সাইন আপ করুন
লগিন করুন
রিসেট পাসওয়ার্ড
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? আপনার ইমেইল এড্রেস দিন। ইমেইলের মাধ্যমে আপনি নতুন পাসওয়ার্ড তৈরির লিংক পেয়ে যাবেন।
আপনি কেন মনে করছেন এই প্রশ্নটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই উত্তরটি রিপোর্ট করা উচিৎ?
আপনি কেন মনে করছেন এই ব্যক্তিকে রিপোর্ট করা উচিৎ?
নিশীথ সূর্যের দেশ শুধুই কি নরওয়ে?
কল্পনা করুন তো, গভীর রাত। সুনসান নীরবতা চারদিকে। আপনি কোনো কারণে বাইরে বের হয়ে দেখতে পেলেন সূর্যটা ডুবে না গিয়ে ঝুলে আছে দিগন্তে। সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত কমলা আলোকরশ্মিতে আলোকিত হয়ে আছে দিগন্ত। অপার্থিব সেই আলোর আভায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে প্রকৃতি, চারপাশ। মধ্যরাতের সেই সূর্যের আলোয় আপনি পথে হাঁটছেন! অবিশ্বাবিস্তারিত পড়ুন
কল্পনা করুন তো, গভীর রাত। সুনসান নীরবতা চারদিকে। আপনি কোনো কারণে বাইরে বের হয়ে দেখতে পেলেন সূর্যটা ডুবে না গিয়ে ঝুলে আছে দিগন্তে। সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত কমলা আলোকরশ্মিতে আলোকিত হয়ে আছে দিগন্ত। অপার্থিব সেই আলোর আভায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে প্রকৃতি, চারপাশ। মধ্যরাতের সেই সূর্যের আলোয় আপনি পথে হাঁটছেন! অবিশ্বাস্য, তাই না? মধ্যদিবসের সুনীল আকাশে প্রজ্জ্বলিত সূর্য দেখতেই আমরা অভ্যস্ত। সেই আমাদেরকে যদি মধ্যরাতের অন্ধকার আকাশে জ্বলন্ত সূযের কথা বলা হয় তাহলে চোখ কপালে উঠতেই পারে।
কিন্তু গভীর নিশীথে সূর্যের দর্শন কোন অবাস্তব বা অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা নয়। ‘নিশীথ সূর্য (Midnight Sun)’ একটি অত্যাশ্চর্য প্রাকৃতিক ঘটনা। এক্ষেত্রে সূর্য দিনশেষে দিগন্তের ওপারে টুপ করে হারিয়ে যায় না, দিগন্তে স্থির থাকে। মানে এই ঘটনায় সাধারণত দিনের ২৪ ঘন্টাই সূর্যের আলো পাওয়া যায়। কখনো যদি সূর্য ডোবেও, তাহলে সেটা মাঝরাতে। ভোরে আবার সূর্য উদিত হতে দেখা যায়। নিশীথে সূয্যিমামার দেখা পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে ইউরোপের দেশ নরওয়েতে।
নরওয়ের নিশীথ সূর্য; Source: pinterest
আমাদের অনেকেরই জানা আছে নিশ্চয়ই, নরওয়েকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বলা হয়। উত্তর নরওয়েতে প্রতিবছর গ্রীষ্মকালের কিছু সময়ে মাঝরাত্রেও সূর্য দেখা যায় বলেই এই আজব উপনামটি জুটেছে দেশটির কপালে ।
নরওয়েই কি একমাত্র ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’?
মানুষ শুধু নরওয়েকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ হিসেবে চিনলেও পৃথিবীতে আরো অনেক স্থান আছে যেখানে সূর্য সারারাত জেগে থাকে। আসলে সুমেরুবৃত্ত (উত্তর মেরু থেকে ২৩.৫ ডিগ্রী অক্ষাংশ দূরে আঁকা একটি কাল্পনিক রেখা) থেকে উত্তরে অবস্থিত এবং কুমেরুবৃত্ত (দক্ষিণ মেরু থেকে ২৩.৫ ডিগ্রী অক্ষাংশে কল্পিত রেখা) থেকে আরো দক্ষিণে অবস্থিত স্থানগুলোতে গ্রীষ্মকালে অস্ত যায় না। এজন্য এই জায়গাগুলোতে স্থানীয় সময় যখন মধ্যরাত, তখনও আকাশের দিকে তাকালে সূর্য দেখতে পাওয়া যায়। কুমেরুবৃত্তের পরে গবেষকদের তাঁবু ছাড়া আর কোনো জনবসতি নেই। তাই আমরা সেই এলাকার কোনো জায়গার কথা জানি না। তবে সুমেরুবৃত্ত পেরিয়ে গেলে অনেক জায়গা আছে যেখানে লোকবসতি আছে। আমরা জানবো সেই স্থানগুলোর কথা।
সুইডেনের সূর্যালোকস্নাত রাত; Source:Sofia wellness journeys
উত্তর মেরুর আগে, সুমেরুবৃত্তের পর আছে কানাডার বেশ কিছু এলাকা- আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, গ্রীনল্যান্ড, রাশিয়ার কিছু অংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা।
ফিনল্যান্ডের নৈশ সূর্য ; Source:indrashishghosh.com
ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে উত্তরের স্থানে প্রায় দুই মাস সূর্য অস্ত যাওয়ার কথা ভাবেও না। আর ইউরোপের সর্বউত্তরের লোকবসতি নরওয়ের ভালবার্দ দ্বীপপুঞ্জে মোটামুটি ১৯ এপ্রিল থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সূর্যমামা দিগন্তে গা এলিয়ে বিশ্রাম নেন।
নর্থ কেপ, নরওয়েতে রাতের সূর্য দেখার ভীড়; Source: nordic travel
তাহলে, দেখা যাচ্ছে নরওয়ে ছাড়াও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সবগুলো দেশ, এমনকি স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বাইরের অনেক এলাকায় নিশীথ সূর্যের দেখা মেলে। ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই মূলত নরওয়েতে এই আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। নরওয়ের অধিবাসীরা রাতে সূর্য দেখে আর আমরা দিনে দেখি। নরওয়ের গ্রীষ্মকালটা হয় দারুণ সুন্দর। কড়া রোদে বরফ গলে হিমবাহ বয়ে যায়, পাহাড়ি ঝর্ণারা গান গায়। রঙ-বেরঙের ফুলে রঙিন হয়ে ওঠে প্রকৃতি। যেহেতু এ সময় সূর্য ডোবে না। তাই চাইলে সারাদিনই আপনি ঘুরে বেড়াতে পারবেন। গ্রীষ্মে নরওয়েতে ‘মিডনাইট সান’ নামক উৎসবের আয়োজন করা হয়।
আচ্ছা, নিশ্চয়ই আপনার সাথে এমন ঘটনা ঘটেছে যে দিনে কোনো উৎসবে গিয়েছেন, কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় বাসায় চলে আসতে হয়েছে। তখন আফসোস করে ভেবেছেন, দিনটা যদি শেষ না হতো! আপনার এই ইচ্ছা পূরণ হতে পারেন নরওয়েতে! এখানে যেহেতু সূর্য ডোবে না, প্রাকৃতিকভাবে রাত হয় না। তাই এখানেই কেবল সম্ভব অফুরন্ত দিবস উৎসব। ‘মিডনাইট সান ফেস্টিভ্যাল’ হচ্ছে এমনই একটি উৎসব। এই সময় নরওয়ে থাকে উল্লাসে পরিপূর্ণ। তবে কি নরওয়ের মানুষজন ঘুমায় না? ঘুমায় তো। এখানে রাত হয় ঘড়ির কাঁটায়। কাজকর্ম চলে ঘড়ি ধরে। কারণ আবহাওয়া আর সূর্য দেখে সময় বোঝার উপায় থাকে না। আর রাতে সূর্য আসলে কতটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তা নির্ভর করে আবহাওয়া, কুয়াশা, আকাশের মেঘ প্রভৃতি বিষয়গুলোর উপর।
নিশীথ সূর্য দীর্ঘসময় থাকলে
আমরা জেনেছি, দুই মেরু থেকে অগ্রবর্তী এলাকায় বছরের বিশেষ সময়ে মধ্যরাতে সূর্য দেখতে পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি মেরুর কাছাকাছি বা মেরুতে যাওয়া যায় তাহলে কী ঘটবে? সুমেরু বা কুমেরুবৃত্ত থেকে যতই মেরুর কাছাকাছি যাওয়া যায় ততই দীর্ঘদিন ধরে মাঝরাতে সূর্য দেখতে পাওয়া যায়। উত্তর বা দক্ষিণ মেরুতে সবচেয়ে বেশিদিন রাতে সূর্য আলো দেয়। আর এই সময়টা হচ্ছে ছয় মাস। এই ব্যাপারটিকেই বলা হয় মেরুদিবস। মেরুর বরফঢাকা প্রান্তরে কমলা রঙের বলের মতো সূর্য দিগন্তে ঠায় দাড়িয়ে থাকে যেন কার অপেক্ষায়।
দক্ষিণ মেরুতে সূর্যরাঙা রাত; Source: twanight
ক্ষীণ অন্ধকারে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে নানা আকৃতির বরফখন্ডের আনাচে-কানাচে। অপার্থিব সুন্দর হয়ে প্রতিভাত হয় সেই দৃশ্য! সেই সাথে রহস্যময়ও বটে! একসময় সূর্যের অপেক্ষার পালা শেষ হয়। আসে মেরুরাত্রি। দীর্ঘ ছয় মাস অন্ধকারে ডুবে থাকে মেরু। সময় বয়ে চলে। আবার সূর্য ওঠে। তাহলে বলা যায়, নরওয়ের নিশীথ সূর্য মেরুদিবসের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ মাত্র।
শুভ্র রাত্রি (White night)
রাতে তো থাকে অন্ধকারের রাজত্ব। চন্দ্র বা নক্ষত্রের আলো না থাকলে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই রাত কিভাবে সাদা হতে পারে? অবাস্তব শোনাচ্ছে, তাই না? সাদা রাত্রি বা হোয়াইট নাইট আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্য না ঠেকলেও নিশীথ সূর্যের মতোই এটিও একটি বাস্তব ঘটনা। একটি প্রাকৃতিক বিস্ময়। সুমেরুবৃত্ত বা কুমেরুবৃত্ত থেকে কিছুটা আগে, নিরক্ষরেখা থেকে ষাট ডিগ্রী চৌত্রিশ মিনিট অক্ষাংশের একটু পরে অবস্থিত স্থানগুলোতে গ্রীষ্মকালে মধ্যরাতে সূর্য না দেখা গেলেও মধ্যরাতে গোধূলীর (Midnight Twilight) দেখা মেলে। এ স্থানগুলো দিগন্ত থেকে ৬ বা ৭ ডিগ্রী নিচে থাকে। এই জায়গাগুলোতে সারারাত গোধূলীর আকাশের মতো মৃদু সূর্যের আলো থাকে। এ আলোয় পড়াশোনা বা দিনের অন্যান্য কাজ করা যায়। রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গ সাদারাত্রির জন্য বিখ্যাত।
সেইন্ট পিটার্সবার্গের শ্বেতরজনী; Source: private russia
বছরের ১১ জুন থেকে ২ জুলাই সময়টাতে এখানে স্থানীয় সময় যখন মাঝরাত, তখন গোধূলী প্রত্যক্ষ করা যায়। জুন মাসের শেষ ১০ দিন এখানে বিশেষ আয়োজন থাকে, নাম White Night Festival। হোয়াইট নাইট ফেস্টিভ্যালে নানারকম জমকালো উৎসবের আয়োজন করা হয়।
হোয়াইট নাইট ফেস্টিভ্যাল,সেইন্ট পিটার্সবার্গ; Source: lonely planet
এ উপলক্ষ্যে আকাশে চোখ ধাঁধানো আতশবাজির প্রদর্শনী চলে। আর রক্তলাল রঙের পালতোলা নৌকা নানা রঙের আলোয় সাজিয়ে পানিতে ভাসানো হয়।
চোখধাঁধানো সাজের স্কারলেট সেইল; Source: saintpetesburg.com
এ সময়টাতে স্কুলের শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়ায় নিশ্চিন্তে আনন্দে মাতে ছেলেমেয়েরা। উচ্ছ্বাস-আনন্দে বিভোর থাকে সেন্ট পিটার্সবার্গ।
নিশীথ সূর্যের ঘটনা কেন ঘটে?
আসলেই কৌতুহলউদ্দীপক ব্যাপার, তাই না? মাঝরাতে সূর্য! এমনটা হয় কেন? সূর্যটা ডোবে না কেন? তবে কি সূর্য ডুবতে ভুলে যায়? উত্তরটা জানি চলুন। আমরা জানি, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে পশ্চিম-পূর্বে আবর্তন করছে। আবর্তন করার সময় পৃথিবী নিজ অক্ষের উপর একটু হেলে থাকে। একটু বলতে পৃথিবী এর মেরুরেখার সাথে ২৩.৫ ডিগ্রী কোণ করে হেলে থাকে। কখনো হেলে থাকে উত্তর গোলার্ধের দিকে, কখনো দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে। যখন যে গোলার্ধ সূর্যের দিকে থাকে সেই গোলার্ধে সূর্যরশ্মি খাড়াভাবে পড়ে এবং দীর্ঘসময় সূর্যের আলো পাওয়া যায়। ফলে দিন বড় হয়, রাত ছোট হয়। অক্ষাংশ যত বেশি হয় দিন তত বড় হয়। সূর্যের গ্রীষ্মকালীন উত্তরায়নের বা দক্ষিণায়নের সময় অনেক বেশি অক্ষাংশে অবস্থিত জায়গাগুলোতে গ্রীষ্মকালে সূর্য অস্ত যায় না।
তখন মেরু থেকে ১০০ কি.মি. এর মধ্যে অবস্থিত জায়গাগুলোতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত টানা সূর্যাস্ত ঘটে না, আর মেরুতে ছয় মাস। এর বিপরীত ঘটনা ঘটে শীতকালে। মেরুতে পূর্ব দিগন্তে উঁকি দিতেই পারে না ছয় মাস পর্যন্ত। আর মেরুর আগের স্থানগুলোতে কয়েক সপ্তাহ টানা রাত থাকে। উত্তর মেরুতে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর টানা ছয় মাস দিন থাকে আর এ সময় দক্ষিণ গোলার্ধে টানা ছয় মাস থাকে রাত। আর দক্ষিণ গোলার্ধে যখন দিন তখন উত্তর গোলার্ধে রাত। এই এতসব আশ্চর্য ঘটনার কারণ একটাই, পৃথিবীর হেলে থাকা। এজন্যই পৃথিবী ঋতু বৈচিত্র্যের কল্যাণে একেক রুপে সাজে, এজন্যই নিশীথ সূর্য বা নিশীথ গোধূলীর মতো বিস্ময়কর ঘটনার অবতারণা ঘটে।
সংক্ষেপে দেখুনআপনার রক্তের গ্রুপ অনাগত সন্তানের মৃত্যুশঙ্কার কারণ হতে পারে, কিন্তু কিভাবে?
মানুষের জন্মের এমন একটি পরিস্থিতি নিয়ে আজকের লেখায় আলোচনা করা হবে, যেটি জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলেও অনেকেই জানেন না। আমাদের দেশে বিয়ের সময় দুই পক্ষের অনেক কিছুই পরস্পরের বোঝাপড়ার বিষয় হয়ে থাকে, কিন্তু এই ব্যাপারটি উপেক্ষিত হয় সবসময়। শুরুতেই জানা যাক লেখার সেই মূল বিষয়টি- স্বামী-স্ত্রীবিস্তারিত পড়ুন
মানুষের জন্মের এমন একটি পরিস্থিতি নিয়ে আজকের লেখায় আলোচনা করা হবে, যেটি জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলেও অনেকেই জানেন না। আমাদের দেশে বিয়ের সময় দুই পক্ষের অনেক কিছুই পরস্পরের বোঝাপড়ার বিষয় হয়ে থাকে, কিন্তু এই ব্যাপারটি উপেক্ষিত হয় সবসময়। শুরুতেই জানা যাক লেখার সেই মূল বিষয়টি- স্বামী-স্ত্রীর রক্তের একটি কম্বিনেশনে সন্তানের জন্ম হতে পারে মারাত্মক প্রাণঘাতী জন্ডিস রোগ নিয়ে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে বলা হয় ইরাইথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস (Erythroblastosis Fetalis)।
মায়ের রক্ত নেগেটিভ আর গর্ভের সন্তানের রক্ত পজিটিভ; Source: http://www.medindia.net
এই রোগটি সন্তানে কেবল তখনই হয়, যখন পিতার রক্ত হয় পজিটিভ গ্রুপের, আর মায়ের রক্ত নেগেটিভ গ্রুপের। Rh Factor-এর রক্তে উপস্থিতি-অনুপস্থিতির ভিত্তিতে এই পজিটিভ-নেগেটিভ নির্ণয় করা হয়ে থাকে। Rh Factor উপস্থিত থাকলে রক্তটি পজিটিভ গ্রুপের, অনুপস্থিত থাকলে রক্তটি নেগেটিভ। পজিটিভ রক্তবাহী স্বামী ও নেগেটিভ রক্তবাহী স্ত্রী ব্যতীত অন্য কোনো ক্ষেত্রে সমস্যাটি দেখা দেয় না। তাছাড়া আমাদের দেশে নেগেটিভ রক্তবাহী খুবই কম, নারীর ক্ষেত্রে সেই হিসেব আরো কমে আসে। তাই না জেনে বিয়ে করলেও দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই পজিটিভ রক্তবাহী। আমাদের দেশের মানুষের জন্য বিষয়টি শাপে-বর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যেহেতু সচরাচর চোখে পড়ে না মানুষের মাঝে রোগটি, আমরা রয়ে যাই অজ্ঞতার মাঝে। আমাদের আর জানা হয়ে উঠে না, আমাদেরই অবিবেচনায় সন্তানের শরীরে দেখা দিতে পারে প্রাণঘাতী এক রোগ, এই রোগ নিয়েই সে জন্মায়, আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেখানে তাকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। সন্তানের শরীরের পুরো রক্ত বদলে দিয়ে যদিও বাঁচানো সম্ভব, আপনিই ভেবে বলুন, এমন জটিল পদ্ধতি আপনার সন্তানের জন্য বেছে নেবেন কিনা। চিকিৎসা বিজ্ঞান চিকিৎসা বাতলে দিয়েছে, সমাধান দিয়েছে। তবে এই সমাধানের চেয়ে প্রতিরোধ করে নেওয়াটাই সর্বোত্তম।
এই রোগের ব্যাপারটি বুঝতে হলে আপনাকে বুঝতে হবে অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি বিষয়গুলো। এগুলো আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত। একজন মানুষের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক শক্তিশালী। আমরা প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ জীবাণু আর ধুলাবালি নাক-মুখ, হাত, খাবার, কিংবা পানির মাধ্যমে গ্রহণ করে থাকি, আমাদের এতদিন পর্যন্ত বাঁচা সম্ভব হতো না যদি শরীরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকতো। আমাদের যে সামান্য জ্বর হয়, যাকে আমরা রোগ বলে জানি, এটি আসলে রোগ নয়, রোগের লক্ষণ। শরীরের তৃতীয় এবং সর্বশেষ স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর একটি হলো এই জ্বর। জ্বর হলো শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে জীবাণুগুলো ধ্বংস করার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। প্রতিরক্ষার ব্যাপারে বিস্তারিত বলা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তবে আজকে যে রোগটি নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি তা পুরোপুরি বুঝতে হলে অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি ব্যাপারগুলো নিয়ে ধারণা থাকা প্রয়োজন।
এই রোগটি সন্তানে কেবল তখনই হয়, যখন পিতার রক্ত হয় পজিটিভ গ্রুপের, আর মায়ের রক্ত নেগেটিভ গ্রুপের; source: hotelwkrakowie.info
শরীরের কোনো অংশ কিংবা অঙ্গ হলো শরীরের নিজস্ব সম্পত্তি। আপনি কারো শরীরের একটি কিডনি সরিয়ে অন্য কারো থেকে কিডনি নিয়ে বসিয়ে দিলেন। কিডনি তো কিডনি, তার তো আর বোধশক্তি নেই, সে কীভাবে বুঝবে তাকে অন্য শরীরে নেওয়া হয়েছে, সে তার মতো করে কাজ করে যাবে। কিন্তু কাজে বিঘ্ন ঘটাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি। দেহের T-lymphocyte তাকে শনাক্ত করে ফেলবে যে, এই বস্তু এই শরীরের নয়। তখন সেটি অ্যান্টিবডি সিস্টেমকে সজাগ করে তুলবে। অ্যান্টিবডি সিস্টেমকে নির্দেশ দেওয়াই আছে, কোনো বস্তুকে নিজস্ব সম্পত্তি বলে শনাক্ত না করা গেলেই সেটিকে ধ্বংস করে ফেলার উদ্যোগ নিতে হবে। শরীরে জীবাণু প্রবেশ করলে এভাবেই ব্যবস্থা নেয় অ্যান্টিবডি। এখন অ্যান্টিবডি কীভাবে বুঝবে যে, তার ভালোর জন্যেই খারাপ কিডনী পাল্টে ভালো কিডনী রাখা হয়েছে শরীরে, সে তো তার দায়িত্ব পালন করে যাবে।
শরীরে বাইরে থেকে যা প্রবেশ করলো কিংবা প্রবেশ করানো হলো, জীবাণু হোক অথবা কোনো অঙ্গ, তারা হলো অ্যান্টিজেন। অ্যান্টিবডি অ্যান্টিজেনকে শনাক্ত করা মাত্রই আর বাঁচতে দেবে না।
এই অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডির সংঘর্ষেই তৈরি হয় Erythroblastosis Fetalis নামক রোগটি। বিষয়টি পুরোটাই রক্তের সাথে সম্পর্কিত।সন্তানের দেহে এই রোগ তৈরি হবে কিনা, তা নির্ভর করে পিতা-মাতার রক্তের গ্রুপের উপর। রক্তের গ্রুপগুলো তৈরি করে রক্তে অবস্থানকারী কিছু অ্যান্টিজেন। কথা উঠতে পারে যে, তাহলে এই অ্যান্টিজেনগুলো অবস্থান করে কীভাবে। সেটা অন্য ব্যাপার; সংক্ষেপে বলা যায়, শরীরের কিছু নিজস্ব অ্যান্টিজেন রয়েছে, যা মানুষে মানুষে ভিন্নরূপে থাকে, এগুলোকে শনাক্ত করে মনে রাখাটাও T-lymphocyte-এরই কাজ।
মায়ের রক্তে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি গর্ভের সন্তানের রক্তে প্রবেশ; Source: citybeauty.info
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, পিতা-মাতার মাঝে যেকোনো একজন পজিটিভ রক্তবাহী হলেই সেটি সন্তানের রক্তে সঞ্চালিত হবে। এই কারণটিই সন্তানের রক্তে জটিলতা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। একজন নেগেটিভ রক্তবাহী নারীর অবশ্যই উচিৎ একজন নেগেটিভ রক্তবাহী পুরুষকে বিয়ে করা। কেবলমাত্র তখনই সন্তানের রক্ত সম্পর্কিত কোনো রোগের ঝুঁকি থাকে না। নেগেটিভ রক্তবাহী নারী যদি পজিটিভ রক্তবাহী পুরুষকে বিয়ে করে, তাহলে সন্তানের রক্তে জটিলতাটি দেখা দেয়। উল্টোটা যদি হয়, মানে পুরুষ নেগেটিভ, নারী পজিটিভ, তবে কোনো ভয় নেই। কেননা সন্তান থাকে মাতৃগর্ভে। সন্তানের রক্ত পজিটিভ গ্রুপের, মায়ের রক্তও পজিটিভ, এখানে অ্যান্টিবডি সিস্টেম কিছুই করতে পারবে না। কেননা সন্তানের রক্তে যেমন পজিটিভ সৃষ্টিকারী অ্যান্টিজেন রয়েছে, তা মায়ের রক্তেও রয়েছে। সুতরাং অ্যান্টিবডি সিস্টেম এখানে পার্থক্য করতে পারবে না।
অ্যান্টিবডি সিস্টেম তখনই কার্যকর হয়, যখন সে কোনো অ্যান্টিজেনের উপস্থিতি টের পায়। ধরা যাক, পিতার রক্ত পজিটিভ আর মায়ের রক্ত নেগেটিভ হওয়াতে সন্তানের রক্ত পজিটিভ। পজিটিভ রক্ত নিয়ে সন্তান মাতৃগর্ভে অবস্থান করে আছে। মায়ের সাথে সন্তানকে যুক্ত করে Placenta, Umbilical Cord দিয়ে। এই Umbilical Cord একপ্রান্তে মায়ের Placenta-তে আর অপরপ্রান্তে সন্তানের Umbilicus অর্থাৎ নাভীর সাথে যুক্ত থাকে। এটাই মাতৃগর্ভে আমাদের সবার পরিবহন ব্যবস্থা। মায়ের শরীর থেকে রক্ত-পুষ্টি সবই সন্তানে আসে এর দ্বারা। এখন এই অবস্থায় মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে আসা রক্ত যদি পুনরায় ফিরে যায় মায়ের প্রবাহে, তখনই বিপত্তি বাঁধে, এমনটা হয় সাধারণত সন্তান জন্মের সময়তেই।
রক্তের লোহিত কণিকা মূলত প্রধান পরিবাহক রূপে কাজ করে থাকে; Source: wallpaperscraft.com
প্রত্যেক জীবিত প্রাণীর শরীরে সবকিছু পরিবহনের দায়িত্ব পালন করে থাকে রক্ত। মা ও সন্তানে যোগাযোগ রক্ষা করে তাদের দু’জনের রক্ত। মায়ের রক্ত যখন নেগেটিভ আর সন্তানের রক্ত পজিটিভ, তখন মায়ের রক্ত সন্তানের রক্তে খাবার নিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসবে এক নতুন অ্যান্টিজেনের তথ্য নিয়ে। অ্যান্টিবডি সিস্টেম কিন্তু এটা সহ্য করবে না। সেই অ্যান্টিজেনকে হত্যা করতে উপযুক্ত অ্যান্টিবডি তৈরিতে হাত দেবে। এটাই একমাত্র কারণ এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথম সন্তানটির কোনো ক্ষতি না হওয়ার। কেননা পূর্ব থেকে অ্যান্টিবডি সিস্টেমের জানা নেই যে, এমন পজিটিভ কোনো অ্যান্টিজেন থাকতে পারে। সে অ্যান্টিজেনের সংস্পর্শে গিয়েই তবে চিনতে পারে, সাথে সাথে উপযুক্ত হত্যাকারী অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শুরু করে। প্রথম সন্তানের অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করা কিছু সময়সাপেক্ষ ও ধীরগতির ব্যাপার। কিন্তু একই অবস্থায় দ্বিতীয় সন্তান হলে তখন কিন্তু আর অ্যান্টিবডি প্রস্তুতের প্রয়োজন নেই, অ্যান্টিবডি আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখা আছে।
মানুষের এমন কিছু রোগ হয়, যেগুলো জীবনে একবার হলে আর হয় না। এমন অনেকগুলো রোগের নাম আপনারাই বলতে পারবেন। এই রোগগুলো শরীরে দেখা দিলে, অ্যান্টিবডি সিস্টেম উপযুক্ত অ্যান্টিবডি তৈরি করে সেই রোগগুলোকে প্রতিহত করে। সেই সাথে রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুগুলোকেও চিনে রাখে ভালোমতো। পরের বার এদের উপস্থিতি শরীর টের পেলেই ধ্বংস করে দেয়, কারণ অ্যান্টিবডি আগে থেকেই যে তৈরি হয়ে আছে।
প্রথম সন্তান গর্ভে থাকাকালীন মায়ের রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, সেই অ্যান্টিবডি মায়ের রক্ত হয়ে দ্বিতীয় রক্তে প্রবেশ করছে; Source: nursetecmilenio.blogspot.com
যে রোগটি নিয়ে আজকের লেখা, ফিরে আসি সেটির ব্যাপারে। রোগটি মূলত নবজাতকের দেহে জন্ডিস আর অ্যানিমিয়ার সংমিশ্রণ। মানুষের শরীরের রক্তে লোহিত কণিকা রয়েছে, এগুলোর কারণেই রক্ত লাল দেখায়। লোহিত কণিকা যদি পরিমাণে স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে, তখন তাকে অ্যানিমিয়া বলা হয়। ইরাইথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিসের ক্ষেত্রেও লোহিত কণিকা কম থাকে। মা-সন্তানের পজিটিভ-নেগেটিভ জটিলতায় সন্তানের রক্তের লোহিত কণিকাগুলো ভাঙতে শুরু করে। লোহিত কণিকার ভেতর হিমোগ্লোবিন অবস্থান করে। হিমোগ্লোবিনগুলো মুক্ত হয়েই বিলিরুবিনে পরিবর্তিত হয়ে যায়। আর এই বিলিরুবিনের উপস্থিতি কীভাবে বোঝা যায়, সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই আপনাদের জানা আছে। বিলিরুবিনের রং হলুদ, তাই এটি ত্বকের নিচে যখন জমা হয়, ত্বক কিংবা চোখ হলুদ দেখি আমরা। বিলিরুবিনের উপস্থিতিতে হলুদ রঙের আবির্ভাবই কিন্তু জন্ডিস রোগ। মা-বাবার রক্তসংক্রান্ত জটিলতায় সন্তানটি মারাত্মক প্রাণঘাতী জন্ডিস রোগ নিয়ে জন্ম নেয় এভাবে। এই রোগ হলে অধিকাংশ সময়েই বাচ্চাকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। যদি সন্তান মাতৃগর্ভে থাকাকালীন টের পাওয়া যায় সন্তানে জন্ডিসের আবির্ভাব ঘটেছে, তখন বাচ্চাটিকে নির্দিষ্ট সময়ের যতটুকু পূর্বে সম্ভব ডেলিভারির ব্যবস্থা করা হয়, জন্মের পর তাকে বাঁচাতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাতৃগর্ভে অবস্থানকারী একটি সন্তানের Viable Age হলো আটাশ সপ্তাহ। অর্থাৎ আটাশ সপ্তাহের পূর্বে সন্তান জন্মালে সেই সন্তানকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।
গর্ভবতী অবস্থায় যদি একজন নেগেটিভ রক্তবাহী নারী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, চিকিৎসক প্রথমেই রক্ত পরীক্ষা করতে চাইবেন। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে, পূর্ববর্তী সন্তান জন্মদানের কারণে রক্তে অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি রয়েছে কিনা। নারীর রক্তে যদি চিকিৎসক এই অ্যান্টিবডি খুঁজে পান, তবে তিনি বুঝে নেবেন, উনার বর্তমান সন্তান মৃত্যুঝুঁকির মাঝে রয়েছে, অতিসত্ত্বর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। মাতৃগর্ভে অবস্থানকারী সন্তানকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফিটাস বলা হয়। ফিটাসের আটাশ সপ্তাহ পূর্ণ হলে, মায়ের রক্তে Rh Immunoglobulin ইনজেকশন দেয়া হয়। মায়ের শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টি-Rh-কে প্রতিহত করে এই ইনজেকশন। সন্তান জন্মের পর ৭২ ঘণ্টার মাঝে আবারো এই ইনজেকশন প্রদান করা হয়, এটি দেওয়া হয় নিশ্চিতকারকরূপে। কারণ সন্তান জন্মদানের সময় Umbilical Cord কাটার কারণে রক্তক্ষরণ হয়, তখন যেন মায়ের রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি না হতে পারে তাই ইনজেকশন আবার দেওয়া হয়।
ইরাইথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস এর লক্ষণ; source: medindia.net
আর একটি ফিটাসের যদি Viable Age এর আগেই অ্যানিমিয়া দেখা দেয়, তখন ফিটাসের শরীরে রক্ত সঞ্চালন করা হয়। হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি এমন প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো গঠিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা হয়। এগুলো গঠিত হলেই ফিটাসের নির্দিষ্ট সময় পূর্বেই ডেলিভারি করা হয়।
সন্তানকে বাঁচাতে সর্বশেষ যে চিকিৎসা দেওয়া হয়, তা হলো শরীরের রক্ত পরিবর্তন। আগেই বলা হয়েছে, প্রথম সন্তানটি কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হয় না এক্ষেত্রে। দ্বিতীয় সন্তানটি যদি প্রচণ্ড মাত্রায় জন্ডিস নিয়ে জন্মায়, পুরো শরীর হলুদ হয়ে থাকবে তার, দেখেই বোঝা যাবে। সেই সন্তানের রক্ত পজিটিভ গ্রুপের, প্রতিনিয়ত লোহিত কণিকা ভেঙে যাচ্ছি অ্যান্টিবডির উপস্থিতিতে। এমতাবস্থায় শিশুটিকে বাঁচাতে এক জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। শরীর সমস্ত রক্ত বের করে নেগেটিভ রক্ত দিয়ে পূর্ণ করা হয়; তবু যদি বাঁচানো যায়। সম্পূর্ণ রক্ত একেবারে বের করা হয় না, অল্প অল্প রক্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে এই অসাধ্য সাধন করা হয়। এছাড়াও বেশ কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় সন্তানটি যদি প্রচণ্ড মাত্রায় জন্ডিস নিয়ে জন্মাতে পারে; source: citybeauty.info
মায়ের শরীরে যদি একবার অ্যান্টি-Rh উৎপন্ন হয়ে যায়, তাহলে Rh Immunoglobulin ইনজেকশন কোনো কাজে আসবে না। এটাই প্রথম চিকিৎসা, এর মাধ্যমে প্রতিহত করা মঙ্গলজনক। তাই স্বামী-স্ত্রীর রক্ত যদি এই পজিটিভ-নেগেটিভ কম্বিনেশনের হয়ে থাকে, তবে প্রথম থেকেই চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নিন।
দিন যতই যাবে, বিজ্ঞান নিত্য-নতুন পদ্ধতি উপহার দেবে আমাদের। একসময় এর সমাধান ছিলো না, সন্তান তীব্র জন্ডিসের কারণে জন্মের পর পরই মারা যেত কিংবা মায়ের গর্ভপাত হয়ে যেত। এখন সমাধান এসেছে এই জটিল রোগের। বলছি না যে, সমাধানগুলো কার্যকর নয়, যথেষ্ট কার্যকর। তবু ঝুঁকি ও কৃত্রিমতা থেকে বেরিয়ে এসে সমস্যাটি প্রতিরোধ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
বিষাক্ত মাকড়সা কোনগুলো?
নিজের ঘরেই হোক কিংবা বনে-জঙ্গলে, মাকড়সা দেখে আঁতকে ওঠেন না বা এই প্রাণীকে এড়িয়ে চলে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে আট পা এবং ষোলো হাঁটুর এই প্রাণীটির প্রজাতির সংখ্যা প্রায় চল্লিশ হাজার। কাজেই এত সব প্রজাতির মধ্যে থেকে খুঁজে-বেছে সঠিক করে বলা মুশকিল যে, কোন মাকড়সাগুলো সবথেকে বেশি মারাত্মবিস্তারিত পড়ুন
নিজের ঘরেই হোক কিংবা বনে-জঙ্গলে, মাকড়সা দেখে আঁতকে ওঠেন না বা এই প্রাণীকে এড়িয়ে চলে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে আট পা এবং ষোলো হাঁটুর এই প্রাণীটির প্রজাতির সংখ্যা প্রায় চল্লিশ হাজার। কাজেই এত সব প্রজাতির মধ্যে থেকে খুঁজে-বেছে সঠিক করে বলা মুশকিল যে, কোন মাকড়সাগুলো সবথেকে বেশি মারাত্মক। আবার বিভিন্ন মানুষের শরীরে একই মাকড়সার প্রভাব ভিন্নভাবে পড়তে পারে। এটি সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মাকড়সা বিষের প্রতি সংবেদনশীলতার উপরে।
আর্থ্রোপোডা (Arthropoda) পর্বভূক্ত এই প্রাণীটির প্রতি মানুষের মনে একপ্রকার ভীতি জন্ম নেয়। মাকড়সার প্রতি এই ভীতিকে বলা হয় আরাকনোফোবিয়া (Arachnophobia)। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫% এই মাকড়সাভীতিতে ভুগে থাকেন। জাস্টিন টিম্বারলেক কিংবা জে. কে. রাওলিং এর মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরাও এই তলিকার বাইরে নন। যদিও মাকড়সার চল্লিশ হাজার প্রজাতির মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক প্রজাতি আছে, যাদের নিয়ে মানুষের সত্যিকারের ভয় পাওয়ার কারণ আছে।
মাকড়সার সকল প্রজাতিরই দুটি বিষদাঁত থাকে। এই বিষদাঁতের মাধ্যমে মাকড়সা এর জালে আটক শিকারের শরীরে বিষ প্রয়োগ করে। এই বিষের প্রভাবে শিকার পতঙ্গের অভ্যন্তরের সবকিছু তরল হয়ে যায়। মাকড়সা এই তরল শুষে নিজের ক্ষুধা নিবৃত্ত করে। উল্লেখ্য, মাকড়সার বিষ মাকড়সার কোনো ক্ষতি করে না।
এখন জানা যাক সামগ্রিকভাবে বিষাক্ত কিছু মাকড়সা সম্বন্ধে যাদের নিয়ে মানুষের চিন্তার কারণ আছে।
ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডারিং স্পাইডার
এই তালিকার প্রথমেই আছে ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডারিং স্পাইডার (Brazilian wandering spider)। অনেকটা দক্ষিণ আমেরিকার উলফ স্পাইডারের মতো দেখতে হলেও ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডারিং স্পাইডার আকারে বড় এবং এর বিষের শক্তিমাত্রা বেশি। এই ধরনের মাকড়সার বিষ স্নায়বিকভাবে খুবই সক্রিয়। একে মাকড়সাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিষধর এবং বিপদজনক বলে মনে করা হয়ে থাকে।

ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডারিং স্পাইডার; Source: pexels.com
সাধারণত শিকারী প্রজাতির এই মাকড়সা প্রচুর ভ্রমণ করে থাকে। দিনের বেলায় এদের চলাচল কম হলেও রাতে এরা যথেষ্ট চলাচল করে। এরা যদি কখনো বিপদের আভাস পায় বা কোনো প্রাণীর স্পর্শ পায় সেক্ষেত্রে এরা নিজেকে বাঁচানোর জন্য কামড় বসাতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে এই কামড়ের মাধ্যমে কোনো বিষ প্রয়োগ করে না। এরা বিষ প্রয়োগ করে তখনই যখন এরা আঘাতপ্রাপ্ত হয় বা এদেরকে কোনোভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। সাধারণত এই প্রজাতির মাকড়সা প্রতিটি কামড়ের সাথে শক্তিশালী সেরোটনিন (Serotonin) সমৃদ্ধ বিষ প্রয়োগ করে যা মাংসপেশীতে তীব্র চোটের (Muscle shock) সৃষ্টি করে। এরপর আস্তে আস্তে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় যা একপর্যায়ে পক্ষাঘাতের সৃষ্টি করে।
এদের বিষকে কতিপয় বিপদজনক সাপের বিষের সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে। মাকড়সা জগতের দ্বিতীয় ভয়ংকর প্রজাতি ব্ল্যাক উইডোর বিষের থেকে এদের বিষ প্রায় বিশগুণ শক্তিশালী। বিষের শক্তিমাত্রা এতটাই বেশি যে, কামড়ের পর বিষের এন্টিডট অর্থাৎ এন্টিভেনম দেয়ার পরেও কামড়ের এক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যুর রেকর্ড আছে। শিশু এবং বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরো বেশি। কারণ তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে কম।
ব্ল্যাক উইডো স্পাইডার
মাকড়সা জগতে ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডারিং স্পাইডারের পরেই ব্ল্যাক উইডো স্পাইডারকে (Black widow spider) স্থান দেয়া হয়। এই কুখ্যাত প্রজাতির মাকড়সাকে এদের পেটে রঙিন বালিঘড়ির চিহ্ন দেখে শনাক্ত করা যায়। এই প্রজাতির মাকড়সা সাধারণত নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে বসবাস করে থাকে। পুরোনো ধাঁচের বাড়ি, কাঠের বাড়ি অথবা কাঠের স্তূপ এদের জন্য উপযুক্ত বসবাসের জায়গা। মজার ব্যাপার হলো, এই প্রজাতির স্ত্রী মাকড়সাই বেশি দেখা যায়, কারণ পুরুষ মাকড়সার সাথে মিলনের পরেই স্ত্রী মাকড়সা এদের খেয়ে ফেলে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই এই প্রজাতির নাম হয়েছে উইডো অর্থাৎ বিধবা।

ব্ল্যাক উইডো স্পাইডার; Source: jenniferharmancpt.com
ব্ল্যাক উইডো প্রজাতির মাকড়সার বিষ র্যাটলস্নেকের বিষের থেকে প্রায় ১৫ গুণ বেশি শক্তিশালী। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৯ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এই মাকড়সার কামড়ের জন্য প্রায় ৬৩ জনের মৃত্যুর রেকর্ড আছে। একই সাথে জানা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর বিষ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে (Poison Control Center) প্রায় ২,৫০০ জন ভর্তি হয় শুধুমাত্র এই প্রজাতির মাকড়সার কামড়ের কারণে। তবে এখন ভবন নির্মাণ কৌশলের আধুনিকতার কারণে এবং এন্টিভেনম আবিষ্কারের কারণে এই মৃত্যু নেই বললেই চলে।
এরা সাধারণত উগ্র প্রজাতির নয়। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কামড়ের সাথে বিষ প্রয়োগ করে না। কিন্তু কোনো কারণে বিষ প্রয়োগ করলে সেটি মাংসপেশীতে ব্যথার সৃষ্টি করে। এরপর আস্তে আস্তে ডায়াফ্রাম প্যারালাইজড হয়ে যায়, যার ফলে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে কেউ কেউ দাবী করেন, তারা এই অবস্থা থেকে সেরে উঠেছেন কয়েকদিন পরেই। এদের বিষের ফলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকে বলা হয় ল্যাট্রোডেকটিজম (Latrodectism)। উল্লেখ্য, ব্ল্যাক ঊইডো স্পাইডার, রেড ব্যাক স্পাইডার এবং ব্রাউন উইডো স্পাইডারের প্রকৃতি ও বিষক্রিয়া প্রায় একই রকম।
সিডনি ফানেল ওয়েব স্পাইডার
অস্ট্রেলিয়ার পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী এই প্রকার মাকড়সাকে প্রথম শ্রেণীর বিষাক্ত মাকড়সাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এদেরকে সাধারণত কোনোভাবে উত্তেজিত করার চেষ্টা করলে এরা বেশ উগ্ররূপ ধারণ করে। অর্থাৎ এই মাকড়সা অনেকটা বদমেজাজি ধরনের হয়ে থাকে। স্ত্রী মাকড়সা অধিকাংশ সময় এদের জালেই জীবন কাটায়। পুরুষ মাকড়সা গ্রীষ্মকালে মিলনের জন্য ঘোরাঘুরি করে থাকে।
সিডনি ফানেল ওয়েব (Sydney Funnel Web) মাকড়সার বিষদাঁত মাকড়সা জগতের মধ্যে সবথেকে বেশী নিখুঁত। এদের বিষদাঁত কতিপয় প্রজাতির সাপের থেকে উন্নত। তীক্ষ্ণ, সূচালো এই দাঁতের সাহায্যেই এই মাকড়সা এদের শিকারকে বা উত্যক্তকারীকে কামড় দেয় এবং বিষ প্রয়োগ করে। এদের দাঁত এতটাই তীক্ষ্ণ যে, চামড়ার জুতার ভেতর দিয়ে, এমনকি নখের উপর দিয়ে এরা কামড়াতে পারে।

সিডনি ফানেল ওয়েব স্পাইডার; Source: bbc.com
এদের বিষে অ্যাট্রাকোটক্সিন (Atracotoxin) নামক একপ্রকার যৌগ থাকে, যা স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলে। এদের বিষ পূর্বে বর্ণিত মাকড়সাদের থেকে খুব শক্তিশালী নয়। তবে এরা যখন কামড় দেয় তখন আক্রান্ত প্রাণীর সঙ্গে লেগে থেকে একের পর এক কামড় দিতে থাকে এবং প্রতি কামড়েই বিষ প্রয়োগ করতে থাকে। এভাবে যতক্ষণ না বিষের পুরো ডোজ প্রয়োগ করা না হয় ততক্ষণ কামড় চলেতে থাকে।
১৯২৭ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে এই প্রকার মাকড়সার কামড়ে নিশ্চিত মৃত্যুর রেকর্ড আছে ১৩ জনের এবং এদের কামড়ের পনেরো মিনিটের মধ্যে একটি বাচ্চার মৃত্যুর কথাও জানা যায়। তবে ১৯৮০ সালে এদের এন্টিভেনম আবিষ্কারের পর আর কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
রিক্লজ স্পাইডার
রিক্লজ স্পাইডারের (Recluse spider) মধ্যে দুই ধরনের মাকড়সার উল্লেখ পাওয়া যায় যারা বিষাক্ত। এরা হলো ব্রাউন রিক্লজ স্পাইডার এবং চিলিয়ান (Chilean) রিক্লজ স্পাইডার। মাথায় বেহালার মতো চিহ্ন থাকায় ব্রাউন রিক্লজ স্পাইডার ‘ভায়োলিন স্পাইডার’ বা ‘ফিডলার’ নামেও পরিচিত। অলস প্রকৃতির এই মাকড়সা সাধারণত জুতার মধ্যে বা কাপড়চোপড়ের মধ্যে বাসা বাধে। এর ফলে এরা সহজেই মানুষের সংস্পর্শে আসে এবং যদি কোনোভাবে এরা চাপ অনুভব করে তখন কামড় দেয়।

ব্রাউন রিক্লজ স্পাইডার; Source: phys.org
ব্রাউন রিক্লজ স্পাইডারের কামড় বিষাক্ত হয়ে থাকে। যদিও এদের কামড়ের ফলে কোনো মৃত্যুর রেকর্ড পাওয়া যায় না। এদের বিষ সাধারণত ক্ষয়কারী। এদের কামড়ের ফলে অত্যধিক টিস্যুক্ষয় এবং সংক্রমণ দেখা দেয়। এই অবস্থাকে বলা হয় লক্সোসেলিজম (Loxoscelism)। এদের বিষের কোনো সঠিক প্রতিষেধক না থাকায় সম্পূর্ণ সারতে প্রায় এক মাস সময় লেগে যায়। কখনো কখনো টিস্যু অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্থ হলে গ্রাফটিং করার প্রয়োজন পড়ে।
এরপর আসে চিলিয়ান রিক্লজ স্পাইডার। এরাও ব্রাউন রিক্লজের মতো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে এবং এদের বিষক্রিয়াও মাংসপেশী ও টিস্যুর ক্ষয় করে থাকে।
সিক্স আইড স্যান্ড স্পাইডার
এই প্রকার মাকড়সা সাধারণত আফ্রিকার মরুভূমি অঞ্চলে পাওয়া যায়। এদের রিক্লজ মাকড়সাদের নিকটাত্মীয়ও বলা যেতে পারে। আকারে খানিকটা কাকড়ার মতো চ্যাপ্টা হওয়ার কারণে এদের ‘ক্র্যাব স্পাইডার’ও বলা হয়ে থাকে। মরুভূমির বালির মধ্যে আত্মগোপন করে থাকা এই মাকড়সা যেকোনো প্রাণীর জন্যেই আততায়ীর মতো ভূমিকা পালন করে।

সিক্স আইড স্যান্ড স্পাইডার; Spurce: realmonstrosities.com
মানুষের ক্ষেত্রে এদের কামড়ের ক্ষেত্রে কোনো সঠিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। ফলে এরা মানুষের জন্য কতটা বিষধর তা জানার উপায় নেই। তবে এখন পর্যন্ত দুজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এদের কামড়ের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা হয়। একজনের ক্ষেত্রে নেক্রোসিস অর্থাৎ মাংসপেশীর ক্ষয়ের ফলে একটি হাত পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে। অন্যজনের ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণের ফলে মৃত্যুর কথা জানা যায়। তবে খরগোশের ক্ষেত্রে এদের বিষের প্রভাব থেকে জানা যায় যে, ৫-১২ ঘন্টার মধ্যে খরগোশের মৃত্যু হতে পারে। এদের বিষে সাইটোটক্সিন (Cytotoxin) নামক যৌগের উল্লেখ পাওয়া যায় যা ক্ষয়কারী।
মাকড়সাভীতির বাইরেই অধিকাংশ মানুষের কাছেই মাকড়সা একটি ছোটখাট পতঙ্গ ছাড়া আর কিছুই না। এটা হতে পারে এই কারণে যে, আমাদের আশেপাশে যেসব মাকড়সা আছে তারা নিরীহ প্রকৃতির বা অতটা বিষাক্ত নয়। কিন্তু অবশ্যই সাবধান থাকা উচিত, কারণ কখন কোন মাকড়সার কামড়ে কী ক্ষতি হয়ে যায়!
অনুশোচনায় ভোগা আবিষ্কারকের তালিকায় কার কার নাম রয়েছে? কেনইবা তারা অনুশোচনায় ভুগেছেন সারাজীবন?
মানুষ নিত্যনতুন সমস্যার সমাধানের জন্য প্রতিনিয়তই নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে চলছে। ছোটখাট আবিষ্কার থেকে বড় বড় আবিষ্কারগুলোও মানুষের জীবনযাত্রা করে তুলছে আরো সহজ। ক্ষুদ্র সেফটি পিনও আজকাল জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ। আবিষ্কারকদেরও তাই স্মরণ করা হয় শ্রদ্ধাভরে। তবে কিছু কিছু আবিষ্কারক নিজেদের আবিষ্কার নবিস্তারিত পড়ুন
মানুষ নিত্যনতুন সমস্যার সমাধানের জন্য প্রতিনিয়তই নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে চলছে। ছোটখাট আবিষ্কার থেকে বড় বড় আবিষ্কারগুলোও মানুষের জীবনযাত্রা করে তুলছে আরো সহজ। ক্ষুদ্র সেফটি পিনও আজকাল জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ। আবিষ্কারকদেরও তাই স্মরণ করা হয় শ্রদ্ধাভরে।
তবে কিছু কিছু আবিষ্কারক নিজেদের আবিষ্কার নিয়ে ভুগেছেন হতাশায়। তাদের মতে, সেগুলো আবিষ্কার করাই ছিলো তাদের ভুল কাজ। আজ আমরা জানবো এমন সব আবিষ্কারের কথা, যেগুলোর জন্য পরবর্তীতে অনুতাপ করে গেছেন তারা।
ইথান জুকারম্যান – পপ আপ
এমআইটি’র অধ্যাপক ইথান জুকারম্যান তরুণ বয়সেই কোডিংয়ের উপর দক্ষ ছিলেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই ট্রাইপড ডট কম নামে এক ইন্টারনেট স্টার্ট আপের সাথে কাজ শুরু করেন তিনি।
১৯৯৬ সালে জুকারম্যানকে নতুনভাবে সাইটে বিজ্ঞাপন দেখানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর তখনই তিনি তৈরি করে বসেন পপ আপ অ্যাডস। পপ আপ এর আভিধানিক অর্থ হছে আকস্মিক বা হঠাৎ দৃশ্যমান। পপ আপ অ্যাডগুলো যেকোনো মূহুর্তে আপনার ব্রাউজকৃত সাইটে অনুমতি ছাড়া চলে আসবে। আর তাতে করেই মানুষের বিরক্তির উদ্রেক হয়। বেশিরভাগ মানুষই পপ আপ অ্যাডে নিজেদের বিরক্তির কথা জানান। সেই পরিপেক্ষিতে অপেরা মিনি সর্বপ্রথম পপ আপ অ্যাড ব্লক করার অপশন চালু করে। পরবর্তীতে মজিলা ফায়ারফক্স ও অন্যান্য ব্রাউজারগুলোতেও পপ আপ অ্যাড ব্লক করার সুবিধা যুক্ত করা হয়।
অবশ্য ইথান জুকারম্যান পরবর্তীতে নিজেই পপ আপ অ্যাড আবিষ্কারের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার কোডিংয়ের উদ্দেশ্য ছিলো ভিন্ন। কিন্তু শেষপর্যন্ত এভাবে ব্যাপারটা শেষ হওয়াও তিনি সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

মানুষের বিরক্তির উদ্রেক করা পপ আপ অ্যাডস; Image Source: The Times
ওয়েলি কনরন – ল্যাব্রাডুডল
অস্ট্রেলিয়ার রয়্যাল গাইড ডগ অ্যাসোসিয়েশন কুকুর ছানার বেড়ে তোলার জন্য এক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন ওয়েলি কনরন। ১৯৮০ সালে কনরনকে একজন অন্ধ মহিলাকে গাইড করানোর জন্য একটি নন শেডিং কুকুরছানার নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কনরন একটি গোল্ডেন ল্যাব্রাডরের সাথে একটি পোডল কুকুর ছানার সংকরায়নে ল্যাব্রাডুডল নামে নতুন এক প্রজাতির কুকুর ছানার আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে ল্যাব্রাডুডল নামে নতুন এই প্রজাতির এই কুকুর হয়ে ওঠে সবচেয়ে আকাঙ্খিত কুকুর ছানা। আপনি হয়তো ভাবছেন, এতে কনরন অনেক খুশি হয়েছিলেন। আদতে মোটেও তা নয়।
তার দেখাদেখি অন্য অনেকেই নতুন প্রজাতির কুকুর ছানা আবিষ্কারের নেশায় সব ধরনের প্রজাতির সংকরায়ণ শুরু করে। গোল্ডেনডুডল থেকে শুরু করে রোডলস, শিফুস ও আরো নানা জাতের হাইব্রিড কুকুরের উৎপত্তি হয়। যার ফলে নতুন প্রজাতির কুকুরগুলো বেশিরভাগই বিভিন্ন দৈহিক সমস্যা নিয়ে জন্মাতে শুরু করে।
এই প্রসঙ্গে পরে কনরন বলেছেন, তিনি একটি প্যান্ডোরার বক্স খুলেছেন। আর শত শত মানুষ টাকার লোভে নানা প্রজাতির কুকুর ছানা সংকরায়ন শুরু করে। অথচ কেউই অক্ষম কুকুর জন্মানোর হারের দিকে কর্ণপাত করলো না। নিজের আবিষ্কার নিয়ে বাকি সময় ধরে অনুতাপই করে গেছেন কনরন।

সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ল্যাব্রাডুডল কুকুর ছানা; Image Source: Wagberg
আনা জারভিস – মাদার্স ডে
উনিশ শতকের দিকে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে বসবাসরত আনা জারভিস নামে এক ভদ্রমহিলা ‘মাদার্স ডে ওয়ার্কস ক্লাব’ নামে একটি সংঘ গড়ে তোলেন। সংঘটির দায়িত্ব ছিলো সন্তানদের কীভাবে দেখভাল করতে হবে তা শিখিয়ে দেওয়া। পরবর্তীতে এই সংঘটির দ্বারাই সূচিত হয় মাদার্স ডে পালন করার প্রথা।
১৯০৫ সালে আনা জারভিসের মায়ের মৃত্যুর পর তিনি এই প্রস্তাব উত্থাপিত করেন। ১৯০৮ সালের ১০ মে আনা বিশেষভাবে তার মাকে স্মরণ করার জন্যে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার চার্চে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। ১০ মে-কে সরকারিভাবে মাদার্স ডে হিসেবে পালন করার জন্য ছুটিরও আবেদন করেন তিনি। ১৯১৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মাদার্স ডের জন্য সরকারি ছুটির ঘোষণা করেন।
সারাজীবন ক্যালেন্ডারে মাদার্স ডে-কে স্থান দেওয়ার জন্য লড়ে যাওয়া আনা জারভিস কিছুদিন পরই বেঁকে বসেন। তিনি চেয়েছিলেন মাদার্স ডে পালিত হবে পরিবার সহ ঘরোয়াভাবে। কিন্তু ক্রমেই পুরো দিনটি হয়ে ওঠে বাণিজ্যিক। সবাই ফুল কিংবা উইশকার্ডে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তিনি লোকজনকে এসব কিনতে নিষেধ করেন। কিন্তু সময়ের সাথে ব্যাপারটা হয়ে ওঠে আরো বাণিজ্যিক। ১৯২০ সালে তাই আবার সোচ্চার হয়ে ওঠেন জারভিস। এবার ঠিক উল্টো কারণে। আমেরিকান ক্যালেন্ডার থেকে মাদার্স ডে বাদ দেওয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করেন তিনি। অবশেষে তার মৃত্যুর পর ১৯৪৮ সালে ছুটির দিনটি উঠিয়ে নেওয়া হলেও মাদার্স ডে এখনো বিশ্বজুড়ে আড়ম্বরের সাথেই পালিত হয়।

পুরো বিশ্বজুড়ে বেশ আড়ম্বরের সাথেই পালিত হয় মা দিবস; Image Source: India .com
মিখাইল কালাশনিকভ – একে ৪৭
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মারণাস্ত্রের দিক দিয়ে জার্মানদের থেকে বেশ পিছিয়ে ছিলো রাশিয়ানরা। মিখাইল কালাশনিকভ নামে এক লোক, যিনি কি না ট্যাংক ইউনিটে কাজ করতেন, এক নতুন উদ্ভাবনী ক্ষমতা নিয়ে আবির্ভূত হন। ইতিমধ্যেই ট্যাংকের উন্নতি সাধন করে নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতার জানান দেন মিখাইল।
নাৎসি বাহিনীর সাথে পাল্লা দেওয়ার জন্য মিখাইল তৈরি করেন নতুন এক ধরনের মারণাস্ত্র। স্বয়ংক্রিয় সেই অস্ত্রটি টেকসই এবং হালকা হওয়ায় ক্রমেই তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একে ৪৭ নামের এই অস্ত্রটি হয়ে ওঠে সন্ত্রাসীদের প্রধান হাতিয়ার।
পরবর্তীতে নিজের এই আবিষ্কারের জন্য অনুতাপে ভোগেন মিখাইল। দ্যা গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিখাইল কালাশনিকভ বলেন, তিনি এমন যন্ত্র আবিষ্কারে খুশি হতেন যা লোকজন যুদ্ধে ব্যবহার করার পর প্রয়োজনে চাষাবাদেও ব্যবহার করতে পারতো।

নিজের আবিষ্কার হাতে কালাশনিকভ; Image Source: Business Insider
স্কট ফ্যালমান – ইমোটিকন
আজকাল অনলাইন চ্যাটিংয়ে ইমোটিকন হয়ে উঠেছে জনপ্রিয় একটি বিষয়। মানুষ এখন শব্দের চেয়ে সুন্দর একটি ইমোজি ব্যবহারকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। আর এই বহুল ব্যবহৃত ইমোজির উদ্ভাবক স্কট ফ্যালমান। তবে হঠাৎ করে প্রচুর জনপ্রিয়তা পাওয়া এই ইমোটিকন আবিষ্কার করে মোটেই খুশি নন এই ভদ্রলোক।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নিজেকে তার মাঝে মাঝে ডক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো মনে হয়। কিছু জায়গায় কথা বলা প্রয়োজন। কিন্তু মানুষ ইমোজি ব্যবহারে বেশিই আসক্ত হয়ে পড়েছে। যার জন্য নিজের আবিষ্কার নিয়ে মোটেই সন্তুষ্ট নন ফ্যালমান।

ইমোটিকনের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে; Image Source: Wall Street Journal
অ্যালবার্ট আইনস্টাইন – পারমাণবিক বোম
পারমাণবিক বোমের সরাসরি আবিষ্কারক না হলেও স্বনামধন্য বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের বিখ্যাত সুত্র E = mc^2 এর উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে ভয়াবহ এটি। নিজের আবিষ্কারে প্রথমে খুশিই ছিলেন আইনস্টাইন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা তাকে মর্মাহত করে। বিশেষ করে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমটির বিস্ফোরণ পৃথিবীর অন্যান্য মানুষের মতো আইনস্টাইনকেও হতভম্ব করে দেয়।
নিজের এই আবিষ্কার নিয়ে পরবর্তীতে অনুতাপও করেন বিংশ শতাব্দীর এই শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। ১৯৪৭ সালে নিউজউইককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পারমাণবিক বোমের এই ভয়াবহতা আগে টের পেলে কখনোই এমন কিছু আবিষ্কার করতেন না তিনি।

হিরোশিমাতে পারমাণবিক বোমা হামলার ভয়াবহতা; Image Source: Getty Image
রবার্ট ওপেনহেইমার: পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারে যার অন্যতম অবদান ছিল
জে. রবার্ট ওপেনহেইমারকে বলা হয় ‘দ্য ফাদার অফ এটমিক বোম্ব’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ‘লস এলামস ল্যাব‘ এর পরিচালক ছিলেন। সে সময়ে এক দেশ আরেক দেশের সাথে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত ছিল এবং প্রত্যেকদিন প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছিলো। নিজেদের এবং দেশের নাগরিকদের জন্য একটি নিরাপদ বিশ্ব তৈরি করতে তারা আইনস্টাইনের ফর্মুলা ব্যবহার করে পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন এমন আবিষ্কারের ফলে হয়তো এক দেশ আরেক দেশকে আক্রমণ করার সাহস পাবে না।

রবার্ট ওপেনহেইমার; Source: media.ws.irib.ir
কিন্তু তাদের অনুশোচনার শেষ রইলো না যখন তারা দেখলেন তাদের এই বোমাটিকেই বরং ধ্বংসাত্মক কাজে জাপানে ব্যবহার করা হলো। লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেলো। তাই ওপেনহেইমার তার জীবনের শেষকালে অনুতাপ করে বলেছিলেন, যুদ্ধ তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ভোতা করে দিয়েছিলো। তা না হলে এমন নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর বোমা বানানোর মত ভুল তারা কীভাবে করলেন!
ডং গুয়েন: ফ্ল্যাপি বার্ড গেমের নির্মাতা
চলুন এবার একটু কম গুরুতর বিষয়ের দিকে যাওয়া যাক। কয়েক বছর আগেই ইন্টারনেট জগতে এক ছোট্ট গেমের আগমন ঘটে যা পুরো বিশ্বকেই প্রায় গেমটির মাঝে আসক্ত করে ফেলে। গেমটির নাম ‘Flappy Bird’। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো ডং গুয়েন তার সৃষ্ট গেমটির বিশাল জনপ্রিয়তার জন্য উল্টো একেই ঘৃণা করা শুরু করেন। যেখানে অন্যান্য নির্মাতারা তাদের সৃষ্ট পণ্য জনপ্রিয় হলে সেটা উপভোগ করেন; গুয়েন ছিলেন তার একদম উল্টো।

গুয়েন এবং ফ্ল্যাপি বার্ড; Source: static.standard.co.uk
এমনকি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় গেমটি প্রতিদিন প্রায় ৫০,০০০ ডলার করেও আয় করছিলো, যা ছিল একজন ছোট এবং স্বাধীন গেম ডেভেলপারের জন্য বিরাট কিছু। তবুও তিনি গেমটি তৈরির জন্য নিজের প্রতিই ছিলেন বিরক্ত। কারণ ফ্ল্যাপি বার্ডের জনপ্রিয়তার জন্য তাকে সবাই আলাদা করে চেনা শুরু করে, বিভিন্ন মিডিয়া তার পেছনে ছুটতে শুরু করে। কিন্তু তিনি তার সরল সোজা জীবনকেই বেশি পছন্দ করতেন। তিনি অন্যদের মনোযোগ নিজের প্রতি টেনে আনতে চাননি। কিন্তু গেমটির জনপ্রিয়তা তার স্বাভাবিক জীবনযাপনকে শুধু ব্যাহতই করছিলো।
কামরান লোমান: পিপার স্প্রের উদ্ভাবক
(বামে) কামরান লোমান; Source: harrywalker.com
কামরান লোমান আরেকজন ব্যক্তি যিনি তার উদ্ভাবিত পিপার স্প্রের অপব্যবহারে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি FBI এ কর্মরত থাকা অবস্থায় এই পিপার স্প্রের আবিষ্কারে মূল ভূমিকা রাখেন। সাময়িকভাবে কোনো দুষ্কৃতিকারীকে অকেজো এবং অন্ধ করে দেওয়ার জন্যই এটি আবিষ্কার করা হয়েছিল। পিপার স্প্রে প্রয়োগে প্রথমে ব্যক্তির চোখে প্রচণ্ড জ্বালা করে এবং পরে চোখ দিয়ে অনর্গল পানি পড়া শুরু হয়। ফলে যে কেউ নিজের আত্মরক্ষা করার পাশাপাশি নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যেতে পারে।

পুলিশের পিপার স্প্রের যাচ্ছেতাই ব্যবহার; Source: images.vice.com
লোমান এমনকি একটি গাইডলাইনও লিখেছিলেন কীভাবে পিপার স্প্রে ব্যবহার করা উচিত। কারণ কিছু পরিস্থিতিতে এর প্রতিক্রিয়া বিপদজনকও হতে পারে। কিন্তু দেখা গেলো মানুষের থেকে পুলিশই পিপার স্প্রের বেশি অপব্যবহার করছে। শুধু সন্ত্রাসীদের কাবু করার ক্ষেত্রেই নয়, তারা বিভিন্ন মিছিল, মিটিং, বিভিন্ন প্রকারের আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতেও এর যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে। গাইডলাইন অনুসরণ না করেই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে অনেকের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে আরো ভয়াবহ। আবার অনেক সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারীরাও এটি পথচারীদের উপর ব্যবহার করা শুরু করে। ফলে লোমান মনে করেন তার পিপার স্প্রে আবিষ্কার করাটাই একটি ভুল পদক্ষেপ ছিল।
আলফ্রেড নোবেল: ডিনামাইটের আবিষ্কারক
আলফ্রেড নোবেল; Source: raikfcquaxqncofqfm.stackpathdns.com
আলফ্রেড নোবেল ছিলেন মূলত একজন শিল্পপতি, প্রকৌশলী এবং আবিষ্কারক। ১৮৬০ সালে তিনি পাথর ভাঙার সহজ উপায় খুঁজতে গিয়ে নাইট্রো-গ্লিসারিনের সাথে সিলিকার মিশ্রণে একধরনের উদ্বায়ী পেস্ট তৈরি করেন যা ডিনামাইট নামে পরিচিত হয়। প্রাথমিকভাবে তার উদ্দেশ্য সফল হলেও পরবর্তীতে লক্ষ্য করে দেখলেন, যে কাজের জন্য তিনি ডিনামাইট আবিষ্কার করেছিলেন সে কাজের পরিবর্তে মানুষ বরং অপর মানুষকে পঙ্গু এবং হত্যা করার জন্যই তা বেশি ব্যবহার করছে। এসব দেখে তিনি খুবই ব্যথিত হন এবং ডিনামাইট আবিষ্কারের জন্য অনুতপ্ত হন।
ডিনামাইট; Source: cdn-a.william-reed.com
বিশ্বের জন্য ভাল কিছু করে যাবার তাগিদ থেকে তিনি তার দলিলে বলে যান, পুরো বিশ্বের কল্যাণে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় যারা অবদান রাখবে তাদেরকে যেন তার অধিকাংশ সম্পদ থেকে পুরষ্কৃত করা হয়। ফলে বর্তমানে তার ‘নোবেল অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন’ থেকে বিশেষ অবদানের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মানসূচক নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়। আলফ্রেড নোবেল বেঁচে থাকলে হয়তো দেখতে পেতেন কীভাবে নিজের সেই অনুশোচনাকে তিনি মানবজাতির জন্য এক বিশেষ সম্মান ও মর্যাদায় রূপান্তরিত করতে পেরেছেন।
বর্ণালীবীক্ষণ’ বা Spectroscope কি ? এটা কি কাজে ব্যবহৃত হয়?
পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বা উদ্ভাবনগুলোর তালিকা করলে তার মাঝে অবশ্যই রাখতে হবে ‘বর্ণালীবীক্ষণ’ বা Spectroscope নামে একটি যন্ত্রকে। চাকা, প্রিন্টিং প্রেস, টেলিফোন, কম্পিউটার সহ অন্যান্য পরিচিত জিনিসের পাশে স্থান করে নেবে এটি। মানব সভ্যতার প্রেক্ষাপটে যন্ত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের কাবিস্তারিত পড়ুন
পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বা উদ্ভাবনগুলোর তালিকা করলে তার মাঝে অবশ্যই রাখতে হবে ‘বর্ণালীবীক্ষণ’ বা Spectroscope নামে একটি যন্ত্রকে। চাকা, প্রিন্টিং প্রেস, টেলিফোন, কম্পিউটার সহ অন্যান্য পরিচিত জিনিসের পাশে স্থান করে নেবে এটি। মানব সভ্যতার প্রেক্ষাপটে যন্ত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের কাছে বেশি পরিচিত নয়। গণহারে মানুষ এই যন্ত্রটিকে ব্যবহার করে না বলে অনেকেই এর গুরুত্ব নিয়ে ভাবে না। কেন এটি সেরা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার-উদ্ভাবনের মাঝে থাকবে, তা এই লেখাটিতে পরিষ্কার হবে।
রংধনু ও লাল সরণ
বর্ণালীবীক্ষণকে বলা যায় এক প্রকার রংধনু তৈরি করার যন্ত্র। দূরবর্তী নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোক রশ্মি এর ভেতরে প্রবেশ করলে এটি ঐ আলোকে বিস্তৃত বর্ণালীতে রূপান্তর করে দেয়। অনেকটা প্রিজমের মাধ্যমে সাদা আলো থেকে সাত রংয়ের আলোতে বিশ্লিষ্ট হবার মতো। তবে বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রটি নিউটনের প্রিজম থেকে আরো বেশি বিস্তৃত ও পরিশীলিত। এটি ব্যবহার করে এমনকি দূর-নক্ষত্রের আলো নিয়ে সূক্ষ ও সঠিক পরিমাপ করা যায়।
একটি বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র। ছবি: ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো
কীসের পরিমাপ? রংধনু আর বর্ণালীতে আবার মাপামাপির কী আছে? এখান থেকেই মজার জিনিসটা শুরু হয়। ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্র থেকে আসা আলো ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে, ভিন্ন ভিন্ন বর্ণালী তৈরি করে। বর্ণালীর এই বিষয়গুলো নক্ষত্র সম্পর্কে আমাদেরকে অনেক তথ্য প্রদান করে।
সচরাচর আমরা যে রং দেখি তার বাইরে কি আরো রং থাকতে পারে? দূরের নক্ষত্রগুলো কি আমাদের পরিচিত কোনো রঙের চেয়ে ভিন্ন ও অচেনা কোনো রঙের হতে পারে? না, সাধারণ মানুষের ক্ষমতায় এমন দেখা সম্ভব নয়। চোখের পক্ষে যতটুকু দেখার সামর্থ্য আছে, তার বাইরে দেখা সম্ভব নয়। রংধনুর সাত রং বেগুনী, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল আমরা দেখতে পাই। এর বাইরেও অনেক বৈচিত্র্যময় রং দেখে থাকি, তবে এগুলো ভিন্ন কোনো রং নয়। তিনটি মৌলিক রংয়ের বিভিন্ন আনুপাতিক মিশ্রণের মাধ্যমে এরকম হাজার হাজার বৈচিত্র্যময় রং তৈরি করা যায়। জগতে যত ধরনের রং দেখি, তার সবই আসলে তিনটি মৌলিক রঙের বিভিন্ন আনুপাতিক সমাবেশ মাত্র। এমনকি রংধনুর অতিরিক্ত চারটি রংও এই তিন রং থেকে তৈরি করা যায়। মৌলিক রং তিনটি হচ্ছে লাল, নীল ও সবুজ।
তিন মৌলিক রং লাল, নীল ও সবুজ (বড় বৃত্ত) এবং তাদের সমাবেশে তৈরি অন্যান্য রং (ছেদকৃত অংশ)। ছবি: স্টাডি ব্লু
নক্ষত্রে আমরা ব্যতিক্রম কোনো রং দেখতে পাবো না, অথচ পূর্বে উল্লেখ করেছিলাম ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্র ভিন্ন ভিন্ন রংধনু-বর্ণালী প্রদান করে। তাহলে এই বাক্য দিয়ে কী বোঝানো হয়েছিল? নক্ষত্র থেকে আগত আলো যখন বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রের ভেতর দিয়ে বিশ্লিষ্ট হয় তখন বারকোডের (Barcode) মতো অনেকগুলো সরু লাইনের সৃষ্টি করে। বিভিন্ন পণ্যের গায়ে পণ্যের পরিচিতি হিসেবে বারকোড ছাপানো থাকে। নক্ষত্রের আলো থেকে বিশ্লিষ্ট রেখা বর্ণালীকে আক্ষরিক অর্থেও ‘বারকোড’ বলা যায়। কারণ, বারকোড যেমন পণ্যের উৎপাদন, মেয়াদ, মূল্য, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে, তেমনই নক্ষত্রের আলোক বর্ণালী থেকেও নক্ষত্রের বয়স, গঠন, উপাদান ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
বারকোড। ছবি: বারকোড গ্রাফিক্স
এমন না যে শুধুমাত্র দূরবর্তী নক্ষত্র থেকে আগত আলোক রশ্মিই বারকোড লাইন তৈরি করে, বিশেষ ক্ষেত্রে পৃথিবীতে উৎপন্ন আলোক রশ্মিও বারকোড লাইন তৈরি করতে পারে। সেই হিসেবে ল্যাবরেটরিতে এই আলোক রশ্মি বিশ্লেষণ করে আমরা কোনো অজানা পদার্থের পরিচয়ও বের করতে পারবো। এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে বিভিন্ন অজানা পদার্থের পরিচয় বের করা হয়ও। যেমন, সোডিয়াম থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন আলোর বর্ণালীতে হলুদ রং বেশি প্রকট আকারে থাকে। সেই কারণে সোডিয়ামের আলো হলদেটে হয়ে থাকে।
স্পেকট্রোস্কোপের বর্ণালী। ছবি: ই-মেইজ
ঢাকার রাস্তায় রাতের বেলা ভ্রমণ করলে দেখা যাবে, অনেক স্থানে রাস্তা আলোকিত করে রেখেছে হলুদাভ একধরনের বাতি। কেউ যদি মাঝরাতে বিমানবন্দর থেকে রামপুরা যায়, তাহলে রাস্তা ফাঁকা পাবে। বাসে চড়লে একটার পর একটা হলুদ বাতি অতিক্রম করবে আর এর পেছনের বৈজ্ঞানিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবে। এই হলুদ বাতিগুলো মূলত সোডিয়াম বাষ্পের আলো প্রদান করে। অন্যান্য মৌল অন্য রংয়ের আলো প্রদান করে। মৌল ভেদে আলোর রংয়ের তারতম্য কেন ঘটে কিংবা বিশেষ উপায়ে এসব মৌল কেন বর্ণালী প্রদান করে তা আবার পদার্থবিজ্ঞানের আরেক গল্প।
রাস্তায় ব্যবহার করা সোডিয়ামের আলোগুলো হলদেটে হয়ে থাকে। ছবি: নর্থ কোস্ট কারেন্ট
প্রথম উদাহরণ হিসেবে হাইড্রোজেন বর্ণালীর দিকে খেয়াল করি। নিচের ছবিটি হাইড্রোজেনের বর্ণালী নির্দেশ করছে। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে, হাইড্রোজেন চারটি রেখার সৃষ্টি করে। একটি বর্ণালীর বেগুনী অংশে, আরেকটি কালচে নীল অংশে, আরেকটি মলিন নীল অংশে এবং আরেকটি লাল অংশে।
হাইড্রোজেন বর্ণালী। ছবি: ডেভ ম্যাককেইন
বর্ণালীবীক্ষণ দিয়ে পরীক্ষা করলে কোন ধরনের বর্ণালী পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে উৎস কোন অবস্থায় আছে কিংবা কীসের সাথে সংযুক্ত আছে তার উপর। তবে এসব ছাপিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, নির্দিষ্ট কোনো মৌলের জন্য রেখাগুলো সবসময় একই অবস্থানে থাকে। রেখা রঙিন হোক আর কালো হোক, তার অবস্থান সবসময় বর্ণালীর একই অবস্থানে থাকে।
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে বসে সকল মৌলের বর্ণালী রেকর্ড করে রেখেছেন। তাই দূর নক্ষত্র থেকে আগত আলোক রশ্মির বর্ণালী বিশ্লেষণ করে এবং পরে তা রেকর্ড থেকে মিলিয়ে নিয়ে তারা বলে দিতে পারেন, নক্ষত্রটি কোন কোন উপাদান দিয়ে তৈরি।
বিজ্ঞানীরা সকল মৌলের বর্ণালী নির্ণয় করে রেখেছেন। ছবি: জিওফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি
তবে আপাত দৃষ্টিতে এখানে কিছু সমস্যার কথাও মনে হতে পারে। নক্ষত্র একাধিক মৌল দিয়ে গঠিত হতে পারে এবং এসব মৌল একসাথে তালগোল পাকিয়ে খিচুড়ি অবস্থা করে ফেলতে পারে। এমতাবস্থায় এদের থেকে আগত আলোক রশ্মি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে কিছু সমস্যা হবার কথা ছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র বিশেষ উপায়ে এদেরকে আলাদা করে নিতে পারে। ফলে বড় একটি সমস্যার একদম জলের মতো সহজ সমাধান আমরা পেয়ে যাই। স্বীকার না করে উপায় নেই যে, এটি খুবই চমৎকার একটি যন্ত্র!
যে সকল নক্ষত্র আমরা দেখতে পাই, তাদের বেশিরভাগই আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে অবস্থিত। রাতের আকাশে নক্ষত্রমণ্ডলীর বেশিরভাগই অবস্থিত আমাদের কাছাকাছিই অর্থাৎ আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সিতে। অল্প কিছু উজ্জ্বল বস্তু দেখা যায়, যারা দূরের অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে অবস্থিত। দূরের গ্যালাক্সির কোনো নক্ষত্রের সোডিয়াম বর্ণালী পরীক্ষা করে দেখলে অবাক করা কিছু পার্থক্য দেখা যাবে। নিচের ছবিটিতে তিনটি ভিন্ন স্থানের সোডিয়ামের বারকোড বর্ণালী দেখানো হয়েছে- উপরেরটি আমাদের পৃথিবীর, মাঝেরটি কাছের গ্যালাক্সির যেকোনো নক্ষত্রের এবং নিচেরটি দূরবর্তী নক্ষত্রের।
তিনটি ভিন্ন অবস্থানে সোডিয়াম বর্ণালীর পার্থক্য। ছবি: ডেভ ম্যাককেইন
উপরে পৃথিবীর বারকোডের সাথে নীচে দূরবর্তী নক্ষত্রের বারকোড তুলনা করলে তাদের অবস্থানের বেশ পার্থক্য দেখা যায়। অথচ উপরে বলা হয়েছিল বারকোডের অবস্থান সবসময় একই হবে। কিন্তু এখানে বারকোডের অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন দেখাচ্ছে। এরকম হলে কীভাবে আমরা নিশ্চিত হবো যে, এগুলো আসলেই সোডিয়াম মৌলের বর্ণালী?
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার খেয়াল করতে হবে যে, বর্ণালীর রেখাগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব একই। দূরে সরলে সম্পূর্ণ প্যাটার্নটিই দূরে সরেছে, কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যবর্তী দূরত্ব আগের মতোই আছে। শুধু সোডিয়ামের বেলাতেই নয়, অন্যান্য মৌলের বেলাতেও এরকম হয়। দূরবর্তী নক্ষত্রের বেলায় সেসব মৌলের বর্ণালীর সবটাই দূরে সরে যায় কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যবর্তী দূরত্ব সবসময় ঠিকই থাকে। সেই হিসেবে বর্ণালীর রেখা বা বারকোডের মধ্যবর্তী দূরত্ব বিশ্লেষণ করেও কোনো অজানা মৌলের পরিচয় জানা সম্ভব।
উপরের ছবিটির দিকে খেয়াল করলে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দেখা পাওয়া যাবে। পৃথিবীর প্যাটার্নের নিচে, মাঝের প্যাটার্নটি আমাদের গ্যালাক্সির কাছের নক্ষত্রগুলোর। এই নক্ষত্রগুলো থেকে আগত বর্ণালীরেখা লাল রঙের দিকে সরে যাচ্ছে। যদিও কাছের নক্ষত্রগুলোর বর্ণালী লালের দিকে সরে যাবার পরিমাণ খুব বেশি নয়। অন্যদিকে দূরের নক্ষত্রগুলোর বর্ণালীও লালের দিকে সরে যাচ্ছে, আর এখানে সরে যাবার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি।
সোডিয়ামের পাশাপাশি অন্য কোনো মৌলকে নিয়ে বিশ্লেষণ করলেও একই ঘটনার দেখা পাওয়া যাবে। সকলেই লালের দিকে সরে যাবে। গ্যালাক্সি যত দূরে অবস্থিত হবে, তাদের বর্ণালী লালের দিকে সরে যাবার পরিমাণ তত বেশি হবে। নক্ষত্রের বর্ণালীরেখা লাল রঙের দিকে সরে যাবার এই ঘটনাকে বলা হয় ‘লাল সরণ’। একে Hubble Shift বা হাবল সরণও বলা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবলের নামানুসারে এরকম নামকরণ করা হয়েছে। হাবলই দূরবর্তী নক্ষত্রের বেলায় প্রথম লাল সরণ আবিষ্কার করেছিলেন। বিভিন্ন গ্যালাক্সির অনেক বিখ্যাত ছবি হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে তোলা, হাবল টেলিস্কোপের নামকরণও করা হয়েছে এডউইন হাবলের নামানুসারে।
এডউইন হাবল। ছবি: ই-মেইজ
এই লাল সরণ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সম্পর্কে আমাদেরকে ধারণা দেয়। ব্যাপারটি হচ্ছে বিগ ব্যাং। বিগ ব্যাংয়ের ফলে যে গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর দূরে সরে যাচ্ছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় লাল সরণ পর্যবেক্ষণ করে। গ্যালাক্সি যত দূরে অবস্থিত হবে, তার বর্ণালী লালের দিকে সরে যাবার পরিমাণও বেশি হবে। তাই কোনো গ্যালাক্সি যদি ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যেতে থাকে, তাহলে তার বর্ণালীও ধীরে ধীরে লালের দিকে সরে যেতে থাকবে। যদি কোনো গ্যালাক্সির বর্ণালী পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, এর বর্ণালী লালের দিকে সরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, তাহলে ধরে নিতে হবে যে এই গ্যালাক্সিটি দূরে সরে যাচ্ছে। বর্ণালী লালের দিকে যত দ্রুত অগ্রসর হয়, সেটি তত বেশি বেগে দূরে সরে যায়।
বিজ্ঞানী এডউইন হাবল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখেছিলেন যে দূরবর্তী গ্যালাক্সির বর্ণালী লালের দিকে অগ্রসর হয়। গ্যালাক্সিগুলো যত দূরে অবস্থান করছে, লালের দিকে অগ্রসরের পরিমাণ তাদের তত বাড়ছে। তিনি ধরে নেন, যেহেতু লালের দিকে সরণ হচ্ছে, সেহেতু গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর দূরে সরে যাচ্ছে। এবং এটা হচ্ছে আনুপাতিক হারে। যেহেতু আনুপাতিক হারে সরে যাচ্ছে, তার মানে উল্টোদিকে গেলে এমন একটা সময়ের দেখা পাওয়া যাবে, যেখানে সমস্ত মহাবিশ্ব একত্রিত অবস্থায় ছিল। আর তাদের একত্র অবস্থা থেকে মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিল বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে।
মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের চিন্তাধারাই পালটে দিয়েছিল এই আবিষ্কার। একই সাথে এ আবিস্কার মানুষের বাস্তবিক জগত এবং আত্মিক জগতেও অনেক প্রভাব রেখেছিল। আর অবশ্যই এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র বা স্পেকট্রোস্কোপ, তাই চাকা, প্রিন্টিং প্রেস, টেলিফোন কিংবা কম্পিউটারের মতোই সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন বলা যায় এই যন্ত্রটিকে।
সংক্ষেপে দেখুন‘পিংক মুন’ আসলে কি?
আচ্ছা, ‘পিংক মুন’ বা গোলাপি চাঁদের নাম শুনেছেন কখনো? নাম শুনে কী মনে হয়? ব্লাড মুন যেভাবে নিজের নামের অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রক্তের মতো লাল রঙ নিয়ে আকাশে উদিত হয়, ঠিক তেমনি পিংক মুনও তার নামের সাথে মিল রেখে গোলাপি রঙ ছড়িয়ে উদিত হয়? সত্যি বলতে, পিংক মুনের সাথে ‘পিংক’ বা গোলাপি রঙের কোনো সম্পর্কইবিস্তারিত পড়ুন
আচ্ছা, ‘পিংক মুন’ বা গোলাপি চাঁদের নাম শুনেছেন কখনো? নাম শুনে কী মনে হয়? ব্লাড মুন যেভাবে নিজের নামের অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রক্তের মতো লাল রঙ নিয়ে আকাশে উদিত হয়, ঠিক তেমনি পিংক মুনও তার নামের সাথে মিল রেখে গোলাপি রঙ ছড়িয়ে উদিত হয়?
সত্যি বলতে, পিংক মুনের সাথে ‘পিংক’ বা গোলাপি রঙের কোনো সম্পর্কই নেই। একটি সাধারণ চাঁদ বা পূর্ণিমা দেখতে যেমন হয়, পিংক মুনও দেখতে ঠিক একই রকম। তবে নামের কারণ বা ভিন্নতা রয়েছে এই নাম দেওয়ার ইতিহাস বা তাৎপর্যের ক্ষেত্রে। এপ্রিলের পূর্ণিমাকেই বলা হয় ‘পিংক মুন’ বা ‘ফুল পিংক মুন’।

এপ্রিলের পূর্ণিমাকেই বলা হয় ‘পিংক মুন’; Image source: narcity.com
পিংক মুন নামটি যেভাবে এলো
প্রাচীনকালে চন্দ্রপঞ্জিকা দেখেই মৌসুম বা মাস ঠিক করা হত। তখন সৌরপঞ্জিকার মতো স্থির কোনো পঞ্জিকা ছিল না যা দেখে সহজেই বারো মাসের হিসাব বোঝা যাবে।

চন্দ্রপঞ্জিকা ২০১৯; Image source: vertex42.com
পূর্ণিমা মানেই নতুন মাসের আগমন ধরে নেওয়া হত। সেই সময়ে জুলিয়ান বা গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা তারা অনুসরণ করতো না। এই ভিন্ন ভিন্ন পূর্ণিমার মাধ্যমেই তারা মাসের হিসাবটা করে নিত। যুগের পর যুগ ইউরোপ এবং আদি আমেরিকান আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো এই নিয়মই মেনে চলেছে। ইউরোপিয়ান বা স্থানীয় আমেরিকান জনগণ নিজেদের সুবিধার্থে প্রত্যেকটি পূর্ণিমার আলাদা আলাদা নামও নির্ধারণ করে দেয়। নামগুলো তারা উত্তর গোলার্ধে ঘটে যাওয়া সাধারণ ঘটনা বা কোনো মাসের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই ঠিক করা হয়। যেমন- জানুয়ারির ‘ফুল ওলফ মুন’, ফেব্রুয়ারির ‘ফুল স্নো মুন’, মার্চের ‘ফুল ওর্ম মুন’, এপ্রিলের ‘ফুল পিংক মুন’, মে মাসের ‘ফুল ফ্লাওয়ার মুন, জুনের ‘ফুল স্ট্রবেরি মুন’, জুলাইয়ের ‘ফুল বাক মুন’, আগস্টের ‘ফুল স্টার্জন মুন’, সেপ্টেম্বরের ‘ফুল কর্ন মুন’, অক্টোবরের ‘ফুল হান্টার্স মুন’, নভেম্বরের ‘ফুল বীবর মুন’ এবং ডিসেম্বেরের ‘ফুল কোল্ড মুন’। এগুলো ছাড়াও কোনো কোনো বছর ১৩টা ‘ফুল মুন’ বা পূর্ণিমা দেখা যায়। অতিরিক্ত একটি পূর্ণিমার নাম ‘ব্লু মুন’।
কেন এই চাঁদকে ‘পিংক মুন’ বলা হয়?
এপ্রিল মাসের পূর্ণিমাকে ‘পিংক মুন’ বলা হয়। তবে চাঁদটি দেখতে একদমই ‘পিংক’ বা ‘গোলাপি’ রঙের নয়। আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে হালকা হলুদ, কমলা, লাল বা সাদা হতে পারে।

চাঁদটি দেখতে হালকা হলুদ, কমলা, লাল বা সাদা হতে পারে; Image source:wyso.org
তবে গোলাপি কোনোভাবেই হবে না। নিতান্তই কাকতলীয় বিষয় হবে যদি কোনো বছর লাল এবং সাদা মিলে হালকা গোলাপি দেখায় এই ‘পিংক মুন’। স্বাভাবিক কারণেই তাহলে প্রশ্ন আসে- গোলাপি চাঁদ না হলে এর নাম ‘পিংক মুন’ হয় কেন? নামটি আসলে এই মাসের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে আসে। বসন্তের এই সময়ে বিভিন্ন নতুন ও সুগন্ধি ফুলের আগমন ঘটে। এর মধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকায় ‘মস পিংক’ বা ‘ওয়াইল্ড গ্রাউন্ড ফ্লক্স’ ফুল ফোঁটা খুব সাধারণ একটি বিষয়। এটি আদি আমেরিকার একপ্রকার বন্য ফুল। সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত প্রতি বছরই এ সময়ে এই ফুলে চারপাশের পরিবেশ ভরে ওঠে। আর এসব ফুলের গোলাপি রঙের আভা যেন এ সময়ে ভূমি থেকে আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।
পিংক মুনের আধ্যাত্মিক অর্থ
আধ্যাত্মিক অর্থে, পিংক মুন বা গোলাপি চাঁদ হলো পুনর্জাগরণ এবং নবজীবনের প্রতীক। মার্চের ফুল মুন বা পূর্ণিমাকে বলা হয় ফুল ওর্ম মুন। এটা হলো শীতের মৌসুমের শেষ পূর্ণিমা। একনাগাড়ে লম্বা সময়ের জন্য ঠাণ্ডা, বেরঙ, নীরস এবং করুণ শীতকালের কারণে পরিবেশটা কেমন জানি মরা মরা হয়ে যায়। ফলে এপ্রিল আসতে আসতে বসন্তের আগমন যে আনন্দ ও সৌন্দর্য আশেপাশের বাতাবরণে ছড়িয়ে দেয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই এপ্রিলের প্রথম পূর্ণিমা যে পরিবেশের নতুন জন্ম ও সৌন্দর্যের প্রতীক তা অনেকটা বোধগম্য। অনেকের বিশ্বাস, পিংক মুনের আলো সকলের শক্তি ও প্রাণ আবার ফিরিয়ে আনবে। পিংক মুন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন হলো উত্থান-পতন, শীতযাপন এবং পুনর্জাগরণের একটি চক্র যা মৃত্যু অবধি চলতেই থাকে। যেমন- প্রতি বছর এই সময়ে গোলাপি রঙের ওয়াইল্ড গ্রাউন্ড ফ্লক্সের আগমন ঘটে এবং কিছু সময় পর তা চলে যায়। পরবর্তীতে নতুন রূপে ও নতুন সৌন্দর্যে আবার ফিরে আসে।


ওয়াইল্ড গ্রাউন্ড ফ্লক্স; Image source:gardenia.net
এই মুনের অন্য নামগুলো হলো স্প্রাউটিং গ্রাস মুন, হেয়ার মুন, ফিশ মুন ও এগ মুন। প্রত্যেকটি নামের পেছনেই এই মৌসুমের কোনো বৈশিষ্ট্যের ছাপ দেখা যায় । যেমন- এই সময়ে নতুন করে ঘাস গজানো শুরু করে। তাই এর নাম ‘স্প্রাউটিং গ্রাস মুন’। আরেক নাম ‘এগ মুন’, কারণ বসন্তে পাখিরা ডিম পাড়ে। ফিশ মুনও বলা হয়, কেননা মাছের ফলন এই মৌসুমে অধিক। খরগোশ এই ঋতুতেই সন্তান জন্ম দেয়। আর এজন্য এপ্রিলের পূর্ণিমাকে ‘হেয়ার মুন’ও বলা হয়। উল্লেখ্য যে, মে মাসের পূর্ণিমাকেও ‘হেয়ার মুন’ বলা হয়। তাছাড়া এপ্রিল মাসের এই প্রথম পূর্ণিমা যাজকীয় বা খ্রিস্টানদের পঞ্জিকায় ‘প্যাসচেল মুন’ নামেও পরিচিত। পিংক মুন খ্রিস্টানদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ‘ইস্টার সানডে’র তারিখ নির্ধারণে সহায়তা করে বিধায় এর নাম ‘প্যাসচেল মুন’ দেওয়া হয়।
পিংক মুন খ্রিস্টানদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ‘ইস্টার সানডে’র তারিখ নির্ধারণে সহায়তা করে; Image source: visitrenotahoe.com
এপ্রিলের পূর্ণিমার পর প্রথম যে রবিবার আসে সেই দিনই পালিত হয় ইস্টার সানডে। জ্যোতির্বিদরা বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি পূর্ণিমাই আমাদের উপর কোনো না কোনো প্রভাব ফেলে। সবসময় বিষয়টি আমরা বুঝতে না পারলেও প্রতিনিয়ত এরকমই হচ্ছে বলে তাদের ধারণা। জ্যোতির্বিদ সিন্ডি ম্যাককিয়ান বলেন, “জ্যোতির্বিদ্যায় চাঁদ আমাদের অনুভূতি, চক্র, উর্বরতা এবং এরকম আরো কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে।” তিনি আরো বলেন, “এপ্রিলের পূর্ণিমা হলো উজ্জীবনের প্রতীক। এর প্রভাবে মানুষের মধ্যে স্থির অনুভূতি এবং আনন্দ পরিলক্ষিত হয়।” জ্যোতির্বিদ প্যাভলোভার মতে, “পিংক মুন আমাদের অনুভূতিকে মার্চের ফুল মুন থেকে অধিক প্রভাবিত করে। এ সময় সবকিছুতে একপ্রকার ভঙ্গুরতাও দেখা যায়, আবার একপ্রকার নতুনত্বও দেখা যায়। নতুন সম্পর্ক গড়ার এবং নতুন কোনো বিবর্তনও ঘটতে পারে এই সময়।” তার মতে, পিংক মুনের আলোর দরুণ সবকিছু একেবারে নতুন করে গড়তে শুরু করে।
প্রতিটি পূর্ণিমাই কোনো না কোনো রাশিতে উদিত হয়। আর পিংক মুন বৃশ্চিক নক্ষত্রপুঞ্জে উদিত হয়। পূর্ণিমা সাধারণত কোনো কিছুর পরিপূর্ণতা লাভ করা বা পরিসমাপ্তি বোঝায়। আর বৃশ্চিক রাশির কথা বললে এই অর্থটি আরো সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১২টি রাশিকে মোট চার ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- আগুন, মাটি, বায়ু এবং জল রাশি। এই বৃশ্চিক হলো জল রাশির অন্তর্ভুক্ত। তাই এটি স্বভাবতই জল রাশির সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো বহন করে। যথা- ইচ্ছাশক্তি, আত্মসংযম, অনুভূতির গভীরতা। অর্থাৎ এই বিষয়গুলো আমাদেরকে নির্দেশ করে যে মনের ভেতর যত দুঃখ বা অপ্রীতিকর ঘটনা চাপা পড়ে আছে তা ভুলে গিয়ে জীবনটাকে আবার নতুন করে শুরু করাই শ্রেয়। এপ্রিলের পূর্ণিমা যেন একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে যাওয়ার জন্যই বারবার পথপ্রদর্শন করে।

সংক্ষেপে দেখুন‘স্প্রিং ক্লিনিং’ বা বসন্তকালীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জীবনের আরম্ভ করা যায়; Image source: destorage.com
বসন্তের আগমনে গাছপালার পাতা থেকে শুরু প্রায় সকল জীবজন্তুই নতুন করে নিজেদের জীবনটাকে সাজানো শুরু করে। আবার ‘পিংক’ বা গোলাপি রঙ হলো পুনর্জাগরণের রঙ। এসব কিছুর প্রেক্ষিতে বসন্তের এই ‘পিংক মুন’ও যে আমাদের নবজীবন শুরু করার দিকে যেতে বলে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ব্যাপারটি যে শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক বা মনস্তাত্ত্বিক সেরকমও নয়। শুধু মনের মনের ময়লা দূর করার মধ্যেই ‘পিংক মুন’-এর ব্যাপারটি শেষ হয় না। ‘স্প্রিং ক্লিনিং’ বা বসন্তকালীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে ঘরবাড়ি এবং আশেপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রেখে নতুন এবং পরিচ্ছন্ন জীবনের আরম্ভ করা যায়।
মানুষের মাথায় টাক পড়ার কারণ কি?
দীঘল কালো চুল রমণীয় শোভার অলংকার হলেও ঘন চুলের আবেদন কিংবা প্রয়োজনীয়তা পুরুষদের নিকট কম নয় মোটেই। চুলের আবেদন ও প্রয়োজনীয়তা তারাও হাড়ে হাড়ে টের পান যখন মাথার ওপর দৃশ্যমান হয় আস্ত ফাঁকা ময়দান তথা আবির্ভাব হয় টাকের। ‘টেকো’ কিংবা ‘টাকলু’ উপাধি তো জোটেই, পাশাপাশি চুলবিহীন চেহারা ক্ষণে ক্ষণে ববিস্তারিত পড়ুন
দীঘল কালো চুল রমণীয় শোভার অলংকার হলেও ঘন চুলের আবেদন কিংবা প্রয়োজনীয়তা পুরুষদের নিকট কম নয় মোটেই। চুলের আবেদন ও প্রয়োজনীয়তা তারাও হাড়ে হাড়ে টের পান যখন মাথার ওপর দৃশ্যমান হয় আস্ত ফাঁকা ময়দান তথা আবির্ভাব হয় টাকের। ‘টেকো’ কিংবা ‘টাকলু’ উপাধি তো জোটেই, পাশাপাশি চুলবিহীন চেহারা ক্ষণে ক্ষণে বয়ে আনে চাপা দীর্ঘশ্বাস। পৃথিবীর অধিকাংশ লোকেরই একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর চুল কমে যেতে থাকে। বছর পঞ্চাশের পর টাক পড়ে যায় অনেকেরই। কিন্তু এই টাকের আগমন বয়োবৃদ্ধদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। বছর ত্রিশের যুবাও টাকের প্যাঁচে ঘায়েল হয়েছে – এ নজিরও কিন্তু আজ মোটেই কম নয়।
বস্তুত টাকঘটিত নানা দুঃখের পাশাপাশি টাকের নেপথ্যের কারণও নেহায়েত কম নয়। পৃথিবীর শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ মানুষ ত্রিশ বছরের মধ্যে মাথায় টাক গজিয়ে বসেন। টাকের কারণ, আর কেনই বা এর ভুক্তভোগীর তালিকায় সর্বাধিক অগ্রগণ্যতা পেয়েছে পুরুষ সে গল্প নিয়েই লেখা আজকের এই টাক সমাচার।
টাকের বিড়ম্বনা! ছবিসূত্র- (cbsnews.com)
প্রথমেই বলে রাখি, দিনে গড়ে প্রায় ১০০টির মতো চুল পড়া স্বাভাবিক এবং এটা প্রাকৃতিক ও সাধারণ নিয়মবশতই ঘটে। তবে এর বেশি চুল পড়তে থাকাটা খুব স্বাভাবিক না। টাক পড়ে যাওয়াকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘Pattern Baldness’, বৈজ্ঞানিকভাবে যা অ্যানড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া (Androgenetic Alopecia), অ্যানড্রোজেনিক অ্যালোপেসিয়া (Androgenic Alopecia) ইত্যাদি নামে পরিচিত। টাক পড়ার পেছনে দুটি কারণকে দায়ী করা হয়- জীনগত (জীন হলো মানুষের ক্রোমোজমের ডিএনএ এর সেই অংশ যা প্রোটিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে) এবং ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন নামক এক প্রকার অ্যানড্রোজেন হরমোন যা পুরুষের মধ্যে পাওয়া যায়। কারো কারো মাথার দু’পাশে কিংবা পেছনে কয়েক গোছা চুল রয়ে যায় ,আবার কারো কারো সম্পূর্ণ মাথাটাই হয়ে যায় ফাঁকা মাঠ।
কেন পড়ে টাক?
টাকের প্রক্রিয়া জানার আগে চুলের গোড়ার দিকে একটু আলোকপাত করা যাক। আমাদের প্রিয় চুলগুলো তৈরি হয় ‘হেয়ার ফলিকল’ নামক অংশে। এই হেয়ার ফলিকল মাথার চামড়ার নিচের একটি গহ্বর সদৃশ অংশ যেখানে চুল তৈরি হয়, সেখানে বৃদ্ধি পায় প্রায় ২ থেকে ৬ বছর, অতঃপর প্রকৃতির নিয়ম মেনে কিছুদিন বৃদ্ধি রহিত হয়ে স্থিতাবস্থায় থাকে এবং তারপর ঝরে পড়ে। এরপর সেখানে আবার নতুন চুল গজায় এবং চক্রটি পুনরায় চলতে থাকে। এভাবে চুল গজানো, বৃদ্ধি, ঝরে যাওয়া এবং আবারও গজানোর প্রক্রিয়া চলতে থাকে মানুষের জীবনে।
মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ এনজাইমসমূহের ক্রিয়ায় পুরুষের দেহের হরমোন টেস্টোস্টেরন পরিণত হয় ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরনে। চর্মবিশেষজ্ঞ ও গবেষক কাটো মর্কের মতে, “এই ধরণের এনজাইমগুলো একজনের শরীরে কী পরিমাণে বিদ্যমান তার কারণ বংশগত। তবে এটি পিতার নাকি মাতার জীন কিংবা উভয়েই নির্ধারণ করে কিনা তা এখনও অজানা।” ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন এমন একটি হরমোন যা চুলের বৃদ্ধির স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত ও ধীর করে এবং চুলগুলোকে খাটো ও পাতলা করে দেয়। চুলগুলোকে কৃশকায় বানানোর পাশাপাশি ঝরে যাওয়া চুলকে নতুন চুল দিয়ে প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াকেও ব্যাহত করে এই হরমোনটি।
টাক পড়ার নানা ধাপ। ছবিসূত্র- independent.co.uk
বিজ্ঞানীরা মনে করেন হরমোনটি তৈরিকারী এনজাইমগুলো এশিয়ান পুরুষে কম তৈরি হয় বিধায় তাদের চুল পড়ার হারও ককেশিয়ান পুরুষদের থেকে কম। এছাড়াও টাক পড়ে যাওয়া অনেকাংশে নির্ভর করে মাথার ত্বকে কতগুলি রিসেপ্টর আছে তার ওপর। এই রিসেপ্টর যত বেশি হবে চুলও তত দ্রুত পড়বে। এমনকি পর্যাপ্ত পরিমানে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন এবং এটি তৈরিকারী এনজাইম থাকা সত্ত্বেও এগুলোর গ্রহীতা রিসেপ্টরের অপ্রতুলতা থাকলে মাথায় টাক পড়বে না!
চুল পড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় হেয়ার ফলিকলগুলোর ক্রমসংকোচনের মাধ্যমে। এই কুঁচকে যাবার দরুন ফলিকলগুলো স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অনেক ছোট হয়ে যায়। ফলে এখান থেকে গজানো চুলগুলোও হয় তুলনামূলকভাবে কৃশকায়। স্বাভাবিক চুলের চেয়ে তাড়াতাড়ি ঝরেও পড়ে এ চুলগুলো। এরূপে ধীরে ধীরে ফলিকলগুলো এতই সংকুচিত হয় যে, তাতে চুলের কিয়দংশ গজায় ঠিকই কিন্তু তা আর মাথার ত্বক অবধি আসে না। ফলাফল মাথার উপরিভাগে সূচনা হয় চুলহীনতার তথা টাকের।
যদিও বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া জনিত টাকের পেছনে অনেকগুলো জীনের ভূমিকা রয়েছে, এখন পর্যন্ত একটি এমন জীন পাওয়া গেছে যার পরিবর্তনের সাথে টাকের সম্পর্ক বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই জীনটি হলো ‘এআর’ জীন (AR) যা কিনা একপ্রকার অ্যানড্রোজেন রিসেপ্টর প্রোটিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এই রিসেপ্টরগুলোই ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন এবং অন্যান্য অ্যানড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে ত্বরান্বিত করে টাক পড়া। এই এআর জীনের কোনো ধরণের পরিবর্তনই বাড়িয়ে দেয় চুল পড়া।
টাকের ইতিবৃত্ত
কারো টাক পড়ে মাথার উপরে পেছনভাগে, আবার কারো বা দুই চোখের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকেই হয় সূত্রপাত। কিছুক্ষে ত্রে ইংরেজি ‘এম’ হরফের ন্যায় অঞ্চল তৈরি হয় মাথায় আবার কারো ক্ষেত্রে পুরো মাথাই হয়ে যায় ফাঁকা। মূলত মাথার ত্বকের তিনটি অঞ্চলে চুল কমে যাওয়াটা বেশি লক্ষণীয়-
১) মাথার একদম সম্মুখভাগের চুলের সারি থেকে চুল পড়া শুরু হয় অনেকের। বলা হয় কিশোর থেকে যুবায় পরিণত হবার সময় মাত্র ৫% লোকেরই সেই কৈশোরকালীন প্রান্তীয় চুলের রেখা বজায় থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই চুল পড়ে যাবার হার মৃদু। তবে অনেকের ক্ষেত্রে দুই চোখের পার্শ্ববর্তী এলাকার চুলগুলো ঝরে যেতে থাকে এবং অনেকের ক্ষেত্রেই ইংরেজি ‘এম’ অক্ষরের ন্যায় চুলবিহীন অঞ্চল তৈরি হয়।
মাথার সম্মুখভাগের টাক। ছবিসূত্র- independent.co.uk
২) মাথার পেছনের উপরিভাগে চুল কমে যায় অনেকের যা আস্তে আস্তে বিস্তৃত হতে থাকে চারিদিকে।
মাথার পেছনের উপরিভাগে পড়া টাক। ছবিসূত্র- independent.co.uk
৩) মাথার মধ্য-সম্মুখভাগে চুল পাতলা হতে থাকা বিশেষত এশিয়ান পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এমনকি যে সকল মহিলাদের চুল পাতলা হয়ে যায় বয়সের সাথে, তাদের মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষ্যণীয়।
মাথার মধ্য ও সম্মুখভাগে চুল পাতলা হয়ে যায়। ছবিসূত্র- arochahairrestoration.com
এই টাকজনিত চুল পড়ে যাওয়া এক হেয়ার ফলিকল থেকে অন্য হেয়ার ফলিকলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মধ্যবর্তী কোনো অঞ্চলই এর থেকে রেহাই পায় না। এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যেন কোনো ব্যাপন প্রক্রিয়ায় কোনো রাসায়নিক বস্তু এটি ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু টাকের পেছনে দায়ী এমন কোনো রাসায়নিক পদার্থের হদিs পাওয়া যায়নি। এমনকি টাকসংলগ্ন মাথার চুলযুক্ত এলাকা থেকে কিছু অংশ শরীরের অন্য অংশে প্রতিস্থাপন করা হলেও চুলগুলোর ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে যাওয়াটা চলতে থাকে, দেখলে মনে হয় যেন তারা শরীরের অন্য কোনো অংশে নয় বরং এখনও মাথায়ই রয়ে গেছে। এতে বোঝা যায় যে হেয়ার ফলিকলগুলোর ডিএনএতেই এমন কোনো পরিবর্তন হয়েছে যা এগুলোকে এরূপ আচরণে বাধ্য করছে।
চুল কমে যাবার এ ধারার বাইরেও অন্য এক প্রকারেও চুল কমে যায় যা সচরাচর আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। মাথায় যে চুলগুলো গজায় তা দেহের অন্যত্র গজানো লোমগুলো থেকে আলাদা। অসংখ্য ফলিকল একক থেকে জন্মানো এক গুচ্ছ চুল একটি নির্দিষ্ট গহ্বর থেকে মাথার উপরিভাগে বের হয়। প্রতিটি গুচ্ছে ২-৫ টি চুল থাকে। প্রতিটি ফলিকল একক থেকে একটি প্রাথমিক চুল বের হয়। জন্মের সময় শুধু এই প্রাথমিক চুলগুলো থাকে বলেই নবজাতকের চুলগুলো পাতলা এবং নমনীয় হয়। পরবর্তী দু-তিন বছরে অন্য চুলগুলোও গজিয়ে গেলে চুলের ঘনত্ব ও আয়তন বেড়ে যায়।
যেভাবে হেয়ার ফলিকল হতে চুল গজায়। ছবিসূত্র- independent.co.uk
অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া হলে তা পরবর্তী সময়ে গজানো চুলগুলোর উপর সর্বপ্রথম প্রভাব ফেলে। চুলগুলো ছোট হতে হতে একসময় প্রতিটি গহ্বর থেকে একটি মাত্র চুল ছাড়া অন্যান্য কোনো চুলই আর অবশিষ্ট থাকে না। এভাবে চুল পাতলা হয়ে যায়। যখন সেই একমাত্র চুলটিরও একই পরিণতি হয় তখনই টাক পড়তে শুরু করে। এক্ষেত্রে এমনও হতে পারে যে মাথার চুলের শতকরা ৫০ ভাগ পড়ে যাওয়া সত্ত্বেও টাক নাও পড়তে পারে। মেয়েদের বেণী বা খোঁপার ঘনত্ব দেখে যদিওবা চুল পড়ে যাচ্ছে আঁচ করা যায়, ছেলেদের চুল ছোট হওয়ায় এক্ষেত্রে টাক পড়ার আগ পর্যন্ত সেটি বোঝা বেশ দুষ্কর। এক্ষেত্রে রোদে পোড়া মাথার ত্বক দেখে ব্যাপারটি আঁচ করা যেতে পারে।
আগেই বলেছি এই দু’প্রকার চুল পড়ার পেছনে জীন ও বংশগত কারণই দায়ী। বংশগতভাবে কারো টাক থাকলে তারও টাকের ভুক্তভোগী হবার ঝুঁকি বেশি। আবার পরিবেশের প্রভাবও রয়েছে কিছুটা। সদৃশ জমজদের ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রায় একই বয়সে তাদের চুল পড়ে যায় এবং তা একই হারে ও ধাঁচে ঘটে। তবে অনেকক্ষেত্রে বিভিন্ন রোগের কারণেও টাক পড়তে পারে। যেমন পুরুষের ক্ষেত্রে করোনারি হার্ট ডিজিজ, প্রোস্টেট ক্যান্সার এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম হলে তা অ্যানড্রোজেন বাড়িয়ে দিতে পারে যা অ্যানড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়ার জন্য দায়ী।
পুরুষই কেন হয় টেকোমাথা?
অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়ার ভুক্তভোগী শুধুই ছেলেরা এ ধারণাটি ভুল। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে পুরো মাথায় চুল পড়ে গেলেও একেবারে টাক পড়তে সচরাচর দেখা যায় না। ক্ষেত্রবিশেষে মাথায় চুলহীন এলাকার উদ্ভব হলেও তা অনেক বেশি বয়সের আগে দেখা যায় না। কেন ভুক্তভোগীদের মধ্যে পুরুষের অগ্রগণ্যতা বেশি? উত্তর হলো- চুল পড়ে যাবার জন্য মূলত দায়ী টেস্টোস্টেরন যা পুরুষত্ব নির্ধারণকারী হরমোন। চর্মবিজ্ঞানী কাটো মর্কের মতে, “যেহেতু পুরুষদের হরমোন টেস্টোস্টেরনের চুলের ওপর সর্বোচ্চ প্রভাব আছে, তাই মেয়েরা ঠিক পুরুষদের মতো চুল হারায় না।” তবে মেনোপজের পরে মেয়েদের শরীরের মেয়েলি হরমোন ইস্ট্রোজেন কমে যায় বিধায় মেয়েদের শরীরে আগে থেকেই থাকা টেস্টোস্টেরন আরো বেশি সক্রিয় হয়ে চুল পড়ায় প্রভাব ফেলে। তবে পুরুষের মতো নির্দিষ্ট অঞ্চলে টাক পড়ার পরিবর্তে পুরো মাথায় চুলের ঘনত্ব কমে যাবার নজির পাওয়া যায়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে মেয়েদেরও টাক পড়তে দেখা যায়, যদিও তা অতিমাত্রায় বিরল।
অ্যানড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়ার দরূণ মেয়েদের চুল পড়া
“মেয়েরা যেমন মুটিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন, ছেলেরা তেমনি চুল পড়া নিয়ে”- বলেন প্রাণীবিদ পার জ্যাকবসেন। তবে ছেলেরা সান্ত্বনার বাণী হিসেবে জেনে রাখুন, প্রাণীকুলে কেবলমাত্র আপনারাই এর ভুক্তভোগী নন, বরং অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও পাওয়া যায় এর নজির। শিম্পাঞ্জি, ম্যাকাকুই (পুং ও স্ত্রীলিঙ্গ উভয়েই), পূর্ব কেনিয়ার সাভো সিংহের মধ্যেও টাকের নিদর্শন পাওয়া যায়। কিছু কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে চুলবিহীন পুরুষের আবেদনই স্ত্রী প্রাণীদের কাছে বেশি।
টাক থেকে রেহাই পাবার উপায় কী?
কোনো ফলপ্রসূ চিকিৎসা নেই যা এর নিরাময় করবে। তবে কিছু প্রচলিত পদ্ধতি আছে যেমন- ফিনাস্টেরাইডের মতো ঔষধ সেবন, মিনোক্সিডিল লোশনের ব্যবহার ইত্যাদি। তবে এগুলোর ব্যবহারের নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি নানা বিরূপ প্রভাব ও ঝুঁকি রয়েছে। এগুলোর ফলাফলও খুব কার্যকরী নয় বরং ব্যবহার বন্ধে আবারও ফিরে আসবে টাক। এছাড়াও অনেকেরই পুরো মাথার চুল পড়ে যায় না, বরং মাথার পেছনভাগে কিছু চুল থেকে যায়। অনেকেই এই মাথার পেছনভাগের চুল ও ত্বক নিয়ে মাথার অন্যান্য অংশে ‘হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট’ বা চুল প্রতিস্থাপন সার্জারির মাধ্যমে ফিরে পান নিজের চুল। টাক ঘুচিয়ে ফেলার একটি পন্থা এটি।
চুল পড়ায় মিনোক্সিডিল লোশনের ব্যবহার। ছবিসূত্র- youtube.com
একপ্রকার হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট পদ্ধতি। ছবিসূত্র- quora.com
চুল পড়ে যাওয়া এবং টাকের উদ্ভব বয়ে আনে দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতা। এই সমস্যাটির পাকাপাকি সমাধান আজ অবধি পাওয়া না গেলেও আধুনিক বিজ্ঞান ভবিষ্যতে হয়তো খুঁজে নিয়ে আসবে এর পেছনের প্রকৃত কারণ ও সমাধান।
সংক্ষেপে দেখুনমানব মস্তিষ্ক কি আসলেই সুপারকম্পিউটারের চেয়ে শক্তিশালী ?
আমাদের গোটা শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে ধড়ের উপর বসে থাকা মস্তিষ্কটি। এত জটিল, অসাধারণ আর সুক্ষ্ম মস্তিষ্ক এত নিখুঁতভাবে আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে যে তার বর্ণনা শুনতে গেলে যে কারো চোয়াল ঝুলে পড়তে বাধ্য। তবে মস্তিষ্ক নিয়ে ভ্রান্ত ধারনাও কম নেই একেবারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক সে সব কথা অবিশ্বাস্য তথ্য। মস্তিষবিস্তারিত পড়ুন
আমাদের গোটা শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে ধড়ের উপর বসে থাকা মস্তিষ্কটি। এত জটিল, অসাধারণ আর সুক্ষ্ম মস্তিষ্ক এত নিখুঁতভাবে আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে যে তার বর্ণনা শুনতে গেলে যে কারো চোয়াল ঝুলে পড়তে বাধ্য। তবে মস্তিষ্ক নিয়ে ভ্রান্ত ধারনাও কম নেই একেবারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক সে সব কথা অবিশ্বাস্য তথ্য।
মস্তিষ্কের শরীরবৃত্ত
মস্তিষ্কের মোট ওজন তিন পাউন্ডের মত। সারা শরীরের সাথে তুলনা করলে আমাদের শরীরের মোট ওজনের মাত্র দু’ভাগ দখল করে আছে মস্তিষ্ক। কিন্তু খরচের বেলায় সে মুক্তকচ্ছ। আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি তার শতকরা ২০ শতাংশ একাই খরচ করে। এই খাদ্য এবং অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার জন্য ১,০৪০-৮০ লিটার রক্ত পরিবাহিত হয় চব্বিশ ঘণ্টায়।
মস্তিষ্ক; source: buzzkeys.com
সে কি শুধু খরচ করে? উহু, একদম নয়। প্রতিদিন মস্তিষ্কে ১২ থেকে ২৫ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। লো ভোল্টেজের LED জ্বালানোর জন্য যথেষ্ট নয় কি?
মস্তিষ্কের অধিকাংশই পানি। পরিসংখ্যানে আনলে দাঁড়ায় ৭৩ শতাংশের মত। বাকি সাতাশ ভাগের ৬০ ভাগই আবার চর্বি। সত্যি বলতে কী, আমাদের দেহের সবচেয়ে ফ্যাটি অংশ এই মস্তিষ্কই। চর্বির কথা আরেকটু বলতে গেলে, আমরা সবসময় কোলেস্টেরল ছাড়া খাবার খুঁজি। কিন্তু শরীরের মোট সঞ্চিত কোলেস্টেরলের ২৫ ভাগ মানে প্রতি চার ভাগের এক ভাগই মস্তিষ্কের কোষে থাকে। এই কোলেস্টেরল এতই অত্যাবশ্যকীয় যে এগুলো ছাড়া নিউরন (স্নায়ু কোষ) মারা যাবে।
বিভিন্ন কারণে আমাদের শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কে। মস্তিষ্কে পানির পরিমাণ কমে গেলে আমরা ঠিকভাবে কাজ করতে পারি না। দুই শতাংশ কমে গেলেই আমাদের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাধাপ্রাপ্ত হয়।
একটি নিউরন প্রতি সেকেন্ডে ১,০০০ সংকেত পাঠাতে পারে। প্রতিটি নিউরন অন্যান্য নিউরন এর সাথে প্রায় দশ হাজার বন্ধন তৈরি করে।
নিউরন কোষ source: livescience.com
একটি গমের দানার সমপরিমাণ মস্তিষ্ক টিস্যুতে ১ লক্ষের মতো নিউরন থাকে, যেগুলো পরস্পরের সাথে এক বিলিয়ন বন্ধন তৈরি করে। তাহলে মোট নিউরনের সংখ্যা কত? নিখুঁত হিসেব এখনও পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানিদের ধারণা, সেটা ৮৬ বিলিয়নের কম না। এদের সবাই একরকম তা নয়। প্রায় ১০ হাজার বিভিন্ন রকম নিউরন রয়েছে।
মস্তিষ্ক টিস্যু কিন্তু অক্সিজেনের উপরে খুবই নির্ভরশীল। পাঁচ মিনিট অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে নিউরন মারা যাওয়া শুরু করে। আর নিউরন মারা গেলে সাধারণত তার জায়গা নেয়ার জন্য নতুন কোনো নিউরন তৈরি হয় না। ধূমপান এই অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করার মূল কালপ্রিট। কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছেন তো?
বাচ্চাদের আমরা অনেক সময়ই বলি, এই থাম তো! তোর এখনো বোঝার বয়স হয়নি। ২ বছর বয়সে মস্তিষ্ক ৮০ ভাগ পূর্ণতা পায়। সম্পূর্ণ পূর্ণতা পেতে ২৫ বছর লেগে যায়। সুতরাং আপনি দুই-তিন বছর বয়সের বাচ্চার সামনে যা না তা-ই বলবেন আর ভাববেন সে কিছু বোঝে না, তাহলে কিন্তু ভুল ভাবছেন। বাচ্চারা সব বোঝে!
আমাদের মস্তিষ্ককে সুরক্ষা প্রদান করার জন্য একটি পর্দা রয়েছে যার নাম ব্লাড-ব্রেইন-ব্যারিয়ার। রক্ত থেকে মস্তিষ্কে কী যাবে তা নিয়ন্ত্রণ করে এই পর্দা। ক্ষতিকর পদার্থ এই পর্দা ভেদ করে সাধারণত যেতে পারে না। তবে নিকোটিন কিংবা অ্যালকোহলকে বাধা দিতে পারে না সে।
সারাদিন পঞ্চাশ হাজার বারের বেশি চিন্তা করেন আপনি; source: buzzkeys.com
আপনি সারাদিন সবচেয়ে বেশি কী করেন সেটা কি জানেন? চিন্তা করেন; শুধু চিন্তা করেন আর চিন্তা করেন। সারাদিন প্রায় পঞ্চাশ হাজার বার চিন্তা করেন আপনি! মানে বুঝেছেন? আপনি একজন বড় মাপের চিন্তাবিদ।
কার মস্তিষ্ক কত বড়?
ছেলেদের মস্তিষ্ক মেয়েদের চেয়ে প্রায় ১০ ভাগ বড়। এই তথ্যটি পড়ে ছেলেদের বড় করে হাসি দেয়ার কিছু নেই। যে অংশটি স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করে, সেই হিপোক্যাম্পাস কিন্তু মেয়েদের তুলনামূলক বড়। অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক অন্যদের চেয়ে খানিকটা ছোট ছিলো, প্রায় দশ শতাংশের মত। কিন্তু তাতে নিউরনের ঘনত্ব ছিলো স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে বেশি।
বিগত বিশ হাজার বছরে আমাদের মস্তিষ্কের আকার ক্রমশ ছোট হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে যতটুকু ছোট হয়েছে তা দিয়ে একটি টেনিস বল বানানো যাবে। ভালো কথা, নিয়ান্ডারথালদের মস্তিষ্ক মানুষের চেয়ে বড় ছিলো।
লন্ডনের ট্যাক্সিক্যাব চালকদের হিপোক্যাম্পাস গড়পড়তা মানুষের চেয়ে বড়। কেন? তাদের প্রায় পঁচিশ হাজার রাস্তা মুখস্ত রাখতে হয় যে!
ব্রেনের ক্ষয়
প্রতিনিয়ত চেপে ধরা হতাশা এবং মানসিক অবসাদ মস্তিষ্ক সঙ্কুচিত করে তোলে। আমরা আধুনিক যে ফাস্টফুড খাই তাতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে না। এটি মস্তিষ্কের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। নিয়মিত এই ধরনের খাবার খেলে মস্তিষ্ক সঙ্কুচিত হয়ে যায়।
এই আধুনিক যুগে আমরা একসাথে অনেকগুলো কাজ করতে অভ্যস্ত। কিন্তু মস্তিষ্ক একসাথে দুটি কাজে মনোযোগ দিতে পারে না। ফলে কী হচ্ছে? চটজলদি একটি কাজ সমাধা করে অন্য কাজ মনোযোগ দিতে হচ্ছে। ফলে মনোযোগের সময়সীমা, সক্ষমতা, এমনকি দীর্ঘকালীন স্মৃতি কমে যাচ্ছে আমাদের।
২০০০ সালের দিকে মানুষের মনোযোগের সময়সীমা ছিলো ১২ সেকেন্ড; এখন সেটা কমে ৮ সেকেন্ডে নেমে আসছে।
যখন প্রয়োজনীয় পুস্টি পায় না তখন মস্তিষ্ক কোষগুলো নিজদের ধ্বংস করে ফেলে। আমরা যখন অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার নিয়ন্ত্রণ করি, যেটাকে সবাই ডায়েট বলে, তখন এটা বেশি ঘটে। সুতরাং ডায়েট করার আগে সতর্ক থাকুন।
মস্তিষ্ক নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা
মস্তিষ্ক নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত কথাগুলোর একটি হচ্ছে, আমরা আমাদের মস্তিষ্কের ১০ ভাগ ব্যবহার করি। কথাটি সম্পূর্ণ ভুল। আমরা আমাদের মস্তিষ্কের পুরোটাই ব্যবহার করি। এমনকি ঘুমের সময়ও আমাদের মস্তিষ্ক কার্যকর থাকে। তবে হ্যাঁ, আমরা চর্চার মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্কের সক্ষমতা বাড়াতে পারি।
অ্যালকোহল আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনকে ধ্বংস করে না। তবে অতিরিক্ত অ্যালকোহল মস্তিষ্ক কোষের নিউরনের সাথে থাকা কানেকটিভ টিস্যুকে ধ্বংস করে। আরেকটি ব্যাপার আছে। আপনি যদি আগের দিন পার্টিতে গিয়ে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরে ঘুম থেকে উঠে ভাবেন, “আরে তাই তো! কাল কী করেছিলাম মনে পড়ছে না কেন? কী মুশকিল!” এর মানে এই নয় যে, আপনি গতদিনের স্মৃতি ভুলে গেছেন। এর কারণ ভিন্ন। দেখা গেছে, অ্যালকোহলিক মস্তিষ্ক নতুন কিছু সঠিকভাবে শিখতে পারে না।
মোজার্ট শুনলে মস্তিষ্কের ক্ষমতা বেড়ে যায়- প্রচলিত একটি কথা। শুধু মোজার্ট নয়; এ ধরনের সকল সুরই মস্তিষ্কের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
বলা হয়ে থাকে, মস্তিষ্কে প্রায় ১০ হাজার মাইল লম্বা রক্তনালী রয়েছে। কথাটি অতিরঞ্জিত। সঠিক হিসেবে এটা ৪০০ মাইলের মত। এটাও কিন্তু একেবারে কম নয়।
স্মৃতি
আমরা যখন একটি কাজ করি সেটি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একসাথে মিলে করে। সম্পূর্ণ কাজটি কয়েকটি অংশে ভাগ হয়ে বিভিন্ন অংশে সম্পন্ন হয় এবং শেষে একটি একক কাজ হিসেবে আউটপুট দেয়। আমাদের মস্তিষ্ক পূর্ণতা পাওয়ার পরপরই বুড়ো হতে শুরু করে, অর্থাৎ কম-বেশি পঁচিশ বছরের পর থেকে। সেই হিসেবে বলতে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাধর মস্তিষ্ক এই পঁচিশ বছর বয়সে পাওয়া যায়।
হিপোক্যাম্পাস; source: buzzkeys.com
তবে তার পরে যে মানুষ কোনো কাজে সর্বোচ্চ পরিমাণে নৈপুণ্য দেখাতে পারে না, তা নয়। যেমন মানুষের শব্দজ্ঞান সবচেয়ে পূর্ণতা পায় প্রায় ৭২ বছর বয়সে। দেখাই যাচ্ছে, মস্তিষ্কের দক্ষতার পেছনে অভিজ্ঞতার একটি বড় অবদান রয়েছে।
পৃথিবীতে মিস আর্থ, মিস ইউনিভার্স এর পাশাপাশি আরেকটি প্রতিযোগিতা হয়। সেখানে যাচাই করা হয় কার স্মৃতি সবচেয়ে বেশি প্রখর। এই প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়নরা কিন্তু জন্মসূত্রে মহা স্মৃতিধর না। এটি তাদের চর্চা এবং কৌশলের ফলাফল। বুঝতেই পারছেন কী বলত চাইছি? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। আপনি চাইলে হতে পারেন দারুণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী।
আমাদের প্রায়শই প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এটা সত্যি যে, মস্তিষ্ক নিজে নিজের ব্যথা অনুভব করতে পারে না! সেই কারণে একজন সার্জন রোগীকে জাগিয়ে রেখেই মস্তিষ্কে অপারেশন করতে পারে। তাহলে ব্যথা অনুভূত হয় কীভাবে? এই ব্যথা মূলত আশেপাশের মাথার ত্বক, হাড়ের গিঁট, সাইনাস, মাংসপেশিতে থাকা স্নায়ু উত্তেজনার ফলে।
অন্তর্মুখী এবং বহির্মুখী মানুষের মস্তিষ্কের প্যাটার্ন কিন্তু আলাদা। যারা অন্তর্মুখী তাদের মস্তিষ্কে গ্রে-ম্যাটারের পরিমাণ বেশি। আর যারা বহির্মুখী তাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন লেভেল বেশি কার্যকর।
তুলনা
কম্পিউটার থেকে এগিয়ে আছে মস্তিষ্ক; source: tbn-tv.com
বিভিন্ন সময়ে যত তথ্য-প্রযুক্তিগত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয়েছে তাদের সাথে মস্তিষ্কের তুলনা হয়েছে। এভাবে তাকে সেই লম্বা সময় ধরে পরীক্ষা দিয়ে আসতে হয়েছে, কে বেশি দক্ষ? ঘড়ি নাকি মস্তিষ্ক? কম্পিউটার নাকি মস্তিষ্ক? ইন্টারনেট নাকি মস্তিষ্ক?
সুখের কথা হলো, প্রতিবারই কেল্লাফতে করেছে আমাদের মস্তিষ্কই।
আমাদের মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা কত? কয়েক গিগাবাইট কিংবা টেরাবাইট হবে- এমন ভাবছেন তো? তাহলে ভুল ভাবছেন। আমাদের মস্তিষ্কের কোনো মেমোরি কার্ডের মতো সীমাবদ্ধতা নেই। অর্থাৎ কখনো আমাদের মস্তিষ্ক স্মৃতিতে পরিপূর্ণ হয়ে শেষ হয়ে যাবে না! সুতরাং যদি এমন কেউ থেকে থাকেন, যারা ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে অলস বসে থাকেন, তাহলে কাজে নেমে পড়ুন। যত ইচ্ছা ব্যবহার করুন তাকে।
সংক্ষেপে দেখুনকিভাবে বুঝবো পৃথিবী আসলেই গোলাকার?
অবিশ্বাস্য মনে পারে, কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতেও এমন কিছু মানুষ আছে, যারা মনে করে পৃথিবী গোলাকার না, বরং সমতল। এই তত্ত্বে বিশ্বাসীদের একটি সংগঠনও আছে, যার নাম দ্য ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটি। এদের ধারণা অনুযায়ী, গোলাকার পৃথিবী সম্পর্কিত যত গবেষণা এবং ছবি বা ভিডিও প্রমাণ আছে, সব নাসা এবং উন্নত বিশ্বের সরকারবিস্তারিত পড়ুন
অবিশ্বাস্য মনে পারে, কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতেও এমন কিছু মানুষ আছে, যারা মনে করে পৃথিবী গোলাকার না, বরং সমতল। এই তত্ত্বে বিশ্বাসীদের একটি সংগঠনও আছে, যার নাম দ্য ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটি। এদের ধারণা অনুযায়ী, গোলাকার পৃথিবী সম্পর্কিত যত গবেষণা এবং ছবি বা ভিডিও প্রমাণ আছে, সব নাসা এবং উন্নত বিশ্বের সরকারগুলোর ষড়যন্ত্র। বাস্তবে পৃথিবী একটি চাকতির মতো সমতল পৃষ্ঠ বিশিষ্ট, চন্দ্র এবং সূর্যের আকার খুব বেশি না, সেগুলো মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার উপর দিয়ে পৃথিবীর উপর বিচরণ করে এবং পৃথিবী সহ সমগ্র মহাবিশ্ব প্রচন্ড বেগে উপরের দিকে ছুটে যায় বলেই মাধ্যাকর্ষণের সৃষ্টি হয়।
ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটির সদস্যদের মতে পৃথিবী যেরকম; Source: videoblocks.com
মজার ব্যাপার হচ্ছে, পৃথিবী যে আসলেই গোলাকার, সেটি বোঝার জন্য নাসা বা কোনো দেশের সরকারের উপর নির্ভর করার কোনো দরকার নেই। নাসা বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই মানুষ জানত পৃথিবী গোলাকার। অনেকের ধারণা, আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ক্রিস্টোফার কলম্বাস পৃথিবীকে গোলাকার প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবী যে গোলাকার, তা আরো আগে থেকেই মানুষ জানত। কোনো প্রকার জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়াই অতি সাধারণ কিছু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আপনিও সহজেই বুঝতে পারবেন পৃথিবী আসলে সমতল নয়, বরং গোলাকার।
চাঁদ এবং অন্যান্য গ্রহের আকার
আজ থেকে আড়াই হাজার বছর পূর্বে, পিথাগোরাস সর্বপ্রথম লক্ষ্য করেন যে, চাঁদ বৃত্তাকার। সেখান থেকেই তিনি ধারণা করেন, পৃথিবী সহ অন্যান্য মহাকাশীয় বস্তুও বৃত্তাকার। এখনও যদি আমরা টেলিস্কোপের সাহায্যে অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে নিশ্চিতভাবেই দেখতে পারব, মহাবিশ্বের প্রায় সকল বস্তুই মোটামুটি বৃত্তাকার। চাকতির মতো সমতল কোনো গ্রহের অস্তিত্ব কোথাও নেই। স্বাভাবিকভাবেই আমরা ধরে নিতে পারি, পৃথিবীর আকারও অন্যান্য গ্রহের মতোই হবে।
চন্দ্রগ্রহণ পর্যবেক্ষণ
চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়া; Source: Popsci.com
পিথাগোরাসের মৃত্যুর প্রায় ১৫০ বছর পর, অ্যারিস্টটল সর্বপ্রথম বৃত্তাকার পৃথিবীর পক্ষে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি দেখান। তিনি লক্ষ্য করেন, চন্দ্রগ্রহণের সময় যখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে, তখন ছায়ার আকার অর্ধবৃত্তাকার হয়ে থাকে। এ থেকেই তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, পৃথিবী গোলাকার। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে চন্দ্রগহণের সময় মোটামুটি একই রকম অর্ধবৃত্তাকার ছায়া দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, পৃথিবী শুধু গোলাকারই না, তা প্রায় নিরেট বৃত্তাকার।
দিগন্তে জাহাজের আবির্ভাব
সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে কেউ যদি দূর থেকে কোনো জাহাজের আগমন প্রত্যক্ষ করে, তাহলে তার কাছে মনে হবে জাহজটি যেন সমুদ্রের পানি থেকে উঠে আসছে। পৃথিবী যদি সমতল হতো, তাহলে এরকম মনে হতো না, বরং সেক্ষেত্রে জাহাজটি প্রথমে অস্পষ্ট থাকত এবং ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতো। কিন্তু পানি থেকে উঠে আসতে দেখা যাওয়ার ঘটনা থেকেই বোঝা যায় পৃথিবী বৃত্তাকার।
ব্যাপারটি বোঝার জন্য খুব সহজ একটি পরীক্ষা করা যায়। বৃত্তাকার একটি ফুটবলের উপর একটি পিঁপড়াকে বসিয়ে ফুটবলটিকে ঘুরিয়ে পিঁপড়াটিকে দৃষ্টির বাইরে থেকে ধীরে ধীরে দৃষ্টির আওতায় আনতে থাকলে জাহাজের মতোই সেটিকে দিগন্ত থেকে উদিত হচ্ছে বলে মনে হবে। কিন্তু একই পিঁপড়াকে যদি সোজা একটি লম্বা রাস্তায় দূর থেকে ধীরে ধীরে কাছে আসতে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি অস্পষ্ট থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকবে।
জাহাজ হঠাৎ করে যেভাবে দৃশ্যমান হয়; Source: Popsci.com
পরিবর্তনশীল নক্ষত্র
আজ থেকে প্রায় ২,৩৫০ বছর পূর্বেই গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল লক্ষ্য করেন, বিষুবীয় রেখা থেকে উত্তরে বা দক্ষিণে যেতে থাকলে আকাশের নক্ষত্রগুলোর অবস্থান পরিবর্তিত হতে থাকে। যেসব নক্ষত্রকে বিষুবীয় অঞ্চলে ঠিক মাথার উপরে দেখা যায়, উত্তরে বা দক্ষিণে গেলে সেগুলো একদিকে হেলে পড়ে এবং বিপরীত দিক থেকে নতুন নতুন নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটতে থাকে।
অ্যারিস্টটল যখন মিসর এবং সাইপ্রাস ভ্রমণ করেন, তখনই প্রথম তিনি ব্যাপারটি লক্ষ্য করেন। ভ্রমণ থেকে ফিরে এসে তিনি লিখেন, মিসর এবং সাইপ্রাসের আকাশে এমন কিছু তারা দেখা যায়, যেগুলো গ্রীসের আকাশে দেখা যায় না। তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, পৃথিবীর পৃষ্ঠ গোলাকার হলেই কেবল এরকম ঘটনা ঘটতে পারে।
পরিবর্তনশীল ছায়া
পৃথিবী গোলাকার হওয়ার কারণে ছায়ার পার্থক্য; Source: futurism.com
মাটির উপর একটি খুঁটি পুঁতে রাখলে তার ছায়া পড়বে। যেহেতু সূর্যের অবস্থান পৃথিবী থেকে অনেক দূরে এবং সূর্য থেকে আগত আলোক রশ্মিগুলো প্রায় সমান্তরাল, তাই পৃথিবী সমতল হলে পাশাপাশি দুটো এলাকায় একই সময়ে একই দৈর্ঘ্যের খুঁটির ছায়ার দৈর্ঘ্য একই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।
আজ থেকে প্রায় ২,২০০ বছর পূর্বে মিসরের আলেক্সান্দ্রিয়া লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান এরাতোস্থেনেস সর্বপ্রথম বিষয়টি লক্ষ্য করেন। তিনি একটি নির্দিষ্ট দিনে ঠিক দুপুর বেলা আলেক্সান্দ্রিয়া এবং কয়েকশ কিলোমিটার দূরবর্তী শহর সিয়েনে একই দৈর্ঘ্যের দুইটি খুঁটির ছায়া পরিমাপ করেন। সিয়েনে সূর্য ঠিক মাথার উপরে থাকার কারণে কোনো ছায়া পড়েনি, কিন্তু আলেক্সান্দ্রিয়ায় সামান্য একটু ছাড়া পড়ে। এ থেকে তিনি নিশ্চিত হন যে, পৃথিবী বৃত্তাকার।
এরাতোস্থেনেস ছায়ার দৈর্ঘ্য থেকে সূর্যরশ্মির কোণ পরিমাপ করেন। শহর দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং তাদের ছায়ার কৌণিক পার্থক্য থেকে তিনি প্রায় নিখুঁতভাবে পৃথিবীর পরিধিও নির্ণয় করতে সক্ষম হন। এরাতোস্থেনেস পৃথিবীকে সম্পূর্ণ বৃত্তাকার মনে করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবী উত্তর-দক্ষিণ দিক একটু চাপা হওয়ায় তার হিসেবে সামান্য পরিমাণ ভুল ছিল।
উঁচু স্থান থেকে দূরের দৃশ্য
উঁচু স্থান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়; Source: Popsci.com
কোনো গাছ বা উঁচু ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে খালি চোখে অথবা দূরবীণের সাহায্য সর্বোচ্চ যতদূর পর্যন্ত দেখা যায়, সেই গাছের উপরে অথবা ভবনের ছাদে উঠে তাকালে তার চেয়েও দূর পর্যন্ত দেখা যায়। পৃথিবী সমতল হলে এটি সম্ভব হতো না। সমুদ্রের তীরে সূর্যাস্তের সময় খুব সহজেই এই পরীক্ষাটি করা সম্ভব। সূর্যাস্তের সময় মাটিতে শুয়ে থাকলে ঠিক যে মুহূর্তে সূর্য ডুবে গেছে বলে মনে হবে, তখন উঠে দাঁড়ালেই দেখা যাবে, সূর্য পুরোপুরি ডোবেনি, তার কিছু অংশ তখনও দৃশ্যমান। একই স্থানে যদি আরও উঁচুতে ওঠা যায়, তাহলে সম্পূর্ণ সূর্যাস্তটিই পুনরায় উপভোগ করা সম্ভব হয়। পৃথিবীপৃষ্ঠ গোলাকার বলেই এটি সম্ভব।
দিবা-রাত্রির দৈর্ঘ্য এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সময়ের পার্থক্য
বাংলাদেশে যখন দুপুর ১২টা, অর্থাৎ সূর্য যখন ঠিক মাথার উপরে, বিশ্বের কিছু কিছু এলাকায়, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তখন রাত ১২টা। সূর্যের কোনো অস্তিত্বই সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না। পৃথিবী যদি সমতল হতো, তাহলে সময়ের খুবই সামান্য ব্যবধান হতো। এক দেশে রাত, অন্য দেশে দিন হতো না। পৃথিবী প্রায় বৃত্তাকার বলেই কোনো স্থানে সূর্য যখন মাথার উপরে থাকে, বিপরীত পৃষ্ঠ তখন সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে, অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পর্যায়ক্রমে দিন এবং রাতের আগমন ঘটে। এছাড়াও পৃথিবী গোলাকার বলেই বিষুবীয় অঞ্চলের সাথে উত্তর বা দক্ষিণ গোলার্ধে দিন এবং রাতের দৈর্ঘ্য পার্থক্য দেখা যায়।
সংক্ষেপে দেখুনব্যারোমিটার কি সত্যি বাতাসের চাপ মাপার যন্ত্র?
আজ বাতাসের চাপ কেমন? বৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি? এসব জানার একটি সহজ উপায় হলো ব্যারোমিটারের সাহায্যে বায়ুচাপ নির্ণয়। কী এই ব্যারোমিটার? ব্যারোমিটার হলো মূলত বায়ুচাপ নির্ণয়ের একটি যন্ত্র। আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানতে এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর ব্যবহার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই আবিষ্কারের পেছনে একটি মজবিস্তারিত পড়ুন
আজ বাতাসের চাপ কেমন? বৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি? এসব জানার একটি সহজ উপায় হলো ব্যারোমিটারের সাহায্যে বায়ুচাপ নির্ণয়। কী এই ব্যারোমিটার? ব্যারোমিটার হলো মূলত বায়ুচাপ নির্ণয়ের একটি যন্ত্র। আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানতে এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর ব্যবহার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই আবিষ্কারের পেছনে একটি মজার ইতিহাস আছে যা অনেকেরই অজানা। কী সেই ইতিহাস? চলুন জেনে নেয়া যাক।

Image source: Britannica
‘ব্যারোমিটার’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘ব্যারোস’ এবং ‘মেট্রোন’ থেকে। ‘ব্যারোস’ শব্দের অর্থ ওজন এবং ‘মেট্রোন’ শব্দের অর্থ ‘পরিমাপ’। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইতালিতে অনেক বিজ্ঞানী স্বতন্ত্রভাবে ভ্যাকুয়াম এবং বায়ুচাপ সম্পর্কিত তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যেই একজন হলেন টরিসেলি। তাকেই মূলত ব্যারোমিটারের উদ্ভাবক হিসেবে গণ্য করা হয়।
গ্যালিলিও এর সেই বিখ্যাত ‘ টাওয়ার অব পিজা’-এর কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? তিনি দেখিয়েছিলেন, বায়ুর বাধা না থাকলে ভারী এবং হালকা বস্তু একই সময়ে নিচে এসে পড়ে। এখান থেকে আমরা বায়ুচাপ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাই। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বায়ুচাপের তারতম্য দেখা যায়। সমুদ্র সমতলে বায়ুচাপ সবচেয়ে বেশি। যত উপরে ওঠা যায়, বায়ুচাপ ততই কমতে থাকে। এমনকি একটি স্থানের বায়ুচাপও কখনও ধ্রুবক থাকে না, পরিবর্তিত হতে থাকে। এর কারণ হলো পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ক্রমাগত ঘুরছে। ফলে বিভিন্ন স্থান বিভিন্ন পরিমাণ তাপ গ্রহণ করছে। টরিসেলি বায়ুচাপের তারতম্যের এ বিষয়টি খেয়াল করেন। বায়ুচাপকে যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত করলে প্রতি বর্গক্ষেত্রে প্রযুক্ত বলকে বোঝায়। এ থেকে বোঝা যায়, বায়ুরও ওজন আছে। টরিসেলি প্রকৃতপক্ষে বায়ুচাপকে ওজনে রূপান্তর করেই কাজ করেছিলেন।

টরিসেলি; Image source: Wikimedia Commons
কীভাবে টরিসেলি বায়ুচাপের তারতম্যের বিষয়টি বুঝেছিলেন? প্রকৃতপক্ষে গ্যালিলিও এ ধারণার সূচনা করেন। বহু শতাব্দী পূর্বে অ্যারিস্টটলসহ কয়েকজন প্রাচীন দার্শনিক মতবাদ দেন, প্রকৃতিতে ভ্যাকুয়াম বা বায়ুশূন্য ফাঁকা স্থান থাকা সম্ভব নয়। বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা এ ধারণার সাথে একমত পোষণ করে এসেছিলেন। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে এ ধারণা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা যায়। কী ছিল এই বিভ্রান্তির কারণ?
চোষণ পাম্পে পানি উত্তোলন নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দেখা দেয় চিন্তাশীলতা। যেসকল বিজ্ঞানী পানির ঘনত্ব ও স্তম্ভের উচ্চতা সম্পর্কিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান, গ্যালিলিওকে তাদের মধ্যে অন্যতম ধরা হয়। শোনা যায়, তিনি একটি লম্বা টিউবকে কুয়ায় ডোবান যা একটি পাম্প দ্বারা চালনা করা হয়। কিন্তু তিনি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন, যত পরিশ্রমই করা হোক না কেন, ৯.৭ মিটারের বেশি উচ্চতায় পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি পরীক্ষায় একই ফলাফল পাওয়া যাচ্ছিল। তিনি উপলব্ধি করলেন, প্রকৃতপক্ষে বায়ুচাপই পানির পৃষ্ঠে বল প্রয়োগ করে পানি উত্তোলন করে থাকে। এজন্য প্রথমে পাম্প থেকে বাতাস অপসারণ করে ভ্যাকুয়াম অবস্থার সৃষ্টি করা দরকার।

গ্যালিলিও; Image source: Biography
গ্যালিলিওর শিক্ষার্থী হিসেবে টরিসেলি গ্যালিলিওর পরীক্ষা নিয়ে কাজের জন্য উঠে-পড়ে লাগলেন। তিনি মূলত গ্যালিলিওর ভ্যাকুয়াম তত্ত্ব নিয়েই কাজ করছিলেন। গ্যালিলিওর তত্ত্ব ব্যারোমিটারের উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে অনেকটা সহায়ক ছিল। গ্যালিলিওই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি ভ্যাকুয়াম যন্ত্র নিয়ে কাজ করেন। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ‘ভ্যাকুয়াম তত্ত্ব’-এর অনুমোদন। তবে এক্ষেত্রে তিনি পরিবেশের বায়ুচাপের তারতম্য নির্ণয়ের জন্য কোনো প্রচেষ্টা চালাননি। যদিও তার ভ্যাকুয়াম নীতিই ব্যারোমিটারের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
যা-ই হোক, টরিসেলি তার পরীক্ষায় প্রথমে একটি লম্বা টিউবকে পানিপূর্ণ করলেন। পরবর্তীতে তিনি এ টিউবকে উল্টিয়ে পানির একটি ধারকের মধ্যে রাখলেন। টিউবে পানির ধীর অপসারণ দেখে তিনি বুঝতে পারলেন, পানির উপর যে একমাত্র বল কাজ করছিল সেটি নিশ্চিতভাবে বায়ুর বল বা ওজন। তবে দু’ধরনের বলের মধ্যে ভারসাম্য কাজ করছিল-
১. পরিবেশের বাতাস দ্বারা পানিতে প্রযুক্ত বল।
২. টিউবের অভ্যন্তরে পানির বল।
তবে টরিসেলি তার পরীক্ষার প্রথমেই বিপত্তির শিকার হন। কেননা, তখন তিনি তরল হিসেবে এ পরীক্ষায় পানি ব্যবহার করেন। পানি ব্যবহারে এখানে বিপত্তিটা কোথায়? পানি অপেক্ষাকৃত হালকা হওয়ায় টরিসেলির প্রথম ব্যারোমিটারটির উচ্চতা হওয়া প্রয়োজন ছিল প্রায় ৩৫ ফুট, যা তার বাড়ির ছাদ ফুঁড়ে বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়! এক্ষেত্রে তিনি তার বিশাল পানির স্তম্ভের উপর একটি পুতুল বসান যাতে তার নড়াচড়া থেকে পরিবেশের বায়ুচাপের তারতম্য নির্ণয় করতে পারেন।
কিন্তু এটি আরেক সমস্যার সৃষ্টি করে। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশিরা গুজব শুরু করে। অনেকে সন্দেহ করে, টরিসেলি জাদুবিদ্যার চর্চা শুরু করে দিয়েছেন! এ ধরনের গুজবের মুখোমুখি হলে টরিসেলি উপলব্ধি করেন, তাকে আরও গোপনে কাজ করতে হবে এবং সেজন্য তাকে আরও ভারী কোনো তরল ব্যবহার করতে হবে। ভারী তরল পদার্থ হিসেবে তিনি বেছে নেন পারদ বা ‘মার্কারি’। ফলে এবার আর ৩৫ ফুট লম্বা স্তম্ভের দরকার হলো না, ৩২ ইঞ্চি ছোট টিউব দিয়েই কাজ হলো। এতে করে প্রতিবেশিদের অভিযোগ ছাড়াই গোপনে কার্যক্রম চালাতে পারলেন টরিসেলি।
পারদ দ্বারা পরীক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি দেখলেন, টিউবের মধ্যে পারদ একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় এসে থেমে যায় এবং উপরে কিছু স্থান ফাঁকা থেকে যায়। এ থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায়, পারদের ভারসাম্য ততক্ষণই বজায় থাকে যতক্ষণ বায়ুর ওজন এবং পারদের ওজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। টরিসেলি পরবর্তীতে উল্লেখ করেন, প্রতিদিন টিউবের পারদের উচ্চতা পরিবর্তিত হতো। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, প্রতিদিন পরিবেশে বায়ুচাপের পরিবর্তনের কারণে এ পরিবর্তন হয়। এ সম্পর্কে তিনি লেখেন, “প্রকৃতপক্ষে আমরা একটি বায়ুর সমুদ্রে বাস করি এবং নিঃসন্দেহে এ বায়ুর ওজন আছে।” এদিকে সে ময় অধিকাংশ বিজ্ঞানীই বিশ্বাস করতেন, বায়ুর কোনো ওজন নেই। তাই টরিসেলির এ ধারণা ছিল একেবারেই নতুন।

পারদ ব্যারোমিটার; Image source: johnvagabondscience.com
তবে কেমন ছিল এই ব্যারোমিটারের বায়ুচাপ নির্ণয় প্রক্রিয়া? খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করলে কিছুটা এরকম- একটি বায়ুশূন্য গ্লাস টিউবকে একটি পারদপূর্ণ পাত্রে নেয়া হয়। পাত্রের পারদের উপর পরিবেশের বাতাস চাপের কারণে টিউবে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পারদের স্তম্ভ থেমে যায়। এ উচ্চতা থেকে বায়ুচাপ নির্ণয় করা হয়। এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত সূত্র ব্যবহৃত হয়,
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৬৪৬ সালের দিকে বিজ্ঞানী প্যাসকেলও টরিসেলির পরীক্ষা-কার্যক্রম নিয়ে কাজ শুরু করেন। কথিত আছে, তিনি তার এক আত্মীয়কে পাহাড়ের উপর নিয়ে ব্যারোমিটারের পারদের উচ্চতা নির্ণয় করতে বলেন। ফলাফলস্বরূপ দেখা যায়, পারদের উচ্চতা নিচে নেমে আসে। তবে এ পরীক্ষার তাৎপর্য কী ছিল? এ পরীক্ষা থেকে প্রমাণিত হয়েছে উঁচু স্থানে বায়ুচাপ কমে যায়। অর্থাৎ বায়ুর উল্লম্ব ওজন আছে।
সেসময় বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের প্রায়ই সংঘর্ষ লেগে থাকত। সেই কারণে গ্যালিলিও বাইবেলের বিরুদ্ধে পৃথিবীর সূর্যের চারদিকে ঘূর্ণন নিয়ে মতবাদ দেয়ার কারণে দণ্ডপ্রাপ্ত হন। এদিকে টরিসেলির এ উদ্ভাবনের সাথেও চার্চের সংঘর্ষের উপক্রম হয়েছিল। সেটা কীরকম?
ভ্যাকুয়াম বা শূন্যস্থানের মতবাদ খ্রিস্টধর্মের সাথে সংঘাতপূর্ণ ছিল। কেননা, ধর্মের নীতি অনুযায়ী, সৃষ্টিকর্তার অবস্থান সব জায়গায়। এক্ষেত্রে ভ্যাকুয়াম বা শূন্যস্থান থাকার কোনো অবকাশ নেই। যা-ই হোক, টরিসেলি প্রায় একশো বছর পর তার উদ্ভাবনের স্বীকৃতি পান।

মেরিন ব্যারোমিটার; Image source: Zhuhai Weitong Import & Export Co., Ltd.
১৬৭০ সালের দিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের যন্ত্র হিসেবে ঘর-বাড়িতে ব্যারেমিটারের ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তী দু’শো বছরের মধ্যে মার্কারি ব্যারোমিটার ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। সমুদ্রযাত্রার জন্য ‘মেরিন ব্যারোমিটার’ নামে ব্যারোমিটারের ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। কালের বিবর্তনে বিভিন্ন রকম ব্যারোমিটারের উদ্ভাবন হয়। এমনকি উড়োজাহাজের যে প্রথম অ্যাল্টিমিটার বা উচ্চতা মাপার যন্ত্রবিশেষ, সেগুলো একপ্রকার ব্যারোমিটারই ছিল।
বর্তমানে বিভিন্ন উন্নত সংস্করণের ব্যারোমিটারের ব্যবহার দেখা যায়, যার অধিকাংশই ‘অ্যানিরয়েড’। তবে ব্যারোমিটারের মৌলিক সংস্করণের উদ্ভাবনের জন্য টরিসেলিকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হবে। আর বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যে ব্যারোমিটারের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ তা তো বলাই বাহুল্য।
সংক্ষেপে দেখুননদীগুলো আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হয় কেন ?
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি নদী আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হয়ে আসছে। এমন কোনো নদী নেই যেটা সোজা পথে প্রবাহিত হচ্ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় নদীর এই সর্পিল পথকে Meandering বলা হয়ে থাকে। মাটি থেকে অনেক উপর থেকে বিশেষ করে বিমান কিংবা পাহাড়ের উপর থেকে নিচের দিকে খেয়াল করলে নদীর এই সাপের মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া সহজেই বোঝা যায়বিস্তারিত পড়ুন
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি নদী আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হয়ে আসছে। এমন কোনো নদী নেই যেটা সোজা পথে প্রবাহিত হচ্ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় নদীর এই সর্পিল পথকে Meandering বলা হয়ে থাকে। মাটি থেকে অনেক উপর থেকে বিশেষ করে বিমান কিংবা পাহাড়ের উপর থেকে নিচের দিকে খেয়াল করলে নদীর এই সাপের মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া সহজেই বোঝা যায়। মাঝে মাঝে নদীর কোনো কোনো অংশ সোজা দেখা যায়। কিন্তু সেই সোজা অংশটিও সামনে এগিয়ে গিয়ে আবার বাঁকা পথ ধরে প্রবাহিত হতে থাকে। মাঝে মাঝে কিছু কিছু নদী এত তীব্রভাবে বেঁকে যায় যে নদীর প্রবাহ পথ থেকে অনেক সময় এই বাঁকা অংশ আলাদা হয়ে যায়। এই আলাদা হয়ে যাওয়া অংশকে বলা হয় Oxbow। এই অংশগুলোকে নদীর সর্পিল পথের পাশেই স্থান নিতে দেখা যায়। পৃথিবীর কম বেশি প্রায় প্রত্যেকটি নদীর পাশে Oxbow দেখা যায়।
খুব স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন এখানে চলে আসে, কেন নদীগুলো সোজা প্রবাহিত না হয়ে এঁকেবেঁকে নিজের গতিপথ নির্ধারণ করে? নদীর প্রবাহ পথের এরকম প্যাটার্ন কি নিছক সম্ভাবনা নাকি প্রাকৃতিক কোনো কারণ রয়েছে? যদি প্রাকৃতিক কারণ হয় তাহলে এর পেছনে কোন কোন বৈশিষ্ট্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে? আজকের এই লেখায় এই প্রশ্নগুলোর বৈজ্ঞানিক উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা হবে।
Meandering এবং Oxbow lake এর সমাবেশ; Image Source: Pinterest
নদীর উৎপত্তি হবার পর নদীটি যে বেঁকে যাবে সেটা অনেকটাই নির্ধারিত। কিন্তু এই বেঁকে যাবার শুরুটা ঘটে দৈবক্রমে। নদী তার উৎপত্তির পরপর যেভাবে প্রবাহিত হয়ে বেঁকে যায় সেই গতির ব্যাখ্যা দেয়া খুবই জটিল। কারণ প্রক্রিয়াটির সাথে সম্ভাব্যতা (Probability) জড়িত থাকে। তরল গতিবিদ্যা (Fluid Dynamics) দিয়ে ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু এ ব্যাপারে ভিন্ন মত রয়েছে [১]।
নদীর প্রবল স্রোত নদীর দুই তীরের নদীমাটির ক্ষয় সাধন করে। নদীর দিক পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া খুবই জটিল; Image Source: wyza.com.au
নদীর প্রবল স্রোত এবং প্রবাহ বলের কারণে একবার যদি দিক পরিবর্তন শুরু হয় তাহলে সেই পরিবর্তনের হার খুবই দ্রুত হবে এটা ধরে নেয়া যায়। নদীর স্রোতের প্রবাহের এই পরিবর্তনের জন্য নদীর দুই তীরের মাটির ক্ষয়সাধন (Soil Erosion) হয়। নদীর দিক পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া খুবই জটিল এবং বিশেষ বিশেষ কিছু অবস্থার উপর নির্ভর করে। পদার্থবিজ্ঞানে খুব সহজ করে এই প্রক্রিয়ার একটি ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। ব্যাখ্যাটি এরকম-
স্রোতের কারণে বেঁকে যাওয়া শুরুর প্রক্রিয়া বেশ জটিল। তবে একবার বেঁকে যাওয়ার পর, তা যত অল্পই হোক না কেন, নদীর পানি যখন এই বাঁকের মধ্যে প্রবেশ করে তখন পানির এই প্রবাহের উপর এক ধরনের বল কাজ করে যা পানির স্রোতকে বাইরের দিকে ঠেলে দিতে চায়। কখনো দোলনায় চড়লে খেয়াল করে দেখবেন, দোলনার ঘূর্ণনের সময় একটি বল আমাদেরকে বাইরে ঠেলে নিয়ে যেতে চায়- বিষয়টা অনেকটা এরকম। কিন্তু নদীর তীর এবং নদীর আশেপাশের মাটির কারণে পানি তীরের বাইরে চলে যেতে পারে না। কারণ নদীর পানি এবং তীরের মাটিগুলোর মধ্যে একধরনের ঘর্ষণ বল কাজ করে যা স্রোতকে বাইরে ঠেলতে বাধা দেয়। এই অবস্থায় নদীতে একধরনের প্রবাহ সৃষ্টি হয়, যা নদীর এক তীর থেকে আরেক তীরের দিকে প্রবাহমান হয়। এই প্রবাহকে Secondary Flow বলে [২]।
Image Source: Colorado.com
Secondary Flow কী সেটা পরিষ্কারভাবে এবং সহজ করে বুঝতে হলে চায়ের কাপে চামচ দিয়ে নাড়ানোর উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। চামচ দিয়ে যখন চায়ের কাপের চারদিকে আমরা নাড়াতে থাকি তখন কাপের ভিতরে চায়ের মিশ্রণের আচরণের দিকে একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, কাপের মাঝ বরাবর একটি ঘূর্ণন সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘূর্ণনটি হয় কাপের উপরের দিকেই। নিচের দিকে এই ঘূর্ণন অনেক কম হয় কারণ কাপের তলানির সাথে এবং পাশের দেয়ালের সাথে ঘর্ষণের ফলে ঘূর্ণনের গতি কমে যায়।
কাপের উপরে এবং নিচের দিকের ঘূর্ণনের বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের জন্য উপর থেকে নিচের দিকে তরল চা প্রবাহিত হয়। চামচ দিয়ে ঘোরানোর ফলে প্রথমে ঘূর্ণন গতি বাইরের দিকে একটি বল অনুভব করবে, যে কারণে প্রবাহটি চায়ের উপরের পৃষ্ঠ বরাবর প্রথমে দেয়ালের দিকে যাবে। এরপর দেয়াল বরাবর নিচের দিকে গিয়ে কাপের তলানি বরাবর চারদিকে একবার ঘূর্ণন হবে এবং এই ঘূর্ণন কাপের মাঝ বরাবর উপরের দিকে উঠে যাবে। এই পুরো প্রবাহকে Secondary Flow বলা হয়ে থাকে। চায়ের উপরের দিকে মাঝখানে আমরা যে ঘূর্ণন দেখি, সেটা এই প্রক্রিয়াতেই তৈরি হয়।
আমাজন বনে সৃষ্ট নদীর Meandering; Image Source: Pinterest
নদী বেঁকে যাবার পর দুই তীরের মধ্যবর্তী এবং নদীর মাঝামাঝি জায়গায়ও একই প্রক্রিয়া ঘটে। পানির প্রচণ্ড স্রোত যখন বাঁকের ভিতর প্রবেশ করে তখন চায়ের কাপের ভিতরের অবস্থার অনুরূপ একটা ঘূর্ণন গতির সৃষ্টি হয়, যার দরুন নদীর স্রোতের কিছু অংশ নদীর বাহিরের দিকের তীর (Outer Bank) পর্যন্ত প্রবাহিত হয় এবং সেখান থেকে নদীর তীর ঘেঁষে নিচের দিকে গিয়ে নদীর তলার (River Bed) সাথে সমান্তরালে প্রবাহিত হতে থাকে। সেখান থেকে নদীর অপর পাশের ভিতরের দিকের তীর (Inner Bank) বরাবর উপরের দিকে উঠে যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি সেকেন্ডারি ফ্লোয়ের কারণে হয়।
সেকেন্ডারি ফ্লো মেকানিজম; Image Source: Hindered Settling Blog
এই প্রবাহের কারণে নদীর বাইরের দিকের তীর ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কারণে নদীর মাটি কণাগুলো আলাদা হয়ে যায়। আলাদা মাটির কণাগুলো সেকেন্ডারি ফ্লোয়ের কারণে যে প্রবাহের সৃষ্টি হয় তার দিক বরাবর নদীর পানির সাথে প্রবাহিত হতে থাকে। এভাবে পানির সাথে বহমান মাটির কণাগুলো তলানি হিসেবে কিছু নদীর পানির নিচে এবং কিছু নদীর ভিতরের দিকের তীরে গিয়ে জমা হয়। এভাবে বাইরের তীর থেকে মাটি সরে গিয়ে অপর তীর ক্ষতিগ্রস্থ করে। যে দিকের মাটি সরে যায় সেই দিক বরাবর নদীগুলো বেঁকে যেতে থাকে। একইভাবে নদীর দিক পরিবর্তন হয়ে নদীগুলো সর্পিল আকারে প্রবাহিত হতে থাকে। কোনো কোনো সময় অতিরিক্ত স্রোতের কারণে কিংবা মাটির গঠনের কারণে এই বাঁকগুলো অনেক দীর্ঘ এবং ঘন হতে পারে।
নদীর এই বাঁকগুলো যখন একদিক থেকে গিয়ে আরেক দিকে আবারও বেঁকে যায় অর্থাৎ একটি লুপ তৈরি করে তখন কিছু কিছু নদীর ক্ষেত্রে এই বাঁকগুলো লুপ সহ আলাদা হয়ে যায়। আলাদা হয়ে গিয়ে এরা নদীর এক পাশেই অবস্থান করে। এ ধরনের লুপকে বলা হয় Oxbow Lake; Image Source: thoughtco.com
নদীর এই বাঁকগুলো যখন একদিক থেকে অন্য দিকে আবারও বেঁকে যায় অর্থাৎ একটি লুপ তৈরি করে, তখন কিছু কিছু নদীর ক্ষেত্রে এই বাঁকগুলো লুপ সহ আলাদা হয়ে যায়। আলাদা হয়ে গিয়ে এরা নদীর এক পাশেই অবস্থান করে। এই ধরনের লুপকে বলা হয় Oxbow Lake, যেটা সম্পর্কে আগেই একটু বলা হয়েছিল। এটি দেখতে অনেকটা U আকৃতির হয়ে থাকে। এখানে পানি প্রবাহ থাকে না। পুকুরের মতো স্থির পানি দিয়ে ভরা থাকে। বিভিন্ন জায়গায় কৃত্রিমভাবে Oxbow Lake তৈরি করা হয়। জার্মানির রাইন নদী থেকে একবার এরকম Oxbow Lake তৈরি করা হয়েছিলো। এর ফলে সেই নদী পথে চলাচল করার জন্য সোজা পথ তৈরি হয়।
সংক্ষেপে দেখুননীল রঙের যেসব জিনিস আমরা দেখি সেগুলো কি আসলেই নীল?
প্রকৃতি সবসময়ই আমাদের কাছে এক বিস্ময়। রূপে-রঙে, বর্ণে-গন্ধে প্রকৃতি যেমন আমাদের মনকে ভরিয়ে রাখে তেমনই জীবন ধারণের উপকরণও আমরা পাই এই প্রকৃতি থেকে। মানব মনকে প্রকৃতি সবসময় তার রূপ-সৌন্দর্য দিয়ে আকৃষ্ট করে রাখে। এত রঙ চারদিকে; গাছের সবুজ পাতা, ফুল ও ফলের নানা বর্ণ, বর্ণিল পশুপাখি ইত্যাদি আমাদের মনকে নবিস্তারিত পড়ুন
প্রকৃতি সবসময়ই আমাদের কাছে এক বিস্ময়। রূপে-রঙে, বর্ণে-গন্ধে প্রকৃতি যেমন আমাদের মনকে ভরিয়ে রাখে তেমনই জীবন ধারণের উপকরণও আমরা পাই এই প্রকৃতি থেকে। মানব মনকে প্রকৃতি সবসময় তার রূপ-সৌন্দর্য দিয়ে আকৃষ্ট করে রাখে। এত রঙ চারদিকে; গাছের সবুজ পাতা, ফুল ও ফলের নানা বর্ণ, বর্ণিল পশুপাখি ইত্যাদি আমাদের মনকে নির্মল রাখতে পালন করে এক অনবদ্য ভূমিকা।
প্রকৃতির এত বর্ণিলতার মধ্যেও সামান্য হেরফের আছে। গবেষকরা দেখেছেন, প্রকৃতিতে নীল রঙের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে খুব কম। বিশেষ করে জীবজগতের মধ্যে এ প্রবণতা আরো বেশি। নিশ্চয়ই ভাবছেন যেসব নীল বর্ণ আপনি দেখে থাকেন ফুলে, ফলে কিংবা পাখির গায়ে সেসব কি ভুল? এমনকি মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলেও মনে হয় পুরো পৃথিবীটাই যেন নীল। সেগুলো কি মিথ্যা? আসলে সেসব মিথ্যাও নয়, আবার সত্যও নয়।
প্রজাপতির ডানার নীল বর্ণও আসলে নীল নয়; Source: orkin.com
পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর একভাগ স্থল। জলের আধার সমুদ্রের পানিও নীল বর্ণের দেখায়। সমুদ্রের পানি কি তাহলে নীল রঙ ধারণ করে? সমুদ্রের পানি আসলে কোনো বর্ণ ধারণ করে না। তবে এর নীল বর্ণের কারণ আলোক বিজ্ঞান (Optics) দিয়ে ব্যখ্যা করা যায়। আকাশ যখন নীল থাকে তখন পানিতে আকাশের রঙ প্রতিফলিত হয়। সেজন্য আকাশের রঙে সমুদ্রকে নীল দেখায়।আবার পরিষ্কার পানির ধর্মই হচ্ছে বৃহৎ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করবে এবং ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলিত করবে। নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ক্ষুদ্র। ফলে এটি নীল আলোকে প্রতিফলিত করে, যার কারণে সমুদ্রের পানি নীল মনে হয়।
পরিষ্কার সমুদ্রের পানি সূর্যরশ্মির বৃহৎ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে আর ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলিত করে; Source: wonderopolis.org
অন্যদিকে আকাশের দিকে তাকালেও দেখা যায়, পরিষ্কার ও মেঘমুক্ত আকাশ নীল বর্ণের দেখায়। সূর্য থেকে আলোক রশ্মি যখন পৃথিবীর দিকে আসে তখন বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষিত হয়ে যায় এবং ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো অর্থাৎ নীল আলোকরশ্মি চারদিকে বিক্ষিপ্ত হতে থাকে। ফলে আকাশ পরিষ্কার থাকলে একে আমরা সবসময় নীল দেখি। বৃহৎ পরিসরে আমরা যে নীল দেখি অর্থাৎ সাগরের পানি আর খোলা আকাশ সেখানে আসলে বিশেষ কোনো নীল বর্ণকণিকা নেই।
সূর্যের আলোকরশ্মি বায়ুমণ্ডলে বিক্ষিপ্ত হয় এবং নীল হিসেবে আমাদের চোখে ধরা দেয়; Source: kabar6.com
এবার চোখ ফেরানো যাক প্রকৃতির জীবন্ত উপাদানের দিকে। প্রথমেই আসে প্রকৃতির অপরিহার্য উপাদান বৃক্ষের কথা। গাছের পাতায় থাকে ক্লোরোফিল নামক বর্ণকণিকা (Pigment), যার কারণে গাছের পাতা সবুজ বর্ণের হয়ে থাকে। আবার ফুলের বিভিন্ন বর্ণের জন্য আছে দুটি রাসায়নিক উপাদান। সেগুলো হচ্ছে এন্থোসায়ানিন আর ক্যারোটিনয়েড। একাধিক রঙ যেমন একত্রে মিলিত হলে ভিন্ন রঙের সৃষ্টি হয়ে তেমনই এই উপাদানও যদি ভিন্ন ভিন্ন অনুপাতে একত্রে যুক্ত হয় তখন ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের সৃষ্টি হয়। এ কারণে দেখা যায় ফুলের রঙের অনেক বৈচিত্র্য আছে।
এন্থোসায়ানিন রাসায়নিক গোত্রের মধ্যে মূলত লাল, পার্পেল (বা লালাভ বেগুনী) এবং কিছু মাত্রায় নীল বর্ণ রয়েছে। অন্যদিকে ক্যারোটিনয়েড গোত্রে আছে লাল, হলুদ ও কমলা রঙ। বোঝাই যাচ্ছে যে, এদের মধ্যে লাল বর্ণটি উভয়ের সাধারণ বর্ণ। ফলে এদের সমন্বয়ে যখন নতুন বর্ণ তৈরী হবে তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থাকবে লালের আধিক্য। বাস্তবেও আমরা দেখি যে অধিকাংশ ফুলের বর্ণই লাল বর্ণের বা লালাভ বর্ণের হয়ে থাকে।
প্রাকৃতিকভাবে স্বল্প পরিমাণ পাওয়া যায় নীল বর্ণের ফুল। এর মধ্যে মধ্যে একটি হলো হাইড্রেনজিয়া (Hydrangeas); Source: mnn.com
লাল বা লালাভ হওয়ার কারণে মৌমাছি বা অন্যান্য মধু আহরণকারী পোকা আকৃষ্ট হয় এবং একইসাথে ফুলের পরাগায়ন ঘটে। কাজেই লাল রঙ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ কারণেই যে নীল রঙের ফুল দেখা যাবে না এমন নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যদিও বা ফুল নীল বর্ণের হতে চায় তখনও অনেক বেশি পরিমাণ লাল রঙ থেকে যাবে লুকায়িত অবস্থায়। এন্থোসায়ানিন আর ক্যারোটিনয়েডের মিশ্রণের কারণে নীলাভ হয়তো দেখাবে, কিন্তু লাল রঙের উপাদান ভেতরে ভেতরে ঠিকই রয়ে যাবে। এর ফলে বিশুদ্ধ নীল পাওয়ার পরিবর্তে পাওয়া যাবে বেগুনী বা লালাভ বেগুনী বর্ণ। অর্থাৎ ফুলের ক্ষেত্রে সত্যিকার বিশুদ্ধ নীল বর্ণকণিকা বা নীল পিগমেন্ট বলতে আসলে কিছু নেই।
তারপরও কথা হচ্ছে আমরা নীল বর্ণের ফুল দেখে থাকি। সেগুলো এলো কীভাবে? প্রশ্ন থেকেই যায়।সাধারণত যেসব ফুলকে আমরা নীল দেখে অভ্যস্ত সেসব ফুলের নীল বর্ণের পেছনে উদ্ভিদের এক গোপন কারসাজি আছে। উদ্ভিদ লাল বর্ণের এন্থোসায়ানিনকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বিশেষায়িত করে নীল বর্ণ তৈরি করে।
Plumbago auriculata একপ্রকার গুল্ম যা মূলত উষ্ণ তাপমাত্রা অঞ্চলে জন্মে এবং নীল বর্ণের ফুল ধারণ করে; Source: mnn.com
যারা স্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত তারা এন্থোসায়ানিন ভালো করে চেনেন। কারণ সায়ানিডিন-৩-গ্লুকোসাইড (C-3-G) হচ্ছে একটি অন্যতম এন্টিঅক্সিডেন্ট এবং এটিই সাধারণ লাল বর্ণবিশিষ্ট এন্থোসায়ানিন। উদ্ভিদ আসলে এই C-3-G এন্থোসায়ানিনকেই বিভিন্ন উপায়ে রূপান্তরিত করে। যেমন পিএইচ পরিবর্তন করতে পারে, পিগমেন্ট, অণু বা আয়নের মিশ্রণ ঘটাতেও পারে। এই জটিল মিশ্রণ আর পরিবর্তন প্রক্রিয়া যখন পিগমেন্টের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত আলোর সাথে যুক্ত হয় তখন ফুলের পৃষ্ঠের বর্ণ নীল দেখা যায়।
এমনিতে গবেষকগণ কৃত্রিমভাবে নীল রঙের ফুল তৈরির জন্যে গবেষণা করে যাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে জাপানের একদল বিজ্ঞানী এক্ষেত্রে নার্সারিতে নীল বর্ণের অর্কিড তৈরী করেছেন। কিন্তু আদতে তারা কোনো পিগমেন্ট ব্যবহার করে নয়, বরং জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে ডাই ব্যবহার করেই তৈরী করেছেন এই নীল অর্কিড।
জিন প্রযুক্তির দ্বারা উদ্ভাবিত chrysanthemums প্রজাতির নীল ফুল; Source: nature.com
কারমিট দ্য ফ্রগ-এর একটি গানে তিনি গেয়েছিলেন যে “It’s not that easy being green” (সবুজ হওয়া অতটা সহজ নয়)। সেই সূত্রে ফ্লোরিডা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিদ্যার অধ্যাপক ডেভিড লী বলেছিলেন যে “It’s even harder to be blue” (অর্থাৎ নীল হওয়া আরো বেশি কঠিন)।
এবার উদ্ভিদ ছেড়ে এবার আমরা একটু প্রাণীদের দিকে আসি। এন্থোসায়ানিনের উপস্থিতি এবং উদ্ভিদের নিজস্ব পদ্ধতির দরুণ সেখানে নীলবর্ণ তৈরী করা সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু প্রাণীদের ক্ষেত্রে কীভাবে নীলবর্ণ তৈরী করা সম্ভব? কারণ প্রাণীরা এই বর্ণকণিকা ধারণ করে না বা তৈরি করতে পারে না। তাহলে আমরা যে নীলরঙা পাখি বা প্রজাপতি দেখে থাকি সেগুলো কি তাহলে ভুল দেখি? আসলে ভুল দেখি না। সেখানেও আছে এক বিশেষ কারসাজি।
প্রাণীর শরীরের নীলবর্ণ তাদের শরীরের কাঠামোগত প্রভাবের ফলাফল। খুব সহজ করে বলতে গেলে এই কাঠামোগত প্রভাব মূলত নির্দিষ্ট প্রকারের আলোকের প্রতিফলন ও চিত্রপ্রভার সৃষ্টি করে যা নীলবর্ণের দেখায়। উদাহরণ হিসেবে আমরা নীলকণ্ঠ পাখি বা Morpho প্রজাতির প্রজাপতির কথা বলতে পারি।
নীলকণ্ঠ পাখির ক্ষেত্রে, এরা সাধারণত মেলানিন নামক রঞ্জক পদার্থ তৈরী করে। মেলানিন মূলত কালো বা গাড় ধূসর বর্ণের হয়। ফলে এই পাখির বর্ণও কালো বা ধূসর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এদের পালকের মাঝে মাঝে যে ছোট ছোট বায়ু কুঠুরী আছে আর সেখানে যে বায়ু আছে সেই বায়ুর কারণে আপতিত আলো বিক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের চোখে এসে নীলরূপে ধরা দেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘র্যালে স্ক্যাটারিং’।
নীলকণ্ঠ পাখির শরীরের নীলবর্ণ আসলে নীল নয়; Source: mnn.com
সাধারণত উভচর বা সরীসৃপ প্রজাতির প্রাণী থেকে পাখি বা প্রজাপতির ক্ষেত্রেই এই বিক্ষেপণের পরিমাণ বেশি দেখা যায়। কারণ এই বিক্ষেপণ একদিকে যেমন বায়ুকণার দ্বারাও ঘটতে পারে অন্যদিকে তেমনি আঁশ বা লোমশ অংশ এবং পালকের ক্ষেত্রেও হতে পারে। কতিপয় ব্যাঙের প্রজাতি এবং নিউডিব্র্যাঙ্কিয়া (Nudibranchia) বর্গের সামুদ্রিক শামুকও নীল বর্ণের হয়।
Morpho প্রজাপতি মূলত গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে পাওয়া যায়। এই প্রজাতির প্রজাপতি যখন বিশ্রাম করে তখন তাদের ডানা দুটি উপরের দিকে ভাঁজ করা থাকে যা মূলত ধূসর বর্ণের। প্রজাপতির বাদামী, হলুদ কিংবা কালো বর্ণের পেছনে পিগমেন্টের ভূমিকা আছে। কিন্তু নীল বর্ণের পেছনে আছে এদের কাঠামোগত প্রভাব অনেকটা নীলকণ্ঠ পাখির মতো।
Morpho প্রজাতির প্রজাপতির নীল রঙের আড়ালে আছে ধূসর রঙের আঁশ; Source: laughingsquid.com
প্রজাপতির ডানায় যে আঁশ থাকে সেগুলো আকারে খুবই ক্ষুদ্র এবং এগুলো একেকটি পিক্সেলের মতো কাজ করে, অনেকটা বড় মোজাইকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টাইলের মতো যারা কিছুটা একে অপরের উপর অবস্থান করে। এই অভিলেপিত আঁশের সারিগুলো পরে প্রিজমের মতো কাজ করে। অর্থাৎ এই পৃষ্ঠের উপর যখন আলো পতিত তখন সেখানে গঠনমূলক ব্যাতিচারের সৃষ্টি হয়। গঠনমূলক ব্যাতিচার হলে এসব অভিলেপিত সারিগুলো থেকে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রতিফলিত আলো একে অপরের সাথে মিশে যায় এবং বাকি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো একে অপরকে নাকচ করে দেয়। সাধারণত নীল বর্ণের আলোই এক্ষেত্রে অভিলেপিত হয় এবং আমাদের চোখে এসে তা ধরা দেয়।
সব মিলিয়ে দেখা যায় যে, প্রকৃতিতে অন্যান্য অনেক বর্ণ কম বেশি থাকলেও নীল বর্ণকণিকা আসলেই কম। যেটুকু নীল আমরা দেখে থাকি সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুভংকরের ফাঁকির মতো। তবে প্রকৃতিবিজ্ঞানীরা এখনও সঠিকভাবে তেমন কোনো কারণ খুঁজে পাননি যে কেন প্রকৃতিতে নীল বর্ণকণিকার পরিমাণ এত কম। কিছু তত্ত্ব পাওয়া যায় যেমন উদ্ভিদের ক্ষেত্রে লাল পিগমেন্টের আধিক্য কিংবা প্রাণীর দেহের পালক ও আঁশের মেলানিন নামক রঞ্জক। তারপরও অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। সে প্রশ্নের উত্তর সে রহস্যের সমাধানের জন্য আমাদেরকে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
সংক্ষেপে দেখুনফটোগ্রাফিক মেমোরি বলতে কি আসলেই কিছু আছে?
ধরুন, আগামীকাল আপনার কোনো একটা ফাইনাল পরীক্ষা, আপনি পড়ছেন, আরো পড়ছেন, কিন্তু সিলেবাস শেষ হচ্ছে না। যা-ই পড়ছেন, নতুন কিছু একটা শুরু করতে গিয়েই মনে হচ্ছে আগেরটা ভুলে গিয়েছেন। এমন অবস্থা তো আমাদের সবার জীবনেই হয়েছে, তা-ই না? তখন কি মনে হয় না, ইশ আমার যদি ফটোগ্রাফিক মেমোরি থাকতো, কতই না ভালো হতো! একবারবিস্তারিত পড়ুন
ধরুন, আগামীকাল আপনার কোনো একটা ফাইনাল পরীক্ষা, আপনি পড়ছেন, আরো পড়ছেন, কিন্তু সিলেবাস শেষ হচ্ছে না। যা-ই পড়ছেন, নতুন কিছু একটা শুরু করতে গিয়েই মনে হচ্ছে আগেরটা ভুলে গিয়েছেন। এমন অবস্থা তো আমাদের সবার জীবনেই হয়েছে, তা-ই না? তখন কি মনে হয় না, ইশ আমার যদি ফটোগ্রাফিক মেমোরি থাকতো, কতই না ভালো হতো! একবার দেখতাম, সব ঢুকে যেত মাথায়, পরীক্ষায় গিয়ে শুধু উগড়ে দিয়ে আসতাম! তারপর একদম কেল্লা ফতে! সেরা ফলাফল আর ঠেকায় কে!
শুনতে বেশ সিনেমাটিক লাগছে তাই না? সিনেমাটিকই বটে, সুপারম্যানের লেক্স লুথর, এক্স ম্যানের প্রোফেসর এক্সের মতো চরিত্রের মাঝে ফটোগ্রাফিক মেমোরি দেখতে দেখতেই আমাদের মনে গেঁথে গেছে ফটোগ্রাফিক মেমোরির অস্তিত্ব।
কিন্তু পর্দার বাইরের বাস্তব জীবনে কি আসলেই ফটোগ্রাফিক মেমোরি বলে কিছু আছে? মানুষের ভালো স্মৃতিশক্তি তো আমরা অহরহই দেখতে পাই। দাবার গ্র্যান্ডমাস্টাররা দাবা বোর্ডের দিকে পাঁচ সেকেন্ড তাকিয়েই স্মৃতিতে গেঁথে নিতে পারেন সবার অবস্থান। রুবিক্স কিউব যারা অনেক দ্রুত মেলান, তারাও একবার তাকিয়ে মনে রাখতে পারেন সম্পূর্ণ কিউবটা কীভাবে আছে। অবশ্য তাদের এটা পারেন কারণ তাদের কাছে দাবার ঘুঁটির বিভিন্ন অবস্থান আর রুবিক্স কিউবের সজ্জা মাথায় প্যাটার্নের মতো গেঁথে আছে। তারপর হাইপারথেসমিয়া বা ‘কিছু না ভোলার রোগ’ বলে একটা ব্যাধি আছে, এ রোগ থাকলে মানুষ দৈনন্দিন জীবনের কিছুই ভুলতে পারে না এবং এ ব্যাপারটার উপর সে রোগীর কোনো নিয়ন্ত্রণও থাকে না। কিন্তু ফটোগ্রাফিক মেমোরি বলতে আমরা বুঝি একটু অন্যরকম কিছু- কোনো একজন মানুষ কোনোকিছুর দিকে তাকালো, একটি মানসিক ছবি নিয়ে নিলো, পরে সম্পূর্ণ একটি ছবির মতোই সেই দৃশ্যটাকে মনে করে ফেললো।
এধরনের ফটোগ্রাফিক মেমোরির আসলে কোনো নজির আছে কি না, তা জানতে আমরা একটু পেছনে তাকাই।
১৯৭০ সালে ‘ন্যাচার’ জার্নাল থেকে একটা স্টাডি প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয় এলিজাবেথ নামক এক নারীর কথা, যিনি নাকি অনেকটাই ফটোগ্রাফিক মেমোরির অধিকারী। তার উপরে করা টেস্টটায় তাকে আলাদাভাবে এমন দুটো ডট প্যাটার্ন দেখানো হয়, যেগুলোকে এক করলে একটি পরিচিত চিহ্ন বা অক্ষর দেখা যাবে। এলিজাবেথকে সেগুলো দেখানোর পর তিনি বলে দিতে পারতেন, অক্ষর বা চিহ্নটি আসলে কী। তিনি নাকি বিদেশী ভাষা, অর্থাৎ যেই ভাষা তিনি জানেনই না, সে ভাষার কবিতাও মুখস্থ বলে দিতে পারতেন একবার দেখেই।

এলিজাবেথের উপরে নেয়া হয়েছিল এমনই একটি মেমোরি টেস্ট, এ দুটোর লাল ডট মিলিয়ে ‘F’ অক্ষরটি তৈরি করে; image source: drawinglics.com
এ স্টাডিটি তখন বিজ্ঞানীমহলে হৈচৈ ফেলে দেয়। অন্য বিজ্ঞানীরাও তখন ব্যাপারটি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৭৯ সালে জন মেরিট নামের আরেকজন গবেষক একটি ফটোগ্রাফিক মেমোরি টেস্ট তৈরি করে জনপ্রিয় পত্রিকায় প্রকাশ করেন।
প্রায় দশ লাখের মানুষ তার টেস্টটি সল্ভ করার চেষ্টা করেন, সফল হন মাত্র ৩০ জন। তাদের মধ্যে ১৫ জন মানুষের সাথে তিনি সরাসরি সাক্ষাৎ করেন, কিন্তু সামনাসামনি সেই মানুষগুলো আর ফটোগ্রাফিক মেমোরির প্রমাণ দেখাতে পারেন না। তাই এলিজাবেথ তখনো অদ্বিতীয়ই থেকে যান।
কিন্তু এই এলিজাবেথ গল্পের সত্যতা সম্পর্কেই আসলে কোনো নিশ্চয়তা নেই। তার এই স্টাডিটি প্রকাশ হবার পর, তার উপর আরো টেস্ট করার প্রস্তাব করা হয়, কিন্তু তিনি আর রাজি হননি। এবং, স্টাডিটির লেখক আর এলিজাবেথ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কিছুদিনের মধ্যেই।
সুতরাং, সেই গবেষণাটির ফলাফল যে বৈজ্ঞানিক কৌতূহল ছাড়াও অন্য কোনো আবেগ দ্বারা প্রভাবিত ছিল না, তার নিশ্চয়তা কি আদৌ আছে?
এই ঘটনার পরও, বেশকিছু মানুষই দাবি করেছেন যে তাদের ফটোগ্রাফিক মেমোরি আছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করার পর দেখা গেছে, তাদের কারোরই আসলে এধরনের কিছু ছিল না, কেউ হয়তো ক্ষেত্রবিশেষে খুব ভালো স্মৃতিশক্তির নজির দেখিয়ে ফেলেছিলেন, কারো দাবিটিই ছিল নিতান্ত মিথ্যে।
তবে ফটোগ্রাফিক মেমোরির কাছাকাছি একটা ব্যাপার কিন্তু প্রকৃতিতে আছে। এর নাম ‘আইডেটিক ইমেজারি’। পুরোপুরি ফটোগ্রাফিক মেমোরির মতো না হলেও আইডেটিক ইমেজারি ব্যাপারটাও বেশ মজার।
আইডেটিক ইমেজারি যাদের থাকে, তাদেরকে বলা হয় আইডেটিকারস। তারা বাস্তবে কোনো একটা ছবি দেখার পর চোখ সরিয়ে নিলেও সে ছবিটি দেখা চালিয়ে যেতে পারে, বিবরণ দিতে পারে খুব ছোট ছোট ডিটেইলের। তাদের সেই ছবি দেখার অভিজ্ঞতাও হয় একদম আসলটা যখন দেখেছিল, ঠিক তেমন। এছাড়াও মনের মধ্যেও তারা তৈরি করে ফেলতে পারে এরকম ছবি, যেটা দেখার অভিজ্ঞতার সাথে বাস্তব ছবি দেখার অভিজ্ঞতার কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু ছবিটা সাধারণত ধীরে ধীরে কয়েক মিনিটের মধ্যে উধাও হয়ে যায় চোখের সামনে থেকে, আর চোখ বন্ধ করলে বা পলক ফেললেও উধাও হয়ে যায় এমনিতেই। আর যদি একবার চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে যায়, তখন সেটা আর ফিরেও আসে না। এছাড়া যখন ছবিটা চোখের সামনে থাকেও, এমন না যে সেখান থেকে লেখা পড়ে লিখে ফেলা যাবে খুব, তাই আমরা ফটোগ্রাফিক মেমোরি দিয়ে যা করার কথা ভাবি, তা আসলে আইডেটিক ইমেজারি দিয়ে করা সম্ভব নয়।
তবে অদ্ভুত বিষয় হলো, এই আইডেটিক ইমেজারিটা শুধুমাত্র শিশুদের মধ্যেই দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এর নজির এখনো একবারও পাওয়া যায়নি। আর শিশুদের জন্যেও, তারা যত বড় হতে থাকে, এই ইমেজ দেখার ক্ষমতা কমতে থাকে। তাই গবেষকরা ভাবছেন, আইডেটিক ইমেজারি হারিয়ে যাওয়া সম্ভব স্বাভাবিক বিকাশেরই অংশ। তবে অনেকে এও বলেন যে, আমরা যত বড় হই, আমাদের চিন্তা তত ভাষাভিত্তিক হয়। আমরা শব্দে ভাবি, ছবিতে নয়। আর যখন কোনো একটা বস্তুর জন্য আমরা শব্দ তৈরি করে ফেলি, তখন সে বস্তুর আইডেটিক ইমেজ আর আমরা তৈরি করতে পারি না। এ কারণেই আইডেটিক ইমেজারি হারিয়ে যেতে থাকে ভাষায় দক্ষ হবার সাথে সাথেই।
তবে একটি শিশুর ভাষার দক্ষতা বাড়ার সাথে সাথেই তার আইডেটিক ইমেজারি কমে যাচ্ছে, এটা সবসময়ই হয় না, কিছু স্টাডিতে এর ব্যতিক্রমও দেখা গেছে। তাই এই ব্যাখ্যাটি ভুলও হতে পারে।
আবার এও দেখা গেছে যে, আইডেটিক ইমেজারি মস্তিষ্কের অক্সিপিটাল লোবে আলফা-ওয়েভ অ্যাক্টিভিটির জন্ম দেয়। আলফা-ওয়েভ অ্যাক্টিভিটি সাধারণত মানুষের হয় জাগ্রত অবস্থায় চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেবার সময়, অথচ আইডেটিক ইমেজারি দেখবার সময় চোখ থাকে বন্ধ। এসব তথ্যে বিজ্ঞানীরা বেশ বিভ্রান্তই আছেন এখনো।

আইডেটিক ইমেজারি মস্তিষ্কের অক্সিপিটাল লোবে আলফা-ওয়েভ অ্যাক্টিভিটির জন্ম দেয়; image source: imcreator.com
তাই আইডেটিক ইমেজারির প্রকৃতি ও কারণ এখনো একদম নিশ্চিতভাবে বের করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।
কিন্তু ফটোগ্রাফিক মেমোরি যে আসলে বাস্তবে নেই, সেটা বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত। তাই এক ঝলকেই স্মৃতিতে গেঁথে ফেলব, এরকম শর্টকাটও আসলে নেই। স্মৃতিশক্তিকে তুখোড় করার উপায় তাই নিয়মিত অনুশীলন। এছাড়া নেমোনিক (Mnemonics) ব্যবহার করে মনে রাখাও একটা ভালো উপায়। নেমোনিক হচ্ছে ছড়া, ছন্দ বা কোনো গল্প- এধরনের বিভিন্ন স্মৃতিসহায়ক দিয়ে কিছু মনে রাখার পদ্ধতি। এই নেমোনিক ব্যবহারকে পাকাভাবে রপ্ত করেই বিভিন্ন স্মৃতিশক্তি প্রতিযোগিতার প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতায় সয়লাব করে থাকে। মোদ্দা কথা, চর্চা আর অধ্যবসায় আপনাকে করতেই হবে। তবে এই প্রবন্ধ পড়ার পর থেকে নিশ্চয়ই আপনি আর আপনার ফটোগ্রাফিক মেমোরি থাকার আশা করবেন না। এ নিয়ে আফসোস করারও কিছু নেই, এটা আপনার যেমন নেই, তেমনি পৃথিবীর কারোরই নেই।
সংক্ষেপে দেখুনগণিত কী কখনও একটি পূর্ণ ভাষা হতে পারে?
গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের ভাষা। আমরা ভাষা বলতে যা বুঝি, গণিত কি তেমনই বাংলা, ইংরেজি কিংবা ম্যান্দারিনের মতো কোনো ভাষা? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের দেখতে হবে গণিতের শব্দ ও ব্যাকরণ কীভাবে এক একটি বাক্য রচনা করে। ভাষা কী? ভাষার বহুরকম সংজ্ঞায়ন হতে পারে। ভাষা হতে পারে কিছু শব্দ বা সংকেত, যেগুলো কিছুবিস্তারিত পড়ুন
গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের ভাষা। আমরা ভাষা বলতে যা বুঝি, গণিত কি তেমনই বাংলা, ইংরেজি কিংবা ম্যান্দারিনের মতো কোনো ভাষা? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের দেখতে হবে গণিতের শব্দ ও ব্যাকরণ কীভাবে এক একটি বাক্য রচনা করে।
ভাষা কী?
ভাষার বহুরকম সংজ্ঞায়ন হতে পারে। ভাষা হতে পারে কিছু শব্দ বা সংকেত, যেগুলো কিছু নিয়মের অধীনে থাকে। আবার বলা যেতে পারে, শব্দ কিংবা প্রতীক ব্যবহারের মাধ্যমে যোগাযোগের একটি পদ্ধতি। বিশ্ববিখ্যাত ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি ভাষাকে সংজ্ঞায়ন করেন সসীম সংখ্যক উপাদান দিয়ে গঠিত বাক্যসমগ্র বলে।
যেভাবেই সংজ্ঞায়ন করা হোক, আমরা সার্বিক বিবেচনায় কিছু উপাদানকে ভাষার বৈশিষ্ট্যের সূচক বলে ধরতে পারি।
ভাষা চর্চিত হবে একদল মানুষের মাঝে, আর ভাষাটি তাদের পারস্পরিক বোধ্যগম্যও হতে হবে; Source: Journal of Speech, Language, and Hearing Research – ASHA
এই শর্তগুলো হাতে নিয়ে গণিতের দিকে তাকালে দেখা যায়, গণিত সবগুলো শর্তই পূরণ করে বসে আছে। বিশ্বব্যাপী গণিতের প্রতীক, তার অর্থ, ব্যবহার আর ব্যাকরণ একই। গণিতবিদ, বিজ্ঞানী এবং অন্যান্যরা ধারণার আদান-প্রদানে গণিতকে ব্যবহার করেন। গণিত যেমন একদিকে বাস্তব ঘটনাকে বর্ণনা করতে পারে, তেমনই বিমূর্ত ধারণাকেও বর্ণনা করতে পারে। এমনকি গণিতের এমন একটি শাখা আছে, যেখানে নিজেই নিজেকে বর্ণনা করতে পারে। ঐ শাখাটি হলো মেটা-ম্যাথমেটিকস।
অভিধান, ব্যাকরণ ও পদবিন্যাস
গণিতের অভিধান সাজানো হয়েছে বিভিন্ন বর্ণমালা থেকে। পাশাপাশি এতে আছে বিভিন্ন চিহ্ন, যেমন যোগ কিংবা বিয়োগ। একটি গাণিতিক সমীকরণকে বলা যায় শব্দের সমাহারে তৈরি বাক্য। একটি সরল গাণিতিক সমীকরণ বিবেচনা করি।
3 + 5 = 8
একে পড়া যায়- তিন এর সাথে পাঁচ যোগ করলে আট এর সমান হয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি পরিপূর্ণ বাক্য।
গণিতের ভাষায় বিশেষ্য পদ হলো এগুলো
সংখ্যা ও অংক (0, 2, 5, 9, 17 ইত্যাদি)
ভগ্নাংশ (1⁄4, 5⁄9, 2 1⁄3)
চলক (a, b, c, x, y, z ইত্যাদি)
রাশি (3x, x^2, 4+x ইত্যাদি)
রেখাচিত্র বা দৃশ্যমান উপাদান (বৃত্ত, কোণ, ত্রিভুজ, টেন্সর, ম্যাট্রিক্স ইত্যাদি)
অসীম সংখ্যা (∞)
পাই (π)
কাল্পনিক সংখ্যা (i, -i)
আলোর বেগ (C)
গণিতে ব্যবহৃত প্রতীক দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে বাক্য; Source: Westend61 / Getty Images
গণিতের ক্রিয়াপদগুলো
সমান ও অসমতা চিহ্ন (=, <, >)
গাণিতিক ক্রিয়া, যেমন- যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, বর্গমূল করা। (+, , ×, ÷)
অন্যান্য ক্রিয়া (sin, cos, tan, sec ইত্যাদি)
গণিতের ব্যাকরণ এবং বাক্যগঠন অভিধানের মতোই আন্তর্জাতিক। কেউ যে দেশেরই লোক হোক, যে ভাষাতেই কথা বলুক, গাণিতিক ভাষার গঠন সকল দেশে একই। গাণিতিক সার্বজনীনতা সকলের জন্য সমান।
গণিতের রাশিমালা সবসময় লিখতে হয় বাম দিক থেকে; Source: Emilija Manevska
ভাষা একটি শিক্ষা উপকরণ
কীভাবে গাণিতিক বাক্যগুলো কাজ করে তা জানলে গণিত শেখা ও শেখানো উভয় পক্ষের জন্যই কার্যকরী ভূমিকা রাখে। সংখ্যা এবং প্রতীক প্রায়ই শিক্ষার্থীদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে। তাই কোনো পরিচিত ভাষায় সমীকরণকে বর্ণনা করলে তা সহজে শিক্ষার্থীর কাছে গ্রহণীয় হয়। মূলত, এটা অনেকটা কোনো বিদেশী ভাষাকে নিজের ভাষায় রূপান্তরের মতো।
যেহেতু পৃথিবীব্যাপী গণিত একই, তাই স্বভাবতই গণিত একটি বিশ্বজনীন ভাষা। গণিতের কোনো সংজ্ঞা কিংবা সূত্রের অর্থ বিভিন্ন ভাষায় একই। দুজন মানুষের মধ্যে কথ্য ভাষায় ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু গণিত সেই যোগাযোগ বাধা উৎরে গিয়েও কাজ করতে পারে।
গণিত শুধু সংখ্যা আর সমীকরণ নয়
গণিত বলতে শুরুতেই মোটাদাগে সংখ্যা আর সংখ্যাদের দিয়ে কিছু ক্রিয়া (যেমন, যোগ, বিয়োগ, ভাগ, বর্গমূল ইত্যাদি) বোঝায় না। বিমূর্ততা, ভাবমূলক বর্ণনা, বস্তুনিরপেক্ষ সংজ্ঞায়ন গণিতের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। জ্যামিতির কথাই বিবেচনা করি। একটি বস্তু কেমন হতে পারে তা গণিতের আওতাধীন। এমনকি কোনো বস্তু কেমন হওয়া অসম্ভব তা-ও গণিত শাস্ত্রের আওতাধীন।
সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, মানুষের দ্বারা যত ভাষা সৃষ্টি হয়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে আদিম কিন্তু এই গণিতই। যুক্তি ও যাচাইয়ের ভিত্তি হিসেবে সবসময় কাজ করেছে এই গণিত। ধর্ম, সংস্কৃতি, লিঙ্গ, কাল ইত্যাদি কোনোকিছুই এ ধারণার পরিবর্তন করতে পারেনি।
গণিতকে ভাষা না বলার যুক্তি
গণিতকে ভাষা বলার যুক্তি যেমন আছে, তেমনই একে নিয়ে আছে বিপরীত মত কিংবা ভিন্ন মত। অনেক ভাষাবিদ একে ভাষা হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ। কারণ ‘ভাষা’র কোনো কোনো সংজ্ঞায় যোগাযোগকে কথ্যরূপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। গণিত মূলত যোগাযোগের একটি লিখিত মাধ্যম; যেখানে খুব সরল একটি সমীকরণ সহজেই পড়ে ফেলা সম্ভব (যেমন- 1 + 1 = 2), কিন্তু জটিল কোনো সমীকরণ যেমন, ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ পড়তে গেলে বক্তার মাতৃভাষার সহায়তা নিতেই হবে- যে কারণে গণিত তাদের মতে ভাষা হিসেবে বিশ্বজনীনতা হারায়।
একই যুক্তিতে ইশারা বা সাংকেতিক ভাষার (Sign language) স্বীকৃতিও কেড়ে নেয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ ভাষাতাত্ত্বিকেরা সাংকেতিক ভাষাকে সত্যিকার ভাষা হিসেবে স্বীকার করেন।
ভাষা মাত্রই ভাবের আদান প্রদান জরুরী; Source: Dictaview.com
গণিত দিয়ে আমরা বিশাল মহাবিশ্বের বিবিধ রহস্য থেকে শুরু করে কোষের ক্ষুদ্র জটিল জগত এমনকি ডিএনএ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করতে পারি। শুধু তা-ই নয়, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণুকেও ব্যাখ্যা করতে পারি। গ্রহদের গতি, জটিল রোগের প্রতিকার এমনকি ঘরের দরজা থেকে বেরিয়ে কর্মস্থল বা শিক্ষাঙ্গন, পার্ক যেখানেই যাই না কেন গণিতের অস্তিত্বকে ঝেড়ে ফেলার কোনো উপায় নেই। কম্পিউটার আর তথ্য বিনিময়ের অতিকায় বিপ্লবের বিস্তারিত কথা না-ই বললাম।
দৈনন্দিন জীবনে গণিত আষ্টেপৃষ্ঠে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে আমরা তার খানিকটাও দেখতে পাই না। অনেকটা বাতাসের সমুদ্রে থেকে বাতাসকে না দেখার মতো। আমাদের সহজাত প্রবৃত্তির কারণে আমরা হয়তো অভ্যাসের ভেতর থেকে ছেঁকে এনে ততটা খেয়াল করি না গণিতকে, কিন্তু যদি বলা হয় শুধুমাত্র সংখ্যা ছাড়া একটা দিন চলতে, তাহলে কি কেউ পারবে?
আধুনিক পৃথিবীর কোনো কল্পনায় আপনাকে নাহয় না ভাসালাম। আদিম সমাজের গুহাবাসী কোনো পরিবারের কর্তাকে যদি কেউ বলতো, তোমার কয় ছেলেমেয়ে গো?
কর্তাকে ছেলেমেয়েদের বের করে এনে দেখাতে হতো এই যে এরা! সংখ্যা না থাকলে এছাড়া আর কী উপায় আছে বলার? কর্তা যদি প্রতিকী দাগ দিয়ে, পাথর কিংবা কাঠি দিয়েও ছেলেমেয়ের সংখ্যা বোঝাতে যায় তাহলেও কিন্তু বিপদ! গণিত ঢুকে যাবে এতে!
আমাদের সকল ক্ষেত্রে আষ্টেপৃষ্ঠে এমনভাবে বিজড়িত একটি বিষয়কে ভাষা না বললেও, এর গুরুত্ব ভাষার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
সংক্ষেপে দেখুনমানব ইতিহাসে কোন রোগটি সর্বপ্রথম নির্মূল করা সম্ভব হয়েছিলো ?
১৭৯৬ সালের কথা। ইংল্যান্ডের বার্কলিতে অবস্থানরত একজন চিকিৎসক ডঃ এডওয়ার্ড জেনার একদিন লক্ষ্য করেন যে, বাড়ি বাড়ি গরুর দুধ দিয়ে বেড়ানো মেয়েটির দেহে স্মলপক্স অর্থাৎ গুটিবসন্ত রোগের সংক্রমণ হয়নি। আশেপাশের মানুষজন গুটিবসন্তে আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু প্রচন্ড সংক্রমণশালী এই গুটিবসন্ত মেয়েটিকে কিছুতেই সংক্রমণবিস্তারিত পড়ুন
১৭৯৬ সালের কথা। ইংল্যান্ডের বার্কলিতে অবস্থানরত একজন চিকিৎসক ডঃ এডওয়ার্ড জেনার একদিন লক্ষ্য করেন যে, বাড়ি বাড়ি গরুর দুধ দিয়ে বেড়ানো মেয়েটির দেহে স্মলপক্স অর্থাৎ গুটিবসন্ত রোগের সংক্রমণ হয়নি। আশেপাশের মানুষজন গুটিবসন্তে আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু প্রচন্ড সংক্রমণশালী এই গুটিবসন্ত মেয়েটিকে কিছুতেই সংক্রমণ করতে পারছে না। তখনকার দিনে শতবছর ধরে টিকে থাকা এ রোগে মানুষের মৃত্যুহার ছিলো অনেক বেশি। গত শতাব্দীতেও প্রতি দশজনে তিনজনের মৃত্যু হতো, এতটাই ভয়ানক এক রোগ এই গুটিবসন্ত।
ডঃ জেনার সাহেব সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি এই মেয়েটিকে পরীক্ষা করে দেখবেন, কোনো একভাবে নিশ্চয়ই মেয়েটির শরীরে গুটিবসন্ত সৃষ্টিকারী ভ্যারিওলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা তৈরি হয়েছে। যদি সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি পুনরায় তৈরি করা যায়, তবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানো যাবে। ডঃ এডওয়ার্ড জেনার এই বিষয়টিকে খতিয়ে দেখতে একদিন মেয়েটির বাড়ি যান। তিনি দেখতে পান যে, মেয়েটির বাড়িতে গরুগুলো সবই গোবসন্তে আক্রান্ত। গুটিবসন্তের মতো গরুতেও একধরনের বসন্তরোগ হয়ে থাকে, এরই নাম ছিলো গোবসন্ত। গরুর শরীরেও তরলপূর্ণ ছোট ছোট গুটি দেখা যেতো।
জেনার সাহেব বুঝতে পারেন যে, হয়তো কোনো একভাবে গরুটির সংস্পর্শে থেকে মেয়েটির শরীরে গোবসন্ত সংক্রমিত হয়েছে, গোবসন্ত মানবদেহে কোনো রোগ তৈরি করতে পারেনি, একইসাথে গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।



শিল্পীর কল্পনায় ডঃ এডওয়ার্ড জেনার, গুটিবসন্তের টিকা প্রদান করছেন, Image Source: The New York Academy of Medicine Library
ডঃ জেনার সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি এই ধারণাটি পরীক্ষা করে দেখবেন। ৮ বছর বয়সী একটি বাচ্চা ছেলের দেহে তিনি একটু ক্ষতসৃষ্টি করে সেখানে গোবসন্তের ক্ষত থেকে সংগৃহীত তরল লাগিয়ে দেন। বাচ্চাটির ক্ষতস্থানটি তাৎক্ষণিক ভাবে ফুলে উঠলেও কিছুদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায় সবকিছু।
গত শতাব্দীতে নির্মিত একটি কাঠের টিউব, এতে সংগ্রহ করা হয় গুটিবসন্তের জীবাণু©JOSE ESPARZA
ডঃ জেনার কিছুদিন পর বাচ্চাটির দেহে আবারো একইভাবে জীবাণু প্রবেশ করান। তবে এবার গোবসন্তের জীবাণু নয়, তরতাজা গুটিবসন্তের জীবাণু প্রবেশ করান তিনি। বাচ্চাটি অল্প অসুস্থ হয়ে কয়দিনের ভেতর সুস্থ হয়ে উঠে, গুটিবসন্ত শিশুটিকে আর আক্রান্ত করতে পারছে না। ডঃ জেনার বুঝতে পারেন যে, এভাবে গুটিবসন্তের কবল হতে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে এই টিকা পদ্ধতির খবর দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সব এলাকায় চিকিৎসকরা একইভাবে মানুষকে টিকা প্রদান করতে শুরু করেন।
ধীরে ধীরে গুটিবসন্তের লক্ষণ প্রকাশ©Kathy Mak
দিনে দিনে গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হয়েছে আরো উন্নত ধরনের টিকাপদ্ধতি। শুধু তা-ই নয়, মারণক্ষয়ী ছোঁয়াছে রোগ পোলিও, হাম, যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস-বি, হুপিং কাঁশি, ধনুষ্টংকারসহ প্রভৃতির বিরুদ্ধেও টিকা আবিষ্কৃত হয়। মানবজাতি সভ্য হবার সময়কাল থেকেই ক্ষতিকারক সব জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিকার এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে, চিকিৎসাবিজ্ঞান যখন উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে, জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিকার এবং প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য অর্জন করেছে।
সব রোগেরই প্রতিকার অর্থাৎ কোনো রোগ হলে সেটির চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে। এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা কেউ যদি আক্রান্ত হয় একসময় তার এইডস দেখা দেয়, তার মৃত্যু নিশ্চিত কিন্তু সেখানেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের চিকিৎসা উপস্থিত। ‘অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ড্রাগ’; এর মাধ্যমে একজন এইডস রোগীর জীবনকে কিছু দীর্ঘায়ু করা সম্ভব, রোগী যতদিন বেঁচে থাকবেন, সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করে যেতে পারবেন। আর যে সমস্ত রোগের সমাধা করা যায়নি, সেসব নিয়েও বিশ্বজুড়ে চলছে বিস্তর গবেষণা।

বিশ্বব্যাপী গুটিবসন্তের টিকা অনুমোদন পেলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গুটিবসন্ত নির্মূল কর্মসূচী আরম্ভ করে, Image Source: The Ruin
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি কথা রয়েছে যে, প্রতিকারের চেয়ে কোনো রোগকে প্রতিরোধ করতে পারাটাই সবচেয়ে ভালো। চিকিৎসাবিজ্ঞান সবার পূর্বে এই ব্যাপারে কাজ করেন যে, রোগটির বিরুদ্ধে পুরোপুরি প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় কিনা। এসব নিয়েও চলছে গবেষণা। পৃথিবীর প্রতিটি বিন্দুতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র জীবাণু। খালি চোখে দেখতে পাই না আমরা, কিন্তু এদের অস্তিত্ব অনুভব করি।
প্রাণী কিংবা উদ্ভিদে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয় এসমস্ত অণুজীবেরা। কিছু অণুজীব আমাদের মানবজাতির জন্য নানান বিষয়ে উপকারী, আবার কিছু প্রজাতি অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসমস্ত ক্ষতিকর অণুজীবেরা মানুষের শরীরে কিংবা আমাদের উপকারী প্রাণী কিংবা উদ্ভিদদেহে রোগ সৃষ্টি করে থাকে। সমস্ত অণুজীবের জন্যই তাদের পোষকদেহ নির্দিষ্ট, কেননা নির্দিষ্ট পরিবেশ ছাড়া তারা বাঁচতে সক্ষম নয়। যেমন ম্যালেরিয়া পরজীবী, তার জীবনচক্রের অর্ধেকটা কাটায় মানবদেহে আর বাকি অর্ধেকটা মশকীদেহে। মশকীদেহ বলতে সবধরনের মশার প্রজাতিতে নয়, কেবলমাত্র অ্যানোফিলিস মশকী। কারণ অন্যসব মশকীদেহের লালাগ্রন্থিতে উপস্থিত এক বিষাক্ত এনজাইমের কারণে এরা ধ্বংস হয়ে যায়।
রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাবলীকে নির্ভর করতে হয় মানবদেহে স্রষ্টা প্রদত্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর। মানবদেহের সবচেয়ে বিস্ময়কর একটি ব্যবস্থা হলো এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। খুবই শক্তিশালী এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। নির্দিষ্ট অণুজীব যা দিয়ে প্রতিনিয়ত আমরা রোগে আক্রান্ত হই, কোনোভাবে যদি অণুজীবগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়, তবেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি সেসব অণুজীবের বিরুদ্ধে কাজ করে সক্ষম হবে। মানব ইতিহাসের প্রথম টিকা গুটিবসন্ত টিকা আবিষ্কারের সময়, ঠিক এই ধারণাটিই কাজে লাগিয়েছিলেন ডঃ এডওয়ার্ড জেনার।
ভ্যারিওলা ভাইরাস বসন্ত রোগ সৃষ্টি করে, এর ভিন্ন দুইটি টাইপের (এই ভাইরাসের সর্বমোট ৪টি টাইপ রয়েছে) একটি থেকে গরুদেহে, আরেকটি থেকে মানবদেহে বসন্ত হয়। গরুদেহের ভাইরাস মানবদেহে উপস্থিত থাকার কারণে অন্য টাইপটি বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারে না। আর গোবসন্তের জীবাণুও মানবদেহে রোগ তৈরিতে অক্ষম। কেবলমাত্র এই ধারণাকে ব্যবহার করেই তৈরি করা হয়েছে অন্যান্য রোগের টিকাগুলো। ১৮৮৫ সালে লুই পাস্তুর যখন জলাতংকের প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা করছিলেন, তিনিও ডঃ জেনারের পদ্ধতি অনুসরণ করেন।



লুই পাস্তুর, Image Source: Famous Biography
রোগকে প্রতিরোধ করতে টিকা প্রদান করা হয়। নবজাতককে জন্মের পরপরই ১০টি রোগের বিরুদ্ধে ৬টি টিকা বাংলাদেশ সরকার EPI কর্মসূচীর মাধ্যমে ইতোমধ্যেই নিশ্চিত করেছে। একটি শিশুর জন্মের সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় টিকাদান, ১৫ মাস বয়স পূর্ণ হতে হতে সবগুলো টিকা দিয়ে শেষ করা হয়। গুটিবসন্ত রোগটির ইতিহাস বহু পুরনো, প্রাচীন মিশরীয় মমিতেও গুটিবসন্তের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিলো।
৩০০০ বছরের পুরনো মমি ফারাও ৫ম রামসিসের মাথায় গুটিবসন্তের নিদর্শন দেখা যায়; Image Source: WHO
গুটিবসন্তের গ্রাস থেকে বাঁচাতে মানবজাতিকে টিকাদানের ফলে, গুটিবসন্তের ভাইরাসটিই পৃথিবী থেকে নির্মূল হয়ে গেছে একটাসময়। বিংশ শতাব্দীতেই পুরো বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ মারা যায় এই গুটিবসন্ত রোগে। অবশেষে ১৯৮০ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা দেয় যে, গুটিবসন্ত রোগটি শতভাগ নির্মূল সম্ভব হয়েছে। শেষবার এ রোগে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছিলো ১৯৭৭ সালে।
এই সেই শিশু কন্যা রহিমা বানু, বাংলাদেশে সর্বশেষ মানুষ যে কিনা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়েছিলো©Stanley O. Foster
গুটিবসন্তের সর্বশেষ রোগীদের মাঝে বাংলাদেশী একটি শিশুও ছিলো। তখনকার সময়ে কেউ গুটিবসন্তের সন্ধান দিতে পারলে পুরষ্কার দেবার ঘোষণা করা হয়েছিলো। ১৯৭৫ সালের দিকে, তিনবছর বয়সী শিশুকন্যা রহিমা বানুর খোঁজ যখন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়, রহিমাকে নিজের বাড়িতে সবার থেকে আলাদা করে রাখার উদ্যোগ নেয়া যাতে আশেপাশের মানুষের মধ্যে এ রোগ ছড়াতে না পারে। ঐ এলাকায় দ্রুত সবাইকে গুটিবসন্তের টিকা দেয়া শুরু করা হয়। এছাড়াও পুরো গ্রামে গুটিবসন্ত নির্মূল কর্মসূচী থেকে নিযুক্ত একজন কর্মকর্তা পরীক্ষা করে দেখেন কারো মাঝে গুটিবসন্তের লক্ষণ পাওয়া যায় কিনা। রহিমার সুস্থতা নিশ্চিত হবার পরই কেবল তাকে পরিবারের সবার সাথে মিশতে দেয়া হয়।
পরবর্তীতে সোমালিয়ায় একজনকে খুঁজে পাওয়া যায়, যাকে প্রাথমিকভাবে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ভাবা হয়। বেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গুটিবসন্ত নির্মূল কর্মসূচীর একজন কর্মী নিশ্চিত করেন যে, মানুষটি গুটিবসন্তে আক্রান্ত। পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় চিকিৎসার মাধ্যমে তাকেও সুস্থ করে তোলা হয়।

সংক্ষেপে দেখুনডঃ এডওয়ার্ড জেনার; Image Source: The School Run
ডঃ জেনার সাহেব আবিষ্কৃত প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনুসরণ করে করে গুটিবসন্ত রোগকে পৃথিবী থেকে বিতাড়িত করতে প্রায় ২০০ বছরের মতো সময় লেগে যায়। এই গুটিবসন্তের টিকা ছিলো প্রথম আবিষ্কৃত টিকা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অবদানে টিকাদানের ফলে এই গুটিবসন্তই বর্তমানে প্রথম ও একমাত্র নির্মূলকৃত রোগ।
প্রতি ১০০ বছরেই কেন বিশ্বব্যাপী মহামারি দেখা দেয়?
১৭২০ সালের প্লেগ, ১৮২০ সালের কলেরা, ১৯২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লু, ২০২০ সালের করোনাভাইরাস ...এগুলো কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে? ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে যেখানেই মানুষের আনাগোনা কমেছে, পরিবেশ দূষণও কমতে শুরু করেছে। প্রকৃতি কি তাহলে তার ওপর আরোপিত অযাচিত দূষণ কমাতে নিজের পথ তৈরি করে নবিস্তারিত পড়ুন
১৭২০ সালের প্লেগ, ১৮২০ সালের কলেরা, ১৯২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লু, ২০২০ সালের করোনাভাইরাস… এভাবে প্রতি ১০০ বছরেই কেন বিশ্বব্যাপী মহামারি দেখা দেয়?
ফ্রান্সভিত্তিক ওয়েবপোর্টাল মেজুওল ডট কম একটা ইন্টারেস্টিং আর্টিকেল প্রকাশ করেছে সম্প্রতি। সেখানে তারা বলছে, প্রতি ১০০ বছরে একটা করে বৈশ্বিক মহামারি ছড়িয়ে পড়ছে। অন্তত গত ৪০০ বছরের ইতিহাস সে সাক্ষী দেয়। আসুন সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক সে ইতিহাস, তারপর না হয় প্রাসঙ্গিক আলাপে যাওয়া যাবে।
১৭২০ খ্রিষ্টাব্দ
বৃহৎ আকারে বৈশ্বিক বিবনিক প্লেগ দেখা গিয়েছিলো ১৭২০ সালে। এটাকে ‘দ্য গ্রেট প্লেগ অফ মার্সেইল’ বলা হয়। রেকর্ড অনুযায়ী এ ব্যাকটেরিয়াজনিত এ প্লেগে ১ লাখের বেশী মানুষ মারা গিয়েছিলো। ধারণা করা হয়ে থাকে, এ প্লেগের ব্যাকটেরিয়া মাছির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছিলো।
১৮২০ খ্রিষ্টাব্দ
বিশ্বের সর্বপ্রথম কলেরা মহামারি দেখা দেয় ১৮২০ সালে। এশিয়ার থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া হয়ে বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়েছিলো এ কলেরা। শুধুমাত্র এশিয়াতেই এক লাখের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো। উক্ত ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত পানি পান করেই এ কলেরা ছড়িয়েছিলো।
১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ
ঠিক ১০০ বছর আগে ১৯২০ সালে ঘটে যাওয়া এ মহামারি- পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে ভয়ঙ্কর মহামারি ছিলো। ৫০ কোটি আক্রান্তের মধ্যে ১০ কোটি মারা গিয়েছিলো এ স্প্যানিশ ফ্লুতে। এইচ১এন১ স্ট্রেইনের এই ইনফ্রুয়েঞ্জা জেনেটিক মিউটেশনের মাধ্যমে এ মহামারি ঘটিয়েছিলো। ঠিক এ ঘরানার বাকী স্ট্রেইনের ফ্লুর প্রাদুর্ভাব চীনেও দেখা গিয়েছে সাম্প্রতিককালে করোনাভাইরাস চলাকালে।
২০২০ খ্রিষ্টাব্দ
গত ৪০০ বছরের ইতিহাসে প্রতি শতকে মহামারির প্রাদুর্ভাবের কী শুধুই কাকতালীয়? সম্প্রতি চীনের উহান থেকে বিশ্বজুড়ে ছড়ানো করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ২ লাখেরও বেশি মানুষ। মৃত্যুবরণ করেছেন ৮ হাজারেরও বেশী। না জানি এই লাশের মিছিল কোথায় গিয়ে থামবে।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বিশ্বম্যাপ
গলছে বরফ- উন্মুক্ত হচ্ছে ভাইরাস
অ্যান্টার্কটিকার গ্লেসিয়ারগুলোকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর ‘প্রাকৃতিক ফ্রিজার’, যেখানে কয়েক হাজার বছরের পুরোনো মৃতদেহগুলো অনেকটা অক্ষত অবস্থায় বরফের নিচে চাপা রয়েছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে গ্লেসিয়ারগুলো গলতে শুরু করায় উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে সেই মৃতদেহগুলো। জমাটবদ্ধ বরফে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াগুলো এত বছর যাবত সুপ্ত অবস্থায় থাকলেও বরফ গলার সাথে সাথে সেগুলো পুনরায় জীবন্ত হতে শুরু করেছে।
বিজ্ঞানীরা এই অণুজীবগুলোর নাম দিয়েছেন ‘টাইম ট্রাভেলিং ভাইরাস’, ২০১৫ সালে তিব্বতের গলিত গ্লেসিয়ারের ওপর গবেষণা চালান সালে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের একটি দল। ১৫৪ ফুট গভীর গর্ত করে তারা ১৫ হাজার বছরের পুরোনো নমুনা সংগ্রহ করেন। ল্যাব পরীক্ষার পর সেই নমুনা থেকে ৩৩ ধরণের ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যার মধ্যে ২৮টি ভাইরাস বিজ্ঞানীদের কাছে একদমই নতুন। ২০১৬ সালে সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলে ১২ বছরের এক বালকের মৃত্যু ঘটে এবং একইসাথে আরও কিছু মানুষ অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন, যারা মূলত ‘বরফে জমাটবদ্ধ থাকা অ্যানথ্রাক্স ভাইরাস’ এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। বিবিসির রিপোর্টে তথ্যগুলোর সত্যতা মিলেছে।
কালের বিবর্তনে উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে গলতে থাকবে অ্যান্টার্কটিকার আরও অনেক গ্লেশিয়ার এবং সমুদ্রের পানিতে মিশতে থাকবে নাম না জানা আরও কিছু ভাইরাস, যেখানে এক ‘করোনাভাইরাস’ নিয়ন্ত্রণেই বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সর্বশক্তি ব্যর্থ হচ্ছে।
করোনায় আক্রান্ত হবার আগে ও পরের- পৃথিবীর পরিবেশ দূষণের স্যাটেলাইট থার্মাল ইমেজ
করোনায় আক্রান্ত হবার আগে ও পরের- পৃথিবীর পরিবেশ দূষণের স্যাটেলাইট থার্মাল ইমেজ গুগল করে চেক করে দেখুন প্লিজ। দেখলে মনে হবে, পৃথিবী নিজেই নিজেকে শান্ত করার মরণপণ চেষ্টা করছে। নিজেকে শান্ত করার এই চেষ্টায় একদিন হয়তো পৃথিবী নিজেকেই ধ্বংস করে ফেলবে। কী মনে হয়, কিছুদিন পর পর প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো কি অযথাই হয়? শুধু গজব বলে চালিয়ে দিলে হবে? সেই গজবের কারণ খুঁজে বের করতে হবে না?
প্রাসঙ্গিকভাবে আবারো ঐ একই প্রশ্ন এসে যায়, এগুলো কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে? আরেকটা বিষয় তুলে ধরি তাহলে। গত কিছুদিন ধরে করোনার মহামারিতে ইতালি লকডাউন করে দেয়া হয়েছে। এই লকডাউনের ফলাফল কি জানেন? ভেনিসের নালার পানিগুলো পরিস্কার হতে শুরু করেছে। সেখানে মাছের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। হাঁস সাঁতার কাটছে। কোস্টাল এরিয়াগুলোতে ডলফিনের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে যেখানে মানুষের আনাগোনা কমেছে, পরিবেশ দূষণও কমতে শুরু করেছে। প্রকৃতি কি তাহলে তার ওপর আরোপিত অযাচিত দূষণ কমাতে নিজের পথ তৈরি করে নিয়েছে?
অ্যানিমেইটেড ফিল্ম কুংফু পান্ডায় মাস্টার উগুয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। ‘দেয়ার আর নো অ্যাক্সিডেন্টস্। ওয়ান অফেন মিটস্ হিজ ডেস্টিনি অন দ্য রোড হি টেকস্ টু অ্যাভোয়েড ইট।’
কীটপতঙ্গদের কেনো ধন্যবাদ জানাবেন?
সাধারণ মানুষের কাছে কীটপতঙ্গ কোনো পছন্দনীয় প্রাণী নয়। মানুষমাত্রই কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় এসব থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করে। এই অপছন্দের কারণ কিন্তু খুব বেশি অযৌক্তিক নয়। ফসলে বা উপকারী উদ্ভিদের উপর পোকামাকড় আক্রমণ করে সেগুলোকে নষ্ট করে ফেলে, যে কারণে অনেক সময় মানবজাতির খাদ্যাভাব দেখা দেয়। এসব পোকামাকড়কে ববিস্তারিত পড়ুন
সাধারণ মানুষের কাছে কীটপতঙ্গ কোনো পছন্দনীয় প্রাণী নয়। মানুষমাত্রই কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় এসব থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করে। এই অপছন্দের কারণ কিন্তু খুব বেশি অযৌক্তিক নয়। ফসলে বা উপকারী উদ্ভিদের উপর পোকামাকড় আক্রমণ করে সেগুলোকে নষ্ট করে ফেলে, যে কারণে অনেক সময় মানবজাতির খাদ্যাভাব দেখা দেয়। এসব পোকামাকড়কে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় পেস্ট (Pest)। আবার অনেক পোকামাকড় মানুষের ভিতর নিজেদের রোগজীবাণু ছড়িয়ে দেয়, যা অনেক সময় তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এছাড়া কামড় দেয়া, শরীরের উপর বসে জীবাণু ছড়ানো ইত্যাদি বিভিন্ন কারণ তো আছেই। তাই নিজে থেকে কোনো সাধারণ মানুষ পোকামাকড়কে পছন্দ করবে সেটা ভাবা বোকামি। অথচ এই পোকামাকড় না থাকলে প্রকৃতিতে ভারসাম্য কিন্তু বজায় থাকতো না!

পোকামাকড় না থাকলে হয়তো পৃথিবীতে প্রাণীরা টিকে থাকতে পারতো না; Image Source: AnimalSake
প্রকৃতির এক অনবদ্য দান হচ্ছে এই কীটপতঙ্গ। প্রকৃতির সৃষ্ট কোনো কিছুই অকারণে সৃষ্টি হয় না। তার পেছনে ভারসাম্যতা বজায় রাখার একটা ব্যাপার কাজ করে। প্রকৃতিতে প্রাণীকুলের মধ্যে মানুষ আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে, কিন্তু মানুষের সাথে সাথে আরও যে যে প্রাণীকুল দেখতে পাওয়া যায় সেগুলোকে কি এমনি এমনি সৃষ্টি করা হয়েছে? এই প্রাণীদের কাজ কি শুধু মানুষের ক্ষতি করে বেড়ানো?
প্রত্যেকটি জীবের ভালো এবং খারাপ- দুটি দিকই আছে। তাই শুধু মাত্র ক্ষতি করার জন্যই যে পোকামাকড়ের সৃষ্টি হয়েছে সেটা ভেবে নেয়াটা ভুল। অথচ মানবজাতি তথা পুরো বিশ্বকে টিকিয়ে রাখতে এবং প্রকৃতিতে টিকে থাকতে এই কীটপতঙ্গের অবদান অপরিসীম। কম-বেশি আমরা সবাই প্রকৃতিতে কীটপতঙ্গের অবদান সম্পর্কে জানি। কিন্তু এই ব্যাপারটা আমরা কতটুকু অনুভব করেছি সেটা ভেবে দেখার বিষয়। আমরা যদি সত্যিই ব্যাপারটি অনুভব করতে পারি তাহলে আমরা পোকামাকড়দের ধন্যবাদ দিতে কখনোই পিছপা হবো না।
পরাগায়ন প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়াকলাপ। পরাগায়নের মাধ্যমে একই উদ্ভিদ তাদের ফুলের রেণুর মাধ্যমে আরও একটি জায়গায় একই প্রজাতির উদ্ভিদ উৎপন্ন করতে পারে। উদ্ভিদগুলোর প্রজাতি একই রকম হয়ে থাকে। এই পরাগায়নটা হয় কীটপতঙ্গের মাধ্যমে। যখন কীটপতঙ্গগুলো কোনো প্রজাতির উদ্ভিদ ফুলের উপর বসে তখন সেটার রেণু সেই পতঙ্গের গায়ে লেগে যায় এবং এই পতঙ্গ যখন একই প্রজাতির আরেকটি উদ্ভিদের উপর বসে তখন সেখানে পতঙ্গ থেকে সেই রেণু লেগে যায় এবং পরাগায়ন শুরু হয়। এই পরাগায়ন উদ্ভিদজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দান। বিভিন্ন ধরনের Monarch Butterfly, যেমন- মৌমাছি এবং এরকম আরও কীটপতঙ্গ এই পরাগায়নে সাহায্য করে।

প্রকৃতির এক অনবদ্য দান হচ্ছে এই কীটপতঙ্গ; Image Source: Canadian Geographic
মাদাগাস্কার দ্বীপে একধরনের অর্কিড পাওয়া যায়। এই অর্কিডের পরাগায়ন সম্ভব একধরনের মথের সাহায্যে। এই বিশেষ ধরনের মথ ছাড়া কোনোভাবেই এই অর্কিডের পরাগায়ন সম্ভব নয়। মথ নিজেও একধরনের পোকা। চার্লস ডারউইন প্রথম এই বিশেষ ধরনের অর্কিডের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে পারেন।
আবার এমন কিছু কিছু পোকা আছে যেগুলো অন্য পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে, যেমন- Plant Mantis। এই প্রজাতির পোকা বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে এবং বংশবৃদ্ধি করে। এই ক্ষতিকর পোকামাকড়গুলো আবার আমাদের ফসলের ক্ষতি করে। তাই প্রকৃতি নিজে থেকেই এই Plant Mantis সৃষ্টি করেছে যেটা Pest Control Service হিসেবে কাজ করে এবং যে নিজেই ক্ষতিকর প্রাণীগুলোকে শেষ করে দিচ্ছে, আর তাতে আমাদের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। এই Plant Mantis এর মধ্যে একধরনের জাত আছে যাকে বলে শিকারি ম্যানটিস (Praying Mantis)। এই জাতটি পেস্ট জাতীয় পোকামাকড়গুলোকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, যে কারণে এসব ক্ষতিকর পোকামাকড়ের সংখ্যা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

পরাগায়ন উদ্ভিদজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দান; Image Source: Living in the environment/ John Henry Williams-Bruce Coleman USA
কিছু কিছু পোকামাকড় আবার জৈব যৌগ ভেঙে ফেলতে পারে। যারা জাদুঘরে কাজ করে তারা পোকামাকড়ের এই গুণটি তাদের নিজেদের কাজে ব্যবহার করে। জাদুঘরে পুরনো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের কঙ্কাল দেখতে পাওয়া যায়। এই কঙ্কালগুলোকে পরিষ্কার করার জন্য তারা একটি বিশেষ ধরনের গুবরেপোকা ব্যবহার করে যেটা পশম জাতীয় জিনিসে জন্মায় এবং সেখানেই নিজস্ব কলোনি তৈরি করে। এই পোকাগুলো জৈব যৌগ, পশম, গালিচা ইত্যাদি খেয়ে ফেলতে পারে।
আবার কিছু কিছু পোকামাকড় আছে যারা মাটির নিচে থাকে এবং মাটিকে উর্বর রাখতে এবং নরম রাখতে সহায়তা করে। এই উর্বরতা বৃদ্ধির কারণে গাছপালা সহজে জন্মাতে পারে, যা প্রকৃতির টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন।

৪০০ মিলিয়ন বছর আগে এই পৃথিবীতে পোকামাকড়ের জন্ম হয়; Image Source: Geographical magazine
৪০০ মিলিয়ন বছর আগে এই পৃথিবীতে পোকামাকড়ের জন্ম হয়। অর্থাৎ মানুষের বর্তমান যে অবস্থা তার থেকে প্রায় ২,০০০ গুণ বেশি বছর আগে থেকে কীটপতঙ্গ-পোকামাকড়দের আনাগোনা পৃথিবীতে শুরু হয়। মানুষের থেকে বুদ্ধি এবং প্রজাতিগত উন্নতিতে পিছিয়ে থাকলেও কীটপতঙ্গ যুগ যুগ ধরে নিজেদেরকে প্রকৃতিতে খুব সফলতার সাথে টিকিয়ে রাখছে। তারা খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে। আশেপাশের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলার জন্য নিজেদের ভিতর নতুন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তৈরি করে নিতে পারে।
কিছু কিছু পোকামাকড় প্রকৃতিতে সফলভাবে টিকে থাকার জন্য নিজেদের প্রজাতি পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। প্রকৃতিতে এরকম বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এরকম বৈশিষ্ট্য খুব বেশি প্রাণীর মধ্যে দেখা যায় না। প্রাণীবিদরা এই বৈশিষ্ট্য প্রকৃতিতে সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন। বিখ্যাত বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইলসন, যিনি একাধারে একজন পিঁপড়া বিশেষজ্ঞ এবং জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ, বলেন যে, যদি পৃথিবীর সব ধরনের পোকামাকড়-কীটপতঙ্গ নিঃশেষ হয়ে যায় তাহলে এই পুরো পৃথিবীর প্রাণীকূল ধ্বংসের মুখে পতিত হবে। পৃথিবীতে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব না-ও থাকতে পারে এবং এতে অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীদেরও টিকে থাকতে সমস্যা হবে।

সংক্ষেপে দেখুনPlant Mantis – এই প্রজাতির পোকা বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে; Image Source: Living in the environment/ Peter J. Bryant_Biological Photo Service
বিজ্ঞানীরা কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় ইত্যাদি সংরক্ষণ করার জন্য অনেক ধরনের গবেষণা করছেন। বিখ্যাত একটি জার্নাল আছে, নাম Journal of Insect Conservation। এই জার্নালটিতে প্রতিবছর প্রকৃতি বিশেষজ্ঞরা পরিবেশে পোকামাকড়ের অবদান নিয়ে তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করে থাকেন। এগুলোর মধ্যে কিছু গবেষণাপত্র সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক এবং কিছু ব্যবহারিক। খুবই হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নাল এটি। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদেরকে নিয়েই মূলত লিখতে হয় এই জার্নালটিতে। পোকামাকড়ের শ্রেণীকরণ, তাদের অভ্যাস এবং ব্যবহার, বংশপরম্পরা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে এই জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়ে থাকে।
চোখের রং নীল হয় কেন?
মাঝে মাঝে চোখের রং আলাদা হওয়ার কারণে কেউ অনেক প্রশংসিত হয়, যেমন হয় ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের ছবিগুলো। আবার মাঝে মধ্যে চোখের রংয়ের কারণে কেউ কেউ দুঃখজনক মন্তব্য শুনে থাকে। এই যেমন আমার দেখা এক মেয়ের চোখের রং একটু আলাদা, এ কারণে তাকে রেফারেন্স দিতে গেলে অন্যরা বলে 'আরেহ আছে না ওই যে বিড়বিস্তারিত পড়ুন
মাঝে মাঝে চোখের রং আলাদা হওয়ার কারণে কেউ অনেক প্রশংসিত হয়, যেমন হয় ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের ছবিগুলো। আবার মাঝে মধ্যে চোখের রংয়ের কারণে কেউ কেউ দুঃখজনক মন্তব্য শুনে থাকে। এই যেমন আমার দেখা এক মেয়ের চোখের রং একটু আলাদা, এ কারণে তাকে রেফারেন্স দিতে গেলে অন্যরা বলে ‘আরেহ আছে না ওই যে বিড়ালের চোখের মতো চোখওয়ালী…’। মানুষের জাজমেন্ট করার ধরন আর মন্তব্যের রকমসকম যে কত রংয়ের হয়!
যাইহোক, চোখের রংয়ের এই পার্থক্য কি একেবারেই প্রাকৃতিক, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে? প্রশ্নটার উত্তর হয়ত আমরা অনেকেই জানি না, তাই কারো চোখের রংয়ের ভিন্নতায় আমরা অদ্ভুত মন্তব্য করে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করি।
রং-বেরং
প্রশ্ন হলো অধিকাংশ মানুষের চোখের রং কালো কেন? কারণ, আমাদের চোখে আছে ‘পিগমেন্টেড সেল’। পিগমেন্ট চোখে প্রবেশ করা আলো শুষে নেয়। ফলে চোখের রং কালো দেখায়। একটু ভেঙ্গে বলা যাক।
আপনার চোখের রংয়ের অংশটুকুকে বলা হয় আইরিস। এই আইরিসের গঠন দুই লেয়ারের, পেছনের লেয়ার হলো এপিথেলিয়াম এবং সামনের লেয়ারটি স্ট্রোমা। এপিথেলিয়ামে কালো, বাদামি পিগমেন্ট থাকে। আর স্ট্রোমা রংহীন ফাইবার দ্বারা গঠিত হয়ে থাকে। কখনো কখনো স্ট্রোমাতে মেলানিন নামক ডার্ক পিগমেন্ট থাকতে পারে, অথবা অনেক বেশি কোলাজেন ডিপোজিট থাকতে পারে। মূলত এই দুটি ফ্যাক্টরই চোখের রং কেমন হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে।
কালো, বাদামী, নীল- বিভিন্ন রংয়ের চোখ হয়
যেমন ধরুন, কারো চোখের রং বাদামি। সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে, তার স্ট্রোমায় উচ্চস্তরের মেলানিন বিদ্যমান, যা চোখে প্রবেশ করা আলোকে কৃষ্ণাভ রকমের রং দেয়। আবার ধরুন, কারো চোখের রং সবুজ। সেক্ষেত্রে আপনাকে বুঝতে হবে, সে ব্যক্তির চোখে মেলানিন একেবারে কম এবং কোলাজেন ডিপোজিটও নেই। ফলে, চোখ হয় সবুজ। তবে সবুজ রংয়ের চোখ অনেক বিরল।
নীল চোখ
সবচেয়ে ইন্টেরেস্টিং হলো নীল চোখ। যাদের নীল চোখ, তাদের স্ট্রোমাতে কোনো রং নেই। তাদের কোনো পিগমেন্টও নেই। ফলে পিগমেন্ট দ্বারা বিভিন্ন রংয়ের আলো চোখ শুষে নিতে পারে না। নীল চোখ যাদের তাদের কোলাজেন ডিপোজিটও নেই একেবারেই। এরফলে চোখের ভেতর যখন নানা রংয়ের আলো প্রবেশ করে বিক্ষিপ্তভাবে তারা চোখের পেছনের অংশে টিন্ড্যাল ইফেক্ট তৈরি হয়। এই টিন্ড্যাল ইফেক্ট নীল রং তৈরি করে।
অ্যালবিনিজম কী?
অ্যালবিনিজম বা লিউসিজমকে বলা হয় জন্মগত রোগ। এই রোগে আক্রান্তদের চুল, চোখ, ত্বক বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। আগেই বলেছি, আমাদের পিগমেন্ট সেলের কারণে আমরা স্বাভাবিক রংয়ের ত্বক, চোখ, দেহ পাই। এই পিগমেন্টের অভাবে হয় অ্যালবিনিজম। ফলে, এই রোগে আক্রান্ত মানুষরা কিছুটা ইউনিক রংয়ের চোখ বা ত্বকের অধিকারী হন।
টিন্ডাল ইফেক্টের কারণেই চোখের রং নীল হয়
অকুলার অ্যালবিনিজম
অ্যালবিনিজম দুই প্রকার, এর মধ্যে যে অ্যালবিনিজমের কারণে চোখের রং বদলে যায়, সেটাই অকুলার অ্যালবিনিজম। অকুলার অ্যালবিনিজমে মানুষের চোখের মণির রঙ সবুজ থেকে নীল এমনকি বাদামী রঙ ধারণ করতে পারে। এক্ষেত্রে খুব অল্প পরিমান পিগমেন্ট চোখে থাকে বলে আলো সরাসরি আইরিসে প্রতিফলিত হয়। যা তৈরি করে টিন্ড্যাল ইফেক্ট। বদলে যায় রং। বিজ্ঞান বলে, অকুলার অ্যালবিনিজম বংশানুক্রমে বিস্তার লাভ করে থাকে৷ পিতামাতার দুইজনই যদি অ্যালবিনিজম রোগের বাহক হয়ে থাকেন, তাহলে সন্তানেরও অ্যালবিনিজম হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
একটুখানি ইতিহাস
অকুলার অ্যালবিনিজম ছাড়াও চোখের রং নীল হতে পারে। কীভাবে? জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ধারার কারণে। আপনি যদি ইউরোপের মানুষদের দিকে তাকান, দেখবেন প্রচুর ভিন্নরংয়ের চোখসমৃদ্ধ মানুষ ঘুরছে চারদিকে। তারা কি সবাই রোগী? অবশ্যই না। এটা হয়েছে বংশানুক্রমিকভাবে। বিবর্তনের এক পর্যায়ে জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে যার সূত্রপাত, সেই ধারা অব্যাহত হচ্ছে অনেক সময় ধরে।
কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলে, চোখের রংয়ের এই বদলের উৎস খুঁজতে হলে ফিরতে হবে ১০ হাজার বছর আগে! বিজ্ঞানীরা বলছেন, আনুমানিক ৬ থেকে ১০ হাজার বছর পূর্বে জেনেটিক এক পরিবর্তন ঘটে এক জাতির মধ্যে। এই পরিবর্তন মেলানিন ও পিগমেন্টের উপরে হয় যা আমাদের ত্বক, চুল, চোখের রং নির্ধারণ করে। ক্রমোজমে থাকা OCA2 নামক একটি জিন বিবর্তনের কারণে চোখের রং নীল হতে শুরু করে। তার আগে পৃথিবীতে ছিল না কোনো নীল রংয়ের চোখ।
একটা ইন্টেরেস্টিং তথ্য গবেষণায় দাবি করা হয়। সেটা দিয়েই লেখাটি শেষ করি। গবেষণায় বলা হয়, যাদের চোখের রং নীল তাদের চোখের ডিএনএ প্রায় অনুরুপ, একই। অর্থাৎ, এই নীল চোখের মানুষগুলো সরাসরি সম্পর্কযুক্ত না হয়েও চোখের রংয়ের কারণে অলিখিত এক সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন নিজেদের অগোচরেই!
সংক্ষেপে দেখুনপৃথিবীর সব বরফ যদি গলে যায় তাহলে কী ঘটবে?
প্রকৃতির প্রতিশোধে যদি পৃথিবীর সব বরফ একসাথে গলে যায় তাহলেও কি আমরা পরিবেশ দূষণ বন্ধ করব? সে প্রশ্নের উত্তর অদৃষ্টের উপরেই ছেড়ে দেই। তবে আশা করছি আমাদের সাথে এমন কিছু হবে না, কিন্তু যদি হয়ে যায় তাহলে কি আপনি পুরো শহর সহ পানিতে ডুবে যাবেন? আসুন জেনে নেই পরিবেশ দূষণের প্রভাবে পৃথিবীর সমস্ত বরফ গলে গেলবিস্তারিত পড়ুন
প্রকৃতির প্রতিশোধে যদি পৃথিবীর সব বরফ একসাথে গলে যায় তাহলেও কি আমরা পরিবেশ দূষণ বন্ধ করব? সে প্রশ্নের উত্তর অদৃষ্টের উপরেই ছেড়ে দেই। তবে আশা করছি আমাদের সাথে এমন কিছু হবে না, কিন্তু যদি হয়ে যায় তাহলে কি আপনি পুরো শহর সহ পানিতে ডুবে যাবেন?
আসুন জেনে নেই পরিবেশ দূষণের প্রভাবে পৃথিবীর সমস্ত বরফ গলে গেলে আমাদের সাথে ঠিক কী হতে যাচ্ছে?
বেড়ে যাবে পানির উচ্চতা
আমাদের পৃথিবীর বেশ বড় একটা অংশ বরফে ঢাকা। রাতারাতি যদি সব বরফ গলে যায় তাহলে সমুদ্রের পানি প্রায় ২৫০ ফুট উপরে উঠে যাবে। আর এটুকুই যথেষ্ট আমাদের দেশের বড় বড় সব ব্রিজগুলো পুরোপুরি পানিতে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য। এরই সাথে সাথে ভারত এবং বাংলাদেশের অনেক বড় বড় শহর মুম্বাই, গোয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট এগুলোর সাথে আরো সাত মহাদেশের অনেকগুলো শহর পুরোপুরি পানিতে ডুবে যাবে। আর তখন না থাকবে মায়ামি শহর আর না থাকবে লন্ডন! এমনকি অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ জায়গা পানিতে ডুবে যাবে। এছাড়া আচমকা চলে আসা এই জলস্রোতে ভেনিস এবং নেদারল্যান্ড পৃথিবীর মানচিত্র থেকেই একদম ডুবে যাবে।
আফ্রিকা হয়ে যাবে জনমানবশূন্য
আফ্রিকাকে অন্যান্য দেশের মতো অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে না। আদতে যেটা বলতে চাচ্ছি সেটা হলো, আফ্রিকার অবস্থা তার থেকেও খারাপ অবস্থা হবে। হুট করেই সব বরফ গলে গেছে! তার মানে হলো পানির সাথে সাথে গরমও অনেক বেড়ে গেছে। আর এই অতিরিক্ত তাপমাত্রার সবচেয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে আফ্রিকার উপর। অস্বাভাবিক রকম গরম থাকার কারণে আফ্রিকা মহাদেশের অনেকগুলো অংশ একদম জনমানবশূন্য, এমনকি প্রাণীশূন্যও হয়ে যাবে। অত্যধিক গরমের কারণে সেখানে অনেক প্রাণীই বেঁচে থাকতে পারবে না।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ
অবশ্য এমন অনেক জায়গা থেকে যাবে পৃথিবীতে যেগুলো পুরোপুরি পানিতে ডুবে যাবে না তবে সেই জায়গাগুলোকে অনেক ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হবে। আপনার কি মনে হয়? এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কি মানব সভ্যতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে? না, ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। তবে এই দুর্যোগ থেকে যারা বেঁচে থাকবে তাদেরকে অনেক ধরনের প্রতিকূলতার সামনাসামনি করতে হবে। সব বরফ গলে যাওয়ার পর বাতাসে কার্বনডাইঅক্সাইড বেড়ে যাবে আর এর ফলাফলস্বরূপ বেঁচে থাকা মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীদের নিঃশ্বাস নিতে অনেক সমস্যায় ভুগতে হবে।
অনেক সামুদ্রিক প্রাণী বিলুপ্ত হতে থাকবে ধীরে ধীরে
এদিকে সমুদ্রের স্রোত তার গতিপথ বদলে ফেলবে, যার প্রভাব সামুদ্রিক প্রাণীদের উপরেও যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান থাকবে। এই আচমকা পরিবর্তনের মধ্যে তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে না, এরই মধ্যে অনেক প্রাণী এই পরিবর্তনের কারণে মারা পর্যন্ত যাবে। ফলাফল স্বরূপ অনেক সামুদ্রিক পানি এবং পোলার এনিমেল অর্থাৎ বরফে বাস করা প্রাণীরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর যারা বেঁচে থাকবে তাদের নিজেদের ঠিকানা এবং অভ্যাস বদলাতে হবে অবশ্যই।
ফুড চেনের উপর সরাসরি প্রভাব!
আর প্রকৃতির এই হাজারো পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি আমাদের ফুড সাপ্লাই চেনের উপরে এসে পড়বে। না আমরা নিজেদের জন্য শস্য উৎপাদন করতে পারব আর না অন্য প্রাণীদেরকে নিজেদের খাবারে রূপান্তর করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে প্রাণী খুঁজে পাব। কেননা পুরো প্রকৃতিই বরফ গলার সাথে সাথে অন্য রকম রূপ ধারণ করবে। মরুভূমিতে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হতে থাকবে আর যে সব জায়গায় আগে বৃষ্টি হতো সেখানে বৃষ্টি হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। যার কারণে আমাদের কৃষি কাজ আচমকা বাঁধার সম্মুখীন হবে এবং যার কারণে পুরো বিশ্বে খাদ্যের অভাব পড়ে যাবে।
সুনামির সংখ্যা বেড়ে যাবে
এদিকে বাতাসের গতি প্রকৃতিও পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে যাবে, সমুদ্রে বরফ না থাকার কারণে সূর্যের কিরণ প্রতিফলিত হবে না, যার ফলে সমুদ্রের পানি অনেক গরমের কারণে মেঘ হয়ে আকাশে থাকবে আর সব মেঘ পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে একত্র হয়ে সেখানে ভারী বর্ষণের সৃষ্টি করবে। আর এই ভারী বর্ষণ পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে নিয়ে আসবে অতিরিক্ত বন্যা। আবার এদিকে সমুদ্রের উপর একের পর এক তুফান এবং সাইক্লোনের সৃষ্টি হতে থাকবে, যার ফলে নিচু এলাকাগুলোকেও প্রচুর পরিমাণ বন্যার শিকার হতে হবে। এই ধরনের এলাকাগুলোতে ছোটখাটো একটা ভূমিকম্প অনেক বড় ধরনের সুনামি তৈরি করবে, আর সেই সুনামি আশেপাশের সব এলাকাকে পুরোপুরি নাস্তানাবুদ করে দিবে।
যেই দুনিয়াকে আজ আমরা দেখছি, সেটা ধ্বংসের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। অন্যান্য প্রাণীদের কথা বলা মুশকিল তবে মানব জাতি এভাবে ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে আশার কথা হলো, সবগুলো বরফ এক রাতের মধ্যেই গলে যাচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, খুব দ্রুততার সাথেই সব বরফ গলা শুরু করেছে। এমনকি আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফ এলাকা যেটা পুরো পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করছে, সেটাও গলা শুরু করেছে।
আর ঠিক এই কারণেই আমাদের এখনই থামতে হবে, আমরা যদি এখনই পরিবেশ দূষণ না থামিয়ে দেই তাহলে এই ধ্বংস কোনো ভাবেই থামানো যাবে না। আগামী পাঁচ হাজার বছরের মধ্যেই পৃথিবীর সবগুলো বরফ গলে যাবে। এমনিতে তো পাঁচ হাজার বছর অনেক বড় একটা সময়, তার আগেই কে জানে আমাদের পৃথিবীর উপর যদি কোনো উল্কাপিণ্ডের আঘাত আসে অথবা সমুদ্রের পানি পুরোপুরি শুকিয়ে যায়। কোনো কিছুই পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে না।
সংক্ষেপে দেখুনযুগে যুগে ব্যাটারি দেখতে কেমন ছিলো ?
আজকের যুগে মোবাইলের ভেতর সুদৃশ্যভাবে ব্যাটারি বসানো থাকে। সেসব ব্যাটারির ক্ষমতাও থাকে বেশ। চার্জারের মাথা মোবাইলে লাগিয়ে নিমিষেই চার্জ করে ফেলা যায় সেগুলো। সবার কাছেই এটা ভাত খাওয়া কিংবা জল খাওয়ার মতোই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন ব্যাটারি মোটেই স্বাভাবিক কিছু ছিল না। সামান্য একটু চার্বিস্তারিত পড়ুন
আজকের যুগে মোবাইলের ভেতর সুদৃশ্যভাবে ব্যাটারি বসানো থাকে। সেসব ব্যাটারির ক্ষমতাও থাকে বেশ। চার্জারের মাথা মোবাইলে লাগিয়ে নিমিষেই চার্জ করে ফেলা যায় সেগুলো। সবার কাছেই এটা ভাত খাওয়া কিংবা জল খাওয়ার মতোই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন ব্যাটারি মোটেই স্বাভাবিক কিছু ছিল না। সামান্য একটু চার্জের প্রভাব দেখে তাজ্জব বনে যেত বিজ্ঞানীরা। দিনের পর দিন কৌতূহল নিয়ে এর পেছনে পড়ে থাকত তারা। ব্যাটারি থেকে বের হওয়া বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ দেখার জন্য টিকিট কেটে অডিটরিয়ামে আসত সাধারণ মানুষেরা। আজকের যুগে ব্যাটারি যে অবস্থানে এসেছে তা একদিনে হয়নি। অল্প অল্প করে ধীরে ধীরে উন্নত হতে হতে এই অবস্থানে এসেছে। তারই কিছু টুকরো ইতিহাস নিয়ে এখানের আলোচনা।
১৭৮৬: লুইগি গ্যালভানি
গ্যালভানির ব্যাটারি আবিষ্কারের ব্যাপারটা বেশ মজার। তিনি জানতেনই না যে তিনি ব্যাটারি আবিষ্কার করেছেন। গ্যালভানি পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক। বিভিন্ন প্রাণী কাটাছেরা করা ছিল তার রুটিন মাফিক কাজ। একদিন একটা ব্যাঙ কেটে টেবিলের উপর রেখে দিলেন। ওদিকে তার সহকর্মী একটা ধাতব ছোরা এনে ব্যাঙয়ের গায়ে লাগাতেই কেটে রাখা মৃত ব্যাঙটির পা লাফিয়ে উঠল। এই ঘটনায় গ্যালভানি বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠেন। নানা রকমের বস্তুকে ব্যাঙয়ের গায়ে ছুঁয়ে পরীক্ষা করতে থাকেন।

লুই গ্যালভানি; Image Source: AwesomeStories
তিনি ধরে নিলেন ব্যাঙয়ের ভেতর কোথাও বিদ্যুৎ শক্তি সঞ্চিত থাকে। ধাতব বস্তু ছোঁয়ানো হলে সেটি মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসে, যার কারণে ব্যাঙয়ের পা লাফিয়ে উঠে। তবে এখানে আসলে ঘটছিল অন্য ঘটনা। ব্যাঙটিকে রাখা হয়েছিল একটি ধাতব ক্ষেত্রে। তার উপর রাখা হয়েছিল আরেকটি ধাতু। এক ধাতু থেকে আরেক ধাতুর মধ্যে বিদ্যুতের আদান প্রদান হচ্ছিল। এদের মধ্যে পরিবাহী হিসেবে ছিল ব্যাঙ। ব্যাঙ মরে গেলেও তার পেশীর কোষগুলো সচল ছিল। তাদের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবাহ হতেই সেগুলো নড়াচড়া করে উঠে। এখানে মূলত তৈরি হয়েছিল একটি ব্যাটারি। লিপিবদ্ধ ইতিহাসের প্রথম ব্যাটারিটি তিনিই তৈরি করেন, অথচ এর সম্বন্ধে নিজেই জানতেন না।
ভিডিওতে দেখুন- বিশেষ পরিস্থিতিতে মৃত ব্যাঙয়ের পা নড়াচড়া করে।
১৮০০: আলেসান্দ্রো ভোল্টা
ব্যাটারি বলতে সত্যিকার অর্থে যা বোঝায় সেটি সর্বপ্রথম তৈরি করেছিলেন আলেসান্দ্রো ভোল্টা। তার তৈরি করা ব্যাটারিটি অনেকটা এরকম- কতগুলো তামার পাত ও দস্তার পাত নেয়া হল। কার্ডবোর্ড কিংবা কাপড় দিয়ে এগুলোকে পরস্পর আলাদা করে রাখা। সেগুলো ডোবানো থাকে লবণের দ্রবণে। বর্তনী সংযোগ দিলে তাদের মধ্যে বিদ্যুতের প্রবাহ শুরু হয়। তবে ব্যবহারিক কাজের জন্য এই ব্যাটারি খুব একটা উপযোগী নয়। কাজ করে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তার উপর তামার পাতে হাইড্রোজেনের বুদবুদ জমে গিয়ে পাতের পরিবাহিতা কমিয়ে দেয়। একপর্যায়ে সেটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়।

আলেসান্দ্রো ভোল্টা (১৭৪৫-১৮২৭); Image Source: Time
উল্লেখ্য লুইগি গ্যালভানির কাজ নিয়েও তিনি গবেষণা করেছিলেন। তিনি ছিলেন গ্যালভানির বন্ধু ও শিস্য। তিনি প্রথমে গ্যালভানির ধারণাকে মেনেও নিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর এই ধারণা থেকে ফিরে আসেন।
১৮২০: ড্যানিয়েল সেল
ভোল্টার তৈরি করা ব্যাটারির স্থায়িত্ব কম হওয়ায় সেটি ব্যবহারিকভাবে মানুষের তেমন কাজে আসেনি। কিন্তু প্রয়োজন ঠিকই আছে মানুষের মাঝে। সে লক্ষ্যে ইংরেজ বিজ্ঞানী জন এফ ড্যানিয়েল নতুন ধরনের একটি ব্যাটারি তৈরি করেন। এটি ভোল্টার ব্যাটারি থেকে বেশি স্থায়ী। সেখানে কপার সালফেট ও জিংক সালফেটের তড়িৎদ্বার ব্যবহার করা হয়। এর নাম দেয়া হল ড্যানিয়েল সেল। স্থায়িত্ব বেশি হওয়াতে এটি বাসাবাড়ির টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, ডোরবেল ইত্যাদিতে ব্যবহার হতে লাগল। মানুষের ব্যবহারিক কাজে লাগলেই না কেবল একটি আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের প্রকৃত মাহাত্ম্য বোঝা যায়। ড্যানিয়েল সেল পরবর্তী ১০০ বছর পর্যন্ত মানুষের মাঝে স্থান দখল করে ছিল।

ড্যানিয়েল সেলের সরল রূপ; Image Source: Wikimedia Commons
১৮৫৯: রিচার্জেবল ব্যাটারি
এই পর্যায়ের আগে যত ব্যাটারি উদ্ভাবিত হয়েছে তাদের সবগুলোই ছিল একমুখী। ব্যাটারির ভেতরে যে উপাদান আছে সেগুলো বিদ্যুৎ হিসেবে ব্যবহার হয়ে গেলে সেগুলোকে পুনরায় ব্যবহার করা যায় না। ক্যামেলি আলফোনস ফাউর নামে একজন বিজ্ঞানী এমন একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন যেখানে ব্যাটারিকে পুনরায় ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ রিচার্জ করে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়। এতে তিনি ব্যবহার করেন লেড ও এসিড। এ ধরনের ব্যাটারি পরবর্তীতে ট্রেনে ও গাড়িতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়।

লেড এসিড ব্যাটারির বর্তমান রূপ; Image Source: B&H
১৯৪৯: অ্যালকালাইন ব্যাটারি
১৯৫০ সাল পর্যন্ত জিংক-কার্বন ব্যাটারি ব্যবহৃত হতো সকল ক্ষেত্রে। কিন্তু ব্যবহারের চাহিদা ও প্রয়োজনের তুলনায় এর আয়ু ছিল অনেক কম। যা ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীদের মনে অসন্তোষ নিয়ে আসে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য এগিয়ে আসে একটি ব্যাটারি কোম্পানি। এভ্রিডে ব্যাটারি কোম্পানি এই দিকটি উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দেয় লুইস ইউরি নামে এক বিজ্ঞানীকে। তিনি এই কাজটি বেশ ভালভাবেই সম্পন্ন করেন। এর মাঝে তিনি অ্যালকালাইন ব্যবহার করলেন এবং দেখলেন এটি প্রচলিত জিংক-কার্বন ব্যাটারির চেয়ে প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকেই ভালো ফলাফল দেয়।

অ্যালকালাইন ব্যাটারির বর্তমান রূপ; Image Source: Sportsman’s Guide
১৯৫৪: সৌর কোষ
সূর্যে প্রচুর শক্তি আছে। চেষ্টা করলে সেসব শক্তি মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহার করতে পারে। তার জন্য দরকার শুধু উপযুক্ত ব্যবস্থা। সৌর কোষ এমনই একটি ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় সৌরশক্তি বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সৌর কোষে কয়েক স্তরে সজ্জিত সিলিকনের স্ট্রিপ থাকে। এই স্ট্রিপগুলো সূর্যের আলোর প্রভাবে ইলেকট্রন ও হোল তৈরির মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি করে। ব্যাটারির চমৎকার এই প্রযুক্তিটি ১৯৫৫ সালের অক্টোবরে বাজারে আসে।

একটি সৌর কোষ; Image Source: Bauratgeber-Deutschland
১৯১২: লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি
লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ইতিহাসটা বেশ পুরনো। ১৯১২ সালের দিকে গিলবার্ট নিউটন লুইস লিথিয়াম ব্যাটারি নিয়ে গবেষণা করেন। কিন্তু তখন সেটি বাণিজ্যিকভাবে লভ্য হয়নি এবং একটা সময় পর এটি চাপা পড়ে যায়। পরবর্তীতে এই প্রযুক্তির কথা নতুন করে অনুভব করে গবেষকরা। কয়েক দশক ধরে কয়েক ধাপে উন্নয়নের পর জাপানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সনি ১৯৯১ সালে রিচার্জযোগ্য লিথিয়াম ব্যাটারি বাজারে আনে। ধীরে ধীরে এই ব্যাটারি এখন মোবাইল, ক্যামেরা, ল্যাপটপ সহ গুরুত্বপূর্ণ সব প্রযুক্তি পণ্যে আধিপত্য বিস্তার করছে।

মোবাইলে ব্যবহৃত লিথিয়াম আয়নের ব্যাটারি; Image Source: Pixel Ballads
বিশেষ: বাগদাদ ব্যাটারি
বাগদাদ ব্যাটারি ঠিক ব্যাটারি কিনা সে নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। অনেক অনেক আগের নমুনা বিধায় নিশ্চিত করে বলা বেশ কঠিন। যদি ব্যাটারি হয়ে থাকে তাহলে এটিই ব্যাটারির সবচেয়ে প্রাচীন নমুনা।
১৯৩৮ সালের ইরাক। মাটি খুড়তে গিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা পেলেন গোলকধাঁধাময় এক পাত্র। পাত্রের ভেতরে একটি লোহার পাত ঢুকানো এবং চারপাশে অন্য কোনো বস্তু থাকার জন্য ফাঁকা জায়গা। অনেকটা ব্যাটারির কোষের মতো। হিসেব করে জানা গেল এটি তৈরি করা হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ সালে।

সংক্ষেপে দেখুনবাগদাদ ব্যাটারির নমুনা; Image Source: may.tistory.com
এত আগেকার মানুষ ব্যাটারির মতো কোনোকিছু তৈরি করেছিল? করলে কী কাজের জন্য করেছিল? নাকি ব্যাটারি ছাড়া, ভিন্ন কোনো কারণে এই গঠন তৈরি করেছে? এর উত্তর এখন আর সহজে বলা সম্ভব নয়। দিনে দিলে অনেক বেলা গড়িয়ে গেছে। যদি সত্যিই এটি ব্যাটারি হয় তাহলে সে কালের মানুষদের নিয়ে আমাদের ধারণা পালটে ফেলতে হবে পুরোপুরি।