থাকায় সেগুলো মাসের পর মাস ধরে জ্বলতে পারে। লোকালয় কিংবা বনাঞ্চল থেকে বেশি দূরে অবস্থিত না হলে অগ্নিকান্ড ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। এছাড়াও প্রথম ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই শক্তি গ্রহণের মাত্রায় ব্যাপক হ্রাস হওয়ায় বিশ্বের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেফ মোডে চলে যাবে।
দুই-তিন দিনের মধ্যেই বিশ্বের অধিকাংশ ভূগর্ভস্থ রেললাইন এবং টানেল পানিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে যাবে। নিয়মিত পানি নিষ্কাশনের জন্য অধিকাংশ ভূগর্ভস্থ রেললাইন এবং টানেলেই পাম্প ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এবং জেনারেটরের জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় সেগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এবং পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব না হওয়ায় ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে পড়বে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
১০ দিনের মধ্যেই অধিকাংশ পোষা প্রাণী অনাহারে মৃত্যুবরণ করবে। ইলেক্ট্রিক গেটগুলো অকেজো হয়ে পড়ায় প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই বিশ্বের শত কোটি গরু, ছাগল, শূকর, মুরগিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণী তাদের খামার থেকে বেরিয়ে পড়বে। যারা বের হতে পারবে না, তারা খামারের ভেতরেই মারা যাবে। আর যারা বের হতে পারবে, তারাও বাইরের পরিবেশের সাথে অভ্যস্ত না হওয়ায় এবং খাবারের সংকট থাকায় ধীরে ধীরে মারা পড়বে। বেঁচে থাকবে কেবল আগে থেকেই বাইরে থাকা হিংস্র বন্য পশুরা। বিভিন্ন জাতের ইঁদুর এবং তেলাপোকা বেঁচে থাকলেও যেগুলো মানুষের ফেলে দেওয়া ময়লার উপর নির্ভরশীল ছিল, খাদ্যের অভাবে তাদের সংখ্যাও বিপুলভাবে হ্রাস পাবে।
এক মাসের মধ্যেই নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলোকে ঠান্ডা করার জন্য ব্যবহৃত পানি বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার ফলে রিঅ্যাক্টরগুলোতে বিস্ফোরণ শুরু হবে। নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এর প্রতিক্রিয়া হবে চেরনোবিল এবং ফুকুশিমার সম্মিলিত বিপর্যয়ের চেয়েও মারাত্মক। বিশাল এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে যাবে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত পৃথিবীর বড় একটি অংশ জুড়ে এর প্রভাব বজায় থাকবে। আশেপাশের এলাকার প্রচুর প্রাণী দীর্ঘকাল পর্যন্ত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ছাড়াও প্রাকৃতিক কারণেও নিয়মিত অগ্নিকান্ড ঘটবে। সামান্য বজ্রপাতের কারণে কোনো এলাকায় অগ্নিকান্ডের সূচনা হলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। অগ্নিকান্ডের কারণে বিশ্বের প্রচুর গ্রামের কাঠের নির্মিত ঘরবাড়ি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আগুনের হাত থেকে বেঁচে গেলেও কাঠের অধিকাংশ ঘরবাড়ি ধীরে ধীরে ঘুণপোকা এবং ছারপোকার আক্রমণে ধ্বসে পড়তে থাকবে। মোটামুটি ৭৫ বছরের মধ্যে কাঠের বিম এবং কলামগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করবে এবং ১০০ বছরের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ কাঠের স্থাপনা ধ্বসে পড়বে।
২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে ফুটপাথ এবং রাস্তাঘাটগুলোতে ফাটল ধরে সেখানে আগাছা এবং গাছপালা জন্মাতে থাকবে। এ সময়ের মধ্যে ফুটপাত এবং খোলা চত্বরগুলোর তিন-চতুর্থাংশই ঘাস এবং আগাছায় আবৃত হয়ে যাবে। বিশ্বের অনেক রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাবে। শীত প্রধান দেশে শীতকালে পানি জমে বরফ হয়ে যাবে এবং গরমকালে আবার বরফ গলে পানিতে রূপান্তরিত হবে। এই তারতম্যের কারণে রাস্তাঘাটের ভাঙণ ত্বরান্বিত হবে। বৃষ্টির পানি ছাদের উপর জমে কনক্রিটের ভবনগুলোরও একই দশা সৃষ্টি করবে। মোটামুটি ২০০ বছরের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ কনক্রিটের বিল্ডিং ভেঙে পড়তে শুরু করবে।

শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
ব্যবস্থাপনার অভাবে স্টিলের তৈরি ভবন এবং ব্রিজগুলোতে বৃষ্টির পানি এবং বাতাসের অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় মরচে ধরতে শুরু করবে। মোটামুটি ৩০০ বছরের মধ্যে আইফেল টাওয়ার, গোল্ডেন গেট ব্রিজসহ বিশ্বের অধিকাংশ স্টিলের স্থাপনা ভেঙে পড়তে শুরু করবে। মরুভূমিতে এই প্রক্রিয়া একটু মন্থর হবে, কিন্তু তার আগেই আরব আমিরাত, কাতারসহ বিশ্বের অধিকাংশ মরুময় এলাকা পুনরায় বালিতে ডুবে যাবে। যত মজবুতই হোক, ব্যবস্থাপনা না থাকায় কয়েকশো বছরের মধ্যে বাঁধগুলোও ভেঙে পড়বে এবং প্রচুর এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। প্রকৃতি ধীরে ধীরে মানব সভ্যতাকে গ্রাস করে নিতে থাকবে।
মানুষের কারণে যেসব বন্যপ্রাণী, পাখি এবং সামুদ্রিক মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল, তাদের সংখ্যা পুনরায় বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে। চিড়িয়াখানা থেকে বের হয়ে যাওয়া বন্য এবং বিরল প্রজাতির প্রাণীরাও নতুন করে বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করবে। মানুষের অনুপস্থিতিতে দূষণ হ্রাস পাবে, বায়ুমন্ডল পরিষ্কার হয়ে উঠতে থাকবে। কয়েক হাজার বছর পরে মানুষের নির্মিত শহরগুলোর খুব কম চিহ্নই অবশিষ্ট থাকবে। শহরের রাস্তাগুলো নদীতে এবং শহরগুলো বনাঞ্চলে পরিণত হয়ে যাবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে মানুষ যে কৃত্রিম আবাসস্থল তৈরি করেছিল, প্রকৃতি সেগুলো আবার অধিগ্রহণ করে নিবে।

সংক্ষেপে দেখুনশিল্পীর দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত বিশ্ব যেরকম হবে; Image Source: wallpapercave.com
মানুষের নির্মিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে শেষপর্যন্ত টিকে থাকবে প্রাচীনকালে পাথর কেটে তৈরি করা বিশালাকৃতির স্থাপনাগুলোই। ১০ হাজার বছর পর কেবলমাত্র চীনের মহাপ্রাচীর, মিসরের পিরামিড এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট রাশমোর ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ছাড়া বলতে গেলে মানুষের নির্মিত আর কোনো স্থাপনাই টিকে থাকবে না। মাউন্ট রাশমোরে পাহাড় কেটে প্রেসিডেন্টদের তৈরি মূর্তিগুলোই হয়তো সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হবে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত না হলে সেগুলো সাত মিলিয়ন বছর পর্যন্ত অক্ষত থাকতে পারবে। দশ থেকে পনেরো মিলিয়ন বছর পর যদি কোনো এলিয়েন পৃথিবীতে ভ্রমণ করে, তবে কেবলমাত্র কিছু প্লাস্টিকের অবশেষ ছাড়া মানুষের তৈরি কোনো কিছুই তারা খুঁজে পাবে না।
পৃথিবীটা যদি সমতল হতো তাহলে কেমন হতো?
কেমন হতো যদি আমাদের পৃথিবীটা বর্তুলাকার না হয়ে সমতল চাকতির মতো হতো? যেরকমটি ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটির সদস্যরা বিশ্বাস করে থাকে? আমাদের জীবনে এই সমতল চাকতির মতো পৃথিবীর প্রভাব কীরকম হতো? আমরা যদি হাঁটতে হাঁটতে সেই চাকতির একেবারে প্রান্তে পৌঁছে যেতাম, তাহলে কি সেখান থেকে বাইরের মহাশূন্যে ছিটকে পড়ে যেতাম?বিস্তারিত পড়ুন
কেমন হতো যদি আমাদের পৃথিবীটা বর্তুলাকার না হয়ে সমতল চাকতির মতো হতো? যেরকমটি ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটির সদস্যরা বিশ্বাস করে থাকে? আমাদের জীবনে এই সমতল চাকতির মতো পৃথিবীর প্রভাব কীরকম হতো? আমরা যদি হাঁটতে হাঁটতে সেই চাকতির একেবারে প্রান্তে পৌঁছে যেতাম, তাহলে কি সেখান থেকে বাইরের মহাশূন্যে ছিটকে পড়ে যেতাম?
পৃথিবী বা অন্য কোনো গ্রহের পক্ষেই আসলে সমতল হওয়া সম্ভব না। মহাকর্ষ শক্তির প্রভাবেই গ্রহ-নক্ষত্রগুলো প্রায় বৃত্তাকার হতে বাধ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির গ্রহ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভ স্টিভেনসনের মতে, এই মুহূর্তে যদি পৃথিবীকে জোর করে প্যানকেকের মতো সমতল করে দেওয়া হয়, তাহলে যা ঘটবে তা হচ্ছে, মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে এটি আবার গোলকে রূপান্তরিত হওয়ার চেষ্টা করবে। সমতল বানিয়ে ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথেই পৃথিবী এত প্রবলভাবে গোলক রূপে ফিরে যেতে চাইবে যে, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এমন কোনো পদার্থ নেই, যা দিয়ে পৃথিবীর পুনরায় গোলকে রূপান্তরিত হওয়ার প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে রাখা যাবে। তার মতে, মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই পৃথিবী গোলকে রূপান্তরিত হতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।
সমতল পৃথিবীর প্রান্ত থেকে বাইরে পড়ে যাওয়ার ধারণা @ Antar Dayal / Getty
লন্ডনের রয়্যাল অবজারভেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী ম্যারেক কুকুলাও স্টিভেনসনের মতো একই ধারণা পোষণ করেন। তার মতে, পৃথিবীকে যদি সমতল অবস্থায় রাখতে হয়, তাহলে এমন একটি সুইচের প্রয়োজন হবে, যার মাধ্যমে মহাকর্ষকে গায়েব করে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে পৃথিবীতে বায়ুমণ্ডল বলে কিছু থাকবে না; বায়ুমণ্ডল সহ পৃথিবীর সাথে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত নয়, এমন সব কিছুই ভাসতে ভাসতে মহাশূন্যে উড়ে যাবে। তাছাড়া বায়ুমণ্ডল না থাকায় অক্সিজেনের অভাবে সেখানে কোনো প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকাও সম্ভব হবে না।
কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয় যে, কোনো অলৌকিক ক্ষমতা বলে পৃথিবীকে সমতল করে ফেলা হলো এবং এর আকর্ষণ শক্তিও বজায় রাখা হলো, সেক্ষেত্রে কী ঘটতে পারে?
মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রকৃতি
গোলাকার পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির দিক; Source: TheHUB
সমতল পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির দিক; Source: TheHUB
সমতল পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কেন্দ্র হবে চাকতিটির পৃষ্ঠের কেন্দ্রবিন্দুতে। ফলে আপনি যদি চাকতির মতো আকৃতি বিশিষ্ট পৃথিবী পৃষ্ঠের কেন্দ্রে বা এর আশেপাশে অবস্থান করেন, তাহলে অনেকটা এখনকার মতোই আকর্ষণ অনুভব করবেন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে যত দূরে যেতে থাকবেন, পৃথিবী সমতল হওয়ার কারণে মাধ্যাকর্ষণ বল আপনাকে তত তীর্যকভাবে আকর্ষণ করতে থাকবে। ফলে আপনার হাঁটতে কষ্ট হবে এবং মনে হবে, আপনি বুঝি ঢালু পথ বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করছেন। কেন্দ্র থেকে যত বেশি প্রান্তের দিকে যেতে থাকবেন, আপনার কাছে ঘর-বাড়ি, পাহাড়-পর্বত সব কিছুকে তীর্যকভাবে তৈরি বলে মনে হতে থাকবে।
পৃথিবী পৃষ্ঠের পুরুত্বের উপর নির্ভর করে কেন্দ্রের দিকে অভিকর্ষের মান মোটামুটি স্বাভাবিক হতে পারে। চাকতিটির পুরুত্ব কীরকম হতে পারে, সেটি নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। তবে এর পুরুত্ব বর্তমান পৃথিবীর ব্যাসার্ধের এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ প্রায় ২,১২৩ কিলোমিটার ধরে নেওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে, গোলকের পৃষ্ঠকে যদি ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ব্যাসার্ধের এক-তৃতীয়াংশ পুরুত্ব নিলেই কেবল গোলকের সমান আয়তন পাওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে পৃথিবীর কেন্দ্র অভিকর্ষের মান বর্তমানের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হতে পারে। তবে কেন্দ্র থেকে দূরে যেতে থাকলে এই মান ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকবে।
পৃথিবীর প্রান্ত থেকে ছিটকে পড়ে যাওয়া
পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরে যেতে থাকলে পথগুলোকে ঢালু মনে হবে; Source: VSauce/YouTube
পৃথিবীর একেবারে প্রান্তে পৌঁছানো আপনার পক্ষে অসম্ভব না হলেও খুবই কঠিন একটি কাজ হবে। কারণ, একেবারে প্রান্তে পৃথিবীর অভিকর্ষ বল প্রায় ভূমির সমান্তরালে কাজ করবে। ফলে আপনি যদি প্রান্তের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করেন, তাহলে আপনার কাছে মনে হবে, আপনি বুঝি একেবারে খাড়া পাহাড় বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন।
যদি কোনোভাবে আপনি পৃথিবী নামক চাকতিটির একেবারে প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারেন, তাহলে আপনি তো বাইরের মহাশূন্যে ছিটকে পড়বেনই না, বরং সম্ভাবনা আছে কেন্দ্রের দিক থেকে ভূমির সমান্তরাল আকর্ষণ শক্তির প্রভাবে আপনি ভেতরের দিকেই পড়ে যাবেন। আর একবার যদি চাকতির প্রান্তের ধারের উপর উঠে যেতে পারেন, তাহলে আপনার কাছে সেটিকেই স্বাভাবিক মাটি বলে হবে। সেখানে আপনি খুবই স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারবেন, অনেকটা এখনকার মতোই।
পৃথিবীর প্রান্তে পৌঁছালে ভেতর দিকে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে; Source: VSauce/YouTube
দিবারাত্রির পরিবর্তন
পৃথিবী গোলক হওয়ায় নিজ অক্ষের উপর আবর্তের ফলে দিবারাত্রি সংঘটিত হয়। কিন্তু পৃথিবী যদি সমতল হয়, তাহলে দিন বা রাত বলে পৃথক কিছু থাকবে না। সবসময় সমগ্র পৃথিবী একই রকমের আলো পাবে। অবশ্য আমরা যদি কল্পনা করে নেই যে, পৃথিবী না, বরং সূর্যই পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, সেক্ষেত্রে অবশ্য ভিন্ন কথা। সেক্ষেত্রে দিন এবং রাত সংঘটিত হবে ঠিকই, কিন্তু সমগ্র পৃথিবীতে একই সাথে দিন হবে, আবার একই সাথে রাত হবে।
ঋতু পরিবর্তন
পৃথিবী তার অক্ষের উপর তীর্যকভাবে হেলে থাকা অবস্থায় সূর্যের চারদিকে আবর্তন করার ফলে দিবারাত্রির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে এবং ঋতু পরিবর্তিত হয়। কিন্তু পৃথিবী সমতল হলে ঋতুর কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। পুরো বছর জুড়ে পৃথিবীর সকল স্থান একই রকম সূর্যের আলো পাবে। ফলে গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকাল বা শীতকাল বলে পৃথক পৃথক কোনো ঋতু থাকবে না। সমগ্র পৃথিবীর তাপমাত্রা মোটামুটি একই রকম থাকবে। উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু নামে কিছু না থাকায় কোথাও কোনো বরফও থাকবে না।
সাগর-মহাসাগরের অবস্থান
গোলাকার পৃথিবী বনাম সমতল পৃথিবী; Source: TheHUB/ Youtube
যেহেতু পৃথিবী নামক চাকতিটি সবকিছুকে তার কেন্দ্র বরাবর আকর্ষণ করবে, তাই পৃথিবীর সব সাগর-মহাসারের অবস্থান হবে পৃথিবীর কেন্দ্রে। অন্য কোথাও কোনো জলাধারের অস্তিত্ব থাকবে না। অর্থাৎ পুরো পৃথিবীর শুধুমাত্র যে দুটো জায়গায় স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বিরাজ করবে, তার একটি (কেন্দ্র) হবে মহাসাগর, আর অন্যটি (চাকতির প্রান্তের ধারের উপর) হবে পানিবিহীন সম্পূর্ণ মরুময়।
দৃষ্টিসীমা
পৃথিবী গোল হওয়ার কারণে আমরা মাটিতে থাকা অবস্থায় যতদূর পর্যন্ত দেখতে পারি, উঁচু স্থানে উঠলে তার চেয়ে আরো অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পারি। কিন্তু পৃথিবী সমতল হলে পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে খুব বেশি লাভ হবে না। পৃথিবী গোল বলেই সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ালে দূর থেকে কোনো জাহাজ যখন আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়, তখন আমরা প্রথমে তার মাস্তুলের চূড়াটি দেখি, এরপর পুরো জাহাজটির বিভিন্ন অংশ উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। কিন্তু সমতল পৃথিবীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ জাহাজ একসাথে আমাদের চোখের সামনে ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকবে। এখন যেরকম প্লেনে চড়লে আমরা পৃথিবীর বক্রতা বুঝতে পারি, তখন সেরকম ঘটবে না। প্লেন থেকেও দিগন্তকে সমতল বলে মনে হবে।
প্লেন থেকে দেখলে পৃথিবীর বক্রতা বোঝা যায়: Source: TheHUB
চন্দ্রগ্রহণ
সূর্য, চাঁদ এবং পৃথিবী যদি একই সমান্তরালে আসে, তখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়লে সেটাকে আমরা চন্দ্রগ্রহণ বলি। পৃথিবী গোলাকার বলেই পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে দিন বা রাতের যেকোনো সময় চন্দ্রগ্রহণ উপভোগ করার সময় চাঁদের উপর গোলাকার পৃথিবীর ছায়া পড়তে দেখা যায়। কিন্তু যদি পৃথিবী সমতল হয়, তাহলে চাঁদের উপর গোলাকার ছায়া পড়ার ঘটনাটি, অর্থাৎ পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হবে খুবই বিরল ঘটনা।
কারণ, অধিকাংশ সময়ই পৃথিবী-চন্দ্র-সূর্য একই সমান্তরালে আসার পরেও দেখা যাবে, পৃথিবীর সাথে তাদের অবস্থান এমন এক কৌণিক তলে যে, চাঁদের উপর গোলাকার পৃথিবীর ছায়া পড়া পড়ছে না, কেবলমাত্র একটি সরু দাগ দেখা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে পূর্ণ গ্রহণ কেবলমাত্র তখনই ঘটবে, যখন এদের অবস্থান একই সমান্তরালে অবস্থিত হবে এবং একইসাথে সূর্যের অবস্থান হবে পৃথিবীর উপরি পৃষ্ঠের ঠিক বিপরীত দিকে। অর্থাৎ পূর্ণগ্রহণ হবে শুধুমাত্র মাঝরাতে।
খেলাধুলার উপর প্রভাব
পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরে যেতে থাকলে অভিকর্ষ তীর্যকতর হতে থাকবে; Source: VSauce/YouTube
পৃথিবী সমতল হলে খেলাধুলার উপরেও বিশাল প্রভাব পড়বে। ফুটবল খেলার সময় বল যেদিকেই নিক্ষেপ করা হোক না কেন, মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে সেটি সব সময়ই গড়িয়ে পৃথিবী পৃষ্ঠের কেন্দ্রের দিকে ছুটে চলে আসতে চাইবে। কাজেই মাঠগুলোর দিক যদি হয় পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে এর প্রান্তের মধ্যবর্তী ব্যাসার্ধের অভিমুখে, তাহলে যে দল প্রান্তের দিকে থাকে থাকবে, তারা বেশি সুবিধা পাবে। ফলে সবগুলো মাঠের দিক হতে হবে ব্যাসার্ধের সাথে লম্ব অভিমুখে।
গাছপালার বৃদ্ধি
পৃথিবীতে গাছপালা বৃদ্ধি পায় মাধ্যাকর্ষণ বলের বিপরীত দিক অভিমুখে। ঋণাত্মক গ্র্যাভিট্রোপিজম নামক এক প্রকার বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি ঘটে থাকে। পৃথিবী সমতল হলে কেবলমাত্র কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থিত গাছপালার বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবে হবে। কেন্দ্র থেকে দূরত্ব যত বেশি হবে, গাছপালা তত তীর্যকভাবে বেড়ে উঠতে থাকবে।
সংক্ষেপে দেখুনসূর্য কিভাবে পৃথিবীর সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখছে?
বেঁচে থাকতে এবং বেঁচে থাকার তাগিদে করা প্রত্যেকটি কাজের পেছনে আছে সূর্যের হাত। দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো এক দিক থেকে সূর্যের উপস্থিতি পাওয়া যাবেই। আমাদের জীবন ধারণ করতে সূর্য কেমন ভূমিকা পালন করছে সে সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা হবে এখানে। আমরা এখনো জানি নাবিস্তারিত পড়ুন
বেঁচে থাকতে এবং বেঁচে থাকার তাগিদে করা প্রত্যেকটি কাজের পেছনে আছে সূর্যের হাত। দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো এক দিক থেকে সূর্যের উপস্থিতি পাওয়া যাবেই। আমাদের জীবন ধারণ করতে সূর্য কেমন ভূমিকা পালন করছে সে সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা হবে এখানে।
আমরা এখনো জানি না পৃথিবীর বাইরে মহাবিশ্বের কোনো স্থানে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা। তবে এটা জানি, যদি বহির্বিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব থেকে থাকে তাহলে তা অবশ্যই হবে কোনো নক্ষত্রের কাছাকাছি কোনো স্থানে। অন্তত এটা বলা যায়, পৃথিবীতে যে ধরনের প্রাণ আছে সে ধরনের প্রাণ যদি বাইরের বিশ্বে থাকে তাহলে তারা তাদের নক্ষত্রের কাছে থাকবে। কারণ এরকম প্রাণের টিকে থাকতে হলে নিকটবর্তী নক্ষত্র থেকে শক্তি সংগ্রহ করতে হবে। শক্তি ছাড়া কোনো প্রাণ টিকে থাকতে পারে না, শক্তি ছাড়া কোনো সভ্যতার বিকাশ হতে পারে না।
পৃথিবী যেমন সূর্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে অনেকটা তেমনই কাছে অবস্থান করবে প্রাণ ধারণকারী সেই গ্রহটি। কাছাকাছি বলতে একদম নিকটে বোঝানো হয়নি, আপেক্ষিকভাবে কাছাকাছি থাকবে অর্থাৎ প্রাণবান্ধব এলাকার মাঝে অবস্থান করবে। খুব কাছেও নয়, যার কারণে অধিক উত্তাপে পানি বাষ্প হয়ে উবে যাবে, আবার খুব দূরেও নয় যার কারণে অধিক শীতলতায় পানি সর্বদা বরফ হয়ে থাকবে। এরকম এলাকাই হচ্ছে প্রাণ ধারণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ।
প্রাণবান্ধব অঞ্চলটি দূরবর্তী কক্ষপথেও থাকতে পারে, আবার কাছের কক্ষপথেও হতে পারে। যেমন R136a1 নামে একটি নক্ষত্র আছে, যা আকারে বেশ বড়। নক্ষত্রের প্রাণ ধারণকারী গ্রহটির অবস্থান হবে এর থেকে দূরে, কারণ বড় বলে তার উত্তাপ বেশি হবে, তাই এমন দূরত্বে থাকতে হবে যেন উত্তাপে প্রাণ কোনো হুমকির মুখে না পড়ে। আবার সূর্যের চেয়েও ছোট কোনো নক্ষত্রের বেলায় প্রাণ ধারণকারী গ্রহ থাকবে নক্ষত্রের একদম কাছে, কারণ এর চেয়ে বেশি দূরে চলে গেলে গ্রহের পরিবেশ হবে অত্যধিক শীতল।
নক্ষত্রের আকার অনুসারে প্রাণ বান্ধব অঞ্চলের অবস্থান (গাঢ় আকাশী রঙ), মূল ছবি: পেগাসাস/বাংলায় রূপান্তর: লেখক
এবার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নে প্রবেশ করা যাক। প্রাণ ধারণকারী গ্রহকে কেন নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থান করতে হবে? কারণ প্রত্যেক প্রাণেরই টিকে থাকার জন্য শক্তি দরকার। আর শক্তির চমৎকার ও সহজলভ্য উৎস হচ্ছে নক্ষত্র। কোনো প্রকার কর্মযজ্ঞ ও অর্থ বিনিয়োগ না করেই নক্ষত্র বছরের পর বছর ধরে শক্তি সরবরাহ করে যায়। ফ্রি ফ্রি পাওয়া উন্নতমানের সুবিধা, এটার সদ্ব্যবহার করাই বেশি যৌক্তিক।
পৃথিবীর কথা বিবেচনা করি। পৃথিবীতে উদ্ভিদেরা সূর্যালোক থেকে শক্তি সংগ্রহ করে এবং তা সরবরাহ করে সমগ্র জীবজগতকে। উদ্ভিদ সূর্যালোক থেকে নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে। খাদ্য তৈরির জন্য অবশ্য সূর্যের আলোর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইডেরও প্রয়োজন হয়। এদের পাশাপাশি মাটির নিচ থেকে পানি ও খনিজেরও দরকার হয়। মূল শক্তিটুকু সূর্যের আলো থেকেই সংগ্রহ করে এবং এর সাহায্যেই স্যুগার বা চিনি তৈরি করে। চিনির শক্তিকে ভেঙেই সকল প্রাণী ও উদ্ভিদেরা চলাফেরা ও নড়াচড়া করে।
পাতার মধ্যে ঘটে যাওয়া প্রক্রিয়াগুলো হাজার হাজার সোলার প্যানেলের সমন্বয়ে তৈরি বিশাল এক ফ্যাক্টরির মতো। বাড়তি উপযোগ পাবার জন্য পাতাগুলো চ্যাপ্টা হয়ে থাকে। চ্যাপ্টা হলে এর ক্ষেত্রফলের পরিমাণ বাড়ে, ক্ষেত্রফল বাড়লে তাতে অধিক পরিমাণ সূর্যালোক আপতিত হয়। ফলে অধিক পরিমাণ খাদ্য উৎপন্ন হয়। বায়ু থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ে, ভূগর্ভ থেকে পানি ও খনিজ নিয়ে সূর্যের আলোকে ব্যবহার করে যে রেসিপির প্রক্রিয়া করা হয় তার চূড়ান্ত উৎপাদ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের চিনি।
পাতায় উৎপন্ন হওয়া বিভিন্ন ধরনের চিনি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চলে যায় উদ্ভিদের সমগ্র দেহে। দেহের বিভিন্ন অংশ আবার চিনি থেকে স্টার্চ বা শ্বেতসার তৈরি করে। শক্তি হিসেবে এটি আবার চিনি থেকেও বেশি সুবিধাজনক। উদ্ভিদের দেহের এই শ্বেতসার ও চিনি থেকে তৈরি হওয়া শক্তি ব্যবহার করেই বেঁচে থাকে দুনিয়ার সকল প্রাণী।
সূর্যালোকের শক্তির সাহায্যে বেঁচে থাকে উদ্ভিদ, আর উদ্ভিদের পাতায় উৎপন্ন হওয়া শক্তি ব্যবহার করে বেঁচে থাকে তাবৎ প্রাণিজগৎ। ছবি: গুড হাউজ কিপিং
তৃণভোজী (হার্বিভোরাস) কোনো প্রাণী, যেমন হরিণ বা খরগোশ, যখন কোনো উদ্ভিদকে খায়, তখন উদ্ভিদের শক্তিগুলোও তাদের দেহে যায়। এসব প্রাণীরা তাদের দেহ ও পেশি গঠন করতে শক্তিগুলো কাজে লাগায়। দেহের ও পেশির মাঝে শক্তিগুলো দরকার হয় মূলত খাদ্য সংগ্রহ করা, সঙ্গীর সাথে মিলন করা, বিপদে দৌড় দেয়া, অন্যের সাথে যুদ্ধ করা ইত্যাদি কাজে। এই শক্তিগুলোর আদি বা মূল উৎস হচ্ছে সূর্য, যা উদ্ভিদকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে তাদের মাঝে এসেছে।
মাংসভোজী (কার্নিভোরাস) প্রাণীরা আবার তৃণভোজী প্রাণীদেরকে খায়। ফলে এখানেও তৃণভোজী প্রাণীর শক্তি স্থানান্তরিত হয়ে চলে আসছে মাংসভোজী প্রাণীর মাঝে। এই শক্তিও মাংসভোজী প্রাণীর দেহ ও পেশি গঠন করতে কাজে লাগে। তারাও বিবাদে, দৌড়ে, মিলনে, গাছের চরণে শক্তি ব্যয় করে। মাংসভূক প্রাণীটি যদি স্তন্যপায়ী হয়, তাহলে তার কিছুটা শক্তি শিশুর জন্য দুধ উৎপাদন করতেও চলে যায়। এখানেও শক্তির মূল উৎস হিসেবে থাকছে সূর্য। যদিও এই শক্তি বেশ কতগুলো ধাপ পার হয়ে এই অবস্থানে আসে।
অন্যান্য প্রাণী ও পরজীবীরা মাংসভোজী প্রাণীর দেহে বসবাস করে আরো পরোক্ষভাবে শক্তি সংগ্রহ করে। এখানেও পরজীবীর শক্তির মূল উৎস হচ্ছে সূর্য।
জীবন অতিক্রম করে যখন কোনোকিছু মারা যায়, হোক সেটা প্রাণী, উদ্ভিদ, মাংসভোজী, তৃণভোজী কিংবা কোনো পরজীবী- তারা মৃত্যুর পর মাটিতে বিয়োজিত হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো আবর্জনাভূক প্রাণীরা এদের দেহাবশেষ খেয়ে ফেলে। এমন ধরনের আবর্জনাভূক প্রাণীর উদাহরণ হচ্ছে গোবরে পোকা। ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকও মৃতদেহটিকে খেয়ে শেষ করে ফেলতে পারে। ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকও মূলত এক প্রকার আবর্জনাভূক। এখানেও সেই আগের কথা, শক্তির মূল উৎস হচ্ছে সূর্য। এ কারণেই কম্পোস্টের স্তুপগুলো গরম হয়ে থাকে। কম্পোস্ট মূলত এক ধরনের জৈব সার। গোবর, আবর্জনা, বর্জ্য ইত্যাদি একত্র করে কোনো গর্তে ফেলে ঢেকে রাখলে কয়েকদিন পর যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তা-ই কম্পোস্ট। বছরখানেক আগে যে শক্তি উদ্ভিদের পাতায় আটকা পড়েছিল, সেটি এখন টগবগ করছে পচা কম্পোস্টের স্তূপে।
আবর্জনাভুক গুবরে পোকা, ছবি: esquire.com
‘মেগাপড’ নামে অস্ট্রেলীয় অঞ্চলের একটি পাখি আছে, এরা এদের ডিমে তা দেয় কম্পোস্ট স্তূপের তাপকে ব্যবহার করে। অন্যসব পাখিদের থেকে এরা একটু ব্যতিক্রম। অন্যান্য পাখিরা ডিমের উপর বসে নিজের গায়ের তাপ ব্যবহার করে ডিমে তা দেয়, কিন্তু অস্ট্রেলীয় মেগাপড পাখি তা দেবার জন্য বিচিত্র কারণে কম্পোস্টের স্তূপকে বেছে নেয়। এর জন্য তারা প্রথমে কম্পোস্টের একটি ক্ষেত্র তৈরি করে নেয় এবং পরে তার উপর ডিম পাড়ে। প্রয়োজন অনুসারে তারা তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণও করে। যখন তাপমাত্রা বাড়ানো দরকার, তখন উপর থেকে আরো কম্পোস্ট এনে যোগ করে, যখন তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলা দরকার, তখন কিছু পরিমাণ কম্পোস্ট সরিয়ে নেয়। পাখিগুলো এখানেও কিন্তু আদতে সূর্যের শক্তিকেই ব্যবহার করছে।
অস্ট্রেলীয় মেগাপড, ছবি: ডি কাউয়েল/উইকিমিডিয়া কমন্স
আবর্জনার স্তূপ থেকে মেগাপডের ডিম সংগ্রহ করছেন একজন ব্যক্তি, ছবি: মাইকেল রাংকেল
মাঝে মাঝে কিছু গাছ অনেকদিন ধরে টিকে থাকে। এই গাছগুলো বিয়োজিত হয় না বা কেউ এদের খেয়ে ফেলে না। তবে কারো খাদ্য না হলেও এরা স্তরীভূত অঙ্গারে পরিণত হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলমান এই প্রক্রিয়ায় স্তরের উপর স্তর জমা হয়ে বড় স্তর গঠন করে। পশ্চিম আয়ারল্যান্ড সহ অন্যান্য অঞ্চলের মানুষেরা বড় ইটের আকৃতিতে এসব অঙ্গার কেটে কেটে তুলে নিয়ে আসে।
ইট আকৃতির অঙ্গারগুলো তারা শীতের দিনে ঘর গরম রাখতে ব্যবহার করে। বরফের দেশগুলোতে ঘর গরম রাখতে ঘরের ভেতরে কিছু না কিছু জ্বালাতে হয়, বাংলাদেশ বা উষ্ণ অঞ্চলীয় দেশগুলোতে এভাবে জ্বালাতে হয় না। ঘরের ভেতর ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচতে তাপের যে শক্তি ব্যবহার করা হয় তার মূল উৎসও সূর্য, যা হাজার হাজার বছর আগে গাছের পাতায় আটকা পড়েছিল।
এই অঙ্গারগুলো উপযুক্ত পরিবেশ ও প্রভাবকের মধ্যে যদি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে থাকে, তাহলে সেগুলো কয়লায় পরিণত হয়। কয়লা অঙ্গারের চেয়ে ভালো মানের জ্বালানী। কয়লা পুড়িয়ে অধিক পরিমাণ উত্তাপ পাওয়া যায়। কয়লার এমন তাপীয় উপযোগিতার কারণেই আঠারো ও ঊনিশ শতকে শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল।
তেল, গ্যাস ও কয়লার শক্তি আদতে সূর্যেরই শক্তি; ছবি: সিটি অব পিটস্টোন
স্টিল মিলের উত্তপ্ত মেশিনের চালিকাশক্তি, স্টিম ইঞ্জিনের ধোঁয়া উড়ানো প্রবল বেগ, পানি কেটে জাহাজের ছুটে চলা এগুলোর সমস্ত শক্তিই আসলে আসছে সূর্য থেকে। হোক প্রত্যক্ষভাবে কিংবা হোক পরোক্ষভাবে। হতে পারে সেই শক্তি ১ হাজার বছর আগে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে কিংবা হতে পারে সেই শক্তির প্রক্রিয়াকাল ৩০০ মিলিয়ন বছর আগের।
শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিকে কিছু কিছু ইন্ডাস্ট্রি চলতো স্টিম ইঞ্জিনে। বাদ বাকি অধিকাংশ কটন মিলই চলতো পানি চালিত এক ধরনের যন্ত্রের মাধ্যমে। এই যন্ত্রকে বলা হয় ‘ওয়াটার হুইল’। এই যন্ত্রে চালিত মিল-ফ্যাক্টরিগুলো স্থাপন করা হতো তীব্র স্রোত সম্পন্ন নদীর পাশে। স্রোতের পানির মধ্যে হুইলকে বসানো হতো, এই স্রোতে হুইল ঘুরতো। এই শক্তিকে ব্যবহার করেই চলতো পুরো ফ্যাক্টরি। এখানে ইঞ্জিনের শক্তি কোথা থেকে আসছে? দেখতে সূর্যের সাথে সম্পর্কহীন মনে হলেও আসলে এখানেও শক্তি আসছে মূলত সূর্য থেকেই। কীভাবে?
চাকা বা হুইল ঘুরে পানির স্রোতে, পানির স্রোত তৈরি হয় অভিকর্ষীয় শক্তির প্রভাবে- যার মানে হচ্ছে পানিকে নীচে থেকে উপরে উঠতে হয়। কারণ নীচের পানি উপরে না গেলে উপরে পানির যে সাপ্লাই আছে তা কয়েক দিনেই শেষ হয়ে যাবে। পানিগুলো উপরে উঠতে হলে অবশ্যই বাষ্পে রূপ নিয়ে বায়ুতে ভর করে উঠতে হবে। আর পানি থেকে বাষ্প তৈরি করার কাজটা করে সূর্যের তাপশক্তি। সুতরাং যে ইঞ্জিনই হোক, আর যে শক্তিই হোক- সকল শক্তির উৎসই হচ্ছে মূলত সূর্য।
ওয়াটার হুইলের শক্তিও ঘুরে ফিরে সূর্য থেকেই আসে, ছবি: হামাহিস্ট্রি
কয়লার মাধ্যমে শিল্প বিপ্লব সাধিত হলে কটন মিলগুলো পানির পরিবর্তে কয়লা ব্যবহার করে ইঞ্জিন চালানো শুরু করেছিল। কয়লাও মূলত সূর্যেরই শক্তি। এখন এদের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে, এ প্রকার শক্তি তৈরি হয়েছিল মিলিয়ন বছর আগে, আর আরেক প্রকার শক্তি সঞ্চিত হয়েছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। পানি বাষ্প হয়ে উপরে উঠে কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বৃষ্টি আকারে ঝরে পড়ে কিংবা পর্বতের চূড়া থেকে বরফ হতে গলে পড়ে। এ ধরনের শক্তিকে বলা হয় ‘বিভব শক্তি’। নিচে থেকে উপরে উঠানোর ফলে এতে শক্তি জমা হয় বা বিভব জমা হয় বলে একে বিভব শক্তি বলে। বস্তু যত উপরে উঠবে, অভিকর্ষের প্রভাবে ভূমির সাপেক্ষে তার বিভব শক্তি ততই বাড়বে।
পুরো বিশ্ব কীভাবে সূর্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এর মাধ্যমে আমরা তা বুঝতে পারি। উদ্ভিদ যখন আলোর উপস্থিতিতে খাদ্য-চিনি উৎপন্ন করে, তখন সূর্য সাহায্য করছে। যখন কোনো তৃণভোজী বা মাংসভোজী প্রাণী খাদ্য হিসেবে অন্য প্রাণী বা উদ্ভিদকে খাচ্ছে, তখনও শক্তির উৎস হিসেবে থাকছে সূর্য।
আমরা যদি আমাদের আশেপাশে মাটি, পানি, পাতা, লতা, কাঠ, কয়লা, তেল কাগজ, কাপড়, ফার্নিচার, হিটার, ফ্যান ইত্যাদির দিকে তাকাই, তাহলে সবখানেই দেখতে পাবো সূর্যের অবদানের উপস্থিতি। প্রত্যেকটা মিনিটে মিনিটে আমরা সূর্যের অবদানের কাছে ঋণী। পৃথিবীর সকল প্রাণই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সূর্যের কাছে ঋণী। সূর্য যে এতকিছু উপহার দিচ্ছে মানুষকে তার অল্প স্বল্পও হয়তো মানুষ জানতো, তার কারণেই সূর্যকে পূজা করতো প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা। অ্যাজটেকরা সূর্যকে খুশি করার জন্য হাজার হাজার মানুষকে ভয়াবহভাবে বলিদান করেছিল।
সূর্য কোনো দেবতা নয়, তবে দেবতা না হলেও পৃথিবীর মানুষকে যা উপকার করছে তা হাজার দেবতাকেও হার মানায়; ছবি: নাসা
আমরা আজকের মানুষেরা সত্যিই ভাগ্যবান। সূর্যকে আমাদের পূজা করতে হচ্ছে না। বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ আমরা জানি সূর্য আসলে একটা মহাজাগতিক বস্তু মাত্র, যা পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম কানুন মেনে তৈরি হয়েছিল এবং পদার্থবিজ্ঞানেরই কিছু নিয়মের প্রভাবে এক সময় মরে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
সংক্ষেপে দেখুনকাঁচ একটি কঠিন পদার্থ হওয়া সত্ত্বেও স্বচ্ছ কেন?
কাচ স্বচ্ছ পদার্থ, এটি স্বচ্ছ বলেই এর মধ্য দিয়ে আলোকরশ্মি ভেদ করে চলে যেতে পারে। কাচ, আয়না কিংবা কাচের সামগ্রী আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য পদার্থ। কাচের এত ব্যবহার হবার একটিই কারণ, এটি সহজলভ্য। কিন্তু কখনো কি আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, কাচ কেন স্বচ্ছ? কেন এর ভেতর দিয়ে আলোকরশ্মি অনায়াসে পার হয়ে যবিস্তারিত পড়ুন
কাচ স্বচ্ছ পদার্থ, এটি স্বচ্ছ বলেই এর মধ্য দিয়ে আলোকরশ্মি ভেদ করে চলে যেতে পারে। কাচ, আয়না কিংবা কাচের সামগ্রী আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য পদার্থ। কাচের এত ব্যবহার হবার একটিই কারণ, এটি সহজলভ্য। কিন্তু কখনো কি আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, কাচ কেন স্বচ্ছ? কেন এর ভেতর দিয়ে আলোকরশ্মি অনায়াসে পার হয়ে যেতে পারে?
ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির স্মার্টফোনে কাচের ব্যবহার; Source: inverse.com
কাচ কেন স্বচ্ছ এবং আলোকরশ্মি কেন একে ভেদ করে চলে যেতে সক্ষম এটি বুঝতে হলে বুঝতে হবে একটি কাচের গঠন সম্পর্কে। কাচ তৈরির প্রধান উপাদান হচ্ছে বালু। বালুর সাথে আরো অন্যান্য উপাদান মেশানো হয়। সামান্য অবাক লাগছে কি? বালুর মতো পদার্থ দিয়ে তৈরি হচ্ছে অতি প্রয়োজনীয় কাচ! বালুকে নিকৃষ্ট ভাববেন না, বালুও একটি প্রয়োজনীয় পদার্থ। বালুর প্রধান উপাদান হলো সিলিকা অর্থাৎ সিলিকন-ডাই-অক্সাইড। এই সিলিকার সাথেই সোডা অ্যাশ আর লাইমস্টোন মিশিয়ে ১,৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গলানো হয়। এই উপাদানগুলোর সাথে কাচে বাড়তি কোনো রঙ কিংবা বৈশিষ্ট্য যোগ করতে নির্দিষ্ট বস্তুকে যুক্ত করা যেতে পারে। গলিত পদার্থটি পুরোপুরি তরলের ন্যায় আচরণ করে না, বিশেষ ধরনের কঠিন পদার্থে পরিণত হয় তখন এটি, যাকে বলা হয় ‘অ্যামোরফাস সলিড’।
১,৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় চলছে গলানোর কাজ; Source: darkroom.baltimoresun.com
কাচের গঠন থেকে সরে এসে এবার একে ভেদনকারী আলোকরশ্মি নিয়ে বলা যাক। আলোকরশ্মি কণা নাকি তরঙ্গ, সেদিকে না গিয়ে আলোচনার সুবিধার্থে ধরা যাক, আলোকরশ্মি হলো কণা, অর্থাৎ একক পরিমাণ শক্তি সম্বলিত ফোটন। কাচ ভেদ করে আলো চলে যাচ্ছে মানে হলো, ফোটনগুলো গতিশীল অবস্থায় কাচে কোনো বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে না, কিংবা কাচ ফোটনটিকে শোষণ করে রেখে না দিয়ে নিজের ভেতর দিয়ে সঞ্চালিত হবার সুযোগ দিচ্ছে।
দৃশ্যমান আলোকরশ্মির ফোটনগুলো শোষিত হচ্ছে না। কারণ, কাচের মাঝে এমন কোনো পদার্থ নেই যা দৃশ্যমান আলোকরশ্মিকে শোষণে সক্ষম। অদৃশ্যমান আলোকরশ্মিগুলো আবার ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্ন আচরণ করে থাকে। আমাদের দেহ কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে কোনো স্বচ্ছ পদার্থ নয়, এক্স-রশ্মির নিকট আবার আমাদের দেহ একটি প্রায় স্বচ্ছ পদার্থ, এক্স-রশ্মি আমাদের দেহকে ভেদ করে যেতে পারে। স্কায়াগ্রাফের মাধ্যমে খুব সহজেই এক্স-রশ্মি ব্যবহার করে শরীরের ভেতরের অংশ দেখা যায়।
Source: commons.wikimedia.org
আলো আসলে দ্বৈত আচরণ করে, একই সঙ্গে কণা ও তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে থাকে আলো। যেহেতু আলোকরশ্মি একটি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ, সেহেতু অবশ্যই এর একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকবে। তরঙ্গদৈর্ঘ্য কিংবা কম্পাঙ্ক হিসেব করে বলা যায় একটি ফোটন কী পরিমাণ শক্তি বহন করছে কিংবা করবে। একটি ফোটন কী পরিমাণ শক্তি পরিবহন করছে, সেই পরিমাণকে ভিত্তি করেই বলে দেওয়া সম্ভব কোন পদার্থ এই ফোটনকে শোষণ করবে আর কোনটি করবে না।
বাম পাশে দেখা যাচ্ছে কাচের গঠন, অণুগুলো এলোমেলোভাবে সজ্জিত হয়ে আছে, সাধারণত একটি অস্বচ্ছ কঠিন পদার্থে অণুগুলো ডান পাশের মতো সুসজ্জিত হয়ে থাকে; Source: acs.org
আর শুরুতেই বলা হয়েছে যে, কাচ একটি কঠিন পদার্থ, কঠিন পদার্থ মানেই আমাদের চোখে হয়তো খুব শক্ত, অস্বচ্ছ পদার্থের ছবি ভেসে উঠবে। প্রথম সেকেন্ডেই কাচের কথা মনে হবে না যে, এটি একটি কঠিন পদার্থ। কাচ কোনো তরল কিংবা গ্যাসীয় পদার্থ নয়, এটি একটি বিশেষ ধরনের কঠিন পদার্থ, আগে যাকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘অ্যামোরফাস সলিড’ হিসেবে।
গলিত সিলিকা; Source: italyxp.com
গলিত সিলিকা থেকে প্রস্তুত করা হচ্ছে কাচের বোতল; Source: youtube.com
কঠিন পদার্থের সংজ্ঞা নিশ্চয়ই মনে আছে, অণুগুলো পরস্পরের সবথেকে কাছে অবস্থান করে। অণুগুলোর আন্তঃআণবিক দূরত্ব কম এবং এরা একটি সুনির্দিষ্ট সজ্জায় সজ্জিত হয়ে পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করে। কিন্তু কাচের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি হয় উল্টো। আন্তঃআণবিক দূরত্ব কম বলে কঠিন পদার্থ হবার যোগ্যতা কাচের রয়েছে। কিন্তু ব্যতিক্রম হলো, অণুগুলোর অবস্থানে কোনো সুনির্দিষ্ট সজ্জা নেই। কাচের মাঝে অণুগুলো অবস্থান করে এলোমেলোভাবে। এলোমেলোভাবে অবস্থান করেও আন্তঃআণবিক দূরত্ব একটি কঠিন পদার্থের ন্যায় সর্বনিম্ন হওয়ায় কাচ একটি কঠিন পদার্থ, আর কাচ সহজেই ভেঙে যাবার পেছনেও দায়ী অণুগুলোর এলোমেলো অবস্থান।
একটি পরমাণুর গ্রাফিক্যাল চিত্র; Source: chemistryworld.com
স্কুল পর্যায়ে রসায়নে শেখা কিছু তথ্য এবার মনে করতে হবে। রসায়ন বইতে আমাদের শেখানো হয়েছিলো পরমাণুর গঠন সম্পর্কে। পরমাণুর কেন্দ্রে রয়েছে একটি অতি ক্ষুদ্র নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করেই চারপাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে রয়েছে বিভিন্ন বৃত্তাকার শক্তিস্তর। শক্তিস্তর অনুযায়ী সেখানে আবর্তন করছে ইলেকট্রন। নিলস বোরের সংশোধিত পারমাণবিক গঠনের তথ্যানুযায়ী, একটি ইলেকট্রনকে যদি শক্তি প্রদান করা হয় তবে সেটি সেই শক্তি শোষণ করে আরো উচ্চ শক্তির স্তরে আরোহণ করবে। আবার ইলেকট্রন যদি শক্তি বিকিরণ করে, তবে ইলেকট্রনটি অবস্থানরত শক্তিস্তর ছেড়ে দিয়ে নিচের দিকে নিম্নশক্তির স্তরে গমন করবে।
বোর পারমাণবিক মডেল অনুযায়ী ইলকট্রন শক্তি শোষণ করে উত্তেজিত অবস্থায় উচ্চ শক্তিস্তরে গমন করে কিংবা শক্তি বিকিরণের মাধ্যমে নিম্ন শক্তিস্তরে গমন করে; Source: youtube.com
বোরতত্ত্বের ভিত্তিতে একটি পরমাণু একটি ফোটনের সাথে তিন ধরনের আচরণ করতে পারে।
১) ফোটন যে পরিমাণ শক্তি বয়ে নিয়ে এলো পরমাণুর ইলেকট্রনের কাছে, ইলেকট্রনটি সেই পরিমাণ শক্তিকে শোষণ করে নিয়ে উচ্চ শক্তিস্তরে আরোহণ করতে পারে, আর বাহিত শক্তি দান করে ফোটনটিও নিঃশেষ হয়ে যায়।
২) এক্ষেত্রেও প্রথম ঘটনাটি ঘটে থাকে, তবে ফোটনটি নিঃশেষ হয়ে যাবার সাথে সাথে অপর একটি ফোটন তৈরি হয়ে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যায় আলোকরশ্মির উৎসের দিকে। অর্থাৎ একটি আলোকরশ্মি শোষিত না হয়ে প্রতিফলনের সৃষ্টি করে।
৩) এক্ষেত্রে একটি পরমাণু আলোকরশ্মিকে পুরোপুরি অপরিবর্তিত অবস্থায় সঞ্চালিত হতে দেয়। এর কারণ হলো, ফোটনের শক্তি পরমাণুর কোনো ইলেকট্রন শোষণ করে নেয়নি, আলোকরশ্মিটি ততক্ষণই গতিশীল থাকবে, যতক্ষণ এর ফোটনগুলোর মাঝে শক্তি বিরাজমান থাকবে।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন, তিন নম্বর ঘটনাটিই ঘটে থাকে একটি কাচের মধ্যে। কাচের অণু কিংবা পরমাণুগুলো আলোকরশ্মিকে শোষণ না করে চলমান রাখে। এমনটি হয় কেবলমাত্র এই কারণে যে, ফোটনে যে পরিমাণ শক্তি রয়েছে, কাচের মাঝে উপস্থিত পরমাণুগুলোকে শক্তি দিয়ে উত্তেজিত করার মাধ্যমে উচ্চস্তরে প্রেরণের জন্য তা যথেষ্ট নয়। পদার্থবিজ্ঞানে এই ব্যাপারটি সুন্দরমতো ব্যাখ্যার জন্য ‘ব্যান্ড তত্ত্ব’ ব্যবহার করা হয়। এই তত্ত্বের বিস্তারিত বলা হবে না এখানে, শুধু এটুকু বলা যায় যে, এই তত্ত্বানুযায়ী যে পদার্থের ব্যান্ড গ্যাপ যত বেশি, তার মধ্য দিয়ে তত ভালোভাবে আলোকরশ্মি সঞ্চালিত হয়ে যাবে। কাচও একটি এমন পদার্থ। কাচের পরমাণুগুলোকে উত্তেজিত করতে হলে অধিক শক্তির প্রয়োজন, যা দৃশ্যমান আলোর ফোটনের থাকে না। ফলে দৃশ্যমান আলোকরশ্মি অতি সহজেই কোনোরূপ শোষণ কিংবা বিকিরণ না ঘটিয়ে কাচকে ভেদ করে চলে যায়।
তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালী, এতে দৃশ্যমান আলোকরশ্মির সাথে অন্যান্য তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকরশ্মিও দেখানো হয়েছে; Source: civilengineerlearn.blogspot.com
দৃশ্যমান আলোর চেয়ে ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য সম্পন্ন আলোকরশ্মি হলো অতিবেগুণী রশ্মি, এক্স-রশ্মি ও গামা রশ্মি। এই রশ্মিগুলোর ফোটনে একটি ইলেকট্রনকে উত্তেজিত করবার মতো পর্যাপ্ত শক্তি বিরাজ করে। তাই এই রশ্মিগুলো কাচকে ভেদ করে যেতে সক্ষম নয়। কাচ এই রশ্মিগুলোর কাছে অস্বচ্ছ পদার্থ।
সংক্ষেপে দেখুনসৌরজগতের জন্ম হয়েছিল কিভাবে ?
চীনের উপকথায় প্যান গু নামের এক দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। আকৃতিতে তিনি মানুষের মতো, মুখটি তার কুকুরের মতো, সারা দেহ লোমে আবৃত। মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে স্বর্গ ও মর্তের সকল কিছু একটি ডিমের ভেতর আবদ্ধ ছিল। তিনি নিজেও ডিমের ভেতর ঘুমন্ত ছিলেন টানা আঠারো বছর। ঘুম ভাঙলে তিনি সেখান থেকে বের হতে চাইলেন। হাতে থাকাবিস্তারিত পড়ুন
চীনের উপকথায় প্যান গু নামের এক দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। আকৃতিতে তিনি মানুষের মতো, মুখটি তার কুকুরের মতো, সারা দেহ লোমে আবৃত। মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে স্বর্গ ও মর্তের সকল কিছু একটি ডিমের ভেতর আবদ্ধ ছিল। তিনি নিজেও ডিমের ভেতর ঘুমন্ত ছিলেন টানা আঠারো বছর। ঘুম ভাঙলে তিনি সেখান থেকে বের হতে চাইলেন। হাতে থাকা একটি কুঠার দিয়ে সজোরে আঘাত করলেন ডিমের দেয়ালে। ডিম ভেঙে গেলে তিনি সেখান থেকে বের হন। ডিম থেকে কিছু দৃঢ় ও থলথলে পদার্থও বের হয়। দৃঢ় পদার্থ দিয়ে তৈরি হয় পৃথিবী।
ডিম থেকে বেরিয়ে দেখেন পৃথিবী আর আকাশ একসাথে লেগে যাচ্ছে। তাই তিনি শক্ত করে আকাশকে ধরে উপরের দিকে ঠেলে রাখছিলেন। এতে তার সকল শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। মৃত্যুর পর তার দুই চোখ থেকে চাঁদ ও সূর্যের জন্ম হয়। নিঃশ্বাস থেকে বায়ুমণ্ডল, কণ্ঠ থেকে বজ্রপাত, পেশি থেকে উর্বর ভূমি, শিরা থেকে নদী ও রাস্তা তৈরি হয়।
পৃথিবী ও সূর্য তথা সৌরজগতের জন্ম নিয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নানা ধরনের পৌরাণিক উপকথা প্রচলিত আছে। সেগুলো শুনতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবতার সাথে মিল বহুদূর। বাস্তবতা জানতে হলে অনুসন্ধান করতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক কারণ।

প্যান গু’র এক চোখ থেকে তৈরি হয়েছে সূর্য আর এক চোখ থেকে তৈরি হয়েছে চাঁদ; Credit: Devine Art/testabuddy05
সৌরজগতের উৎপত্তি নিয়ে এখন পর্যন্ত যে মতবাদ প্রচলিত আছে তা অনেকটা এরকম- সূর্য ও অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহ জন্মের আগে বিস্তৃত এলাকা ব্যাপী গ্যাসীয় মেঘ হিসেবে বিদ্যমান ছিল। একদম শুরুতে কয়েক আলোক বর্ষ ব্যাপী এলাকা নিয়ে মহাজাগতিক গ্যাস ও ধূলি বিদ্যমান ছিল। কয়েক আলোক বর্ষ এই এলাকাটা কতটুকু বিশাল? শুনতে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এর বিশালতা ব্যাপক। আলো এক সেকেন্ডে অতিক্রম করে ৩ লক্ষ কিলোমিটার। ১ মিনিটে যায় এর ৬০ গুণ। এক ঘণ্টায়? আরো ৬০ গুণ। এক দিনে? এক মাসে এক বছরে? এভাবে গুণ গিয়ে আসলে দেখা যাবে কল্পনাতীত পরিমাণ বড় এক এলাকা নিয়ে ছিল সৌরজগতের প্রাথমিক গাঠনিক উপাদানগুলো।
এরপর কিছু একটা হলো যার কারণে গ্যাসের মেঘগুলো পরস্পরের কাছে আসতে শুরু করলো। কী হতে পারে সেটা? হতে পারে পাশ দিয়ে ভারী কোনো নক্ষত্র অতিক্রম করে গিয়েছে যার মহাকর্ষীয় আকর্ষণের কারণে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বস্তুগুলো একটা দিকে এসে একত্রিত হওয়া শুরু করেছিল। কিংবা এমনও হতে পারে কোনো শক ওয়েভের ধাক্কায় বস্তুগুলো একদিকে সংকুচিত হওয়া শুরু করেছিল। শক ওয়েভ যেদিক দিয়ে যায় সেদিকের বস্তুগুলোকেও নাড়িয়ে যায় কিংবা সাথে নিয়ে যায়। ভূমিকম্পের সময় মাটিতে আন্দোলন হয় শক ওয়েভের কারণেই। সেখানে কীভাবে শক ওয়েভ তৈরি হতে পারে? সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে কিংবা বড় কোনো মহাজাগতিক ঘটনায় শক ওয়েভ তৈরি হতে পারে।

বিস্তৃত মহাজাগতিক মেঘ একত্রিত হয়ে তৈরি করেছিল সৌরজগৎ; Credit: NASA, ESA/Hubble
তো একত্রীকরণের পেছনে যে কারণই থাকুক, কোনোএকভাবে বস্তুগুলো একত্রিত হওয়া শুরু করেছিল। এরপর আর কিছু করতে হয়নি। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে নিজেই গঠন করে ফেলেছে সৌরজগৎ। একবার পথ দেখানোর পর পথিক নিজেই নিজের আলোতে বাকি পথ চিনে নিয়েছে।
যখন বস্তুগুলো একটুখানি কাছে আসা শুরু করেছে তখন একটির সাথে আরেকটি মিলে বড় বস্তু তৈরি করেছে। এখানে কাজ করেছে মহাকর্ষ। বস্তু ভর কম হলেও মহাশূন্যে কম ভরের আকর্ষণেরও ভালো প্রভাব থাকে। এখন বস্তুটি একটু বড় বা ভারী হওয়া মানে এর মহাকর্ষীয় আকর্ষণ আরো বেশি হবে। ফলে আশেপাশের আরো বস্তুকে নিজের দিকে টেনে নিতে পারবে। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র বলছে বস্তুর ভর যত বেশি হবে আকর্ষণের পরিমাণ তত বেশি হবে। ফলে একসময় ভারী হতে হতে বিস্তৃত এলাকা ব্যাপী মহাকর্ষীয় প্রভাব বিস্তার করবে।
সৌরজগতের ক্ষেত্রে যে অংশে সবচেয়ে বেশি বস্তু জমা হয়েছিল সেটি বর্তমানে সূর্য। সূর্যের মধ্যে এত বেশি বস্তু জমা হয়েছিল যে প্রবল মহাকর্ষের চাপে ভেতরের বস্তুগুলো আর স্বাভাবিক থাকতে পারেনি। সংঘটিত হওয়া বস্তুগুলোর মাঝে বেশিরভাগই হাইড্রোজেন গ্যাস। প্রবল চাপে পড়ে তারা উত্তপ্ত হয়ে উঠে। গ্যাসের সূত্র অনুসারে চাপ বাড়লে তাপমাত্রা বাড়ে। এখানে সেটিই হয়েছে। তাপমাত্রা বেড়ে এতই উত্তপ্ত হয়ে গিয়েছিল যে এক পরমাণু আরেক পরমাণুর ভেতর ঢুকে ফিউশন বিক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল।
ফিউশন বিক্রিয়ায় প্রচুর তাপ ও আলোক শক্তি অবমুক্ত হয়। তার ফলে সূর্যটি জ্বলে উঠে। সেই যে জ্বলেছে এখনো নেভেনি। ভেতরে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটাবার মতো জ্বালানি শেষ হবার আগ পর্যন্ত জ্বলতেই থাকবে।
সূর্য ছাড়া অন্য কোনো গ্রহেরও সুযোগ ছিল জ্বলে উঠার। যেমন বৃহস্পতি, এর ভর তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। কিন্তু জ্বলে উঠতে হলে ন্যূনতম যে ভর অর্জন করতে হয় তা অর্জন করতে পারেনি সে। তাই আর জ্বলে উঠতে পারেনি। যদি বৃহস্পতি গ্রহও জ্বলে উঠতো তাহলে সৌরজগতে সূর্য থাকতো দুটি। আর একে বলা হতো বাইনারি স্টেলার সিস্টেম। মহাবিশ্বে এরকম যুগল নক্ষত্রের অনেক উদাহরণ আছে। স্টার ওয়ার্স চলচ্চিত্রগুলোতে এরকম যুগল নক্ষত্র দেখা যায় প্রায়ই।

সূর্যের মতো তাপ ও আলো ছড়ানোর একটি সম্ভাবনা ছিল বৃহস্পতি গ্রহের; Credit: JAXA / ISAS / DARTS / Damia Bouic
সূর্য যখন চারপাশ থেকে বস্তু ধারণ করছিল তখন তার পাশাপাশি অন্যান্য স্থানেও টুকটাক ছোট ছোট বস্তুর সংগ্রহ হতে থাকে। যে যার মতো করে পেরেছে নিজের দিকে আকর্ষণ করেছে। এদের মধ্যে যারা বেশি ভারী হয়ে গিয়েছিল তারা গ্রহ কিংবা উপগ্রহ হিসেবে বিদ্যমান আছে। আর যারা খুব বেশি ভারী হতে পারেনি তারা শেষমেশ সূর্যে গিয়ে ঠেকেছে কিংবা পার্শ্ববর্তী গ্রহে গিয়ে মিশেছে। উদাহরণ, পৃথিবীতে প্রায় সময় ঘটে যাওয়া উল্কাপাত।
সূর্য তো গ্রহগুলোকে আকর্ষণ করছে, তাহলে গ্রহগুলো কেন সূর্যের বুকে পড়ে যায় না কিংবা উপগ্রহগুলো কেন গ্রহে গিয়ে ঠেকে না? আসলে গ্রহদের দিক থেকে গ্রহগুলো ঠিকই সূর্যের উপর পড়ছে কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের একটা নিয়মের প্রভাবে সেই পড়া আর সূর্যের গা পর্যন্ত যায় না। খুব সহজ করে বললে এভাবে বলা যায়, সৌরজগৎ গঠনের সময় গ্রহগুলোতে একটি বহির্মুখী বল তৈরি হয়, আবার অন্যদিকে সূর্যের আকর্ষণের ফলে একটি কেন্দ্রমুখী বলও বিদ্যমান। দুই বলের টানাটানিতে গ্রহগুলো না যেতে পারে বাইরের দিকে না আসতে পারে ভেতরের দিকে।
দুই বল (ভেক্টর রাশি) যদি দুই দিকে টানাটানি করে তাহলে বস্তুটি দুই দিকের কোনো দিকে না গিয়ে ৩য় একটি দিকে যাবে (লব্ধি ভেক্টর)। এটা পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম। গ্রহগুলোর ঘূর্ণনের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়। দুই বলের টানাটানিতে লব্ধি হিসেবে ঘুরতে থাকে।

সংক্ষেপে দেখুনপৃথিবী সহ অন্য গ্রহগুলো কেন সূর্যে পতিত হয় না? Source: shodor.org
পৃথিবী গঠনের পর এতে কোনো পানি ছিল না। গনগনে উত্তপ্ত ছিল পুরো গ্রহ। গ্রহাণু ধূমকেতুরা এসে আছড়ে পড়তে লাগলো পৃথিবীর পৃষ্ঠে। ধূমকেতুতে প্রচুর পানি ও বরফ থাকে। এই পানি ও বরফের প্রভাবে শীতল হয়ে এলো পৃথিবীর উপরিপৃষ্ঠ। শুধু শীতলই হয়নি, সাগর মহাসাগরের পানিগুলোর উৎসও এরাই। অন্তত সাম্প্রতিক গবেষণা তা-ই বলে। পানি থাকাতে তার মাঝে প্রাণ ধারণ করার পরিবেশ অনুকূল হয়। সেখানে জন্ম নেয় এক কোষী প্রাণ। তারপর ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবী ছেয়ে যায় প্রাণিবৈচিত্র্যে। সেখানে বাস করছি আমরা মানুষেরা।
ভাষার উৎপত্তি হয় কিভাবে?
১ মানব সভ্যতা ও সমাজের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মূলত ভাষা। নিজেদের মধ্যে অর্থপূর্ণভাবে ঠিক করে যোগাযোগ করতে না পারলে এই সভ্যতা গড়ে তোলা আদৌ সম্ভব হতো বলে মনে হয় না। অন্যান্য প্রাণীর দিকে তাকালেই এটা আমরা বুঝতে পারি। এই ভাষার প্রচলন কীভাবে হলো সেটা নিয়ে অনেক গল্প আছে। এরকম বিখ্যাত গল্পগুলোর একটিবিস্তারিত পড়ুন
১
মানব সভ্যতা ও সমাজের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মূলত ভাষা। নিজেদের মধ্যে অর্থপূর্ণভাবে ঠিক করে যোগাযোগ করতে না পারলে এই সভ্যতা গড়ে তোলা আদৌ সম্ভব হতো বলে মনে হয় না। অন্যান্য প্রাণীর দিকে তাকালেই এটা আমরা বুঝতে পারি।
এই ভাষার প্রচলন কীভাবে হলো সেটা নিয়ে অনেক গল্প আছে। এরকম বিখ্যাত গল্পগুলোর একটি আমরা প্রায় সবাই সম্ভবত ছোটকালে পড়েছি বা শুনেছি। বিশেষ করে ব্যাকরণ বইগুলোতে এই গল্পটা থাকত। তবে এই গল্পটা সরাসরি ভাষার উৎপত্তি নিয়ে না, বরং বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি নিয়ে।

শিল্পির চোখে টাওয়ার অফ ব্যাবিলন; Image Source: Phillip Medhurst
গল্প মতে, প্রাচীন ব্যবিলনের মানুষ ভেবেছিল একটা টাওয়ার বানাবে। সেই টাওয়ার দিয়ে ছুঁয়ে ফেলবে আকাশ। মানুষ ভাবত, নীল আকাশের ওপারেই স্রষ্টার বাস। তাই টাওয়ার বানালে স্রষ্টার কাছে সরাসরি পৌঁছানো যাবে, কথা বলা যাবে। কিন্তু টাওয়ারের কাজ অনেক দূর হওয়ার পরে স্রষ্টা ভাবলেন, এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না!
একদিন লোকজন ইট-পাথর আনতে গিয়েছিল। টাওয়ারের কাছে এসে ওরা টের পেল, কেউ আর কারো কথা বুঝতে পারছে না। স্রষ্টা আসলে একেকজনকে একেক ভাষা শিখিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু কেউ কথা না বুঝলে টাওয়ারের কাজ কীভাবে এগোবে! ভেস্তে গেল টাওয়ার বানানো। স্রষ্টা আকাশের ওপারে অধরাই রয়ে গেলেন। আর এদিকে, মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ল নানা ধরনের ভাষা।
এই গল্পের অনেক ফাঁক-ফোঁকর আছে। চাইলেই গল্পটা নিয়ে নানারকম প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু সেসব প্রশ্ন করা আমাদের উদ্দেশ্য না। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, এই ব্যাপারটাকে তলিয়ে দেখা। বুঝতে চেষ্টা করা, আসলেই ঠিক কী হয়েছিল। তবে এই কাজটা আমরা করব বিজ্ঞানের চোখে, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে।
সেজন্য অবশ্যই আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাচীন পৃথিবীতে। যে পৃথিবীর কথা ঘুরে ফিরে এসেছে মানুষের ইতিহাসে, কল্পে-গল্পে।
২
কথা হলো, আমরা কি শুরু থেকেই শুরু করব? চট করে ফিরে যাব সেই পৃথিবীতে? ভাবার চেষ্টা করব, সে সময়ের মানুষ তখন কী করছিল? উঁহু, সেটা করা যাবে না। যুক্তি আমাদের বলে, উল্টো দিক থেকে পুরো জিনিসটা দেখার চেষ্টা করতে হবে আমাদের। ধীরে ধীরে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ফিরে যেতে হবে সেই সময়টায়, যখন ভাষার শুরু হয়েছিল।
কথা হলো, বিজ্ঞানীরা এটা কীভাবে করেন? মানে, ভাষা তো আর ফসিল রেখে যায়নি যে, ফসিল বিশ্লেষণ করে, কার্বন ডেটিং করে এর ইতিহাস বের করে ফেলা যাবে। কথা সত্য। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের দেহের গঠণ বিশ্লেষণ করলে সেটা দেখা যায় যে, ধীরে ধীরে তারা যোগাযোগের দিকে ঝুঁকছে। তাদের দেহে সেই চিহ্ন ফুটে উঠছে ধারাবাহিকভাবে। সেই সঙ্গে তাদের রেখে যাওয়া বিভিন্ন জিনিসেও আমরা এর ছাপ দেখতে পাই। এসব সূত্র ধরে ধরেই বিজ্ঞানীরা ভাষার শুরুর গল্পটা বোঝার চেষ্টা করেছেন।
আগেই বলেছি, সেটা করতে হবে উল্টোভাবে। এই হিসেবে, প্রথম প্রমাণটা পাওয়া যায় মানুষের লেখালেখির। যে লিখতে পারে, সে যে ভাষা পারবে, সেটা তো আর আলাদা করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মানুষের লেখার ইতিহাসের সূচনা হয়েছে মাত্র কয়েক হাজার বছর আগে। তার মানে, এটা আমাদের খুব বেশি দূরে নিয়ে যেতে পারে না। সেজন্য উনিশ শতকের বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, ভাষার উৎপত্তি বের করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। শুধু ভেবেই ক্ষান্ত দেননি। ১৮৬৬ সালে প্যারিস ল্যাঙ্গুইস্টিক সোসাইটি এ বিষয় নিয়ে আলোচনা-গবেষণাও নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। উঁহু, গবেষণা করলে পাপ হবে, এমন না। ওদের মনে হয়েছিল, এই নিয়ে কাজ করাটা কেবলই সময় নষ্ট।
আশার কথা হলো, সময় বা অর্থ নষ্ট হবে ভেবে কৌতূহলী মানুষ কখনোই থেমে যায়নি। সেজন্যেই মানুষ চাঁদে পা রাখতে পেরেছে। মানুষের হাতে গড়া মহাকাশযান পেরিয়ে গেছে সৌরজগতের সীমানা। একইভাবে একশ বছরের মতো পরে এসে জীববিজ্ঞানী ও ইভোলিউশনারি থিওরিস্টরা ভাবলেন, এভাবে তো ভাষাকে ফেলে রাখার কোনো মানে হয় না। আমাদের জীবন ও সভ্যতার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ইতিহাস জানতে হবে। সেজন্য কাজে নামা দরকার। কিন্তু কীভাবে?
ফসিল নেই, নেই যথেষ্ট সূত্র। লেখালেখিও শুরু হয়েছে অল্প কিছুদিন আগে। তাহলে উপায়? বিজ্ঞানীরা ভাবেন। ভেবে ভেবে তারা সেই আপ্ত বাক্যের কাছে ফিরে গেলেন। দশে মিলে করি কাজ, হারি-জিতি নাহি লাজ! শুধু জীববিজ্ঞানের হাত ধরে হয়তো হবে না। কিন্তু বিজ্ঞানের বাকি সব শাখা আছে কী করতে? শেষমেষ প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, ভাষা বিজ্ঞান ও কগনিটিভ সায়েন্স- সব কিছু একসঙ্গে নিয়ে মাঠে নামলেন বিজ্ঞানীরা। অবশেষে ফল পাওয়া গেল৷ এর মধ্যে দিয়ে শুধু একটি নয়, মানুষের ভাষা খুঁজে পাওয়া নিয়ে দু-দুটো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান মিলে গেল একসঙ্গে।

প্রাচীন মানুষের আঁকা গুহাচিত্র; Image Source: frontiersin.org
৩
চল্লিশ হাজার বছর আগের কথা। মানুষ তখন গুহাচিত্র আঁকত। এ ধরনের ছবি আমরা দেখেছি। সেসব ছবির পেছনে চিন্তা, সংস্কৃতি ও বিমূর্ত ভাবনা ছিল, এটা আমরা বুঝতে পারি। ভাষার জন্যে তো ঠিক এই জিনিসগুলোই দরকার, তাই না? তাহলে, কয়েক হাজার বছর থেকে চল্লিশ হাজার বছর পর্যন্ত পিছিয়ে এলাম আমরা। কথা হলো, এই সময়েই কি ভাষার আবির্ভাব হয়েছিল?
হতে পারে। না-ও হতে পারে! সহজ কথায়, সবই ঠিক আছে, কিন্তু এককভাবে এই ব্যাখ্যাটি যথেষ্ট না। অর্থাৎ আরো প্রমাণ দরকার। সেজন্যে আমরা সে সময়ের মানব-সমাজের দিকে তাকাতে পারি।
মানুষের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব, চল্লিশ হাজার বছর আগে মানুষ কিন্তু এক জায়গায় নেই। গোত্র বা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে নানাদিকে ছড়িয়ে গেছে। তার মানে, এই সময়ে যদি ভাষার উৎপত্তি হয়, তাহলে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় একইসঙ্গে বা অল্প সময়ের ব্যবধানে সব মানুষদের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসতে হবে। চিন্তার ক্ষমতা তৈরি হলেই শুধু হবে না, সেটা প্রকাশের মানসিক ও শারীরিক ক্ষমতা এবং সেজন্য দেহে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও হতে হবে। এ থেকে আমরা একটা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসতে পারি।
মানুষ নিশ্চয়ই আরো আগেই ভাষা শিখে গিয়েছিল। সেজন্যই তারা বিমূর্ত চিন্তা করতে শিখেছে এবং সেসব গুছিয়ে আঁকতে শিখেছে গুহার দেয়ালে। তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? তখনকার পৃথিবীতেও ভাষা ছিল, হয়তো বিভিন্ন গোত্র বা দলের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলত; কিন্তু উৎপত্তিটা তখন হয়নি। হয়েছে আরো আগে, আরো অনেক আদিম পৃথিবীতে।
৪
আদিম পৃথিবীতে মানুষের আগেই এসেছিল এপরা। এই এপদের গলায় বড় আকারের বায়ুথলী ছিল। এটা দিয়ে তারা ‘গোঁ গোঁ’ ধরনের শব্দ করে প্রতিপক্ষ বা অন্যান্য প্রাণীকে ভয় দেখাত। সমস্যা হচ্ছে, এ ধরনের বায়ুথলী স্বরবর্ণের উচ্চারণে বাধা দেয়। এটা কিন্তু বিজ্ঞানীরা ইচ্ছেমতো বলে দেননি। বেলজিয়ামের ফ্রি ইউনিভার্সিটি অফ ব্রাসেলসে বিজ্ঞানী বার্ট দ্য বোর সিমুলেশন করে দেখিয়েছেন। কিন্তু মানুষের ভাষার পেছনে স্বরবর্ণ, যাকে বলে, আবশ্যক।
এপদের মধ্যে এ ধরনের বায়ুথলী ছিল ঠিকই, কিন্তু হোমো হাইডেলবার্জেনিস প্রজাতীর দেহে এরকম কিছু দেখা যায় না। এই হোমো হাইডেলবার্জেনিস থেকেই পরে নিয়ান্ডারথাল ও স্যাপিয়েন্সরা এসেছে বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা। হোমো হাইডেলবার্জেনিস পৃথিবীতে ছিল প্রায় সাত লাখ বছর আগে। অর্থাৎ এ সময় পৃথিবীতে ভাষা না থাকলেও, ভাষা তৈরি হওয়ার বেশ কিছু প্রয়োজনীয় উপাদান ততদিনে চলে এসেছে।

নিয়ান্ডারথাল; Image Source: theguardian.com
আধুনিক মানুষের কথা যদি ভাবি, মস্তিষ্ক থেকে মেরুদণ্ড হয়ে অনেক অনেকগুলো স্নায়ু ডায়াফ্রাম এবং পাঁজরের মধ্যকার পেশীতে এসে যুক্ত হয়েছে। ঠিকভাবে শ্বাস নিয়ন্ত্রণ ও যথার্থ শব্দ করার জন্য এগুলো জরুরি ভূমিকা রাখে। এই একই জিনিস নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও দেখা যায়।
এই দুই প্রজাতির কানের ভেতরের অংশেও একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। ফলে, মানুষের উচ্চারিত শব্দের কম্পাংকের যে পরিসীমা আছে- এই সীমায় প্রজাতি দুটির কানের ভেতরে দারুণ সংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে। কথা বলার জন্য শোনা ও এর ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বোঝাটা জরুরি। এটার খুব সহজ একটা উদাহরণ আমরা বর্তমানেই দেখতে পারি। যারা কথা বলতে পারেন না, তারা কানেও শুনতে পান না। কারণ, শুনে সেটা প্রকাশ না করতে পারলে, এই ভার মস্তিষ্ক নিতে পারবে না। আবার, না শুনলে বলার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি হওয়া একরকম অসম্ভব।
এরপরেও, কথা বলার জন্য আরেকটা জিনিস দরকার। FOXP2 জিন। মস্তিষ্কের যে অংশ কথা নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে কারিকুরি ফলায় এটি। অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যেই এটা থাকে। কিন্তু মানুষের ভেতরে এই জিনটি কিছুটা উন্নত। সেজন্যই আমরা মুখ ও চেহারায় ভাষার জন্য প্রয়োজনীয় নড়াচড়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও এই জিন ছিল, কিন্তু এতটা উন্নত ছিল না।
এসব তথ্য আমাদেরকে একটা সময়ের দিকে ইঙ্গিত করে। এ থেকে বলা যায়, মোটামুটি চার লাখ বছর আগে পৃথিবীতে ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল। ততদিনে মানুষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা চলে এসেছে তার ভেতরে। ধীরে ধীরে চিন্তার ক্ষমতাও বাড়ছে। সেজন্যই এই ভাবনাগুলো প্রকাশ করা জরুরি হয়ে গেছে। ফলে তৈরি হয়েছে ভাষা।

হোমো ইরেক্টাস; Image Source: resonance.is
কিন্তু আরো আগে, প্রায় দুই মিলিয়ন বছর আগে হোমো ইরেক্টাসরা যখন শিকার করত, তখন তারা নানারকম যন্ত্র বানাত সেজন্যে। তাহলে তারাও কি ভাষা জানত? হয়তো জানত। হয়তো জানত না। কিন্তু সেই ভাষা যে আধুনিক মানুষের ভাষা ছিল না, এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত। মানুষের ভাষার আদিম রূপ, হয়তো ঠিক ভাষা হয়েও ওঠেনি- এমন কিছু থাকলেও থাকতে পারে সে সময়।
এ সব মিলে ধরে নেওয়া যায়, মানুষের মাঝে ভাষার উদ্ভব হয়েছিল চার লাখ বছর আগে। আর, সেই ভাষাই দিনে দিনে আরো পরিণত হয়েছে। আবার, মানুষ দল বা গোত্রে ভাগ হয়ে যাওয়ার ফলে বিকৃত হয়ে গেছে ভাষা। সেভাবেই তৈরি হয়েছে নানা ধরনের এত সব ভাষা। কিন্তু যতই আলাদা হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি না কেন, ভালোভাবে খুঁজলে আজও আমরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মধ্যেও মিল খুঁজে পাই, কাছাকাছি উচ্চারণ ও অর্থের শব্দ খুঁজে পাই। এই সব কিছুই আমাদের একটি সাধারণ ভাষার দিকে ইঙ্গিত করে। সাধারণ এক প্রজাতির ভাষার শুরুটাও যে একটা সাধারণ ভাষা দিয়েই হবে, তা আর আশ্চর্য কী!

ভাষার উৎপত্তির সময়কাল; Image Source: Writer
৫
ভাষার উদ্ভবের সময়কাল নাহয় পাওয়া গেল। কিন্তু কথা হলো, এই ভাষাটা এলো কীভাবে? ভাষার উৎপত্তি যে যোগাযোগের জন্য, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু এই তাড়নাটা মানুষ অনুভব করা শুরু করল কেন? এই প্রশ্নটাই মানুষের ভাষা খুঁজে পাওয়া নিয়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন। (প্রথম প্রশ্নটা কী ছিল, সেটা কি আলাদা করে আর বলা লাগবে? তা-ও বলে দেই। প্রশ্নটা হলো, ভাষার উৎপত্তিটা কখন হয়েছিল? আসলে, এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে না পারলে, সে সময় মানুষ কী কারণে এই তাড়নাটা অনুভব করেছিল, সেটা বের করা কঠিন।)
এই প্রশ্নের তিনটি সম্ভাব্য উত্তর আছে। প্রথম উত্তরটা দিয়ে গেছেন চার্লস ডারউইন। ভদ্রলোক বলেছিলেন, বিভিন্ন প্রাণীকে সঙ্গী নির্বাচনের কৌশল হিসেবে অদ্ভুত সব কাজকর্ম করতে দেখা যায়। মানুষও সেরকম কিছু করতে চাইত। এর ফলে প্রোটোল্যাঙ্গোয়েজ বা ‘আদিভাষা’ ধরনের একটা কিছু একটা গড়ে ওঠে। অবশ্য, এই আদিভাষার সরাসরি কোনো অর্থ ছিল না। যেমন- পাখিদের ডাক।

গিবন; Image Source: nationalgeographic.com
পুরুষরা সেই আদিভাষা ব্যবহার করে নারীদের আকর্ষণ করতে চাইত। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য তারা আদিভাষা নিয়ে আরো ভাবতে থাকে, এবং আরো জটিল ও সুমধুর কোনো ধ্বনি প্রকাশের চেষ্টা করতে থাকে। এভাবেই ভাষা গড়ে ওঠে। ডারউইন উদাহরণ হিসেবে গিবনদের কথা বললেন। এই প্রাইমেটরাও এভাবে গেয়ে গেয়ে নারী গিবনদের আকৃষ্ট করতে চায়। কেউ কেউ পরে এই অনুমানের ওপরে ভিত্তি করে বলেছেন, শুধু পুরুষরাই এমনটা না-ও করতে পারে। নারীরাও হয়তো একইভাবে পুরুষদের আকৃষ্ট করতে চাইত।
কিন্তু এরকম হলে, এর ফলে জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের বাকিদের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে থাকার কথা। বাড়তি কোনো বৈশিষ্ট্য বা সুবিধা পাওয়ার কথা তাদের। আবার, একই জিনিস বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়া সবগুলো গোত্র বা দলের মধ্যেই ঘটতে হবে। এসব কিছু বিবেচনা করে ডারউইনের এই উত্তরকে ঠিক জুতসই মনে হয় না।
কিন্তু এই আইডিয়ার ওপরে ভিত্তি করেই দ্বিতীয় উত্তর বা ধারণাটি গড়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা খেয়াল করে দেখলেন, মানুষ, এমনকি অন্ধরাও সাধারণত হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলার চেষ্টা করে। তাহলে, ‘আদিভাষা’টা হয়তো স্বর নির্ভর না, বরং ভঙ্গিনির্ভর হয়ে গড়ে উঠেছিল। সেই ব্যাপারটাই এখনও আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। হয়তো সেজন্যই এখনো আমরা কিছু বোঝাতে না পারলে হাত বা কাঁধ নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করি। আবার, সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই ভঙ্গি ভালোরকম প্রভাব রাখতে পারে। যেমন- বক্তব্যের সময় মানুষের ভঙ্গি দেখে আকৃষ্ট হই আমরা। নাচের মুদ্রা দেখে আকৃষ্ট হই। এই ব্যাপারগুলোর ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় কিছুটা করে।
আবার খেয়াল করলে দেখা যাবে, অন্যান্য বেশ কিছু প্রাণীও টুকটাক অঙ্গভঙ্গি করে। মানুষ হয়তো ভাবতে শেখার কারণে এই ভঙ্গিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছিল আরো অনেক দূর। আর, অঙ্গভঙ্গি করে যে পুরোপুরি যোগাযোগ করা যায়, সেটা তো আমরা জানিই। মূক-বধির অনেকেই এভাবে যোগাযোগ করেন।
দারুণ চিন্তা-ভাবনা হলেও, এই প্রস্তাবনারও একটা বড় ঝামেলা আছে। ভঙ্গিনির্ভর এই ভাষা থেকে স্বরনির্ভর ভাষা এলো কীভাবে?
ফলে, তৃতীয় আরেকটি আইডিয়া বা উত্তর নিয়ে ভাবলেন বিজ্ঞানীরা। এই আইডিয়াটিই বর্তমানে সবচেয়ে ভালোভাবে ভাষাকে ব্যাখ্যা করতে পারে। এটাকে বলে ওনোম্যাটোপিয়া (onomatopoeia)। মানে, কোনো শব্দ শুনে সেটাকে নকল করার চেষ্টা। এখনও মানব শিশুদের এরকম শব্দ শুনে শুনে বলার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
মানুষের যদি ভাষা বলার মতো যথেষ্ট বোধ না-ও থেকে থাকে, তবু শুনে শুনে এই নকল করতে পারাটা খুব জটিল কিছু না। আগেই বলেছি, ভাষা আসতে আসতে ততদিনে মানুষের মধ্যে ধ্বনি উচ্চারণের শারীরিক সক্ষমতা চলে এসেছে। তাছাড়া, নতুন কিছু গবেষণা থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, অন্যান্য প্রাইমেটও বেশ ভালোভাবেই শ্বাস এবং গলার নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
যৌক্তিকভাবে ব্যাপারটা থেকে আমরা একটা কল্পনা দাঁড় করাতে পারি। বিভিন্ন প্রাণীর ডাক শুনে শুনে মানুষ সেটাকে নকল করতে শিখেছে। সেসব প্রাণীর বিরুদ্ধে টিকে থাকতে গিয়ে বানাতে হয়েছে সরঞ্জাম। সেই সাথে, সেরকম কোনো প্রাণী, যেমন- বাঘকে আসতে দেখলে বাকিদের সাবধান করে দেওয়ার প্রয়োজনীতা তৈরি হয়েছে। বাঘের গর্জন নকল করে নিজেদের লোকজনকে সতর্ক করে দেওয়ার চেয়ে সহজ আর কী আছে? তাতে করে ভিন্ন ভিন্ন প্রানিকে শনাক্ত করতে পারছে মানুষ। আবার, ধীরে ধীরে এসব ধ্বনি বা ডাকের মধ্যে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে। আরেকটা ভালো ব্যাপার হলো, বিভিন্ন প্রাণির ডাক নকল করে শিকারের জন্য তাদেরকে প্রলুব্ধ করে ফাঁদেও ফেলা সম্ভব ছিল। এভাবে ধীরে ধীরে অর্থবোধক ধ্বনি বুঝতে শিখেছে মানুষ। বুঝতে শিখেছে, ধ্বনির মাধ্যমে চাইলে অন্যদেরকে কিছু বোঝানো যায়।
সেই সাথে অঙ্গভঙ্গিও শিখছিল মানুষ। এটা অবশ্য অনেকটাই সহজাত (মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও এটা দেখা যায়)। তাছাড়া, সরঞ্জাম বানাতে গিয়েও হাত-পা অর্থবোধকভাবে নাড়ানোর কৌশল বুঝতে পারছিল মানুষ। এভাবেই, সময়ের সাথে সাথে গড়ে উঠতে শুরু করেছিল ভাষা।
একটা সময়, হয়তো রাতের বেলা আগুনের পাশে বসে মজা করে প্রাণীদের ডাক নকল করতে গিয়ে, বা নিজেদের মতো করে কিছু বোঝাতে গিয়ে মানুষ গাইতে শিখেছে। টের পেয়েছে, গলার তাল-লয় নিয়ন্ত্রণ করে অর্থবোধক ধ্বনিকে আরো সুমধুর করে তোলা যায়।

কাউকে গান গাইতে শুনলে আমরাও গলা মেলাই; Image Source: pinkvilla.com
এই গান গাওয়াটার খুব বড় একটা ভূমিকা আছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সাধারণ বাক্যে ‘আমরা’ বা দলগত বোধটা সেভাবে প্রকাশ পায় না। গানে সেটা সহজেই করা যায়। একজন গাইতে থাকলে বাকিরা গলা মেলাতে পারে। এটাও আসলে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তির অংশ। এখনও সেজন্যই গান শুনলে আমরাও গলা মেলাই, মেলাতে চাই। শব্দ করে না হলেও মনে মনে গেয়ে উঠি একই বাক্য।
ইউনিভার্সিটি কলেজ, লন্ডনের নৃতত্ত্ববিদ জেরোম লুইস মনে করেন, এভাবেই গড়ে উঠেছে ভাষা। আর, এই প্রস্তাবনা সত্যি হলে এটি যেমন ভাষা ও গানের উৎপত্তির ব্যাখ্যা দিতে পারবে, তেমনি বলতে পারবে এদের উৎপত্তির সময়কালও। আর, এই উৎপত্তির সময়টা পেলে দিনে দিনে ভাষার ওপরে কী প্রভাব পড়েছে এবং ভাষা কীভাবে বদলেছে- তার একটা মোটামুটি হিসেব আমরা দাঁড় করাতে পারব।
শব্দ হয়তো ফসিল রেখে যায় না, রেখে যায় না কোনো চিহ্ন। কিন্তু এত বছর পরে হলেও, আমরা এর ইতিহাস লেখার সূত্র খুঁজে পেয়েছি। হয়তো আরো কিছুটা সময় লাগবে, কিন্তু আমরা নিশ্চয়ই লিখে ফেলতে পারব ভাষার ইতিহাস। মানুষের ইতিহাসের ওপরে এর প্রভাব ও সময়ের বাঁকে বাঁকে এর দিক বদল। আসলে, বিজ্ঞানীরাও সেজন্যই ভাষার গল্পটা বোঝার চেষ্টা করে গেছেন নিরন্তর।
কারণ, ভাষার ইতিহাস ছাড়া মানুষের ইতিহাস কোনোভাবেই পূর্ণতা পায় না।
ডগ স্কোয়াড ট্রেনিংয়ে কুকুরগুলোকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় কিভাবে ?
র্যাবের সাথে বা পুলিশের সাথে অভিযানে যেতে দেখা যায় সুঠাম দেহগঠনের আরেকটি বাহিনী, তাদের নাম ডগ স্কোয়াড। গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে তাদের দক্ষতা এবং পারফরমেন্স প্রশংসার দাবিদার। তবে এক্ষেত্রে তাদেরকে দক্ষ করে যারা গড়ে তোলেন, তাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না। কুকুরকে আর্মি ট্রেনিংয়ের মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং ট্রেনবিস্তারিত পড়ুন
র্যাবের সাথে বা পুলিশের সাথে অভিযানে যেতে দেখা যায় সুঠাম দেহগঠনের আরেকটি বাহিনী, তাদের নাম ডগ স্কোয়াড। গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে তাদের দক্ষতা এবং পারফরমেন্স প্রশংসার দাবিদার। তবে এক্ষেত্রে তাদেরকে দক্ষ করে যারা গড়ে তোলেন, তাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না। কুকুরকে আর্মি ট্রেনিংয়ের মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং ট্রেনিং দেয়া হয়, সেটা সকলেরই কম-বেশি জানা আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে যে মনোবিজ্ঞানের থিওরিগুলোকে ব্যবহার করা হয়, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। চলুন জেনে নেয়া যাক কীভাবে ডগ স্কোয়াড ট্রেনিংয়ে মনোবিজ্ঞানের থিওরি ব্যবহৃত হয়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডগ স্কোয়াড; source: Dhaka Tribune
সাধারণ নির্বাচন প্রক্রিয়া
ডগ স্কোয়াডের কাজ মূলত গন্ধ শুঁকে বোমা বা মাদকদ্রব্য শনাক্ত করা। জন্মগতভাবেই এ ক্ষমতা সব কুকুরের মধ্যে থাকে। তারপরও বিশেষ কয়েকটি জাতের কুকুরের মাঝে এ ক্ষমতা প্রবল; যেমন- ল্যাব্রাডোর, ব্লাডহাউন্ড বা জার্মান শেপার্ড। একদম ছানা অবস্থায় সুস্থ দেখে কয়েকটি কুকুর নির্বাচন করে পাঁচ থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মনিটর করা হয়। তারপর শুরু হয় ট্রেনিং। আর হ্যাঁ, মনিটরের সময়েই বাধ্য হতে শেখানো, টয়লেট ট্রেনিং ইত্যাদি টুকটাক শিক্ষাদান চলতে থাকে। যেহেতু সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ করবে, তাই প্রথমেই বিকট শব্দের সাথে মানিয়ে নেয়া শেখানো হয়। প্রথমে শব্দের মাত্রা কম থাকবে এবং ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে এবং শেষে সত্যিকারের গুলির শব্দের সাথে মানিয়ে নেয়া শেখানো হয়। মোটামুটি এ ট্রেনিংগুলো শেষ হবার পর যে কুকুর ছানাগুলোর পারফরমেন্স ভালো থাকে, তারা ডগ স্কোয়াডে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হয়।
ছানা অবস্থায় নির্দিষ্ট জাতের কুকুর এনে সেগুলোকে মনিটরিং করা হয়; source: Daily mail
এরপর থেকে প্রতিদিন কিছু লুকোচুরি খেলা খেলতে হবে তাদের সাথে। মানুষের ছোঁয়া জিনিস গন্ধ শুঁকে খুঁজে বের করতে হবে। পরবর্তী ধাপে যে মানুষের ছোঁয়া জিনিস খুঁজে পেয়েছে, সে মানুষটাকেই খুঁজে বের করা লাগে। এ ট্রেনিংয়ের সময় কুকুরের মুখে মুখবন্ধ দিয়ে নেয়া ভালো, কেননা অনেক সময় এরা আক্রমণাত্মক হয়ে পড়ে।
স্কোয়াড ডগ ট্রেনিংয়ের মুহূর্তে; source: You Tube
মনোবৈজ্ঞানিক থিওরি এবং স্কোয়াড ট্রেনিং
কুকুরকে ট্রেনিং দেবার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো আচরণের পরিবর্তন আনা। আচরণে পরিবর্তন আনতে মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত মনোবিজ্ঞানের থিওরিগুলোই কাজে লাগানো হয়। যেমন-
প্যাভলভের ক্লাসিক্যাল শর্তারোপ থিওরি
মনোবিজ্ঞানে আচরণ পরিবর্তনে ব্যবহৃত অন্যতম থিওরিগুলোর একটি হলো এই থিওরি। স্বাভাবিক একটি আচরণকে অন্য কিছু দ্বারা পরিবর্তন করাই এই থিওরির উদ্দেশ্য। প্যাভলভ এই থিওরিটি কুকুরের উপর প্রয়োগ করেই দিয়েছিলেন।
মাংস দেখলে স্বাভাবিকভাবেই কুকুরের লালাক্ষরণ হয়। তিনি প্রথমে একটি ঘন্টা বাজান এবং এরপর একটি কুকুরকে মাংস খেতে দেন। বেশ কয়েকবার এমন করার পর দেখলেন ঘন্টা দিয়ে মাংস না দিলেও কুকুরটির লালাক্ষরণ হচ্ছে। অর্থাৎ ঘন্টা দ্বারা লালাক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে।
প্যাভলভের ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং; source: SlideShare
তো কীভাবে ডগ স্কোয়াডে এর ব্যবহার হতে পারে? একটি হতে পারে কুকুরকে স্পটে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। অনেক কুকুরই যেতে চায় না বা অস্থিরতা প্রকাশ করে। সেগুলো নিয়মের মাঝে আনতে প্রতিদিন যেকোনো একটি স্পটে নিয়ে যেতে হবে এবং ফেরার পর খাবার দিতে হবে। এভাবে কিছুদিন করলে সে বুঝে যাবে যে, স্পটে গেলেই খাবার পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে এটা রপ্ত হয়ে গেলে তখন খাবার না দিলেও পরের দিন যাবে। তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে আচরণ আবার আগের মতো হয়ে যেতে পারে।
ট্রেনিং এ গুলির শব্দের সাথে পরিচিত করানো হচ্ছে; source: You Tube
স্কিনারের অপারেন্ট কন্ডিশনিং
উদ্দীপক পেলে সাড়া দেবে- এমনই এক মূল কথা মাথায় রেখে দেয়া হয় অপারেন্ট কন্ডিশনিং। যেমন ধরুন, একটি বাচ্চা পড়তে চাচ্ছে না। আপনি তাকে বললেন পড়লে চকোলেট পাবে- এই ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি ঠিক তেমন। কুকুরদেরকে নির্দিষ্ট টাস্ক দেয়া হয়। যদি টাস্ক সম্পন্ন করতে পারে তবে পুরষ্কার পাবে, যদি না পারে তাহলে শাস্তি পাবে, যেমন- আঘাত করা, ধমকানো ইত্যাদি। তবে বিজ্ঞানীরা বলেন, শাস্তি দিয়ে ভালো কিছু আদায় করা সম্ভব নয়। তার চেয়ে কোনো টাস্ক না পারলে পুরস্কারটি না দেওয়াই তার জন্য শাস্তি হবে। এটিকে নেগেটিভ রি-ইনফোর্সমেন্ট বলা হয়। এই কন্ডিশনিংয়ের উদ্দেশ্য হলো ভালো আচরণকে পুরষ্কৃত করে সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটানো।
source: Pinterest
স্কিনার আরো একটি পদ্ধতির কথা বলেছেন, তা হলো শেপিং। কোনো কঠিন একটি টাস্ককে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নেয়া এবং প্রতিটি অংশ সফলতার সাথে কমপ্লিট করার জন্য পুরষ্কৃত করাই হলো শেপিং। ডগ স্কোয়াড ট্রেনিংয়ে এ বিষয়টি প্রত্যেক ট্রেইনার মোটামুটি অনুসরণ করে থাকেন।
বান্দুরার সোশাল লার্নিং থিওরি
ছোট বাচ্চাদের সহজাত শিক্ষার প্রক্রিয়া খেয়াল করেছেন কি? তারা দেখে শেখে। অন্যরা কী করছে তা খেয়াল করে দেখে এবং তারপর তা নিজে করার চেষ্টা করে। অর্থাৎ খেয়াল করে দেখা এবং অনুকরণের সমন্বয়ই হলো আমাদের আচরণ। এই থিওরিকে সোশাল লার্নিং থিওরি বলে। আলবার্ট বান্দুরা এই বিষয়টি নিয়ে একটি পরীক্ষাও করেন।
ডগ ট্রেনিংয়ে সোশাল লার্নিং থিওরি এর ব্যবহার অনেকটা এমন; source: E-Learning-Provocateur
কুকুরের ট্রেনিংয়ের সময়ও এই থিওরি কিছুটা প্রয়োগ করা হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ট্রেইনারকে অনুকরণের বদলে অভিজ্ঞ কুকুরকে মডেল হিসেবে অনুকরণ করানো হয়।
মাসলোর চাহিদা সোপান থিওরি
মাসলোর মতে, প্রতিটি প্রাণীর প্রয়োজনীয়তার একটি সোপান বা সিঁড়ি রয়েছে। এটি অনেকটা পিরামিড আকৃতির। প্রতিটি প্রাণীর ক্ষেত্রে এই সোপানের ব্যাখ্যা আলাদা আলাদা হলেও কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে সকলের মাঝে, যেগুলো হলো মৌলিক চাহিদা, যেমন- খাদ্য, পানি, ভালোবাসা ইত্যাদি। অর্থাৎ ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং আনন্দ লাভ হলো প্রতিটি প্রাণীর প্রথম চাহিদা। আর এ কারণেই পোষা প্রাণীর আচরণ পরিবর্তনে পুরষ্কারের ব্যবস্থা করা হয়।
কুকুরের চাহিদা সোপান; source: thoseclevercanines.com
তাই ডগ ট্রেনিংয়ে কুকুরের ছোটখাটো একটি টাস্ক দেওয়া হয়। ভালো আচরণকে মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয়। এতে করে কুকুরটি কাজে উৎসাহিত হবে এবং শান্ত হয়ে বসবে। এরপর আরেকটু হার্ড টাস্ক দেওয়া হবে এবং পারলে আবারো মৌলিক চাহিদার একটি পূরণ করা হয়। এতে করে কুকুরটি আনন্দিত হবে এবং পরবর্তী টাস্কগুলো সফলতার সাথে করার চেষ্টা করবে।
হার্ড টাস্ক ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে ডগ স্কোয়াডকে; Source: BBC.com
টলম্যানের ল্যাটেন্ট লার্নিং
বারবার পুরস্কার না দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর বা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাস্ক কমপ্লিটের পর দিলে লার্নিংয়ের ফলাফল ভালো হয়। এই থিওরিটি টলম্যান ইঁদুরের উপর কাজ করে দিলেও, তা কুকুরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
ধরুন, কুকুরকে কোনো উঁচু পাঁচিল লাফিয়ে পার হওয়া শিখাতে হবে। তাহলে কুকুরকে চেষ্টা করতে দিন। অনেকবার চেষ্টার পর তাকে খাবার দিন পুরষ্কার হিসেবে। তাহলে দেখবেন পুরষ্কার পাবার পর খুব দ্রুত এবং সঠিকভাবে টাস্ক কমপ্লিট করতে পারছে। আর তাই এটিকে ল্যাটেন্ট লার্নিং বলে।
ট্রেনিংপ্রাপ্ত স্কোয়াড; source: news.mongabay.com
ডগ ট্রেনিংয়ে মাঝে মাঝেই কুকুরগুলোকে মানুষ এবং অন্যান্য কুকুরের সংস্পর্শে সামাজিক করার চেষ্টাও করা হয়, যেন স্পটে গিয়ে মানুষ বা অন্য পরিবেশ দেখে ভীত না হয়ে পড়ে। আর ডগ ট্রেনিং কখনো শেষ হবার নয়। অভিজ্ঞ কুকুরগুলোকেও নিয়মিত প্র্যাকটিস করাতে হয়। পরিশেষে, ডগ ট্রেনিংয়ে মনোবিজ্ঞানের এসব থিওরি ব্যবহৃত হয় খুবই দক্ষ হাতে। একজন অভিজ্ঞ ডগ ট্রেইনারের পক্ষেই তা সম্ভব।
সংক্ষেপে দেখুনভ্যাম্পায়ার: লোককথা নাকি বাস্তব?
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীতে প্রচলিত আছে ভ্যাম্পায়ারদের গল্প। কিছু গল্প হয়তো মজার, কিন্তু কিছু গল্প গায়ে কাঁটা দেবার মতোই। এবং সব গল্পেই ভ্যাম্পায়ারদের চরিত্রটা একইরকম- মৃত মানুষ তারা, ফ্যাকাশে চামড়ার রক্তপিপাসু সব, সূর্যের আলোতে আসলেই ঝলসে যায় তাদের শরীর। তবে সত্যিই কি এগুলো শ্রুতিকথা? যেকোনো সবিস্তারিত পড়ুন
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীতে প্রচলিত আছে ভ্যাম্পায়ারদের গল্প। কিছু গল্প হয়তো মজার, কিন্তু কিছু গল্প গায়ে কাঁটা দেবার মতোই। এবং সব গল্পেই ভ্যাম্পায়ারদের চরিত্রটা একইরকম- মৃত মানুষ তারা, ফ্যাকাশে চামড়ার রক্তপিপাসু সব, সূর্যের আলোতে আসলেই ঝলসে যায় তাদের শরীর। তবে সত্যিই কি এগুলো শ্রুতিকথা? যেকোনো সজ্ঞান ব্যক্তিই বলবে, “হ্যাঁ, অবশ্যই, ভ্যাম্পায়ারের কাহিনীর কি আবার বাস্তব ভিত্তি আছে নাকি?” কিন্তু মজার বিষয় কি জানেন? বিজ্ঞান কিন্তু ভ্যাম্পায়ারকে স্রেফ শ্রুতিকথা বলে উড়িয়ে দিচ্ছে না। হ্যাঁ, অদ্ভুত হলেও সত্য, ভ্যাম্পায়ের এসব লোককথার রয়েছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
বেশিরভাগ সংস্কৃতিতেই ভ্যাম্পায়ার বা ভ্যাম্পায়ারের মতোই কোনো চরিত্র নিয়ে লোককথা আছে। চীনের লোককথায় আছে অন্যের জীবন থেকে শক্তি নেয়া প্রেতের কথা। ভারতে আছে শ্মশানের ভূতের গল্প। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় মেসোপটেমিয়া, হিব্রু, গ্রিক বা রোমান- সবার উপকথাতেই আছে ভ্যাম্পায়ারদের মতো কোনো অপদেবতার গল্প।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব উপকথা যাচাই করলে দেখা যায়, এসব শ্রুতির জন্ম হয়েছে রোগবিস্তার সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা থেকে। যেমন- প্লেগ যখন ইউরোপে মহামারি রূপে ছড়িয়েছিল, তখন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বেশ ভীত হয়ে গিয়েছিল, বের করেছিল এই রোগ এবং রোগ বিস্তারের অদ্ভুত সব ব্যাখ্যা। অনেকে বলেছিলো, ইহুদীরা ছড়াচ্ছে এই রোগ, অনেকে ভেবেছিল ঈশ্বর তাদেরকে পাপের শাস্তি দিচ্ছে। অথচ এই মহামারীরও ছিল সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কিত লোককথাগুলোর সাথে যেসব সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো জড়িয়ে আছে, বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এগুলোও আসলে সত্যিকারের কিছু মেডিকেল কন্ডিশনেরই অতিকথন।
একটি সম্ভাব্য সংযোগ হিসেবে বিজ্ঞানীরা ভাবছেন পোরফিরিয়াকে। পোরফিরিন নামক রক্তের এক অণুর আতিশায্যের ফলে এই ব্যাধি হয়।
আমরা জানি, রক্তের লোহিত কণিকায় বড়সড় একটি প্রোটিন থাকে, হিমোগ্লোবিন যার নাম। এর মাধ্যমেই অক্সিজেন আর কার্বন ডাইঅক্সাইড সঞ্চালিত হয় আমাদের দেহে। আর এই হিমোগ্লোবিনের মাঝে থাকে কার্বন, নাইট্রোজেন আর হাইড্রোজেনের একটি রিং, পোরফিরিন রিং। সাধারণত এনজাইম এই পোরফিরিনকে হেম গ্রুপে রূপ দেয়, হিমোগ্লোবিনের কাজ শুরু হয়ে সেখান থেকে। কিন্তু পোরফিরিয়ার রোগীদের এই এনজাইমের ঘাটতি থাকে, ফলশ্রুতিতে তাদের দেহে পোরফিরিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই পোরফিরিন জমে তাদের দেহে নানা সমস্যার তৈরি করে।


পোরফিরিন; image source: commons.wikimedia.org
তাদের ত্বক তখন সূর্যের আলোর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, আলো লাগলেই ফুসকুড়ি হয় দেহে, ব্যথা করে সেগুলো। এই অতিরিক্ত পোরফিরিনগুলো তাদের দাঁতে-মুখে জমা হয়, সেখানকার ত্বকগুলো লাল হয়ে যায়। দেখে এটাও মনে হতে পারে যে, মানুষটা হয়তো রক্ত চুষে এসেছে কোনো জায়গা থেকে!
পোরফিরিয়ায় আক্রান্ত একজন ব্যক্তি; image source: Acute Porphyrias- Youtube
এখন এই পোরফিরিয়া এত বড় ব্যাধি হিসেবে আর নেই, এর প্রকৃতিও আমরা বুঝি, একে সারানোও যায়। তখন মানুষের কাছে এই ব্যাধি ছিল রহস্যময়, তাই হয়তো মানুষ একে ঘিরে এত গল্প বানিয়েছিল।
আর পোরফিরিয়াগুলো বংশ পরম্পরায় পরিবাহিতও হয়। এ কারণে একজন ভ্যাম্পায়ার তার পরিবারের সবাইকে ভ্যাম্পায়ার বানিয়ে ফেলছে এমন গল্পও তাই এখন আর ব্যাখ্যাতীত নয়।
পেলাগ্রা নামক আরেকটি ব্যাধি দিয়েও এই উপকথাকে ব্যাখ্যা করা যায়। ভিটামিন বি-৩ আর ট্রিপ্টোফ্যান নামক এক অ্যামিনো এসিডের অভাবে এ রোগ হয়।
আমাদের দেহ ভিটামিন বি-৩ কে ব্যবহার করে খাবারকে শক্তিতে রুপান্তর করে। আর আমাদের খাবারে যদি ভিটামিন বি-৩ যথেষ্ট না-ও থাকে, আমাদের দেহ ট্রিপ্টোফ্যান থেকে ভিটামিন তৈরি করে নেয়, যাতে দেহের কার্যকলাপ ঠিক থাকে। কিন্তু কারো দেহে যদি এই দুটোরই অভাব থাকে, তখনই আসলে সমস্যার সূত্রপাত হয়।

ভিটামিন বি৩ বা নায়াসিন; image source: poultrydvm.com
আজ থেকে ৩০০ বছর আগে, গমের স্থানে ভুট্টা ইউরোপিয়ানদের প্রধান খাদ্য হিসেবে উত্থিত হতে শুরু করে। ভুট্টার ফলন তখন খুব ভালো হতো এবং দামেও ছিল সস্তা। এজন্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে ভুট্টা। তবে ভুট্টার কিন্তু গমের মতো পুষ্টিমান ছিল না। এর মাঝে ভিটামিন বি-৩ থাকলেও ছিল গমের থেকে কিছুটা ভিন্ন রূপে, সেটা হজম করার ক্ষমতা আমাদের দেহে ছিল না। ইউরোপে ভুট্টা আসে মেক্সিকানদের থেকে, মেক্সিকানরা ভুট্টাকে খাবার হিসেবে ব্যবহার করার আগে চুন-পানির মিশ্রণে একটু ভিজিয়ে নেয়। এ সময়ে হওয়া কিছু বিক্রিয়ার জন্য তখনই আসলে ভুট্টার পুষ্টিগুণ বেড়ে যায় অনেকগুণ। ইউরোপিয়ানদের মাঝে এ চর্চা ছিল না। তাই ভিটামিন বি-৩ থেকেও তারা বঞ্চিত হতো। এর মধ্যে আবার ভুট্টায় ট্রিপ্টোফ্যানের অস্তিত্বই নেই। এ কারণে যত ভুট্টাই খান, প্রয়োজনীয় ভিটামিনের অভাব আপনার কোনোভাবেই পূরণ হচ্ছে না। তাই এই পরিবর্তনের সময়েই ইউরোপে বেশ দ্রুত পেলাগ্রা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
পেলাগ্রা আর পোরফিরিয়ার উপসর্গগুলো বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। সূর্যের আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা, বাহিরে বের হলেই ফুসকুড়ি- এসব তো আছেই। এই ফুসকুড়ি আবার এ রোগের ক্ষেত্রে বেশ ভয়ংকর। ত্বক পুরো ফ্যাকাশে কাগজের মতো হয়ে যায় এক্ষেত্রে।
এই রোগাক্রান্তদেরও মুখ লাল হয়ে যায়, জিহ্বাও ফুলে যায়। জিহ্বায় দাঁতের দাগ পড়ে যায় তখন, দেখে মনে হয় মুখের ভেতর বোধহয় অনেক বড় বড় দাঁত। ভ্যাম্পায়ারদেরকেও তো আমরা এমনটাই ভাবি, তাই না?
এছাড়াও পেলাগ্রায় মস্তিষ্কের নিউরন ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ফলে দেখা যায় রোগীরা বিভিন্ন মানসিক রোগ কিংবা ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। সূর্যের আলোর প্রতি এলার্জি আর ইনসমনিয়ায় দুটোর সমন্বয় যদি হয় কারো মাঝে, তবে কি আর সে মানুষটাকে ঘুমাতে দেখা যাবে? গল্পের ভ্যাম্পায়াররা এ কারণেই রাতে ঘুমায় না।
তবে এই পেলাগ্রা আর পোরফিরিয়া হয়তো ভ্যাম্পায়ারদের কিছু বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু “মৃত মানুষ হেঁটে বেড়াচ্ছে”- এই গল্পের ব্যাখ্যা কোথায় পাবো আমরা? হ্যাঁ, বিজ্ঞানেই আছে সেই ব্যাখ্যা।
কোনো কোনো বিজ্ঞানীর মতে, ক্যাটালেপ্সি নামক এক স্নায়বিক ব্যাধি থেকে উৎপত্তি এই গল্পের। এপিলেপ্সির মতোই সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম বাধাগ্রস্থ হয় এ সময়। রোগী তখন নড়তে পারে না, হৃদস্পন্দন আর শ্বাসপ্রশ্বাস এতটাই ধীর হয়ে যায় যে রোগীকে দেখে যে কারো মনে হতে পারে, সে হয়তো মৃত। এখন মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের হাতে বর্তমানে আছে অনেক সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি, যেগুলো দিয়ে কারো মাঝে যদি জীবিত থাকার ক্ষুদ্রতম লক্ষণও থেকে থাকে, তা আমরা বের করে ফেলতে পারি। আগে কিন্তু এমনটা ছিল না। ক্যাটালিপ্টিক সিজারে থাকা কাউকে মৃত ভেবে ফেলাটা আসলে অনেকটা স্বাভাবিকই ছিল। আর মৃত ব্যক্তিদেরকে কী করা হয়? কবর দেয়া হয়। এমনকি কোমায় থাকা মানুষদেরও কবর দিয়ে দেয়াও তো সেসময়ের জন্য খুব অস্বাভাবিক কিছু না। কবরে গিয়ে কিন্তু ঠিকই এই অসুস্থ মানুষগুলো সম্বিত ফিরে পেতে পারে।

ক্যাটালেপ্টিক সিজারে থাকা একজন ব্যক্তি; image source: pinterest.com
আর কেউ যদি দেখে কবর থেকে কেউ উঠে এসে হেঁটে বেড়াচ্ছে, তাকে কি আর কোনোভাবে বোঝানো সম্ভব যে এ ব্যক্তি জীবিতই আসলে, কোনো ভ্যাম্পায়ার নয়?
এই তিনটি ব্যাধিই এখনো টিকে আছে পৃথিবীতে, কিন্তু সবগুলোই চিকিৎসা সম্ভব। আর চিকিৎসা হতে হতে ব্যাপ্তিও কমে গিয়েছে এখন। তাহলে দেখা গেলো, ভ্যাম্পায়ার আসলে শুধু হরর বইয়ের গল্পের চরিত্র বা লোককথার পিশাচই নয়, রীতিমতো বাস্তব কিছু মেডিকেল কন্ডিশন। মানবসভ্যতা জ্ঞান-বিজ্ঞানে এতটা এগিয়ে যাবার পর কত মজার মজার ব্যাপারই আমাদের সামনে আসছে এখন। ইতিহাসের অদ্ভুততম লোককথাগুলোকেও যখন বিজ্ঞান ব্যখ্যা করে দিচ্ছে, তখন প্রজন্ম হিসেবে নিজেদেরকে ভাগ্যবানই বলতে হয়!
সংক্ষেপে দেখুনআঙুলের নখ কিভাবে বৃদ্ধি পায়?
যারা হাতের আঙুলে নখের উপর মেহেদী দিয়েছেন কখনো, তারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, মেহেদীর রঙ কীভাবে ধীরে ধীরে মুছে যায়। রঙ আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে থাকে। প্রথমে নখের গোঁড়ায় ফাঁকা হতে শুরু করে। কখনো কি ভেবেছেন কেন এমনটা হয়? আঙুলের নখ তিনদিকে আবদ্ধ, শুধুমাত্র সামনের দিক উন্মুক্ত, এই সামনের দিকটিই নখ বৃদ্বিস্তারিত পড়ুন
যারা হাতের আঙুলে নখের উপর মেহেদী দিয়েছেন কখনো, তারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, মেহেদীর রঙ কীভাবে ধীরে ধীরে মুছে যায়। রঙ আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে থাকে। প্রথমে নখের গোঁড়ায় ফাঁকা হতে শুরু করে। কখনো কি ভেবেছেন কেন এমনটা হয়? আঙুলের নখ তিনদিকে আবদ্ধ, শুধুমাত্র সামনের দিক উন্মুক্ত, এই সামনের দিকটিই নখ বৃদ্ধি পাবার জন্য যথেষ্ট নয় কি?
এমনটা হতেও পারতো, তবে সেক্ষেত্রে অনেক সমস্যা দেখা যেতো। উদাহরণ হিসেবে মেহেদীর রঙের কথাই ধরা যাক। এই রঙ কখনো নখ থেকে মুছে যেতো না, সামনের মুক্ত অংশে নখ বৃদ্ধি পেতো, আর আমরা কেটে ফেলতাম বাড়তি অংশটুকু। হয়তো আঙুলের নখ নিয়ে কিংবা মাথার চুল নিয়ে কখনো ভাবনা জাগেনি মনে। জীবদেহে থাকা কোনোকিছুই ফেলনা নয়, সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে। নখের প্রয়োজনীয়তা নখ কাঁটার পর উপলব্ধি করতে পারেন নিশ্চয়ই। সৌন্দর্যবর্ধন এবং সূক্ষ্ম কোনো বস্তু ধরা ছাড়াও আরো অনেক কাজ রয়েছে নখগুলোর।

আঙুলের অগ্রভাগে উপস্থিত হলুদ অংশের কুটুরিগুলোই পাল্প স্পেস নামে পরিচিত; Image Source: Atlas of Dermatologic Ultrasound
আঙুলে পাল্প স্পেস নামে ছোট ছোট কুঠুরীর মতো রয়েছে, সবধরনের আঘাত থেকে আঙুলের অগ্রভাগে অবস্থিত এ পাল্প স্পেসটিকে রক্ষা করে থাকে নখ। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মাঝে কেবল প্রাইমেট বর্গের প্রাণীদেহে নখ পাওয়া যায়। এই নখ জন্মের পর নয়, বরং মাতৃগর্ভে থাকাকালেই তৈরি হয়ে যায়। কেরাটিন জাতীয় প্রোটিন নির্মিত এই নখ শক্ত এক আবরণের মতো আবৃত করে রাখে আঙুলের অগ্রভাগকে।
মাতৃগর্ভে একটি শিশুর বয়স যখন ২০ সপ্তাহ পূর্ণ হয়, আঙুলগুলোর অগ্রভাগে শক্ত একটি আবরণের মতো তৈরি হতে শুরু করে। মাতৃগর্ভে ২৮০ দিন পূর্ণ করে একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হতে হতে সেই আবরণগুলো পরিপূর্ণ নখে পরিণত হয়।

একটি নখের বিভিন্ন অংশ©Lineage
আঙুলের গোঁড়ায়, নখ যেখানে ত্বকের সাথে মিশে গেছে, এই অংশটুকুকে বলা হয় কিউটিকল, এর ভেতরের দিকে, আঙুলের আরো গভীরে থাকে নখের মূল; একে ম্যাট্রিক্স বলা হয়। এই ম্যাট্রিক্স থেকেই অনবরত নখের সৃষ্টি হতে থাকে। নখগুলো গোড়ার দিকে যেখানে গিয়ে ত্বকে মিশেছে, সেখানে সম্পূর্ণ সাদা অর্ধচন্দ্রাকৃতির একটি অংশ দেখা যায়। না দেখতে পেলেও সমস্যার কিছু নেই, সাধারণত দেখা যাবার কথা নয়। বৃদ্ধাঙ্গুলির দিকে তাকালে হয়তো স্পষ্ট দেখা যেতে পারে। এই অংশটুকুকে বলা হয় লুনুলা, এটি ত্বকের নিচে ম্যাট্রিক্সের বাড়তি অংশ। অর্ধচন্দ্রাকৃতির হওয়ায় এর নাম হয়েছে লুনুলা।
নখ এবং চুল মৃত কোষ দিয়ে তৈরি। কোনো ধরনের স্নায়ু সংযোগ থাকে না বলে নখ কিংবা চুল কাঁটলে আমরা ব্যথা পাই না। কিন্তু এই যে নখের ম্যাট্রিক্স অংশটুকু, এটি মৃত নয়, জীবিত কোষ দ্বারা তৈরি হয়েছে, ত্বকের নিচে এর সাথে রক্তবাহিকা এবং স্নায়ু সংযুক্ত থাকে। রক্তবাহিকার মাধ্যমে পর্যাপ্ত পুষ্টি পেয়ে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নতুন নতুন কোষ তৈরি করে এই ম্যাট্রিক্স, নতুন তৈরি হওয়া কোষগুলোকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়, যা কিউটিকল পার করে বাইরের দিকে উন্মোচিত হয়।
নখ হিসেবে আমরা যে অংশটুকুকে চিনি, এই শক্ত আবরণটুকুকে বলা হয় ‘নেইল প্লেট’। ম্যাট্রিক্স কোষ থেকে অনবরত কেরাটিন কোষ তৈরি হয়ে বাইরে এসে নেইল প্লেট তৈরি করে। এই কোষগুলো কেরাটিন জাতীয় প্রোটিন তৈরি করে বলেই এরা শক্ত হয়ে যায় মারা যাবার পর। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন কোষগুলো তৈরি হয়ে সামনের দিকে সমভাবে বণ্টিত হয় কীভাবে?
সমতা রেখে রেলগাড়ি চলার জন্য যেমন একটি রেল ট্র্যাক বা রেল লাইন রয়েছে, তেমনিভাবে নখেও একটি ট্র্যাক থাকে, একে বলা হয় নেইল বেড। নখের ঠিক নিচে একস্তর জীবিত কোষের আবরণ থাকে; এটি নেইল বেড নামে পরিচিত। এতে রক্তবাহিকা এবং স্নায়ু রয়েছে। এজন্যই নেইল বেডে কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমরা ব্যথা পাই।

ক্লাবিং উপস্থিত থাকলে হাতের নখগুলো এমন দৈত্যাকার ধারণ করে থাকে; Image Source: Drug Development Technology
নখ হিসেবে আমরা যেটুকু দেখছি পুরোটাই মৃত কোষে তৈরি। কিন্তু আমরা নখ কাঁটার সময় অগ্রভাগে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কাঁটতে পারি, ভেতরের দিকে কাটতে গেলেই ব্যথা লাগবে। মৃত কোষে নির্মিত নখ প্লেটে ব্যথা হয় না, যদি নখ উপড়ে ফেলা হয় কিংবা কাঁটা হয়, নেইল বেডে থাকা স্নায়ুর জন্যই আমরা ব্যথা পেয়ে থাকি। যদি কোনো দুর্ঘটনায় আঙুলে ক্ষতি হয়, নখ উপড়ে ফেলে দিতে হয়, একজন চিকিৎসক সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন নেইল বেড এবং ম্যাট্রিক্স অংশটুকুকে ঠিকমতো বসিয়ে দিতে। কারণ তাহলেই নতুন করে নখ গজিয়ে উঠবে। মোটকথা, নেইল বেড যদি অক্ষত থাকে, নেইল প্লেট ঠিকমতো পুনরায় তৈরি হয়ে যাবে।
বারংবার কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নখের বেড়ে উঠাটাকে স্রষ্টার একটি উপহার হিসেবেই ভাবা যেতে পারে। নখগুলো যদি দাঁতের মতো স্থায়ী হতো, হয়তোবা আমাদের কষ্ট করে নখ কাটা লাগতো না। আর নখ কাটা নিয়ে এত ভাবতেও হতো না। কোনো দুর্ঘটনায় নখ পড়ে গেলেও সেখানে পুনরায় গজানোর সুযোগ থাকে। দাঁতের মতো স্থায়ী কিছু হলে এই সুযোগ আর থাকতো না। একবার নষ্ট হলে কিংবা উপড়ে গেলে বাকি জীবন নখ ছাড়াই থাকতে হতো।
নখের বেড়ে উঠা খুবই ধীরগতির। পায়ের নখগুলো হাত থেকে আরো ধীর গতিতে বেড়ে উঠে। হাতের নখ প্রতি মাসে ৩ মিলিমিটারের মতো বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। অর্থাৎ ছয় মাসের ভেতর একটি আঙুলের সম্পূর্ণ নেইল প্লেটটি প্রতিস্থাপিত হয়ে যাবে নতুন নেইল প্লেট দ্বারা। কোনো দুর্ঘটনায় যদি নখের কোনো ক্ষতি হয়, চিন্তার কোনো কারণ নেই, নেইল বেড ঠিক থাকলে ৫-৬ মাসেই নতুন নখ তৈরি হয়ে যাবে। আর পায়ের নখগুলো প্রতিমাসে ১ মিলিমিটারের মতো বাড়ে, পুরো নেইল প্লেট প্রতিস্থাপিত হতে সময় প্রয়োজন প্রায় এক থেকে দেড় বছরের মতো।



সংক্ষেপে দেখুনপায়ের নখ থাকুক সুস্থ সবল; Image Source: Podiatry Belmont
নখ যে শুধু সৌন্দর্যের অংশ তা, আঙুলের অগ্রভাগকে সুরক্ষিত রাখার অস্ত্র তা নয়। মানুষের হাত পরীক্ষা করেই অনেক রোগ নির্ণয় সম্ভব। শরীরের অনেক রোগের লক্ষণই হাতে, আঙুলের ও নখে প্রকাশ পায়। উল্লেখযোগ্য লক্ষণগুলোর মধ্যে ক্লাবিং, লিউকোনাইকিয়া, কইলোনাইকিয়া বিশেষ। দেহের বিশেষ রোগে এই লক্ষণগুলো নখে দর্পণস্বরূপ প্রকাশিত হয়।
নখ কাটতে অসাবধানতায় এমন ইনফেকশন তৈরি হতে পারে; Image Source: Medical News Today
সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি সঠিক পদ্ধতিতে নখের যত্ন নিন। অনেকেই ম্যানিকিউর-প্যাডিকিউর করে থাকেন। এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করলে নখে ইনফেকশন তৈরি হতে পারে। অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিন, যেসমস্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পার্লারগুলো, সেখানে প্রতিবার কাজ শেষে পরিষ্কার করা হয় কিনা। নখ কাটার ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করুন। আঙুলের অগ্রভাগে নেইল বেডের সীমারেখার সামান্য সামনে পর্যন্ত কাটুন। একেবারে নেইল বেড পর্যন্ত কাঁটা হলে নেইল বেড উন্মোচিত হয়ে পড়ে, যেহেতু জীবিত কোষ রয়েছে, এর নিচেই অজস্য রক্তবাহিতা, দ্রুত ইনফেকশন তৈরি হবার সুযোগ থেকে যায়।
ছোট শিশুদের নখে ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকে। তাই বেশি গভীর করে নখ কাটবেন না; Image Source: The Irish Times
নিয়মিত নখ কাঁটুন, বাড়তি অংশে দেখা-অদেখা হাজারো ময়লা বা জীবাণু জমে থেকে মুখে চলে যায়, খাবারে মিশে যায়। খাবার গ্রহণের পূর্বে সঠিক ভাবে ভালোমতো হাত ধুয়ে নিন, নির্দিষ্ট সময় পর পর নখ কেটে ফেলুন। এতে অনেক রোগ থেকেই বেঁচে যাবেন আপনি। পায়ের নখের দিকেও নজর দিন, ওয়াশরুম থেকে জীবাণুগুলো পায়ের নখ হয়েই আপনার ঘরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। পা পরিষ্কার করা হলেও নখ কদাচিৎ পরিষ্কার করা হয়, তার চেয়ে বরং নিয়ম করে কেঁটে রাখুন। পরিবারে ছোটদের মাঝেও নখ কাঁটার এই সুন্দর অভ্যাসগুলো গড়ে তুলুন।
কিভাবে সান্ত্বনা দেবেন হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে ?
কখনো কি খুব হতাশাগ্রস্ত কোনো ব্যক্তির সান্নিধ্যে এসেছেন? নিশ্চয়ই এসেছেন। এই দুঃখময় জগতে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির সংখ্যা তো নেহাত কম নয়। মাঝেমধ্যেই আমাদের আশেপাশের অনেক ব্যক্তিকে চরম হতাশাগ্রস্ত সময় পার করতে হয়। আমাদের কোনো বন্ধু হয়তো পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সিজিপিএ অর্জন করতে পারেনি, কোনো সহকর্মীর হয়তো প্রেমবিস্তারিত পড়ুন
কখনো কি খুব হতাশাগ্রস্ত কোনো ব্যক্তির সান্নিধ্যে এসেছেন? নিশ্চয়ই এসেছেন। এই দুঃখময় জগতে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির সংখ্যা তো নেহাত কম নয়। মাঝেমধ্যেই আমাদের আশেপাশের অনেক ব্যক্তিকে চরম হতাশাগ্রস্ত সময় পার করতে হয়। আমাদের কোনো বন্ধু হয়তো পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সিজিপিএ অর্জন করতে পারেনি, কোনো সহকর্মীর হয়তো প্রেমিকা বা স্ত্রীর সাথে বাদানুবাদ হয়েছে, কিংবা কোনো নিকটাত্মীয়ের হয়তো হঠাৎ করেই মৃত স্বামীর কথা ভেবে খুব মন খারাপ হয়ে গেছে।
এরকম পরিস্থিতিতে যদি আমরা তাদের কাছাকাছি থাকি, কিংবা অন্য কোনোভাবে তাদের সাথে যোগাযোগ ঘটে, তখন প্রচন্ড বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তারা তাদের দুঃখের কথা আমাদের সাথে ভাগ করে নেয়, এবং আশা করে আমরা হয়তো তাদেরকে যথাযথ সান্ত্বনা দিতে পারব, তাদের মন হালকা করতে পারব।
কিন্তু আমরা সবাই কি তা পারি? হতাশাগ্রস্ত মানুষকে সান্ত্বনা দেয়া এমন একটি শিল্প, যেটির উপর আমাদের অধিকাংশেরই ভালো দখল নেই। আমরা হয়তো বুঝি ঠিকই যে মানুষটা কষ্ট পাচ্ছে, তার পাশে আমাদের থাকা উচিৎ, তাকে মানসিক সমর্থন যোগানো উচিৎ। কিন্তু ঠিক কীভাবে যে সেটি সম্ভব, তা বুঝে উঠতে পারি না। ফলে তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে উল্টো এমন কিছু একটা বলে বসি, যাতে তার মন ভালো হওয়ার পরিবর্তে আরো বিষিয়ে যায়।
আর কোনো ব্যক্তিকে যদি তার দুঃসময়ে আমরা সান্ত্বনা দিতে না পারি, তবে তার মনে আমাদের ব্যাপারে বেশ খারাপ একটা ধারণা জন্মে যায়, এবং পরবর্তীতে সে আমাদেরকে আর নিজের খুব আপন কেউ বলে ভাবতে পারে না। এভাবেই একসময় যার সাথে ঘনিষ্ঠ সখ্যতা বা আত্মীয়তা ছিল, তার সাথেই আমাদের দূরত্ব তৈরি হয়ে যেতে শুরু করে।
এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা একজন হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে সান্ত্বনা দিতে পারি? তার সকল দুঃখ-কষ্ট দূর করতে না-ই বা পারলাম, কীভাবে অন্তত তাকে কিছুটা হলেও ভালো বোধ করাতে পারি? এ লেখায় আমরা সে বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করব।

প্রথমে শুনতে হবে; Image Source: WikiHow
শোনা
কাউকে সান্ত্বনা দেয়া বা ভালো বোধ করানোর প্রাথমিক শর্ত হলো, তাকে মন খুলে কথা বলতে দেয়া, এবং মনোযোগ দিয়ে তা শোনা। অধিকাংশ ব্যক্তিই কষ্ট পায় নিজের মনের কথা কাউকে খুলে বলতে পারে না বলে। তাই আমাদের উচিৎ হবে, তাকে এমনটা বোঝানো যে আমরা তার ব্যাপারে আসলেই জানতে চাই, এবং সে নিঃসংকোচে নিজের সকল সমস্যার কথা আমাদের সাথে ভাগ করে নিতে পারে।
যদি সে নিজে থেকে বলতে না চায়, তাহলে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে টুকটাক প্রশ্ন করে আমরা সে সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা লাভ করতে পারি। তাছাড়া, সাধারণত দেখা যায় যে, আগ্রহী শ্রোতা পেলে যেকোনো মানুষই নিজেকে মেলে ধরে।
সুতরাং আমাদের কর্তব্য হবে আগ্রহ প্রকাশ করা, সে কথা বলতে শুরু করলে মাঝেমধ্যে ‘হ্যাঁ’, ‘ঠিক’, ‘তাই তো’ জাতীয় কথা বলে তাল দেওয়া, এবং সে কোনো কথা বলতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেলে বিভিন্ন প্রশ্ন করে বিষয়টি সম্পর্কে ভালো করে জেনে নেয়া।
যদি কোনো হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি একজন আগ্রহী ও বিশ্বাসী শ্রোতার কাছে নিজের সমস্যার কথা কোনো রাখঢাক না রেখেই প্রকাশ করতে পারে, তাহলে তার খারাপ লাগার প্রায় অর্ধেকই দূর হয়ে যায়।

দেখাতে হবে সঠিক প্রতিক্রিয়া; Image Source: WikiHow
সঠিক প্রতিক্রিয়া দেখানো
একজন হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি যখন আমাদেরকে বিশ্বাস করে তার সব মনের কথা খুলে বলল, তখন কিন্তু আমাদের দায়িত্বও বহুগুণে বেড়ে গেল। ওই ব্যক্তির যখন নিজের তরফ থেকে সব বলা শেষ হয়ে যাবে, তখন সে অপেক্ষা করতে থাকবে আমাদের কী প্রতিক্রিয়া তা জানার। সুতরাং প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রে বিচক্ষণ হতে হবে।
অনেক সময় এমন হতে পারে যে, ওই ব্যক্তির সমস্যাটা আমাদের কাছে তেমন বেশি গুরুতর মনে হলো না। এটি খুবই স্বাভাবিক, কেননা সকলের বিবেচনাবোধ তো আর সমান নয়। তবে মনে রাখতে হবে যে, আমাদের কাছে যা-ই মনে হোক না কেন, ওই ব্যক্তি কিন্তু এই সমস্যাটি নিয়েই পীড়িত হয়ে আছে।
তাই কোনোভাবেই এমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না যাতে মনে হয়, “আরে, এটা কোনো সমস্যা হলো নাকি!” বরং জোর দিয়ে তাকে বলতে হবে, “হ্যাঁ, সমস্যাটা আসলেই গুরুতর, এবং কষ্ট পাবার মতোও।”

হতে হবে সহানুভূতিশীল; Image Source: WikiHow
সহানুভূতিশীল হওয়া
হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির মানসিক অবস্থা যদি আমরা উপলব্ধি করতে না পারি, তাহলে সকল চেষ্টাই মাঠে মারা যাবে। তাই এবার আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে, তার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে ভাবা, “আমার সাথে এমন কিছু হলে আমি কেমন বোধ করতাম।”
যখন আমরা তৃতীয় পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ছেড়ে ওই ব্যক্তির জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে নতুন করে সমস্যাটি নিয়ে ভাবতে পারব, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব বেড়ে যাবে। শুরুতে যেটিকে হয়তো আমাদের কাছে নিতান্তই হাস্যকর মনে হয়েছিল, সেটিকেই এখন বৃহত্তর কোনো সমস্যা বলে মনে হবে।
এই ব্যাপারটির নামই হলো সহানুভূতি। এবং এই সহানুভূতি কেবল নিজের ভেতর চেপে রাখলেই হবে না, বরং ওই ব্যক্তির সামনে তা দেখাতেও হবে। তাকে বলতে হবে, “আমি বুঝতে পারছি তুমি কতটা কষ্ট পাচ্ছো। তোমার মনের জোরের তারিফ করতেই হয়। তোমার জায়গায় আমি থাকলে কিছুতেই এত কষ্ট সহ্য করতে পারতাম না।”
মনে রাখবেন, আমাদের এই কথায় তার সমস্যা মিটে যাবে না ঠিকই, কিন্তু নিজের উপর কিছুটা হলেও আত্মবিশ্বাস সে ফিরে পাবে। এই মুহূর্তে আত্মবিশ্বাস যে তার খুবই প্রয়োজন।

দিতে হবে ভরসা; Image Source: WikiHow
ভরসা দেওয়া
এবার হলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন আমরা হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে ভরসা দিতে শুরু করব, সব ঠিক হয়ে যাবার আশ্বাস দেব।
কিন্তু এই পর্যায়ে এসেই অনেকে ভুলটা করে বসে। তারা কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব দেখিয়ে বলে, “আরে, এটা নিয়ে চিন্তা করার কোনো দরকারই নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।” অনেকে তো আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বিভিন্ন অসম্ভব সমাধানও বাতলে দিতে শুরু করে।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, হতাশাগ্রস্ত মানুষের মনে জেঁকে বসা দুঃখ-কষ্ট এত পলকা না যে আমাদের দুই-একটা কথাতেই তা দূর হয়ে যাবে। তাছাড়া আমরা হুট করে যেসব সমাধান বাতলে দিচ্ছি, ওই ব্যক্তি নিজে কি সেগুলো নিয়ে আগে ভেবে দেখেনি? অবশ্যই দেখেছে, এবং তার কাছে সেগুলোকে ভরসাযোগ্য মনে হয়নি। তাই নতুন করে সেগুলোই তাকে বললে, তার মানসিক অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হবে না।
তাহলে আমাদের করণীয় কী? আমাদের করণীয় হলো খুবই বুঝে শুনে পা ফেলা। এভাবে বলা, “সমস্যাটা তো যথেষ্ট জটিল। চাইলেই সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে সমাধান যে অসম্ভব, এমনটাও নয়। চলো, কী সমাধান বের করা যায় তা নিয়ে আমরা ভাবতে থাকি।”
এরপর আমাদেরকে বাস্তবিকই সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে, এবং শেষ পর্যন্ত যেটিকে সবচেয়ে জোরালো বলে মনে হয়, সেটি তার সামনে উপস্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি যে, হুট করে বের করা সমাধান হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির উপর যতটা প্রভাব ফেলবে, ভেবেচিন্তে বের করা সমাধান সে তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব ফেলবে।”

প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা বলতে হবে; Image Source: WikiHow
কথা বলা
কখনো কখনো এমন হয় যে, অনেক খুঁজে-পেতেও কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা যায় না। এমন ক্ষেত্রে অনেকেই চেষ্টা করেন প্রসঙ্গ বদলে ফেলার। তাদের ধারণা, সমস্যার কথা ভুলে গিয়ে অন্য কিছু নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে হয়তো হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির ভালো লাগবে।
কিন্তু আদতে তা ঘটে না। সমস্যাটি যেহেতু আমাদের নিজেদের না, তাই আমরা চাইলেই যত সহজে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে অন্য কিছু নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিতে পারব, ওই ব্যক্তি কিন্তু তা পারবে না। তার অবচেতন মনে ওই সমস্যাটির কথাই বারবার ঘুরপাক খেতে থাকবে। এমতাবস্থায় যখন সে খেয়াল করবে আমরা তার সমস্যাটিকে পাশ কাটিয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছি, তখন তার মনে হবে, আমরা হয়তো তার সমস্যাটিকে আর গুরুত্ব দিচ্ছি না। এমন মনে হওয়ার ফলে সে আরো বেশি অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়বে।
তাই কোনো অবস্থাতেই পলায়নপর মানসিকতা দেখানো চলবে না। অন্য প্রসঙ্গে আলোচনার বদলে, আমাদের উচিৎ হবে সমস্যাটি নিয়েই টুকটাক আলাপ করতে থাকা, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির উপর আলোকপাত করা। এতে ওই ব্যক্তির মনের চাপ যেমন ধীরে ধীরে কমতে থাকবে, তেমনই জোরালো সম্ভাবনা থাকবে আলোচনার একপর্যায়েই কোনো একটি সমাধান বের হয়ে আসার।
তাই আবারো বলছি, সমস্যা থেকে পালিয়ে বেড়ালে চলবে না, সেটিকে মোকাবেলা করতে হবে কথার মাধ্যমে।

কিছু সময় নীরবতাও কাম্য; Image Source: WikiHow
নীরবতা
আগের ধাপটি অনুসরণের ক্ষেত্রেও কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। যদি এমন দেখা যায় যে কথা অব্যহত রেখেও কোনো সমাধান খুঁজে বের করা যাচ্ছে না, বরং হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির উপর তা আরো চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন আমাদেরকে থেমে যেতে হবে। জোর করে কিছু করা যাবে না। এমনও হতে পারে যে, এই মুহূর্তে ওই ব্যক্তির কিছুটা নীরবতা কাম্য। তাকে সেই নীরবতা লাভের সুযোগ করে দিতে হবে। এমন হতে পারে যে, সে আমাদেরকে তার পাশে চাচ্ছে, কিন্তু একই সাথে সে আর কথা চালিয়ে যেতে আগ্রহী নয়। সেক্ষেত্রে আমাদের উচিৎ হবে নিশ্চুপ হয়ে তার পাশে বসে থেকে, তাকে নীরব সমর্থন যোগানো।

আলিঙ্গনে মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়; Image Source: WikiHow
স্পর্শ
মৌখিক সান্ত্বনা যখন আর কাজ করে না, তখন শারীরিক স্পর্শ বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো, হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিটির সাথে আমাদের সম্পর্ক কতটা গভীর, এবং কী ধরনের।
যদি তার সাথে আমাদের সম্পর্ক এমন হয় যে তাকে আমরা জড়িয়ে ধরলেও সে বিব্রতবোধ করবে না, তাহলে তাকে জড়িয়ে ধরা যেতে পারে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানসিক চাপে ভুগতে থাকা ব্যক্তিকে জড়িয়ে ধরলে, তার চাপ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।
কিন্তু যদি এমন হয় যে ওই ব্যক্তির সাথে আমাদের এমন সম্পর্ক যে তাকে জড়িয়ে ধরা উপযুক্ত নয়? তাহলে আমরা তার কাঁধে হাত রাখতে পারি, কিংবা নিজেদের কাঁধ তার দিকে বাড়িয়ে দিতে পারি। কাঁধ হলো নির্ভরতার প্রতীক। কারো কাঁধে হাত রাখা মানে হলো নীরবে এমনটি বলা যে, “চিন্তা কোরো না, আমি তোমার পাশে আছি।” আবার নিজের কাঁধে কাউকে মাথা রাখতে দেয়া মানেও তার ভরসাস্থল হয়ে ওঠা।
কিন্তু সম্পর্কের খাতিরে যদি এগুলোও উপযুক্ত না হয়? সেক্ষেত্রে আমরা অন্তত তার হাত ধরতে পারি। হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির হাত ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকলেও তার যন্ত্রণা অনেকাংশে লাঘব হয়।

ফোনে কিংবা ফেসবুকে যোগাযোগ রাখতে হবে; Image Source: WikiHow
যোগাযোগ বজায় রাখা
এমনটা হতেই পারে যে, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির মন ভালো করতে পারলাম না। তার সমস্যা শুরুতে যেমন ছিল, শেষ পর্যন্ত তা-ই থাকল। কিন্তু এখন সময় হয়ে গেছে আমাদের ওই স্থান ত্যাগ করার, কিংবা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার।
সেক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হলো, কিছু সময় পর আবারো তার সাথে যোগাযোগ করা। অন্তত তাকে ফোন করা কিংবা ফেসবুকে নক দেওয়া, এবং তার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া।
আমাদের মনে রাখতে হবে, হতাশাগ্রস্ত মানুষ যদি অনেক লম্বা সময় ধরে একা থাকে, তাহলে তার মধ্যে অবসাদ আরো জেঁকে বসে, এমনকি তার ভেতর আত্মহত্যার প্রবণতাও জাগতে পারে। তাই যোগাযোগ বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই।
আমরা তার সমস্যার সমাধান করতে পারিনি কিংবা তার মন ভালো করতে পারিনি, তাতে কী হয়েছে! অন্তত আমরা যে তার সমস্যাটি নিয়ে চিন্তিত, তার ভালো-মন্দ নিয়ে আমরা ভাবিত, এই বিষয়গুলো বোঝাতে পারলেও তাকে অনেক নেতিবাচক চিন্তা থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব।
সংক্ষেপে দেখুনপৌরাণিক গল্পের অস্তিত্ব নেই কেন?
মানবজাতির ইতিহাসে মানুষ কাজে ব্যস্ত থেকেছে, অলসতায় সময় কাটিয়েছে, অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করেছে। আশেপাশে কোনো ঘটনা ঘটলে সেগুলোর কারণ উদঘাটন করে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তখন বিজ্ঞান ছিল না, তাই স্বভাবতই সেসব ব্যাখ্যা পরবর্তীতে অযৌক্তিক হিসেবে গণ্য হয়েছে। ব্যাখ্যাগুলো যৌক্তিক দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য হলেও শবিস্তারিত পড়ুন
মানবজাতির ইতিহাসে মানুষ কাজে ব্যস্ত থেকেছে, অলসতায় সময় কাটিয়েছে, অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করেছে। আশেপাশে কোনো ঘটনা ঘটলে সেগুলোর কারণ উদঘাটন করে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তখন বিজ্ঞান ছিল না, তাই স্বভাবতই সেসব ব্যাখ্যা পরবর্তীতে অযৌক্তিক হিসেবে গণ্য হয়েছে। ব্যাখ্যাগুলো যৌক্তিক দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য হলেও শিল্পমানে অনন্য ছিল। একজন লেখক যখন ফ্যান্টাসি গল্প ও কল্পবিজ্ঞান লিখেন, তখন আমরা পাঠকেরা সেগুলো পড়ে বিমোহিত হই, লেখককে বাহবা দেই, কারণ সেগুলো শিল্পমানে উন্নত। হোক না কাল্পনিক, কিন্তু মনের আনন্দের খোরাক তো জোগায়। তেমনই প্রাচীনকালের মানুষদের ব্যাখ্যাগুলো বিজ্ঞানের দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য হলেও, সেগুলো এখন পর্যন্ত বেঁচে রয়েছে শিল্প-সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে। সেগুলো টিকে আছে উপকথা ও পৌরাণিক কাহিনী হিসেবে।
জগতে ঘটমান অনেক ক্ষেত্রেই পৌরাণিক গল্প-কাহিনীর দেখা পাওয়া যায়। যেমন- পৃথিবীতে মানুষ কীভাবে আসলো তা নিয়ে গ্রিক, তাসমানীয়, ভাইকিং প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। প্রাণের বৈচিত্র্য কেন আছে, তা নিয়ে উত্তর আমেরিকার হোপি, নাভাহো, পিউরো প্রভৃতি অঞ্চলে নানা উপকথা প্রচলিত আছে। মানুষ কেন এত এত ভাষায় কথা বলে তা নিয়েও পৌরাণিক ব্যাখ্যা আছে। শীত কেন আছে, গ্রীষ্ম কেন আছে, শীত-গ্রীষ্ম কেন চক্রাকারে চলতে থাকে, রাত কেন আছে, দিন কেন আছে, রাত-দিনের কেন সুনির্দিষ্ট চক্র আছে- এসব নিয়ে অস্ট্রেলীয়, কানাডীয়, গ্রিক প্রভৃতি অঞ্চলে আলাদা আলাদা উপকথা প্রচলিত আছে। সূর্য আসলে কী, সূর্য কেন উঠে, চাঁদ কেন আকৃতিতে সূর্যের সমান হয়েও সূর্যের মতো তীব্র নয় তা নিয়েও অনেক অঞ্চলে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। রংধনু, মহাবিশ্বের উৎপত্তি, ধূমকেতু, সমুদ্র, নদী, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি, বন্যা, খরা ইত্যাদি অনেক কিছু নিয়েই পৌরাণিক উপকথা বিদ্যমান আছে।
ইকারাস, উড়োজাহাজ সম্পর্কিত উপকথার নায়ক; Credit: Musée Antoine Vivenel
কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে যেগুলো সম্পর্কে অনেক খোঁজাখুঁজি করলেও কোনোপ্রকার পৌরাণিক উপকথার দেখা পাওয়া যাবে না। এমন অনেক অনেক বিষয়ের উদাহরণ দেয়া যায়। এর মধ্যে চমৎকার একটি হচ্ছে, ক্ষুদ্র জগৎ তথা মাইক্রোস্কোপিক লেভেল। ক্ষুদ্র জগৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো পৌরাণিক কাহিনী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যে সকল প্রাচীন মানুষ পৌরাণিক কাহিনীগুলোর জন্ম দিয়েছিল, তাদের ধারণাতেই আসেনি ক্ষুদ্র জগৎও চমৎকারিত্বে ভরা এবং এই জগৎ নিয়েও প্রচুর কাহিনী তৈরি করা যায়। এই ব্যাপারটি নিয়ে যদি চিন্তা-ভাবনা করা হয়, তাহলে দেখতে পাবো, এটি খুব একটা অবাক করা বিষয় নয় যে, কেন তাদের মনে ক্ষুদ্র জগৎ নিয়ে কোনো কাহিনীর জন্ম হয়নি।
রোগ শোক তথা ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাস, যৌগ, মৌল, অণু, পরমাণু ইত্যাদির ক্ষুদ্র জগৎও যে চমৎকার একটি মহাবিশ্ব, এ সম্বন্ধে জানার কোনো উপায় ছিল না তখনকার মানুষের। পৌরাণিক কাহিনী তৈরি হয়েছে বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে। যেহেতু তখনকার মানুষ ক্ষুদ্র জগত সম্বন্ধে জানতোই না, সেহেতু এই জগতের ব্যাখ্যারও প্রয়োজন পড়েনি এবং তাই কোনো পৌরাণিক কাহিনীরও জন্ম হয়নি।
ক্ষুদ্র জগত সম্বন্ধে জানার কোনো উপায় ছিল না তখনকার মানুষের; source: Chemical Oceanography Unit
ষোড়শ শতাব্দীতে অণুবীক্ষণ যন্ত্র (মাইক্রোস্কোপ) উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত ক্ষুদ্র পরিমণ্ডলে বিস্তার করা এই জগৎ সম্পর্কে কেউই জানতো না। ষোড়শ শতাব্দীর পরে মানুষ আবিষ্কার করেছে যে, পুকুর-ডোবা-খাল, মাটি-ধূলো-বালি এমনকি আমাদের নিজেদের শরীরে অতিক্ষুদ্র প্রাণেরা বসবাস করছে। এগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে, এদের আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। কিন্তু তারপরেও এরা প্রাণ বা জীব, ক্ষুদ্র বলে এদের গঠনও যে সরল হয়ে যাবে এমন না। যথেষ্ট পরিমাণ জটিল এদের গঠন ও কর্মপ্রক্রিয়া। আর এদের সকলেই বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে সৌন্দর্যময় কিংবা ভয়ঙ্কর। সুন্দর দেখাবে নাকি ভয়ঙ্কর দেখাবে, তা নির্ভর করবে আমরা তাদেরকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি তার উপর।
নিচের ছবির জীবটি ধূলোবালিতে বাস করা একধরনের অতিক্ষুদ্র প্রাণ (Mites)। শারীরিক গঠনে কিছুটা মাকড়সার মতো কিন্তু ক্ষুদ্র বলে, এদেরকে কণা বা ফুটকীর মতো বলে মনে হয়। এরকম হাজার হাজার ক্ষুদ্র জীব বাস করছে আমাদের ঘরে, কার্পেটে, বিছানায়।
ধূলোর পোকা; source: NerdHeist
আদিম মানুষেরা যদি তাদের সম্পর্কে জানতো বা ধারণা রাখতো, তাহলে এটা বলা বাহুল্য যে, তারা কী পরিমাণ পৌরাণিক গল্প আর উপকথার জন্ম দিতো এদেরকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। কিন্তু মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, ক্ষুদ্র স্কেলে এমন আশ্চর্য এক জগৎ লুকিয়ে আছে আমাদেরই চারপাশে।
এই জীবগুলো অনেক ক্ষুদ্র হলেও এরা একশত ট্রিলিয়নেরও বেশি পরিমাণ পরমাণু ধারণ করে। এর থেকে অনুমান করা যায় পরমাণু কতটা ক্ষুদ্র। দৃষ্টিগোচর হবার জন্য ধূলোর পোকা যথেষ্ট ক্ষুদ্র হলেও, এর চেয়েও অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণের অস্তিত্ব আছে। যেমন- ব্যাকটেরিয়া, এরাও একধরনের জীব এবং এরা ধূলিপোকার দেহের অভ্যন্তরে বসবাস করে। আমাদের দেহেও এরকম ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া আছে প্রচুর পরিমাণে। ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও আরো ক্ষুদ্র প্রাণের অস্তিত্ব আছে এবং এসব ক্ষুদ্র প্রাণ প্রচুর পরিমাণে বাসও করছে আমাদের শরীরে। শুধু আমাদের শরীর কেন, ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার শরীরেও বাস করছে আরো ক্ষুদ্র ভাইরাস।
কথায় আছে, বাঘের উপরেও টাগ থাকে। ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার ভেতরেও বাস করে ক্ষুদ্রতর ভাইরাস; source: John Creech Scientific
পুরো পৃথিবীটাই অবিশ্বাস্য রকমের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণ দিয়ে পরিপূর্ণ। এদের কাউকেই খালি চোখে দেখা যায় না এবং পৃথিবীর কোনো পৌরাণিক গল্পেই এদের কোনো ব্যাখ্যা নেই। প্রাচীন মানুষেরা বিশ্বাস করতো, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণবৈচিত্র্যই তৈরি করেছেন মর্ত্য ও নক্ষত্রলোকে বসবাসকারী এবং সর্ববিষয়ে জ্ঞানী দেব-দেবীরা। তাদের পুঁথিতে ক্ষুদ্র জগৎ সম্পর্কে কোনো কিছুরই কোনো দেখা নেই।খেয়াল করলে দেখা যাবে, আধুনিক বিজ্ঞানের আবিস্কার-উদ্ভাবনগুলোর কোনো উল্লেখই নেই দেবতাদের গল্প-কাহিনীতে। দেব-দেবীদের গল্প বা গ্রন্থগুলো বলে না বা বলতে পারে না যে, এই মহাবিশ্ব কত বড় কিংবা এই মহাবিশ্ব কত বছর বয়সী; তারা বলে না কীভাবে ক্যান্সারের প্রতিরোধ করতে হয়; তারা মহাকর্ষের কোনো ব্যাখ্যা দেয় না; অন্তর্দহন ইঞ্জিনের কার্যপ্রণালীর ধারণা দেয় না; তারা আমাদেরকে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু বা নিউক্লিয়ার ফিশন বা বিদ্যুৎ বা এনেস্থেটিক সম্পর্কে কোনোকিছুই বলে না।
সত্যি কথা বলতে কী, এসব গল্পকাহিনী বা গ্রন্থগুলো যখন কারো দ্বারা রচিত হয়েছিল, এগুলো তখনকার সময়ের পরের কোনো তথ্যই ধারণ করে না। রচয়িতাদের পক্ষে ভবিষ্যৎ জ্ঞানের কোনোকিছু লিপিবদ্ধ করা সম্ভব নয়। ঐ গ্রন্থগুলোতে যা আছে তা তখন পর্যন্ত প্রাপ্ত জ্ঞানের বাইরে নয়। আর ঐ সময়গুলোতে বিজ্ঞানের কোনো অগ্রগতিই ছিল না, তাই এটি খুবই স্বাভাবিক যে, এসব গ্রন্থ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুব একটা গ্রহণযোগ্য বা নির্ভুল হবে না। বাস্তবেও দেখা যায় সেটি, পৌরাণিক গল্পকাহিনীগুলোতে প্রচুর বৈজ্ঞানিক অসামঞ্জস্যতা পাওয়া যায়।
পৌরাণিক রচনায় পরবর্তী সময়ের তথ্য বা ব্যাখ্যা না থাকাটাই স্বাভাবিক; source: CILIP
আবার অন্যদিকে বিজ্ঞানও কোনো আরাধ্য বিষয় নয়। বিজ্ঞানের সাথে কোনো কিছু না মিললে সেটা অচ্ছুৎ হয়ে যাবে ব্যাপারটা এমন নয়। পৌরাণিক কাহিনীগুলো বেঁচে থাকবে তাদের কল্পনা-শিল্প-সাহিত্যের আবেদনের মাধ্যমেই। আর আধুনিক যে যে বিষয়ের উপকথা নেই, সেগুলো নিয়ে যে উপকথা তৈরি হবে না তা কিন্তু নয়। প্রশ্ন আসতে পারে, এই আধুনিক কালেও কীভাবে পুরাণ আর উপকথার জন্ম হতে পারে? আসলে উপকথা তো কোনো না কোনো কালের মানুষেরাই বানায়। প্রাচীনকালে জন্ম নেয়া উপকথাগুলোও তো তাদের সময় ‘আধুনিক’ ছিল। তাদের সময়ের প্রেক্ষিতে সেগুলো ছিল ‘বর্তমান’। এখন আমরা সেগুলোর বাস্তবতা-অবাস্তবতা নিয়ে হাসাহাসি করি। ঠিক একইভাবে আমাদের আজকের যুগের কোনো অন্ধবিশ্বাসও তো হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হাস্যকর উপকথা।
সংক্ষেপে দেখুনসবুজ পৃথিবীর স্বপ্নে বাগানের ধারণা কতটা গুরুত্ব রাখে?
ছোটবেলায় ইংরেজি বিষয়ে অনুচ্ছেদ লেখায় যখন শখের কথা বলতে হতো আমাদের, তখন একটি বহুল প্রচলিয় শখের কথা শোনা যেত মুখে মুখে- বাগান করা। বাড়ির সামনে একটি ছোট্ট বাগান, সেখানে নানা রঙের ফুল আর সবজির সমারোহ। এমন ভাবনা স্বপ্নে দেখা আর সেটা সত্যি করে তোলায় আজকাল ফারাক থেকে যায় শহুরে বাস্তবতায়। কংক্রিটের নগরীতে সবিস্তারিত পড়ুন
ছোটবেলায় ইংরেজি বিষয়ে অনুচ্ছেদ লেখায় যখন শখের কথা বলতে হতো আমাদের, তখন একটি বহুল প্রচলিয় শখের কথা শোনা যেত মুখে মুখে- বাগান করা। বাড়ির সামনে একটি ছোট্ট বাগান, সেখানে নানা রঙের ফুল আর সবজির সমারোহ। এমন ভাবনা স্বপ্নে দেখা আর সেটা সত্যি করে তোলায় আজকাল ফারাক থেকে যায় শহুরে বাস্তবতায়। কংক্রিটের নগরীতে সংকীর্ণ জায়গায় বাগান করার ধারণা বেশ চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ঠেকে। কিন্তু পৃথিবী যখন জলবায়ু সংকটের মতো ভয়াবহ এক পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তখন সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তব করে তোলা বেশ জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই ভাবনায় বাগান করা ঠিক কতটা গুরুত্ব বহন করতে পারে- এই লেখায় জানা যাক সেই ব্যাপারে।
গাছ লাগানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
গাছের ছাউনিগুলো একটি শারীরিক ছাকঁনি হিসেবে কাজ করে। এরা ধুলো আটকায়, এবং বায়ু থেকে দূষক শোষণ করে। গাছ সৌর বিকিরণ থেকে ছায়া প্রদান করে এবং শব্দ কমায়।
গবেষণা বলছে, আপনি যদি গাছ এবং সবুজে ঘেরা স্থানে মিনিটখানেকও অবস্থান করেন, তাহলে আপনার রক্তচাপ কমতে থাকবে, এবং হৃদস্পন্দন ধীর হবে। একইসাথে আপনাকে মানসিক প্রশান্তিও এনে দিতে সক্ষম গাছ।

আপনি যদি গাছ এবং সবুজে ঘেরা স্থানে মিনিটখানেকও অবস্থান করেন তাহলে মানসিক প্রশান্তি পাবেন। Image Courtesy : http://www.birstall.co.uk Caption
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি গাছ লাগানোর মতো উদ্যোগ জলবায়ু সংকট মোকাবেলা করার জন্য বায়ুমণ্ডল থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাইঅক্সাইড বের করে নেওয়ার সবচেয়ে বড়, এবং সুলভ উপায়গুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিটি পৃথক গাছ প্রতি বছর ১.৭ কেজি পর্যন্ত কার্বন অপসারণ করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই গাছ লাগানোর উদ্যোগে ফসলি জমির ক্ষতি করা যাবে না। শহুরে এলাকায় বাস্তবায়ন করতে হবে সবুজায়নের এই প্রচেষ্টা। বাগান করা তাই হতে পারে এই উদ্যোগের সহজ সমাধান।
কার্বন ডাইঅক্সাইডকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হয়। মানুষের নানা কার্যকলাপের দরুন বায়ুমন্ডলে এর উপস্থিতি ক্রমশই বাড়ছে। একটি গাছ যত বড় হতে থাকে, এই কার্বন ডাইঅক্সাইড সঞ্চয় ও শোষণের ক্ষমতা বাড়তে থাকে তার।
গাছ বাতাসের গতি কমিয়ে একে শীতল করে। এর পাতা সূর্যের তাপ প্রতিফলিত করে। এতে কমে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা। অনুমান করা হয়, গাছ একটি শহরের তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে পারে।

গাছ শহরের তাপমাত্রাও কমাতে সক্ষম; Image Courtesy : Asean Foundation
শুধুই গাছ লাগানো বাগান করা নয়
দেখতে যেমনই হোক, পৃথিবীর সকল বাগানই প্রায় একই ভিত্তির উপরই তৈরি। বাগান করার মূল উপাদানগুলো সেখানে থাকবেই।
বাগান করার অর্থ শুধু চারা লাগানোই নয়। কিংবা সৌন্দর্যের ভাবনা থেকেই বাগান করা হয়- এমন ভাবনাও অমূলক। বরং এর সংজ্ঞা বেশ বিস্তৃত পরিসর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। সংশ্লিষ্ট স্থানের মাটি, পোকামাকড়, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ এসব কিছুই একটি বাগানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। একটি বাগান স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের উন্নতিতে দারুণ প্রভাব রাখতে পারে। একইসাথে এটি দূষণ কমাতে এবং উষ্ণায়নের বিরুদ্ধেও বেশ কার্যকর। প্রকৃতির প্রতিটি বিষয়ের সাথে নিবিড় সম্পর্কে মিশে থাকে বাগানের নাম।
এ কারণেই যদি আপনার লক্ষ্য হয়ে থাকে শুধু গাছের বৃদ্ধি, তাহলে সেটি হবে হতাশার। কারণ সেখানে অর্থনৈতিক চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ ফুটে ওঠে। কিন্তু প্রকৃতির ভাবনায় লক্ষ্যের জায়গাতে আনতে হবে পরিবর্তন, চিন্তার পরিধিকে করে তুলতে হবে বিস্তৃত। জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে এবং সবুজ পৃথিবীর স্বপ্নকে সত্যি করে তুলতে বাগানকে করে তুলতে হবে পরিবেশ ও প্রাণীবান্ধব।
বাগানে গাছ লাগানো কতটা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে?
বৈশ্বিক উষ্ণতা কার্বন ডাইঅক্সাইডের মতো অত্যধিক গ্রিনহাউজ গ্যাসের কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই গ্যাস বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখে। সময়ের সাথে সাথে এই উষ্ণতা ব্যাপক জলবায়ু পরিবর্তনে অবদান রাখে, যার ফলে বরফের টুকরো গলে যেতে পারে, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে পারে, এবং ক্রমবর্ধমান তীব্র ঝড় ও দাবানল হতে পারে।
আপনার ছোট্ট জমিতে কয়েকটি গাছ, গুল্ম, ফুল এবং শাকসবজি রোপণ করা এই প্রভাবকে প্রশমিত করতে সহায়তা করতে পারে। বাড়ির উঠোনে করা বাগানের গাছগুলো পরিমাণে কম হলেও কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণে সক্ষম। এমন ছোট্ট জায়গায় বপন করা গাছের চারা খুব একটা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে না। কিন্তু আমরা এখন যে পরিস্থিতিতে আছি, সেটা আমলে নিলে প্রতিটি সামান্য পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একটি গাছের চারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে; Image Courtesy : Billion Tree Initiative
যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম বনভূমি সংরক্ষণ বিষয়ক দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘উডল্যান্ড ট্রাস্ট’ এর উডল্যান্ড আউটরিচ ডিরেক্টর জন টাকার বলছেন, “একটি গাছের চারা হয়তো কোনো পার্থক্য তৈরি করবে না, কিন্তু যদি ১ কোটি মানুষ একটি করে গাছ লাগায় তাহলে সেটি অবশ্যই পার্থক্য গড়ে দিতে সক্ষম। ” লোকেরা যদি মনে করে যে তারা কিছু করতে চায়, তাহলে সঠিক জায়গায় একটি গাছ লাগানো একটি ভালো কাজ বলে মত দিয়েছেন টাকার।
আপনার নিজের জন্য খাদ্যের জোগান দেওয়া আপনার পরিবেশগত প্রভাবকেও কমিয়ে দিতে পারে, কারণ এর অর্থ হলো মুদি দোকানে কম যেতে হয়। বাজারে কিংবা সুপারশপ থেকে কেনা সবজি ও ফল প্রায়ই দূরের এলাকা থেকেই আসে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য আমদানি করা পণ্যের চেয়ে পরিবেশের জন্য সর্বদা ভাল।
এগুলোর পরিবহনে জ্বালানী শক্তি ব্যয় হয়। এটি একইসাথে উচ্চ কার্বন ফুটপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিবেশে দূষণ ছড়াচ্ছে। কিন্তু নিজের বাগানেই যদি সেই সবজি বা ফল উৎপাদন করা সম্ভব হয়, তাহলে নিজের খাবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পরিবেশেও রাখা যাবে ইতিবাচক প্রভাব।
জন টাকার মানুষকে আমদানির মাধ্যমে এসেছে এমন গাছ কেনা থেকে বিরত থেকে নিজ দেশ বা এলাকায় জন্মানো গাছের চারা লাগানোর উপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলছেন, “আমদানী করা গাছ কিনতে লোকেদের উৎসাহিত করা এড়াতে চাই। কারণ এটি রোগের ঝুঁকি নিয়ে আসে।”
চাইলেই বাগানে সব গাছ লাগানো যায় না। আবার বাগানের আকারভেদেও চারা লাগানো নির্ভর করে। আপনি যেখানে থাকেন, সেখানে কোন প্রজাতির গাছের বৃদ্ধি ভালো হবে, এবং এটি কত বড় হতে পারে সেই সম্পর্কে আপনাকে ভাবতে হবে। জন টাকার বলছেন, “আপনার পেছনের দরজার বাইরে দুই ফুট একটি ওক গাছ লাগিয়ে কোনো লাভ নেই- এটি আপনার বাড়ির ক্ষতি করবে।”

বাগানে কী গাছ লাগাচ্ছেন সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত; Image Courtesy :cwf-fcf
তার মতে, বাগান করার ক্ষেত্রে বাড়ির ভিত্তি, ভূগর্ভস্থ ড্রেন, ওভারহেড পাওয়ার লাইন সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে, এবং নিশ্চিত করতে হবে যে গাছটি এমন জায়গায় থাকবে যেখানে এটি বাড়তে পারে, এবং কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। আপনার প্রতিবেশীদের উপর প্রভাব সম্পর্কেও চিন্তা করতে হবে। ছোট প্রজাতির মধ্যে আপেল গাছ বা রোয়ান অন্তর্ভুক্ত।
শুধু রোপণের কাজকে এই প্রক্রিয়ার শেষ হিসেবে দেখা উচিত নয়। সদ্য রোপণ করা গাছের জন্য পরিচর্যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যত্ন ছাড়াই আমরা এমন অনেক গাছ রোপণ করতে পারি যেগুলো অকালেই মারা যায়, বা এমন আকারে বাড়ে না যেখানে তারা কার্বন শোষণ করার মতো সুবিধা প্রদান করতে পারে।
সংক্ষেপে দেখুনসময় পরিভ্রমণ কি সম্ভব?
কেমন হতো, যদি টাইম মেশিনে করে সহজেই ফিরে যেতে পারতাম ছেলেবেলায়। আবার পেতাম নির্ঝঞ্ঝাট সহজ-সরল জীবন। কিংবা যদি এক লাফে দশ বছর পরের ভবিষ্যতে চলে যেতাম, আর পড়াশোনার ঝামেলায় পড়তে হতো না, তা-ই না? কিন্তু, সেরকম কি আসলে সম্ভব? ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া সাড়া জাগানো মুভি Predestination নিশ্চয়ই অনেকেই দেখেছেন। বিস্তারিত পড়ুন
কেমন হতো, যদি টাইম মেশিনে করে সহজেই ফিরে যেতে পারতাম ছেলেবেলায়। আবার পেতাম নির্ঝঞ্ঝাট সহজ-সরল জীবন। কিংবা যদি এক লাফে দশ বছর পরের ভবিষ্যতে চলে যেতাম, আর পড়াশোনার ঝামেলায় পড়তে হতো না, তা-ই না? কিন্তু, সেরকম কি আসলে সম্ভব?
২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া সাড়া জাগানো মুভি Predestination নিশ্চয়ই অনেকেই দেখেছেন। টাইম মেশিনে করে সহজেই কীভাবে অনেক বছর অতীতে চলে যাওয়া যায়, কীভাবে নিজের বাচ্চাকালকে চোখের সামনে দেখা যায়। যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই ধরেই নিয়েছেন যে, এসব নিছকই সায়েন্স ফিকশন! বাস্তবে অতীত বা ভবিষ্যতে আবার যাওয়া যায় নাকি! সে প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবো আজ আমরা। বিজ্ঞানের আলোকে বোঝার চেষ্টা করবো- আসলেও সময় পরিভ্রমণ সম্ভব কি না।

সময় পরিভ্রমণ- সম্ভাবনা ও বাস্তবতা; image source: writeup.in
সময় পরিভ্রমণ বলতে সহজ ভাষায় অতীতে বা ভবিষ্যতে যেতে পারাকে বোঝায়। আমি যদি ২০০০ সালে ফিরে যেতে পারি বা ২০৩০ সালের পৃথিবীতে চলে যেতে পারি, তবে তাকে সময় পরিভ্রমণ বলবে। শুনতে যতটা সহজ লাগছে বাস্তবে কিন্তু সেটা ততটা সহজ না। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন! ততটা সহজ না, তবে অসম্ভব কিছুও না! টাইম ট্রাভেল কীভাবে সম্ভব তা জানতে হলে আমাদের একটু গভীরে যেতে হবে। জেনে আসতে হবে সময় পরিভ্রমণ নিয়ে বিজ্ঞানের কিছু তত্ত্ব।
সময় পরিভ্রমণ বোঝার জন্য আপনাকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা ও আলোর গতিসূত্র বুঝতে হবে। আইনস্টাইন সময় জিনিসটাকে আলোর মাধ্যমে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন। কোনো বস্তু যত দ্রুত গতিতে চলবে, তার সাপেক্ষে সময় তত স্থির হয়ে থাকবে। অর্থাৎ, আপনি যদি আলোর কাছাকাছি গতিতে চলতে পারেন, তবে আপনার সাপেক্ষে সময় প্রায় স্থির থাকবে। আপনি দুই ঘন্টা ভ্রমণ করে আসার পর দেখবেন পৃথিবীতে হয়তো এর মাঝে দুই বছর সময় চলে গিয়েছে! এ তো গেল আলোর কাছাকাছি গতিতে ভ্রমণ করতে পারলে কী হবে সেই কথা। আর আলোর চেয়ে দ্রুতগতিতে যেতে পারলে আপনি সময়কেই অতিক্রম করে ফেলতে পারবেন!
একটি সহজ উদাহরণ দেয়া যাক। মনে করুন, আপনি পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের কোনো একটি নক্ষত্রকে টেলিস্কোপ দিয়ে দেখছেন। এই মুহূর্তে আপনি যে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রটি দেখছেন সেটি কিন্তু নক্ষত্রটির বর্তমান অবস্থা না। আমরা কোনো বস্তু তখন দেখতে পাই যখন সেটি থেকে আলো এসে আমাদের চোখে পড়ে। অর্থাৎ, এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে থাকা সেই নক্ষত্রটি থেকে আলো এসে পৃথিবীতে পৌঁছাতে এক লক্ষ বছর লেগেছে। আপনি এই মুহুর্তে নক্ষত্রটিকে যেমন দেখছেন সেটি আপনার কাছে বর্তমান হলেও, নক্ষত্রটির কাছে সেটি এক লক্ষ বছর অতীতের ঘটনা।
এখন, কল্পনা করে নিন, সেই নক্ষত্রটি ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সেখানে বাস করা একটি এলিয়েন ১ লক্ষ আলোকবর্ষ/সেকেন্ড গতিতে পৃথিবীতে চলে আসলো। সে আসার পরও কিন্তু সে নক্ষত্রটিকে একই অবস্থায় দেখতে পাবে পৃথিবী থেকে। তারও এক লক্ষ বছর পর পৃথিবীবাসীরা সেই নক্ষত্রকে ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে যেতে দেখবে। তাহলে এ থেকে আমরা কী বুঝলাম? পৃথিবীবাসীরা যা এক লক্ষ বছর পর দেখবে, যা তাদের কাছে এক লক্ষ বছর ভবিষ্যতের ঘটনা, সেই ঘটনাটি পৃথিবীতে চলে আসা এলিয়েনের কাছে নিকট অতীত!

স্পেস-টাইম ফেব্রিক; image source: nasa.org
এখন, এখানে একটি ছোট সমস্যা রয়ে গেছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তো খুব করে বললাম, এলিয়েনটি এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরত্ব এক সেকেন্ডে চলে আসবে। কিন্তু, তা কি আদৌ সম্ভব? উত্তর, সম্ভব নয়। আইনস্টাইনের সূত্রমতে, আলোর গতি ধ্রুব এবং কোনো কিছুই আলোর চেয়ে অধিকতর গতিশীল হতে পারবে না। সেই হিসেবে এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরত্বও এক মুহূর্তে অতিক্রম করা সম্ভব না। তাহলে ভবিষ্যতে পরিভ্রমণ করার উপায় কী? আসুন, এবারে আর দ্বিধায় না রেখে সহজে বুঝিয়ে দেই।
আমরা কোনো বিন্দুর অবস্থান বের করি XYZ অক্ষ দ্বারা। অর্থাৎ, দৈর্ঘ্য নির্ণয়ে X, প্রস্থ নির্ণয়ে Y আর উচ্চতা নির্ণয়ে Z অক্ষ ব্যবহার করি। কিন্তু কোনো ঘটনার প্রকৃত অবস্থান জানতে এ তিনটি মাত্রা বাদেও আরেকটি মাত্রার প্রয়োজন। তা হলো সময়। এ চতুর্থ মাত্রাকে আইনস্টাইন স্পেস-টাইম বলেছেন। এখন, মহাবিশ্বে জালের মতো ছড়ানো যে স্পেস টাইম ফেব্রিক রয়েছে, তা দিয়ে সময়/আলো প্রবাহিত হয়। যেহেতু আলোর গতিকে অতিক্রম করা সম্ভব না, সেহেতু আমাদের সময় পরিভ্রমণের জন্য বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে। একটি ব্যবহারিক উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি। একটি কাগজের পৃষ্ঠা হাতে নিন। পৃষ্ঠাটির বরাবর উপরে নিচের দুই প্রান্তে দুটি আলাদা ফুটো করুন। এবারে মাঝ বরাবর পৃষ্ঠাটি দুই ভাঁজ করে কী দেখতে পেলেন? ফুটো দুটি একসাথে লেগে আছে, তাই তো? এবার পৃষ্ঠাটি আবার আগের মতো খুলে ধরুন। খুলে রাখা পৃষ্ঠায় দুটি ছিদ্র যতটা দূরে, ভাঁজ করা পৃষ্ঠার ক্ষেত্রে বলতে গেলে তা একদমই নেই।

ওয়ার্মহোল; image source: sciencenews.uk
এখন যদি এই পৃষ্ঠাটিকে আমরা একটি স্পেস-টাইম ফেব্রিক হিসেবে কল্পনা করি তাহলে বুঝতে পারি, স্বাভাবিকভাবে দুটি ঘটনা বিন্দু অনেক দূরত্বে থাকলেও, ফেব্রিকের সংকোচনের ফলে দুটি ঘটনা বিন্দুকে খুব অল্প দূরত্বে নিয়ে আসা সম্ভব। অর্থাৎ, সাধারণভাবে যে ঘটনা বিন্দুটি অনেক পরে দেখতে পাওয়ার কথা, সেখানে শর্টকাটে অনেক আগেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। এ ধারণার উপর ভিত্তি করেই ওয়ার্মহোল বা সময় সুড়ঙ্গের ধারণাটি এসেছে।
ওয়ার্মহোল হচ্ছে এমন একটি ক্ষুদ্র সুড়ঙ্গ, যা অনেক অনেক আলোকবর্ষ দূরের দুটি ঘটনা বিন্দুকেও স্পেস ফেব্রিকের সংকোচনের মাধ্যমে খুব কাছাকাছি দূরত্বে নিয়ে আসে। সুতরাং, ওয়ার্মহোলের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে আলোর অধিক গতিবেগ ছাড়াই ভবিষ্যৎ পরিভ্রমণ সম্ভব। প্রশ্ন থাকতে পারে, এখন পর্যন্ত কেউ ওয়ার্মহোলে করে কেন তাহলে ভবিষ্যত ভ্রমণ করেনি। এর উত্তর হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, মহাবিশ্বে ওয়ার্মহোল খুব মাঝে মাঝে সামান্য কিছু সময়ের জন্য আবির্ভূত হয়। তাছাড়াও এ ওয়ার্মহোলগুলোর ব্যাস হয় এক সেন্টিমিটারের লক্ষ কোটি ভাগের কম। সুতরাং এত কম সময় স্থায়ী ও এত ক্ষুদ্র ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করা প্রায় অসম্ভব! সুতরাং, ভবিষ্যত পরিভ্রমণ তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবিকভাবে এখন পর্যন্ত ভবিষ্যত পরিভ্রমণ করার মতো প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি।

চতুর্থ মাত্রা; image source: space.org
ভবিষ্যত পরিভ্রমণ নিয়ে আলোচনা গেল। এবার আসা যাক অতীত পরিভ্রমণে। তাহলে তো অতীত পরিভ্রমণও একইভাবে ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে করা যাবে, তাই না? উত্তর, না। এখানে দুটি ঝামেলা আছে। এই ঝামেলাগুলোকে ‘সেলফ কনসিস্টেন্সি থিওরি’ ও ‘গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স থিওরি’ বলে।
আমি ভবিষ্যতে গিয়ে যদি সব ভেঙেচুরে একাকার করে ফেলি, তাহলে সেটি বড় কোনো প্রাকৃতিক সমস্যা দাঁড় করাবে না। আমি ১০০ বছর ভবিষ্যতে গিয়ে ভাংচুর করে চলে আসার পর, স্বাভাবিকভাবে ১০০ বছর পরের ভবিষ্যতে এই ঘটনাটিই হবে। কিন্তু সমস্যা হবে অতীতে গিয়ে কোনো অদ্ভুত ঘটনা ঘটালে। মনে করুন, ১৯৪৬ সালের ৬ জুলাইয়ে আমি গিয়ে যদি সদ্য জন্ম নেয়া জর্জ বুশকে মেরে ফেলি, তাহলে আবার বর্তমানে এসে বুশকে কীভাবে দেখবো? সে তো জন্মের দিনই মারা গিয়েছিল, তা-ই না? জটিল লাগছে খুব? এ প্রশ্নের উত্তরই আছে দুটি থিওরিতে।
আসুন দেখে নেই থিওরি দুটির মূলকথা।
সেলফ কনসিস্টেন্সি থিওরি: এ থিওরি অনুযায়ী, কেউ অতীত ভ্রমণ করলেও সে প্রকৃতির কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না। প্রকৃতি তাকে কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে দেবে না। কেউ চাইলে ওয়ার্মহোলে করে অতীতে গিয়ে ঘুরে আসতে পারবে, সবকিছু দেখতে পারবে, কিন্ত কোনো ঘটনায় প্রভাব রাখতে পারবে না। ছায়ার মতো শুধুই দর্শনার্থী হয়ে থাকতে হবে। সুতরাং, এক্ষেত্রে কোনো ঘটনার পরিবর্তন বা কোনো ধরনের প্যারাডক্স সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।

প্যারালাল ইউনিভার্স; image source: space.com
গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স: ধরে নিচ্ছি, আমি ৮০ বছর অতীতে গিয়ে দেখলাম আমার দাদা কাদা মাখামাখি করে হা-ডু-ডু খেলছে। এখন, আমি যদি সাথে করে নিয়ে যাওয়া রিভলবার দিয়ে আমার দাদাকে গুলি করে মেরে ফেলি, তাহলে আমি আসবো কোথা থেকে? আমার দাদা যদি শিশু বয়সে মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে তো তার আর বিয়েও হবে না। তার ছেলে, মানে আমার বাবাও পৃথিবীতে আসবে না কোনোদিন। আমার বাবা যদি জন্মই না নেয় তাহলে তো আমারও জন্ম নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্ত আমি তো আছি! তাহলে আমি আসলাম কোথা থেকে! অতীত পরিভ্রমণ সম্পর্কিত এই গোলমেলে সমস্যাকে বলে গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স।
এ সমস্যা সামনে আসার পর বিজ্ঞানীরা এর আপাত সমাধান হিসেবে প্যারালাল ইউনিভার্সের কথা বলেছেন। প্যারালাল ইউনিভার্স থিওরি মতে, প্রতিটি ঘটনার অসংখ্য সম্ভাবনা থাকতে পারে। অর্থাৎ, একই ধরনের ঘটনা আরো অনেকগুলো ইউনিভার্সে থাকা সম্ভব। দুটি সমান্তরাল রেখার যেভাবে কখনো দেখা হয় না, একইভাবে দুটি প্যারালাল ইউনিভার্সেরও কখনো দেখা হবে না। দুটি সমান্তরাল রেখার মাঝে ছোট আরেকটি রেখা টেনে যেভাবে দুটি রেখাকে যুক্ত করা যায়, একইভাবে ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে দুটি প্যারালাল ইউনিভার্সের মাঝে ভ্রমণ করা হয়। সুতরাং, আপনি অতীতে যেতে চাইলে কখনোই আপনার নিজের ইউনিভার্সের অতীতে যেতে পারবেন না। আপনি ওয়ার্মহোলে ঢোকামাত্র অন্য কোনো প্যারালাল ইউনিভার্সে চলে যাবেন। সেখানে গিয়ে আপনি আপনার দাদাকে হত্যা করলেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ সেই ইউনিভার্সের ভবিষ্যতে আপনার কোনো অস্তিত্বই নেই!

গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স; image source: alltop.com
এই ছিলো মোটামুটি সময় পরিভ্রমণ নিয়ে আলোচনা। XYZ অক্ষের মতো হয়তো বা একদিন সময়কেও মানুষ নিজের মতো করে ভ্রমণের কাজে ব্যবহার করতে পারবে। বিজ্ঞানের বহুর্মুখী অগ্রযাত্রার নিরিখে বলতে পারি, আপাতত সম্ভব না হলেও, হয়তো সেই দিন আর বেশি দূরে নয়!
উদ্ভিদরা নাকি রান্না-বান্না করে খায়!! ঘটনা কি সত্যি ?
উদ্ভিদের রান্না-বান্না? নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে? কিন্তু সত্যিই উদ্ভিদের রয়েছে নিজস্ব রসুইঘর বা রান্নাঘর। যেখানে রান্না হয় উদ্ভিদের খাদ্য উৎপাদনের জন্য। আমাদের রান্নাঘরের মতো সে রান্নায়ও প্রয়োজন হয় নানা উপাদানের। রান্নার প্রয়োজনে উদ্ভিদকেও বাজার সারতে হয়, মানে খাবারের কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়। সেটাকে আবাবিস্তারিত পড়ুন
উদ্ভিদের রান্না-বান্না? নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে? কিন্তু সত্যিই উদ্ভিদের রয়েছে নিজস্ব রসুইঘর বা রান্নাঘর। যেখানে রান্না হয় উদ্ভিদের খাদ্য উৎপাদনের জন্য। আমাদের রান্নাঘরের মতো সে রান্নায়ও প্রয়োজন হয় নানা উপাদানের। রান্নার প্রয়োজনে উদ্ভিদকেও বাজার সারতে হয়, মানে খাবারের কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়। সেটাকে আবার রান্নাঘরেও পৌঁছে দিতে হয়। সেই রান্নায় তাপের প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় জ্বালানীরও।
তো কোথায় সেই রসুইঘর? কীভাবেই বা রান্না হয় তাতে? আর জীবজগৎ সেই রান্নার উপর নির্ভরশীলই বা কীভাবে?
উদ্ভিদের রসুইঘরের অবস্থান উদ্ভিদের পাতায়। বাজার মানে খাদ্য সংগ্রহ করে উদ্ভিদের শেকড়। আর বিভিন্ন কোষ-কলা তা পৌঁছে দেয় রান্নাঘর মানে পাতায়। সেখানে সূর্যের তাপে চলে রান্না। সেই রান্নায় জ্বালানীর মতো প্রয়োজন হয় কার্বন ডাই অক্সাইড। সেই রান্না থেকেই উৎপাদিত হয় অক্সিজেন মানে আমাদের নিঃশ্বাস!
জাইলেম ও ফ্লোয়েম টিস্যু: খাবার আনা নেওয়া যাদের কাজ
তো বলছিলাম উদ্ভিদকে বাজার করতে হয়, আবার সে বাজার যেমন পাতায় পৌঁছে দিতে হয়, তেমনি পাতা থেকে সরবরাহ করতে হয় পুরো উদ্ভিদের আনাচে-কানাচে। এই কাজটি করে জাইলেম ও ফ্লোয়েম টিস্যু। জাইলেম টিস্যুগুলোকে বলা হয় জটিল টিস্যু, কারণ এই টিস্যুগুলো নির্দিষ্ট কোনো কাজ নিয়ে বসে থাকে না, বরং একাধিক কাজ করে থাকে। জাইলেম শব্দটি এসেছে গ্রিক Xylos থেকে, যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘কাঠ’। উদ্ভিদের কাণ্ডকে দৃঢ়তা দেওয়ার জন্য এই টিস্যুর ভূমিকা আছে। জাইলেম টিস্যু মাটি থেকে শেকড়ের সংগ্রহ করা পানি ও খনিজ পাতায় বহন করে নিয়ে আসে।

উদ্ভিদের বিভিন্ন জায়গায় জাইলেম ও ফ্লোয়েম টিস্যুর অবস্থান; Image Source: bbc.co.uk
আবার ফ্লোয়েম টিস্যুুর কাজ হচ্ছে পাতায় উৎপাদিত খাবার উদ্ভিদের আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেওয়া। জাইলেম ও ফ্লোয়েম টিস্যুুকে একত্রে বলা হয় ভাস্কুলার বান্ডল বা সংবহনতন্ত্র। আর এই সংবহনতন্ত্র যে পদ্ধতিতে খাবার পৌঁছে দেয়, সে পদ্ধতিকে বলা হয় অসমোসিস বা অভিস্রবণ পদ্ধতি।
স্টোমেটা: রসুইঘরের দুয়ার
স্টোমেটা (একবচনে স্টোমা) হচ্ছে পাতার উপরে এবং নিচের ত্বকে অবস্থিত সূক্ষ্ম দুয়ার, বাংলায় যাকে বলা হয় পত্ররন্ধ। এই পত্ররন্ধ দুইটি রক্ষীকোষ দিয়ে পরিবেষ্টিত থাকে। উদ্ভিদের বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যেমন- প্রস্বেদন ও সালোকসংশ্লেষণ সমাধা হওয়ার পেছনে এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। স্টোমেটার মাধ্যমেই উদ্ভিদ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড ভেতরে নেয় এবং উৎপাদিত অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে পাঠায়। আবার এর মাধ্যমেই উদ্ভিদের শ্বসন বা প্রস্বেদন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়।

চিত্রের ছোট ছোট দুয়ারগুলোই স্টোমেটা; Image Source: socratic.org
সালোকসংশ্লেষণ: উদ্ভিদের রান্নার রেসিপি
সালোকসংশ্লেষণ বা ফটোসিনথেসিসকে তুলনা করা যায় উদ্ভিদের রান্নার রেসিপি হিসেবে। এককথায় উদ্ভিদের খাবার তৈরির পদ্ধতিকেই বলা হয় সালোকসংশ্লেষণ। যদিও সালোকসংশ্লেষণের দু’টি পদ্ধতি আছে, অক্সিজেনিক ও অ্যানোক্সিজেনিক, তবে অ্যানোক্সিজেনিক পদ্ধতির ব্যবহার নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়া ছাড়া অন্য কোথাও দেখা যায় না। এবার তাহলে জানা যাক অক্সিজেনিক সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের খাবার তৈরির কথা।

যেভাবে উৎপাদিত হয় উদ্ভিদের খাবার; Image Source: ducksters.com
উদ্ভিদের খাবার রান্নায় যা যা প্রয়োজন হয়,
১) কার্বন ডাই অক্সাইড,
২) পানি,
৩) সূর্যের আলো।
সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় ছয় অণু কার্বন ডাই অক্সাইড ও বারো অণু পানির সাথে সূর্যালোকের সংশ্লেষণের পর উৎপন্ন হয় এক অণু কার্বোহাইড্রেট বা গ্লুকোজ, ছয় অণু পানি ও ছয় অণু অক্সিজেন। বিক্রিয়াটি হচ্ছে-
এখানে দেখা যাচ্ছে, উদ্ভিদ যে কয়টি কার্বন ডাই অক্সাইড অণু গ্রহণ করেছে, তার সমপরিমাণ অক্সিজেনে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রভাবক হলো ক্লোরোফিল। এর অবস্থান ক্লোরোপ্লাস্ট নামক সবুজ প্লাস্টিডের অভ্যন্তরে। তবে সবুজ বর্ণের উদ্ভিদ ছাড়া অন্য উদ্ভিদগুলো আরো বিভিন্ন ধরনের যৌগ- ক্যারোটিন, জ্যান্থোফিল ইত্যাদির মাধ্যমে সালোকসংশ্লেষণ ঘটাতে পারে।
ক্লোরোপ্লাস্ট: উদ্ভিদের রান্নাঘর
ক্লোরোপ্লাস্টকে তুলনা করা যায় রান্নার সুপরিকল্পিত কাঠামো কিংবা রান্নাঘরের সাথে, যেখানে উদ্ভিদের খাবার উৎপাদনের মূল কার্যটি সমাধা হয়। ক্লোরোপ্লাস্টের অবস্থান পাতার মেসোফিল টিস্যুর ভেতরে। মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন প্রায় একই রকম। এর রয়েছে তিনটি মেমব্রেন সিস্টেম- আউটার মেমব্রেন, ইনার মেমব্রেন ও থাইলাকোয়েড মেমব্রেন। আউটার মেমব্রেন ও ইনার মেমব্রেনের মধ্য সামান্য ফাঁকা জায়গা থাকে, যাকে বলা হয় ইন্টারমেমব্রেন স্পেস। আর থাইলাকোয়েড মেমব্রেনটি জটিল আকারে ভাঁজ হয়ে ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করে, যাকে বলা হয় থাইলাকোয়েড। বেশকিছু থাইলাকোয়েড স্তুপাকারে টেবিলে সাজিয়ে রাখা বইয়ের আকার ধারণ করে, একে একত্রে বলা হয় গ্রানাম।

ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন; Image Source: venngage.com
ক্লোরোপ্লাস্টের এই থাইলাকোয়েডগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ক্লোরোফিল নামক রঞ্জক পদার্থ অবস্থান করে। উদ্ভিদের রান্নার মূল কারিগর তারাই। এই ক্লোরোফিলের সবুজ রঙের জন্যই ক্লোরোপ্লাস্ট এমনকি গাছের পাতার রং সবুজ দেখায়।
ক্লোরোফিল: রান্নার মূল কারিগর
উদ্ভিদের রান্নার আয়োজনে ক্লোরোফিলের ভূমিকা মুখ্য। ক্লোরোফিলের দু’টি অংশের একটি হচ্ছে পোরফাইরিন রিং। এই রিং গঠিত হয় চারটি নাইট্রোজেন পরমাণু ও একটি ম্যাগনেসিয়াম পরমাণুর সমন্বয়ে। ম্যাগনেসিয়াম পরমাণুটি অবস্থান করে চারটি নাইট্রোজেন পরমাণুর কেন্দ্রে। আরেকটি অংশ হচ্ছে হাইড্রোকার্বন লেজ। এই লেজের মাধ্যমে ক্লোরোফিল থাইলাকোয়েড ঝিল্লির সাথে যুক্ত থাকে।


ক্লোরোফিলের গঠন; Image Source: chem.ucla.edu
থাইলাকোয়েড ঝিল্লির উপর তিন থেকে চারশো’ ক্লোরোফিল এবং অন্য কিছু রঞ্জক অণু মিলে একটি স্বতন্ত্র ফটোসিস্টেম তৈরি করে। প্রতিটি ফটোসিস্টেমে থাকে একটি রিঅ্যাকশন সেন্টার বা বিক্রিয়া কেন্দ্র।
ক্লোরোফিলের একটি ফটোসিস্টেম; Image Source: writeopinions.com
ক্লোরোফিল প্রথমত যে কাজটি করে, তা হচ্ছে সূর্যের আলো থেকে ফোটন শোষণ। ক্লোরোফিলের ইলেকট্রনগুলো যখন ফোটন শোষণ করে, তখন সেগুলোর শক্তিস্তরে পরিবর্তন আসে এবং ইলেকট্রন উচ্চ শক্তিস্তরে উন্নীত হয়।
এসময় উচ্চ শক্তিস্তরে থাকা ইলেকট্রনগুলো তাদের অতিরিক্ত শক্তি ফোটন আকারে বের করে দেয় এবং পাশের ক্লোরোফিলগুলো সেই ফোটন গ্রহণ করে। এই গ্রহণকৃত ফোটন আবার তারাও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় আরেকটি ক্লোরোফিলের দিকে ছুঁড়ে দেয়। ছোঁড়াছুঁড়ির এক পর্যায়ে তা এসে পৌঁছায় ফটোসিস্টেমের বিক্রিয়া কেন্দ্রে, যেখানে রয়েছে বিশেষ ধরনের রঙ্গক অণু প্রাথমিক ইলেকট্রন গ্রাহক (Primary electron acceptor)। এখানে ফোটন পৌঁছার সাথে সাথে বিজারণ বিক্রিয়া শুরু হয়। এই বিক্রিয়ার ফলে বিক্রিয়া কেন্দ্রের ক্লোরোফিলগুলো প্রাইমারি ইলেকট্রন গ্রাহকের দিকে ফোটনের বদলে ইলেকট্রন ছুঁড়ে দেয়। যার ফলে সূর্যের আলোর বিপরীতে পাওয়া যায় ইলেকট্রন।

কেলভিন সাইকেলের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার পর উৎপাদিত হয় গ্লুকোজ; Image Source: nationalgeographic.org
এভাবেই এগিয়ে চলে খাদ্য উৎপাদনের প্রথম ধাপের কাজ। এই ধাপকে বলা হয় লাইট রিঅ্যাকশন (Light reaction), এ ধাপে উদ্ভিদ সূর্যালোকের ফোটন থেকে শক্তি উৎপাদন করে। তারপরের ধাপের নাম ডার্ক রিঅ্যাকশন যা কেলভিন চক্র (Calvin cycle) নামে পরিচিত। এই ধাপে সূর্যালোক থেকে পাওয়া শক্তি কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে জটিল প্রক্রিয়ায় জি৩পিতে (Glyceraldehyde 3-phosphate) রূপান্তরিত করা হয়। তারপর কেলভিন চক্রের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে উৎপন্ন হয় উদ্ভিদের খাবার গ্লুকোজ (C6H12O6)। সেই সাথে উপজাত হিসেবে উৎপন্ন হয় অক্সিজেন।
যেভাবে জীবজগৎ টিকে আছে এই রান্নার উপর
যদিও এই রান্নায় সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিতে হয় সূর্যকে, কারণ গ্লুকোজ উৎপাদনে উদ্ভিদ যে শক্তি ব্যয় করে, তা উৎপাদিত গ্লুকোজের শক্তির থেকেও বেশি!
যা-ই হোক, যদি কোনো কারণে উদ্ভিদের এই খাদ্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, তবে প্রথমত উদ্ভিদ নিজেই ধ্বংস হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে গেলে মানুষ কিংবা অন্যান্য প্রাণীদেরও ধ্বংসের পরিণতি নেমে আসবে, কারণ জীবজগৎ শ্বাসকার্য পরিচালনার জন্য অক্সিজেন ও খাবারের জন্য নির্ভরশীল উদ্ভিদের উপর। জীবজগৎ উদ্ভিদের এই রান্নার উপর প্রচণ্ডরকম ঋণী। প্রকৃতির সৃশৃঙ্খল চক্রে উদ্ভিদের এই রান্নার ঋণ বেড়েই চলছে শুধু।
সংক্ষেপে দেখুনঘণ্টা-মিনিট কেন ৬০ ভিত্তিক, আর দিন কেন ২৪ ভিত্তিক?
আমাদের সংখ্যা পদ্ধতি ১০ ভিত্তিক। প্রায় সব কিছু পরিমাপের জন্যই আমরা দশমিক পদ্ধতির একক ব্যবহার করি। কিন্তু সময়ের ক্ষেত্রে আমাদের এককগুলো খুবই অদ্ভুত। ৩৬৫ দিনে ১ বছর, ৩০ দিনে ১ মাস, ৭ দিনে ১ সপ্তাহ, ২৪ ঘণ্টায় ১ দিন- কোনোটির সাথে কোনোটির মিল নেই। এর পেছনে অবশ্য কারণও আছে। ১ বছর বা ৩৬৫ দিন হচ্ছে সূর্যেরবিস্তারিত পড়ুন
আমাদের সংখ্যা পদ্ধতি ১০ ভিত্তিক। প্রায় সব কিছু পরিমাপের জন্যই আমরা দশমিক পদ্ধতির একক ব্যবহার করি। কিন্তু সময়ের ক্ষেত্রে আমাদের এককগুলো খুবই অদ্ভুত। ৩৬৫ দিনে ১ বছর, ৩০ দিনে ১ মাস, ৭ দিনে ১ সপ্তাহ, ২৪ ঘণ্টায় ১ দিন- কোনোটির সাথে কোনোটির মিল নেই। এর পেছনে অবশ্য কারণও আছে। ১ বছর বা ৩৬৫ দিন হচ্ছে সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর একবার ঘুরে আসার সময়, ১ মাস বা ৩০ দিন হচ্ছে চাঁদের পৃথিবীকে আবর্তন করার সময় এবং ১ দিন হচ্ছে পৃথিবীর নিজ অক্ষের উপর ঘুরতে পৃথিবীর প্রয়োজনীয় সময়।
কিন্তু এরপর দিনের ভগ্নাংশগুলোর পেছনে কোনো প্রাকৃতিক কারণ নেই। অর্থাৎ ১ দিন সমান যে ২৪ ঘণ্টা, এর পেছনে চন্দ্র, সূর্য বা পৃথিবীর আবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই। ১ দিন সমান ২৪ ঘণ্টা না হয়ে ১০ ঘণ্টা বা ২০ ঘণ্টাও হতে পারত। কেন হয়নি? অথবা ১ ঘণ্টাকে কেন ৬০ মিনিট, বা ১ মিনিটকে কেন ৬০ সেকেন্ড ধরা হয়েছে? কেন ১০০ মিনিট বা ১০০ সেকেন্ড ধরা হয়নি? সংক্ষেপে উত্তরটি হচ্ছে, হাজার হাজার বছর ধরে এই পদ্ধতি চলে আসছে। কেন ঠিক এই ২৪ এবং ৬০ এর পদ্ধতিই চালু হয়েছে, তার পেছনে ইতিহাসবিদরা কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন।
দিন কেন ১২ ঘণ্টা?
সরল সূর্যঘড়ি; Source: Getty Images
১২ ঘণ্টা ভিত্তিক দিন প্রথম ব্যবহার করতে দেখা যায় প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায়। মিসরীয়দের তৈরি প্রথম দিকের সূর্যঘড়ি ছিল খুবই সাধারণ একটি কাঠি, যার ছায়ার দৈর্ঘ্য দেখে দিনের বিভিন্ন সময়ের হিসেব বের করা হতো। তবে আজ থেকে অন্তত ৩,৫০০ বছর পূর্বেই মিসরীয়রা উন্নততর সূর্যঘড়ি আবিষ্কার করে, যেখানে দিনকে ১২টি ভাগে ভাগ করা হয়। কেন তারা দিনকে ১২ ভাগ করেছিল, ইতিহাসবিদরা তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
কারো মতে, ১২ সংখ্যাটি নেওয়া হয়েছিল বছরের ১২টি মাস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ১২ সংখ্যার ধারণাটি রাশিচক্রের ১২টি নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে প্রভাবিত। অবশ্য অনেকে মনে করেন, প্রাচীন মিসরীয়রা ব্যাবলনীয়দের ১২ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ১২ ঘণ্টার দিন চালু করেছিল। তবে মিসরীয়রা ঘণ্টাগুলোকে আর মিনিট বা সেকেন্ডে ভাগ করেনি, এবং তাদের ঘণ্টাগুলোও গ্রীষ্মকালে বড় এবং শীতকালে ছোট হতো।
১২ ঘন্টা সময় বিশিষ্ট সূর্যঘড়ি; Source: timecenter.com
প্রাচীন চীনারাও দিন এবং রাতকে পৃথক পৃথক ১২ ঘণ্টায় হিসেব করতো, যা দ্বৈত ঘণ্টা নামে পরিচিত ছিল। তবে চীনে একইসাথে আরেকটি পদ্ধতিও চালু ছিল, যেখানে দিনকে ১০০টি ভাগে ভাগ করা হতো। প্রতিটি ভাগকে চীনা ভাষায় ‘কে’ বলা হতো। কিন্তু ১০০ সংখ্যাটি ১২ এর মতো ৩ দ্বারা বিভাজ্য না হওয়ায় দুই পদ্ধতির মধ্যে সময়ের রূপান্তর জটিল ছিল। ফলে পরবর্তীতে ১৬২৮ সালে ১০০ ভাগকে সংশোধন করে ৯৬ ভাগে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। ৯৬, ১২ এর গুণিতক হওয়ায় দুই পদ্ধতির মধ্যে সমন্বয় করা সহজ হয়।
রাত কেন ১২ ঘণ্টা?
দিনের বেলাকে সূর্যঘড়ির সাহায্যে ১২ ভাগে ভাগ করা সম্ভব হলেও রাতে তা সম্ভব ছিল না। ফলে প্রাচীন মিসরীয় জ্যোতির্বিদরা রাত্রিবেলাকে ভাগ করার জন্য নক্ষত্রের সাহায্য নিতেন। তারা সে সময় ডেকান্স নামে ৩৬টি নক্ষত্রপুঞ্জকে ব্যবহার করতেন, যার মধ্যে ১৮টি রাত্রিবেলা দৃশ্যমান থাকতো। এর মধ্যে ৩ করে ৬টিকে দেখা যেত সন্ধ্যা এবং ভোরের আলো-আঁধারির সময়টুকুতে, আর বাকি ১২টি দেখা যেত গাঢ় অন্ধকারের সময়ে। এই ১২টি নক্ষত্রের উদয়ের সময়ের মাধ্যমেই মিসরীয়রা রাত্রিবেলাকে ১২টি ভাগে ভাগ করত।
নক্ষত্র ব্যবহার করে রাতের ঘণ্টাগুলোর দৈর্ঘ্য নির্ণয়ের এই পদ্ধতির নমুনা সে সময়ের কিছু কফিনের ঢাকনাতেও পাওয়া গেছে। সম্ভবত মিসরীয় বিশ্বাস করত, মৃত ব্যক্তিরও সময়ের হিসেব রাখার দরকার হতে পারে। তবে এ পদ্ধতিতে বছরের বেশিরভাগ সময়ই রাতের ঘণ্টাগুলো এখনকার ১ ঘণ্টার সমান হতো না। সেগুলো হতো প্রায় ৪০ মিনিট দীর্ঘ।
রাতের বেলা ডেকান্স তারকাপুঞ্জের চিত্রায়িত দৃশ্য; Source: scienceabc.com
২৪ ঘন্টার একীভূত দিবারাত্রির ধারণা
পৃথক পৃথকভাবে ১২ ঘণ্টার দিন এবং ১২ ঘণ্টার রাত নির্ধারণের পর ২৪ ঘণ্টার দিনরাত্রির ধারণাটি তৈরি হয়। কিন্তু বছরের সব সময় সমান দৈর্ঘ্যের ঘণ্টার কৃত্রিম ধারণাটি প্রথম ব্যবহার হতে দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে, যখন গ্রীক জ্যোতির্বিদরা তাদের তত্ত্বীয় হিসেব-নিকেশের জন্য এ ধরনের আদর্শ সময়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ১২৭ থেকে ১৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রীক জ্যোতির্বিদ হিপারকাস সর্বপ্রথম সমান দৈর্ঘ্যের ২৪ ঘণ্টার দিন ব্যবহার করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু চতুর্দশ শতকে ইউরোপে যান্ত্রিক ঘড়ি আবিস্কার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার প্রস্তাব কার্যকর হয়নি।
১ ঘণ্টায় কেন ৬০ মিনিট?
সংখ্যাপদ্ধতি
আমাদের ১০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি এসেছে হাতের ১০টি আঙ্গুল ব্যবহার করে গণনা করার সুবিধার্থে। কিন্তু আজ থেকে অন্তত ৫,০০০ বছর আগে, সুমেরীয় সভ্যতায় জটিল গাণিতিক এবং জ্যামিতিক হিসাবের জন্য দশমিক সংখ্যা পদ্ধতির পরিবর্তে ১২ এবং ৬০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করতো। ১০ ভিত্তিক পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা হলো, ১০ কে শুধুমাত্র ২ এবং ৫ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ভাগ করা যায় না। সেই তুলনায় ১২ কে ২, ৩, ৪, ৬ দ্বারা এবং ৬০ কে ২ থেকে ৬ পর্যন্ত সবগুলো সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায় বলে এসব পদ্ধতিতে ভগ্নাংশের কাজ হিসেব করা বেশ সহজ ছিল।
কফিনের ভেতরে পাওয়া সময়ের হিসাব; Source: Wikimedia Commons
এছাড়াও সুমেরীয়রা এবং পরবর্তী ব্যাবলনীয়রা হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে বাকি চারটি আঙ্গুলের তিনটি করে বিভাজন হিসেব করে এক হাতে মোট ১২ পর্যন্ত গণনা করত। এক হাতের ১২টি সংখ্যাকে অন্য হাতের ৫টি আঙ্গুল দ্বারা গুণ করলে দুই হাতে সর্বোচ্চ ৬০ পাওয়া যায়। এটিও মিনিট-সেকেন্ডে ৬০ সংখ্যাটি নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যা
সুমেরীয় সভ্যতার পতনের পর খ্রিস্টপূর্ব অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্যাবলনীয়রা কোণ পরিমাপের জন্য ডিগ্রী আবিস্কার করে। সে সময় তাদের ধারণা ছিল পৃথিবী ৩৬০ দিনে একবার সূর্যকে আবর্তন করে। অর্থাৎ যদি প্রতিদিনের কৌণিক আবর্তনকে ১ ডিগ্রী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তাহলে পূর্ণ আবর্তনে ৩৬০ ডিগ্রী সম্পন্ন হয়। ইতিহাসবিদরা ধারণা করেন, এখান থেকেই বৃত্তের ৩৬০ ডিগ্রীর ধারণাটি আসে। বৃত্তের এক ষষ্ঠাংশ, অর্থাৎ ৬০ ডিগ্রী প্রকৃত কোণ গঠন করে। অর্থাৎ ৬০ ডিগ্রী করে বৃত্তের অভ্যন্তরে ছয়টি ত্রিভুজ আঁকলে প্রতিটি ত্রিভুজ সমবাহু হয়। এ কারণে তখন থেকেই জ্যামিতি এবং জ্যোতির্বিদ্যায় ৬০ সংখ্যাটির বিশেষ গুরুত্ব ছিল।
৩৩৫ থেকে ৩২৪ খ্রিস্টপূর্বের মধ্যে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের বিশাল এলাকা বিজয়ের ফলে ব্যাবিলনের জ্যোতির্বিদ্যা গ্রীসে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলিম বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদরাও রোম এবং ভারত থেকে ১২ এবং ৬০ ভিত্তিক সময় পরিমাপের পদ্ধতি গ্রহণ করেন। এভাবে ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী এই পদ্ধতি বিস্তার লাভ করে।
সংক্ষেপে দেখুনচীনাদের আবিষ্কৃত পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন ভূমিকম্প নির্ণায়ক যন্ত্রের নাম কি?
আধুনিক ক্যালেন্ডারের হিসাবে দ্বিতীয় শতাব্দীতে চীনের রাজ দরবারে এক অদ্ভুত যন্ত্র তৈরি হয়েছিল। দূর থেকে দেখতে সেটি এক বিশাল পাত্রের মতো দেখতে। সেই পাত্রের ঘাড় থেকে বেরিয়ে এসেছে চীনা ঐতিহ্যের প্রতীক ড্রাগনের মোট ৮টি মাথা। আবার সেই ড্রাগনের মাথার ঠিক নিচেই ক্ষুধার্ত অভিব্যক্তি নিয়ে আকাশের পানে হা করে তাবিস্তারিত পড়ুন
আধুনিক ক্যালেন্ডারের হিসাবে দ্বিতীয় শতাব্দীতে চীনের রাজ দরবারে এক অদ্ভুত যন্ত্র তৈরি হয়েছিল। দূর থেকে দেখতে সেটি এক বিশাল পাত্রের মতো দেখতে। সেই পাত্রের ঘাড় থেকে বেরিয়ে এসেছে চীনা ঐতিহ্যের প্রতীক ড্রাগনের মোট ৮টি মাথা। আবার সেই ড্রাগনের মাথার ঠিক নিচেই ক্ষুধার্ত অভিব্যক্তি নিয়ে আকাশের পানে হা করে তাকিয়ে আছে ৮টি ধাতব ব্যাঙ। ব্যাঙ আর ড্রাগনের নকশা করা এই যন্ত্রটি দেখে অনেকে তা সম্রাটের আমোদ ফূর্তির মাধ্যম বা শৈল্পিক নিদর্শন ভেবে ভুল করে। কিন্তু একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই যন্ত্র কোনো শিল্পকার্য নয় এবং এর সাথে সম্রাটের মনোরঞ্জনেরও কোনো সম্পর্ক নেই। তারপরেও বেশ দীর্ঘ সময় ধরে সম্রাটের দরবারের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাজপ্রহরীদের কঠোর নজরদারিতে সংরক্ষিত রয়েছে যন্ত্রটি। প্রহরীদের কাজ ছিল যন্ত্রের গায়ে জুড়ে দেয়া ড্রাগনের মুখের দিকে নজর রাখা। তারা দিনের পর দিন সেই ড্রাগনগুলোর মুখের দিকে নজর রেখে চলেছেন। এই নজরদারির যেন কোনো শেষ নেই।
কিন্তু একদিন প্রহরীদের চোখের সামনে যন্ত্রের একটি ড্রাগনের মুখ থেকে একটি ধাতব গোলক বের হয়ে আসলো। সেটি গিয়ে সোজা পতিত হলো এক ক্ষুধার্ত ব্যাঙের মুখে। সাথে সাথে কাসায় চামচ দিয়ে আঘাত করার মতো শব্দে সেই সংরক্ষিত কুঠুরির দেয়াল প্রকম্পিত হয়ে উঠলো। রাজপ্রহরীরা তৎক্ষণাৎ ছুটে চললেন সম্রাটের দরবারে। যাওয়ার পথে লোকের কানে কানে পৌঁছে দিলেন সেই সংবাদ, “‘হু-ফ্যাঙ দিদোং ই’-র ড্রাগনেরা জেগে উঠেছে।”
হু-ফ্যাঙ দিদোং ই
সুপ্রিয় পাঠকগণ ইতোমধ্যে প্রবন্ধের শিরোনাম পড়ে জেনে গিয়েছেন সেই ড্রাগন আর ব্যাঙের মূর্তি সম্বলিত যন্ত্রটি মূলত ভূমিকম্প নির্ণায়ক যন্ত্র। আর এই যন্ত্র তৈরি হয়েছিল ১৩২ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন চীন সাম্রাজ্যে। তখনও মানব সভ্যতা ভূপৃষ্ঠের প্লেট তত্ত্ব আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়নি। তখনকার পৃথিবীতে মানুষ ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাসসহ যেকোনো দুর্যোগকে মহাজাগতিক ইন এবং ইয়াং এর মাঝে অসামঞ্জস্যতার পরিণাম হিসেবে গণ্য করতো। তাদের নিকট প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল এক রহস্য। বিশাল চীন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং প্রদেশে প্রায়ই ভূমিকম্প সঙ্ঘটিত হতো। ভূমিকম্পের কারণে প্রাণহানী এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কম ছিল না। তাই চীন সম্রাট এই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা লাঘব করার লক্ষ্যে দুর্যোগ কবলিত স্থানে অতিসত্বর সাহায্য প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তাছাড়া সেই আমলের ধর্মীয় বিশ্বাসে ভূমিকম্পকে স্বর্গীয় ঘটনার নির্দেশক হিসেবে গণ্য করা হতো।


জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে হু-ফ্যাঙ দিদোং ই’র রেপ্লিকা; Sky Alert USA
কিন্তু দ্রুত সাহায্য প্রেরণ করা বেশ কঠিন কাজ। তৎকালীন সমাজে যোগাযোগ মাধ্যমে ছিল না কোনো টেলিফোন, টেলিগ্রাফ কিংবা ডাক ব্যবস্থা। দেখা যেত সম্রাটের নিকট ভূমিকম্পের খবর পৌঁছুতে সপ্তাহখানেক দেরি হয়ে যেত। তাই সম্রাট রাজ্যের বিজ্ঞানীদের ফরমান জারি করলেন, দ্রুত ভূমিকম্পের খবর জানার উপায় বের করতে। সম্রাটের ফরমানে সাড়া দিয়ে বিজ্ঞানীরা আদা জল খেয়ে কাজে নেমে পড়লেন। শত শত বিজ্ঞানীদের মাঝে ঝাং হ্যাং নামক এক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম ভূমিকম্প নির্ণায়ক এক অভিনব যন্ত্র নিয়ে সম্রাটের দরবারে হাজির হন। তিনি সেই যন্ত্রের নাম দিয়েছিলেন হু-ফ্যাঙ দিদোং ই বা ‘ভূমিকম্প নির্দেশক’।
সম্রাট ফরমান জারি করলেন বিজ্ঞানীদের প্রতি; Image Source: Universal Images Group/Getty Images
ঝাং হ্যাং এক প্রতিভার নাম
চীনা সাম্রাজ্যকে ভূমিকম্প নির্ণায়ক যন্ত্র উপহার দেয়া বিজ্ঞানী ঝাং হ্যাং ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে জ্যোতির্বিদ, গাণিতিক, প্রকৌশলি, কবি, ভূতাত্ত্বিক এবং চমৎকার একজন উদ্ভাবক। সাঁঝের আঁধারে যখন চীনের সকল কর্মকাণ্ড থেমে যেত, তখন জেগে উঠতো তার উৎসুক মন। তিনি রাতের পর রাত আকাশ পানে তাকিয়ে প্রায় আড়াই হাজারের মতো তারকারাজির অবস্থান লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এছাড়া তিনি পৃথিবীর প্রথম পানিচালিত অ্যাস্ট্রোলেইব উদ্ভাবন করেন।

বিজ্ঞানী ঝাং হ্যাং-এর স্মরণে প্রচলিত ডাকটিকিট; Photograph: Tristan Tan
প্রথম শতাব্দীতে তিনি হান সাম্রাজ্যের শাসনামলে চীনে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু ঠিক কত সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন সে সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা সম্ভব হয়নি। তার কর্মদক্ষতা অচিরেই তাকে চীনা রাজ দরবারের প্রধান বিজ্ঞানীর সম্মানে ভূষিত করেছে। তবে ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে পৃথিবীর প্রথম সিসমোস্কোপ হু-ফ্যাঙ দিদোং ই আবিষ্কারের জন্য।
যন্ত্রের কলাকৌশল
ঝাং হ্যাং-এর যন্ত্রটি বাইরে থেকে দেখতে একটি ৬ ফুট পরিধির ব্রোঞ্জের পাত্রের মতো। তৎকালীন চীনে সাধারণত এধরনের পাত্র ব্যবহার করা হতো মদ এবং পানীয় রাখার জন্য। পাত্রের গায়ে ৮টি ড্রাগন লাগানো ছিল। চীনা সংস্কৃতিতে সর্বমোট ৮টি দিক ব্যবহার করে বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করার প্রচলন ছিল। প্রতিটি ড্রাগনের মুখ সেই ৮টি দিক নির্দেশ করতো। ড্রাগনের মাথার একদম নিচে ৮টি ধাতব ব্যাঙ অবস্থান করতো। এই গেলো পাত্রের বাইরের বর্ণনা। পাত্রের ভেতরে ঝাং হ্যাং একটি সূক্ষ্ম পেন্ডুলাম জুড়ে দিয়েছিলেন। পাত্রের ভেতরের ফাঁকা জায়গা তিনি এক প্রকার তরল পদার্থ দিয়ে পূর্ণ করেছিলেন যা সম্পর্কে এখনও বিজ্ঞানীরা অন্ধকারে আছেন। প্রাচীন চীনা পাণ্ডুলিপির অস্পষ্ট পাঠ থেকে এই যন্ত্রের কলাকৌশল এবং এর ধারণকৃত তরলের প্রকৃতি সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়নি।

সিসমোস্কোপের অভ্যন্তরীণ কলাকৌশল; Image Source: Science & Society Picture Library
যন্ত্রের সূক্ষ্ম কলকব্জা সম্পর্কে গবেষকগণ এখনও ধোঁয়াশায় আছেন। তবে সহজ কথায় তারা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট কম্পন অনুভূত হওয়া মাত্র পাত্রের ভেতরের পেন্ডুলাম নির্দিষ্ট দিকে আন্দোলিত হতো। এর ফলে সেই দিকে রাখা ধাতব গোলক পেন্ডুলামের আঘাতে ড্রাগনের মুখ দিয়ে নিচে রাখা ব্যাঙের মুখে পতিত হতো। তবে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এই যন্ত্র এর আশেপাশে ভূমিকম্প ব্যতীত সৃষ্ট কম্পন দিয়ে প্রভাবিত হতো না। কিন্তু সেই সময়ে ঝাং হ্যাং কীভাবে এই জটিল কাজ সম্পন্ন করেছেন, তা বিজ্ঞানীদের বোধগম্য নয়। ধাতব গোলক ব্যাঙের মুখে পড়ার পর বেশ জোরালো শব্দের মাধ্যমে তা প্রহরীদের সতর্ক করে দিতো। এর মাধ্যমে শুধু ভূমিকম্প নির্দেশিত হতো না, বরং এর দিক এবং অবস্থানও জানা যেত।
সতীর্থদের প্রতিহিংসা এবং অপেক্ষা
সম্রাট যখন বিজ্ঞানীদের নিকট সিসমোস্কোপ নির্মাণের ফরমান জারি করেছিলেন, তখন শত শত বিজ্ঞানী সম্রাটকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কাজে নেমেছিলেন। কিন্তু তারা সকলেই ব্যর্থ হয়েছিলেন শুধু ঝাং হ্যাং ছাড়া। তাই স্বাভাবিকভাবে তিনি সহকর্মীদের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন। তারা তাকে পথেঘাটে হেয় করা শুরু করে। সবাই বলাবলি করতো, ঝাং হ্যাং খ্যাতির লোভে সম্রাটকে বোকা বানানোর চেষ্টা করেছে। ওদিকে সম্রাটের দরবারে সেই যন্ত্র পড়ে আছে মাসখানেক ধরে। শুনতে হাস্যকর লাগলেও সবাই অপেক্ষা করছিল পরবর্তী ভূমিকম্পের জন্য। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ফলাফল না হওয়ায় সবাই ধরে নিয়েছিল এই যন্ত্রের কোনো কার্যকারিতা নেই।

সহকর্মীদের প্রতিহিংসা আর তিরস্কারের শিকার হন ঝাং হ্যাং; Artist: Darani Vasudeva
ঝাং হ্যাং-এর অপেক্ষার পালা শেষ হয় ১৩৮ সালের এক সুন্দর সকালে। রাজপ্রহরীরা তাকে সম্রাটের নির্দেশে রাজ দরবারে নিয়ে যায়। তিনি সেখানে পৌঁছে আবিষ্কার করেন পশ্চিম দিকে মুখ করা এক ব্যাঙের মুখে ধাতব গোলকটি আটকে আছে। কিন্তু রাজধানী শহরের পশ্চিম দিকে কেউ ভূকম্পন অনুভব করেননি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল যন্ত্রটি প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় থাকা হ্যাং জানতেন তার অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়ে এসেছে। কয়েকদিন পর পশ্চিমের শহর লং (বর্তমান গানসু) থেকে দূত এসে সম্রাটকে জানালেন ভূমিকম্পের কথা। এমনকি ভূমিকম্প সঙ্ঘটনের সময়কাল গোলক পতনের সাথে মিলে যায়। এই বিস্ময়কর মুহূর্ত শুধু ঝাং হ্যাং-এর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পুরো বিজ্ঞানের জয়জয়কার হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। দেখা গেলো যারা তাকে তিরস্কার করেছিল, সেই সতীর্থরাই ঝাং হ্যাং-কে সেরাদের আসনে বসিয়ে দিলো। প্রতিভার কাছে হেরে গেল বিষাক্ত প্রতিহিংসা।
রেপ্লিকা বানানোর প্রচেষ্টা
সিসমোস্কোপ নির্মাণের এক বছর পর ঝাং হ্যাং মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার শিষ্যরা সফলভাবে হু-ফ্যাঙ দিদোং ই’র রেপ্লিকা বানাতে সক্ষম হন। কিন্তু কালের আবর্তে সবগুলো রেপ্লিকা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। কারণ, কীভাবে সেই যন্ত্র শত শত মাইল দূরের ভূকম্পন নির্ণয় করার সময় পারিপার্শ্বিক কম্পন অগ্রাহ্য করতো তা এখনও জানা যায়নি। আধুনিক যুগে ১৯শ এবং ২০শ শতাব্দীতে পৃথক পৃথক গবেষণাগারে বহুবার এই যন্ত্রের রেপ্লিকা নির্মাণের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন গবেষকরা। ২০০৫ সালে চীনের একাডেমি অফ সায়েন্সের ভূমিকম্প বিশারদগণ এর কার্যকর রেপ্লিকা নির্মাণ করেছেন বলে দাবি করেছেন। কিন্তু সেই যন্ত্রে নেই ঝাং হ্যাং-এর অসাধারণ সূক্ষ্মতার ছোঁয়া।


সংক্ষেপে দেখুন২০০৫ সালে নির্মিত একটি রেপ্লিকা; Image Source: Beijing Times
চীনা রেপ্লিকায় ৮টি আলাদা গোলকের বদলে মাত্র একটি গোলক ব্যবহৃত হয়েছে। গোলক স্পর্শ করে ঝুলে আছে একটি পেন্ডুলাম। ভূকম্পনের প্রভাবে পেন্ডুলাম নির্দিষ্ট দিকে আন্দোলিত হয়ে গোলকটিকে ড্রাগনের মুখে ঠেলে দেয়। বিজ্ঞানীরা এই যন্ত্র নিয়ে আরো কাজ করে যাচ্ছেন। তারা আশাবাদী অদূর ভবিষ্যতে তারা চীনা পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত যন্ত্রের সূক্ষ্মতার কাছাকাছি রেপ্লিকা নির্মাণ করতে পারবেন।
ঝাং হ্যাং-এর প্রাচীন সিসমোস্কোপের হাত ধরে এসেছে আধুনিক সিসমোগ্রাফ; Image Source: Ha Civilizaciones
ঝাং হ্যাং-এর পৃথিবী এখন অনেকটাই বদলে গেছে। যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে বিপ্লব। ভূমিকম্প নিয়ে মানুষ প্লেট তত্ত্ব আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসমোগ্রাফের মাধ্যমে ভূমিকম্প নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। প্রয়োজনে দ্রুততার সাথে আক্রান্ত স্থানে ত্রাণ সরবরাহ করা হচ্ছে বছরজুড়ে। কিন্তু এই ১৮০০ বছরের ব্যবধানেও ঝাং হ্যাং-এর নাম মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। এমনকি আধুনিক যুগের যন্ত্রগুলোতেও দেখা যায় সেই প্রাচীন হু-ফ্যাঙ দিদোং ই’র ছোঁয়া। বর্তমান সিসমোস্কোপে ব্যবহৃত সেন্সরটি একটি ঝুলন্ত দেহ যা সেই পেন্ডুলামের কাজ করে যাচ্ছে। পেন্ডুলামের পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে চুম্বকীয় শক্তি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি ধীরে ধীরে এই যন্ত্রকে আরো উন্নত করবে, কিন্তু এসব কিছুই শুরু হয়েছিল হান সাম্রাজ্যের চীনে একজন প্রতিভাবানের হাত ধরে। সেই প্রতিভাবান ঝাং হ্যাং-এর প্রতি মানব সভ্যতা চির কৃতজ্ঞ।
পৃথিবীতে যা কিছু দুষ্প্রাপ্য, তা-ই কি মূল্যবান?
বিখ্যাত লেখক রলফ ডবেলি (Rolf Dobelli) একবার এক বন্ধুর বাসায় কফির দাওয়াতে গেলেন। সেখানে একদিকে বড়রা মিলে গল্প করছিল, আরেক দিকে তিনটে গ্যাদাপোনা এক অন্যের সাথে কোস্তাকুস্তি করছিল। তার সাথে তো কিছু মার্বেল ছিল। তার মনে হলো মার্বেলগুলো দিয়ে যদি বাচ্চাগুলোকে ঠাণ্ডা করা যায় তাহলে মন্দ হয় না। মার্বেলগুলো তবিস্তারিত পড়ুন
বিখ্যাত লেখক রলফ ডবেলি (Rolf Dobelli) একবার এক বন্ধুর বাসায় কফির দাওয়াতে গেলেন। সেখানে একদিকে বড়রা মিলে গল্প করছিল, আরেক দিকে তিনটে গ্যাদাপোনা এক অন্যের সাথে কোস্তাকুস্তি করছিল। তার সাথে তো কিছু মার্বেল ছিল। তার মনে হলো মার্বেলগুলো দিয়ে যদি বাচ্চাগুলোকে ঠাণ্ডা করা যায় তাহলে মন্দ হয় না। মার্বেলগুলো তিনি ছড়িয়ে দিলেন মেঝেতে। ভাবলেন, এবার শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
কীসের কী? অশান্তি আরো বাড়লো। বাচ্চাগুলো নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়ল। কেন এই বিবাদ? দেখা গেল, মার্বেলগুলোর মধ্যে একটার রঙ নীল। আর বাচ্চারা সেটা নিয়েই কাড়াকাড়ি করছে। সবগুলো মার্বেলের আকার, আকৃতি, ঔজ্জ্বল্য একইরকম ছিল। নীল মার্বেলটার তাহলে বিশেষত্ব কী ছিল? একটাই বিশেষত্ব ছিল। নীল মার্বেলটা ছিল অন্যগুলো থেকে আলাদা। আর কোনো নীল মার্বেল ছিল না সেখানে। এই শিশুসুলভ আচরণ দেখে তিনি মনে মনে হেসে দিলেন। আর ভাবলেন, শিশুদের চিন্তাভাবনা কতই না মজার আর অযৌক্তিক হয়।
এই ঘটনা যে তার নিজের জীবনেও আসবে, এটা তখন তিনি ভাবেননি। কয়েক বছর পর। ২০০৫ সাল। সোশ্যাল মিডিয়া না আসলেও ইন্টারনেট তখন পুরোদমে মানুষের জীবনে জায়গা করে নিচ্ছে। ইমেইল সার্ভিস বলতে তখনো ইয়াহু, হটমেইল এদের বোঝাতো। গুগল তখনো মাঠে নামেনি। আগস্ট মাসে গুগল ঘোষণা দেয়, তারা নিজস্ব ইমেইল সার্ভিস চালু করবে। এ খবর শোনামাত্রই রলফ ডবেলি একটা জিমেইল একাউন্টের জন্য পাগল হয়ে গেলেন।
সে সময় জিমেইল একাউন্ট খোলাতে ছিল খুব কড়াকড়ি। আগে থেকে একাউন্ট আছে এমন কারো ইনভাইটেশন পেলেই কেবল এখানে একাউন্ট খোলা যেত। এ কারণে জিনিসটা আরো মহার্ঘ হয়ে গেল। এমন না যে তার সে সময় কোনো ইমেইল একাউন্ট ছিল না। এমনও না যে জিমেইল তার সার্ভিসের দিক দিয়ে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে ছিল। কেবল অল্প কিছু মানুষ বিশেষ এই সুবিধা পাচ্ছে- এই ভাবনাই মানুষকে এর জন্য আরো বেশি করে লালায়িত হতে প্রণোদিত করে। এই ঘটনা মনে করে তিনি এখনো মনে মনে হেসে উঠেন, আর ভাবেন, সেদিনের সেই শিশুদের তুলনায় তিনি ব্যতিক্রম কিছু নন। আমাদের সবার মধ্যেই হয়তো একটা শিশু সত্ত্বা লুকিয়ে আছে।

প্রথম দিকে জিমেইলের লুক; Image: Time.com
Rara sunt cara নামে রোমান একটা বচন আছে। যা কিছু দুষ্প্রাপ্য, তা-ই মূল্যবান। Scarcity error বা দুষ্প্রাপ্যতার ভ্রান্তি মানুষের ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। আপনি একজন রিয়েল এস্টেট এজেন্টের কাছে গেলেন ঢাকার অদূরে একটা প্লট কিনতে। জায়গাটা এখন পানির নিচে। কিন্তু সে আপনাকে বললো, পাঁচ বছরের মধ্যে এখানে বাড়ি তো বাড়ি, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল সব গজিয়ে উঠবে। সে আপনাকে আরো বললো, এই প্লট গতকালই আমেরিকায় বসবাসরত এক ইঞ্জিনিয়ার এসে দেখে গেছে। আপনি কি তার কথা বিশ্বাস করবেন? সে হয়তো শুধুমাত্র আপনাকে বাজিয়ে দেখার জন্যই এই মিথ্যেটুকু বলেছে। মিথ্যেটুকু হয়তো সামান্য, কিন্তু এর প্রভাব ব্যাপক। আপনি বাসায় এসে কই মাছের ঝোল আর ইলিশের ডিমটুকু তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেতে পারবেন না। চোখের সামনে আপনি দেখতে পাবেন, এক টুকরো পছন্দ করা জমি কোথাকার কোন এক ইঞ্জিনিয়ার এসে নিয়ে যাচ্ছে। তড়িঘড়ি করে আপনি তখন প্লটটা বুকিং দিয়ে দেবেন।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমি আর আমার স্ত্রী, দু’জনেরই টক খুব পছন্দ। আমরা যখন আমড়া মাখা বা কাঁচা আম মাখা বা এরকম কিছু খেতে বসি, আমাদের মনোমালিন্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায় মাখার শেষ অংশুটুকু। শুরুটকুও নয়, মাঝের টুকুও নয়। পাতের শেষ ঝোলটুকু খাবার যে মজা, তা আর কোন কিছুর সাথেই তুলনীয় নয়।
দুষ্প্রাপ্যতার ভ্রান্তি পরীক্ষা করার জন্য উদ্যোগ নেন অধ্যাপক স্টিভেন ওরচেল। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের দুই ভাগে ভাগ করলেন। প্রথম গ্রুপকে পুরো এক বাক্স বিস্কুট খেতে দিলেন। আর দ্বিতীয় গ্রুপকে দিলেন মাত্র দুটি বিস্কুট। খাওয়া শেষে অংশগ্রহণকারীদের বললেন, বিস্কুটকে রেটিং দিতে। দেখা গেলো, দ্বিতীয় গ্রুপের লোকজন বিস্কুট খেয়ে বেশি মজা পেয়েছে। এই পরীক্ষা বেশ কয়েক বার করা হলো। প্রতিবারই একই ফলাফল পাওয়া গেল।
বিশেষ কোনো ইভেন্টের পোস্টার আমাদের বলে, ‘শুধু মাত্র আজকের জন্য’। আর্ট গ্যালারির মালিকরা এই দুষ্প্রাপ্যতার ভ্রান্তির সুযোগ নেয়। তারা অধিকাংশ পেইন্টিংইয়ের উপর লাল মার্কারে করে ‘Sold’ লিখে রাখে। এর ফলে বাকি পেইন্টিংগুলোকে আমাদের কাছে মনে হয় খুব দামী আর দুষ্প্রাপ্য কিছু।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ তাদের ব্রশিউরে লিখে রাখে, ‘শেষ সুযোগ বিরল প্রজাতির এক জলহস্তী দেখার’। আপনার কিন্তু কখনোই জলহস্তি দেখার কোনো শখ ছিল না। বিরল প্রজাতির জলহস্তী তো নয়-ই। কিন্তু শেষ সুযোগ বলে কথা। এই শেষ সুযোগের ফাঁদে পড়ে আপনি প্লেনের টিকেট করে তানজানিয়া চলে গেলেন জলহস্তী দেখতে।
আমরা ডাকটিকেট, কয়েন, পুরানো গাড়ি সংগ্রহ করি। জানি যে এগুলো কোন কাজের না। পোস্ট অফিস পুরানো ডাকটিকেট নেয় না, ব্যাঙ্ক পুরানো কয়েন নেয় না, পুরানো গাড়ি নিয়ে রাস্তায় চলা যায় না। তারপরও আমরা এগুলো কিনি। একটাই কারণ- এদের যোগান কম।


দুষ্প্রাপ্যতা দাম বাড়িয়ে দেয় চিত্রকর্মের; Painting by Harish Bhoyar
আরেকটা পরীক্ষায় ছাত্রছাত্রীদের বলা হলো, দশটা পোস্টারকে আকর্ষণীয়তার ভিত্তিতে র্যাংক করতে। র্যাংক করা হয়ে গেলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পুরস্কারস্বরূপ তারা একটা পোস্টার নিজেদের কাছে রেখে দিতে পারবে। পাঁচ মিনিট পর বলা হলো, যে পোস্টারটি র্যাংকিংয়ে তিন নম্বরে আছে, তা কাউকে দেওয়া হবে না। এখন তোমরা আবার দশটা পোস্টারকে র্যাংক করো। যে পোস্টারটি সরিয়ে ফেলা হলো, হঠাৎ করে সেটাই সবার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হিসেবে দেখা দিল। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় Reactance। কোনোকিছু যখন আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়, হঠাৎ সেটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হিসেবে দেখা দেয়। বিখ্যাত ইংরেজি টিভি সিরিজ FRIENDS-এর শুরুর দিকে র্যাচেল রসকে খুব একটা পাত্তা দিত না। যখনই রস অন্য একজনের প্রেমে পড়লো, তখনই র্যাচেল তার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া শুরু করলো।
FRIENDS সিরিজে রস ও র্যাচেল; Image: Bustle.com
এই ঘটনাকে রোমিও এ্যান্ড জুলিয়েট ইফেক্টও বলা হয়। ভালোবাসা মানে না কোন বাঁধা। আর যা কিছু নিষিদ্ধ, তার প্রতি ভালবাসাও জন্মায় বেশি। কেবল যে ভালোবাসার ক্ষেত্রেই এটা হয়, তা না। আমেরিকায় আন্ডারগ্র্যাড ছাত্রদের পার্টিগুলোতে মদ্যপানের এতো ছড়াছড়ি কেন? বেসামাল মদ্যপের সংখ্যাই বা এতো বেশি কেন এই পার্টিগুলোতে? সেই একই কারণ। ২১ বছরের নিচে এখানে মদ্যপান করা নিষেধ। আর যা কিছু নিষেধ, তার প্রতি আকর্ষণও তো বেশি।
দুষ্প্রাপ্যতা ভ্রান্তির কারণে আমরা পরিষ্কার মাথায় চিন্তা করতে পারি না। পণ্য হোক আর সেবাই হোক, মূল্যায়ন হওয়া উচিত কেবল তার দাম আর সে কী উপযোগিতা দিচ্ছে আমাকে, তার উপর। পণ্যটা দ্রুত মার্কেট থেকে আউট হয়ে যাচ্ছে কিনা, এর ভিত্তিতে না।
সংক্ষেপে দেখুনচোরাবালি কি সত্যিই আমাদের মেরে ফেলতে পারে?
একটু ভাবুন তো, আপনি এরকম ক’টি সিনেমা দেখেছেন যেখানে নায়ক চোরাবালির মধ্যে পড়ে যায়, আর ঠিক শেষ মুহূর্তে হয়তো গাছের ডাল ধরে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে বের হয়ে আসে? সিনেমাতে যদি না-ও দেখে থাকেন, গল্পে চোরাবালির কথা পড়েননি কিংবা চোরাবালির নাম অন্তত শোনেননি এমন কাউকে হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে সিনেমাতে দেখেবিস্তারিত পড়ুন
একটু ভাবুন তো, আপনি এরকম ক’টি সিনেমা দেখেছেন যেখানে নায়ক চোরাবালির মধ্যে পড়ে যায়, আর ঠিক শেষ মুহূর্তে হয়তো গাছের ডাল ধরে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে বের হয়ে আসে? সিনেমাতে যদি না-ও দেখে থাকেন, গল্পে চোরাবালির কথা পড়েননি কিংবা চোরাবালির নাম অন্তত শোনেননি এমন কাউকে হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে সিনেমাতে দেখে থাকা চোরাবালির দৃশ্যকে সত্যি ভেবে বসলে হয়ত কারও কাছে একে কোনো মারাত্মক গভীর কোনো গহ্বর মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে চোরাবালির গভীরতা কয়েক ফুটের বেশি হয় না। বলা বাহুল্য, এই কয়েক ফুট গভীরতাই যে কারো মনে মৃত্যু-শঙ্কা তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। আপনি যদি চোরাবালিতে কখনো পড়েও যান, সেখানে কেউ কিন্তু আপনাকে ভেতরের দিকে নিয়ে যাবে না। চোরাবালিতে তলিয়ে যাওয়ার কাজটি করবেন আপনি নিজেই! অদ্ভুত ঠেকছে না ব্যাপারটা?
Source: bournemouthecho.co.uk
চোরাবালি কী?
চোরাবালি আসলে সাধারণ বালির মতোই এক ধরনের বালি। কিন্তু সাধারণ বালির সাথে একটি বড় পার্থক্যও আছে এর। পার্থক্য হলো এই বালি পানি দ্বারা অতি-সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। আমরা যখন সাধারণ বালির উপরে দাঁড়াই, তখন পা কিছুটা ভেতরে ঢুকে গেলেও বেশিদূর যেতে পারে না। এর কারণ, বালিতে থাকা ঘর্ষণ বল আমাদেরকে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। অন্যদিকে পানি দ্বারা প্রচুর পরিমাণে সম্পৃক্ত হবার দরুন চোরাবালিতে এই বল সাধারণ বালির তুলনায় অনেক কমে যায়। এর ফলে পানি ও মাটি মিশ্রিত হয়ে স্যুপের মতো হয়ে যায়। যখন পানি ঝরঝরে-আলগা বালির মধ্যে আটকা পড়ে, তখন এটি তরলীকৃত মাটি তৈরি করে। ফলে এই মাটি কোনো ধরনের ভার বহন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আর এরকম প্রাকৃতিক কারণেই মূলত তৈরি হয় ‘চোরাবালি’ নামক ফাঁদের।
যেভাবে চোরাবালির সৃষ্টি হয়; Source: quoracdn.net
বাঁচার উপায়
চলচ্চিত্রে দেখা চোরাবালির দৃশ্যকে সম্পূর্ণ সত্যি মনে করে আপনি হয়তো ধরেই নিয়েছেন যে, এর থেকে পরিত্রাণের সহজ কোনো উপায় নেই। আবার কেউ হয়তো এর থেকেও ভয়াবহ কিছু ভাবছেন, কল্পনা করছেন মৃত্যু! কিন্তু বাস্তবে এমনটা হওয়ার সুযোগ অনেক কম, যদি আপনি নিজে শান্ত থাকেন।
চোরাবালিতে পানি-বালির যে স্যুপ তৈরি হয়, তা অনেক সময় প্রাথমিকভাবে দেখে বোঝা খুব কঠিন। চোরাবালিতে পানি নিচের দিকে চুয়ানোর কারণে এর উপরের অংশ কখনো কখনো সাধারণ বালির মতোই দেখায়। আবার মাঝে মাঝে সাধারণ কাদা বলেও মনে হতে পারে। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রেই এমন হয় যে সেটার উপর পা রাখার আগে পর্যন্ত কেউ বুঝতে পারবে না সে চোরাবালিতে পা দিতে যাচ্ছে!
একটু চেষ্টা করলেই চোরাবালি থেকে উঠে আসতে পারবেন; Source: ytimg.com
আপনি যদি ঘটনাক্রমে চোরাবালিতে পড়েও যান, তাহলে আপনার প্রথম কাজটি হবে- আতঙ্কিত না হওয়া। আগেই বলেছি, চোরাবালি কয়েক ফুটের বেশি গভীর হয় না। তাই চোরাবালিতে পড়ে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপনার জুতা জোড়া হারানোর সম্ভাবনাই প্রকট!
চোরাবালির ফাঁদে পড়লে যে কয়টি ব্যাপার মনে রাখবেন:
১. আপনি মারা যাচ্ছেন না, এটা নিশ্চিত!
২. আপনি যতটা বল প্রয়োগ করবেন, ততটাই ঐ ফাঁদে ফেঁসে যাবেন। তাই নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন। কখনোই হাত-পা ছোঁড়ার চেষ্টা করবেন না। এই কাজ করলে আপনি শুধু একটাই সাফল্য পাবেন- আপনি নিজেকে চোরাবালির আরও গভীরে নিয়ে যাবেন!
৩. মানবদেহের ঘনত্ব প্রতি ঘনফুটে ৬২.৪ পাউন্ড। আর এই ঘনত্ব নিয়েই আমরা দিব্যি পানিতে ভেসে থাকতে পারি। অন্যদিকে চোরাবালির ঘনত্ব প্রতি ঘনফুটে ১২৫ পাউন্ড। তার মানে বুঝতেই পারছেন, পানির চেয়েও অনেক সহজে ভেসে থাকা যাবে চোরাবালিতে!
এখন তাহলে চোরাবালি থেকে পরিত্রাণ পাবার পদ্ধতিতে যাওয়া যাক। প্রথমত, আপনার কাঁধে কোনো ব্যাগ থাকলে তা খুলে ফেলার চেষ্টা করুন। আপনার ভর যত কমবে ততই ভালো। একইসাথে চেষ্টা করুন পায়ের জুতাও খুলে ফেলতে। জুতা থাকলে সেটা আংটার মতো কাজ করতে পারে এবং আপনাকে চোরাবালি থেকে বের হতে একটু বেশিই পরিশ্রমে পড়তে হতে পারে। অবশ্য পায়ের জুতা খুলে ফেলা সম্ভব না হলেও নিরাশ হওয়ার কিছু নেই, একটু বেশি পরিশ্রম করতে হবে, এ-ই যা!
প্রসঙ্গত একটা কথা বলে রাখা ভালো, চোরাবালিতে পুরো শরীর নিয়ে না পড়ে যদি কখনো এক পা পড়ে যায়, তাহলে সাথে সাথে পিছনে ফিরে আসুন। চোরাবালি প্রায় এক মিনিট সময় নেয় তরলিত হওয়ার জন্য। আপনি সচেতন থাকলেই নিজের পা-কে ঐ সময়ের মধ্যে বের করে নিয়ে আসতে পারবেন।
আর আপনি যদি চোরাবালিতে পুরো দেহসমেত পড়েই যান, তাহলে আরো কিছু কাঠখড় পোড়াতেই হবে। চলুন অন্য একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করি। ধরুন, আপনি চোরাবালিতে না পড়ে একটি বিশাল বড় পুকুরে পড়ে গেছেন। তখন আপনি কী করবেন? সাঁতরে পাড়ে ওঠার চেষ্টা করবেন অবশ্যই। একই কাজ করতে হবে চোরাবালির ক্ষেত্রেও। নিজের দেহকে আনুভূমিক করে পিঠের উপর ভর দেয়ার চেষ্টা করুন। এতে আপনার শরীরের ভর সমানভাবে বণ্টন হবে। এর ফলে আপনি সহজে ভেসে থাকতে পারবেন। এরপর মূলত আপনাকে চিৎসাঁতার দিতে হবে! নিজের পা দুটোকে ঝাঁকিয়ে পায়ে লেগে থাকা বালিগুলোকে আলগা করার চেষ্টা করুন এবং ধীরে ধীরে সেগুলোকে উপরে নিয়ে আসার চেষ্টা করুন। সাঁতারে যেভাবে হাতকে কাজে লাগান ঠিক সেভাবে এখানেও করার চেষ্টা করুন। তবে সাবধান! নিজের হাত দুটোকে ডুবিয়ে একসাথে করবেন না যেন। তাহলে ওগুলো আবার চোরাবালিতে আটকে যেতে পারে! এভাবে সাঁতরে আপনি যখন একটু শক্ত মাটির নাগাল পাবেন, নিজেকে টেনে বের করে নিয়ে আসুন।
হলিউডের একটি মুভিতে নায়কের চোরাবালিতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য; Source:slate.com
তাহলে কি চোরাবালিকে একদম ভয় পাবেন না?
চোরাবালি যে একদম অহিংস- এমন বলা যাবে না। আবার অত্যন্ত বিপদজনক- এ কথাও বলা যাবে না। নিজে নোংরা হওয়া, জুতা কিংবা কাঁধের ব্যাগ হারানোর থেকে তেমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা এতে তেমন নেই। কিন্তু ব্যাপারটা মারাত্মক হতে পারে এতে আটকা পড়ার জায়গার পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। চোরাবালিতে আটকা পড়ার পর মৃত্যুর খবরও শোনা যায়নি, এমন বলা যাবে না। সমুদ্রের তীরে চোরাবালিতে আটকা পড়ে পরবর্তীতে সমুদ্রে ঢেউয়ের কারণে মারা যাওয়ার ঘটনাও শোনা গেছে। আবার জনমানবহীন জায়গায় চোরাবালিতে আটকা পড়ে যদি নিজেকে উপরে তুলে আনতে কেউ ব্যর্থ হন, তাহলে সেটাকেও যথেষ্ট বিপদজনক বলতে হবে। তাই বলা যায়, মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করলে আপনার তেমন কোনো ক্ষতিই হবে না চোরাবালি থেকে।
এবারে আপনাদেরকে একটু চমকে দেয়া যাক! চোরাবালি যে পানি আর বালির সংমিশ্রণেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। চোরাবালি শুষ্কও হতে পারে। শুষ্ক চোরাবালি তখনই তৈরি হয়, যখন বালুকণা অত্যন্ত আলগা গঠন ধারণ করে। এর এমন পরিস্থিতি হয় যে, এটি খুব কষ্টে নিজের ভরই ধরে রাখে। তাহলে ভাবুন আপনি পড়ে গেলে কী হবে? তাসের ঘর যেভাবে পলকের মধ্যে ভেঙে যায়, ঠিক সেভাবেই টুপ করে এর ভেতরে হারিয়ে যাবেন আপনি! এখন মনে মনে আপনি হয়তো ভাবছেন, তাহলে চোরাবালিকে বিপদজনক বলবো না কেন? সৌভাগ্যবশত শুষ্ক চোরাবালির অস্তিত্ব গবেষণাগার ছাড়া প্রকৃতিতে কখনো পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা বিশেষ পদ্ধতিতে বালির মধ্য দিয়ে বায়ু প্রবাহিত করার মাধ্যমে শুষ্ক চোরাবালি তৈরি করেন। তবে বিজ্ঞানীরা শুষ্ক চোরাবালির অস্তিত্ব একেবারেই নাকচ করে দেন না। তবে কখনো যদি এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়, ভাগ্যের উপর ভরসা করা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না বৈকি!
সংক্ষেপে দেখুন